📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (ঘ) ছোটদের সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর উত্তম আখলাকের নিদর্শন

📄 (ঘ) ছোটদের সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর উত্তম আখলাকের নিদর্শন


মহান আল্লাহ্ কর্তৃক ঘোষিত সর্বোত্তম আখলাকের অধিকারী মহানবী (স) তাঁহার উত্তম আখলাক হইতে ছোটদেরকেও বঞ্চিত করেন নাই। শিশুদের সহিত তিনি উত্তম আখলাকের যে পরিচয় দিয়াছেন বিশ্ববাসীর জন্য তাহা কিয়ামত পর্যন্ত আদর্শ হইয়া থাকিবে। তিনি শিশুদের পর্যন্ত আগে সালাম দিতেন, তাহাদেরও মনরক্ষা করিবার জন্য কোন কিছু করিতে দ্বিধাবোধ করিতেন না। হযরত আনাস (রা) এক বর্ণনায় বলেন, একদা নবী করীম (স) কতিপয় বালকের নিকট দিয়া যাইতেছিলেন। তখন তিনি তাহাদেরকে সালাম দেন (আখলাকুন-নবী, পৃ. ৬৭)।
অপর এক বর্ণনায় হযরত আনাস (রা) বলেন, মদীনার ছোট্ট বালিকাদের মধ্যে কোন এক বালিকা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিত এবং তাঁহার হাত ধরিত। তিনি বালিকাটির হাত হইতে নিজের হাত গুটাইয়া নিতেন না। সে যেইখানে ইচ্ছা তাঁহাকে হাত ধরিয়া নিয়া যাইত (আখলাকুন-নবী, পৃ. ১৪)।
একবার রাসূলুল্লাহ (স) হযরত হাসান ও হযরত হুসায়নকে কাঁধে বহন করিয়া বাহিরে আসিলে জনৈক ব্যক্তি বলিলেন, মণিরা! তোমরা কত ভাগ্যবান যে, অতি উৎকৃষ্ট সওয়ারী পাইয়াছ। তিনি বলিলেন, আরোহীও তো কত ভাল (আত-তিরমিযী)।
হাদীছে আসিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) যখন নামাযে সিজদায় যাইতেন তখন কখনও কখনও হাসান, হুসায়ন ভাঁতাদ্বয় তাহার পিঠে আসিয়া সওয়ার হইতেন। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদেরকে অধিক আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ দানের জন্য সিজদা দীর্ঘায়িত করিতেন।
অপর এক বর্ণনায় আসিয়াছে, তিনি যখন সওয়ারীতে আরোহণ করিতেন তখন অগ্র-পশ্চাতে শিশুদিগকে তুলিয়া লইতেন এবং সেই অবস্থাতেই গৃহে প্রত্যাবর্তন করিতেন (হযরত রাসূল করীম (স): জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ২৮৪; ইবন মাজাহ, কিতাবুল-আদাব)।
অনেক সময় শিশুরা তাঁহার কাপড়ে পেশাব করিয়া দিত, কিন্তু তিনি তাহাদিগকে কিছুই বলিতেন না; বরং পানি আনাইয়া উহা পরিষ্কার করিয়া লইতেন (প্রাগুক্ত)।
কোন কোন শিশু তাঁহার মোহরে নবুওয়াত লইয়া খেলায় মাতিয়া উঠিত; কেহ বারণ করিতে গেলে তিনি নিষেধ করিতেন (প্রাগুক্ত)।
শিশুদের সহিত তাহাদের বোধশক্তি অনুযায়ী কথা বলিতেন। আবিসiniya হইতে আগত একটি শিশুকন্যাকে হাসানা শব্দের পরিবর্তে তাহারই ভাষায় সানাহ, সানাহ বলিয়া সোহাগ করিতেন (প্রাগুক্ত)।
উপঢৌকন আসিলে উহাতে শিশুদের অংশ নির্দিষ্ট করিয়া রাখিতেন। একবার কালো রেখাবিশিষ্ট কাপড়ের হাদিয়া আসিলে তিনি উম্মু খালিদ নাম্নী এক বালিকাকে ডাকিলেন এবং তাহাকে একটি পরিধেয় নিজ হাতে পরিধান করাইয়া বলিলেন, পরিধান করিয়া জীর্ণ কর (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২০খ., ৬৬৩)।
কোন শিশুকে ডাকিতে হইলে یابنی হে বৎস! বলিয়া ডাকিতেন (আবূ দাউদ, কিতাবুল আদাব; মুসলিম, কিতাবুল-আদাব)।
তিনি শিশুদের সহিত আনন্দ-কৌতুকও করিতেন। হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণিত এক হাদীছে আসিয়াছে, তাহার ছোট ভাই 'উমায়র-এর একটি পোষা পাখী মারা গেলে তিনি তাহার মনোরঞ্জনের জন্য বলিতেন, يا ابا عمير ما فعل النغيرহ আবূ উমায়র! তোমার নুগায়রের কি হইল (আত-তিরমিযী, শামাইল, পৃ. ১৬; তিরমিযী, আস-সুনান, ২খ., ২০)?
