📄 (চ) দুর্ব্যবহারকারীদের সহিত উত্তম আখলাকের নিদর্শন
সর্বশ্রেষ্ঠ আখলাকের অধিকারী রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাকের মহত্ত্বে কোন দুর্ব্যবহারকারীর চরম দুর্ব্যবহারেও ঘাটতি ঘটাইতে পারে নাই। দুর্ব্যবহারকারী দুর্ব্যবহার করিয়া যাইতেছে কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার শ্রেষ্ঠ আখলাকসুলভ ব্যবহারে অটল। তায়েফে তাঁহার সহিত তায়েফবাসীদের দুর্ব্যবহার কাহার না লোমকূপে শিহরণ জাগায়। একদিকে অপমান, অপরদিকে প্রস্তরাঘাতে শরীর জর্জরিত করিয়া দেওয়া হইয়াছে। হযরত আইশা (রা) একদা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! উহুদ হইতে কঠিন দিন কি কখনও আপনার উপর আসিয়াছে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হাঁ, আমি তোমাদের জাতির নিকট হইতে এমন আচরণেরও সম্মুখীন হইয়াছি যাহা উহুদের চাইতেও অধিক কঠিন ছিল। তাহা হইতেছে তায়িফের ঘটনা (বিস্তারিত দ্র. সীরাত বিশ্বকোষ ৫ম খণ্ড, পৃ. ১১৮-১২৫)। হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণিত এক হাদীছে তিনি বলেন, জনৈক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে হাযির হইয়া কিছু প্রার্থনা করিল। নবী কারীম (স) একটি চাদর পরিহিত ছিলেন। লোকটি প্রার্থনার আতিশয্যে তাঁহার চাদর ধরিয়া এত জোরে টান দিল যে, চাদরটি ফাঁড়িয়া গিয়া একপার্শ্ব নবী করীম (স)-এর কাঁধের উপর ঝুলিতে থাকে। নবী করীম (স) লোকটির এই আচরণ সত্ত্বেও তাহাকে কিছু দান করিতে নির্দেশ দেন (আখলাকুন-নবী, পৃ. ১০৬)।
একবার রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদের সহিত মসজিদে উপবিষ্ট ছিলেন। তখন জনৈক বেদুঈন সেইখানে আসিল এবং মসজিদের ভিতর পেশাব করিল। সাহাবীগণ তাহাকে বাধা দিয়া বলিতে লাগিলেন, থাম! থাম! তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, বাধা দিও না। পেশাব করা শেষ হইলে তিনি লোকটিকে ডাকিলেন এবং বলিলেন, দেখ, এ মসজিদগুলি পেশাব-পায়খানা কিংবা এই জাতীয় কোন আবর্জনা ফেলার জায়গা নয়। এইগুলি পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহ পাকের যিকির ও সালাত আদায় করার স্থান। অতঃপর তিনি এক বালতি পানি আনিতে নির্দেশ দেন এবং উহা দ্বারা সেই জায়গাটি পরিষ্কার করাইয়া দেন (আখলাকুন-নবী,
হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ (রা) হইতে বর্ণিত একটি হাদীছে তিনি একটি ঘটনার উল্লেখ করিয়া বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) মাহারিবে খাছফা নামক একটি স্থানে যুদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে অবস্থান করিতেছিলেন। কাফিররা মুসলমানদের অসতর্কতার সুযোগ খুঁজিতেছিল। জনৈক কাফির চুপিসারে আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর শিয়রে দাঁড়াইল এবং বলিল, এখন তোমাকে আমার হাত হইতে কে রক্ষা করিবে? তিনি বলিলেন, আল্লাহ। তৎক্ষণাৎ তাঁহার