📄 সংবাদ যাচাইয়ে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়নীতি
মুস্তালিক গোত্রের সরদার উম্মুল মু'মিনীন হযরত জুওয়ায়রিয়া (রা)-এর পিতা হযরত হারিছ ইন্ন দিরার (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে হাযির হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং যাকাত প্রদানের নির্দেশ দেন। তিনি দীন ইসলাম কবুল করিবার পর যাকাত আদায় করিবার অঙ্গীকার করিয়া বলিলেন, এখন আমি সগোত্রে ফিরিয়া গিয়া তাহাদেরকেও দীন ইসলাম কবূল ও যাকাত প্রদানের দাওয়াত দিব। যাহারা আমার কথা মানিবে এবং যাকাত আদায় করিবে, আমি তাহাদের যাকাত একত্র করিয়া আমার নিকট জমা রাখিব। আপনি অমুক মাসের অমুক তারিখের মধ্যে কোন দূত আমার নিকট প্রেরণ করিবেন যাহাতে আমি যাকাতের জমাকৃত অর্থ তাহার হস্তে সোপর্দ করিতে পারি।
অতঃপর হারিছ (রা) যখন ওয়াদা অনুযায়ী যাকাতের অর্থ জমা করিলেন এবং দূত আগমনের নির্ধারিত মাস ও তারিখ অতিক্রান্ত হওয়ার পরও কোন দূত আগমন করিল না, তখন তিনি আশংকা করিলেন যে, সম্ভবত রাসূলুল্লাহ (স) কোন কারণে তাহাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হইয়াছেন। নতুবা ওয়াদা অনুযায়ী দূত না পাঠাইবার কোন কারণ থাকিতে পারে না। হারিছ (রা) আশংকার কথা ইসলাম গ্রহণকারী নেতৃস্থানীয় লোকদের কাছেও প্রকাশ করিলেন এবং সকলে মিলিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হওয়ার ইচ্ছা করিলেন।
এদিকে রাসূলুল্লাহ (স) নির্ধারিত তারিখে ওয়ালীদ ইব্ন উকবা (রা)-কে যাকাত গ্রহণের জন্য পাঠাইয়া দেন। জাহিলী যুগে ওয়ালীদ ইব্ন উকবার সহিত মুস্তালিক গোত্রের পুরাতন শত্রুতা ছিল। ওয়ালীদ যখন মুস্তালিক গোত্রে পৌঁছান তখন মুস্তালিক গোত্র তাহার অভ্যর্থনার উদ্দেশ্যে সম্মিলিতভাবে বাহির হইয়া আসে। ওয়ালীদ মনের সন্দেহবশত ভাবিলেন যে, তাহারা বোধহয় পুরাতন শত্রুতার কারণে তাহাকে হত্যা করিতে আগাইয়া আসিতেছে। সেমতে তিনি সেখান হইতে ফিরিয়া আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে নিজ ধারণা অনুযায়ী আরয করিলেন, তাহারা যাকাত দিতে সম্মত নয় বরং আমাকে হত্যা করিতে উদ্যত হইয়াছে।
তখন রাসূলুল্লাহ (স) খালিদ ইব্দুল ওয়ালীদ (রা)-কে প্রেরণ করিলেন এবং নির্দেশ দিলেন যে, গোপনে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে। যদি তাহাদের ঈমানের কোন লক্ষণ পাওয়া যায় তবে তাহাদের নিকট হইতে যাকাত গ্রহণ করিবে, নতুবা কাফিরদের সহিত যেমন ব্যবহার করা হয় তাহাদের সহিতও তেমন ব্যবহার করিবে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশ
অনুযায়ী খালিদ (রা) তথায় গুপ্তচরের মাধ্যমে মাগরিব ও 'ইশার নামাযের আযান শুনিতে পাইলেন। অতএব তিনি তাহাদের নিকট হইতে যাকাত আদায় করিলেন এবং তাহাদের মধ্যে আনুগত্য ও কল্যাণকর বিষয় ছাড়া ফেতনা-ফাসাদ মূলত কিছুই পান নাই। অতঃপর খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রত্যাবর্তন করিয়া উপরিউক্ত সংবাদ প্রদান করিলেন।
আল্লাহ তা'আলা খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা)-এর সংবাদের সত্যতামূলক এবং 'উকবার সংবাদ ধারণাপ্রসূত অসত্যমূলক তাহা প্রমাণ করিয়া নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করিলেন, যাহা ছিল ন্যায়পরায়ণতা বিকাশের অন্যতম সুযোগ। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن جَآءَكُمْ فَاسِقُۢ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوٓاْ أَن تُصِيبُواْ قَوْمًۢا بِجَهَٰلَةٍ فَتُصْبِحُواْ عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَٰدِمِينَ .
"হে মু'মিনগণ! যদি কোন ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের নিকট সংবাদ আনয়ন করে তবে তোমরা তাহা যাচাই করিয়া দেখিবে, যাহাতে অজ্ঞানতাবশত তোমরা কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও, অতঃপর নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও” (৪৯: ৬; আততাফসীর আল-মাযহারী, ৯ম., পৃ. ৪৫-৪৬; মুফতী শফী, মা'আরেফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত সং. পৃ. ১২৭৮)।
উল্লেখিত ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর কতিপয় ন্যায়পরায়ণতা উদঘাটিত হইয়াছে। যথা: (১) হারিছ (রা)-এর ওয়াদা মুতাবিক যাকাত সংগ্রহে নির্দিষ্ট মাসে, নির্দিষ্ট দিনে দূত প্রেরণ।
(২) ধারণার বশবর্তী হইয়া ওয়ালীদ ইবন 'উকবা সত্যে উপনীত না হইয়া ইজতিহাদী সংবাদ রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রদান করিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহা গ্রহণ না করিয়া পুনরায় খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা)-কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিবার জন্য প্রেরণ করিলেন।
(৩) খালিদ (রা) যাকাত গ্রহণ করিয়া যাচাইকৃত সঠিক তথ্য পরিবেশন করিলেন এবং আল্লাহ তা'আলা সেই মুহূর্তে উল্লিখিত আয়াত নাযিল করিয়া সত্যায়ন করিলেন। ফলে বনুল-মুস্তালিক অযাচিত অন্যায় যুদ্ধ হইতে বাঁচিয়া গেল এবং রাসূলুল্লাহ (স) দূরদর্শিতার মাধ্যমে ন্যায়পরায়ণভাবে যাচাই করিয়া অগত্যা এক অহেতুক যুদ্ধ হইতে নিরাপদ হইলেন।
মুস্তালিক গোত্রের সরদার উম্মুল মু'মিনীন হযরত জুওয়ায়রিয়া (রা)-এর পিতা হযরত হারিছ ইন্ন দিরার (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে হাযির হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং যাকাত প্রদানের নির্দেশ দেন। তিনি দীন ইসলাম কবুল করিবার পর যাকাত আদায় করিবার অঙ্গীকার করিয়া বলিলেন, এখন আমি সগোত্রে ফিরিয়া গিয়া তাহাদেরকেও দীন ইসলাম কবূল ও যাকাত প্রদানের দাওয়াত দিব। যাহারা আমার কথা মানিবে এবং যাকাত আদায় করিবে, আমি তাহাদের যাকাত একত্র করিয়া আমার নিকট জমা রাখিব। আপনি অমুক মাসের অমুক তারিখের মধ্যে কোন দূত আমার নিকট প্রেরণ করিবেন যাহাতে আমি যাকাতের জমাকৃত অর্থ তাহার হস্তে সোপর্দ করিতে পারি।
