📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর দৃঢ়চিত্ততা
পবিত্র কুরআনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূলদের প্রশংসা করা হইয়াছে। মহানবী (স)-কে উদ্দেশ্য করিয়া আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُوا الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ وَلَا تَسْتَعْجِلْ لَهُمْ. "আপনি ধৈর্য ধারণ করুন যেমন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন রাসূলগণ ধৈর্য ধারণ করিয়াছেন এবং তাহাদের বিষয়ে তড়িঘড়ি করিবেন না" (৪৬: ৩৫)।
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এবং খাতিমুল-আম্বিয়া বা সবশেষ নবী হিসাবে আল্লাহ তা'আলা এই পবিত্র গুণটি তাঁহাকে প্রদান করিয়াছিলেন। শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত ইসলামের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে তিনি কথা ও কাজে এমন দৃঢ়তার পরিচয় দিয়াছিলেন যাহা অন্য কাহারও পক্ষে সম্ভব নহে। আরব মরুর প্রতিটি ধূলিকণা যেন প্রতিবন্ধকতার পাহাড়-সম হইয়া তাঁহার সামনে দাঁড়াইয়াছিল। কিন্তু নবৃওয়াতের মর্যাদা এবং আল্লাহপ্রদত্ত দৃঢ়তার কাছে এইগুলি হুমড়ি খাইয়া পড়িয়া যাইত এবং বিরুদ্ধবাদীদের সকল ক্ষমতা ও শক্তি ইহার সামনে ভাঙ্গিয়া খান খান হইয়া যাইত। তাঁহার কর্মতৎপর জীবনে এইরূপ বহু সংকটজনক পরিস্থিতির উদ্ভব হইয়াছে যখন তাঁহার দৃঢ়চিত্ততা ও অটল সংকল্পের অভিব্যক্তি ঘটিয়াছে।
রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাঁহার কাজ যথারীতি চালাইয়া যাইতে লাগিলেন এবং লোকজনকে আল্লাহর দীনের দিকে আহ্বান করিতে লাগিলেন তখন কুরায়শদের আক্রোশও দিন দিন বাড়িয়া যাইতে লাগিল। তাঁহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর তীব্র সমালোচনায় মাতিয়া উঠিল এবং পরস্পরকে তাঁহার বিরুদ্ধে উস্কানী দিতে আরম্ভ করিল। তাহারা আবু তালিবের কাছে উপস্থিত হইয়া বলিল, হে আবূ তালিব! আপনি আমাদের মধ্যে প্রবীণ ও মুরব্বী। আমরা আপনাকে শ্রদ্ধা ও মান্য করি। আমরা বলিয়াছিলাম, আপনার ভাতিজাকে নিষেধ করুন, কিন্তু আপনি তাহা করিলেন না। আল্লাহ্র কসম! আমরা তাঁহাকে এইভাবে আর চলিতে দিতে পারি না। সে আমাদের দেব-দেবীর নিন্দা ও আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে বোকামী ঠাওরানোর যে দৃষ্টতা প্রদর্শন করিতেছে তাহা আমরা আর সহ্য করিতে পারি না। এখন হয় আপনি তাহাকে নিবৃত্ত করুন, নচেৎ আমরা আপনাকেসহ তাঁহার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইব এবং একপক্ষ ধ্বংস হইয়া যাওয়ার আগে আর থামিব না। তখন আবূ তালিব রাসূলুল্লাহ (স)-কে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন:
يا ابن اخي ان قومك قد جاءونى فقالوا لى كذا وكذا للذى كانوا قالوا له فابق على وعلى نفسك ولا تحملني من الامر لا أطيق.
“হে ভাতিজা! তোমার সম্প্রদায় আমার নিকট আসিয়া এইভাবে এইভাবে বলিয়াছে। অতএব অবস্থা এই পর্যায়ে উপনীত হইয়াছে। কাজেই তুমি নিজেকে সংযত করিয়া চল। আমার উপর আমার সাধ্যের বেশি কোন কিছু চাপাইয়া দিও না”।
রাসূলুল্লাহ (স) ভাবিলেন, চাচা মত পাল্টাইয়া ফেলিয়াছেন এবং কুরায়শদের মুকাবিলায় তাঁহাকে সাহায্য করিতে অক্ষম হইয়া পড়িয়াছেন।
ইহা ছিল তাঁহার চিন্তা ও চেতনার শেষ সময় এবং দৃঢ়তা ও অটলতার সর্বশেষ পরীক্ষা। এই সময় তাহার কথার প্রত্যুত্তরে তিনি যেই সকল কথা বলিয়াছেন, এই নিখিল বিশ্বে দৃঢ়তা ও দৃঢ়চিত্ততার জন্য ইহার চেয়ে বেশি কিছু প্রত্যাশা করা অবান্তর। তিনি বলিলেন, চাচাজান! والله لو وضعوا الشمس في يمينى والقمر في يسارى على ان أترك هذا الأمر حتى يظهره الله او أهلك فيه ما تركته.
“আল্লাহ্র শপথ! যদি তাহারা (কুরায়শরা) আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চন্দ্রও আনিয়া দেয় তবুও আমি দীন প্রচার হইতে বিরত থাকিব না—যেই পর্যন্ত এই প্রচারের দায়িত্ব শেষ না হইবে কিংবা আমার মৃত্যু না ঘটিবে"।
একদা কুরায়শ নেতাগণ কা'বা শরীফের নিকট জমায়েত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে আহ্বান করিলে তিনি সেইখানে উপস্থিত হইলেন। তাহারা বলিল, “হে মুহাম্মাদ! তোমার সাথে কিছু কথা বলিবার জন্য আমরা তোমাকে ডাকিয়া পাঠাইয়াছি। আল্লাহর শপথ! তুমি তোমার সম্প্রদায়ের মধ্যে যে বিভেদ সৃষ্টি করিয়াছ তেমন আর কোন আরব কখনও করিয়াছে বলিয়া আমাদের জানা নাই। তুমি পূর্বপুরুষদের ভর্ৎসনা করিয়াছ, প্রচলিত ধর্মের নিন্দা করিয়াছ, দেব-দেবীকে গালি-গালাজ করিয়াছ, বুদ্ধিমান লোকদের বোকা ঠাওরাইয়াছ এবং জাতির ঐক্যে ভাঙ্গন ধরাইয়াছ।
“এখন কথা হইল, এইসব কথা বলিয়া তুমি যদি সম্পদ অর্জন করিতে চাও, তাহা হইলে আমরা তোমাকে বিত্তশালী করিয়া দেই। আর যদি পদমর্যাদার প্রত্যাশী হও, তাহা হইলে আমরা তোমাকে নেতা বানাইয়া দেই। অথবা যদি রাজা-বাদশাহ্ হইতে চাও, তাহা হইলে আমরা তোমাকে রাজা বানাইয়া নেই।” রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের এই সকল লোভনীয় প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিলেন, "তোমরা যাহা যাহা বলিয়াছ তাহার কোনটাই আমি চাই না। আমার দাওয়াতের উদ্দেশ্য এই নয় যে, আমি তোমাদের সম্পদ বা পদমর্যাদা চাই কিংবা রাজা হইতে চাই; বরং আমি তোমাদের কাছে রাসূল হিসাবে প্রেরিত হইয়াছি। এখন তোমরা যদি আমার এই দাওয়াত গ্রহণ কর তাহা হইলে ইহা তোমাদের জন্য ইহকালীন শান্তি ও পরাকালীন মুক্তির ফয়সালা হইয়া যাইবে। আর যদি প্রত্যাখ্যান কর তাহা হইলে তোমাদের ও আমার ব্যাপারে আল্লাহর চূড়ান্ত ফয়সালা না আসা পর্যন্ত আমি ধৈর্য ধারণ করিব"।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর দৃঢ়চিত্ততার আরো সমুজ্জ্বল নিদর্শন পাওয়া যায় তাঁহার শি'বে আবী তালিব-এ অবস্থানকালীন সময়ে। কুরায়শগণ যখন দেখিতে পাইল যে, প্রতিরোধ, নির্যাতন ও নৃশংসতায় কিছুই হইতেছে না বরং দিন দিন ইসলামের দাওয়াত সম্প্রসারিত হইতেছে। ইতোমধ্যে হযরত উমার (রা) ও হযরত হামযা (রা)-এর মত ব্যক্তিত্ব ঈমান আনয়ন করিয়াছেন। নাজাশীও মুসলমানদিগকে আশ্রয় দান করিয়াছেন। তাই তাহারা এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল যে, মুসলমানদিগকে অবরুদ্ধ করিয়া ধ্বংস করিয়া ফোলতে হইবে। এই উপলক্ষে মক্কার সকল গোত্র একজোট হইয়া চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করিল। শর্ত ছিল কোন ব্যক্তি হাশেমী গোত্রের সাথে কোন প্রকার আত্মীয়তা স্থাপন করিবে না, তাহাদের কাছে কোন প্রকার জিনিস-পত্র বেচা-কেনা করিবে না তাহাদের সহিত মিলিত হইবে না, তাহাদের কাছে কোন প্রকার পানাহার সামগ্রী যাইতে দিবে না, যতক্ষণ না তাহারা হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে হত্যার জন্য কুরায়শদের হস্তে সমর্পণ করিবে। এই চুক্তিপত্রটি মানসূর ইবন ইকরিমা লিখিয়া কা'বা শরীফের দেওয়ালে টানাইয়া দিল।
আবু তালিব বাধ্য হইয়া খান্দানের সকল সদস্যসহ 'শি'বে আবী তালিব'-এ আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। দীর্ঘ তিন বৎসর বানু হাশিম গোত্র অবরুদ্ধ জীবন যাপন করিল। হাদীছ শরীফে বর্ণিত আছে, মুসলমানগণ সেই সময় কাটাযুক্ত গাছের পাতা ভক্ষণ করিয়া দিন অতিবাহিত করিতেন, যাহার ফলে তাঁহাদের অনেকের মল ছাগলের মলের ন্যায় হইয়া গিয়াছিল। এত প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও মহানবী (স) দীন প্রচার হইতে একটুও পিছপা হন নাই। ইহা হইতে অধিক দৃঢ়চিত্ততার উদাহরণ আর কি-ইবা হইতে পারে?
হিজরতের পূর্বে একবার সাহাবীগণ কাফিরদের জ্বালা-যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে তাহাদের জন্য বদ-দু'আ করিবার অনুরোধ করিলে তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে বলিলেন:
قَدْ كَانَ مِنْ قَبْلِكُمْ يُؤْخَذُ الرَّجُلُ فَيُحْفَرُ لَهُ فِي الْأَرْضِ ثُمَّ يُؤْتَى بِالْمِنْشَارِ فَيُجْعَلُ عَلَى رَأْسِهِ فَيُجْعَلُ فِرْقَتَيْنِ مَا يَصْرِفُهُ ذَالِكَ عَنْ دِيْنِهِ وَيُمَشِّطُ بِأَمْشَاطِ الْحَدِيدِ مَا دُوْنَ عِظَمِهِ مِنْ لَحْمٍ وَعَصَبٍ مَا يَصْرِفُهُ ذَالِكَ عَنْ دِيْنِهِ - وَاللهِ لَيُتِمَّنَّ اللهُ هَذَا لْأَمْرَ حَتَّى يَسِير الرَّاكِبُ مَا بَيْنَ صَنْعَاءَ وَحَضْرِ مَوْتَ مَا يَخَافُ إِلَّا اللهَ تَعَالَى.
