📄 মদীনায় মুওয়াখাত (ভ্রাতৃত্ব বন্ধন): পরস্পর ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের প্রয়োজনীয়তা
মক্কা হইতে মদীনায় হিজরতকারী মুহাজিরগণ বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যার সম্মুখীন হন। এই কথা সুবিদিত যে, মুহajirগণ তাঁহাদের পরিবার-পরিজন এবং সহায়-সম্পদ মক্কাতে ফেলিয়া রাখিয়া মদীনায় হিজরত করেন। তাঁহারা ব্যবসা-বাণিজ্যে দক্ষ ছিলেন। কুরায়শরা এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত কুশলী হইলেও কৃষি ও হস্তশিল্পে পারদর্শী ছিলেন না। অথচ মদীনার অর্থনীতি এই দুইটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করিয়া গড়িয়া উঠিয়াছিল।
ব্যবসার জন্য প্রয়োজন মূলধন। এই মূলধনের অভাবে মুহajirগণ নূতন সমাজে সহজে নিজস্ব জীবিকার উপায় অবলম্বন করিতে সমর্থ হইতেছিলেন না। নবগঠিত রাষ্ট্র তাহাদের জীবিকা নির্বাহের সুযোগ সৃষ্টি ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করিতে হিমশিম খাইতেছিলেন। নূতন সমাজের সহিত মুহাজিরদের সম্পর্কের কেবল সূচনা হইয়াছিল। মুহাজিরগণ মক্কাতে পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধব ছাড়িয়া চলিয়া আসেন এবং তাহাদের সহিত যোগাযোগ সম্পূর্ণ ছিন্ন হইয়া যায়। ইহার ফলে মুহাজিরগণ একাকিত্ব বোধ করেন এবং মাতৃভূমি মক্কার জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠেন। ইহা ছাড়া মক্কা এবং মদীনার আবহাওয়াও ছিল ভিন্ন প্রকৃতির। ফলে মুহাজিরদের অনেকে জ্বরে আক্রান্ত হন।
এমতাবস্থায় তাহাদের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া এবং স্বাভাবিক মেহমানদারীর অতিরিক্ত সাময়িক সমাধান করা জরুরী হইয়া পড়িয়াছিল। আনসারগণ নিঃসঙ্কোচে তাহাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়াইয়া দেন। তাহারা ত্যাগ ও নিঃস্বার্থতার এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন যাহা আল্লাহ্র কিতাবে চিরকালের জন্য অবিস্মরণীয় হইয়া রহিয়াছে :
وَالَّذِينَ تَبَوَّقُ الدَّارَ وَالْإِيْمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوكَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
“আর তাহাদের জন্যও যাহারা (আনসার) মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে এই নগরীতে বসবাস করিয়াছে ও ঈমান আনিয়াছে, তাহারা মুহাজিরদেরকে ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যাহা দেওয়া হইয়াছে তাহার জন্য তাহারা অন্তরে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না, আর তাহারা তাহাদেরকে নিজেদের উপর অগ্রাধিকার দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হইলেও। যাহাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য হইতে মুক্ত রাখা হইয়াছে তাহারাই সফলকাম” (৫৯:৯)।
আনসারদের এহেন ত্যাগ ও উদারতা সত্ত্বেও মুহাজিরদের সুষ্ঠু জীবন যাপনের গ্যারান্টি দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ন্যায়সঙ্গত বিধান প্রণয়নের প্রয়োজন থাকিয়াই যায়। বিশেষ করিয়া মুহাজিরদের ব্যক্তিত্ব, গৌরব ও মর্যাদার স্বাভাষিক দাবি ছিল যে, তাহাদের সমস্যা এমনভাবে সমাধান করা হউক বাহাতে তাহারা যে আনসারদের উপর নির্ভরশীল এই কথা তাহাদের ভাবিতে না হয়। এই কারণে ইনসাফের মহান ধারক রাসূলুল্লাহ (স) আনাস ইবন মালিকের বাড়ীতে ৪৫ জন মুহাজির ও অপর ৪৫ জন আনসারের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের নিমিত্ত আনসারদের লক্ষ্য করিয়া বলেন:
📄 মুওয়াখাতের ফলাফল
تأخوا في الله أخوين ثم أخذ على بن ابى طالب فقال هذا أخي فكان رسول الله سيد المرسلين وامام المتقين ورسول رب العالمين الذي ليس له خطير ولا نظير من العباد وعلى بن ابى طالب رضى الله عنه أخوين
"আল্লাহ্র ওয়াস্তে তোমরা প্রত্যেকে একজন করিয়া ভ্রাতা গ্রহণ কর। অতঃপর তিনি নিজেই 'আলী ইব্ন আবী তালিব (রা)-এর হাত ধরিয়া বলেন, এই আমার ভাই। অতএব আল্লাহ্ রাসূল (স) সমস্ত রাসূলদের নেতা, সমস্ত মু'মিন ও মুত্তাকীদের ইমাম, যিনি বিশ্বের রব, অতুলনীয়, অপ্রতিদ্বন্দ্বী তাঁহার রাসূল এবং আলী ইব্ন আবী তালিব দুই ভাই হইয়া গেলেন" (ইব্ন হিশাম, আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যা, ২খ., ১১২; রাসূলের (স) যুগে মদীনার সমাজ, ১ম খণ্ড, রূপ ও বৈশিষ্ট্য, পৃ. ৮৫, ৮৬)।
আল্লাহ উক্ত মুওয়াখাত বিধানকে চিরকালের জন্য স্বাগত জানাইয়া কুরআন মজীদে ঘোষণা করেন:
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ.
"মু'মিনগণ পরস্পর ভাই। সুতরাং তোমরা ভ্রাতৃগণের মধ্যে শান্তি স্থাপন কর এবং আল্লাহকে ভয় কর যাহাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও” (৪৯: ১০)।
মুওয়াখাতের ফলাফল
মুওয়াখাতের (পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব বন্ধন) বিধানের ফলে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ দুই ব্যক্তির মধ্যে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার মত বিশেষ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সহযোগিতা কোন নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না, জীবন সমস্যা মুকাবিলায় সব ধরনের বস্তুগত সাহায্য ও সহযোগিতার সর্বব্যাপী ব্যবস্থা ছিল, হউক তাহা সাহায্যদান বা পরিচর্যা করা, উপদেশ প্রদান, পারস্পরিক মেহমানদারী ও ভালবাসা। মুওয়াখাতের ফলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ দুই ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছাড়াই পরস্পরের উত্তরাধিকারীও হইতে পারিতেন। এই ব্যবস্থা দুই ব্যক্তির মধ্যে এমন উচ্চতর ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রচনা করিয়াছিল যাহা রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে স্থাপিত ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের চেয়েও সুদৃঢ় ছিল।
আনসারগণ তাহাদের মুহাজির ভাইদের জন্য ত্যাগের সুযোগ পাইয়া আনন্দিত হন। মুওয়াখাতের এক অনুপম ত্যাগের উদাহরণ হইল সাহাবী সা'দ ইব্ন আর-র-বী' (আনসার) এবং আবদুর রহমান ইবন 'আওফের (মুহাজির) মধ্যকার ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। সা'দ (রা) 'আবদুর রহমান (রা)-কে বলিলেন, "আমার যে সম্পত্তি রহিয়াছে আমি তাহা আমাদের দুইজনের মধ্যে আধাআধি ভাগ করিয়া লইতে চাই। আমার দুইজন স্ত্রী আছে, আপনি তাহাদের যাহাকে পছন্দ করিবেন আমি তাহাকে তালাক দিব যাহাতে আপনি যথা সময়ে তাহাকে বিবাহ করিতে পারেন"। আবদুর রহমান (রা) বলিলেন, "আল্লাহ আপনার স্ত্রী ও সম্পদকে আপনার জন্য রহমতে রূপান্তরিত করুন। আমাকে বাজারের দিকে লইয়া চলুন"।