অতঃপর হারিছ (রা) যখন ওয়াদা অনুযায়ী যাকাতের অর্থ জমা করিলেন এবং দূত আগমনের নির্ধারিত মাস ও তারিখ অতিক্রান্ত হওয়ার পরও কোন দূত আগমন করিল না, তখন তিনি আশংকা করিলেন যে, সম্ভবত রাসূলুল্লাহ (স) কোন কারণে তাহাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হইয়াছেন। নতুবা ওয়াদা অনুযায়ী দূত না পাঠাইবার কোন কারণ থাকিতে পারে না। হারিছ (রা) আশংকার কথা ইসলাম গ্রহণকারী নেতৃস্থানীয় লোকদের কাছেও প্রকাশ করিলেন এবং সকলে মিলিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হওয়ার ইচ্ছা করিলেন।
এদিকে রাসূলুল্লাহ (স) নির্ধারিত তারিখে ওয়ালীদ ইব্ন উকবা (রা)-কে যাকাত গ্রহণের জন্য পাঠাইয়া দেন। জাহিলী যুগে ওয়ালীদ ইব্ন উকবার সহিত মুস্তালিক গোত্রের পুরাতন শত্রুতা ছিল। ওয়ালীদ যখন মুস্তালিক গোত্রে পৌঁছান তখন মুস্তালিক গোত্র তাহার অভ্যর্থনার উদ্দেশ্যে সম্মিলিতভাবে বাহির হইয়া আসে। ওয়ালীদ মনের সন্দেহবশত ভাবিলেন যে, তাহারা বোধহয় পুরাতন শত্রুতার কারণে তাহাকে হত্যা করিতে আগাইয়া আসিতেছে। সেমতে তিনি সেখান হইতে ফিরিয়া আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে নিজ ধারণা অনুযায়ী আরয করিলেন, তাহারা যাকাত দিতে সম্মত নয় বরং আমাকে হত্যা করিতে উদ্যত হইয়াছে।
তখন রাসূলুল্লাহ (স) খালিদ ইব্দুল ওয়ালীদ (রা)-কে প্রেরণ করিলেন এবং নির্দেশ দিলেন যে, গোপনে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে। যদি তাহাদের ঈমানের কোন লক্ষণ পাওয়া যায় তবে তাহাদের নিকট হইতে যাকাত গ্রহণ করিবে, নতুবা কাফিরদের সহিত যেমন ব্যবহার করা হয় তাহাদের সহিতও তেমন ব্যবহার করিবে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশ অনুযায়ী খালিদ (রা) তথায় গুপ্তচরের মাধ্যমে মাগরিব ও 'ইশার নামাযের আযান শুনিতে পাইলেন। অতএব তিনি তাহাদের নিকট হইতে যাকাত আদায় করিলেন এবং তাহাদের মধ্যে আনুগত্য ও কল্যাণকর বিষয় ছাড়া ফেতনা-ফাসাদ মূলত কিছুই পান নাই। অতঃপর খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রত্যাবর্তন করিয়া উপরিউক্ত সংবাদ প্রদান করিলেন।
আল্লাহ তা'আলা খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা)-এর সংবাদের সত্যতামূলক এবং 'উকবার সংবাদ ধারণাপ্রসূত অসত্যমূলক তাহা প্রমাণ করিয়া নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করিলেন, যাহা ছিল ন্যায়পরায়ণতা বিকাশের অন্যতম সুযোগ। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن جَآءَكُمْ فَاسِقُۢ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوٓاْ أَن تُصِيبُواْ قَوْمًۢا بِجَهَٰلَةٍ فَتُصْبِحُواْ عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَٰدِمِينَ .
"হে মু'মিনগণ! যদি কোন ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের নিকট সংবাদ আনয়ন করে তবে তোমরা তাহা যাচাই করিয়া দেখিবে, যাহাতে অজ্ঞানতাবশত তোমরা কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও, অতঃপর নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও” (৪৯: ৬)।
উল্লেখিত ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর কতিপয় ন্যায়পরায়ণতা উদঘাটিত হইয়াছে। যথা: (১) হারিছ (রা)-এর ওয়াদা মুতাবিক যাকাত সংগ্রহে নির্দিষ্ট মাসে, নির্দিষ্ট দিনে দূত প্রেরণ।
(২) ধারণার বশবর্তী হইয়া ওয়ালীদ ইবন 'উকবা সত্যে উপনীত না হইয়া ইজতিহাদী সংবাদ রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রদান করিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহা গ্রহণ না করিয়া পুনরায় খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা)-কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিবার জন্য প্রেরণ করিলেন।
(৩) খালিদ (রা) যাকাত গ্রহণ করিয়া যাচাইকৃত সঠিক তথ্য পরিবেশন করিলেন এবং আল্লাহ তা'আলা সেই মুহূর্তে উল্লিখিত আয়াত নাযিল করিয়া সত্যায়ন করিলেন। ফলে বনুল-মুস্তালিক অযাচিত অন্যায় যুদ্ধ হইতে বাঁচিয়া গেল এবং রাসূলুল্লাহ (স) দূরদর্শিতার মাধ্যমে ন্যায়পরায়ণভাবে যাচাই করিয়া অগত্যা এক অহেতুক যুদ্ধ হইতে নিরাপদ হইলেন।
📄 সময় বণ্টনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা
রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার জীবনের প্রতিটি কাজকর্ম, কথাবার্তা, চালচলন, আচার-ব্যবহার, বাহ্যিক আচরণ, অভ্যন্তরীণ আচরণ, প্রকাশ্য-গোপন, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিকসহ সর্বাঙ্গণে সময় বণ্টনের ক্ষেত্রেও ছিলেন ন্যায়পরায়ণতার এক অনুপম দৃষ্টান্ত, যাহা পূর্ণাঙ্গভাবে উদ্ভাসিত হইয়াছে ইমাম হাসান ইবন আলী (রা)-এর হাদীছ হইতে। তিনি 'আলী ইব্ন আবী তালিব (রা) হইতে বর্ণনা করেন:
كان دخوله لنفسه ماذونا له في ذلك و كان اذا اتى الى منزله جزء دخوله ثلاثة اجزاء (۱) جزء الله . (۲) جزء لاهله (۳) وجزء لنفسه . ثم يجعل جزأه بين الناس فيرد ذلك على العامة بالخاصة ولا يدخر عنهم شيئا فكان من سيرته في جزء الامة ايثار اهل الفضل بإذنه وقسمته على قدر فضلهم في الدين منهم ذو الحاجة ومنهم ذو الجاجتين ومنهم ذو الحوائز فيشغل بهم ويشغلهم فيما يصلحهم والامة من مسالته عنهم واخبارهم بالذي ينبغي لهم يقول ليبلغ الشاهد منكم الغائب وابلغوني حاجة من لا يستطيع ابلاغي حاجته فانه من ابلغ سلطانا حاجة من لا يستطيع ابلغها ثبت الله قدميه يوم القيامة لا يذكر عنده الا ذلك ولا يقبل من احد غيره . . . . . . . . . قد وسع الناس منه خلقه فصار لهم أبا و صار عنده في الحق سواء مجلسه مجلس حلم وحياء وصدق وامانة
