📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জাহিলী যুগেও ন্যায়ের আদর্শে অধিষ্ঠিত

📄 জাহিলী যুগেও ন্যায়ের আদর্শে অধিষ্ঠিত


ইসলাম সত্য ও ন্যায়সঙ্গত, কুফর মিথ্যা, অন্যায় ও পরিত্যাজ্য-আজ এই কথা সর্বজন- স্বীকৃত। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াত লাভের পূর্ব পর্যন্ত এই বক্তব্য এতটা সুস্পষ্ট ছিল না,
কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) আজন্ম ন্যায়পথের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। কখনও কেহ তাঁহাকে বিন্দুমাত্র ন্যায়পথ ও ন্যায়নীতি হইতে বিচ্যুত করিতে পারে নাই যাহার বাস্তব দৃষ্টান্ত নিম্নোক্ত ঘটনাবলী: রাসূলুল্লাহ (স) হযরত খাদীজা (রা)-এর ব্যবসায়িক পণ্য-সামগ্রী লইয়া সিরিয়ার বুসরা বাজারে পৌছিলেন। তৎকালীন আরবে কোন বক্তব্যের সত্যতা প্রতিপাদনে বিভিন্ন দেব-দেবীর নামে শপথ করা হইত যাহা হারাম এবং গর্হিত অন্যায় বটে। বুসরায় ক্রয়-বিক্রয়কালে মূল্য নির্ধারণ লইয়া প্রতিপক্ষের সহিত মতভেদ সৃষ্টি হয়। প্রতিপক্ষের লোকটি তাঁহাকে লাত ও 'উয্যার শপথ করিতে বলিলে তিনি বলেন, আমি কখনও উহাদের শপথ করি না (সীরাত বিশ্বকোষ, ৪খ., পৃ. ২৭৩)।
একবার জনৈক কুরায়শীর গৃহে রাসূলুল্লাহ (স)-কে দাওয়াত দেওয়া হইল। তিনি সময়মত তাহার গৃহে উপস্থিত হইলেন। যথারীতি তাঁহার সম্মুখে বিভিন্ন প্রকার খাবার পরিবেশিত হইল। রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যান্য দেব-দেবীর নামে যবেহকৃত জন্তুর গোশত ভক্ষণ করেন না বলিয়া খাবার গ্রহণ থেকে বিরত ছিলেন (সীরাত বিশ্বকোষ, ৪খ., পৃ ৩০০)।
জাহিলী যুগে কা'বা ঘরে ইসাফ ও নায়লা নামক দুইটি প্রতিমা রাখা ছিল। কাফির মুশরিকরা কা'বা ঘর তাওয়াফ করার সময় এই দুইটি প্রতিমাকে কল্যাণ ও মঙ্গলের উদ্দেশ্যে স্পর্শ করিত। যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (س)-এর সহিত কা'বা ঘর তাওয়াফ করার সময় উক্ত প্রতিমাদ্বয় স্পর্শ করিতে রাসূলুল্লাহ (স) নিষেধ করেন। আমি দ্বিতীয়বার স্পর্শ করিলে রাসূলুল্লাহ (স) আরো কঠোরভাবে নিষেধ করেন (সীরাত বিশ্বকোষ, ৪খ., পৃ. ৩০৬)। উল্লিখিত ঘটনায় প্রতীয়মান হয় যে, তিনি জাহিলী কর্মকাণ্ড হইতে দূরে থাকিয়া ন্যায়ের পথে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হাজারে আসওয়াদ স্থাপনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা

📄 হাজারে আসওয়াদ স্থাপনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা


রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াত লাভের পাঁচ বৎসর পূর্বে যখন তাঁহার বয়স ছিল পঁয়ত্রিশ বৎসর তখন মক্কার কুরায়শগণ কা'বা ঘর পুনর্নির্মাণ করে। সম্মিলিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রত্যেক গোত্রই তাহাদের জন্য নির্ধারিত স্থান পৃথক পৃথকভাবে নির্মাণ করিতে থাকে। কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত নির্মাণ কাজ শেষ হইবার পর হাজারে আসওয়াদ ইহার নির্দিষ্ট যায়গায় স্থাপনের বিষয়ে বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। কারণ এই পবিত্র পাথর স্থাপনের বিষয়টি অতি পুণ্যময় মনে করিয়া সকলেই এই কাজটি করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিল এবং কোন গোত্রই হাজারে আসওয়াদ স্থাপনের দাবি ত্যাগ করিতে সম্মত হইল না। ফলে সকল গোত্রের মধ্যে এক ভয়াবহ সংঘাত, এমনকি যুদ্ধ শুরু হইবার উপক্রম হইল। আরব গোত্রসমূহের এই কোন্দল ও মতবিরোধে মক্কা নগরী কম্পিত হইয়া উঠিল। সামান্য কারণ বা অকারণে যুগ যুগ ধরিয়া পুরুষানুক্রমে যাহারা যুদ্ধে লিপ্ত হইত, পরস্পরের রক্ত প্লাবিত করিয়াও যাহাদের প্রতিহিংসা নিবৃত্ত হইত না, তাহারা সকলে স্বীয় কৌলীন্য ও গৌরব এবং পূর্বপুরুষদের মর্যাদা রক্ষার নামে যুদ্ধ শুরু করিতেছে ভাবিয়া আতঙ্কগ্রস্ত হইয়া পড়িল। এইজারে কারদিন, অতিবাহিত হইল কিন্তু কোন মীমাংসা হইল না। অবশেষে তাহারা সেই সময় দেশের প্রচলিত প্রথানুযায়ী রক্তপূর্ণ পাত্রে
হাত ডুবাইয়া মৃত্যুর প্রতিজ্ঞা করিল। উল্লেখ্য যে, ইহা ছিল আরবদের কঠোরতম প্রতিজ্ঞা। নিমেষে চারদিকে অস্ত্রের মহড়া শুরু হইল।
যে কোন মুহূর্তে ভয়াবহ যুদ্ধ ও রক্তপাত শুরু হইয়া যাইতে পারে এইরূপ সঙ্কটময় মুহূর্তে কুরায়শদের সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি আবূ উমায়্যা ইব্‌ন মুগীরা মাখযুমী দুই বাহু ঊর্ধ্বে তুলিয়া আবেগের সঙ্গে সকলকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, হে কুরায়শ সম্প্রদায়! তোমরা শান্ত হও, আমার কথা শোন। এই শুভ কাজ সম্পাদনের শেষ মুহূর্তে তোমরা অশুভ ও অকল্যাণের সূত্রপাত করিও না। হাজারে আসওয়াদ স্থাপনের ব্যাপারে আমার সুচিন্তিত মতামত ও পরামর্শ এই যে, আগামী কাল সকালে যেই ব্যক্তি সর্বপ্রথম কা'বা ঘরে উপস্থিত হইবে তাঁহার মতামত ও পরামর্শ অনুযায়ী এই বিবাদের মীমাংসা করা হইবে। সকলে এই প্রবীণ ব্যক্তির পরামর্শ সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করিল। পরের