📄 রাসূল (স)-এর দৃষ্টিতে তোষামোদ
তোষামোদ, খোশামোদ ও চাটুকারিতাকে রাসূলুল্লাহ (স) ঘৃণা করিতেন। নিজে তিনি কোনদিন কাহারও তোষামোদ করেন নাই এবং কাহাকেও তোষামোদ করিবার সুযোগ দেন নাই যাহার স্বাক্ষ্য স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল ইয্যত পবিত্র কুর'আনে এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন,
وَدُّوا لَوْ تُدْهِنُ فَيُدْهِنُونَ .
"উহারা চায় যে, আপনি তাহাদিগের প্রতি নমণীয় হন, তাহা হইলে তাহারাও আপনার প্রতি নমণীয় হইবে" (৬৮: ৯)।
অতএব বলা যায় যে, মহানবী (স) নিজে কাহারো তোষামোদ করেন নাই বরং তোষামোদকারীর প্রতি তিনি ছিলেন অসন্তুষ্ট। তোষামোদকারীর বিরুদ্ধে তিনি কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করিয়াছেন। যেমন তিনি বলিয়াছেন:
عن عبد الرحمن بن ابي بكرة عن أبيه قال مدح رجل رجلا عند النبي ﷺ قال فقال ويحك قطعت عنق صاحبك قطعت عنق صاحبك مرارا اذا كان احدكم مادحا صاحبه لا محالة فليقل احسب فلانا والله حسيبه ولا ازكى على الله احدا احسبه ان كان يعلم ذلك كذا وكذا (متفق عليه).
"হযরত আবূ বাকরা (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির প্রশংসা করিল। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমার ধ্বংস হউক! তুমি তো তোমার বন্ধু ও সাথীর গর্দান কাটিয়া দিলে। এই কথাটি তিনি বারবার বলিলেন। অতঃপর তিনি বলিলেন, কাহারো প্রশংসা যদি একান্তই করিতে হয় তবে তুমি বলিবে, আমার ধারণামতে সে এইরূপ। অবশ্য তোমার ধারণামত সে সত্যিই যদি এইরূপ হইয়া থাকে তবে একমাত্র মহান আল্লাহই তাহার সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান রাখেন। আর মহান আল্লাহ্র জ্ঞানের উপর কাহাকেও প্রাধান্য দিতে চাই না বরং বলিবে, আমি তাহাকে এইরূপ জ্ঞান রাখেন বলিয়া ধারণা করি"
(ইমাম বুখারী, আস-সাহীহ, ২খ., পৃ. ৮৯৫; ইমাম মুসলিম, সাহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ৪১৪; ইমাম ওয়ালী উদ্দীন বাগাবী, মিশকাত, ৩খ., পৃ. ১৩৫)।
অপর এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন,
عن أبي موسى قال سمع النبي ﷺ رجلا يثنى على رجل يطريه في المدحة فقال لهذا هلكتم او قطعتم ظهر الرجل.
"আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা) বলেন, নবী করীম (স) এক ব্যক্তিকে অপর ব্যক্তির মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা করিতে শুনিলেন এবং বলিলেন, তোমরা তাহাকে ধ্বংস করিয়াছ অথবা তাহার মেরুদণ্ড ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছ” (ইমাম বুখারী, আস-সাহীহ, ২খ., পৃ. ৮৯৫; ইমাম মুসলিম, সাহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ৪১৪; হায়াতুস-সাহাবা ২খ., পৃ. ৫১৬)।
তোষামোদকারীর পরিণতির কথা উল্লেখ করিয়া অন্য এক হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
عن المقداد بن الاسود (رض) قال قال رسول الله ﷺ اذا رايتم المداحين فاحثوا في وجوههم التراب.
"হযরত মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, তোষামোদকারীদিগকে যখন তোমরা দেখিবে তখন তাহাদের মুখে মাটি নিক্ষেপ করিবে” (মিশকাত, ৩খ., পৃ. ১৩৫৮)।
মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় হযরত মা'মার হইতে বর্ণিত হইয়াছে :
فجعل المقداد يحثى عليه التراب - وقال أمرنا رسول الله ﷺ ان نحشى في وجوه المداحين التراب.
