📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব নীতির বৈশিষ্ট্যসমূহ

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব নীতির বৈশিষ্ট্যসমূহ


বর্ণ, বংশ, গোত্র ও শ্রেণীভেদ-বৈষম্য পৃথিবীর মানবেতিহাসের একটি চলমান জটিল সমস্যা। এই সমস্যার সমাধানে পৃথিবীর মানবেতিহাসে বহু মতবাদের উদ্ভব ঘটিয়াছে, বহু তত্ত্ব ও থিওরীর আত্মপ্রকাশ ঘটিয়াছে। কিন্তু কোন মতবাদ ও থিওরী দ্বারা এই সমস্যার সমাধান তো হয়-ই নাই বরং ইহা জটিল আকার ধারণ করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর অবির্ভাবকালেও পৃথিবীতে এই সমস্যা ছিল, বরং বলা যায় সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ রূপে ছিল। কারণ সেই যুগটি পৃথিবীর ইতিহাসের চরম জাহিলিয়াতের যুগ।
রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব নীতির দ্বারা এই সমস্যার সফল সমাধান করিয়াছিলেন। তিনিই বিশ্বময় সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বেশি সফলতা অর্জন করিয়াছিলেন। ইহা ছিল তাঁহার কর্ম ও অবদানের একটি বিস্ময়কর ও অসাধারণ দৃষ্টান্ত। যে সকল বর্ণ, জাতি ও গোষ্ঠীর মধ্যে কোন দিন ন্যূনতম সহযোগিতা ও মমত্ববোধ আশা করা যায় নাই, তিনি তাহাদের মধ্যে অতুলনীয় সাম্য ও সীশাঢালা প্রাচীরের ন্যায় সুদৃঢ় ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন প্রতিষ্ঠা করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। ইহার কারণ এই যে, তাঁহার সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব নীতির মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য বর্তমান ছিল, যাহা অপরাপর মতবাদ ও থিওরীসমূহে ছিল না। ফলে তাঁহার শিক্ষা সাফল্যের শীর্ষ চূড়ায় পৌঁছিয়াছে। পক্ষান্তরে অপরাপর মতবাদ ও থিওরীসমূহ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইয়াছে। আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব নীতির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা কবির।
(১) যে কোন ধর্মাদর্শের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বিশ্বের সকল মানুষের কল্যাণ ও মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। এই দৃষ্টিতে ধর্মের পয়গাম হওয়া চাই সকলের জন্য উন্মুক্ত, সার্বজনীন। এই ক্ষেত্রে কোনরূপ বৈষম্য গ্রহণযোগ্য নহে।
সমকালীন ধর্মাদর্শ ও মতবাদসমূহ বিশ্লেষণ করিলে দেখা যাইবে যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর পয়গামই পৃথিবীর বুকে একমাত্র পয়গাম, যাহা বর্ণ, বংশ, দেশ, জাতি, অঞ্চল, ভূখণ্ড যুগ-কাল সকল কিছুর ঊর্ধ্বে বিশ্বমানবতার জন্য নাযিলকৃত সকলের জন্য সমভাবে প্রজোয্য ও গ্রহণযোগ্য। তাঁহার পয়গামই সর্বপ্রথম বিশ্বের সকল মানুষকে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রতি আহ্বান করিয়াছে।
(২) রাসূলুল্লাহ (স) সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা প্রচার করিয়াছেন দয়ার অপরিহার্য অঙ্গ হিসাবে। কারণ, এই দুইটি জিনিস একই সাথে পালন করিলে যাবতীয় গরিমা, অহমিকা, কৌলিন্যবোধ ও স্বার্থপরতা পরিহার করা যায়। তিনি ঘোষণা করিয়াছেন:
والله لا يؤمن والله لا يؤمن والله لا يؤمن قيل من يارسول الله قال الذي لا يامن جاره بواثقه "আল্লাহ্র কসম। সে মুমিন নহে; আল্লাহ্র কসম! সে মুমিন নহে; আল্লাহর শপথ! সে মমিন নহে। কেহ বলিল, কে সে হে আল্লাহ্র রাসূল? তিনি বলিলেন: সেই ব্যক্তি যাহার অনিষ্ট হইতে তাহার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না"।
ليس المؤمن الذي شبع وجاره جائع ৩১১ “সেই ব্যক্তি মুমিন নহে যে উদর পূর্তি করিয়া খায় আর তাহার প্রতিবেশী তাহার পার্শ্বে ক্ষুধার্ত থাকে”।
الراحمون يرحمهم الرحمن ارحموا من فى الارض يرحمكم من فى السماء “দয়ালুদের প্রতি দয়াময় আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া কর, আকাশের অধিপতি তোমাদের প্রতি দয়া করিবেন”।
لا يرحم الله من لا يرحم الناس .
“যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ্ তাহার প্রতি দয়া করেন না”।
(৩) রাসূলুল্লাহ (স) যেই সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রতি আহ্বান করিয়াছেন উহার ভিত্তি ছিল মানব মর্যাদার উপর। মানব মর্যাদা জাতিতে জাতিতে, গোত্রে গোত্রে, বর্ণে বর্ণে বা বিজয়ী ও বিজিতের মধ্যে কোন পার্থক্য নির্দেশ করে না। সমগ্র মানবগোষ্ঠীই এই সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আওতাভুক্ত। তিনি পরিষ্কার ঘোষণা করিয়াছেন:
الناس كلهم من آدم وآدم من تراب لافضل لعربي على عجمي ولا لعجمي على عربي ولا احمر على اسود ولا اسود على احمر الا بالتقوى
“সকল মানুষ আদমের বংশধর, আর আদম মাটি হইতে তৈরী। কোন আরবের উপর যেমন অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নাই, তেমনি কোন অনারবের উপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নাই। শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাটি একমাত্র তাকওয়া”।
(৪) রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের পয়গাম কেবল মুসলিমদের জন্য ছিল না, ইহা ছিল সার্বজনীন বিশ্বভ্রাতৃত্বের পয়গাম। এই পয়গামের বুনিয়াদ ছিল বিশ্বাসের অঙ্গ হিসাবে, বিশ্বাস মানুষে মানুষে কোন পার্থক্য করে না। বরং সকল মানুষকে একই সূত্রে গ্রথিত করে। তাঁহার প্রচারিত শিক্ষা হইতে ইহা সুপ্রমাণিত। তিনি আহ্বান করিয়াছেন:
قُلْ يَاأَهْلَ الكتب تَعَالَوْا إِلى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّنْ دُونِ اللَّهِ فَإِنْ تَوَلَّوا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ .
“হে কিতাবীগণ! আইস সেই কথায় যাহা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যেন আমরা আল্লাহ ব্যতীত কাহারও ইবাদত না করি, কোন কিছুকেই তাঁহার শরীক না করি এবং আমাদের কেহ কাহাকেও আল্লাহ ব্যতীত প্রতিপালকরূপে গ্রহণ না করি। যদি তাহারা মুখ ফিরাইয়া লয় তবে বল, তোমরা সাক্ষী থাক, অবশ্যই আমরা মুসলিম” (৩ঃ ৬৪)।
রাসূলুল্লাহ (স) বিশ্বের সকল মত ও পথের মানুষকে স্মরণ করাইয়া দেন যে, তাহারা একই রর্ণ ও মিল্লাতের অনুসারীরূপে পরস্পর ভাই ভাই ছিল। কিন্তু অন্যায় মতভেদ ও হিংসা-দ্বেষ তাহাদিগকে বিভক্ত করিয়া রাখিয়াছে। তাই তিনি পুনরায় সমগ্র বিশ্বে একক ধর্ম উম্মাহভিত্তিক মানব ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান:
يايها الناس قولوا لا اله الا الله تفلحوا "হে মানবজাতি! তোমরা সকলে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আন, তাহা হইলে তোমরা সফলকাম হইতে পারিবে”।
ইয়াহুদী, খৃস্টান, এমনকি পৌত্তলিক মুশরিক সকলেই এই বিশ্ব উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত। বস্তুত তাহাদের প্রতি ঈমান ও বিশ্বাসের আহ্বানও সত্যিকারের ভ্রাতৃত্বের চেতনারই ফল। তিনি চাহিয়াছেন যে, বিশ্ববাসী যেন ঈমানের ভিত্তিতে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হইয়া মুক্তির রাজপথে একাত্ম হয় এবং আল্লাহ্র পরিবারভুক্ত হইয়া এককের পথে পরিচালিত হয়।
(৫) ইয়াহুদী ও খৃস্টানগণ তাহাদের নিজ নিজ নবীর বাহিরে কোন নবীকে স্বীকার করে না, সম্মান করে না। তাহাদের আসমানী গ্রন্থ ছাড়া কোন গ্রন্থকে স্বীকার করে না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশ এই যে, কোন মুসলিম ততক্ষণ পর্যন্ত মুসলিমই হইতে পারে না, যতক্ষণ না সে দুনিয়ার সকল নবী ও রাসূলের উপর এবং আসমানী কিতাবসমূহের উপর ঈমান আনয়ন করিবে।
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أُمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَى رَسُولِهِ والكتاب الَّذِي أَنْزَلَ مِنْ قَبْلُ وَمَنْ يُكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلَئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَلاً بَعِيدًا
