📄 দরিদ্রের মর্যাদা
রাসূলুল্লাহ (স)-এর আদর্শে ধনী-দরিদ্রের মানবীয় মর্যাদাগত কোন ভেদাভেদ ছিল না। প্রকৃত মর্যাদা মূল্যায়নের মানদণ্ড হইল মানুষের যোগ্যতা, গুণাবলী ও তাহার সত্যনিষ্ঠা। দরিদ্রদের অন্তরে সত্যনিষ্ঠা জাগ্রত করা এবং দারিদ্র্যের কষ্ট ভুলাইয়া দেওয়ার জন্য তিনি খুবই যত্নবান থাকিতেন। তিনি বলেন, দরিদ্রদের মধ্যে তোমরা আমাকে অন্বেষণ কর। কারণ তোমরা সাহায্য ও রিযিকপ্রাপ্ত হও তোমাদের দরিদ্রদের বদৌলতেই।
তিনি আরও বলেন, তোমরা বাহ্যিক অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করিও না। কেননা অনেক সময় কোন দুঃস্থ ব্যক্তি আল্লাহর নিকট এইরূপ মর্যাদার অধিকারী হইয়া থাকে যে, সে কোন শপথ করিলে তাহা তিনি পূর্ণ করেন।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, "জান্নাতে প্রবেশকারীদের অধিকাংশই হইবে দরিদ্র” (বুখারী, পৃ. ১৩৬২)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, দরিদ্রগণ ধনীদের পাঁচ শত বৎসর পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করিবে।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে অন্য একটি বর্ণনায় আসিয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, নিকৃষ্টতম বিবাহভোজ হইল যাহাতে কেবল ধনীদিগকে দাওয়াত করা হয় এবং বর্জন করা হয় দরিদ্রদিগকে।
তিনি আরও বলেন, যেই ব্যক্তি তাহার ভাইয়ের প্রয়োজন পূর্ণ করিবে, আল্লাহ তাহার প্রয়োজন পূর্ণ করিবেন। যেই ব্যক্তি কোন মুসলমানের বিপদ দূর করিবে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তাহাকে মহাবিপদ হইতে উদ্ধার করিবেন।
'আমর ইবনুল 'আছ (রা) বর্ণনা করেন, একদিন আমি মসজিদে নববীতে বসা ছিলাম। এক পাশে দরিদ্র মুহাজিরগণ গোল হইয়া বসিয়াছিলেন। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে নববীতে আগমন করিলেন এবং দরিদ্র মুহাজিরগণের সহিত বসিয়া পড়িলেন। তিনি বলিলেন, তোমরা সুসংবাদ শোন! তোমরা ধনীদের চল্লিশ বৎসর পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করিবে। বর্ণনাকারী বলেন, এই বাণী শুনিয়া তাহাদিগের শরীর আনন্দে শিহরিয়া উঠিল। আর আমার আফসোস হইল, হায়! আমি যদি তাহাদিগের অন্তর্ভুক্ত হইতাম।
সালমান (রা), বিলাল (রা) ও সুহায়ব (রা) পূর্ববর্তী জীবনে ক্রীতদাস ছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে তাহাদিগের মর্যাদা সম্ভ্রান্ত কুরায়শ সর্দারদের তুলনায় কোন অংশেই কম ছিল না বরং আবু বকর (রা)-এর সমতুল্য প্রভাবশালী ব্যক্তিও যদি তাহাদিগের মনে আঘাত দিতেন তাহা হইলেও তিনি তাঁহাকে ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ দিতেন এবং তাহাদের অসন্তুষ্টিকে আল্লাহর অসন্তুষ্টি বলিয়া ব্যক্ত করিতেন। এই প্রসঙ্গে বর্ণিত হইয়াছে, একদা সালমান (রা) ও বিলাল (রা) এক স্থানে বসা ছিলেন। এমন সময় কুরায়শ নেতা আবৃ সুয়ানের প্রতি তাঁহাদের দৃষ্টি পড়িল। তাঁহারা বলাবলি করিতে লাগিলেন, এখনও সত্যের তরবারি আল্লাহর এই দুশমনদের গর্দানের নাগাল পাইল না। আবু বকর (রা) এই কথা শুনিয়া বলিয়া উঠিলেন, কুরায়শ সর্দার সম্পর্কে তোমরা এতবড় কথা বলিয়াছ? রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া তিনি এই ঘটনা বিবৃত করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) ঘটনা শুনিয়া বলিলেন, আবূ বকর! আপনি তাহাদিগকে অসন্তুষ্ট করেন নাই তো? তাহারা যদি অসন্তুষ্ট হন, তবে আল্লাহ তা'আলাও অসন্তুষ্ট হন। এই কথা শুনিয়া আবূ বকর (রা) তৎক্ষণাৎ বিলাল ও সালমান (রা)-এর নিকট গেলেন এবং কাতর কণ্ঠে নিবেদন করিলেন, আপনারা আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হন নাই তো? তাঁহারা জবাব দিলেন 'না, আপনাকে ক্ষমা করিয়া দিলাম'।
রাসূলুল্লাহ (স) মর্যাদার ক্ষেত্রে পার্থিব দিক অপেক্ষা আত্মিক দিকেরই অধিক গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলিতেন, যদি গোটা ভূপৃষ্ঠ কলুষ আত্মা ধনাঢ্যদের দ্বারা পরিপূর্ণ হইয়া যায়, তথাপি তাহারা পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী একজন দরিদ্রের সমতুল্য হইতে পারে না।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে দরিদ্রদের মর্যাদা ছিল সর্বাধিক। তিনি তাহাদিগের প্রতি এমন সম্মান প্রদর্শন করিতেন যে, সম্পদহীনতার কথা তাহারা ভুলিয়া যাইত। একবার মাত্র সামান্য অসাবধানতাবশত ইসলামের স্বার্থে এই নীতির পরিপন্থী একটি ঘটনা ঘটিয়া যায়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর পক্ষ হইতে এইজন্য সাবধানবাণী নাযিল হয়। ঘটনাটি হইল এইরূপ: একবার রাসূলুল্লাহ (স) কতিপয় কুরায়শ সর্দারের সঙ্গে বসিয়া ইসলামের দাঁওয়াত সম্পর্কে আলোচনা করিতেছিলেন। এই সময় অন্ধ ও দরিদ্র সাহাবী আবদুল্লাহ ইব্ন উম্মে মাকতুম (রা) আসিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে একটি দীনী বিষয়ে আলোচনা শুরু করিলেন। কুরায়শ নেতৃবর্গ ছিল অত্যন্ত অহংকারী। তাহাদের সামনে একজন অন্ধ ও দরিদ্র ব্যক্তি আসিয়া পড়াতে তাহাদিগের অহমিকাবোধ আহত হইল। রাসূলুল্লাহ (স) সাময়িকভাবে কুরায়শ নেতৃবর্গের মন রক্ষার্থে আবদুল্লাহ ইব্ন উম্মে মাকতুম (রা)-এর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করিলেন না। কিন্তু আল্লাহ্র নিকট এই ব্যবহার পসন্দ হইল না। এই প্রসঙ্গে এই আয়াত নাযিল হইল:
عَبَسَ وَتَوَلَّى أَنْ جَاءَهُ الْأَعْمَى، وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّهُ يَزْكَّى أَوْ يَذَّكَّرُ فَتَنْفَعَهُ الذِّكْرَى. أَمَّا مَنِ اسْتَغْنَى فَأَنْتَ لَهُ تَصَدَّى وَمَا عَلَيْكَ أَلا يَزْكُى، وَأَمَّا مَنْ جَاءَكَ يَسْعَى وَهُوَ يَخْشَى. فَأَنْتَ عَنْهُ تَلَهَى.