"অতঃপর মিকদাদ (রা) তাহার মুখমণ্ডলে মৃত্তিকা নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন এবং বলিলেন, তোষামোদকারীর মুখে মাটি নিক্ষেপ করিতে রাসূলুল্লাহ (স) আমাদিগকে আদেশ করিয়াছেন" (সাহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ৪১৪; মিশকাত, ৩খ., পৃ. ১৩৫৮; ইমাম তিরমিযী, আল-জামি', ২খ., পৃ. ৬২; আল-আদাবুল মুফরাদ, ২খ., পৃ. ৫০; হায়াতুস-সাহাবা, ২খ., পৃ. ৫১৪)।
কাহার প্রশংসা সাধারণত দোষের কিছু নয়। তবে শর্ত হইল যে, তাহা যেন তোষামোদে পরিণত না হয় এবং প্রশংসার বিষয়টি প্রশংসিত ব্যক্তির মাঝে বিদ্যমান থাকে।
عن ابن عباس رضي الله عنه سمع عمر يقول على المنبر سمعت النبي ﷺ يقول لا تطروني كما اطرت النصارى عيسى بن مريم فانما انا عبده فقولوا عبد الله ورسوله.
"হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত: তিনি হযরত উমর (রা)-কে মিম্বরের উপর বসিয়া বলিতে শুনিয়াছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি, তোমরা আমার এমন
প্রশংসা করিও না যেমন খৃষ্টান সম্প্রদায় হযরত 'ঈসা (আ) সম্পর্কে করিয়া থাকে। অনন্তর আমি আল্লাহ তা'আলার একজন বান্দা। সুতরাং তোমরা বলিবে, আল্লাহ তা'আলার বান্দা ও তাঁহার রাসূল (ইমাম বুখারী, আস-সাহীহ, ২খ., পৃ. ৩৬৯)।
অপর এক বর্ণনায় আসিয়াছে: عن انس ان رجلا قال للنبي ﷺ يا خيرنا وابن خيرنا وسيدنا وابن سيدنا - فقال النبي ﷺ قولوا ما اقول لكم - ولا يستهدينكم الشيطان انزلوني حيث انزلني الله انا عبد الله ورسوله.
"হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণিত: এক ব্যক্তি নবী করীম (স)-কে বলিল, হে আমাদের মাঝে মহোত্তম ব্যক্তি, মহোত্তম ব্যক্তির সন্তান, আমাদের নেতা, আমাদের নেতার সন্তান! তিনি বলিলেন, তোমরা তাহাই বলিবে আমি তোমাদিগকে যাহা বলিয়াছি। মনে রাখিবে, শয়তান যেন কখন ও তোমাদিগকে প্রবৃত্তির অনুসারী করিতে না পারে। আল্লাহ তা'আলা আমাকে যে মর্যাদা দান করিয়াছেন, তোমরাও তাহাই দিবে। আমি আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁহার রাসূল (আল-ওয়াফা, ২খ., পৃ. ৪৩৫; হায়াতুস-সাহাবা, ২খ., পৃ. ৫১৪)।
অপর একটি হাদীছে আসিয়াছে, একবার এক কিশোরী গাহিয়া উঠিল: فينا نبي يعلم مافي الغد.
"আমাদের মাঝে আছেন এমন একজন নবী যিনি ভবিষ্যত জানেন"। তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন, থাম তো! এই ধরনের কথা বলিও না। ইতোপূর্বে যাহা বলিতেছিলে তাহাই বল (ইমাম তিরমিযী, আল-জামি, ৩খ., ৩৯৯)। عن جبير بن محمد جبير بن مطعم عن أبيه عن جده قال اذى رسول الله ﷺ اعرابی فقال يا رسول الله فاستسق الله لنا فانا نتشفع بك على الله ونستشفع بالله عليك قال رسول الله ﷺ ويحك أتدرى ما تقول فما زال يسبح حتى عرف. ذلك في وجوه اصحابه ثم قال ويحك انه لا يستشفع بالله على احد من خلقه شان الله اعظم من ذلك.