"তোমাদের পূর্বে যেই সকল ধর্মপরায়ণ লোক চলিয়া গিয়াছে, তাহাদের জন্য মাটিতে গর্ত খনন করা হইত। অতঃপর তাহাদেরকে করাত দ্বারা চিরিয়া দুই টুকরা করিয়া ফেলা হইত। কিন্তু তবুও ইহা তাহাদিগকে ধর্মচ্যুত করিতে পারিত না। তাহাদের শরীরে লোহার চিরুনী চালনা করা হইত যাহার ফলে দেহ হইতে চর্ম বিচ্ছিন্ন হইয়া যাইত। তবুও ইহা তাহাদিগকে ধর্মচ্যুত করিতে পারিত না। আল্লাহর শপথ! দীন ইসলাম পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করিবেই। এমনকি সান'আ হইতে হাদারামাওত পর্যন্ত ভ্রমণকারিগণ নির্ভয়ে চলিয়া আসিবে। তাহাদের অন্তরে আল্লাহ ব্যতীত আর কাহারও ভয় থাকিবে না"। কী পরিমাণ দৃঢ়চিত্ত হইলে এই ধরনের উক্তি করিতে পারেন তাহা সহজেই অনুমেয়।
বদর যুদ্ধসহ সকল যুদ্ধে (হুনায়ন যুদ্ধে ব্যতীত) মুসলিম বাহিনীর তুলনায় শত্রু সৈন্য ছিল কয়েক গুণ বেশী। তথাপি রাসূলুল্লাহ (স) এক মুহূর্তের জন্যও তাঁহার সংকল্পে বিচলিত হন নাই বরং দৃঢ়চিত্তে এই সকল যুদ্ধ মুকাবিলা করিয়াছেন। বদর যুদ্ধে যখন তিন শত তেরজন মুসলিম সৈন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র-শস্ত্রহীন অবস্থায় এক হাজার সশস্ত্র কাফির সৈন্যের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে লিপ্ত হইলেন। তখন কাফির বাহিনী সংখ্যাধিক্য ও শক্তির দাপটে মুহুর্মুহু আক্রমণ করিতেছিল এবং মুসলিম বাহিনী আত্মরক্ষামূলক কৌশল অবলম্বন করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সন্নিকটে ব্যূহ রচনা করিতেছিলেন, তখনও তিনি দৃঢ়চিত্তে তাহা সম্পূর্ণরূপে মুকাবিলা করিয়াছিলেন।
উদের যুদ্ধে কতিপয় সাহাবীর পরামর্শে মদীনার বাহিরে গিয়া শত্রুদের প্রতিরোধ করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হইলে রাসূলুল্লাহ (স) গৃহে প্রবেশ করিলেন এবং যুদ্ধের বর্ম পরিধান করিয়া বাহিরে আসিলেন। এই দৃশ্য দেখিয়া উপরিউক্ত সাহাবীগণ অনুতপ্ত কণ্ঠে তাঁহাকে তাঁহার ইচ্ছানুযায়ী মদীনায় থাকিয়া প্রতিরোধ করিবার অনুরোধ করিলেন। তখন তিনি দৃঢ়চিত্তে বলিলেন:
لا ينبغي لنبي إذ لبس لأمته ان يضعها حتى يحكم الله بينه وبين أعدائه فانظروا ما امرتکم به فافعلوه وامضوا على اسم الله فلكم النصر ما صبرتم.
"নবী যখন যুদ্ধের বর্ম পরিধান করেন তখন শত্রুদের সাথে আল্লাহ্ একটা ফয়সালা না করিয়া দেওয়া পর্যন্ত তাঁহার উহা পরিত্যাগ করা শোভনীয় নয়। অতএব যেই ব্যাপারে আমি তোমাদিগকে নির্দেশ দিয়াছি তাহা ভাবিয়া দেখ এবং আল্লাহর নামে উহা বাস্তবায়ন কর। তোমাদের জন্যই রহিয়াছে সাহায্য যতক্ষণ তোমরা ধৈর্য ধারণ কর।
হুনায়ন যুদ্ধে হাওয়াযিন গোত্রের বীর সিপাহীরা যখন একযোগে বৃষ্টির মত তীর নিক্ষেপ করিতে শুরু করিল তখন কতিপয় সাহাবী ভীত-বিহবল হইয়া পড়িলেন। কিন্তু মহানবী (স) অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে কয়েকজন সাহসী সাহাবীর সাথে যুদ্ধের ময়দানে অটল ছিলেন। হাদীছ শরীফে বর্ণনাটি নিম্নোক্তভাবে আসিয়াছে:
عن ابي اسحاق سمع البراء وسأله رجل من قيس أفررتم عن رسول الله ﷺ يوم حنين ؟ فقال لكن رسول الله الله لم يفر كانت هوازن رماة وإنا لما حملنا عليهم انكشفرا فاكببنا على الغنائم فاستقبلنا بالسهام ولقد رأيت النبي على بغلته البيضاء وان ابا سفيان بن الحارث اخذ بزمامها وهو يقول انا النبى لا كذب. وفي رواية زاد انا ابن عبد المطلب.
"আবূ ইস্হাক হইতে বর্ণিত। তিনি বারাআ (রা)-কে বলিতে শুনিয়াছেন যে, তাহাকে কায়স গোত্রের জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, হুনায়ন যুদ্ধের দিন আপনারা কি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হইতে পলায়ন করিয়াছিলেন? তিনি বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়ন করেন নাই। হাওয়াযিন গোত্রের লোকগণ ছিল সুদক্ষ তীরন্দাজ। আমরা যখন তাহাদের উপর আক্রমণ করিলাম তখন তাহারা ছত্রভঙ্গ হইয়া পালাইতে আরম্ভ করিল। আমরা যখন গনীমত সংগ্রহ করিতে শুরু করিলাম ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা (অতর্কিতভাবে) তাহাদের তীরন্দাজ বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হইলাম। তখন আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাঁহার সাদা বর্ণের খচ্চরটির উপর আরোহিত অবস্থায় দেখিয়াছি আর আবূ সুফ্যান ইবনুল হারিছ তাঁহার খচ্চরের লাগাম ধরিয়াছিলেন। তখন তিনি বলিয়াছিলেন, আমি আল্লাহর নবী, ইহাতে কোন মিথ্যা নাই। আবু ইসহাকের অপর বর্ণনায়: আমি তো আবদুল মুত্তালিবের সন্তান"।
তাঁহার এই সুদৃঢ় মনোবল ও দৃঢ় সংকল্প মুসলমানদের অনুকূলে যুদ্ধের মোড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়াছিল।
অপর একটি ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর দৃঢ়চিত্ততার একটি বিরল দৃষ্টান্ত পরিলক্ষিত হয়। রাসূলুল্লাহ (স) নাজদ এলাকায় কোন এক যুদ্ধশেষে প্রত্যাবর্তনকালে একটি বাবলা গাছের নিচে অবস্থান করিয়া তরবারিখানা গাছে লটকাইয়া রাখিলেন। এমন সময় এক কাফির তাঁহার ঘুমন্ত অবস্থার সুযোগে শাণিত তরবারি উত্তোলন করিয়া বলিল, হে মুহাম্মাদ!
من يمنعك منى ؟ قلت له الله. "এখন তোমাকে আমার হাত হইতে কে রক্ষা করিবে? তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন, আল্লাহ!"।
এই দৃঢ়তা, নির্ভয়তা, সাহস ও বীরত্ব অবলোকন করিয়া কাফির এতই ভীত-সন্ত্রস্ত হইল যে, তৎক্ষণাত তাহার হাত হইতে তরবারিটি পড়িয়া গেল। মহানবী (স) তরবারিখানা উত্তোলন করিয়া বলিলেন, এখন তোমাকে আমার হাত হইতে কে রক্ষা করিবে? সে বলিল, আপনি আমাকে ক্ষমা করিয়া উত্তম তরবারি ধারণকারী হওয়ার পরিচয় দিন। অতঃপর তিনি তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিলেন। এই উপবিষ্ট ব্যক্তিই হইল সেই ব্যক্তি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার কোন প্রতিশোধ গ্রহণ করেন নাই।
হিজরতের প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (স) যখন আবু বকর (রা)-কে নিয়া ছওর পর্বতের গুহায় অবস্থান করিতেছিলেন তখন কাফিররা তাঁহাদের খোঁজে গুহার নিকটবর্তী হইলে আবু বকর (রা) মহানবী (স)-কে বলিলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি তাহাদের কেহ পা উঠায় তাহা হইলে আমাদিগকে দেখিয়া ফেলিবে। জবাবে রাসূলুল্লাহ (স) যাহা বলিলেন দৃঢ়চিত্ততা প্রমাণের জন্য ইহা হইতে বড় উক্তি আর কী-ই-বা হইতে পারে? তিনি বলিলেন:
ما ظنك باثنين الله ثالثهما ؟
"এমন দুইজন সম্পর্কে তোমার ধারণা কি যাহাদের তৃতীয়জন স্বয়ং আল্লাহ” (ইমাম বুখারী, আস-সাহীহ্, পৃ. ৯৭০)।
আর উক্ত ঘটনাটি আল্লাহ রব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করিয়াছেন। তিনি বলেন:
إِلَّا تَنْصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْهُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا فَأَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُودٍ لَمْ تَرَوْهَا .
“যদি তোমরা তাহাকে (রাসূলকে) সাহায্য না কর তবে (মনে রাখিও) আল্লাহ তো তাহাকে সাহায্য করিয়াছিলেন যখন কাফিররা তাহাকে (মক্কা হইতে) বহিষ্কার করিয়াছিল। তিনি ছিলেন দুইজনের দ্বিতীয় দ্বিতীয়জন যখন তাহারা গুহার মধ্যে ছিলেন। তিনি তখন তাহার সঙ্গীকে বলিয়ালেন, বিষণ্ণ হইও না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁহার প্রতি স্বীয় প্রশান্তি অবতীর্ণ করিলেন এবং তাঁহাকে শক্তিশালী করেন। এমন এক সৈন্য বাহিনী দ্বারা যাহা তোমরা দেখ নাই” (৯:৪০)।
হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত উছমান (রা)-কে আবূ সুফ্যান ও অন্যান্য কুরায়শ নেতাদের সাথে দেখা করিবার জন্য প্রেরণ করিলেন। তাহারা বলিল, দেখ উছমান! তুমি যদি কা'বা তাওয়াফ করিতে চাও তবে তাওয়াফ করিয়া লও।' উছমান (রা) বলিলেন, 'রাসূলুল্লাহ (স) তাওয়াফ না করা পর্যন্ত আমি তাওয়াফ করিব না।' ইহাতে কুরায়শরা ক্ষিপ্ত হইয়া হযরত উছমান (রা)-কে আটক করিয়া রাখিল।
ঐদিকে রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানদের নিকট এই সংবাদ পৌঁছিল যে, হযরত উছমান (রা) শাহাদাত বরণ করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) এই সংবাদ শোনামাত্র অল্প সংখ্যক সাহাবী থাকা সত্ত্বেও দৃঢ়চিত্তে বলিলেন, لا نبرح حتى نناجز القوم “কুরায়শদের সাথে লড়াই না করিয়া এই স্থান ত্যাগ করিব না” এই বলিয়া মুসলমানদিগকে লড়াইয়ের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করাইলেন যেইটিকে আমরা بيعة الشجرة বা بيعة الرضوان বলিয়া থাকি। রাসূলুল্লাহ (স)-এর তাৎক্ষণিক এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও দৃঢ়চিত্ততা আল্লাহ্র নিকট এতই পছন্দ হইল যে, তিনি তাঁহার প্রশংসা করিয়া পবিত্র কুরআনের আয়াত নাযিল করিলেন:
لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنْزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَآثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا
"আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হইলেন যখন তাহারা বৃক্ষের নীচে আপনার কাছে বায়'আত গ্রহণ করিল। তাহাদের অন্তরে যাহা ছিল তাহা তিনি অবগত ছিলেন। অতঃপর তিনি তাহাদের প্রতি প্রশান্তি নাযিল করিলেন এবং তাহাদিগকে আসন্ন বিজয় দান করিলেন" (৪৮: ১৮)।
তাঁহার এই ধরনের অসংখ্য দৃঢ়চিত্ততার উদাহরণ আমাদিগকে দৃঢ়চিত্ত হইতে পথ-নির্দেশ করে।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর সত্যবাদিতা
সত্যবাদিতা নবী ও রাসূলগণের একটি অপরিহার্য গুণ। এই গুণ তাঁহাদের সত্তা হইতে কখনও পৃথক হইতে পারে না। কারণ যদি তাঁহাদের কথাবার্তায় সত্যবাদিতাই না থাকে তবে তাঁহাদের দ্বারা প্রচারিত আল্লাহর কালাম ও দীন কোনটাই মানুষ বিশ্বাস করিতে পারিবে না। এইজন্য আল্লাহ্ রব্বুল 'আলামীন নবী ও রাসূলগণকে যেমনিভাবে সর্বপ্রকার মন্দ ও অনৈতিক কাজ হইতে বিরত রাখিয়াছেন, অনুরূপভাবে তাহাদের মুখ হইতে জীবনে একটি মিথ্যা কথাও বাহির করেন নাই।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সত্যবাদিতা ছিল সর্বজনবিদিত। তাঁহার শত্রুই হউক আর মিত্রই হউক, বিশ্বাসীই হউক আর অবিশ্বাসীই হউক, সকলেই একবাক্যে স্বীকার করে যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) জীবনে একটি মিথ্যা কথাও বলেন নাই।
তাঁহার সত্যবাদিতা সম্পর্কে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে অসংখ্য আয়াত অবতীর্ণ হইয়াছে। তন্মধ্যে কয়েকটি আয়াত নিম্নে পেশ করা হইল।
আল্লাহ্ বলেন:
وَلَوْ تَقُولَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيلِ. لَأَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ، ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ. فَمَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ عَنْهُ حَاجِزِينَ.
