📄 জামাতার সহিত ন্যায়সঙ্গত আচরণ
মক্কা বিজয়ের কিছু দিন পূর্বে আবুল 'আস বাণিজ্যিক সফরে সিরিয়া গমন করেন এবং যেহেতু তিনি বিশ্বস্ত ছিলেন সেহেতু অনেক লোকের বাণিজ্য-সম্ভার তাহার নিকট ছিল। যখন তিনি প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদন করিয়া সিরিয়া হইতে প্রত্যাবর্তন করেন তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সেনাদল তাহার পথরোধ করে এবং সকল বাণিজ্যিক দ্রব্যসম্ভার দখল করিয়া তাহাকে পালাইয়া যাইতে বাধ্য করে। সেনাদল সমস্ত মাল-সম্পদ লইয়া মদীনায় প্রত্যাবর্তন করে। অপরদিকে বিচক্ষণ আবুল 'আস বাণিজ্য-সম্ভার অনায়াসে লাভ করিবার মানসে সঙ্গোপনে মদীনায় তাহার স্ত্রী যায়নাব (রা)-এর নিকট গমন করিয়া তাঁহার নিকট তাহার নিরাপত্তা কামনা করেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর কন্যা যায়নাব (রা) তাঁহার স্বামী আবুল 'আসকে (কাফির থাকা অবস্থায়) নিরাপত্তা প্রদান করেন।
প্রত্যূষে যখন রাসূলুল্লাহ (স) ফজরের সালাতের উদ্দেশ্যে বাহির হন তখন উচ্চৈস্বরে যয়নাব (রা) ঘোষণা করেন, হে লোকসকল! আমি আবুল 'আস ইবন রাবী'কে নিরাপত্তা প্রদান করিয়াছি এবং তাহাকে আমার আশ্রয়ে গ্রহণ করিয়াছি। সালাত শেষে রাসূলুল্লাহ (স) সকলকে জিজ্ঞাসা করেনঃ তোমরা কি কিছু শুনিতে পাইয়াছ? সকলে জবাব দিল, হাঁ! তিনি তখন বলিলেন, আল্লাহ্র শপথ! এই সম্পর্কে আমি ঘুণাক্ষরেও কিছু জানি না। তোমরা যাহা শ্রবণ করিয়াছ তাহা আমি এখনই শ্রবণ করিলাম। তারপর রাসূলুল্লাহ (স) গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে স্বীয় কন্যা যায়নাব (রা)-কে বলিলেন, হে কন্যা। সাবধান থাকিবে! সে যেন তোমার সহিত দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন না করে। কারণ সে তোমার জন্য বৈধ নহে (সে এখন কাফির আর তুমি মুসলিম)। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) সেনাদলকে ডাকিলেন এবং তাহাদের উদ্দেশ্যে বলিলেন: আবুল 'আসের সহিত আমার কি সম্পর্ক তাহা তোমাদের নিকট সুবিদিত।
তোমরা তাহার বাণিজ্য-সামগ্রী হস্তগত করিয়াছ। যদি তোমরা দয়াপরবশ হও এবং তাহা তাহাকে প্রত্যর্পণ কর তাহা হইলে তাহা আমার মনের মতই কাজ হইবে। আর যদি তোমরা তাহা না কর তাহা হইলে তাহা গনীমতের সম্পদ এবং তোমরা উহার প্রাপক। সকলে বলিল, না, আমরা তাহার সব মালামাল প্রত্যর্পণ করিতেছি। তাহাদের যাহার নিকট যাহা ছিল তাহারা উহা এক জায়গায় একত্র করে, এমনকি বালতি এবং উটের রশিও একত্র করা হয়। প্রত্যেকের সামগ্রী যথাযথভাবে ফেরত দেওয়া হয়। উল্লিখিত ঘটনায় পূর্ণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিশেষ কারণে সাহাবীদের গণীমত প্রত্যর্পণে অনুরোধ ন্যায়পরায়ণতার এক মহান দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হইয়াছে (আসহহুস সিয়ার, অনু. পৃ. ২১৭)।
📄 যায়দ ইবন হারিছার সহিত ন্যায়পরায়ণ আচরণ
