📄 সাহাবায়ে কিরাম (রা)-এর সহিত হাস্যরস
সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর আকস্মিক রসিকতা দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইয়া একবার বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমাদের সাথে হাস্যরসও করিতেছেন? প্রত্যুত্তরে রাসূলে কারীম (স) বলিলেন, আমি রসিকতা করিলেও সত্য কথা ছাড়া কখনও মিথ্যা কথা বলি না। এই প্রসঙ্গে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, একদা কতিপয় সাহাবী (রা) আরয করিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি (রাসূল হইয়াও) আমাদের সহিত রসিকতা করিতেছেন? রাসূলুল্লাহ (স) প্রত্যুত্তরে বলিলেন : (রসিকতা করিলেও) আমি সব সময় সত্য কথা বলিয়া থাকি (মিশকাত, ৩খ., হাদীছ ৪৮৮৫)।
বাস্তবিকপক্ষে আল্লাহর রাসূল (স)-এর জীবনের সমুদয় রসিকতা ও কৌতুকই সত্য ঘটনা ভিত্তিক ছিল।
হযরত আনাস (রা) বলিয়াছেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে বাহনের জন্য কোন জন্তু চাহিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: তোমাকে একটি উটের বাচ্চা দেওয়া হইবে। আবেদনকারী আরয করিল: উটের বাচ্চা দিয়া আমি কি করিব? আমার তো বাহন দরকার। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: প্রতিটি উটই তো কোন না কোন উটের বাচ্চা হইয়া থাকিবে (মিশকাত, ৩খ., হাদীছ ৪৮৮৬)।
জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ (রা) বলিয়াছেন, আমি এক বয়স্ক মহিলাকে বিবাহ করিলাম। ইহার পর আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন: হে জাবির! তুমি কি বিবাহ করিয়াছ? আমি বলিলাম, হাঁ। তিনি বলিলেন, কুমারী না অকুমারী? আমি বলিলাম, অকুমারী। তিনি বলিলেন, তুমি কুমারী বিবাহ করিলে না কেন? তাহা হইলে তুমিও তাহার সহিত ক্রীড়া-কৌতুক করিতে আর সেও তোমার সহিত ক্রীড়া-কৌতুক করিত (আত্-তিরমিযী, ৩খ., পৃ. ৩৭৯)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বিড়াল ছানাকে অত্যন্ত ভালবাসিতেন। রাত্রি বেলা গাছে তুলিয়া দিতেন আর দিনের বেলা গাছ হইতে নামাইয়া খেলা করিতেন। সেইজন্য সকলেই তাঁহাকে আবূ হুরায়রা বা বিড়ালের পিতা নামে সম্বোধন করিত। ইসলাম কবুল করার পর আল্লাহর নবী (স) কৌতুক করিয়া স্নেহমাখা হৃদয়ে 'ইয়া আবা হুরায়রা' (হে বিড়াল ছানার পিতা) নামে সম্বোধন করিতেন। অতঃপর আবূ হুরায়রা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখ নিঃসৃত বাণীর বরকত লাভ করিবার আশায় উক্ত নামকে অত্যন্ত পছন্দ করিয়া নিজের নাম আবূ হুরায়রা গ্রহণ করিলেন (ইবন সা'দ, তাবাকাতুল-কুবরা, ৪খ., পৃ. ৩২৬)।
হযরত ইবন 'আব্বাস (রা) বলেন, এক ব্যক্তি একটি বকরী যবেহ করিবার জন্য মাটিতে শোয়াইয়া দিয়া ছুরিতে শান দিতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহা দেখিয়া তাহাকে হাস্যরসছলে বলিলেন, তুমি কি ইহাকে দুইবার মারিতে চাহিয়াছ? ইহাকে শোয়াইয়া দেওয়ার আগেই কেন তুমি ছুরিতে শানদিলে না (নবীয়ে রহমত, পৃ. ৪৭০)?
একবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে অত্যন্ত গরীব এক সাহাবী আসিয়া বলিয়াছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি ধ্বংস হইয়া গিয়াছি। কেননা নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও আমি রমযানের দিবসে আমার স্ত্রীর সহিত সহবাস করিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার উক্ত অপরাধের জন্য কাফফারাস্বরূপ একটি গোলাম আযাদ করিয়া দিতে বলিলেন। উক্ত ব্যক্তি বলিলেন, আমার কোন গোলাম নাই। অতঃপর রাসূলুল্লাহ! বলিলেন, তাহা হইলে তুমি একাধারে দুই মাস রোযা রাখ। তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (স)। ইহাতেও আমি সক্ষম নহি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহা হইলে ষাটজন মিসকীনকে আহার করাও। উক্ত ব্যক্তি বলিলেন, ইহাতেও আমি সক্ষম নহি। সেই মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে কিছু খেজুর হাদিয়া হিসাবে আসিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, প্রশ্নকারী ব্যক্তিটি কোথায়? এই খেজুরগুলি নিয়া সাদাকা করিয়া দাও। উক্ত ব্যক্তি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার চেয়ে বেশী অভাবগ্রস্থ কে আছে? আল্লাহর তা'আলার কসম! মদীনার উভয় প্রান্তের মধ্যবর্তী স্থানে এমন কোন পরিবার নাই যে, আমাদের চেয়েও বেশি অভাবগ্রস্থ। তখন রাসূলুল্লাহ (স) এমনভাবে মুচকি হাসি দিলেন যে, তাঁহার চোয়ালের দাঁতগুলো পর্যন্ত দেখা গিয়াছিল। অতঃপর তিনি তাহাকে বলিলেন, তাহা হইল তুমিই ইহা খাইয়া লও (বুখারী, হাদীছ ৬০৮, পৃ. ১২৯২)।
যুহায়র ইবন হারাম নামে গ্রামে বসবাসরত একজন সাহাবী ছিলেন। তাঁহার চেহারা সুন্দর ছিল না। তিনি গ্রামের যাবতীয় সামগ্রী তথা তরি-তরকারী, শাক-সবজি রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে পেশ করিতেন। আর বিনিময়ে রাসূলুল্লাহ (স) শহরের খাদ্য বস্তু উপহার স্বরূপ তাহাকে দান করিতেন। এই কারণে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে (যুহায়র) তাহাদের গ্রাম এবং নিজেকে তাঁহার শহর আখ্যায়িত করিতেন। একদিন যুহায়র কোন এক স্থানে দাঁড়াইয়া তাঁহার জিনিসপত্র বিক্রয় করিতেছিলেন। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে আগমন করিয়া তাঁহার পিছন দিকে আসিয়া দুই হাত দ্বারা যুহায়রের কোমর চাপিয়া ধরিলেন যাহাতে তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখিতে না পান। তিনি বলিলেন, আরে কে? আমাকে ছাড়িয়া দাও। কিন্তু যখন আড়চোখে রাসূলুল্লাহ (س)-কে দেখিতে পাইলেন তখন নিজের কোমর ইচ্ছাপূর্বক পিছনে ঠেলিয়া দিয়া রাসূলুল্লাহ (س)-এর বুকের সহিত লাগাইয়া দিলেন। তখন মহানবী (স) রসিকতা করিয়া বলিলেন: এই গোলামটি ক্রয় করিবার জন্য কেউ আছ কি? যুহায়র বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে বিক্রয় করিলে খুব কম মূল্য পাইবেন। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, না, না। আল্লাহ তা'আলার নিকট তোমার দাম কম নয়, অনেক বেশি (মিশকাত, ৩খ., হাদীছ ৪৮৮৮)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরষ আগমন করিতেন। একবার রাসূলুল্লাহ (س)-এর দরবারে জনৈকা বৃদ্ধা মহিলা উপস্থিত হইয়া আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার জন্য দু'আ করিবেন যেন আল্লাহ তা'আলা আমাকে জান্নাতে দাখিল করেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে রসিকতা করিয়া বলিলেন: জান্নাতে বৃদ্ধ মহিলা দাখিল হইতে পারিবে না। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এহেন (কৌতুকপূর্ণ) বক্তব্য শুনিয়া মহিলাটি কাঁদিতে কাঁদিতে বাড়ি
ফিরিয়া যাইতে লাগিল। তখন রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে আদেশ করিলেন, তোমরা যাইয়া বুড়ীকে বুঝাইয়া দাও যে, জান্নাতে কেহই বার্ধক্য অবস্থায় দাখিল হইবে না বরং আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে প্রবেশের পূর্বে সকল জান্নাতী মহিলাকে যুবতী (কুমারী) বানাইয়া দিবেন। কেননা আল্লাহ তা'আলা কুরআন শরীফে ঘোষণা করিয়াছেন, 'আমি এই মহিলাদেরকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করিয়াছি। তাহাদেরকে কুমারী করিয়াছি' (৫৬ : ৩৫-৩৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৫৪)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর সময় দূর-দূরান্তের পথে যাতায়াতের একমাত্র বাহন ছিল উট, ঘোড়া, গাধা ইত্যাদি প্রাণী। একদা রাসূলুল্লাহ (স) কোথাও সফরে বাহির হইয়াছিলেন। সফরসঙ্গী হিসাবে তাঁহার কতিপয় সহধর্মিনীও ছিলেন। তাঁহাদের বাহনের পরিচালক ছিল আনজাশা নামক এক যুবক। সে অত্যন্ত চমৎকার সুরেলা কাণ্ঠের অধিকারী ছিল। তাহার সুরেলা আবৃত্তিতে উট দ্রুত গতিতে ছুটিয়া চলিত। মহিলা যাত্রীদের ইহাতে কষ্ট হইত। এই অবস্থা দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) আন্ন্জাশাকে লক্ষ্য করিয়া হাস্যরস ছলে বলিলেন, হে আনজাশা! একটু ধীরে চালাও। তোমার আরোহীরা যেন কাঁচ (আল-আদাবুল-মুফরাদ, ২খ., পৃ. ৭)।
গ্রন্থপঞ্জীঃ (১) আল-কুরআনুল-কারীম, স্থা, ৩৩ : ২১; ৫৬ : ৩৫-৩৬, ৬৪;৪; (২) আল-বুখারী, আস-সাহীহ, দারুস-সালাম, রিয়াদ, ১ম সং, সউদী আরব ১৯৯৭ খৃ., পৃ. ১২৭৬, ৯৪, ১২৯২; (৩) আল-খাতীব আত্-তাবরীযী, মিশকাতুল-মাসাবীহ, আল-মাকতাবুল ইসলামী, বৈরূত, লেবানন ১৯৮৫ খৃ., ৩য় সং, ৩খ., পৃ. ১৩৬৯, ১৩৭০; (৪) ইবন সা'দ, আত্-তাবাকাতুল-কুরা, দার সাদির, বৈরুত, লেবানন, তা.বি., ৪খ., ৮খ., পৃ. ৩২৫, ২২৪; (৫) ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, দার ইহয়াইত্-তুরাছিল আরাবী, বৈরূত, লেবানন ১৯৯২ খৃ., ১ম সং, নং ৫খ., পৃ. ৫২, ৫৪; (৬) আত্-তিরমিযী, সুনানুত-তিরমিযী, অনু. ই.ফা.বা. ১৯৯৫ খৃ., ৩খ., পৃ. ৩৭৯; (৭) আল-বুখারী, আল-আদাবুল-মুফরাদ, অনু. ই. ফা. বা. ১৯৯৪ খৃ., ২খ., পৃ. ১১, ৯, ৭; (৮) আল-ইসফাহানী, আখলাকুন্-নবী, স. অনু. ই.ফা. বা., ১৯৯৪ খৃ., পৃ. ২০; (৯) আবুল হাসান আলী নদবী, নবীয়ে রহমত, স. অনু. আবু সাঈদ মুহাম্মাদ ওমর আলী, মজলিশে নাশরিয়াত-ই ইসলাম, ঢাকা ও চট্টগ্রাম ১৯৯৭ খৃ., ১ম সং, পৃ. ৪৭৩; (১০) আল্লামা শিবলী নো'মানী, সীরাতুন-নবী (স), অনু. মাওঃ মুহিউদ্দীন খান, মদীনা পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০০০ খৃ., ৭ম সং, পৃ. ৭৪১)।
মুহাম্মদ জয়নুল আবেদীন খান