"হযরত জুবায়র (রা) বলেন, এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ্র নিকট আমাদের জন্য বৃষ্টি প্রার্থনা করুন। আমরা আপনার মাধ্যমে আল্লাহর সমীপে এবং আল্লাহর মাধ্যমে আপনার নিকট সুপারিশ প্রার্থনা করি। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) রাগান্বিত কণ্ঠে বলিলেন, তুমি উৎসন্নে যাও! কি বলিয়াছ তুমি, জান? অতঃপর তিনি এমনভাবে আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতা বর্ণনা করিলেন যে, তাঁহার প্রভাব সাহাবীদের মুখমণ্ডলেও প্রকাশ পাইল। অতঃপর আবার বলিলেন, তুমি উৎসন্নে যাও! কোন ব্যক্তির কাছে
আল্লাহর মাধ্যমে কেহ সুপারিশ করিও না। আল্লাহর মর্যাদা উহা হইতে অনেক ঊর্ধ্বে” (সুনান আবূ দাউদ, ৫খ., পৃ. ৭২৬)।
উল্লিখিত হাদীছসমূহ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, প্রশংসায় অতিরঞ্জন তোষামোদের ন্যায় বর্জনীয়।
তোষামোদ বর্জনীয়, কিন্তু সাধারণ প্রশংসা নহে। তাই এই জাতীয় প্রশংসা করিতে বারণ করা হয় নাই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামনেও শর্তসাপেক্ষে প্রশংসা কর যায়। কারণ এই জাতীয় প্রশংসায় অকল্যাণের আশঙ্কা নাই। তবে শর্ত হইল তাহা বাস্তব এবং যথার্থ হইতে হইবে।
عن خلاد بن السائب قال دخلت على اسامة بن زيد فمدحنى في وجهي وقال انه حملني على ان امدحك في وجهك اني سمعت رسول الله ﷺ يقول اذا مدح المؤمن في وجهه ربا الايمان في قلبه
"হযরত খাললাদ ইব্ন আস-সাইব (রা) বলেন, উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-এর নিকট আমি গেলাম। তিনি আমার সামনেই আমার প্রশংসা করিলেন, তারপর তিনি বলিলেন, আমি তোমার মুখের উপর তোমার প্রশংসা এইজন্য করিয়াছি যে। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি : কোন মু'মিন ব্যক্তির প্রশংসা তাহার সম্মুখে করা হইলে তাহার অন্তরে ঈমান বৃদ্ধি পায়” (সিলসিলাতুল আহাদীছ আদ-দা'ঈফা ওয়াল-মাওদু'আ, ৪খ., পৃ. ১৪৩)।
হাদীছটি দা'ঈফ। কারণ বর্ণিত সনদের রাবী লাহী'আর স্মৃতিশক্তি দুর্বল। তবে অন্যান্য রাবীগণ ছিকাহ (প্রাগুক্ত)।
উপরিউল্লিখিত হাদীছে সামনা-সামনি প্রশংসার বৈধতা দেওয়া হইয়াছে। অবশ্য নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারেও প্রচুর হাদীছ রহিয়াছে। উভয় প্রকার হাদীছের মাঝে সামঞ্জস্য বিধান করিতে গিয়া ইমাম নববী (র) উল্লেখ করিয়াছেন যে, প্রশংসিত ব্যক্তি যদি পরিপূর্ণ ঈমান ও প্রত্যয়ের অধিকারী হইয়া থাকে, পরিশুদ্ধ মন ও জ্ঞানের অধিকারী হইয়া থাকে এবং সামনা-সামনি প্রশংসা তাহার ক্ষতি করিবে না এবং গর্বিত হইয়া প্রশংসা কুড়াইয়া আত্ম-তৃপ্তি লাভ করিবার কোন আশংকা না থাকে, তবে সেই ক্ষেত্রেই কেবল এই ধরনের প্রশংসা বৈধ। কিন্তু যদি উল্লেখিত দোষগুলোর কোন একটি বা একাধিক দোষ প্রকাশ পাওয়ার আশংকা থাকে তবে সামনা-সামনি প্রশংসা খুবই মারাত্মাক কাজ (ইমাম নববী, রিয়াদুস-সালেহীন, পৃ. ৬৪৩)।
সেইজন্যই রাসূলুল্লাহ (স) নিজে স্বয়ং এই জাতীয় প্রশংসা করিয়াছেন এবং সাহাবীদিগকেও এই কাজে উৎসাহিত করিতেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রশংসা ছিল যথার্থ প্রশংসা। ইহাতে তোষামোদের লেশমাত্রও ছিল না। তিনি অযথা, অবাস্তব, অসম্ভব প্রশংসা করেন নাই। কারণ তাহা মিথ্যার নামান্তর; বরং তাঁহার প্রশংসা সীমিত থাকিত। ব্যক্তির মধ্যে যাহা রহিয়াছে শুধু তাহাতেই।
عن سعد ما سمعت النبي ﷺ يقول لاحد يمشى على الارض انه كان من اهل الجنة الا لعبد الله بن سلام.
