📄 মসজিদে নববী নির্মাণের জন্য জায়গা সংগ্রহ
রাসূলুল্লাহ (স) মদীনার মুহাজির ও আনসারগণকে লইয়া জামা'আতে নামায পড়িবার জন্য মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন। আবূ আয়্যব (রা)-এর বাড়ির সম্মুখে যেই স্থানে তাঁহার উট হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া পড়িয়াছিল মসজিদ নির্মাণের জন্য এই স্থানটিকেই তিনি পছন্দ করিলেন। জায়গাটি ছিল নাজ্জার বংশীয়দের। তখনকার দিনে জায়গাটির বিশেষ কোন গুরুত্ব ছিল না। এক পার্শ্বে কয়েকটি কবর আর কয়েকটি খেজুর গাছ ছিল। তিনি নাজ্জার বংশীয় লোকদিগকে বলিলেন, আমি মসজিদ নির্মাণের জন্য এই স্থানটি ক্রয় করিতে চাই। তোমরা মূল্য গ্রহণ করিয়া ইহা আমাকে দিয়া দাও। তাহারা উত্তর করিলেন, আমরা মূল্য লইয়াই স্থানটি আপনাকে দান করিব, কিন্তু মূল্যটা আপনার নিকট হইতে নহে বরং আল্লাহ্র নিকট হইতে গ্রহণ করিব। তিনি যখন জানিতে পারিলেন যে, প্রকৃতপক্ষে এই স্থানটি দুইটি ইয়াতীম বালকের তখন তিনি ঐ বালকদ্বয়কে বলিলেন: "উপযুক্ত মূল্য গ্রহণ করিয়া স্থানটি আমাকে দিয়া দাও।” বালকেরা কিছুতেই ইহার মূল্য গ্রহণ করিতে সম্মত হইল না। তাহারা বিনা মূল্যেই জমিটি রাসূলুল্লাহ (স)-কে দান করিতে চাহিল। কিন্তু তিনি বিনা মূল্যে ইয়াতীমদের সম্পদ লইতে কিছুতেই রাজী হইলেন না।
এইজন্য অগত্যা তাহারা ইহার মূল্য গ্রহণ করিল। নাজ্জার প্রধানগণ জমিটির মূল্য দশ দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) নির্ধারণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর আদেশক্রমে আবূ বকর (রা) জমিটির নির্ধারিত মূল্য প্রদান পূর্বক মসজিদের জন্য ওয়াক্ফ করিয়া দিলেন। কাফিরদের পুরাতন কবরসমূহ উঠাইয়া স্থানটি সমতল করা হইল। তৎপর মসজিদ নির্মাণের কাজ আরম্ভ হইয়া গেল। ন্যায়পরায়ণতার মূর্ত প্রতীক রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদ নির্মাণের কাজে যোগদানের জন্য লোকদিগকে আদেশ না দিয়া স্বয়ং ইটের বোঝা বহন করার কাজে যোগদান করিলেন (হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স) সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৪২৬, ৪২৭)।
উল্লিখিত ঘটনায় ইয়াতীমের সম্পদ ক্রয়ে ন্যায়ানুগ মূল্য প্রদান এবং নির্মাণকাজে অংশগ্রহণ দ্বারা চিরকালের জন্য অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হইয়াছে।
📄 রাষ্ট্র পরিচালনায় আদর্শ বিধান
আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে রাসূলুল্লাহ (স) স্বদেশ ভূমি মক্কা হইতে মদীনায় হিজরত করেন। তৎকালে মদীনায় ইয়াহুদীদের দশটি গোত্র এবং আওস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের বারটি উপগোত্র বসবাস করিতেছিল। আওস ও খাযরাজদের মধ্যে মুসলমানও ছিল, পৌত্তলিকও ছিল। এতদ্ব্যতীত ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্বে আওস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয় পরস্পরের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হইয়াছিল। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) সর্বাগ্রে গোত্র ও বংশভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা নির্মূল করিয়া তদস্থলে একটি বিশ্বজনীন ভ্রাতৃ-সমাজ প্রতিষ্ঠা করিলেন, বর্ণ-গোত্র-গোষ্ঠী এবং ভাষা ও আঞ্চলিকতার ঊর্ধ্বে এক উম্মাহ ও এক মিল্লাত প্রতিষ্ঠা করিলেন, অমুসলিম ও বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারিত করেন, রাষ্ট্র ও নাগরিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক, অধিকার ও কর্তব্য চিহ্নিত করেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করিয়া আইনের দৃষ্টিতে সকলের সমান অধিকার নীতির প্রবর্তন করেন এবং প্রশাসন, আইন প্রণয়ন ও বিচার বিভাগের মূলনীতি ও বিধিমালা সুবিন্যস্ত করেন। মোটকথা, একটি বিধিবদ্ধ মানব সমাজ সংগঠন, উহার উন্নতি, অগ্রগতি, কল্যাণ ও প্রবৃদ্ধির জন্য এবং এতদসঙ্গে একটি উন্নত ও উত্তম আদর্শ ইনসাফ ভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি আদর্শ বিধান সম্পাদন করেন। এই আদর্শ বিধান মদীনার সনদ নামে খ্যাত। ইহাতে মোট ৪৭টি ধারা বিন্যস্ত হইয়াছে। ইহা দুই অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে ২৩টি ধারা এবং দ্বিতীয় অংশে ২৪টি। প্রথম অংশ মুসলিমদের আভ্যন্তরীণ সম্পর্ক এবং তাহাদের অধিকার ও কর্তব্যসমূহ চিহ্নিত করা হয়। দ্বিতীয় অংশে রহিয়াছে মুসলিম এবং ইয়াহুদী ও 'অন্যান্য মদীনাবাসীর পারস্পরিক সম্পর্ক, অধিকার ও কর্তব্য এবং তদসংশ্লিষ্ট অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের স্পষ্ট বিধান যাহা পরিপূর্ণ ইনসাফের মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠিত। এখানে ইনসাফের সহিত প্রত্যক্ষ কিছু ধারা উপস্থাপিত হইল:
(১) ইহা আল্লাহ্ নবী ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর অংগীকারপত্র যাহা কুরায়শী ও মদীনার মুসলিমদের মধ্যে এবং সেই সকল লোকের মধ্যে যাহারা মুসলিমদের অনুসরণ করিয়া তাহাদের সহিত ঐক্যবদ্ধ হইয়া জিহাদে অংশগ্রহণ করিবে।
(২) উপরিউক্ত জনসমষ্টি অন্যান্য লোকদের হইতে স্বতন্ত্র একটি জাতিতে পরিণত হইবে।
(৩) কুরায়শী মুহাজিরগণ তাহাদের গোত্র-বিধান অনুসারে পরস্পর নিজেদের দিয়াত (রক্তপণ) আদায় করিবে; অনুরূপ তাহারা নিজেদের বন্দীদের মুক্তিপণ মু'মিন ও মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত রীতি অনুসারে এবং ইনসাফের সহিত আদায় করিবে।
(৪) বানু 'আওফ তাহাদের গোত্রীয় বিধি-ব্যবস্থায় নিজেদের পূর্বেকার দিয়াতসমূহ আদায় করিবে এবং তাহাদের সকল উপগোত্র নিজেদের বন্দীদের মুক্ত করিবার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মাঝে প্রচলিত বিধি এবং ইনসাফের সহিত মুক্তিপণ (ফিদয়া) প্রদান করিবে।
(৫) বানুল হারিছ (ইব্ন খাযরাজ) নিজেদের বিধি অনুসারে নিজেদের পুরাতন দিয়াতসমূহ প্রদান করিবে এবং তাহাদের প্রত্যেক উপগোত্র নিজেদের বন্দীদের মুক্তিপণ মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত বিধির অধীনে ন্যায়পরায়ণতার সহিত আদায় করিবে।
