📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর দয়া ও উদারতা
রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন সকল গুণের আধার। কুরআন মাজীদে যত সুন্দর স্বচ্ছতা, মানবতা ও কল্যাণময় গুণাবলীর কথা উল্লেখ হইয়াছে সেইগুলির নিখাদ, নিখুঁত ও পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটিয়াছিল মহানবী (স)-এর জীবনে। আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করিয়াছেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ. "তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের জীবনে রহিয়াছে উত্তম আদর্শ” (৩৩:২১)।
উদারতা মানুষের একটি মহৎ গুণ। রাসূলুল্লাহ (স) যে সকল গুণ ছিল সেইগুলির মধ্যে একটি হইল—তিনি সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ। আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন:
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ. "আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করিয়াছি” (২১: ১০৭)।
মূলত তিনি ছিলেন উদারতার মূর্ত প্রতীক। কাহারও মন জয় করিবার জন্য উদারতার তুলনায় অধিক শক্তিশালী আর কিছুই নাই। রাসূলুল্লাহ (س) দীর্ঘ সময়ে দ্বন্দ্ব ও কলহে লিপ্ত মুশরিক জাতিকে উদারতা প্রদর্শনের মাধ্যমে সফলতার শীর্ষে আহরণ করাইয়াছিলেন। এই কারণে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন:
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ. "আল্লাহর রহমতে আপনি তাহাদের প্রতি কোমল হৃদয় হইয়াছেন। আপনি রূঢ় ও কঠিন চিত্ত হইলে তাহারা আপনার আশপাশ হইতে সরিয়া পড়িত" (৩: ১৫৯)।
মহানবী (س)-এর জীবনে এমন অনেক ঘটনা রহিয়াছে যাহা হইতে তাঁহার উদারতার পরিচয় পাওয়া যায়। হযرت আনাস (را) বলেন، আমি মদীনায় দশ বৎসর যাবত রাসূলুল্লাহ (س)-এর খেদমত করিয়াছি। তখন আমি বালক ছিলাম এবং আমার সকল কাজ তাঁহার ইচ্ছা মাফিক হইত না। কিন্তু তিনি কোন দিন আমার উপর বিরক্ত হইয়া উহ্ বলেন নাই এবং এইরূপও বলেন নাই: তুমি এই কাজ কেন করিলে বা তুমি এই কাজ কেন কর নাই (মুসলিম، ৪খ.، পৃ. ১০৯؛ আবূ দাউদ، ৪খ.، পৃ. ২৪৭)।
হযرت 'আইশা (را) বলেন، রাসূলুল্লাহ (س) কোন সময় তাঁহার খাদিম বা সহধর্মিণীকে প্রহার করেন নাই (আবু দাউদ، ৪খ.، পৃ. ২৫১؛ কাদী 'ইয়াদ، আশ-শিফা، ১খ.، পৃ. ২২৬؛ মুহাম্মাদ রিদা، মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (স)، পৃ. ৪৬৭)।
অপর এক বর্ণনা অনুসারে তিনি গৃহস্থালীর কাজে স্ত্রীদের সাহায্য করিতেন، কাপড়ে তালি লাগাইতেন، ঘর ঝাড়ু দিতেন، দুধ দোহন করিতেন، বাজার হইতে সওদা বহন করিয়া আনিতেন، বালতি মেরামত করিয়া দিতেন، নিজে উট বাঁধিতেন এবং খাদিমদের সাথে আটার খামীর তৈয়ার করিতেন (কাদী 'ইয়াদ، আশ-শিফা، ১খ.، পৃ. ১৩২-৩৩)। এই সকল হাদীছ প্রমাণ করে যে، রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহার পারিবারিক জীবনে উদারতার মহিমা প্রকাশ করিয়াছেন।
রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহার তেইশ বৎসর নবুওয়াতী জীবনে দুশমনের হাতে অনেকবার দৈহিক নির্যাতনের শিকার হইয়াছিলেন। তাৎক্ষণিক কিংবা সময়ের পরিবর্তনে তিনি প্রতিশোধ লইতে পারিতেন، কিন্তু ইহার পরিবর্তে তাহাদিগকে ক্ষমা প্রদর্শন করিয়া উদারতার এক বিরল নজীর স্থাপন করিয়াছেন। এই বিষয়ে অনেক হাদীছ পাওয়া যায়।
হযرت 'আইশা (রা) বলেন، রাসূলুল্লাহ (س) নিজস্ব ব্যাপারে কারো উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করেন নাই। তবে যদি কেহ আল্লাহ্র হুকুম-আহকামের অবমাননা করিত তাহাকে কখনও রেহাই দিতেন না (আবূ দাউদ، ৪খ.، পৃ. ২৫০)।
রাসূলুল্লাহ (س) হযরত যায়দ (রা)-কে সঙ্গে লইয়া মক্কা হইতে প্রায় আট মাইল দূরে তাইফ-নগরীতে ইসলামের দা'ওয়াত দিতে গমন করেন। তায়েফবাসীরা ইসলাম কবুল তো করেই নাই، বরং তাহাদের অমানবিক নির্যাতনে মহানবী (س) রক্তাক্ত হইলেন। তবুও তাহাদের জন্য তিনি আল্লাহ তা'আলার দরবারে প্রার্থনা করিলেন :
اللهم اليك اشكو ضعف قوتي وقلة حيلتي وهواني على الناس يا ارحم الراحمين انت رب المستضعفين وانت ربى إلى من تكلني إلى بعيد يتجهمني أو إلى عدو ملكته أمرى إن لم يكن بك على غضب فلا أبالي ولكن عافيتك هي أوسع لى أعوذ بنور وجهك الذي أشرقت له الظلمات وصلح عليه أمر الدنيا والاخرة من أن ينزل بى غضبك أو يحل على سخطك لك العتبى حتى ترضى لا حول ولا قوة إلا بك .
“হে আল্লাহ! আমি নিজের দুর্বলতা، উপায়হীনতা এবং লোকচক্ষে নিজের অসহায়ত্ব সম্পর্কে তোমারই দরবারে অভিযোগ করিতেছি। হে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াময়، অক্ষম ও দুর্বলের প্রতিপালক! তুমি আমারও রব। তুমি আমাকে কাহার হাতে সমর্পণ করিতেছ؟ যাহারা রুক্ষ কর্কশ ভাষায় আমাকে জর্জরিত করিবে তাহাদের হাতে، না যাহারা আমার সাধনাকে বিপর্যস্ত করিবার ক্ষমতা রাখে তাহাদের হাতে؟ যদি আমার প্রতি তোমার ক্রোধ পতিত না হয় অর্থাৎ তুমি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট না হইয়া থাক তবে আমি কোন কিছুর পরওয়া করি না। তোমার অনুগ্রহই আমার জন্য সবচাইতে প্রশস্ত সম্বল। তোমার পূর্ণ জ্যোতির প্রভাবে সকল অন্ধকারই আলোকিত হইয়া উঠে এবং দীন-দুনিয়ার সমস্ত কাজই ইহার উপর সুবিন্যস্ত হয়। আমি সেই পূর্ণ জ্যোতির আশ্রয় গ্রহণ করিয়া আমার প্রতি তোমার ক্রোধ অবতীর্ণ না হওয়ার এবং তোমার অসন্তুষ্টি পতিত না হইবার প্রার্থনা জানাইতেছি। তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্যই তোমার নিকট ফরিয়াদ করিতেছি। তুমি শক্তিদান না করিলে সৎকর্ম করিবার কোন ক্ষমতা আমার নাই" (তারীখুল উমাম وয়ান-মুল্ক، ২খ.، পৃ. ৩৪৫؛ আস-সীরাতুল হালাবিয়া، ১খ.، পৃ. ৩৫৪؛ আসাহ্হুস্ سیار، পৃ. ১১১)।
রাসূলুল্লাহ (س)-এর হাদীছ দ্বারা স্বীকৃত যে، তাঁহার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিন ছিল তাইফে অবস্থানকালীন এই দিন। এই প্রার্থনার পর মালাকুল জিবাল (পাহাড়ের ফেরেশতা) আসিয়া তায়েফবাসীদের শাস্তি দেওয়ার অনুমতি চাহিলে মহানবী (س) নিষেধ করেন।
হযرت আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (س)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন، উহুদের দিনের চেয়েও কি কোন কঠিন দিন আপনার জীবনে আসিয়াছে؟ তিনি জবাব দিলেন، তোমায় কওমের পক্ষ হইতে আমি যে সকল সংকটের সম্মুখীন হইয়াছি তাহা হইতে কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হই যেই দিন সেই দিন ছিল আকাবার দিন। সেই দিন যখন ইব্ن ابد یاليل ইب্ন ابد কُلالের সামনে হাজির হই، তখন আমি যাহা চাহিয়াছিলাম তাহার কোন সদুত্তর' সে দেয় নাই। অতএব মনঃক্ষুণ্ণ হইয়া ফিরিয়া আসিলাম। তখনও আমার হুঁশ ফিরিয়া আসে নাই، এমনি অবস্থায় আমি কারনিس-সা'আলাবে আসিয়া পৌঁছিলাম। অতঃপর মাথা উঠাইয়া হঠাৎ দেখিলাম، এক খণ্ড মেঘ আমাকে ছায়া প্রদান করিতেছে। যখন সেই দিকে তাকাইলাম অভ্যন্তরে জিবরাঈল (را)-কে দেখিতে পাইলাম। তিনি আমাকে ডাকিলেন এবং বলিলেন، আপনার সাথে আপনার জাতির কথাবার্তা এবং তাহাদের যাহা প্রতিউত্তর হইয়াছে، অবশ্যই আল্লাহ তাহার সব কিছুই শুনিয়াছেন। তিনি পাহাড়ের ফেরেশতাকে আপনার কাছে প্রেরণ করিয়াছেন। উদ্দেশ্য হইল، এই সকল লোকের ব্যাপারে আপনি তাহাকে যেমন ইচ্ছা হুকুম করিতে পারেন। তখন পাহাড়ের ফেরেশতা আমাকে ডাকিল، সালাম করিল এবং বলিল، হে মুহাম্মাদ! ইহাদের ব্যাপারে আপনার ইচ্ছা কি؟ আপনি যদি চাহেন اخش باين নামক দুইটি পাহাড় তাহাদের উপর চাপাইয়া দিতে পারি। এই কথা শুনিয়া মহানবী (س) বলিলেনঃ
ارجو ان يخرج الله من أصلابهم من يعبد الله وحده ولا يشرك به شيئا .
"বরং আমি আশা করি، মহান আল্লাহ তাহাদের বংশে এমন সন্তান সৃষ্টি করিবেন যাহারা এক অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদত করিবে এবং তাঁহার সাথে অন্য কাহাকেও শরীক করিবে না" (বুখারী، পৃ. ৬৬১)।
অন্য বর্ণনায় আছে، রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহাদের জন্য দো'আ করিলেন এইভাবে:
اللهم اهد قومي فانهم لا يعلمون.
"হে আল্লাহ! তুমি আমার কওমকে হেদায়াত দান কর। যেহেতু তাহারা বোঝে না” (নূরুল-ইয়াকীন، পৃ. ৭৭)। জালিম কওমের প্রতি উদারতা প্রদর্শনে ইহার চেয়ে উত্তম নমুনা আর কী হইতে পারে؟
ওহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (س)-এর মুখমণ্ডলে মারাত্মক যখম হয়، রুবাই নামক দাঁতও ভাঙ্গিয়া যায় এবং তাঁহার লৌহ শিরস্ত্রাণ ভাঙ্গিয়া কপালে ঢুকিয়া যায়। ইহার পরও তাঁহার উপর অত্যন্ত নিমর্মভাবে তীর নিক্ষিপ্ত হইতে থাকিলে তিনি খুবই বিচলিত হইয়া পড়িলেন। কারণ যেই জাতি তাহাদের পয়গম্বরের উপর নির্মম অত্যাচার করিতেছে، না জানি তাহাদের উপর আল্লাহর কোন গযب নাযিল হইয়া পড়ে। এই আশংকায় বিচলিত হইয়া রাসূলুল্লাহ (س) আল্লাহ্র দরবারে প্রার্থনা করিতে লাগিলেন:
رَبِّ اغْفِرْ قَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ. “হে প্রতিপালক! আমার জাতিকে ক্ষমা করুন، তাহারা বোঝে না।" (মুসলিম، ৩খ.، পৃ. ২৭৪-৭৫)।
মদীনা মুনাওয়ারায় বহু-সংখ্যক মুনাফিকের বসবাস ছিল। তাহাদের সরদার আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি ইবন সালুল গোপনে ইসলামের নবী (س) ও তাঁহার সাহাবীদের বিরুদ্ধাচরণ করিত। রাসূলুল্লাহ (س) ওহী মারফত তাহাদের সকলকে এবং তাহাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত হইয়াছিলেন। ইচ্ছা করিলে মুসলমানগণ তাহাদিগকে পিষিয়া ফেলিতে পারিতেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (س) তাহাদের প্রতি সামান্যতম রূঢ় ব্যবহার করাও পছন্দ করেন নাই।
মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি-এর বিভিন্ন অবৈধ কার্যকলাপে অতিষ্ঠ হইয়া হযরত উমার (را) আরয করেন، ইয়া রাসূলাল্লাহ! অনুমতি দিন، আমি এই মুনাফিকের গর্দান উড়াইয়া দেই। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، উমার! থাম। তাহা হইলে তো লোকে বলিবে، মুহাম্মাদ তাঁহার সঙ্গী-সাথীদিগকে হত্যা করে (বুখারী، পৃ. ১০৫৩، ৫৪، ৫৫)। অন্য রিওয়ায়াতে আছে، হযরত উমার (را) বলিয়াছিলেন، আপনি 'আব্বাদ ইب্ন বিশ্বকে আদেশ করেন، সে তাহার মস্তক কাটিয়া আনিয়া আপনার সামনে হাজির করুক। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، উমার! তাহা হইলে তো আমি মানুষের মধ্যে খ্যাত হইয়া যাইব، আমি আমার সাহাবীকে হত্যা করি। অতঃপর তিনি ইبْن উবায়্যিকে হত্যা করিতে নিষেধ করেন। হযরত উমার (রা)-এর এই কথা আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি-এর পুত্র আবদুল্লাহ জানিতে পারেন। তিনি খাটি মুসলমান ছিলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (س)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া আরয করেন، যদি আপনি আমার পিতার এই সকল কথাবার্তার কারণে তাহাকে হত্যা করিতে চাহেন، তাহা হইলে আমাকে আদেশ করুন। আমি তাহার মস্তক কাটিয়া আপনার কাছে এই মজলিস ত্যাগ করিবার পূর্বেই হাজির করিব। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، তাহাকে হত্যা করিবার ইচ্ছা আমার নাই এবং আমি কাহাকেও এই বিষয়ে আদেশও করি নাই (মুফতী মুহাম্মাদ শফী، মা'আরিফুল কুরআন، ৮খ.، পৃ. ৪৫؛ মুসলিম، ৩খ.، পৃ. ২২১)।
আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি-এর মৃত্যুর পর তাহার ছেলে আবদুল্লাহ (রা)-এর অনুরোধে রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে স্বীয় জামা পরিধান করাইয়া জানাযা ও দাফন কার্য সম্পন্ন করেন، এমনকি তাহার জন্য সত্তর বারের অধিক ইসতিগফার করিবারও প্রতিশ্রুিতি দেন (বুখারী، কিতাবুল জানাইয، পৃ. ২৬৫، ২৬৯)।
হযরত জাবির ইب্ন আবদুল্লাহ (را) বলেন، আমরা রাসূলুল্লাহ (س)-এর সাথে নজদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিলাম। দুপুরে প্রচণ্ড গরমে সকলকে সাথে লইয়া রাসূলুল্লাহ (س) এমন একটি প্রান্তরে উপনীত হইলেন যাহা বড় বড় কাটাযুক্ত গাছে ভর্তি ছিল। তিনি একটি গাছের নিচে যাইয়া তাঁহার ছায়ায় আশ্রয় নিলেন এবং নিজের তরবারিখানা গাছে ঝুলাইয়া রাখিলেন। লোকজন সকলে বিভিন্ন গাছের ছায়ায় ছড়াইয়া পড়িল। আমরা নানা কাজে ব্যস্ত ছিলাম، এমন সময় রাসূলুল্লাহ (س) আমাদের ডাকিলেন। আমরা তাঁহার নিকট যাইয়া দেখিলাম، এক বেদুঈن তাঁহার সামনে বসিয়া রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، আমি নিদ্রিত ছিলাম। এমন সময় সে আমার কাছে আসিয়া আমার তরবারিখানা উচাইয়া ধরিয়াছে। ঘুম ভাঙ্গিলে আমি শুনিলাম যে، খোলা তলোয়ার হাতে আমার মাথার সামনে দাঁড়াইয়া সে বলিল، এখন আমার হাত হইতে তোমাকে কে রক্ষা করিবে؟ আমি বলিলাম، আল্লাহ। তখন সে بসিয়া পড়িল। এইতো সে এখন بসিয়া রহিয়াছে। জাবির ইب্ন আবদুল্লাহ (را) বলেন، ইহার পর রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে কোন শাস্তি দেন নাই বা প্রতিশোধ গ্রহণ করেন নাই (বুখারী، کتبا ل المغازی، باب غزوتی بني المستالق، পৃ. ৮৫২)। এই বেদুঈনের প্রতি রাসূলুল্লাহ (س)-এর যে উদারতা প্রদর্শন করিলেন তাহার ফলাফল অন্য একটি বিবরণ হইতেও জানা যায়।
যখন বেদুঈন তরবারি হাতে লইয়া বলিল، আমার হাত হইতে তোমাকে কে রক্ষা করিবে، তখন রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، আল্লাহ। তখন তাঁহার হাত হইতে তরবারিখানা পড়িয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (س) তরবারিখানা তুলিয়া লইলেন। অতঃপর বলিলেন، এখন কে তোমাকে আমার হাত হইতে রক্ষা করিবে؟ সে বলিল، আপনি উত্তম তরবারি ধারণকারী হইবেন। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، তুমি এই সাক্ষ্য দাও যে، আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই؟ আর আমি নিশ্চয় আল্লাহর রাসূল؟ সে বলিল، না। কিন্তু আপনার সাথে অঙ্গীকার করিতেছি যে، আমি কখনও আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিব না এবং ঐ সকল লোকের সঙ্গেও থাকিব না যাহারা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে ছাড়িয়া দিলেন। সে তাহার সাথীদের নিকট আসিয়া বলিল، আমি মানবজাতির শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তির নিকট হইতে তোমাদের নিকট ফিরিয়া আসিয়াছি (রিয়াদুস-সালেহীন، পৃ. ৩৬؛ کادی 'ایاز، اش-شیفا، ۱خ.، পৃ. ২২৪)।
সুরাকা ইبن মালিক ইসলাম গ্রহণের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (س)-এর হিজরতের সময় রাসূলুল্লাহ (س) এবং হযরত ابূ بکر (را)-কে হত্যা করিয়া এক শত উট পুরস্কার পাইবার প্রত্যাشায় তাঁহার পিছু লইয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে অতি নিকটে পাইয়াও কিছু বলেন নাই। পরবর্তীতে সুরাকা নিজেই ঘটনাটি বিশদভাবে বর্ণনা করেন। বর্ণনাটি এইরূপ:
সুরাকা ইبن মালিক (را) বলেন، আমাদের নিকট কুরায়শ কাফিরদের প্রেরিত লোক উপস্থিত হইয়া এই সংবাদ প্রদান করিল যে، কুরায়শরা রাসূলুল্লাহ (س) এবং ابূ بکر (را)-কে হত্যা বা বন্দী করার উপর এক শত উট পুরস্কার দানের ঘোষণা করিয়াছে।
অতঃপর একদিন আমি আমার গোত্রীয় লোকদের সহিত بسیয়া খোশগল্প করিতেছিলাম। তখন এক ব্যক্তি আসিয়া আমাকে খবর দিল، আমি উপকূলবর্তী পথে কতিপয় ব্যক্তির গমন লক্ষ্য করিয়াছি। আমার মনে হয় মুহাম্মাদ (س) এবং তাঁহার সঙ্গিগণই হইবেন। আমি তখন উহা বিশ্বাস করিয়াছিলাম، সেই পথিকগণ তাঁহারা হইবেন। কিন্তু ঐ খবরদাতা ব্যক্তিকে পুরস্কার
লাতের সুযোগ গ্রহণ হইতে বিরত রাখিবার উদ্দেশ্যে প্রবঞ্চনাস্বরূপ বলিলাম، ঐ পথিক তাঁহারা নহেন، বরং ঐ পথিকগণ হইতেছেন অমুক অমুক।
কিছু সময়ের জন্য খবরটার প্রতি তৎপরতা না দেখাইয়া সকলের সঙ্গে بسیয়া থাকিলাম। তাহার পর তথা হইতে উঠিয়া বাড়ি আসিলাম এবং আমার এক দাসীকে বলিলাম، আমার ঘোড়াটি বাড়ি হইতে বাহির করিয়া অমুক স্থানে আড়ালে নিয়া রাখ। আমি আমার বল্লمটা হাতে লইয়া বাড়ির পিছন দিকের পথে বাহির হইলাম। এমনকি বল্লمটার ফলক নিচের দিকে রাখিয়া সোজা হইয়া নিয়া চলিলাম। এইরূপ গোপনে আমি আমার ঘোড়ার নিকট উপস্থিত হইলাম এবং উহার উপর আরোহণ করিয়া উহাকে দ্রুত গতিতে চালাইলাম। এমন কি অল্প সময়ের মধ্যে আমি ঐ পথিকদের নিকট পৌঁছিয়া গেলাম। এমতাবস্থায় আমার ঘোড়াটি হোঁচট খাইয়া পড়িয়া গেল এবং আমি উহার পৃষ্ঠ হইতে পড়িয়া গেলাম। আমি তাড়াতাড়ি দাঁড়াইয়া আমার تیر دان হইতে ভাগ্য গণনার تیر বাহির করিয়া গণনা করিয়া দেখিলাম، আমি উদ্দেশ্যে সফল হইব কিনা। গণনার ফলাফল আমার ইচ্ছার বিপরীত হইল।
কিন্তু আমি গণনার ফলাফলের পরোয়া না করিয়া পুনঃ ঘোড়ায় আরোহণ করিয়া উহাকে দ্রুত অগ্রসর করিলাম এবং নিকটবর্তী হইয়া গেলাম যে، রাসূলুল্লাহ (س)-এর কুরআন পাঠের আওয়াজ শুনিতে পাইলাম। তিনি কিন্তু পিছনের দিকে মোটেও তাকান নাই، অবশ্য ابূ بکر (را) بار بار তাকাইতেছিলেন। ইতোমধ্যে আমার ঘোড়ার সম্মুখের পা দুইটি হাঁটু পর্যন্ত জমিনের মধ্যে ডাকিয়া গেল। অতঃপর আমি উহাকে সজোরে হাঁকাইলাম। ঘোড়াটি উঠিয়া দাঁড়াইতে চেষ্টা করিল، কিন্তু পা দুইখানি উঠাইতে সক্ষম হইল না। অবশ্য অতি কষ্টে সোজা হইয়া দাঁড়াইল। হঠাৎ দেখিতে পাইলাম، যেই স্থানে তাহার পা দাবিয়া গিয়াছিল তথা হইতে ধূল-بالو ধোঁয়ার ন্যায় আকাশের দিকে উঠিতেছে। তখন পুনরায় আমি تیر দ্বারা ভাগ্য গণনা করিলাম। এই বারও ফলাফল আমার ইচ্ছার বিপরীত হইল। তখন আমি তাঁহাদের প্রতি আমার পক্ষ হইতে নিরাপত্তা দানের ধ্বনি উচ্চারণ করিলাম। সেই মতে তাঁহারা দাঁড়াইলেন، আমি ঘোড়ায় আরোহণ করিয়া তাঁহাদের নিকট পৌঁছিলাম। আমি যখন তাঁহাদের নিকট পৌঁছিতে বিপদগ্রস্ত হইতেছিলাম তখন আমার অন্তরে এই কথা জাগিয়া উঠিয়াছিল যে، রাসূলুল্লাহ (س)-এর আন্দোলন অচিরে বিজয় লাভ করিবে। তিনি নিশ্চয়ই জয়ী হইবেন।
অতঃপর আমি তাঁহাকে জানাইলাম، আপনার দেশবাসী আপনার বিনিময়ে এক শত উট পুরস্কার দানের ঘোষণা করিয়াছে। তাঁহাকে আমি লোকদের সমুদয় ইচ্ছার বিস্তারিত বৃত্তান্তও শুনাইলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমি তাঁহাদের খিদমতে খাদ্য و আবশ্যকীয় বস্তু পেশ করিলাম، কিন্তু তাঁহাদের জন্য কোন কিছুই আমার ব্যয় করিতে হইল না। তাঁহারা আমার নিকট কোন অভিপ্রায়ও প্রকাশ করিলেন না। শুধু একটি কথা মহানবী (س) আমাকে বলিলেন، আমাদের সংবাদটা গোপন রাখিও। তখন আমি রাসূলুল্লাহ (س)-এর খিদমতে আরয করিলাম، আমার জন্য একটি নিরাপত্তামূলক পত্র লিখিয়া দিন। মহানবী (س) عامر ইব্ن فوحیرہ (را)-কে উহা লিখিয়া দিবার নির্দেশ দিলেন। তিনি একটি চর্মখন্ডে উহা লিখিয়া দিলেন। তাহার পর রাসূলুল্লাহ (س) চলিয়া গেলেন (বুখারী، পৃ. ৮০১)।
مكة বিজয়ের পর সুরাকা ইবন মালিক ঐ নিরাপত্তা পত্রটি লইয়া রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট গেলেন। তখন তিনি حنين و تايف অভিযান শেষ করিয়া جي'رانায় অবস্থান করিতেছিলেন। সুরাকা রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট পৌছিয়া সেই লিখিত টুকরাটি উঁচু করিয়া দেখাইয়া বলিলেন، ইয়া রাসূলাল্লাহ! এইটি সেই বস্তু যাহাতে আপনি একটি বাণী লিখিয়া দিয়াছিলেন। আমি জু'شামের পুত্র সুরাকা। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، আজ ওয়াদা পালন و উদারতা প্রদর্শনের দিন। নিকটে আস। সুরাকা তাঁহার নিকট গেলেন و ইসলাম কবূল করিলেন (ابن هشام، سيرة النبي (س)، ۲خ.، পৃ. ۱۰۱-۲)।
بدر প্রান্তরে রাসূলুল্লাহ (س)-এর সাথে ইসলামের দুশمنদের প্রথম যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে আটক বন্দীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (س) যথার্থ উদারতা প্রদর্শন করিয়াছিলেন। অথচ তৎকালীন সামরিক আইন অনুযায়ী তাহাদিগকে হত্যা কিংবা আজীবন দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখা যাইত (ابن كثير، السيرة النبوية، ۲خ.، পৃ. ۴۷۵)।
بدرের যুদ্ধবন্দীদিগকে সাহابীদের মাঝে বন্টন করিয়া রাসূলুল্লাহ (س) ارشاد করিলেন، তোমরা বন্দীদের প্রতি সহানুভূতির মনোভাব রাখিবে (ابن هشام، سيرة النبي، ۲خ.، পৃ. ۲۱۷)।
حज़रત ابن عباس (را) বলেন، রাসূলুল্লাহ (س) সেই দিন সাহাবাদিগকে বলিয়াছিলেন، আমি জানিতে পারিয়াছি যে، বনू ہاشم গোত্রের কিছু লোককে জোর করিয়া যুদ্ধে আনা হইয়াছে। আমাদের সাথে যুদ্ধ করিবার কোন প্রয়োজন তাহারা অনুভব করে নাই। কাজেই بَنू ہاشمের কেহ তোমাদের সামনে পড়িলে তাহাদিগকে হত্যা করিবে না। ابول بخترة ابن ہاشم কাহারও সামনে পড়িলে তাহাকে হত্যা করিবে না। আর عباس ابن عبد المطلب কাহারও সামনে পড়িলে তাহাকেও হত্যা করিবে না। কেননা তাহাকেও যبرদস্তি করিয়া যুদ্ধে আনা হইয়াছে। তখন ابُو حذیفہ বলিলেন، আমরা আমাদের পিতাপুত্র، ভাই ও আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করিব আর عباسকে কেন ছাড়িয়া দিব؟ আমার সামনে পড়িলে আমি তাহাকে তরবারি দিয়া আঘাত করিবই। এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (س) عمر ابن الخطاب (را)-কে ডাকিয়া বলিলেন، হে عمر! আল্লাহ্র রাসূলের চাচার মুখে কি তরবারি দিয়া আঘাত করা যায় (ابن ہشام، السيرة، ۲خ.، পৃ. ۲۰۴)।
বন্দীদের মধ্যে سهيل ابن عمرو، যে قریشদের মধ্যকার একজন সুবক্তা ছিল، তাহার কথার মাধ্যমে মুসলমানদের কষ্ট দিত। عمر ابن الخطاب (را) বলিলেন، ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে অনুমতি দিন আমি سهيلের সামনের দাঁত উপড়াইয়া ফেলি যাহাতে সে তাঁহার کَوْمের মধ্যে আর বক্তৃতা না করিতে পারে। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، না، এমনটি করিও না। যদি এমনটি করে তাহা হইলে আল্লাহও আমার সাথে এই ধরনের ব্যবহার করিবেন، যদিও আমি নবী (نور اليقين، পৃ. ۱۲۵)।
বন্দীদের মুক্তিপণ নির্ধারণে রাসূলুল্লাহ (س) উদারতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন। তিনি বন্দীদের অবস্থা অনুপাতে মুক্তিপণ নির্ধারণ করিয়াছিলেন। সঙ্গতিসম্পন্ন লোকদের জন্য উর্দ্ধে ছয় হাজার درهم و সাধারণ পরিমাণ চার হাজার درهم নির্ধারিত হইয়াছিল। কিন্তু যাহারা এই পরিমাণ মুক্তিপণ আদায় করিতে অক্ষম এমন দরিদ্রদিগকে শুধু চার শত درهم লইয়া ছাড়িয়া দেওয়া হইয়াছিল (سيرة مصطفى، পৃ. ۲۴۶)।
মহানবী (س) بدرের যুদ্ধবন্দীদের কয়েকজনকে মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্তিদান করিলেন। তাঁহারা হইলেন ابول عاص ابن ربیعه، مطاب ابن حنطب، سيفي ابن ابى رفاعه و ابُو عجا عمر و ابن عبد الله (ابن ہشام، السيرة، ۲خ.، পৃ. ۲۲۸)।
ابُو عجا ছিল কবি، যে مكة আল্লাহ্র রাসূলকে ভীষণ কষ্ট দিত। সে বলিল، হে আল্লাহর রাসূল! আমার সমুদয় সম্পদ সম্পর্কে আপনার জানা রহিয়াছে। আমি অভাবগ্রস্ত و আমি বহু সন্তানভারে ক্লিষ্ট। রাসূলুল্লাহ (س) তাহার প্রতি উদারতা প্রদর্শন পূর্বক মুক্তি প্রদান করেন (نور اليقين، পৃ. ۱۳۲)।
حज़रত Anas (ra) বলেন، একবার অস্ত্র-سست্রে সজ্জিত আশিজনের একটি দল Tan'im পর্বতের আড়াল হইতে রাসূলুল্লাহ (س) ও তাঁহার সাহাবীদের উপর অতর্কিতে আক্রমণ করিয়া তাঁহাদিগকে ঘায়েল করিবার উদ্দেশ্যে নিচে অবতরণ করিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (س) তাহাদিগকে জীবিত ছাড়িয়া দিলেন। অন্য বর্ণনায় আছে، রাসূলুল্লাহ (س) তাহাদিগকে আযাদ করিয়া দিলেন। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা ارشاد করেন:
وَهُوَ الَّذِي كَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنْكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ عَنْهُمْ بِبَطْنِ مَكَّةَ.
"আল্লাহ সেই মহান সত্তা، যিনি মক্কার অদূরে তাহাদের হাত তোমাদের উপর হইতে و তোমাদের হাত তাহাদের উপর হইতে বিরত রাখিয়াছেন" (۴۸: ۲۴)।
مदीनार ইয়াহুদীদের মধ্যে বানু কাینকা' সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (س) ও তাহাদের মধ্যকার সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করে। ফলে রাসূলুল্লাহ (س) তাহাদেরকে অবরোধ করেন و তাহারা শর্ত সাপেক্ষে আত্মসমর্পণ করে। যখন আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সাহায্য করিলেন، তখন عبد اللہ ابن ابی ابی ابن سَلUL তাঁহার নিকট আসিয়া বলিল، হে মুহাম্মাদ। আমার মিত্রদের সহিত উত্তম ব্যবহার কর। রাসূলুল্লাহ (س) তাহার কথার কোন উত্তর দিলেন না। সে আবার বলিল، হে মুহাম্মাদ! আমার মিত্রদের সহিত সদয় আচরণ কর। রাসূলুল্লাহ (س) তাহার দিক হইতে মুখ ফিরাইয়া নিলেন। অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ (س)-এর লৌহ বর্মের পকেটে হাত ঢুকাইয়া দিল। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে বলিলেন، ছাড়। রাসূলুল্লাহ (س) এত ক্রুদ্ধ হইলেন যে، তাঁহার মুখমণ্ডল রক্তিম বর্ণ ধারণ করিল। তিনি তাহাকে আবার বলিলেন، আমাকে ছাড়। সে বলিল، না। আল্লাহ্র কসম! আমি আপনাকে ছাড়িতেছি না যতক্ষণ না আপনি আমার মিত্রদের ব্যাপারে সদয় আচরণ করেন। চারি শত খালি মাথাবিশিষ্ট যোদ্ধা ও তিন শত বর্মধারী যোদ্ধা আমাকে সারা দুনিয়া হইতে নিরাপদ করিয়া দিয়াছে। আর আপনি তাহাদিগকে একদিনে নির্মূল করিয়া দিবেন؟ আল্লাহ্র কসম! আমি তাহাদের ছাড়া এক মুহূর্তেও নিরাপদ নই। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، বেশ। তাহাদিগকে তোমার মর্জির উপর ছাড়িয়া দিলাম (ابن ہشام، السيرة، ۳خ.، পৃ. ۴۱)। এই ছিল এক ইয়াহুদীদের মিত্রের প্রতি রাসূলুল্লাহ (س)-এর উদারতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
श्रीका খায়রারে سلام ابن مشقامের স্ত্রী Zainab বিষ্ণু হারিছ একটি বকরীর গোশত রান্না করিয়া রাসূলুল্লাহ (س)-কে হাদিয়া দেয়। এই গোশতের সহিত Zainab কিছু বিষ মিশাইয়া দেয়। রাসূলুল্লাহ (س) তাহা হইতে কিছু গোশত মুখে তুলিতেই বুঝিতে পারেন و তাহা মুখ হইতে ফেলিয়া দেন। কিন্তু বিশ্বर ابن البراء রাসূলুল্লাহ (س) এর সুরুষে এমনটি করা বেয়াদরি মনে করিয়া তাহা ভক্ষণ করেন। রাসূলুল্লাহ (س) ঐ স্ত্রীলোক ও ইয়াকুলীবের ڈابیا জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা বলিল، আমরা এইজন্য বিষ প্রয়োগ কুরিয়াছি যে، আপনি প্রকৃতপক্ষেই যদি নবী হন তাহা হইলে তাহা প্রমাণিত হইবে। আর যদি মিথ্যা দাবিদার হন তাহা হইলে আমরা আন্তরক্ষা করিতে পারিব। অতঃপর স্ত্রীলোকটি ইসলাম গ্রহণ করে و রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে ক্ষমা করিয়া দেন। অবশ্য বিশ্বর মৃত্যুবরণ করিলে রাসূলুল্লাহ (س) স্ত্রীলোকটিকে ডাকিয়েন، و কিসাসস্বরূপ হত্যা করিলেন، (بخاری، পৃ. ৬৪৬؛ ابن کثیر، الفسول، পৃঃ ۱۹۰؛ اساحس-سیار، পৃ. ۲۵۸)۔
بند ہنیفہ গোত্রের jumama ابن عصل ছিলেন یامادباشিদের سرور۔ رسول اللہ (ص) ناعدیر দিকে কিছু সংখ্যক অশ্বারোহী পাঠাইলে তাহারی humamaকে ধরিয়া آریا مسجد نوحاشیر একটি খুঁটির সহিত বাঁধিয়া রাখিল۔ رسول اللہ (ص) তাঁহার কাছে আসিলেন و তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন، اوحے ثمامہ! তুমি কী মনে করিলেই۔ সে بلینم ہتھائی۔ اگر آپ ایاکے کو مارتے ہیں تو آپ کو خونخوار کا قتل کرنا پڑے گا۔ اور اگر آپ کو فضل حاصل ہوتا ہے تو آپ کی قیمت اچھی ہوتی ہے۔ اور اگر آپ کو دولت چاہیے تو آپ کی قیمت اچھی ہوتی ہے۔ اللہ کے رسول (ص) اسے چھوڑ کر چلے گئے۔
دوسرے دن رسول اللہ (ص) اس کے پاس آئے اور وہی سوال پوچھا۔ اس نے پہلے دن والا جواب دیا۔ تیسرے دن بھی رسول اللہ (ص) نے اس سے وہی سوال پوچھا۔ اس نے پھر وہی جواب دیا جو پہلے دن دیا تھا۔ رسول اللہ (ص) نے فرمایا: ثمامہ کو چھوڑ دو۔
تب وہ آزاد ہو کر مسجد نبوی کے قریب ایک کھجور کے باغ میں چلا گیا اور غسل کر کے مسجد نبوی میں داخل ہو کر کہنے لگا کہ میں گواہی دیتا ہوں کہ اللہ کے سوا کوئی معبود نہیں اور محمد (ص) اللہ کے بندے اور رسول ہیں۔ اس کے بعد اس نے کہا: اے محمد! اللہ کی قسم، زمین پر آپ کے چہرے سے زیادہ مجھے کوئی اور چہرہ ناپسند نہیں تھا۔ لیکن اب آپ کا چہرہ دنیا کے ہر چہرے سے زیادہ مجھے پیارا ہے۔ اللہ کی قسم، آپ کے دین سے زیادہ کوئی دین مجھے ناپسند نہیں تھا۔ لیکن اب آپ کا دین دنیا کے ہر دین سے زیادہ پیارا ہو گیا ہے۔ اللہ کی قسم، آپ کے شہر سے زیادہ ناپسندیدہ شہر مجھے کوئی اور نہیں تھا۔ لیکن اب آپ کا شہر مجھے دنیا کے ہر شہر سے زیادہ پیارا ہے۔