নুগায়র-এর অর্থ হয় পাখীর বাচ্চা। রাসূলুল্লাহ (স) উমায়র-এর সহিত মিলাইয়া নুগায়র শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন, যাহাতে সে কিছুটা আনন্দবোধ করে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (ঙ) অমুসলিমদের সহিত আচার-ব্যবহারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উত্তম আখলাকের উদাহরণ

📄 (ঙ) অমুসলিমদের সহিত আচার-ব্যবহারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উত্তম আখলাকের উদাহরণ


রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাক এতই উন্নত ছিল যে, অমুসলিমগণও তাঁহার উত্তম আখলাক হইতে বঞ্চিত হয় নাই। হুনায়নের যুদ্ধে প্রায় হয় সহস্র অমুসলিম নর-নারী বন্দী হয়। আরবের প্রাচীন রীতি অনুযায়ী তাহাদের সকলকে গোলাম-বাঁদীতে পরিণত করা যাইত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সকলকে তাহাদের সম্প্রদায়ের অবশিষ্ট লোকদের নিবেদনক্রমে সসম্মানে মুক্তি দান করেন (আত-তাবাকাত, ২খ, পৃ. ১৫৪)।
অনেক সময় রাসূলুল্লাহ (স) অমুসলিমদেরকে গনীমতের মালও দান করিতেন। তিনি হুনায়নের যুদ্ধের পর প্রাপ্ত গনীমতের মাল হইতে সাওয়ান ইবন উমায়্যাকে এক শত উট দান করিয়াছিলেন (সহীহ মুসলিম, ২খ, পৃ. ২৪৪)।
একদা তাঁহার ও হযরত মূসা (আ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে জনৈক মুসলিম ও ইয়াহুদীর মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (স)-এর কর্ণগোচর হইলে তিনি ইয়াহুদীর সমর্থনে বলিলেন, তোমরা হযরত মূসা (আ)-এর উপর আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিও না। কারণ কিয়ামতের দিন মানুষ যখন সংজ্ঞাহীন হইয়া যাইবে তখন সর্বপ্রথম আমারই চেতনা লাভ হইবে। তখন আমার দৃষ্টিতে পড়িবে মূসা (আ) আরশের খুঁটি ধরিয়া দণ্ডায়মান রহিয়াছেন। আমি জানি না, তিনি কি আমার পূর্বে সংজ্ঞাপ্রাপ্ত হইবেন অথবা তিনি আদৌ সংজ্ঞা হারাইবেন কি না (আল-বুখারী, আল-আমবিয়া; মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৪৫; আহমাদ ইবন হাম্বল, মুসনাদ, ২খ., পৃ. ২৬৪)।
রাসূলুল্লাহ (স) অমুসলিমদেরকে পূর্ণ আন্তরিকতার সহিত মেহমানদারী করিতেন। তাহারা অনেক সময় প্রচুর পরিমাণ আহার্যে উদরপূর্তি করিত। একবার এক অমুসলিম মেহমান সাতটি বফরীর দুধ নিঃশেষ করিয়া দিয়াছিল (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২০খ., ৬৬২; আত-তিরমিযী, হাদীছ; ১৮১৯)। অনেক সময় অমুসলিম মেহমান মজলিসে শিষ্টাচার ভঙ্গ করিত; কিন্তু তিনি তাহাদিগকে মার্জনা করিয়া দিতেন। তাঁহার গৃহে কোন অমুসলিম মেহমানের আগমন ঘটিলে তিনি তাহাদের আদর-যত্নে কোন ত্রুটি করিতেন না। তিনি স্বহস্তে তাহাদের পরিবেশন করিতেন (আত-তিরমিযী, আবওয়াবুল-আদাব)।
নাজরানের নাসারাদেরকে তিনি কেবল মসজিদে অবস্থান করিতেই দেন নাই বরং তাহাদিগকে তাহাদের নিয়ম অনুযায়ী উপাসনা করিবারও অনুমতি দিয়াছিলেন (আল-বুখারী, কিতাবুল-আদাব; হযরত রাসূল করীম (স) জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ২৮৫)।
মানবিকতা-ও সামাজিকতার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (স) মুসলিম-অমুসলিমের মধ্যে তারতম্য করিতেন না। তিনি মুশরিকদের উপহার-উপঢৌকন গ্রহণ করিতেন এবং তাহাদিগকে বদলাও দিতেন (আত-তিরমিযী, ১খ., পৃ. ১৯১)। তিনি কোন কোন ইয়াহুদীর রোগশয্যায় গিয়া কুশল
