📄 মেহমানদের যত্ন ও খোঁজ-খবর নেওয়া
রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট কোন মেহমান আসিলে তিনি স্বয়ং মেহমানের সমাদর ও সেবা-যত্ন করিতেন। অনেক সময় মেহমানদারী করিতে যাইয়া তাঁহাকে এবং তাঁহার পরিবারবর্গকে অনাহারে থাকিতে হইত। তথাপি তিনি কখনও মেহমানের আগমনে বিরক্ত হইতেন না।
কখনও কখনও এমনও হইত যে, অধিক মেহমানের আগমনের ফলে তাহাদের সকলের আপ্যায়ন এবং থাকিবার জায়গার সংকুলান হইত না। এমতাবস্থায় তিনি মেহমানদিগকে সাহাবীদের মাঝে বণ্টন করিয়া দিতেন। তিনি রাত্রে নিদ্রা হইতে জাগিয়া মেহমানদের খোঁজ-খবর লইতেন। একবার আব্দে কায়স গোত্রের একটি বিরাট কাফেলা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে হাযির হইল। তিনি তাহাদের সাদর অভ্যর্থনা জানাইলেন। তাহাদের সরদার আশাজ্জকে তাঁহার নিকট বসাইলেন, অতঃপর তাহাদের এবং তাহাদের দেশের হালচাল ও কুশলাদি জিজ্ঞাসা করিলেন। পরিচয় ও কুশলপর্ব সমাপ্ত করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) আনসারী সাহাবীগণকে ডাকিয়া বলিলেন, "তোমরা তোমাদের ভাইদের সমাদর কর"। সকালবেলা মেহমানদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের আনসারী ভাইদেরকে কেমন পাইলে? তাহারা তোমাদিগের কিরূপ আদর-যত্ন ও মেহমানদারী করিল? তাহারা বলিল, "উত্তম! তাহারা আমাদের জন্য নরম বিছানা পাতিয়া দিয়াছে, উত্তম খাবার খাওয়াইয়াছে। রাত্রে ও সকালে তাহারা আমাদিগকে কুরআন এবং আপনার হাদীছ শিক্ষা দিয়াছে।" রাসূলুল্লাহ (স) ইহাতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করিলেন।
মক্কা বিজয়ের পর আরবের বিভিন্ন প্রান্ত হইতে দলে দলে লোক রাসূলুল্লাহ (স)-এর খidমতে হাযির হইতে লাগিল। ইহাদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় মেহমানও হইত প্রচুর। রাসূলুল্লাহ (স) নিজে এই সকল মেহমানের আতিথেয়তার আঞ্জাম দিতেন। উপরন্তু মেহমানদের সেবাযত্ন ও খidমতের সুষ্ঠু ইন্তেজামের জন্য তিনি সাহাবী হযরত বিলাল (রা)-কে বিশেষভাবে তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেন।
মেহমানদিগকে মসজিদে নববীতে এবং আসহাবে সুফ্ফার সহিত অবস্থানের ব্যবস্থা করা হইত। ইহা ছাড়াও মদীনার দুইজন মহিলা সাহাবীর গৃহকেও মেহমানদের থাকিবার জন্য ব্যবহার করা হইত। তাঁহারা হইলেন হযরত রামলা (রা) এবং হযরত উম্মে শারীক (রা)।
আসহাবে সুফফা ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রায় সার্বক্ষণিক মেহমান। তাঁহার গৃহে একটি বড় ও ভারী খাবারের পাত্র ছিল, ইহা নাড়াচাড়া করিতে চারজন লোকের প্রয়োজন হইত। দ্বিপ্রহরের সময় পাত্রটিতে খাবার ভর্তি করিয়া সুফ্ফায় লইয়া যাওয়া হইত। সুফ্ফার মেহমানগণ উহার চতুষ্পার্শ্ব ঘিরিয়া বসিয়া যাইতেন এবং খাবার খাইতেন।
রাসূলুল্লাহ (স) খাবারের সময় তাঁহার চলার পথে কোন সাহাবীর সাক্ষাত পাইলে তাঁহাকে সাথে লইয়া যাইতেন এবং আপ্যায়ন করাইতেন। হযরত জাবির (রা) বলেন, একদিন আমি একটি বাড়ীতে বসা ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) আমার নিকট দিয়া যাওয়ার সময় আমাকে ডাকিলেন এবং আমার হাত ধরিয়া তাঁহার সহিত লইয়া চলিলেন। তিনি তাঁহার এক স্ত্রীর গৃহে উপস্থিত হইলেন এবং বলিলেন, আহারের উপযোগী কোন খাবার আছে কি? গৃহের লোকজন বলিলেন, হাঁ। অতঃপর তিনটি রুটি আনা হইল। রুটিগুলির অর্ধেক আমার সামনে এবং অর্ধেক রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার নিজের সামনে দস্তরখানে রাখিলেন। তাঁদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, রুটি খাওয়ার জন্য কোন তরকারী আছে কি? তাহারা বলিলেন, সামান্য সিরকা রহিয়াছে। তিনি বলিলেন, উহাই আন। সিরকা কতই না উত্তম তরকারী।