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহে, তাঁহার রাসূলে, তিনি যে কিতাব তাঁহার রাসুলের প্রতি নাযিল করিয়াছেন তাহাতে এবং যে কিতاب তিনি পূর্বে নাযিল করিয়াছেন তাহাতে ঈমান আন। এবং কেহ আল্লাহ, তাঁহার ফেরেশতা, তাঁহার কিতাব, তাঁহার রাসূল এবং আখিরাতকে প্রত্যাখ্যান করিলে সে তো ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হইয়া পড়িবে” (৪: ১৩৬)।
لا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِم .. "আমরা রাসূলগণের মধ্যে কোন তারতম্য করি না" (২: ২৮৫)।
অতীতের নবী-রাসূলগণের মর্যাদার স্বীকৃতি, তাঁহাদের কিতাবের সত্যতার সাক্ষ্য প্রদান ও সকলের ধর্মাদর্শের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়া বস্তুত রাসূলুল্লাহ (স) বিশ্ববাসীকে এক নূতন আধ্যাত্মিক সাম্য ও মানবিক ভ্রাতৃত্বের পয়গাম দিয়াছেন। ইহা দ্বারা তাঁহার শিক্ষার সার্বজনীনতা ও সাম্যের পরিসর যে কত ব্যাপক ও বিস্তৃত তাহাই প্রতিভাত হইয়াছে।
(৬) সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষাকে শুধুমাত্র নৈতিক ও চারিত্রিক গুণ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করিয়াই রাসূলুল্লাহ (স) ক্ষান্ত হন নাই; বরং তিনি ইহাকে ইসলামী রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি হিসাবে স্থান দিয়াছেন। তাঁহার প্রতিষ্ঠিত মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব নীতিই ছিল প্রধানতম আদর্শ। মদীনার রাষ্ট্রে মাক্কী, ইরানী, রোমীয়, আবিসিনীয় এবং ইয়াহুদীগণ বসবাস করিত। তাহারা ছিল সংখ্যায় অল্প। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সহিত পূর্ণ ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের আচরণ করিয়াছিলেন। মদীনার অধিবাসীগণ সংখ্যাধিক হওয়া সত্ত্বেও বহিরাগত এই সকল সংখ্যালঘু নাগরিকদের উপর তাহাদের কোনরূপ শ্রেষ্ঠত্ব ছিল না। অধিকার ও নাগরিক সুবিধা প্রাপ্তিতেও ছিল না কোন প্রকার বিভাজন ও তারতম্য। সেখানে কোন দিন এই প্রশ্ন উঠে নাই যে, কে দেশী কে বিদেশী, কে দেশমাতৃকার। তাহারা সকলেই ছিল এক ও অভিন্ন মর্যাদায় অভিষিক্ত। মদীনার রাষ্ট্রে কখনও অধিকার প্রাপ্তির জন্য কোটা নির্ধারণের দাবি উঠে নাই। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট একটি মাত্র মানদণ্ড ছিল মর্যাদা পার্থক্যের। তাহা হইল তাকওয়া-আল্লাহ ভীরুতা।
মানবাধিকার প্রাপ্তিতে তিনি কখনও বর্ণ ও ধর্মের বিভাজনকে টানিয়া আনেন নাই, বরং তাঁহার রাষ্ট্রে ধর্ম, বর্ণ, বংশ নির্বিশেষে সকলের জন্য নিম্নবর্ণিত মানবাধিকারগুলি সমানভাবে প্রযোজ্য ছিল:
(১) জীবনের নিরাপত্তা, (২) সম্পদের নিরাপত্তা, (৩) ইজ্জত-আবরুর নিরাপত্তা, (৪) ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সংরক্ষণ, (৫) গৃহজীবনের নিরাপত্তা, (৬) মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, (৭) শিক্ষা-দীক্ষা ও মেধা বিকাশের অধিকার, (৮) ইনসাফ ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার; (৯) সম্মানজনক জীবন যাপনের অধিকার, (১০) অর্থনৈতিক অধিকার। অর্থনৈতিক অধিকারের মধ্যে রহিয়াছে বাসস্থান, জীবিকা, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিবাহ-শাদীর ব্যবস্থা ইত্যাদি।
সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব নীতির আলোকে রাসূলুল্লাহ (স) দেশের সকল নাগরিকের জন্য এই সমস্ত মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন করিয়াছিলেন।
