📄 স্ত্রীগণের ব্যবহারে ধৈর্য
হযরত আনাস (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার কোন এক স্ত্রীর ঘরে অবস্থানরত ছিলেন। অপর এক স্ত্রীর একটি বরতনে তাঁহার জন্য কিছু খাদ্যদ্রব্য হাদিয়া পাঠাইলে সেই বিবি খাদেমের হাতে প্রহার করিলে পাত্রটি পড়িয়া দুই টুকরা হইয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (স) উভয় টুকরাকে পাশাপাশি মিলাইয়া ইতস্তত বিক্ষিপ্ত খাদ্যসমূহ উঠাইতে লাগিলেন ও বলিতেছিলেন: তোমাদের মায়ের আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত লাগিয়াছে, তোমরা খাইয়া ফেল। ইহাতে উপস্থিত খাদেম সাহাবীগণ খাবারটুকু খাইয়া ফেলিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) পাত্রটি ধরিয়া পূর্বের বিবির ঘরে আসিলেন এবং উহার পরিবর্তে একটি ভাল পাত্র বাহকের নিকট হস্তান্তর করিলেন আর ভাঙ্গা পাত্রটি যিনি ভাঙ্গিয়াছেন তাহার ঘরে রাখিয়া দিলেন (সুনান নাসাঈ, কিতাবু ইশরাতিন্নিসা, বাবুল গায়রাত)।
হযরত উম্মু সালামা (রা) বলেন, একদা তিনি স্বীয় বরতনে করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার সাহাবীগণের জন্য কিছু খাদ্যদ্রব্য লইয়া আসিলেন। ইত্যবসরে হযরত 'আইশা (রা) একটি চাদরে আপাদমস্তক আবৃত করিয়া ঔষধ পেষণের একটি পাথর লইয়া আসিলেন ও উহার সাহায্যে বরতনটি টুকরা টুকরা করিয়া ফেলিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বিক্ষিপ্ত টুকরাসমূহ একত্র করিতে লাগিলেন ও দুইবার বলিলেন, তোমাদের মায়ের আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত লাগিয়াছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) হযরত 'আইশা হইতে একটি ভাল বরতন লইয়া হযরত উম্মু সালামার নিকট পাঠাইয়া দিলেন এবং ভাঙ্গা পাত্রটি হযরত 'আইশাকে দিলেন (প্রাগুক্ত)।
'আইশা (রা) বলেন, কখনও এইরূপ হইত যে, রাসূলুল্লাহ (স) যায়নাব বিন্ত জাহশের ঘরে অবস্থানকালে মধু পান করিতেন। একবার আমি ও হাফসা (রা) এই মর্মে একজোট হইলাম যে, আমাদের মধ্য হইতে যাহার ঘরেই তিনি আসিবেন সে বলিবে, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি কি মাগাফির (এক প্রকারের দুর্গন্ধযুক্ত আঠাল খাদ্যবিশেষ) খাইয়াছেন? আমি তো আপনার মুখ হইতে উহার দুর্গন্ধ অনুভব করিতেছি! অতঃপর এমনই হইল। আমাদের মধ্য হইতে একজনের ঘরে তিনি প্রবেশ করিলে সে বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি কি মাগাফির আহার করিয়াছেন? আমি তো আপনার মুখ হইতে উহার দুর্গন্ধ পাইতেছি! রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, না, বরং আমি যায়নাব বিন্ত জাহশের গৃহে মধু পান করিয়াছি। আর কখনও উহা পান করিব না। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ
يأَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكَ .
"হে নবী! আল্লাহ্ তোমার জন্য যাহা বৈধ করিয়াছেন তুমি তাহা নিষিদ্ধ করিতেছ কেন" (৬৬:১)? ও এই আয়াত ان تتوبا إلى الله "যদি তোমরা উভয়ে অনুতপ্ত হইয়া আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর" (৬৬:৪)। (এই আয়াতখানা) আইশা ও হাফসা সম্পর্কেই অবতীর্ণ হইয়াছে এবং এই আয়াত وَاذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَى بَعْضٍ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا (স্মরণ কর, নবী তাহার স্ত্রীদিগের একজনকে গোপনে কিছু বলিয়াছিল)। রাসূলুল্লাহ (স) যখন বলিলেন, আমি মাগাফির খাই নাই বরং মধু পান করিয়াছি তখন এই আয়াত নাযিল হয় (প্রাগুক্ত)।
উম্মুল মু'মিনীন মায়মূনা (রা) বলেন, এক রাত্রে রাসূলুল্লাহ (স) আমার নিকট হইতে বাহির হইলে আমি দরজা বন্ধ করিয়া দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি ফিরিয়া আসিয়া দরজা খুলিতে বলিলে আমি অস্বীকার করিলাম। তিনি আমাকে কসম দিয়া বলিলেন, দরজা খোল। ইহাতে আমি বলিলাম, আমার পালার রাত্রিতে আপনি অন্য স্ত্রীর ঘরে চলিয়া যাইতে চাহেন। তিনি বলিলেন, না, আমি তাহা করি নাই; বরং পেশাবের প্রয়োজন হইয়াছিল (আল-মুস্তাদরাক, কিতাবু মা'রিফাতিস্ সাহাবা, তামমিয়াতু আওয়াজি রাসূলিল্লাহ (স), যিকরু উম্মিল মু'মিনীন মায়মূনা বিনতিল হারিছ (রা), ৪/৩২, ২৩৯৮/৬৮০০)।