একদিন রাসূলুল্লাহ (স) সুফ্ফার সকলকে লইয়া হযরত 'আইশা (রা)-এর ঘরে আসিলেন এবং ঘরে খাবার যাহা কিছু আছে তাহা আনিতে বলিলেন। হযরত 'আইশা (রা) যাহা কিছু রান্না করিয়াছিলেন তাহা সবই হাযির করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) আরও কিছু খাবার চাহিলে হযরত 'আইশা (রা) ঘরে রক্ষিত খেজুরগুলি আনিয়া দিলেন। ইহার পর একটি পাত্র ভরিয়া দুধ আনিলেন এবং ইহাই ছিল ঘরের সর্বশেষ খাবার।
এইভাবে মেহমানকে আদর-আপ্যায়ন করিতে যাইয়া নবী পরিবারবর্গ অনেক সময় অভুক্ত থাকিতেন। সাহাবী আবূ বিশর গিফারী (রা) তাহার নিজের দেখা ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন এইভাবে যে, আমি ছিলাম পৌত্তলিক ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ। ঐ সময় একবার আমি মদীনায় আগমন করি এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর মেহমান হিসাবে তাঁহার গৃহে অবস্থান করি। রাত্রিবেলা তাঁহার পালিত সব কয়টি ছাগলের দুধ আমি গোপনে দোহন করিয়া পান করি। অথচ এই বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে একটি কথাও বলেন নাই। ঐ রাত্রে তিনি ও তাঁহার পরিবারের সকলে অভুক্ত অবস্থায় ঘুমাইয়া পড়েন।" অনুরূপ একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন হযরত আবূ হুরায়রা (রা)। এক রাত্রে এক অমুসলিম রাসূলুল্লাহ (স)-এর ঘরে মেহমান হিসাবে অবস্থান করে। সে একের পর এক সাতটি ছাগলের দুধ পান করে। কিন্তু মহানবী (স) লোকটির প্রতি কোন প্রকার বিরক্তি ভাব প্রকাশ করেন নাই, তাহাকে কিছু বলেনও নাই। মহানবী (স)-এর এই মার্জিত আচরণে মুগ্ধ হইয়া পরদিন সকালে সে ইসলাম গ্রহণ করে এবং নবীগৃহে অবস্থানকালে একটি মাত্র ছাগলের দুধ পান করিয়াই তৃপ্ত থাকে।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) ছিলেন সুফ্ফার অন্যতম সদস্য। এই সুবাদে তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিয়মিত মেহমান। তিনি তাঁহার জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন, একদিন আমি চরম ক্ষুধার তাড়নায় অতিষ্ঠ হইয়া মসজিদে নববীর সামনে মানুষের চলার পথে বসিয়া পড়িলাম যাহাতে আমার ক্ষুধার্ত অবস্থা কাহারও দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারে। এই সময় হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) আমার নিকট দিয়া গেলেন। আমি তাঁহার নিকট কুরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা জানিতে চাহিলাম। আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল তিনি যেন আমার অবস্থা উপলব্ধি করিতে পারেন এবং আমাকে তাঁহার গৃহে লইয়া যান। তিনি আয়াতের ব্যাখ্যা দিয়া চলিয়া গেলেন এবং আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য উপলব্ধি করিলেন না। অতঃপর হযরত উমার (রা)-র আগমন ঘটিল। আমি তাঁহার সহিতও তদ্রূপ কৌশল অবলম্বন করিলাম। কিন্তু তিনিও চলিয়া