📄 হিলফুল মুতায়্যাবীন
হিলফুল মুতায়্যাবীন হিলফুল মুতায়্যাবীন বা আতর ব্যবহারকারীগণের অঙ্গীকার ছিল প্রাগ-ইসলামী সেবাসংঘের একটি অন্যতম সেবাসংঘ। রাসূলুল্লাহ (স) উক্ত সেবাসংঘের একজন সদস্য ছিলেন যাহা হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেন: বাল্যকালেই আমি আমার চাচাদের সহিত হিলফুল মুতায়্যাবীনে অংশগ্রহণ করি। সেই অঙ্গীকার ভঙ্গের বিনিময়ে অনেকগুলি লাল উটও আমি পছন্দ করি না। এই অঙ্গীকার মক্কা মুকাররমায় 'আবদুল্লাহ ইব্ন জুদআনের গৃহে বনী হাশিম ও বনী উমায়্যা এবং বনী যুহরা ও বনী মাখযূমের মধ্যে অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। ইহা ছিল পরস্পর সহযোগিতা, যালিমের নিকট হইতে মযলূমের হক আদায় করার, মান-মর্যাদা প্রকৃত যোগ্যতমদেরকে ফিরাইয়া দেওয়ার এক মহান অঙ্গীকার। একটি বড় সুগন্ধির পাত্রে তাহারা সকলে হাত রাখিয়া অঙ্গীকার করিয়াছিল এবং অঙ্গীকারশেষে কা'বার দেওয়ালে হাত স্পর্শ করিয়াছিল বলিয়া এই অঙ্গীকারকে 'হিলফুল মুতায়্যারীন' বলা হয়। মক্কায় হাজীদের যমযমের পানি পান করানো ও চাঁদা লইয়া দ্বন্দুকে কেন্দ্র করিয়া এই দ্বিতীয় হিলফুল মুতায়্যাবীন গঠিত হয়। এই অঙ্গীকারে রাসূলুল্লাহ (স) অংশগ্রহণ করিয়া ন্যায়পরায়ণতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাখিয়াছেন (মহানবীর জীবনী বিশ্বকোষ, ১খ., পৃ. ৩১৭)।
📄 হিলফুল ফুযূল
হিলফুল ফুযূল হিলফুল ফুযূল-এর হিলফ শব্দটির অর্থ পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্যের অঙ্গীকার (ইন মানজুর, লিসানুল 'আরাব, ২খ., পৃ. ৯৬৩)। সুদূর অতীতে আল-ফাদল নামক কয়েকজন শান্তিপ্রিয় লোকের উদ্যোগে হিজাযে, বিশেষত মক্কা মু'আজ্জমায় সামাজিক শান্তি-শৃংখলা ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইহাই ইতিহাসে 'হিলফুল ফুযূল' নামে প্রসিদ্ধ।
আরব গোত্রসমূহের মধ্যে অব্যাহত যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ব্যাপক হানাহানির ফলে, বিশেষ করিয়া ফিজার যুদ্ধে বহু সংখ্যক জীবনহানি ঘটিলে এবং সামাজিক শাক্তি-শৃংখলা ও জনজীবনে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হইলে কিছু সংখ্যক লোকের মনে হিলফুল ফুযূলের কথা জাগ্রত হয় এবং সামাজিক নিরাপত্তা বহাল করার জন্য উক্ত সংঘের পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (স)-এর পিতৃব্য যুবায়র ইবন 'আবদুল মুত্তালিবের অনুপ্রেরণায় বানু হাশিম, বানুল মুত্তালিব, বানু আসাদ ইব্ন আবদিল উয্যা, বাচ্চু যুহরা ইব্ন কিলাব ও বানু তায়ম ইব মুররা আবদুল্লাহ ইব্ন জুদআনের বাড়িতে সমবেত হইয়া ফিজার যুদ্ধের চারি বৎসর পর
মহানবী (স)-এর নবুওয়াত লাভের বিশ বৎসর পূর্বে যুলকা'দা মাসে 'হিলফুল ফুযূল' নামক সেবাসংঘ পুনর্গঠিত করে। ইহা আরবদের নিকট সর্বাধিক সম্মানিত ও প্রসিদ্ধ চুক্তি হিসাবে বিবেচিত ছিল (ইব্ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ১৩৯-৪০; আল-বিদায়া, ২খ., পৃ ২৭০; তাবাকাত ইবন সা'দ, ১খ., পৃ. ১২৯)।
📄 হিলফুল ফুযূল গঠনের কারণ
