📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 চুরির শাস্তিবিধানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা

📄 চুরির শাস্তিবিধানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা


রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা বিজয়ের সময় ফাতিমা বিন্ত আবুল আসাদ ইবন 'আবদুল আসাদ মাখযূমী চুরি করিয়া ধৃত হন। ইবন সা'দ মহিলাটির নাম উন্মু 'আমর বিন্ত সুফয়ান ইব্‌ 'আবদুল আসাদ লিখিয়াছেন। বনূ মাখযূম গোত্রে উক্ত মহিলার পরিবারটি ছিল সম্ভ্রান্ত। রাসূলুল্লাহ (স) যথা বিধি তাঁহার হাত কাটার আদেশ দিলেন। ইহাতে তাহার সম্প্রদায় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়। তাহারা উসামা ইবন যায়দ (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট সুপারিশ করিতে বলিলে তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে ইহা পেশ করেন। তৎক্ষণাত রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখমণ্ডল অসন্তোষে রক্তিম বর্ণ হইয়া গেল। তিনি কঠোর ভাষায় বলিলেন, হে উসামা! তুমি আমার নিকট আল্লাহর নির্ধারিত বিধান পরিবর্তনের সুপারিশ করিতে আসিয়াছ? উসামা (রা) সঙ্গে সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (س) খুতবার উদ্দেশ্যে দাঁড়াইলেন। হামদ ও ছানার পর ঘোষণা করিলেন :
انما هلك من كان قبلكم بانه اذا سرق فيهم الشريف تركوه واذا سرق فيهم الضعيف قطعوه والذي نفسي بيده لو كانت فاطمة بنت محمد لقطعت يدها فقطع يد المخزومية .
"তোমাদের পূর্ববর্তী সম্প্রদায় এইজন্যই ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছে যে, তাহাদের মধ্যে কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করিলে তাহাকে শাস্তি হইতে মুক্তি দেওয়া হইত। আর কোন দুর্বল ব্যক্তি চুরি করিলে তাহার হাত কাটিয়া দেওয়া হইত। সেই সত্তার শপথ যাঁহার কব্জায় আমার প্রাণ! মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমা উহা করিলে অবশ্যই তাঁহার হাতও কাটিয়া ফেলিতাম। অতঃপর উক্ত মাখযুমী মহিলার হাত কাটিয়া ফেলা হইল" (আত-তাফসীর আল-মাযহারী, ৩খ., পৃ. ৯৬; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৩২৫)।
রাসূলুল্লাহ (স) ন্যয়বিচার প্রতিষ্ঠায় যে কত কঠোর ছিলেন তাঁহার অনুপম দৃষ্টান্ত উল্লিখিত ঘটনায় পরিস্ফুটিত হইয়াছে। এমনিভাবে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবন চলার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোতভাবে রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন ন্যায়পরায়ণ, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য যেমন ন্যায়পরায়ণ হওয়ার জন্য তিনি আল্লাহ কর্তৃক আদিষ্ট হইয়াছেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যাকাত বণ্টনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা

📄 যাকাত বণ্টনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা


মদীনার কোন কোন মুনাফিক রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর যাকাত বণ্টনে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপন করে। উক্ত অভিযোগ হইতে রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত। আল্লাহ তা'আলা উক্ত ঘটনা প্রসঙ্গে ইরশাদ করেন:
وَمِنْهُمْ مِّنْ يَلْمِرُكَ فِي الصَّدَقْتِ فَأَنْ أَعْطُوا مِنْهَا رَضُوا وَإِن لَّمْ يُعْطُوا مِنْهَا إِذَاهُمْ وَلَوْ أَنَّهُمْ رَضُوا مَا أَنْهُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ سَيُؤْتِينَا اللَّهُ مِنْ يَسْخَطُونَ . وَلَوْ أَن فَضْلِهِ وَرَسُولُهُ إِنَّا إِلَى اللَّهِ رَاغِبُونَ .
"উহাদের মধ্যে এমন লোক আছে, যে সাদাকা (যাকাত) বণ্টন সম্পর্কে আপনাকে দোষারোপ করে। অতঃপর ইহার কিছু উহাদিগকে দেওয়া হইলে উহারা পরিতুষ্ট হয়, আর ইহার কিছু উহাদেরকে না দেওয়া হইলে তৎক্ষণাত উহারা বিক্ষুব্ধ হয়। ভাল হইত যদি উহারা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল উহাদেরকে যাহা দিয়াছেন তাহাতে পরিতুষ্ট হইত এবং বলিত, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, আল্লাহ আমাদেরকে দিবেন নিজ করুণায় এবং অচিরেই তাঁহার রাসূলও; আমরা আল্লাহ্র প্রতি অনুরক্ত" (৯: ৫৮-৫৯)।
এই প্রসঙ্গে যায়দ ইব্‌ন্ন হারিছ আস-সুদাঈ হইতে বর্ণিত হইয়াছে যে, একদা তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে হাযির হইয়া অবগত হইলেন যে, তিনি তাঁহার গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার জন্য সৈন্যের একটি দল অচিরেই প্রেরণ করিবেন।
তিনি আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি বিরত থাকুন। আমি দায়িত্ব লইতেছি যে, তাহারা সকলেই বশ্যতা স্বীকার করিয়া এখানে হাযির হইবে। অতঃপর তিনি স্বগোত্রে পত্র প্রেরণ করিলেন। পত্র পাইয়া তাঁহারা সকইে ইসলাম গ্রহণ করে। এই প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে বলেন:
يا اخا صداء المطاع في قومه .