"যদি সে আমার নামে কোন কথা রচনা করিত তবে আমি তাহার দক্ষিণ হস্ত ধরিয়া ফেলিতাম, অতঃপর কাটিয়া দিতাম তাহার জীবন ধমনী, তোমাদের কেহই তাহাকে রক্ষা করিতে পারিতে না" (৬৯: ৪৪-৪৮)।
وَلَمَّا جَاءَهُمْ رَسُولٌ مِّنْ عِنْدِ اللهِ مُصَدِّقٌ لَمَا مَعَهُمْ نَبَدَ فَرِيقٌ مِّنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ كِتَابَ اللهِ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ كَانَّهُمْ لَا يُعْلَمُونَ.
"যখন তাহাদের কাছে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে একজন রাসূল আগমন করিলেন যিনি ঐ কিতাবের সত্যায়ন করেন যাহা তাহাদের কাছে রহিয়াছে, তখন আহলে কিতাবের একদল আল্লাহ্র গ্রন্থকে পশ্চাতে নিক্ষেপ করিল" (২:১০১)।
نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنْزَلَ التَّوْرَةَ وَالْإِنْجِيلَ.
"তিনি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করিয়াছেন সত্যতার সাথে যাহা সত্যায়ন করে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের" (৩:৩)।
وَلَمَّا رَأَ الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزَابَ قَالُوا هَذَا مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَصَدَقَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ.
"যখন মু'মিনগণ শত্রুবাহিনীকে দেখিল তখন বলিল, আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূল এই ওয়াদাই আমাদেরকে দিয়াছিলেন এবং আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূল সত্য বলিয়াছেন" (৩৩: ২২)।
فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ كَذَبَ عَلَى اللهِ وَكَذَّبَ بِالصِّدْقِ إِذْ جَاءَهُ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَشْوَى للكافرين.
"যে ব্যক্তি আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা বলে এবং তাহার কাছে সত্য আগমন করিবার পর তাহাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে, তাহার চেয়ে অধিক যালিম আর কে হইবে? কাফিরদের বাসস্থান জাহান্নামে নয় কি" (৩৯:৩২)?
وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا أَتَيْتُكُمْ مِّنْ كِتَبٍ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مُصَدِّقٌ لمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنْصُرُنَّهُ.
"আর আল্লাহ্ যখন নবীগণের নিকট হইতে অংগীকার গ্রহণ করিলেন যে, আমি যাহা কিছু তোমাদের দান করিয়াছি কিতাব ও জ্ঞান এবং অতঃপর তোমাদের নিকট কোন রাসূল আসেন তোমাদের কিতাবের সত্যতা প্রতিদানের জন্য, তখন তোমরা অবশ্যই সেই রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়ন করিবে এবং তাহাকে সাহায্য করিবে” (৩:৮১)।
অনুরূপভাবে হাদীছ শরীফের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেও তাঁহার সত্যবাদিতা সম্পর্কে বহু সংখ্যক বর্ণনা পাওয়া যায়। এখানে হাদীছে জিবরীল-এর উল্লেখ করা যায় যাহাতে মহানবী (স)-কে তিনি বিভিন্ন প্রশ্ন করিয়াছিলেন এবং মহানবী (স) তাঁহার প্রশ্নের উত্তর দিয়াছিলেন। প্রতিবারই জিবরীল (আ) তাঁহার কথাকে সত্যায়ন করিয়াছিলেন। হাদীছে জিবরাঈলের বর্ণনা নিম্নরূপ:
হযরত 'উমার (রা) বলেন, আমরা একদা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দরবারে বসা ছিলাম। এমন সময় ধবধবে সাদা কাপড় পরিহিত ও কুচকুচে কালো চুলবিশিষ্ট এক ব্যক্তি আমাদের নিকট উপস্থিত হইলেন। অথচ তাঁহার চেহারার মধ্যে সফরের কোন চিহ্ন পরিলক্ষিত হইতেছিল না এবং আমরা কেহই তাহাকে চিনিতে পারিলাম না। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর হাঁটুর সহিত তাঁহার হাটু মিলাইয়া বসিলেন এবং তাঁহার উভয় হাতের তালু উভয় উরুর উপর রাখিয়া বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন। তিনি বলিলেন, ইসলাম হইতেছে তোমার এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নাই এবং হযরত মুহাম্মাদ (স) আল্লাহ্র রাসূল, আর নামায কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমযানের রোযা রাখা, আর সামর্থ্য থাকিলে বায়তুল্লাহ্র হজ্জ করা। তিনি (জিবরীল) বলিলেন, আপনি সত্য বলিয়াছেন। ইহাতে আমরা আশ্চার্যান্বিত হইলাম এই ভাবিয়া যে, তিনি প্রশ্ন করিতেছেন, আবার স্বয়ং সত্যায়নও করিতেছেন। আবার বলিলেন, আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ঈমান হইতেছে তুমি বিশ্বাস স্থাপন করিবে আল্লাহর প্রতি, তাঁহার ফেরেশতাগণের প্রতি, তাঁহার (নাযিলকৃত) কিতাবসমূহের প্রতি, তাঁহার প্রেরিত রাসূলগণের প্রতি, শেষ দিবসের প্রতি আর ঈমান আনয়ন করিবে তাকদীরের ভাল-মন্দের প্রতি। তিনি বলিলেন, আপনি সত্য বলিয়াছেন।
হযরত আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) সর্বোত্তম সত্যবাদী।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর জন্মের পর হইতে তাঁহার শৈশবে, কৈশোরে, যৌবনে, প্রৌঢ়ত্বে বা বার্ধক্যে কেহই তাঁহাকে কোন দিন মিথ্যা কথা বলিয়াছেন বলিয়া কোন প্রমাণ দিতে পারে নাই, বরং ছোটবেলা হইতেই তাঁহাকে (আল-আমীন) বা বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী বলিয়া আখ্যায়িত করা হইয়াছিল। ইবন ইসহাক বলেন, তাঁহাকে "আল-আমীন" এইজন্যই বলা হইত যে, আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন তাঁহার মধ্যে সর্বপ্রকার সৎ, যোগ্য ও যথাযথ আখলাক বা চরিত্রের সন্নিবেশ করিয়াছিলেন। আল্লাহ্ বলেন :
مطاع ثم أمين কোন কোন তাফসীরকারের অভিমত হইতেছে এই, "আমীন" দ্বারা মুহাম্মাদ (স)-কেই বুঝান হইয়াছে।
ইতিহাস সাক্ষ্য যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার নবুওয়াত-পূর্ব জীবনেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিচার ফয়সালা করিয়াছেন এবং সমগ্র জাতি তাহা নিঃসংকোচে মানিয়া লইয়াছে। কারণ তাহারা জানিত, যে ব্যক্তি জীবনে একটি মিথ্যা কথাও বলেন নাই বা কোন দিন কাহারও আমানতের খিয়ানত করেন নাই, তাঁহার পক্ষে যে কোন ধরনের বিচার ফয়সালায় পক্ষপাতিত্ব করা কখনও সম্ভব হইবে না। বর্ণিত আছে যে, কুরায়শগণ কা'বা ঘর পুনর্নির্মাণকালে "হাজরে আসওয়াদ"-কে কেন্দ্র করিয়া তাঁহাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি কা'বা ঘরে প্রবেশ করিবে তাহার ফয়সালাই সকলে মানিয়া লইবে। সর্বাগ্রে রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে প্রবেশ করিতে দেখিয়া তাহারা সমস্বরে বলিয়া উঠিল :
هذا محمد الامين قد رضيناه هذا محمد الامين.
"এই তো মুহাম্মাদ! এই তো আল-আমীন" (বিশ্বস্ত সত্যবাদী)। আমরা তাঁহার (ফয়সালার) প্রতি সন্তুষ্ট।
রাবী' ইব্ন খুছায়ম বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) জাহিলী যুগেও বিচার ফয়সালা করিতেন। তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! নিশ্চয় আমি ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলে আমীন বা বিশ্বস্ত সত্যবাদী।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা, উত্তম আচরণ ও মধুর ব্যবহারের খ্যাতি দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। এই খ্যাতির কথা হযরত খাদীজা (রা)-ও শুনিয়াছিলেন। তিনি একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও পবিত্রা মহিলা ছিলেন। তিনি মহানবী (স)-কে তাঁহার বাণিজ্যসামগ্রী লইয়া সিরিয়া গমনের প্রস্তাব দেন। তিনি উক্ত প্রস্তাব গ্রহণ করেন। হযরত খাদীজা (রা) প্রচুর বাণিজ্যসামগ্রী রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর হাতে ন্যস্ত করেন এবং মায়সারা নামক এক ভৃত্যকে তাঁহার সংগী করিয়া দেন। এই সফর ছিল খুবই সফল এবং ইহাতে মুনাফা হইয়াছিল অনেক বেশী। সুতরাং হযরত খাদীজাও কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রাসূলুল্লাহ (স)-কে ওয়াদার অতিরিক্ত পারিশ্রমিক প্রদান করেন।
হযরত খাদীজা (রা) পূর্ব হইতেই রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সততা, সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তদুপরি তিনি তাঁহার মধ্যে বাণিজ্যিক আমানতদারি ও সত্যবাদিতা পূর্ণরূপে অবলোকন করেন। এতদ্ভিন্ন সিরিয়ায় সংঘটিত বিভিন্ন অলৌকিক কর্মকাণ্ড ও ব্যবসায়িক সততার বর্ণনা তিনি তাঁহার ভৃত্য মায়সারার নিকট হইতে শুনিয়া তাঁহার প্রতি আকৃষ্ট হইয়া বিবাহের প্রস্তাব দেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার চাচার অনুমতিক্রমে বিবাহে সম্মতি দেন ও তাঁহাকে বিবাহ করেন।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর উপর যখন সর্বপ্রথম “ওহী” অবতীর্ণ হয় তখন খাদীজা (রা) তাঁহাকে লইয়া তাঁহার চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইবন নাওফালের নিকট গমন করিলেন এবং ওয়ারাকা তাঁহার নিকট হইতে সবকিছু ভালভাবে শুনিলেন, অতঃপর যাহা বলিলেন তাহা হাদীছে এইভাবে আসিয়াছে:
অতঃপর তাঁহাকে লইয়া খাদীজা (রা) তাঁহার চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইবন নাওফাল ইব্ন আসাদ ইব্ন আবদুল-উয্যার নিকট গেলেন যিনি জাহিলী যুগে ঈসায়ী ধর্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি ইবরানী ভাষায় লিখিতে জানিতেন এবং আল্লাহর তাওফীক অনুযায়ী ইবরানী ভাষায় ইঞ্জীল হইতে অনুবাদ করিতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বয়োবৃদ্ধ এবং অন্ধ হইয়া গিয়াছিলেন। খাদীজা (রা) তাহাকে বলিলেন, 'হে চাচাতো ভাই! আপনার ভাতিজার কথা শুনুন!' ওয়ারাকা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, 'ভাতিজা! তুমি কি দেখ'? রাসূলুল্লাহ্ (স) যাহা দেখিয়াছিলেন সবই খুলিয়া বলিলেন। তখন ওয়ারাকা তাঁহাকে বলিলেন, 'ইনি সেই দূত যাঁহাকে আল্লাহ্ তা'আলা মূসা (আ)-এর নিকট পাঠাইয়াছিলেন। আফসোস! আমি যদি সেদিন যুবক থাকিতাম। আফসোস্! আমি যদি সেদিন জীবিত থাকিতাম যেদিন তোমার কওম তোমাকে দেশ হইতে বহিষ্কার করিয়া দিবে'। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহারা কি আমাকে দেশ হইতে বহিষ্কার করিবে? তিনি বলিলেন, হাঁ, অতীতে যিনিই তোমার মত কিছু লইয়া আসিয়াছেন তাহার সঙ্গেই শত্রুতা করা হইয়াছে। সেদিন যদি আমি থাকি, তবে তোমাকে প্রবলভাবে সাহায্য করিব।' ইহার কিছু দিন পর ওয়ারাকা ইন্তিকাল করেন।
অর্থাৎ তিনি যে সত্য নবী এবং তাঁহার কথায় মিথ্যার কোন ছাপ নাই তাহা তিনি (ওয়ারাকা) রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর কথাতেই পূর্ণভাবে নিশ্চিত হইতে পারিয়াছিলেন।
রাসূলুল্লাহ্ (স) যখন নবৃওয়াতের প্রচার শুরু করিলেন তখন কাফিরদের মধ্য হইতে যাহারা তাঁহার সম্পর্কে অবগত ছিল তাহারা তাঁহাকে মিথ্যাবাদী বলিয়া বিশ্বাস করিতে পারিল না; বরং তাহারা মনে করিল যে, তাহার বুদ্ধিবিভ্রম ঘটিয়াছে কিংবা কবিত্ব ভাব ফুটিয়া উঠিয়াছে। এই কারণে তাহারা তাঁহাকে মাজনূন বলিয়া আখ্যায়িত করিল, কিন্তু তাঁহাকে মিথ্যাবাদী বলিতে পারে নাই।
আবু জাহল বলিত, হে মুহাম্মাদ। আমি তোমাকে মিথ্যাবাদী বলিতে পারি না, বরং তুমি যাহা বলিতেহ এইগুলি আমি সঠিক বলিয়া মানিয়া নিতে পারিতেছি না। ঠিক তখনই আল-কুরআনের এই আয়াত নাযিল হয়:
فَإِنَّهُمْ لَا يُكَذِّبُونَكَ وَلَكِنَّ الظَّالِمِينَ بِآيَاتِ اللَّهِ يَجْحَدُونَ.