(৭) সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর আরেকটি বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, তিনি তাঁহার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও পররাষ্ট্র নীতির ভিত্তি রাখিয়াছেন এই সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষার উপর। তাই তিনি কোন বর্ণ বা শ্রেণীভেদ অথবা সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের গণ্ডীকে স্বীকার করেন না। জ্ঞানী বা মূর্খ, উন্নত বা অনুন্নত, কৃষ্ণ বা শ্বেত এই ভিত্তিতে তিনি কোন দেশ ও জাতির মর্যাদা ও অধিকার পরিমাপ করেন নাই। তিনি সকল জাতের, সকল বর্ণের, সকল দেশের মানুষকে পরস্পর ভাই ও বৃহত্তর মানব ভ্রাতৃত্বের সদস্য বলিয়া গণ্য করেন। আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্বের এই ধারণা রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি মৌলিক শিক্ষা। তিনি ইরশাদ করেন:
يايها الناس الا ان ربكم واحد لا فضل لعربي على عجمى ولا لعجمي على عربي ولا اسود على احمر ولا احمر على اسود الا بالتقوى
"হে মানবজাতি! শুনিয়া লও, তোমাদের রব একজন। অনারবের উপর আরবের এবং আরবের উপর অনারবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নাই। লালের উপর কালোর এবং কালোর উপর লালের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নাই। তবে তাকওয়ার কারণে শ্রেষ্ঠত্ব হইতে পারে"।
বিশ্বমানব ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের এই নীতির উপরই রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার বহিরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অসংখ্য শান্তি ও সহযোগিতা চুক্তি ও সন্ধি সম্পাদন করিয়াছেন। যথাঃ মদীনায় বসবাসকারী অপরাপর জাতি, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সহিত কৃত মদীনার সনদ, মক্কাবাসীদের সহিত কৃত হুদায়বিয়ার সন্ধি, বাহরায়ন ও নাজরানের খৃস্টানদের সহিত কৃত চুক্তি ইত্যাদি।
(৮) সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এই যে, তিনি সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধকে একটি সামাজিক অধিকার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছন, সমাজের উচ্চস্তরের লোকদের বদান্যতা ও অনুগ্রহ হিসাবে নহে। অন্যান্য ধর্মাদর্শ ও মতবাদে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের কথা রহিয়াছে কিন্তু তাহা অধিকার হিসাবে নহে, অনুগ্রহ- রূপে। তাই আমরা দেখিতে পাই যে, ইউরোপ, আমেরিকার সংবিধানেও সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের কথা আছে, কিন্তু তাহা বর্ণবৈষম্য দূরীকরণে চরমভাবে ব্যর্থ হইয়াছে। তাহাদের নীতিবাক্য শ্রেণী সংগ্রাম ও বর্ণ সংগ্রাম ঠেকাইতে অপারগ প্রমাণিত হইয়াছে। অনুরূপ হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মেও সাম্য ও মমত্ববোধের কথা বলা হইয়াছে কিন্তু তাহা অকার্যকর প্রমাণিত হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর কর্মজীবনে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বনীতির বাস্তবায়ন

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর কর্মজীবনে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বনীতির বাস্তবায়ন


রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পয়গামে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের যে সকল নীতি প্রচার করিয়াছেন, তাঁহার কর্মজীবনে উহা বাস্তবায়ন করিয়া বিশ্ববাসীর সামনে তুলিয়া ধরিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাম্য ও ভ্রাতৃত্বনীতির বাস্তবায়নে কয়েকটি দৃষ্টান্ত নিম্নে উল্লেখ করা হইল।
(১) আরবে ক্রীতদাসকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মনে করা হইত। তাহাদের সহিত পশু ও ইতরতুল্য আচরণ করা হইত। রাসূলুল্লাহ (স) ক্রীতদাসকে ভাইরূপে গ্রহণ করার নির্দেশ দানের পাশাপাশি তাঁহার আপন ক্রীতদাস যায়দ ইবন হারিছাকে নিজ পালক-পুত্র হিসাবে গ্রহণ করেন। যায়দের সহিত তিনি এমন মমতাপূর্ণ আচরণ করিতেন যে, সাধারণ মানুষ যায়দকে তাঁহার ক্রীতদাস বলিয়া মনেই করিত না। তাহারা যায়দকে 'যায়দ ইব্‌ন মুহাম্মাদ' নামে ডাকিত।
