📄 ব্যক্তিগত কাজ
রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার নিজের কাজ নিজেই সম্পন্ন করিতেন। হাদীছে বর্ণিত আছে, উরওয়া (রা) বলেন, আমি হযরত 'আইশা (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম, নবী (স) তাঁহার ঘরে কি কি কাজ করিতেন? জবাবে তিনি বলিলেন, তোমাদের মধ্যকার কোন ব্যক্তি যাহা করিয়া থাকে তিনিও তাহাই করিতেন। তিনি জুতা সেলাই করিতেন, কাপড়ে তালি লাগাইতেন এবং সেলাই করিতেন।
এক সফরে রাসূলুল্লাহ (স)-এর জুতার ফিতা ছিঁড়িয়া গিয়াছিল। তিনি নিজ হাতেই তাহা জোড়া দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হইলেন। একজন সাহাবী আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ। আমাকে দিন, আমি তাহা জোড়া দিয়া দিতেছি। তিনি বলিলেন, ইহাও এক প্রকারের ব্যক্তিতন্ত্র যাহা আমি পছন্দ করি না।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে বাজারে গমন করিলাম। তথায় তিনি একটি পাজামা ক্রয় করিলে আমি তাহা বহন করিতে গেলাম। তিনি বলিলেন, বস্তুর মালিক সেই বস্তুটি বহন করিবার অধিক দায়িত্বশীল।
📄 পারিবারিক কাজ
পারিবারিক কাজ আঞ্জাম দেওয়া প্রতিটি ব্যক্তির একটি পবিত্র দায়িত্ব। মহানবী (স) তাঁহার নবুওয়াত-পূর্ববর্তী যুগেও পারিবারিক কাজ আঞ্জাম দিতেন। যখন তাঁহার বয়স দশ অথবা বার বৎসর, তখন তিনি বকরী চরাইয়াছেন। ইহা হেয় কিংবা ঘৃণার কোন বিষয় ছিল না; বরং ইহা ছিল পরিশ্রম ও কষ্টসহিষ্ণুতা, উন্নত মনোবল ও পৌরুষ জ্ঞাপক।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী করীম (স) বলিয়াছেন, আল্লাহ তা'আলা এমন কোন নবী পাঠান নাই যিনি বকরী চরান নাই। তাঁহার সাহাবীগণ বলিলেন, আপনিও? তিনি বলিলেন, হাঁ, আমি কয়েক কীরাতের বিনিময়ে মক্কাবাসীদের বকরী চরাইতাম।
ইহা ছাড়া রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার নবুওয়াত-পূর্ববর্তী যুগে ব্যবসা-বাণিজ্য করিয়াছেন। ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জিত সম্পদই ছিল তাঁহার নিকট প্রিয়। মক্কা মুকাররমায় আবূ তালিবের একটি দোকান ছিল। তিনি কাপড় ও আতরের ব্যবসায় করিতেন। তীক্ষ্ণধীসম্পন্ন ভ্রাতুষ্পুত্রও সেই পরিবেশেই লালিত-পালিত হইয়াছিলেন। হাদীছ ও সীরাত গ্রন্থসমূহ হইতে জানা যায়, হযরত মুহাম্মাদ (স) নবুওয়াত লাভের পূর্বে যৌবনেই ব্যবসা করিয়াছেন এবং ইহাতে অত্যন্ত সুনাম ও সুখ্যাতি অর্জন করিয়াছিলেন। পিতৃব্য আবূ তালিবের সাহচর্যে তিনি সিরিয়া ও ফিলিস্তীন অভিমুখে যেই সমস্ত সফর করেন উহা তাঁহাকে বাণিজ্যিক নিয়মনীতি রপ্ত করিতে ব্যাপকভাবে সহায়তা করে। অনন্তর তিনি স্বীয় স্বাধীন ব্যবসায় শুরু করেন। হযরত খাদীজার সহিত বিবাহের পূর্বে ইহাই ছিল তাঁহার আয়ের উৎস।