"তাহারা যদিও আপনাকে মিথ্যাবাদী বলিতেছে না, তবুও এই জালিমরা আল্লাহ্র নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করিতেছে" (৬: ৩৩)।
হযরত ইব্ন 'আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, যখন আল-কুরাআনের এই আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ وَأَنْذِرْ عَشِيْرَتَكَ الْأَقْرَبَيْنَ. "হে নবী! স্বীয় পরিবার-পরিজনদের সতর্ক করুন, ইসলামের দাওয়াত দিন"। তখন তিনি সাফা পাহাড়ের উপর আরোহণ করিয়া কুরায়শদের ডাক দিলেন। সকল লোক সমবেত হইলে তিনি বলিলেন:
أرأيتكم لو أخبرتكم ان خيلا بالموادى تريد ان تغير عليكم أكنتم مصدقى ؟ قالوا نعم ما جربنا عليك الا صدقا ...
"যদি আমি বলি, এই পাহাড়ের পাদদেশে একদল আশ্বরোহী তোমাদের উপর হামলা করিবার জন্য ওঁৎ পাতিয়া আছে, তবে তোমরা কি তাহা বিশ্বাস করিবে? সবাই বলিল, হাঁ, কেননা আমরা তোমাকে কখনও মিথ্যা কথা বলিতে শুনি নাই"।
বদর যুদ্ধের দিন আখনাস ইবন শুরায়ক আবু জাহলকে বলিল, হে আবুল হাকাম! এখানে আমি এবং তুমি ছাড়া শোনার মত কেহই নাই। আচ্ছা বল তো! মুহাম্মাদ (স) সত্যবাদী, না মিথ্যাবাদী? তখন আবূ জাহল বলিল, আল্লাহর শপথ। নিশ্চয় মুহাম্মাদ (স) সত্যবাদী, সে কখনও মিথ্যা কথা বলে নাই।
কুরায়শ নেতৃবৃন্দ যদিও ঈমান আনয়ন করে নাই তবুও তাহারা জানিত যে, মুহাম্মাদ (স) যাহা বলিতেছেন তাহা সত্য। তাহা না হইলে তাহারা রাতের পর রাত জাগ্রত থাকিয়া রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর তিলাওয়াতকৃত কুরআন কেন শুনে?
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর স্বভাব ছিল, তিনি রাত্রে সালাতে কিরাআত উচ্চৈস্বরে তিলাওয়াত করিতেন, সালাত ছাড়াও তিলাওয়াত করিতেন। তিনি কুরআন একেবারে উচ্চৈস্বরেও পাঠ করিতেন না আবার একেবারে নিম্নস্বরেও নয়। তিনি এতটুকু উচ্চৈস্বরে তিলাওয়াত করিতেন যাহা বাড়ির বাহিরের লোকেরাও শুনিতে পাইত। কাফিররা যাহা করিত তাহা হইল, তাহারা কুরআনের আয়াত শ্রবণ করিত বিশেষত তাহাজ্জুদের পর। কোন কোন সময় প্রভাতকাল পর্যন্ত তাহারা উপবিষ্ট থাকিত। ইহা তাহাদের হৃদয়ের উপর যে গভীর প্রভাব বিস্তার করিত তাহা নিম্নের ঘটনা হইতে সহজেই অনুমেয়।
এক রজনীতে আবু সুফ্যান ইবন হারব, আবু জাহল ইব্ন হিশাম এবং আখনাস ইব্ শুরায়ক এই তিনজন রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করিবার উদ্দেশ্যে গমন করে, কিন্তু কাহারও সাথে কাহারও যোগাযোগ ছিল না। প্রত্যূষে তিনজনই স্ব-স্ব স্থান ত্যাগ করিয়া গৃহাভিমুখে যাত্রা করিয়া পথিমধ্যে পরস্পরের সহিত পরস্পরের সাক্ষাত ঘটে। যেহেতু পূর্বে কুরআন মজীদ না শুনার সিদ্ধান্ত গহীত হইয়াছিল উহা তাহার খেলাফ ছিল, তাই তিনজনেই তাহাদের বড় ভুল হইয়াছে বলিয়া স্বীকার করিল এবং ভবিষ্যতে এমনভাবে আর আসা উচিৎ নয় বলিয়া অভিমত প্রকাশ করিল। দ্বিতীয় রজনীতে আর স্থির থাকিতে না পারিয়া পূর্ব রজনীর ন্যায় তিনজনই আবার আগমন করিল, মনে মনে এই ভাবিয়া যে, আজ তো আর অন্য কেহই আগমন করিবে না। কিন্তু যখন তাহারা স্বীয় স্থান ত্যাগ করিয়া গৃহাভিমুখে যাত্রা করিল তখন পুনরায় তিনজনের পথিমধ্যে সাক্ষাত ঘটিল। তিনজনই তাহাদের পদক্ষেপের জন্য অনুশোচনা করিল এবং অঙ্গীকার করিল যে, অতঃপর আর কেহই আসিবে না। কিন্তু তৃতীয় রজনীতেও তাহারা মনে করিল, গতকাল যে পাকা ওয়াদা হইয়াছে তাহাতে অদ্য কেহই আসিবে না। ফলে প্রত্যেকেই স্ব-স্ব ধারণা অনুসারে গমন করিল এবং পুনরায় তিনজনের স্ব-স্ব কর্মতৎপরতার জন্য অনুতপ্ত হইয়া দৃঢ় অংগীকারে আবদ্ধ হইল।
কিন্তু প্রত্যূষে আখনাস ইবন শুরায়ক আবূ সুফ্যানের নিকট গমন করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, আচ্ছা বলতো! রাত্রে মুহাম্মাদের নিকট ইহতে যেইসব কথাবার্তা শুনিয়াছ সেই সম্পর্কে তোমার মতামত কি? উত্তরে আবু সুফয়ান বলিল, তাঁহার মুখ নিঃসৃত বাণী খুবই উন্নত। তুমিও তো তাহার কিছু কিছু হৃদয়ংগম করিতে সক্ষম হইয়াছ, আর কিছু কথা এমনও আছে যাহা আমাদের জ্ঞানসীমা বহির্ভূত যাহার অর্থ ও মর্ম আমাদের উপলব্ধি হইতেও উন্নততর। আখনাস বলিল, আমারও কিন্তু একই উপলব্ধি। অতঃপর আখনাস আবু জাহলের নিকট গমন করিল এবং একই প্রশ্ন করিল। আবূ জাহল উত্তরে বলিল, শোন। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আমাদের ও আব্দ মনাফদের মধ্যে নিয়ত প্রতিযোগিতা লাগিয়াই আছে। আমরা পরস্পর সমান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী সওয়ারীর ন্যায় ছিলাম। যিয়াফত, দায়িত্ব পালন ও দান-দক্ষিণার ক্ষেত্রে আমরা উভয়ই সমকক্ষ ছিলাম। কিন্তু এখন তাহারা বলে, আমাদের মধ্য হইতে একজন নবীর আবির্ভাব ঘটিয়াছে যাঁহার নিকট আল্লাহ্ ওহী আসে। এখন বল ইহার প্রতিকার কি? আল্লাহ্ শপথ! আমরা কখনও মুহাম্মাদ (স)-কে নবী হিসাবে মানিয়া লইব না এবং তাঁহার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিব না।
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, কুরায়শ নেতৃবৃন্দ এই কথা বিশ্বাস করিত, মুহাম্মাদ (স) যাহা বলিতেছেন তাহা সত্য। কিন্তু তাহাদের নেতৃত্ব হারাইবার ভয়ে তাহারা তাঁহাকে সত্য নবী হিসাবে জনসমক্ষে স্বীকার করিত না।
ইসলাম গ্রহণ করিবার পূর্বে আবূ সুফ্যান ইসলামের ঘোর শত্রু ছিলেন। মক্কা বিজয়ের পূর্বে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত প্রায় প্রতিটি অভিযানেই তিনি নেতৃত্ব দিয়াছিলেন। সেই আবূ সুফ্যানই রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের সম্মুখে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সত্যবাদিতাকে অকপটে স্বীকার করিয়াছিলেন। হাদীছ শরীফে ঘটনাটি নিম্নোক্তভাবে আসিয়াছে:
আব্দুল্লাহ ইব্ন 'আব্বাস (রা) বলেন, আবু সুফ্যান ইব্ন্ন হারব তাহাকে বলিয়াছেন, বাদশাহ হিরাকল (হিরাক্লিয়াস) একবার তাহার নিকট লোক পাঠাইলেন। তিনি কুরায়শদের কাফেলায় তখন ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়ায় ছিলেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ্ (স) আবূ সুফ্যান ও কুরায়শদের সাথে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সন্ধিবদ্ধ ছিলেন। আবু সুফ্যান তাঁহার সঙ্গীদেরসহ হিরাকল (হিরাক্লিয়াস)-এর দরবারে আসিলেন এবং তখন হিরাকল (হিরাক্লিয়াস) জেরুসালেমে অবস্থান করিতেছিলেন। হিরাকল (হিরাক্লিয়াস) তাহাদিগকে তাহার দরবারে ডাকিলেন। তাহার পার্শ্বে তখন রোমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিল। অতঃপর তাহাদের কাছে ডাকিয়া আনিলেন এবং দোভাষীকে ডাকিলেন। তাহারপর জিজ্ঞাসা করিলেন, 'এই যে ব্যক্তি নবী বলিয়া দাবি করেন, তোমাদের মধ্যে বংশের দিক দিয়া তাঁহার সবচেয়ে নিকটাত্মীয় কে'? আবূ সুফ্যান বলিলেন, 'বংশের দিক দিয়া আমিই তাঁহার নিকটাত্মীয়'। তিনি বলিলেন, 'আবু সুফিয়ানকে আমার নিকটে লইয়া আস এবং তাহার সঙ্গীদের পেছনে বসাইয়া দাও'। ইহার পর তাহারা দোভাষীকে বলিলেন, তাহাদের বলিয়া দাও, আমি তাহার কাছে সেই ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করিব, সে যদি আমার কাছে মিথ্যা বলে। তবে সাথে সাথে তোমরা তাহাকে মিথ্যাবাদী বলিয়া প্রকাশ করিবে। আবূ সুফ্যান বলেন, আল্লাহর কসম। তাহারা, আমাকে মিথ্যাবাদী বলিয়া প্রচার করিবে এই লজ্জা যদি আমার না থাকিত, তবে অবশ্যই আমি তাঁহার সম্পর্কে মিথ্যা বলিতাম। অতঃপর তিনি তাঁহার সম্পর্কে আমাকে প্রথম যে প্রশ্ন করেন তাহা হইতেছে, তোমাদের মধ্যে তাহার বংশমর্যাদা কেমন? আমি বলিলাম, তিনি আমাদের মধ্যে। অতি সম্ভ্রান্ত বংশের। তিনি বলিলেন, তোমাদের মধ্যে কি কেহই ইতোপূর্বে নবুওয়াতের দাবী করিয়াছে? আমি বলিলাম, না। তিনি বলিলেন, তাহার বাপদাদাদের মধ্যে কি কেহ বাদশাহ্ ছিলেন? আমি বলিলাম, না। তিনি বলিলেন, সম্ভ্রান্ত লোকেরা তাহার অনুসরণ করে, না সাধারণ লোকেরা? আমি বলিলাম, সাধারণ লোকেরা। তিনি বলিলেন, তাহারা সংখ্যায় বাড়িতেছে, না কমিতেছে? আমি বলিলাম, তাহারা বাড়িয়াই চলিতেছে। তিনি বলিলেন, তাহার দীন গ্রহণ করিবার পর কেহ কি অসন্তুষ্ট হইয়া তাহা পরিত্যাগ করে? আমি বলিলাম, না। তিনি বলিলেন, নবুওয়াতের দাবির আগে তোমরা কখনও কি তাহাকে মিথ্যার দায়ে অভিযুক্ত করিয়াছ? আমি বলিলাম, না। এই ছিল তখনকার ইসলামের প্রচণ্ড বিরোধী আবূ সুফ্যান ইন্ন হারব-এর স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য।
