📄 বেআদবি কথা ও ক্রোধের সময় ধৈর্য
'আবদুর রহমান ইব্ন আবযা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) ছিলেন সর্বাধিক সহিষ্ণু, সবচাইতে বেশী ধৈর্যশীল ও সর্বাপেক্ষা অধিক ক্রোধসংবরণকারী (আবুশ্ শায়খ, অধ্যায় মা রুবিয়া কী কাযমিহীল গায়যা ওয়া হিলমিহী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম, হাদীছ নং ১৭৫)।
ইসমাঈল ইব্ন 'আয়্যাশ-এর মুরসাল সূত্রে বর্ণনা। তিনি বলেন, মানুষের নানাবিধ কষ্টে ও দুঃখদানে রাসূলুল্লাহ্ (স) সর্বাধিক ধৈর্যপরায়ণ ছিলেন (কানযুল উম্মাল, হাদীছ নং ১৭৮৮১)।
'আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কখনও নিজ খাদেমকে প্রহার করেন নাই, তাঁহার কোন পত্নীকেও কখনও মারধর করেন নাই, এমনকি তিনি অন্য কাহাকেও কখনও প্রহার করেন নাই। তাঁহার প্রতি কেহ অন্যায় আচরণ করিলে যতক্ষণ পর্যন্ত উহাতে আল্লাহর কোন অমোঘ বিধানের লঙ্ঘন না হইবে ততক্ষণ পর্যন্ত উহার প্রতিশোধ লইতেন না। হাঁ, আল্লাহ্র হুকুম লঙ্ঘন হইলে অবশ্যই প্রতিশোধ গ্রহণ করিতেন। তাঁহাকে দুইটি বিষয়ের মধ্যে স্বাধীনতা দেওয়া হইলে গোনাহ্ না হওয়া সাপেক্ষে তিনি সর্বদা তুলনামূলক সহজ সরল বিষয়টিই অবলম্বন করিতেন। তবে উহার মধ্যে গুনাহের লেশ মাত্র থাকিলে তাহা হইতে সবচাইতে দূরে ভাগিতেন (মুসলিম, কিতাবুল ফাদাইল, বাব ২০, হাদীছ নং ৭৯)।
জুনদুব ইব্ন সুফয়ান (র) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট জিবরাঈল (আ) আসিতে কয়েক দিন বিলম্ব করিলেন। ইহাতে মুশরিকরা বলাবলি করিতে লাগিল, মুহাম্মাদ পরিত্যক্ত হইয়াছেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করিলেন: وَالضُّحى . وَالَّيْلِ إِذَا سَجَى . مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَى "শপথ পূর্বাহ্নের, শপথ রজনীর যখন উহা হয় নিঝুম। তোমার প্রতিপালক তোমাকে পরিত্যাগ করেন নাই এবং তোমার প্রতি বিরূপও হন নাই" (৯৩: ১-৩)।
অপর এক বর্ণনায় রহিয়াছে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (স) অসুস্থতাজনিত কারণে দুই-তিন দিন ঘর হইতে বাহির হইতে পারিলেন না। ইহাতে এক মহিলা (ওহীর ধারা বন্ধ হইয়া গিয়াছে ভাবিয়া) আসিয়া বলিল, হে মুহাম্মাদ! আমার মনে হয়, তোমার শয়তানটি এখন তোমাকে ছাড়িয়া দিয়াছে (না'ঊযু' বিল্লাহ)। কেননা সে তো দুই-তিন দিন যাবৎ তোমার নিকট আসিতেছে না। ইহাতে আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেন: وَالضُّحى . وَالَّيْلِ إِذَا سَجَى مَا وَدَعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَى (মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস্-সিয়ার, বাব নং ৩৯, মা লাকি'য়ান্নাবীস্থ্য (স). মিন আযাল-মুশরিকীন ওয়াল-মুনাফিকীন, হাদীছ নং ১৭৯৭)।
'উরওয়া ইন্ন যুবায়র (র) বলেন আমার পিতা যুবায়র (রা) স্বীয় একটি ঘটনা এইভাবে বলিতেন, একদা আমি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন আনসারী সাহাবীর বিরুদ্ধে হাররা (মদীনা নগরী সংলগ্ন প্রস্তরময় উপত্যকা)-এর যেই খাল হইতে আমরা উভয়ে নিজ নিজ জমিতে
