📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মানুষের জুলুম-নির্যাতন ও অসভ্য ব্যবহারে ধৈর্যধারণ

📄 মানুষের জুলুম-নির্যাতন ও অসভ্য ব্যবহারে ধৈর্যধারণ


আইশা (রা) বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জানিতে চাহিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। উহুদ যুদ্ধের দিন আপনার উপর যেই নির্মম নির্যাতন চালানো হইয়াছে ইহার চাইতেও কঠিন সময়ও কি আপনার উপর দিয়া অতিক্রম করিয়াছে? তিনি বলিলেন, হাঁ, ইহার চাইতেও কঠিনতম মুহূর্ত আমার উপর দিয়া অতিক্রম করিয়াছে। তাহা ছিল আকাবার দিন। উহাই ছিল আমার জন্য সবচাইতে দুঃখ ও কষ্টের দিবস।
আমি ইবন আব্দ ইয়ালীল ইব্‌ন আব্দ কুলাল-এর নিকট দাওয়াত পেশ করিয়া আমাকে আশ্রয় দেওয়ার কথা বলিলে তিনি আমাকে প্রত্যাখ্যান করিলেন। ইহাতে আমি অবর্ণনীয় চিন্তিত ও দুঃখিত অবস্থায় যেই দিকেই নযর যায় সেই দিকেই চলিতেছিলাম। হঠাৎ লক্ষ্য করিয়া দেখিতে পাইলাম, আমি কারনুছ ছা'আলিব নামক স্থানে আসিয়া উপনীত হইয়াছি। আকাশের দিকে মাথা উঠাইয়া দেখিতে পাইলাম, একখণ্ড মেঘ আমাকে ছায়াদান করিতেছে। গভীরভাবে লক্ষ্য করিয়া সেইখানে জিবরাঈল (আ)-কে দেখিতে পাইলাম। তিনি আমাকে আহ্বান করিয়া বলিলেন: আপনার দা'ওয়াত ও আপনার সম্প্রদায়ের প্রতিউত্তর আল্লাহ তা'আলা শ্রবণ করিয়াছেন। তিনি পর্বতমালার দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেস্তাকে আপনার নিকট পাঠাইয়া দিয়াছেন, যেন আপনি তাঁহাকে ইহাদের বিষয়ে যাহা নির্দেশ দান করেন তাহাই করিতে পারে। অতঃপর পর্বতের ফেরেশতা সালাম পূর্বক আমাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনার জাতি আপনাকে যাহা বলিয়াছে তাহা আল্লাহ্ তা'আলা শ্রবণ করিয়াছেন। আমি পাহাড়ের দায়িত্ব পালনকারী ফেরেস্তা। তিনি আমাকে আপনার নিকট পাঠাইয়াছেন, যেন আপনার সিদ্ধান্ত আমাকে অবগত করেন। তাবারানীর বর্ণনায় রহিয়াছে, আপনি যাহা ইচ্ছা তাহাই আমাকে নির্দেশ দিতে পারেন। যদি আপনি চাহেন তাহা হইলে আমি দুই দিকের পাহাড়কে একত্র করিয়া তাহাদিগকে নিষ্পেষিত করিয়া দিতে পারি। রাসূলুল্লাহ (স) উত্তরে বলিলেন, না, বরং আমি আশা করি ইহাদের বংশধর হইতে এমন মানুষ সৃষ্টি হইবে যাহারা আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদত করিবে ও তাঁহার সহিত কাহাকেও শরীক করিবে না (মুসলিম, বাব যা লাকিয়ান্নাবিয়্যু (স) মিন আযাল-মুশরিকীনা ওয়াল-মুনাফিকীন, হাদীছ নং ১৭৯৫)।
উরওয়া ইব্‌ন যুবায়র (রা) বলেন, আবূ তালিবের ইন্তিকালের পর রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর যুলুম-অত্যাচার বৃদ্ধি পাইলে তিনি ছাকীফ গোত্রে এই উদ্দেশ্যে গমনেচ্ছা করিলেন যে, হয়ত তাহারা তাঁহাকে আশ্রয় দিবে ও তাঁহার সাহায্য করিবে। তিনি সেইখানে যাইয়া ছাকীফের নেতৃস্থানীয় তিন ব্যক্তিকে একত্রে পাইলেন। তাঁহারা ছিলেন তিন ভাই, যথাক্রমে 'আব্দ ইয়ালীল, ইব্‌ন 'আমর, খুবায়ব ইবন 'আমর ও মাস'উদ ইব্‌ন আমর। তিনি তাহাদের নিকট আশ্রয় কামনা করিলেন এবং স্বীয় সম্প্রদায় কুরায়শের সীমাহীন অত্যাচার ও নির্যাতনের অভিযোগ করিলেন।
তাঁহার কথা শ্রবণান্তে একজন বলিল, আল্লাহ্ যদি বাস্তবিকই তোমাকে কোন কিছু (নবুওয়াত) দিয়া প্রেরণ করিয়া থাকেন তাহা হইলে আমি কা'বা শরীফের চাদর চুরি করিয়া
লইয়া আসিব। দ্বিতীয় ব্যক্তি বলিল, আল্লাহ্র কসম! এই বৈঠকের পর তোমার সহিত আমি কোন কথাই বলিব না। কেননা সত্যিই যদি তুমি নবী হইয়া থাক তাহা হইলে তুমি এতই উচ্চ মর্যাদার অধিকারী যে, তোমার সহিত আমি কথা বলার সাহসই করিতে পারি না। ইন ইসহাকের বর্ণনায় রহিয়াছে, পক্ষান্তরে যদি তুমি আল্লাহ্ নামে মিথ্যা দাবি করিয়া থাক, তাহা হইলে তো তোমার সহিত কথা বলা মোটেই সমীচীন হইবে না। তৃতীয় ব্যক্তি বলিল, আল্লাহ্ বুঝি নবী বানাইবার জন্য তোমাকে ছাড়া আর কাহাকেও পাইলেন না?