হারিছ ইব্ন আমের একজন মন্দ লোক ছিল। সে মানুষের সম্মুখে রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে মিথ্যাবাদী বলিত। কিন্তু যখন সে পরিবার-পরিজনের সাথে একাকী অবস্থান করিত তখন বলিত, আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (স) মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নয়।
একদিন আবূ জাইল রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া তাঁহার সহিত মুসাফাহা করিল। ইহাতে লোকসকল বলিতে লাগিল, কি হলো, তুমি মুহাম্মাদের সাথে মুসাফাহা করিলে? তখন সে বলিল, আল্লাহ্ শপথ। আমি জানি, সে সত্য নবী। কিন্তু কি করিব? আমরা যে আব্দ মনাফ-এর সন্তানদের মধ্যে নেতৃস্থানীয়। অর্থাৎ আমাদের নেতৃত্বের কারণে আমরা তাঁহাকে নবী বলিয়া স্বীকার করিতে পারিতেছি না।
কুরায়শগণ রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দাওয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করিবার জন্য তাঁহাকে বিভিন্ন উপাধিতে আখ্যায়িত করিবার প্রয়াস চালাইলেও কেহই তাঁহাকে মিথ্যাবাদী বলিবার দুঃসাহস দেখায় নাই। প্রবীণ কুরায়শ নেতা ওয়ালীদ ইবন আল-মুগীরার নিকট কুরায়শদের একটি দল সমবেত হইলে সে বলিল, হে কুরাশগণ! হজ্জের মওসুম সমাগত। আরবের বিভিন্ন অঞ্চল হইতে এইখানে লোক আসিবে। আর মুহাম্মাদ (স)-এর কথা তাহারা ইতোমধ্যে শুনিয়াছে। সুতরাং তোমরা তাঁহার সম্পর্কে একটি সর্বসম্মত মত স্থির কর। এই ব্যাপারে তোমাদের মধ্যে যেন কোন মতানৈক্য না থাকে। যদি মতানৈক্য থাকে তবে একজনের কথা আরেকজনের দ্বারা মিথ্যা প্রমাণিত হইবে।
সকলেই বলিল, তাহা হইলে আপনিই একটি মত ঠিক করিয়া দিন, আমরা সকলেই সেই মতের প্রতিধ্বনি করিব। ওয়ালীদ বলিল, "বরং তোমরাই বল, আমি শুনি"। সমবেত সকলে বলিল, "আমরা বলিব, মুহাম্মাদ (স) একজন গণক"। ওয়ালীদ বলিল, "না, সে গণক নয়। আমরা অনেক গণক দেখিয়াছি। মুহাম্মাদ (স)-এর কথাবার্তা গণকের ছন্দবদ্ধ প্রতারণামূলক কথার মত নহে।"
সকলে বলিল, "তাহা হইলে আমরা সকলে বলিব, মুহাম্মাদ (স) পাগল"। ওয়ালীদ বলিল, "না, সে পাগলও নয়। আমরা অনেক পাগল দেখিয়াছি আর পাগলামী কাহাকে বলে তাহাও জানি। পাগলের কথা-বার্তায় জড়তা ও অসুস্থতা থাকে, প্রবল ভাবাবেগের মুর্ছনা এবং সন্দেহ-সংশয়ে তাহা ভারাক্রান্ত থাকে। কিন্তু মুহাম্মাদ (স)-এর কথায় তাহা নাই।” সকলে বলিল, "তাহা হইলে আমরা বলিব, সে একজন কবি।" ওয়ালীদ বলিল, "না, সে কবিও নয়। আমরা সব ধরনের কবিতা সম্পর্কে জানি। কিন্তু মুহাম্মাদ (স)-এর কথা কোন ধরনের কবিতার আওতায় পড়ে না।"
সকলে এইবার বলিল, "তাহা হইলে আমরা বলিব, সে যাদুকর"। ওয়ালীদ বলিল, "না, সে যাদুকরও নয়। আমরা অনেক যাদুকর ও যাদু দেখিয়াছি। কিন্তু তাহাদের মত গিরা দেওয়া ও তাহাতে ফুঁক দেওয়ার অভ্যাস মুহাম্মাদ (স)-এর নাই।" সকলেই বলিল, "তাহা হইলে আপনি কি বলিতে চান?"
ওয়ালীদ বলিল, "ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, মুহাম্মাদ (স)-এর কথা শুনিতে বেশ মিষ্টি লাগে। তাঁহার গোড়া অত্যন্ত শক্ত এবং শাখা-প্রশাখা ফলপ্রসূ। তোমরা যেই কথাই বলিবে তাহা মিথ্যা বলিয়া প্রতিপন্ন হইবে। তবে সবচেয়ে উপযুক্ত কথা হইবে তাঁহাকে যাদুকর বলা। কেননা সে এমন সব কথা বলে যাহা ভাইয়ে ভাইয়ে, স্বামী-স্ত্রীতে ও আত্মীয়-স্বজনের পরস্পরের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করিতে যাদুর মতই কাজ করে। তাই তাহাকে যথার্থ যাদুই বলা চলে। ইহার প্রভাবে জাতি বাস্তবিকই বিভেদের শিকার হইয়াছে"।
এই ছিল ওয়ালীদ ইব্ন মুগীরা ও তাহার সংগীদের বক্তব্য। কিন্তু তাহারা তাঁহার সম্পর্কে এত কিছু বলিবার পরও কেহই তাঁহাকে মিথ্যাবাদী বলার দুঃসাহস দেখায় নাই।
রাসূলুল্লাহ্ (স) যখন ব্যবসায় জড়িত হন, তখনই তাঁহার আমানতদারি ও সত্যবাদিতা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছিল। বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার নবুওয়াত লাভের পূর্বে সাইব ইব্ন আবু সাইব-এর সহিত ব্যবসায় অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি তাহার নিকট আসিয়া বলেন:
كنت شريكي فنعم الشريك كنت لا تدارى ولا تمارى
"তুমি আমার কতই না উত্তম অংশীদার ছিলে, তুমি কখনও ধোঁকাবাজি বা ঝগড়া কর নাই"।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সত্যবাদিতার কারণে মক্কার লোকেরা তাঁহার নিকট নানা জিনিস গচ্ছিত রাখিত। তিনি তাঁহার হিজরতের প্রাক্কালে ঐসব আমানত ফেরত দেওয়ার জন্য হযরত আলী (রা)-কে দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং এই গচ্ছিত মাল ফেরত দেওয়ার জন্য মক্কায় কিছুদিন অবস্থান করার নির্দেশ দেন।
এতদ্ভিন্ন রাসূলে কারীম (স) অনাগত ভবিষ্যতের জন্য এমন কিছু চরম সত্য ও বাস্তব ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন যাহা পদে-পদে, অক্ষরে-অক্ষরে পৃথিবীবাসীর সম্মুখে সত্যে পরিণত হইয়াছে যাহা দ্বারা তাঁহার সত্যবাদিতাই প্রমাণিত হয়। এই সম্পর্কিত দুই-একটি ঘটনা উল্লেখ করা গেল:
১. রাসূল কারীম (স) ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, কিস্সা ও কায়সারের ধন-সম্পদ আল্লাহ্ পথে ব্যয়িত হইবে এবং বাস্তবেও তাহা হইয়াছিল। খুলাফায়ে রাশেদার খেলাফতকালেই রোম সাম্রাজ্য এবং পারস্য মুসলমানদের করতলগত হইয়াছিল। তাঁহার সেই চিরসত্য ভবিষ্যদ্বাণী হাদীছে এইভাবে আসিয়াছে: হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: কিসরা (পারস্য সম্রাট) যখন একবার ধ্বংস হইবে, তাহার পর আর কোন কিসরার আবির্ভাব ঘটিবে না এবং কায়সার (রোম সম্রাটের উপাধি) যখন ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে, তাহার পর আর কোন কায়সারের উদ্ভব ঘটিবে না। ঐ সত্তার কসম! যাঁহার হাতে আমার প্রাণ! ইহা নিশ্চিত যে, অচিরেই তোমরা কিস্সা ও কায়সারের ধনাগারসমূহ জয় করিবে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করিবে।
২. তাতারীদের সাথে যুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী তাঁহার সত্যবাদিতার আরেকটি অপূর্ব নিদর্শন। এই যুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী তিনি এইভাবেই করিয়াছিলেন: আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলে কারীম (স) বলিয়াছেন: যেইসব লোক চুলের জুতা পরিধান করিবে যে পর্যন্ত তোমরা তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করিবে এবং যে পর্যন্ত তোমরা তুর্কীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করিবে, যাহাদের চুল হইবে ক্ষুদ্র, মুখমণ্ডল লাল, নাক চেপ্টা আর চেহারা হইবে পেটা ঢালের ন্যায়, সেই পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হইবে না। পরবর্তী কালে তাতার ও তুর্ক বিজয় রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর ভবিষ্যদ্বাণী সত্যতার প্রমাণ বহন করে।
৩. মহানবী (স) হযরত হাসান (রা)-এর ছোট বেলায় তাঁহার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন যে, তাঁহার দ্বারা আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন মুসলমানদের বিবদমান দুইটি দলের মধ্যে সমঝোতা করাইবেন। বাস্তবেও তাহাই হইয়াছিল। কারণ তিনি খিলাফতের দাবি ত্যাগ করিয়া হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর সাথে সন্ধিচুক্তি করেন। হাদীছে ঘটনাটি এইভাবে আসিয়াছেঃ
عن أبي بكرة قال اخرج النبي الله ذات يوم الحسن فصعد به المنبر فقال إبنى هذا سيد ولعل الله ان يصلح به بين فئتين من المسلمين.