পানি সিঞ্চন করিতাম সেই খাল সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট অভিযোগ করিলাম। তিনি আমাকে বলিলেন, হে যুবায়র! তোমার ক্ষেতে সেচ দেওয়ার পর প্রতিবেশীর জন্য পানি ছাড়িয়া দাও। ইহা শুনিয়া আনসারী সাহাবী রাগিয়া উঠিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! যুবায়র আপনার ফুফাত ভাই হওয়ার কারণেই তো এইরূপ পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত প্রদান করিয়াছেন। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চেহারা মুবারক রক্তবর্ণ ধারণ করিল। অতঃপর তিনি বলিলেন, হে যুবায়র! তোমার জমিতে সেচ দেওয়ার পর পানি বন্ধ করিয়া দাও যেন পানি ক্ষেতের প্রাচীর পর্যন্ত পৌঁছে। বর্ণনাকারী বলেন, এই ফয়সালায় রাসূলুল্লাহ্ (স) যুবায়র-এর জন্য পানির সম্পূর্ণ হকই প্রদান করিলেন। অথচ প্রথমবারের সিদ্ধান্তে তিনি যুবায়র-এর জন্য যাহা বলিয়াছিলেন উহাতে উভয়ের জন্যই সেচের অবকাশ ছিল। কিন্তু আনসারী সাহাবী তাঁহাকে রাগান্বিত করিলে তিনি যুবায়র-এর জন্য সম্পূর্ণ পানি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করিলেন। কেননা প্রকৃতপক্ষে ইহাই ছিল তাহার হক। 'উরওয়া বলেন, যুবায়র বলিয়াছেন, কসম করিয়া বলিতে পারি যে, আমাদের এই ঘটনা সম্পর্কেই এই আয়াত নাযিল হইয়াছে:
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ .
"কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! তাহারা মু'মিন হইবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তাহারা তাহাদের নিজেদের বিবাদ-বিস্বাদের বিচারভার তোমার উপর অর্পণ না করে" (৪ : ৬৫; ইমাম বুখারী, কিতাবুস সুলহি, বাব ইযা আশরাল ইমাম বিস্সুলহি' ফাআবা, বাব নং ১২ হাদীছ নং ২৭০৮)।
'আবদুল্লাহ ইব্ন আমর (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট স্বর্ণ ও রৌপ্যের তৈরী একটি ছোট হার আনা হইলে তিনি সাহাবীদের মধ্যে উহা বণ্টন করিয়া দিলেন। জনৈক বেদুঈন দাঁড়াইয়া বলিল, আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ তো আপনাকে ইনসাফ করিবার নির্দেশ দিয়াছেন; কিন্তু আমি তো আপনাকে ইনসাফ করিতে দেখিতেছি না। ইহাতে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, আফসোস্ তোমার জন্য! আমার পরে তাহা হইলে তোমার জন্য আর কে ইনসাফ করিবে? অতঃপর লোকটি চলিয়া যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ্ (স) উপস্থিত সাহাবীদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, লোকটিকে শান্তভাবে আমার নিকট লইয়া আস। অতঃপর তাহাকেও কিছু দান করিলেন, যদিও পাওয়ার উপযুক্ত ছিল না (আখলাকুন্নবী (স), বাব মা রুবিয়া মিন 'আফবি'হী ওয়া সাফহিহী (স), হাদীছ নং ৬৭)।
'আবদুল্লাহ (র) বলেন, হুনায়ন যুদ্ধের সময় গনীমতের মাল বণ্টনের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ্ (স) কয়েকজন মুসলমানকে প্রাধান্য দেন। তাহা এইরূপ ছিল যে, আকরা ইবন হাবিসকে এক শত উষ্ট্রী ও 'উয়ায়নাকে এক শত উষ্ট্রী প্রদান করেন এবং কয়েকজন সম্ভ্রান্ত আরবকে অন্যদের তুলনায় অধিক দান করেন। এইরূপ বণ্টন দেখিয়া জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর অগোচরে এই বলিয়া মন্তব্য করিল যে, আল্লাহর কসম! এই বণ্টনে ইনসাফ করা হয় নাই এবং ইহাতে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য নহে। বর্ণনাকারী বলেন, তাহার মন্তব্য শুনিয়া আমি বলিলাম, আল্লাহর কসম! অবশ্যই আমি এই কথা রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে জানাইয়া দিব। অতঃপর আমি তাঁহার নিকট