কামনা করিতেন এবং তাহাদিগকে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানাইতেন (আল-বুখারী, 'ইয়াদাতুল- মুশরিক; হযরত রাসূল করীম (স), জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ২৮৫)।
সুবিচারের ক্ষেত্রে নবী পাক (স)-এর নিকট মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে কোন তফাৎ ছিল না। বহুবার তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে অমুসলমানদের পক্ষে রায় দিয়াছেন। জনৈক ইয়াহুদী জনৈক মুসলমানকে কিছু ঋণ দিয়াছিল। খায়বার যুদ্ধের সময় সে তাগাদা আরম্ভ করে। মুসলমান ব্যক্তি অবকাশ চাহিলে ইয়াহুদী সময় দিতে অস্বীকার করিল। এই ক্ষেত্রে নবী কারীম (স) ঋণী ব্যক্তিকে সত্বর ঋণ পরিশোধ করিবার নির্দেশ দেন এবং ঋণ পরিশোধ করিতে না পারিলে ঋণদাতাকে তাহার কিছু পরিধেয় বস্ত্র লইয়া যাওয়ারও অনুমতি দেন (মুসনাদ ইমাম আহমদ, ৩খ., পৃ. ৪২৩)। খায়বার বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (স) চাষাবাদের সমস্ত কাজ ইয়াহুদীদের নিকট সমর্পণ করেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (চ) দুর্ব্যবহারকারীদের সহিত উত্তম আখলাকের নিদর্শন

📄 (চ) দুর্ব্যবহারকারীদের সহিত উত্তম আখলাকের নিদর্শন


সর্বশ্রেষ্ঠ আখলাকের অধিকারী রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাকের মহত্ত্বে কোন দুর্ব্যবহারকারীর চরম দুর্ব্যবহারেও ঘাটতি ঘটাইতে পারে নাই। দুর্ব্যবহারকারী দুর্ব্যবহার করিয়া যাইতেছে কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার শ্রেষ্ঠ আখলাকসুলভ ব্যবহারে অটল। তায়েফে তাঁহার সহিত তায়েফবাসীদের দুর্ব্যবহার কাহার না লোমকূপে শিহরণ জাগায়। একদিকে অপমান, অপরদিকে প্রস্তরাঘাতে শরীর জর্জরিত করিয়া দেওয়া হইয়াছে। হযরত আইশা (রা) একদা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! উহুদ হইতে কঠিন দিন কি কখনও আপনার উপর আসিয়াছে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হাঁ, আমি তোমাদের জাতির নিকট হইতে এমন আচরণেরও সম্মুখীন হইয়াছি যাহা উহুদের চাইতেও অধিক কঠিন ছিল। তাহা হইতেছে তায়িফের ঘটনা (বিস্তারিত দ্র. সীরাত বিশ্বকোষ ৫ম খণ্ড, পৃ. ১১৮-১২৫)। হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণিত এক হাদীছে তিনি বলেন, জনৈক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে হাযির হইয়া কিছু প্রার্থনা করিল। নবী কারীম (স) একটি চাদর পরিহিত ছিলেন। লোকটি প্রার্থনার আতিশয্যে তাঁহার চাদর ধরিয়া এত জোরে টান দিল যে, চাদরটি ফাঁড়িয়া গিয়া একপার্শ্ব নবী করীম (স)-এর কাঁধের উপর ঝুলিতে থাকে। নবী করীম (স) লোকটির এই আচরণ সত্ত্বেও তাহাকে কিছু দান করিতে নির্দেশ দেন (আখলাকুন-নবী, পৃ. ১০৬)।
একবার রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদের সহিত মসজিদে উপবিষ্ট ছিলেন। তখন জনৈক বেদুঈন সেইখানে আসিল এবং মসজিদের ভিতর পেশাব করিল। সাহাবীগণ তাহাকে বাধা দিয়া বলিতে লাগিলেন, থাম! থাম! তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, বাধা দিও না। পেশাব করা শেষ হইলে তিনি লোকটিকে ডাকিলেন এবং বলিলেন, দেখ, এ মসজিদগুলি পেশাব-পায়খানা কিংবা এই জাতীয় কোন আবর্জনা ফেলার জায়গা নয়। এইগুলি পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহ পাকের যিকির ও সালাত আদায় করার স্থান। অতঃপর তিনি এক বালতি পানি আনিতে নির্দেশ দেন এবং উহা দ্বারা সেই জায়গাটি পরিষ্কার করাইয়া দেন (আখলাকুন-নবী,