যায়দ (রা) ছিলেন কাল্ব গোত্রের হারিছা ইব্ন শুরাহবীল / শারাহবীল নামক জনৈক ব্যক্তির পুত্র। তাঁহার মা সু'দা বিন্ত ছা'লাবা তাঈ গোত্রের শাখা মায়ানা গোত্রসম্ভূত ছিলেন। তাহার আট বৎসর বয়সের সময় তাহার মা তাহাকে লইয়া তাহার বাপের বাড়ী বেড়াইতে যান। পথিমধ্যে বানু কায়ন ইন্ন জাসর-এর লোকজন তাহাদের কাফেলা আক্রমণ করিয়া লুটতরাজ করে এবং তাহাদেরকে ধরিয়া লইয়া যায়। তাহাদের মধ্যে যায়দ (রা)-ও ছিলেন। তারপর তাহারা তায়েফের নিকটবর্তী 'উকায মেলায় তাহাকে বিক্রয় করিয়া দেয়। ক্রেতা ছিলেন খাদীজাতুল কুবরা (রা)-এর ভাতিজা হাকীম ইবন হিযাম। তিনি তাহাকে মক্কায় আনিয়া তাহার ফুফু খাদীজাতুল কুবরা (রা)-কে উপহার দেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত খাদীজা (রা)-এর যখন বিবাহ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার গৃহে তাহাকে দেখিতে পান। তাহার স্বভাব-চরিত্র ও আচার-আচরণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট খুবই পছন্দনীয় ছিল বিধায় খাদীজা (রা) ক্রীতদাস যায়দ (রা)-কে তাঁহার স্বামীর খিদমতে পেশ করিলেন। অতঃপর এই সৌভাগ্যবান বালক ক্রীতদাস রাসূলুল্লাহ (স)-এর তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হইতে লাগিলেন। তাঁহার মহান সাহচর্য লাভ করিয়া উত্তম চারিত্রিক সৌন্দর্য পর্যবেক্ষণের সুযোগ লাভে ধন্য হইল।
এইদিকে তাহার স্নেহময়ী জননী পুত্রশোকে অস্থির হইয়া পড়িল এবং তাহার চোখের পানি কখনও শুকাইত না। তাহার বড় দুঃখ ছিল, তাহার ছেলেটি বাঁচিয়া আছে, না ডাকাতদের হাতে মারা গিয়াছে, এই কথাটি তিনি জানিতেন না। তাই তিনি খুব হতাশ হইয়া পড়েন। তাহার পিতা হারিছা সম্ভাব্য সকল স্থানে হারানো ছেলেকে খুঁজিতে থাকেন। পরিচিত-অপরিচিত প্রতিটি মানুষের নিকট ছেলের সন্ধান করেন। তিনি ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন প্রসিদ্ধ ও বিশিষ্ট কবি। দীর্ঘদিন পর মক্কায় ছেলে আছে সন্ধান পাইয়া তিনি বড় ভাই কা'বসহ যায়দের মুক্তিপণের পর্যাপ্ত অর্থ-কড়ি লইয়া মক্কায় পৌঁছিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছিয়া বলিলেন, 'ওহে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর। আপনারা আল্লাহ্ ঘরের প্রতিবেশী। অসহায়ের সাহায্যকারী, ক্ষুধার্তকে অন্নদানকারী ও আশ্রয়প্রার্থীকে আশ্রয়দানকারী। আপনার নিকট আমাদের যেই ছেলেটি রহিয়াছে আমরা তাহার ব্যাপারে আসিয়াছি। তাহার পর্যাপ্ত মুক্তিপণও সঙ্গে লইয়া আসিয়াছি। আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন এবং আপনার ইচ্ছামত তাহার মুক্তিপণ নির্ধারণ করুন।
রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আপনারা কোন্ ছেলের কথা বলিতেছেন? প্রত্যুত্তরে তাহারা বলিল, আপনার দাস যায়দ। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: মুক্তিপণের চাইতে উত্তম কিছু যদি আপনাদের জন্য নির্ধারণ করি, তাহা কি আপনারা কামনা করেন? তাহারা বলিল, তাহা কি? অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আমি তাহাকে আপনাদের সম্মুখে আহ্বান করিতেছি। স্বেচ্ছায় সে নির্ধারণ করিবে যে, সে আমার সহিত থাকিবে, না আপনাদের সহিত চলিয়া যাইবে। সে যদি আপনাদের সহিত যাইতে চায়, মুক্তিপণ ছাড়াই তাহাকে লইয়া যাইবেন। আর সে আমার সহিত অবস্থান করিতে চাহিলে সেই ক্ষেত্রে আমার করিবার কিছুই নাই।