আসিয়া উক্ত মন্তব্য সম্পর্কে অবহিত করিলে তিনি বলিলেন, আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলই যদি ইনসাফ না করেন তাহা হইলে আর কে ইনসাফ করিবে? আল্লাহ্ মূসা (আ)-এর উপর রহম করুন। তাঁহাকে তো ইহার চেয়েও অধিক কষ্ট দেওয়া হইয়াছে কিন্তু তিনি ধৈর্য ধারণ করিয়াছিলেন (ইমাম বুখারী, আল-জামিউস্ সাহীহ, কিতাবু ফারদিল খুমুস, বাব ১৯: মা কানান্নাবিয়্যু (স) যুতীল মুআল্লাফাতা কুলূবুহুম, হাদীছ নং ৩১৫০)।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর হত্যার চক্রান্তকারীদের প্রতিশোধ গ্রহণ না করিয়া তাহাদিগকে ক্ষমা প্রদর্শনের সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দান
ইব্ন শিহাব বলেন, জাবির ইব্ন 'আবদিল্লাহ্ (রা) আমাদিগকে এই হাদীছ বর্ণনা করিতেন যে, খায়বারের জনৈক ইয়াহুদী নারী ভূনা করা একটি বকরীতে বিষ মিশ্রিত করিয়া রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে হাদিয়া পেশ করিল। রাসূলুল্লাহ্ (স) উহার একটি রান লইয়া কিছুটা আহার করিলেন এবং তাঁহার সহিত কয়েকজন সাহাবীও আহার করিলেন। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণকে খাদ্য গ্রহণ করিতে নিষেধ করিলেন এবং ইয়াহুদী নারীকে ডাকিয়া বলিলেন, তুমি কি এই বকরীতে বিষ মিশাইয়াছ? সে বলিল, আপনাকে কে জানাইল? বলিলেন, আমার হাতের এই রানটি আমাকে জানাইয়াছে। সে বলিল, হাঁ মিশাইয়াছি। তিনি বলিলেন, ইহাতে তোমার কি উদ্দেশ্য ছিল? বলিল, এই মনে করিয়া যে, যদি আপনি সত্যই নবী হইয়া থাকেন তাহা হইলে আপনার কোন ক্ষতি হইবে না। পক্ষান্তরে যদি নবী না হইয়া থাকেন তাহা হইলে আমরা আপনার এই ধরনের কার্যকলাপ হইতে নিস্তার পাইব। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিলেন ও কোনরূপ প্রতিশোধ লইলেন না, কিন্তু ভক্ষণকারী সাহাবীগণের মধ্য হইতে একজন সাহাবী এই কারণে প্রাণ হারাইয়াছিলেন (অন্য বর্ণনা অনুযায়ী উক্ত সাহাবীর কিসাস-স্বরূপ তাহাকে হত্যা করা হইয়াছিল)। রাসূলুল্লাহ (স) সেই সাহাবীর পৃষ্ঠের উপরী অংশে শিঙ্গা লাগাইতে বলিলে মদীনার বনী বায়াদা গোত্র কর্তৃক মুক্তিপ্রাপ্ত দাস আবূ হিন্দ শিং ও চাকুর সাহায্যে শিঙ্গা লাগাইয়াছিলেন, কিন্তু তাহার প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয় নাই (আবূ দাউদ, আস-সুনান, কিতাবুদ দিয়াত, বাব ৬: ফী মান সাকা রাজুলান সাম্মান আও আত'আমাহু ফামাতা, হাদীছ নং ৪৪৯৯)।
'আইশা (রা) বলেন, বনী যুরায়ক গোত্রের লাবীদ নামের এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-কে যাদু করিলে তাঁহার অবস্থা এইরূপ হইয়া গেল যে, তিনি কোন জিনিস করেন নাই অথচ তাঁহার ধারণা হইত যে, উহা করিয়াছেন। এমনই অবস্থায় কোন এক দিনে বা রাত্রে তিনি আমার নিকট অবস্থানরত ছিলেন, অথচ তিনি আমাকে লইয়া ব্যস্ত না হইয়া দু'আর মধ্যেই মশগুল হইয়া গেলেন। অতঃপর বলিলেন, হে 'আইশা! আমি যাহা দু'আ করিয়াছি আল্লাহ্ তাহা কবূল করিয়াছেন, তুমি কি অনুভব করিতে পারিয়াছ? (অতঃপর বলিলেন) আমার নিকট দুইজন লোক আগমন করিলেন, একজন আমার মাথার পার্শ্বে ও অপরজন পায়ের নিকট বসিয়া একজন অপরজনকে জিজ্ঞাসা করিলেন- লোকটির কী কষ্ট? অপরজন বলিলেন, তিনি