হযরত জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রা) হইতে বর্ণিত একটি হাদীছে তিনি একটি ঘটনার উল্লেখ করিয়া বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) মাহারিবে খাছফা নামক একটি স্থানে যুদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে অবস্থান করিতেছিলেন। কাফিররা মুসলমানদের অসতর্কতার সুযোগ খুঁজিতেছিল। জনৈক কাফির চুপিসারে আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর শিয়রে দাঁড়াইল এবং বলিল, এখন তোমাকে আমার হাত হইতে কে রক্ষা করিবে? তিনি বলিলেন, আল্লাহ। তৎক্ষণাৎ তাঁহার হাত হইতে তরবারি পড়িয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) তরবারিটি তুলিয়া লইলেন এবং বলিলেন, এখন তোমাকে আমার হাত হইতে কে রক্ষা করিবে? সে বলিল, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আপনি উত্তম তরবারি ধারণকারী হউন। অবশেষে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ছাড়িয়া দিলেন। লোকটি তাহার সঙ্গীদের নিকট আসিয়া বলিল, আমি সর্বোত্তম ব্যক্তির হাত হইতে মুক্তি পাইয়া তোমাদের নিকট আসিয়াছি (আখলাকুন-নবী, পৃ. ২৯)।
মক্কাবাসী ইসলাম ও মুসলমানদের উপর যে অত্যাচার করিয়াছিল তাহার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। ইহার পরও যখন মক্কা বিজয় হইল তখন সেই অত্যাচারীদের সহিত কি মহৎ আচরণটাই না নবী করীম (স) করিলেন! হযরত উমর (রা) বলেন, যখন মক্কা বিজয়ের দিন আসিল, রাসূলুল্লাহ (স) সাফওয়ান ইবন উমায়্যা ইব্‌ন খালাফ, আবূ সুফ্যান ইব্‌ হাব ও হারিছ ইব্‌ন হিশামকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। হযরত উমার (রা) বলেন, আমি আপন মনে বলিলাম, আজ আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাহাদের কৃতকর্মের শান্তি প্রদান ও প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ দান করিবেন। কেননা স্পষ্টতই ইহারা যুদ্ধাপরাধী। নবী কারীম (স) তাহাদেরকে হত্যা করাইবেন এবং আমার দ্বারাই এই কাজ করাইবেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) দীর্ঘ বাদানুবাদের পর বলিলেন, এখন আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত সম্পূর্ণ হযরত ইউসুফ (আ) তাঁহার ভ্রাতাদের ও তাঁহার ভাইদের মত। এইজন্য আমি তাহাই বলিব যাহা হযরত ইউসুফ (আ) বলিয়াছিলেন : لَا تَشْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ "তোমাদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিশোধ নাই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন।” হযরত উমার (রা) বলেন, আমি লজ্জায় নতমুখ হইয়া গেলাম। আমি যেইখানে প্রতিশোধ গ্রহণের প্রস্তুতি লইতেছি, আনন্দ উল্লাস করিতেছি, তিনি সেইখানে আজীবনের জানের দুশমনদেরকে ক্ষমার সুসংবাদ শুনাইতেছেন (আখলাকুন-নবী, পৃ. ৩৮)।