'আইশা (র) বলেন, একদা সাওদা আমাকে দেখিতে আসিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) আসিয়া আমার ও তাঁহার মাঝখানে বসিলেন। আমি হারীরা নামক এক প্রকার সুস্বাদু খাদ্য তৈয়ার করিয়া অনিয়া বলিলাম, আহার করুন। সাওদা অস্বীকৃতি জানাইলে আমি বলিলাম, হয় খাইবেন, না হয় আমি ইহা আপনার চেহারায় মাখাইয়া দিব। ইহাতেও তিনি সম্মত না হইলে আমি পাত্র হইতে কিছুটা খাদ্য লইয়া তাঁহার চেহারায় মাখাইয়া দিলাম। এই দৃশ্য দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) হাসিয়া দিলেন এবং স্বীয় পা তাহার কোল হইতে তুলিয়া নিয়া বলিলেন, তুমিও তাহার চেহারায় একইভাবে মাখাইয়া দাও। ইহাতে তিনি খানিকটা খাবার লইয়া আমার মুখমণ্ডলে মাখাইয়া দিলেন। এইদিকে রাসূলুল্লাহ (স) হাসিতেছিলেন। উমার (রা) আমাদের নিকটবর্তী রাস্তা দিয়া হে আবদুল্লাহ্! হে আবদুল্লাহ্! বলিয়া কাহাকেও ডাকিতে ডাকিতে যাইতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) এই ভাবিয়া যে, হযরত 'উমার (রা) ঘরে আসিবেন আমাদিগকে বলিলেন : তোমরা যাও ও আপন আপন চেহারা ধৌত কর। 'আইশা বলেন, ইহার পর হইতে আমি 'উমারকে ভয় করি। কেননা রাসূলুল্লাহ (স) স্বয়ং তাঁহাকে শ্রদ্ধা করিতেন (বুগয়াতুর রায়িদ ফী তাহক্বীকি মাজমাইয যাওয়াইদ, কিতাবুন্নিকাহ্, বাব ইশরাতিন্নিসা, ৪খ., পৃ. ৫৭৮; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৭০)।
'আইশা (রা) বলেন, এক সফরে আমার সামান ছিল হালকা আর তাহাও ছিল একটি দ্রুতগামী উটের পিঠে। পক্ষান্তরে সাফিয়্যার সামান ছিল ভারী ও তাঁহার উটটি ছিল ধীর গতিসম্পন্ন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (স) সঙ্গীদিগকে বলিলেন, 'আইশার আসবাব আনিয়া সাফিয়্যার উটে রাখ এবং সাফিয়্যার আসবাব 'আইশার (রা) উটে রাখ যেন বাহন সুন্দরভাবে চলিতে পারে। আমি বলিলাম, হে আল্লাহ্র বান্দারা! এই ইয়াহুদী মেয়েটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিষয়ে আমাদের উপর বিজয়ী হইল। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আয় 'আব্দুল্লাহ্র মা! তোমার সামান হালকা আর সাফিয়্যার সামান হইল ভারী যাহার দরুন চলিতে বিলম্ব হইতেছে।
📄 অসুস্থতায় ও প্রিয়জনদের মৃত্যুতে ধৈর্যধারণ
এইজন্য তাহার সামান তোমার উটে ও তোমার জামান তাহার উটে পরিবর্তন করিয়া দিয়াছি। 'আইশা (রা) বলেন, আমি বলিলাম, আপনি কি নিজেকে আল্লাহর রাসূল বলিয়া বিশ্বাস করেন না? ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) হাসিয়া দিলেন ও বলিলেন, হে আবদুল্লাহ্ মা। আমার মধ্যেও কি সন্দেহ হইতে পারে? 'আইশা বলেন, আমি বলিলাম, যদি আপনি নিজেকে নবী বলিয়া বিশ্বাস করেন তাহা হইলে কেন আপনি ইনসাফ করিলেন না? আবু বকর (রা) আমার কথা শুনিতে পাইলেন। তিনি একজন তেজস্বী মানুষ ছিলেন। তিনি আগাইয়া আসিয়া আমার মুখে চপেটাঘাত করিলেন। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, থামুন, হে আবু বকর! এত তাড়াহুড়া করিবেন না। তিনি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি শুনিয়াছেন সে কী বলিয়াছে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন মেয়েরা উপত্যকার উপর হইতে নিম্নভূমি দেখিতে পায় না (অর্থাৎ ভাল-মন্দের মধ্যে পার্থক্য করিতে পারে না) (প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৩২২; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৭১, আল-বাবুস্ সাবিউ ফী হুসনি খুলוקিহী)।
অসুস্থতায় ও প্রিয়জনদের মৃত্যুতে ধৈর্যধারণ আবু সা'ঈদ খুদরী (রা) বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে অসুস্থ পাইলাম। তাঁহার গায়ে একটি চাদর ছিল। আমি চাদরের উপরে হাত রাখিয়া গরম অনুভব করিয়া বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনার জ্বর কত তীব্র! তিনি বলিলেন, নবীগণের উপর মুসীবত খুবই তীব্র হইয়া থাকে আর ইহার প্রতিদানও দ্বিগুণ হইয়া থাকে। অতঃপর আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! কোন্ ব্যক্তিকে সবচাইতে কঠিন বিপদ দেওয়া হয়? তিনি বলিলেন, নবীগণকে। আমি বলিলাম, অতঃপর কাহাকে? বলিলেন, আলিমগণকে। বলিলাম, ইহার পর কাহাকে? বলিলেন, নেককারদিগকে। অতঃপর তিনি বলেন, পূর্বেকার নেককার লোকদের মধ্য হইতে কাহাকেও উকুনের দ্বারা মুসীবত দেওয়া হইয়াছিল, এমনকি উকুন তাহাকে মারিয়া ছাড়িয়াছিল। কাহাকেও দারিদ্র্যের বিপদে ক্লিষ্ট করা হইয়াছিল, এমনকি পরিধানের জন্য শুধু একটি চাদর ব্যাতীত অন্য কিছুই মিলিত না। তাহাদের মধ্যে অনেকে এমনও ছিলেন যে, এতসব কঠিন মুসীবত পাইয়াও এতখানি খুশী হইতেন যত্নস্থানি তোমাদের অনেকেই নেয়ামত পাইয়া আনন্দিত হয় (আত্-তারগীব ওয়াত-তারহীব, কিতাবুল জানাইয ওয়ামা ইয়াতাকাদ্দামুহা, আত্-তারগীব ফিস্-সাবরি, হাদীছ নং ৪৮৯০)।
