📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হিলফুল ফুযূল নামকরণের কারণ

📄 হিলফুল ফুযূল নামকরণের কারণ


"আবদুল্লাহ ইব্‌ন জুদ'আনের গৃহে অনুষ্ঠিত শপথ অনুষ্ঠানে আমি আমার পিতৃব্যগণের সহিত অংশগ্রহণ করিয়াছি। তাহার বিনিময়ে আমাকে লাল বর্ণের উস্ত্রী প্রদান করা হইলেও আমি ইহাতে সন্তুষ্ট হইব না। ইসলামী সমাজেও যদি কেহ আমাকে উহার দোহাই দিয়া ডাকে তবে আমি অবশ্যই সাড়া দিব" (মুসতাদরাক হাকেম, ২খ., পৃ. ২২০; মুসনাদ আহমাদ, ১খ., পৃ. ১৯০, ১৯৪)।
হিলফুল ফুযূল নামকরণের কারণ: আদি যুগে যাাহাদের উদ্যোগে ইহা গঠিত হইয়াছিল তাহাদের সকলের নামের ধাতুমূল ছিল ফা-দ-ল (ফাদল) এবং ইহা হইতেই হিলফুল ফুযূল (ফুদূল) নামকরণ করা হইয়াছে। কিন্তু ইব্‌ন হিশাম এই সংঘ গঠনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অংশগ্রহণ সংক্রান্ত হাদীছের উল্লেখ করিয়া বলেন যে, তাহারা প্রাপকের মাল (আল-ফুদূল) তাহাকে ফেরত প্রদানের অঙ্গীকার করিয়াছিলেন বিধায় ইহার নাম হিলফুল ফুযূল হইয়াছে। যেমন হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
تحالفوا ان ترد الفضول على اصلها والا يعد ظالم مظلوما .
"তাহারা অঙ্গীকার করে যে, তাহারা (জোরপূর্বক ছিনাইয় লওয়া) 'ফুদুল' (মাল) ইহার প্রাপককে প্রত্যর্পণ করিবে এবং যালিম যেন মযলূমের উপর বাড়াবাড়ি করিতে না পারে" (আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ১৩৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হিলফুল ফুযূলের ধারাসমূহ

📄 হিলফুল ফুযূলের ধারাসমূহ


হিলফুল ফুযূলের ধারাসমূহ নিম্নরূপঃ (১) আমরা দেশ হইতে অশান্তি দূর করিব; (২) আমরা বহিরাগতদেরকে রক্ষা করিব; (৩) আমরা নিঃস্বদেরকে সাহায্য করিব; (৪) আমরা শক্তিহীনদের উপর শক্তিমানদের অত্যাচার প্রতিহত করিব।
এই সেবাসংঘের প্রচেষ্টায় সমাজে অত্যাচার-অবিচার বহুলাংশে হ্রাস পায়, মানুষের যাতায়াত নিরাপদ হয়, যাহার দৃষ্টান্ত নিম্নোক্ত ঘটনা: ইসলাম-পূর্ব যুগে একদা খাছ'আম গোত্রীয় জনৈক ব্যক্তি তাহার পরমা সুন্দরী কন্যাসহ হজ্জ অথবা 'উমরা করার উদ্দেশ্যে মক্কায় আগমন করিলে নুবায়হ ইব্‌ন হাজ্জাজ নামক এক দুর্বৃত্ত জোরপূর্বক তাহার কন্যাকে অপহরণ করে। সে সাহায্যের আহ্বান জানাইলে জনতা তাহাকে বলিল, তুমি হিলফুল ফুযুলের সদস্যবৃন্দকে জানাও! তখন সে কা'বা ঘরের নিকটে দাঁড়াইয়া উচ্চৈস্বরে ডাকিতে লাগিল, হে হিলফুল ফুযূল! এই ডাক শুনিয়া চতুর্দিক হইতে সেবকগণ উলঙ্গ তরবারি হাতে লইয়া দোঁড়াইয়া আসিয়া তাহার বিপদের কথা জিজ্ঞাসা করিল। ঘটনার বিবরণ শুনিয়া তাহারা নুবায়হ-এর বাড়িতে পৌছাইয়া তাহার কন্যাকে উদ্ধার করিয়া আনে (সীরাত বিশ্বকোষ,
উল্লিখিত প্রাক-ইসলামী যুগের সেবাসংঘের কার্যক্রম এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ (স) নবুওয়াতের পূর্বে এবং পরে সর্বাবস্থায় অবিচার-অত্যাচার-অন্যায়কে প্রতিহত করিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন এবং মযলুমকে সার্বিক সহযোগিতা করিয়া ন্যায়পরায়ণতা ও সহমর্মিতার অপূর্ব দৃষ্টান্ত পেশ করিয়াছিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বদরের যুদ্ধবন্দীদের সহিত ন্যায়পরায়ণ আচরণ