যাদুগ্রস্ত। ১ম ব্যক্তি: কে যাদু করিয়াছে? ২য় ব্যক্তি: লাবীদ ইব্ন আসাম। ১ম ব্যক্তি : কিসের সাহায্যে করিয়াছে। ২য় ব্যক্তি: চিরুনী করিয়া পড়া কেশ ও একটি ময় খর্জুর বৃক্ষের খোসার দ্বারা। ১ম ব্যক্তিঃ উহা কোথায় রাখা হইয়াছে? ২য় ব্যক্তি: যারওয়ান কূপে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) কয়েকজন সাহাবীসহ সেইখানে যাইয়া অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিলেন এবং ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন, হে 'আইশা! সেই কূপের পানির রং মেহেদির রঙের ন্যায় রক্তিম এবং সেই কূপ হইতে সেচনকৃত খেজুর গাছের মাথা একেবারে শয়তানের মস্তকের ন্যায় বিশ্রী। আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি কি উহা বাহির করিলেন না? বলিলেন: আল্লাহ তো আমাকে সুস্থ করিয়া দিয়াছেন। কাজেই মানুষের নিকট ইহার আলোচনা ভাল মনে করি নাই। কেননা হইতে পারে যাদুর চর্চা করিয়া খারাবীতে লিপ্ত হইয়া যাইবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে উহাকে বাহির করিয়া পুতিয়া রাখা হইয়াছে। অপর বর্ণনায় রহিয়াছে, লাবীদ ইব্ন আসাম মুনাফিক ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ডাকাইয়া জিজ্ঞাসা করিলে সে স্বীকার করিয়াছিল। কেহ কেহ তাহাকে হত্যা করিবার পরামর্শ দিয়াছিল, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিয়াছেন। কেননা তিনি নিজের জন্য প্রতিশোধ গ্রহণ করেন না (বুখারী, কিতাবুত্ তিব্ব, বাব নং ৪৭, ৪৯, ৫০, বাবুস সিহত্র, হাদীছ নং ৫৭৬৩, ৫৭৫৬, ৫৭৬৬)।
জাবির ইব্ন 'আবদুল্লাহ (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত নাজদ অভিমুখে যুদ্ধে গমন করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) প্রত্যাবর্তন করিলে তিনিও তাঁহার সহিত প্রত্যাবর্তন করিতেছিলেন। দ্বিপ্রহরের প্রচণ্ড গরমের সময় তাঁহারা কণ্টকময় বৃক্ষ বেষ্টিত এক উপত্যকায় আসিয়া পৌছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বাহন হইতে অবতরণ করিলে অন্যান্য সঙ্গীও নিজ নিজ বাহন হইতে অবতরণ করিলেন এবং বিভিন্ন বৃক্ষের ছায়ায় আরামের উদ্দেশ্যে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়াইয়া পড়িলেন। রাসূলুল্লাহ (স) অধিক পত্রবিশিষ্ট একটি বৃক্ষে স্বীয় তরবারি লটকাইয়া উহার ছায়ায় আরাম করিতে লাগিলেন। জাবির (রা) বলেন, আমাদের নিদ্রা যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই অকস্মাৎ রাসূলুল্লাহ (স) আমাদিগকে ডাকিতে লাগিলেন। আমরা গমন করিয়া দেখি তাঁহার নিকট এক বেদুঈন বসিয়া রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এই লোকটি আমার ঘুমন্ত অবস্থায় আমার তরবারিখানা হস্তগত করিয়াছে। আমি জাগ্রত হইয়া দেখিতে পাই যে, সে নগ্ন তরবারি লইয়া আমার সামনে দণ্ডায়মান। অতঃপর সে আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, তোমাকে আমার হাত হইতে কে রক্ষা করিবে? আমি বলিলাম, আল্লাহ্! অপর এক বর্ণনায় রহিয়াছে, অতঃপর তাহার হাত হইতে তরবারি পড়িয়া গেল। ইহার পর আমি উহা লইয়া তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলাম, এইবার বল, আমার হাত হইতে তোমাকে কে রক্ষা করিবে? সে বলিল, আপনি আমাকে ক্ষমা করিয়া উত্তম তরবারি ধারণকারী হওয়ার পরিচয় দিন। অতঃপর তিনি তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিলেন। এই উপবিষ্ট ব্যক্তিই হইল সেই ব্যক্তি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার কোন প্রতিশোধ গ্রহণ করেন নাই (প্রাগুক্ত, কিতাবুল মাগাযী, বাব গাযওয়াতি যাতির-রিকা, বাব নং ৩১, হাদীছ নং ৪১৩৫)।