যুবায়দ গোত্রের এক ব্যক্তি তাহার পণ্যসামগ্রী লইয়া মক্কায় পৌঁছিয়া তাহা 'আস ইব্ন ওয়াইল-এর নিকট বিক্রয় করে। কিন্তু সে তাহার পণ্যদ্রব্যের মূল্য প্রদান না করিয়া তাহা আত্মসাৎ করে। উপায়ান্তর না দেখিয়া যুবায়দী হিলফুল ফুযুলভুক্ত গোত্রসমূহে উপস্থিত হইয়া তাহাদের সাহায্য প্রার্থনা করে, কিন্তু তাহারা তাহাকে সহায়তা করিতে অসম্মতি প্রকাশ করে। যুবায়দী অনিষ্ট আশংকা করিয়া সূর্যোদয়কালে আবূ কুবায়স পাহাড়ের চূড়ায় উঠিয়া উচ্চৈস্বরে ডাক দিয়া তাহার সর্বস্ব অপহরণের ঘটনা বিবৃত করিয়া সাহায্য প্রার্থনা করে। এই সময় কুরায়শরা তাহাদের সম্মেলন স্থলে (দারুন নাদওয়াতে) উপস্থিত ছিল। এই ডাক শুনিয়া যুবায়র ইবন 'আবদুল মুত্তালিবের আহ্বানে 'আবদুল্লাহ ইব্ন জুদ'আনের গৃহে পূর্বোক্ত গোত্রসমূহ একত্র হইয়া হিলফুল ফুযুল গঠন করে, অতঃপর সংঘবদ্ধভাবে 'আস ইব্ন ওয়াইলের গৃহে উপস্থিত হইয়া যুবায়দীর মালপত্র উদ্ধার করিয়া দেয় (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ১১০)। এই প্রসঙ্গে যুবায়দী তাহার নিম্নোক্ত কবিতায় বলেন:
يا ال فهر المظلوم بضاعته + ببطن مكة نأى الدار والنفر ومحرم أشعت لم يقض عمرته + بل للرجال وبين الحجر والحجر. ان الحرام لمن تمت كرامته + ولا حرام لثوب الفاجر الغدر
"হে ফির গোত্রের লোকেরা। মযলূমের সাহায্যার্থে আগাইয়া আস। যাহার সহায়-সম্বল মক্কায় খোয়া গিয়াছে, যে মযলূম তাহার বাড়ি হইতে বহু দূরে। ঐ এলোকেশী মুহরিমের সাহায্যে আগাইয়া আস যে তাহার 'উমরা আদায় করিতে পারে নাই। হিজর ও হাজরের মাঝে লোকদের সাহায্যে আগাইয়া আস" (মহানবী (স)-এর জীবনী বিশ্বকোষ, ১খ., পৃ. ৩১৬)। এই প্রসঙ্গে যুবায়র ইবন 'আবদুল মুত্তালিব তাহার কবিতায় বলেন:
ان الفضول تحالفوا وتحاكموا وتعاقدوا + ان لا يقر ببطن مكة ظالم امر عليه تعاهدوا وتوافقوا + فالجارون المعترفيهم سالم
"ফযলেরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইল যে, মক্কায় কোন অত্যাচারীর ঠাঁই হইবে না। এই বিষয়ে তাহারা দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ হইল যে, এইখানে মক্কাবাসী ও বহিরাগত সকলেই নিরাপদ থাকিবে” (সীরাত বিশ্বকোষ, ৪খ., পৃ. ২৮৪)।
রাসূলুল্লাহ (স) নবুওয়াত লাভের পূর্বেও অন্যায়-অবিচার ও যুলুমকে সমাজ হইতে নিশ্চিহ্ন করিবার জন্য উক্ত হিলফুল ফুযূলের শপথ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। এই প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন:
لقد شهدت مع عمومتي حلفا في دار عبد الله بن جدعان ما احب ان لي به حمر النعم ولو دعيت به في الاسلام لاجبت.
📄 হিলফুল ফুযূল নামকরণের কারণ
"আবদুল্লাহ ইব্ন জুদ'আনের গৃহে অনুষ্ঠিত শপথ অনুষ্ঠানে আমি আমার পিতৃব্যগণের সহিত অংশগ্রহণ করিয়াছি। তাহার বিনিময়ে আমাকে লাল বর্ণের উস্ত্রী প্রদান করা হইলেও আমি ইহাতে সন্তুষ্ট হইব না। ইসলামী সমাজেও যদি কেহ আমাকে উহার দোহাই দিয়া ডাকে তবে আমি অবশ্যই সাড়া দিব" (মুসতাদরাক হাকেম, ২খ., পৃ. ২২০; মুসনাদ আহমাদ, ১খ., পৃ. ১৯০, ১৯৪)।
হিলফুল ফুযূল নামকরণের কারণ: আদি যুগে যাাহাদের উদ্যোগে ইহা গঠিত হইয়াছিল তাহাদের সকলের নামের ধাতুমূল ছিল ফা-দ-ল (ফাদল) এবং ইহা হইতেই হিলফুল ফুযূল (ফুদূল) নামকরণ করা হইয়াছে। কিন্তু ইব্ন হিশাম এই সংঘ গঠনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অংশগ্রহণ সংক্রান্ত হাদীছের উল্লেখ করিয়া বলেন যে, তাহারা প্রাপকের মাল (আল-ফুদূল) তাহাকে ফেরত প্রদানের অঙ্গীকার করিয়াছিলেন বিধায় ইহার নাম হিলফুল ফুযূল হইয়াছে। যেমন হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
تحالفوا ان ترد الفضول على اصلها والا يعد ظالم مظلوما .
"তাহারা অঙ্গীকার করে যে, তাহারা (জোরপূর্বক ছিনাইয় লওয়া) 'ফুদুল' (মাল) ইহার প্রাপককে প্রত্যর্পণ করিবে এবং যালিম যেন মযলূমের উপর বাড়াবাড়ি করিতে না পারে" (আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ১৩৯)।