"সে ভ্রুকুঞ্চিত করিল এবং মুখ ফিরাইয়া লইল। কারণ, তাহার নিকট অন্ধ লোকটি আসিয়াছে। তুমি কেমন করিয়া জানিবে, সে হয়ত পরিশুদ্ধ হইত অথবা উপদেশ গ্রহণ করিত। ফলে উপদেশ তাহার উপকারে আসিত। পক্ষান্তরে যে পরোয়া করে না, তুমি তাহার প্রতি মনোযোগ দিয়াছ। অথচ সে নিজে পরিশুদ্ধ না হইলে তোমার কোন দায়িত্ব নাই। অন্যপক্ষে যে তোমার নিকট ছুটিয়া আসিল আর সে সশংক চিত্ত, তুমি তাহাকে উপেক্ষা করিলে"।
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, কুরায়শদের কতিপয় সর্দার রাসূলুল্লাহ (স)-এর পাশ দিয়া যাইতেছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট সুহায়ب (রা), বিলাল (রা), খাব্বাব (রা) ও 'আম্মার (রা) প্রমুখ দরিদ্র সাহাবীগণ বসা ছিলেন। তাহারা বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ (উপহাসমূলক সম্বোধন)! আপনার সম্প্রদায়ের মধ্য হইতে কি এই সমস্ত দরিদ্র লোককেই পসন্দ হইল? ইহারাই কি সেই লোক যাহাদের উপর আল্লাহ তা'আলা অনুগ্রহ করিয়াছেন? আমাদেরকে কি তাহাদের অনুকরণ করিয়া চলিতে হইবে? আমরা এই শর্তে আপনার মজলিসে উপস্থিত হইতে সম্মত আছি যে, আপনি মজলিস হইতে নিম্ন শ্রেণীর লোকদিগকে দূরে সরাইয়া দিবেন। তখন আল্লাহ তা'আলা দরিদ্রদের মর্যাদা প্রদান প্রসঙ্গে এই আয়াত নাযিল করেন :
وَلَا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاوَةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ ، مَا عَلَيْكَ مِنْ حِسَابِهِمْ مِنْ شَيْءٍ وَمَا مِنْ حِسَابِكَ عَلَيْهِمْ مِّنْ شَيْءٍ فَتَطْرُدَهُمْ فَتَكُوْنَ مِنَ الظَّلِمِينَ.
"যাহারা তাহাদের প্রতিপালককে প্রাতে ও সন্ধ্যায় তাঁহার সন্তুষ্টি লাভার্থে ডাকে তাহাদিগকে তুমি বিতাড়িত করিও না। তাহাদের কর্মের জবাবদিহির দায়িত্ব তোমার নয় এবং তোমার কোন কর্মের জবাবদিহির দায়িত্ব তাহাদের নয় যে, তুমি তাহাদিগকে বিতাড়িত করিবে। করিলে তুমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হইবে" (৬:৫২)।
মুসলমান দরিদ্রগণ আল্লাহর প্রিয় বান্দা। আল্লাহ তা'আলার নিকট তাহাদের মর্যাদা অভাবনীয়। রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদিগকে জিজ্ঞাসা করিবেন, দেখ তো, আমার প্রিয় বান্দাগণ কোথায়? ফেরেশতাগণ নিবেদন করিবে, হে আল্লাহ! কাহারা আপনার প্রিয় বান্দা? আল্লাহ তা'আলা উত্তর দিবেন, তাহারা দরিদ্র মুসলমান। যাহা কিছু আমি পৃথিবীতে তাহাদিগকে দান করিয়াছি তাহাতে তাহারা সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত ছিল। সুতরাং তাহাদের সকলকেই জান্নাতে লইয়া যাও। আদেশ পাওয়ামাত্র ফেরেশতাগণ তাহাদিগকে সর্বাগ্রে জান্নাতে লইয়া যাইবে। এইদিকে অন্যসব মানুষ তাহাদের হিসাব-নিকাশের দায়ে আবদ্ধ থাকিবে।
একদিন রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণের সঙ্গে মজলিসে উপবিষ্ট ছিলেন। সামনে দিয়া এক ব্যক্তিকে যাইতে দেখিয়া তিনি পাশের একজনকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এই লোকটি সম্পর্কে তোমার কি ধারণা? সাহাবী উত্তর দিলেন, সম্ভ্রান্ত আমীর শ্রেণীর লোক। আল্লাহর শপথ! তাহার এতটুকু যোগ্যতা আছে যে, সে যদি কোথাও বিবাহের প্রস্তাব দেয় তবে তাহা সাদরে গৃহীত হয়, যদি কোন সুপারিশ করে তবে তাহা কবুল হয়। উত্তর শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন। ইতোমধ্যে আরেকজন লোককে যাইতে দেখা গেল। রাসূলুল্লাহ (স) সেই লোককে জিজ্ঞাসা করিলেন, এই লোকটি সম্পর্কে তোমার কি ধারণা? সাহাবী উত্তর দিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! একজন দরিদ্র মুহাজির। কোন ভাল ঘরে বিবাহপ্রার্থী হইলে তাহারা বিমুখ হইবে, কোথাও সুপারিশ করিলে কেহ তাহার কথা শুনিবে না। কোন ফরিয়াদ করিলে কেহ তাহার কথায় কান দিবে না। ইহার পর তিনি ইরশাদ করিলেন, তোমার সেই আমীর লোকটির মত মানুষ দ্বারা যদি সমগ্র পৃথিবীও ভরিয়া যায়, তবুও তাহাদের সকলের চেয়ে এই দরিদ্র লোকটি অনেক ভাল।
📄 দীন-দুঃখীদের প্রতি মমত্ববোধ
রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন দুঃস্থ ও দীন-দুঃখীদের একান্ত আপনজন, দরদী বন্ধু। তিনি তাহদিগকে মায়া-মমতা ও ভালবাসার অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ করিয়াছিলেন। তিনি তাহদিগকে শুধু ভালবাসিতেন তাহাই নহে, বরং তাহাদের মত হওয়ার কামনা করিতেন এবং অন্যদেরকেও তাহাদেরকে ভালবাসার নির্দেশ দিতেন। তিনি দু'আ করিতেন, "হে আল্লাহ! আমাকে দরিদ্রাবস্থায় জীবিত রাখিও, দরিদ্রাবস্থায় মৃত্যু দিও এবং দরিদ্রদের সঙ্গে হাশরে একত্র করিও”। 'আইশা (রা) জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি এইরূপ দু'আ করিলেন কেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, কারণ দরিদ্রগণ ধনীদের ৪০ বৎসর পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করিবে। হে 'আইশা। গরীবদেরকে কখনও বিমুখ করিবে না। এক টুকরা খurমা হইলেও তাহাদের দান কর। হে 'আইশা। তুমি দরিদ্র লোকদেরকে ভালবাসিও এবং তাহাদিগকে তোমাদের নিকটবর্তী করিয়া লইও; তাহা হইলে আল্লাহও তোমাকে তাঁহার নিকটবর্তী করিয়া লইবেন।
একবার কয়েকজন দরিদ্র মুসলমান আসিয়া নিবেদন করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সম্পদশালিগণ পরকালের ব্যাপারে আমাদের অগ্রে চলিয়া যাইতেছে। নামায-রোযা আমরা যেইরূপ আদায় করি, তাহারাও সেইরূপই আদায় করে। কিন্তু সাদাকা-খায়রাতের মাধ্যমে যেই নেকী তাহারা সঞ্চয় করিতেছে তাহা হইতে আমরা বঞ্চিত থাকিয়া যাইতেছি। তখন রাসুলুল্লাহ (স) ইরশাদ করিলেন, এমন পন্থা কি আমি তোমাদিগকে বলিয়া দিব যাহার দ্বারা তোমরা অগ্রে চলিয়া যাইবে এবং পরে আর কেহ তোমাদের মুকাবিলা করিতে পারিবে না। সাহাবীগণ আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ। অবশ্যই বলুন। তিনি বলিলেন, প্রত্যেক নামাযের পর ৩৩ বার করিয়া সুবহানাল্লাহ ও আলহামদু লিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়িয়া লও।