(২) বংশীয় গৌরব, গোত্রীয় কৌলিন্য ও আভিজাত্যের অহমিকা আরব সমাজে ভেদ-বৈষম্যের অনতিক্রম্য প্রাচীর দাঁড়াইয়া রাখিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব নীতির বাস্তব নমুনার মাধ্যমে এই জাতভেদের প্রাচীর চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিলেন। তিনি তাঁহার কুরায়শ বংশীয়া আপন ফুফাতো বোন যয়নব বিন্ত জাহ্শকে আপন ক্রীতদাস যায়দ ইবন হারিছার সহিত বিবাহ দেন।
(৩) ক্রীতদাস যায়দের পুত্র উসামা ইব্‌ন যায়দকে রাসূলুল্লাহ (স) অত্যন্ত ভালবাসিতেন। তাঁহার কন্যা ফাতিমা (রা)-এর শিশু পুত্র হাসান (রা) ও ক্রীতদাস পুত্র উসামা (রা) ছিলেন সমবয়স্ক। তিনি তাঁহাদের উভয়কে একসঙ্গে কোলে নিতেন এবং আদর-সোহাগ করিতেন। একবার 'আব্বাস (রা) ও 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনার নিকট আপনার পরিবারের মধ্যে সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি কে? তিনি উত্তরে বলিলেন: ফাতিমা। তাঁহারা বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা ফাতিমা (রা) সম্পর্কে জানিতে চাহি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় উসামা ইব্‌ন যায়দ।
(৪) আরবে গোত্রীয় মর্যাদার তারতম্য এত প্রবল ছিল যে, উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন গোত্র কখনও নিম্ন বংশীয় কাহাকেও যুদ্ধ-লড়াইয়ে সেনাধ্যক্ষ হিসাবে বরণ করিত না, রণাঙ্গনে সে যত বড় বীরই হউক না কেন। রাসূলুল্লাহ (স) এই প্রথা উচ্ছেদ করিয়া একাধিক যুদ্ধ-জেহাদে যায়দ ইবন হারিছা, তাঁহার পুত্র উসামা ইব্‌ন যায়দ এবং অন্যান্য সাহাবীকে সেনাপতির দায়িত্বে মনোনয়ন দিয়াছেন। তাঁহার এই মনোনয়ন মানিয়া লওয়া অতীতের গর্বস্ফীত আরবদের পক্ষে কষ্টকর ছিল। কিন্তু তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সহিত তাহাদের আপত্তি প্রত্যাখ্যান করিয়া সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। তিনি পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করিলেন:
اسمعوا واطيعوا وان استعمل عليكم عبد حبشى كان راسه زبيبة .
“তোমরা তোমাদের কর্মকর্তাদের কথা শুন এবং আনুগত্য কর, একজন মস্তক মুণ্ডিত হাবশী দাসকেও যদি তোমাদের নেতা বানানো হয় তবুও তাহার আনুগত্য কর যতক্ষণ সে তোমাদের মধ্যে আল্লাহর আইন জারি করে"।
অন্য কথায়, ইসলাম একজন দাসের এই অধিকারেরও স্বীকৃতি দিয়াছে যে, সে ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদও অলংকৃত করিতে পারে। হযরত উমার (রা) যখন তাঁহার স্থলাভিষিক্ত খলীফা নির্বাচিত করার প্রয়োজন অনুভব করেন তখন তিনি বলিলেন, "আবূ হুযায়ফার মুক্ত দাস সালিম যদি এখন জীবিত থাকিতেন তবে আমি তাহাকে খলীফা নিয়োগ করিতাম"।
হযরত উমার (রা) যখন তাঁহার স্থলাভিষিক্ত খলীফা নির্বাচিত করার প্রয়োজন অনুভব করেন তখন তিনি বলিলেন, "আবূ হুযায়ফার মুক্ত দাস সালিম যদি এখন জীবিত থাকিতেন তবে আমি তাহাকে খলীফা নিয়োগ করিতাম"।
সালমান ফারসী (রা) উমার (রা)-এর শাসনামলে মাদায়নের গভর্নর নিযুক্ত হন। আমৃত্যু তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। হযরত উমার (রা)-এর খিলাফতকালে খাব্বাব ইবনুল-আরাত (রা)-কে তিনি অধিক সম্মান করিতেন এবং অন্যের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করিতেন। উমার (রা) রোমীয় ক্রীতদাস সুহায়ব আর-রোমীকে তাহার মৃত্যু পূর্ববর্তী আহতাবস্থায় ভারপ্রাপ্ত খলীফা হিসাবে নামাযের ইমামতির জন্য নিযুক্ত করেন।
আবূ হুযায়ফা (রা)-এর দাসী ইসলামের প্রথম শহীদ হযরত সুমাইয়া (রা)-এর পুত্র আম্মার ইন্ন ইয়াসার (রা)। ক্রীতদাসিনীর পুত্র অথচ উমার ও আলী (রা)-এর সহিত তাঁহার গভীর বন্ধুত্ব ছিল। উমার (রা) তাঁহাকে ইরাকের অন্তর্গত কুফার গভর্নর নিযুক্ত করেন। পরবর্তী কালে তিনি সিফফীনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