(৬) তাকওয়ার অনুসারিগণ ঐক্যবদ্ধভাবে এমন প্রতিটি ব্যক্তির বিরোধিতা করিবে, যে তাহাদের মধ্যে যুলুম, পাপ, বাড়াবাড়ি, অবাধ্যতা, বিশৃংখলা ও বিদ্রোহের কারণ হইতে পারে। তাহারা সকলে একত্রে এই প্রকৃতির ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে, সেই অনাজ্ঞাত ব্যক্তি তাহাদের কাহারও সন্তানই হউক না কেন।
(৭) ইয়াহুদীদের মধ্য হইতে যাহারাই আমাদের আনুগত্য স্বীকার করিয়া লইবে তাহাদের সহিত যথারীতি বিধিসম্মত আচরণ, ইনসাফ ও সমতার ভিত্তিতে আচরণের বিধান করা হইল। তাহাদের উপর যুলম করা হইবে না এবং তাহাদের বিরুদ্ধে কাহাকেও সাহায্য-সহায়তা প্রদান করা হইবে না।
(৮) মুসলিমদের সন্ধি সমভাবে ও সমপর্যায়ের গুরুত্বসম্পন্ন। কোনও মুসলমান আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের কালে মুসলমানদের হইতে পৃথক হইয়া কাহারও সহিত সন্ধি করিতে পারিবে না। মুসলমানদের মধ্যে সাম্য ও ন্যায়নীতি অক্ষুণ্ণ রাখিবার প্রতি লক্ষ্য রাখিতে হইবে।
(৯) সকল মুসলিম একে অপরের সাহায্যকারী ও সহকর্মী থাকিবে।
(১০) যেই ব্যক্তি কোন মু'মিনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করিবে তাহাকে নিহতের বিনিময়ে হত্যা করা হইবে, যদি না নিহত ব্যক্তির অভিভাবক তাহার বিনিময়ে রক্তপণ (দিয়াত) গ্রহণে সম্মত হইয়া যায়। ঈমানদার সকলেই হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে থাকিবে।
(১১) বানু 'আওফ-এর ইয়াহুদীরা নিজেরা, তাহাদের মিত্রবর্গ ও মাওলা (মুক্তদাস)-দের সহকারে মুসলমানদের সহিত এক পক্ষ ও একদল সাব্যস্ত হইবে। ইয়াহুদীরা নিজেদের ধর্ম পালন করিতে পারিবে এবং মুসলমানগণ নিজ ধর্মে প্রতিষ্ঠিত থাকিবে। যে কেহই যুলুম ও পাপ করিবে সে নিজেকে এবং পরিবারকে বিপদগ্রস্ত করিবে।
(১২) প্রতিবেশীরা প্রত্যেকের নিজের সমতুল্য পরিগণিত হইবে। তাহাদের কোনও ক্ষতিসাধন করা যাইবে না; তাহাদের উপর অবিচার করা যাইবে না।
(১৩) এই চুক্তি যালিম ও পাপীকে তাহার অসৎকর্মের পরিণাম হইতে রক্ষা করিবে না। যেই ব্যক্তি (মদীনা হইতে) বাহিরে চলিয়া যাইবে সেও নিরাপদ থাকিবে এবং যেই ব্যক্তি (মদীনায়) অবস্থান করিয়া থাকিবে সেও নিরাপত্তা লাভ করিবে। কিন্তু যেই ব্যক্তি যুলুম ও গুনাহ করিবে, সে নিরাপদ থাকিবে না। আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল (স) নেককার ও মুত্তাকী লোকদের সহায় ও সংরক্ষণকারী (ইসলামী বিশ্বকোষ সম্পাদনা পরিষদ, হযরত রাসূলে করীম (স) জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ৩১১-৩২২; রাসূল (স)-এর যুগে মদীনার সমাজ, (১ম খণ্ড), রূপ ও বৈশিষ্ট্য, পৃ. ১২৩-১৪০; ইবন ইসহাক, সীরাতে রাসূলুল্লাহ (স), অনু. ই.ফা.বা., ৩খ., পৃ. ১৯-২২)।
📄 আমানত হস্তান্তরে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা
ইসলাম-পূর্ব কালেও কা'বা ঘরের সেবা করাকে এক বিশেষ মর্যাদার কাজ বলিয়া মনে করা হইত। খানায়ে কা'বার কোন বিশেষ খেদমতের জন্য যাহারা নির্বাচিত হইত, তাহারা গোষ্ঠী, সমাজ তথা জাতির মধ্যে সম্মানিত ও বিশিষ্ট বলিয়া পরিগণিত হইত। সেইজন্য বায়তুল্লাহর বিশেষ খেদমত বিভিন্ন লোকের মধ্যে ভাগ করিয়া দেওয়া হইত। জাহিলী যুগ হইতে হজ্জের