আবদুল্লাহ যুল-বিজাদায়ন (রা) একজন নিতান্ত দরিদ্র সাহাবী ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের অপরাধে তাঁহার সম্প্রদায় তাঁহার উপর নির্যাতন চালাইত। লজ্জা নিবারণের একটি ছেড়া কাপড় ছাড়া তাঁহার আর সব কিছুই তাহারা ছিনাইয়া নিল। তিনি পালাইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে চলিয়া আসিলেন। তাবুকে তিনি ইন্তিকাল করেন। রাসূলুল্লাহ (স) আবু বকর ও উমার (রা)-সহ রাতের অন্ধকারে তাঁহার জানাযায় গমন করেন। তিনি স্বয়ং কবরে অবতরণ করিলেন এবং দু'আ করিলেন, হে আল্লাহ! আমি তাহার উপর সন্তুষ্ট, তুমিও তাহার উপর সন্তুষ্ট হইয়া যাও।
জনৈক দরিদ্র হাবশী মসজিদে নববীতে ঝাড়ু দিতেন। হঠাৎ তাহার মৃত্যু হইলে সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (স)-কে না জানাইয়া তাহাকে দাফন করিলেন। তিনি কয়েক দিন তাহাকে না দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিয়া জানিতে পারিলেন, তাহার মৃত্যু হইয়াছে। মহানবী (س) অভিযোগ করিলেন, আমাকে সংবাদ দিলে না কেন? সাহাবীগণ উত্তর দিলেন, তাহার জানাযার জন্য আপনাকে কষ্ট দেওয়া সমীচীন মনে করি নাই। তখন রাসূলুল্লাহ (স) সেই লোকটির কবরস্থানে দাঁড়াইয়া তাহার জন্য দু'আ করিলেন।
📄 দরিদ্রদের প্রতি সহানুভূতি
রাসূলুল্লাহ (স) দরিদ্রের প্রতি পরম সহানুভূতিশীল ছিলেন। সর্বদা তাহাদের কল্যাণ কামনা করিতেন। তিনি তাহাদিগকে দান করিতেন, অন্যদেরকেও দান করার প্রতি উৎসাহিত করিতেন। বিভিন্নভাবে তিনি তাহাদের প্রয়োজন পূর্ণ করিতেন। দরিদ্রের প্রতি তাঁহার সহানুভূতিশীলতার বর্ণনা দিয়া হযরত খাদীজা (রা) বলেন, আল্লাহ কখনও আপনাকে লাঞ্ছিত করিবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী, ঋণগ্রস্তকে দায়মুক্তকারী, অভাবীর জন্য উপার্জনকারী, অতিথি আপ্যায়নকারী এবং বিপদে মানুষকে সাহায্যকারী।
কাহাকেও দুঃখ-কষ্টে দেখিলে তিনি অস্থির হইয়া উঠিতেন। তাহাদের সু-ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত তাঁহার চেহারায় প্রশান্তির চিহ্ন দেখা যাইত না।
কোন ব্যক্তি দরিদ্রের উপর স্বীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করিলে তিনি বলিতেন, তোমরা যাহা কিছু অধিকারীয় হইয়াছ তাহা মেহনতীদের বদৌলতেই।
যদি কেহ কোন দরিদ্রকে মন্দ বলিত, তাহা হইলে তিনি অতিশয় অসন্তুষ্ট হইতেন এবং ইহাকে জাহিলী যুগের আচরণ বলিতেন।
গরীব-দুঃখী ও নিরাশ্রিতদের সাহায্য করনার্থে বানু হাশিম ও অন্যান্য গোত্রের কিছু সংখ্যক সদ্ হৃদয় ব্যক্তির মাঝে ‘হিলফুল-ফুযূল’ চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তিতে রাসূলুল্লাহ (স) খুব গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলিতেন : ইহা হইতে দূরে থাকিবার জন্য। যদি আমাকে উৎকৃষ্ট জাতের এক শত উটও প্রদান করা হয়, তথাপি আমি তাহাতে সম্মত হইব না এবং এখনও যদি কেহ আমাকে সেই চুক্তির নামে আহবান করে, তবে অবশ্যই আমি উহাতে লাব্বায়িক বলিব।
একটি গোত্রের লোক ইসলাম গ্রহণের পরপরই দুর্ভিক্ষের শিকার হয়। অর্থাভাবের কারণে রাসূলুল্লাহ (স) তখন যায়দ ইব্ন সা‘য়াহ নামক জনৈক ইয়াহূদী হইতে ৪০ দীনার ঋণ গ্রহণ করিয়া তাহাদিগের খাদ্যসামগ্রীর ব্যবস্থা করিয়া দেন।
আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা) হইতে বর্ণিত। কতিপয় দরিদ্র আনসারী সাহাবী রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট আসিল এবং কিছু চাহিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে কিছু দান করিলেন। তাহারা পুনরায় চাহিল, রাসূলুল্লাহ (স) আবার কিছু দিলেন। এইভাবে তিনবার দান করিলেন। এমন কি রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট যাহা কিছু ছিল সব নিঃশেষ হইয়া গেল। তখন তিনি বলিলেন, দেখ আমার হাতে যতক্ষণ কিছু থাকিবে আমি কখনও তাহা তোমাদিগকে না দিয়া সঞ্চয় করিব না। তবে মনে রাখিও, যে ব্যক্তি ভিক্ষা চাওয়া হইতে বাঁচিয়া থাকিবার জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করে আল্লাহ তাহাকে তাহা হইতে বাঁচাইয়া রাখেন। আর যে ব্যক্তি আত্মনির্ভরশীলতার জন্য দু'আ করে আল্লাহ তাহাকে আত্মনির্ভরশীল করিয়া দেন।
একবার একজন দরিদ্র সাহাবী রোযা অবস্থায় স্ত্রী-সহবাস করিয়া বসে। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (س)-এর দরবারে আসিয়া নিবেদন করিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তো বরবাদ হইয়া গিয়াছি। রোযাবস্থায় স্ত্রী সহবাস করিয়াছি। ইহা হইতে পরিত্রাণের উপায় কি? রাসূলুল্লাহ (س) জিজ্ঞাসা করিলেন, একটি গোলাম আযাদ করিতে পারিবে? সে উত্তর দিল, না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, দুই মাস ক্রমাগত রোযা রাখিতে পার? লোকটি উত্তর দিল, ইহাও আমার পক্ষে সম্ভব নহে। তবে ষাট জন মিসকীনকে খাওয়াইতে পার? সে বলিল, আমি খেজুর পাইব কোথায়? রাসূলুল্লাহ (س) কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিলেন। ইতোমধ্যে কিছু খেজুর আসিলে তিনি সেইগুলি তাহাকে দিয়া বলিলেন, মদীনার দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করিয়া দাও। খেজুর হাতে লইয়া সে বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ। মদীনায় আমার চেয়ে দরিদ্র আর কেহ নাই। তাহার এই অকপট সরলতা দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) হাসি সংবরণ করিতে পারিলেন না। হাসিতে হাসিতে তিনি বলিলেন, যাও, তবে তোমার পরিবারের লোকদিগকেই বণ্টন করিয়া দাও।