"হে সুদা-এর ভ্রাতা! তুমি তোমার গোত্রের একান্ত প্রিয় নেতা"।
তিনি আরয করিলেন, ইহাতে তাঁহার কৃতিত্বের কিছুই নাই। আল্লাহর অনুগ্রহে তাহারা হিদায়াত লাভ করিয়া মুসলমান হইয়াছে। ইত্যবসরে এক ব্যক্তি আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট কিছু সাহায্য (যাকাত) প্রার্থনা করিল। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে জবাব দিলেন, সাদাকা (যাকাত) ভাগ-বাটোয়ারার দায়িত্ব আল্লাহ তাঁহার নবী বা অন্য কাহারও উপর ন্যস্ত করেন নাই। তিনি নিজেই সাদাকা আটটি খাত নির্দিষ্ট করিয়া দিয়াছেন। এই আটটি শ্রেণীর কোন একটিতে তুমি অন্তর্ভুক্ত থাকিলে আমি তোমাকে সাদাকা দিতে পারি। উল্লিখিত ঘটনা দ্বারা সুস্পষ্ট হইয়া গেল যে, রাসূলুল্লাহ (س) কখনও যাকাত বণ্টনে স্বজনপ্রীতি করেন নাই।
তিনি স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থাকিয়া ন্যায়পরায়ণভাবে বণ্টন করিতেন (মুফতী শফী, তাফসীরে মা'আরেফুল কোরআন, বঙ্গানুবাদ, পৃ. ৫৭৫-৫৭৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তাবুক যুদ্ধে অনুপস্থিত সাহাবীদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা

📄 তাবুক যুদ্ধে অনুপস্থিত সাহাবীদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা


রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাধারণ নিয়ম ছিল, তিনি (স) কোন স্থানে অভিযানে যাইতে ইচ্ছা করিলে প্রথমেই তাহা প্রকাশ করিতেন না। কয়েক দিন পথ চলিবার পর কোথায় কিভাবে কাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে হইবে তাহা তিনি ভালভাবে বুঝাইয়া দিতেন। কিন্তু তাবুক অভিযানের সময় তিনি এইরূপ করেন নাই। কারণ তখন ছিল গ্রীষ্মের প্রচণ্ড উত্তাপ। ভ্রমণপথ ছিল সুদীর্ঘ ও বন্ধুর। শত্রুসংখ্যাও ছিল অনেক। তাই রাসূলুল্লাহ (স) যাত্রার পূর্বেই সকল কিছুর স্পষ্ট ঘোষণা দিয়াছিলেন। তাঁহার ঘোষণা শুনিয়া যুদ্ধযাত্রার জন্য প্রস্তুত হইলেন তিরিশ হাজার সৈন্য।
রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাবুক অভিযানে যাত্রা করিলেন তখন ছিল ফসলের মৌসুম। খেজুরের বাগানগুলি ছিল ফলে ভরপুর। প্রায় আশিজন মুনাফিক বিভিন্ন বাহানা, ওযর ও আপত্তিতে তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ হইতে বিরত থাকে। আর মাত্র তিন ব্যক্তি যাহাদের মধ্যে কা'ব ইবন মালিক (রা)-ও ছিলেন, তাহারা এই অভিযানে গমন করেন নাই। এতদ্ব্যতীত ইতোপূর্বে অন্যান্য যুদ্ধে তাঁহারা অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন।
হযরত কা'ব (রা) ছিলেন তৃতীয় আকাবার বায়'আতের অন্যতম সদস্য। অপর দুইজন মুরারা ইবন রাবী' (রা) ও হিলাল ইবন উমায়‍্যা (রা) ছিলেন বদরী সাহাবী। তাঁহারা সকলেই আজ যায় কাল যায় বলিয়া একদিন দুই দিন করিয়া বিলম্ব করেন। ফলে যখন তাঁহারা রওয়ানা হইবার ইচ্ছা করিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (স) মদীনা হইতে অনেক দূরে চলিয়া গিয়াছেন। তাই তাঁহারা তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিতে পারেন নাই।
বিনানুমতি ও বিনা উযরে অলসতা করিয়া বিশিষ্ট তিনজন সাহাবীর (রা) অনুপস্থিতি ছিল বড় অপরাধ। কারণ যেই ব্যক্তি আল্লাহ্র নিকট যত প্রিয় তাহার ত্রুটিও আল্লাহ্র নিকট তত গুরুতর। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (س) তাবুক হইতে মদীনায় পৌঁছিলে যুদ্ধে অংশগ্রহণে বিরত একনিষ্ঠ তিনজন আনসারী সাহাবী ভাবিলেন যে, তাবুক অভিযানে না যাইয়া করিয়াছি এক অপরাধ; আবার মিথ্যা ওযর দর্শাইলে হইবে অপর এক অপরাধ। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তো আমাদের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবগত আছেন। আমরা সত্য কথা বলিতে কার্পণ্য করিব না। অতঃপর তাঁহারা নির্দ্বিধায় অকপটে অভিযানে গমন না করিবার কারণ বলিয়াছিলেন যাহাতে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করিতে শাস্তি বিধান করেন।
রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণকে বলিয়া দিলেন, আল্লাহর পক্ষ হইতে কোন ফায়সালা না আসা পর্যন্ত যুদ্ধত্যাগী সাহাবীত্রয়ের সহিত সালাম-কালাম, লেন-দেন, উঠা-বসা সবকিছু নিষিদ্ধ করা হইল। কা'ব (রা) নিয়মিত মসজিদে সালাতে আসিতেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকটে দাঁড়াইতেন। কা'ব (রা) বারংবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে তাকাইতেন, চোখে চোখ পড়ামাত্র রাসূলুল্লাহ (س) অন্যদিকে দৃষ্টি ফিরাইয়া লইতেন। কা'ব (রা) রাসূলুল্লাহ (س)-কে সালাম দিলে তাহার কোন জওয়াব দিতেন না।
এইভাবে দীর্ঘ চল্লিশ দিন অতিবাহিত হইয়া যায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (س) দূত মারফত তাহাদেরকে নিজ নিজ স্ত্রীর সহিত দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন হইতেও বিরত থাকার নির্দেশ দেন। তখন তাঁহাদের নিকট বিস্তৃত পৃথিবী সংকুচিত হইয়া গেল।
মদীনার সমাজ, পরিবার সর্বক্ষেত্রে তাঁহাদেরকে বয়কট করে। অর্থবল, জনবল, পরিবার-পরিজন থাকিতেও তাঁহারা অপাংতেয় হইয়া যান। মুনাফিকদের মত ছল-চাতুরির মিথ্যা আশ্রয় না লইয়া সত্য কথা প্রকাশ করায় তাঁহাদের উপর এই চরম অসহায়ত্বের একাকীত্ব ও নির্জন জীবনের মানসিক শান্তি চলিতে থাকে। তাঁহাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেনঃ
وَعَلَى الثَّلُثَةِ الَّذِينَ خُلَّفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ اَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَنْ لَا مَلْجَا مِنَ اللهِ إِلا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ .
“এবং অপর তিনজনকে যাহাদেরকে পিছনে রাখা হইয়াছিল, যখন পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাহাদের জন্য সংকুচিত হইয়া গেল এবং তাহাদের জীবন দুর্বিসহ হইয়া উঠিল; আর তাহারা বুঝিতে পারিল যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন আশ্রয়স্থল নাই। অতঃপর তিনি সদয় হইলেন তাহাদের প্রতি যাহাতে তাহারা ফিরিয়া আসে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ দয়াময়, করুণাশীল” (৯:১১৮)।
অপরদিকে মুনাফিকদের গোপন চরিত্র ফাঁস করিয়া মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:
يَعْتَذِرُونَ إِلَيْكُمْ إِذَا رَجَعْتُمْ إِلَيْهِمْ قُلْ لا تَعْتَذِرُوا لَنْ نُؤْمِنَ لَكُمْ قَدْ نَبَّأَنَا اللَّهُ مِنْ أَخْبَارِكُمْ وَسَيَرَى اللَّهُ عَمَلَكُمْ وَرَسُولُهُ ثُمَّ تُرَدُّونَ إِلَى عُلِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ . سَيَحْلِفُوْنَ بِاللهِ لَكُمْ إِذَا انْقَلَبْتُمْ إِلَيْهِمْ لِتُعْرِضُوا عَنْهُمْ فَأَعْرِضُوا عَنْهُمْ إِنَّهُمْ رِجْسٌ وَمَا وَهُمْ جَهَنَّمُ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ . يَحْلِفُونَ لَكُمْ لِتَرْضَوْا عَنْهُمْ فَإِنْ تَرْضَوْا عَنْهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يَرْضَى عَنِ الْقَوْمِ الْفُسِقِينَ . الأَعْرَابُ أَشَدُّ كُفْرًا وَنِفَاقًا وَأَجْدَرُ أَلَّا يَعْلَمُوا حُدُودَ مَا أَنْزَلَ اللهُ عَلَى رَسُولِهِ وَاللهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ، وَمِنَ الْأَعْرَابِ مَنْ يَتَّخِذُ مَا يُنْفِقُ مَغْرَمًا وَيَتَرَبَّصُ بِكُمُ الدَّوَائِرَ عَلَيْهِمْ دَائِرَةُ السَّوْءِ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ .
"তোমরা উহাদের নিকট ফিরিয়া আসিলে উহারা তোমাদের নিকট অজুহাত পেশ করিবে। বলিবেন, অজুহাত পেশ করিও না, আমরা তোমাদেরকে কখনও বিশ্বাস করিব না। আল্লাহ আমাদেরকে তোমাদের খবর জানাইয়া দিয়াছেন এবং আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করিবেন এবং তাঁহার রাসূলও। অতঃপর যিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা তাঁহার নিকট
তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তিত করা হইবে এবং তিনি তোমরা যাহা করিতে তাহা তোমাদেরকে জানাইয়া দিবেন। তোমরা উহাদের নিকট ফিরিয়া আসিলে অচিরেই উহারা আল্লাহর শপথ করিবে যাহাতে তোমরা উহাদের উপেক্ষা কর। সুতরাং তোমরা উহাদেরকে উপেক্ষা করিবে। উহারা অপবিত্র এবং উহাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ জাহান্নাম উহাদের আবাসস্থল। উহারা তোমাদের নিকট শপথ করিবে যাহাতে তোমরা উহাদের প্রতি তুষ্ট হও। তোমরা উহাদের প্রতি তুষ্ট হইলেও আল্লাহ তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের প্রতি তুষ্ট হইবেন না। কুফরী ও কপটতায় মরুবাসীরা কঠোরতর; এবং আল্লাহ তাঁহার রাসূলের প্রতি যাহা নাযিল করিয়াছেন তাহার সীমারেখা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার যোগ্যতা ইহাদের অধিক। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। মরুবাসীদের কেহ কেহ, যাহা তাহারা আল্লাহ্ পথে ব্যয় করে তাহা অর্থদণ্ড বলিয়া গণ্য করে এবং তোমাদের ভাগ্যবিপর্যয়ের প্রতীক্ষা করে। মন্দ ভাগ্যচক্র উহাদেরই হউক; আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ” (৯:৯৪-৯৮)।
রাসূলুল্লাহ (স) মদীনায় পৌঁছার পূর্বেই মুনাফিকরা তাহাদের অহেতুক ওযর-আপত্তি তুলিয়া ধরিল। ইহার পরও রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের ওযর-আপত্তি গ্রহণ করিয়া বায়'আত করিলেন। যেহেতু আল্লাহ্ পক্ষ হইতে কোন বিধিনিষেধ ছিল না এবং প্রকাশ্য সাক্ষ্য প্রমাণের উপর শর'ঈ বিধান কার্যকর। অপ্রকাশ্যভাবে তথ্য জ্ঞাত হইলেও তাহা বিচারকের নিকট গ্রহণযোগ্য নহে। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা সমাজচ্যুত সাহাবায়ে কিরামত্রয়ের ব্যাপারে ইরশাদ করেন:
وَأَخَرُوْنَ مُرْجَوْنَ لِأَمْرِ اللَّهِ إِمَّا يُعَذِّبُهُمْ وَإِمَّا يَتُوبُ عَلَيْهِمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ .
"এবং আল্লাহ্র আদেশের প্রতীক্ষায় অপর কতকের সম্পর্কে এই সিদ্ধান্ত স্থগিত রহিল যে, তিনি উহাদেরকে শাস্তি দিবেন, না ক্ষমা করিবেন। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়” (৯: ১০৬)।
এমতাবস্থায় সমাজচ্যুত সাহাবীত্রয় আশংকাগ্রস্ত হইয়া পড়িলেন, আমরা মৃত্যুবরণ করিলে আমাদের জানাযায় রাসূলুল্লাহ (স) এবং কোন মুসলমান আসিবে না। আমাদের জানাযাও হইবে না এবং দাফন-কাফনও হইবে না। আল্লাহ্ না করুন, আর এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) ইনতিকাল করিলে আমরা চিরদিনের জন্য মুসলিম সমাজচ্যুত হইয়া পড়িব। আর আল্লাহ্ রহমত তো পাওয়ার কোন ভরসাই নাই। এইভাবে তাহারা চরম মানসিক যন্ত্রণায় ছটফট করিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে উন্মাদ হইয়া পড়িলেন। তদুপরি স্ত্রীদের নিকট হইতে নির্জনতা অবলম্বনের নির্দেশ আরো শঙ্কিত করিয়া তুলিল। তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রেরিত দূত খুযায়মা ইব্‌ন ছাবিত (রা) স্ত্রীদের নিকট হইতে বিচ্ছিন্ন থাকিবার নির্দেশ প্রদান করিলে তাঁহারা তাঁহাদিগকে তালাক দিবেন কিনা ব্যাখ্যা চাহিলে-শুধু দৈহিক ও অন্যান্য খেদমত লইতে নিষেধ করা হয়। এইভাবে চল্লিশ দিনের পর ক্রমান্বয়ে পঞ্চাশ দিনের দিকে তাহাদের বয়কট চলিতে লাগিল। ইতোমধ্যে সিরিয়ার গাস্সান অধিপতির নিকট হইতে কা'ব (রা)-এর নিকট চিঠি আসিল যাহা ছিল রেশমী কাপড়ে মোড়ানো। তাহাতে লিখা ছিল:
أما بعد فانه قد بلغني ان صاحبك قد جفاك واقصاك ولم يجعلك الله بدار الهوان ولا مصنيعة فان كنت مجولا فالحق بنا نواسيك .