গেলেন, আমাকে সঙ্গে করিয়া নিলেন না। কিছুক্ষণ পর এই পথে রাসূলুল্লাহ (স) আগমন করিলেন। তিনি আমাকে দেখিয়াই আমার অন্তরের ভাষা বুঝিয়া ফেলিলেন এবং মৃদু হাসিয়া বলিলেন, হে আবূ হির! আমার সঙ্গে আস। আমি তাঁহার পিছনে পিছনে চলিলাম। তিনি উম্মুল মু'মিনীনের একজনের গৃহে প্রবেশ করিলেন। সেখানে এক পেয়ালা দুধ রক্ষিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলিলেন, আবূ হির! যাও, সুফ্ফার সকলকে ডাকিয়া আন। আমি মনে মনে ভাবিলাম, মাত্র এক পেয়ালা দুধ ভাবিয়াছিলাম, তৃপ্তি সহকারে উহা পান করিব। এখন সুফফার সত্তরজন মেহমানকে ডাকিয়া লইলে আমার ভাগ্যে কী জুটিবে? যাহা ইউক, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশমত সকলকে ডাকিলাম তিনি দুধের পেয়ালাটি আমার হাতে দিয়া বলিলেন, সকলকে পান করাও। আমি সকলের হাতে একের পর এক দুধের পেয়ালাটি তুলিয়া দিতে লাগিলাম। সকলেই তৃপ্তি সহকারে পান করিতে লাগিলেন। সকলের পান করার পর আমি পেয়ালাটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাতে ফিরাইয়া দিলাম। তিনি মৃদু হাসিয়া বলিলেন, আবূ হির! এইবার তুমি পান কর। আমি পেট ভরিয়া পান করিলাম। মহানবী (স) বলিলেন, আরও পান কর। আমি আরও পান করিলাম। এইভাবে তিনি বারবার আমাকে বলিতেছিলেন, "আরও পান কর, আরও পান কর"। অবশেষে আমি বলিলাম, হে আল্লাহর রাসূল। মহান আল্লাহর শপথ। আমার পেটে আর এক ফোঁটা পরিমাণ দুধেরও জায়গা নাই। অতঃপর তিনি পেয়ালাটি হাতে নিলেন এবং দুধ পান করিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) মেহমানের সহিত একই পাত্রে খাবার খাইতেন। অনেক সময় এমনও হইত যে, তাঁহার তৃপ্তি হইয়া গিয়াছে, খাবারের আর চাহিদা নাই, তথাপি তিনি খাবারের পাত্র হইতে হাত উঠাইতেন না যতক্ষণ না মেহমান তৃপ্তি সহকারে খাবার খাইয়া লইত। তিনি মেহমানের সহিত খাবার খাওয়ার সময় খাবারের উৎকৃষ্ট অংশ, যেমন গোশত ইত্যাদি মেহমানের সামনে বাড়াইয়া দিতেন। তিনি বলিতেন, দলবদ্ধভাবে খাবার গ্রহণকালে যদি কাহারও তৃপ্তি হইয়া যায়, তথাপি খাবার পাত্র হইতে হাত উঠাইয়া লওয়া তাহার উচিৎ হইবে না। ইহাতে মেহমান সংকোচ বোধ করিবে। হইতে পারে মেহমানের আরও খাবার খাওয়ার চাহিদা রহিয়াছে। তিনি যখন মেহমানের সহিত খাবার খাইতেন, তখন সকলের পরে তাঁহার খাবার খাওয়া শেষ করিতেন যাহাতে মেহমান ভালভাবে পরিতৃপ্ত হইতে পারে। কখনও কখনও মেহমানের সামনে খাবার উপস্থিত করা হইলে মেহমান লজ্জা ও সংকোচের কারণে বলিত, আমার খাবারের চাহিদা নাই। তখন রাসূলুল্লাহ (স) উত্তরে বলিতেন, পেটে ক্ষুধা রাখিয়া 'না' বলিও না, খাবারে শরীক হও।
রাসূলুল্লাহ (স) বিভিন্ন সময়ে সাহাবাই কিরামকে তাঁহার গৃহে দাওয়াত করিতেন। কখনও তাহা বিশেষ কোন উপলক্ষেও হইত। যেমন বিবাহোত্তর ওয়ালীমা। হযরত আনাস (রা) বলেন, খায়বার বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (স) হযরত সাফিয়্যা (রা)-কে বিবাহ করেন। এই উপলক্ষে তিনি তাঁহার গৃহে বিবাহোত্তর ভোজের আয়োজন করেন। অনুরূপ রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার প্রতিটি বিবাহেই বিবাহোত্তর ভোজের আয়োজন করিয়াছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) দীর্ঘ সফরের পর মদীনায় প্রত্যাবর্তন উপলক্ষেও ভোজানুষ্ঠানের আয়োজন করিতেন। তিনি এই উপলক্ষে তাঁহার সাহাবা ও নিকটাত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত করিতেন। হযরত জাবির (রা) বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (স) দীর্ঘ সফর শেষে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিয়া এক বিশেষ দাওয়াতের আয়োজন করিলেন। উহাতে তিনি উট অথবা গরু যবেহ করিয়াছিলেন।