"আবূ বাক্সা (রা) বলেন, একদিন মহানবী (স) হাসানকে লইয়া বাহিরে আসিলেন এবং তাহাকে লইয়া মিম্বরে আরোহণ করিলেন। তারপর তিনি বলিলেন, আমার এই পুত্র (দৌহিত্র) নেতা হইবে এবং তাহার দ্বারা আল্লাহ মুসলমানদের দুইটি বিবদমান দলের মধ্যে সমঝোতা করাইবেন"।
৪. হযরত আলী ও মু'আবিয়া (রা)-এর মধ্যকার সংঘটিত যুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণীও রাসূলুল্লাহ্ (স) করিয়াছিলেন যাহা বাস্তবে সত্য প্রমাণিত হইয়াছিল। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, যে পর্যন্ত এমন দুইটি দলের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত না হইবে যাহাদের দাবি হইবে এক ও অভিন্ন, সে পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হইবে না।
৫. রাসূলে কারীম (স)-এর আরেকটা ভবিষ্যদ্বাণী হইতেছে, হিজাষ হইতে অগ্নি বাহির হওয়া যাহা বুসরা নগরীর উটসমূহের ঘাড় আলোকোজ্জ্বল করিবে। আর এই ঘটনা সত্যে পরিণত হইয়াছিল ৬৫৪ হিজরীতে। আল্লামা ইন্ন কাছীর (র) বলেন, এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আমার কাছে ইহা বর্ণনা করিয়াছেন। হাদীছ শরীফে ঘটনাটি নিম্নোক্তভাবে বর্ণনা করা হইয়াছেঃ
عن أبي هريرة أن رسول الله ﷺ قال لا تقوم الساعة حتى تخرج نار من ارض الحجاز تضيئي اعناق الابل ببصري “কিয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত সংঘটিত হইবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না হিজায ভূমি হইতে অগ্নি বাহির হইয়া বুসরা নগরীর উটসমূহের ঘাড় আলোকোজ্জ্বল করিবে"।
৬. খারেজীদের যুদ্ধ প্রসংগেও রাসূলুল্লাহ্ (স) ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন এবং তাহাদের মধ্যকার এক ব্যক্তির শারীরিক আকৃতি ও তাহার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তৃত বর্ণনা দিয়াছিলেন। তিনি বলেন, তাহাদের চিনিবার জন্য নিদর্শন হইবে এই যে, তাহাদের মধ্যে একজন কৃষ্ণকায় লোক হইবে যাহার একটি বাহু হইবে স্ত্রীলোকের স্তনের ন্যায় অথবা নড়বড়ে গোশতের টুকরার ন্যায়। যখন মানুষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিবে তখন তাহারা আত্মপ্রকাশ করিবে।
আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, আলী ইব্ন আবু তালিব (রা) তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছেন এবং আমি সেই যুদ্ধে তাঁহার সাথে ছিলাম। তিনি এই কৃষ্ণকায় লোকটিকে খুঁজিয়া বাহির করিবার জন্য নির্দেশ জারী করিয়াছিলেন। অতঃপর লোকটিকে হাজির করা হইলে আমি তাহার মধ্যে ঐ সকল বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করিয়াছি, নবী করীম (স) তাহার ব্যাপারে যাহা উল্লেখ করিয়াছিলেন।
৭. রাসূলে করীম (স)-এর আরেকটি ভবিষ্যদ্বাণী হইতেছে উম্মে ওয়ারাকা বিন্ত নাওফাল প্রসংগে যিনি শাহাদাতের অদম্য স্পৃহা নিয়া বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর অনুমতি প্রার্থনা করিয়াছিলেন। তখন তিনি তাহাকে বলিয়াছিলেন:
قرى في بيتك فان الله يرزقك الشهادة. “তুমি গৃহে অবস্থান কর। নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাকে শাহাদাত দান করিবেন।” ইহার পর হইতে তাহাকে "শাহীদা" বলা হইত। একদা রাত্রিবেলা তাহার সুদাব্বার দাস ও দাসী কাপড় দ্বারা গলা পেঁচাইয়া তাহাকে হত্যা করিল। আর সবার সম্মুখে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হইল।
এই ধরনের অসংখ্য ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হওয়ায় কাফির মুশরিকরা পর্যন্তও রাসূলে করীম (স)-এর উপর মিথ্যার অপবাদ আরোপ করিতে দুঃসাহস দেখাইতে করে নাই।
পরিশেষে বলা যায়, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-ই পৃথিবীবাসীর জন্য একমাত্র আদর্শের মূর্ত প্রতীক। তাই তো তিনি সর্বগুণে গুণান্বিত। তাঁহার সারা জীবনই ছিল সত্যবাদিতার গুণে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর অঙ্গীকার পালন
অঙ্গীকার ভঙ্গ করা অতি নিন্দনীয় কাজ। ইহা এক ধরনের মিথ্যাচার। কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দেশ বা জাতির সম্মান ও মর্যাদা বহুলাংশে নির্ভর করে তাহাদের কৃত অঙ্গীকার পালনের উপর। আল-কুরআনে বলা হইয়াছে:
وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولاً.
"তোমরা অঙ্গীকার পালন কর, নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হইবে" (১৭:৩৪)।
ইহা ছাড়াও কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতগুলিতে প্রতিশ্রুতি রক্ষার তাকীদ রহিয়াছে: (৫:১; ৯:১; ১৬:৯১; ২:১৭৭)। ব্যক্তিবর্গ বা গোষ্ঠীবর্গের মধ্যে সম্পাদিত সকল রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও লেনদেন সম্পর্কিত চুক্তি বা অঙ্গীকারসমূহ ইহার অন্তর্ভুক্ত।
অঙ্গীকার করিয়া তাহা ভঙ্গ করা মুনাফিকদের কাজ, মু'মিনের নহে। অঙ্গীকার রক্ষায় মহানবী (স) সর্বদা যত্নবান থাকিতেন। অতি সংকটময় মুহূর্তেও অঙ্গীকার পালন করিতে দ্বিধা করিতেন না।
নবুওয়াতের কিছুকাল পূর্বে বানু হাশিম ও অন্যান্য গোত্রের কিছু সংখ্যক সহৃদয় ব্যক্তির মধ্যে হিলফুল-ফুযুল-এর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিকে রাসূলুল্লাহ (স) কৃত গুরুত্ব দিতেন তাহা ইবন সা'দ-এর বর্ণনা হইতে অনুমান করা যায়। তিনি বলিয়াছেন, 'যদি ইহা (হিলফুল- ফুযুল) হইতে দূরে থাকিবার জন্য আমাকে উৎকৃষ্ট লোহিত বর্ণের উটও প্রদান করা হয় তথাপি আমি ইহাতে সম্মত হইব না এবং কখনও যদি কেহ আমাকে সেই চুক্তির নামে আহবান করে তবে অবশ্যই আমি উহাতে লাব্বায়ক বলিব'।
হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন আবিল হাসমা (রা) নবুওয়াত পূর্বকালের ঘটনা বর্ণনা করেন, আমি একবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে লেনদেন করি, কিন্তু আমার কাছে তাঁহার কিছু পাওনা বাকী রহিয়া গিয়াছিল। একদিন বলিলাম, আপনি অপেক্ষা করুন, এখনই বাড়ি হইতে বাকি অর্থ লইয়া আসিতেছি। কিন্তু বাড়ি আসিয়া অঙ্গীকারের কথা সম্পূর্ণ ভুলিয়া যাই। এইভাবে তিন দিন অতিবাহিত হইলে হঠাৎ আমার সেই অঙ্গীকারের কথা স্মরণ হয়। তৎক্ষণাৎ আমি ঘটনাস্থলে গিয়া উপস্থিত হই। দেখিলাম, তিনি সেই জায়গায়ই প্রতীক্ষমান রহিয়াছেন। আমাকে দেখিয়া তিনি বলিলেন:
يا فتى لقد شققت على انا ههنا منذ ثلاث أنتظرك. "হে যুবক! তুমি আমাকে বড়ই কষ্ট দিয়াছ। আমি তিন দিন যাবত এখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করিতেছি”।
অঙ্গীকার পালনের ক্ষেত্রে ইহার চেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ আর কী হইতে পারে? রোম সম্রাট 'কায়সার' তাহার রাজপ্রাসাদে আবূ সুফ্যানকে যেই সকল প্রশ্ন করিয়াছিল ইহার মধ্যে এই প্রশ্নটিও ছিল যে, মুহাম্মাদ (স) কি কখনও অঙ্গীকার ভঙ্গ করিয়াছেন? উত্তরে আবূ সুফ্যান স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছিল, না, তিনি কখনও অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন নাই। এই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রাণের শত্রু আবূ সুফ্যানের ভাষ্য।
উহুদের যুদ্ধে ওয়াহ্শী হযরত হামযা (রা)-কে শহীদ করিয়াছিল। মক্কা বিজয়ের পর সে প্রাণ ভয়ে এক শহর হইতে অন্য শহরে পলায়ন করিয়া ফিরিতেছিল। তায়েফবাসীরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে যে প্রতিনিধি দল প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেয় তন্মধ্যে তাঁহার নামও ছিল। কিন্তু সে ভয় করিতেছিল, না জানি প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয় কিনা। কিন্তু লোকেরা তাহাকে আশ্বস্ত করিল, তুমি নির্ভয়ে গমন কর, মুহাম্মাদ (স) প্রতিনিধিদিগকে হত্যা করেন না। সুতরাং সে এই বিশ্বাস নিয়া মহানবী (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইল এবং ইসলাম গ্রহণ করিল।
এইখানে উল্লেখ করা যাইতে পারে, যদিও তাহারা ইসলামের শত্রু ছিল, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তাহারা সম্যক অবগত ছিল। হযরত সাওয়ান ইব্ন উমায়্যা (রা) ইসলাম গ্রহণ করিবার পূর্বে কট্টর কাফির ছিলেন। মক্কা বিজয়ের পর তিনি ইয়ামান গমনের উদ্দেশ্যে জিদ্দা চলিয়া যান। উমায়ের ইব্ন ওয়াহ্ব রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া সকল ঘটনা খুলিয়া বলিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) সঙ্গে সঙ্গে তাহাকে নিরাপত্তা দানের ঘোষণা দিলেন। উমায়র পুনরায় নিবেদন করিলেন, নিরাপত্তার নিদর্শন প্রদান করিলে তাহার মনে আস্থা সৃষ্টি হইত। তাহার এই আবেদনে সাড়া দিয়া রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় পাগড়ী তাহার হাতে তুলিয়া দিলেন।
উমায়র এই পবিত্র পাগড়ী সঙ্গে লইয়া সাফওয়ানের নিকট পৌছিলেন এবং তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক নিরাপত্তা দানের কথা অবহিত করিলেন। সাফওয়ান শুনিয়া বলিলেন, দরবারে নবৃওয়াতে উপনীত হইলে আমার জীবন সংকটাপন্ন হইতে পারে। উমায়ر বলিলেন, আপনি মুহাম্মাদ (স)-এর মহানুভবতা ও ক্ষমা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত না হইবার কারণেই এমন ধারণা পোষণ করিতেছেন। আসুন, আপনার কেশাগ্রও স্পর্শ করা হইবে না। এই কথা শুনিয়া সাফওয়ান উমায়রের সঙ্গে দরবারে নবৃওয়াতে উপস্থিত হইলেন। রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট তাহার প্রথম প্রশ্ন ছিল, হে আল্লাহর রাসুল। আপনি কি আমাকে নিরাপত্তা প্রদান করিয়াছেন? রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, হাঁ, তোমাকে নিরাপত্তা প্রদান করা হইয়াছে। অতঃপর সাফওয়ান নিবেদন করিল, আমাকে দুই মাসের সময় দিন। রাসূলুল্লাহ (س) উত্তরে বলিলেন, দুইমাস নয়, তোমাকে চার মাসের সময় প্রদান করা হইল। উহার পর সাফওয়ান রাসূলুল্লাহ (س)-এর ক্ষমা ও ঔদার্যে অভিভূত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিলেন।
