📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দা'ওয়াতী কার্যে নজিরবিহীন ধৈর্যাবলম্বন

📄 দা'ওয়াতী কার্যে নজিরবিহীন ধৈর্যাবলম্বন


আল-হারিছ ইবনুল হারিছ বলেন, একদিন আমি বেশকিছু লোককে সমবেত অবস্থায় দেখিতে পাইয়া আমার আব্বাকে তাহাদের একত্র হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন: তাহারা একজন ধর্মত্যাগীর নিকট সমবেত হইয়াছে। অতঃপর আমরা নিকটে যাইয়া দেখিলাম, রাসূলুল্লাহ্ (স) লোকদিগকে ঈমান ও তাওহীদের প্রতি দা'ওয়াত দিতেছেন আর তাহারা উহা প্রত্যাখ্যান করিতেছে ও তাঁহাকে কষ্ট দিতেছে। এইভাবে দ্বিপ্রহর হইয়া গেলে লোকজন চলিয়া গেল। অতঃপর উঠতি বয়সের জনৈকা তরুণী একটি পাত্র ও রুমাল লইয়া আসিলে রাসূলুল্লাহ্ (স) কিছু পানি পান করিয়া উযূ করিলেন ও স্বীয় মস্তক উত্তোলন করিয়া তাঁহাকে দেখিয়া বলিলেন: বেটী! ওড়না ব্যবহার কর। আর তোমার বাবার জন্য পরাজিত বা লজ্জিত হওয়ার আশংকা করিও না। আমরা জানিতে চাহিলাম মেয়েটি কে? লোকেরা বলিল, সে তাঁহারই কন্যা যায়নাব (র) (আল-মু'জামুল কাবীর, ২২খ., পৃ. ৪৩২, হাদীছ নং ১০৫২, বাব যিকরু সিন্নি যায়নাব ওয়া ওয়াফাতিহা ওয়ামিন আখবারিহা)।
'উরওয়া ইবনু যুবায়র (র) বলেন, একদিন আমি 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর (রা)-এর নিকট এই মর্মে প্রশ্ন করিলাম, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দুশমন হইয়া কুরায়শগণ তাঁহাকে কোন্ ধরনের কষ্ট দিতে ও জ্বালাতন করিতে আপনি বেশী লক্ষ্য করিয়াছেন? তিনি উত্তরে বলিলেন, একবারের ঘটনা। মক্কার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ হাজরে আসওয়াদের সন্নিকটে সমবেত ছিল। আমিও তাহাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলাম। তাহারা বলিল, এই লোকটির (মুহাম্মাদ (স)-এর) ক্ষেত্রে আমরা যতখানি ধৈর্যধারণ করিয়াছি ইহার নজীর আর কোথাও মিলিবে না। এই লোকটি আমাদের বুদ্ধিমানদেরকে নির্বোধ আখ্যায়িত করে, আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে গালমন্দ করে, আমাদের ধর্মের দোষচর্চা করিয়া বেড়ায় ও আমাদের একতাকে বিচ্ছিন্ন করিয়া দিয়াছে, সর্বপরি আমাদের উপাস্যদিগকে যা তা বলে। এতদসত্ত্বেও আমরা তাহার ব্যাপারে অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিয়াছি।
এইরূপ আলাপচারিতায় তাহারা লিপ্ত ছিল। ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর আগমন ঘটিল। তিনি রুকনে ইয়ামানীর বরাবর আসিয়া কা'বা শরীফ তাওয়াফ আরম্ভ করিলেন। প্রথম চক্করের সময় তিনি যখন উপস্থিত নেতৃবৃন্দের নিকট দিয়া অতিক্রম করিতেছিলেন তখন তাহারা এমন কিছু কথা বলিয়া তাঁহাকে উত্যক্ত করিতে চাহিল যাহা তিনি স্বীয় দাওয়াতের সময় বলিয়া থাকেন। আমি তৎক্ষণাৎ তাঁহার চেহারা লক্ষ্য করিয়া বিরক্তির ভাব বুঝিতে পারিলাম। দ্বিতীয় চক্করের সময়ও তাহারা পূর্বের অনুরূপ করিলে আমি তাঁহার চেহারায় পুন বিরক্তি লক্ষ্য করিলাম। কিন্তু তিনি কোনরূপ প্রতিউত্তর না করিয়া বরাবর তাওয়াফ করিতে লাগিলেন।