📄 মেহমানের সাথে অন্তরঙ্গতা ও হাস্যরস
রাসূলুল্লাহ (স) মেহমানের সহিত খুবই অন্তরঙ্গ ছিলেন এবং হাস্যরস করিতেন, মেহমানের সহিত হাসিমুখে কথা বলিতেন। তিনি বলিতেন, মেহমানদের সহিত হাসিমুখে সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা বলাও একটি সাদাকাহ। বর্ণিত হইয়াছে, একবার তিনি মেহমানের সহিত খেজুর খাইতেছিলেন। খাবারের দস্তরখানে হযরত আলী (রা)-ও ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) খেজুরের সব আঁটি হযরত আলী (রা)-এর সামনে রাখিয়া বলিলেন, তুমি তো দেখিতেছি বড্ড পেটুক! হযরত আলী (রা) বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি আর কত পেটুক। আপনার সামনে তো আঁটি পর্যন্তও নাই। তখন সবাই হাসিয়া উঠিলেন।
হযরত আনাস (রা) বলেন, একবার এক মেহমান বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমার কোন সওয়ারী নাই, সুতরাং চড়িয়া বেড়াইবার জন্য আমাকে একটি সওয়ারী দিন। রাসূলুল্লাহ (স) (কৌতুক করিয়া) বলিলেন তোমাকে একটি উষ্ট্রীর বাচ্চা দিব। লোকটি বলিল, উটের বাচ্চা লইয়া আমি কি করিব? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এমন কোন উট আছে কি যাহা কোন উটের গর্ভ হইতে জন্মায় নাই?
📄 বিদায়কালে মেহমানকে উপঢৌকন প্রদান
রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন অসাধারণ অতিথিপরায়ণ। প্রত্যেক মেহমানকে তিনি অত্যন্ত যত্ন সহকারে আদর-আপ্যায়ন তো করিতেনই, উপরন্তু বিদায়কালে প্রত্যেক মেহমানকে উপযুক্ত পথ-খরচা এবং উপঢৌকন প্রদান করিতেন। ইহা করিতে যাইয়া তিনি কখনও কখনও ঋণগ্রস্ত হইয়া পড়িতেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার ওফাতকালে যেই সংক্ষিপ্ত ওসিয়্যাত করিয়াছিলেন, তন্মধ্যে ইহাও ছিল আমি যেইভাবে মেহমানদিগকে উপঢৌকন প্রদান করিয়াছি, তোমরাও সেইভাবে উহা প্রদান করিও। সাধারণভাবে প্রদত্ত এই পথ-খরচা ও বিদায়ী উপঢৌকনের পরিমাণ ছিল জনপ্রতি পাঁচ উকিয়া রৌপ্য। ইহা ছাড়া অন্যান্য দ্রব্যও প্রদান করা হইত।
হযরত হাবীব ইবন 'উমার সালমানী (রা) বলেন, আমরা সালমানী গোত্রের সাতজন লোক রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাতের জন্য মদীনায় হাজির হই। আমরা তিন দিন মদীনায় ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) তিন দিনই আমাদিগকে মেহমানদারী করেন। যখন বিদায়ের সময় হইল তখন হযরত বিলাল (রা) তাঁহার নির্দেশমত আমাদের প্রত্যেককে জনপ্রতি পাঁচ উকিয়া রৌপ্য প্রদান করিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) এই বলিয়া ওযরখাহি করিলেন, আজ আমাদের হাতে অর্থ নাই। আমরা বলিলাম, হযরত! ইহার চেয়ে উত্তম মাল আর কী হইতে পারে? তারপর আমরা মাতৃভূমির উদ্দেশে রওয়ানা হইলাম।
