📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সৈনিক নির্বাচনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়নীতি

📄 সৈনিক নির্বাচনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়নীতি


রাসূলুল্লাহ (স) উহুদ যুদ্ধে শরীক হইবার জন্য উপযুক্ত বয়সের দক্ষ মুসলিমদেরকে তৈরি হইতে নির্দেশ দেন। তখন জিহাদের দুর্নিবার কামনায় সামুরা ইবন জুনদুব ফাযারী ও রাফে' ইব্‌ন খাদীজ (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদেরকে বয়সের অপূর্ণতার কারণে অদক্ষ ভাবিয়া প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করেন। উল্লেখ্য যে, তাঁহারা উভয়ে পনের বৎসর বয়সে পৌঁছিয়াছিলেন। ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট সংবাদ আসিল যে, রাফে' (রা) তীর নিক্ষেপে অত্যন্ত পারদর্শী। তখন তিনি তাহাকে অনুমতি দিলেন। তাহাকে অনুমতি দেওয়ার পর সামুরা ইব্‌ন জুনদুব (রা)-এর ব্যাপারে বলা হইল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সামুরা তো রাফেকে কুস্তিতে পরাস্ত করিতে পারে। কাজেই তাহাকেও অনুমতি দিন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহাদের পরিণত বয়স ও দক্ষতা প্রমাণ সাপেক্ষে উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দেন, আর অন্যান্য (পনের বৎসরের নীচের) বালককে উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দেন নাই (ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ই.ফা.বা., ৩খ., পৃ. ২৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সংখ্যাগরিষ্ঠ সাহাবীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাসূলুল্লাহ (স)

📄 সংখ্যাগরিষ্ঠ সাহাবীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাসূলুল্লাহ (স)


রাসূলুল্লাহ (স) উহুদ যুদ্ধ মদীনায় অবস্থান করিয়া পরিচালনা করা সমীচীন মনে করিয়াছিলেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ সাহাবী মদীনার বাহিরে যাইয়া মুকাবিলা করিতে পছন্দ করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) এককভাবে সিদ্ধান্তের অধিকারী থাকা সত্ত্বেও তিনি সর্বসাধারণ সদস্যদের পরামর্শ গ্রহণ করিয়া মদীনার বাহিরে গিয়া যুদ্ধ করিবার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন। আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে একমাত্র আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি ইব্‌ন সাল্‌ল মদীনায় থাকার পক্ষে ছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) মদীনার বাহিরে যুদ্ধে যাওয়ার রায় গ্রহণ করিয়া ন্যায়পরায়ণতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন (ইব্‌ন হিশام, সীরাতুন নবী (স), অনু.।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মদীনায় মুওয়াখাত (ভ্রাতৃত্ব বন্ধন): পরস্পর ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের প্রয়োজনীয়তা

📄 মদীনায় মুওয়াখাত (ভ্রাতৃত্ব বন্ধন): পরস্পর ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের প্রয়োজনীয়তা