দিন সকলেই কা'বা ঘরে সমবেত হইল। সকলে রুদ্ধশ্বাসে, আশংকা ও আতঙ্কমিশ্রিত মনে আগন্তুকের অপেক্ষা করিতে লাগিল। সকলেই ভাবিতে লাগিল, কি জানি কে প্রথম কা'বা ঘরের প্রান্তরে প্রবেশ করে, কে জানে সে কাহার পক্ষের লোক হইবে, না জানি সে কি মীমাংসা করিয়া বসে। তাহার মীমাংসা যদি প্রতিকূল হয় তাহা হইলে কি করিয়া উহা মানিয়া লওয়া যাইবে। এই উদ্বেগ উৎকণ্ঠাসহ সকলে পলকহীন নেত্রে কা'বা গৃহের দিকে তাকাইয়া আছে। তাহারা সহসা দেখিতে পাইল যে, তাহাদের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব হযরত মুহাম্মাদ (স) আজ প্রথম ব্যক্তি যিনি কা'বার দিকে আগমন করিতেছেন। আনন্দে আত্মহারা হইয়া সকলের কণ্ঠে উচ্চারিত হইল:
هذا محمد الامين قد رضيناه هذا محمد الامين. "এই হইল মুহাম্মাদ (স) আল-আমীন, আমরা তাঁহার নির্দেশ ও মতামত মানিতে প্রস্তুত আছি। এই হইল মুহাম্মাদ (স) আল-আমীন।"
কা'বা ঘরে উপস্থিত হওয়ার পর হাজারে আসওয়াদ স্থাপনে উদ্ভূত ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা মুহাম্মাদ (স)-কে অবহিত করা হইল। তিনি সকল ঘটনা অবগত হইয়া সকল নেতৃবৃন্দকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, যে সকল গোত্র হাজারে আসওয়াদ স্থাপনের মাধ্যমে পুণ্য লাভের অধিকারী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করিতেছে তাহারা নিজ নিজ গোত্র হইতে এক একজন প্রতিনিধি নির্বাচন করুক যাহাতে কোন গোত্রই এই পুণ্যময় কাজ হইতে বঞ্চিত না হয়। অতঃপর তিনি একটি চাদর আনাইলেন এবং নিজ হাতে পাথরখানা চাদরের উপর রাখিলেন। সাথে সাথে গোত্রের প্রতিনিধিগণকে চাদরের এক এক প্রান্ত ধরিয়া তাহা যথাস্থানে লইয়া যাওয়ার জন্য বলিলেন। কুরায়শদের যে সমস্ত নেতৃবৃন্দ ঐদিন চাদর ধরিয়াছিলেন তাহারা হইলেন: (১) 'উতবা ইবন রাবী'আ, (২) আসওয়াদ ইব্‌ন মুত্তালিব, (৩) আবূ হুযায়ফা ইবন মুগীরা ও (৪) কায়স ইব্‌ন 'আদী সাহমী।
এইভাবে যখন পাথরখানা নির্দিষ্ট স্থানে লইয়া যাওয়া হইল তখন মুহাম্মাদ (س) নিজ হাতে চাদর হইতে পাথরখানা উঠাইয়া কা'বা ঘরের প্রাচীরে স্থাপন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর
ন্যায়পরায়ণতা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা ও ঐতিহাসিক ভূমিকার ফলে আরববাসীদের মধ্যে সৃষ্ট সংঘাত ও সম্মুখ যুদ্ধ পরিস্থিতি সুকৌশলে নির্বাপিত হইল এবং মক্কাবাসী এক ভয়াবহ রক্তপাত হইতে মুক্তি পাইল (সীরাত বিশ্বকোষ, ৪খ., পৃ. ৩০৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল-আমীন উপাধি লাভ