ফিরিবার সময় তিনি বিশুদ্ধ মাখন ও গৃহে তৈরী পনীর লইয়া আসেন। তিনি যে ব্যবসা করিলেন—এইটি ছিল তাহার মুনাফা। আবদুর রহমান (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমার শরীর হলুদের রং দেখিয়া বলিলেন, কী ব্যাপার? আমি বলিলাম, আমি এক আনসার মহিলাকে বিবাহ করিয়াছি। তিনি বলিলেন, একটি বকরী হইলেও ওলীমার ব্যবস্থা কর।
গভীর ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক স্বার্থত্যাগের এই অপূর্ব দৃশ্য দেখিয়া যে কেহ বিস্ময়ে অভিভূত হইয়া পড়িবেন, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। আমরা অন্য কোন জাতির ইতিহাসে সহমর্মিতার ও সাম্যের এমন ঘটনার কোন নজীর দেখিতে পাই না (রাসূলুল্লাহর (স) যুগে মদীনার সমাজ (১ম খণ্ড) রূপ ও বৈশিষ্ট্য, পৃ. ৮৫, ৮৬, ৮৭)। উক্ত দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হইয়াছিল একমাত্র রাসূলুল্লাহ (স)-এর আজীবন ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সার্বিক ত্যাগের বিনিময়ে।
📄 মসজিদে নববী নির্মাণের জন্য জায়গা সংগ্রহ
রাসূলুল্লাহ (স) মদীনার মুহাজির ও আনসারগণকে লইয়া জামা'আতে নামায পড়িবার জন্য মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন। আবূ আয়্যব (রা)-এর বাড়ির সম্মুখে যেই স্থানে তাঁহার উট হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া পড়িয়াছিল মসজিদ নির্মাণের জন্য এই স্থানটিকেই তিনি পছন্দ করিলেন। জায়গাটি ছিল নাজ্জার বংশীয়দের। তখনকার দিনে জায়গাটির বিশেষ কোন গুরুত্ব ছিল না। এক পার্শ্বে কয়েকটি কবর আর কয়েকটি খেজুর গাছ ছিল। তিনি নাজ্জার বংশীয় লোকদিগকে বলিলেন, আমি মসজিদ নির্মাণের জন্য এই স্থানটি ক্রয় করিতে চাই। তোমরা মূল্য গ্রহণ করিয়া ইহা আমাকে দিয়া দাও। তাহারা উত্তর করিলেন, আমরা মূল্য লইয়াই স্থানটি আপনাকে দান করিব, কিন্তু মূল্যটা আপনার নিকট হইতে নহে বরং আল্লাহ্র নিকট হইতে গ্রহণ করিব। তিনি যখন জানিতে পারিলেন যে, প্রকৃতপক্ষে এই স্থানটি দুইটি ইয়াতীম বালকের তখন তিনি ঐ বালকদ্বয়কে বলিলেন: "উপযুক্ত মূল্য গ্রহণ করিয়া স্থানটি আমাকে দিয়া দাও।” বালকেরা কিছুতেই ইহার মূল্য গ্রহণ করিতে সম্মত হইল না। তাহারা বিনা মূল্যেই জমিটি রাসূলুল্লাহ (স)-কে দান করিতে চাহিল। কিন্তু তিনি বিনা মূল্যে ইয়াতীমদের সম্পদ লইতে কিছুতেই রাজী হইলেন না।
এইজন্য অগত্যা তাহারা ইহার মূল্য গ্রহণ করিল। নাজ্জার প্রধানগণ জমিটির মূল্য দশ দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) নির্ধারণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর আদেশক্রমে আবূ বকর (রা) জমিটির নির্ধারিত মূল্য প্রদান পূর্বক মসজিদের জন্য ওয়াক্ফ করিয়া দিলেন। কাফিরদের পুরাতন কবরসমূহ উঠাইয়া স্থানটি সমতল করা হইল। তৎপর মসজিদ নির্মাণের কাজ আরম্ভ হইয়া গেল। ন্যায়পরায়ণতার মূর্ত প্রতীক রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদ নির্মাণের কাজে যোগদানের জন্য লোকদিগকে আদেশ না দিয়া স্বয়ং ইটের বোঝা বহন করার কাজে যোগদান করিলেন (হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স) সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৪২৬, ৪২৭)।
