📄 জাতিগত ও বর্ণগত বিরোধ
আজকের বিশ্বে সভ্যতার দাবিদার রাষ্ট্রসমূহের রাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হইল ওই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদ। তাহাদের নিকট পররাষ্ট্রের ও পরবর্ণের নাগরিকদের প্রতি কোনরূপ ভ্রাতৃত্ব ও মমত্ববোধ নাই। সাম্য ও মানবতার দোহাই দিয়া তাহারা যাহা কিছু কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে উহার নেপথ্য উদ্দেশ্য হয় কেবল দুর্বল ও পশ্চাদপদ জাতি-গোষ্ঠীকে নিজেদের দাসত্বের নিগড়ে বন্দী করা। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের পয়গাম দুনিয়ার যে সকল দেশ ও রাষ্ট্রে এখনও গৃহীত হয় নাই তথাকার বিরাজমান পরিবেশ ও পরিস্থিতির প্রতি লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে যে, তথাকার লোকজন আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে বংশ, বর্ণ, গোত্র, জাতি ও ধন-সম্পদের ভেদ-বৈষম্যের অনতিক্রম্য প্রাচীর দাঁড় করাইয়া রাখিয়াছে। এই আধুনিক যুগেও ভারত অধিবাসী হিন্দুরা অপরাপর সকল মানুষকে ম্লেচ্ছ ও অস্পৃশ্য গণ্য করিয়া জাতিভেদ সৃষ্টি করিয়াছে। প্রাচীন সভ্যতার নীতিতে তাহাদের মধ্যে চার শ্রেণীর ভেদ-বৈষম্য আছেই। আধুনিক ইসরাঈলী ইয়াহুদীরা এখনও নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ এবং অপর সকলকে হেয় বলিয়া মনে করে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর আগমনকালে পৃথিবীতে এই বর্ণগত ও জাতিগত বিরোধ মারাত্মকভাবে বিদ্যমান ছিল। তিনি তাঁহার সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব নীতির ভিত্তিতে ইহার মূলোৎপাটন করিয়াছিলেন। প্রথমেই তিনি সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদ ও কৌলিন্যবাদকে জাহিলিয়াত বলিয়া চিহ্নিত করেন এবং পরিষ্কার ঘোষণা করেন: "সে আমাদের দলভুক্ত নহে, যে গোত্রপ্রীতি প্রচার করে। সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নহে, যে গোত্রীয় গোঁড়ামীর উপর লড়াই করে। সে আমাদের মধ্যে নহে যে গোত্রীয় প্রীতির চেতনার উপর মারা যায়"।
"মানুষ মাত্রই আদমের বংশধর, আর আদম মাটি হইতে সৃষ্ট। অনারবের উপর যেমন কোন আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নাই তেমনি আরবের উপর কোন অনারবের প্রাধান্য নাই, তবে শ্রেষ্ঠত্ব তাকওয়ার ভিত্তিতে” (রূহুল মা'আনী, ১৩খ., পৃ. ৩১৪)।
বস্তুত রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার এই সকল বাণী ও শিক্ষার মাধ্যমে জাতিভেদ ও বর্ণভেদের সকল প্রাচীর চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিয়াছেন। তাঁহার দৃষ্টিতে বর্ণ, বংশ ও জাতীয়তা মানুষের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টির কারণ হইতে পারে না। সকল বর্ণের ও সকল জাতের মানুষ এক ও অভিন্ন। তাহারা সমান ও তারতম্যহীন। সকল আদম সন্তান বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ।
বিশ্ব অশান্তির আরেকটি কারণ হইল ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত ও জাতিগত স্বার্থোদ্ধারের প্রতিযোগিতা। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সামগ্রিক জীবনে ইহার সমাধানে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বনীতির আলোকে, জনকল্যাণের ভিত্তিতে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করিয়াছেন। তাঁহার দৃষ্টিতে সমাজের সার্বিক কল্যাণ একটি অবিভাজ্য বিষয় এবং ইহার মধ্যে কোন ব্যক্তিগত, গোত্রগত ও জাতিগত একক অধিকার থাকিতে পারে না। কারণ সমাজের সকল মানুষ আল্লাহর বান্দা, তাঁহারই পরিবারভুক্ত। তাই সকলেই সমান। অতএব তাঁহার নীতিতে জনকল্যাণের স্থান ব্যক্তি, গোষ্ঠী, শ্রেণী ও জাতিকল্যাণের ঊর্ধ্বে।
রাসূলুল্লাহ (স) মানব কল্যাণকে ঈমানের পূর্ণতার জন্য পূর্বশর্ত স্থির করিয়াছেন। তিনি বলিতেন:
والذي نفسي بيده لا يؤمن عبد حتى يحب لاخيه ما يحب لنفسه “সেই আল্লাহ্র কসম যাঁহার হাতে আমার জীবন! কোন মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হইতে পারে না, যতক্ষণ না সে তাহার ভাইয়ের জন্য তাহাই পছন্দ করিবে, যাহা সে নিজের জন্য পছন্দ করে"।
حق المسلم على المسلم ست اذا لقيته فسلم عليه واذا دعاله فاجبه واذا استنصحه فانصح له واذا عطش وحمد الله فشمته واذا مرض فعده واذا مات فاتبعه
"এক মুসলিমের উপর অপর মুসলিমের কর্তব্য ছয়টি: তাহার সহিত তোমার সাক্ষাতে তুমি তাহাকে সালাম দিবে, সে তোমাকে দাওয়াত দিলে তুমি তাহাতে সাড়া দিবে, সে তোমার নিকট পরামর্শ বা নসীহত কামনা করিলে তাহাকে সুপরামর্শ দিবে ও নসীহত করিবে, হাঁচিদাতার 'আলহামদু লিল্লাহ'র উত্তরে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলিবে, সে অসুস্থ হইলে তাহার সহিত দেখা-সাক্ষাত করিবে, ইন্তিকাল করিলে জানাযায় শরীক হইবে"।
জনকল্যাণ নীতির আলোকে তিনি প্রতিবেশীর সহিত সদাচার ও ভ্রাতৃত্বমূলক উঠাবসা করিতে নির্দেশ দিয়াছেন। তিনি বলেন, সেই ব্যক্তি প্রকৃত মুমিন নহে যাহার অত্যাচার হইতে তাহার প্রতিবেশী নিরাপদ নহে। একবার তিনি আবূ যার (রা)-কে বলিলেন, আবু যার! তুমি যখন তরকারী রান্না কর তখন ঝোল একটু বেশি দিবে এবং তোমার প্রতিবেশীর খবর নিবে।