📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (খ) পারিবারিক পর্যায়ে আখলাকের নিদর্শন

📄 (খ) পারিবারিক পর্যায়ে আখলাকের নিদর্শন


বিভিন্ন হাদীছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর পারিবারিক পর্যায়ের আখলাকের দৃষ্টান্ত বর্ণিত হইয়াছে। আসওয়াদ (র) হইতে বর্ণিত এক হাদীছে হযরত 'আইশা (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পরিজনের সহিত কিরূপ আচরণ করিতেন? তিনি বলিলেন, তিনি তাঁহার পরিজনের সহিত কাজে লগিয়া থাকিতেন। যখন সালাতের সময় হইত তখন সালাতের জন্য দণ্ডায়মান হইতেন এবং সালাত আদায় করিতেন (আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৯২)।
অপর এক বর্ণনায় আসিয়াছে, কেহ হযরত আইশা (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) কিভাবে তাঁহার গৃহে সময় কাটাইতেন? তিনি উত্তর দিলেন, তিনিও তোমাদের মত গৃহস্থালীর কাজকর্মে মশগুল থাকিতেন। নিজের কাপড় এবং নিজের জুতা নিজেই সেলাই করিতেন (আখলাকুন-নবী, পৃ. ৪)।
পরিবার-পরিজনের সহিত আখলাকের এক বিরল দৃষ্টান্ত বর্ণিত হইয়াছে হযরত আইশা (রা)-এর একটি হাদীছে। তিনি বলেন, আমি নবী করীম (স)-এর গৃহে কাপড়ের পুতুল নিয়া খেলা করিতাম। আমার কিছু সখীও ছিল। তাহারা আমার কাছে আসিয়া আমার সহিত খেলা করিত, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে আসিতে দেখিলে গৃহের এইদিক সেইদিক লুকাইয়া থাকিত। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদেরকে এইদিক সেইদিক হইতে একত্র করিয়া পুনরায় আমার নিকট পাঠাইয়া দিতেন। তাহারা পুনরায় আমার সহিত খেলা করিত (আখলাকুন- নবী, পৃ. ৫)।
অপর এক বর্ণনায় হযরত আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমার হুজরার দরজায় দাঁড়াইয়াছিলেন। হাবশী লোকেরা তখন মসজিদে নববীতে যুদ্ধের কসরত দেখাইতেছিল। আমিও দাঁড়াইয়া তাহাদের কসরত দেখিতেছিলাম। তিনি আমাকে তাঁহার চাদর দ্বারা আড়াল করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন এবং যেই পর্যন্ত আমি সেইখান হইতে সরিয়া না আসি সেই পর্যন্ত তিনি সেইখানে দাঁড়াইয়া থাকিলেন। হযরত আইশা (রা) বলেন, তোমরা অনুমান কর, একজন অল্প বয়সী বালিকার খেলাধুলার প্রতি কতখানি আগ্রহ থাকিতে পারে (আখলাকুন- নবী, পৃ. ১২)!
হযরত জাবির (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) অত্যন্ত সহজ সরল ছিলেন। হযরত আইশা (রা) যখন কোন কিছু কামনা করিতেন তখন তিনি তাহা পূরণ করিতেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭)।
পারিবারিক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাকের এক চিত্তাকর্ষক বর্ণনা আসিয়াছে হযরত আইশা (রা)-এর সহিত তাঁহার দৌড় প্রতিযোগিতা সম্পর্কে। হযরত আইশা (রা) বলেন, আমি নবী করীম (স)-এর সহিত সফরে গিয়াছিলাম। আমি তখন অল্প বয়স্কা ছিলাম। শরীর মাংসল