মওসুমে হাজ্জীদেরকে 'যমযমের' পানি পান করানোর সেবা রাসূলুল্লাহ (স)-এর পিতৃব্য আব্বাস (রা)-এর উপর ন্যস্ত ছিল। এই কাজকে বলা হইত 'সিকায়া'। এমনি করিয়া অন্যান্য আরো কিছু কিছু সেবার দায়িত্ব রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্য পিতৃব্য আবু তালিবের উপর এবং কা'বা ঘরের চাবি নিজের কাছে রাখিয়া নির্ধারিত সময়ে উহা খুলিয়া দেওয়া ও বন্ধ করিবার দায়িত্ব 'উছমান ইব্ন তালহা (রা)-এর উপর ন্যস্ত ছিল।
উছমান ইব্ন তালহা সোমবার ও বৃহস্পতিবার দিন বায়তুল্লাহর দরজা খুলিয়া দিলে মানুষ উহাতে প্রবেশ করিত। হিজরতের পূর্বে একবার রাসূলুল্লাহ (স) কয়েকজন সাহাবীসহ বায়তুল্লাহ শরীফে প্রবেশের উদ্দেশ্যে গমন করিলে উছমান (যিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেন নাই) তাঁহাকে ভিতরে প্রবেশ করিতে বাধা দিলেন এবং অত্যন্ত বিরক্তি প্রদর্শন করিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) ধৈর্য সহকারে উছমানের কটূক্তিসমূহ সহ্য করিলেন এবং তাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন :
يا عثمان لعلك ستري هذا المفتاح يوما بيدي اصنعه حيث شئت
"হে উছমান! অচিরেই তুমি একদিন বায়তুল্লাহর এই চাবি আমার হাতে দেখিতে পাইবে। তখন যাহাকে ইচ্ছা এই চাবি হস্তান্তর করিবার অধিকার আমারই থাকিবে।"
উছমান বলিল, যদি তাই হয় তবে সেই দিন কুরায়শরা অপমানিত ও অপদস্থ হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : بل عمرت وعزت না, উহা নয়। তখন কুরায়শরা প্রতিষ্ঠিত হইবে, তাহারা হইবে যথার্থভাবে সম্মানিত।" এই কথা বলিতে বলিতে তিনি বায়তুল্লাহর ভিতরে প্রবেশ করিলেন।
অতঃপর মক্কা বিজিত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) উহমানের নিকট হইতে চাবি চাহিয়া লইলেন। মতান্তরে উছমান চাবি লইয়া বায়তুল্লাহর উপর উঠিয়া যান। তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে আলী (রা) তাহার নিকট হইতে জোরপূর্বক চাবি ছিনাইয়া লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাতে দিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বায়তুল্লাহ প্রবেশ করিয়া দুই রাক'আত নামায আদায় করিলেন। এই সময় আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ করিলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمْنَتِ إِلى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُمْ بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا .
"নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিতেছেন আমানত উহার হকদারকে প্রত্যর্পণ করিতে। তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করিবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সহিত বিচার করিবে। আল্লাহ তোমাদেরকে যে উপদেশ দেন তাহা কত উৎকৃষ্ট। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা” (৪:৫৮)।
রাসূলুল্লাহ (স) কা'বা শরীফ হইতে বাহির হইলে আল্লাহ তা'আলার উল্লিখিত নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে উছমান ইব্ন তালহাকে তিনি পুনরায় কা'বা শরীফের চাবি দিয়া বলিলেনঃ
خذها خالدة تالدة لا ينزعها منكم الا الظالم يا عثمان ان الله استامنكم على بيته فكلوا بما وصل اليكم من هذا البيت بالمعروف .