একবার মুযায়না কবীলার চার শত লোকের একটি কাফেলা রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাজির হইল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের উপযুক্ত মেহমানদারী করিলেন। বিদায়কালে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত উমার (রা)-কে ডাকিয়া বলিলেন, উমার! উঠ, ইহাদিগকে ঘরে ফিরিবার মত পথ-খরচা দিয়া দাও। হযরত উমার (রা) বলিলেন, আমার কাছে তো আর কিছু নাই। যাহা কিছু খেজুর আছে উহা সকলের প্রয়োজন মিটাইবে না। রাসূলুল্লাহ (স) পুনরায় বলিলেন, উমার! যাও, তাহদিগকে পাথেয় দিয়া দাও। অবশেষে উমার (রা) মেহমানদিগকে লইয়া তাহার গৃহের ছাদের উপরে উঠিলেন। তিনি উঠিয়াই বিস্ময়ের সহিত দেখিলেন যে, উটের পিঠের সমান উচু এক বিশাল খেজুরের স্তূপ। তিনি মেহমানদিগকে বলিলেন, আপনারা নিজ নিজ প্রয়োজন মাফিক খেজুর তুলিয়া নিন। হযরত নু'মান ইব্ন্ন মুকাররিন (রা) বলেন, কী বিস্ময়কর! আমরা এত লোক খেজুর লওয়ার পরও সেই স্তূপের একটি খেজুর কমিয়াছে বলিয়া মনে হইল না।
সাহাবী হারিস ইব্ন আওফের নেতৃত্বে যু-মুররা গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (স)-এর মেহমান হইল। বিদায়কালে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের প্রত্যেককে দশ উকিয়া পরিমাণের রৌপ্য এবং সাহাবী হারিছকে বার উকিয়া রৌপ্য প্রদান করিলেন। অনুরূপভাবে যে কেহ তাঁহার মেহমান হইত, বিদায়কালে তিনি তাহাদিগকে কিছু না কিছু পারিতোষিক প্রদান না করিয়া তৃপ্ত হইতেন না। কোন মেহমান তাঁহার জন্য হাদিয়া লইয়া আসিলে তিনি উহার যথার্থ মূল্যায়ন করিতেন এবং বিদায়কালে উহার উপযুক্ত উপঢৌকন প্রদান করিতেন। হযরত আনাস (রা) বলেন, জাহীর ইবন হারাম নামে রাসূলুল্লাহ (স)-এর একজন মরুবাসী প্রিয় সাহাবী ছিলেন। তিনি মাঝে মাঝে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বেড়াইতে আসিতেন। আসিবার সময় তিনি গ্রাম হইতে কিছু শাক-সবজী রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য উপহার হিসাবে লইয়া আসিতেন। তিনি যখন মদীনা হইতে ফিরিয়া যাইবার ইচ্ছা প্রকাশ করিতেন, তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে শহরের কিছু না কিছু জিনিস উপহার দিতেন। তিনি বলিতেন, "জাহীর আমাদের গাঁয়ের বন্ধু আর আমরা তাহার শহরের বন্ধু”।
মেহমানদের আতিথেয়তা এবং তাহাদের সেবা-যত্ন ও উপঢৌকন প্রদান ইত্যাদির ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (স) সর্বদা তাহাদের মর্যাদার প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রাখিতেন। এই ক্ষেত্রে মেহমানের মর্যাদা, আন্তরিকতা ও তাকওয়ার বিষয়টিও বিশেষভাবে বিবেচনায় আনিতেন।
মেহমানদিগকে উপহার প্রদানকালে পাছে কেহ বাকী রহিল কি না, সেই দিকেও রাসূলুল্লাহ (স) বিশেষভাবে খেয়াল রাখিতেন। তুজীব কবীলার তেরজন মেহমানকে বিদায়কালে তাহদিগকে উপযুক্ত হাদিয়া প্রদান করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের মধ্যে কেহ বাকী রহিয়া গেল না তো? তাহারা বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ একজন তরুণকে আমরা আমাদের মালপত্র এবং বাহন দেখাশুনার জন্য রাখিয়া আসিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ডাকাইয়া আনাইলেন এবং অন্যান্যদের মত তাহাকেও উপহার প্রদান করিলেন।