তৃতীয়বার চক্কর দেওয়ার সময় যখন তাহারা পূর্বের ন্যায় অযাচিত ব্যবহার করিল তখন তিনি বলিলেন, “হে কুরায়শ নেতৃবর্গ! ভাল করিয়া শুনিয়া রাখ, সেই সত্তার শপথ যাঁহার হস্তে আমার প্রাণ রহিয়াছে, আমি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নির্দেশ লইয়া আসিয়াছি"। কথাটি তাহাদের অন্তরে মারাত্মক রেখাপাত করিল। এমনকি তাহাদের সকলেই এমনভাবে মাথা নোয়াইয়া ভাবিতে লাগিল যেন তাহাদের মাথার উপর পাখি বসিয়া রহিয়াছে। ইহার চাইতেও মজার কথা হইল, গতকল্য পর্যন্ত যেই লোকটি তাঁহাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য লোকজনকে উৎসাহিত করিয়া বেড়াইত এখন সে ভয়ে তাঁহার সহিত নরম কথা বলিতে লাগিল। এক পর্যায়ে সে তাঁহাকে বলিল : হে আবুল কাসিম। চলিয়া যান। আপনি তো ভাল মানুষ, আপনার নিকট তো অবস্থা অজানা নয়। ইহাতে রাসূলুল্লাহ্ (স) চলিয়া গেলেন।
পরের দিন আবার তাহারা পূর্বের স্থানে একত্র হইল, আমিও তাহাদের সঙ্গে ছিলাম। তাহারা পরস্পর বলাবলি করিতে লাগিল, তোমরা আগে বলিয়াছ যে, সে (মুহাম্মাদ স) কোথায় যাইয়া পৌঁছিয়াছে ও তোমাদিগকে কোথায় আনিয়া ঠেকাইয়াছে। কিন্তু যখন সে তাঁহার সেই ঘৃণ্য কাজ লইয়া তোমাদের সামনে আসিল যাহা তোমরা অপছন্দ কর তখন তাহাকে ছাড়িয়া দিলে? এইরূপ আলোচনায় তাহারা ব্যস্ত ছিল। ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর আগমন ঘটিল। এইবার তাঁহাকে দেখামাত্র সকলে মিলিয়া একসাথে তাঁহার উপর ঝাপাইয়া পড়িল। সকলে তাঁহাকে বেষ্টনপূর্বক যা তা করিতে লাগিল যে, তুমিই কি এইরূপ বল? তাহাদের দেব-দেবী ও ধর্মের দোষারোপমূলক তিনি যাহা বলিতেন সবকিছু তাঁহাকে বলিতে লাগিল। তাহাদের কথার উত্তরে নবী কারীম (স) বলিলেন, আমিই তো এইসব বলিয়া থাকি। ইহার পর তাহাদের মধ্য হইতে এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করিলাম যে, সে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর চাদরের পৌঁচাইয়া ধরিয়া তাঁহাকে কষ্ট দিতেছে। ইতোমধ্যে আবূ বকর (রা) উপস্থিত হইয়া সেই লোকটিকে ধরিবার উদ্দেশ্যে আগাইতে লাগিলেন ও এই কথা বলিতেছিলেন, এক ব্যক্তি বলে যে, রাব্বী আল্লাহ (আমার প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহ্)। এতখানি অপরাধের কারণে তোমরা কি তাঁহাকে মারিয়া ফেলিবার মত আচরণ করিতে পার? ইহার পর দেখিতে দেখিতে সকলেই চলিয়া গেল। 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন আমর (রা) বলেন, আমার প্রত্যক্ষিত ঘটনাসমূহ হইতে ইহাই ছিল কুরায়শদের পক্ষ হইতে তাঁহার সহিত সবচাইতে জঘন্য আচরণ (আল-হায়ছামী, বুগয়াতুর- রায়িদ ফী তাহকীক মাজমা'ইয যাওয়াইদ, ৬খ., পৃ. ৮-২১)।
আবূ তালিবের ইন্তিকালের পর মুশরিক যখন অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়াইয়া অসহনীয় নির্যাতন ও নিপীড়ন আরম্ভ করিল তখন রাসূলুল্লাহ্ (স) এই আশায় তাইফ রওয়ানা করিলেন যে, হইতে পারে ছাকীফ বংশের লোকেরা তাঁহার সাহায্যকারী হইবে। কেননা তাহারা তাঁহার মামার বংশধর ছিল। ইহা ছাড়া তাহাদের পরস্পরের মধ্যে কোনরূপ পূর্ব-শত্রুতা ছিল না। পক্ষান্তরে ঘটনা সম্পূর্ণ বিপরীত হইল। তাহারা কুরায়শদের তুলনায় কয়েক গুণ অগ্রে বাড়িয়া নির্যাতন চালাইয়া তাঁহার সহিত অত্যন্ত নির্মম ও দুঃখজনক ব্যবহার প্রদর্শন করিল। এতদসত্ত্বেও তাঁহার ধৈর্যের পাহাড় দেখিয়া সকলকে বিস্মিত হইতে হয়। নিম্নে এইরূপ কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করা হইল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মানুষের জুলুম-নির্যাতন ও অসভ্য ব্যবহারে ধৈর্যধারণ

📄 মানুষের জুলুম-নির্যাতন ও অসভ্য ব্যবহারে ধৈর্যধারণ


আইশা (রা) বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জানিতে চাহিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। উহুদ যুদ্ধের দিন আপনার উপর যেই নির্মম নির্যাতন চালানো হইয়াছে ইহার চাইতেও কঠিন সময়ও কি আপনার উপর দিয়া অতিক্রম করিয়াছে? তিনি বলিলেন, হাঁ, ইহার চাইতেও কঠিনতম মুহূর্ত আমার উপর দিয়া অতিক্রম করিয়াছে। তাহা ছিল আকাবার দিন। উহাই ছিল আমার জন্য সবচাইতে দুঃখ ও কষ্টের দিবস।
আমি ইবন আব্দ ইয়ালীল ইব্‌ন আব্দ কুলাল-এর নিকট দাওয়াত পেশ করিয়া আমাকে আশ্রয় দেওয়ার কথা বলিলে তিনি আমাকে প্রত্যাখ্যান করিলেন। ইহাতে আমি অবর্ণনীয় চিন্তিত ও দুঃখিত অবস্থায় যেই দিকেই নযর যায় সেই দিকেই চলিতেছিলাম। হঠাৎ লক্ষ্য করিয়া দেখিতে পাইলাম, আমি কারনুছ ছা'আলিব নামক স্থানে আসিয়া উপনীত হইয়াছি। আকাশের দিকে মাথা উঠাইয়া দেখিতে পাইলাম, একখণ্ড মেঘ আমাকে ছায়াদান করিতেছে। গভীরভাবে লক্ষ্য করিয়া সেইখানে জিবরাঈল (আ)-কে দেখিতে পাইলাম। তিনি আমাকে আহ্বান করিয়া বলিলেন: আপনার দা'ওয়াত ও আপনার সম্প্রদায়ের প্রতিউত্তর আল্লাহ তা'আলা শ্রবণ করিয়াছেন। তিনি পর্বতমালার দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেস্তাকে আপনার নিকট পাঠাইয়া দিয়াছেন, যেন আপনি তাঁহাকে ইহাদের বিষয়ে যাহা নির্দেশ দান করেন তাহাই করিতে পারে। অতঃপর পর্বতের ফেরেশতা সালাম পূর্বক আমাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনার জাতি আপনাকে যাহা বলিয়াছে তাহা আল্লাহ্ তা'আলা শ্রবণ করিয়াছেন। আমি পাহাড়ের দায়িত্ব পালনকারী ফেরেস্তা। তিনি আমাকে আপনার নিকট পাঠাইয়াছেন, যেন আপনার সিদ্ধান্ত আমাকে অবগত করেন। তাবারানীর বর্ণনায় রহিয়াছে, আপনি যাহা ইচ্ছা তাহাই আমাকে নির্দেশ দিতে পারেন। যদি আপনি চাহেন তাহা হইলে আমি দুই দিকের পাহাড়কে একত্র করিয়া তাহাদিগকে নিষ্পেষিত করিয়া দিতে পারি। রাসূলুল্লাহ (স) উত্তরে বলিলেন, না, বরং আমি আশা করি ইহাদের বংশধর হইতে এমন মানুষ সৃষ্টি হইবে যাহারা আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদত করিবে ও তাঁহার সহিত কাহাকেও শরীক করিবে না (মুসলিম, বাব যা লাকিয়ান্নাবিয়্যু (স) মিন আযাল-মুশরিকীনা ওয়াল-মুনাফিকীন, হাদীছ নং ১৭৯৫)।
উরওয়া ইব্‌ন যুবায়র (রা) বলেন, আবূ তালিবের ইন্তিকালের পর রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর যুলুম-অত্যাচার বৃদ্ধি পাইলে তিনি ছাকীফ গোত্রে এই উদ্দেশ্যে গমনেচ্ছা করিলেন যে, হয়ত তাহারা তাঁহাকে আশ্রয় দিবে ও তাঁহার সাহায্য করিবে। তিনি সেইখানে যাইয়া ছাকীফের নেতৃস্থানীয় তিন ব্যক্তিকে একত্রে পাইলেন। তাঁহারা ছিলেন তিন ভাই, যথাক্রমে 'আব্দ ইয়ালীল, ইব্‌ন 'আমর, খুবায়ব ইবন 'আমর ও মাস'উদ ইব্‌ন আমর। তিনি তাহাদের নিকট আশ্রয় কামনা করিলেন এবং স্বীয় সম্প্রদায় কুরায়শের সীমাহীন অত্যাচার ও নির্যাতনের অভিযোগ করিলেন।
তাঁহার কথা শ্রবণান্তে একজন বলিল, আল্লাহ্ যদি বাস্তবিকই তোমাকে কোন কিছু (নবুওয়াত) দিয়া প্রেরণ করিয়া থাকেন তাহা হইলে আমি কা'বা শরীফের চাদর চুরি করিয়া
লইয়া আসিব। দ্বিতীয় ব্যক্তি বলিল, আল্লাহ্র কসম! এই বৈঠকের পর তোমার সহিত আমি কোন কথাই বলিব না। কেননা সত্যিই যদি তুমি নবী হইয়া থাক তাহা হইলে তুমি এতই উচ্চ মর্যাদার অধিকারী যে, তোমার সহিত আমি কথা বলার সাহসই করিতে পারি না। ইন ইসহাকের বর্ণনায় রহিয়াছে, পক্ষান্তরে যদি তুমি আল্লাহ্ নামে মিথ্যা দাবি করিয়া থাক, তাহা হইলে তো তোমার সহিত কথা বলা মোটেই সমীচীন হইবে না। তৃতীয় ব্যক্তি বলিল, আল্লাহ্ বুঝি নবী বানাইবার জন্য তোমাকে ছাড়া আর কাহাকেও পাইলেন না?