"অতএব আমি জানিতে পারিলাম, আপনার (কা'ব) অধিকর্তা আপনার প্রতি অবিচার করিয়াছে। আল্লাহ্ আপনাকে তুচ্ছ অথবা ধ্বংসকর পৃথিবীতে সৃষ্টি করেন নাই। আপনি আমাদের কাছে চলিয়া আসুন। আমরা আপনাকে সহায়তা করিব।”
কা'ব (রা) চিঠি পড়িয়া দেখিলেন, কাফির-মুশরিক সম্প্রদায় তাহাকে কুফুরীর দিকে আহ্বান করিতেছে যাহা তাঁহার জন্য এইরূপ বিভীষিকাময় মুহূর্তে ঈমানের চরম পরীক্ষাস্বরূপ। তিনি উক্ত পত্র পাঠ করিয়া তাহা আগুনে জ্বালাইয়া আল্লাহ্র নিকট হইতে ক্ষমার প্রবল আশা লইয়া প্রতীক্ষা করিতে থাকিলেন। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা পঞ্চাশ দিবস রাতের এক-তৃতীয়াংশ অতিবাহিত' হইলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর তাঁহাদের ক্ষমা করা হইয়াছে এই মর্মে (৯ : ১১৭-১১৯) আয়াত নাযিল করিলেন।
ফজরের নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (স) উহা সাহাবীগণকে জানাইয়া দিলেন। আবু বকর সিদ্দীক ও 'উমার (রা) পাহাড়ের চূড়ায় উঠিয়া উচ্চকণ্ঠে তাহা ঘোষণা করিয়াছিলেন। সাহাবায়ে কিরাম (রা) প্রতিযোগিতামূলকভাবে সমাজচ্যুত সাহাবীত্রয়ের সহিত সালাম, মুসাফাহা করিতে ছুটিয়া আসিলেন।
অতঃপর কা'ব (রা) মসজিদে নববীতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাত করিতে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) চতুর্দিকে মানুষ পরিবেষ্টিত হইয়া বসিয়া আছেন। অতঃপর সেই বসা মানুষদের মধ্য হইতে সর্বপ্রথম তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ (রা) দাঁড়াইয়া তাঁহার দিকে ছুটিয়া আসিলেন এবং তাঁহার সহিত মুসাফাহা (করমর্দন) করিলেন এবং মুবারকাবাদ জানাইলেন। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (س)-কে তিনি সালাম দিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর চেহারা মুবারক সুসংবাদের আনন্দে বিদ্যুতের মত জ্বলজ্বল করিতেছিল। এমতাবস্থায় তিনি (স) বলিলেন :
ابشر بخير يوم مر عليك منذ ولدتك امك.
"আমি তোমাকে এমন শ্রেষ্ঠতম কল্যাণকর সুসংবাদ দিতেছি যাহা তোমার মা তোমাকে প্রসব করার পর কোন দিন পাওনি।"
তখন কা'ব (রা) আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই সুসংবাদ কি আপনার তরফ হইতে না আল্লাহ্র তরফ হইতে? রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, না, আমার তরফ হইতে নহে বরং আল্লাহ তা'আলার তরফ হইতে। তখন রাসূলুল্লাহ (স) তিলাওয়াত করিলেন নিম্নোক্ত আয়াত যাহা আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন :
لَقَدْ تَابَ اللهُ عَلَي النَّبِيِّ وَالمُهْجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِنْ بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيغُ قُلُوبُ فَرِيقٌ مِّنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ إِنَّهُ بِهِمْ رَءُوفٌ رَّحِيمُ . وَعَلَي الثَّلْثَةِ
الَّذِينَ خُلَّفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَنْ لَا مَلْجَا مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُبُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ . يَأَيُّهَا الَّذِينَ أمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّدِقِينَ
“আল্লাহ অবশ্যই অনুগ্রহপরায়ণ হইলেন নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি যাহারা তাহার অনুসরণ করিয়াছিল সংকটকালে— এমনকি যখন তাহাদের এক দলের চিত্তবৈকল্যের উপক্রম হইয়াছিল। পরে আল্লাহ উহাদেরকে ক্ষমা করিলেন। তিনি তো উহাদের প্রতি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু। এবং তিনি ক্ষমা করিলেন অপর তিনজনকেও যাহাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হইয়াছিল, যে পর্যন্ত না পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাহার জন্য উহা সংকুচিত হইয়াছিল এবং তাহাদের জীবন তাহাদের জন্য দুর্বিষহ হইয়াছিল এবং তাহারা উপলব্ধি করিয়াছিল যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন আশ্রয়স্থল নাই, তাঁহার দিকে প্রত্যাবর্তন ব্যতীত। পরে তিনি উহাদের তওবা কবুল করিলেন যাহাতে উহারা তওবায় স্থির থাকে। নিশ্চয় আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। হে মু'মিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও” (৯:১১৭-১১৯)।