যাহা হউক, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিষয়ে গোটা ছাকীফ গোত্রকে সংবাদ জানাইয়া দিলে সকলেই সমবেত হইয়া তাঁহাকে উপহাস করিতে লাগিল এবং তাহারা হাতে পাথর লইয়া রাস্তার দুই ধারে কাতার বাঁধিয়া বসিয়া পড়িল। রাসূলুল্লাহ (স) যখনই পা উঠাইতেন বা নামাইতেন সঙ্গে সঙ্গে তাহারা উহাতে পাথর নিক্ষেপ করিয়া রক্তাক্ত করিয়া দিত এবং অত্যন্ত বিদ্রূপ ও উপহাস করিত। অতঃপর যখন তিনি তাহাদের কাতার অতিক্রম করিলেন আর তাঁহার দুইটি পা হইতে রক্ত ঝরিতেছিল তখন তিনি তাহাদের একটি আঙ্গুর বাগানের দিকে যাইতে মনস্থ করিয়া আঙ্গুর বাগানের ছায়ার নীচে আসিলেন, শিকড়ের নিকট সীমাহীন দুঃখিত ও ব্যথিত হৃদয়ে বসিয়া পড়িলেন। তখন তাঁহার দুই পা হইতে রক্ত ঝরিতেছিল (সায়্যিদুনা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, বাব সাবরুহু (স) ‘আলা আযপল-মুশরিকীন ওয়া তাহাদুলুহুশ শাদাইদ ফী সাবীলিল্লাহ্, পৃ. ২৭৩-৫, উদ্ধৃতি: আবু নু'আয়ম ফিদ্‌-দালায়িল; শারহুল আল্লামা 'আয-যুরকানী 'আলাল-মাওয়াহিব, বাব খুরুজুন্নবী (স) ইলাত- তাইফ, ২খ., পৃ. ৪৯-৫৬; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, বাবঃ সাফারুন্নাবী (স) ইলাহ্-তাইফ, ২খ., পৃ. ৪৩৮-৪১)।
'আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জা'ফার (রা) বলেন: আবু তালিবের ইন্তিকাল করিলে রাসূলুল্লাহ (স) পায়ে হাঁটিয়া তাইফ গমন করিলেন ও তাইফবাসীকে ইসলামের দা'ওয়াত দিলেন। কিন্তু তাহার দা'ওয়াত প্রত্যাখ্যান করিলে তিনি আঙ্গুর গাছের ছায়াতলে আসিয়া দুই রাক'আত সালাত আদায় পূর্বক আল্লাহ্ তা'আলার নিকট দু'আ করিলেন: হে আল্লাহ্! আমার দুর্বলতা অদূরদর্শিতা ও আমার প্রতি মানুষের মন্দ ব্যবহারের অভিযোগ একমাত্র আপনার নিকট করিতেছি। ইয়া আরহামার রাহিমীন! আপনি সমস্ত দয়ালু মধ্যে সর্বাধিক দয়ালু, আপনি দুর্বলদের প্রতিপালক। আপনি আমাকে কাহার হাওয়ালা করেন? আপনি কি আমাকে এমন দূরবর্তী দুশমনের নিকট ছাড়িয়া দিয়াছেন যে আমার সহিত কঠোর মূর্তি ধারণ করিয়া রুক্ষ ব্যবহার করে, নাকি এমন কোন নিকটবর্তী শত্রুর নিকট হস্তান্তর করেন যাহাকে আপনি আমার উপর ক্ষমতাশালী বানাইয়া দিয়াছেন? হে আল্লাহ্! আপনি যদি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট না থাকেন তাহা হইলে আমার কোন পরওয়া নাই। তবে আমি আপনার পক্ষ হইতে নিরাপত্তা পাইবার অধিক উপযুক্ত। হে আল্লাহ্! আপনার যে নূরের দ্বারা নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল আলোকোদ্ভাসিত হইয়াছে ও যাহার দ্বারা সমস্ত অন্ধকার দূরীভূত হইয়াছে ও যাহার দ্বারা ইহ ও পরকালের যাবতীয় বিষয় পরিশুদ্ধ হইয়াছে, সেই নূরের উসীলায় আমার উপর আপনার ক্রোধ ও অসন্তুষ্টি পতিত হওয়া হইতে আপনার নিকট আশ্রয় চাহিতেছি। আপনি সন্তুষ্ট হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আমি
আপনার সন্তুষ্টি প্রার্থনা করিব। আপনার সাহায্য ব্যতীত না গুনাহ্ হইতে বাঁচার শক্তি আমার রহিয়াছে, না ইবাদাত করিবার ক্ষমতা (আল-মু'জামুল কাবীর, ২৫খ., পৃ. ৩৪৬)।
উসামা ইবন যায়দ (রা) বলেন, ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধের পূর্বে একদা রাসূলুল্লাহ (স) অসুস্থ সা'দ ইবন উবাদা (রা)-কে দেখিবার উদ্দেশে বানুল হারিছ ইবনিল খাযরাজ গোত্রে যাওয়ার মনস্থ করিয়া একটি গাধায় চড়িয়া রওয়ানা হইলেন। তাঁহার গাধার উপর একটি ফাদাকী চাদর বিছাইয়া একটি গদি উহার উপর বসাইয়া তিনি উহাতে আরোহণ করিলেন ও আমাকে তাঁহার পিছনে বসাইলেন। পথিমধ্যে এমন একটি সমাবেশ অতিক্রম করিতে হইল যাহাতে মুসলিম, মুশরিক, ইয়াহুদী ও অগ্নিপূজক তথা সর্বজাতির লোকসহ মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্য ইব্‌ন সালূলও উপস্থিত ছিল। প্রসিদ্ধ সাহাবী আবদুল্লাহ ইব্‌ন রাওয়াহা (রা)-ও সেইখানে উপস্থিত ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর আগমনের সময় তাঁহার গাধার চলার কারণে ধুলাবালি উড়িয়া সমাবেশে পৌঁছিলে 'আবদুল্লাহ ইবন উবায়্য চাদর দ্বারা স্বীয় নাসিকা আবৃত করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিল, আমাদিগকে ধুলা দিবেন না। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে সালাম করিয়া বাহন হইতে অবতরণ করিলেন। অতঃপর তিনি উপস্থিত লোকজনকে কুরআন তিলাওয়াত করিয়া শুনাইলেন ও আল্লাহর দিকে দা'ওয়াত দিলেন। ইহাতে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন উবায়্য বলিয়া উঠিল, ওহে! ইহার চাইতে ভাল কিছু নাই? আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার কথা যদি বাস্তবিকই সঠিক হইয়া থাকে তাহা হইলে নিজ বাহনে যাইয়া বসিয়া থাক। কেহ তোমার কাছে সাগ্রহে গেলে তাহাকে শোনাও, কিন্তু আমাদের সমাবেশে আসিয়া আমাদিগকে আর বিরক্ত করিও না।
ইহাতে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন রাওয়াহা (রা) বলিলেন, বরং আপনি আমাদের মজলিসে অবশ্যই আসিবেন ও আপনার বক্তব্য শুনাইবেন। কেননা আমরা উহা পছন্দ করি। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর মুসলিম, মুশরিক ও ইয়াহুদীগণ পরস্পর গালিগালাজ আরম্ভ করিয়া দিলে পরিস্থিতি এই পর্যায়ে গড়াইল যে, একে অপরকে প্রহার করিতে উদ্যত হইল। এইদিকে রাসূলুল্লাহ (স) সকলকে শান্ত হওয়ার জন্য চেষ্টা চালাইয়া এক পর্যায়ে তিনি স্বীয় বাহনে আরোহণ পূর্বক সা'দ ইবন উবাদা (রা)-এর গৃহে প্রবেশ করিলেন। তিনি সা'দকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, সা'দ! আবূ হুবাব (আবদুল্লাহ ইব্‌ন উবায়্য ইব্‌ন সালুল) কী বলিয়াছে তাহা কি শুনিয়াছ? সে তো এইরূপ এইরূপ বলিয়াছে। সা'দ বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিন, তাহাকে মার্জনা করিয়া দিন। আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ্ আপনাকে যাহা দান করিয়াছেন তাহা তো আর বলিবার অপেক্ষা রাখে না। তবে এই এলাকাবাসী সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছিল যে, তাহারা 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন উবায়্য ইব্‌ন সালূলকে মুকুট পরাইয়া দিবে ও পাগড়ী বাঁধিয়া দিবে (অর্থাৎ তাহাদের বাদশাহ স্থির করিবে)। ইতোমধ্যে আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে সত্য ধর্মসহ প্রেরণ করিয়া তাহার ভাবী নেতৃত্বকে চুরমার করিয়া দিয়াছেন। এইজন্যই সে (আত্মহিংসার
আগুনে) জ্বলিতেছে বিধায় আপনার সহিত এইরূপ ব্যবহার করিয়াছে। ইছহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিলেন (মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, বাবুন ফী দু'আইন-নাবী (স) ওয়া সাবরুহু 'আলা আযাল-মুনাফিকীন, হাদীছ নং ১৭৯৮)।
আনাস ইবন মালিক (র) বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবন উবায়্য ইব্‌ন সালূলকে দা'ওয়াত দেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-কে অনুরোধ করা হইলে তিনি একটি গর্দভে আরোহণ পূর্বক তাহার উদ্দেশে রওয়ানা করিলেন। তাঁহার সঙ্গে কয়েকজন মুসলমানও ছিলেন। আবদুল্লাহর এলাকার মাটি ছিল লবণাক্ত ও শেওলাযুক্ত। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার নিকট পৌঁছিলে সে বলিল, আমার নিকট হইতে দূরে সরুন। আল্লাহ্র কসম! আপনার গর্দভের দুর্গন্ধে আমি বিব্রত বোধ করিতেছি। ইহা শুনিয়া একজন আনসারী সাহাবী বলিলেন, তোমার গন্ধের চাইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর গাধার গন্ধ অনেক উত্তম। ইহা শুনিয়া 'আবদুল্লাহ ইবন উবায়্য-এর স্বগোত্রীয় জনৈক ব্যক্তি চটিয়া গেল। উভয় পক্ষের লোকেরা একে অপরের প্রতি ক্রোধাগ্নি প্রদর্শন করিতে লাগিল এবং এক পর্যায়ে হাত, জুতা ও খর্জুরশাখা দিয়া মারামারিও হইয়া গেল। বর্ণনাকারী বলেন, পরে আমি শুনিয়াছি যে, তাহাদের সম্পর্কেই এই আয়াত নাযিল হয়:
وَإِنْ طَائِفَتَنِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا .
"মুমিনদের দুই দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হইলে তোমরা তাহাদের মধ্যে মীমাংসা করিয়া দিবে" (৪৯: ৯; প্রাগুক্ত, হাদীছ নং ১৭৯৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বেদুঈনদের রুক্ষ ব্যবহারে ধৈর্যাবলম্বন

📄 বেদুঈনদের রুক্ষ ব্যবহারে ধৈর্যাবলম্বন


আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, এক বেদুঈন একদা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া কোন বিষয়ে সাহায্য প্রার্থনা করিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে কিছু দান করিয়া বলিলেন, আমি কি তোমার উপকার করি নাই? সে বলিল, না, আপনি সুন্দর করেন নাই। ইহা শুনিয়া মুসলমানগণ ক্রোধান্বিত হইয়া তাহাকে প্রহার করিতে উদ্যত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) ইঙ্গিতে, তাহাদেরকে থামিতে বলিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) মজলিস হইতে উঠিয়া স্বগৃহে তাশরীফ আনিলেন। কিছুক্ষণ পর বেদুঈনকে গৃহে সংবাদ দিয়া আনিলেন এবং তাহাকে আরও কিছু বাড়াইয়া দিলেন। ইহাতে সে খুশী হইয়া গেল। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন, প্রথমে তুমি আমার নিকট আসিয়া কিছু চাহিলে আমি তোমাকে কিছু দান করিলাম। কিন্তু উহার জবাবে তুমি কি বলিয়াছিলে তাহা তোমার ভালভাবেই জানা আছে, যাহার কারণে মুসলমানদের অন্তরে ব্যথা লাগিয়াছে। তুমি ভাল মনে করিলে এখন আমার সামনে যেইভাবে সন্তুষ্টি প্রকাশ করিয়াছ তাহাদের সামনেও যাইয়া উহা প্রকাশ কর যেন তাহাদের অন্তরের দুঃখ দূর হইয়া যায়। সে বলিল, ঠিক আছে। পরের দিন সকাল বা বিকালে লোকটি আসিলে রাসূলুল্লাহ (স) সকলের প্রতি লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তোমাদের এই সাথীটি ক্ষুধার্ত ছিল। আমি কিছু দান করার
পর কী বলিয়াছিল তাহা তোমাদের জানা আছে। ইহার পর আমি তাহাকে আমার গৃহে আহবান করিয়া আরও কিছু দান করিলে স্বীয় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। কি ঠিক বলিয়াছি? ইহাতে বেদুঈন বলিয়া উঠিল, হাঁ। আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে ও আপনার পরিবার-পরিজনকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, একটি বিষয় ভাল করিয়া বুঝিয়া লও। আমার ও এই বেদুঈনের উপমা হইল ঐ ব্যক্তির ন্যায় যাহার একটি উষ্ট্রী ছিল যাহা তাহার হাতছাড়া হইয়া লম্ফঝম্ফ করিতে করিতে পালাইতে লাগিল। লোকেরা উহাকে ধরিবার জন্য পিছন হইতে অনুসরণ করিলে উহা আরও দ্রুত গতিতে পালাইতে লাগিল। অতঃপর উষ্ট্রীর মালিক লোকদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, আমার উষ্ট্রী আমাকেই ধরিতে দাও, কেননা আমি উহার প্রতি অধিক সদয়। অতঃপর সে উষ্ট্রীর সম্মুখে মাটি হইতে কিছু খড়কুটা একত্র করিয়া উহার সামনে রাখিলে উষ্ট্রী নিকটে আসিয়া বসিয়া পড়িল। তৎক্ষণাৎ মালিক উহার উপরে গদি বাঁধিয়া উহাতে চড়িয়া বসিল। জানিয়া রাখ, বেদুঈনের উক্ত অশোভনীয় কথার পর আমি যদি তাহাকে ছাড়িয়া দিতাম আর তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ করিতে যাইয়া তাহাকে মারিয়া ফেলিতে—তাহা হইলে লোকটি জাহান্নামে যাইত (বুগয়াতুর রাইদ ফী তাহকীকি মাজমাইয যাওয়াইদ, ৮খ., পৃ. ৫৭৫, হাদীছ নং ১৪১৯৩; আল-ওয়াফা বি-আহওয়ালিল মুস্তাফা, বাব ৪, ফী যিকরি শাফাকাতিহি ওয়া মাদারাতিহি (স), হাদীছ নং ৭০৭)।
হযরত আনাস (রা) বলেন, একদা জনৈক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (স)-কে পাইয়া তাঁহার চাদর মুবারক ধরিয়া প্রচণ্ড বেগে টান দিল। আমি তাঁহার গ্রীবাদেশে লক্ষ্য করিয়া দেখিলাম যে, টানের তীব্রতায় সেইখানে চাদরের কিনারার দাগ পড়িয়া গিয়াছে। অতঃপর বেদুঈন বলিল, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহ্ আপনাকে যে সম্পদ দান করিয়াছেন তাহা হইতে আমাকে কিছু দান করুন। রাসূলুল্লাহ (স) চেহারা মুবারক ঘুরাইয়া লোকটিকে দেখিয়া হাসিয়া দিলেন এবং তাহাকে কিছু দান করিবার জন্য খাদেমকে নির্দেশ প্রদান করিলেন (আখলাকুন-নবী (স), বাবঃ মা রুবিয়া মিন কারামিহী ওয়া কাছরাতি ইহ'তিমালিহী ওয়া কাযমিহিল গায়য, হাদীছ নং ৬২)।