উল্লিখিত ঘটনায় ইয়াতীমের সম্পদ ক্রয়ে ন্যায়ানুগ মূল্য প্রদান এবং নির্মাণকাজে অংশগ্রহণ দ্বারা চিরকালের জন্য অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হইয়াছে।
📄 রাষ্ট্র পরিচালনায় আদর্শ বিধান
আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে রাসূলুল্লাহ (স) স্বদেশ ভূমি মক্কা হইতে মদীনায় হিজরত করেন। তৎকালে মদীনায় ইয়াহুদীদের দশটি গোত্র এবং আওস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের বারটি উপগোত্র বসবাস করিতেছিল। আওস ও খাযরাজদের মধ্যে মুসলমানও ছিল, পৌত্তলিকও ছিল। এতদ্ব্যতীত ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্বে আওস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয় পরস্পরের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হইয়াছিল। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) সর্বাগ্রে গোত্র ও বংশভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা নির্মূল করিয়া তদস্থলে একটি বিশ্বজনীন ভ্রাতৃ-সমাজ প্রতিষ্ঠা করিলেন, বর্ণ-গোত্র-গোষ্ঠী এবং ভাষা ও আঞ্চলিকতার ঊর্ধ্বে এক উম্মাহ ও এক মিল্লাত প্রতিষ্ঠা করিলেন, অমুসলিম ও বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারিত করেন, রাষ্ট্র ও নাগরিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক, অধিকার ও কর্তব্য চিহ্নিত করেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করিয়া আইনের দৃষ্টিতে সকলের সমান অধিকার নীতির প্রবর্তন করেন এবং প্রশাসন, আইন প্রণয়ন ও বিচার বিভাগের মূলনীতি ও বিধিমালা সুবিন্যস্ত করেন। মোটকথা, একটি বিধিবদ্ধ মানব সমাজ সংগঠন, উহার উন্নতি, অগ্রগতি, কল্যাণ ও প্রবৃদ্ধির জন্য এবং এতদসঙ্গে একটি উন্নত ও উত্তম আদর্শ ইনসাফ ভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি আদর্শ বিধান সম্পাদন করেন। এই আদর্শ বিধান মদীনার সনদ নামে খ্যাত। ইহাতে মোট ৪৭টি ধারা বিন্যস্ত হইয়াছে। ইহা দুই অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে ২৩টি ধারা এবং দ্বিতীয় অংশে ২৪টি। প্রথম অংশ মুসলিমদের আভ্যন্তরীণ সম্পর্ক এবং তাহাদের অধিকার ও কর্তব্যসমূহ চিহ্নিত করা হয়। দ্বিতীয় অংশে রহিয়াছে মুসলিম এবং ইয়াহুদী ও 'অন্যান্য মদীনাবাসীর পারস্পরিক সম্পর্ক, অধিকার ও কর্তব্য এবং তদসংশ্লিষ্ট অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের স্পষ্ট বিধান যাহা পরিপূর্ণ ইনসাফের মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠিত। এখানে ইনসাফের সহিত প্রত্যক্ষ কিছু ধারা উপস্থাপিত হইল:
(১) ইহা আল্লাহ্ নবী ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর অংগীকারপত্র যাহা কুরায়শী ও মদীনার মুসলিমদের মধ্যে এবং সেই সকল লোকের মধ্যে যাহারা মুসলিমদের অনুসরণ করিয়া তাহাদের সহিত ঐক্যবদ্ধ হইয়া জিহাদে অংশগ্রহণ করিবে।
(২) উপরিউক্ত জনসমষ্টি অন্যান্য লোকদের হইতে স্বতন্ত্র একটি জাতিতে পরিণত হইবে।
(৩) কুরায়শী মুহাজিরগণ তাহাদের গোত্র-বিধান অনুসারে পরস্পর নিজেদের দিয়াত (রক্তপণ) আদায় করিবে; অনুরূপ তাহারা নিজেদের বন্দীদের মুক্তিপণ মু'মিন ও মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত রীতি অনুসারে এবং ইনসাফের সহিত আদায় করিবে।