(৬) আইন ও শাস্তি প্রয়োগ নীতিতে, বর্ণ ও জাতভেদ বৈষম্য ছিল আরব সমাজের একটি পুরাতন ব্যাধি। একই অপরাধের শাস্তি নিম্ন বর্ণ ও নিম্নশ্রেণীর জন্য হইত এক রকম, আর উচ্চ শ্রেণীর জন্য হইত ভিন্ন রকম। আইন ও শাস্তি নীতির এই বৈষম্য উৎখাত করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) 'আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান' এই নীতি প্রতিষ্ঠিত করেন। মক্কা বিজয়ের পর আরবের সম্ভ্রান্ত গোত্র বনূ মাখযূমের এক মহিলা একটি চুরির অপরাধে অভিযুক্ত হয়। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সাম্য ও ন্যায়নীতি ভিত্তিক আইনের আলোকে তাহার হস্ত কর্তনের নির্দেশ দেন।
ইহাতে বনূ মাখযূম নিজেদের গোত্রীয় কৌলিন্য রক্ষার জন্য অন্য কোন শাস্তি প্রয়োগের আবদার করে। তাহাদেরকে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়া দিলেন, তোমাদের পূর্ববর্তীদিগকে এই জন্যই ধ্বংস করা হইয়াছে যে, তাহারা সমাজের নিম্ন শ্রেণীর মানুষের উপর তাহাদের শরী'আতের আহকাম কার্যকর করিত আর উচ্চ শ্রেণীর লোকদের কেহ অন্যায় করিলে কোন না কোন অজুহাতে তাহাকে শাস্তি হইতে অব্যাহতি প্রদান করিত। আল্লাহ্র শপথ করিয়া বলিতেছি, আমার কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করিত তবে আমি তাহার হাত কর্তনের নির্দেশ দিতাম। অতঃপর সেই মাখযূমী মহিলার উপর বিচারের রায় কার্যকর করা হয়।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রবর্তিত অর্থনীতি সাম্যের প্রতীক

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রবর্তিত অর্থনীতি সাম্যের প্রতীক


অতীতের ন্যায় বর্তমান বিশ্বেও অশান্তির কারণ প্রধানত দুইটি: (১) জাতিগত ও বর্ণগত বিরোধ এবং (২) ভারসাম্যহীন অর্থব্যবস্থার কারণে শ্রেণী সংগ্রাম ও শ্রেণী সংঘাত। মানবেতিহাসে এই সমস্যার সমাধানে বহু মতবাদের উদ্ভব ঘটিয়াছে। কোথাও সাম্যবাদের নামে গরীবদেরকে ধনীদের বিরুদ্ধে ক্ষেপাইয়া দাঙ্গা-হাঙ্গামা করানো হইয়াছে। কোথাও সম্পদশালী শ্রেণী বিলোপ করিয়া মানব সম্প্রদায়কে রেশনভোগী জীবন যন্ত্রে পরিণত করা হইয়াছে। আবার কোথাও অবাধ ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে মানুষকে চরম স্বেচ্ছাচারী ও স্বার্থপরে পর্যবসিত করা হইয়াছে। এইভাবে পৃথিবীতে জন্মিয়াছে বহুবিধ মতবাদ ও দর্শন। যথা পুঁজিবাদ, ধনবাদ, সাম্যবাদ, সমাজবাদ ইত্যাদি। কিন্তু কোন মতবাদ ও তন্ত্র-মন্ত্র দ্বারাই পৃথিবী হইতে অশান্তি দূরীভূত করা সম্ভব হয় নাই। রাসূলুল্লাহ (স) এই সমস্যার সমাধানে তাঁহার সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব নীতির আলোকে একটি নূতন অর্থব্যবস্থা প্রবর্তন করিয়াছেন এবং তিনিই এই সমস্যার সমাধানে সাফল্য অর্জন করিয়াছেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রবর্তিত অর্থব্যবস্থায় একদিকে ব্যক্তি মালিকানার স্বীকৃতি দিয়া প্রত্যেক সক্ষম ব্যক্তিকে উপার্জনে উদ্বুদ্ধ করা হইয়াছে। অপরদিকে একটি নির্দিষ্ট সীমার অর্থ-সম্পদের অধিকারী প্রত্যেক সচ্ছল ব্যক্তির উপরই দারিদ্র্য বিমোচনের উদ্দেশ্যে যাকাত, ফিতরা, 'উশর প্রবর্তন করিয়াছেন। অতঃপর কতিপয় আইন ও নীতিমালার মাধ্যমে স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বার্থপরতার পথ রুদ্ধ করা হইয়াছে। উপরন্তু প্রত্যেক ব্যক্তিকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে দান-খয়রাত ও সাদাকাহ প্রদানে নৈতিকভাবে উৎসাহিত করা হইয়াছে। ফলে সমাজ সদস্যদের মধ্যে অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে এবং শ্রেণী সংগ্রাম ও শ্রেণী সংঘাতের ন্যায় জটিল সামাজিক সমস্যার অবসান ঘটিয়াছে। ইসলামের স্বর্ণযুগের ইতিহাসে ইহার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রহিয়াছে।