হাত হইতে তরবারি পড়িয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) তরবারিটি তুলিয়া লইলেন এবং বলিলেন, এখন তোমাকে আমার হাত হইতে কে রক্ষা করিবে? সে বলিল, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আপনি উত্তম তরবারি ধারণকারী হউন। অবশেষে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ছাড়িয়া দিলেন। লোকটি তাহার সঙ্গীদের নিকট আসিয়া বলিল, আমি সর্বোত্তম ব্যক্তির হাত হইতে মুক্তি পাইয়া তোমাদের নিকট আসিয়াছি (আখলাকুন-নবী, পৃ. ২৯)।
মক্কাবাসী ইসলাম ও মুসলমানদের উপর যে অত্যাচার করিয়াছিল তাহার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। ইহার পরও যখন মক্কা বিজয় হইল তখন সেই অত্যাচারীদের সহিত কি মহৎ আচরণটাই না নবী করীম (স) করিলেন! হযরত উমর (রা) বলেন, যখন মক্কা বিজয়ের দিন আসিল, রাসূলুল্লাহ (স) সাফওয়ান ইবন উমায়্যা ইব্ন খালাফ, আবূ সুফ্যান ইব্ হাব ও হারিছ ইব্ন হিশামকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। হযরত উমার (রা) বলেন, আমি আপন মনে বলিলাম, আজ আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাহাদের কৃতকর্মের শান্তি প্রদান ও প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ দান করিবেন। কেননা স্পষ্টতই ইহারা যুদ্ধাপরাধী। নবী কারীম (স) তাহাদেরকে হত্যা করাইবেন এবং আমার দ্বারাই এই কাজ করাইবেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) দীর্ঘ বাদানুবাদের পর বলিলেন, এখন আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত সম্পূর্ণ হযরত ইউসুফ (আ) তাঁহার ভ্রাতাদের ও তাঁহার ভাইদের মত। এইজন্য আমি তাহাই বলিব যাহা হযরত ইউসুফ (আ) বলিয়াছিলেন : لَا تَشْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ "তোমাদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিশোধ নাই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন।” হযরত উমার (রা) বলেন, আমি লজ্জায় নতমুখ হইয়া গেলাম। আমি যেইখানে প্রতিশোধ গ্রহণের প্রস্তুতি লইতেছি, আনন্দ উল্লাস করিতেছি, তিনি সেইখানে আজীবনের জানের দুশমনদেরকে ক্ষমার সুসংবাদ শুনাইতেছেন (আখলাকুন-নবী, পৃ. ৩৮)।
একবার এক ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাক পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে প্রথমে নিজে আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত কিছু লেনদেন করিল। অতঃপর তাহার পাওনা পরিশোধের নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই আসিয়া সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত দুর্ব্যবহার করিতে শুরু করিল এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাদরের উভয় পার্শ্ব ধরিয়া সজোরে টানিয়া বলিল, আবদুল মুত্তালিবের গোষ্ঠীর মধ্যে আমি আপনাকে চিনি, আপনি অত্যন্ত টালবাহানাকারী। হযরত উমার (রা) এই কথা শুনিয়া তাহার গর্দান উড়াইয়া দেওয়ার হুমকি দিলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে মৃদু হাসিয়া বলিলেন, তোমার বরং উচিৎ ছিল আমাকে যথাসময়ে কর্জ পরিশোধ করিতে বলা এবং তাহাকে নরম ভাষায় চাওয়ার নির্দেশ দেওয়া। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) উমার (রা)-কে বলিলেন, তাহার পাওনা পরিশোধ করিয়া দাও এবং ধমক দেওয়ার জন্য আরও বিশ সা' বেশী দাও। তিনি
তাহাই করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই আখলাকের পরিচয় পাইয়া লোকটি ইসলাম গ্রহণ করিল (আখলাকুন-নবী, পৃ. ১২২-১২৪)।
📄 (ছ) জিহাদের ময়দানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাক
মদীনার জীবনে মহানবী (স)-কে বহুবার ইসলামের দুশমনদের সহিত মুকাবিলা করিতে হয় এবং সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করিতে হয়। প্রচলিত যুদ্ধ বিচার-বুদ্ধির পরিবর্তে আবেগ-উদ্দীপনা দ্বারা পরিচালিত হইত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর মহান চরিত্রে এই সকল ক্ষেত্রেও সর্বদা ন্যায়পরায়ণতা ও ভারসাম্য সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। এই সকল ক্ষেত্রেও তাঁহার উত্তম আখলাক জগতকে বিস্ময়াভিভূত করিয়াছে। যুদ্ধের ময়দানে মুজাহিদগণের প্রতি তাঁহার নির্দেশ ছিল কেবল আল্লাহ তা'আলার মহান বাণী সমুন্নত রাখিবার উদ্দেশ্যেই জিহাদ করিবে (আল-বুখারী, কিতাবুল-জিহাদ; মুসলিম, কিতাবুল-জিহাদ)।
কোন যুদ্ধে মুজাহিদগণকে বিদায় করিবার সময় তিনি মদীনার উপকণ্ঠ পর্যন্ত গমন করিতেন। তিনি তাহাদেরকে এবং তাহাদের দীনকে আল্লাহর আশ্রয়ে ন্যস্ত করিতেন। ইহা ছাড়া এই উপদেশ প্রদান করিতেন যে, আল্লাহকে সর্বাবস্থায় ভয় করিবে এবং স্বীয় সঙ্গী মুসলমানদের কল্যাণ কামনা করিবে। তারপর বলিতেন, আল্লাহর উদ্দেশ্যে কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করিবে; অসাধুতা ও অঙ্গীকার ভঙ্গ করিবে না। নিহতের নাক-কান কর্তন (মুছলা) করিবে না, শিশু ও নারীদের হত্যা করিবে না (আল-বুখারী, ১খ., পৃ. ৪১৫; আত-তিরমিযী, ১খ., পৃ. ১৯১)।
কোন যুদ্ধে শত্রুদের প্রতিরোধকল্পে যেই কৌশলই বিবেচিত হইত তিনি সেই কৌশল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সাহাবীদের সহিত শরীক থাকিতেন। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খনন উহার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত (আল-বুখারী, কিতাবুল-জিহাদ, ১খ., ৩৯৮)।
সাহাবায়ে কিরামের প্রতি তাঁহার নির্দেশ ছিল : যদি শত্রু তোমাদের উপর হামলা করে এবং তাহারা তোমাদের হামলার সময় কালেমা পাঠ করে তবে তৎক্ষণাত তাহাদের উপর হইতে অস্ত্র সংবরণ করিবে (মুসলিম, কিতাবুল-জিহাদ)।
অধিক রক্তপাত যেন না হয় সেইজন্য তিনি এমনভাবে অভিযান পরিচালনা করিতেন যেন শত্রুপক্ষ টের না পাইয়া হতবুদ্ধি হইয়া পড়ে এবং অল্পতে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২০খ., ৬৩৪)। আল্লাহর সাহায্যে যখন রাসূলুল্লাহ (স) আনন্দদায়ক কিছু অর্জন করিতেন, তখন কৃতজ্ঞতার সিজদা আদায় করিতেন (আত-তিরমিযী, ১খ., পৃ. ১৯১)।