অনেক দরিদ্র শ্রেণীর অশিক্ষিত লোক রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে পানির পাত্র লইয়া উপস্থিত হইত। তাহাদিগের বিশ্বাস ছিল, এই পানিতে তাঁহার পবিত্র হাতের স্পর্শ পড়িলেই তাহা বরকতময় হইয়া যাইবে। প্রচণ্ড শীতের দিন সকাল বেলায়ও যদি কেহ পানি লইয়া আসিত, তবুও তিনি কাহাকেও নিরাশ করিতেন না।
একবার জনৈক বেদুঈন আসিয়া দেখিল, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে একটি বৃহৎ ছাগলের পাল রহিয়াছে। সে তাহার দরিদ্র্যতার কথা নিবেদন করিলে সঙ্গে সঙ্গে গোটা ছাগলের পালই তিনি তাহাকে দিয়া দিলেন। বেদুঈন তাহার গোত্রে গিয়া প্রচার করিতে লাগিল, তোমরা সকলে ইসলাম গ্রহণ কর। মুহাম্মাদ (স) এমন একজন উদার লোক যে, নিজে দরিদ্র হইয়া যাইবেন এইরূপ ভয় না করিয়াই মুক্তহস্তে দান করিতে থাকেন।
আরবের শ্রেষ্ঠ সম্পদ ছিল ফলবান বাগ-বাগিচা। তৃতীয় হিজরীতে মুখায়রীক নামক বানু নাদীর গোত্রীয় এক ইয়াহূদী মৃত্যুর সময় অত্যন্ত উৎকৃষ্ট সাতটি বাগান রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য ওয়াক্ত করিয়া যায়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) বাগানগুলির একটিও নিজের জন্য রাখেন নাই, ছিন্নমূল দরিদ্রদের কল্যাণে ওয়াক্ত করিয়া দেন। শেষ পর্যন্ত বাগানগুলির আয় গরীব মিসকীনদের মধ্যেই বণ্টিত হইত।
জনৈক দরিদ্র সাহাবী ওলীমার জন্য কিছু সাহায্য চাহিতে আসিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়া দিলেন, 'আইশার ঘরে এক টুকরী আটা আছে, উহাই চাহিয়া লও। সাহাবী কথামত আটা লইয়া চলিয়া গেলেন। কিন্তু খোদ রাসূলুল্লাহ (স)-এর ঘরে এই আটা ছাড়া খাওয়ার জন্য আর কিছুই ছিল না।
মিকদাদ (রা) বর্ণনা করেন, আমি ও আমার অন্য দুইজন সঙ্গী এত দরিদ্র ছিলাম যে, অভুক্ত থাকিতে থাকিতে শেষ পর্যন্ত আমাদের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হইয়া গেল। আমাদের প্রতিপালনের জন্য অনেকের নিকট নিবেদন করিয়া ব্যর্থ হওয়ার পর আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে আবেদন পেশ করিলাম। নবী করীম (স) আমাদের দুরবস্থা দেখিয়া আমাদিগকে বাড়িতে লইয়া গেলেন এবং তিনটি বকরী দেখাইয়া বলিলেন, এই তিনটি বকরী দোহন করিয়া পান করিতে থাক। এই তিনটি বকরীর দুধ পান করিয়া আমাদের দিন কাটিয়া যাইতে লাগিল।
হাকীম ইবন হিযাম (রা) মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। একবার তিনি আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট কিছু চাহিলে তিনি তাঁহাকে কিছু দিলেন। এইভাবে তিনবার চাহিলে তিনবারই তাঁহাকে কিছু দান করিলেন। ইহার পর বলিলেন, দেখ হাকীম! এই অর্থ-সম্পদ সবুজ মিষ্ট জিনিস। যাহারা আত্মনির্ভরতার জন্য তাহা গ্রহণ করে, তাহারা তাহাতে বরকত পায়। আর যাহারা লোভের বশবর্তী হইয়া সম্পদ আহরণে লাগিয়া যায়, তাহারা বরকত হইতে বঞ্চিত হয়। মনে রাখিও, উপরের হাত নীচের হাত অপেক্ষা উত্তম। নবী করীম (স)-এর এই উপদেশ তাঁহার মনে এমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করিল যে, অবশিষ্ট জীবনে কাহারও কাছে কোন মামুলি বস্তুর জন্যও তিনি হাত বাড়ান নাই।
ধনী-দরিদ্র, আমীর-ফকীর সকলের সাথে তিনি সমান আচরণ করিতেন। আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, একবার রাসূলুল্লাহ (স) আমার বাড়ীতে তাশরীফ আনিলেন। তিনি খাবার পানি চাহিলে আমি দুধ প্রদান করিলাম। মজলিসের বামে আবূ বকর (রা), মধ্যস্থলে উমার (রা) এবং ডান দিকে জনৈক বেদুঈন বসা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) দুধপান শেষ করিলে উমার (রা) ইশারা করিয়া বলিলেন যেন অবশিষ্ট দুধটুকু আবূ বকরের হাতে দেওয়া হয়। কিন্তু দুধের পিয়ালা ডান দিকে উপবিষ্ট বেদুঈনের হাতেই দেওয়া হইল।
মুসলমানদের নিকট হইতে যাকাতের যেই অর্থ সংগৃহীত হইত সেই সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাধারণ নির্দেশ ছিল, এই সমস্ত অর্থ ধনবানদের নিকট হইতে সংগ্রহ করিয়া সেই এলাকার দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করা হইবে। আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) যখন মু'আয (রা)-কে ইয়ামানে পাঠান তখন তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, তাহারা যদি তোমার ডাকে সাড়া দেয় তাহা হইলে তাহাদের কর্তব্য হইবে যাকাত ও সদাকা আদায় করা। এই অর্থ ধনীদের নিকট হইতে লইয়া দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করা হইবে।
জারীর (রা) বর্ণনা করেন, একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে বসা ছিলাম। এমন সময় ছিন্নমূল একটি গোত্র আসিয়া উপস্থিত হইল। তাহাদের অবস্থা এতই শোচনীয় ছিল যে, শিশু, যুবক, বৃদ্ধ কাহারও শরীরে কাপড় ছিল না। নগ্ন পদ, ছিন্ন বসন, গলায় একেকটি তরবারি ঝুলানো ছিল। পশুর চামড়া দিয়া কেহ কেহ লজ্জা নিবারণের চেষ্টা করিতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স) ইহাদের দুরবস্থা দেখিয়া এইরূপ উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িলেন যে, তাঁহার চেহারার রং পরিবর্তিত হইয়া গেল। তিনি অস্থির হইয়া একবার ভিতরে আরেকবার বাহিরে আসা-যাওয়া করিতে লাগিলেন। নামাযের সময় ঘনাইয়া আসিলে বিলাল (রা)-কে আযান দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। নামাযের পর মর্মস্পর্শী ভাষণ দিয়া সকল সাহাবীকে এই ছিন্নমূলদিগকে সাহায্য করিবার জন্য উৎসাহিত করিলেন।