📄 স্ত্রীগণের ব্যবহারে ধৈর্য
হযরত আনাস (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার কোন এক স্ত্রীর ঘরে অবস্থানরত ছিলেন। অপর এক স্ত্রীর একটি বরতনে তাঁহার জন্য কিছু খাদ্যদ্রব্য হাদিয়া পাঠাইলে সেই বিবি খাদেমের হাতে প্রহার করিলে পাত্রটি পড়িয়া দুই টুকরা হইয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (স) উভয় টুকরাকে পাশাপাশি মিলাইয়া ইতস্তত বিক্ষিপ্ত খাদ্যসমূহ উঠাইতে লাগিলেন ও বলিতেছিলেন: তোমাদের মায়ের আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত লাগিয়াছে, তোমরা খাইয়া ফেল। ইহাতে উপস্থিত খাদেম সাহাবীগণ খাবারটুকু খাইয়া ফেলিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) পাত্রটি ধরিয়া পূর্বের বিবির ঘরে আসিলেন এবং উহার পরিবর্তে একটি ভাল পাত্র বাহকের নিকট হস্তান্তর করিলেন আর ভাঙ্গা পাত্রটি যিনি ভাঙ্গিয়াছেন তাহার ঘরে রাখিয়া দিলেন (সুনান নাসাঈ, কিতাবু ইশরাতিন্নিসা, বাবুল গায়রাত)।
হযরত উম্মু সালামা (রা) বলেন, একদা তিনি স্বীয় বরতনে করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার সাহাবীগণের জন্য কিছু খাদ্যদ্রব্য লইয়া আসিলেন। ইত্যবসরে হযরত 'আইশা (রা) একটি চাদরে আপাদমস্তক আবৃত করিয়া ঔষধ পেষণের একটি পাথর লইয়া আসিলেন ও উহার সাহায্যে বরতনটি টুকরা টুকরা করিয়া ফেলিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বিক্ষিপ্ত টুকরাসমূহ একত্র করিতে লাগিলেন ও দুইবার বলিলেন, তোমাদের মায়ের আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত লাগিয়াছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) হযরত 'আইশা হইতে একটি ভাল বরতন লইয়া হযরত উম্মু সালামার নিকট পাঠাইয়া দিলেন এবং ভাঙ্গা পাত্রটি হযরত 'আইশাকে দিলেন (প্রাগুক্ত)।
'আইশা (রা) বলেন, কখনও এইরূপ হইত যে, রাসূলুল্লাহ (স) যায়নাব বিন্ত জাহশের ঘরে অবস্থানকালে মধু পান করিতেন। একবার আমি ও হাফসা (রা) এই মর্মে একজোট হইলাম যে, আমাদের মধ্য হইতে যাহার ঘরেই তিনি আসিবেন সে বলিবে, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি কি মাগাফির (এক প্রকারের দুর্গন্ধযুক্ত আঠাল খাদ্যবিশেষ) খাইয়াছেন? আমি তো আপনার মুখ হইতে উহার দুর্গন্ধ অনুভব করিতেছি! অতঃপর এমনই হইল। আমাদের মধ্য হইতে একজনের ঘরে তিনি প্রবেশ করিলে সে বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি কি মাগাফির আহার করিয়াছেন? আমি তো আপনার মুখ হইতে উহার দুর্গন্ধ পাইতেছি! রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, না, বরং আমি যায়নাব বিন্ত জাহশের গৃহে মধু পান করিয়াছি। আর কখনও উহা পান করিব না। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ
يأَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكَ .
"হে নবী! আল্লাহ্ তোমার জন্য যাহা বৈধ করিয়াছেন তুমি তাহা নিষিদ্ধ করিতেছ কেন" (৬৬:১)? ও এই আয়াত ان تتوبا إلى الله "যদি তোমরা উভয়ে অনুতপ্ত হইয়া আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর" (৬৬:৪)। (এই আয়াতখানা) আইশা ও হাফসা সম্পর্কেই অবতীর্ণ হইয়াছে এবং এই আয়াত وَاذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَى بَعْضٍ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا (স্মরণ কর, নবী তাহার স্ত্রীদিগের একজনকে গোপনে কিছু বলিয়াছিল)। রাসূলুল্লাহ (স) যখন বলিলেন, আমি মাগাফির খাই নাই বরং মধু পান করিয়াছি তখন এই আয়াত নাযিল হয় (প্রাগুক্ত)।
উম্মুল মু'মিনীন মায়মূনা (রা) বলেন, এক রাত্রে রাসূলুল্লাহ (স) আমার নিকট হইতে বাহির হইলে আমি দরজা বন্ধ করিয়া দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি ফিরিয়া আসিয়া দরজা খুলিতে বলিলে আমি অস্বীকার করিলাম। তিনি আমাকে কসম দিয়া বলিলেন, দরজা খোল। ইহাতে আমি বলিলাম, আমার পালার রাত্রিতে আপনি অন্য স্ত্রীর ঘরে চলিয়া যাইতে চাহেন। তিনি বলিলেন, না, আমি তাহা করি নাই; বরং পেশাবের প্রয়োজন হইয়াছিল (আল-মুস্তাদরাক, কিতাবু মা'রিফাতিস্ সাহাবা, তামমিয়াতু আওয়াজি রাসূলিল্লাহ (স), যিকরু উম্মিল মু'মিনীন মায়মূনা বিনতিল হারিছ (রা), ৪/৩২, ২৩৯৮/৬৮০০)।
'আইশা (র) বলেন, একদা সাওদা আমাকে দেখিতে আসিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) আসিয়া আমার ও তাঁহার মাঝখানে বসিলেন। আমি হারীরা নামক এক প্রকার সুস্বাদু খাদ্য তৈয়ার করিয়া অনিয়া বলিলাম, আহার করুন। সাওদা অস্বীকৃতি জানাইলে আমি বলিলাম, হয় খাইবেন, না হয় আমি ইহা আপনার চেহারায় মাখাইয়া দিব। ইহাতেও তিনি সম্মত না হইলে আমি পাত্র হইতে কিছুটা খাদ্য লইয়া তাঁহার চেহারায় মাখাইয়া দিলাম। এই দৃশ্য দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) হাসিয়া দিলেন এবং স্বীয় পা তাহার কোল হইতে তুলিয়া নিয়া বলিলেন, তুমিও তাহার চেহারায় একইভাবে মাখাইয়া দাও। ইহাতে তিনি খানিকটা খাবার লইয়া আমার মুখমণ্ডলে মাখাইয়া দিলেন। এইদিকে রাসূলুল্লাহ (স) হাসিতেছিলেন। উমার (রা) আমাদের নিকটবর্তী রাস্তা দিয়া হে আবদুল্লাহ্! হে আবদুল্লাহ্! বলিয়া কাহাকেও ডাকিতে ডাকিতে যাইতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) এই ভাবিয়া যে, হযরত 'উমার (রা) ঘরে আসিবেন আমাদিগকে বলিলেন : তোমরা যাও ও আপন আপন চেহারা ধৌত কর। 'আইশা বলেন, ইহার পর হইতে আমি 'উমারকে ভয় করি। কেননা রাসূলুল্লাহ (স) স্বয়ং তাঁহাকে শ্রদ্ধা করিতেন (বুগয়াতুর রায়িদ ফী তাহক্বীকি মাজমাইয যাওয়াইদ, কিতাবুন্নিকাহ্, বাব ইশরাতিন্নিসা, ৪খ., পৃ. ৫৭৮; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৭০)।
'আইশা (রা) বলেন, এক সফরে আমার সামান ছিল হালকা আর তাহাও ছিল একটি দ্রুতগামী উটের পিঠে। পক্ষান্তরে সাফিয়্যার সামান ছিল ভারী ও তাঁহার উটটি ছিল ধীর গতিসম্পন্ন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (স) সঙ্গীদিগকে বলিলেন, 'আইশার আসবাব আনিয়া সাফিয়্যার উটে রাখ এবং সাফিয়্যার আসবাব 'আইশার (রা) উটে রাখ যেন বাহন সুন্দরভাবে চলিতে পারে। আমি বলিলাম, হে আল্লাহ্র বান্দারা! এই ইয়াহুদী মেয়েটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিষয়ে আমাদের উপর বিজয়ী হইল। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আয় 'আব্দুল্লাহ্র মা! তোমার সামান হালকা আর সাফিয়্যার সামান হইল ভারী যাহার দরুন চলিতে বিলম্ব হইতেছে।