ইব্ন মাস'উদ (রা) বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রবেশ করিয়া দেখিলাম তিনি অসুস্থ। আমি তাঁহার শরীরে হাত রাখিয়া বলিলাম, আপনার রোগের প্রকোপ তো খুবই তীব্র? তিনি বলিলেন, হাঁ, আমি তোমাদের মত দুইজন ব্যক্তির সমপরিমাণ প্রকোপ ভোগ করিয়া থাকি। আমি বলিলাম, ইহা কি এইজন্য যে, আপনার প্রতিদান দ্বিগুণ হইয়া থাকে। বলিলেন, হাঁ, কোন মুসলমান যদি বিপদগ্রস্ত হয়, তাহা অসুস্থতাজনিত হউক বা অন্য কোন কারণেই হউক, ইহাতে তাঁহার গুনাহসমূহ এমনভাবে ঝরিয়া যায় যেমনভাবে বৃক্ষ হইতে শুকনা পত্র ঝরিয়া পড়ে (প্রাগুক্ত, হাদীছ নং ৪৯৩৩)।
আনাস (রা) বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে লৌহকার আবূ সায়ফ-এর বাড়িতে গেলাম। আবূ সায়ফ ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর পুত্র ইব্রাহীমের স্তন্যদানকারিনী মহিলার স্বামী। রাসূলুল্লাহ (স) ইব্রাহীমকে লইয়া চুম্বন করিলেন ও তাঁহাকে নাকের সাথে মিলাইলেন। ইহার পর অন্য একদিন আমি তাঁহার সঙ্গে সেই বাড়িতে গেলাম। তখন ইব্রাহীমের অন্তিম অবস্থা ছিল। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চক্ষুদ্বয় হইতে অশ্রু ঝরিতে আরম্ভ করিলে আবদুর রহমান ইবন 'আওফ (রা) তাঁহাকে বলিলেন, এই অবস্থায় আপনিও ক্রন্দন করিয়া থাকেন? বলিলেন, হে 'আওফের পুত্র! বরং ইহা হইল কোমল হৃদয় ও দয়ার বহিঃপ্রকাশ। ইহার পর তাঁহার চক্ষু হইতে পুনর্বার অশ্রু আসিলে বলিলেন, চক্ষু অশ্রুসজল ও অন্তর ব্যথিত হইতেছে। কিন্তু আমরা এইরূপ কোন বাক্য উচ্চারণ করিব না যাহাতে আল্লাহ্ অসন্তুষ্ট হইয়া যান। আমরা শুধু এতখানি বলিতে চাহি যে, হে ইবরাহীম! আমরা তোমার বিচ্ছেদে ব্যথিত (বুখারী, কিতাবুল জানাইয, বাব কাওলিন্নাবিয়্যি (স) ইন্নাবিকা লামাহযুনূন, বাব নং ৪৩, হাদীছ নং ১৩০৩)।
'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বলেন, সা'দ ইবন 'উবাদা (রা) অসুস্থতাজনিত কারণে চরম দুর্বল হইয়া পড়িলে 'আবdur রহমান ইবন 'আওফ, সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস ও 'আবদুল্লাহ্ ইবন মাস'উদ (রা)-এর সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স)-ও তাঁহাকে দেখিতে আসিলেন। তিনি তাঁহার নিকট প্রবেশ করিয়া দেখিতে পাইলেন যে, পরিবারের লোকজন তাঁহাকে বেষ্টন করিয়া আছে। তিনি বলিলেন, সা'দ কি দুনিয়া হইতে চলিয়া গিয়াছে? তাহারা বলিল, না ইয়া রাসূলাল্লাহ! তখন রাসূলুল্লাহ (স) কাঁদিয়া ফেলিলেন। উপস্থিত লোকজন তাঁহাকে কাঁদিতে দেখিয়া নিজেরাও কাঁদিয়া ফেলিল। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা কি ইহা শ্রবণ কর নাই যে, আল্লাহ্ তা'আলা চক্ষুর অশ্রু ও হৃদয়ের চিন্তার কারণে শান্তিদান করেন না? বরং জিহ্বার প্রতি ইঙ্গিত করিয়া বলেন, ইহার কারণে, অথবা অনুগ্রহ করিয়া থাকেন। আর ইহাও জানিয়া রাখা আবশ্যক যে, মৃত ব্যক্তিকে তাহার পরিবারের কান্নার কারণে শাস্তি দেওয়া হইয়া থাকে। এইরূপ মাতম করিয়া কান্নাকাটি করিলে উমার (রা) লাঠি দিয়া প্রহার করিতেন, পাথর নিক্ষেপ করিতেন ও মাটি ছিটাইয়া দিতেন (প্রাগুক্ত, বাবুল বুকা' 'ইনদাল-মারীদ, বাব নং ৪৪, হাদীছ নং ১৩০৪)। উল্লেখ্য যে, মৃত ব্যক্তি কান্নাকাটি করার ওসিয়াত করিয়া থাকিলেই কেবল সে শান্তিপ্রাপ্ত হইবে।
'আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট যায়দ ইব্ন হারিছা, জা'ফার ও আবদুল্লাহ ইন্ন রাওয়াহা (রা)-এর শাহাদতের সংবাদ আসিয়া পৌছিলে তিনি দুঃখিত ও মর্মাহত হইয়া বসিয়া পড়েন। আমি দরজার কিনারা দিয়া উঁকি মারিলে তাঁহার চেহারায় মারাত্মক দুঃখিত হওয়ার লক্ষণ দেখা যায় (প্রাগুক্ত, বাব মা য়ুনহা মিনান্নাওহি ওয়াল-বুকাই, বাব নং ৪৫, হাদীছ মং ১৩০৫)।
আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) একদল কারী সাহাবাকে একটি সারিয়্যায় প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাঁহারা বি'র মা'উনা নামক স্থানে শাহাদাত বরণ করিলে রাসূলুল্লাহ (স) এতখানি দুঃখিত হইয়াছিলেন যে, আর কখনও তাঁহাকে এত দুঃখিত হইতে আমি দেখি নাই (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৮খ., পৃ. ৩৫৫, আল-বাবুছ ছালিছ ফী হুন্নিহী ওয়া বুকায়িহী)।
📄 জীবনোপকরণের দৈন্যতায় ধৈর্য
আনাস (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর এক কন্যার মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাঁহার কবরে নামিতে দেখিয়াছি। তখন তাঁহার উভয় চক্ষু হইতে অশ্রু প্রবাহিত হইতে আমি লক্ষ্য করিয়াছি (প্রাগুক্ত, কিতাবুল জানাইয, বাব মান ইয়াদখুলু কণবরাল মারআতি, বাব নং ৭২, হাদীছ নং ১৩৪২)।
'আইশা (রা) বলেন, 'উছমান ইব্ন মায্'উন (রা)-এর ইন্তিকালের পর আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখিয়াছি যে, তিনি তাঁহাকে চুম্বন করিয়াছেন তখন তাঁহার চক্ষুদ্বয় হইতে অশ্রু ঝরিতেছিল, এমনকি অশ্রু তাঁহার মুখ-মণ্ডলে গড়াইয়া পড়িতে আমি লক্ষ্য করিয়াছি (তিরমিযী, আবওয়াবুল জানায, বাবু মা জা'আ ফী তাকবীলিল মায়িয়ত, বাব নং ১৩, হাদীছ নং ৯৯৪)।
জীবনোপকরণের দৈন্যতায় ধৈর্য 'উমার (রা) বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর ঘরে প্রবেশ করিয়া দেখি তিনি একটি চাটাইয়ে কাত হইয়া শুইয়া রহিয়াছেন। তাঁহার পার্শ্বদেশে চাটাইয়ের বুননের অনুরূপ চিহ্ন পরিদৃষ্ট হইতেছে। আমি মাথা উঁচু করিয়া সম্পূর্ণ ঘরখানা লক্ষ্য করিলাম, আল্লাহ্র কসম, এমন কোন জিনিস সেইখানে পাই নাই যাহাতে দৃষ্টি নিবদ্ধ হইতে পারে। শুধু ঝুলন্ত তিনটি চামড়া, আর স্তূপীকৃত কিছু যব দেখা গিয়াছিল। এই দৃশ্য দেখিয়া আমার দুইটি চক্ষু হইতে অশ্রু ঝরিতে আরম্ভ করিল। রাসূলুল্লাহ (স) ইহা লক্ষ্য করিতে পারিয়া বলিলেন, উমার! তোমার কী হইয়াছে ? বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি হইলেন সমগ্র সৃষ্টিকূলের মধ্যে আল্লাহ্ তা'আলার মনোনীত ও শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। কিসরা ও কায়সার অবর্ণনীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দে দিনাতিপাত করিতেছে? এই কথা শোনামাত্র তাঁহার চেহারার রঙ রক্তবর্ণ হইয়া গেল। তিনি শোয়া হইতে উঠিয়া বসিয়া পড়িলেন ও বলিলেন, হে 'উমার! এই বিষয়ে তুমি কি এখনও সন্দিহান রহিয়াছ? অতঃপর বলিলেন, হে 'উমার! জানিয়া রাখ, আল্লাহ্ তা'আলা ঐসমস্ত লোককে পার্থিব জীবনেই যাবতীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দান করিয়া তাহাদের পাওনা শেষ করিয়া দেন। তুমি কি ইহাতে সন্তুষ্ট নও যে, তাহাদের শুধু দুনিয়া মিলিবে আর আমাদের জন্য নির্ধারিত থাকিবে আখেরাত? আমি বলিলাম, নিশ্চয় ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আল্লাহ্ তা'আলার শুকরিয়া আদায় করিতেছি। অন্য বর্ণনায় রহিয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন, হে 'উমার! আমি যদি চাহিতাম যে, সুউচ্চ পাহাড়সমূহ স্বর্ণে রূপান্তরিত হইয়া আমার সঙ্গে সঙ্গে চলুক, তাহা হইলে অবশ্যই চলিত (সুবুলুল-হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৭খ., পৃ. ৭৭, বাব নং ১৬, ফী যুহদিহী ফিদ্-দুনয়া)।
'আবদুল্লাহ্ ইব্ন 'আব্বাস (রা) বলেন, একদিন দ্বিপ্রহরে আবূ বকর (রা) মসজিদে আগমন করিলেন। উমার (রা) ইহা জানিতে পারিয়া তিনিও আসিলেন ও আবূ বকর (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আবূ বকর! এই দ্বিপ্রহরে কী কারণ আপনাকে এইখানে লইয়া আসিয়াছে? তিনি বলিলেন, অন্য কিছু নহে, আল্লাহ্র কসম, শুধু ক্ষুধার তাড়নাই আমাকে এই অসময়ে এইখানে লইয়া আসিয়াছে। ইহা শুনিয়া উমার (রা) বলিলেন, যেই সত্তার কুদরতী হাতে আমার প্রাণ তাঁহার কসম করিয়া বলিতেছি, আমাকেও একমাত্র ক্ষুধা ব্যতীত অন্য কিছু বাহির করে নাই।
ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ (স)-ও তাঁহাদের মধ্যে তাশরীফ আনিলেন। তিনি তাঁহাদের দুইজনকে অপ্রত্যাশিতভাবে মসজিদে উপস্থিত পাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদিগকে এই সময় কী 'কারণ মসজিদে লইয়া আসিল? তাঁহারা বলিলেন, ক্ষুধার তাড়না। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যাহার কুদরতী হস্তে আমার প্রাণ তাঁহার শপথ করিয়া বলিতেছি, আমাকেও ক্ষুধা ব্যতীত অন্য কিছু বাহির করিয়া আনে নাই। আচ্ছা ঠিক আছে, চল।
