📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রণাঙ্গনে অপরিসীম ধৈর্যাবলম্বন

📄 রণাঙ্গনে অপরিসীম ধৈর্যাবলম্বন


উহুদ যুদ্ধে মারাত্মক আহত হওয়া সত্ত্বেও চরম ধৈর্য ৮৯
হুনায়নের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ধৈর্য ৯১
সচ্চরিত্রে ধৈর্যাবলম্বন ৯২
ধৈর্য সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাণী ৯৩
page_008.jpg
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার দাঁতের প্রতি ইশারা করিয়া বলেন, যে সম্প্রদায় তাহাদের নবীর সহিত এইরূপ অন্যায় আচরণ করিল তাহাদের উপর আল্লাহ্ তা'আলা মারাত্মক ক্রোধান্বিত হইয়াছেন। আল্লাহ্ তা'আলা সেই ব্যক্তির উপর স্বীয় ক্রোধ অধিক পতিত করেন যেই ব্যক্তিকে আল্লাহ্র রাস্তায় স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) হত্যা করেন (সাহীহুল-বুখারী, কিতাবুল-মাগাযী, বাব মা-আসাবান্নাবিষ্যু (স) মিনাল জিরাহি ইয়াওমা উহুদিন, বাব নং ২৪, হাদীছ নং ৪০৭৩)।
'আবদুল্লাহ ইব্‌ন 'আব্বাস (রা) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা সেই ব্যক্তির উপর কঠিন রাগান্বিত হন যাহাকে রাসূলুল্লাহ (স) স্বয়ং আল্লাহ্র রাস্তায় হত্যা করিয়াছেন। অনুরূপভাবে সেই জাতির উপর আল্লাহ্ তা'আলা মারাত্মক ক্রোধান্বিত হন যাহারা স্বীয় নবীর মুখমণ্ডলকে রক্তাক্ত করিয়া দিয়াছে (পূর্বোক্ত, হাদীছ নং ৪০৭৪)।
উপরিউক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় ইবন হাজার আসকালানী বলেন, আওযা'ঈ-এর সূত্রে উল্লেখ হইয়াছে যে, তিনি বলেন-আমাদের নিকট এই সংবাদ পৌঁছিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) উহুদ যুদ্ধে আহত হইয়া একটি বস্তুদ্বারা স্বীয় রক্ত মুছিতেছিলেন ও বলিতেছিলেন, যদি ইহা হইতে সামান্য পরিমাণ রক্ত মাটিতে পড়ে তাহা হইলে আসমান হইতে তোমাদের উপর আযাব নাযিল হইবে। অতঃপর বলিলেন, হে আল্লাহ্! আমার জাতিকে আপনি ক্ষমা করিয়া দিন, কেননা ইহারা অজ্ঞ (ফাতহুল-বারী, হাদীছ নং ৪০৭৪-এর ব্যাখ্যা)।
বদর যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আহত হওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সাহল ইবন সা'দ (রা) বলেন, ভালভাবে জানিয়া রাখ, আল্লাহ্র কসম! আমি অবশ্যই জানি, রাসূলুল্লাহ (স)-এর
ক্ষতস্থান কে ধৌত করিয়া দিয়াছিল এবং কে সেইখানে পানি ঢালিয়াছিল এবং কিসের দ্বারা উহার চিকিৎসা করা হইয়াছিল? তিনি বলেন, নবী-কন্যা ফাতিমা (রা) ক্ষতস্থান ধৌত করিয়া দিতেন এবং আলী (রা) ঢালের সাহায্যে উহার উপর পানি ঢালিতেন। এক পর্যায়ে ফাতিমা (রা) ইহা লক্ষ্য করিলেন যে, পানি ঢালার দ্বারা রক্ত না কমিয়া আরও বৃদ্ধি পাইতেছে তখন একটি পুরাতন চাটাইয়ের টুকরা পোড়াইয়া উহার ছাই ক্ষতস্থানে লাগাইলে রক্ত বন্ধ হইয়া যায়। সেই দিন রাসূলুল্লাহ (স)-এর কর্তনদন্ত ভাঙ্গিয়া যায়, চেহারা মুবারক বিক্ষত হয় এবং লোহার টুপি ভাঙ্গিয়া মাথায় বিদ্ধ হয় (সাহীহুল বুখারী, পূর্বোক্ত কিতাব ও বাব, হাদীছ নং ৪০৭৫)।
আনাস (রা) বলেন, উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখের সামনের পাটির দাঁত ভাঙ্গিয়া গেল এবং মাথায় লোহা ভাঙ্গিয়া ঢুকিয়া পড়িলে তিনি রক্ত মুছিতেছিলেন এবং বলিতেছিলেন, সেই জাতি কীভাবে সফল হইতে পারে যাহারা স্বীয় নবীকে আহত করিয়াছে, তাঁহার কর্তনদন্ত ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছে অথচ তিনি তাহাদিগকে আল্লাহর পথে ডাকিতেছিলেন? তখন আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেন لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْء "এই বিষয়ে তোমরা করণীয় কিছুই নাই" (৩: ১২৮; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল-জিহাদি ওয়াস্-সিয়ার, কিতাব নং ৩২, বাব নং ৩৭, হাদীছ নং ১০৪, ১৭৯১)।
ইবন ইসহাক উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আহত হওয়ার বর্ণনা দান করিয়া বলেন, শত্রুপক্ষ অনন্যোপায় হইয়া এক পর্যায়ে অতর্কিতে মুসলিম বাহিনীর উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল। আর উহা ছিল মুসলমানদিগের জন্য অগ্নিপরীক্ষার দিবস। আল্লাহ্ তা'আলা সেই দিন কতক মুসলমানকে শাহাদাতের সূধা পান করাইয়া সম্মানিত করিয়াছেন। এমনকি শত্রুরা রাসূলুল্লাহ (স) পর্যন্ত পৌঁছিতে সক্ষম হইয়াছিল এবং তাঁহার উপর পাথর নিক্ষেপ করিয়া আঘাত হানিলে তাঁহার দন্ত মুবারক আহত হইল, মুখমণ্ডলে পাথর বিদ্ধ হইল এবং ঠোঁট ক্ষত-বিক্ষত হইয়া গেল। তাঁহাকে হামলাকারী সেই পাপিষ্ঠের নাম ছিল উতবা ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস।
ইবন ইসহাক আনাস ইবন মালিক (রা)-এর সূত্রে উল্লেখ করিয়াছেন, উহুদ যুদ্ধের রাসূলুল্লাহ (স)-এর কর্তনদন্ত ভাঙ্গিয়া যায় এবং চেহারা মুবারকে পাথর বিদ্ধ হইয়া রক্ত গড়াইয়া পড়িতে লাগিলে তিনি রক্ত মুছিতেছিলেন ও বলিতেছিলেন, যেই জাতি স্বীয় নবীর মুখমণ্ডল রক্তাক্ত করিয়াছে, অথচ তিনি তাহাদিগকে তাহাদের প্রতিপালকের প্রতি আহ্বান করিতেছিলেন, সেই জাতি কিভাবে সফল হইতে পারে? তখন আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াত অবতীর্ণ করিলেন:
لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٍ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظُلِمُونَ "তিনি তাহাদের প্রতি ক্ষমাশীল হইবেন অথবা তাহাদিগকে শাস্তি দিবেন, এই বিষয়ে তোমার করণীয় কিছুই নাই; কারণ তাহারা যালিম” (৩: ১২৮)।
ইবন হিশাম বলেন, রুবায়হ্ ইবন 'আন্দির রহমান আবূ সাঈদ খুদরী (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন, উতবা ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-কে লক্ষ্য করিয়া (তীর)
নিক্ষেপ করিলে তাঁহার নীচ পাটির ডান কর্তনদন্তখানি ভাঙ্গিয়া যায় এবং নীচ ঠোঁটে যখম হয়। এতদ্ব্যতীত আবদুল্লাহ ইব্‌ন শিহাব যুহরী এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর কপালে (তীর) বিদ্ধ করে এবং ইব্‌ন কামিয়াহ্ তাঁহার গালের উপরিভাগে যখম করিলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর লৌহবর্মের দুইটি লোহা তাঁহার গালের উপরিভাগে ঢুকিয়া পড়ে এবং তিনি একটি গর্তের ভিতর পড়িয়া যান, যেই গর্তসমূহ আবূ আমের এইজন্যই খনন করিয়াছিল যেন মুসলিম বাহিনী অজান্তে এই গর্তে পড়িয়া যায়।
অতঃপর 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাত ধরিলেন এবং তালহা ইবন 'উবায়দুল্লাহ্ তাঁহাকে উঠাইলে তিনি সোজা হইয়া দাঁড়াইলেন। মালিক ইবন সিনান ও আবূ সা'ঈদ খুদরী (রা) উভয়ে নিজ নিজ জিহ্বার সাহায্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চেহারা মুবারক হইতে রক্ত মুছিয়া গিলিয়া ফেলিলেন। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমার রক্ত যাহার রক্তের সহিত মিশ্রিত হইয়াছে তাহাকে জাহান্নামের অগ্নি স্পর্শ করিবে না।
ইবন হিশাম বলেন, আবদুল আযীয ইব্‌ন মুহাম্মাদ আদ-দারাওয়ারদী উল্লেখ করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, কেহ যদি পৃথিবীতে বিচরণকারী যিন্দা শহীদ দেখিতে চায় সে যেন তালহা ইবন 'উবায়দিল্লাহকে দেখিয়া লয়। আদ্‌-দারাওয়ারদী আবূ বকর সিদ্দীক (র)-এর সূত্রে আরও উল্লেখ করিয়াছেন যে, আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ্ রাসূলুল্লাহ (স)-এর চেহারা মুবারকে বিদ্ধ হওয়া দুইটি লৌহ আংটা হইতে একটিকে যখন বাহির করিলেন তখন তাঁহার একটি দাঁত পড়িয়া গেল। ইহার পর যখন দ্বিতীয় আংটাটি বাহির করিলেন তখন তাঁহার আরেকটি দাঁত পড়িয়া গেল। এইভাবে তাঁহার দুইটি দাঁতই পড়িয়া যায় (ইবন হিশাম, আস্-সীরাহ আন্-নাবাবিয়্যা, গাযওয়াতু উহুদ, মা লাকিয়াহুর রাসূলু ইয়াওমা উহুদ, ৩খ., পৃ. ৮৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 উহুদ যুদ্ধে মারাত্মক আহত হওয়া সত্ত্বেও চরম ধৈর্য

📄 উহুদ যুদ্ধে মারাত্মক আহত হওয়া সত্ত্বেও চরম ধৈর্য


আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার দাঁতের প্রতি ইশারা করিয়া বলেন, যে সম্প্রদায় তাহাদের নবীর সহিত এইরূপ অন্যায় আচরণ করিল তাহাদের উপর আল্লাহ্ তা'আলা মারাত্মক ক্রোধান্বিত হইয়াছেন। আল্লাহ্ তা'আলা সেই ব্যক্তির উপর স্বীয় ক্রোধ অধিক পতিত করেন যেই ব্যক্তিকে আল্লাহ্র রাস্তায় স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) হত্যা করেন (সাহীহুল-বুখারী, কিতাবুল-মাগাযী, বাব মা-আসাবান্নাবিষ্যু (স) মিনাল জিরাহি ইয়াওমা উহুদিন, বাব নং ২৪, হাদীছ নং ৪০৭৩)।
'আবদুল্লাহ ইব্‌ন 'আব্বাস (রা) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা সেই ব্যক্তির উপর কঠিন রাগান্বিত হন যাহাকে রাসূলুল্লাহ (স) স্বয়ং আল্লাহ্র রাস্তায় হত্যা করিয়াছেন। অনুরূপভাবে সেই জাতির উপর আল্লাহ্ তা'আলা মারাত্মক ক্রোধান্বিত হন যাহারা স্বীয় নবীর মুখমণ্ডলকে রক্তাক্ত করিয়া দিয়াছে (পূর্বোক্ত, হাদীছ নং ৪০৭৪)।
উপরিউক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় ইবন হাজার আসকালানী বলেন, আওযা'ঈ-এর সূত্রে উল্লেখ হইয়াছে যে, তিনি বলেন-আমাদের নিকট এই সংবাদ পৌঁছিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) উহুদ যুদ্ধে আহত হইয়া একটি বস্তুদ্বারা স্বীয় রক্ত মুছিতেছিলেন ও বলিতেছিলেন, যদি ইহা হইতে সামান্য পরিমাণ রক্ত মাটিতে পড়ে তাহা হইলে আসমান হইতে তোমাদের উপর আযাব নাযিল হইবে। অতঃপর বলিলেন, হে আল্লাহ্! আমার জাতিকে আপনি ক্ষমা করিয়া দিন, কেননা ইহারা অজ্ঞ (ফাতহুল-বারী, হাদীছ নং ৪০৭৪-এর ব্যাখ্যা)।
বদর যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আহত হওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সাহল ইবন সা'দ (রা) বলেন, ভালভাবে জানিয়া রাখ, আল্লাহ্র কসম! আমি অবশ্যই জানি, রাসূলুল্লাহ (স)-এর
ক্ষতস্থান কে ধৌত করিয়া দিয়াছিল এবং কে সেইখানে পানি ঢালিয়াছিল এবং কিসের দ্বারা উহার চিকিৎসা করা হইয়াছিল? তিনি বলেন, নবী-কন্যা ফাতিমা (রা) ক্ষতস্থান ধৌত করিয়া দিতেন এবং আলী (রা) ঢালের সাহায্যে উহার উপর পানি ঢালিতেন। এক পর্যায়ে ফাতিমা (রা) ইহা লক্ষ্য করিলেন যে, পানি ঢালার দ্বারা রক্ত না কমিয়া আরও বৃদ্ধি পাইতেছে তখন একটি পুরাতন চাটাইয়ের টুকরা পোড়াইয়া উহার ছাই ক্ষতস্থানে লাগাইলে রক্ত বন্ধ হইয়া যায়। সেই দিন রাসূলুল্লাহ (স)-এর কর্তনদন্ত ভাঙ্গিয়া যায়, চেহারা মুবারক বিক্ষত হয় এবং লোহার টুপি ভাঙ্গিয়া মাথায় বিদ্ধ হয় (সাহীহুল বুখারী, পূর্বোক্ত কিতাব ও বাব, হাদীছ নং ৪০৭৫)।
আনাস (রা) বলেন, উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখের সামনের পাটির দাঁত ভাঙ্গিয়া গেল এবং মাথায় লোহা ভাঙ্গিয়া ঢুকিয়া পড়িলে তিনি রক্ত মুছিতেছিলেন এবং বলিতেছিলেন, সেই জাতি কীভাবে সফল হইতে পারে যাহারা স্বীয় নবীকে আহত করিয়াছে, তাঁহার কর্তনদন্ত ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছে অথচ তিনি তাহাদিগকে আল্লাহর পথে ডাকিতেছিলেন? তখন আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেন لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْء "এই বিষয়ে তোমরা করণীয় কিছুই নাই" (৩: ১২৮; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল-জিহাদি ওয়াস্-সিয়ার, কিতাব নং ৩২, বাব নং ৩৭, হাদীছ নং ১০৪, ১৭৯১)।
ইবন ইসহাক উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আহত হওয়ার বর্ণনা দান করিয়া বলেন, শত্রুপক্ষ অনন্যোপায় হইয়া এক পর্যায়ে অতর্কিতে মুসলিম বাহিনীর উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল। আর উহা ছিল মুসলমানদিগের জন্য অগ্নিপরীক্ষার দিবস। আল্লাহ্ তা'আলা সেই দিন কতক মুসলমানকে শাহাদাতের সূধা পান করাইয়া সম্মানিত করিয়াছেন। এমনকি শত্রুরা রাসূলুল্লাহ (স) পর্যন্ত পৌঁছিতে সক্ষম হইয়াছিল এবং তাঁহার উপর পাথর নিক্ষেপ করিয়া আঘাত হানিলে তাঁহার দন্ত মুবারক আহত হইল, মুখমণ্ডলে পাথর বিদ্ধ হইল এবং ঠোঁট ক্ষত-বিক্ষত হইয়া গেল। তাঁহাকে হামলাকারী সেই পাপিষ্ঠের নাম ছিল উতবা ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস।
ইবন ইসহাক আনাস ইবন মালিক (রা)-এর সূত্রে উল্লেখ করিয়াছেন, উহুদ যুদ্ধের রাসূলুল্লাহ (স)-এর কর্তনদন্ত ভাঙ্গিয়া যায় এবং চেহারা মুবারকে পাথর বিদ্ধ হইয়া রক্ত গড়াইয়া পড়িতে লাগিলে তিনি রক্ত মুছিতেছিলেন ও বলিতেছিলেন, যেই জাতি স্বীয় নবীর মুখমণ্ডল রক্তাক্ত করিয়াছে, অথচ তিনি তাহাদিগকে তাহাদের প্রতিপালকের প্রতি আহ্বান করিতেছিলেন, সেই জাতি কিভাবে সফল হইতে পারে? তখন আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াত অবতীর্ণ করিলেন:
لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٍ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظُلِمُونَ "তিনি তাহাদের প্রতি ক্ষমাশীল হইবেন অথবা তাহাদিগকে শাস্তি দিবেন, এই বিষয়ে তোমার করণীয় কিছুই নাই; কারণ তাহারা যালিম” (৩: ১২৮)।
ইবন হিশাম বলেন, রুবায়হ্ ইবন 'আন্দির রহমান আবূ সাঈদ খুদরী (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন, উতবা ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-কে লক্ষ্য করিয়া (তীর)
নিক্ষেপ করিলে তাঁহার নীচ পাটির ডান কর্তনদন্তখানি ভাঙ্গিয়া যায় এবং নীচ ঠোঁটে যখম হয়। এতদ্ব্যতীত আবদুল্লাহ ইব্‌ন শিহাব যুহরী এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর কপালে (তীর) বিদ্ধ করে এবং ইব্‌ন কামিয়াহ্ তাঁহার গালের উপরিভাগে যখম করিলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর লৌহবর্মের দুইটি লোহা তাঁহার গালের উপরিভাগে ঢুকিয়া পড়ে এবং তিনি একটি গর্তের ভিতর পড়িয়া যান, যেই গর্তসমূহ আবূ আমের এইজন্যই খনন করিয়াছিল যেন মুসলিম বাহিনী অজান্তে এই গর্তে পড়িয়া যায়।
অতঃপর 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাত ধরিলেন এবং তালহা ইবন 'উবায়দুল্লাহ্ তাঁহাকে উঠাইলে তিনি সোজা হইয়া দাঁড়াইলেন। মালিক ইবন সিনান ও আবূ সা'ঈদ খুদরী (রা) উভয়ে নিজ নিজ জিহ্বার সাহায্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চেহারা মুবারক হইতে রক্ত মুছিয়া গিলিয়া ফেলিলেন। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমার রক্ত যাহার রক্তের সহিত মিশ্রিত হইয়াছে তাহাকে জাহান্নামের অগ্নি স্পর্শ করিবে না।
ইবন হিশাম বলেন, আবদুল আযীয ইব্‌ন মুহাম্মাদ আদ-দারাওয়ারদী উল্লেখ করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, কেহ যদি পৃথিবীতে বিচরণকারী যিন্দা শহীদ দেখিতে চায় সে যেন তালহা ইবন 'উবায়দিল্লাহকে দেখিয়া লয়। আদ্‌-দারাওয়ারদী আবূ বকর সিদ্দীক (র)-এর সূত্রে আরও উল্লেখ করিয়াছেন যে, আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ্ রাসূলুল্লাহ (স)-এর চেহারা মুবারকে বিদ্ধ হওয়া দুইটি লৌহ আংটা হইতে একটিকে যখন বাহির করিলেন তখন তাঁহার একটি দাঁত পড়িয়া গেল। ইহার পর যখন দ্বিতীয় আংটাটি বাহির করিলেন তখন তাঁহার আরেকটি দাঁত পড়িয়া গেল। এইভাবে তাঁহার দুইটি দাঁতই পড়িয়া যায় (ইবন হিশam, আস্-সীরাহ আন্-নাবাবিয়্যা, গাযওয়াতু উহুদ, মা লাকিয়াহুর রাসূলু ইয়াওমা উহুদ, ৩খ., পৃ. ৮৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হুনায়নের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ধৈর্য

📄 হুনায়নের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ধৈর্য


'আব্বাস (রা) বলেন, হুনায়নের যুদ্ধে আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত অংশগ্রহণ করিলাম। সেইখানে আমি ও আবূ সুফ্যান ইবন আল-হারিছ রাসূলুল্লাহ (স)-কে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত বেষ্টন করিয়া রাখিয়াছিলাম। ফারওয়া ইব্‌ নুফাছা আল-জুযামী রাসূলুল্লাহ (স)-কে একটি খচ্চর হাদিয়া দিয়াছিলেন। তিনি উহার উপর উপবিষ্ট ছিলেন। মুসলিম ও কাফির বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হইলে মুসলমানগণ পিছন দিকে হটিতে আরম্ভ করিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) কাফিরদের অভিমুখে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। আব্বাস (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খচ্চরের লাগাম ধরিয়া রাখিয়াছিলাম। খচ্চরটি দ্রুত আগে না বাড়ার জন্য আমি উহাকে বাধা দিতেছিলাম আর আবূ সুফ্যান রাসূলুল্লাহ (স)-এর পাদানি ধরিয়া রাখিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হে 'আব্বাস! সামুরাওয়ালাদিগকে আহ্বান কর (হুদায়বিয়ায় যে বৃক্ষের নিচে যুদ্ধের বায়'আত অনুষ্ঠিত হইয়াছিল উহাকে সামুরা বলা হইত বিধায় তাঁহাদিগকে সামুরাওয়ালা বলিয়া সম্বোধন করিয়াছিলেন)। 'আব্বাস (রা) অত্যন্ত উচ্চ আওয়াজের অধিকারী ছিলেন। তিনি বলেন, আমি সর্বোচ্চ আওয়াজে বলিলাম, সামুরাওয়ালারা
কোথায়? তিনি বলেন, আল্লাহ্র কসম! আমার আওয়াজ শোনামাত্র তাঁহাদের মধ্যে এমনই ভাবাবেগের সৃষ্টি হইল যেইরূপ ভাবাবেগ হইয়া থাকে গাভীর স্বীয় বাচ্চার উপর। সুতরাং তাঁহারা বলিয়া উঠিলেন-ইয়া লাব্বায়ক, ইয়া লাব্বায়ক, হাজির, হাজির। এই বলিয়া তাঁহারা কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িলেন।
অনুরূপভাবে আনসারদিগকে আহ্বান করা হইল, ইয়া মা'শারাল আনসার! ইয়া মা'শারাল আনসার! হে আনসারবর্গ, হে আনসারবর্গ! বর্ণনাকারী বলেন, ইহার পর আনসারদিগকে একেকটি গোত্র হিসাবে ডাকা হইল, যেমন হে আল-হারিছ ইব্‌ন আল-খাযরাজ বংশের লোকেরা! হে হারিছ ইব্‌ন খাযরাজ গোত্রের সদস্যবর্গ!
এইভাবে সকলেই যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িলে রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় সাদা খচ্চরে থাকিয়া মাথা উঁচু করিয়া যুদ্ধের অবস্থা লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, এখন শুরু হইয়াছে যুদ্ধ। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তিনি এক মুষ্টি কংকর লইয়া কাফিরদিগের চেহারায় নিক্ষেপ করিয়া বলিলেন, মুহাম্মাদের পালনকর্তার কসম! ইহারা (কাফিররা) পরাজয় বরণ করিয়াছে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর আমি যুদ্ধের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিলে আমার মনে হইল যে, যুদ্ধ বুঝি এখনও আপন অবস্থায়ই রহিয়াছে। কিন্তু আল্লাহ্র কসম! রাসূলুল্লাহ (স)-এর কংকরসমূহ নিক্ষেপ করার পর হইতে আমি দেখিতেছিলাম যে, তাহাদের শক্তি ক্রমশ নিস্তেজ হইয়া পড়িয়াছে এবং তাহারা পলায়ন করিয়াছে (মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, বাব ফী গাযওয়াতি হুনায়ন, বাব নং ২৮, হাদীছ নং ১৭৭৫)।
