📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শিশু হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর ইনসাফবোধ

📄 শিশু হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর ইনসাফবোধ


হালীমা সা'দিয়া (রা) উল্লেখ করেন, যখনই আমি শিশু মুহাম্মাদকে দুধ পান করাইবার উদ্দেশ্যে কোলে উঠাইয়া লইতাম তখন তাঁহার নিকট উভয় স্তন পেশ করিতাম যেন তিনি তাঁহার পছন্দমত দুধ পান করিতে পারেন। তিনি তৃপ্তি সহকারে (একটি স্তনের) দুধপান করিতেন এবং তাঁহার দুধভাই 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন হারিছ (রা) একই সাথে তাঁহার মায়ের (আমার অপর স্তনের) দুধ তৃপ্তিসহ পান করিতেন। ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) কখনও হালীমা সা'দিয়া (রা)-এর একটি স্তন ছাড়া অন্যটি গ্রহণ করিতেন না। অথচ তিনি তাঁহার উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় স্তনাটও পেশ করিতেন। কিন্তু মুহাম্মাদ (স) উহা গ্রহণ করিতেন না। তিনি যেন অনুভব করিতেন ও জানিতেন যে, হালীমা (রা)-এর স্তনে আরও একজন অংশীদার বিদ্যমান আছে। তিনি ছিলেন সত্য ও ন্যায় তথা ইনসাফ-এর প্রতীক এবং অংশীদারের অংশ প্রদানে, ন্যায়বিচার ও সহমর্মিতা প্রদর্শনে তুলনাহীন (আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, ১খ., পৃ. ১৮৭; ইবন হিশام, সীরাত, ১খ., পৃ. ১৭১ পাদটীকা-১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কিশোর মুহাম্মাদ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা

📄 কিশোর মুহাম্মাদ (স)-এর ন্যায়পরায়ণতা


রাসূলুল্লাহ (স) মাতৃক্রোড় হইতেই ছিলেন তীক্ষ্ণ উপলব্ধি ও ন্যায়বোধসম্পন্ন। পিতামহের মৃত্যুর পর তিনি পিতৃব্য আবূ তালিবের তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হইতেছিলেন। আবূ তালিবের সংসার ছিল বেশ অসচ্ছল। অধিক সন্তান এবং অল্প আয়ের কারণে সংকটের মাঝে তাঁহার সংসার চলিতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বাল্য বয়সেই তাহা ভালভাবে উপলব্ধি করিতে পারিয়াছিলেন। তাঁহার মন ব্যথিত হইয়া উঠিল যে, তাঁহারও তো চাচার সংসারে আয়- উন্নতির ব্যাপারে সহযোগিতা করা উচিত। তিনি কিশোর অবস্থায় উল্লিখিত ন্যায়নীতির প্রতি আগ্রহান্বিত থাকার কারণে পিতৃব্যের সহযোগিতার উদ্দেশ্যে পাহাড়ের আশেপাশে ছাগল চরাইতেন। তাঁহার অর্জিত সামান্য পারিশ্রমিক হয়ত বা চাচা আবু তালিবের বিরাট সংসারে তেমন কোন বড় সাহায্য ছিল না, কিন্তু ইহার দ্বারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর মধ্যে ন্যায়পরায়ণতার আজন্ম চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়াছিল। অপরের অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল না হইয়া বরং নিজের উপার্জিত সামান্য অর্থের উপর জীবন চলার এক অস্বাভাবিক ইনসাফবোধের দৃষ্টান্ত রাসূলুল্লাহ (স)-এর মধ্যে পরিস্ফুটিত হইয়াছে (সাঈদ হাবী, সীরাহ নাবাবিয়াহ্, ১খ., পৃ. ৯; বুখারী, ১খ., কিতাবুল ইজারা, বাবা রা'ইল গানাম, পৃ. ৩০১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ফিজারের যুদ্ধে যুবক মুহাম্মাদ (স)-এর ইনসাফবোধ