উল্লিখিত ঘটনা প্রমাণ করে যে, তিনি যাহাকে নিরাপত্তার অঙ্গীকার দিয়াছেন ইহার ব্যত্যয় কখনও ঘটে নাই। হযরত আবু রাফে' (রা) একজন দাস ছিলেন। তিনি কাফির থাকা অবস্থায় কুরায়শদের নিকট হইতে প্রতিনিধি হইয়া মদীনা আগমন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া তাঁহার চেহারা মুবারকের প্রতি দৃষ্টি পড়িতেই ইসলামের সত্যতার বীজ তাহার অন্তরে উপ্ত হইল। তিনি আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এখন আর কাফিরদিগের নিকট ফিরিয়া যাইব না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি অঙ্গীকার ভঙ্গ করিতে পারিনা, বরং তুমি এই যাত্রা ফিরিয়া যাও। সেইখানে পৌছিয়া তোমার অন্তরের অবস্থা যদি একইরূপ থাকে, তাহা হইলে চলিয়া আইস। সুতরাং তিনি তখন ফিরিয়া গেলেন এবং পরবর্তী সময়ে আসিয়া ইসলাম গ্রহণ করিলেন।
এই ঘটনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, রাসূলুল্লাহ (স) কাফিরদের পক্ষ হইতে প্রেরিত প্রতিনিধি দলের ক্ষেত্রে কখনও অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন নাই। তিনি যদি তৎক্ষণাৎ আবূ রাফে'কে ইসলামে দীক্ষিত করিয়া তাঁহার নিকট রাখিয়া দিতেন তাহা হইলে কাফিররা বলিতে পারিত, মুহাম্মাদ (স) অঙ্গীকার ভঙ্গ করিয়া আমাদের প্রতিনিধিকে তাঁহার নিকট রাখিয়া দিয়াছেন।
হুদায়বিয়ার সন্ধির একটি শর্ত ছিল, যদি মক্কা হইতে কেহ মুসলমান হইয়া মদীনায় চলিয়া আসে তাহা হইলে মক্কাবাসীদের চাওয়ার সাথে সাথে তাহাকে ফেরত পাঠাইতে হইবে। ঠিক যখন সন্ধির শর্তগুলি লিখা হইতেছিল, তখন হযরত আবূ জান্দাল (রা) পায়ে জিঞ্জীর বাঁধা অবস্থায় মক্কাবাসীদের নিকট হইতে পালাইয়া রাসূলুল্লাহ (س)-এর দরবারে উপস্থিত হইলেন। সকল সাহাবী তাঁহার এই করুণ অবস্থা অবলোকন করিয়া কাঁপিয়া উঠিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (س) ধীরকণ্ঠে বলিলেন, হে আবূ জানদাল! তুমি ধৈর্য ধারণ কর এবং নিজের অবস্থার উপর সন্তুষ্ট থাক। তুমি ও তোমার মত যেইসব অসহায় নির্যাতিত মুসলমান তোমার সহিত মক্কায় অবস্থান করিতেছে আল্লাহ তাহাদের মুক্তির জন্য একটা ব্যবস্থা করিয়া দিবেন। আমরা কুরায়শদের সহিত একটি সন্ধি ও শান্তিচুক্তি সম্পাদন করিয়াছি। এই ব্যাপারে আল্লাহকে সাক্ষী মানিয়া আমরা পরস্পরকে প্রতিশ্রুতি দিয়াছি। আমরা তাহাদেরকে দেওয়া এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিব না।
কাফিরদের সহিত কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করিতে গিয়া রাসূলুল্লাহ (স) নির্যাতিত সাহাবী হযরত আবু জান্দালকে তাঁহার পিতা সুহায়লের নিকট হস্তান্তর করিলেন। যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাহা ছিল কতইনা হৃদয়বিদারক। তারপর মহানবী (স) মদীনায় ফিরিয়া আসিলেন। অতঃপর আবু বাসীর নামে কুরায়শ বংশীয় একজন মুসলমান তাঁহার নিকট পালাইয়া আসিলেন। কুরায়শরা তাহার সন্ধানে দুইজন লোক পাঠাইল। তাহারা বলিল, আপনি আমাদের সহিত সম্পর্কিত সন্ধির কথা স্মরণ করুন। তিনি তাহাকে লোক দুইটির নিকট সোপর্দ করিলেন। তাহারা তাহাকে লইয়া বাহির হইল এবং যুল-হুলায়ফা নামক স্থানে পৌঁছিয়া খেজুর খাইতে লাগিল। আবূ বাসীর তাহাদের একজনকে বলিলেন, হে অমুক, আল্লাহর শপথ! তোমার তরবারিটি বড়ই সুন্দর। সেই লোকটি নিজের কোষ হইতে তরবারিটি বাহির করিয়া বলিল, হাঁ, আল্লাহর শপথ! ইহা একটি সুন্দর তরবারি এবং আমি তাহা কয়েকবার পরীক্ষা করিয়াছি। আবূ বাসীর বলিলেন, আমাকে একটু দেখাও, আমি তাহা একটু দেখি। সে তাহাকে তরবারিটি দিলে আবূ বাসীর ইহার দ্বারা লোকটিকে হত্যা করিলেন। আর তাহার অপর সাথী পালাইয়া মদীনায় আসে এবং দৌড়াইতে দৌড়াইতে মসজিদে নববীতে ঢুকিয়া পড়ে। তাহাকে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইহাকে ভীত মনে হইতেছে। সে মহানবী (স)-এর কাছে গিয়া বলিল, আল্লাহর কসম! আমার সঙ্গীকে আবূ বাসীর হত্যা করিয়াছে এবং আমাকেও পাইলে হত্যা করিত। এমন সময় সেইখানে আবূ বাসীর উপস্থিত হইয়া বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এই বিষয়ে আপনার আর কোন দায়িত্ব নাই। আপনি আমাকে কাফিরদের নিকট ফেরত দিয়াছেন। কিন্তু আল্লাহ আমাকে তাহাদের হাত হইতে মুক্তি দান করিয়াছেন। এই কথা শুনিয়া মহানবী (স) বলিলেন, সর্বনাশ! সে তো যুদ্ধের আগুন জ্বালাইয়া দিত যদি তাহার সামর্থ্য থাকিত। এই কথা শুনিয়া তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে পুনরায় কাফিরদের নিকট ফেরত দিবেন। তাই তিনি রওয়ানা হইয়া সমুদ্র তীরে চলিয়া গেলেন। এইদিকে আবূ জান্দাল তাহাদের নিকট হইতে পালাইয়া আসিয়া আবূ বাসীরের সহিত মিলিত হন। অবশেষে তাঁহাদের একটি দল তৈরী হয়। যখনই তাঁহারা শুনিতেন, সিরিয়ার দিকে কুরায়শদের কোন বাণিজ্য কাফেলা যাইতেছে তখনই তাঁহারা তাহাদের উপর আক্রমণ করিত এবং তাহাদের পণ্যদ্রব্য কাড়িয়া লইত।
অবস্থা বেগতিক দেখিয়া কুরায়শগণ মহানবী (স)-এর নিকট আল্লাহর শপথ ও আত্মীয়তার শপথ দিয়া কিছু সংখ্যক লোক পাঠাইল এই বলিয়া যে, তিনি যেন আবূ বাসীর ও তাহার লোকজনকে বিরত রাখেন এবং তাঁহার নিকট কোন মুসলমান মক্কা হইতে ফিরিয়া গেলে আর তাহাকে ফেরত দিতে হইবে না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহাদের ডাকিয়া পাঠান। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, অঙ্গীকার পালনে রাসূলুল্লাহ (স) কত দৃঢ় ছিলেন। আর এই দৃঢ়তার কারণেই তিনি আবূ বাসীরকে কাফিরদিগের নিকট হস্তান্তর করিয়াছিলেন। অথচ আবু জান্দাল ও আবূ বাসীর ছিলেন নির্যাতিত মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত। অঙ্গীকার পালনের নিমিত্তে এই ধরনের সিদ্ধান্ত লওয়া পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
বদর যুদ্ধে কাফিরদের মুকাবিলায় মুসলমানদের সংখ্যা ছিল এক-তৃতীয়াংশেরও কম। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইচ্ছা এই হওয়া দরকার ছিল যে, মানুষের সংখ্যা যতই বাড়িবে ততই মঙ্গল। কিন্তু তখনও তিনি সামগ্রিকভাবে আল্লাহ্র ইচ্ছার উপর নির্ভলশীল ছিলেন। এমনকি অঙ্গীকার পালনে ছিলেন দৃঢ়, অবিচল। হুযায়ফা ইব্ন আল-ইয়ামান (রা) এবং আবু হুছাইল (রা) নামক দুইজন সাহাবী মক্কা হইতে আগমন করিতেছিলেন। পথিমধ্যে কাফিরগণ তাহাদের এই বলিয়া বাঁধা দিল যে, তাহারা মদীনায় মহানবী মুহাম্মাদ (স)-এর কাছে যাইতেছেন। তাহারা এই কথা অস্বীকার করিলেন। পরিশেষে তাহাদের নিকট হইতে এই অঙ্গীকার লইয়া ছাড়িয়া দিল যে, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিবে না। এই দুইজন রাসূলুল্লাহ (س)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করিলে তিনি বলিলেন, তোমরা দুইজনই ফিরিয়া যাও। কোনক্রমেই আমি অঙ্গীকার ভঙ্গ করিতে পারিব না। আমার কেবল আল্লাহ্র সাহায্যই দরকার।
কুরায়শগণ ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর মধ্যে সম্পাদিত হুদায়বিয়ার সন্ধিতে একটি শর্ত এই ছিল যে, কোন তৃতীয় পক্ষ মুহাম্মাদ (স) বা কুরায়শদের সহিত মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করিতে পারিবে। তদনুযায়ী বানু বক্স কুরায়শদের এবং বানু খুযা'আ রাসূলুল্লাহ (س)-এর সহিত মিত্রতার ঘোষণা করে। মিত্রতার শর্তানুসারে একে অপরকে সাহায্য করিবার অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু কুরায়শরা হুদায়বিয়া সন্ধি শর্ত ভঙ্গ করিয়া বানূ বকরকে অস্ত্র দিয়া সাহায্য করিল এবং অনেকেই রাত্রের অন্ধকারে বানু বকর-এর সহিত মিলিয়া বানু খুযা'আর উপর আক্রমণ করিল এবং তাহাদের অনেককে হত্যা করিল। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) বানু খুযা'আর সহিত সম্পাদিত মৈত্রী চুক্তির অঙ্গীকার রক্ষা করিতে সুদৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যাহার ফলে মক্কা বিজিত হয়।
মক্কা বিজয়কালে রাসূলুল্লাহ (স) যখন মুসলমানদিগকে মক্কায় প্রবেশের নির্দেশ দেন তখন মুসলিম অধিনায়কগণের নিকট হইতে অঙ্গীকার লইয়াছিলেন যে, হামলা করা না হইলে কাহারও সহিত সংঘর্ষে লিপ্ত হইও না। তিনি কেবল কয়েকজন গুরুতর অপরাধীর নাম উল্লেখ করিয়া বলিলেন, তাহারা যদি কা'বার গিলাফের মধ্যেও লুকাইয়া থাকে তবুও তাহাদেরকে হত্যা করা হইবে। অবশ্য অনেককেই রাসূলুল্লাহ (স) শেষ পর্যন্ত ক্ষমাও করিয়া দিয়াছিলেন। এই ঘোষণাকৃত ব্যক্তিগণ ছাড়া তিনি বিজয়ের প্রাক্কালে তিনটি ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়াছিলেন। তাহা হইতেছে :
(এক) যে ব্যক্তি নিজের গৃহে অবস্থান করিবে সে নিরাপদ থাকিবে; (দুই) যে ব্যক্তি মসজিদুল হারামে অবস্থান করিবে সে নিরাপদ থাকিবে; (তিন) যে আবূ সুফ্যান-এর ঘরে অবস্থান করিবে সেও নিরাপদ। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার এই কৃত অঙ্গীকারটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করিয়াছিলেন যাহা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ইহার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিধানের জন্য মদীনায় হিজরতের পর মহানবী (স) মদীনার অধিবাসী আওস, খায়রাজ ও তাহাদের মিত্রদের সহিত একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন যাহা ইতিহাসে 'মদীনা সনদ' নামে পরিচিত। ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত মহানবী (স) কখনও এই চুক্তি লংঘন করেন নাই বরং ইয়াহুদীরাই সর্বপ্রথম এই সনদের চুক্তি লংঘন করে। ইব্ন হিশাম বলেন :
إن بني قينقاع كانوا أول يهود نقضوا ما بينهم وبين رسول الله ﷺ وحاربوا فيما بين بدر واحد.