“এই নাও, এখন হইতে এই চাবি সব সময় তোমার বংশধরদের হাতেই থাকিবে। যালিম ছাড়া কেহ ইহা তোমাদের নিকট হইতে ছিনাইয়া লইতে পারিবে না। হে উছমান! অবশ্য আল্লাহ তা'আলা তোমাকে তাঁহার ঘরের আমানতদার করিয়াছেন। অতএব এই ঘরের সেবার মাধ্যমে যাহা কিছু বৈধভাবে অর্জিত হইবে উহা তোমাদের জন্য বৈধ"।
উছমান ইব্ন তালহা চাবি লইয়া আনন্দচিত্তে চলিয়া যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ডাকিয়া বলিলেন, أَلَمْ يَكُنِ الَّذِي قُلْتُ لَكَ “হে উছমান! আমি তোমাকে যাহা বলিয়াছিলাম তাহাই হইল নাকি"? তখন আমার সেই কথাটি মনে পড়িয়া গেল। আমি নিবেদন করিলাম:
يللى اشهد انك رسول الله "আপনার কথা বাস্তবায়িত হইয়াছে। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি অবশ্যই আল্লাহ্হ্হ্র রাসূল।"
অতঃপর আজীবন উছমান ইব্ন তালহা (রা)-এর নিকট কা'বা শরীফের চাবি ছিল। তাঁহার মৃত্যুর পর তাঁহার ভাই শায়বা (রা)-এর নিকট এই চাবি ছিল। অতঃপর তাঁহাদের বংশধরদের মধ্যে ক্রমান্বয়ে হস্তান্তরিত হইতে হইতে কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকিবে (আত-তাফসীর আল-মাযহারী, ২খ, ১৪৭-১৪৮; আল-কুরতুবী, ৩খ., পৃ. ১৭৭-১৭৮; মুফতী শফী, তাফসীরে মা'আরেফুল কুরআন, অনুবাদ সৌদি সরকার কর্তৃক, পৃ. ২৫৭-২৫৮ ও অন্যান্য প্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থসমূহ)।
উল্লিখিত ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (স) চাবির একচ্ছত্র মালিক হইয়াও আল্লাহ্র নির্দেশ মুতাবিক অমুসলিম উছমানকে হস্তান্তর করিয়া চরম ন্যায়পরায়ণতার দৃষ্টান্ত রাখিয়াছেন। ফলে তিনি মুসলমান হন।
📄 স্ত্রীদের সঙ্গে ব্যবহারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা
রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার অভ্যাস অনুযায়ী 'আসরের সালাতের পর কিছু সময়ের জন্য স্ত্রীদের হুজরাসমূহে যাইতেন। একবার তিনি কয়েক দিন পর্যন্ত যায়নাব (রা)-এর হুজরায় সাধারণ নিয়মের চাইতে কিছু বেশি সময় কাটাইয়াছিলেন। 'আইশা (রা) ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিয়া জানিতে পারিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট মধু ও মিষ্টি খুবই পছন্দ। আর যায়নাব (রা)-এর নিকট কোথা হইতে কিছু মধু আসিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার হুজরায় গেলেই তিনি (যায়নাব রা) তাঁহার সামনে মধু পেশ করিতেন এবং রাসূলুল্লাহ (স) তাহা পান করিতেন। এই কারণে স্বাভাবিক সময়ের চাইতে সেখানে বেশী সময় অতিবাহিত হয়। ঈর্ষান্বিত হইয়া 'আইশা (রা) ব্যাপারটি জানিতে চাহিলেন। 'আইশা (রা) মনে করিলেন যে, রাসূলুল্লাহ
(স)-কে বেশি সময় আপন হুজরায় ধরিয়া রাখিবার জন্যই যায়নাব (রা) এই কৌশল উদ্ভাবন করিয়াছেন।
'আইশা (রা) একটি কর্মপন্থা সম্পর্কে চিন্তা করেন এবং হাফসা (রা)-ও তাঁহার সহিত যোগ দেন। সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (স) যখন যায়নাব (রা)-এর ঘর হইতে তাঁহাদের ঘরে আসিবেন তখন তাঁহারা বলিবেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার মুখ হইতে 'মাগাফীর'-এর গন্ধ আসিতেছে। ইহার পর এই সিদ্ধান্তের কথা অন্যান্য স্ত্রীদেরকেও জানানো হইল এবং তাঁহারাও তাহাতে যোগ দিলেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (স) যখন আপন অভ্যাস অনুযায়ী হাফসা (রা)-এর হুজরায় আসেন তখন তিনি তাঁহাকে বলিলেন, আপনি কি মাগাফীর খাইয়াছেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, না। এই কথার উপর হাফসা (রা) বলিলেন, আপনার মুখ হইতে তো মাগাফীরের গন্ধ আসিতেছে। এই একই কথা অন্যান্য স্ত্রীরাও রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রত্যেকের সহিত সাক্ষাতমাত্র বলেন। এই অবস্থা দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার কারণে অন্যরা ন্যূনতম কষ্ট পাইবে তাহা তাঁহার ন্যায়পরায়ণতার শানের খেলাফ বুঝিতে পারিলেন। সুতরাং স্ত্রীদের সন্তুষ্টির নিমিত্তে তিনি শপথ করিলেন যে, তিনি আগামীতে কখনও মধু খাইবেন না। মধু একটি হালাল খাদ্য এবং ইহা না খাওয়ার শপথ গ্রহণ করা একটি হালাল বস্তুকে হারাম করারই নামান্তর। ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করিতে যাইয়া একটি হালাল বস্তুকে নিজের জন্য হারাম করিয়া লওয়াও ঠিক নহে। সেহেতু আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিলেন:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَآ أَحَلَّ ٱللَّهُ لَكَ تَبْتَغِى مَرْضَاتَ أَزْوَٰجِكَ وَٱللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ قَدْ فَرَضَ ٱللَّهُ لَكُمْ تَحِلَّةَ أَيْمَٰنِكُمْ وَٱللَّهُ مَوْلَٰكُمْ وَهُوَ ٱلْعَلِيمُ ٱلْحَكِيمُ
"হে নবী! আল্লাহ আপনার জন্য যাহা বৈধ করিয়াছেন আপনি তাহা নিজের জন্য নিষিদ্ধ করিতেছেন কেন? আপনি আপনার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি চাহিতেছেন; আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আল্লাহ তোমাদের শপথ হইতে মুক্তিলাভের ব্যবস্থা করিয়াছেন। আল্লাহ তোমাদের সহায়; তিনি সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়" (৬৬ : ১-২)।
এই প্রসঙ্গে 'আইশা (রা) বলিয়াছেন:
كان رسول الله ﷺ يشرب عسلا عند زينب ابنة جحش ويمكث عندها فواطأت انا وحفصة عن اتينا دخل عليها فلتقل أكلت مغافير انى اجد ريح مغافير قال لا ولكني كنت اشرب عسلا عند زينب ابنة جحش فلن اعود له وقد حلفت ولا تخبري بذلك احدا .
"রাসূলুল্লাহ (স) যায়নাব বিনত জাহ্শ (রা)-এর হুজরায় মধু পান করিতেন এবং (এই কারণে) দীর্ঘ সময় সেইখানে বসিতেন। ইহার পর আমি ও হাফসা (রা) সিদ্ধান্ত লইয়াছিলাম যে, যখনই রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের কাহারও নিকট আসিবেন তখন আমরা সকলে বলিব,
আপনি মাগাফীর খাইয়াছেন? ইহার গন্ধ তো আপনার মুখ হইতে আসিতেছে। শেষ পর্যন্ত আমরা তাহাই করিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) ইহা শুনিয়া বলিলেন, আমি তো মাগাফীর খাই নাই। তবে হাঁ, যায়নাব-এর গৃহে মধু খাইয়াছি। এখন আমি শপথ নিতেছি যে, আমি আগামীতে কখনো মধু খাইব না। কিন্তু তোমরা এই কথা কাহারও নিকট বলিও না” (মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, রাসূলে রহমত (স), ই.ফা.বা. অনুবাদ, পৃ. ৪৮০-৪৮২)।
পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ (স) কাফ্ফারা প্রদান করিয়া শপথ ভংগ করেন এবং আল্লাহ্র নির্দেশ মান্য করিয়া ন্যায়পরায়ণতার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করিলেন।