📄 ফিজারের যুদ্ধে যুবক মুহাম্মাদ (স)-এর ইনসাফবোধ


জাহিলী যুগেও আরবদের মধ্যে মুহাররাম, রজব, যুল-কা'দা ও যুল-হিজ্জা এই মাস চতুষ্টয়ে সশস্ত্রযুদ্ধ নিষিদ্ধ ছিল। আলোচ্য যুদ্ধ নিষিদ্ধ মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ায় তাহারা ইহার
নামকরণ করে 'হারবুল ফিজার' (পাপের যুদ্ধ, অন্যায় যুদ্ধ)। বিভিন্ন কারণে এই যুদ্ধ চারবার অনুষ্ঠিত হয়। চতুর্থ ফিজার যুদ্ধেই রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পিতৃব্যদের সহিত কোন কোন দিন যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন। আবরাহার হস্তীবাহিনী ধ্বংসের পর এই যুদ্ধই ছিল সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ঘটনা। এই যুদ্ধের এক পক্ষে ছিল কিনানা ও কুরায়শ গোত্র এবং অপর পক্ষে ছিল কায়স আয়লান গোত্র (ছাকীফ ও হাওয়াযিন গোত্রদ্বয়সহ)। কুরায়শ গোত্রের সকল উপগোত্র স্বতন্ত্রভাবে নিজ নিজ বাহিনী গঠন করে। হাশিম উপগোত্রের সামারিক পতাকা বহন করেন যুবায়র ইবন 'আবদুল মুত্তালিব এবং রাসূলুল্লাহ (স) এই বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
হিরা অধিপতি নু'মান ইব্‌ন মুনযির প্রতি বৎসর উকাযের মেলায় নিজের ব্যবসায়িক পণ্যসামগ্রী প্রেরণ করিত। যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার বৎসর হাওয়াযিন গোত্রের উরওয়া আর-রাহহাল নামক এক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি নু'মানের পণ্যসম্ভার উকাষের মেলায় পৌঁছানোর দায়িত্ব গ্রহণ করে। ইহাতে কিনানা গোত্রের বাররাদ ইব্‌ন কায়স ক্ষিপ্ত হইয়া নজদের উচ্চভূমি তায়নান যী-তালাল নামক স্থানে উরওয়াকে হত্যা করে। উকাযের মেলায় কুরায়শদের নিকট উরওয়ার নিহত হওয়ার সংবাদ পৌঁছিলে তাহারা তৎক্ষণাৎ যুদ্ধ না করার উদ্দেশ্যে হারাম এলাকায় রওয়ানা হল এবং হারাম এলাকায় পৌছিবার পূর্বেই হাওয়াযিন গোত্রের সহিত যুদ্ধের সূত্রপাত হয় এবং সারাদিন যুদ্ধ চলিতে থাকে। এই যুদ্ধ একাধারে চারদিন চলে এবং রাসূলুল্লাহ (স) ইয়াওমুশ-শূরব নামে অভিহিত তৃতীয় দিনের যুদ্ধে উপস্থিত হইয়াছিলেন। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া সংঘটিত যুদ্ধে পিতৃব্যের সম্মানার্থে যুবক মুহাম্মাদ (স) যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হইলেও তিনি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই এবং কাহাকেও আঘাত করেন নাই। এই সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ
كُنْتُ أُنَبِّلُ عَلَى أَعْمَامِي أَنْ أَرَدَّ عَنْهُمْ نَبْلَ عَدُوِّهِمْ بِهَا .
"দুশমনদের নিক্ষিপ্ত তীর আমি কুড়াইয়া আনিয়া আমার পিতৃব্যদের হাতে দিতাম।" উল্লিখিত যুদ্ধক্ষেত্রে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে তিনি উপস্থিত হইয়া পিতৃব্যদের নিকট দুশমনদের নিক্ষিপ্ত তীর কুড়াইয়া দিয়াছেন সত্য; কিন্তু এই যুদ্ধ অন্যায় ও অহেতুক বলিয়া ন্যায়পরায়ণ রাসূলুল্লাহ (স) সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হন নাই এবং শত্রুপক্ষের কাহাকেও আঘাত করেন নাই। পরবর্তী কালে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিতেন, আমি যদি এতটুকু অংশ গ্রহণও না করিতাম তবে তাহাই উত্তম হইত। উল্লিখিত বক্তব্য দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যাইতেছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) আজন্ম ইনসাফের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন (সীরাত বিশ্বকোষ, ই.ফা.বা., ৪খ., পৃ. ২৮১-২৮২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 প্রাপ্য পরিশোধে ন্যায়পরায়ণতা