"ব্যক্তিগতভাবে তাঁহার এই অনুমতি ছিল যে, যখনই ইচ্ছা করিতেন তখনই তিনি গৃহে প্রবেশ করিতে পারিতেন। তবুও তাঁহার ন্যায়নিষ্ঠ অভ্যাস ছিল, যখনই গৃহে গমন করিতেন তাঁহার সময়কে তিনভাগে ভাগ করিতেন।
(১) এক ভাগ আল্লাহ তা'আলার ইবাদতের জন্য; (২) দ্বিতীয় ভাগ নিজ পরিবার-পরিজনের জন্য; (৩) এবং তৃতীয় ভাগ নিজের আরামের জন্য; আবার নিজ আরামের সময়টুকুও লোকজনের কল্যাণে ব্যয় করিতেন।
তাঁহার অভ্যাস ছিল, উম্মতের জন্য নির্ধারিত সময়ে স্বীয় ইচ্ছা অনুযায়ী জ্ঞানীদেরকে প্রাধান্য দিতেন এবং ঐ সময়ের বণ্টনে দীনী মর্যাদা হিসাবে তারতম্য ঘটিত। তাহাদের মধ্যে কাহারও থাকিত একটি কাজ, কাহারও থাকিত দুইটি কাজ এবং কাহারও কয়েকটি কাজ।
তোমরা আমাকে সেই ব্যক্তির প্রয়োজন অবগত কর, যে তাহার প্রয়োজনকে আমার নিকট পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারে না। কেননা যে ব্যক্তি আমীর (প্রশাসক) পর্যন্ত এমন কোন ব্যক্তির প্রয়োজনকে পৌঁছাইয়া দিয়াছে, যে তাহার নিজের প্রয়োজনকে ঐ পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারে না, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা ঐ ব্যক্তিকে দৃঢ়পদ রাখিবেন। এই কথাই তাহার কাছে আলোচিত হইত এবং ইহা ছাড়া তিনি কাহারও কোন কথা পছন্দ করিতেন না।
তাঁহার ব্যবহার সমস্ত লোকের জন্য সমান ছিল। (স্নেহ-মমতার ক্ষেত্রে) তিনি ছিলেন তাঁহাদের পিতা। আর লোকেরা সব (অধিকারের ক্ষেত্রে) তাঁহার নিকট ছিল সমান। তাঁহার মজলিস ছিল ধৈর্যশীলতা, লজ্জাশীলতা, সততা ও আমানতের মজলিস।
উল্লিখিত হাদীছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়নিষ্ঠ সময় বণ্টনের এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হইয়াছে।
📄 মুবাহালার ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা
নবম মতান্তরে দশম হিজরীতে নাজরান খৃস্টান প্রতিনিধি দল আগমন করে। তাহারা বলিল, হযরত ঈসা (আ) স্বয়ং আল্লাহ; আল্লাহর পুত্র, তিন আল্লাহর মধ্যে আল্লাহ্। কেননা তিনি মৃত্যুকে জীবিত করেন, কুষ্ঠরোগীকে ভাল করেন, ধবল রোগীকে আরোগ্যসহ অন্যান্য রোগব্যাধি আরোগ্য করেন, অদৃশ্যের সংবাদ দেন, মাটি দ্বারা পাখি বানাইয়া ফুৎকার দিয়া আকাশে উড়াইয়া দেন। এইসব আল্লাহর কাজ। অতএব তিনি আল্লাহ্। ইহা ছাড়া তাঁহার কোন পিতা নাই। তাই আল্লাহই তাঁহার পিতা হওয়া যুক্তিসঙ্গত। এতদ্ব্যতীত তিনি মাতৃক্রোড়ে কথা বলিয়াছেন যাহা একমাত্র তাঁহারই বৈশিষ্ট্য।
তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদেরকে দীন ইসলাম কবুল করিবার দাওয়াত দিলেন। তাহারা বলিল: হাঁ। আমরা তো আপনার পূর্বেই ইসলাম কবূল করিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের উভয়কে (আকিব ও আরহামকে) লক্ষ্য করিয়া বলিলেন:
الا كذبتما يمنعكما من الاسلام ادعا وكما الله ولدا وعبادتكم الصليب وأكلكما الخنزير .