হযরত আইশা (রা) বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ (স) ঘরে সংরক্ষিত খেজুরের বিনিময়ে এক বেদুঈন হইতে একটি উট ক্রয় করিলেন। উট লইয়া গৃহে ফিরিবার পর অনুসন্ধান করিয়া উক্ত খেজুর আর পাইলেন না। অতঃপর তিনি বেদুঈনের নিকট ফিরিয়া গিয়া বলিলেন, হে আল্লাহর বান্দা। আমি তোমার এই উটটিকে ঘরের মওজুদ খেজুরের বিনিময়ে খরিদ করিয়াছিলাম। আমার ধারণা ছিল যে, খেজুরগুলি ঘরে আছে। কিন্তু এখন খোঁজাখুঁজি করিয়া তাহা না পাইয়া উটটি ফেরত লইয়া আসিলাম। ইহা শুনিয়া বেদুঈন বলিল, হে বিশ্বাসঘাতক! উপস্থিত লোকজন তাহার এই বেআদবিমূলক কথা শোনামাত্র ঘুষি মারিয়া বলিয়া উঠিল, হে বেআদব! রাসূলুল্লাহ (স)-কে এইরূপ কথা বলিস? রাসূলুল্লাহ (স) সকলকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তোমরা তাহাকে ছাড়িয়া দাও (আল-ওয়াফা বি-আহওয়ালিল মুস্তাফা, আল-বাবুছ-ছানী ফী যিকরি হিলmihi ওয়া সাফহিহী, হাদীছ নং ৭০৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বেআদবি কথা ও ক্রোধের সময় ধৈর্য

📄 বেআদবি কথা ও ক্রোধের সময় ধৈর্য


'আবদুর রহমান ইব্‌ন আবযা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) ছিলেন সর্বাধিক সহিষ্ণু, সবচাইতে বেশী ধৈর্যশীল ও সর্বাপেক্ষা অধিক ক্রোধসংবরণকারী (আবুশ্ শায়খ, অধ্যায় মা রুবিয়া কী কাযমিহীল গায়যা ওয়া হিলমিহী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম, হাদীছ নং ১৭৫)।
ইসমাঈল ইব্‌ন 'আয়‍্যাশ-এর মুরসাল সূত্রে বর্ণনা। তিনি বলেন, মানুষের নানাবিধ কষ্টে ও দুঃখদানে রাসূলুল্লাহ্ (স) সর্বাধিক ধৈর্যপরায়ণ ছিলেন (কানযুল উম্মাল, হাদীছ নং ১৭৮৮১)।
'আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কখনও নিজ খাদেমকে প্রহার করেন নাই, তাঁহার কোন পত্নীকেও কখনও মারধর করেন নাই, এমনকি তিনি অন্য কাহাকেও কখনও প্রহার করেন নাই। তাঁহার প্রতি কেহ অন্যায় আচরণ করিলে যতক্ষণ পর্যন্ত উহাতে আল্লাহর কোন অমোঘ বিধানের লঙ্ঘন না হইবে ততক্ষণ পর্যন্ত উহার প্রতিশোধ লইতেন না। হাঁ, আল্লাহ্র হুকুম লঙ্ঘন হইলে অবশ্যই প্রতিশোধ গ্রহণ করিতেন। তাঁহাকে দুইটি বিষয়ের মধ্যে স্বাধীনতা দেওয়া হইলে গোনাহ্ না হওয়া সাপেক্ষে তিনি সর্বদা তুলনামূলক সহজ সরল বিষয়টিই অবলম্বন করিতেন। তবে উহার মধ্যে গুনাহের লেশ মাত্র থাকিলে তাহা হইতে সবচাইতে দূরে ভাগিতেন (মুসলিম, কিতাবুল ফাদাইল, বাব ২০, হাদীছ নং ৭৯)।
জুনদুব ইব্‌ন সুফয়ান (র) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট জিবরাঈল (আ) আসিতে কয়েক দিন বিলম্ব করিলেন। ইহাতে মুশরিকরা বলাবলি করিতে লাগিল, মুহাম্মাদ পরিত্যক্ত হইয়াছেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করিলেন: وَالضُّحى . وَالَّيْلِ إِذَا سَجَى . مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَى "শপথ পূর্বাহ্নের, শপথ রজনীর যখন উহা হয় নিঝুম। তোমার প্রতিপালক তোমাকে পরিত্যাগ করেন নাই এবং তোমার প্রতি বিরূপও হন নাই" (৯৩: ১-৩)।
অপর এক বর্ণনায় রহিয়াছে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (স) অসুস্থতাজনিত কারণে দুই-তিন দিন ঘর হইতে বাহির হইতে পারিলেন না। ইহাতে এক মহিলা (ওহীর ধারা বন্ধ হইয়া গিয়াছে ভাবিয়া) আসিয়া বলিল, হে মুহাম্মাদ! আমার মনে হয়, তোমার শয়তানটি এখন তোমাকে ছাড়িয়া দিয়াছে (না'ঊযু' বিল্লাহ)। কেননা সে তো দুই-তিন দিন যাবৎ তোমার নিকট আসিতেছে না। ইহাতে আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেন: وَالضُّحى . وَالَّيْلِ إِذَا سَجَى مَا وَدَعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَى (মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস্-সিয়ার, বাব নং ৩৯, মা লাকি'য়ান্নাবীস্থ্য (স). মিন আযাল-মুশরিকীন ওয়াল-মুনাফিকীন, হাদীছ নং ১৭৯৭)।