মহানবী (স)-এর বিশ্বস্ততা, উত্তম আচরণ ও মধুর ব্যবহার এবং ওয়াদা পালনের খ্যাতি দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিস্তার লাভ করিয়াছিল। এই খ্যাতির কথা হযরত খাদীজা (রা)-ও জানিতে পারিয়াছিলেন। তিনি একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও পবিত্র মহিলা ছিলেন। তিনি হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে তাঁহার বাণিজ্যসামগ্রী লইয়া ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে সিরিয়া গমনের প্রস্তাব দেন এবং অন্যদের যে পারিশ্রমিক দেওয়া হয় তাঁহাকে উহার দ্বিগুণ প্রদানের কথা বলেন। তিনি উক্ত প্রস্তাব গ্রহণ করেন। এই সফর ছিল খুবই সফল এবং প্রচলিত মুনাফার হার অপেক্ষা তিনি অধিক মুনাফা অর্জন করিয়াছিলেন।
আবার নবুওয়াত-পরবর্তী যুগেও নবুওয়াতের মহান দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি তিনি পারিবারিক কাজেও সহায়তা করিতেন। হযরত আস্তয়াদ (র) বলেন, আমি হযরত 'আইশা (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পরিজনদের সহিত কিরূপ ব্যবহার করিতেন? তিনি বলিলেন, তিনি তাঁহার পরিজনদের সাথে কাজে লাগিয়া থাকিতেন।
অপর এক বর্ণনা অনুসারে তিনি গৃহস্থালীর কাজে তাঁহার স্ত্রীদের সাহায্য করিতেন, কাপড়ে তালি লাগাইতেন, ঘরে ঝাড়ু দিতেন, দুধ দোহন করিতেন, বাজার হইতে সওদা বহন করিয়া আনিতেন, বালতি মেরামত করিয়া দিতেন, নিজে উট বাঁধিতেন এবং খাদেমদের সাথে আটার খামীর তৈয়ার করিতেন।
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ তালহা আনসারীর জন্মকালে আমি তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে নিয়া গেলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (স) একটি "আবা” গায়ে তাঁহার উটের শরীর মালিশ করিতেছিলেন।
এই সম্পর্কিত আরেকটি হাদীছ এইভাবে আসিয়াছে যে, হযরত হাব্বা ইন্ন খালিদ এবং হযরত সাওয়া ইবন খালিদ হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইলেন। তখন তিনি বাড়ির দেওয়াল মেরামত করিতেছিলেন। তাঁহারা দুইজনেই তাঁহাকে এই কাজে সাহায্য করিলেন।
📄 সামাজিক কাজ
সামাজিক কাজকেও রাসূলুল্লাহ (স) নিজের কাজ মনে করিতেন এবং যথাসাধ্য সামাজিক দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করিতেন। যেমন তিনি নবুওয়াত পূর্ববর্তী যুগে কা'বা ঘর পুনঃনির্মাণে কায়িক পরিশ্রম করিয়াছিলেন।
হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ (রা) বলেন, যখন কা'বা ঘর পুনঃনির্মাণ করা হইতেছিল তখন মহানবী (স) ও আব্বাস (রা) (অন্যদের সাথে) পাথর বহন করিয়া আনিতেছিলেন।
এমনিভাবে নবুওয়াত-পরবর্তী যুগেও মসজিদে নববী নির্মাণকালে মহানবী (স) কায়িক পরিশ্রম করিয়াছিলেন। তাঁহার এই অংশগ্রহণ ছিল একজন সাধারণ শ্রমিকের মত। সাহাবীগণ মসজিদের এক একটি পাথর বহন করিতেন এবং যুদ্ধের কবিতা পাঠ করিতেন। রাসূলুল্লাহ (স)-ও তাঁহাদের সাথে সুর মিলাইয়া পাঠ করিতেন, “হে আল্লাহ্! পরকালের মঙ্গল ছাড়া অন্য কোন মঙ্গল নাই। অতএব আন্সার ও মুহাজিরদের ক্ষমা করুন"।
মসজিদে নববী ছাড়াও অন্যান্য মসজিদ নির্মাণে রাসূলুল্লাহ (স) শ্রমিকদের সাথে কাজে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। যেমন মসজিদে কু'বা নির্মাণকালে ভারী ভারী পাথর বহন করিবার সময় তাঁহার দেহ পরিশ্রান্ত হইয়া যাইত। নবী প্রেমিকরা তাহা দেখিয়া ছুটিয়া আসিয়া বলিতেন, 'আমাদের পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হউক। আপনি রাখিয়া দিন, আমরা তাহা বহন করিব'। মহানবী (স) তাঁহাদের অনুরোধ গ্রহণ করিতেন। কিন্তু নিজে অন্য একটি সম ওজনের পাথর বহন করিয়া নিয়া আসিতেন।