ও ভারী ছিল না। তিনি লোকদিগকে বলিলেন, তোমরা অগ্রে চল। তাহারা আগাইয়া গেলে তিনি আমাকে বলিলেন, আস, দৌড় প্রতিযোগিতা করি। প্রতিযোগিতায় আমি অগ্রগামী হইলাম। তিনি নিশ্চুপ রহিলেন, আমাকে কিছু বলিলেন না। পরে যখন আমার শরীর মাংসল ও ভারী হইয়া গেল এবং আমি পূর্বের সেই প্রতিযোগিতার কথাও ভুলিয়া গেলাম, তখন আবার এক সফরে তাঁহার সহিত বাহিরে গেলাম। তিনি লোকদিগকে বলিলেন, তোমরা অগ্রে চল। তাহারা আগাইয়া গেলে তিনি আমাকে বলিলেন, আস, তোমার সহিত দৌড় প্রতিযোগিতা করি। এইবার প্রতিযোগিতায় তিনি অগ্রগামী হইলেন এবং হাসিয়া বলিলেন, এই জিত সেই জিতের বদলা (হায়াতুস-সাহাবা, পৃ. ৩৩)। এই ছিল দোজাহানের সরদার রাসূল কারীম (স)-এর পরিবার-পরিজনের সহিত মধুর আচরণের নমুনা।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (গ) সঙ্গীদের সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর উত্তম আখলাকের দৃষ্টান্ত

📄 (গ) সঙ্গীদের সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর উত্তম আখলাকের দৃষ্টান্ত


রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমগ্র জীবনই ছিল উত্তম আখলাকে পরিপূর্ণ। সুতরাং যেই সকল সঙ্গীদের সহিত তাঁহার জীবন ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত তাহাদের সহিত উত্তম আখলাকের অসংখ্য ঘটনা হাদীছে পাকে এবং সীরাতের কিতাবসমূহে বর্ণিত হইয়াছে। নিম্নে উহার কতিপয় দৃষ্টান্ত পেশ করা হইল।
এক বর্ণনায় হযরত জারীর (রা) বলেন, নবী কারীম (স) তাঁহার একটি গৃহে প্রবেশ করিলেন। গৃহটি লোকে পরিপূর্ণ হইয়া গেল। হযরত জারীর (রা) প্রবেশ করিয়া স্থান না পাইয়া গৃহের বাহিরে বসিয়া পড়িলেন। নবী কারীম (স) যখন তাঁহাকে দেখিলেন, তখন তিনি তাহার কাপড় ভাঁজ করিয়া জারীর (রা)-এর দিকে ছুড়িয়া দিলেন এবং বলিলেন, এই কাপড়টির উপর বস। জারীর (রা) ঐ কাপড়টি তুলিয়া তাহার চেহারায় লাগাইলেন এবং চুমু দিলেন (আখলাকুন-নবী, পৃ. ৩)। অর্থাৎ তাঁহার এক সঙ্গী বিছানা ছাড়া বাহিরে বসিবে, ইহা তিনি পসন্দ করিতে পারিলেন না।
এক হাদীছে হযরত আনাস (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর চরিত্রের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করিতে গিয়া বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত যখন সাহাবীদের মধ্যে কাহারও সহিত সাক্ষাৎ হইত তখন তিনি তাঁহার সহিত দাঁড়াইয়া থাকিতেন এবং যে পর্যন্ত সে পৃথক না হইত তিনি নিজে তাঁহার নিকট হইতে পৃথক হইতেন না। আর যখন কোন সাহাবী তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার সময় তাঁহার হাত মুবারক তাহার হাতে নিত, তখন যে পর্যন্ত ঐ সাহাবী তাহার হাত গুটাইয়া না নিতেন তিনি তাঁহার হাত মুবারক গুটাইয়া নিতেন না। আর কোন সাহাবী যখন তাঁহার সহিত মিলিত হইয়া তাঁহার কানে কানে কোন কথা বলিতে চাহিতেন, তখন তিনি তাঁহার কান তাহার দিকে পাতিয়া দিতেন এবং সেই সময় পর্যন্ত তাঁহার কান সরাইয়া আনিতেন না যেই পর্যন্ত ঐ ব্যক্তি নিজে সরাইয়া নিত (আখলাকুন-নবী, পৃ. ১১)।
"হযরত আনাস (রা) অপর এক হাদীছে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমত করিয়াছি। কিন্তু তিনি আমার কোন ত্রুটিতে কখনও আমাকে লজ্জা দেন নাই (আখলাকুন-
নবী, পৃ. ১৫)। হযরত আনাস (রা) আরও বলেন, রাসুলুল্লাহ (স) কখনও তাঁহার পদদ্বয় তাঁহার নিকট উপবেশনকারীর সামনে ছড়াইয়া বসেন নাই (আখলাকুন-নবী, পৃ. ১৭)।