যাহা হউক, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিষয়ে গোটা ছাকীফ গোত্রকে সংবাদ জানাইয়া দিলে সকলেই সমবেত হইয়া তাঁহাকে উপহাস করিতে লাগিল এবং তাহারা হাতে পাথর লইয়া রাস্তার দুই ধারে কাতার বাঁধিয়া বসিয়া পড়িল। রাসূলুল্লাহ (স) যখনই পা উঠাইতেন বা নামাইতেন সঙ্গে সঙ্গে তাহারা উহাতে পাথর নিক্ষেপ করিয়া রক্তাক্ত করিয়া দিত এবং অত্যন্ত বিদ্রূপ ও উপহাস করিত। অতঃপর যখন তিনি তাহাদের কাতার অতিক্রম করিলেন আর তাঁহার দুইটি পা হইতে রক্ত ঝরিতেছিল তখন তিনি তাহাদের একটি আঙ্গুর বাগানের দিকে যাইতে মনস্থ করিয়া আঙ্গুর বাগানের ছায়ার নীচে আসিলেন, শিকড়ের নিকট সীমাহীন দুঃখিত ও ব্যথিত হৃদয়ে বসিয়া পড়িলেন। তখন তাঁহার দুই পা হইতে রক্ত ঝরিতেছিল (সায়্যিদুনা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, বাব সাবরুহু (স) ‘আলা আযপল-মুশরিকীন ওয়া তাহাদুলুহুশ শাদাইদ ফী সাবীলিল্লাহ্, পৃ. ২৭৩-৫, উদ্ধৃতি: আবু নু'আয়ম ফিদ্‌-দালায়িল; শারহুল আল্লামা 'আয-যুরকানী 'আলাল-মাওয়াহিব, বাব খুরুজুন্নবী (স) ইলাত- তাইফ, ২খ., পৃ. ৪৯-৫৬; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, বাবঃ সাফারুন্নাবী (স) ইলাহ্-তাইফ, ২খ., পৃ. ৪৩৮-৪১)।
'আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জা'ফার (রা) বলেন: আবু তালিবের ইন্তিকাল করিলে রাসূলুল্লাহ (স) পায়ে হাঁটিয়া তাইফ গমন করিলেন ও তাইফবাসীকে ইসলামের দা'ওয়াত দিলেন। কিন্তু তাহার দা'ওয়াত প্রত্যাখ্যান করিলে তিনি আঙ্গুর গাছের ছায়াতলে আসিয়া দুই রাক'আত সালাত আদায় পূর্বক আল্লাহ্ তা'আলার নিকট দু'আ করিলেন: হে আল্লাহ্! আমার দুর্বলতা অদূরদর্শিতা ও আমার প্রতি মানুষের মন্দ ব্যবহারের অভিযোগ একমাত্র আপনার নিকট করিতেছি। ইয়া আরহামার রাহিমীন! আপনি সমস্ত দয়ালু মধ্যে সর্বাধিক দয়ালু, আপনি দুর্বলদের প্রতিপালক। আপনি আমাকে কাহার হাওয়ালা করেন? আপনি কি আমাকে এমন দূরবর্তী দুশমনের নিকট ছাড়িয়া দিয়াছেন যে আমার সহিত কঠোর মূর্তি ধারণ করিয়া রুক্ষ ব্যবহার করে, নাকি এমন কোন নিকটবর্তী শত্রুর নিকট হস্তান্তর করেন যাহাকে আপনি আমার উপর ক্ষমতাশালী বানাইয়া দিয়াছেন? হে আল্লাহ্! আপনি যদি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট না থাকেন তাহা হইলে আমার কোন পরওয়া নাই। তবে আমি আপনার পক্ষ হইতে নিরাপত্তা পাইবার অধিক উপযুক্ত। হে আল্লাহ্! আপনার যে নূরের দ্বারা নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল আলোকোদ্ভাসিত হইয়াছে ও যাহার দ্বারা সমস্ত অন্ধকার দূরীভূত হইয়াছে ও যাহার দ্বারা ইহ ও পরকালের যাবতীয় বিষয় পরিশুদ্ধ হইয়াছে, সেই নূরের উসীলায় আমার উপর আপনার ক্রোধ ও অসন্তুষ্টি পতিত হওয়া হইতে আপনার নিকট আশ্রয় চাহিতেছি। আপনি সন্তুষ্ট হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আমি
আপনার সন্তুষ্টি প্রার্থনা করিব। আপনার সাহায্য ব্যতীত না গুনাহ্ হইতে বাঁচার শক্তি আমার রহিয়াছে, না ইবাদাত করিবার ক্ষমতা (আল-মু'জামুল কাবীর, ২৫খ., পৃ. ৩৪৬)।
উসামা ইবন যায়দ (রা) বলেন, ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধের পূর্বে একদা রাসূলুল্লাহ (স) অসুস্থ সা'দ ইবন উবাদা (রা)-কে দেখিবার উদ্দেশে বানুল হারিছ ইবনিল খাযরাজ গোত্রে যাওয়ার মনস্থ করিয়া একটি গাধায় চড়িয়া রওয়ানা হইলেন। তাঁহার গাধার উপর একটি ফাদাকী চাদর বিছাইয়া একটি গদি উহার উপর বসাইয়া তিনি উহাতে আরোহণ করিলেন ও আমাকে তাঁহার পিছনে বসাইলেন। পথিমধ্যে এমন একটি সমাবেশ অতিক্রম করিতে হইল যাহাতে মুসলিম, মুশরিক, ইয়াহুদী ও অগ্নিপূজক তথা সর্বজাতির লোকসহ মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্য ইব্‌ন সালূলও উপস্থিত ছিল। প্রসিদ্ধ সাহাবী আবদুল্লাহ ইব্‌ন রাওয়াহা (রা)-ও সেইখানে উপস্থিত ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর আগমনের সময় তাঁহার গাধার চলার কারণে ধুলাবালি উড়িয়া সমাবেশে পৌঁছিলে 'আবদুল্লাহ ইবন উবায়্য চাদর দ্বারা স্বীয় নাসিকা আবৃত করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিল, আমাদিগকে ধুলা দিবেন না। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে সালাম করিয়া বাহন হইতে অবতরণ করিলেন। অতঃপর তিনি উপস্থিত লোকজনকে কুরআন তিলাওয়াত করিয়া শুনাইলেন ও আল্লাহর দিকে দা'ওয়াত দিলেন। ইহাতে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন উবায়্য বলিয়া উঠিল, ওহে! ইহার চাইতে ভাল কিছু নাই? আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার কথা যদি বাস্তবিকই সঠিক হইয়া থাকে তাহা হইলে নিজ বাহনে যাইয়া বসিয়া থাক। কেহ তোমার কাছে সাগ্রহে গেলে তাহাকে শোনাও, কিন্তু আমাদের সমাবেশে আসিয়া আমাদিগকে আর বিরক্ত করিও না।
ইহাতে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন রাওয়াহা (রা) বলিলেন, বরং আপনি আমাদের মজলিসে অবশ্যই আসিবেন ও আপনার বক্তব্য শুনাইবেন। কেননা আমরা উহা পছন্দ করি। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর মুসলিম, মুশরিক ও ইয়াহুদীগণ পরস্পর গালিগালাজ আরম্ভ করিয়া দিলে পরিস্থিতি এই পর্যায়ে গড়াইল যে, একে অপরকে প্রহার করিতে উদ্যত হইল। এইদিকে রাসূলুল্লাহ (স) সকলকে শান্ত হওয়ার জন্য চেষ্টা চালাইয়া এক পর্যায়ে তিনি স্বীয় বাহনে আরোহণ পূর্বক সা'দ ইবন উবাদা (রা)-এর গৃহে প্রবেশ করিলেন। তিনি সা'দকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, সা'দ! আবূ হুবাব (আবদুল্লাহ ইব্‌ন উবায়্য ইব্‌ন সালুল) কী বলিয়াছে তাহা কি শুনিয়াছ? সে তো এইরূপ এইরূপ বলিয়াছে। সা'দ বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিন, তাহাকে মার্জনা করিয়া দিন। আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ্ আপনাকে যাহা দান করিয়াছেন তাহা তো আর বলিবার অপেক্ষা রাখে না। তবে এই এলাকাবাসী সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছিল যে, তাহারা 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন উবায়্য ইব্‌ন সালূলকে মুকুট পরাইয়া দিবে ও পাগড়ী বাঁধিয়া দিবে (অর্থাৎ তাহাদের বাদশাহ স্থির করিবে)। ইতোমধ্যে আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে সত্য ধর্মসহ প্রেরণ করিয়া তাহার ভাবী নেতৃত্বকে চুরমার করিয়া দিয়াছেন। এইজন্যই সে (আত্মহিংসার
আগুনে) জ্বলিতেছে বিধায় আপনার সহিত এইরূপ ব্যবহার করিয়াছে। ইছহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিলেন (মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, বাবুন ফী দু'আইন-নাবী (স) ওয়া সাবরুহু 'আলা আযাল-মুনাফিকীন, হাদীছ নং ১৭৯৮)।
আনাস ইবন মালিক (র) বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবন উবায়্য ইব্‌ন সালূলকে দা'ওয়াত দেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-কে অনুরোধ করা হইলে তিনি একটি গর্দভে আরোহণ পূর্বক তাহার উদ্দেশে রওয়ানা করিলেন। তাঁহার সঙ্গে কয়েকজন মুসলমানও ছিলেন। আবদুল্লাহর এলাকার মাটি ছিল লবণাক্ত ও শেওলাযুক্ত। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার নিকট পৌঁছিলে সে বলিল, আমার নিকট হইতে দূরে সরুন। আল্লাহ্র কসম! আপনার গর্দভের দুর্গন্ধে আমি বিব্রত বোধ করিতেছি। ইহা শুনিয়া একজন আনসারী সাহাবী বলিলেন, তোমার গন্ধের চাইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর গাধার গন্ধ অনেক উত্তম। ইহা শুনিয়া 'আবদুল্লাহ ইবন উবায়্য-এর স্বগোত্রীয় জনৈক ব্যক্তি চটিয়া গেল। উভয় পক্ষের লোকেরা একে অপরের প্রতি ক্রোধাগ্নি প্রদর্শন করিতে লাগিল এবং এক পর্যায়ে হাত, জুতা ও খর্জুরশাখা দিয়া মারামারিও হইয়া গেল। বর্ণনাকারী বলেন, পরে আমি শুনিয়াছি যে, তাহাদের সম্পর্কেই এই আয়াত নাযিল হয়:
وَإِنْ طَائِفَتَنِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا .
"মুমিনদের দুই দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হইলে তোমরা তাহাদের মধ্যে মীমাংসা করিয়া দিবে" (৪৯: ৯; প্রাগুক্ত, হাদীছ নং ১৭৯৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বেদুঈনদের রুক্ষ ব্যবহারে ধৈর্যাবলম্বন

📄 বেদুঈনদের রুক্ষ ব্যবহারে ধৈর্যাবলম্বন


আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, এক বেদুঈন একদা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া কোন বিষয়ে সাহায্য প্রার্থনা করিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে কিছু দান করিয়া বলিলেন, আমি কি তোমার উপকার করি নাই? সে বলিল, না, আপনি সুন্দর করেন নাই। ইহা শুনিয়া মুসলমানগণ ক্রোধান্বিত হইয়া তাহাকে প্রহার করিতে উদ্যত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) ইঙ্গিতে, তাহাদেরকে থামিতে বলিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) মজলিস হইতে উঠিয়া স্বগৃহে তাশরীফ আনিলেন। কিছুক্ষণ পর বেদুঈনকে গৃহে সংবাদ দিয়া আনিলেন এবং তাহাকে আরও কিছু বাড়াইয়া দিলেন। ইহাতে সে খুশী হইয়া গেল। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন, প্রথমে তুমি আমার নিকট আসিয়া কিছু চাহিলে আমি তোমাকে কিছু দান করিলাম। কিন্তু উহার জবাবে তুমি কি বলিয়াছিলে তাহা তোমার ভালভাবেই জানা আছে, যাহার কারণে মুসলমানদের অন্তরে ব্যথা লাগিয়াছে। তুমি ভাল মনে করিলে এখন আমার সামনে যেইভাবে সন্তুষ্টি প্রকাশ করিয়াছ তাহাদের সামনেও যাইয়া উহা প্রকাশ কর যেন তাহাদের অন্তরের দুঃখ দূর হইয়া যায়। সে বলিল, ঠিক আছে। পরের দিন সকাল বা বিকালে লোকটি আসিলে রাসূলুল্লাহ (স) সকলের প্রতি লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তোমাদের এই সাথীটি ক্ষুধার্ত ছিল। আমি কিছু দান করার
পর কী বলিয়াছিল তাহা তোমাদের জানা আছে। ইহার পর আমি তাহাকে আমার গৃহে আহবান করিয়া আরও কিছু দান করিলে স্বীয় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। কি ঠিক বলিয়াছি? ইহাতে বেদুঈন বলিয়া উঠিল, হাঁ। আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে ও আপনার পরিবার-পরিজনকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, একটি বিষয় ভাল করিয়া বুঝিয়া লও। আমার ও এই বেদুঈনের উপমা হইল ঐ ব্যক্তির ন্যায় যাহার একটি উষ্ট্রী ছিল যাহা তাহার হাতছাড়া হইয়া লম্ফঝম্ফ করিতে করিতে পালাইতে লাগিল। লোকেরা উহাকে ধরিবার জন্য পিছন হইতে অনুসরণ করিলে উহা আরও দ্রুত গতিতে পালাইতে লাগিল। অতঃপর উষ্ট্রীর মালিক লোকদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, আমার উষ্ট্রী আমাকেই ধরিতে দাও, কেননা আমি উহার প্রতি অধিক সদয়। অতঃপর সে উষ্ট্রীর সম্মুখে মাটি হইতে কিছু খড়কুটা একত্র করিয়া উহার সামনে রাখিলে উষ্ট্রী নিকটে আসিয়া বসিয়া পড়িল। তৎক্ষণাৎ মালিক উহার উপরে গদি বাঁধিয়া উহাতে চড়িয়া বসিল। জানিয়া রাখ, বেদুঈনের উক্ত অশোভনীয় কথার পর আমি যদি তাহাকে ছাড়িয়া দিতাম আর তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ করিতে যাইয়া তাহাকে মারিয়া ফেলিতে—তাহা হইলে লোকটি জাহান্নামে যাইত (বুগয়াতুর রাইদ ফী তাহকীকি মাজমাইয যাওয়াইদ, ৮খ., পৃ. ৫৭৫, হাদীছ নং ১৪১৯৩; আল-ওয়াফা বি-আহওয়ালিল মুস্তাফা, বাব ৪, ফী যিকরি শাফাকাতিহি ওয়া মাদারাতিহি (স), হাদীছ নং ৭০৭)।
হযরত আনাস (রা) বলেন, একদা জনৈক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (স)-কে পাইয়া তাঁহার চাদর মুবারক ধরিয়া প্রচণ্ড বেগে টান দিল। আমি তাঁহার গ্রীবাদেশে লক্ষ্য করিয়া দেখিলাম যে, টানের তীব্রতায় সেইখানে চাদরের কিনারার দাগ পড়িয়া গিয়াছে। অতঃপর বেদুঈন বলিল, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহ্ আপনাকে যে সম্পদ দান করিয়াছেন তাহা হইতে আমাকে কিছু দান করুন। রাসূলুল্লাহ (স) চেহারা মুবারক ঘুরাইয়া লোকটিকে দেখিয়া হাসিয়া দিলেন এবং তাহাকে কিছু দান করিবার জন্য খাদেমকে নির্দেশ প্রদান করিলেন (আখলাকুন-নবী (স), বাবঃ মা রুবিয়া মিন কারামিহী ওয়া কাছরাতি ইহ'তিমালিহী ওয়া কাযমিহিল গায়য, হাদীছ নং ৬২)।