অতঃপর তাঁহারা সকলে উঠিয়া হাঁটিতে হাঁটিতে আবূ আয়্যুব আনসারী (রা)-র বাড়িতে গেলেন। আবূ আয়্যব (রা)-এর একটি অভ্যাস ছিল যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য কোন ধরনের খাদ্য কিংবা দুধ মওজুদ রাখিতেন। কিন্তু সেই দিন রাসূলুল্লাহ (স)-এর আসার সাধারণ সময় পার হইয়া যাওয়ায় আবূ আয়্যব (রা) এই ভাবিয়া যে, তিনি হয়ত আসিবেন না মওজুদকৃত খাবার স্বীয় পরিবারের লোকদিগকে খাওয়াইয়া খেজুর বাগানে চলিয়া গিয়াছিলেন।
যাহা হউক, তাঁহারা সকলে আবু আয়্যব (রা)-র বাড়ির দরজায় পৌঁছিলে তাঁহার স্ত্রী বাহির হইয়া তাঁহাদিগকে দেখিতে পাইয়া অভিবাদন জানাইয়া বলিলেন, মারহাবা! আল্লাহর নবী ও তাঁহার সাহাবীগণকে মারহাবা!! রাসুলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন, আবূ আয়্যুব কোথায়? ইত্যবসরে আবু আয়্যুব খেজুর বাগান হইতে দৌড়াইয়া আসিয়া বলিলেন, মারহাবা! আল্লাহর রাসূল ও তাঁহার সঙ্গীগণকে মারহাবা!! আর আল্লাহর নবী! এইরূপ সময় তো আপনি কখনও আসেন না? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি ঠিকই বলিয়াছ।
বর্ণনাকারী বলেন, ইহার পর আবু আয়্যব (রা) গিয়া খেজুরের একটি কাঁদি কাটিয়া পেশ করিলেন, যাহাতে অপুষ্ট, পুষ্ট ও পাকা সব ধরনের খেজুরই ছিল। ইহা দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, পূর্ণ, কাঁদি আনার প্রয়োজন কি ছিল? শুধু পাকা-খেজুর আনিলেই তো চলিত! আবূ আয়্যব (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! কাঁচা পাকা ও অপুষ্ট যাহা ইচ্ছা হয় তাহাই যেন খ্রাইতে পারেন, সেইজন্য এইরূপ করিয়াছি। ইহার সাথে একটি বক্করী যবেহ করিয়া গোস্তেরও ব্যবস্থা করিতেছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, দুগ্ধবতী বকরী যবেহ করিও না। তিনি একটি বাচ্চা বকরী যবেহ করিয়া স্ত্রীকে বলিলেন, তুমি তো রুটি তৈরীতে সবচাইতে পারদর্শিনী। সুতরাং উৎকৃষ্ট মানের রুটি তৈরী কর। ইহা বলিয়া তিনি নিজে অর্ধেক গোশতের ঝোল-তরকারী ও অবশিষ্ট অর্ধেকের ভুনা তৈরী করিলেন।
খানা প্রস্তুত করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার সঙ্গিগণের সম্মুখে পেশ করা হইলে রাসূলুল্লাহ (স) একটি রুটিতে খানিকটা তরকারী রাখিয়া আবূ আয়্যুবকে বলিলেন, আবূ আয্যর। ইহা ফাতিমা' (রা)-র নিকট পৌছাইয়া দাও। কেননা কয়েক দিন যাবত সেও এইরূপ কোন খাদ্য পাইতেছে না। আবূ আয়্যব (রা) উহা ফাতিমা (রা)-এর নিকট পৌছাইয়া দিয়া আসিলেন।
তাঁহারা আহার করিয়া পরিতৃপ্ত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, রুটি, গোস্ত, পাকা খেজুর, অপুষ্ট ও পুষ্ট খেজুর-এই পর্যন্ত বলিয়াই তিনি কাঁদিয়া ফেলিলেন ও বলিলেন, সেই আল্লাহ্র শপথ যাঁহার হাতে আমার প্রাণ। এই সবই হইল ঐ নিআমত যেইগুলি সম্পর্কে
কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদিগকে জিজ্ঞাসা করিবেন। বিষয়টি উপস্থিত সাহাবীগণের নিকট খুবই গুরুতর মনে হইলে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তবে হাঁ, তোমরা যদি আহারের শুরুতে বিসমিল্লাহ্ ও শেষে এই দু'আ পড় الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي هُوَ أَشْبَعَنَا وَأَنْعَمَ عَلَيْنَا وَأَفْضَلَ )অর্থাৎ সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আমাদিগকে পরিতৃপ্ত করাইয়া উত্তম নি'আমত দান করিয়াছেন) তাহা হইলে ইহা ঐ নিয়ামতের প্রতিবদল হইয়া যাইবে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর অভ্যাস ছিল যে, তাঁহার প্রতি উত্তম আচরণকারীকে তিনি প্রতিদান দিতেন। সুতরাং মজলিস হইতে উঠিয়া আবূ আয়্যব (রা)-কে বলিলেন, আগামী কল্য আমার সহিত সাক্ষাত করিও। কিন্তু তিনি উহা না শুনিলে 'উমার (রা) উহা তাঁহাকে বুঝাইয়া বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আগামী কল্য তোমাকে তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিতে বলিয়াছেন। তিনি সাক্ষাত করিলে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে স্বীয় বাঁদী হাদিয়াস্বরূপ প্রদান করিয়া বলিলেন, আবূ আয়্যুব! তাহার