অপর এক হাদীছে আনাস (রা) বর্ণনা করেন, জনৈক স্ত্রীলোকের বুদ্ধিতে কিছুটা ত্রুটি ছিল। সে বলিল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার সহিত আমার কিছু কথা আছে। রাসulুল্লাহ (স) বলিলেন, হে অমুকের মা! তুমি যে কোন এক রাস্তায় গিয়া দাঁড়াও যাহাতে আমিও তোমার সহিত যাইয়া দাঁড়াইতে পারি। অতঃপর তিনি তাহার সহিত যাইয়া একান্তে কথাবার্তা বলিলেন যতক্ষণ পর্যন্ত ঐ স্ত্রীলোকটি তাহার প্রয়োজন পূর্ণ না করে (আখলাকুন-নবী, পৃ. ১৪)।
হযরত আনাস (রা) আরও বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (স)-এর বহু বৎসর খিদমত করিয়াছি। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি আমাকে গালি দেন নাই, মারপিট করেন নাই, ধমক দেন নাই, চোখ রাঙান নাই। আর কোন বিষয়ে তিনি আমাকে তিরস্কারও করেন নাই, যাহা তিনি আমাকে করিতে আদেশ করিয়াছেন অথচ আমি তাহা করিতে আলস্য করিয়াছি। তাঁহার গৃহের কেহ এই ব্যাপারে আমাকে ভর্ৎসনা করিলে তিনি বলিতেন, আরে রাখ তো! যদি সম্ভব হইত তাহা হইলে তো করিতই (আখলাকুন-নবী, পৃ. ১৮)।
হযরত খাদীজা (রা) বলেন, আমরা যায়দ ইব্‌ন হারিছ (রা)-কে বলিলাম, রাসুলুল্লাহ (স)-এর আখলাক সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করুন। তিনি বলিলেন, আমি তাঁহার কোন আখলাক সম্পর্কে তোমাদরেকে অবহিত করিব? আমি তো তাঁহার প্রতিবেশী ছিলাম। তাঁহার উপর যখনই ওহী নাযিল হইত আমাকে ডাকিয়া পাঠাইতেন। আমি তাহা লিখিয়া ফেলিতাম। আর আমরা যখন দুনিয়া সম্পর্কে আলোচনা করিতাম, তিনিও আমাদের সহিত আলোচনায় অংশ নিতেন (আখলাকুন-নবী, পৃ. ২)।
হযরত ইব্‌ন মাসঊদ (রা) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, তোমাদের মধ্যে কেহ আমার কোন সাহাবী সম্পর্কে আমার নিকট কোন অভিযোগ করিবে না। কেননা আমি তোমাদের সামনে যখন আসিব, তখন তোমাদের ব্যাপারে আমার হৃদয় প্রশান্ত থাকুক ইহাই আমি চাই (আখলাকুন-নবী, পৃ. ৪০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (ঘ) ছোটদের সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর উত্তম আখলাকের নিদর্শন

📄 (ঘ) ছোটদের সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর উত্তম আখলাকের নিদর্শন


মহান আল্লাহ্ কর্তৃক ঘোষিত সর্বোত্তম আখলাকের অধিকারী মহানবী (স) তাঁহার উত্তম আখলাক হইতে ছোটদেরকেও বঞ্চিত করেন নাই। শিশুদের সহিত তিনি উত্তম আখলাকের যে পরিচয় দিয়াছেন বিশ্ববাসীর জন্য তাহা কিয়ামত পর্যন্ত আদর্শ হইয়া থাকিবে। তিনি শিশুদের পর্যন্ত আগে সালাম দিতেন, তাহাদেরও মনরক্ষা করিবার জন্য কোন কিছু করিতে দ্বিধাবোধ করিতেন না। হযরত আনাস (রা) এক বর্ণনায় বলেন, একদা নবী করীম (স) কতিপয় বালকের নিকট দিয়া যাইতেছিলেন। তখন তিনি তাহাদেরকে সালাম দেন (আখলাকুন-নবী, পৃ. ৬৭)।
অপর এক বর্ণনায় হযরত আনাস (রা) বলেন, মদীনার ছোট্ট বালিকাদের মধ্যে কোন এক বালিকা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিত এবং তাঁহার হাত ধরিত। তিনি বালিকাটির হাত হইতে নিজের হাত গুটাইয়া নিতেন না। সে যেইখানে ইচ্ছা তাঁহাকে হাত ধরিয়া নিয়া যাইত (আখলাকুন-নবী, পৃ. ১৪)।
একবার রাসূলুল্লাহ (স) হযরত হাসান ও হযরত হুসায়নকে কাঁধে বহন করিয়া বাহিরে আসিলে জনৈক ব্যক্তি বলিলেন, মণিরা! তোমরা কত ভাগ্যবান যে, অতি উৎকৃষ্ট সওয়ারী পাইয়াছ। তিনি বলিলেন, আরোহীও তো কত ভাল (আত-তিরমিযী)।
