📄 জীবনের চরম শত্রুদের সহিত ন্যায়সঙ্গত আচরণের অপূর্ব দৃষ্টান্ত
মক্কার কুরায়শগণ রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করিবার চূড়ান্ত নীলনকশা প্রণয়ন করিবার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে তাঁহাকে অবগত করিলেন এবং হিজরতের নির্দেশ দিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত হিজরতের নির্দেশ পাওয়ার পর সিদ্দীকে আকবার (রা)-কে মদীনায় হিজরতের জন্য তৈরি হইতে বলিলেন। এদিকে মক্কার ইয়াহূদী-মুশরিকদের গচ্ছিত আমানত যাহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ছিল তাহা তাহাদের নিকট যথাযথভাবে হস্তান্তর করা অপরিহার্য। আল্লাহর নির্দেশে হিজরত এবং আমানত ও ঋণ ন্যায়সঙ্গত প্রত্যর্পণ করা একই সঙ্গে সম্ভব নহে বলিয়া ন্যায়ের মূর্তপ্রতীক রাসূলুল্লাহ (স) আলী (রা)-কে জীবননাশের আশংকাজনক মুহূর্তে তাঁহার স্থলাভিষিক্ত করিলেন। এদিকে মক্কার কাফির-মুশরিক ইসলাদ্রোহী শত্রুগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর গৃহের চতুর্দিকে ঘেরাও করিয়া উন্মুক্ত তলোয়ার হস্তে প্রভাতের অপেক্ষা করিতেছিল। প্রভাত হইলে তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে তরবারির আঘাতে খণ্ড-বিখণ্ড করিয়া ইসলামের জ্যোতি চিরদিনের জন্য নির্বাপিত করিয়া দিবে। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার নিকট গচ্ছিত তাঁহার জীবনশত্রুদের আমানত ও ঋণ যথাযথ পৌছাইয়া দেওয়ার নিমিত্ত তাঁহার বিছানায় চাঁদর মুড়ি দিয়া আলী (রা)-কে শায়িত করিলেন এবং তিনি
শত্রুদের দৃষ্টি এড়াইয়া নিরাপদে মদীনায় হিজরত করিলেন (আসাহহুস সিয়ার, ই.ফা.বা., পৃ. ১১৭); উসদুল গাবা, ৪খ., পৃ. ১০৩; ওয়াফাউল-ওয়াফা, ১খ., পৃ. ২৩৭)।
📄 জামাতার মুক্তিপণে ন্যায়পরায়ণতা
রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্নেহময়ী কন্যা যয়নব বিনতে খাদীজা (রা)-এর স্বামী আবুল 'আস বদর যুদ্ধে যুদ্ধবন্দী হিসাবে মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট নীত হয়। রাসূলুল্লাহ (স)-এর কন্যা যয়নব (রা) তখন মক্কায় কাফির স্বামীর গৃহে অবস্থান করিতেছিলেন। যখন অন্যান্য যুদ্ধবন্দীদের আত্মীয়-স্বজন নিজেদের লোকদের মুক্তির জন্য মক্কা হইতে মুক্তিপণ মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রেরণ করে তখন যয়নব (রা)-ও স্বীয় স্বামীর মুক্তির জন্য মুক্তিপণ প্রেরণ করেন। এই মুক্তিপণের মধ্যে তাঁহার একটি কণ্ঠহারও ছিল যাহা খাদীজা (রা) তাঁহার বিবাহের সময়ে তাঁহাকে দিয়াছিলেন। ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাতা রাসূলুল্লাহ (স) উহা দেখিয়া আবেগাপ্লুত হইয়া সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলেন, যদি তোমরা ভাল মনে কর তাহা হইলে যয়নব-এর বন্দীকে মুক্তি দাও এবং তাহার প্রেরিত মালামালও ফেরত প্রদান কর। এতদশ্রবণে সকল সাহাবী সম্মত হইয়া তাহাকে মুক্তিপণ ব্যতীত মুক্তি প্রদান করেন। উল্লিখিত ক্ষেত্রে মুক্তিপণ ব্যতীত মুক্তি দেওয়ার পরিপূর্ণ এখতিয়ার থাকা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদের পরামর্শ ও সম্মতির অপেক্ষা করিলেন যাহাতে তাঁহার ন্যায়বিচারের অনুপম আদর্শ উপস্থাপিত হইয়াছে (আসাহহুসিয়ার, পৃ. ১৫১)।
📄 খন্দক (পরিখা) খননে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা
সালমান ফারসী (রা)-এর পরামর্শক্রমে রাসূলুল্লাহ (স) মদীনার পূর্বদিকের পাহাড়ের সম্মুখে এমনভাবে পরিখা খনন করেন যাহাতে মুসলিম বাহিনী পরিখা এবং সালআ পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে নিরাপদে অবস্থান লাভ করে। স্বয়ং সেনাপতি রাসূলুল্লাহ (স) এবং সকল মুহাজির ও আনসার পরিখা খননের কাজ করেন। সময়টি ছিল প্রচণ্ড শীতকাল। সকলেই অনাহারক্লিষ্ট ছিলেন। খাদ্যের কোন সংস্থান ছিল না। একাধারে তিন দিবস পর্যন্ত অনেকে ক্ষুধার্ত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) নিজে পেটে পাথর বাঁধেন। এমন অবস্থায় নিজে মাটি খনন করিয়া নিজে নিজেই মস্তকে উত্তোলন করিয়া বহন করিয়া সরাইতেন। বারাআ ইন্ন 'আযিব (রা) এবং আনাস (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর বক্ষ ও পৃষ্ঠ লোমাবৃত ছিল, তাহা সব মাটিতে আবৃত হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) বলিতেন, হে মহান আল্লাহ! আখিরাতের কল্যাণই হচ্ছে প্রকৃত কল্যাণ। ইহা ছিল এক বিরাট বিপদ। উল্লিখিত ঘটনায় সায়্যিদুল মুরসালীন, রহমাতুল্লিল আলামীন যুদ্ধের সেনানায়ক হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ সেনাদের সহিত কাঁধে কাঁধ মিলাইয়া বৈষম্যবিহীন খননকার্য পরিচালনা করিয়া ন্যায়পরায়ণতার মহান আদর্শ পেশ করিয়াছেন (আসাহ্হুস- সিয়ার, পৃ. ২০০)।
📄 জাহিলী যুগেও ন্যায়ের আদর্শে অধিষ্ঠিত
ইসলাম সত্য ও ন্যায়সঙ্গত, কুফর মিথ্যা, অন্যায় ও পরিত্যাজ্য-আজ এই কথা সর্বজন- স্বীকৃত। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াত লাভের পূর্ব পর্যন্ত এই বক্তব্য এতটা সুস্পষ্ট ছিল না,
কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) আজন্ম ন্যায়পথের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। কখনও কেহ তাঁহাকে বিন্দুমাত্র ন্যায়পথ ও ন্যায়নীতি হইতে বিচ্যুত করিতে পারে নাই যাহার বাস্তব দৃষ্টান্ত নিম্নোক্ত ঘটনাবলী: রাসূলুল্লাহ (স) হযরত খাদীজা (রা)-এর ব্যবসায়িক পণ্য-সামগ্রী লইয়া সিরিয়ার বুসরা বাজারে পৌছিলেন। তৎকালীন আরবে কোন বক্তব্যের সত্যতা প্রতিপাদনে বিভিন্ন দেব-দেবীর নামে শপথ করা হইত যাহা হারাম এবং গর্হিত অন্যায় বটে। বুসরায় ক্রয়-বিক্রয়কালে মূল্য নির্ধারণ লইয়া প্রতিপক্ষের সহিত মতভেদ সৃষ্টি হয়। প্রতিপক্ষের লোকটি তাঁহাকে লাত ও 'উয্যার শপথ করিতে বলিলে তিনি বলেন, আমি কখনও উহাদের শপথ করি না (সীরাত বিশ্বকোষ, ৪খ., পৃ. ২৭৩)।
একবার জনৈক কুরায়শীর গৃহে রাসূলুল্লাহ (স)-কে দাওয়াত দেওয়া হইল। তিনি সময়মত তাহার গৃহে উপস্থিত হইলেন। যথারীতি তাঁহার সম্মুখে বিভিন্ন প্রকার খাবার পরিবেশিত হইল। রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যান্য দেব-দেবীর নামে যবেহকৃত জন্তুর গোশত ভক্ষণ করেন না বলিয়া খাবার গ্রহণ থেকে বিরত ছিলেন (সীরাত বিশ্বকোষ, ৪খ., পৃ ৩০০)।
জাহিলী যুগে কা'বা ঘরে ইসাফ ও নায়লা নামক দুইটি প্রতিমা রাখা ছিল। কাফির মুশরিকরা কা'বা ঘর তাওয়াফ করার সময় এই দুইটি প্রতিমাকে কল্যাণ ও মঙ্গলের উদ্দেশ্যে স্পর্শ করিত। যায়দ ইব্ন হারিছা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (س)-এর সহিত কা'বা ঘর তাওয়াফ করার সময় উক্ত প্রতিমাদ্বয় স্পর্শ করিতে রাসূলুল্লাহ (স) নিষেধ করেন। আমি দ্বিতীয়বার স্পর্শ করিলে রাসূলুল্লাহ (স) আরো কঠোরভাবে নিষেধ করেন (সীরাত বিশ্বকোষ, ৪খ., পৃ. ৩০৬)। উল্লিখিত ঘটনায় প্রতীয়মান হয় যে, তিনি জাহিলী কর্মকাণ্ড হইতে দূরে থাকিয়া ন্যায়ের পথে অধিষ্ঠিত ছিলেন।