'এক বেদুঈن রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিল এবং কিছু চাহিল। তিনি তাহাকে দান করিলেন এবং বলিলেন: আমি তোমার সঙ্গে সদাচরণ করিয়াছি তো? বেদুঈন বলিল, না, তুমি সদাচরণ কর নাই। সাহাবীগণ তাহার প্রতি রাগ করিলেন। তিনি তাহাদিগকে বারণ করিলেন এবং তাহাকে লইয়া ভেতর বাড়িতে প্রবেশ করিলেন, ইহার পর আরও বেশী দান করিলেন এবং বলিলেন: আমি তোমার সঙ্গে সদাচরণ করিয়াছি তো? তখন সে বলিল, হাঁ! আল্লাহ তোমাকে ও তোমার পরিজনকে ইহার বিনিময় দান করুন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি যাহা বলিলে উহা সাহাবীগণের সামনে গিয়া আবার বল যাহাতে তোমার প্রতি তাহাদের মনের ক্ষোভ দূর হইয়া যায়। বেদুঈন লোকটি তাহাই করিল।
আবু উমামা (রা) বর্ণনা করেন, এক নারী পুরুষদের সাথে নির্লজ্জের মত অশ্লীল কথাবার্তা বলিত। একবার সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর পাশ দিয়া যাইতেছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (স) একটি উচু জায়গায় বসিয়া 'ছারীদ' (খাদ্য বিশেষ) খাইতেছিলেন। সেই নারী বলিয়া উঠিল, তাহাকে দেখ, গোলামের ন্যায় বসিয়াছে, গোলামের ন্যায় খাইতেছে। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমার চেয়ে অধিক বেশী দাসত্ব অবলম্বন করিবে আর কে? সে বলিল, সে খাইতেছে, আমাকে খাওয়াইতেছে না। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, তুমিও খাও। সে বলিল, আমাকে নিজ হাতে দিন। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে দিলেন। সে বলিল, আপনার মুখ হইতে বাহির করিয়া দিন। রাসূলুল্লাহ (স) মুখ হইতে বাহির করিয়া দিলেন। ফলে তাহার লজ্জা-শরম প্রবল হইয়া গেল। আমরণ সে আর অশ্লীল কথা বলে নাই।
তিনি দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতির পাশাপাশি অন্যদিগকে তাহাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার জন্য উৎসাহিত করিয়াছেন। ইবন উমার (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেন, যেই ব্যক্তি তাহার মুসলমান ভাইয়ের প্রয়োজন ও সংকট নিরসনে সচেষ্ট হয়, আল্লাহ তা'আলা তাহার প্রয়োজন পূর্ণ করিয়া দিবেন। আর যেই ব্যক্তি কোন মুসলমানের একটি দুঃখ লাঘব করিবে আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তাহার একটি দুঃখ লাঘব করিয়া দিবেন।
আবূ মূসা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, তোমরা কয়েদীকে মুক্ত কর, ক্ষুধার্তকে অন্ন দাও এবং অসুস্থদের সহিত দেখা-সাক্ষাত কর।
ক্ষুধার্তকে অন্নদানে আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্ট হন, এই মর্মে তিনি ইরশাদ করেন, হাশরের দিন আল্লাহ তা'আলা বলিবেন, হে আদম সন্তান। আমি তোমার কাছে অন্ন চাহিয়াছিলাম, তুমি তো আমাকে অন্ন দাও নাই। সে বলিবে, হে আল্লাহ। আপনি তো আমার রব, সারা জাহানের প্রতিপালক। আপনাকে আমি অন্ন দিতাম কি করিয়া? আল্লাহ বলিবেন, আমার এক বান্দা ক্ষুধার্ত হইয়া তোমর কাছে অন্ন চাহিয়াছিল। তাহাকে অন্ন দান করিলে সেইখানেই আমাকে পাইতে। অতঃপর আল্লাহ বলিবেন, হে আদম সন্তান! আমি তৃষ্ণাকাতর হইয়া পানি চাহিয়াছিলাম, তুমি তো আমাকে পানি দাও নাই। বান্দা বলিবে, হে আমার প্রভু! আপনি তো সারা জাহানের প্রতিপালক। আমি আপনাকে পানি পান করাইতাম কীভাবে? আল্লাহ বলিবেন, আমার এক বান্দা তৃষ্ণার্ত হইয়া তোমার কাছে পানি চাহিয়াছিল। তাহাকে পানি পান করাইলে সেইখানে আমাকে পাইতে।
তিনি ইরশাদ করেন, "ভিক্ষুককে দাও, যদিও সে ঘোড়ায় আরোহণ করিয়া আসে”। জাবির (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে কিছু চাওয়া হইয়াছে আর তিনি দেন নাই এইরূপ কখনও ঘটে নাই।
দানের প্রতি উৎসাহিত করিয়া তিনি বলেন, তিন ব্যক্তি সম্পর্কে আমি শপথ করিয়া বলিতেছি, তোমরা মনে রাখিও, যেই ব্যক্তি দান করে তাহাতে তাহার সম্পদ কমে না। যেই ব্যক্তির প্রতি অত্যাচার করা হয় সে যদি ধৈর্যধারণ করে তাহা হইলে আল্লাহ পাক অবশ্যই তাহাকে সম্মানিত করিবেন। আর যেই ব্যক্তি নিজের জন্য ভিক্ষার পথ খুলিয়া দেয়, আল্লাহ তা'আলা তাহার জন্য দারিদ্র্যের পথ খুলিয়া দিবেন। তিনি আরও বলেন, রুটির একটি টুকরা দিয়া হইলেও জাহান্নামের আগুন হইতে বাঁচিতে চেষ্টা কর।
দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতিশীল রাসূলুল্লাহ (স) একদিকে বিত্তবানদিগকে আহবান করিয়াছেন তাহাদের অসহায় দরিদ্র ভাইদের প্রতি অনুগ্রহের হাত সম্প্রসারিত করিতে, অন্যদিকে দরিদ্রদিগকে নিষ্কর্মা বসিয়া থাকা ও ধনীদের অর্থ-সম্পদের উপর নির্ভরশীল থাকিবার পরিবর্তে পরিশ্রম করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিতে উৎসাহিত করিয়াছেন। তিনি বলেন, তোমাদের কেহ রশি হাতে পাহাড়ে গিয়া কাঠ কাটিয়া তাহা বাজারে বিক্রয় করিবে আর সেই ওসীলায় আল্লাহ তা'আলা তাহাকে জীবিকা দান করিবেন ইহা মানুষের সামনে হস্ত প্রসারিত করার চেয়ে অনেক উত্তম।
তিনি আরও বলেন, নিজ হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাবার আর নাই। তিনি আরও বলেন, ঐ জীবিকাই সর্বোৎকৃষ্ট যাহা মানুষ স্বহস্তে উপার্জন করে। আল্লাহর নবী দাউদ (আ) নিজ হাতে উপার্জন করিতেন।
শ্রমিকের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করিয়া তিনি বলেন, শ্রমিকের শরীরের ঘর্ম শুকাইবার পূর্বেই তোমরা তাহাকে তাহার পারিশ্রমিক দিয়া দাও। হাদীছে কুদসীতে আছে, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাদী হইয়া দাঁড়াইব, আর আমি যাহার বিরুদ্ধে যাই তাহাকে পরাজিত করিয়াই ছাড়ি। আমি যেই তিনজনের বিরুদ্ধে বাদী হইব তাহাদের একজন হইল সেই ব্যক্তি, যে শ্রমিকের নিকট হইতে পূর্ণভাবে শ্রম আদায় করিয়া লইয়াছে অথচ পারিশ্রমিক পরিশোধ করে নাই।