হাদীছে আসিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) যখন নামাযে সিজদায় যাইতেন তখন কখনও কখনও হাসান, হুসায়ন ভাঁতাদ্বয় তাহার পিঠে আসিয়া সওয়ার হইতেন। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদেরকে অধিক আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ দানের জন্য সিজদা দীর্ঘায়িত করিতেন।
অপর এক বর্ণনায় আসিয়াছে, তিনি যখন সওয়ারীতে আরোহণ করিতেন তখন অগ্র-পশ্চাতে শিশুদিগকে তুলিয়া লইতেন এবং সেই অবস্থাতেই গৃহে প্রত্যাবর্তন করিতেন (হযরত রাসূল করীম (স): জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ২৮৪; ইবন মাজাহ, কিতাবুল-আদাব)।
অনেক সময় শিশুরা তাঁহার কাপড়ে পেশাব করিয়া দিত, কিন্তু তিনি তাহাদিগকে কিছুই বলিতেন না; বরং পানি আনাইয়া উহা পরিষ্কার করিয়া লইতেন (প্রাগুক্ত)।
কোন কোন শিশু তাঁহার মোহরে নবুওয়াত লইয়া খেলায় মাতিয়া উঠিত; কেহ বারণ করিতে গেলে তিনি নিষেধ করিতেন (প্রাগুক্ত)।
শিশুদের সহিত তাহাদের বোধশক্তি অনুযায়ী কথা বলিতেন। আবিসiniya হইতে আগত একটি শিশুকন্যাকে হাসানা শব্দের পরিবর্তে তাহারই ভাষায় সানাহ, সানাহ বলিয়া সোহাগ করিতেন (প্রাগুক্ত)।
উপঢৌকন আসিলে উহাতে শিশুদের অংশ নির্দিষ্ট করিয়া রাখিতেন। একবার কালো রেখাবিশিষ্ট কাপড়ের হাদিয়া আসিলে তিনি উম্মু খালিদ নাম্নী এক বালিকাকে ডাকিলেন এবং তাহাকে একটি পরিধেয় নিজ হাতে পরিধান করাইয়া বলিলেন, পরিধান করিয়া জীর্ণ কর (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২০খ., ৬৬৩)।
কোন শিশুকে ডাকিতে হইলে یابنی হে বৎস! বলিয়া ডাকিতেন (আবূ দাউদ, কিতাবুল আদাব; মুসলিম, কিতাবুল-আদাব)।
তিনি শিশুদের সহিত আনন্দ-কৌতুকও করিতেন। হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণিত এক হাদীছে আসিয়াছে, তাহার ছোট ভাই 'উমায়র-এর একটি পোষা পাখী মারা গেলে তিনি তাহার মনোরঞ্জনের জন্য বলিতেন, يا ابا عمير ما فعل النغيرহ আবূ উমায়র! তোমার নুগায়রের কি হইল (আত-তিরমিযী, শামাইল, পৃ. ১৬; তিরমিযী, আস-সুনান, ২খ., ২০)?
নুগায়র-এর অর্থ হয় পাখীর বাচ্চা। রাসূলুল্লাহ (স) উমায়র-এর সহিত মিলাইয়া নুগায়র শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন, যাহাতে সে কিছুটা আনন্দবোধ করে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (ঙ) অমুসলিমদের সহিত আচার-ব্যবহারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উত্তম আখলাকের উদাহরণ

📄 (ঙ) অমুসলিমদের সহিত আচার-ব্যবহারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উত্তম আখলাকের উদাহরণ


রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাক এতই উন্নত ছিল যে, অমুসলিমগণও তাঁহার উত্তম আখলাক হইতে বঞ্চিত হয় নাই। হুনায়নের যুদ্ধে প্রায় হয় সহস্র অমুসলিম নর-নারী বন্দী হয়। আরবের প্রাচীন রীতি অনুযায়ী তাহাদের সকলকে গোলাম-বাঁদীতে পরিণত করা যাইত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সকলকে তাহাদের সম্প্রদায়ের অবশিষ্ট লোকদের নিবেদনক্রমে সসম্মানে মুক্তি দান করেন (আত-তাবাকাত, ২খ, পৃ. ১৫৪)।
অনেক সময় রাসূলুল্লাহ (স) অমুসলিমদেরকে গনীমতের মালও দান করিতেন। তিনি হুনায়নের যুদ্ধের পর প্রাপ্ত গনীমতের মাল হইতে সাওয়ান ইবন উমায়্যাকে এক শত উট দান করিয়াছিলেন (সহীহ মুসলিম, ২খ, পৃ. ২৪৪)।