তাবুক অভিযানত্যাগী মু'মিন ও মুনাফিকদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণ ফায়সালা নিম্নে আলোচিত হইল।
(১) মুনাফিকদের মিথ্যা ওযর-আপত্তি সত্ত্বেও আল্লাহ্ ফায়সালা অনুযায়ী তাহাদেরকে ক্ষমা করা এবং বায়'আতপূর্বক তাহাদের জন্য দো'আ করা ছিল ন্যায়সঙ্গত।
(২) শর'ঈ হুকুম প্রকাশ্য সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কার্যকর হয়। মুনাফিকরা বাহ্য সাক্ষ্য- প্রমাণে মিথ্যা ওযরে নির্দোষ প্রমাণিত হইয়াছিল সেহেতু অভ্যন্তরীণ ব্যাপার আল্লাহ্র উপর সোপর্দ করিয়া শাস্তি হইতে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
(৩) কা'ব (রা), মুরারা (রা), হিলাল (রা) নিজেদের অপরাধ স্বীকার করিয়াছেন এবং যে কোন শাস্তি গ্রহণে সম্মত ছিলেন, সেহেতু তাহাদের ব্যাপারে বিধান দ্রুত নাযিল হয় নাই।
(৪) বাহ্যিক শর'ঈ ওযর থাকায় তাঁহাদেরকে আল্লাহ্র ফায়সালার উপর ছাড়িয়া দেওয়া হয়।
(৫) একনিষ্ঠ তওবার জন্য তাঁহাদেরকে বয়কট করা হয় যাহাতে ঈমানের দৃঢ়তা আসে।
(৬) মিথ্যা পরিহার করায় কা'ব (রা), হিলাল (রা) ও মুরারা (রা)-কে সিদ্দীক উপাধি দেওয়া হইয়াছে এবং অন্যদিগকেও তাঁহাদের দলভুক্ত হওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হইয়াছে। আর তাহাদের সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ সাদাকা হিসাবে গ্রহণ করা হইয়াছে যাহাতে তাহারা পরিশুদ্ধ হইতে পারেন।
উল্লিখিত যুদ্ধত্যাগীদের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (স) যাবতীয় বিধিনিষেধ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আল্লাহর নির্দেশ মুতাবিক করিয়াছেন এবং বয়কটের ফায়সালা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিজস্ব অথবা
গোপন নির্দেশের ভিত্তিতে হইয়াছিল যাহা ছিল আগত মুসলিম জাতির জন্য এক অনুপম ন্যায়নিষ্ঠ দৃষ্টান্ত। দীর্ঘ পঞ্চাশ দিন পর্যন্ত বয়কট বহাল ছিল যাহা হইতেছে তওবা ককূলের সময়কাল, অতঃপর তওবা কবুল হইলে এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ গ্রহণ করা হইল (তাফসীর আল-মাযহারী, ৪খ., পৃ. ২৮৩-২৮৪, ২৯০, ৩১০-৩২০; ইব্‌ন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল 'আযীম, ২খ.; ইব্‌ন আল-হাসান আত-তাবরাসী, মাজমা'উল বায়ান ফি তাফসীরিল কুরআন, ৫খ., পৃ. ১১৯-১২০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সংবাদ যাচাইয়ে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়নীতি

📄 সংবাদ যাচাইয়ে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়নীতি


মুস্তালিক গোত্রের সরদার উম্মুল মু'মিনীন হযরত জুওয়ায়রিয়া (রা)-এর পিতা হযরত হারিছ ইন্ন দিরার (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে হাযির হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং যাকাত প্রদানের নির্দেশ দেন। তিনি দীন ইসলাম কবুল করিবার পর যাকাত আদায় করিবার অঙ্গীকার করিয়া বলিলেন, এখন আমি সগোত্রে ফিরিয়া গিয়া তাহাদেরকেও দীন ইসলাম কবূল ও যাকাত প্রদানের দাওয়াত দিব। যাহারা আমার কথা মানিবে এবং যাকাত আদায় করিবে, আমি তাহাদের যাকাত একত্র করিয়া আমার নিকট জমা রাখিব। আপনি অমুক মাসের অমুক তারিখের মধ্যে কোন দূত আমার নিকট প্রেরণ করিবেন যাহাতে আমি যাকাতের জমাকৃত অর্থ তাহার হস্তে সোপর্দ করিতে পারি।
অতঃপর হারিছ (রা) যখন ওয়াদা অনুযায়ী যাকাতের অর্থ জমা করিলেন এবং দূত আগমনের নির্ধারিত মাস ও তারিখ অতিক্রান্ত হওয়ার পরও কোন দূত আগমন করিল না, তখন তিনি আশংকা করিলেন যে, সম্ভবত রাসূলুল্লাহ (স) কোন কারণে তাহাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হইয়াছেন। নতুবা ওয়াদা অনুযায়ী দূত না পাঠাইবার কোন কারণ থাকিতে পারে না। হারিছ (রা) আশংকার কথা ইসলাম গ্রহণকারী নেতৃস্থানীয় লোকদের কাছেও প্রকাশ করিলেন এবং সকলে মিলিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হওয়ার ইচ্ছা করিলেন।