হযরত আইশা (রা) বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ (স) ঘরে সংরক্ষিত খেজুরের বিনিময়ে এক বেদুঈন হইতে একটি উট ক্রয় করিলেন। উট লইয়া গৃহে ফিরিবার পর অনুসন্ধান করিয়া উক্ত খেজুর আর পাইলেন না। অতঃপর তিনি বেদুঈনের নিকট ফিরিয়া গিয়া বলিলেন, হে আল্লাহর বান্দা। আমি তোমার এই উটটিকে ঘরের মওজুদ খেজুরের বিনিময়ে খরিদ করিয়াছিলাম। আমার ধারণা ছিল যে, খেজুরগুলি ঘরে আছে। কিন্তু এখন খোঁজাখুঁজি করিয়া তাহা না পাইয়া উটটি ফেরত লইয়া আসিলাম। ইহা শুনিয়া বেদুঈন বলিল, হে বিশ্বাসঘাতক! উপস্থিত লোকজন তাহার এই বেআদবিমূলক কথা শোনামাত্র ঘুষি মারিয়া বলিয়া উঠিল, হে বেআদব! রাসূলুল্লাহ (স)-কে এইরূপ কথা বলিস? রাসূলুল্লাহ (স) সকলকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তোমরা তাহাকে ছাড়িয়া দাও (আল-ওয়াফা বি-আহওয়ালিল মুস্তাফা, আল-বাবুছ-ছানী ফী যিকরি হিলmihi ওয়া সাফহিহী, হাদীছ নং ৭০৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বেআদবি কথা ও ক্রোধের সময় ধৈর্য

📄 বেআদবি কথা ও ক্রোধের সময় ধৈর্য


'আবদুর রহমান ইব্‌ন আবযা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) ছিলেন সর্বাধিক সহিষ্ণু, সবচাইতে বেশী ধৈর্যশীল ও সর্বাপেক্ষা অধিক ক্রোধসংবরণকারী (আবুশ্ শায়খ, অধ্যায় মা রুবিয়া কী কাযমিহীল গায়যা ওয়া হিলমিহী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম, হাদীছ নং ১৭৫)।
ইসমাঈল ইব্‌ন 'আয়‍্যাশ-এর মুরসাল সূত্রে বর্ণনা। তিনি বলেন, মানুষের নানাবিধ কষ্টে ও দুঃখদানে রাসূলুল্লাহ্ (স) সর্বাধিক ধৈর্যপরায়ণ ছিলেন (কানযুল উম্মাল, হাদীছ নং ১৭৮৮১)।
'আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কখনও নিজ খাদেমকে প্রহার করেন নাই, তাঁহার কোন পত্নীকেও কখনও মারধর করেন নাই, এমনকি তিনি অন্য কাহাকেও কখনও প্রহার করেন নাই। তাঁহার প্রতি কেহ অন্যায় আচরণ করিলে যতক্ষণ পর্যন্ত উহাতে আল্লাহর কোন অমোঘ বিধানের লঙ্ঘন না হইবে ততক্ষণ পর্যন্ত উহার প্রতিশোধ লইতেন না। হাঁ, আল্লাহ্র হুকুম লঙ্ঘন হইলে অবশ্যই প্রতিশোধ গ্রহণ করিতেন। তাঁহাকে দুইটি বিষয়ের মধ্যে স্বাধীনতা দেওয়া হইলে গোনাহ্ না হওয়া সাপেক্ষে তিনি সর্বদা তুলনামূলক সহজ সরল বিষয়টিই অবলম্বন করিতেন। তবে উহার মধ্যে গুনাহের লেশ মাত্র থাকিলে তাহা হইতে সবচাইতে দূরে ভাগিতেন (মুসলিম, কিতাবুল ফাদাইল, বাব ২০, হাদীছ নং ৭৯)।
জুনদুব ইব্‌ন সুফয়ান (র) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট জিবরাঈল (আ) আসিতে কয়েক দিন বিলম্ব করিলেন। ইহাতে মুশরিকরা বলাবলি করিতে লাগিল, মুহাম্মাদ পরিত্যক্ত হইয়াছেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করিলেন: وَالضُّحى . وَالَّيْلِ إِذَا سَجَى . مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَى "শপথ পূর্বাহ্নের, শপথ রজনীর যখন উহা হয় নিঝুম। তোমার প্রতিপালক তোমাকে পরিত্যাগ করেন নাই এবং তোমার প্রতি বিরূপও হন নাই" (৯৩: ১-৩)।
অপর এক বর্ণনায় রহিয়াছে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (স) অসুস্থতাজনিত কারণে দুই-তিন দিন ঘর হইতে বাহির হইতে পারিলেন না। ইহাতে এক মহিলা (ওহীর ধারা বন্ধ হইয়া গিয়াছে ভাবিয়া) আসিয়া বলিল, হে মুহাম্মাদ! আমার মনে হয়, তোমার শয়তানটি এখন তোমাকে ছাড়িয়া দিয়াছে (না'ঊযু' বিল্লাহ)। কেননা সে তো দুই-তিন দিন যাবৎ তোমার নিকট আসিতেছে না। ইহাতে আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেন: وَالضُّحى . وَالَّيْلِ إِذَا سَجَى مَا وَدَعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَى (মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস্-সিয়ার, বাব নং ৩৯, মা লাকি'য়ান্নাবীস্থ্য (স). মিন আযাল-মুশরিকীন ওয়াল-মুনাফিকীন, হাদীছ নং ১৭৯৭)।
'উরওয়া ইন্ন যুবায়র (র) বলেন আমার পিতা যুবায়র (রা) স্বীয় একটি ঘটনা এইভাবে বলিতেন, একদা আমি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন আনসারী সাহাবীর বিরুদ্ধে হাররা (মদীনা নগরী সংলগ্ন প্রস্তরময় উপত্যকা)-এর যেই খাল হইতে আমরা উভয়ে নিজ নিজ জমিতে