তাহারা তখন তাহার কথায় সাড়া দিয়া বলিল, আপনি অত্যন্ত ন্যায়বিচারের কথা বলিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) যায়দ (রা)-কে ডাকিয়া তাহাদের পরিচয়ের সত্যতা প্রতিপাদন করিয়া বলিলেন: তুমি ইচ্ছা করিলে তাহাদের সহিত চলিয়া যাইতে পার, আর ইচ্ছা করিলে আমার সহিতও থাকিতে পার। কোন রকম ইতস্তত না করিয়া সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলিয়া উঠিলেন, আমি আপনার সহিত অবস্থান করিব। তৎক্ষণাৎ তাহার পিতা পরিতাপের সহিত বলিলেন, যায়দ, তোমার সর্বনাশ হউক! পিতা-মাতাকে ছাড়িয়া তুমি দাসত্ব বাছিয়া লইলে? প্রত্যুত্তরে তিনি বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর মধ্যে আমি এমন কিছু দেখিয়াছি যাহাতে আমি কখনও তাঁহাকে ছাড়িয়া যাইতে পারিব না।
যায়দ (রা)-এর এই সিদ্ধান্তের পর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার হাত ধরিয়া কা'বা শরীফের নিকট লইয়া আসেন এবং হাজরে আসওয়াদের পার্শ্বে দাঁড়াইয়া উপস্থিত কুরায়শদের লক্ষ্য করিয়া ঘোষণা করেনঃ ওহে কুরায়শ জনমণ্ডলী। তোমরা সাক্ষ্য থাক, আজ হইতে যায়দ আমার ছেলে। সে হইবে আমার এবং আমি হইব তাহার উত্তরাধিকারী। এই ঘোষণায় যায়দের বাবা-চাচা খুব খুশী হইলেন এবং তাহারা তাহাকে তাঁহার নিকট রাখিয়া প্রশান্ত চিত্তে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন। সেই দিন হইতে যায়দ ইবন হারিছা (রা) হইলেন যায়দ ইব্ন মুহাম্মাদ (স)। সকলেই তাহাকে মুহাম্মাদের পুত্র বলিয়া সম্বোধন করিত। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা সূরা আহযাবে "তাহাদেরকে তাহাদের পিতার নামেই ডাক" এই আয়াত নাযিল করিয়া ধর্মপুত্র গ্রহণের প্রথা চিরতরে বাতিল করিলেন। অতঃপর তিনি আবার যায়দ ইবন হারিছা (রা) নামে পরিচিতি লাভ করেন। এই ঘটনার মাত্র কয়েক বৎসর পর রাসূলুল্লাহ (স) নবুওয়াত লাভ করেন।
যায়দ (রা) হইলেন পুরুষ দাসদের মধ্যে প্রথম মু'মিন। পরবর্তী কালে তিনি হইলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিশ্বাসভাজন আমীন, তাঁহার সেনাবাহিনীর কমান্ডার এবং তাঁহার অনুপস্থিতিতে মদীনার অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক। উল্লিখিত ঘটনায় একজন ক্রীতদাসকে আযাদ করিয়া পুত্র বানানো, আপন কুরায়শ বংশীয়া ফুফাতো বোনের সহিত বিবাহ দান এবং সেনাপতি ও অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক বানানো সত্যিই রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা ও সাম্যের অনন্য দৃষ্টান্ত (আসহাবে রাসূলের জীবন কথা, ১খ., পৃ. ১২৫-১২৭; উসদুল গাবা, ২খ., পৃ. ২৮১-২৮৪; আল-ইসাবা, ২খ., পৃ. ৪৯৪; সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, পৃ. ২২০)।