একদা তাঁহার ও হযরত মূসা (আ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে জনৈক মুসলিম ও ইয়াহুদীর মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (স)-এর কর্ণগোচর হইলে তিনি ইয়াহুদীর সমর্থনে বলিলেন, তোমরা হযরত মূসা (আ)-এর উপর আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিও না। কারণ কিয়ামতের দিন মানুষ যখন সংজ্ঞাহীন হইয়া যাইবে তখন সর্বপ্রথম আমারই চেতনা লাভ হইবে। তখন আমার দৃষ্টিতে পড়িবে মূসা (আ) আরশের খুঁটি ধরিয়া দণ্ডায়মান রহিয়াছেন। আমি জানি না, তিনি কি আমার পূর্বে সংজ্ঞাপ্রাপ্ত হইবেন অথবা তিনি আদৌ সংজ্ঞা হারাইবেন কি না (আল-বুখারী, আল-আমবিয়া; মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৪৫; আহমাদ ইবন হাম্বল, মুসনাদ, ২খ., পৃ. ২৬৪)।
রাসূলুল্লাহ (স) অমুসলিমদেরকে পূর্ণ আন্তরিকতার সহিত মেহমানদারী করিতেন। তাহারা অনেক সময় প্রচুর পরিমাণ আহার্যে উদরপূর্তি করিত। একবার এক অমুসলিম মেহমান সাতটি বফরীর দুধ নিঃশেষ করিয়া দিয়াছিল (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২০খ., ৬৬২; আত-তিরমিযী, হাদীছ; ১৮১৯)। অনেক সময় অমুসলিম মেহমান মজলিসে শিষ্টাচার ভঙ্গ করিত; কিন্তু তিনি তাহাদিগকে মার্জনা করিয়া দিতেন। তাঁহার গৃহে কোন অমুসলিম মেহমানের আগমন ঘটিলে তিনি তাহাদের আদর-যত্নে কোন ত্রুটি করিতেন না। তিনি স্বহস্তে তাহাদের পরিবেশন করিতেন (আত-তিরমিযী, আবওয়াবুল-আদাব)।
নাজরানের নাসারাদেরকে তিনি কেবল মসজিদে অবস্থান করিতেই দেন নাই বরং তাহাদিগকে তাহাদের নিয়ম অনুযায়ী উপাসনা করিবারও অনুমতি দিয়াছিলেন (আল-বুখারী, কিতাবুল-আদাব; হযরত রাসূল করীম (স) জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ২৮৫)।
মানবিকতা-ও সামাজিকতার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (স) মুসলিম-অমুসলিমের মধ্যে তারতম্য করিতেন না। তিনি মুশরিকদের উপহার-উপঢৌকন গ্রহণ করিতেন এবং তাহাদিগকে বদলাও দিতেন (আত-তিরমিযী, ১খ., পৃ. ১৯১)। তিনি কোন কোন ইয়াহুদীর রোগশয্যায় গিয়া কুশল
কামনা করিতেন এবং তাহাদিগকে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানাইতেন (আল-বুখারী, 'ইয়াদাতুল- মুশরিক; হযরত রাসূল করীম (স), জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ২৮৫)।
সুবিচারের ক্ষেত্রে নবী পাক (স)-এর নিকট মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে কোন তফাৎ ছিল না। বহুবার তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে অমুসলমানদের পক্ষে রায় দিয়াছেন। জনৈক ইয়াহুদী জনৈক মুসলমানকে কিছু ঋণ দিয়াছিল। খায়বার যুদ্ধের সময় সে তাগাদা আরম্ভ করে। মুসলমান ব্যক্তি অবকাশ চাহিলে ইয়াহুদী সময় দিতে অস্বীকার করিল। এই ক্ষেত্রে নবী কারীম (স) ঋণী ব্যক্তিকে সত্বর ঋণ পরিশোধ করিবার নির্দেশ দেন এবং ঋণ পরিশোধ করিতে না পারিলে ঋণদাতাকে তাহার কিছু পরিধেয় বস্ত্র লইয়া যাওয়ারও অনুমতি দেন (মুসনাদ ইমাম আহমদ, ৩খ., পৃ. ৪২৩)। খায়বার বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (স) চাষাবাদের সমস্ত কাজ ইয়াহুদীদের নিকট সমর্পণ করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00