ভিক্ষাবৃত্তি ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট অসহনীয় ঘৃণ্য বিষয়। এইজন্য কেহ ভিক্ষা করিতে নামিলে তিনি তাহাকে বারণ করিতেন, বর্ণনা করিতেন ইহার অশুভ পরিণামের কথা। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করিবে সে আল্লাহর সামনে এমন অবস্থায় সাক্ষাত করিবে যে, তাহার চেহারায় এক টুকরা গোশতও অবশিষ্ট থাকিবে না।
অন্যত্র তিনি বলেন, যেই ব্যক্তি আমার সাথে এই মর্মে অঙ্গীকারাবদ্ধ হইবে যে, সে কোন দিন ভিক্ষাবৃত্তিতে নামিবে না, তাহার জান্নাত লাভের দায়িত্ব আমি স্বয়ং গ্রহণ করিলাম।
রাসূলুল্লাহ (স) কখনও ভিক্ষুকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করিয়া দিতেন। একবার জনৈক আনসারী রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ভিক্ষা চাহিতে আসিলে তিনি তাহাকে বলিলেন, তুমি ভিক্ষা চাহিয়া বেড়াও কেন? তোমার কি কোন সম্বল নাই? লোকটি বলিল, একটি পানি পান করার লোটা এবং গায়ে দেওয়ার মত একটি কম্বল আছে। নবী করীম (স) বলিলেন, তাহাই লইয়া আস। লোকটি তাহা লইয়া আসিল। রাসূলুল্লাহ (স) নিজেই নিলামে তুলিয়া দুই দিরহামের বিনিময়ে তাহা বিক্রয় করিয়া দিলেন। এক দিরহাম দিয়া একটি কুঠার ক্রয় করিয়া নিজেই ইহার একটি হাতল লাগাইয়া দিলেন এবং বলিলেন, যাও! জঙ্গলে গিয়া কাঠ কাটিয়া জীবন পরিচালনা কর। মনে রাখিও, পনর দিনের মধ্যে যেন আমি তোমার দেখা না পাই। কিছুদিন পর দেখা গেল উক্ত লোকটির উন্নতি হইয়াছে। সে সুন্দর কাপড় পরিয়া নবী করীম (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, অপরের সামনে ভিক্ষার হাত সম্প্রসারিত করিয়া কিয়ামতের দিন লাঞ্ছিত হওয়ার পরিবর্তে ইহাই তোমার জন্য উত্তম পথ।
গনীমত হিসাবে দাস-দাসী আসিলে তিনি তাহাদের উপর নিজ আত্মীয়-স্বজন, এমনকি স্নেহময়ী কন্যা ফাতিমা (রা)-এর তুলনায় দরিদ্রদের অধিকার অধিক মনে করিতেন।
তিনি দরিদ্রদের প্রতি এতই সহানুভূতিশীল ছিলেন যে, কেহ কিছু সওয়াল করিলে তাহাকে কিছু না কিছু অবশ্যই দিতেন। হাতের কাছে না থাকিলে পরে দেওয়ার জন্য অঙ্গীকার করিতেন। ইহার ফলে লোকজন এমন ভয়-লেশশূন্য হইয়া পড়িয়াছিল যে, একদা নামাযে দাঁড়ানোর সময় জনৈক বেদুঈন আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাদর জড়াইয়া ধরিল। সে বলিতে লাগিল, আমার আরও একটি প্রয়োজন রহিয়া গিয়াছে, পরে হয়ত ভুলিয়া যাইব, তাই এক্ষণই আসিয়া পূরণ করিয়া দিন। রাসূলুল্লাহ (স) বিনা বাক্যব্যয়ে তাহার সঙ্গে চলিয়া গেলেন এবং তাহার প্রয়োজন মিটাইয়া আসিয়া নামায পড়িলেন।
দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনে তিনি আনন্দ পাইতেন। একদা এক ব্যক্তি কিছু প্রার্থনা করিল। এই সময় তাঁহার হাতে কিছুই ছিল না। তিনি বলিলেন, আমার হাতে তো কিছু নাই, তবে তুমি আমার সঙ্গে আস। উমর (রা) তাঁহার সঙ্গে ছিলেন। তিনি বলিলেন, আপনার হাতে যখন কিছুই নাই তখন এই লোকের কোন দায়-দায়িত্ব তো আপনার উপর বর্তায় না। সঙ্গে অন্য একজন সাহাবীও ছিলেন। তিনি নিবেদন করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি নিশঙ্ক চিত্তে দিয়া যাইতে থাকুন। আরশের মালিক আল্লাহ কখনও আপনাকে পরমুখাপেক্ষী করিবেন না। এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার পবিত্র চেহারা মুবারক উজ্জ্বল হইয়া উঠিল।
📄 ক্রীতদাসদের প্রতি মমত্ববোধ
দাস-দাসীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। বিশ্ব ইতিহাসে তিনিই সর্বপ্রথম ক্রীতদাসদিগকে তাহাদের বৈধ ও মৌলিক অধিকার প্রদানের জন্য নানাবিধ বাস্তব পন্থা অবলম্বন করিয়াছেন এবং বিভিন্ন ইবাদতের মধ্যে দাসমুক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করিয়াছেন। যেমন কেহ পবিত্র রমাযান মাসে স্ত্রী-সহবাস করিলে কিংবা ভুলবশত কাহাকেও হত্যা করিলে অথবা আল্লাহর নামে শপথ করিয়া ভঙ্গ করিলে ইহার কাফফারাসমূহের একটি হইল দাসমুক্ত করা।
এমনিভাবে তিনি দাসমুক্তির ব্যাপারে মানুষকে উৎসাহিত করিয়াছেন, বর্ণনা করিয়াছেন দাসমুক্তির অনেক ফযীলত। তিনি ইরশাদ করেন, যেই ব্যক্তি কোন গোলাম আযাদ করিল আল্লাহ তা'আলা আযাদকৃত গোলামের প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে আযাদকারীর প্রতিটি অঙ্গকে জাহান্নাম হইতে মুক্তি দিবেন, এমনকি গোলামের গোপনাঙ্গের বিনিময়ে তাহার গোপনাঙ্গকে জাহান্নাম হইতে মুক্তি দিবেন।
বারা'আ (রা) বলেন, একজন লোক রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে আগমন করিয়া বলিলেন, আমাকে এমন কাজের কথা বলিয়া দিন যাহা জান্নাতকে নিকটবর্তী করিবে, আর জাহান্নামকে করিবে দূরে। তিনি ইরশাদ করিলেন, দাসমুক্ত কর এবং দাসমুক্তিতে সহযোগিতা কর।
রাসূলুল্লাহ (স) দাসদিগকে নিজেদেরই সমতুল্য মানুষ মনে করিতেন এবং তাহাদের মানবিক অধিকার রক্ষার প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখিতেন। মাসরূক ইব্ন মু'আয়ি্যদ (র) বর্ণনা করেন, আমি একবার আবু যার গিফারী (রা)-কে দেখিলাম, তাঁহার শরীরে যেই পোশাক তাঁহার দাসের শরীরেও সেই পোশাক। আমি ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি উত্তরে বলিলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুগে এক ব্যক্তিকে বকাঝকা করিয়াছিলেন। ইহাতে রাসূল (স) বলিলেন, এখনও তোমার মধ্যে মূর্খ যুগের অহমিকা বিদ্যমান। দেখ, ইহারা তোমাদেরই ভাই, তোমাদেরই সহযোগী। মহান আল্লাহ্ তাহাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করিয়াছেন। সুতরাং তোমরা যাহা আহার করিবে তাহাদিগকে তাহাই আহার করাইবে। যাহা পরিবে, অহাই পরাইবে। আর তাহাদেরকে এমন কাজ দিবে না যাহা তাহারা করিতে পারিবে না। যদি দাও তাহা হইলে তাহাদেরকে সাহায্য করিবে।
আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, ক্রীতদাসকে তাহার পানাহার দাও, পরিধেয় বস্ত্র দাও এবং তাহাকে সাধ্যাতীত কাজে বাধ্য করিও না।