📄 নববধূর প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইনসাফ
উম্মুল মু'মিনীন 'আইশা (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রিয়তমা স্ত্রী। তাঁহার ছয় / সাত বৎসর বয়সে শাওয়াল মাসে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত তাঁহার বিবাহ হয় এবং প্রথম হিজরী শাওয়াল মাসে নয় বৎসরের সময় প্রথম বাসর হয়। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর একমাত্র কুমারী স্ত্রী ছিলেন (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৬০৬)। 'আইশা সিদ্দীকা (রা) যখন মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর গৃহে নীত হন তখন তাঁহার কম বয়সের দরুন তাঁহার খেলাধুলার মোহ কাটেনি। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে অত্যন্ত স্নেহ করিতেন। চুয়ান্ন বৎসর বয়সে রাসূলুল্লাহ (স) এই কিশোরীর সহিত অতি অন্তরঙ্গ আচরণ করিয়া ইতিহাসে ন্যায়পরায়ণতা ও সহমর্মিতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন। তিনি তাঁহাকে পিত্রালয়ের মত তাঁহার গৃহেও কিশোরীসুলভ আচরণের স্বাধীনতা দিয়াছিলেন। তিনি হাড়ি-পাতিল ও অন্যান্য খেলার সরঞ্জাম লইয়া প্রায়ই খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকিতেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাতে এতটুকু বিরক্তিবোধ করিতেন না, এমনকি তাঁহার খেলাধুলায় কখনও হস্তক্ষেপও করিতেন না বরং তাঁহার যাবতীয় চাহিদা পূরণ করিতেন (মহানবীর জীবন চরিত, পৃ. ২৯৬)।
📄 সৈনিক নির্বাচনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়নীতি
রাসূলুল্লাহ (স) উহুদ যুদ্ধে শরীক হইবার জন্য উপযুক্ত বয়সের দক্ষ মুসলিমদেরকে তৈরি হইতে নির্দেশ দেন। তখন জিহাদের দুর্নিবার কামনায় সামুরা ইবন জুনদুব ফাযারী ও রাফে' ইব্ন খাদীজ (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদেরকে বয়সের অপূর্ণতার কারণে অদক্ষ ভাবিয়া প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করেন। উল্লেখ্য যে, তাঁহারা উভয়ে পনের বৎসর বয়সে পৌঁছিয়াছিলেন। ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট সংবাদ আসিল যে, রাফে' (রা) তীর নিক্ষেপে অত্যন্ত পারদর্শী। তখন তিনি তাহাকে অনুমতি দিলেন। তাহাকে অনুমতি দেওয়ার পর সামুরা ইব্ন জুনদুব (রা)-এর ব্যাপারে বলা হইল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সামুরা তো রাফেকে কুস্তিতে পরাস্ত করিতে পারে। কাজেই তাহাকেও অনুমতি দিন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহাদের পরিণত বয়স ও দক্ষতা প্রমাণ সাপেক্ষে উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দেন, আর অন্যান্য (পনের বৎসরের নীচের) বালককে উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দেন নাই (ইব্ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ই.ফা.বা., ৩খ., পৃ. ২৮)।