গ্রন্থপঞ্জী : (১) আল-কুরআনুল কারীম; (২) ইমাম বুখারী, আস-সহীহ, এম বশীর এণ্ড সন্স, ভারত, ১খ., ২খ.; (৩) ইমাম মুসলিম, কুতুবখানা রহীমিয়া, ভারত, ২খ.; (৪) ইমাম তিরমিযী, আল-জামে', কুতুবখানা রহীমিয়া, দিল্লী, ১খ., ২খ.; (৫) ইমাম আবূ দাউদ, আস্-সুনান, দারু ইহয়াইস সুন্নাতিন্নাবাৰী, ৪খ.; (৬) ইমাম ইবন মাজা, আস্-সুনান, এম বশীর
এণ্ড সন্স, কলিকাতা; (৭) ইমাম আহমাদ ইব্ন হাম্বাল, আল-মুসনাদ, দারুল হাদীছ কায়রো; (৮) ইমাম গাযালী, ইহয়াউ ‘উলূমিদ্দীন, দারুল মা'রিফা, বৈরূত, ৩খ.; (৯) ইব্ন সা'দ, আত্-তাবাকাত, দারু সাদির, বৈরূত, ২খ., ১খ.; (১০) কাদী 'ইয়াদ, আশ্-শিফা, মাকতাবুল-ফারাবী, দামিশক; (১১) ইবনুল জাওযী, আল-ওয়াফা, দারু ইয়াইত-তুরাছ আল-আরাবী, বৈরূত, ২খ.; (১২) ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, কায়রো, ২খ.; (১৩) মুহাম্মাদ আবদুল আযীয, আল-আদাবুন-নাবাবী, দারুল-মা'রিফা, বৈরূত, তা. বি.; (১৪) ইমাম তিরমিযী, আশ-শামাইল, কুতুবখানা রহীমিয়া (আল-জামি সংশ্লিষ্ট), দিল্লী; (১৫) ইমাম কুরতুবী, আল-জামি'উ লি-আহকামিল-কুরআন, দারুল হাদীছ, কায়রো ১৭ খ.; (১৬) সায়্যিদ কুত্ব, ফী যিলালিল কুরআন, কায়রো, ৬খ.; (১৭) ইব্ন মানযূর, লিসানুল-আরাব, বৈরূত, ১০খ.; (১৮) ইমাম রাগিব, আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল-কুরআন; (১৯) মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স), বৈরূত, ১ম সং. ১৪১৭ হি. / ১৯৯৭ খৃ.; (২০) হাফিজ আবূ শায়খ ইসফাহানী, আখলাকুন-নবী, ই.ফা.বা. ১৪১৮ হি. / ১৯৯৮ খৃ.; (২১) ইউসুফ কান্ধলভী, হায়াতুস-সাহাবা, ৩খ.; (২২) ইমাম নববী, রিয়াদুস-সালিহীন, ভারত; (২৩) ইমাম কাসতাল্লানী, আল-মাওয়াহিবুল্লাদুন্নিয়া, আল-মাকতাবুল-ইসলামী, ২খ.; (২৪) ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, 'আলামুল-কুতুব, লণ্ডন তা. বি., ২খ.; (২৫) ইবন হাজার আল-'আসকালানী, তাহযীবুত তাহযীব, দারুল মা'রিফা, বৈরূত তা.বি., ১০খ.; (২৬) মাওলানা আমিনুল ইসলাম, তাফসীরে নূরুল কোরআন, আল-বালাগ প্রকাশনী, ঢাকা, ২৯খ.; (২৭) ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ইসলামী বিশ্বকোষ, ঢাকা; (২৮) ইসলামী বিশ্বকোষ সম্পাদনা পরিষদ, হযরত রাসূল করীম (স) জীবন ও শিক্ষা, ই.ফা.বা.; (২৯) ইব্ন কাছীর, শামাইলুর-রাসূল, দারুল মা'রিফা, বৈরূত, তা.বি.; (৩০) মুহাম্মাদ ইসমাঈল আস-সানআন, সুবুলুস-সালাম, দারুল হাদীছ, কায়রো, ১ম সং. ১৪১৭ হি. /১৯৯৭ খৃ.; (৩১) সুলায়মান ইব্ন আবদুল হানলালী, বাহজাতুন-নাজিরীন, দারু ইব্ন জাওযী, ১ম সং. ১৪১৫ হি. /১৯৯৪ খৃ., ১খ.; (৩২) ঈদে মিলাদুন্নবী স্মরণিকা, সং ১৪২২ হিজরী, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ।
খান মুহম্মদ ইলিয়াস