آپ کی گھڑ سوار فوج نے مجھے اس وقت پکڑا تھا جب میں عمرہ کرنے جا رہا تھا۔ اب آپ مجھے کیا حکم دیتے ہیں؟ رسول اللہ (ص) نے اسے دنیا و آخرت کی خوشخبری سنائی اور اسے عمرہ کرنے کا حکم دیا۔ جب وہ مکہ پہنچا تو کسی نے اس سے پوچھا کہ کیا تم بے دین ہو گئے ہو؟ اس نے جواب دیا کہ ایسا کیوں ہو گا؟ میں نے تو رسول اللہ (ص) پر اسلام قبول کیا ہے۔ اور اللہ کی قسم، رسول اللہ (ص) کی اجازت کے بغیر یمن کے یمامہ سے ایک دانہ بھی تم تک نہیں آئے گا۔ (سيرة الهشام، 421، صفحہ 217)۔
رسول اللہ (ص) تھے بہت ہی فیاض دل انسان۔ صحابہ کرام (رضی اللہ عنہم) دشمنوں کے ظلم و ستم سے تنگ آ کر ان کے لیے یا ان پر بددعا کرنے کی درخواست کرتے تو آپ ان کے لیے دعا کرتے۔ اس سلسلے میں چند واقعات کا ذکر کیا گیا ہے۔ ابوہریرہ (رضی اللہ عنہ) فرماتے ہیں کہ ایک دفعہ کہا گیا: اے اللہ کے رسول! مشرکوں پر بددعا کریں۔ تب آپ نے فرمایا: میں لعنت کرنے والا بنا کر نہیں بھیجا گیا ہوں، بلکہ رحمت بنا کر بھیجا گیا ہوں (مسلم، 421، صفحہ 312)۔
طائف کے لوگوں نے جب اسلام قبول کرنے سے انکار کر دیا اور پتھر مارنے لگے، تب صحابہ کرام (رضی اللہ عنہم) عرض کرنے لگے: اے اللہ کے رسول! ان کے لیے بددعا کریں۔ آپ نے دعا کے لیے ہاتھ اٹھائے۔ صحابہ کرام (رضی اللہ عنہم) نے سوچا کہ آپ شاید بددعا کریں گے۔ لیکن آپ کی زبان سے نکلا: اے اللہ! طائف کے قبیلے (بنೂ ثقیف) کو ہدایت دے اور انہیں اسلام کے سائے تلے لے آ (شبلی نعمانی، سیرت النبی، 221، صفحہ 229)۔
دَوْس کا قبیلہ یمن میں رہتا تھا۔ اس قبیلے کے سردار طفیل ابن عمرو الدوسی (رضی اللہ عنہ) تھے۔ وہ پہلے ہی اسلام قبول کر چکے تھے۔ انہوں نے کافی عرصہ تک اپنے قبیلے کو اسلام کی طرف بلایا۔ لیکن وہ کفر میں ڈوبے رہے۔ آخرکار وہ نبی کریم (ص) کے پاس حاضر ہوئے اور اپنے قبیلے کی حالت بیان کی اور ان کے لیے بددعا کرنے کو کہا تاکہ وہ تباہ ہو جائیں۔ صحابہ کرام (رضی اللہ عنہم) نے سوچا کہ اب دَوْس کا قبیلہ ختم ہو جائے گا۔ لیکن رحمت کے نبی نے دعا کی: اے اللہ! دَوْس قبیلے کو ہدایت دے اور انہیں اسلام کے سائے میں لے آ (شبلی نعمانی، سیرت النبی، 221، صفحہ 229)۔
رسول اللہ (ص) کی نبوی زندگی کا ایک مشکل دور شعب ابی طالب میں گزرا۔ قریش نے رسول اللہ (ص) اور ان کے قبیلے کے لوگوں کو تین سال تک وہاں قید رکھا اور کھانے پینے کی چیزیں بھی پہنچنے نہیں دیں۔ بچے بھوک سے بلکتے اور چیختے تھے۔ ظالم لوگ بچوں کی اس دردناک آواز پر خوش ہوتے اور انہیں رحم نہیں آتا تھا۔ اس نافرمانی پر نبی کریم (ص) نے بددعا کی:
اللهم اغنى عليهم بسبع كسبع يوسف “اے اللہ! ان پر یوسف علیہ السلام کے سات سالوں جیسی حالت مسلط کر دے”۔
اس کے بعد ان پر سے رحمت کا بادل ہٹ گیا اور مکہ میں ایسا قحط پڑا کہ لوگ ہڈیاں اور مردار جانور کھانے لگے تھے۔ ان میں سے کوئی بھی جب آسمان کی طرف دیکھتا تو اسے بھوک کی شدت سے صرف دھواں نظر آتا۔ ابوسفیان، اور ایک روایت کے مطابق کریب ابن مرہ نبی کریم (ص) کے پاس حاضر ہوئے اور عرض کیا: اے محمد! آپ کی قوم تو تباہ ہو رہی ہے۔ اللہ سے دعا کریں کہ وہ اس مصیبت کو دور کرے۔ آپ نے اللہ تعالی سے دعا کی اور مصیبت دور ہو گئی اور بارش ہوئی (مفتی محمد شفیع، معارف القرآن، 762 ویں جلد، صفحہ 762؛ بخاری، 1002-33؛ شبلی نعمانی، سیرت النبی، 221، صفحہ 229)۔
اوپر ذکر کیے گئے واقعات سے رسول اللہ (ص) کی فیاضی کا پتہ چلتا ہے۔ اسلام کے دشمنوں کے ساتھ ان کی یہ فیاضی دنیا کی تاریخ میں بے مثال ہے۔
تاریخ گواہ ہے کہ رسول اللہ (ص) ایک بہت ہی سخی انسان تھے۔ اس بارے میں حدیث کی کتابوں میں یہ بات یوں آئی ہے: رسول اللہ (ص) سے کچھ مانگا گیا تو انہوں نے کبھی 'نہ' نہیں کیا (مسلم، 421، صفحہ 111)۔
حضرت انس (رضی اللہ عنہ) سے روایت ہے کہ ایک دفعہ ایک شخص نے رسول اللہ (ص) سے کچھ مانگا۔ رسول اللہ (ص) نے اسے دو پہاڑوں کے درمیان موجود تمام بھیڑیں دے دیں۔ اس نے اپنے قبیلے والوں کے پاس جا کر کہا: تم سب اسلام قبول کر لو۔ کیونکہ محمد (ص) اتنا دیتے ہیں کہ انہیں غربت کا کوئی ڈر نہیں (امام مسلم، الصحیح، 421، صفحہ 111)۔