সহিত উত্তম ব্যবহার করিও। কেননা সে আমাদের নিকট যতদিন ছিল ততদিন আমরা ইহার দ্বারা ভাল ছাড়া কোন খারাপ হইতে দেখি নাই। আবূ আয়্যব (রা) তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হইতে আনিবার পর বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তাহার সহিত উত্তম ব্যবহার করিতে উপদেশ দিয়াছেন। আমি মনে করি তাহাকে মুক্ত করিয়া দেওয়াই হইতেছে তাহার সহিত অধিক উত্তম ব্যবহার প্রদর্শন। সুতরাং তিনি তাহাকে মুক্ত করিয়া দিলেন। (আল-মুনযিরী, আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, কিতাবুত-তা'আম, আঙ্গত-তারগীব ফী হামদিল্লাহি বা'দাল আকলি, হাদীছ নং ৩১৪০; ইব্ন হিব্বান, আস্-সাহীহ, বিতারতীবি ইব্ন বালবান, তাহকীক-শু'আয়ব আরনাউত, কিতাবুল আতঈমা, বাব যিকরুল আমরি বিতাহমীদিল্লাহি, ১২খ., পৃ. ১৬, হাদীছ নং ৫২১৬০)।
আস্ সাহীহ, বিতারতীবি ইব্ন বালবান, তার্কীক শুআইব আল আরনাউত বাবু যিকরিল আমরি বিতাহমীদিল্লাহি আয্যা ওয়া জাল্লা ইনদাল ফারাগ মিনাত তাআম, ১২খ., পৃ. ১৬)।
'আবদুল্লাহ্ ইব্ন 'আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কখনও ক্রমাগত কয়েক রাত্রি উপবাস কাটাইয়া দিতেন। তিনি ও তাঁহার পরিবার রাত্রে খাওয়ার মত কিছুই পাইতেন না। তাঁহাদের সাধারণ খাদ্য ছিল যবের রুটি (আল-মুসনাদ আহমاد, ১/৩৭৪, হাদীছ নং ৩৫৩৫)।
'আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) মদীনা আগমনের পর হইতে মৃত্যু পর্যন্ত তাঁহার পরিবার কখনও ক্রমাগত তিন দিন গমের রুটি দ্বারা পরিতৃপ্ত হন নাই (বুখারী, কিতাবুর-রিকাক, বাবু কায়ফা কানা আইশুন্ নাবিয়্যি, বাব নং ১৭, হাদীছ নং ৬৪৫৪)।
মাসরূক (র) বলেন, আমি একদা আইশা (রা)-এর খিদমতে হাজির হইলে তিনি আমার জন্য খানা আনিতে বলিলেন। অতঃপর আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আমি যখনই পরিতৃপ্ত হইয়া যাই তখনই আমার কাঁদিতে মনে চায় এবং আমি কাঁদিয়া ফেলি। আমি বলিলাম, তাহা কেন? বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কী অবস্থায় এই দুনিয়া হইতে চলিয়া গিয়াছেন তাহা স্মরণ হইয়া যায়। আল্লাহ্র শপথ! তিনি কখনও দিনে দুইবার রুটি ও গোশত দ্বারা পরিতৃপ্ত হইয়া
আহার করেন নাই (তিরমিযি, কিতাবুয-যুহদ, বাব মা জাআ ফী মা'ঈশাতিন্নাবিয়্যি (স) ওয়া আহলিহী, বাব নং ৩৮, হাদীছ নং ২৩৫৬)।
বায়হাকীর এক বর্ণনায় তাঁহার উক্ত বক্তব্য এইরূপ: কখনও রাসূলুল্লাহ (স) ক্রমাগত তিন দিন তৃপ্তি সহকারে ভক্ষণ করেন নাই। হাঁ, যদি আমরা ইচ্ছা করিতাম তাহা হইলে অবশ্যই সর্বদা পরিতৃপ্ত হইয়া ভক্ষণ করিতে পারিতাম। তবে তিনি সর্বদা নিজের উপর অন্যকে প্রাধান্য দিতেন (আল-বায়হাকী, বাব ফিল-মাতাইমি ওয়াল-মাশারিবি, আল-ফাসলুছ-ছানী ফী যিকরি কাছরাতিল আকলি, হাদীছ নং ৫৬৪০)।
নু'মান ইব্ন বাশীর (রা) স্বীয় শাগরিদদিগকে বলেন, তোমরা কি আপন আপন চাহিদানুযায়ী পানাহার করিতে পারিতেছ না? অথচ আমি তোমাদের নবী করীম (স)-কে এইরূপ অবস্থায় পাইয়াছি যে, তাঁহার এমন সামর্থ্য হইত না যে, নিম্ন মানের খেজুর দ্বারাও তিনি পেট পূর্ণ করিয়া আহার করিয়াছেন (তিরমিযী, কিতাবুয-যুহদ, বাব মা-জাআ ফী মা'ঈশাতি আসহাবিন্নাবিয়্যি (স) বাব নং ৩৯, হাদীছ নং ২৩৭২)।
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, কখনও রাসূলুল্লাহ (স)-এর পরিবারের অবস্থা এমন ছিল যে, তাঁহার কোন স্ত্রীর ঘরে বাতিও জ্বলিত না, চুলাও জ্বলিত না। কেননা বাতি জ্বালাইবার মত তৈল পাওয়া গেলে তাহা শরীরে মাখাইবার কাজেই শেষ হইয়া যাইত। আর চর্বিজাতীয় কিছু পাওয়া গেলে তাহা খাওয়ার কাজেই ফুরাইয়া যাইত (আল-মাওসিলী, আল-মুসনাদ, মুসনাদু আবী হুরায়রা, ৬খ., পৃ. ৬৯ হাদীছ নং ৬৪৪৭)।
'আইশা (রা) স্বীয় বোনপুত্র উরওয়াকে লক্ষ্য করিয়া বলিতেন, আল্লাহ্র কসম! কোন কোন সময় এমনও হইত যে, আমরা এক চাঁদ, অতঃপর দ্বিতীয় চাঁদ, অতঃপর তৃতীয় চাঁদ অর্থাৎ দুই মাসে তিন চাঁদ পর্যন্ত দেখিতাম অথচ এই দীর্ঘ দুই মাসেও রাসূলুল্লাহ (স)-এর কোন সহধর্মিনীর গৃহে আগুন জ্বলে নাই। উরওয়া বলেন, আমি বলিলাম, খালাম্মা! তাহা হইলে কী খাইয়া আপনারা বাঁচিয়া থাকিতেন? তিনি বলিলেন, দুই কালো জিনিস অর্থাৎ খেজুর ও পানি। তবে রাসূলুল্লাহ (স)-এর কয়েকজন আনসারী প্রতিবেশী ছিলেন যাহাদের দুগ্ধবতী উটনী ছিল। তাঁহারা কখনও দুধ পাঠাইলে শুধু তাহাই আমরা পান করিতাম (বুখারী, কিতাবুর-রিকাক, বাব কায়ফা কানা 'আয়শুন্-নাবিয়্যি (স), বাব নং ১৭, হাদীছ নং ৬৪৫৯)।