মক্কা হইতে মদীনায় হিজরতকারী মুহাজিরগণ বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যার সম্মুখীন হন। এই কথা সুবিদিত যে, মুহajirগণ তাঁহাদের পরিবার-পরিজন এবং সহায়-সম্পদ মক্কাতে ফেলিয়া রাখিয়া মদীনায় হিজরত করেন। তাঁহারা ব্যবসা-বাণিজ্যে দক্ষ ছিলেন। কুরায়শরা এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত কুশলী হইলেও কৃষি ও হস্তশিল্পে পারদর্শী ছিলেন না। অথচ মদীনার অর্থনীতি এই দুইটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করিয়া গড়িয়া উঠিয়াছিল।
ব্যবসার জন্য প্রয়োজন মূলধন। এই মূলধনের অভাবে মুহajirগণ নূতন সমাজে সহজে নিজস্ব জীবিকার উপায় অবলম্বন করিতে সমর্থ হইতেছিলেন না। নবগঠিত রাষ্ট্র তাহাদের জীবিকা নির্বাহের সুযোগ সৃষ্টি ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করিতে হিমশিম খাইতেছিলেন। নূতন সমাজের সহিত মুহাজিরদের সম্পর্কের কেবল সূচনা হইয়াছিল। মুহাজিরগণ মক্কাতে পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধব ছাড়িয়া চলিয়া আসেন এবং তাহাদের সহিত যোগাযোগ সম্পূর্ণ ছিন্ন হইয়া যায়। ইহার ফলে মুহাজিরগণ একাকিত্ব বোধ করেন এবং মাতৃভূমি মক্কার জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠেন। ইহা ছাড়া মক্কা এবং মদীনার আবহাওয়াও ছিল ভিন্ন প্রকৃতির। ফলে মুহাজিরদের অনেকে জ্বরে আক্রান্ত হন।
এমতাবস্থায় তাহাদের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া এবং স্বাভাবিক মেহমানদারীর অতিরিক্ত সাময়িক সমাধান করা জরুরী হইয়া পড়িয়াছিল। আনসারগণ নিঃসঙ্কোচে তাহাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়াইয়া দেন। তাহারা ত্যাগ ও নিঃস্বার্থতার এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন যাহা আল্লাহ্র কিতাবে চিরকালের জন্য অবিস্মরণীয় হইয়া রহিয়াছে :
وَالَّذِينَ تَبَوَّقُ الدَّارَ وَالْإِيْمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوكَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
“আর তাহাদের জন্যও যাহারা (আনসার) মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে এই নগরীতে বসবাস করিয়াছে ও ঈমান আনিয়াছে, তাহারা মুহাজিরদেরকে ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যাহা দেওয়া হইয়াছে তাহার জন্য তাহারা অন্তরে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না, আর তাহারা তাহাদেরকে নিজেদের উপর অগ্রাধিকার দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হইলেও। যাহাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য হইতে মুক্ত রাখা হইয়াছে তাহারাই সফলকাম” (৫৯:৯)।
আনসারদের এহেন ত্যাগ ও উদারতা সত্ত্বেও মুহাজিরদের সুষ্ঠু জীবন যাপনের গ্যারান্টি দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ন্যায়সঙ্গত বিধান প্রণয়নের প্রয়োজন থাকিয়াই যায়। বিশেষ করিয়া মুহাজিরদের ব্যক্তিত্ব, গৌরব ও মর্যাদার স্বাভাষিক দাবি ছিল যে, তাহাদের সমস্যা এমনভাবে সমাধান করা হউক বাহাতে তাহারা যে আনসারদের উপর নির্ভরশীল এই কথা তাহাদের ভাবিতে না হয়। এই কারণে ইনসাফের মহান ধারক রাসূলুল্লাহ (স) আনাস ইবন মালিকের বাড়ীতে ৪৫ জন মুহাজির ও অপর ৪৫ জন আনসারের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের নিমিত্ত আনসারদের লক্ষ্য করিয়া বলেন:

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মুওয়াখাতের ফলাফল

📄 মুওয়াখাতের ফলাফল


تأخوا في الله أخوين ثم أخذ على بن ابى طالب فقال هذا أخي فكان رسول الله سيد المرسلين وامام المتقين ورسول رب العالمين الذي ليس له خطير ولا نظير من العباد وعلى بن ابى طالب رضى الله عنه أخوين
"আল্লাহ্র ওয়াস্তে তোমরা প্রত্যেকে একজন করিয়া ভ্রাতা গ্রহণ কর। অতঃপর তিনি নিজেই 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা)-এর হাত ধরিয়া বলেন, এই আমার ভাই। অতএব আল্লাহ্ রাসূল (স) সমস্ত রাসূলদের নেতা, সমস্ত মু'মিন ও মুত্তাকীদের ইমাম, যিনি বিশ্বের রব, অতুলনীয়, অপ্রতিদ্বন্দ্বী তাঁহার রাসূল এবং আলী ইব্‌ন আবী তালিব দুই ভাই হইয়া গেলেন" (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যা, ২খ., ১১২; রাসূলের (স) যুগে মদীনার সমাজ, ১ম খণ্ড, রূপ ও বৈশিষ্ট্য, পৃ. ৮৫, ৮৬)।
আল্লাহ উক্ত মুওয়াখাত বিধানকে চিরকালের জন্য স্বাগত জানাইয়া কুরআন মজীদে ঘোষণা করেন:
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ.
"মু'মিনগণ পরস্পর ভাই। সুতরাং তোমরা ভ্রাতৃগণের মধ্যে শান্তি স্থাপন কর এবং আল্লাহকে ভয় কর যাহাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও” (৪৯: ১০)।
মুওয়াখাতের ফলাফল
মুওয়াখাতের (পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব বন্ধন) বিধানের ফলে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ দুই ব্যক্তির মধ্যে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার মত বিশেষ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সহযোগিতা কোন নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না, জীবন সমস্যা মুকাবিলায় সব ধরনের বস্তুগত সাহায্য ও সহযোগিতার সর্বব্যাপী ব্যবস্থা ছিল, হউক তাহা সাহায্যদান বা পরিচর্যা করা, উপদেশ প্রদান, পারস্পরিক মেহমানদারী ও ভালবাসা। মুওয়াখাতের ফলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ দুই ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছাড়াই পরস্পরের উত্তরাধিকারীও হইতে পারিতেন। এই ব্যবস্থা দুই ব্যক্তির মধ্যে এমন উচ্চতর ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রচনা করিয়াছিল যাহা রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে স্থাপিত ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের চেয়েও সুদৃঢ় ছিল।
আনসারগণ তাহাদের মুহাজির ভাইদের জন্য ত্যাগের সুযোগ পাইয়া আনন্দিত হন। মুওয়াখাতের এক অনুপম ত্যাগের উদাহরণ হইল সাহাবী সা'দ ইব্‌ন আর-র-বী' (আনসার) এবং আবদুর রহমান ইবন 'আওফের (মুহাজির) মধ্যকার ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। সা'দ (রা) 'আবদুর রহমান (রা)-কে বলিলেন, "আমার যে সম্পত্তি রহিয়াছে আমি তাহা আমাদের দুইজনের মধ্যে আধাআধি ভাগ করিয়া লইতে চাই। আমার দুইজন স্ত্রী আছে, আপনি তাহাদের যাহাকে পছন্দ করিবেন আমি তাহাকে তালাক দিব যাহাতে আপনি যথা সময়ে তাহাকে বিবাহ করিতে পারেন"। আবদুর রহমান (রা) বলিলেন, "আল্লাহ আপনার স্ত্রী ও সম্পদকে আপনার জন্য রহমতে রূপান্তরিত করুন। আমাকে বাজারের দিকে লইয়া চলুন"।
ফিরিবার সময় তিনি বিশুদ্ধ মাখন ও গৃহে তৈরী পনীর লইয়া আসেন। তিনি যে ব্যবসা করিলেন—এইটি ছিল তাহার মুনাফা। আবদুর রহমান (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমার শরীর হলুদের রং দেখিয়া বলিলেন, কী ব্যাপার? আমি বলিলাম, আমি এক আনসার মহিলাকে বিবাহ করিয়াছি। তিনি বলিলেন, একটি বকরী হইলেও ওলীমার ব্যবস্থা কর।
গভীর ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক স্বার্থত্যাগের এই অপূর্ব দৃশ্য দেখিয়া যে কেহ বিস্ময়ে অভিভূত হইয়া পড়িবেন, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। আমরা অন্য কোন জাতির ইতিহাসে সহমর্মিতার ও সাম্যের এমন ঘটনার কোন নজীর দেখিতে পাই না (রাসূলুল্লাহর (স) যুগে মদীনার সমাজ (১ম খণ্ড) রূপ ও বৈশিষ্ট্য, পৃ. ৮৫, ৮৬, ৮৭)। উক্ত দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হইয়াছিল একমাত্র রাসূলুল্লাহ (স)-এর আজীবন ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সার্বিক ত্যাগের বিনিময়ে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00