📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর অঙ্গীকার পালন
অঙ্গীকার ভঙ্গ করা অতি নিন্দনীয় কাজ। ইহা এক ধরনের মিথ্যাচার। কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দেশ বা জাতির সম্মান ও মর্যাদা বহুলাংশে নির্ভর করে তাহাদের কৃত অঙ্গীকার পালনের উপর। আল-কুরআনে বলা হইয়াছে:
وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولاً.
"তোমরা অঙ্গীকার পালন কর, নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হইবে" (১৭:৩৪)।
ইহা ছাড়াও কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতগুলিতে প্রতিশ্রুতি রক্ষার তাকীদ রহিয়াছে: (৫:১; ৯:১; ১৬:৯১; ২:১৭৭)। ব্যক্তিবর্গ বা গোষ্ঠীবর্গের মধ্যে সম্পাদিত সকল রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও লেনদেন সম্পর্কিত চুক্তি বা অঙ্গীকারসমূহ ইহার অন্তর্ভুক্ত।
অঙ্গীকার করিয়া তাহা ভঙ্গ করা মুনাফিকদের কাজ, মু'মিনের নহে। অঙ্গীকার রক্ষায় মহানবী (স) সর্বদা যত্নবান থাকিতেন। অতি সংকটময় মুহূর্তেও অঙ্গীকার পালন করিতে দ্বিধা করিতেন না।
নবুওয়াতের কিছুকাল পূর্বে বানু হাশিম ও অন্যান্য গোত্রের কিছু সংখ্যক সহৃদয় ব্যক্তির মধ্যে হিলফুল-ফুযুল-এর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিকে রাসূলুল্লাহ (স) কৃত গুরুত্ব দিতেন তাহা ইবন সা'দ-এর বর্ণনা হইতে অনুমান করা যায়। তিনি বলিয়াছেন, 'যদি ইহা (হিলফুল- ফুযুল) হইতে দূরে থাকিবার জন্য আমাকে উৎকৃষ্ট লোহিত বর্ণের উটও প্রদান করা হয় তথাপি আমি ইহাতে সম্মত হইব না এবং কখনও যদি কেহ আমাকে সেই চুক্তির নামে আহবান করে তবে অবশ্যই আমি উহাতে লাব্বায়ক বলিব'।
হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন আবিল হাসমা (রা) নবুওয়াত পূর্বকালের ঘটনা বর্ণনা করেন, আমি একবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে লেনদেন করি, কিন্তু আমার কাছে তাঁহার কিছু পাওনা বাকী রহিয়া গিয়াছিল। একদিন বলিলাম, আপনি অপেক্ষা করুন, এখনই বাড়ি হইতে বাকি অর্থ লইয়া আসিতেছি। কিন্তু বাড়ি আসিয়া অঙ্গীকারের কথা সম্পূর্ণ ভুলিয়া যাই। এইভাবে তিন দিন অতিবাহিত হইলে হঠাৎ আমার সেই অঙ্গীকারের কথা স্মরণ হয়। তৎক্ষণাৎ আমি ঘটনাস্থলে গিয়া উপস্থিত হই। দেখিলাম, তিনি সেই জায়গায়ই প্রতীক্ষমান রহিয়াছেন। আমাকে দেখিয়া তিনি বলিলেন:
يا فتى لقد شققت على انا ههنا منذ ثلاث أنتظرك. "হে যুবক! তুমি আমাকে বড়ই কষ্ট দিয়াছ। আমি তিন দিন যাবত এখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করিতেছি”।
অঙ্গীকার পালনের ক্ষেত্রে ইহার চেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ আর কী হইতে পারে? রোম সম্রাট 'কায়সার' তাহার রাজপ্রাসাদে আবূ সুফ্যানকে যেই সকল প্রশ্ন করিয়াছিল ইহার মধ্যে এই প্রশ্নটিও ছিল যে, মুহাম্মাদ (স) কি কখনও অঙ্গীকার ভঙ্গ করিয়াছেন? উত্তরে আবূ সুফ্যান স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছিল, না, তিনি কখনও অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন নাই। এই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রাণের শত্রু আবূ সুফ্যানের ভাষ্য।
উহুদের যুদ্ধে ওয়াহ্শী হযরত হামযা (রা)-কে শহীদ করিয়াছিল। মক্কা বিজয়ের পর সে প্রাণ ভয়ে এক শহর হইতে অন্য শহরে পলায়ন করিয়া ফিরিতেছিল। তায়েফবাসীরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে যে প্রতিনিধি দল প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেয় তন্মধ্যে তাঁহার নামও ছিল। কিন্তু সে ভয় করিতেছিল, না জানি প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয় কিনা। কিন্তু লোকেরা তাহাকে আশ্বস্ত করিল, তুমি নির্ভয়ে গমন কর, মুহাম্মাদ (স) প্রতিনিধিদিগকে হত্যা করেন না। সুতরাং সে এই বিশ্বাস নিয়া মহানবী (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইল এবং ইসলাম গ্রহণ করিল।
এইখানে উল্লেখ করা যাইতে পারে, যদিও তাহারা ইসলামের শত্রু ছিল, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তাহারা সম্যক অবগত ছিল। হযরত সাওয়ান ইব্ন উমায়্যা (রা) ইসলাম গ্রহণ করিবার পূর্বে কট্টর কাফির ছিলেন। মক্কা বিজয়ের পর তিনি ইয়ামান গমনের উদ্দেশ্যে জিদ্দা চলিয়া যান। উমায়ের ইব্ন ওয়াহ্ব রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া সকল ঘটনা খুলিয়া বলিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) সঙ্গে সঙ্গে তাহাকে নিরাপত্তা দানের ঘোষণা দিলেন। উমায়র পুনরায় নিবেদন করিলেন, নিরাপত্তার নিদর্শন প্রদান করিলে তাহার মনে আস্থা সৃষ্টি হইত। তাহার এই আবেদনে সাড়া দিয়া রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় পাগড়ী তাহার হাতে তুলিয়া দিলেন।
উমায়র এই পবিত্র পাগড়ী সঙ্গে লইয়া সাফওয়ানের নিকট পৌছিলেন এবং তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক নিরাপত্তা দানের কথা অবহিত করিলেন। সাফওয়ান শুনিয়া বলিলেন, দরবারে নবৃওয়াতে উপনীত হইলে আমার জীবন সংকটাপন্ন হইতে পারে। উমায়ر বলিলেন, আপনি মুহাম্মাদ (স)-এর মহানুভবতা ও ক্ষমা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত না হইবার কারণেই এমন ধারণা পোষণ করিতেছেন। আসুন, আপনার কেশাগ্রও স্পর্শ করা হইবে না। এই কথা শুনিয়া সাফওয়ান উমায়রের সঙ্গে দরবারে নবৃওয়াতে উপস্থিত হইলেন। রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট তাহার প্রথম প্রশ্ন ছিল, হে আল্লাহর রাসুল। আপনি কি আমাকে নিরাপত্তা প্রদান করিয়াছেন? রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, হাঁ, তোমাকে নিরাপত্তা প্রদান করা হইয়াছে। অতঃপর সাফওয়ান নিবেদন করিল, আমাকে দুই মাসের সময় দিন। রাসূলুল্লাহ (س) উত্তরে বলিলেন, দুইমাস নয়, তোমাকে চার মাসের সময় প্রদান করা হইল। উহার পর সাফওয়ান রাসূলুল্লাহ (س)-এর ক্ষমা ও ঔদার্যে অভিভূত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিলেন।
উল্লিখিত ঘটনা প্রমাণ করে যে, তিনি যাহাকে নিরাপত্তার অঙ্গীকার দিয়াছেন ইহার ব্যত্যয় কখনও ঘটে নাই। হযরত আবু রাফে' (রা) একজন দাস ছিলেন। তিনি কাফির থাকা অবস্থায় কুরায়শদের নিকট হইতে প্রতিনিধি হইয়া মদীনা আগমন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া তাঁহার চেহারা মুবারকের প্রতি দৃষ্টি পড়িতেই ইসলামের সত্যতার বীজ তাহার অন্তরে উপ্ত হইল। তিনি আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এখন আর কাফিরদিগের নিকট ফিরিয়া যাইব না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি অঙ্গীকার ভঙ্গ করিতে পারিনা, বরং তুমি এই যাত্রা ফিরিয়া যাও। সেইখানে পৌছিয়া তোমার অন্তরের অবস্থা যদি একইরূপ থাকে, তাহা হইলে চলিয়া আইস। সুতরাং তিনি তখন ফিরিয়া গেলেন এবং পরবর্তী সময়ে আসিয়া ইসলাম গ্রহণ করিলেন।
এই ঘটনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, রাসূলুল্লাহ (স) কাফিরদের পক্ষ হইতে প্রেরিত প্রতিনিধি দলের ক্ষেত্রে কখনও অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন নাই। তিনি যদি তৎক্ষণাৎ আবূ রাফে'কে ইসলামে দীক্ষিত করিয়া তাঁহার নিকট রাখিয়া দিতেন তাহা হইলে কাফিররা বলিতে পারিত, মুহাম্মাদ (স) অঙ্গীকার ভঙ্গ করিয়া আমাদের প্রতিনিধিকে তাঁহার নিকট রাখিয়া দিয়াছেন।
হুদায়বিয়ার সন্ধির একটি শর্ত ছিল, যদি মক্কা হইতে কেহ মুসলমান হইয়া মদীনায় চলিয়া আসে তাহা হইলে মক্কাবাসীদের চাওয়ার সাথে সাথে তাহাকে ফেরত পাঠাইতে হইবে। ঠিক যখন সন্ধির শর্তগুলি লিখা হইতেছিল, তখন হযরত আবূ জান্দাল (রা) পায়ে জিঞ্জীর বাঁধা অবস্থায় মক্কাবাসীদের নিকট হইতে পালাইয়া রাসূলুল্লাহ (س)-এর দরবারে উপস্থিত হইলেন। সকল সাহাবী তাঁহার এই করুণ অবস্থা অবলোকন করিয়া কাঁপিয়া উঠিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (س) ধীরকণ্ঠে বলিলেন, হে আবূ জানদাল! তুমি ধৈর্য ধারণ কর এবং নিজের অবস্থার উপর সন্তুষ্ট থাক। তুমি ও তোমার মত যেইসব অসহায় নির্যাতিত মুসলমান তোমার সহিত মক্কায় অবস্থান করিতেছে আল্লাহ তাহাদের মুক্তির জন্য একটা ব্যবস্থা করিয়া দিবেন। আমরা কুরায়শদের সহিত একটি সন্ধি ও শান্তিচুক্তি সম্পাদন করিয়াছি। এই ব্যাপারে আল্লাহকে সাক্ষী মানিয়া আমরা পরস্পরকে প্রতিশ্রুতি দিয়াছি। আমরা তাহাদেরকে দেওয়া এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিব না।
কাফিরদের সহিত কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করিতে গিয়া রাসূলুল্লাহ (স) নির্যাতিত সাহাবী হযরত আবু জান্দালকে তাঁহার পিতা সুহায়লের নিকট হস্তান্তর করিলেন। যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাহা ছিল কতইনা হৃদয়বিদারক। তারপর মহানবী (স) মদীনায় ফিরিয়া আসিলেন। অতঃপর আবু বাসীর নামে কুরায়শ বংশীয় একজন মুসলমান তাঁহার নিকট পালাইয়া আসিলেন। কুরায়শরা তাহার সন্ধানে দুইজন লোক পাঠাইল। তাহারা বলিল, আপনি আমাদের সহিত সম্পর্কিত সন্ধির কথা স্মরণ করুন। তিনি তাহাকে লোক দুইটির নিকট সোপর্দ করিলেন। তাহারা তাহাকে লইয়া বাহির হইল এবং যুল-হুলায়ফা নামক স্থানে পৌঁছিয়া খেজুর খাইতে লাগিল। আবূ বাসীর তাহাদের একজনকে বলিলেন, হে অমুক, আল্লাহর শপথ! তোমার তরবারিটি বড়ই সুন্দর। সেই লোকটি নিজের কোষ হইতে তরবারিটি বাহির করিয়া বলিল, হাঁ, আল্লাহর শপথ! ইহা একটি সুন্দর তরবারি এবং আমি তাহা কয়েকবার পরীক্ষা করিয়াছি। আবূ বাসীর বলিলেন, আমাকে একটু দেখাও, আমি তাহা একটু দেখি। সে তাহাকে তরবারিটি দিলে আবূ বাসীর ইহার দ্বারা লোকটিকে হত্যা করিলেন। আর তাহার অপর সাথী পালাইয়া মদীনায় আসে এবং দৌড়াইতে দৌড়াইতে মসজিদে নববীতে ঢুকিয়া পড়ে। তাহাকে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইহাকে ভীত মনে হইতেছে। সে মহানবী (স)-এর কাছে গিয়া বলিল, আল্লাহর কসম! আমার সঙ্গীকে আবূ বাসীর হত্যা করিয়াছে এবং আমাকেও পাইলে হত্যা করিত। এমন সময় সেইখানে আবূ বাসীর উপস্থিত হইয়া বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এই বিষয়ে আপনার আর কোন দায়িত্ব নাই। আপনি আমাকে কাফিরদের নিকট ফেরত দিয়াছেন। কিন্তু আল্লাহ আমাকে তাহাদের হাত হইতে মুক্তি দান করিয়াছেন। এই কথা শুনিয়া মহানবী (স) বলিলেন, সর্বনাশ! সে তো যুদ্ধের আগুন জ্বালাইয়া দিত যদি তাহার সামর্থ্য থাকিত। এই কথা শুনিয়া তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে পুনরায় কাফিরদের নিকট ফেরত দিবেন। তাই তিনি রওয়ানা হইয়া সমুদ্র তীরে চলিয়া গেলেন। এইদিকে আবূ জান্দাল তাহাদের নিকট হইতে পালাইয়া আসিয়া আবূ বাসীরের সহিত মিলিত হন। অবশেষে তাঁহাদের একটি দল তৈরী হয়। যখনই তাঁহারা শুনিতেন, সিরিয়ার দিকে কুরায়শদের কোন বাণিজ্য কাফেলা যাইতেছে তখনই তাঁহারা তাহাদের উপর আক্রমণ করিত এবং তাহাদের পণ্যদ্রব্য কাড়িয়া লইত।
অবস্থা বেগতিক দেখিয়া কুরায়শগণ মহানবী (স)-এর নিকট আল্লাহর শপথ ও আত্মীয়তার শপথ দিয়া কিছু সংখ্যক লোক পাঠাইল এই বলিয়া যে, তিনি যেন আবূ বাসীর ও তাহার লোকজনকে বিরত রাখেন এবং তাঁহার নিকট কোন মুসলমান মক্কা হইতে ফিরিয়া গেলে আর তাহাকে ফেরত দিতে হইবে না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহাদের ডাকিয়া পাঠান। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, অঙ্গীকার পালনে রাসূলুল্লাহ (স) কত দৃঢ় ছিলেন। আর এই দৃঢ়তার কারণেই তিনি আবূ বাসীরকে কাফিরদিগের নিকট হস্তান্তর করিয়াছিলেন। অথচ আবু জান্দাল ও আবূ বাসীর ছিলেন নির্যাতিত মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত। অঙ্গীকার পালনের নিমিত্তে এই ধরনের সিদ্ধান্ত লওয়া পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
বদর যুদ্ধে কাফিরদের মুকাবিলায় মুসলমানদের সংখ্যা ছিল এক-তৃতীয়াংশেরও কম। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইচ্ছা এই হওয়া দরকার ছিল যে, মানুষের সংখ্যা যতই বাড়িবে ততই মঙ্গল। কিন্তু তখনও তিনি সামগ্রিকভাবে আল্লাহ্র ইচ্ছার উপর নির্ভলশীল ছিলেন। এমনকি অঙ্গীকার পালনে ছিলেন দৃঢ়, অবিচল। হুযায়ফা ইব্ন আল-ইয়ামান (রা) এবং আবু হুছাইল (রা) নামক দুইজন সাহাবী মক্কা হইতে আগমন করিতেছিলেন। পথিমধ্যে কাফিরগণ তাহাদের এই বলিয়া বাঁধা দিল যে, তাহারা মদীনায় মহানবী মুহাম্মাদ (স)-এর কাছে যাইতেছেন। তাহারা এই কথা অস্বীকার করিলেন। পরিশেষে তাহাদের নিকট হইতে এই অঙ্গীকার লইয়া ছাড়িয়া দিল যে, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিবে না। এই দুইজন রাসূলুল্লাহ (س)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করিলে তিনি বলিলেন, তোমরা দুইজনই ফিরিয়া যাও। কোনক্রমেই আমি অঙ্গীকার ভঙ্গ করিতে পারিব না। আমার কেবল আল্লাহ্র সাহায্যই দরকার।
কুরায়শগণ ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর মধ্যে সম্পাদিত হুদায়বিয়ার সন্ধিতে একটি শর্ত এই ছিল যে, কোন তৃতীয় পক্ষ মুহাম্মাদ (স) বা কুরায়শদের সহিত মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করিতে পারিবে। তদনুযায়ী বানু বক্স কুরায়শদের এবং বানু খুযা'আ রাসূলুল্লাহ (س)-এর সহিত মিত্রতার ঘোষণা করে। মিত্রতার শর্তানুসারে একে অপরকে সাহায্য করিবার অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু কুরায়শরা হুদায়বিয়া সন্ধি শর্ত ভঙ্গ করিয়া বানূ বকরকে অস্ত্র দিয়া সাহায্য করিল এবং অনেকেই রাত্রের অন্ধকারে বানু বকর-এর সহিত মিলিয়া বানু খুযা'আর উপর আক্রমণ করিল এবং তাহাদের অনেককে হত্যা করিল। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) বানু খুযা'আর সহিত সম্পাদিত মৈত্রী চুক্তির অঙ্গীকার রক্ষা করিতে সুদৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যাহার ফলে মক্কা বিজিত হয়।
মক্কা বিজয়কালে রাসূলুল্লাহ (স) যখন মুসলমানদিগকে মক্কায় প্রবেশের নির্দেশ দেন তখন মুসলিম অধিনায়কগণের নিকট হইতে অঙ্গীকার লইয়াছিলেন যে, হামলা করা না হইলে কাহারও সহিত সংঘর্ষে লিপ্ত হইও না। তিনি কেবল কয়েকজন গুরুতর অপরাধীর নাম উল্লেখ করিয়া বলিলেন, তাহারা যদি কা'বার গিলাফের মধ্যেও লুকাইয়া থাকে তবুও তাহাদেরকে হত্যা করা হইবে। অবশ্য অনেককেই রাসূলুল্লাহ (স) শেষ পর্যন্ত ক্ষমাও করিয়া দিয়াছিলেন। এই ঘোষণাকৃত ব্যক্তিগণ ছাড়া তিনি বিজয়ের প্রাক্কালে তিনটি ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়াছিলেন। তাহা হইতেছে :
(এক) যে ব্যক্তি নিজের গৃহে অবস্থান করিবে সে নিরাপদ থাকিবে; (দুই) যে ব্যক্তি মসজিদুল হারামে অবস্থান করিবে সে নিরাপদ থাকিবে; (তিন) যে আবূ সুফ্যান-এর ঘরে অবস্থান করিবে সেও নিরাপদ। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার এই কৃত অঙ্গীকারটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করিয়াছিলেন যাহা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ইহার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিধানের জন্য মদীনায় হিজরতের পর মহানবী (স) মদীনার অধিবাসী আওস, খায়রাজ ও তাহাদের মিত্রদের সহিত একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন যাহা ইতিহাসে 'মদীনা সনদ' নামে পরিচিত। ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত মহানবী (স) কখনও এই চুক্তি লংঘন করেন নাই বরং ইয়াহুদীরাই সর্বপ্রথম এই সনদের চুক্তি লংঘন করে। ইব্ন হিশাম বলেন :
إن بني قينقاع كانوا أول يهود نقضوا ما بينهم وبين رسول الله ﷺ وحاربوا فيما بين بدر واحد.
“বনূ কায়ানুকাই প্রথম ইয়াহুদী দল যাহারা রাসূলুল্লাহ (স) ও তাহাদের মধ্যকার (চুক্তির) বিষয়টি ভঙ্গ করিল এবং বদর ও উহুদের মধ্যবর্তী সময়ে তাহারা যুদ্ধে লিপ্ত হইল”।
মদীনা চুক্তি (সনদ) ও হুদায়বিয়া চুক্তি (সন্ধি) ছাড়াও রাসূলুল্লাহ (س) আরও কতিপয় চুক্তি সম্পাদন করিয়াছিলেন। যেমন, আবওয়া বা ওয়াদ্দান যুদ্ধে বানু দাম্মার সহিত চুক্তি, বানু মুদ্লিজের সহিত চুক্তি, খায়বার চুক্তি, ফাদাকের চুক্তি, তায়মা চুক্তি, আয়লা চুক্তি, জারা ও আযরূহ চুক্তি ও দুমাতু'ল-জান্দালের উকাযদির-এর সহিত চুক্তি।
এই সকল চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল, যেইভাবেই হউক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা। কোন চুক্তি সম্পাদনের পর তিনি ইহার প্রতি সর্বদা পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করিতেন। তাঁহার ঘোর শত্রুরাও কখনও তাঁহার বিরুদ্ধে তাহাদের সহিত কৃত অঙ্গীকার বা বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগ উত্থাপন করিতে পারে নাই।
এমনকি মহানবী (س) মৃত্যু শয্যায় শায়িত অবস্থায়ও তাঁহার অঙ্গীকার পালনে ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। হাদীছ শরীফে আছে : হযরত 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। মহানবী (س) তাঁহার মৃত্যুকালীন রোগের সময় (তাঁহার স্ত্রীগণকে) জিজ্ঞাসা করিতেন, আগামী কাল আমার কাহার কাছে থাকিবার পালা? তিনি 'আইশা (রা)-এর পালার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন। সুতরাং তাঁহার সকল স্ত্রী তাঁহাকে যাহার গৃহে ইচ্ছা থাকিবার অনুমতি দিলেন এবং তিনি আমৃত্যু 'আইশা (রা)-এর গৃহেই অবস্থান করিলেন। আর এইখানেই তাঁহার স্বাভাবিক পালার দিন আল্লাহ তাঁহাকে আপন সান্নিধ্যে উঠাইয়া নিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে কিভাবে অঙ্গীকার পালন করিতে হয় তাহার বাস্তব নমুনা পেশ করিয়া গিয়াছেন এবং ভবিষ্যত জনগোষ্ঠীকে এই ব্যাপারে সঠিক দিক-নির্দেশনাও প্রদান করিয়াছেন। তিনি বলেন, মুনাফিকদের আলামত তিনটি : যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন অঙ্গীকার করে তখন তাহা ভঙ্গ করে, যখন তাহার নিকট আমানত রাখা হয় তখন তাহা খেয়ানত করে।
মোটকথা রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অঙ্গীকার পালন করিয়া চলিতেন এবং অঙ্গীকার ভঙ্গ করাকে মুনাফিকের লক্ষণ বলিয়া অভিহিত করতেন।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুহদ বা অল্পে তুষ্টি
'যুহদ' শব্দটি ১৯; ধাতু হইতে উদ্ভূত, যাহার আভিধানিক অর্থ 'কম'। ইহা الرغبة (আগ্রহ) শব্দের বিপরীত অর্থবোধক। ইহার পারিভাষিক অর্থ, আখিরাতের শান্তি লাভের উদ্দেশ্যে দুনিয়ার সুখ-শান্তি পরিত্যাগ করা। ইব্ন তাইমিয়া (র) বলেন, শারী'আতের পরিভাষায় যুহ্দ অর্থ, আখিরাতের যিন্দেগীতে যাহা কোনও উপকারে আসিবে না উহার প্রতি আগ্রহী না হওয়া। সাধারণভাবে দুনিয়ার প্রতি কোনরূপ মোহ না থাকাকেই যুহৃদ বলা হয়।
মহান আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-কে দুনিয়ার ভোগবিলাস ও সৌন্দর্যের প্রতি চক্ষু তুলিয়া তাকাইতেও নিষেধ করিয়াছেন। তাঁহাকে শিক্ষা দেওয়া হইয়াছে, এইখানকার আনন্দ ও সৌন্দর্যোপকরণ পরীক্ষার জন্য দেওয়া হইয়াছে। আসল শান্তি আখিরাতে পাওয়া যাইবে। ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَوةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَرِزْقُ رَبُّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَى
"তুমি তোমার চক্ষুদ্বয় কখনও প্রসারিত করিও না উহার প্রতি যাহা আমি তাহাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসাবে দিয়াছি, তদ্দ্বারা তাহাদেরকে পরীক্ষা করিবার জন্য। তোমার প্রতিপালক প্রদত্ত জীবনোপকরণ উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী” (২০: ১৩১)।
لَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِلْمُؤْمِنِينَ
"আমি তাহাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়াছি তাহার প্রতি তুমি কখনও তোমার চক্ষুদ্বয় প্রসারিত করিও না। তাহাদের জন্য তুমি দুঃখ করিও না; তুমি মু'মিনদের জন্য তোমার পক্ষপুট অবনমিত কর" (১৫: ৮৮)।
পার্থিব জীবনের শোভা-সৌন্দর্য ও ভোগ-বিলাসের পিছনে পড়িলে মানুষ মহান আল্লাহ্র স্মরণ হইতে অমনোযোগী হইয়া যায় এবং নিজের খেয়াল-খুশীমত চলাফেরা করে। ফলে সে শারী'আতের সীমা অতিক্রম করিয়া যায়। তাই এইরূপ না করিবার জন্য মহান আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-কে নির্দেশ দিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে:
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِي يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَوةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا .
"তুমি নিজকে ধৈর্য সহকারে রাখিবে তাহাদেরই সংসর্গে যাহারা সকাল ও সন্ধ্যায় আহ্বান করে উহাদের প্রতিপালককে তাঁহার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করিয়া উহাদিগ হইতে তোমার দৃষ্টি ফিরাইয়া লইও না। তুমি তাহার আনুগত্য করিও না যাহার চিত্তকে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করিয়া দিয়াছি, যে তাহার খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে ও যাহার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে" (১৮: ২৮)।
যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার স্মরণ বিমুখ সে কেবল পার্থিব জীবনই কামনা করে। সুতরাং তাহাকে উপেক্ষা করিয়া চলার জন্য মহানবী (স)-কে নির্দেশ দিয়াছেন তিনি। ইরশাদ হইয়াছে:
فَأَعْرِضْ عَنْ مَّنْ تَوَلَّى عَنْ ذِكْرِنَا وَلَمْ يُرِدْ إِلَّا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا ذَلِكَ مَبْلَغُهُمْ مِّنَ الْعِلْمِ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اهْتَدَى .
"অতএব যে ব্যক্তি আমার স্মরণে বিমুখ তুমি তাহাকে উপেক্ষা করিয়া চল; সে তো কেবল পার্থিব জীবনই কামনা করে। উহাদের জ্ঞানের দৌড় এই পর্যন্ত। তোমার প্রতিপালকই ভাল জানেন কে তাঁহার পথ হইতে বিচ্যুত, তিনিই ভাল জানেন কে সৎপথ প্রাপ্ত” (৫৩: ২৯-৩০)।
আল্লাহ তা'আলার এইসব উপদেশ ও নির্দেশ রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় জীবনের পরতে পরতে একেবারে অক্ষরে অক্ষরে মানিয়া চলিয়াছিলেন। তাই রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমগ্র জীবন পর্যালোচনা করিলে ইহা সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয় যে, তিনি দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও ভোগ- বিলাসের প্রতি মোটেই আগ্রহী ছিলেন না। ভোগ-বিলাসের সকল উপকরণ করায়ত্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি স্বেচ্ছায় তাহা পরিহার করিয়াছেন। বিবাহের পর আরবের অন্যতম ধনাঢ্য মহিলা হযরত খাদীজা (রা)-এর অঢেল সম্পদ হাতে পাইয়াও তাহা ভোগের জন্য ব্যবহার করেন নাই; বরং দুই হাতে তাহা গরীব-দুঃখীদের মধ্যে বিলাইয়া দিয়াছেন। মদীনায় হিজরতের পর তিনি রাষ্ট্র প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগার ছিল তাঁহারই নিয়ন্ত্রণে। এতদ্ব্যতীত কাফিরদের সহিত যুদ্ধে গনীমতরূপে তাঁহার হস্তাগত হয় অজস্র সম্পদ; কিন্তু নিজের ভোগ ও আরাম- আয়েশের জন্য কিছুই তিনি ব্যয় করেন নাই। পরিবারের সামান্য আহার যোগাইবার জন্য তিনি ঋণ পর্যন্ত করিয়াছেন। তাঁহার ইনতিকালের পর দেখা গেল তাঁহার লৌহ বর্মটি আবূ শাহ্মা নামক এক ইয়াহূদীর নিকট বন্ধক রহিয়াছে, যাহার বিনিময়ে তিনি পরিবারের জন্য সামান্য খাদ্যশস্য সংগ্রহ করিয়াছিলেন।
মহান আল্লাহ তাঁহাকে 'দাস-নবী' ও 'বাদশাহ-নবী' দুইটির যে কোনও একটি গ্রহণের এখতিয়ার দিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি 'দাস-নবী' হওয়া পসন্দ করেন এবং সেইভাবেই জীবন যাপন করিয়াছেন। ইব্ন কাছীর, বুখারী ও নাসাঈর হাদীছ উদ্ধৃত করিয়াছেন:
كان ابن عباس يحدث ان الله ارسل الى نبيه ملكا من الملائكة معه جبريل فقال الملك لرسوله ان الله يخيرك بين أن تكون عبدا نبيا وبين ان تكون ملكا نبيا فالتفت رسول الله ﷺ إلى جبريل كالمستشير له فاشار جبريل الى رسول الله ﷺ ان تواضع فقال رسول الله ﷺ بل اكون عبدا نبيا قال فما اكل بعد تلك الكلمة طعاما متكنا حتى لقى الله عز وجل
"ইব্ন আব্বাস (রা) বর্ণনা করিতেন যে, আল্লাহ তাঁহার নবীর নিকট একজন ফেরেশতা পাঠাইলেন যাহার সহিত জিবরীল (আ)-ও ছিলেন। অতঃপর ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, আপনি কি আল্লাহ্র দাসত্বে নিবেদিত নবী হইবেন, না রাজাধিরাজ নবী—এই ব্যাপারে আল্লাহ আপনাকে ইখতিয়ার দিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) জিবরীল (আ)-এর দিকে তাকাইলেন যেন তিনি তাঁহার পরামর্শপ্রার্থী। জিবরীল (আ) রাসূলুল্লাহ (স)-কে আল্লাহর প্রতি বিনয়ী হওয়ার জন্য ইশারা করিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি বরং আল্লাহর দাসত্বে নিবেদিত নবী হইতে চাহি। রাবী বলেন, এই কথা বলার পর হইতে আল্লাহ্র সহিত সাক্ষাৎ করা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (স) কখনও ঠেস দিয়া বসিয়া আহার করেন নাই”।
হাদীছটি উদ্ধৃত করিয়া ইব্ন কাছীর বলেন, ইমাম বুখারী তাঁহার তারীখ গ্রন্থে হায়ওয়া ইব্ শুরায়হ সূত্রে ইহা উদ্ধৃত করিয়াছেন এবং ইমাম নাসাঈ 'আমর ইব্ন উছমান সূত্রে। এই ধরনের শব্দে সহীহ গ্রন্থে এই হাদীছের মূল বিষয়বস্তু বর্ণিত হইয়াছে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর এইসব ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশ ত্যাগের মূলে ছিল এই চিন্তাধারা যে, দুনিয়া নিতান্তই একটি ক্ষণস্থায়ী জায়গা। তাই আল্লাহ তা'আলার নিকট ইহার কোনই মূল্য নাই। ইহা শুধু আখিরাতের পাথেয় সঞ্চয়ের জায়গা। তাই মু'মিনের জন্য ইহা কারাগাররূপে প্রতিভাত হয়। কিন্তু কাফিরদের যেহেতু পরকালে বিশ্বাস নাই এইজন্য তাহাদের নিকট ইহা জান্নাতস্বরূপ। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন :
الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر "দুনিয়া মু'মিনের কারাগার এবং কাফিরের জান্নাত"।
দুনিয়ার মূল্য আল্লাহ্র নিকট একটি নগণ্য মৃত বকরীর বাচ্চা হইতেও তুচ্ছ। হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
عن جابر بن عبد الله أن رسول الله ﷺ مر بالسوق داخلا من بعض العالية والناس كنفيه فمر بجدى أسك ميت فتناوله فأخذ بأذنه ثم قال أيكم يحب أن هذا له بدرهم فقالوا لا نحب انه لنا بشيئ ما نصنع به قال أتحبون أنه لكم قالوا والله لو كان حيا كان عيبا فيه لأنه أسك فكيف وهو ميت فقال فوالله للدنيا أهون على الله من هذا عليكم (مسلم ، كتاب الزهد والرقائق، رقم الحديث - ٧١٥٠) .
"জাবির ইব্ন আবদিল্লাহ (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) মদীনার উচ্চ ভূমিতে প্রবেশের সময় একটি বাজার দিয়া যাইতেছিলেন। তাঁহার উভয় পার্শ্বে বেশ লোকজন ছিল। অতঃপর ক্ষুদ্র কানবিশিষ্ট একটি মৃত বকরীর বাচ্চা তাঁহার সামনে পড়িল। তিনি উহার কান ধরিয়া বলিলেন, তোমাদের মধ্যে কে ইহা একটি দিরহামের বিনিময়ে লইতে আগ্রহী? তখন তাঁহারা বলিলেন, কোন কিছুর বিনিময়ে আমরা উহা লইতে আগ্রহী নহি। উহা দ্বারা আমরা কি করির? তিনি বলিলেন, কোন বিনিময় ছাড়াই তোমরা কি উহা লইতে আগ্রহী হইবে? তাঁহারা বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! ইহা যদি জীবিতও হইত তবুও তো উহাতে দোষ রহিয়াছে। কারণ উহার কান ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র। আর এখন তো উহা মৃত (তাই কে উহা গ্রহণ করিবে)। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আল্লাহর কসম! ইহা তোমাদের নিকট যতটা তুচ্ছ, দুনিয়া আল্লাহ্র নিকট ইহা হইতে অধিক তুচ্ছ”।
অন্য হাদীছে বর্ণিত আছে যে, দুনিয়ার মূল্য আল্লাহ্র নিকট একটি মশার ডানার সমতুল্যও নহেঃ
عن سهل بن سعد قال قال رسول الله ﷺ لو كانت الدنيا تعدل عند الله جناح بعوضة ما سقى كافرا منها شربة ماء (ترمذى، الجامع الصحيح، كتاب الزهد - رقم الحديث -٢٣٢٣) .
"সাহল ইব্ন সা'দ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: এই দুনিয়া যদি আল্লাহ্র নিকট একটি মশার ডানার সমানও মূল্যবান হইত তবে তিনি ইহা হইতে কোন কাফিরকে এক ঢোক পানিও পান করিতে দিতেন না”।
দুনিয়া যে যতই অর্জন করুক না কেন আখিরাতের তুলনায় তাহা একেবারেই নগণ্য। রাসূলুল্লাহ (স) একটি উদাহরণের মাধ্যমে সুন্দরভাবে তাহা বুঝাইয়া দিয়াছেন:
قال رسول الله ﷺ ما الدنيا في الآخرة الا مثل ما يجعل احدكم اصبعه في اليم فلينظر بماذا يرجع ( ترمذی، کتاب الزهد، رقم الحديث - ٢٣٢٦) .
"রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া হইল এইরূপ যে, তোমাদের কেহ সমুদ্রে তাহার আঙ্গুল ডুবাইয়া বাহির করিয়া আনিল। সে লক্ষ্য করিয়া দেখুক যে, সে তাহার আঙ্গুলে ভিজাইয়া সমুদ্রের কতটুকু 'পানি তুলিয়া আনিতে পারিয়াছে”।
এইসব কারণেই রাসূলুল্লাহ (স) নিজেও দুনিয়ায় সম্পদ সঞ্চয় করা পছন্দ করিতেন না এবং অন্যকেও তাহা করিতে নিরুৎসাহিত করিতেন। যেমন হাদীছে উল্লিখিত হইয়াছে:
عن عبد الله بن مسعود قال قال رسول الله ﷺ لا تتخذوا الضيعة فترغبوا في الدنيا (ترمذى، كتاب الزهد، رقم الحديث - ۲۳۳۱) .
"আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: তোমরা সহায়-সম্পত্তি অর্জন করিও না, তাহা হইলে দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হইয়া পড়িবে”।
রাসূলুল্লাহ (স) দুনিয়াকে ক্ষণিকের বিশ্রামাগারের সহিত তুলনা করিয়াছেন। এইজন্য তিনি স্বেচ্ছায় দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশ ত্যাগ করিয়াছেন। তিনি শক্ত বিছানায় শয়ন করিয়াছেন। কেহ নরম বিছানা দিতে চাহিলেও তিনি তাহা প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন। হাদীছে উল্লিখিত হইয়াছে:
عن عبد الله قال نام رسول الله ﷺ على حصیر فقام وقد اثر في جنبه فقلنا يا رسول الله لو اتخذنا لك وطاء فقال ما لى وما للدنيا ما انا في الدنيا الا كراكب استظل تحت شجرة ثم راح وتركها (ترمذی، کتاب الزهد ، رقم الحديث - ۲۳۸۰ ) .
'আবদুল্লাহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (س) একটি খেজুর পাতার চাটাইয়ের উপর ঘুমাইলেন। তিনি যখন (জাগ্রত হইয়া) দাঁড়াইলেন তখন তাঁহার পার্শ্বদেশে উহার দাগ পড়িয়া গিয়াছিল। আমরা বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার জন্য যদি আমরা একটি নরম বিছানা বানাইয়া দিতে পারিতাম! তিনি বলিলেন, আমার সঙ্গে দুনিয়ার সম্পর্ক কি? আমি তো দুনিয়ায় সেই এক আরোহীর মত, যে (গ্রীষ্মের দিনে) পথ চলিতে চলিতে একটি বৃক্ষের ছায়া তলে আশ্রয় লইল। ইহার পর আবার সে উহা ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেল”।
উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা)-এর বর্ণনায় ইহাও উল্লিখিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছিলেন : فلم يرجع اليها أبدا "উক্ত পথিক প্রস্থান করার পর আর কখনও উহার দিকে ফিরিয়া আসে না”।
আল্লাহ্র পক্ষ হইতে হযরত জিবরীল (আ) মক্কার বালুকাময় অঞ্চলসমূহ স্বর্ণ বানাইয়া দেওয়ার প্রস্তাব দেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (س) সবিনয়ে তাহা প্রত্যাখ্যান করেন। হযرت আবূ উমামা (রা) বর্ণিত দীর্ঘ একটি হাদীছের শেষে উল্লিখিত হইয়াছে:
قال عرض على ربي ليجعل لى بطحاء مكة ذهبا قلت لا يا رب ولكن أشبع يوما وأجوع يوما وقال ثلاثا أو نحو هذا . فاذا جعت تضرعت إليك وذكرتك وإذا شبعت شكرتك وحمدتك (ترمذى، كتاب الزهد ، رقم الحديث - ٢٣٥٠ ) .
"রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আমার প্রতিপালক আমাকে মক্কার বালুকাময় অঞ্চল স্বর্ণে পরিণত করিয়া দেওয়ার প্রস্তাব করিয়াছিলেন। কিন্তু আমি বলিলাম, হে আমার প্রতিপালক! না, বরং আমি একদিন তৃপ্তি সহকারে আহার করিব এবং একদিন ক্ষুধার্ত থাকিব। এই কথাটি তিনি তিনবার বা তদ্রূপ বলিয়াছেন। যখন ক্ষুধার্ত থাকিব তখন তোমারই কাছে কাকুতি-মিনতি করিব; তোমারই স্মরণ করিব। আর যখন তৃপ্তি সহকারে আহার করিব তখন তোমার শোকর করিব এবং তোমার প্রশংসা করিব”।
অন্য এক বর্ণনায় আসিয়াছে যে, জিবরীল (আ) মক্কার পাহাড়গুলিকে স্বর্ণে পরিণত করিয়া দেওয়ার প্রস্তাব দেন এবং ইহাও বলেন, আপনার বহন করার প্রয়োজন হইবে না, বরং সেইগুলিই আপনার সঙ্গে সঙ্গে চলিবে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) এই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেন। কাযী 'আয়ায তাঁহার আশ-শিফা গ্রন্থে হাদীছটি এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন:
ان جبريل نزل عليه فقال له ان الله تعالى يقرئك السلام ويقول لك اتحب ان اجعل هذه الجبال ذهبا وتكون معك حيثما كنت فاطرق ساعة ثم قال يا جبريل ان الدنيا دار من لا دار له ومال من لا مال له قد يجمعها من لا عقل له فقال له جبريل ثبتك الله يا محمد بالقول الثابت
"জিবরীল (আ) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিয়া বলিলেন, আল্লাহ আপনাকে সালাম দিয়াছেন এবং বলিয়াছেন, আপনি চাহিলে আমি এই সকল পর্বতকে স্বর্ণ বানাইয়া দিব। আর আপনি যেখানেই যান উহা আপনার সঙ্গেই থাকিবে। তখন তিনি কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন, অতঃপর বলিলেন, হে জিবরীল! দুনিয়া তাহার ঘর যাহার (পরকালে) কোন ঘর নাই; তাহার সম্পদ যাহার কোন সম্পদ নাই। আর তাহা সঞ্চয় করে সেই ব্যক্তি যাহার কোন বুদ্ধি নাই। তখন জিবরীল (আ) তাঁহাকে বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহ আপনাকে শাশ্বত বাণীর দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত রাখুন"।
রিযিকের প্রাচুর্য তিনি কখনও কামনা করেন নাই; বরং ইসলাম গ্রহণ, প্রয়োজন পরিমাণ রিযিক এবং অল্পে তুষ্ট থাকাকেই তিনি সফলতা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীছে উল্লিখিত হইয়াছে:
عن عبد الله بن عمرو ان رسول الله ﷺ قال قد افلح من اسلم وكان رزقه كفافا وقنعه الله
"আবদুল্লাহ ইব্ন আমর (را) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছেন: সেই ব্যক্তি সফলকাম যে ইসলাম কবুল করিয়াছে এবং প্রয়োজন পরিমাণ রিযিক পাইয়াছে আর আল্লাহ তাহাকে অল্পে তুষ্টি দান করিয়াছেন"।
এইজন্যই রাসূলুল্লাহ (س) স্বীয় বংশধর ও পরিবার-পরিজনদের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজন পরিমাণ রিযিকের জন্য দু'আ করিতেন:
عن ابى هريرة قال قال رسول الله الله اللهم اجعل رزق ال محمد قوتا. وفي رواية للبخارى اللهم ارزق آل محمد قوتا .
"আবু হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (س) বলিতেন, হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ (س)-এর পরিবার-পরিজনদেরকে প্রয়োজনীয় রিযিক দান কর”। রাসূলুল্লাহ (স) কখনও একবেলা খাওয়ার পর অন্য বেলার জন্য আহার্য রাখিয়া দিতেন না। আর কখনও তিনি একইসঙ্গে দুই জোড়া পোশাক ব্যবহার করেন নাই। হযরত 'আইশা (রা) বলেন:
ما رفع رسول الله ﷺ قط عشاء لغد ولا غداء لعشاء ولا اتخذ من شيئ زوجين ولا قميصين ولا ردائين ولا إزارين ولا من النعال . ولا رئى قط فارغا في بيته اما يخصف نعلا لرجل مسكين او يخيط ثوبا لأرملة .
"রাসূলুল্লাহ (স) কখনও রাত্রের খাবার সকালের জন্য তুলিয়া রাখিতেন না। আর না সকালের খাবার রাত্রির জন্য। তিনি কোনও জিনিসের এক জোড়া ব্যবহার করেন নাই, না দুইটি জামা একত্রে ব্যবহার করিয়াছেন, না দুইটি চাদর, না দুইটি লুঙ্গি আর না দুই জোড়া জুতা। আর তাঁহাকে কখনও গৃহে অবসর বসিয়া থাকিতে দেখা যায় নাই। হয় তিনি কোনও মিসকীনের জন্য জুতা সেলাই করিতেন অথবা বিধবা ও ইয়াতীমদের জন্য কাপড় সেলাই করিতেন”। এই মর্মে হযরত আনাস (রা) হইতেও একটি হাদীছ বর্ণিত আছে। তিনি বলেন:
كان النبي ﷺ لا يدخر شيئا لغد.
"নবী করীম (স) আগামী দিনের জন্য কোনও জিনিস জমা করিয়া রাখিতেন না"। তিনি একাধারে তিন দিন পরিতৃপ্ত হইয়া আহার করেন নাই। উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা) বলেন:
ما شبع رسول الله ﷺ ثلاثة ايام تباعا من خبز بر حتى مضى لسبيله (مسلم) کتاب الزهد والرقائق رقم الحديث - ٧١٧٥) .
"রাসূলুল্লাহ (স) একাধারে তিন দিন গমের রুটি পেট ভরিয়া আহার করেন নাই। এই অবস্থায়ই তিনি তাঁহার পথে চলিয়া গিয়াছেন"। ইমাম বুখারী হাদীছটি এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন:
ما شبع ال محمد ﷺ منذ قدم المدينة من طعام البر ثلاث ليال تباعا حتى قبض .
"মুহাম্মদ (স)-এর পরিবার যখন মদীনায় আগমন করিয়াছেন তখন হইতে তাঁহার ইনতিকাল পর্যন্ত একাধারে তিন রাত্র গমের রুটি পেট ভরিয়া আহার করেন নাই"।
একাধারে দুই দিনও তিনি এবং তাঁহার পরিবারের লোকজনও পরিতৃপ্ত হইয়া আহার করেন নাই। হযরত 'আইশা (রা) বর্ণনা করেন:
مَا شَبِعَ آلُ مُحَمَّدِ اللهُ مِنْ خُبْزِ شَعِيرٍ يَوْمَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ حَتَّى قُبِضَ رَسُولُ اللهِ ﷺ (মুসলিম, رقم الحديث - ٧١٧٦).
"মুহাম্মদ (স)-এর পরিবার পরপর দুই দিন কখনও যবের রুটি পেট পুরিয়া আহার করেন নাই। এই অবস্থায়ই রাসূলুল্লাহ (س) ইনতিকাল করেন"। তিনি ময়দার রুটি তথা বিলাসী আহার গ্রহণ করিতেন না, সবচাইতে নিম্ন মানের যে রুটি অর্থাৎ যবের রুটিই খাইতেন। হাদীছে উক্ত হইয়াছে যে, ময়দার রুটি খাওয়া তো দূরের কথা, তিনি তাহা দেখেনও নাই। যবের রুটি তাহাও চালুনিতে ছাঁকিয়া নহে, বরং ফুঁ দিয়া উহার খোসা উড়াইয়া তাহারই মণ্ড তৈরী করত রুটি বানাইয়া খাইতেন।
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ اَنَّهُ قِيلَ لَهُ اَكَلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ النَّقِىَّ يَعْنِى الْحُوَارِىَّ فَقَالَ سَهْلُ مَا رَأَى رَسُولُ اللهِ ﷺ النَّقِىَّ حَتَّى لَقِىَ اللهَ. فَقِيلَ لَهُ هَلْ كَانَتْ لَكُمْ مَنَاخِلُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ ﷺ قَالَ مَا كَانَتْ لَنَا مَنَاخِلَ . قِيلَ كَيْفَ كُنْتُمْ تَصْنَعُونَ بِالشَّعِيرِ . قَالَ كُنَّا نَنْفُخُهُ فَيَطِيرُ مِنْهُ مَا طَارَ ثُمَّ نَثْرِيهِ فَنَعْجِنُهُ .
"সাহল ইবন সা'দ (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হইল, রাসূলুল্লাহ (س) কি কখনও ময়দা খাইয়াছেন? সাহল (রা) বলিলেন, আল্লাহ্র সঙ্গে সাক্ষাৎ করা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (س) ময়দা দেখেন নাই। তাঁহাকে বলা হইল, রাসূলুল্লাহ (س)-এর যুগে আপনাদের চালনি জাতীয় কিছু ছিল কি? তিনি বলিলেন, না, আমাদের চালনি ছিল না। বলা হইল, তাহা হইলে আপনারা যব লইয়া কি করিতেন? তিনি বলিলেন, আমরা তাহাতে ফুঁক দিতাম। ইহাতে যাহা উড়িয়া যাওয়ার উড়িয়া যাইত। ইহার পর পানি ঢালিয়া তাহা মণ্ড করিয়া লইতাম"।
রাসুলুল্লাহ (স) জীবনে কখনও পাতলা রুটি খান নাই এবং টেবিলে বসিয়াও তিনি আহার করেন নাই। যেমন হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
عن انس قال لم يأكل النبي ﷺ على خوان حتى مات وما أكل خبزا مرفقا حتى مات .
"আনাস (রা) বলেন, নবী করীম (স) মৃত্যু পর্যন্ত কখনও টেবিলে আহার করেন নাই। আর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি কখনও পাতলা রুটি আহার করেন নাই"।
হযরত আনাস (রা) হইতে ইমাম তিরমিযী (র) বর্ণনা করেন :
ما اكل رسول الله ﷺ على خوان ولا اكل خبزا مرققا حتى مات .
"রাসূলুল্লাহ (স) মৃত্যু পর্যন্ত টেবিলে রাখিয়া আহার করেন নাই এবং কখনও পাতলা রুটিও আহার করেন না।"
যবের রুটিও আবার সব সময় মিলিত না। ফলে মাসাধিক কাল অতিবাহিত হইয়া যাইত, কিন্তু ঘরে চুলা জ্বলিত না। শুধুমাত্র খেজুর ও পানি দ্বারাই ক্ষুন্নিবৃত্তি করিতে হইত। উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা) বলেন :
ان كنا ال محمد لنمكث شهرا ما نستوقد بنار إن هو الا التمر والماء.
"আমরা মুহাম্মাদ (স)-এর পরিবার কোন মাস এমনভাবেও কাটাইতাম যে, আমরা আগুনও জ্বালাইতাম না। আমরা শুধু খেজুর ও পানি খাইয়াই কাটাইয়া দিতাম"।
ইহার সহিত মাঝেমধ্যে প্রতিবেশীদের নিকট হইতে সামান্য দুধ হাদিয়া আসিলে তাহাই পরিবারের সকলে মিলিয়া পান করিতেন। এই কথাই খুব করুণভাবে হযরত 'আইশা (রা) তাঁহার আদরের ভাগিনেয় ও সুযোগ্য ছাত্র 'উরওয়া ইবনুয যুবায়র (রা)-কে বলিয়াছেন :
عن عروة عن عائشة انها كانت تقول والله يا ابن أختى ان كنا لننظر إلى الهلال ثم الهلال ثم الهلال ثلاثة اهلة فى شهرين وما أقدت في أبيات رسول الله ﷺ نار قال فقلت يا خالة فما كان يعيشكم ؟ قالت الأسودان الماء والتمر الا أنه قد كان لرسول الله ﷺ جيران من الانصار وكانت لهم منائح فكانوا يرسلون الى رسول الله ﷺ من البانها فيسقيناه .
"উরওয়া (র) হযরত 'আইশা (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, 'হে আমার ভগ্নি-পুত্র। আমরা নূতন চাঁদ দেখিতাম, অতঃপর পুনরায় নূতন চাঁদ দেখিতাম, তারপর আবার নূতন চাঁদ দেখিতাম-দুইমাসে তিনবার নূতন চাঁদ দেখিতাম। অথচ রাসূলুল্লাহ (স)-এর ঘরসমূহে আগুন জ্বালানো হইত না। তিনি (উরওয়া) বলেন, আমি বলিলাম, হে খালা! আপনারা কিভাবে দিন যাপন করিতেন? তিনি বলিলেন, দুইটি কালো জিনিস-খেজুর ও পানি দ্বারা। তবে তাঁহার কিছু আনসার প্রতিবেশী ছিল। তাহাদের কিছু দুগ্ধবতী উষ্ট্রী ও বকরী ছিল। তাহারা তাহা দোহন করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পাঠাইতেন। তাহাই তিনি আমাদিগকে পান করাইতেন”।
আবার যখন আহারের সংস্থান হইত, চুলা জ্বলিত, রুটি পাকানো হইত তখনও দুই বেলা পেট পুরিয়া তিনি আহার করেন নাই। হযরত 'আইশা (রা) বলেন:
لقد مات رسول الله ﷺ وما شبع من خبز وزيت في يوم واحد مرتين .
"রাসূলুল্লাহ (স) ইনতিকাল করিলেন অথচ তিনি একদিন দুই বেলা রুটি ও যায়তুন দ্বারা কখনও পরিতৃপ্ত হইয়া আহার করেন নাই”।
أذكر الحال التي فارق عليها رسول الله ﷺ الدنيا . والله ما شبع من خبز ولحم مرتين في يوم .
"রাসূলুল্লাহ (স) যে অবস্থায় দুনিয়া ত্যাগ করিয়া গিয়াছেন তাহা আমার মনে পড়িতেছে। আল্লাহ্র কসম! তিনি দিনে দুই বেলা কখনও রুটি-গোস্ত পেট পুরিয়া খাইতে পারেন নাই”।
কখনও কখনও আহার করার মত কোনও খাদ্যই জুটিত না। ফলে পরিবারসহ সকলেই অনাহারেই কাটাইয়া দিতেন এবং ক্ষুধার তাড়নায় অস্থির থাকিতেন। যেমন সিমাক ইব্ন হারব (র) বলেনঃ
سمعت النعمان بن بشير يخطب قال ذكر عمر ما اصاب الناس من الدنيا فقال لقد رأيت رسول الله ﷺ يظل اليوم يلتوى ما يجد دقلا يملأ به بطنه .
"নু'মান ইব্ন বাশীর (রা)-কে বক্তৃতারত অবস্থায় আমি এই কথা বলিতে শুনিয়াছি যে, 'উমার (রা) বলিয়াছেন, মানুষ কী পরিমাণ দুনিয়া কামাই করিয়াছে! অথচ রাসূলুল্লাহ (স)-কে আমি দেখিয়াছি যে, তিনি ক্ষুধার তাড়নায় সারাদিন অস্থির থাকিতেন। পেটে ভরিবার মত নিম্ন মানের একটি খেজুরও তিনি পাইতেন না”।
কখনওবা তিনি একাধারে রাত্রির পর রাত্রি পরিবারসহ না খাইয়া শুইয়া থাকিতেন এবং অনাহারেই রাত্র কাটাইয়া দিতেন। হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
عن ابن عباس قال كان رسول الله ﷺ يبيت الليالي المتتابعة طاويا واهله لا يجدون عشاء وكان أكثر خبزهم خبز الشعير.
"ইবন 'আব্বাস (را) বলেন, রাসূলুল্লাহ (س) এবং তাঁহার পরিবারের সদস্যগণ পরপর কয়েক রাত্রি ক্ষুধার্ত অবস্থায় কাটাইতেন। তাঁহাদের জন্য রাত্রির আহারের সংস্থান হইত না। অধিকাংশ দিন যবের রুটিই ছিল তাহাদের খাদ্য”।
এমনকি ইনতিকালের সময়ও তিনি সামান্য বব ব্যতীত তেমন কিছু রাখিয়া যান নাই যাহা খাইয়া তাঁহার পরিবারবর্গ জীবন ধারণ করিতে পারেন। উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা) বলেন:
توفى رسول الله ﷺ وما في رفى من شيئ يأكله ذوكبد الا شطر شعير في رف لي فأكلت منه حتى طال على فكلته ففنى .
"রাসूलুল্লাহ (س) দুনিয়া হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়াছেন তখন আমার পাত্রে সামান্য কিছু যব ব্যতীত কোন প্রাণীর আহার করার মত কিছুই ছিল না। তাহা হইতেই আমি আহার করিতাম। এইভাবে অনেক দিন চলিয়া যায়। অতঃপর আমি তাহা ওযন করিলাম, ফলে উহা শেষ হইয়া গেল”।
অনাহারে থাকাটাই তাঁহার নিকট পছন্দনীয় ছিল। তাই রাত্রে অনাহারে থাকিয়াও দিনের বেলা তিনি রোযা রাখিতেন। পৃথিবীর ধনভাণ্ডার, ফল-ফলাদি ও বিত্তবৈভব স্বীয় প্রতিপালকের নিকট চাহিলেই তিনি পাইতেন, কিন্তু তাহা তিনি করেন নাই। এই মর্মে হযরত 'আইশা (রা) হইতে একটি দীর্ঘ হাদীছ কাযী 'আয়ায তাঁহার আশ-শিফা গ্রন্থে উদ্ধৃত করিয়াছেন:
عن عائشة قالت لم يمتلئئ جوف النبي ﷺ شبعا قط ولم يبث شكوى إلى أحد وكانت الفاقة أحب اليه من الغنى وان كان ليظل جائعايلتوى طول ليلته من الجوع فلا يمنعه صيام يومه . ولو شاء سأل ربه جميع كنوز الارض وثمارها ورغد عيشها .. ولقد كنت ابكى له رحمة مما ارى به وامسح بيدى على بطنه مما به من الجوع واقول نفسى لك الفداء لو تبلغت من الدنيا مما يقوتك فيقول يا عائشة مالي وللدنيا ؟ اخواني من اولى العزم من الرسل صبروا على ما هو اشد من هذا فمضوا على حالهم فقدموا على ربهم فاكرم مابهم واجزل ثوابهم فاجدني استحيى ان ترفهت في معيشتي ان يقصربي غدا دونهم وما من شيئ هو احب الى من اللحوق باخواني واخلائي قالت فما أقام بعد لإشهرا حتى توفى ﷺ.
" 'আইশা (রা) বলেন, নবী করীম (س)-এর পেট কখনও পরিতৃপ্ত হইয়া পূর্ণ হয় নাই। কাহারও নিকট তিনি অভিযোগও করেন নাই। ধনাঢ্যতা হইতে অনাহারে থাকাই তাঁহার নিকট পছন্দনীয় ছিল। কখনও তিনি ক্ষুধায় সারারাত্রি কষ্ট করিতেন। কিন্তু ইহা তাঁহাকে দিনের বেলার রোযা রাখা হইতে বিরত রাখিতে পারিত না। তিনি ইচ্ছা করিলে পৃথিবীর সকল ধনভাণ্ডার, ফল-ফলাদি এবং উহার আরাম-আয়েশের সামগ্রী তাঁহার প্রতিপালক হইতে চাহিয়া লইতে পারিতেন। তাঁহার অবস্থা দেখিয়া আমি কাঁদিতাম এবং ক্ষুধার কারণে আমার হাত দ্বারা তাঁহার পেট মর্দন করিয়া দিতাম আর বলিতাম, আপনার জন্য আমার জান কুরবান হউক! আপনি যদি দুনিয়া হইতে আপনার প্রয়োজনমত রিযিক গ্রহণ করিতেন। তিনি বলিতেন, হে 'আইশা। আমার ও দুনিয়ার মধ্যে সম্পর্ক কি? আমার ভ্রাতা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূল্লগণ ইহা হইতেও কঠিন ও কষ্টকর বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করিয়াছেন। অতঃপর তাঁহারা সেই অবস্থায়ই চলিয়া গিয়াছেন। তাঁহারা তাঁহাদের প্রতিপালকের নিকট গমন করিয়াছেন। অতঃপর তিনি তাহাদিগকে সম্মানজনক স্থানে অধিষ্ঠিত করিয়াছেন এবং তাঁহাদিগকে পরিপূর্ণ হাওয়াব দান করিয়াছেন। তাই আমি লজ্জাবোধ করি যে, আমি যদি আমার জীবনধারায় ভোগবিলাস আনয়ন করি তাহা হইলে আগামী দিনে হয়ত বা তাঁহাদের তুলনায় আমার মর্যাদা কমাইয়া দেওয়া হইবে। আমার ভ্রাতা ও বন্ধুবর্গের সহিত মিলিত হওয়ার তুলনায় অধিক পছন্দনীয় আমার নিকট আর কিছুই নাই। 'আইশা (রা) বলেন, ইহার পর তিনি মাত্র একমাস জীবিত ছিলেন, অতঃপর তিনি ইনতিকাল করেন"।
রাসূলুল্লাহ (س) শয়ন করিতেন অত্যন্ত মামুলী ধরনের বিছানায়। তাঁহার বিছানা সম্পর্কে উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা) বলেন:
كان فراش رسول الله ﷺ من آدم وحشوه ليف .
"রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিছানা ছিল চামড়ার। আর উহার ভিতর খেজুর গাছের আশ ভর্তি ছিল”।
কখনও বা একটি চট দুই ভাঁজ করিয়া বিছাইয়া দেওয়া হইত, তাহারই উপর তিনি নিদ্রা যাইতেন। একটু আরামের জন্য একদিন তাহা চার ভাঁজ করিয়া দিলে প্রভাতে উঠিয়াই তিনি এইরূপ করিতে নিষেধ করেন এবং পূর্বের ন্যায় করিতে নির্দেশ দেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা (রা) হইতে এই মর্মে হাদীছ বর্ণিত আছেঃ
سئلت حفصة ما كان فراش رسول الله الله في بيتك قالت مسحا نثنيه ثنتين فينام عليه فلما كان ذات ليلة قلت لو ثنيته اربع ثنيات كان أوطأ له فثنيناه باربع ثنيات فلما اصبح قال ما فرشتموني الليلة ؟ قالت قلنا هو فراشك الا انا ثنيناه باربع ثنيات قلنا اوطأ لك قال ردوه لحاله الاولى فانه منعتنى وطأته صلوتي الليلة .
"হাফসা (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হইল, আপনার গৃহে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিছানা কিরূপ ছিল? তিনি বলিলেন, আমি তাঁহাকে একটি চট দুই ভাঁজ করিয়া বিছাইয়া দিতাম। তিনি উহার উপর নিদ্রা যাইতেন। এক রাত্রে আমি মনে করিলাম, চার ভাঁজ করিয়া বিছাইয়া দিলে উহা নরম হইবে। তাই আমি উহা চার ভাঁজ করিয়াই তাঁহাকে শুইতে দিলাম। পরদিন প্রর্তাতে তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, গত রাত্রে তোমরা আমাকে কিরূপ বিছানা দিয়াছিলে? আমরা বলিলাম, আপনার সেই বিছানা, তবে উহা চার ভাঁজ করিয়া দিয়াছিলাম যাহাতে কিছুটা নরম হয়। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, পূর্বের মতই করিও। কারণ উহার নরম অবস্থা আমার রাত্রের সালাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিয়াছে”।
নিজ হইতে কেহ আরামদায়ক ভাল বিছানা দিলেও তিনি তাহা গ্রহণ করিতেন না। উদ্বুল মু'মিনীন 'আইশা (রা) হইতে এই মর্মে হাদীছ বর্ণিত আছে:
عن عائشة قالت دخلت على امرأة من الانصار فرأت على فراش رسول الله ﷺ قطيفة مثنية فانطلقت فبعثت الى بفراش خشوه الصوف فدخل على رسول الله ﷺ فقال ما هذا يا عائشة فقلت يا رسول الله فلانة الانصارية دخلت على فرات فراشك فذهبت فبعثت الى بهذا فقال ردّيه قالت فلم ارده وقد اعجبني ان يكون في بيتي حتى قال ذالك ثلاث مرات قالت فقال رديه يا عائشة فوالله لو شئت لاجرى الله معى الجبال ذهبا وفضة .
"আইশা (রা) বলেন, এক আনসারী মহিলা আমার নিকট আসিল এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিছানায় একটি ভাঁজ করা মোটা খসখসে চাদর দেখিল। সে বাড়ী ফিরিয়া গিয়া আমার নিকট একটি বিছানা পাঠাইয়া দিল যাহার ভিতরে ছিল পশম। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ (স) আমার নিকট আসিলেন। তিনি বলিলেন, হে 'আইশা! ইহা কি? আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অমুক আনসারী মহিলা আমার নিকট আগমন করিয়াছিল। সে আপনার বিছানা দেখিয়া বাড়ি ফিরিয়া গিয়া আমার নিকট ইহা পাঠাইয়া দিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, উহা ফেরত দাও। 'আইশা (রা) বলেন, কিন্তু আমি তাহা ফেরত দিলাম না। উহা আমার ঘরে থাকুক, আমি তাহাই পছন্দ করিতেছিলাম। তিনবার তিনি ঐরূপ বলিলেন। আইশা (রা) বলেন, অতঃপর তিনি বলিলেন, ইহা ফেরত দাও হে 'আইশা। আল্লাহ্র কসম! তুমি যদি চাও তবে আল্লাহ তা'আলা পর্বতকে স্বর্ণ বানাইয়া আমার সঙ্গে চলিবার ব্যবস্থা করিয়া দিবেন” (আল-মুনযিরী, আত-তারগীব ওয়াত- তারহীব, ৪খ., ২০১-২০২; ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., ৬২)।
খোদ 'আইশা (রা) একটু আরামদায়ক বিছানা তৈরী করিয়া দিলেও তিনি তাহা সরাইয়া ফেলার নির্দেশ দেন:
عن عائشة قالت كان الرسول الله ﷺ فراش رث غلیظ فاردت ان اجعل له فراشا اخر ليكون اوطأ لرسول الله ﷺ فجعلته فقال ما هذا يا عائشة فقلت رأيت فراشك رثا غليظا فاردت ان يكون هذا اوطأ لك فقال آخريه اثنتين والله لا اقعد عليه حتى ترفعيه قال فرفعت الأعلى الذي صنعت .
"আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি শক্ত চাদরের বিছানা ছিল। আমি তাঁহাকে আর একটি বিছানা বানাইয়া দিতে ইচ্ছা করিলাম যাহাতে তাহা রাসূলুল্লাহ (س)-এর জন্য একটু আরামদায়ক হয়। অতএব আমি তাহাই করিলাম। তিনি বলিলেন, হে 'আইশা। ইহা কি? আমি বলিলাম, আমি আপনার শক্ত বিছানা দেখিয়া মনে করিলাম, আপনার জন্য একটু নরম বিছানা হউক। তিনি বলিলেন, উহা সরাইয়া দাও। আল্লাহর কসম! তুমি উহা না উঠানো পর্যন্ত আমি উহাতে বসিব না। রাবী বলেন, তিনি উপর হইতে সে বিছানা উঠাইয়া ফেলিলেন যাহা তিনি বানাইয়াছিলেন”।
একটি রাষ্ট্রের অধিনায়ক হইয়াও তিনি কখনওবা শুধু চাটাইয়ের উপর শুইয়া থাকিতেন, যাহার দাগ পড়িয়া যাইত তাঁহার শরীর মুবারকে যাহা দেখিয়া 'উমার (রা)-এর ন্যায় একজন কঠোর হৃদয়ের সাহাবীও তাঁহার অশ্রু সংবরণ করিতে পারেন নাই। একটি দীর্ঘ হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলেন:
فدخلت على رسول الله ﷺ وهو مضطجع على حصير فجلست فادنی علیه آزاره وليس عليه غيره واذا الحصير قد اثر في جنبه فنظرت ببصری خزانة رسول الله ﷺ فاذا انا بقبضة من شعير نحو الصاع ومثلها قرظا في ناحية الغرفة واذا افيق معلق قال فابتدرت عيناي قال ما يبكيك يا ابن الخطاب قلت يا نبي الله وما لي لا ابكي وهذا الحصير قد اثر في جنبك وهذه خزانتك لا ارى فيها الا ما ارنى وذك كسرى وقيصر في الثمار والانهار وانت نبي الله وصفواته وهذه خزانتك قال يا ابن الخطاب الاترضى ان تكون لنا الآخرة ولهم الدنيا قلت بلى .
"অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রবেশ করিলাম। তখন তিনি একটি চাটাইয়ের উপর কাত হইয়া শোয়া ছিলেন। আমি সেখানে বসিয়া পড়িলাম। তিনি তাঁহার পরনের চাদরখানি তাঁহার শরীরের উপরের দিকে টানিয়া দিলেন। তখন ইহা ছাড়া তাঁহার পরনে অন্য কোন কাপড় ছিল না। তাঁহার বাহুতে চাটাইয়ের দাগ বসিয়া গিয়াছিল। আমি স্বচক্ষে রাসূলুল্লাহ (س)-এর সামানপত্রের দিকে তাকাইলাম। আমি সেইখানে একটি পাত্রে এক সা'-এর কাছাকাছি কয়েক মুষ্টি যব দেখিতে পাইলাম। অনুরূপ সালাম বৃক্ষের কিছু পাতা কামরার এক কোণায় পড়িয়া থাকিতে দেখিলাম। আরও দেখিতে পাইলাম, ঝুলন্ত একখানি চামড়া যাহা পাকা করা হয় নাই। উমার (রা) বলেন, এইসব দেখিয়া আমার চক্ষু অশ্রুসিক্ত হইয়া গেল। তিনি বলিলেন, হে খাত্তাবের পুত্র! কিসে তোমার কান্না পাইয়াছে? আমি বলিলাম, হে আল্লাহ্ নবী! আমি কেন কাঁদিব না! এই যে চাটাই আপনার শরীরে দাগ কাটিয়া দিয়াছে। আর এই হইল আপনার কোষাগার। এখানে সামান্য কিছু যাহা দেখিলাম তাহা ছাড়া তো আর কিছুই নাই। পক্ষান্তরে ঐ যে রোম ও পারস্যের বাদশাহগণ কত বিলাস-ব্যসনে ফলমূল ও ঝরনায় পরিবেষ্টিত হইয়া আড়ম্বরপূর্ণ জীবন যাপন করিতেছে। আর আপনি আল্লাহ্র রাসূল (স) ও প্রশংসনীয় হইয়াও আপনার গৃহের আসবাবপত্রের এই দুরবস্থা? তিনি ইরশাদ করিলেন, হে ইবনুল খাত্তাব! তোমার কি ইহা পছন্দ নহে যে, আমাদের জন্য রহিয়াছে আখিরাত আর তাহাদের জন্য দুনিয়া? আমি বলিলাম, নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট”।
অপর একটি বর্ণনা মতে তিনি হযরত উমর (রা)-কে বলিলেন-
مالي وللدنيا يا عمر انما انا فيها كراكب استظل تحت شجرة ثم راح وتركها .
"হে উমার! দুনিয়ার সাথে আমার কি সম্পর্ক? দুনিয়াতে আমি তো একজন পথিকের ন্যায় যে কোন গাছের ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণ করে, অতঃপর তাহা ত্যাগ করিয়া চলিয়া যায়”।
অতএব রাসূলুল্লাহ (স)-এর শয্যা ছিল খুবই সাধারণ। চাটাই-এর উপর শয়ন করিতেন। শয্যা ত্যাগ করিলে দেখা যাইত যে, শরীরে ইহার দাগ পড়িয়া গিয়াছে। বর্ণিত হইয়াছে:
عن عبد الله بن مسعود قال نام رسول الله ﷺ على حصیر فقام وقد اثر في جنبه .
"হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) একটি চাটাই-এর উপর ঘুমাইলেন। তিনি শয্যা ত্যাগ করিতেন, দেখা যাইত যে শরীরের পার্শ্বদেশে চাটাইয়ের দাগ পড়িয়া গিয়াছে”।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিছানাটি ছিল চামড়ার তৈরী যাহার ভিতরে ছিল খেজুর গাছের আঁশ। যেমন বর্ণিত হইয়াছে:
عن عائشة قالت كان فراش رسول الله ﷺ آدم حشوه ليف .
"হযরত 'আইশা (রা) বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিছানা ছিল চামড়ার তৈরী। ইহার ভিতরে ছিল খেজুর গাছের আঁশ”।
রাসূলুল্লাহ (স) বিশ্ববাসীর জন্য সরলতা ও অনাড়ম্বরতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়া গিয়াছেন। তাঁহার মহান জীবনাদর্শ ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রত্যেকের অনুসরণ করা একান্ত প্রয়োজন। কেবল তিনি নিজেই সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন না, তাঁহার পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজনসহ সাহাবা-ই কিরামদিগকেও তিনি সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনে অনুপ্রাণিত করিয়াছিলেন। সেইজন্যই তো তাঁহারা সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপনের পরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছিলেন।
ইতিহাস পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, নিজের বেলায় অনাড়ম্বর জীবনাভ্যস্ত হইয়া সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম-আয়েশসহ পৃথিবীর যাবতীয় বাহুল্য পরিত্যাগ করা যত সহজ, নিজ পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততিদিগকেও অনুরূপ স্বভাবাদর্শে গড়িয়া তোলা তত সহজ নয়। তবে এই ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (স)-এর পরিবার-পরিজন ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তাঁহাদের প্রত্যেকেই ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর মহান জীবনাদর্শে অনুপ্রাণিত। উত্তম আহার, জাকজমকপূর্ণ পোশাক, অঢেল প্রাচুর্য ও লোভ-লালসা কখনও তাহাদের মনকে প্রলুব্ধ করিতে পারে নাই; বরং তাহারা অনাড়ম্বর জীবনাদর্শকে অবনত মস্তকে গ্রহণ করিয়া আল্লাহ্র সন্তোষ লাভের পথে অগ্রসর হইয়াছেন।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর কোমল ব্যবহার
রাসূলুল্লাহ্ (স) ছিলেন কোমল অন্তরের অধিকারী ও অত্যন্ত দয়ালু। তাঁহার অন্তরের কোমলতা এতই ব্যাপক ছিল যে, কাহারও কোন দুর্দশা দেখিলে তিনি নিজেকে সংবরণ করিতে পারিতেন না। তাঁহার চক্ষু দিয়া তাৎক্ষণিকভাবে অশ্রু প্রবাহিত হইত। ব্যথিত লোকের ব্যথা অনুভব করিলে তাঁহার চোখে নিদ্রা আসিত না। হৃদয়বিদারক কোন ঘটনা শুনিলে তিনি এতই কাতর হইয়া পড়িতেন যে, তাঁহার কান্না সামলানো কঠিন হইয়া পড়িত। তবে এই কোমলতা সত্ত্বেও দীনী কোন কারণে কখনও কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন হইলে তিনি তাহা করিতে দ্বিধা করিতেন না। তাঁহার জীবনের বিভিন্ন দিকে আলোকপাত করিলে দেখা যায় যে, কোমলতা তাঁহার মধ্যে প্রবল থাকিলেও অবিচার-ব্যভিচার ইত্যাদির শান্তি বিধানে অনেক সময় তিনি অত্যন্ত কঠোর হইতেন। তাঁহার কোমলতার কিছুটা নমুনা পাওয়া যায় নিম্নোক্ত বর্ণনা হইতে:
عن أبي الدرداء عن النبي ﷺ قال من اعطى حظه من الرفق فقد اعطى حظه من الخير ومن حرم حظه من الرفق فقد حرم حظه من الخير (رواه الترمذي - ۲۱) .
"আবূদ দারদা' (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, যাহাকে তাহার কোমলতার অংশ প্রদান করা হইয়াছে তাহাকে তাহার কল্যাণের বিরাট অংশ প্রদান করা হইয়াছে। যাহাকে তাহার কোমলতার অংশ হইতে বঞ্চিত করা হইয়াছে তাহাকে তাহার বিরাট কল্যাণ হইতে বঞ্চিত করা হইয়াছে" (তিরমিযী, ২খ., পৃ. ২১)।
عن عائشة قالت قال النبى لا من اعطى حظه من الرفق اعطى حظه من خير الدنيا والآخرة ومن حرم حظه من الرفق حرم حظه من خير الدنيا والآخرة (رواه في شرح السنه مشكوة المصابيح - ٤٣١ ) .
"আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন, যাহাকে তাহার কোমলতার অংশ প্রদান করা হইয়াছে তাহাকে দুনিয়া ও আখিরাতের সর্বোত্তম অংশ প্রদান করা হইয়াছে। যাহাকে তাহার কোমলতার অংশ হইতে বঞ্চিত করা হইয়াছে তাহাকে দুনিয়া ও আখিরাতের সর্বোত্তম কল্যাণ হইতে বঞ্চিত করা হইয়াছে" (শারহুস সুন্নাহ, বরাত মিশকাত, পৃ. ৪৩১)।
কোমলতা প্রদর্শনের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (স) খুবই গুরুত্ব প্রদান করিতেন। তিনি স্বয়ং ঘোষণা করিয়াছেন যে, কোমলতা এমন একটি স্বভাব যাহা খোদ মহান আল্লাহ্রই গুণ। আল্লাহ তা'আলা কোমলতাকে ভালবাসেন। ইরশাদ হইয়াছে:
عن عائشة ان رسول الله ﷺ قال ان الله تعالى رفيق يحب الرفق ويعطى على الرفق مالا يعطى على العنف وما لا يعطى على ما سواه رواه مسلم وفي رواية له قال لعائشة عليك بالرقق واياك والعالف والفحش أن الرفق لا يكون في شيئ الا زانه ولا ينزع من شيئ الا شانه.
"আইশা (রা) হইতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ্ (س) বলিয়াছেন, নিশ্চয় আল্লাহ্ তা'আলা কোমলতার অধিকারী। তিনি কোমলতাকে ভালবাসেন। কোমলতার বিনিময়ে তিনি যেই প্রতিদান দিবেন, কঠোরতার বিনিময়ে তাহা দিবেন না এবং কোমলতার উপর যেই প্রতিদান দিবেন, অন্য কিছুতেই সেই প্রতিদান দিবেন না (মুসলিম)। মুসলিমের অন্য রিওয়ায়াতে রহিয়াছে, রাসূলুল্লাহ্ (স) 'আইশা (রা)-কে বলিলেনঃ হে 'আইশা। তোমার উপর কোমলতা প্রদর্শনকে আবশ্যক করিয়া লও। কঠোরতা ও অশ্লীল বাক্য হইতে সাবধান থাকিও। যেই জিনিসেই কোমলতা প্রদর্শন করা হইবে, সেই জিনিসই সুশোভিত হইবে। পক্ষান্তরে যেই জিনিস হইতে কোমলতা অপসৃত হইয়াছে, তাহা ত্রুটিযুক্ত বা দূষণীয় হিসাবে আখ্যা পাইয়াছে" (মিশকাত)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর মেয়ে যায়নাব (রা)-এর একটি শিশু পুত্রের ইনতিকালের সময় তাঁহার দুই চোখ দিয়া অশ্রু প্রবাহিত হইতে লাগিল। উপস্থিত সাহাবায়ে কিরাম তাঁহার কোমলতার দৃশ্য দেখিয়া অবাক হইয়া গেলেন। রাসূলুল্লাহ্ (س) বলিলেন, আল্লাহ্ তা'আলা কোমল হৃদয়ের বান্দাদের প্রতি করুণা বর্ষণ করেন। ইরশাদ হইয়াছে:
عن اسامة ان ابنة الرسول الله ﷺ ارسلت اليه ومع رسول الله ﷺ اسامة وسعد وابي ان ابني قد احتضر فاشهدنا فارسل يقرا السلام ويقول ان لله ما اخذ وما اعطى وكل شيئ عنده مسمى فلتصبر وتحتسب فارسلت اليه تقسم عليه فقام وقمنا معه فلما قعد رفع اليه فاقعده في حجره ونفس الصبى تقعقع ففاضت عينا رسول الله ﷺ فقال سعد ما هذا يا رسول الله فقال هذه رحمة يضعها الله في قلوب من يشاء من عباده وانما يرحم الله من عباده الرحماء (بخاري - ٩٨٥) .
"উসামা (রা) হইতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর কাছে তাঁহার এক কন্যা সংবাদ পাঠাইলেন, আমার ছেলে মুমূর্ষু অবস্থায় আছে। আমাদের গৃহে আপনি তাশরীফ আনুন। এই সময় তাঁহার নিকট উসামা, সা'দ ও উবায়্যি (রা) উপস্থিত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার নিকট সালাম পাঠাইয়া এই বার্তা পৌঁছাইয়া দিলেন যে, আল্লাহ্রই জন্য তিনি যাহা গ্রহণ করেন এবং যাহা দান করেন। তাঁহার নিকট প্রতিটি জিনিসের একটি নির্ধারিত মেয়াদ রহিয়াছে। সে যেন ধৈর্য ধারণ করে এবং সওয়াব প্রত্যাশা করে। তাঁহার মেয়ে তখন কসম দিয়া পাঠাইলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (س) যেন তাঁহার নিকট আসেন। রাসুলুল্লাহ্ (স) উঠিয়া রওয়ানা হইলেন। আমরাও তাঁহার সহিত রওয়ানা করিলাম। তিনি তথায় উপস্থিত হইয়া আসন গ্রহণ করিলে ছেলেটিকে তাঁহার নিকট দেওয়া হইল এবং তিনি তাহাকে কোলে তুলিয়া লইলেন। ছেলেটির প্রাণ তখন বাহির হইয়া যাওয়ার উপক্রম হইতেছিল। রাসূলুল্লাহ্ (س)-এর চোখ দিয়া অশ্রু গড়াইতেছিল। সা'দ (রা) জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনার চোখ দিয়া উহা কি গড়াইতেছে? রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, উহা হৃদয়ের কোমলতা। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার বান্দাদের মধ্যে যাহার অন্তরে ইচ্ছা উহা দান করেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ করুণা করেন তাঁহার করুণাশীল বান্দাদের প্রতি" (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুল আয়মান, বাব আক'সামو বিল্লাহি জাহদা, ২খ., পৃ. ৯৮৪; কিতাবুল মারদণ, বাব 'ইয়াদাতিس سیان, ২খ., পৃ. ৮৪৪)।
রাসূলুল্লাহ্ (س) মানুষের সহিত নম্র আচরণ করিবার জন্য নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন। তিনি নিজেও মানুষের সহিত নম্র আচরণ করিতেন। ইরশাদ হইয়াছে:
عن أبي مالك الاشعرى قال قال رسول الله ﷺ ان في الجنة غرفا يرى ظاهرها من باطنها وباطنها من ظاهرها اعد الله لمن الان الكلام واطعم الطعام وتابع الصيام وصلى بالليل والناس ينام رواه البيهقي في شعب الايمان مشكوة - ١٠) .
"আবূ মালিক আল-আশ'আরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন, জান্নাতে এমন কতিপয় কামরা রহিয়াছে যাহাদের বহির্দেশ হইতে ভিতরদেশ এবং ভিতরদেশ হইতে বহির্দেশ দেখা যায়। উহা সেই সকল লোকের জন্য তৈরী করা হইয়াছে যাহারা নম্রভাবে কথা বলে, মানুষকে আহার প্রদান করে, নিয়মিত রোযা রাখে এবং মানুষ যখন ঘুমাইয়া পড়ে তখন তাহারা সালাতরত থাকে" (বায়হাকী, মিশকাত, পৃ. ১০৯)।
عن عبد الله بن مسعود قال قال رسول الله ﷺ الا اخبركم بمن يحروم على النار وبمن تحرم النار عليه على كل هين لين قريب سهل رواه احمد والترمذى - ٤٣٢ ) .
"আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন, আমি কি তোমাদিগকে বলিয়া দিব কাহার জন্য জাহান্নাম হারাম হইবে এবং কে জাহান্নামের জন্য হারাম হইবে? তিনি হইলেন, সহজ নম্র ভাষার অধিকারী ব্যক্তি যেই নম্রতা সরলতার নিকটবর্তী" (আহমাদ, তিরমিযী, সূত্র: মিশকাত, পৃ. ৪৩২)।
عن مكحول قال قال رسول الله ﷺ المؤمنون هينون لينون كالجمل الانف ان قيد انقاد وان انيخ على صخرة استناخ (رواه الترمذى مرسلا مشكوة - ٤٣٢ ) .
"মাকহুল (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন, মু'মিনগণ হইল সহজ-সরল নম্র স্বভাবের মানুষ-সেই অনুগত উটের মত যেই উটকে হাঁকানোমাত্র চলিতে থাকে এবং কোন শক্ত পাথরের উপর বসিতে বলিলে বসিয়া পড়ে" (তিরমিযী, বরাত, মিশকাত, পৃ. ৪৩২)।
একদা একদল ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দরবারে আগমন করিল। দরবারে প্রবেশের সময় তাহারা সালাম বিনিময় করিবার বদলে রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে অভিসম্পাত করিল। তিনি তাহাদের যথাযথ উত্তর দিলেন। হযরত 'আইশা (রা) তাহাদের অন্যায় আচরণে ক্রোধান্বিত হইলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহাকে কোমলতা প্রদর্শনের নির্দেশ দিলেন। হাদীছ শরীফে বর্ণিত আছে :
عن عائشة قالت استأذن رهط من اليهود على رسول الله ﷺ فقالوا السام عليكم فقالت عائشة بل عليكم السام واللعنة فقال رسول الله ﷺ يا عائشة ان الله عز وجل يحب الرفق في الأمر كله قالت الم تسمع ما قالوا قال قد وعليكم : (رواه مسلم ٢ : ٢١٤) .
"আইশা (রা) বলেন, একদল ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর অনুমতি প্রার্থনা করিলে তিনি তাহাদিগকে অনুমতি দিলেন। তাহারা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর উদ্দেশ্যে বলিল, 'তোমাদের উপর মৃত্যু আসুক'। 'আইশা (রা) উত্তরে বলিলেন, বরং তোমাদের উপরই মৃত্যু অবতীর্ণ হউক। রাসূলুল্লাহ্ (س) বলিলেন, হে 'আইশা! মহান আল্লাহ্ সকল বিষয়ে কোমলতা পসন্দ করেন। তিনি বলিলেন, তাহারা কি বলিয়াছে তাহা কি আপনি শুনিয়াছেন? তিনি বলিলেন, হাঁ, আমি শুনিয়াছি এবং তদুত্তরে তোমাদের উপর বলিয়া উত্তর দিয়াছি" (মুসলিম, আস-সাহীহ, ২খ., পৃ. ২১৪)।
মুসলিমের অন্য রিওয়ায়াতে আছে, يا عائشة لا تكونى فاحشة "হে আইশা! তুমি কটূক্তিকারী হইও না।”
অন্য একটি রিওয়ায়াতে রহিয়াছে :
ففطنت بهم عائشة فسبتهم فقال رسول الله ﷺ مه يا عائشة فان الله لا يحب الفحش والتفحش .
"হযরত 'আইশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর বিচক্ষণতা দ্বারা উহাদের উদ্দেশ্য বুঝিয়া ফেলিলেন, তাই তাহাদিগকে ভর্ৎসনা করিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (س) বলিলেন, বিরত হও, হে 'আইশা! কারণ আল্লাহ্ তা'আলা অশ্লীল কথা ও আচরণ পসন্দ করেন না" (মুসলিম, প্রাগুক্ত)।
পশু, পাখী ও জীব-জন্তুর প্রতিও কোমলতা প্রদর্শনে রাসূলুল্লাহ্ (স) ছিলেন অত্যন্ত যত্নবান। উহাদিগকে মারপিট করা ও সাধ্যের বাহিরে কোন কাজে বাধ্য করাকে তিনি পসন্দ করিতেন না। কোন একটি উটকে দ্রুত চালানোর জন্য হযরত 'আইশা (রা) প্রহার করিলে রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহা প্রত্যক্ষ করিয়া উহার প্রতি কোমলতা প্রদর্শনের জন্য তাঁহাকে নির্দেশ প্রদান করিলেন। বর্ণিত আছেঃ
عن عائشة قالت كنت على بعير فيه صعوبة فجعلت اضربه فقال النبي ﷺ عليك بالرفق فان الرفق لا يكون في شيئ الا زانه ولا ينزع من شيئ الا شانه (الادب المفرد )
"আইশা (রা) বলেন, আমি একটি উটের উপর সওয়ার ছিলাম, যাহাকে পরিচালনা করা বড়ই কঠিন ছিল। আমি উটটিকে প্রহার করিতে লাগিলাম। রাসূলুল্লাহ্ (س) বলিলেন, তোমার কোমলতা প্রদর্শন করা আবশ্যক। যেখানেই কোমলতা সেখানেই সৌন্দর্য আর যেখানেই কোমলতাশূন্য সেখানেই অসুন্দর" (ইমাম বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ২০৩)।
عن سهل بن الحنظلية قال مر رسول الله الله ببعير قد لحق ظهره ببطنه قال اتقوا الله فى هذه البهائم المعجمة فاركبوها صالحة وكلوها صالحة (رواه ابو داود - ٣٤٥) .
"সাহল ইব্দুল হানযালিয়া (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) একটি উটের পাশ দিয়া অতিক্রমকালে দেখিলেন, ক্ষুধায় উটটির পেট পিঠের সহিত লাগিয়া গিয়াছে। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, তোমরা এই বোবা প্রাণীগুলির ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। উহাদের সুস্থাবস্থায় উহাদের উপর সওয়ার হও এবং আহার দিয়া সুস্থ রাখ" (আবূ দাউদ, সুনান, ১খ., পৃ. ৩৪৫)।
عن عبد الله بن جعفر ان رسول الله لا دخل حائطا لرجل من الانصار فاذا جمل فلما رأى النبي اللحن وذرفت عيناه فاتاه النبي الله فمسح زفراه فسكت فقال من رب هذا الجمل لمن هذا الجمل فجاء فتى من الانصار فقال لى يارسول الله فقال افلا تتقى الله في هذه البهيمة التي ملكك الله اياها فانه شكانى انك تجيعه وتدئبه (رواه ابو داود ( ٣٤٥) .
"আবদুল্লাহ ইব্ন জা'ফার (রা) হইতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ্ (س) জনৈক আনসারের বাগানে প্রবেশ করিলেন। তখন একটি উট তাঁহাকে দেখিয়া সামনে আসিয়া দাঁড়াইল এবং উহার দুই চোখ দিয়া অশ্রু গড়াইয়া পড়িতেছিল। তিনি উহার কাঁধে হাত বুলাইলে উহার কান্না বন্ধ হইল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (س) বলিলেন, উটটি কাহার! কে উহার মালিক? এক আনসার যুবক সাড়া দিয়া বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! উহা আমার। তিনি বলিলেন, আল্লাহ্ তা'আলা তোমাকে যেই উটটির মালিক বানাইয়াছেন উহা সম্পর্কে তুমি কি আল্লাহকে ভয় কর না? সে আমার নিকট আসিয়া অভিযোগ করিল, তুমি উহাকে খাবার দাও নাই এবং উহাকে যাতনা দিতেছ" (আবূ দাউদ, প্রাগুক্ত)।
عن أبي هريرة أن رسول الله ﷺ قال بينما رجل يمشي بطريق فاشتد عليه العطش فوجد بئرا فنزل فيها فشرب ثم خرج فاذا كلب يلهث الثرى من العطش فقال الرجل لقد بلغ هذا الكلب من العطش مثل الذي كان بلغني فنزل البئر فملا خفه فامسكه بفيه حتى رقى فسقى الكلب فشكر الله له فغفر له قالوا يا رسول الله وان لنا في البهائم لاجرا قال في كل ذات كبد رطبة أجر (رواه ابو داود - ٣٤٥) .
"আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন, এক ব্যক্তি পথ অতিক্রমকালে প্রচণ্ড পিপাসায় কাতর হইয়া পড়িল। সে পথিমধ্যে একটি কূপ দেখিতে পাইয়া তাহাতে অবতরণ করিয়া পানি পান করিল। উঠিয়া আসিবার পর সে একটি কুকুরকে হাঁপাইতে দেখিল। কুকুরটি পিপাসার জ্বালায় কাদামাটি চাটিতেছিল। লোকটি মনে মনে বলিল, আমি যেই ধরনের পিপাসায় কাতর হইয়া পড়িয়াছিলাম, কুকুরটিও তদ্রূপ পিপাসায় কাতর হইয়া পড়িয়াছে। লোকটি আবার কূপে অবতরণ করিল। সে তাহার পায়ের মোজায় পানি ভরিয়া তাহা লইয়া উপরে উঠিয়া আসিয়া কুকুরটিকে পান করাইল। আল্লাহ তাহার এই কাজে সন্তুষ্ট হইয়া তাহার গুনাহ্ মাফ করিয়া দিলেন। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আল্লাহর রাসুল! চতুষ্পদ প্রাণীর ব্যাপারেও কি আমাদের ছওয়াব হইবে? তিনি বলিলেন, প্রত্যেক জীবিত প্রাণীর প্রতি করুণাশীল হইলে ছওয়াব হইবে" (আবূ দাউদ, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৪৫)।
عن عبد الله بن عمر ان رسول الله ﷺ قال عذبت امرأة في هرة حبستها حتى ماتت جوعا فدخلت منها النار قال فقال والله اعلم لا انت اطعمتيها ولا سقيتها حين حبستيها ولا انت ارسلتيها فاكلت من خشاش الارض رواه البخاری (۳۱۸).
"আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, এক স্ত্রীলোককে শাস্তি দেওয়া হইয়াছে একটি বিড়ালের কারণে। সে বিড়ালটিকে বাঁধিয়া রাখিবার কারণে উহা অনাহারে মারা যায়। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন, আল্লাহই সম্যক জ্ঞাত। তুমি উহাকে যখন বাঁধিয়া রাখিয়াছিলে তখন উহাকে খাবারও দাও নাই, পানিও দাও নাই এবং ছাড়িয়াও দাও নাই যাহাতে উহা যমীনের পোকা-মাকড় আহার করিতে পারিত" (বুখারী, ১খ., পৃ. ৩১৮)।
عن ابي امامة قال قال رسول الله له من رحم ذبيحه رحمه الله يوم القيامة (رواه البخاري الادب المفرد ) .
"আবু উমামা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন, যেই ব্যক্তি পশু যবেহকালে দয়াপরবশ হইবে কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তাহার প্রতি দয়াবান হইবেন" (বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ, প্রাগুক্ত, হাদীছ নম্বর ৩৮১)।
عن شداد بن اوس قال خصلتان سمعتهما من رسول الله ﷺ ان الله كتب الاحسان على كل شيئ فاذا قتلتم فاحسنوا القتلة واذا ذبحتم فاحسنوا الذبح وليحد احدكم شفرته وليرح ذبيحته (رواه ابو داود (۳۸).
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর দয়া ও উদারতা
রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন সকল গুণের আধার। কুরআন মাজীদে যত সুন্দর স্বচ্ছতা, মানবতা ও কল্যাণময় গুণাবলীর কথা উল্লেখ হইয়াছে সেইগুলির নিখাদ, নিখুঁত ও পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটিয়াছিল মহানবী (স)-এর জীবনে। আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করিয়াছেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ. "তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের জীবনে রহিয়াছে উত্তম আদর্শ” (৩৩:২১)।
উদারতা মানুষের একটি মহৎ গুণ। রাসূলুল্লাহ (স) যে সকল গুণ ছিল সেইগুলির মধ্যে একটি হইল—তিনি সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ। আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন:
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ. "আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করিয়াছি” (২১: ১০৭)।
মূলত তিনি ছিলেন উদারতার মূর্ত প্রতীক। কাহারও মন জয় করিবার জন্য উদারতার তুলনায় অধিক শক্তিশালী আর কিছুই নাই। রাসূলুল্লাহ (س) দীর্ঘ সময়ে দ্বন্দ্ব ও কলহে লিপ্ত মুশরিক জাতিকে উদারতা প্রদর্শনের মাধ্যমে সফলতার শীর্ষে আহরণ করাইয়াছিলেন। এই কারণে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন:
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ. "আল্লাহর রহমতে আপনি তাহাদের প্রতি কোমল হৃদয় হইয়াছেন। আপনি রূঢ় ও কঠিন চিত্ত হইলে তাহারা আপনার আশপাশ হইতে সরিয়া পড়িত" (৩: ১৫৯)।
মহানবী (س)-এর জীবনে এমন অনেক ঘটনা রহিয়াছে যাহা হইতে তাঁহার উদারতার পরিচয় পাওয়া যায়। হযرت আনাস (را) বলেন، আমি মদীনায় দশ বৎসর যাবত রাসূলুল্লাহ (س)-এর খেদমত করিয়াছি। তখন আমি বালক ছিলাম এবং আমার সকল কাজ তাঁহার ইচ্ছা মাফিক হইত না। কিন্তু তিনি কোন দিন আমার উপর বিরক্ত হইয়া উহ্ বলেন নাই এবং এইরূপও বলেন নাই: তুমি এই কাজ কেন করিলে বা তুমি এই কাজ কেন কর নাই (মুসলিম، ৪খ.، পৃ. ১০৯؛ আবূ দাউদ، ৪খ.، পৃ. ২৪৭)।
হযرت 'আইশা (را) বলেন، রাসূলুল্লাহ (س) কোন সময় তাঁহার খাদিম বা সহধর্মিণীকে প্রহার করেন নাই (আবু দাউদ، ৪খ.، পৃ. ২৫১؛ কাদী 'ইয়াদ، আশ-শিফা، ১খ.، পৃ. ২২৬؛ মুহাম্মাদ রিদা، মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (স)، পৃ. ৪৬৭)।
অপর এক বর্ণনা অনুসারে তিনি গৃহস্থালীর কাজে স্ত্রীদের সাহায্য করিতেন، কাপড়ে তালি লাগাইতেন، ঘর ঝাড়ু দিতেন، দুধ দোহন করিতেন، বাজার হইতে সওদা বহন করিয়া আনিতেন، বালতি মেরামত করিয়া দিতেন، নিজে উট বাঁধিতেন এবং খাদিমদের সাথে আটার খামীর তৈয়ার করিতেন (কাদী 'ইয়াদ، আশ-শিফা، ১খ.، পৃ. ১৩২-৩৩)। এই সকল হাদীছ প্রমাণ করে যে، রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহার পারিবারিক জীবনে উদারতার মহিমা প্রকাশ করিয়াছেন।
রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহার তেইশ বৎসর নবুওয়াতী জীবনে দুশমনের হাতে অনেকবার দৈহিক নির্যাতনের শিকার হইয়াছিলেন। তাৎক্ষণিক কিংবা সময়ের পরিবর্তনে তিনি প্রতিশোধ লইতে পারিতেন، কিন্তু ইহার পরিবর্তে তাহাদিগকে ক্ষমা প্রদর্শন করিয়া উদারতার এক বিরল নজীর স্থাপন করিয়াছেন। এই বিষয়ে অনেক হাদীছ পাওয়া যায়।
হযرت 'আইশা (রা) বলেন، রাসূলুল্লাহ (س) নিজস্ব ব্যাপারে কারো উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করেন নাই। তবে যদি কেহ আল্লাহ্র হুকুম-আহকামের অবমাননা করিত তাহাকে কখনও রেহাই দিতেন না (আবূ দাউদ، ৪খ.، পৃ. ২৫০)।
রাসূলুল্লাহ (س) হযরত যায়দ (রা)-কে সঙ্গে লইয়া মক্কা হইতে প্রায় আট মাইল দূরে তাইফ-নগরীতে ইসলামের দা'ওয়াত দিতে গমন করেন। তায়েফবাসীরা ইসলাম কবুল তো করেই নাই، বরং তাহাদের অমানবিক নির্যাতনে মহানবী (س) রক্তাক্ত হইলেন। তবুও তাহাদের জন্য তিনি আল্লাহ তা'আলার দরবারে প্রার্থনা করিলেন :
اللهم اليك اشكو ضعف قوتي وقلة حيلتي وهواني على الناس يا ارحم الراحمين انت رب المستضعفين وانت ربى إلى من تكلني إلى بعيد يتجهمني أو إلى عدو ملكته أمرى إن لم يكن بك على غضب فلا أبالي ولكن عافيتك هي أوسع لى أعوذ بنور وجهك الذي أشرقت له الظلمات وصلح عليه أمر الدنيا والاخرة من أن ينزل بى غضبك أو يحل على سخطك لك العتبى حتى ترضى لا حول ولا قوة إلا بك .
“হে আল্লাহ! আমি নিজের দুর্বলতা، উপায়হীনতা এবং লোকচক্ষে নিজের অসহায়ত্ব সম্পর্কে তোমারই দরবারে অভিযোগ করিতেছি। হে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াময়، অক্ষম ও দুর্বলের প্রতিপালক! তুমি আমারও রব। তুমি আমাকে কাহার হাতে সমর্পণ করিতেছ؟ যাহারা রুক্ষ কর্কশ ভাষায় আমাকে জর্জরিত করিবে তাহাদের হাতে، না যাহারা আমার সাধনাকে বিপর্যস্ত করিবার ক্ষমতা রাখে তাহাদের হাতে؟ যদি আমার প্রতি তোমার ক্রোধ পতিত না হয় অর্থাৎ তুমি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট না হইয়া থাক তবে আমি কোন কিছুর পরওয়া করি না। তোমার অনুগ্রহই আমার জন্য সবচাইতে প্রশস্ত সম্বল। তোমার পূর্ণ জ্যোতির প্রভাবে সকল অন্ধকারই আলোকিত হইয়া উঠে এবং দীন-দুনিয়ার সমস্ত কাজই ইহার উপর সুবিন্যস্ত হয়। আমি সেই পূর্ণ জ্যোতির আশ্রয় গ্রহণ করিয়া আমার প্রতি তোমার ক্রোধ অবতীর্ণ না হওয়ার এবং তোমার অসন্তুষ্টি পতিত না হইবার প্রার্থনা জানাইতেছি। তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্যই তোমার নিকট ফরিয়াদ করিতেছি। তুমি শক্তিদান না করিলে সৎকর্ম করিবার কোন ক্ষমতা আমার নাই" (তারীখুল উমাম وয়ান-মুল্ক، ২খ.، পৃ. ৩৪৫؛ আস-সীরাতুল হালাবিয়া، ১খ.، পৃ. ৩৫৪؛ আসাহ্হুস্ سیار، পৃ. ১১১)।
রাসূলুল্লাহ (س)-এর হাদীছ দ্বারা স্বীকৃত যে، তাঁহার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিন ছিল তাইফে অবস্থানকালীন এই দিন। এই প্রার্থনার পর মালাকুল জিবাল (পাহাড়ের ফেরেশতা) আসিয়া তায়েফবাসীদের শাস্তি দেওয়ার অনুমতি চাহিলে মহানবী (س) নিষেধ করেন।
হযرت আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (س)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন، উহুদের দিনের চেয়েও কি কোন কঠিন দিন আপনার জীবনে আসিয়াছে؟ তিনি জবাব দিলেন، তোমায় কওমের পক্ষ হইতে আমি যে সকল সংকটের সম্মুখীন হইয়াছি তাহা হইতে কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হই যেই দিন সেই দিন ছিল আকাবার দিন। সেই দিন যখন ইব্ن ابد یاليل ইب্ন ابد কُلالের সামনে হাজির হই، তখন আমি যাহা চাহিয়াছিলাম তাহার কোন সদুত্তর' সে দেয় নাই। অতএব মনঃক্ষুণ্ণ হইয়া ফিরিয়া আসিলাম। তখনও আমার হুঁশ ফিরিয়া আসে নাই، এমনি অবস্থায় আমি কারনিس-সা'আলাবে আসিয়া পৌঁছিলাম। অতঃপর মাথা উঠাইয়া হঠাৎ দেখিলাম، এক খণ্ড মেঘ আমাকে ছায়া প্রদান করিতেছে। যখন সেই দিকে তাকাইলাম অভ্যন্তরে জিবরাঈল (را)-কে দেখিতে পাইলাম। তিনি আমাকে ডাকিলেন এবং বলিলেন، আপনার সাথে আপনার জাতির কথাবার্তা এবং তাহাদের যাহা প্রতিউত্তর হইয়াছে، অবশ্যই আল্লাহ তাহার সব কিছুই শুনিয়াছেন। তিনি পাহাড়ের ফেরেশতাকে আপনার কাছে প্রেরণ করিয়াছেন। উদ্দেশ্য হইল، এই সকল লোকের ব্যাপারে আপনি তাহাকে যেমন ইচ্ছা হুকুম করিতে পারেন। তখন পাহাড়ের ফেরেশতা আমাকে ডাকিল، সালাম করিল এবং বলিল، হে মুহাম্মাদ! ইহাদের ব্যাপারে আপনার ইচ্ছা কি؟ আপনি যদি চাহেন اخش باين নামক দুইটি পাহাড় তাহাদের উপর চাপাইয়া দিতে পারি। এই কথা শুনিয়া মহানবী (س) বলিলেনঃ
ارجو ان يخرج الله من أصلابهم من يعبد الله وحده ولا يشرك به شيئا .
"বরং আমি আশা করি، মহান আল্লাহ তাহাদের বংশে এমন সন্তান সৃষ্টি করিবেন যাহারা এক অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদত করিবে এবং তাঁহার সাথে অন্য কাহাকেও শরীক করিবে না" (বুখারী، পৃ. ৬৬১)।
অন্য বর্ণনায় আছে، রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহাদের জন্য দো'আ করিলেন এইভাবে:
اللهم اهد قومي فانهم لا يعلمون.
"হে আল্লাহ! তুমি আমার কওমকে হেদায়াত দান কর। যেহেতু তাহারা বোঝে না” (নূরুল-ইয়াকীন، পৃ. ৭৭)। জালিম কওমের প্রতি উদারতা প্রদর্শনে ইহার চেয়ে উত্তম নমুনা আর কী হইতে পারে؟
ওহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (س)-এর মুখমণ্ডলে মারাত্মক যখম হয়، রুবাই নামক দাঁতও ভাঙ্গিয়া যায় এবং তাঁহার লৌহ শিরস্ত্রাণ ভাঙ্গিয়া কপালে ঢুকিয়া যায়। ইহার পরও তাঁহার উপর অত্যন্ত নিমর্মভাবে তীর নিক্ষিপ্ত হইতে থাকিলে তিনি খুবই বিচলিত হইয়া পড়িলেন। কারণ যেই জাতি তাহাদের পয়গম্বরের উপর নির্মম অত্যাচার করিতেছে، না জানি তাহাদের উপর আল্লাহর কোন গযب নাযিল হইয়া পড়ে। এই আশংকায় বিচলিত হইয়া রাসূলুল্লাহ (س) আল্লাহ্র দরবারে প্রার্থনা করিতে লাগিলেন:
رَبِّ اغْفِرْ قَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ. “হে প্রতিপালক! আমার জাতিকে ক্ষমা করুন، তাহারা বোঝে না।" (মুসলিম، ৩খ.، পৃ. ২৭৪-৭৫)।
মদীনা মুনাওয়ারায় বহু-সংখ্যক মুনাফিকের বসবাস ছিল। তাহাদের সরদার আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি ইবন সালুল গোপনে ইসলামের নবী (س) ও তাঁহার সাহাবীদের বিরুদ্ধাচরণ করিত। রাসূলুল্লাহ (س) ওহী মারফত তাহাদের সকলকে এবং তাহাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত হইয়াছিলেন। ইচ্ছা করিলে মুসলমানগণ তাহাদিগকে পিষিয়া ফেলিতে পারিতেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (س) তাহাদের প্রতি সামান্যতম রূঢ় ব্যবহার করাও পছন্দ করেন নাই।
মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি-এর বিভিন্ন অবৈধ কার্যকলাপে অতিষ্ঠ হইয়া হযরত উমার (را) আরয করেন، ইয়া রাসূলাল্লাহ! অনুমতি দিন، আমি এই মুনাফিকের গর্দান উড়াইয়া দেই। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، উমার! থাম। তাহা হইলে তো লোকে বলিবে، মুহাম্মাদ তাঁহার সঙ্গী-সাথীদিগকে হত্যা করে (বুখারী، পৃ. ১০৫৩، ৫৪، ৫৫)। অন্য রিওয়ায়াতে আছে، হযরত উমার (را) বলিয়াছিলেন، আপনি 'আব্বাদ ইب্ন বিশ্বকে আদেশ করেন، সে তাহার মস্তক কাটিয়া আনিয়া আপনার সামনে হাজির করুক। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، উমার! তাহা হইলে তো আমি মানুষের মধ্যে খ্যাত হইয়া যাইব، আমি আমার সাহাবীকে হত্যা করি। অতঃপর তিনি ইبْن উবায়্যিকে হত্যা করিতে নিষেধ করেন। হযরত উমার (রা)-এর এই কথা আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি-এর পুত্র আবদুল্লাহ জানিতে পারেন। তিনি খাটি মুসলমান ছিলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (س)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া আরয করেন، যদি আপনি আমার পিতার এই সকল কথাবার্তার কারণে তাহাকে হত্যা করিতে চাহেন، তাহা হইলে আমাকে আদেশ করুন। আমি তাহার মস্তক কাটিয়া আপনার কাছে এই মজলিস ত্যাগ করিবার পূর্বেই হাজির করিব। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، তাহাকে হত্যা করিবার ইচ্ছা আমার নাই এবং আমি কাহাকেও এই বিষয়ে আদেশও করি নাই (মুফতী মুহাম্মাদ শফী، মা'আরিফুল কুরআন، ৮খ.، পৃ. ৪৫؛ মুসলিম، ৩খ.، পৃ. ২২১)।
আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি-এর মৃত্যুর পর তাহার ছেলে আবদুল্লাহ (রা)-এর অনুরোধে রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে স্বীয় জামা পরিধান করাইয়া জানাযা ও দাফন কার্য সম্পন্ন করেন، এমনকি তাহার জন্য সত্তর বারের অধিক ইসতিগফার করিবারও প্রতিশ্রুিতি দেন (বুখারী، কিতাবুল জানাইয، পৃ. ২৬৫، ২৬৯)।
হযরত জাবির ইب্ন আবদুল্লাহ (را) বলেন، আমরা রাসূলুল্লাহ (س)-এর সাথে নজদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিলাম। দুপুরে প্রচণ্ড গরমে সকলকে সাথে লইয়া রাসূলুল্লাহ (س) এমন একটি প্রান্তরে উপনীত হইলেন যাহা বড় বড় কাটাযুক্ত গাছে ভর্তি ছিল। তিনি একটি গাছের নিচে যাইয়া তাঁহার ছায়ায় আশ্রয় নিলেন এবং নিজের তরবারিখানা গাছে ঝুলাইয়া রাখিলেন। লোকজন সকলে বিভিন্ন গাছের ছায়ায় ছড়াইয়া পড়িল। আমরা নানা কাজে ব্যস্ত ছিলাম، এমন সময় রাসূলুল্লাহ (س) আমাদের ডাকিলেন। আমরা তাঁহার নিকট যাইয়া দেখিলাম، এক বেদুঈن তাঁহার সামনে বসিয়া রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، আমি নিদ্রিত ছিলাম। এমন সময় সে আমার কাছে আসিয়া আমার তরবারিখানা উচাইয়া ধরিয়াছে। ঘুম ভাঙ্গিলে আমি শুনিলাম যে، খোলা তলোয়ার হাতে আমার মাথার সামনে দাঁড়াইয়া সে বলিল، এখন আমার হাত হইতে তোমাকে কে রক্ষা করিবে؟ আমি বলিলাম، আল্লাহ। তখন সে بসিয়া পড়িল। এইতো সে এখন بসিয়া রহিয়াছে। জাবির ইب্ন আবদুল্লাহ (را) বলেন، ইহার পর রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে কোন শাস্তি দেন নাই বা প্রতিশোধ গ্রহণ করেন নাই (বুখারী، کتبا ل المغازی، باب غزوتی بني المستالق، পৃ. ৮৫২)। এই বেদুঈনের প্রতি রাসূলুল্লাহ (س)-এর যে উদারতা প্রদর্শন করিলেন তাহার ফলাফল অন্য একটি বিবরণ হইতেও জানা যায়।
যখন বেদুঈন তরবারি হাতে লইয়া বলিল، আমার হাত হইতে তোমাকে কে রক্ষা করিবে، তখন রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، আল্লাহ। তখন তাঁহার হাত হইতে তরবারিখানা পড়িয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (س) তরবারিখানা তুলিয়া লইলেন। অতঃপর বলিলেন، এখন কে তোমাকে আমার হাত হইতে রক্ষা করিবে؟ সে বলিল، আপনি উত্তম তরবারি ধারণকারী হইবেন। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، তুমি এই সাক্ষ্য দাও যে، আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই؟ আর আমি নিশ্চয় আল্লাহর রাসূল؟ সে বলিল، না। কিন্তু আপনার সাথে অঙ্গীকার করিতেছি যে، আমি কখনও আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিব না এবং ঐ সকল লোকের সঙ্গেও থাকিব না যাহারা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে ছাড়িয়া দিলেন। সে তাহার সাথীদের নিকট আসিয়া বলিল، আমি মানবজাতির শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তির নিকট হইতে তোমাদের নিকট ফিরিয়া আসিয়াছি (রিয়াদুস-সালেহীন، পৃ. ৩৬؛ کادی 'ایاز، اش-شیفا، ۱خ.، পৃ. ২২৪)।
সুরাকা ইبن মালিক ইসলাম গ্রহণের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (س)-এর হিজরতের সময় রাসূলুল্লাহ (س) এবং হযরত ابূ بکر (را)-কে হত্যা করিয়া এক শত উট পুরস্কার পাইবার প্রত্যাشায় তাঁহার পিছু লইয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে অতি নিকটে পাইয়াও কিছু বলেন নাই। পরবর্তীতে সুরাকা নিজেই ঘটনাটি বিশদভাবে বর্ণনা করেন। বর্ণনাটি এইরূপ:
সুরাকা ইبن মালিক (را) বলেন، আমাদের নিকট কুরায়শ কাফিরদের প্রেরিত লোক উপস্থিত হইয়া এই সংবাদ প্রদান করিল যে، কুরায়শরা রাসূলুল্লাহ (س) এবং ابূ بکر (را)-কে হত্যা বা বন্দী করার উপর এক শত উট পুরস্কার দানের ঘোষণা করিয়াছে।
অতঃপর একদিন আমি আমার গোত্রীয় লোকদের সহিত بسیয়া খোশগল্প করিতেছিলাম। তখন এক ব্যক্তি আসিয়া আমাকে খবর দিল، আমি উপকূলবর্তী পথে কতিপয় ব্যক্তির গমন লক্ষ্য করিয়াছি। আমার মনে হয় মুহাম্মাদ (س) এবং তাঁহার সঙ্গিগণই হইবেন। আমি তখন উহা বিশ্বাস করিয়াছিলাম، সেই পথিকগণ তাঁহারা হইবেন। কিন্তু ঐ খবরদাতা ব্যক্তিকে পুরস্কার
লাতের সুযোগ গ্রহণ হইতে বিরত রাখিবার উদ্দেশ্যে প্রবঞ্চনাস্বরূপ বলিলাম، ঐ পথিক তাঁহারা নহেন، বরং ঐ পথিকগণ হইতেছেন অমুক অমুক।
কিছু সময়ের জন্য খবরটার প্রতি তৎপরতা না দেখাইয়া সকলের সঙ্গে بسیয়া থাকিলাম। তাহার পর তথা হইতে উঠিয়া বাড়ি আসিলাম এবং আমার এক দাসীকে বলিলাম، আমার ঘোড়াটি বাড়ি হইতে বাহির করিয়া অমুক স্থানে আড়ালে নিয়া রাখ। আমি আমার বল্লمটা হাতে লইয়া বাড়ির পিছন দিকের পথে বাহির হইলাম। এমনকি বল্লمটার ফলক নিচের দিকে রাখিয়া সোজা হইয়া নিয়া চলিলাম। এইরূপ গোপনে আমি আমার ঘোড়ার নিকট উপস্থিত হইলাম এবং উহার উপর আরোহণ করিয়া উহাকে দ্রুত গতিতে চালাইলাম। এমন কি অল্প সময়ের মধ্যে আমি ঐ পথিকদের নিকট পৌঁছিয়া গেলাম। এমতাবস্থায় আমার ঘোড়াটি হোঁচট খাইয়া পড়িয়া গেল এবং আমি উহার পৃষ্ঠ হইতে পড়িয়া গেলাম। আমি তাড়াতাড়ি দাঁড়াইয়া আমার تیر دان হইতে ভাগ্য গণনার تیر বাহির করিয়া গণনা করিয়া দেখিলাম، আমি উদ্দেশ্যে সফল হইব কিনা। গণনার ফলাফল আমার ইচ্ছার বিপরীত হইল।
কিন্তু আমি গণনার ফলাফলের পরোয়া না করিয়া পুনঃ ঘোড়ায় আরোহণ করিয়া উহাকে দ্রুত অগ্রসর করিলাম এবং নিকটবর্তী হইয়া গেলাম যে، রাসূলুল্লাহ (س)-এর কুরআন পাঠের আওয়াজ শুনিতে পাইলাম। তিনি কিন্তু পিছনের দিকে মোটেও তাকান নাই، অবশ্য ابূ بکر (را) بار بار তাকাইতেছিলেন। ইতোমধ্যে আমার ঘোড়ার সম্মুখের পা দুইটি হাঁটু পর্যন্ত জমিনের মধ্যে ডাকিয়া গেল। অতঃপর আমি উহাকে সজোরে হাঁকাইলাম। ঘোড়াটি উঠিয়া দাঁড়াইতে চেষ্টা করিল، কিন্তু পা দুইখানি উঠাইতে সক্ষম হইল না। অবশ্য অতি কষ্টে সোজা হইয়া দাঁড়াইল। হঠাৎ দেখিতে পাইলাম، যেই স্থানে তাহার পা দাবিয়া গিয়াছিল তথা হইতে ধূল-بالو ধোঁয়ার ন্যায় আকাশের দিকে উঠিতেছে। তখন পুনরায় আমি تیر দ্বারা ভাগ্য গণনা করিলাম। এই বারও ফলাফল আমার ইচ্ছার বিপরীত হইল। তখন আমি তাঁহাদের প্রতি আমার পক্ষ হইতে নিরাপত্তা দানের ধ্বনি উচ্চারণ করিলাম। সেই মতে তাঁহারা দাঁড়াইলেন، আমি ঘোড়ায় আরোহণ করিয়া তাঁহাদের নিকট পৌঁছিলাম। আমি যখন তাঁহাদের নিকট পৌঁছিতে বিপদগ্রস্ত হইতেছিলাম তখন আমার অন্তরে এই কথা জাগিয়া উঠিয়াছিল যে، রাসূলুল্লাহ (س)-এর আন্দোলন অচিরে বিজয় লাভ করিবে। তিনি নিশ্চয়ই জয়ী হইবেন।
অতঃপর আমি তাঁহাকে জানাইলাম، আপনার দেশবাসী আপনার বিনিময়ে এক শত উট পুরস্কার দানের ঘোষণা করিয়াছে। তাঁহাকে আমি লোকদের সমুদয় ইচ্ছার বিস্তারিত বৃত্তান্তও শুনাইলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমি তাঁহাদের খিদমতে খাদ্য و আবশ্যকীয় বস্তু পেশ করিলাম، কিন্তু তাঁহাদের জন্য কোন কিছুই আমার ব্যয় করিতে হইল না। তাঁহারা আমার নিকট কোন অভিপ্রায়ও প্রকাশ করিলেন না। শুধু একটি কথা মহানবী (س) আমাকে বলিলেন، আমাদের সংবাদটা গোপন রাখিও। তখন আমি রাসূলুল্লাহ (س)-এর খিদমতে আরয করিলাম، আমার জন্য একটি নিরাপত্তামূলক পত্র লিখিয়া দিন। মহানবী (س) عامر ইব্ن فوحیرہ (را)-কে উহা লিখিয়া দিবার নির্দেশ দিলেন। তিনি একটি চর্মখন্ডে উহা লিখিয়া দিলেন। তাহার পর রাসূলুল্লাহ (س) চলিয়া গেলেন (বুখারী، পৃ. ৮০১)।
مكة বিজয়ের পর সুরাকা ইবন মালিক ঐ নিরাপত্তা পত্রটি লইয়া রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট গেলেন। তখন তিনি حنين و تايف অভিযান শেষ করিয়া جي'رانায় অবস্থান করিতেছিলেন। সুরাকা রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট পৌছিয়া সেই লিখিত টুকরাটি উঁচু করিয়া দেখাইয়া বলিলেন، ইয়া রাসূলাল্লাহ! এইটি সেই বস্তু যাহাতে আপনি একটি বাণী লিখিয়া দিয়াছিলেন। আমি জু'شামের পুত্র সুরাকা। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، আজ ওয়াদা পালন و উদারতা প্রদর্শনের দিন। নিকটে আস। সুরাকা তাঁহার নিকট গেলেন و ইসলাম কবূল করিলেন (ابن هشام، سيرة النبي (س)، ۲خ.، পৃ. ۱۰۱-۲)।
بدر প্রান্তরে রাসূলুল্লাহ (س)-এর সাথে ইসলামের দুশمنদের প্রথম যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে আটক বন্দীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (س) যথার্থ উদারতা প্রদর্শন করিয়াছিলেন। অথচ তৎকালীন সামরিক আইন অনুযায়ী তাহাদিগকে হত্যা কিংবা আজীবন দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখা যাইত (ابن كثير، السيرة النبوية، ۲خ.، পৃ. ۴۷۵)।
بدرের যুদ্ধবন্দীদিগকে সাহابীদের মাঝে বন্টন করিয়া রাসূলুল্লাহ (س) ارشاد করিলেন، তোমরা বন্দীদের প্রতি সহানুভূতির মনোভাব রাখিবে (ابن هشام، سيرة النبي، ۲خ.، পৃ. ۲۱۷)।
حज़रત ابن عباس (را) বলেন، রাসূলুল্লাহ (س) সেই দিন সাহাবাদিগকে বলিয়াছিলেন، আমি জানিতে পারিয়াছি যে، বনू ہاشم গোত্রের কিছু লোককে জোর করিয়া যুদ্ধে আনা হইয়াছে। আমাদের সাথে যুদ্ধ করিবার কোন প্রয়োজন তাহারা অনুভব করে নাই। কাজেই بَنू ہاشمের কেহ তোমাদের সামনে পড়িলে তাহাদিগকে হত্যা করিবে না। ابول بخترة ابن ہاشم কাহারও সামনে পড়িলে তাহাকে হত্যা করিবে না। আর عباس ابن عبد المطلب কাহারও সামনে পড়িলে তাহাকেও হত্যা করিবে না। কেননা তাহাকেও যبرদস্তি করিয়া যুদ্ধে আনা হইয়াছে। তখন ابُو حذیفہ বলিলেন، আমরা আমাদের পিতাপুত্র، ভাই ও আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করিব আর عباسকে কেন ছাড়িয়া দিব؟ আমার সামনে পড়িলে আমি তাহাকে তরবারি দিয়া আঘাত করিবই। এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (س) عمر ابن الخطاب (را)-কে ডাকিয়া বলিলেন، হে عمر! আল্লাহ্র রাসূলের চাচার মুখে কি তরবারি দিয়া আঘাত করা যায় (ابن ہشام، السيرة، ۲خ.، পৃ. ۲۰۴)।
বন্দীদের মধ্যে سهيل ابن عمرو، যে قریشদের মধ্যকার একজন সুবক্তা ছিল، তাহার কথার মাধ্যমে মুসলমানদের কষ্ট দিত। عمر ابن الخطاب (را) বলিলেন، ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে অনুমতি দিন আমি سهيلের সামনের দাঁত উপড়াইয়া ফেলি যাহাতে সে তাঁহার کَوْمের মধ্যে আর বক্তৃতা না করিতে পারে। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، না، এমনটি করিও না। যদি এমনটি করে তাহা হইলে আল্লাহও আমার সাথে এই ধরনের ব্যবহার করিবেন، যদিও আমি নবী (نور اليقين، পৃ. ۱۲۵)।
বন্দীদের মুক্তিপণ নির্ধারণে রাসূলুল্লাহ (س) উদারতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন। তিনি বন্দীদের অবস্থা অনুপাতে মুক্তিপণ নির্ধারণ করিয়াছিলেন। সঙ্গতিসম্পন্ন লোকদের জন্য উর্দ্ধে ছয় হাজার درهم و সাধারণ পরিমাণ চার হাজার درهم নির্ধারিত হইয়াছিল। কিন্তু যাহারা এই পরিমাণ মুক্তিপণ আদায় করিতে অক্ষম এমন দরিদ্রদিগকে শুধু চার শত درهم লইয়া ছাড়িয়া দেওয়া হইয়াছিল (سيرة مصطفى، পৃ. ۲۴۶)।
মহানবী (س) بدرের যুদ্ধবন্দীদের কয়েকজনকে মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্তিদান করিলেন। তাঁহারা হইলেন ابول عاص ابن ربیعه، مطاب ابن حنطب، سيفي ابن ابى رفاعه و ابُو عجا عمر و ابن عبد الله (ابن ہشام، السيرة، ۲خ.، পৃ. ۲۲۸)।
ابُو عجا ছিল কবি، যে مكة আল্লাহ্র রাসূলকে ভীষণ কষ্ট দিত। সে বলিল، হে আল্লাহর রাসূল! আমার সমুদয় সম্পদ সম্পর্কে আপনার জানা রহিয়াছে। আমি অভাবগ্রস্ত و আমি বহু সন্তানভারে ক্লিষ্ট। রাসূলুল্লাহ (س) তাহার প্রতি উদারতা প্রদর্শন পূর্বক মুক্তি প্রদান করেন (نور اليقين، পৃ. ۱۳۲)।
حज़रত Anas (ra) বলেন، একবার অস্ত্র-سست্রে সজ্জিত আশিজনের একটি দল Tan'im পর্বতের আড়াল হইতে রাসূলুল্লাহ (س) ও তাঁহার সাহাবীদের উপর অতর্কিতে আক্রমণ করিয়া তাঁহাদিগকে ঘায়েল করিবার উদ্দেশ্যে নিচে অবতরণ করিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (س) তাহাদিগকে জীবিত ছাড়িয়া দিলেন। অন্য বর্ণনায় আছে، রাসূলুল্লাহ (س) তাহাদিগকে আযাদ করিয়া দিলেন। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা ارشاد করেন:
وَهُوَ الَّذِي كَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنْكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ عَنْهُمْ بِبَطْنِ مَكَّةَ.
"আল্লাহ সেই মহান সত্তা، যিনি মক্কার অদূরে তাহাদের হাত তোমাদের উপর হইতে و তোমাদের হাত তাহাদের উপর হইতে বিরত রাখিয়াছেন" (۴۸: ۲۴)।
مदीनार ইয়াহুদীদের মধ্যে বানু কাینকা' সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (س) ও তাহাদের মধ্যকার সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করে। ফলে রাসূলুল্লাহ (س) তাহাদেরকে অবরোধ করেন و তাহারা শর্ত সাপেক্ষে আত্মসমর্পণ করে। যখন আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সাহায্য করিলেন، তখন عبد اللہ ابن ابی ابی ابن سَلUL তাঁহার নিকট আসিয়া বলিল، হে মুহাম্মাদ। আমার মিত্রদের সহিত উত্তম ব্যবহার কর। রাসূলুল্লাহ (س) তাহার কথার কোন উত্তর দিলেন না। সে আবার বলিল، হে মুহাম্মাদ! আমার মিত্রদের সহিত সদয় আচরণ কর। রাসূলুল্লাহ (س) তাহার দিক হইতে মুখ ফিরাইয়া নিলেন। অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ (س)-এর লৌহ বর্মের পকেটে হাত ঢুকাইয়া দিল। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে বলিলেন، ছাড়। রাসূলুল্লাহ (س) এত ক্রুদ্ধ হইলেন যে، তাঁহার মুখমণ্ডল রক্তিম বর্ণ ধারণ করিল। তিনি তাহাকে আবার বলিলেন، আমাকে ছাড়। সে বলিল، না। আল্লাহ্র কসম! আমি আপনাকে ছাড়িতেছি না যতক্ষণ না আপনি আমার মিত্রদের ব্যাপারে সদয় আচরণ করেন। চারি শত খালি মাথাবিশিষ্ট যোদ্ধা ও তিন শত বর্মধারী যোদ্ধা আমাকে সারা দুনিয়া হইতে নিরাপদ করিয়া দিয়াছে। আর আপনি তাহাদিগকে একদিনে নির্মূল করিয়া দিবেন؟ আল্লাহ্র কসম! আমি তাহাদের ছাড়া এক মুহূর্তেও নিরাপদ নই। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন، বেশ। তাহাদিগকে তোমার মর্জির উপর ছাড়িয়া দিলাম (ابن ہشام، السيرة، ۳خ.، পৃ. ۴۱)। এই ছিল এক ইয়াহুদীদের মিত্রের প্রতি রাসূলুল্লাহ (س)-এর উদারতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
श्रीका খায়রারে سلام ابن مشقامের স্ত্রী Zainab বিষ্ণু হারিছ একটি বকরীর গোশত রান্না করিয়া রাসূলুল্লাহ (س)-কে হাদিয়া দেয়। এই গোশতের সহিত Zainab কিছু বিষ মিশাইয়া দেয়। রাসূলুল্লাহ (س) তাহা হইতে কিছু গোশত মুখে তুলিতেই বুঝিতে পারেন و তাহা মুখ হইতে ফেলিয়া দেন। কিন্তু বিশ্বर ابن البراء রাসূলুল্লাহ (س) এর সুরুষে এমনটি করা বেয়াদরি মনে করিয়া তাহা ভক্ষণ করেন। রাসূলুল্লাহ (س) ঐ স্ত্রীলোক ও ইয়াকুলীবের ڈابیا জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা বলিল، আমরা এইজন্য বিষ প্রয়োগ কুরিয়াছি যে، আপনি প্রকৃতপক্ষেই যদি নবী হন তাহা হইলে তাহা প্রমাণিত হইবে। আর যদি মিথ্যা দাবিদার হন তাহা হইলে আমরা আন্তরক্ষা করিতে পারিব। অতঃপর স্ত্রীলোকটি ইসলাম গ্রহণ করে و রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে ক্ষমা করিয়া দেন। অবশ্য বিশ্বর মৃত্যুবরণ করিলে রাসূলুল্লাহ (س) স্ত্রীলোকটিকে ডাকিয়েন، و কিসাসস্বরূপ হত্যা করিলেন، (بخاری، পৃ. ৬৪৬؛ ابن کثیر، الفسول، পৃঃ ۱۹۰؛ اساحس-سیار، পৃ. ۲۵۸)۔
بند ہنیفہ গোত্রের jumama ابن عصل ছিলেন یامادباشিদের سرور۔ رسول اللہ (ص) ناعدیر দিকে কিছু সংখ্যক অশ্বারোহী পাঠাইলে তাহারی humamaকে ধরিয়া آریا مسجد نوحاشیر একটি খুঁটির সহিত বাঁধিয়া রাখিল۔ رسول اللہ (ص) তাঁহার কাছে আসিলেন و তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন، اوحے ثمامہ! তুমি কী মনে করিলেই۔ সে بلینم ہتھائی۔ اگر آپ ایاکے کو مارتے ہیں تو آپ کو خونخوار کا قتل کرنا پڑے گا۔ اور اگر آپ کو فضل حاصل ہوتا ہے تو آپ کی قیمت اچھی ہوتی ہے۔ اور اگر آپ کو دولت چاہیے تو آپ کی قیمت اچھی ہوتی ہے۔ اللہ کے رسول (ص) اسے چھوڑ کر چلے گئے۔
دوسرے دن رسول اللہ (ص) اس کے پاس آئے اور وہی سوال پوچھا۔ اس نے پہلے دن والا جواب دیا۔ تیسرے دن بھی رسول اللہ (ص) نے اس سے وہی سوال پوچھا۔ اس نے پھر وہی جواب دیا جو پہلے دن دیا تھا۔ رسول اللہ (ص) نے فرمایا: ثمامہ کو چھوڑ دو۔
تب وہ آزاد ہو کر مسجد نبوی کے قریب ایک کھجور کے باغ میں چلا گیا اور غسل کر کے مسجد نبوی میں داخل ہو کر کہنے لگا کہ میں گواہی دیتا ہوں کہ اللہ کے سوا کوئی معبود نہیں اور محمد (ص) اللہ کے بندے اور رسول ہیں۔ اس کے بعد اس نے کہا: اے محمد! اللہ کی قسم، زمین پر آپ کے چہرے سے زیادہ مجھے کوئی اور چہرہ ناپسند نہیں تھا۔ لیکن اب آپ کا چہرہ دنیا کے ہر چہرے سے زیادہ مجھے پیارا ہے۔ اللہ کی قسم، آپ کے دین سے زیادہ کوئی دین مجھے ناپسند نہیں تھا۔ لیکن اب آپ کا دین دنیا کے ہر دین سے زیادہ پیارا ہو گیا ہے۔ اللہ کی قسم، آپ کے شہر سے زیادہ ناپسندیدہ شہر مجھے کوئی اور نہیں تھا۔ لیکن اب آپ کا شہر مجھے دنیا کے ہر شہر سے زیادہ پیارا ہے۔
آپ کی گھڑ سوار فوج نے مجھے اس وقت پکڑا تھا جب میں عمرہ کرنے جا رہا تھا۔ اب آپ مجھے کیا حکم دیتے ہیں؟ رسول اللہ (ص) نے اسے دنیا و آخرت کی خوشخبری سنائی اور اسے عمرہ کرنے کا حکم دیا۔ جب وہ مکہ پہنچا تو کسی نے اس سے پوچھا کہ کیا تم بے دین ہو گئے ہو؟ اس نے جواب دیا کہ ایسا کیوں ہو گا؟ میں نے تو رسول اللہ (ص) پر اسلام قبول کیا ہے۔ اور اللہ کی قسم، رسول اللہ (ص) کی اجازت کے بغیر یمن کے یمامہ سے ایک دانہ بھی تم تک نہیں آئے گا۔ (سيرة الهشام، 421، صفحہ 217)۔
رسول اللہ (ص) تھے بہت ہی فیاض دل انسان۔ صحابہ کرام (رضی اللہ عنہم) دشمنوں کے ظلم و ستم سے تنگ آ کر ان کے لیے یا ان پر بددعا کرنے کی درخواست کرتے تو آپ ان کے لیے دعا کرتے۔ اس سلسلے میں چند واقعات کا ذکر کیا گیا ہے۔ ابوہریرہ (رضی اللہ عنہ) فرماتے ہیں کہ ایک دفعہ کہا گیا: اے اللہ کے رسول! مشرکوں پر بددعا کریں۔ تب آپ نے فرمایا: میں لعنت کرنے والا بنا کر نہیں بھیجا گیا ہوں، بلکہ رحمت بنا کر بھیجا گیا ہوں (مسلم، 421، صفحہ 312)۔
طائف کے لوگوں نے جب اسلام قبول کرنے سے انکار کر دیا اور پتھر مارنے لگے، تب صحابہ کرام (رضی اللہ عنہم) عرض کرنے لگے: اے اللہ کے رسول! ان کے لیے بددعا کریں۔ آپ نے دعا کے لیے ہاتھ اٹھائے۔ صحابہ کرام (رضی اللہ عنہم) نے سوچا کہ آپ شاید بددعا کریں گے۔ لیکن آپ کی زبان سے نکلا: اے اللہ! طائف کے قبیلے (بنೂ ثقیف) کو ہدایت دے اور انہیں اسلام کے سائے تلے لے آ (شبلی نعمانی، سیرت النبی، 221، صفحہ 229)۔
دَوْس کا قبیلہ یمن میں رہتا تھا۔ اس قبیلے کے سردار طفیل ابن عمرو الدوسی (رضی اللہ عنہ) تھے۔ وہ پہلے ہی اسلام قبول کر چکے تھے۔ انہوں نے کافی عرصہ تک اپنے قبیلے کو اسلام کی طرف بلایا۔ لیکن وہ کفر میں ڈوبے رہے۔ آخرکار وہ نبی کریم (ص) کے پاس حاضر ہوئے اور اپنے قبیلے کی حالت بیان کی اور ان کے لیے بددعا کرنے کو کہا تاکہ وہ تباہ ہو جائیں۔ صحابہ کرام (رضی اللہ عنہم) نے سوچا کہ اب دَوْس کا قبیلہ ختم ہو جائے گا۔ لیکن رحمت کے نبی نے دعا کی: اے اللہ! دَوْس قبیلے کو ہدایت دے اور انہیں اسلام کے سائے میں لے آ (شبلی نعمانی، سیرت النبی، 221، صفحہ 229)۔
رسول اللہ (ص) کی نبوی زندگی کا ایک مشکل دور شعب ابی طالب میں گزرا۔ قریش نے رسول اللہ (ص) اور ان کے قبیلے کے لوگوں کو تین سال تک وہاں قید رکھا اور کھانے پینے کی چیزیں بھی پہنچنے نہیں دیں۔ بچے بھوک سے بلکتے اور چیختے تھے۔ ظالم لوگ بچوں کی اس دردناک آواز پر خوش ہوتے اور انہیں رحم نہیں آتا تھا۔ اس نافرمانی پر نبی کریم (ص) نے بددعا کی:
اللهم اغنى عليهم بسبع كسبع يوسف “اے اللہ! ان پر یوسف علیہ السلام کے سات سالوں جیسی حالت مسلط کر دے”۔
اس کے بعد ان پر سے رحمت کا بادل ہٹ گیا اور مکہ میں ایسا قحط پڑا کہ لوگ ہڈیاں اور مردار جانور کھانے لگے تھے۔ ان میں سے کوئی بھی جب آسمان کی طرف دیکھتا تو اسے بھوک کی شدت سے صرف دھواں نظر آتا۔ ابوسفیان، اور ایک روایت کے مطابق کریب ابن مرہ نبی کریم (ص) کے پاس حاضر ہوئے اور عرض کیا: اے محمد! آپ کی قوم تو تباہ ہو رہی ہے۔ اللہ سے دعا کریں کہ وہ اس مصیبت کو دور کرے۔ آپ نے اللہ تعالی سے دعا کی اور مصیبت دور ہو گئی اور بارش ہوئی (مفتی محمد شفیع، معارف القرآن، 762 ویں جلد، صفحہ 762؛ بخاری، 1002-33؛ شبلی نعمانی، سیرت النبی، 221، صفحہ 229)۔
اوپر ذکر کیے گئے واقعات سے رسول اللہ (ص) کی فیاضی کا پتہ چلتا ہے۔ اسلام کے دشمنوں کے ساتھ ان کی یہ فیاضی دنیا کی تاریخ میں بے مثال ہے۔
تاریخ گواہ ہے کہ رسول اللہ (ص) ایک بہت ہی سخی انسان تھے۔ اس بارے میں حدیث کی کتابوں میں یہ بات یوں آئی ہے: رسول اللہ (ص) سے کچھ مانگا گیا تو انہوں نے کبھی 'نہ' نہیں کیا (مسلم، 421، صفحہ 111)۔
حضرت انس (رضی اللہ عنہ) سے روایت ہے کہ ایک دفعہ ایک شخص نے رسول اللہ (ص) سے کچھ مانگا۔ رسول اللہ (ص) نے اسے دو پہاڑوں کے درمیان موجود تمام بھیڑیں دے دیں۔ اس نے اپنے قبیلے والوں کے پاس جا کر کہا: تم سب اسلام قبول کر لو۔ کیونکہ محمد (ص) اتنا دیتے ہیں کہ انہیں غربت کا کوئی ڈر نہیں (امام مسلم، الصحیح، 421، صفحہ 111)۔