আবু তালহা (রা) বলেন, একদা আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ক্ষুধার তাড়নার কথা জানাইয়া আমাদের পেট তাঁহাকে দেখাইলাম যাহাতে একটি করিয়া পাথর বাঁধা ছিল। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় পেট উন্মোচন করিলেন যাহাতে দুইখানা পাথর বাঁধা ছিল (তিরমিযী, কিতাবুয-যুহদ, বাব মা-জাআ ফী মা'ঈশাতি আসহাবিন্নাবিয়িয় (স), বাব নং ৩৯, হাদীছ নং ২৩৭১)।
'আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) এমন অবস্থায় ইন্তিকাল করেন যে, ত্রিশ সা' যবের বিনিময়ে তাঁহার যুদ্ধের বর্মখানি এক ইয়াহূদীর নিকট বন্ধক ছিল (আত্-তারগীব ওয়াত-তারহীব, কিতাবুত-তাওবাতি ওয়াহ্-যুহদি, বাব আত্-তারগীবু ফীয যুহদি ফীদ-দুনয়া, হাদীছ নং ৪৭৩০, ৩খ., পৃ. ৩১৪)।
অপর বর্ণনায় আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যেই বালিশে ঠেশ লাগাইতেন ও শয়ন করিতেন তাহার ভিতরে খেজুর গাছের ছাল ভর্তি ছিল (পূর্বোক্ত, হাদীছ নং ৪৭২০)।
অপর বর্ণনায় তিনি বলেন, তিনি যেই বিছানায় শয়ন করিতেন তাহার ভিতরে ছিল খেজুর গাছের ছাল (পূর্বোক্ত)।
'আবদুল্লাহ ইব্ন 'আব্বাস (রা) বলেন, একদিন জিবরাঈল (আ) সাফা পাহাড়ে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাত করিলে তিনি বলিলেন, হে জিবরাঈল! যেই সত্তা আপনাকে প্রেরণ করিয়াছেন তাঁহার কসম! অদ্য সারাদিন মুহাম্মাদ-পরিবারের জন্য না একমুষ্টি আটা মিলিয়াছে, না ছাতু। তাঁহার এই কথাখানি শেষ হইতে না হইতেই আকাশে তিনি এমন একটি ভয়ঙ্কর আওয়াজ শুনিতে পাইলেন যাহাতে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া জিবরাঈল (আ)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, আল্লাহ তা'আলা কি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন? জিবরাঈল (আ) বলিলেন, না, তবে তিনি আপনার বক্তব্য শ্রবণ করিয়া ইসরাফীলকে আপনার নিকট আসিতে বলিলে তিনি অবতরণ করিয়াছেন। ইত্যবসরে ইসরাফীল (আ) তাঁহার নিকট আগমন করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হে নবী! আল্লাহ তা'আলা আপনার বক্তব্য শ্রবণ করিয়া সমগ্র ভূ-মণ্ডলের তাবৎ ভাণ্ডারের চাবিসহ আমাকে আপনার নিকট পাঠাইয়াছেন এবং আমাকে নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন আমি যেন আপনার খেদমতে এই বিষয়টি পেশ করি যে, মক্কার পর্বতমালকে মহামূল্যবান যমুররুদ, ইয়াকৃত, স্বর্ণ ও রৌপ্যে রূপান্তরিত করিয়া আপনার পিছনে পিছনে পরিচালিত করিয়া দেই। আপনি ইচ্ছা করিলে একজন বাদশাহ নবী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করিতে পারেন কিংবা একজন বিনয়ী নবী হিসাবে থাকিতে পারেন। রাসূলুল্লাহ (স) জিবরাঈল (আ)-এর দিকে লক্ষ্য করিয়া দেখিলেন যে, তিনি বিনয় অবলম্বনের প্রতি ইঙ্গিত করিলেন। ইহাতে তিনি তিনবার বলিলেন, বরং আমি বিনয়ী হওয়া গ্রহণ করিলাম (পূর্বোক্ত, হাদীছ নং ৪৭১১)।
📄 ইবাদতে ধৈর্যের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত
হযরত মুগীরা ইব্ন শু'বা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) রাত্রির সালাতে এত দীর্ঘ কিয়াম (দাঁড়ানো অবস্থা) করিতেন যে, তাহাতে তাঁহার পদদ্বয় ফুলিয়া যাইত। তাঁহাকে বলা হইল, আল্লাহ্ তা'আলা তো আপনার পূর্বাপর যাবতীয় গুনাহ ক্ষমা করিয়া দিয়াছেন। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি কি একজন শোকরগুযার বান্দা হইব না? (সাহীহুল বুখারী, কিতাবুত তাহাজ্জুদ, বাব কি'য়ামিন্নাবিয়্যি, কিতাব নং ১৯, বাব নং ৬, হাদীছ নং ১১৩০)।
অপর বর্ণনায় রহিয়াছে, অতঃপর তাঁহার শরীরে গোস্তের পরিমাণ বৃদ্ধি পাইয়া শরীর মোটা হইলে তিনি বসিয়া বসিয়া সালাত আদায় করিতেন।
হযরত 'আইশা (রা) তাঁহার বর্ণনায় বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কখনও রাত্রি জাগরণ ছাড়িতেন না। অসুস্থ হইয়া পড়িলে কিংবা অলসতা অনুভব করিলে বসিয়া হইলেও সালাত আদায় করিতেন (মুসনাদ ইমাম আহমাদ ৬/২৪৯, হাদীছ নং ২৫৫৮৩)।