'উরওয়া ইন্ন যুবায়র (র) বলেন আমার পিতা যুবায়র (রা) স্বীয় একটি ঘটনা এইভাবে বলিতেন, একদা আমি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন আনসারী সাহাবীর বিরুদ্ধে হাররা (মদীনা নগরী সংলগ্ন প্রস্তরময় উপত্যকা)-এর যেই খাল হইতে আমরা উভয়ে নিজ নিজ জমিতে
পানি সিঞ্চন করিতাম সেই খাল সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট অভিযোগ করিলাম। তিনি আমাকে বলিলেন, হে যুবায়র! তোমার ক্ষেতে সেচ দেওয়ার পর প্রতিবেশীর জন্য পানি ছাড়িয়া দাও। ইহা শুনিয়া আনসারী সাহাবী রাগিয়া উঠিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! যুবায়র আপনার ফুফাত ভাই হওয়ার কারণেই তো এইরূপ পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত প্রদান করিয়াছেন। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চেহারা মুবারক রক্তবর্ণ ধারণ করিল। অতঃপর তিনি বলিলেন, হে যুবায়র! তোমার জমিতে সেচ দেওয়ার পর পানি বন্ধ করিয়া দাও যেন পানি ক্ষেতের প্রাচীর পর্যন্ত পৌঁছে। বর্ণনাকারী বলেন, এই ফয়সালায় রাসূলুল্লাহ্ (স) যুবায়র-এর জন্য পানির সম্পূর্ণ হকই প্রদান করিলেন। অথচ প্রথমবারের সিদ্ধান্তে তিনি যুবায়র-এর জন্য যাহা বলিয়াছিলেন উহাতে উভয়ের জন্যই সেচের অবকাশ ছিল। কিন্তু আনসারী সাহাবী তাঁহাকে রাগান্বিত করিলে তিনি যুবায়র-এর জন্য সম্পূর্ণ পানি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করিলেন। কেননা প্রকৃতপক্ষে ইহাই ছিল তাহার হক। 'উরওয়া বলেন, যুবায়র বলিয়াছেন, কসম করিয়া বলিতে পারি যে, আমাদের এই ঘটনা সম্পর্কেই এই আয়াত নাযিল হইয়াছে:
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ .
"কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! তাহারা মু'মিন হইবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তাহারা তাহাদের নিজেদের বিবাদ-বিস্বাদের বিচারভার তোমার উপর অর্পণ না করে" (৪ : ৬৫; ইমাম বুখারী, কিতাবুস সুলহি, বাব ইযা আশরাল ইমাম বিস্সুলহি' ফাআবা, বাব নং ১২ হাদীছ নং ২৭০৮)।
'আবদুল্লাহ ইব্‌ন আমর (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট স্বর্ণ ও রৌপ্যের তৈরী একটি ছোট হার আনা হইলে তিনি সাহাবীদের মধ্যে উহা বণ্টন করিয়া দিলেন। জনৈক বেদুঈন দাঁড়াইয়া বলিল, আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ তো আপনাকে ইনসাফ করিবার নির্দেশ দিয়াছেন; কিন্তু আমি তো আপনাকে ইনসাফ করিতে দেখিতেছি না। ইহাতে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, আফসোস্ তোমার জন্য! আমার পরে তাহা হইলে তোমার জন্য আর কে ইনসাফ করিবে? অতঃপর লোকটি চলিয়া যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ্ (স) উপস্থিত সাহাবীদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, লোকটিকে শান্তভাবে আমার নিকট লইয়া আস। অতঃপর তাহাকেও কিছু দান করিলেন, যদিও পাওয়ার উপযুক্ত ছিল না (আখলাকুন্নবী (স), বাব মা রুবিয়া মিন 'আফবি'হী ওয়া সাফহিহী (স), হাদীছ নং ৬৭)।