📄 আল-আমীন উপাধি লাভ


রাসূলুল্লাহ (স)-এর কৈশোরে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারি, নম্রতা, ভদ্রতা, নিঃস্বার্থ মানবসেবা ও সত্যিকার কল্যাণ প্রচেষ্টা, চরিত্র মাধুর্য ও অমায়িক ব্যবহারের ফলে আরব মুশরিক-কাফিররা তাঁহার প্রতি আকৃষ্ট হয়। অবশেষে তিনি আল-আমীন বা পরম বিশ্বস্ত উপাধিতে ভূষিত হন। ফলে মুহাম্মাদ (স) নাম অন্তরালে পড়িয়া গিয়া তিনি আল-আমীন বা পরম বিশ্বস্ত নামেই খ্যাত হইয়া উঠিলেন। নীতিধর্ম বিবর্জিত ঈর্ষা-বিদ্বেষ কলুষিত, পরশ্রীকাতর দুর্ধর্ষ আরবদের অন্তরে এতখানি স্থান লাভ করা ঐ সময়ে খুবই কঠিন ছিল। অনুপম চরিত্র মাধুর্যের অধিকারী হওয়ার কারণেই মুহাম্মাদ (স)-এর বিপক্ষে তাহা সম্ভব হইয়াছিল (সীরাত বিশ্বকোষ, ৪খ., ২৮৯)। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, আবদুল্লাহ ইব্‌ন আবিল হাসমা নবৃওয়াতের পূর্বে একবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত ব্যবসায় অংশগ্রহণ করে। তাহাতে আবদুল্লাহর যিম্মায় কিছু দেনা বাকী থাকে। তিনি অঙ্গীকার করেন, অনতিবিলম্বে আমি ফিরিয়া আসিব এবং বাকী দেনা পরিশোধ করিব। আপনি কিছুক্ষণ এই জায়গায় আমার জন্য অপেক্ষা করুন। আবদুল্লাহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হইতে বাড়ি যাওয়ার পর ঘটনাক্রমে উক্ত প্রতিশ্রুতি ভুলিয়া যায়। তিন দিন পর ঐ অঙ্গীকারের কথা মনে পড়িলে তৎক্ষণাৎ সে ঐ স্থানে আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে অপেক্ষমান পায়। রাসূলুল্লাহ (স) ক্রোধ প্রকাশ করিলেন না এবং কটু বাক্যও প্রয়োগ করিলেন না বরং বলিলেন, তুমি আমাকে কষ্টের মধ্যে ফেলিয়া দিয়াছ। আমি তিন দিন যাবত এইখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করিতেছি। ইহা ন্যায়পরায়ণতা ও ওয়াদা রক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত (সীরাত বিশ্বকোষ, ৪খ., পৃ. ২৯১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ব্যবসা-বাণিজ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা

📄 ব্যবসা-বাণিজ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা


রাসূলুল্লাহ (স)-এর বয়স ছিল তখন পঁচিশ বৎসর। পিতৃব্যের ছিল অর্থনৈতিক দৈন্য দশার সংসার। তখন অর্থনৈতিক সহযোগিতার বড় প্রয়োজন ছিল। এই সময় খাদীজা বিনত খুওয়ায়লিদ (রা) ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মহিলা। সেই যুগে আরবের নারী অধিকার বলিতে কিছুই ছিল না। পদে পদে নারীরা চরম অবমাননা ও লাঞ্ছনার শিকার হইত। সেই সময় এই সতী-সাধ্বী মহিলা স্বীয় পবিত্রতা ও বংশমর্যাদায় এত সম্মানিত ছিলেন যে, তাহাকে সকলেই 'তাহিরা বা পবিত্রা' উপাধিতে ভূষিত করে। তিনি তাঁহার ব্যবসা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য দক্ষ, ন্যায়পরায়ণ, আমানতদার ও সত্যবাদী বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তির অনুসন্ধান করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে মনোনীত করিলেন এবং প্রচুর মালামাল ও অনেক মূলধনসহ সিরিয়া প্রেরণ করিলেন। সিরিয়া হইতে রাসূলুল্লাহ (স) বাণিজ্য কাফেলাসহ খাদীজা (রা)-এর বাড়িতে পৌছাইয়া আমদানীকৃত সমস্ত মালামাল ও অর্থকড়ি তাঁহাকে যথাযথভাবে বুঝাইয়া দিলেন। এই ব্যবসায়ে খাদীজা (রা) পূর্বের ব্যবসায়ের তুলনায়
অধিক লাভবান হইলেন। সুতরাং অঙ্গীকার অনুযায়ী আনন্দচিত্তে দ্বিগুণের বেশী লভ্যাংশ প্রদান করিয়া তিনি তাঁহাকে ধন্যবাদ জানাইয়া বিদায় করিলেন। অতঃপর খাদীজাতুল কুবরা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর পূত-পবিত্রতা, সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও ন্যায়পরায়ণতায় মুগ্ধ হইয়া তাঁহা সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইতে মনস্থ করেন। সুতরাং খাদীজা (রা) তাঁহার সহচর এবং উভয় পক্ষের আত্মীয়া নাফীসার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (স)-কে বিবাহের প্রস্তাব পাঠান (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৬৪)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00