একবার এক ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাক পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে প্রথমে নিজে আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত কিছু লেনদেন করিল। অতঃপর তাহার পাওনা পরিশোধের নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই আসিয়া সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত দুর্ব্যবহার করিতে শুরু করিল এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাদরের উভয় পার্শ্ব ধরিয়া সজোরে টানিয়া বলিল, আবদুল মুত্তালিবের গোষ্ঠীর মধ্যে আমি আপনাকে চিনি, আপনি অত্যন্ত টালবাহানাকারী। হযরত উমার (রা) এই কথা শুনিয়া তাহার গর্দান উড়াইয়া দেওয়ার হুমকি দিলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে মৃদু হাসিয়া বলিলেন, তোমার বরং উচিৎ ছিল আমাকে যথাসময়ে কর্জ পরিশোধ করিতে বলা এবং তাহাকে নরম ভাষায় চাওয়ার নির্দেশ দেওয়া। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) উমার (রা)-কে বলিলেন, তাহার পাওনা পরিশোধ করিয়া দাও এবং ধমক দেওয়ার জন্য আরও বিশ সা' বেশী দাও। তিনি
তাহাই করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই আখলাকের পরিচয় পাইয়া লোকটি ইসলাম গ্রহণ করিল (আখলাকুন-নবী, পৃ. ১২২-১২৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (ছ) জিহাদের ময়দানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাক

📄 (ছ) জিহাদের ময়দানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাক


মদীনার জীবনে মহানবী (স)-কে বহুবার ইসলামের দুশমনদের সহিত মুকাবিলা করিতে হয় এবং সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করিতে হয়। প্রচলিত যুদ্ধ বিচার-বুদ্ধির পরিবর্তে আবেগ-উদ্দীপনা দ্বারা পরিচালিত হইত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর মহান চরিত্রে এই সকল ক্ষেত্রেও সর্বদা ন্যায়পরায়ণতা ও ভারসাম্য সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। এই সকল ক্ষেত্রেও তাঁহার উত্তম আখলাক জগতকে বিস্ময়াভিভূত করিয়াছে। যুদ্ধের ময়দানে মুজাহিদগণের প্রতি তাঁহার নির্দেশ ছিল কেবল আল্লাহ তা'আলার মহান বাণী সমুন্নত রাখিবার উদ্দেশ্যেই জিহাদ করিবে (আল-বুখারী, কিতাবুল-জিহাদ; মুসলিম, কিতাবুল-জিহাদ)।
কোন যুদ্ধে মুজাহিদগণকে বিদায় করিবার সময় তিনি মদীনার উপকণ্ঠ পর্যন্ত গমন করিতেন। তিনি তাহাদেরকে এবং তাহাদের দীনকে আল্লাহর আশ্রয়ে ন্যস্ত করিতেন। ইহা ছাড়া এই উপদেশ প্রদান করিতেন যে, আল্লাহকে সর্বাবস্থায় ভয় করিবে এবং স্বীয় সঙ্গী মুসলমানদের কল্যাণ কামনা করিবে। তারপর বলিতেন, আল্লাহর উদ্দেশ্যে কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করিবে; অসাধুতা ও অঙ্গীকার ভঙ্গ করিবে না। নিহতের নাক-কান কর্তন (মুছলা) করিবে না, শিশু ও নারীদের হত্যা করিবে না (আল-বুখারী, ১খ., পৃ. ৪১৫; আত-তিরমিযী, ১খ., পৃ. ১৯১)।
কোন যুদ্ধে শত্রুদের প্রতিরোধকল্পে যেই কৌশলই বিবেচিত হইত তিনি সেই কৌশল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সাহাবীদের সহিত শরীক থাকিতেন। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খনন উহার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত (আল-বুখারী, কিতাবুল-জিহাদ, ১খ., ৩৯৮)।
সাহাবায়ে কিরামের প্রতি তাঁহার নির্দেশ ছিল : যদি শত্রু তোমাদের উপর হামলা করে এবং তাহারা তোমাদের হামলার সময় কালেমা পাঠ করে তবে তৎক্ষণাত তাহাদের উপর হইতে অস্ত্র সংবরণ করিবে (মুসলিম, কিতাবুল-জিহাদ)।