“ তোমাদের মিথ্যা বক্তব্যই তোমাদেরকে দীন ইসলাম কবুল করা হইতে বিরত রাখিয়াছে। কেননা তোমরা আল্লাহ্র পুত্র স্বীকার কর, ক্রুশের পূজা কর এবং শূকরের গোশত খাও (যাহা হারাম)"।
তাহারা বলিল, ঈসা (আ)-এর পিতা যদি খোদা না হয় তবে তাহার পিতা কে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা কি জান না, আমাদের প্রতিপালক চিরঞ্জীব। কিন্তু হযরত ঈসা (আ)-এর মৃত্যু হইবে। প্রতিনিধি দল বলিল, জানি। রাসূলুল্লাহ (স) পুনরায় বলিলেন, তোমাদের কি এই কথা জানা নাই যে, তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করিয়া দেন। সবকিছুকে সংরক্ষণ ও রিযিক দানের দায়িত্ব তাঁহারই। তাহারা উত্তর দিল, জানি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এই রকম গুণ কি হযরত ঈসা (আ)-এর রহিয়াছে? তাহারা উত্তর দিল, না।
রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা কি এই জ্ঞান রাখ না যে, আকাশ ও পৃথিবীর কোন কিছুই আল্লাহ্র অগোচরে নাই? তাহারা বলিল, জানিব না কেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এই রকম গুণ কি হযরত ঈসা (আ)-এর আছে? তাহারা বলিল, না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমাদের প্রতিপালক হযরত ঈসা (আ)-কে তাঁহার মায়ের উদরে সৃষ্টি করিয়াছেন। আমাদের আল্লাহ পানাহারের প্রয়োজন হইতে মুক্ত। তাহারা বলিল, হাঁ। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা কি এতটুকুও বুঝিতেছে না, তাঁহার মাতা হযরত ঈসা (আ)-কে অন্যান্য গর্ভধারিণী স্ত্রীলোকদের মতই আপন উদরে ধারণ করিয়াছিলেন, প্রসবও করিয়াছিলেন অন্যান্য মহিলাদের মত, তারপর তিনি আহার দিয়াছিলেন যেমন অন্যান্য শিশুদেরকে দেয়া হয়। তিনি পানাহার করিতেন এবং প্রকৃতির প্রয়োজন পূরণ করিতেন। তাহারা বলিল, এই কথা আমরা জানি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইহার পরও তোমরা তাহাকে আল্লাহ্র পুত্র মনে কর কিভাবে? খৃস্টানরা নির্বাক হইয়া গেল। তখন আল্লাহ তা'আলা সূরা আলে ইমরানের প্রারম্ভ হইতে আশিটি আয়াত নাযিল করিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) শক্তি প্রয়োগ না করিয়া মুবাহালা করেন এবং তাহাদের নিকট হইতে জিযয়া গ্রহণ করিয়া তাহাদেরকে শান্তিতে বসবাস করার ব্যবস্থা করেন এবং স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
📄 সন্ধির শর্ত বহির্ভূত মহিলাদের ব্যাপারে ন্যায়পরায়ণতা
হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি সম্পাদিত হইবার পর মক্কা হইতে কিছু সংখ্যক মু'মিন মহিলা আল্লাহর রাসূল (স)-এর নিকট মদীনায় হিজরত করিয়া আসিলেন। তাহাদের আত্মীয়-স্বজন হুদায়বিয়ার সন্ধি অনুযায়ী তাহাদেরকে ফেরত দাবি করিলেন। আল্লাহর রাসূল (স) এই দাবি প্রত্যাখ্যান করিলেন। ন্যায়পরায়ণতার মদদগার রাসূলুল্লাহ (স) যুক্তি দেখাইলেন যে, এই বিষয়ে চুক্তিতে লিখিত বক্তব্য হইতেছে:
وعلي أنه لا يأتيك منا رجل وإن كان علي دينك الا رودته إلينا .
"আমাদের মধ্য হইতে যে সমস্ত পুরুষ আপনার নিকট আশ্রয় গ্রহণ করিতে আসিবে তাহারা যদিও আপনার দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে তথাপিও তাহাদিগকে ফেরৎ পাঠাইতে হইবে"।
কিন্তু মহিলাদের ব্যাপারে চুক্তিতে কোন শর্তারোপ করা হয় নাই। অতএব মহিলাগণ চুক্তির শর্ত বহির্ভূত। এতদ্ব্যতীত আল্লাহ তা'আলা এই প্রসঙ্গে বলিয়াছেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا جَاءَكُمُ الْمُؤْمِنَتُ مُهْجِرَت فَامْتَحِنُوهُنَّ اللَّهُ أَعْلَمُ بِالْمُنِهِنَّ فَإِنْ عَلِمْتُمُوهُنَّ مُؤْمِنَتٍ فَلا تَرْجِعُوهُنَّ إِلَى الكُفَّارِ لا هُنَّ حِلَّ لَهُمْ وَلَاهُمْ يَحِلُّوْنَ لَهُنَّ وَأَتُوهُمْ مَّا أَنْفَقُوا وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ أَنْ تَنْكِحُوهُنَّ إِذَا أَتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ وَلَا تُمْسِكُوا بِعِصَمِ الْكَوَافِرِ وَسْتَلُوا مَا أَنْفَقْتُمْ وَلِيَسْتَلُوا مَا أَنْفَقُوا ذَلِكُمْ حُكْمُ اللهِ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ وَاللَّهُ عَلِيْمٌ حَكِيمٌ . وَإِنْ فَاتَكُمْ شَيْءٌ مِّنْ أَزْوَاجِكُمْ إِلَى الْكُفَّارِ فَعَاقَبْتُمْ فَأْتُوا الَّذِينَ ذَهَبَتْ أَزْوَاجُهُمْ مِّثْلَ مَا أَنْفَقُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي انْتُمْ بِهِ مُؤْمِنُونَ . يَأَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءَكَ الْمُؤْمِنُتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَي أَنْ لا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ وَلَا يَأْتِينَ بِبُهْتَانٍ يُفْتَرِينَهُ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِينَكَ فِي مَعْرُوفِ فَبَايِعُهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهَ إِنَّ اللهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ .
"হে মু'মিনগণ! তোমাদের নিকট মু'মিন নারীরা হিজরত করিয়া আসিলে তাহাদেরকে পরীক্ষা করিও। আল্লাহ তাহাদের ঈমান সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন। যদি তোমরা জানিতে পার যে, তাহারা মু'মিন তবে তাহাদেরকে কাফিরদের নিকট ফেরত পাঠাইও না। মু'মিন নারিগণ কাফিরদের জন্য বৈধ নহে এবং কাফিররা মু'মিন নারীদের জন্য বৈধ নহে। কাফিররা যাহা ব্যয় করিয়াছে তোমরা তাহা উহাদেরকে ফিরাইয়া দিও। অতঃপর তোমরা তাহাদেরকে বিবাহ করিলে তোমাদের কোন অপরাধ হইবে না যদি তোমরা তাহাদেরকে তাহাদের মাহর দাও। তোমরা কাফির নারীদের সহিত দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখিও না। তোমরা যাহা ব্যয় করিয়াছ তাহা ফেরত চাহিবে এবং কাফিররা ফেরত চাহিবে যাহা তাহারা ব্যয় করিয়াছে। ইহাই আল্লাহ্ বিধান; তিনি তোমাদের মধ্যে ফায়সালা করিয়া থাকেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যদি কেহ হাতছাড়া হইয়া কাফিরদের নিকট রহিয়া যায় এবং তোমাদের যদি সুযোগ আসে তখন যাহাদের স্ত্রীগণ হাতছাড়া হইয়া গিয়াছে তাহাদেরকে, তাহারা যাহা ব্যয় করিয়াছে তাহার সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করিবে। তোমরা ভয় কর আল্লাহকে যাঁহার প্রতি তোমরা বিশ্বাসী। হে নবী! মু'মিন নারীরা যখন তোমার নিকট আসিয়া বায়'আত করে এই মর্মে যে, তাহারা আল্লাহ্র সহিত কোন শরীক স্থির করিবে না, চুরি করিবে না, ব্যভিচার করিবে না, নিজেদের সন্তান হত্যা করিবে না, তাহারা সজ্ঞানে কোন অপবাদ রচনা করিবে না এবং সৎকার্যে তোমাকে অমান্য করিবে না তখন তাহাদের বায়'আত গ্রহণ করিও এবং তাহাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিও। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৬০:১০-১২)।
এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর কোন মু'মিন মহিলা হিজরত করিয়া আসিলে উল্লিখিত শর্ত সাপেক্ষ স্বীকারোক্তি করিয়া অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ার পর মদীনায় থাকার অনুমতি লাভ করিত, ফেরত পাঠান হইত না। আর যাহারা উক্ত শর্ত মুতাবিক অঙ্গীকার করিত না তাহাদেরকে মক্কায় ফেরত পাঠান হইত। এইভাবে রাসূলুল্লাহ (স) মু'মিন নারীদের মদীনায় আশ্রয় দিয়া হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্ত ন্যায়সঙ্গতভাবে রক্ষা করিয়াছেন।