'আবদুল্লাহ (র) বলেন, হুনায়ন যুদ্ধের সময় গনীমতের মাল বণ্টনের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ্ (স) কয়েকজন মুসলমানকে প্রাধান্য দেন। তাহা এইরূপ ছিল যে, আকরা ইবন হাবিসকে এক শত উষ্ট্রী ও 'উয়ায়নাকে এক শত উষ্ট্রী প্রদান করেন এবং কয়েকজন সম্ভ্রান্ত আরবকে অন্যদের তুলনায় অধিক দান করেন। এইরূপ বণ্টন দেখিয়া জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর অগোচরে এই বলিয়া মন্তব্য করিল যে, আল্লাহর কসম! এই বণ্টনে ইনসাফ করা হয় নাই এবং ইহাতে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য নহে। বর্ণনাকারী বলেন, তাহার মন্তব্য শুনিয়া আমি বলিলাম, আল্লাহর কসম! অবশ্যই আমি এই কথা রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে জানাইয়া দিব। অতঃপর আমি তাঁহার নিকট
আসিয়া উক্ত মন্তব্য সম্পর্কে অবহিত করিলে তিনি বলিলেন, আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলই যদি ইনসাফ না করেন তাহা হইলে আর কে ইনসাফ করিবে? আল্লাহ্ মূসা (আ)-এর উপর রহম করুন। তাঁহাকে তো ইহার চেয়েও অধিক কষ্ট দেওয়া হইয়াছে কিন্তু তিনি ধৈর্য ধারণ করিয়াছিলেন (ইমাম বুখারী, আল-জামিউস্ সাহীহ, কিতাবু ফারদিল খুমুস, বাব ১৯: মা কানান্নাবিয়্যু (স) যুতীল মুআল্লাফাতা কুলূবুহুম, হাদীছ নং ৩১৫০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর হত্যার চক্রান্তকারীদের প্রতিশোধ গ্রহণ না করিয়া তাহাদিগকে ক্ষমা প্রদর্শনের সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দান

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর হত্যার চক্রান্তকারীদের প্রতিশোধ গ্রহণ না করিয়া তাহাদিগকে ক্ষমা প্রদর্শনের সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দান


ইব্‌ন শিহাব বলেন, জাবির ইব্‌ন 'আবদিল্লাহ্ (রা) আমাদিগকে এই হাদীছ বর্ণনা করিতেন যে, খায়বারের জনৈক ইয়াহুদী নারী ভূনা করা একটি বকরীতে বিষ মিশ্রিত করিয়া রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে হাদিয়া পেশ করিল। রাসূলুল্লাহ্ (স) উহার একটি রান লইয়া কিছুটা আহার করিলেন এবং তাঁহার সহিত কয়েকজন সাহাবীও আহার করিলেন। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণকে খাদ্য গ্রহণ করিতে নিষেধ করিলেন এবং ইয়াহুদী নারীকে ডাকিয়া বলিলেন, তুমি কি এই বকরীতে বিষ মিশাইয়াছ? সে বলিল, আপনাকে কে জানাইল? বলিলেন, আমার হাতের এই রানটি আমাকে জানাইয়াছে। সে বলিল, হাঁ মিশাইয়াছি। তিনি বলিলেন, ইহাতে তোমার কি উদ্দেশ্য ছিল? বলিল, এই মনে করিয়া যে, যদি আপনি সত্যই নবী হইয়া থাকেন তাহা হইলে আপনার কোন ক্ষতি হইবে না। পক্ষান্তরে যদি নবী না হইয়া থাকেন তাহা হইলে আমরা আপনার এই ধরনের কার্যকলাপ হইতে নিস্তার পাইব। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিলেন ও কোনরূপ প্রতিশোধ লইলেন না, কিন্তু ভক্ষণকারী সাহাবীগণের মধ্য হইতে একজন সাহাবী এই কারণে প্রাণ হারাইয়াছিলেন (অন্য বর্ণনা অনুযায়ী উক্ত সাহাবীর কিসাস-স্বরূপ তাহাকে হত্যা করা হইয়াছিল)। রাসূলুল্লাহ (স) সেই সাহাবীর পৃষ্ঠের উপরী অংশে শিঙ্গা লাগাইতে বলিলে মদীনার বনী বায়াদা গোত্র কর্তৃক মুক্তিপ্রাপ্ত দাস আবূ হিন্দ শিং ও চাকুর সাহায্যে শিঙ্গা লাগাইয়াছিলেন, কিন্তু তাহার প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয় নাই (আবূ দাউদ, আস-সুনান, কিতাবুদ দিয়াত, বাব ৬: ফী মান সাকা রাজুলান সাম্মান আও আত'আমাহু ফামাতা, হাদীছ নং ৪৪৯৯)।
'আইশা (রা) বলেন, বনী যুরায়ক গোত্রের লাবীদ নামের এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-কে যাদু করিলে তাঁহার অবস্থা এইরূপ হইয়া গেল যে, তিনি কোন জিনিস করেন নাই অথচ তাঁহার ধারণা হইত যে, উহা করিয়াছেন। এমনই অবস্থায় কোন এক দিনে বা রাত্রে তিনি আমার নিকট অবস্থানরত ছিলেন, অথচ তিনি আমাকে লইয়া ব্যস্ত না হইয়া দু'আর মধ্যেই মশগুল হইয়া গেলেন। অতঃপর বলিলেন, হে 'আইশা! আমি যাহা দু'আ করিয়াছি আল্লাহ্ তাহা কবূল করিয়াছেন, তুমি কি অনুভব করিতে পারিয়াছ? (অতঃপর বলিলেন) আমার নিকট দুইজন লোক আগমন করিলেন, একজন আমার মাথার পার্শ্বে ও অপরজন পায়ের নিকট বসিয়া একজন অপরজনকে জিজ্ঞাসা করিলেন- লোকটির কী কষ্ট? অপরজন বলিলেন, তিনি