জীবনের সর্বশেষ ওসিয়াতেও রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের অধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করিতে ভুলেন নাই। আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর শেষ কথা ছিল, সালাতের পাবন্দী কর এবং ক্রীতদাসদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর মালিকানায় কোন দাস-দাসী আসিলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাহাকে মুক্ত করিয়া দিতেন। কিন্তু তাহারা নবী করীম (স)-এর সহানুভূতির বন্ধন হইতে কোন কালেই মুক্ত হইতে চাহিত না। মাতা-পিতার স্নেহ এবং আত্মীয়-স্বজনের মায়া-মমতা উপেক্ষা করিয়া তাহারা আজীবন এই মহান দরবারের দাসত্ব করিয়াই কাটাইয়া দিত। তিনি নিজ ক্রীতদাস যায়দ (রা)-কে মুক্তি দিয়া দত্তক গ্রহণ করিয়াছিলেন। যায়দের পিতা তাহাকে লইয়া যাইতে আসিলে দরবারে রিসালাতের মমতার বন্ধনের কাছে পিতৃস্নেহের দাবি হার মানিল। যায়দ (রা) বাকি জীবন এই দরবারেই থাকিয়া গেলেন।
তিনি যায়দ পুত্র উসামাকে এত অধিক ভালবাসিতেন যে, কোন স্বজনের প্রতিও অনুরূপ ভালবাসা পরিলক্ষিত হইত না। এক উরুতে উসামাকে ও অন্য উরুতে হাসান (রা)-কে বসাইয়া বলিতেন, হে আল্লাহ! আমি তাহাদিগকে যেমন ভালবাসি, অনুরূপ তুমিও ভালবাসিও। একবার কয়েক ব্যক্তির পক্ষে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমীপে সুপারিশের প্রয়োজন হইলে উসামা (রা) অপেক্ষা তাঁহাদের নিকট অধিক প্রিয় আর কাহাকেও তাহারা ধারণা করিল না।
সাহাবীগণ তাঁহাকে হিব্বুর-রাসূল (রাসূলের স্নেহভাজন) আখ্যা দিতেন। তাঁহাকে তিনি এত অধিক স্নেহ করিতেন যে, নিজ হাতে তাহার নাক পর্যন্ত পরিষ্কার করিয়া দিতেন। তিনি বলিতেন, উসামা যদি মেয়ে হইত তবে আমি তাহাকে অলঙ্কার তৈরি করিয়া দিতাম। তিনি আরও বলিতেন, হে 'আইশা! আমি তাহাকে ভালবাসি, সুতরাং তুমিও তাহাকে ভালবাসিও।
দাস-দাসীদের কল্যাণ ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি তিনি এত অধিক যত্নবান ছিলেন যে, তাহাদিগকে গোলাম নামে অভিহিত করা তিনি কখনও পসন্দ করিতেন না। তিনি বলিতেন, তোমাদের কেহ যেন স্বীয় দাস-দাসীকে আমার গোলাম, আমার দাসী বলিয়া উল্লেখ না করে। অনুরূপ ক্রীতদাসও যেন তাহার মালিককে আমার প্রভু না বলে; বরং মনিব বলিবে, আমার পুত্র (ইবনী) বা কন্যা (বিনতী) এবং ক্রীতদাস বলিবে, আমার নেতা।
কা'ব ইবন 'উযরা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেন, দাস-দাসীরা তোমাদের থালা-বাটি ভাঙ্গিয়া ফেলিলে তাহাদিগকে মারধর করিও না। কারণ পাত্রেরও মেয়াদ আছে তোমাদের ন্যায়।
তিনি বলিতেন, যেই ব্যক্তি তাহার দাস-দাসীকে থাপ্পড় মারে কিংবা অন্য কোনরূপ প্রহার করে, তাহার এইরূপ আচরণের প্রতিকার হইল সেই দাস-দাসীকে মুক্তি প্রদান।
যদি তিনি জানিতে পারিতেন যে, কোন ব্যক্তি তাহার দাসকে প্রহার করিয়াছে, তবে তিনি তাহাকে উপদেশ দিতেন সে যেন দাসটিকে মুক্তি দিয়া দেয়।
নিঃস্ব ইয়াতীম ও অসহায় বিধবার প্রতি রাসূলুল্লাহ (স) বিশেষভাবে সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি তাহাদের কল্যাণ সাধনে সচেষ্ট থাকিতেন, অন্যদিগকেও ইহার প্রতি উৎসাহিত করিতেন এবং উল্লেখ করিতেন তাহাদের পরিচর্যাকারীদের অনেক ফযীলত। তিনি বলেন, যে কেহ কোন বিধবা ও মিসকীনের কল্যাণ সাধনে সচেষ্ট থাকে, সে আল্লাহ্ পথে জিহাদরত কিংবা ঐ ব্যক্তির সমতুল্য, যে দিনে রোযা রাখে এবং সারা রাত ইবাদতে কাটায়।
সাহল ইবন সা'দ (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার দুইটি আঙ্গুল উচু করিয়া বলেন, আমি ও ইয়াতীমের অভিভাবক বেহেশতের মধ্যে এইভাবে থাকিব। অর্থাৎ এই আঙ্গুল দুইটির অবস্থান যেমন একেবারে কাছাকাছি, আমার ও ইয়াতীমের অভিভাবকের অবস্থানও হইবে ঠিক তেমনি কাছাকাছি।
আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (س) বলেন, মুসলমানদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট গৃহ হইল যেখানে একজন ইয়াতীম বসবাস করে এবং তাহার সাথে সদাচরণ করা হয়। আর সর্বনিকৃষ্ট গৃহ ঐটি যেখানে কোন ইয়াতীম বসবাস করে এবং তাহার সাথে অসদাচরণ করা হয়। আর সর্বনিকৃষ্ট গৃহ হইল যেখানে কোন ইয়াতীম বাস করে কিন্তু তাহার সহিত দুর্ব্যবহার করা হয়।
আবূ উমামা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (س) বলেন, যেই ব্যক্তি কেবল আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোন ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলাইবে, তাহার হাতের নীচের প্রতিটি চুলের পরিবর্তে সে অসংখ্য নেকী পাইবে। আর যেই ব্যক্তি তাহার নিকট প্রতিপালিত কোন ইয়াতীম মেয়ে অথবা ছেলের সাথে সদ্ব্যবহার করিবে, আমি ও সে জান্নাতে এইভাবে থাকিব, এই বলিয়া তিনি নিজের দুইটি আঙ্গুল একত্রে মিলাইলেন।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী করীম (স)-এর নিকট আসিয়া নিজের পাষাণ হৃদয় হওয়ার অভিযোগ পেশ করিল। তিনি বলিলেন, ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলাও এবং অসহায় মিসকীনকে খাবার দাও। অন্যত্র তিনি বলেন, যেই ব্যক্তি মুসলমানদের কোন ইয়াতীমকে তাহার পানাহারে অন্তর্ভুক্ত করিয়া লইবে, অনন্তর সে অভাবমুক্ত হয়, তাহার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হইবে।
রাসূলুল্লাহ (স) ইয়াতীম ছিলেন, ইয়াতীমদের দুঃখ-বেদনা বুঝিতেন সহজে, অনুভব করিতেন হৃদয় দিয়া। আল্লাহ তা'আলাও ইয়াতীম-মিসকীনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার জন্য তাঁহাকে নির্দেশ দিয়াছেন। তিনি বলেন:
اَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَأَوَى وَوَجَدَكَ ضَالاً فَهَدَى وَوَجَدَكَ عَائِلاً فَاَغْنَى فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلاَ تَقْهَرْ وَأَمَّا السَّائِلَ فَلاَ تَنْهَرْ، وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدَّثْ
"তিনি কি তোমাকে ইয়াতীম অবস্থায় পান নাই, আর তোমাকে আশ্রয় দান করেন নাই? তিনি তোমাকে পাইলেন পথ সম্পর্কে অনবহিত, অতঃপর পথের নির্দেশ দিলেন। তিনি তোমাকে পাইলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর অভাবমুক্ত করিলেন। সুতরাং তুমি ইয়াতীমের প্রতি কঠোর হইও না এবং প্রার্থীকে ভর্ৎসনা করিও না। তুমি তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের কথা জানাইয়া দাও" (৯৩ঃ ৬-১১)।
রাসূলুল্লাহ (স) এই আয়াতের উপর পরিপূর্ণভাবে আমল করিয়াছেন। বশীর ইব্ন আকরাবা আল-জুহানী (রা) বলেন, উহুদের যুদ্ধের দিন মহানবী (س)-এর সঙ্গে আমার সাক্ষাত হইল। জিজ্ঞাসা করিলাম, আমার পিতার কি অবস্থা? তিনি উত্তর দিলেন, সে তো শহীদ হইয়াছে। তাহা শুনিয়া আমি কান্নায় ভাঙ্গিয়া পড়িলাম। তখন স্বস্নেহে রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে ধরিলেন, আমার মাথায় তাঁহার কোমল হাত বুলাইলেন, তুলিয়া লইলেন স্বীয় বাহনে এবং বলিলেন, আমি তোমার পিতা, আ'ইশা তোমার মাতা, ইহাতে কি তুমি সন্তুষ্ট নও? প্রিয় নবী (স)-এর এই স্নেহাচারণে বিমোহিত হইল ইয়াতীম, ভুলিয়া গেল পিতৃ বিয়োগের সকল যাতনা।
রাসূলুল্লাহ (স) ইয়াতীম মিসকীনকে অত্যন্ত ভালবাসিতেন, তাহাদের পরিচর্যা করিতেন। মূলত ইয়াতীমের পরিচর্যা করা, ভালবাসার পরশে তাহাদের মাথায় হাত বুলাইয়া দেওয়া ঈমানের অঙ্গ এবং তাহাদিগকে বিমুখ করা, তাড়াইয়া দেওয়া কুফরীর নামান্তর। এই মর্মে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
ارَيْتَ الَّذِي يُكَذِّبُ بِالدِّينِ. فَذَلِكَ الَّذِي يَدُعُ الْيَتِيمَ، وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ المِسْكِينِ .
"তুমি কি দেখিয়াছ তাহাকে, যে বিচারের দীনকে অস্বীকার করে? সে তো সে-ই যে ইয়াতীমকে রূঢ়ভাবে তাড়াইয়া দেয় এবং সে অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দানে উৎসাহ দেয় না" (১০৭:১-৩)।
ইয়াতীম-মিসকীনের প্রতি একান্ত সহানুভূতিশীল রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র জীবন ছিল আল-কুরআনের বাস্তব নমুনা। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتْمَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلُونَ سَعِيراً .
“যাহারা ইয়াতীমের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে, তাহারা তো তাহাদের উদরে অগ্নি ভক্ষণ করে। তাহারা অচিরেই জ্বলন্ত আগুনে জ্বলিবে” (৪ : ১০)।
আল্লাহ তা'আলার এই ঘোষণা রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার কর্মজীবনে বাস্তবায়িত করিতে যাইয়া সবাইকে নির্দেশ করেন, তোমরা সাতটি ধ্বংসকর বিষয় হইতে বিরত থাক: ১. আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা; ২. যাদু করা; ৩. অহেতুক আল্লাহর নিষিদ্ধ জীব হত্যা করা; ৪. সূদ খাওয়া; ৫. ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ করা; ৬. জিহাদ হইতে পালাইয়া যাওয়া; ৭. সতী-সাধ্বী মুসলিম নারীর উপর ব্যভিচারের দোষারোপ করা।
রাসূলুল্লাহ (স) গনীমতের মালেও নির্দিষ্টি করিয়াছেন ইয়াতীমের অংশ। গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের চার-পঞ্চমাংশ তিনি বণ্টন করিতেন যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈনিকদের এবং অবশিষ্টাংশ ইসলামী রাষ্ট্রের বায়তুল-মাল বা জাতীয় ধনভাণ্ডারের মাধ্যমে মাতৃ-পিতৃহীন নাবালক-মিসকীন, অসহায় পথিক এবং আল্লাহর রাসূল ও তাঁহার আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বণ্টন করিতেন। কারণ পবিত্র করআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِّنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتْمَى وَالْمَسَاكِينَ وَابْنِ السَّبِيلِ.
"আরও জানিয় রাখ যে, যুদ্ধে যাহা তোমরা লাভ কর তাহার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর, রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীনদের এবং পথচারীদের" (৮:৪১)।
তিনি ইয়াতীমদের প্রতি এত সহানুভূতিশীল ছিলেন যে, তাহাদিগকে নিজ কন্যা ও আত্মীয়-স্বজনের উপর অগ্রাধিকার দিতেন। একবার কোন এক যুদ্ধের পর ফাতিমা (রা) ও যুবায়র (রা)-এর কন্যাগণ উপস্থিত হইয়া তাহাদিগের অভাব ও দারিদ্র্যের কথা উল্লেখ করিয়া যুদ্ধলব্ধ বাঁদীদের মধ্য হইতে দুই-একটি তাহাদিগকে দেওয়ার জন্য আবেদন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) এই বলিয়া তাহাদিগকে নিবৃত্ত করিলেন যে, বদরের ইয়াতীমগণ তোমাদের পূর্বেই আবেদন করিয়া রাখিয়াছে। তাহাদের দাবি তোমাদের তুলনায় অগ্রগণ্য।
অসহায় বিধবার প্রতি তাঁহার সহানুভূতি ছিল অপরিসীম। তিনি তাহাদের কাজ করিয়া দিতেন। বিধবাদের প্রতি তাঁহার কি পরিমাণ সহানুভূতি ছিল তাহা উপলব্ধি করা যায় তাহাদের সার্বিক উন্নয়নে তাঁহার কর্মপন্থা হইতে। তৎকালীন আরবের লোকেরা বিধবাদিগকে বিবাহ করা পসন্দ করিত না, বরং তাহাদিগকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক হইতে বঞ্চিত রাখিত। এই সামাজিক অবিচার ও কুপ্রথা নির্মূল করিবার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (স) শুধু অন্যকেই বিধবা বিবাহে উৎসাহ প্রদান করেন নাই, বরং তিনি নিজেও একমাত্র 'আইশা (রা) ব্যতীত আর সকল বিবাহ বিধবা স্ত্রীলোকদিগকেই করিয়াছেন। এইভাবে তিনি বিধবাদের নৈতিক ও সামাজিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়া এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন।