📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাক সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাক সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা


আখলাকের এই সকল বিবেচনায় মহানবী (স) ছিলেন সর্বোত্তম আখলাকের অধিকারী। রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনের এই সর্বোত্তম আখলাকের স্বীকৃতি কোন সাধারণ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃক নহে, বরং স্বয়ং আল্লাহ, রাসূলুল্লাহ (সা) নিজে এবং মুসলিম-অমুসলিম সকল শ্রেণীর মানুষ অকপটে এই স্বীকৃতি প্রদান করিয়াছেন। নিম্নে ইহার ধারাবাহিক আলোচনা করা হইল।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাক সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন পবিত্র কুরআনের বহু জায়গায় সুস্পষ্ট ঘোষণা প্রদান করিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছেঃ وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ. "আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত” (৬৮:৫)।
'আল্লামা সায়্যিদ কুত্ব বলেন, ইহা হইতেছে স্বয়ং আল্লাহর সাক্ষ্য, আল্লাহর নিজস্ব মানদণ্ডে নিজের একান্ত প্রিয় বান্দার মূল্যায়ন। মূল্যায়ন এই যে, তুমি অতি উন্নত ও মহৎ চরিত্রের অধিকারী।
এই خُلق عظیم বলিতে কি বুঝানো হইয়াছে- মুফাস্সিরীনে কেরাম ইহার কতিপয় ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন। হযরত ইব্‌ন 'আব্বাস (রা) ও মুজাহিদ (র) বলেন, ইহার অর্থ হইল, دین عظیم অর্থাৎ মহান দীন আর উহা হইল দীন ইসলাম। কারণ আল্লাহ তা'আলার নিকট তাঁহার দীন অপেক্ষা প্রিয় এবং সন্তোষজনক আর কিছু নাই (ইমাম কুরতুবী, আল-জামি'উ লি-আহকামিল কুরআন, ১৭ খ., পৃ. ২১৭)। 'আলী (রা) ও 'আতিয়্যা (র) বলেন, উহার অর্থ আদابুল কুরআন (ادب القرآن) বা কুরআনের শিষ্টাচার বা কুরআনে বর্ণিত শিষ্টাচার। কাতাদা বলেন, উহার অর্থ হইল, আল্লাহ তা'আলা যাহা নির্দেশ দিয়াছেন তাহা গ্রহণ করা এবং যাহা নিষেধ করিয়াছেন তাহা হইতে বিরত থাকা। কেহ বলেন, উহার অর্থ طبع کریم অর্থাৎ কোমল প্রকৃতি। কেহ বলেন, উহার অর্থ উম্মতের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর মমতা ও কল্যাণ কামনা (প্রাগুক্ত)। হযরত 'আতিয়‍্যা হইতে আরও একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, উহার অর্থ ادب عظیم বা উত্তম শিষ্টাচার (ইব্‌ন কাছীর, তাফসীরুল কু'রআনিল 'আজীম)।
হযরত হাসান বাসরী (র) বলিয়াছেন, আলোচ্য আয়াতে خُلُقٍ عظیم -এর অর্থ হইল কুরআনুল করীমে বর্ণিত আদব-কায়দা, নিয়ম-কানুন প্রভৃতি। কেননা হযরত আইশা (রা)-কে যখন প্রিয়নবী (স)-এর আখলাক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় তখন তিনি বলিয়াছিলেন, তাঁহার আখলাক ছিল কুরআন (মাওলানা আমিনুল ইসলাম, তাফসীরে নূরুল কোরআন,
'আল্লামা সায়্যিদ কুতুব বলেন, এই মহান আয়াতটিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর যে মর্যাদা প্রতিফলিত হইয়াছে তাহা একাধিক দৃষ্টিকোণ হইতে লক্ষণীয়। প্রথমত, ইহা খোদ আল্লাহ তা'আলার সাক্ষ্য। সমগ্র সৃষ্টিজগতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এই সাক্ষ্য প্রতিনিয়ত অনুরণিত। সমগ্র বিশ্ববাসীর বিবেক এই সাক্ষ্যে মুখরিত। আল্লাহর ঘনিষ্ঠতম ফেরেশতারাও এই সাক্ষ্য দিয়া বলিয়াছেন, 'সৃষ্টির প্রতিটি কণা ও বিন্দু হইতে এই সাক্ষ্য ঠিকরাইয়া পড়িতেছে। দ্বিতীয়ত, রাসূলুল্লাহ (স)-এর ব্যক্তিত্বের মহত্ত্ব ও চরিত্রের শ্রেষ্ঠত্বের সবচাইতে বড় প্রমাণ এই যে, তিনি ইহার স্বপক্ষে আল্লাহর সাক্ষ্য লাভ করিয়াছেন। এই সাক্ষ্য সব কিছুর ঊর্ধ্বে এবং সবচাইতে মর্যাদাবান। কেননা এই সাক্ষ্য স্বয়ং বিশ্বপ্রভু আল্লাহ তা'আলার। তিনি আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহ তা'আলার এই প্রশংসাকে কিভাবে গ্রহণ করিয়াছিলেন সেই বিষয়টি ভাবিতে গিয়া আমি পুনরায় স্তব্ধ হইয়া যাই। আমি উপলব্ধি করি যে, তিনি এই প্রশংসাকে পূর্ণ ভারসাম্য সহকারে, পরিপূর্ণ গাম্ভীর্য ও প্রশান্তি সহকারে, সম্পূর্ণ অবিচল ও অচঞ্চল চিত্তে গ্রহণ করেন। এই ধরনের দুর্লভ মর্যাদা লাভ করিয়াও যিনি ভারসাম্য হারান না, ধরাকে সরা জ্ঞান করেন না, তিনি যে বিশ্বজাহানে বাস্তবিকপক্ষেই শ্রেষ্ঠতম মানুষ তাহাতে আর সন্দেহের অবকাশ কোথায়? বস্তুত মর্যাদা ও মহত্ত্বের এই সর্বোচ্চ শিখরে শুধু মুহাম্মাদ (স)-ই আরোহণ করিতে পারিয়াছিলেন। মানবীয় পূর্ণতা ও শ্রেষ্ঠত্বের যে উজ্জ্বলতম অভিব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা যে কোন মানব সত্তার ভিতর ঘটাইতে পারেন তাহা ঘটাইয়া ছিলেন মুহাম্মদ (স)-এরই পবিত্র ও নির্মল সত্তায়।
আল্লাহ্ বাণী বাহক শ্রেষ্ঠ মানুষটি নিজ সত্তায় জীবন্ত রূপ লাভ করিয়াছিলেন। আল্লাহ তাঁহাকেই তাঁহার রাসূল বলিয়া চিহ্নিত ও মনোনীত করিয়াছিলেন। তাঁহাকেই শ্রেষ্ঠতম চরিত্রের অধিকারী বলিয়া ঘোষণা করিয়াছিলেন। তিনি আরও বলেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁহার সর্বশেষ নবী ও রাসূলের চরিত্রের এত প্রশংসা কেন করিলেন? এই প্রশ্নে আমরা যতই ভাবি ততই এই কথা সুস্পষ্ট হইয়া উঠে যে, মুহাম্মাদ (স)-এর মানব সত্তায় যেমন সুন্দর ও মহৎ চরিত্রই ছিল সর্বাধিক মূল্যবান ও শ্রেষ্ঠতম উপাদান—তেমনি সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও চারিত্রিক মহত্ত্ব ইসলামেরও মূল প্রাণশক্তি ও ভিত্তি। যেই ব্যক্তি মুহাম্মদ (স)-এর জীবন ও চরিত্রকে এবং ইসলামের আকীদা, আদর্শ ও বিধানকে অধ্যয়ন করিয়াছে, সে সহজেই উপলব্ধি করিতে পারে যে, ইসলামী বিধানের আইনগত ও সাংস্কৃতিক মূলনীতিগুলির ভিত্তি ইসলামের নৈতিক চারিত্রিক আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত। এইখানে আরও উল্লেখ্য যে, এই নৈতিক গুণাবলী নিছক বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত গুণাবলী নহে, বরং সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়বিচার, দয়া ও বদান্যতা ইত্যাকার যেই গুণের কথাই বলা হউক না কেন এই সবই একটি পরিপূরক ও সুসংহত বিধানের অংশ। সামাজিক বিধি-বিধান ও সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ অনুশীলন এই উভয়ে মিলিয়া এমন একটি সার্বিক অবকাঠামো গড়িয়া তোলা যাহার উপর মানুষের সামষ্টিক ও পূর্ণাঙ্গ জীবন প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামের এই পূর্ণাঙ্গ, নির্মল ও নিষ্কলুষ, ভারসাম্যপূর্ণ, সুদৃঢ়, সরল ও স্থিতিশীল নৈতিকতার আদর্শ হইতেছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র ব্যক্তিত্ব। আর এইজন্যই তাঁহার সুমহান সত্তাকে লক্ষ্য করিয়া এই প্রশংসাবাণী উচ্চারিত হইয়াছে : وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ “তুমি শ্রেষ্ঠতম আখলাকের অধিকারী” (আল্লামা সায়্যিদ কুতুব, ফী যিলালিল কুরআন)।
মুফাস্সিরীনে কেরাম বলেন, وَأَنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيم" এই আয়াত-এর মধ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর যেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চরিত্র মাধুর্য বর্ণনা করা হইয়াছে উহার ভিত্তিতেই আল্লাহ তা'আলা সমগ্র বিশ্বমানবতাকে জাতি, বর্ণ, বংশ নির্বিশেষে মহানবী (স)-এর আনুগত্য ও অনুসরণের নির্দেশ দিয়াছেন অপর এক আয়াতে যাহা তাঁহার মহান চরিত্র সম্পর্কে আল্লাহ পাকের অপর আর এক ঘোষণা। ইরশাদ হইতেছে:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ . "নিশ্চয় তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রহিয়াছে উত্তম আদর্শ” (৩৩: ২১)।
ইহা ছাড়া অপর এক আয়াতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আনুগত্য আল্লাহরই আনুগত্য বলিয়া উল্লেখ করিয়া মহান আল্লাহ তা'আলা আবারও তাঁহার রাসূলের মহত্ত্বের ঘোষণা প্রদান করিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে :
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ الله . “যেই ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করিল, সে আল্লাহ্রই আনুগত্য করিল" (৪:৮০)। অন্যত্র তাঁহার অনুসরণকারীদেরকে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে ভালবাসা ও ক্ষমার সুসংবাদ দান করা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ. "হে নবী! আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, তবে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালবাসিবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করিবেন" (৩: ৩১)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর মহান চরিত্রের ঘোষণায় তিনি যে কোমল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন সেই সম্পর্কে অপর এক আয়াতে বলা হইয়াছে:
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ. "আল্লাহ্র দয়ায় তুমি তাহাদের প্রতি কোমল হৃদয় হইয়াছ; যদি তুমি রূঢ় ও কঠোর চিত্ত হইতে তবে তাহারা তোমার আশপাশ হইতে সরিয়া পড়িত" (৩: ১৫৯)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর উত্তম আখলাকে কেবল মুসলমানগণই নহে বরং অমুসলিমগণও মুগ্ধ। এই প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন:
قَدْ نَعْلَمُ إِنَّهُ لَيَحْزُنُكَ الَّذِي يَقُولُونَ فَإِنَّهُمْ لَا يُكَذِّبُونَكَ وَلَكِنَّ الظَّالِمِينَ بِآيَاتِ الله يَجْحَدُونَ. "অবশ্য আমি জানি যে, তাহারা মিথ্যা বলে তাহা আপনাকে নিশ্চিতই কষ্ট দেয়, কিন্তু তাহারা আপনাকে তো মিথ্যাবাদী বলে না; বরং সীমালংঘনকারিগণ আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করে" (৬: ৩৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর উত্তম আখলাক সম্পর্কে তাঁহার নিজের ঘোষণা

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর উত্তম আখলাক সম্পর্কে তাঁহার নিজের ঘোষণা


মহানবী (স)-এর চরিত্র মাধুরীর ঘোষণায় মহান আল্লাহ পাকের অপর এক বাণী হইতেছে: وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ . "আপনাকে কেবল সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হিসাবেই প্রেরণ করিয়াছি” (২১:১০৭)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাকের প্রশংসায় আল্লাহ পাক আরও বলেন: لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ . "তোমাদের মধ্য হইতেই তোমাদের নিকট এমন রাসূল আসিয়াছেন, তোমাদেরকে যাহা বিপন্ন করে উহা তাহার জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মু'মিনদের প্রতি তিনি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু” (৯:১২৮)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর উত্তম আখলাক সম্পর্কে তাঁহার নিজের ঘোষণা রাসূলুল্লাহ (স) অত্যন্ত বিনয়ী ছিলেন। কিন্তু সত্য প্রকাশের জন্য তিনি নিজেই তাঁহার আখলাক সম্পর্কে ঘোষণা করেন: انما بعثت لاتمم مكارم الاخلاق "আমি তো প্রেরিত হইয়াছি উত্তম চরিত্রের পরিপূর্ণতা বিধানের জন্য" (কানযুল উম্মাল, ২খ., পৃ. ৫; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৩৮)।
অন্য বর্ণনায় একই অর্থবোধক হাদীছ রহিয়াছে: انما بعثت لاتمم صالح الاخلاق (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩৮)।
মহান আল্লাহ তাঁহাকে সারা বিশ্বের চরিত্র শিক্ষাদাতাদের উপর বিশেষভাবে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করিয়াছিলেন। তিনি উত্তম চরিত্রের এক মহীয়ান আদর্শরূপে এই উম্মতের হিদায়েতের জন্য প্রেরিত হইয়াছিলেন (আখলাকুন-নবী (স), বাংলা অনুবাদ, পৃ. ৮)।
পূর্ববর্তী আলোচনায় আমরা দেখিতে পাই যে, স্বয়ং আল্লাহ পাক তাঁহার রাসূলের সর্বোত্তম আখলাকের ঘোষণা দিয়াছেন। উক্ত আলোচনার পরে এই হাদীছ হইতে বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স) কেবল সর্বোত্তম আখলাকের অধিকারী তাহাই নহেন বরং শ্রেষ্ঠ আখলাকের পূর্ণতা সাধনকারীও। উপরিউক্ত হাদীছের প্রায় সমার্থক আরও কয়েকটি বর্ণনা পাওয়া যায়। যথা- ان الله بعثني بتمام مكارم الاخلاق وكمال محاسن الافعال "আল্লাহ পাক আমাকে শ্রেষ্ঠতম আখলাকের এবং উত্তম কার্যাবলীর পূর্ণতা সাধনের জন্য প্রেরণ করিয়াছেন” (আল-মাওয়াহিবুল-লাদুন্নিয়া, ২খ., পৃ. ৩২৭)।
ادینی رہی فاحسن تأديبي "আমার প্রতিপালক আমাকে শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়াছেন। অতএব তিনি আমার আচার-ব্যবহারকে অতি উত্তম করিয়া দিয়াছেন" (মুহাম্মদ রিদা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স), পৃ. ৩৯৪)।
এই হাদীছের আলোকে আমরা যদি কুরআনের দিকে তাকাই তবে দেখিতে পাই যে, মহান আল্লাহ পাক তাঁহার হাবীবকে বিভিন্ন বিষয়ে শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়াছেন, নিম্নোক্ত আয়াত-গুলিতে ইহার উজ্জ্বল প্রমাণ রহিয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ . "আপনি ক্ষমাপরয়ণতা অবলম্বন করুন, সৎকার্যের নির্দেশ দিন এবং অজ্ঞদেরকে এড়াইয়া চলুন” (৭: ১৯৯)।
তাঁহার গুণে গুণান্বিত মু'মিনদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কুরআন মজীদে ইরশাদ ইহয়াছে: وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ. "আর যাহারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল, আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণ-দেরকে ভালবাসেন" (৩: ১৩৪)।
وَلَمَنْ صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ "অবশ্য যে ধৈর্য ধারণ করে এবং ক্ষমা করিয়া দেয়, উহা তো হইবে দৃঢ় সংকল্পের কাজ" (৪২:৪৩)।
রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে অন্য আয়াতে ইরশাদ হইয়াছে: وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيُّ حَمِيمٌ. "ভাল ও মন্দ সমান হইতে পারে না। মন্দ প্রতিহত কর উৎকৃষ্ট দ্বারা; ফলে তোমার সহিত যাহার শত্রুতা আছে সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত হইয়া যাইবে। এই গুণের অধিকারী করা হয় কেবল তাহাদেরকে যাহারা ধৈর্যশীল; এই গুণের অধিকারী করা হয় কেবল তাহাদেরকে যাহারা মহাভাগ্যবান” (৪১: ৩৪-৩৫)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিজ আখলাক সম্পর্কে ঘোষণায় অপর এক হাদীছে আসিয়াছে যে, উহুদ যুদ্ধের পর সাহাবা কিরাম রাসূলুল্লাহ (স)-কে মক্কার কাফিরদের বিরুদ্ধে বদদো'আ করিতে বলিলে তিনি বলেন:
انى لم ابعث لعانا وانما بعثت رحمة . وفى رواية بعثت داعيا ورحمة .
"আমি অভিশাপ প্রদানকারী হিসাবে প্রেরিত হই নাই, আমি তো রহমত হিসাবে প্রেরিত হইয়াছি।” অপর বর্ণনায় আসিয়াছে, "আমি তো আহ্বানকারী এবং রহমত হিসাবে আসিয়াছি" (কাযী ইয়াদ, আশ্-শিফা, পৃ. ২২১)।
একবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট সোনা-রূপার একটি ছোট হার উপস্থিত করা হইল। তিনি উহা তাঁহার সাহাবীদের মাঝে বণ্টন করিলেন। এক বেদুঈন দাঁড়াইয়া বলিল, হে মুহাম্মাদ! (স) আল্লাহ্র কসম। আল্লাহ যদি আপনাকে সুবিচার করার নির্দেশ দিয়া থাকেন তবে আমি আপনাকে সুবিচার করিতে দেখিতেছি না। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন:
ويلك ان لم اعدل فمن يعدل
"হায়! আমি যদি সুবিচার না করি তবে আর কে সুবিচার করিবে” (আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ৯১০; অনুরূপ বর্ণনার জন্য আশ-শিফা, পৃ. ২২৩)?

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর উত্তম আখলাক সম্পর্কে তাঁহার পরিবারবর্গের ঘোষণা

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর উত্তম আখলাক সম্পর্কে তাঁহার পরিবারবর্গের ঘোষণা


বিশেষ করিয়া কাহারও আখলাক সম্পর্কে পারিবারিক মন্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কথাটি একদা রাসূলুল্লাহ (স) স্বয়ং তাঁহার এক হাদীছে বলিয়াছিলেন এইভাবে:
خيركم خيركم لاهله وانا خير لاهلي . "তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম যে তাহার পরিবারের নিকট উত্তম। আর আমি আমার পরিজনের কাছে উত্তম।"
অপর এক হাদীছে তিনি বলিয়াছেন خیارکم خياركم لنسائهم "তোমাদের মধ্যে তাহারা উত্তম, যাহারা তাহার স্ত্রীদের নিকট উত্তম” (তিরমিযী, আস-সুনান)।
এই দৃষ্টিকোণ হইতে আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাক সম্পর্কে তাঁহার পরিবার- পরিজনের মন্তব্য তুলিয়া ধরিব। হযরত 'আইশা (রা) বলেন,
ما كان احد احسن خلقا من رسول الله ﷺ "রাসূলুল্লাহ (স) হইতে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী আর কোন লোক ছিলেন না"।
তিনি আরও বলেন, তাঁহার সাহাবা ও পরিবারবর্গের মধ্য হইতে কেহ যখন তাঁহাকে ডাকিতেন তখন তিনি জবাবে বলিতেন, লাব্বায়ক-আমি হাজির। এই কারণেই মহান আল্লাহ তাঁহার সম্পর্কে নাযিল করিয়াছেন, وَأَنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ “নিঃসন্দেহে আপনি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত” (৬৮: ৫; আখলাকুন-নবী, পৃ. ১)।
হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা) মহানবী (স)-এর সঙ্গে প্রায় ২৫ বৎসর সংসার জীবন যাপন করিয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছেন।
اِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ وَتَصْدُقُ الْحَدِيْثَ وَتَحْمِلُ الْكَلَّ وَتَكْسِبُ الْمَعْدُوْمَ وَتَقْرِى الضَّيْفَ وتعين على نوائب الحق .
“নিশ্চয় আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, সত্য কথা বলেন, অভাবীর অভাব মোচন করেন, মেহমানের মেহমানদারী করেন এবং বিপদে মানুষকে সাহায্য করেন” (ইমাম বুখারী, আস-সাহীহ, ১ম, পৃ. ৩)।
হযরত আয়েশা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি বলিতেন, كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ “তাঁহার চরিত্র ছিল আল-কুরআন” (আখলাকুন-নবী, পৃ. ১)।
হযরত ইয় abandoned ইয়াযীদ ইব্‌ন বাবানুস হইতে বর্ণিত। হাদীছে আসিয়াছে, তিনি বলেন, আমি ‘আয়েশা (রা)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া বলিলাম, হে উম্মুল-মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাক সম্পর্কে কিরূপ ছিল? তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর চরিত্র ছিল আল-কুরআন। তারপর তিনি বলেন, তোমরা কি ‘সূরা মু’মিনুন পড় না? আমরা বলিলাম হাঁ, পড়ি। তিনি বলিলেন, পড়। তখন আমি পড়িলাম—
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِيْنَ هُمْ فِيْ صَلَاتِهِمْ خَاشِعُوْنَ. وَالَّذِيْنَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُوْنَ. وَالَّذِيْنَ هُمْ لِلزَّكَاةِ فَاعِلُوْنَ. وَالَّذِيْنَ هُمْ لِفُرُوْجِهِمْ حَافِظُوْنَ.
“অবশ্যই সফলকাম হইয়াছে মু’মিনগণ; যাহারা নিজেদের সালাতের মধ্যে বিনয় নম্র; যাহারা অসার ক্রিয়াকলাপ হইতে বিরত থাকে; যাহারা যাকাত দানে সক্রিয়; যাহারা আপন যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে।”
অতঃপর হযরত ‘আয়েশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর চরিত্র এইরূপই ছিল (আখলাকুন-নবী, পৃ. ২)।
হযরত আবূ আবদুল্লাহ আল-জাদালী বলেন, আমি ‘আয়েশা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলেন :
لَمْ يَكُنْ فَاحِشًا وَلَا مُتَفَحِّشًا وَلَا سَخَّابًا فِى الْاَسْوَاقِ وَلَا يَجْزِى بِالسَّيِّئَةِ السَّيِّئَةَ وَلَكِنْ يَّعْفُوْ وَيَصْفَحُ .
“তিনি ইচ্ছাকৃত-অনিচ্ছাকৃত কোনভাবে কখনও অশ্লীল কথা বলিতেন না, হাট-বাজারে শোরগোল ও চীৎকার করিতেন না এবং অন্যায়ের প্রতিকার অন্যায় দ্বারা করিতেন না, বরং ক্ষমা ও মার্জনা করিতেন” (আত্-তিরমিযী, শামাইল, পৃ. ২৫; ইবনুল-জাভী, আল-ওয়াফা, ২খ., পৃ. ৪১৬; ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৩৬; আত্-তিরমিযী, আস-সুনان, ২খ., পৃ. ২২)।
হযরত ‘আয়েশা (রা) আরও বলেন, কেহ যদি স্বীয় ব্যাপারে তাঁহার নিকট দুইটি প্রস্তাব উপস্থাপন করিতেন, তবে তিনি তাহার পক্ষে যাহা সহজসাধ্য হইত তাহাই পছন্দ করিতেন, যদি
উহা পাপের কাজ না হইত (আত-তিরমিযী, শামাইল, পৃ. ৩৮৯; আল-ওয়াফা, ২খ., পৃ. ৪২০; মুসলিম, আস-সাহীহ, ২খ., পৃ. ২৫৬)।
অপর বর্ণনায় আসিয়াছে, যদি উহা পাপের কাজ হইত তবে উহা হইতে তিনি সর্বাধিক দূরে থাকিতেন। তিনি কখনও তাঁহার নিজের উপর কোন অত্যাচারের প্রতিশোধ গ্রহণ করেন নাই (মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৫৬; ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৩৮)।
হযরত 'আইশা (রা) বলেন: كان ابر الناس واكرم الناس ضحاكا بساما - “তিনি ছিলেন সর্বাধিক সৎ, ভদ্র ও হাসিখুশি লোক” (আখলাকুন-নবী, পৃ. ১৩)।
হযরত সাফিয়্যা (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স) অপেক্ষা সুন্দর চরিত্রের অধিকারী আর কাহাকেও দেখি নাই (ইউসুফ কান্ধলবী, হায়াতুস-সাহাবা, ৩খ.)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর উত্তম আখলাক সম্পর্কে তাঁহার সাহাবীদের মন্তব্য

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর উত্তম আখলাক সম্পর্কে তাঁহার সাহাবীদের মন্তব্য


রাসূলুল্লাহ (স) যে সর্বোত্তম আখলাকের অধিকারী, ইহার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হইতেছে তাঁহার সঙ্গী-সাথীদের পক্ষ হইতে তাঁহার উত্তম আখলাক সম্পর্কে অসংখ্য বর্ণনা। এই বিষয়টিকে একদা রাসূলুল্লাহ (স) এইভাবে বলিয়াছিলেন: خير الاصحاب عند الله تعالى خيرهم لصاحبه "সাথী হিসাবে ঐ ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট উত্তম যে তাহার সঙ্গীর নিকট উত্তম” (আল-আরবা'উনা হাদীছান ফিল-আখলাক, পৃ. ২৯)।
সুতরাং সঙ্গী হিসাবে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাক সম্পর্কে যে সকল বিবরণ তাঁহার সাহাবীগণের পক্ষ হইতে প্রদান করা হইয়াছে উহার কতিপয় দৃষ্টান্ত নিম্নে প্রদান করা হইল।
হযরত আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) চরিত্রের দিক হইতে সর্বোত্তম ব্যক্তি ছিলেন। একদা তিনি আমাকে কোন একটা প্রয়োজনে যাইতে বলিয়াছিলেন। আমি বলিয়াছিলাম, আল্লাহ্র কসম! আমি যাইব না। অথচ আমার মনে মনে ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশমত আমি যাইব। অতঃপর আমি বাহির হইয়া বাজারে কতিপয় খেলাধুলারত ছেলের পাশ দিয়া যাইতেছিলাম। তখন পিছন দিক হইতে রাসূলুল্লাহ (স) আমার কাঁধ ধরিলেন। আমি দেখিলাম তিনি হাসিতেছেন এবং বলিলেন, হে উনায়স! আমি যেইখানে যাইতে বলিয়াছিলাম সেইখানে গিয়াছ? আমি বলিলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি যাইতেছি (ইমাম মুসলিম, আস-সাহীহ, ২খ., পৃ. ২৫৩)।
হযরত আনাস (রা) আরও বলেন, “আমি দশ বৎসর পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমত করিয়াছি। তিনি কখনও কোনও কাজের ব্যাপারে আমাকে এই কথা বলেন নাই, তুমি এই কাজটি করিলে কেন এবং এই কাজটি করিলে না কেন” (আত-তিরমিযী, শামাইল, পৃ. ৩৮৪; ইব্ন সা'দ, আত-তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৮২; মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৫৩)।
হযরত ইব্‌ন উমার (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কখনও ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কোন অশ্লীল কথা বলিতেন না। তিনি বলিতেন, তোমাদের মধ্যে যে চরিত্রের দিক হইতে উত্তম সেই প্রকৃত উত্তম (আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৯১; মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৫৫; তিরমিযী, ২খ., পৃ. ১৯)। অনুরূপ বর্ণনায় হযরত আবূ যার (রা)-ও বলেন, আমার পিতামাতার শপথ, রাসূলুল্লাহ (স) ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে অশ্লীল কথা বলিতেন না এবং বাজারে শোরগোল করিতেন না (আখলাকুন্নবী, পৃ. ২১)।
হযরত আল-বারা'আ ইব্‌ন আযিব (রা) বলেন:
كان رسول الله ﷺ احسن الناس وجها واحسن الناس خلقا -
"রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন চেহারার দিক হইতেও সর্বাধিক সুন্দর এবং চরিত্রের দিক হইতেও সর্বাধিক সুন্দর" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৩৮; মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৫৮)।
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) হইতে বর্ণিত এক বর্ণনায় আসিয়াছে,
كان رسول الله ﷺ احسن الناس وكان اجود الناس وكان اشجع الناس
"রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন সর্বাধিক সুন্দর মানুষ, সর্বাধিক দানশীল এবং সর্বাধিক বীর বাহাদুর মানুষ” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৩৯; আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৯১; মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৫২)।
তিনি আরও বলেন:
لم يكن رسول الله ﷺ سبابا ولا لعانا ولا فاحشا
"রাসূলুল্লাহ (স) না ছিলেন গালমন্দকারী, না অভিশাপ দানকরী আর না অশ্লীল বাক্যালাপকারী” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত; আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৯১)।
হযরত আলী (রা) নবুওয়তের ২৩ বৎসর এবং ইহার পূর্বের কয়েকটি বৎসর নবী করীম (স)-কে দেখিয়াছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর মহান চরিত্র সম্পর্কে বলিতেন: মহানবী (স) হাস্যমুখ, নম্র স্বভাব ও দয়ার্দ্র প্রকৃতির ছিলেন। তিনি উগ্র প্রকৃতির ও সংকীর্ণ চিত্ত ছিলেন না। কোন মন্দ কথা অশ্লীল বাক্য তাঁহার পবিত্র মুখ হইতে বাহির হইত না। কাহারও দোষ-ত্রুটি খুঁজিয়া বেড়াইতেন না। যাহা তাঁহার পসন্দ হইত না, মুখ ফিরাইয়া নিতেন। তিনি নিজেকে তিনটি আচরণ হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখিয়াছিলেন: ঝগড়া-কলহ, অহংকার ও বাজে কথা। অন্যদের সম্পর্কেও তিনি তিনটি বিষয় সর্বদা পরিহার করিয়া চলিতেন- কাহারও কুৎসা রটনা করা, অন্যায়ভাবে দোষারোপ করা এবং গোপনে ছিদ্রান্বেষণ করা। তিনি এমন কথা বলিতেন যাহা জনগণের পরিণামের জন্য কল্যাণকর। যেই কথা শুনিয়া সকলে হাসিত তিনিও উহাতে হাসিতেন। যেই বিষয়ে সকলে আশ্চর্য বোধ করিত, তিনিও উহাতে আশ্চর্য বোধ করিতেন। আগন্তুক ও অপরিচিত ব্যক্তির কর্কশ বাক্য ও অসঙ্গত প্রশ্নে তিনি ধৈর্যাবলম্বন করিতেন। কেহ
তাঁহার প্রশংসা করিলে তিনি উহা পসন্দ করিতেন না। কিন্তু কেহ তাঁহার উপকারের কৃতজ্ঞতা-স্বরূপ প্রশংসা করিলে তিনি নীরব থাকিতেন। তিনি কাহারও কথার মাঝখানে বাধা দিতেন না (আত-তিরমিযী, শামাইল, পৃ. ২৫; আখলাকুন্নবী, পৃ. ৮-৯)। এক রিওয়ায়াতে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায় কাহাকেও না পূর্বে পাইয়াছি, না পরে (হায়াতুস-সাহাবা, ৩খ.)।
হযরত আলী (রা) আরও বলেন, তিনি অতি দানশীল, সত্যভাষী, নম্র স্বভাব ও খোশমেযাজী ছিলেন। কেহ হঠাৎ দেখিয়া ভয় পাইলেও সে যদি তাঁহার সান্নিধ্যে আসিত তরে আন্তরিকভাবে তাঁহাকে ভালবাসিতে থাকিত (প্রাগুক্ত)। অন্য এক সাহাবী হযরত হিন্দ (রা) ইন আবী হালাহ্ দীর্ঘকাল যাবত রাসূলুল্লাহ (স)-এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। তিনি বলেন, মহানবী (স) নম্র স্বভাবের ছিলেন, নির্দয় ছিলেন না; কাহারও অপমান তিনি কখনও অনুমোদন করিতেন না। সামান্য ব্যাপারেও লোকদের শুকরিয়া আদায় করিতেন। কোনও বস্তুকে মন্দ বলিতেন না। কখনও ব্যক্তিগত ব্যাপারেও রাগ করিতেন না। অবশ্য কেহ যদি কোন ন্যায় ও সৎ কাজের বিরোধিতা করিত, তবে অসন্তুষ্ট হইতেন (কাদী 'ইয়াদ, আশ-শিফা, পৃ. ৭০; আত-তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৪২২-৪২৩)।
হযরত আমর ইবনুল 'আস (রা) নবী করীম (স)-এর সান্নিধ্যে থাকিয়া প্রায় চারি বৎসর পর্যন্ত নবী চরিত্র প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) সাধারণ মানুষের সহিতও খোশআলাপ ও উত্তম আচরণ করিতেন। ফলে প্রত্যেক ব্যক্তি তাহার নিজের সম্পর্কে এইরূপ ধারণা পোষণ করিত যে, নবী করীম (স)-এর নিকট তাহার মর্যাদা সর্বাধিক। হযরত 'আমর ইবনুল 'আস (রা) নিজের সম্পর্কে বলেন, আমি আমার নিজের সম্পর্কে এইরূপ ধারণা করিতাম। তাই একবার সুযোগ পাইয়া আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার দৃষ্টিতে আমি উত্তম, না আবু বকর? তিনি বলিলেন, আবূ বকর। তারপর জিজ্ঞাসা করিলাম, আমি উত্তম, না উমর? তিনি বলিলেন, উমর। পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলাম, আমি উত্তম না উছমান? তিনি বলিলেন, উছমান। মহানবী (স) সত্য প্রকাশ করিয়া আমার ভুল ধারণা দূর করিয়া দিলেন। আমার আফসোস হইল, হায়! আমি যদি তাঁহাকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা না করিতাম (শামাইল, পৃ. ২৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00