রাসূলুল্লাহ (স)-ই সর্বপ্রথম এই বাণী প্রচার করেন যে, দারিদ্র্য মানুষকে অবজ্ঞা ও হেয় প্রতিপন্ন করার কারণ হইতে পারে না। দরিদ্রতম ব্যক্তিও অর্থসম্পদশালী ব্যক্তির চেয়ে শ্রেষ্ঠ হইতে পারে। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের বাহ্যিক গড়ন, গঠন ও তোমাদের ধন-সম্পদ দেখেন না। তিনি দেখেন তোমাদের অন্তরের অবস্থা ও আমল অর্থাৎ ঈমান, নেক আমল ও আল্লাহ ভীতি।
তবে ইহাও সত্য যে, ধনাঢ্যতা ও দারিদ্র্য সমাজে উঁচু-নীচুর বৈষম্য সৃষ্টি করিতে চাহে এবং করেও। রাসূলুল্লাহ (স) দুইটি উপায়ে এই স্বাভাবিকতাকে প্রতিরোধ করিয়া সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। উপায় দুইটি হইল: (ক) বিবেক ও মানবতাবোধকে জাগ্রত করা এবং (খ) আইন প্রণয়ন। ইহার মধ্যে বিবেক ও মানবতাবোধ জাগ্রত করাই ছিল অধিক শক্তিশালী। তিনি প্রত্যেক মু'মিনের বিবেক এমনভাবে জাগ্রত করিয়াছেন যে, কোন বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তি তাহার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অভাবী রাখিয়া নিজে ভোগবিলাসী জীবন যাপন করিতে পারে, ইহা কল্পনাও করা যায় না। তিনি প্রত্যেককে অল্পে তুষ্ট থাকিতে এবং রসনাকে সংযত রাখিতে নির্দেশ দিয়াছেন।
রাসূলুল্লাহ (স) অনুপ্রাণিত করিয়াছেন মনিব ও অধীনস্থকে একই রকম পোশাক পরিধান করিতে, একই মানের খাবার খাইতে। তাঁহার এই আহ্বান সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় এতই কার্যকর হইয়াছিল যে, মা'রূর ইব্‌ন সুয়ায়দ (রা) বলেন, একদিন আমি আবূ যার (রা) ও তাঁহার ভূত্যকে একই রকম পোশাক পরিহিত দেখিতে পাইয়া ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলাম। তিনি বলিলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি : তাহারা (দাস-দাসী) তোমাদের ভাই। আল্লাহ্ তোমাদের হিফাজতে তাহাদিগকে রাখিয়াছেন। যে ব্যক্তি তাহার ভাইকে নিজ হিফাজতে রাখিয়াছে, সে তাহাকে তাহাই খাওয়াইবে যাহা সে নিজে খায়, তাহাকে তাহাই পরিধান করাইবে যাহা সে নিজে পরিধান করে এবং তাহার উপর অত্যধিক বোঝা চাপাইবে না। যদি সে তাহা করে, তবে তাহাকে সাহায্য করিবে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জাতিগত ও বর্ণগত বিরোধ

📄 জাতিগত ও বর্ণগত বিরোধ


আজকের বিশ্বে সভ্যতার দাবিদার রাষ্ট্রসমূহের রাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হইল ওই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদ। তাহাদের নিকট পররাষ্ট্রের ও পরবর্ণের নাগরিকদের প্রতি কোনরূপ ভ্রাতৃত্ব ও মমত্ববোধ নাই। সাম্য ও মানবতার দোহাই দিয়া তাহারা যাহা কিছু কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে উহার নেপথ্য উদ্দেশ্য হয় কেবল দুর্বল ও পশ্চাদপদ জাতি-গোষ্ঠীকে নিজেদের দাসত্বের নিগড়ে বন্দী করা। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের পয়গাম দুনিয়ার যে সকল দেশ ও রাষ্ট্রে এখনও গৃহীত হয় নাই তথাকার বিরাজমান পরিবেশ ও পরিস্থিতির প্রতি লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে যে, তথাকার লোকজন আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে বংশ, বর্ণ, গোত্র, জাতি ও ধন-সম্পদের ভেদ-বৈষম্যের অনতিক্রম্য প্রাচীর দাঁড় করাইয়া রাখিয়াছে। এই আধুনিক যুগেও ভারত অধিবাসী হিন্দুরা অপরাপর সকল মানুষকে ম্লেচ্ছ ও অস্পৃশ্য গণ্য করিয়া জাতিভেদ সৃষ্টি করিয়াছে। প্রাচীন সভ্যতার নীতিতে তাহাদের মধ্যে চার শ্রেণীর ভেদ-বৈষম্য আছেই। আধুনিক ইসরাঈলী ইয়াহুদীরা এখনও নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ এবং অপর সকলকে হেয় বলিয়া মনে করে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর আগমনকালে পৃথিবীতে এই বর্ণগত ও জাতিগত বিরোধ মারাত্মকভাবে বিদ্যমান ছিল। তিনি তাঁহার সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব নীতির ভিত্তিতে ইহার মূলোৎপাটন করিয়াছিলেন। প্রথমেই তিনি সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদ ও কৌলিন্যবাদকে জাহিলিয়াত বলিয়া চিহ্নিত করেন এবং পরিষ্কার ঘোষণা করেন: "সে আমাদের দলভুক্ত নহে, যে গোত্রপ্রীতি প্রচার করে। সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নহে, যে গোত্রীয় গোঁড়ামীর উপর লড়াই করে। সে আমাদের মধ্যে নহে যে গোত্রীয় প্রীতির চেতনার উপর মারা যায়"।
"মানুষ মাত্রই আদমের বংশধর, আর আদম মাটি হইতে সৃষ্ট। অনারবের উপর যেমন কোন আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নাই তেমনি আরবের উপর কোন অনারবের প্রাধান্য নাই, তবে শ্রেষ্ঠত্ব তাকওয়ার ভিত্তিতে” (রূহুল মা'আনী, ১৩খ., পৃ. ৩১৪)।
বস্তুত রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার এই সকল বাণী ও শিক্ষার মাধ্যমে জাতিভেদ ও বর্ণভেদের সকল প্রাচীর চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিয়াছেন। তাঁহার দৃষ্টিতে বর্ণ, বংশ ও জাতীয়তা মানুষের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টির কারণ হইতে পারে না। সকল বর্ণের ও সকল জাতের মানুষ এক ও অভিন্ন। তাহারা সমান ও তারতম্যহীন। সকল আদম সন্তান বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ।
বিশ্ব অশান্তির আরেকটি কারণ হইল ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত ও জাতিগত স্বার্থোদ্ধারের প্রতিযোগিতা। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সামগ্রিক জীবনে ইহার সমাধানে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বনীতির আলোকে, জনকল্যাণের ভিত্তিতে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করিয়াছেন। তাঁহার দৃষ্টিতে সমাজের সার্বিক কল্যাণ একটি অবিভাজ্য বিষয় এবং ইহার মধ্যে কোন ব্যক্তিগত, গোত্রগত ও জাতিগত একক অধিকার থাকিতে পারে না। কারণ সমাজের সকল মানুষ আল্লাহর বান্দা, তাঁহারই পরিবারভুক্ত। তাই সকলেই সমান। অতএব তাঁহার নীতিতে জনকল্যাণের স্থান ব্যক্তি, গোষ্ঠী, শ্রেণী ও জাতিকল্যাণের ঊর্ধ্বে।
রাসূলুল্লাহ (স) মানব কল্যাণকে ঈমানের পূর্ণতার জন্য পূর্বশর্ত স্থির করিয়াছেন। তিনি বলিতেন:
والذي نفسي بيده لا يؤمن عبد حتى يحب لاخيه ما يحب لنفسه “সেই আল্লাহ্র কসম যাঁহার হাতে আমার জীবন! কোন মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হইতে পারে না, যতক্ষণ না সে তাহার ভাইয়ের জন্য তাহাই পছন্দ করিবে, যাহা সে নিজের জন্য পছন্দ করে"।
حق المسلم على المسلم ست اذا لقيته فسلم عليه واذا دعاله فاجبه واذا استنصحه فانصح له واذا عطش وحمد الله فشمته واذا مرض فعده واذا مات فاتبعه
"এক মুসলিমের উপর অপর মুসলিমের কর্তব্য ছয়টি: তাহার সহিত তোমার সাক্ষাতে তুমি তাহাকে সালাম দিবে, সে তোমাকে দাওয়াত দিলে তুমি তাহাতে সাড়া দিবে, সে তোমার নিকট পরামর্শ বা নসীহত কামনা করিলে তাহাকে সুপরামর্শ দিবে ও নসীহত করিবে, হাঁচিদাতার 'আলহামদু লিল্লাহ'র উত্তরে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলিবে, সে অসুস্থ হইলে তাহার সহিত দেখা-সাক্ষাত করিবে, ইন্তিকাল করিলে জানাযায় শরীক হইবে"।
জনকল্যাণ নীতির আলোকে তিনি প্রতিবেশীর সহিত সদাচার ও ভ্রাতৃত্বমূলক উঠাবসা করিতে নির্দেশ দিয়াছেন। তিনি বলেন, সেই ব্যক্তি প্রকৃত মুমিন নহে যাহার অত্যাচার হইতে তাহার প্রতিবেশী নিরাপদ নহে। একবার তিনি আবূ যার (রা)-কে বলিলেন, আবু যার! তুমি যখন তরকারী রান্না কর তখন ঝোল একটু বেশি দিবে এবং তোমার প্রতিবেশীর খবর নিবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00