এদিকে রাসূলুল্লাহ (স) নির্ধারিত তারিখে ওয়ালীদ ইব্‌ন উকবা (রা)-কে যাকাত গ্রহণের জন্য পাঠাইয়া দেন। জাহিলী যুগে ওয়ালীদ ইব্‌ন উকবার সহিত মুস্তালিক গোত্রের পুরাতন শত্রুতা ছিল। ওয়ালীদ যখন মুস্তালিক গোত্রে পৌঁছান তখন মুস্তালিক গোত্র তাহার অভ্যর্থনার উদ্দেশ্যে সম্মিলিতভাবে বাহির হইয়া আসে। ওয়ালীদ মনের সন্দেহবশত ভাবিলেন যে, তাহারা বোধহয় পুরাতন শত্রুতার কারণে তাহাকে হত্যা করিতে আগাইয়া আসিতেছে। সেমতে তিনি সেখান হইতে ফিরিয়া আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে নিজ ধারণা অনুযায়ী আরয করিলেন, তাহারা যাকাত দিতে সম্মত নয় বরং আমাকে হত্যা করিতে উদ্যত হইয়াছে।
তখন রাসূলুল্লাহ (স) খালিদ ইব্‌দুল ওয়ালীদ (রা)-কে প্রেরণ করিলেন এবং নির্দেশ দিলেন যে, গোপনে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে। যদি তাহাদের ঈমানের কোন লক্ষণ পাওয়া যায় তবে তাহাদের নিকট হইতে যাকাত গ্রহণ করিবে, নতুবা কাফিরদের সহিত যেমন ব্যবহার করা হয় তাহাদের সহিতও তেমন ব্যবহার করিবে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশ
অনুযায়ী খালিদ (রা) তথায় গুপ্তচরের মাধ্যমে মাগরিব ও 'ইশার নামাযের আযান শুনিতে পাইলেন। অতএব তিনি তাহাদের নিকট হইতে যাকাত আদায় করিলেন এবং তাহাদের মধ্যে আনুগত্য ও কল্যাণকর বিষয় ছাড়া ফেতনা-ফাসাদ মূলত কিছুই পান নাই। অতঃপর খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রত্যাবর্তন করিয়া উপরিউক্ত সংবাদ প্রদান করিলেন।
আল্লাহ তা'আলা খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা)-এর সংবাদের সত্যতামূলক এবং 'উকবার সংবাদ ধারণাপ্রসূত অসত্যমূলক তাহা প্রমাণ করিয়া নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করিলেন, যাহা ছিল ন্যায়পরায়ণতা বিকাশের অন্যতম সুযোগ। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن جَآءَكُمْ فَاسِقُۢ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوٓاْ أَن تُصِيبُواْ قَوْمًۢا بِجَهَٰلَةٍ فَتُصْبِحُواْ عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَٰدِمِينَ .
"হে মু'মিনগণ! যদি কোন ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের নিকট সংবাদ আনয়ন করে তবে তোমরা তাহা যাচাই করিয়া দেখিবে, যাহাতে অজ্ঞানতাবশত তোমরা কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও, অতঃপর নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও” (৪৯: ৬; আততাফসীর আল-মাযহারী, ৯ম., পৃ. ৪৫-৪৬; মুফতী শফী, মা'আরেফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত সং. পৃ. ১২৭৮)।
উল্লেখিত ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর কতিপয় ন্যায়পরায়ণতা উদঘাটিত হইয়াছে। যথা: (১) হারিছ (রা)-এর ওয়াদা মুতাবিক যাকাত সংগ্রহে নির্দিষ্ট মাসে, নির্দিষ্ট দিনে দূত প্রেরণ।
(২) ধারণার বশবর্তী হইয়া ওয়ালীদ ইবন 'উকবা সত্যে উপনীত না হইয়া ইজতিহাদী সংবাদ রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রদান করিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহা গ্রহণ না করিয়া পুনরায় খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা)-কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিবার জন্য প্রেরণ করিলেন।
(৩) খালিদ (রা) যাকাত গ্রহণ করিয়া যাচাইকৃত সঠিক তথ্য পরিবেশন করিলেন এবং আল্লাহ তা'আলা সেই মুহূর্তে উল্লিখিত আয়াত নাযিল করিয়া সত্যায়ন করিলেন। ফলে বনুল-মুস্তালিক অযাচিত অন্যায় যুদ্ধ হইতে বাঁচিয়া গেল এবং রাসূলুল্লাহ (স) দূরদর্শিতার মাধ্যমে ন্যায়পরায়ণভাবে যাচাই করিয়া অগত্যা এক অহেতুক যুদ্ধ হইতে নিরাপদ হইলেন।

মুস্তালিক গোত্রের সরদার উম্মুল মু'মিনীন হযরত জুওয়ায়রিয়া (রা)-এর পিতা হযরত হারিছ ইন্ন দিরার (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে হাযির হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং যাকাত প্রদানের নির্দেশ দেন। তিনি দীন ইসলাম কবুল করিবার পর যাকাত আদায় করিবার অঙ্গীকার করিয়া বলিলেন, এখন আমি সগোত্রে ফিরিয়া গিয়া তাহাদেরকেও দীন ইসলাম কবূল ও যাকাত প্রদানের দাওয়াত দিব। যাহারা আমার কথা মানিবে এবং যাকাত আদায় করিবে, আমি তাহাদের যাকাত একত্র করিয়া আমার নিকট জমা রাখিব। আপনি অমুক মাসের অমুক তারিখের মধ্যে কোন দূত আমার নিকট প্রেরণ করিবেন যাহাতে আমি যাকাতের জমাকৃত অর্থ তাহার হস্তে সোপর্দ করিতে পারি।