"হযরত সা'দ (রা) হইতে বর্ণিত। আমি নবী করীম (স)-কে আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রা) ব্যতীত কাহাকেও দুনিয়াতে বিচরণকারী জান্নাতী বলিতে শুনি নাই” (ইমাম বুখারী, আস-সাহীহ, ২খ., পৃ. ৮৯৫)।
রাসূলুল্লাহ (স) ব্যক্তির সৎ গুণাবলী যেমন প্রকাশ করিতেন, তেমনি তাহার দোষ- ত্রুটিসমূহও বর্ণনা করিতেন অকপটে যাহা তোষামোদকারীরা কখনও, এমনকি ভুলেও করেন না। তোষামোদ আর প্রশংসাকারীর মাঝে মৌলিক পার্থক্য এইখানেই। অপর এক বর্ণনায় রহিয়াছে -
عن عبد الرحمن عن أبي يونس مولى عائشة أن عائشة قالت استأذن رجل على رسول الله ﷺ فقال رسول الله له بئس ابن العشيرة فلما دخل هشى له وانبسط اليه فلما خرج الرجل استأذن اخر قال نعم ابن العشير فلما دخل لم ينبسط اليه كما انبسط الى الآخر ولم يهش اليه كاهش الآخر فلما خرج قلت يا رسول الله قلت لفلان ثم هششت اليه وقلت لفلان ولم اراك صنعت مثله قال يا عائشة أن من شر الناس من اتقى لفحشه.
"উম্মুল মু'মিনীন হযরত আইশা সিদ্দীকা (রা) রর্ণনা করিয়াছেন যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রবেশানুমতি প্রার্থনা করিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সমাজের মন্দ লোক আসিয়াছে। সে অন্দরে প্রবেশ করিলে তিনি তাহার সহিত অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় মিলিত হইলেন। সে চলিয়া গেলে অপর একজন প্রবেশানুমতি প্রার্থনা করিলে। তিনি বলিলেন, সমাজের উত্তম লোক আসিয়াছে। সে প্রবেশ করিলে তিনি তাহার সহিত প্রথম ব্যক্তির ন্যায় তত হাসিমুখে মিলিত হইলেন না। যখন ঐ ব্যক্তি চলিয়া গেল তখন আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি প্রথমোক্ত ব্যক্তি সম্পর্কে এই এই বলিয়াছেন, অতঃপর তাহার সাথে হাসিমুখে মিলিত হইয়াছেন। দ্বিতীয় ব্যক্তি সম্পর্কে এই বলিয়াছেন এবং আপনাকে তাহার সাথে ঐ ব্যক্তির ন্যায় ব্যবহার করিতে দেখি নাই। উত্তরে তিনি বলিলেন, হে আইশা। সর্বনিকৃষ্ট লোক হইতেছে ঐ ব্যক্তি যাহার অশ্লীল মুখ হইতে রক্ষা পাওয়ার জন্য লোকে তাহাকে পরিহার করে (আল- আদাবুল-মুফরাদ, ২খ., পৃ. ৪৯)।
রাসূলুল্লাহ (স) শুধু প্রশংসা করিয়াছেন এমনটি নয়, পাইয়াছেনও যথেষ্ট। তবে তোষামোদের শিকার কিন্তু হন নাই কোনদিন। বিভিন্ন কবিতায়, বক্তৃতায়, সম্বোধনে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রশংসা করা হইয়াছে। অথচ প্রশংসাকারীর মুখে মৃত্তিকা নিক্ষেপাদেশ করা হয় নাই।
যেমন- হযরত হাসসান ইব্ন ছাবিত (রা) (যিনি শা'ইরুর-রাসূল নামে খ্যাত) বহু কবিতার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রশংসা করিয়াছেন, আরো করিয়াছেন কবি কা'ব ইব্ন যুহায়র, আরও অনেকে (আল-আয়নী, উমদাতুল-কারী, ২২খ., পৃ. ১৩২)।