অধিক রক্তপাত যেন না হয় সেইজন্য তিনি এমনভাবে অভিযান পরিচালনা করিতেন যেন শত্রুপক্ষ টের না পাইয়া হতবুদ্ধি হইয়া পড়ে এবং অল্পতে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২০খ., ৬৩৪)। আল্লাহর সাহায্যে যখন রাসূলুল্লাহ (স) আনন্দদায়ক কিছু অর্জন করিতেন, তখন কৃতজ্ঞতার সিজদা আদায় করিতেন (আত-তিরমিযী, ১খ., পৃ. ১৯১)।
গ্রন্থপঞ্জী : (১) আল-কুরআনুল কারীম; (২) ইমাম বুখারী, আস-সহীহ, এম বশীর এণ্ড সন্স, ভারত, ১খ., ২খ.; (৩) ইমাম মুসলিম, কুতুবখানা রহীমিয়া, ভারত, ২খ.; (৪) ইমাম তিরমিযী, আল-জামে', কুতুবখানা রহীমিয়া, দিল্লী, ১খ., ২খ.; (৫) ইমাম আবূ দাউদ, আস্-সুনান, দারু ইহয়াইস সুন্নাতিন্নাবাৰী, ৪খ.; (৬) ইমাম ইবন মাজা, আস্-সুনান, এম বশীর
এণ্ড সন্স, কলিকাতা; (৭) ইমাম আহমাদ ইব্‌ন হাম্বাল, আল-মুসনাদ, দারুল হাদীছ কায়রো; (৮) ইমাম গাযালী, ইহয়াউ ‘উলূমিদ্দীন, দারুল মা'রিফা, বৈরূত, ৩খ.; (৯) ইব্‌ন সা'দ, আত্-তাবাকাত, দারু সাদির, বৈরূত, ২খ., ১খ.; (১০) কাদী 'ইয়াদ, আশ্-শিফা, মাকতাবুল-ফারাবী, দামিশক; (১১) ইবনুল জাওযী, আল-ওয়াফা, দারু ইয়াইত-তুরাছ আল-আরাবী, বৈরূত, ২খ.; (১২) ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, কায়রো, ২খ.; (১৩) মুহাম্মাদ আবদুল আযীয, আল-আদাবুন-নাবাবী, দারুল-মা'রিফা, বৈরূত, তা. বি.; (১৪) ইমাম তিরমিযী, আশ-শামাইল, কুতুবখানা রহীমিয়া (আল-জামি সংশ্লিষ্ট), দিল্লী; (১৫) ইমাম কুরতুবী, আল-জামি'উ লি-আহকামিল-কুরআন, দারুল হাদীছ, কায়রো ১৭ খ.; (১৬) সায়্যিদ কুত্ব, ফী যিলালিল কুরআন, কায়রো, ৬খ.; (১৭) ইব্‌ন মানযূর, লিসানুল-আরাব, বৈরূত, ১০খ.; (১৮) ইমাম রাগিব, আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল-কুরআন; (১৯) মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স), বৈরূত, ১ম সং. ১৪১৭ হি. / ১৯৯৭ খৃ.; (২০) হাফিজ আবূ শায়খ ইসফাহানী, আখলাকুন-নবী, ই.ফা.বা. ১৪১৮ হি. / ১৯৯৮ খৃ.; (২১) ইউসুফ কান্ধলভী, হায়াতুস-সাহাবা, ৩খ.; (২২) ইমাম নববী, রিয়াদুস-সালিহীন, ভারত; (২৩) ইমাম কাসতাল্লানী, আল-মাওয়াহিবুল্লাদুন্নিয়া, আল-মাকতাবুল-ইসলামী, ২খ.; (২৪) ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, 'আলামুল-কুতুব, লণ্ডন তা. বি., ২খ.; (২৫) ইবন হাজার আল-'আসকালানী, তাহযীবুত তাহযীব, দারুল মা'রিফা, বৈরূত তা.বি., ১০খ.; (২৬) মাওলানা আমিনুল ইসলাম, তাফসীরে নূরুল কোরআন, আল-বালাগ প্রকাশনী, ঢাকা, ২৯খ.; (২৭) ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ইসলামী বিশ্বকোষ, ঢাকা; (২৮) ইসলামী বিশ্বকোষ সম্পাদনা পরিষদ, হযরত রাসূল করীম (স) জীবন ও শিক্ষা, ই.ফা.বা.; (২৯) ইব্‌ন কাছীর, শামাইলুর-রাসূল, দারুল মা'রিফা, বৈরূত, তা.বি.; (৩০) মুহাম্মাদ ইসমাঈল আস-সানআন, সুবুলুস-সালাম, দারুল হাদীছ, কায়রো, ১ম সং. ১৪১৭ হি. /১৯৯৭ খৃ.; (৩১) সুলায়মান ইব্‌ন আবদুল হানলালী, বাহজাতুন-নাজিরীন, দারু ইব্‌ন জাওযী, ১ম সং. ১৪১৫ হি. /১৯৯৪ খৃ., ১খ.; (৩২) ঈদে মিলাদুন্নবী স্মরণিকা, সং ১৪২২ হিজরী, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ।
খান মুহম্মদ ইলিয়াস

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00