এক সফরে বকরী যবেহ করা হইল এবং তাহা রান্না করিবার জন্য সকলেই নিজ নিজ কাজ বণ্টন করিয়া নিলেন। তিনি বলিলেন, 'আমি জঙ্গল হইতে কাঠ কাটিয়া আনিবার দায়িত্ব নিতেছি'। সাহাবায়ে কিরাম ইহাতে ইতস্তত করিতে লাগিলেন। তিনি বলিলেন, 'আমি বৈষম্য পছন্দ করি না'।
ইহা ছাড়া রাসূলুল্লাহ (স) মেহমানদের সেবাযত্ন নিজেই আঞ্জাম দিতেন। তাঁহার গৃহে সকল সময় মেহমান থাকিত। এমনকি তাঁহার গৃহে কোন অমুসলিম মেহমানের আগমন ঘটিলেও তিনি তাহাদের সেবা-যত্নে কোন প্রকার ত্রুটি করিতেন না। যেমন, একবার নাজাশীর নিকট হইতে একদল প্রতিনিধি আগমন করিলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদেরকে নিজের কাছে রাখিয়া স্বয়ং মেহমানদারির যাবতীয় দায়িত্ব পালন করিলেন। সাহাবীগণ আরয করিলেন, 'আমরা এই খেদমত আঞ্জাম দিব'। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, 'এই লোকজন আমার বন্ধুদেরকে বহু খেদমত করিয়াছে। তাই আমি নিজে তাহাদের খেদমত করিতে চাই'।
শুধু মেহমানদের সেবাযত্ন করিয়াই তিনি ক্ষান্ত হন নাই, বরং অভিভাবকহীনদের দেখাশুনার দায়িত্বও তিনি নিজের কাজ মনে করিয়া গুরুত্ব সহকারে পালন করিতেন। যেমন, মহানবী (স) বলিয়াছেন, "মিসকীন ও স্বামীহীনাদের ভরণ-পোষণের জন্য যে ব্যক্তি উপার্জনের প্রচেষ্টা চালায়, সে হইল আল্লাহর পথে মুজাহিদের মত বা ঐ ব্যক্তির মত পুণ্যের অধিকারী সে হইবে, যে দিনভর সিয়াম পালন করে এবং রাতভর দাঁড়াইয়া আল্লাহর জন্য সালাত আদায় করে”। হযরত জুন্নাব ইব্ন আরুত (রা) একজন সাহাবী ছিলেন। একবার রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে কোন এক যুদ্ধে প্রেরণ করিলেন। এইজন্য তিনি প্রতিদিন জুন্নাবের ঘরে গমন করিয়া দুধ দোহন করিয়া দিতেন।
রোগীদের সেবাযত্ন করা নবী করীম (স)-এর আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি নিজে রোগীদের দেখাশুনা করিতেন। মুহাম্মাদ ইব্ন নাফে ইব্ন্ন যুবায়র (রা) হইতে বর্ণিত: তিনি বলিয়াছেন, আমি মহানবী (স)-কে হযরত সাঈদ ইবনুল 'আস্ (রা)-এর সেবা করিতে দেখিয়াছি। তখন আমি দেখিলাম তিনি টুকরা কাপড়ের সাহায্যে সাঈদ ইব্ন আসকে (শরীরে) গরম সেক দিতেছেন।
ইহা ছাড়া যুদ্ধের ময়দানে স্বয়ং কাজে অংশগ্রহণ ও বীরত্ব প্রকাশ করিয়া মহানবী (স) কথা ও কাজের অপূর্ব মিল দেখাইয়াছিলেন। খন্দকের যুদ্ধের সময় মদীনা প্রতিরক্ষার জন্য শহরের অভ্যন্তরে থাকিয়াই প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই উদ্দেশ্যে ছয়দিনে দশ হাত গভীর পরিখা খননের কাজ সম্পন্ন হয়। এই খন্দক খননের সময় সাহাবীদের সাথে মহানবী (স)-ও কাজে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন।
বারাআ (রা) হইতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্ (স) খন্দক খননের সময় মাটি উঠাইতেছিলেন এবং বলিতেছিলেন (ইয়া আল্লাহ্।) 'আপনি না হইলে আমরা হিদায়াত পাইতাম না'।
