📄 কিশোরীদের সাথে কৌতুক
৪। রাসূলে কারীম (স)-এর দরবারে একবার হাবশী মেয়ে উম্মে খালিদ তাহার পিতা খালিদ ইব্ন সাঈদ (রা)-এর সাথে উপস্থিত হইল। তাহার পরিধানে ছিল ধূসর বর্ণের একটি জামা, যাহা দেখিয়া রাসূলে কারীম (স) খুব প্রশংসা করিলেন। হাক্কায় 'হুসনা'-কে 'সানাহ' বলা হয়। সেইহেতু রাসূলে কারীম (স) কৌতূহলবশে উক্ত মেয়েটিকে 'সানাহ' বলিয়া সম্বোধন করিলেন (বুখারী, হাদীছ ৫৯৯৩, পৃ. ১২৭৬)।
অপর একটি ঘটনায় বর্ণিত আছে যে, রাসূলে কারীম (স)-এর দরবারে কাপড় বণ্টন করিবার সময় দুই দিকে সুন্দর আঁচলযুক্ত একটি কালো রঙের ছোট চাঁদর পাওয়া গিয়াছিল। তিনি সাহাবায়ে কিরামকে জিজ্ঞাসা করিলেন: এই চাঁদরটি কাহাকে দেওয়া যায়? সকলেই চুপ করিয়া রহিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, উম্মে খালিদকে নিয়া আস। তাহাকে আনিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে নিজ হাতে সেই চাঁদরটি পরাইয়া দিলেন এবং বলিলেন, বড় মানাইয়াছে তোমাকে। পুরাতন না হওয়া পর্যন্ত ব্যবহার করিবে কেমন! ইহা কি 'সানাহ' (সুন্দর) নয়?
উহার সাথে নিম্নোক্ত ঘটনার মিল পাওয়া যায়। উম্মে খালিদ ইব্ন সাঈদ (রা) বলিয়াছেন, একবার আমি আমার পিতা খালিদ ইব্ন সাঈদ (রা)-এর সহিত রাসূলে কারীম (স)-এর দরবারে আসিয়াছিলাম। আর আমার গায়ে ছিল ধুসর বর্ণের জামা। অতঃপর রাসূলে কারীম (স) জামাটি দেখিয়া বলিলেন: সানাহ! সানাহ! (সুন্দর! সুন্দর!)।
আবদুল্লাহ (রা) বলিয়াছেন, হাবশী ভাষায় 'সানাহ' বলিতে 'হাসানাহ' (সুন্দর)-কে বুঝাইয়া থাকে। উম্মে খালিদ বলিয়াছেন, অতঃপর আমি রাসূলে কারীম (স)-এর মাহরে নবৃওয়াত নিয়া খেলা করিতে লাগিলাম। আমার পিতা 'মাহরে নবৃওয়াত' নিয়া খেলা করিতে নিষেধ করিলেন। রাসূলে কারীম (স) বলিলেন: উম্মে খালিদকে মাহরে নবৃওয়াত নিয়া খেলা করিতে দাও (বুখারী, পৃ. ১২৭৬)।
📄 দুথমাতার সাথে হাস্যরস
উম্মে আয়মান (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সর্বপ্রথম দাত্রী অর্থাৎ জন্মগ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ (স) সর্বপ্রথম উম্মে আয়মান (রা)-এর বুকের দুধ পান করিয়াছিলেন। সেইহেতু তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর দুধমাতা। তিনি একবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে সওয়ারীর উপযুক্ত একটি উট চাহিতে আসিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সাথে মুচকি হাসিয়া বলিয়াছিলেন, ঠিক আছে, আপনাকে একটি উটের বাচ্চা দেওয়া হইবে। তখন দুধমাতা বলিয়াছিলেন, আমি উটের বাচ্চা দিয়া কি করিব? উহা তো আমাকে বহন করিতে পারিবে না। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ছোট বড় সব উটই তো কোন না কোন উটের বাচ্চা হইবে (ইবন সা'দ, তাবাকাতুল কুবরা, ৮খ., পৃ. ২২২)।
📄 উন্মুহাতুল মু'মিনীনের সাথে হাস্যরস
হযরত নু'মান ইব্ন বাশীর (রা) বলিয়াছেন, হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর ঘরে প্রবেশ করিবার অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। তখন ঘরের অভ্যন্তরে পারিবারিক কোন ব্যাপারে বাক-বিতণ্ডার কারণে তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর কণ্ঠের উপর 'আইশা সিদ্দীকা (রা)-এর উচ্চকণ্ঠ শ্রবণ করিলেন। অতঃপর আবূ বকর সিদ্দীক (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর ঘরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া আইশা সিদ্দীকা (রা)-কে উচ্চকণ্ঠের কারণে শাসন করিতে যাইয়া চড় মারিতে উদ্যত হইলেন এবং বলিলেন, আমি দেখিলাম তোমার কণ্ঠ রাসূলুল্লাহ (স)-এর কন্ঠের উপর শোনা যাইতেছে। তখন রাসূলুল্লাহ (স) 'আইশা সিদ্দীকা (রা)-কে আড়াল করিয়া তাহাকে (আবু বকর সিদ্দীক (রা)-কে) বাঁধা দিয়াছিলেন যাহাতে তাহাকে চড় মারিতে না পারেন। আর তৎক্ষণাৎ আবু বকর সিদ্দীক (রা) রাগান্বিত অবস্থায় বাহির হইয়া গিয়াছিলেন। অতঃপর যখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) বাহির হইয়া গিয়াছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (রা) 'আইশা সিদ্দীকা (রা)-কে প্রাণবন্ত ভাষায় রসময় কণ্ঠে বলিলেন: দেখিয়াছ, কিভাবে তোমাকে ঐ ব্যক্তিটির হাত হইতে মুক্তি দিয়াছি। কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর পুনরায় হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাহিয়া