📄 প্রাপ্য পরিশোধে ন্যায়পরায়ণতা


জনৈক পণ্যসামগ্রী বিক্রেতা বিক্রয়ের নিমিত্ত তাহার কিছু দ্রব্য-সামগ্রী লইয়া আসে। আবূ জাহল তাহার নিকট হইতে দ্রব্যসামগ্রী খরিদ করিল, কিন্তু তাহার মূল্য পরিশোধ না করিয়াই তাহাকে বিদায় করিল। গরীব বিক্রেতা অনন্যোপায় হইয়া দারুন- নাদওয়াতে উপস্থিত হইয়া সকলকে সম্বোধন করিয়া বলিল, হে কুরায়শগণ! তোমাদের মধ্যে এমন কেহ আছে কি যে
আবুল হাকামের নিকট হইতে আমার প্রাপ্য আদায় করিয়া দিতে পারিবে? আমি একজন গরীব ফেরিওয়ালা, সে আমার অধিকার আত্মসাৎ করিয়াছে। ঘটনাক্রমে রাসূলুল্লাহ (স) তখন মসজিদে অবস্থান করিতেছিলেন। কুরায়শগণ তামাশা দেখিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি ইঙ্গিত করিয়া বলিল, ঐ ব্যক্তি তোমার প্রাপ্য আদায় করিয়া দিবে।
নবৃওয়াত প্রাপ্তির পর রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত আবূ জাহলের কী ধরনের শত্রুতা ছিল তাহারা তাহা খুব ভাল করিয়াই অবগত ছিল। ইহার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (স)-কে হেয় প্রতিপন্ন ও বিরক্ত করাই ছিল তাহাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। পণ্য বিক্রেতা ইনসাফ পাওয়ার আশায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গমন করিয়া সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করিল এবং আরও বলিল, কুরায়শগণ বলিয়াছে, আপনিই নাকি আমার প্রাপ্য ন্যায়সঙ্গতভাবে আদায় করিয়া দিতে পারিবেন। ন্যায়পরায়ণতার মাইলফলক রাসূলুল্লাহ (স) ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিরস্কারকারীর তিরস্কারের এবং অত্যাচারীর অত্যাচারকে কখনও পরওয়া করিতেন না। তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (স) উক্ত লোককে সঙ্গে লইয়া তাঁহার জীবনশত্রু আবূ জাহলের গৃহে গমন করত তাহার দরজায় খটখট্ করিলেন। তৎক্ষণাৎ আবু জাহল বাহিরে আসিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে সম্বোধন করিয়া গম্ভীর স্বরে বলিলেন, "এই বেচারার প্রাপ্য পরিশোধ করিয়া দাও।” এতদ শ্রবণে আবূ জাহল তৎক্ষণাৎ ফেরিওয়ালার সমুদয় প্রাপ্য পরিশোধ করিয়া দেয়। এইভাবে রাসূলুল্লাহ (স) সর্বক্ষেত্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ছিলেন সুদৃঢ় (আসাহহুস সিয়ার, ই.ফা.বা. অনুবাদ, পৃ. ১০৬-১০৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00