আবূ ইসহাক বলেন, কায়স গোত্রের জনৈক ব্যক্তি বারাআ (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিল, আপনারা কি হুনায়ন যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-কে রাখিয়া ময়দান হইতে পালায়ন করিয়াছিলেন? বারাআ (রা) বলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) পালায়ন করেন নাই। হাওয়াযিন গোত্র অতর্কিতে হামলা চালাইয়াছিল। আমরা তাহাদের উপর পাল্টা আক্রমণ চালাইলে তাহারা ময়দান ছাড়িয়া পালাইয়া যায়। অতঃপর আমরা গনীমতের মাল সংগ্রহ করিতে আরম্ভ করিলে তাহারা অতর্কিত হামলা চালায় (ইহাতে মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িল)। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি লক্ষ্য করিলাম, তিনি স্বীয় খচ্চরে উপবিষ্ট আছেন, আবু সুফয়ান ইব্‌ন হারিছ উহার লাগাম ধরিয়া আছেন। এমতাবস্থায় তিনি বলিতেছিলেন, أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِبٌ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِب "মিথ্যা নয়, আমি সত্যই নবী, আমি আবদুল মুত্তালিবের প্রপৌত্র” (প্রাগুক্ত, হাদীছ নং ১৭৭৫-এর শেষ বর্ণনা)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সচ্চরিত্রে ধৈর্যাবলম্বন

📄 সচ্চরিত্রে ধৈর্যাবলম্বন


আনাস (রা) বলেন, আমি ক্রমাগত দশটি বৎসর রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমত করিয়াছি। (এই দীর্ঘদিন যাবত) তাঁহার শরীর হইতে আতরের সুঘ্রাণ পাইয়াছি। তাঁহার মুখে যেইরূপ সুঘ্রাণ বিরাজ করিত অনুভব করিয়াছি সেইরূপ অন্য কাহারো মুখে অনুভব করি নাই। কোন সাহাবী তাঁহার সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আসিয়া দাঁড়াইয়া থাকিলে তিনি (সাক্ষাত না দিয়া) তাহার নিকট হইতে মুখ ফিরাইয়া লইতেন না। কোন সাহাবী সাক্ষাতের সময়ে মুসাফাহার
উদ্দেশ্যে হাত বাড়াইলে তিনিও স্বীয় হস্ত বাড়াইয়া দিতেন। অতঃপর সেই সাহাবী আগে হাত না সরাইলে তিনি সরাইতেন না। অনুরূপভাবে কোন সাহাবী কানে কানে কথা বলিতে চাহিলে স্বীয় কর্ণ তাহার প্রতি বাড়াইয়া দিতেন। অতঃপর নিজের কান আগে সরাইতেন না যতক্ষণ না সাহাবী মুখ ফিরাইত (আখলাকুন্নাবী, বাব মা যুকিরা মিন হুস্মি খুলুকি' রাসূলিল্লাহ (স), হাদীছ নং ১৮)।
উম্মুল মু'মিনীন 'আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কখনও কাহাকেও প্রহার করেন নাই। নিজস্ব কোন খাদেমকেও প্রহার করেন নাই এবং তাঁহার কোন সহধর্মিণীকেও কখনও মারধর করেন নাই। তাঁহার প্রতি কেহ অন্যায় আচরণ করিলে যতক্ষণ পর্যন্ত উহাতে আল্লাহ্র কোন অমোঘ বিধান লঙ্ঘন না হইত ততক্ষণ পর্যন্ত উহার প্রতিশোধ গ্রহণ করিতেন না। হাঁ, আল্লাহ্ হুকুম লঙ্ঘন হইলে নিশ্চয়ই তিনি প্রতিশোধ লইতেন। অপর বর্ণনায় রহিয়াছে, তাঁহাকে দুইটি বিষয়ের মধ্যে স্বাধীনতা দেওয়া হইলে গুনাহ না হওয়া সাপেক্ষে তিনি সর্বদা তুলনামূলক সহজ-সরল বিষয়টিই অবলম্বন করিতেন। তবে উহার মধ্যে গুনাহের লেশ মাত্র থাকিলে তাহা হইতে সবচাইতে বেশী দূরে থাকিতেন (মুসলিম, কিতাবুল ফাদাইল, বাবু মুবা'আদাতিহী (স) লিল-আছাম, বাব নং ২০, হাদীছ নং ৭৯ (২৩২৮) ও ৭৮ (২৩২৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00