দেখিলেন, তাঁহারা স্বামী-স্ত্রী পরস্পর অত্যন্ত আন্তরিকতাসম্পন্ন। সেহেতু তাঁহাদেরকে লক্ষ্য করিয়া তিনি বলিলেন, আমি কী আপনাদের আনন্দ-ঘন মুহূর্তে প্রবেশ করিতে পারি যেমন সেই দিন আপনাদের বাক-বিতণ্ডা ও ক্রোধের সময় প্রবেশ করিয়াছিলাম? অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) প্রত্যুত্তরে বলিলেন: আমাদের অভিব্যক্তি তো এমনটিই ছিল। আমাদের প্রত্যাশা তো এমনটিই ছিল। অর্থাৎ আমরা আশা করিয়াছিলাম, আপনি আমাদের আনন্দঘন মুহূর্তে আসিয়া শরীক হইবেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৫২)।
হযরত 'আইশা সিদ্দীকা (রা) বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমার হুজরার দরজায় দাঁড়াইয়াছিলেন। হাবশী লোকেরা তখন মসজিদে নববীতে যুদ্ধের কসরত দেখাইতেছিল। আমিও দাঁড়াইয়া তাহাদের কসরত দেখিতেছিলাম। তখন তিনি আমাকে তাঁহার চাঁদর দ্বারা
আড়াল করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন এবং যে পর্যন্ত আমি সেখান হইতে সরিয়া না আসিয়াছি তখন পর্যন্ত তিনি সেইখানে দাঁড়াইয়াছিলেন। হযরত 'আইশা সিদ্দীকা (রা) বলিলেন, তোমরা অনুমান কর তো, একজন অল্পবয়সী বালিকার খেলাধূলার প্রতি কতখানি আগ্রহ থাকিতে পারে এবং তিনি কত দীর্ঘ সময় পর্যন্ত (কষ্ট সহ্য করিয়া আমাকে আনন্দ উপভোগ করিবার জন্য) তখন সেখানে দাঁড়াইয়াছিলেন (আখলাকুন-নবী, পৃ. ২০)।
একদা হযরত আইশা সিদ্দীকা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে রসিকতা করিলেন। তখন তাঁহার মাতা (আইশা (রা)-এর মাতা) বলিলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই পরিবারের কোন কোন রসিকতা কিনানা গোত্র হইতে আসিয়াছে। নবী করীম (স) বলিলেন, আমাদের একটি মূর্তমান রসিকতা তো ঐ গোত্র হইতেই আসিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) এখানে তদীয় প্রিয়তমা 'আইশা (রা)-কে মূর্তমান রসিকতা বলিয়া অভিহিত করিয়া তাঁহার প্রতি তদীয় প্রাণঢালা সোহাগের অভিব্যক্তি করিলেন (আল-আদাবুল মুফরাদ, ২খ., পৃ. ৯)।
একদিন রাসূলুল্লাহ (স) হাস্যরস ছলে 'আইশা সিদ্দীকা (রা)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করিলেন। 'আইশা (রা) তখন অত্যন্ত হাল্কা-পাতলা ছিলেন। তিনি আগে চলিয়া গিয়াছিলেন। কিছু কাল পর তাঁহার শরীর ভারী হইয়া গেল। তখন পুনরায় দৌড় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হইল। এইবার রাসূলুল্লাহ (স) বিজয়ী হইলেন। অতঃপর বলিলেন, ইহা ঐ দিনের প্রতিশোধ (সীরাতুন-নবী, অনু. মুহিউদ্দীন খান, পৃ. ৭৪১)।
📄 মেয়ে-জামাতার সাথে হাস্যরস
রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচাত ভাই এবং জামাতা ছিলেন হযরত আলী (রা)। একদিন রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সন্ধানে হযরত ফাতিমা (রা)-এর গৃহে পদার্পণ করিলেন এবং হাস্যরসছলে তাঁহার মেয়েকে বলিলেন, আমার চাচাত ভাই কোথায়? তখন আলী (রা) মসজিদে কাত হইয়া শুইয়াছিলেন। তাঁহার শরীরে মাটি লাগিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) তথায় গমন করিয়া তাঁহার মাটি ঝাড়িয়া দিতে দিতে বলিলেন: ওঠ হে আবূ তুরাব। ওঠ, হে আবূ তুরাব! ইহা সম্পর্কে নিম্নোক্ত হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
হযরত সাহল ইবন সা'দ (রা) বলিয়াছেন, রাসূলে কারীম (স) ফাতিমা (রা)-এর ঘরে আসিলেন, কিন্তু আলী (রা)-কে ঘরে পাইলেন না। তিনি ফাতিমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আমার চাচাত ভাই কোথায়? তিনি বলিলেন, আমার ও তাঁহার মধ্যে কিছু ঘটিয়াছে। তিনি আমার সাথে অভিমান করিয়া বাহিরে চলিয়া গিয়াছেন। আমার ঘরে দ্বিপ্রহরের বিশ্রামও করেন নাই। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) এক ব্যক্তিকে বলিলেন, দেখিয়া আস সে কোথায়। ঐ ব্যক্তি সন্ধান করিয়া আসিয়া বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি মসজিদে শুইয়া আছেন। রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে গমন করিলেন। তখন আলী (রা) কাত হইয়া শুইয়াছিলেন। তাঁহার শরীরে মাটি লাগিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার শরীরের মাটি ঝাড়িতে ঝাড়িতে বলিলেন, ওঠ হে আবূ তুরাব। ওঠ হে আবূ তুরাব! (মুকাম্মাল বুখারী, হাদীছ ৪৪১, পৃ. ৯৪, ১ম সং)।