খোশামোদ ও চাটুকারিতা সর্বাবস্থায় বর্জনীয়। কেননা ইহাতে নৈতিকতার অধঃপতন ঘটে, প্রকাশিত হয় নীচতা, হীনতা আর লজ্জাহীনতা। পাশাপাশি মিথ্যার প্রচ্ছন্ন একটা আবরণও ইহাতে লুক্কায়িত থাকে। এই সব তোষামোদ কাহারো জন্যই কল্যাণকর নহে।
তোষামদের কারণে নিজের সম্পর্কে ভুল ধারণা জন্মে। কারণ অতি মাত্রায় প্রশংসার আনন্দে আত্মহারা হইয়া পড়ে এবং বিশ্বাস করে যে, সে সত্যি সত্যি উক্ত গুণাবলীর অধিকারী। এই জাতীয় প্রশংসা বা তোষামোদ কামনাকারীদের সম্পর্কে পবিত্র কুর'আনে বলা হইয়াছে-
وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَفْرَحُونَ بِمَا أَتَوا وَيُحِبُّونَ أَنْ يُحْمَدُوا بِمَا لَمْ يَفْعَلُوا فَلَا تَحْسَبَنَّهُمْ بِمَفَازَةٍ مِّنَ الْعَذَابِ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ.
"যাহারা নিজেরা যাহা করিয়াছে তাহাতে আনন্দ প্রকাশ করে এবং যাহা নিজেরা করে নাই এমন কর্মের জন্য প্রশংসিত হইতে ভালবাসে, তাহারা শাস্তি হইতে মুক্তি পাইবে- এইরূপ তুমি কখনও মনে করিও না। তাহাদের জন্য রহিয়াছে মর্মন্তুদ শাস্তি” (৩: ১৮৮)।
উপরিউক্ত আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, নিজের কৃতকর্মের উপর অহংকার করা আর অকৃতকর্মের উপর প্রশংসা কামনা করা এতই নিকৃষ্ট ও জঘন্য অপরাধ যে, তওবা ব্যতীত ইহার শাস্তি হইতে রেহাই পাওয়া দুস্কর। তবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যদি অনুগ্রহ করিয়া ক্ষমা করিয়া দেন। তোষামোদকারীরা তোষামোদ করিতে গিয়া স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা না করিয়া নির্বোধের মত তোষামোদ করিয়া থাকে। কি ভালকি মন্দ, ধার্মিক কি অধার্মিক নির্বিশেষে সকলের তোষামোদ করিতে বিন্দুমাত্রও দ্বিধা করে না। একটিবারও ভাবিয়া দেখিতে চাহে না অধার্মিক ফাসিকের তোষামোদ যে কত বড় ভয়ঙ্কর অপরাধ। এই প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন-
اذا مدح الفاسق غضب الرب تعالى واهتزله العرش .
কোন ফাসিক ব্যক্তির প্রশংসা করা হইলে আল্লাহ তা'আলা ক্রোধান্বিত হন এবং আল্লাহ্র আরশ প্রকম্পিত হয় (মিশকাত শরীফ, পৃ. ৪১৪)।
পরিশেষে বলা যায়, তোষামোদ বর্জন করিয়া অনুপম সুন্দর মার্জিত জীবনাদর্শে অভ্যস্ত হইয়া নির্মল কোমল জীবন গঠনে প্রত্যেকের ব্রতী হওয়া উচিত। আর মহানবী (স) শিষ্টাচার, মার্জিত ব্যবহার ও উত্তম চরিত্র পরিপূরণের জন্যই প্রেরিত হইয়াছেন।
قال ان الله بعثني لتمام مكارم الاخلاق وكمال محاسن الافعال
উত্তম চরিত্রু পরিপূরণ এবং উত্তম কার্যাবলীর পূর্ণতা দান করিতে আল্লাহ তা'আলা আমাকে দুনিয়ায় প্রেরণ করিয়াছেন (মিশকাত শরীফ, ৩খ., পৃ. ১৬০৬; কানযুল-উম্মাল, ২খ., পৃ. ৫)। আর এই বিষয়টি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সত্যায়ন করিয়াছেন এই বলিয়া।
إِنَّكَ لَعَلى خُلُقٍ عَظِيمٍ .
"নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত" (৬৮৪)