আনাস (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) কিছুটা ব্যথা অনুভব করিতেছিলেন। সকালবেলা কেহ তাঁহাকে বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। ব্যথার প্রভাব আপনার চেহারায় পরিষ্কার দেখা যাইতেছে। তিনি বলিলেন, গত রাত্রের তাহাজ্জুদ সালাতে সূরা বাকারা হইতে প্রথম সাতটি বড় সূরা পড়িয়াছি; উহারই প্রভাব দেখিতে পাইতেছ (আখলাকু- নাবী, বাব যিকরু শিদ্দাতি ইজতিহাদিহী ওয়া 'ইবাদাতিহী, হাদীছ নং ৫৪১)।
হুযায়ফা (রা) বলেন, ইশার সালাতের পর রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত আমার সাক্ষাত হইলে আরয করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। আমাকে আপনার মত ইবাদত করিবার অনুমতি দিন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) একটি কূপের নিকট গেলেন। আমিও তাঁহার সঙ্গে গেলাম। অতঃপর আমি তাঁহার কাপড় ঝুলাইয়া ও তাঁহাকে আমার পিছনে করিয়া পর্দার ব্যবস্থা করিলাম। তিনি গোসল সারিয়া আমার কাপড়ের সাহায্যে আমাকে পর্দা করিলে আমিও গোসল করিয়া নিলাম। অতঃপর তিনি মসজিদে আসিয়া কিবলামুখী হইয়া দাঁড়াইলেন ও আমাকে তাঁহার ডানদিকে দাঁড় করাইলেন। ইহার পর সালাত শুরু করিয়া সূরা ফাতিহা শেষ করিয়া সূরা বাকারা আরম্ভ করিলেন। তিনি রহমতের আয়াত আসিলে আল্লাহ্র নিকট রহমতের দু'আ করিতেন, ভীতিজনক আয়াত আসিলে সেই ভয় হইতে আশ্রয় চাহিতেন, কোন দৃষ্টান্ত আসিলে তাহাতে চিন্তা করিতেন, এইভাবে উহা শেষ করিলেন। অতঃপর আল্লাহু আকবার বলিয়া রুকূতে যাইয়া বলিলেন, সুবহানা রাব্বিয়াল 'আযীম এবং তিনি স্বীয় ওষ্ঠদ্বয় নাড়াইয়া আরও কি যেন পড়িলেন। আমার মনে হইল তিনি ওয়া বিহামদিহী বলিয়াছেন। তিনি রুকুতে এত দীর্ঘ সময় কাটাইয়া দিলেন যে প্রায় কিয়ামের কাছাকাছি হইয়া গেল। অতঃপর রুকু হইতে মাথা উঠাইলেন ও তাকবীর বলিয়া সিজদায় গমন করিলেন। সেইখানে তাঁহাকে সুবহানা রাব্বিয়াল আ'লা বলিতে শুনিয়াছি। আরও ঠোঁট নাড়াইলে আমার মনে হইল, তিনি ওয়াবিহামদিহী বলিয়াছেন। সিজদায় তিনি এতদীর্ঘ সময় কাটাইলেন যে, কিয়ামের কাছাকাছি হইয়া গেল।
ইহার পর দ্বিতীয় রাক'আতের জন্য উঠিয়া সূরা ফাতিহা পড়িয়া সূরা আল-ইমরান শুরু করিলেন। রহমতের আয়াত অতিক্রম করিলে রহমত চাহিলেন এবং কোন দৃষ্টান্ত আসিলে চিন্তা করিলেন, এইভাবে পূর্ণসূরা সমাপ্ত করিয়া রুকু ও সিজদা করিলেন এবং পূর্বের রুকূ-সিজদায় যাহা করিয়াছেন এইবারও তাহা করিলেন। অতঃপর আমি ফজরের আযান শুনিতে পাইলাম। হুযায়ফা (রা) বলেন, ইহার চাইতে কঠিন ইবাদত আমি আর কখনও করি নাই (সুবুলুল-হুদা ওয়ার-রাশাদ, আল-বাবুছ-ছালিছ ফী ওয়াক্তি কিয়ামিহী, ৮খ., পৃ. ২৭৯)।
অপর এক বর্ণনায় হ্যায়ফা (রা) বলেন, এক রাত্রে রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে নববীতে সালাতে দণ্ডয়মান হইলে আমি তাঁহার পিছনে এই ভাবিয়া ইক্তিদা করিলাম যে, হয়ত তিনি টের পাইবেন না। প্রথমে তিনি সূরা বাকারা আরম্ভ করিলেন। আমি মনে মনে ভাবিলাম হয়ত এক শত আয়াত পড়িয়া রুকূতে যাইবেন। কিন্তু এক শত আয়াত পড়িবার পর রুকৃতে না যাইয়া সামনে আরও পড়িতে লাগিলেন। আমি মনে করিলাম, হয়ত দুই শত আয়াত পড়িয়া রুকূ করিবেন, কিন্তু তখনও তিনি রুকূ করিলেন না। এইবার আমি ভাবিলাম, হয়ত পূর্ণ সূরা শেষ
করিয়াই রুকূতে যাইবেন। অতঃপর সূরা বাকারা শেষ করিয়া তিনি আল্লাহ্ তা'আলার কৃতজ্ঞতা আদায় করিয়া বলিলেন, আল্লাহুম্মা লাকাল হামদু (হে আল্লাহ্! আপনার জন্যই সব প্রশংসা)। কিন্তু তিনি রুকুতে না যাইয়া সূরা আল ইমরান শুরু করিলেন। ভাবিলাম, ইহা শেষ করিয়া রুকুতে যাইবেন। অতঃপর দেখা গেল ইহা শেষ করিয়া পূর্বের ন্যায় আল্লাহুম্মা লাকাল হামদু বলিয়া সূরা নিসা শুরু করিয়া দিলেন। তখন আমার ধারণা হইল যে, ইহা শেষ করিয়াই রুকূ করিবেন। বাস্তবেও তাহাই হইল। তিনি উহা শেষ করিয়া রুকূতে গেলেন ও সেইখানে বলিলেন, সুবহানা রাব্বীয়াল 'আযীম। তাঁহার ওষ্ঠদ্বয়ের নাড়াচাড়ার আওয়াযে মনে হইল তিনি আরও কিছু পড়িয়াছেন, তবে উহা কি তাহা আমি বুঝিতে পারি নাই। এইভাবে প্রথম রাক'আত শেষ করিয়া দ্বিতীয় রাক'আতে দাঁড়াইয়া সূরা আন'আম আরম্ভ করিলে আমি তাহাকে ছাড়িয়া চলিয়া আসিলাম (প্রাগুক্ত, ৮খ., পৃ. ২৭৮; আব্দুর রায্যাক আস্-সানআনী, আল-মুসান্নাফ, কিতাবুস্-সালাত, বাব কিরাআতিস্-সুওয়ার ফির-রাক'আতি, ২খ., পৃ. ১৪৬, হাদীছ নং ২৮৪২)।