📄 অসুস্থতায় ও প্রিয়জনদের মৃত্যুতে ধৈর্যধারণ
এইজন্য তাহার সামান তোমার উটে ও তোমার জামান তাহার উটে পরিবর্তন করিয়া দিয়াছি। 'আইশা (রা) বলেন, আমি বলিলাম, আপনি কি নিজেকে আল্লাহর রাসূল বলিয়া বিশ্বাস করেন না? ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) হাসিয়া দিলেন ও বলিলেন, হে আবদুল্লাহ্ মা। আমার মধ্যেও কি সন্দেহ হইতে পারে? 'আইশা বলেন, আমি বলিলাম, যদি আপনি নিজেকে নবী বলিয়া বিশ্বাস করেন তাহা হইলে কেন আপনি ইনসাফ করিলেন না? আবু বকর (রা) আমার কথা শুনিতে পাইলেন। তিনি একজন তেজস্বী মানুষ ছিলেন। তিনি আগাইয়া আসিয়া আমার মুখে চপেটাঘাত করিলেন। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, থামুন, হে আবু বকর! এত তাড়াহুড়া করিবেন না। তিনি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি শুনিয়াছেন সে কী বলিয়াছে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন মেয়েরা উপত্যকার উপর হইতে নিম্নভূমি দেখিতে পায় না (অর্থাৎ ভাল-মন্দের মধ্যে পার্থক্য করিতে পারে না) (প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৩২২; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৭১, আল-বাবুস্ সাবিউ ফী হুসনি খুলוקিহী)।
অসুস্থতায় ও প্রিয়জনদের মৃত্যুতে ধৈর্যধারণ আবু সা'ঈদ খুদরী (রা) বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে অসুস্থ পাইলাম। তাঁহার গায়ে একটি চাদর ছিল। আমি চাদরের উপরে হাত রাখিয়া গরম অনুভব করিয়া বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনার জ্বর কত তীব্র! তিনি বলিলেন, নবীগণের উপর মুসীবত খুবই তীব্র হইয়া থাকে আর ইহার প্রতিদানও দ্বিগুণ হইয়া থাকে। অতঃপর আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! কোন্ ব্যক্তিকে সবচাইতে কঠিন বিপদ দেওয়া হয়? তিনি বলিলেন, নবীগণকে। আমি বলিলাম, অতঃপর কাহাকে? বলিলেন, আলিমগণকে। বলিলাম, ইহার পর কাহাকে? বলিলেন, নেককারদিগকে। অতঃপর তিনি বলেন, পূর্বেকার নেককার লোকদের মধ্য হইতে কাহাকেও উকুনের দ্বারা মুসীবত দেওয়া হইয়াছিল, এমনকি উকুন তাহাকে মারিয়া ছাড়িয়াছিল। কাহাকেও দারিদ্র্যের বিপদে ক্লিষ্ট করা হইয়াছিল, এমনকি পরিধানের জন্য শুধু একটি চাদর ব্যাতীত অন্য কিছুই মিলিত না। তাহাদের মধ্যে অনেকে এমনও ছিলেন যে, এতসব কঠিন মুসীবত পাইয়াও এতখানি খুশী হইতেন যত্নস্থানি তোমাদের অনেকেই নেয়ামত পাইয়া আনন্দিত হয় (আত্-তারগীব ওয়াত-তারহীব, কিতাবুল জানাইয ওয়ামা ইয়াতাকাদ্দামুহা, আত্-তারগীব ফিস্-সাবরি, হাদীছ নং ৪৮৯০)।
ইব্ন মাস'উদ (রা) বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রবেশ করিয়া দেখিলাম তিনি অসুস্থ। আমি তাঁহার শরীরে হাত রাখিয়া বলিলাম, আপনার রোগের প্রকোপ তো খুবই তীব্র? তিনি বলিলেন, হাঁ, আমি তোমাদের মত দুইজন ব্যক্তির সমপরিমাণ প্রকোপ ভোগ করিয়া থাকি। আমি বলিলাম, ইহা কি এইজন্য যে, আপনার প্রতিদান দ্বিগুণ হইয়া থাকে। বলিলেন, হাঁ, কোন মুসলমান যদি বিপদগ্রস্ত হয়, তাহা অসুস্থতাজনিত হউক বা অন্য কোন কারণেই হউক, ইহাতে তাঁহার গুনাহসমূহ এমনভাবে ঝরিয়া যায় যেমনভাবে বৃক্ষ হইতে শুকনা পত্র ঝরিয়া পড়ে (প্রাগুক্ত, হাদীছ নং ৪৯৩৩)।