উক্ত রাবী আরেকটি হাদীছে বর্ণনা করেন, আহযাবের দিন আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখিয়াছি যে, তিনি মাটি বহন করিতেছেন, আর তাঁহার পেটের শুভ্রতা মাটি ঢাকিয়া ফেলিয়াছে।
বদরের যুদ্ধসহ অন্যান্য যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স) স্বয়ং তরবারি হাতে নিয়া যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছিলেন, অন্যান্যদিগকে যুদ্ধের নির্দেশ দিয়া নিজে নিরাপদ স্থানে বসিয়া থাকেন নাই। হযরত আলী (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি প্রত্যক্ষ করিয়াছি যে, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর পার্শ্বে আশ্রয় খুঁজিতেছিলাম। আর তিনি আমাদের সকলের তুলনায় শত্রুদের বেশী কাছাকাছি পৌছিয়া মুকাবিলা করিয়া যাইতেছিলেন। বদরের সেই দিন তাঁহার বীরত্ব ও সাহসিকতা ছিল সর্বাধিক।
এই সমস্ত কাজের পাশাপাশি তিনি অন্যের কাজে সহযোগিতা করিতেন ও পরামর্শ দিতেন। শুধু পরামর্শ নয়, নিজের কাজ মনে করিয়া তাহা আঞ্জাম দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টাও করিতেন। মদীনার দাসী-বাঁদীরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে হাজির হইয়া বলিত, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার এই কাজটি করা প্রয়োজন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি উঠিয়া সেই কাজটি সমাধা করিয়া দিতেন। হযরত আনাস (রা) বলেন, এক পাগল মহিলা (যিনি বাঁদী ছিলেন) রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে হাজির হইল এবং বলিল, 'আমার এই প্রয়োজন রহিয়াছে'। তিনি বলিলেন, 'হে অমুকের মা! তুমি আমাকে শহরের কোন গলিতে নিয়া যাইতে চাও? তুমি আমাকে যেই গলিতে নিয়া যাইতে চাও, আমি সেইখানেই যাইব এবং তোমার কাজ করিয়া দিব।' বর্ণনাকারী বলেন, মহানবী (স) সেই মহিলার সাথে গমন করিলেন এবং তাহার কাজ সমাধা করিয়া দিলেন।
ইহা ছাড়া মহানবী (স) কোন শিষ্টাচার পরিপন্থী কাজ দেখিলে তাহা বর্জন করিবার উপদেশ দিতেন এবং তাহা শুধরাইয়া দিতেন। হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, মহানবী (স) এক বেদুঈনকে মসজিদে পেশাব করিতে দেখিলেন। ইহাতে সাহাবীগণ তাহার প্রতি মারমুখী হইলে তিনি বলিলেন, "ওকে ছাড়িয়া দাও"। সে পেশাব শেষ করিলে তিনি পানি আনাইয়া সেখানে ঢালিয়া দিলেন এবং লোকটিকে বলিয়া দিলেন, মসজিদে পেশাব করা সঙ্গত নহে।
এই সম্পর্কিত আরেকটি বর্ণনা এইভাবে আসিয়াছে যে, মহানবী (স) মসজিদের দেওয়ালে কফ দেখিয়া, কাঁকর দিয়া তাহা মুছিয়া ফেলিলেন। তারপর বলিলেন, তোমাদের কেহ যেন সামনের দিকে অথবা ডান দিকে কফ না ফেলে, বরং সে যেন তাহার বাম দিকে অথবা তাহার রাম পায়ের নীচে তাহা ফেলে।
উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলিতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার কথা ও কাজে এমন অপূর্ব মিল রাখিয়াছেন দুনিয়ার অন্য কোন মানুষের মাঝে এমন মিল আদৌ পরিলক্ষিত হয় না।