📄 কঠিন দুর্ভিক্ষে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা
একবার মক্কায় কঠিন দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। আবু তালিবের অনেক সন্তান ছিল। তাই তাহার পক্ষে তাহাদের সকলের ভরণপোষণ নির্বাহ করা কষ্টসাধ্য ছিল। এইজন্য রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার চাচা আব্বাস (রা)-এর নিকট গেলেন। তিনি ছিলেন বানু হাশিমের সচ্ছল ব্যক্তিদের অন্যতম। ন্যায়পরায়ণতার আধার রাসূলুল্লাহ (স) কঠিন দুর্ভিক্ষের সময় পিতৃব্যের অভাবী সংসারে স্বাচ্ছন্দ্যের আলো জ্বালাইতে আব্বাস (রা)-কে বলিলেন: يا عباس ان اخاك ابا طالب كثير العيال وقد أصاب الناس ما ترى من هذه الازمة فانطلق بنا اليه فتخفف عنه من عياله أخذ من بنيه رجلا وتأخذ أنت رجلا - فنكلهما عنه.
“হে আব্বাস! আপনার ভাই আবূ তালিবের তো অনেক সন্তান। আর এই দুর্ভিক্ষের কারণে মানুষ যে কেমন বিপদগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছে, উহা তো আপনি দেখিতেছেন। তাই চলুন, আমরা তাহার কাছে যাই যাহাতে তাহার কষ্টের ভার আমরা কিছুটা লাঘব করিতে পারি। তাহার সন্তানদের একজনকে আমি গ্রহণ করিব এবং আপনি আরেকজনকে গ্রহণ করিবেন। অতঃপর আমরা তাহাদের তত্ত্বাবধান করিব।” অতঃপর আব্বাস (রা) তাহাতে সায় দেন এবং তাঁহারা উভয়ে আবূ তালিবের নিকট আসিয়া বলেন:
انا نريد ان نخفف عنك من عيالك حتى يتكشف عن الناس ماهم فيه.
"আমরা চাহিতেছি আপনার পরিবারের ভার কিছুটা লাঘব করিতে যে পর্যন্ত না লোকজন সংকট কাটাইয়া উঠে"।
অতঃপর আলী (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) এবং জা'ফার (রা)-কে আব্বাস (রা) নিজ তত্ত্বাবধানে গ্রহণ করিয়া সংকটের সমঅংশীদার হইয়াছিলেন (সীরাত বিশ্বকোষ, ৪খ., পৃ. ৪৮২)।
📄 মেষচারণে ন্যায়সঙ্গত অবদান
মুহাম্মাদ (স)-এর দুধমাতা হালীমা সা'দিয়া (রা)-এর এক পুত্র 'আবদুল্লাহ ইবনুল হারিছ এবং দুই কন্যা আনীসা বিনতুল হারিছ ও খুযামা বিনতুল হারিছ ছিল তাঁহার শৈশবের খেলার সাথী। রাসূলুল্লাহ (স) সুদীর্ঘ চার বৎসর তাঁহার দুধমাতার ক্রোড়ে লালিত-পালিত হইয়াছিলেন। তাঁহার দুধভাই বোনেরা গ্রামপল্লীর অনতিদূরে মেষ চরাইতেন। সার্বিক ক্ষেত্রে সমতা ও সম অংশীদারের প্রতিষ্ঠাতা রাসূলুল্লাহ (স) ন্যায়সঙ্গত কারণেই তাঁহার দুধভাই-বোনের সহিত মাঠে মেষ চরাইতেন। যেহেতু মেষ বা ছাগল চরাইতে তাঁহার দুধভাই-বোনের যেমন কর্তব্য ছিল অদ্রূপ কর্তব্য ছিল তাঁহারও। সেহেতু ন্যায়সঙ্গত কর্তব্যের খাতিরে তিনি ছাগল চরাইতে দুধভাই-বোনের সহিত মাঠে যাইতেন। যেমন তিনি বলেন, তোমরা সর্বাধিক কালো ফলগুলি আহরণ কর। কেননা ঐ ফলগুলিই বেশী সুস্বাদু। আমি শিশুকালে যখন মেষ চরাইতাম তখন কালো ফলগুলি গ্রহণ করিতাম। আমরা বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি মেষ চরাইয়াছেন? তিনি বলিলেন, হাঁ। প্রত্যেক নবীই মেষ চরাইয়াছেন। উল্লিখিত ঘটনা দ্বারা জানা যাইতেছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) ন্যায়পরায়ণতা ও সহমর্মিতা রক্ষা করিতে ভাই-বোনদের সম-অংশীদার হিসাবে মেষ চরাইতেন (সীরাত বিশ্বকোষ, ৪খ., পৃ. ২৩৭-২৪০)।
📄 জীবনের চরম শত্রুদের সহিত ন্যায়সঙ্গত আচরণের অপূর্ব দৃষ্টান্ত
মক্কার কুরায়শগণ রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করিবার চূড়ান্ত নীলনকশা প্রণয়ন করিবার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে তাঁহাকে অবগত করিলেন এবং হিজরতের নির্দেশ দিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত হিজরতের নির্দেশ পাওয়ার পর সিদ্দীকে আকবার (রা)-কে মদীনায় হিজরতের জন্য তৈরি হইতে বলিলেন। এদিকে মক্কার ইয়াহূদী-মুশরিকদের গচ্ছিত আমানত যাহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ছিল তাহা তাহাদের নিকট যথাযথভাবে হস্তান্তর করা অপরিহার্য। আল্লাহর নির্দেশে হিজরত এবং আমানত ও ঋণ ন্যায়সঙ্গত প্রত্যর্পণ করা একই সঙ্গে সম্ভব নহে বলিয়া ন্যায়ের মূর্তপ্রতীক রাসূলুল্লাহ (স) আলী (রা)-কে জীবননাশের আশংকাজনক মুহূর্তে তাঁহার স্থলাভিষিক্ত করিলেন। এদিকে মক্কার কাফির-মুশরিক ইসলাদ্রোহী শত্রুগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর গৃহের চতুর্দিকে ঘেরাও করিয়া উন্মুক্ত তলোয়ার হস্তে প্রভাতের অপেক্ষা করিতেছিল। প্রভাত হইলে তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে তরবারির আঘাতে খণ্ড-বিখণ্ড করিয়া ইসলামের জ্যোতি চিরদিনের জন্য নির্বাপিত করিয়া দিবে। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার নিকট গচ্ছিত তাঁহার জীবনশত্রুদের আমানত ও ঋণ যথাযথ পৌছাইয়া দেওয়ার নিমিত্ত তাঁহার বিছানায় চাঁদর মুড়ি দিয়া আলী (রা)-কে শায়িত করিলেন এবং তিনি
শত্রুদের দৃষ্টি এড়াইয়া নিরাপদে মদীনায় হিজরত করিলেন (আসাহহুস সিয়ার, ই.ফা.বা., পৃ. ১১৭); উসদুল গাবা, ৪খ., পৃ. ১০৩; ওয়াফাউল-ওয়াফা, ১খ., পৃ. ২৩৭)।
📄 জামাতার মুক্তিপণে ন্যায়পরায়ণতা
রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্নেহময়ী কন্যা যয়নব বিনতে খাদীজা (রা)-এর স্বামী আবুল 'আস বদর যুদ্ধে যুদ্ধবন্দী হিসাবে মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট নীত হয়। রাসূলুল্লাহ (স)-এর কন্যা যয়নব (রা) তখন মক্কায় কাফির স্বামীর গৃহে অবস্থান করিতেছিলেন। যখন অন্যান্য যুদ্ধবন্দীদের আত্মীয়-স্বজন নিজেদের লোকদের মুক্তির জন্য মক্কা হইতে মুক্তিপণ মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রেরণ করে তখন যয়নব (রা)-ও স্বীয় স্বামীর মুক্তির জন্য মুক্তিপণ প্রেরণ করেন। এই মুক্তিপণের মধ্যে তাঁহার একটি কণ্ঠহারও ছিল যাহা খাদীজা (রা) তাঁহার বিবাহের সময়ে তাঁহাকে দিয়াছিলেন। ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাতা রাসূলুল্লাহ (স) উহা দেখিয়া আবেগাপ্লুত হইয়া সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলেন, যদি তোমরা ভাল মনে কর তাহা হইলে যয়নব-এর বন্দীকে মুক্তি দাও এবং তাহার প্রেরিত মালামালও ফেরত প্রদান কর। এতদশ্রবণে সকল সাহাবী সম্মত হইয়া তাহাকে মুক্তিপণ ব্যতীত মুক্তি প্রদান করেন। উল্লিখিত ক্ষেত্রে মুক্তিপণ ব্যতীত মুক্তি দেওয়ার পরিপূর্ণ এখতিয়ার থাকা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদের পরামর্শ ও সম্মতির অপেক্ষা করিলেন যাহাতে তাঁহার ন্যায়বিচারের অনুপম আদর্শ উপস্থাপিত হইয়াছে (আসাহহুসিয়ার, পৃ. ১৫১)।