যাদুগ্রস্ত। ১ম ব্যক্তি: কে যাদু করিয়াছে? ২য় ব্যক্তি: লাবীদ ইব্‌ন আসাম। ১ম ব্যক্তি : কিসের সাহায্যে করিয়াছে। ২য় ব্যক্তি: চিরুনী করিয়া পড়া কেশ ও একটি ময় খর্জুর বৃক্ষের খোসার দ্বারা। ১ম ব্যক্তিঃ উহা কোথায় রাখা হইয়াছে? ২য় ব্যক্তি: যারওয়ান কূপে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) কয়েকজন সাহাবীসহ সেইখানে যাইয়া অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিলেন এবং ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন, হে 'আইশা! সেই কূপের পানির রং মেহেদির রঙের ন্যায় রক্তিম এবং সেই কূপ হইতে সেচনকৃত খেজুর গাছের মাথা একেবারে শয়তানের মস্তকের ন্যায় বিশ্রী। আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি কি উহা বাহির করিলেন না? বলিলেন: আল্লাহ তো আমাকে সুস্থ করিয়া দিয়াছেন। কাজেই মানুষের নিকট ইহার আলোচনা ভাল মনে করি নাই। কেননা হইতে পারে যাদুর চর্চা করিয়া খারাবীতে লিপ্ত হইয়া যাইবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে উহাকে বাহির করিয়া পুতিয়া রাখা হইয়াছে। অপর বর্ণনায় রহিয়াছে, লাবীদ ইব্‌ন আসাম মুনাফিক ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ডাকাইয়া জিজ্ঞাসা করিলে সে স্বীকার করিয়াছিল। কেহ কেহ তাহাকে হত্যা করিবার পরামর্শ দিয়াছিল, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিয়াছেন। কেননা তিনি নিজের জন্য প্রতিশোধ গ্রহণ করেন না (বুখারী, কিতাবুত্ তিব্ব, বাব নং ৪৭, ৪৯, ৫০, বাবুস সিহত্র, হাদীছ নং ৫৭৬৩, ৫৭৫৬, ৫৭৬৬)।
জাবির ইব্‌ন 'আবদুল্লাহ (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত নাজদ অভিমুখে যুদ্ধে গমন করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) প্রত্যাবর্তন করিলে তিনিও তাঁহার সহিত প্রত্যাবর্তন করিতেছিলেন। দ্বিপ্রহরের প্রচণ্ড গরমের সময় তাঁহারা কণ্টকময় বৃক্ষ বেষ্টিত এক উপত্যকায় আসিয়া পৌছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বাহন হইতে অবতরণ করিলে অন্যান্য সঙ্গীও নিজ নিজ বাহন হইতে অবতরণ করিলেন এবং বিভিন্ন বৃক্ষের ছায়ায় আরামের উদ্দেশ্যে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়াইয়া পড়িলেন। রাসূলুল্লাহ (স) অধিক পত্রবিশিষ্ট একটি বৃক্ষে স্বীয় তরবারি লটকাইয়া উহার ছায়ায় আরাম করিতে লাগিলেন। জাবির (রা) বলেন, আমাদের নিদ্রা যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই অকস্মাৎ রাসূলুল্লাহ (স) আমাদিগকে ডাকিতে লাগিলেন। আমরা গমন করিয়া দেখি তাঁহার নিকট এক বেদুঈন বসিয়া রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এই লোকটি আমার ঘুমন্ত অবস্থায় আমার তরবারিখানা হস্তগত করিয়াছে। আমি জাগ্রত হইয়া দেখিতে পাই যে, সে নগ্ন তরবারি লইয়া আমার সামনে দণ্ডায়মান। অতঃপর সে আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, তোমাকে আমার হাত হইতে কে রক্ষা করিবে? আমি বলিলাম, আল্লাহ্! অপর এক বর্ণনায় রহিয়াছে, অতঃপর তাহার হাত হইতে তরবারি পড়িয়া গেল। ইহার পর আমি উহা লইয়া তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলাম, এইবার বল, আমার হাত হইতে তোমাকে কে রক্ষা করিবে? সে বলিল, আপনি আমাকে ক্ষমা করিয়া উত্তম তরবারি ধারণকারী হওয়ার পরিচয় দিন। অতঃপর তিনি তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিলেন। এই উপবিষ্ট ব্যক্তিই হইল সেই ব্যক্তি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার কোন প্রতিশোধ গ্রহণ করেন নাই (প্রাগুক্ত, কিতাবুল মাগাযী, বাব গাযওয়াতি যাতির-রিকা, বাব নং ৩১, হাদীছ নং ৪১৩৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00