(৪) বানু 'আওফ তাহাদের গোত্রীয় বিধি-ব্যবস্থায় নিজেদের পূর্বেকার দিয়াতসমূহ আদায় করিবে এবং তাহাদের সকল উপগোত্র নিজেদের বন্দীদের মুক্ত করিবার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মাঝে প্রচলিত বিধি এবং ইনসাফের সহিত মুক্তিপণ (ফিদয়া) প্রদান করিবে।
(৫) বানুল হারিছ (ইব্ন খাযরাজ) নিজেদের বিধি অনুসারে নিজেদের পুরাতন দিয়াতসমূহ প্রদান করিবে এবং তাহাদের প্রত্যেক উপগোত্র নিজেদের বন্দীদের মুক্তিপণ মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত বিধির অধীনে ন্যায়পরায়ণতার সহিত আদায় করিবে।
(৬) তাকওয়ার অনুসারিগণ ঐক্যবদ্ধভাবে এমন প্রতিটি ব্যক্তির বিরোধিতা করিবে, যে তাহাদের মধ্যে যুলুম, পাপ, বাড়াবাড়ি, অবাধ্যতা, বিশৃংখলা ও বিদ্রোহের কারণ হইতে পারে। তাহারা সকলে একত্রে এই প্রকৃতির ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে, সেই অনাজ্ঞাত ব্যক্তি তাহাদের কাহারও সন্তানই হউক না কেন।
(৭) ইয়াহুদীদের মধ্য হইতে যাহারাই আমাদের আনুগত্য স্বীকার করিয়া লইবে তাহাদের সহিত যথারীতি বিধিসম্মত আচরণ, ইনসাফ ও সমতার ভিত্তিতে আচরণের বিধান করা হইল। তাহাদের উপর যুলম করা হইবে না এবং তাহাদের বিরুদ্ধে কাহাকেও সাহায্য-সহায়তা প্রদান করা হইবে না।
(৮) মুসলিমদের সন্ধি সমভাবে ও সমপর্যায়ের গুরুত্বসম্পন্ন। কোনও মুসলমান আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের কালে মুসলমানদের হইতে পৃথক হইয়া কাহারও সহিত সন্ধি করিতে পারিবে না। মুসলমানদের মধ্যে সাম্য ও ন্যায়নীতি অক্ষুণ্ণ রাখিবার প্রতি লক্ষ্য রাখিতে হইবে।
(৯) সকল মুসলিম একে অপরের সাহায্যকারী ও সহকর্মী থাকিবে।
(১০) যেই ব্যক্তি কোন মু'মিনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করিবে তাহাকে নিহতের বিনিময়ে হত্যা করা হইবে, যদি না নিহত ব্যক্তির অভিভাবক তাহার বিনিময়ে রক্তপণ (দিয়াত) গ্রহণে সম্মত হইয়া যায়। ঈমানদার সকলেই হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে থাকিবে।
(১১) বানু 'আওফ-এর ইয়াহুদীরা নিজেরা, তাহাদের মিত্রবর্গ ও মাওলা (মুক্তদাস)-দের সহকারে মুসলমানদের সহিত এক পক্ষ ও একদল সাব্যস্ত হইবে। ইয়াহুদীরা নিজেদের ধর্ম পালন করিতে পারিবে এবং মুসলমানগণ নিজ ধর্মে প্রতিষ্ঠিত থাকিবে। যে কেহই যুলুম ও পাপ করিবে সে নিজেকে এবং পরিবারকে বিপদগ্রস্ত করিবে।
(১২) প্রতিবেশীরা প্রত্যেকের নিজের সমতুল্য পরিগণিত হইবে। তাহাদের কোনও ক্ষতিসাধন করা যাইবে না; তাহাদের উপর অবিচার করা যাইবে না।
(১৩) এই চুক্তি যালিম ও পাপীকে তাহার অসৎকর্মের পরিণাম হইতে রক্ষা করিবে না। যেই ব্যক্তি (মদীনা হইতে) বাহিরে চলিয়া যাইবে সেও নিরাপদ থাকিবে এবং যেই ব্যক্তি (মদীনায়) অবস্থান করিয়া থাকিবে সেও নিরাপত্তা লাভ করিবে। কিন্তু যেই ব্যক্তি যুলুম ও গুনাহ করিবে, সে নিরাপদ থাকিবে না। আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল (স) নেককার ও মুত্তাকী লোকদের সহায় ও সংরক্ষণকারী (ইসলামী বিশ্বকোষ সম্পাদনা পরিষদ, হযরত রাসূলে করীম (স) জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ৩১১-৩২২; রাসূল (স)-এর যুগে মদীনার সমাজ, (১ম খণ্ড), রূপ ও বৈশিষ্ট্য, পৃ. ১২৩-১৪০; ইবন ইসহাক, সীরাতে রাসূলুল্লাহ (স), অনু. ই.ফা.বা., ৩খ., পৃ. ১৯-২২)।