কখনও কখনও রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসা মেহমানগণ তাহাদের পূর্ব পরিচিতির কারণে কোন কোন সাহাবীর গৃহে অবস্থান করিতেন। ইহাদের প্রতিও রাসূলুল্লাহ (স) বিশেষভাবে খেয়াল রাখিতেন, ইহাদের মেহমানদারী এবং সেবা-যত্নের খোঁজ-খবর লইতেন এবং সাধ্যমত তিনি নিজেও এই সকল মেহমানের আদর-আপ্যায়নে শরীক হইতেন। সাহাবী হযরত রুওয়ায়ফি' (রা) বলেন, আমি ছিলাম আরবের বালী গোত্রের লোক। একবার বালী গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল আমার বাড়ীতে মেহমান হইল। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাতের জন্য আসিয়াছিল। তাহারা তিন দিন আমার বাড়ীতে ছিল। একদিন রাসূলুল্লাহ (স) আমার বাড়ীতে আসিয়া মেহমানদের আপ্যায়নের জন্য কিছু খেজুর দিয়া গেলেন, অতঃপর বিদায়কালেও তিনি তাহাদের প্রত্যেককে উপযুক্ত উপঢৌকন প্রদান করিলেন।
হযরত আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার নিকট আগত মেহমানদের উপযুক্ত সম্মান করিতেন। তিনি কাহারও সহিত স্বীয় আন্তরিকতা ও প্রফুল্লচিত্ততার ক্ষেত্রে তারতম্য করিতেন না। তিনি প্রত্যেকের খোঁজ-খবর লইতেন। তিনি মেহমানদের সহিত নিরহংকারভাবে বসিতেন। তাঁহার নিকট আগত কেহই এই কথা অনুভব করিত না যে, সে ছাড়া অন্য কেহ তাঁহার বেশী প্রিয়। তিনি ছিলেন নম্র ও বিনয়ী। তিনি প্রত্যেক মেহমানকে প্রয়োজন মাফিক সময় দিতেন। মেহমান প্রয়োজনের কথা জানাইলে তাহা পূরণের জন্য তিনি সাধ্যমত চেষ্টা করিতেন অথবা কোমল ভাষায় সান্ত্বনা দিতেন। তিনি মেহমানদের অসংলগ্ন কথাবার্তা ও অযাচিত ব্যবহারে ধৈর্য ধারণ করিতেন। অপর একটি রিওয়ায়াতে হযরত আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন সামাজিকতা পালনে তৎপর। তাই যে কেহ তাঁহার সহিত মিশিত এবং তাঁহার সমাদর দেখিত, সে-ই তাঁহাকে অত্যধিক ভালবাসিত।
হ হযরত জারীর ইব্ন আবদুল্লাহ বাজালী (রা) বলেন, আমি একদিন রাসূলুল্লাহ (স)-এর গৃহে আগমন করিয়া দেখিলাম, গৃহে অনেক লোক। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে দেখিয়া তাঁহার চাদর মোবারক বাড়াইয়া দিয়া বলিলেন, "ইহা বিছাইয়া বসিয়া যাও। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাদর মোবারক হাতে পাইয়া উহাকে আমার সিনায় লাগাইলাম এবং চুমু খাইলাম। বলিলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে যেই উষ্ণ সমাদর করিলেন, আল্লাহ আপনাকে অনুরূপ সমাদর করুন। তিনি উত্তরে বলিলেন, শোন! যখন তোমাদের নিকট কোন সম্মানিত ব্যক্তি আগমন করে তখন তোমরা তাহাকে যথাযথ সমাদর করিবে”।
হযরত জারীর ইব্ন আবদুল্লাহ (রা) আরও বলেন, ইসলামে দীক্ষিত হইবার পর যখনই আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিতাম, তিনি আমাকে অভ্যর্থনা জানাইতেন। আমাকে গ্রহণ করিবার সময় সর্বদা আমি তাঁহার মুখে হাসি বিচ্ছুরিত হইতে দেখিতাম।
হযরত জাহজাহ আল-গিফারী (রা) বলেন, আমি যখন পৌত্তলিক ছিলাম, ঐ সময় একবার আমি মদীনায় আসি এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর মেহমান হিসাবে তাঁহার গৃহে অবস্থান করি। রাত্রি বেলা তাঁহার পালিত সব কয়টি ছাগলের দুধ আমি দোহন করিয়া পান করি। ইহার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে একটি কথাও বলেন নাই। ঐ রাত্রে তিনি ও তাঁহার পরিবারের সকলে অভুক্ত অবস্থায় ঘুমাইয়া পড়েন।
হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বর্ণিত একটি হাদীছে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, যে ব্যক্তি সালাত আদায় করে, যাকাত প্রদান করে, রমযান মাসে সিয়াম আদায় করে এবং মেহমানের আদর-আপ্যায়ন করে সে বেহেশতে প্রবেশ করিবে।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, ফেরেশতাগণ ঐ ব্যক্তির জন্য রহমতের দু'আ করিতে থাকেন যতক্ষণ পর্যন্ত মেহমানের জন্য তাহার দস্তরখান বিছানো থাকে।
যাহারা কৃপণতা করে, মেহমানদারী করে না, তাহাদের সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (স) কঠোর বাণী উচ্চারণ করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, لا خير فيمن لا يضيف "যে ব্যক্তি মেহমানের আদর-আপ্যায়ন করে না তাহার মধ্যে কল্যাণ নাই”।
তিনি আরও বলেন, যদি তোমরা কোন কওমের নিকট অবতরণ কর, আর তাহারা তোমাদের যথাযথ আতিথেয়তা আঞ্জাম দেয় তবে তাহা গ্রহণ কর। আর যদি তাহারা তোমাদের মেহমানদারী না করে তাহা হইলে তোমরা তাহাদের অবস্থা মাফিক মেহমানের হক আদায় করিয়া লও।
আসহাবে সুফফা ছিলেন মুসলমানদের স্থায়ী মেহমান। রাসূলুল্লাহ (স) বলিতেন, তোমাদের মধ্যে যাহার দুইজনকে আহার করাইবার সামর্থ্য আছে, সে তাহাদের তিনজনকে সাথে লইবে। যাহার চারজনের আহার করাইবার সামর্থ্য রহিয়াছে, সে তাহাদের পাঁচজনকে সাথে লইবে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই ঘোষণা শুনিয়া কোন সাহাবী একজন, কোন সাহাবী দুইজন, কোন সাহাবী তিনজন, এইভাবে প্রত্যেকেই আপন আপন সামর্থ্যানুযায়ী তাঁহাদিগকে নিজেদের মেহমান হিসাবে নিজ নিজ গৃহে লইয়া যাইতেন।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, একদিন এক ক্ষুধার্ত ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া খাবার চাহিল। তিনি আহারের জন্য তাহাকে তাঁহার এক স্ত্রীর গৃহে পাঠাইলেন। সেখান হইতে জবাব আসিল, গৃহে পানি ছাড়া আর কোন খাবার নাই। তিনি তাহাকে আর এক স্ত্রীর নিকট পাঠাইলেন। সেখান হইতেও একই জবাব আসিল। এইভাবে সকল স্ত্রীর নিকট হইতে একই জবাব আসিল। অবশেষে তিনি উপস্থিত সাহাবীগণকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, কে আছ, আজ রাত এই মেহমানের আদর-আপ্যায়ন করিবে? একজন আনসারী সাহাবী দাঁড়াইয়া বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি তৈরী আছি। আনসারী সাহাবী মেহমানকে সাথে লইয়া নিজ গৃহে পৌঁছিলেন। তখন তাঁহার গৃহে তাঁহার শিশু সন্তানদের খাবার ছাড়া আর কোন খাবারই ছিল না। অবশেষে তাঁহারা কৌশলে শিশু সন্তানদিগকে অভুক্ত রাখিয়াই ঘুম পাড়াইয়া দিলেন এবং ঐ খাবারই মেহমানের সম্মুখে উপস্থিত করিলেন। আনসারী সাহাবী তাঁহার স্ত্রীকে বলিলেন, শোন! মেহমান যখন দস্তরখানে বসিবে তখন বাতি নিভাইয়া দিবে এবং আমরা ভান করিব যেন মেহমান বুঝিতে পারে, আমরাও খাবার খাইতেছি। এইভাবে তাহারা মেহমানের সমাদর করিলেন এবং নিজেরা অভুক্ত রাত্র কাটাইলেন। পরের দিন সকালে রাসূলুল্লাহ (স) আনসারী সাহাবীকে ডাকিয়া বলিলেন, তোমরা স্বামী-স্ত্রী মেহমানের যেই আদর-আপ্যায়ন করিয়াছ, ইহাতে আল্লাহ অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়াছেন। তিনি তোমাদের শানে এই আয়াত নাযিল করিয়াছেন:
وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ.
"আর তাহারা তাহাদিগকে (মেহমানদিগকে) নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্থ হইলেও"।