আনাস (রা) বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে লৌহকার আবূ সায়ফ-এর বাড়িতে গেলাম। আবূ সায়ফ ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর পুত্র ইব্রাহীমের স্তন্যদানকারিনী মহিলার স্বামী। রাসূলুল্লাহ (স) ইব্রাহীমকে লইয়া চুম্বন করিলেন ও তাঁহাকে নাকের সাথে মিলাইলেন। ইহার পর অন্য একদিন আমি তাঁহার সঙ্গে সেই বাড়িতে গেলাম। তখন ইব্রাহীমের অন্তিম অবস্থা ছিল। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চক্ষুদ্বয় হইতে অশ্রু ঝরিতে আরম্ভ করিলে আবদুর রহমান ইবন 'আওফ (রা) তাঁহাকে বলিলেন, এই অবস্থায় আপনিও ক্রন্দন করিয়া থাকেন? বলিলেন, হে 'আওফের পুত্র! বরং ইহা হইল কোমল হৃদয় ও দয়ার বহিঃপ্রকাশ। ইহার পর তাঁহার চক্ষু হইতে পুনর্বার অশ্রু আসিলে বলিলেন, চক্ষু অশ্রুসজল ও অন্তর ব্যথিত হইতেছে। কিন্তু আমরা এইরূপ কোন বাক্য উচ্চারণ করিব না যাহাতে আল্লাহ্ অসন্তুষ্ট হইয়া যান। আমরা শুধু এতখানি বলিতে চাহি যে, হে ইবরাহীম! আমরা তোমার বিচ্ছেদে ব্যথিত (বুখারী, কিতাবুল জানাইয, বাব কাওলিন্নাবিয়্যি (স) ইন্নাবিকা লামাহযুনূন, বাব নং ৪৩, হাদীছ নং ১৩০৩)।
'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বলেন, সা'দ ইবন 'উবাদা (রা) অসুস্থতাজনিত কারণে চরম দুর্বল হইয়া পড়িলে 'আবdur রহমান ইবন 'আওফ, সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস ও 'আবদুল্লাহ্ ইবন মাস'উদ (রা)-এর সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স)-ও তাঁহাকে দেখিতে আসিলেন। তিনি তাঁহার নিকট প্রবেশ করিয়া দেখিতে পাইলেন যে, পরিবারের লোকজন তাঁহাকে বেষ্টন করিয়া আছে। তিনি বলিলেন, সা'দ কি দুনিয়া হইতে চলিয়া গিয়াছে? তাহারা বলিল, না ইয়া রাসূলাল্লাহ! তখন রাসূলুল্লাহ (স) কাঁদিয়া ফেলিলেন। উপস্থিত লোকজন তাঁহাকে কাঁদিতে দেখিয়া নিজেরাও কাঁদিয়া ফেলিল। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা কি ইহা শ্রবণ কর নাই যে, আল্লাহ্ তা'আলা চক্ষুর অশ্রু ও হৃদয়ের চিন্তার কারণে শান্তিদান করেন না? বরং জিহ্বার প্রতি ইঙ্গিত করিয়া বলেন, ইহার কারণে, অথবা অনুগ্রহ করিয়া থাকেন। আর ইহাও জানিয়া রাখা আবশ্যক যে, মৃত ব্যক্তিকে তাহার পরিবারের কান্নার কারণে শাস্তি দেওয়া হইয়া থাকে। এইরূপ মাতম করিয়া কান্নাকাটি করিলে উমার (রা) লাঠি দিয়া প্রহার করিতেন, পাথর নিক্ষেপ করিতেন ও মাটি ছিটাইয়া দিতেন (প্রাগুক্ত, বাবুল বুকা' 'ইনদাল-মারীদ, বাব নং ৪৪, হাদীছ নং ১৩০৪)। উল্লেখ্য যে, মৃত ব্যক্তি কান্নাকাটি করার ওসিয়াত করিয়া থাকিলেই কেবল সে শান্তিপ্রাপ্ত হইবে।
'আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট যায়দ ইব্ন হারিছা, জা'ফার ও আবদুল্লাহ ইন্ন রাওয়াহা (রা)-এর শাহাদতের সংবাদ আসিয়া পৌছিলে তিনি দুঃখিত ও মর্মাহত হইয়া বসিয়া পড়েন। আমি দরজার কিনারা দিয়া উঁকি মারিলে তাঁহার চেহারায় মারাত্মক দুঃখিত হওয়ার লক্ষণ দেখা যায় (প্রাগুক্ত, বাব মা য়ুনহা মিনান্নাওহি ওয়াল-বুকাই, বাব নং ৪৫, হাদীছ মং ১৩০৫)।
আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) একদল কারী সাহাবাকে একটি সারিয়্যায় প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাঁহারা বি'র মা'উনা নামক স্থানে শাহাদাত বরণ করিলে রাসূলুল্লাহ (স) এতখানি দুঃখিত হইয়াছিলেন যে, আর কখনও তাঁহাকে এত দুঃখিত হইতে আমি দেখি নাই (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৮খ., পৃ. ৩৫৫, আল-বাবুছ ছালিছ ফী হুন্নিহী ওয়া বুকায়িহী)।