পানি সিঞ্চন করিতাম সেই খাল সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট অভিযোগ করিলাম। তিনি আমাকে বলিলেন, হে যুবায়র! তোমার ক্ষেতে সেচ দেওয়ার পর প্রতিবেশীর জন্য পানি ছাড়িয়া দাও। ইহা শুনিয়া আনসারী সাহাবী রাগিয়া উঠিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! যুবায়র আপনার ফুফাত ভাই হওয়ার কারণেই তো এইরূপ পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত প্রদান করিয়াছেন। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চেহারা মুবারক রক্তবর্ণ ধারণ করিল। অতঃপর তিনি বলিলেন, হে যুবায়র! তোমার জমিতে সেচ দেওয়ার পর পানি বন্ধ করিয়া দাও যেন পানি ক্ষেতের প্রাচীর পর্যন্ত পৌঁছে। বর্ণনাকারী বলেন, এই ফয়সালায় রাসূলুল্লাহ্ (স) যুবায়র-এর জন্য পানির সম্পূর্ণ হকই প্রদান করিলেন। অথচ প্রথমবারের সিদ্ধান্তে তিনি যুবায়র-এর জন্য যাহা বলিয়াছিলেন উহাতে উভয়ের জন্যই সেচের অবকাশ ছিল। কিন্তু আনসারী সাহাবী তাঁহাকে রাগান্বিত করিলে তিনি যুবায়র-এর জন্য সম্পূর্ণ পানি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করিলেন। কেননা প্রকৃতপক্ষে ইহাই ছিল তাহার হক। 'উরওয়া বলেন, যুবায়র বলিয়াছেন, কসম করিয়া বলিতে পারি যে, আমাদের এই ঘটনা সম্পর্কেই এই আয়াত নাযিল হইয়াছে:
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ .
"কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! তাহারা মু'মিন হইবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তাহারা তাহাদের নিজেদের বিবাদ-বিস্বাদের বিচারভার তোমার উপর অর্পণ না করে" (৪ : ৬৫; ইমাম বুখারী, কিতাবুস সুলহি, বাব ইযা আশরাল ইমাম বিস্সুলহি' ফাআবা, বাব নং ১২ হাদীছ নং ২৭০৮)।
'আবদুল্লাহ ইব্‌ন আমর (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট স্বর্ণ ও রৌপ্যের তৈরী একটি ছোট হার আনা হইলে তিনি সাহাবীদের মধ্যে উহা বণ্টন করিয়া দিলেন। জনৈক বেদুঈন দাঁড়াইয়া বলিল, আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ তো আপনাকে ইনসাফ করিবার নির্দেশ দিয়াছেন; কিন্তু আমি তো আপনাকে ইনসাফ করিতে দেখিতেছি না। ইহাতে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, আফসোস্ তোমার জন্য! আমার পরে তাহা হইলে তোমার জন্য আর কে ইনসাফ করিবে? অতঃপর লোকটি চলিয়া যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ্ (স) উপস্থিত সাহাবীদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, লোকটিকে শান্তভাবে আমার নিকট লইয়া আস। অতঃপর তাহাকেও কিছু দান করিলেন, যদিও পাওয়ার উপযুক্ত ছিল না (আখলাকুন্নবী (স), বাব মা রুবিয়া মিন 'আফবি'হী ওয়া সাফহিহী (স), হাদীছ নং ৬৭)।
'আবদুল্লাহ (র) বলেন, হুনায়ন যুদ্ধের সময় গনীমতের মাল বণ্টনের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ্ (স) কয়েকজন মুসলমানকে প্রাধান্য দেন। তাহা এইরূপ ছিল যে, আকরা ইবন হাবিসকে এক শত উষ্ট্রী ও 'উয়ায়নাকে এক শত উষ্ট্রী প্রদান করেন এবং কয়েকজন সম্ভ্রান্ত আরবকে অন্যদের তুলনায় অধিক দান করেন। এইরূপ বণ্টন দেখিয়া জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর অগোচরে এই বলিয়া মন্তব্য করিল যে, আল্লাহর কসম! এই বণ্টনে ইনসাফ করা হয় নাই এবং ইহাতে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য নহে। বর্ণনাকারী বলেন, তাহার মন্তব্য শুনিয়া আমি বলিলাম, আল্লাহর কসম! অবশ্যই আমি এই কথা রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে জানাইয়া দিব। অতঃপর আমি তাঁহার নিকট
আসিয়া উক্ত মন্তব্য সম্পর্কে অবহিত করিলে তিনি বলিলেন, আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলই যদি ইনসাফ না করেন তাহা হইলে আর কে ইনসাফ করিবে? আল্লাহ্ মূসা (আ)-এর উপর রহম করুন। তাঁহাকে তো ইহার চেয়েও অধিক কষ্ট দেওয়া হইয়াছে কিন্তু তিনি ধৈর্য ধারণ করিয়াছিলেন (ইমাম বুখারী, আল-জামিউস্ সাহীহ, কিতাবু ফারদিল খুমুস, বাব ১৯: মা কানান্নাবিয়্যু (স) যুতীল মুআল্লাফাতা কুলূবুহুম, হাদীছ নং ৩১৫০)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00