📄 বদরের যুদ্ধবন্দীদের সহিত ন্যায়পরায়ণ আচরণ


বদব যুদ্ধবন্দীদেরকে সাহাবীগণ খুব শক্ত করিয়া বাঁধেন এবং তাহাতে বন্দীরা খুবই অস্বস্তিকর অবস্থায় নিপতিত হয়। তাহাদের ক্রন্দনের রোল শ্রবণ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) সমগ্র রাত শয়্যাহীন অবস্থায় অতিবাহিত করেন। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই অবস্থা টের পাইয়া তাঁহার চাচা 'আব্বাসের বন্ধন শিথিল করিয়া দেন। সাহাবীগণের ধারণা ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর আপন চাচার বন্ধন কিছুটা শিথিল করিয়া দিলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মানসিক কষ্ট লাঘব হইবে। কিন্তু ন্যায়পরায়ণতার প্রতীক রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : “প্রত্যেক বন্দীর বন্ধন শিথিল করিয়া দাও।” কেননা যুদ্ধবন্দী হিসাবে সকল বন্দীই ইনসাফের দৃষ্টিতে সমান (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ১৫৩)।
রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধবন্দীদের সহিত সদ্ব্যবহার করিবার নির্দেশ দেন এবং বলেন, استوصوا بهم خيرا "তোমরা তাহাদের সহিত ভাল ব্যবহার করিবে”। এই প্রসঙ্গে আবূ উযায়র বর্ণনা করেন, সাহাবীগণ যখন আমাকে বন্দী করিয়া লইয়া আসিল তখন জনৈক আনসারীর ঘরে আমার জায়গা মিলিল। তাহারী আমাকে দুই বেলা রুটি খাইতে দিত আর নিজেরা খেজুর খাইয়া থাকিত। ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতার সর্বোত্তম নির্দেশেরই ফল। কেহ কোন স্থান হইতে এক টুকরা রুটি পাইলে উহা আমাকে আনিয়া দিত। তাহা গ্রহণ করিতে আমি লজ্জা পাইতাম। তাই আমি তাহা ফিরাইয়া দিতাম। কিন্তু তাহারা আমাকে জোর করিয়া খাইতে দিত এবং নিজেরা তাহা হাত দিয়াও ধরিত না। ইহাই ছিল যুদ্ধবন্দীদের সহিত মুসলমান তথা রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়সঙ্গত সর্বোত্তম আচরণ (সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী, নবীয়ে রহমত, অনু. পৃ. ২৩৮; ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ২খ., পৃ. ২১৮)।
বদরের যুদ্ধবন্দীদেরকে রাসূলুল্লাহ (স) ক্ষমা করেন এবং তাহাদের মুক্তিপণ গ্রহণ করেন। বেই ব্যক্তি যেই রকম ধনী ও বিত্তবান ছিল তাহার মুক্তিপণও সেই অনুপাতে নির্ধারিত হয়, নিকটাত্মীয়তার জন্য তারতম্য হইত না। যাহার দেওয়ার মত কিছুই ছিল না তাহাকে বিনা পণেই মুক্তি দেওয়া হয়। মোটের উপর কুরায়শরা তাহাদের বহু বন্দীকেই মুক্তিপণের মাধ্যমে মুক্ত করিয়া লয়। এমন কিছু সংখ্যক বন্দীও ছিল যাহাদের মুক্তিপণ দেওয়ার মত কিছুই ছিল না। তাহাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স) সিদ্ধান্ত লইয়াছিলেন যে, তাহারা আনসারদের শিশুদেরকে লেখা-পড়া শিখাইবে। একজন বন্দী দশজন মুসলিমকে লেখা-পড়া শিখাইবে ঠিক করিয়া দেওয়া হয়। যায়দ ইব্‌ন্ন ছাবিত (রা) এইভাবেই লেখা-পড়া শিখিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৩৯)। পৃথিবীর ইতিহাসে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মত যুদ্ধবন্দীদের সহিত এমন ন্যায়সঙ্গত আচরণ করিবার দৃষ্টান্ত দ্বিতীয়টি বোধ হয় খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 চুক্তিবদ্ধদেরকে হত্যার দিয়‍্যাত প্রদান

📄 চুক্তিবদ্ধদেরকে হত্যার দিয়‍্যাত প্রদান


আমর ইবন উমায়‍্যা (রা) (যিনি চতুর্থ হিজরীতে নজদে তাবলীগে দীনে প্রেরিত সত্তরজন সাহাবীদের পশ্চাদবর্তী পর্যবেক্ষক হিসেবে ছিলেন) বীরে মাউনার ঘটনায় বন্দী হন। কিন্তু আমের জানিতে পারে যে, এই ব্যক্তি মুদার গোত্রের। তখন সে তাঁহার মাথার সম্মুখ দিকের চুল কাটিয়া স্বীয় মাতার পক্ষ হইতে তাঁহাকে মুক্তি প্রদান করে। আমর ইবন উমায়‍্যা (রা) সেখান হইতে রওয়ানা হইয়া 'কারকারা' নামক স্থানে যখন পৌঁছাইলেন তখন তিনি একটি বৃক্ষের ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেইখানে বানু কিলাবের আরও দুই ব্যক্তি আসিয়া বৃক্ষের ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে এবং দুইজনই ঘুমাইয়া পড়ে। তখন তিনি দুইজনকেই শায়িত অবস্থায় হত্যা করেন এবং মনে মনে ভাবিলেন, আমি সাহাবীদের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করিয়াছি। কিন্তু তাঁহারা দুইজনই যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত চুক্তিবদ্ধ মিত্র পক্ষের লোক ছিল উহা তাহার জানা ছিল না। যখন তিনি মদীনায় পৌঁছিয়া সকল বৃত্তান্ত পেশ করেন তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "তাহাদের হত্যার বদলে আমাদের তো দিয়াত (রক্তপণ) প্রদান করিতে হইবে।” এই রকমই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতার দৃষ্টান্ত (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৩খ., ১৪৭-১৪৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00