অতঃপর হারিছ (রা) যখন ওয়াদা অনুযায়ী যাকাতের অর্থ জমা করিলেন এবং দূত আগমনের নির্ধারিত মাস ও তারিখ অতিক্রান্ত হওয়ার পরও কোন দূত আগমন করিল না, তখন তিনি আশংকা করিলেন যে, সম্ভবত রাসূলুল্লাহ (স) কোন কারণে তাহাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হইয়াছেন। নতুবা ওয়াদা অনুযায়ী দূত না পাঠাইবার কোন কারণ থাকিতে পারে না। হারিছ (রা) আশংকার কথা ইসলাম গ্রহণকারী নেতৃস্থানীয় লোকদের কাছেও প্রকাশ করিলেন এবং সকলে মিলিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হওয়ার ইচ্ছা করিলেন।
এদিকে রাসূলুল্লাহ (স) নির্ধারিত তারিখে ওয়ালীদ ইব্‌ন উকবা (রা)-কে যাকাত গ্রহণের জন্য পাঠাইয়া দেন। জাহিলী যুগে ওয়ালীদ ইব্‌ন উকবার সহিত মুস্তালিক গোত্রের পুরাতন শত্রুতা ছিল। ওয়ালীদ যখন মুস্তালিক গোত্রে পৌঁছান তখন মুস্তালিক গোত্র তাহার অভ্যর্থনার উদ্দেশ্যে সম্মিলিতভাবে বাহির হইয়া আসে। ওয়ালীদ মনের সন্দেহবশত ভাবিলেন যে, তাহারা বোধহয় পুরাতন শত্রুতার কারণে তাহাকে হত্যা করিতে আগাইয়া আসিতেছে। সেমতে তিনি সেখান হইতে ফিরিয়া আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে নিজ ধারণা অনুযায়ী আরয করিলেন, তাহারা যাকাত দিতে সম্মত নয় বরং আমাকে হত্যা করিতে উদ্যত হইয়াছে।
তখন রাসূলুল্লাহ (স) খালিদ ইব্‌দুল ওয়ালীদ (রা)-কে প্রেরণ করিলেন এবং নির্দেশ দিলেন যে, গোপনে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে। যদি তাহাদের ঈমানের কোন লক্ষণ পাওয়া যায় তবে তাহাদের নিকট হইতে যাকাত গ্রহণ করিবে, নতুবা কাফিরদের সহিত যেমন ব্যবহার করা হয় তাহাদের সহিতও তেমন ব্যবহার করিবে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশ অনুযায়ী খালিদ (রা) তথায় গুপ্তচরের মাধ্যমে মাগরিব ও 'ইশার নামাযের আযান শুনিতে পাইলেন। অতএব তিনি তাহাদের নিকট হইতে যাকাত আদায় করিলেন এবং তাহাদের মধ্যে আনুগত্য ও কল্যাণকর বিষয় ছাড়া ফেতনা-ফাসাদ মূলত কিছুই পান নাই। অতঃপর খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রত্যাবর্তন করিয়া উপরিউক্ত সংবাদ প্রদান করিলেন।
আল্লাহ তা'আলা খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা)-এর সংবাদের সত্যতামূলক এবং 'উকবার সংবাদ ধারণাপ্রসূত অসত্যমূলক তাহা প্রমাণ করিয়া নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করিলেন, যাহা ছিল ন্যায়পরায়ণতা বিকাশের অন্যতম সুযোগ। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن جَآءَكُمْ فَاسِقُۢ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوٓاْ أَن تُصِيبُواْ قَوْمًۢا بِجَهَٰلَةٍ فَتُصْبِحُواْ عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَٰدِمِينَ .
"হে মু'মিনগণ! যদি কোন ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের নিকট সংবাদ আনয়ন করে তবে তোমরা তাহা যাচাই করিয়া দেখিবে, যাহাতে অজ্ঞানতাবশত তোমরা কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও, অতঃপর নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও” (৪৯: ৬)।
উল্লেখিত ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর কতিপয় ন্যায়পরায়ণতা উদঘাটিত হইয়াছে। যথা: (১) হারিছ (রা)-এর ওয়াদা মুতাবিক যাকাত সংগ্রহে নির্দিষ্ট মাসে, নির্দিষ্ট দিনে দূত প্রেরণ।
(২) ধারণার বশবর্তী হইয়া ওয়ালীদ ইবন 'উকবা সত্যে উপনীত না হইয়া ইজতিহাদী সংবাদ রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রদান করিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহা গ্রহণ না করিয়া পুনরায় খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা)-কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিবার জন্য প্রেরণ করিলেন।
(৩) খালিদ (রা) যাকাত গ্রহণ করিয়া যাচাইকৃত সঠিক তথ্য পরিবেশন করিলেন এবং আল্লাহ তা'আলা সেই মুহূর্তে উল্লিখিত আয়াত নাযিল করিয়া সত্যায়ন করিলেন। ফলে বনুল-মুস্তালিক অযাচিত অন্যায় যুদ্ধ হইতে বাঁচিয়া গেল এবং রাসূলুল্লাহ (স) দূরদর্শিতার মাধ্যমে ন্যায়পরায়ণভাবে যাচাই করিয়া অগত্যা এক অহেতুক যুদ্ধ হইতে নিরাপদ হইলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00