“বনূ কায়ানুকাই প্রথম ইয়াহুদী দল যাহারা রাসূলুল্লাহ (স) ও তাহাদের মধ্যকার (চুক্তির) বিষয়টি ভঙ্গ করিল এবং বদর ও উহুদের মধ্যবর্তী সময়ে তাহারা যুদ্ধে লিপ্ত হইল”।
মদীনা চুক্তি (সনদ) ও হুদায়বিয়া চুক্তি (সন্ধি) ছাড়াও রাসূলুল্লাহ (س) আরও কতিপয় চুক্তি সম্পাদন করিয়াছিলেন। যেমন, আবওয়া বা ওয়াদ্দান যুদ্ধে বানু দাম্মার সহিত চুক্তি, বানু মুদ্লিজের সহিত চুক্তি, খায়বার চুক্তি, ফাদাকের চুক্তি, তায়মা চুক্তি, আয়লা চুক্তি, জারা ও আযরূহ চুক্তি ও দুমাতু'ল-জান্দালের উকাযদির-এর সহিত চুক্তি।
এই সকল চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল, যেইভাবেই হউক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা। কোন চুক্তি সম্পাদনের পর তিনি ইহার প্রতি সর্বদা পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করিতেন। তাঁহার ঘোর শত্রুরাও কখনও তাঁহার বিরুদ্ধে তাহাদের সহিত কৃত অঙ্গীকার বা বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগ উত্থাপন করিতে পারে নাই।
এমনকি মহানবী (س) মৃত্যু শয্যায় শায়িত অবস্থায়ও তাঁহার অঙ্গীকার পালনে ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। হাদীছ শরীফে আছে : হযরত 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। মহানবী (س) তাঁহার মৃত্যুকালীন রোগের সময় (তাঁহার স্ত্রীগণকে) জিজ্ঞাসা করিতেন, আগামী কাল আমার কাহার কাছে থাকিবার পালা? তিনি 'আইশা (রা)-এর পালার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন। সুতরাং তাঁহার সকল স্ত্রী তাঁহাকে যাহার গৃহে ইচ্ছা থাকিবার অনুমতি দিলেন এবং তিনি আমৃত্যু 'আইশা (রা)-এর গৃহেই অবস্থান করিলেন। আর এইখানেই তাঁহার স্বাভাবিক পালার দিন আল্লাহ তাঁহাকে আপন সান্নিধ্যে উঠাইয়া নিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে কিভাবে অঙ্গীকার পালন করিতে হয় তাহার বাস্তব নমুনা পেশ করিয়া গিয়াছেন এবং ভবিষ্যত জনগোষ্ঠীকে এই ব্যাপারে সঠিক দিক-নির্দেশনাও প্রদান করিয়াছেন। তিনি বলেন, মুনাফিকদের আলামত তিনটি : যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন অঙ্গীকার করে তখন তাহা ভঙ্গ করে, যখন তাহার নিকট আমানত রাখা হয় তখন তাহা খেয়ানত করে।
মোটকথা রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অঙ্গীকার পালন করিয়া চলিতেন এবং অঙ্গীকার ভঙ্গ করাকে মুনাফিকের লক্ষণ বলিয়া অভিহিত করতেন।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুহদ বা অল্পে তুষ্টি
'যুহদ' শব্দটি ১৯; ধাতু হইতে উদ্ভূত, যাহার আভিধানিক অর্থ 'কম'। ইহা الرغبة (আগ্রহ) শব্দের বিপরীত অর্থবোধক। ইহার পারিভাষিক অর্থ, আখিরাতের শান্তি লাভের উদ্দেশ্যে দুনিয়ার সুখ-শান্তি পরিত্যাগ করা। ইব্ন তাইমিয়া (র) বলেন, শারী'আতের পরিভাষায় যুহ্দ অর্থ, আখিরাতের যিন্দেগীতে যাহা কোনও উপকারে আসিবে না উহার প্রতি আগ্রহী না হওয়া। সাধারণভাবে দুনিয়ার প্রতি কোনরূপ মোহ না থাকাকেই যুহৃদ বলা হয়।
মহান আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-কে দুনিয়ার ভোগবিলাস ও সৌন্দর্যের প্রতি চক্ষু তুলিয়া তাকাইতেও নিষেধ করিয়াছেন। তাঁহাকে শিক্ষা দেওয়া হইয়াছে, এইখানকার আনন্দ ও সৌন্দর্যোপকরণ পরীক্ষার জন্য দেওয়া হইয়াছে। আসল শান্তি আখিরাতে পাওয়া যাইবে। ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَوةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَرِزْقُ رَبُّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَى
"তুমি তোমার চক্ষুদ্বয় কখনও প্রসারিত করিও না উহার প্রতি যাহা আমি তাহাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসাবে দিয়াছি, তদ্দ্বারা তাহাদেরকে পরীক্ষা করিবার জন্য। তোমার প্রতিপালক প্রদত্ত জীবনোপকরণ উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী” (২০: ১৩১)।
لَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِلْمُؤْمِنِينَ
"আমি তাহাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়াছি তাহার প্রতি তুমি কখনও তোমার চক্ষুদ্বয় প্রসারিত করিও না। তাহাদের জন্য তুমি দুঃখ করিও না; তুমি মু'মিনদের জন্য তোমার পক্ষপুট অবনমিত কর" (১৫: ৮৮)।
পার্থিব জীবনের শোভা-সৌন্দর্য ও ভোগ-বিলাসের পিছনে পড়িলে মানুষ মহান আল্লাহ্র স্মরণ হইতে অমনোযোগী হইয়া যায় এবং নিজের খেয়াল-খুশীমত চলাফেরা করে। ফলে সে শারী'আতের সীমা অতিক্রম করিয়া যায়। তাই এইরূপ না করিবার জন্য মহান আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-কে নির্দেশ দিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে:
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِي يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَوةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا .
"তুমি নিজকে ধৈর্য সহকারে রাখিবে তাহাদেরই সংসর্গে যাহারা সকাল ও সন্ধ্যায় আহ্বান করে উহাদের প্রতিপালককে তাঁহার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করিয়া উহাদিগ হইতে তোমার দৃষ্টি ফিরাইয়া লইও না। তুমি তাহার আনুগত্য করিও না যাহার চিত্তকে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করিয়া দিয়াছি, যে তাহার খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে ও যাহার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে" (১৮: ২৮)।
যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার স্মরণ বিমুখ সে কেবল পার্থিব জীবনই কামনা করে। সুতরাং তাহাকে উপেক্ষা করিয়া চলার জন্য মহানবী (স)-কে নির্দেশ দিয়াছেন তিনি। ইরশাদ হইয়াছে:
فَأَعْرِضْ عَنْ مَّنْ تَوَلَّى عَنْ ذِكْرِنَا وَلَمْ يُرِدْ إِلَّا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا ذَلِكَ مَبْلَغُهُمْ مِّنَ الْعِلْمِ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اهْتَدَى .
"অতএব যে ব্যক্তি আমার স্মরণে বিমুখ তুমি তাহাকে উপেক্ষা করিয়া চল; সে তো কেবল পার্থিব জীবনই কামনা করে। উহাদের জ্ঞানের দৌড় এই পর্যন্ত। তোমার প্রতিপালকই ভাল জানেন কে তাঁহার পথ হইতে বিচ্যুত, তিনিই ভাল জানেন কে সৎপথ প্রাপ্ত” (৫৩: ২৯-৩০)।
আল্লাহ তা'আলার এইসব উপদেশ ও নির্দেশ রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় জীবনের পরতে পরতে একেবারে অক্ষরে অক্ষরে মানিয়া চলিয়াছিলেন। তাই রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমগ্র জীবন পর্যালোচনা করিলে ইহা সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয় যে, তিনি দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও ভোগ- বিলাসের প্রতি মোটেই আগ্রহী ছিলেন না। ভোগ-বিলাসের সকল উপকরণ করায়ত্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি স্বেচ্ছায় তাহা পরিহার করিয়াছেন। বিবাহের পর আরবের অন্যতম ধনাঢ্য মহিলা হযরত খাদীজা (রা)-এর অঢেল সম্পদ হাতে পাইয়াও তাহা ভোগের জন্য ব্যবহার করেন নাই; বরং দুই হাতে তাহা গরীব-দুঃখীদের মধ্যে বিলাইয়া দিয়াছেন। মদীনায় হিজরতের পর তিনি রাষ্ট্র প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগার ছিল তাঁহারই নিয়ন্ত্রণে। এতদ্ব্যতীত কাফিরদের সহিত যুদ্ধে গনীমতরূপে তাঁহার হস্তাগত হয় অজস্র সম্পদ; কিন্তু নিজের ভোগ ও আরাম- আয়েশের জন্য কিছুই তিনি ব্যয় করেন নাই। পরিবারের সামান্য আহার যোগাইবার জন্য তিনি ঋণ পর্যন্ত করিয়াছেন। তাঁহার ইনতিকালের পর দেখা গেল তাঁহার লৌহ বর্মটি আবূ শাহ্মা নামক এক ইয়াহূদীর নিকট বন্ধক রহিয়াছে, যাহার বিনিময়ে তিনি পরিবারের জন্য সামান্য খাদ্যশস্য সংগ্রহ করিয়াছিলেন।
মহান আল্লাহ তাঁহাকে 'দাস-নবী' ও 'বাদশাহ-নবী' দুইটির যে কোনও একটি গ্রহণের এখতিয়ার দিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি 'দাস-নবী' হওয়া পসন্দ করেন এবং সেইভাবেই জীবন যাপন করিয়াছেন। ইব্ন কাছীর, বুখারী ও নাসাঈর হাদীছ উদ্ধৃত করিয়াছেন:
كان ابن عباس يحدث ان الله ارسل الى نبيه ملكا من الملائكة معه جبريل فقال الملك لرسوله ان الله يخيرك بين أن تكون عبدا نبيا وبين ان تكون ملكا نبيا فالتفت رسول الله ﷺ إلى جبريل كالمستشير له فاشار جبريل الى رسول الله ﷺ ان تواضع فقال رسول الله ﷺ بل اكون عبدا نبيا قال فما اكل بعد تلك الكلمة طعاما متكنا حتى لقى الله عز وجل
"ইব্ন আব্বাস (রা) বর্ণনা করিতেন যে, আল্লাহ তাঁহার নবীর নিকট একজন ফেরেশতা পাঠাইলেন যাহার সহিত জিবরীল (আ)-ও ছিলেন। অতঃপর ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, আপনি কি আল্লাহ্র দাসত্বে নিবেদিত নবী হইবেন, না রাজাধিরাজ নবী—এই ব্যাপারে আল্লাহ আপনাকে ইখতিয়ার দিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) জিবরীল (আ)-এর দিকে তাকাইলেন যেন তিনি তাঁহার পরামর্শপ্রার্থী। জিবরীল (আ) রাসূলুল্লাহ (স)-কে আল্লাহর প্রতি বিনয়ী হওয়ার জন্য ইশারা করিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি বরং আল্লাহর দাসত্বে নিবেদিত নবী হইতে চাহি। রাবী বলেন, এই কথা বলার পর হইতে আল্লাহ্র সহিত সাক্ষাৎ করা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (স) কখনও ঠেস দিয়া বসিয়া আহার করেন নাই”।
হাদীছটি উদ্ধৃত করিয়া ইব্ন কাছীর বলেন, ইমাম বুখারী তাঁহার তারীখ গ্রন্থে হায়ওয়া ইব্ শুরায়হ সূত্রে ইহা উদ্ধৃত করিয়াছেন এবং ইমাম নাসাঈ 'আমর ইব্ন উছমান সূত্রে। এই ধরনের শব্দে সহীহ গ্রন্থে এই হাদীছের মূল বিষয়বস্তু বর্ণিত হইয়াছে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর এইসব ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশ ত্যাগের মূলে ছিল এই চিন্তাধারা যে, দুনিয়া নিতান্তই একটি ক্ষণস্থায়ী জায়গা। তাই আল্লাহ তা'আলার নিকট ইহার কোনই মূল্য নাই। ইহা শুধু আখিরাতের পাথেয় সঞ্চয়ের জায়গা। তাই মু'মিনের জন্য ইহা কারাগাররূপে প্রতিভাত হয়। কিন্তু কাফিরদের যেহেতু পরকালে বিশ্বাস নাই এইজন্য তাহাদের নিকট ইহা জান্নাতস্বরূপ। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন :
الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر "দুনিয়া মু'মিনের কারাগার এবং কাফিরের জান্নাত"।
দুনিয়ার মূল্য আল্লাহ্র নিকট একটি নগণ্য মৃত বকরীর বাচ্চা হইতেও তুচ্ছ। হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
عن جابر بن عبد الله أن رسول الله ﷺ مر بالسوق داخلا من بعض العالية والناس كنفيه فمر بجدى أسك ميت فتناوله فأخذ بأذنه ثم قال أيكم يحب أن هذا له بدرهم فقالوا لا نحب انه لنا بشيئ ما نصنع به قال أتحبون أنه لكم قالوا والله لو كان حيا كان عيبا فيه لأنه أسك فكيف وهو ميت فقال فوالله للدنيا أهون على الله من هذا عليكم (مسلم ، كتاب الزهد والرقائق، رقم الحديث - ٧١٥٠) .
"জাবির ইব্ন আবদিল্লাহ (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) মদীনার উচ্চ ভূমিতে প্রবেশের সময় একটি বাজার দিয়া যাইতেছিলেন। তাঁহার উভয় পার্শ্বে বেশ লোকজন ছিল। অতঃপর ক্ষুদ্র কানবিশিষ্ট একটি মৃত বকরীর বাচ্চা তাঁহার সামনে পড়িল। তিনি উহার কান ধরিয়া বলিলেন, তোমাদের মধ্যে কে ইহা একটি দিরহামের বিনিময়ে লইতে আগ্রহী? তখন তাঁহারা বলিলেন, কোন কিছুর বিনিময়ে আমরা উহা লইতে আগ্রহী নহি। উহা দ্বারা আমরা কি করির? তিনি বলিলেন, কোন বিনিময় ছাড়াই তোমরা কি উহা লইতে আগ্রহী হইবে? তাঁহারা বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! ইহা যদি জীবিতও হইত তবুও তো উহাতে দোষ রহিয়াছে। কারণ উহার কান ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র। আর এখন তো উহা মৃত (তাই কে উহা গ্রহণ করিবে)। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আল্লাহর কসম! ইহা তোমাদের নিকট যতটা তুচ্ছ, দুনিয়া আল্লাহ্র নিকট ইহা হইতে অধিক তুচ্ছ”।
অন্য হাদীছে বর্ণিত আছে যে, দুনিয়ার মূল্য আল্লাহ্র নিকট একটি মশার ডানার সমতুল্যও নহেঃ
عن سهل بن سعد قال قال رسول الله ﷺ لو كانت الدنيا تعدل عند الله جناح بعوضة ما سقى كافرا منها شربة ماء (ترمذى، الجامع الصحيح، كتاب الزهد - رقم الحديث -٢٣٢٣) .
"সাহল ইব্ন সা'দ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: এই দুনিয়া যদি আল্লাহ্র নিকট একটি মশার ডানার সমানও মূল্যবান হইত তবে তিনি ইহা হইতে কোন কাফিরকে এক ঢোক পানিও পান করিতে দিতেন না”।
দুনিয়া যে যতই অর্জন করুক না কেন আখিরাতের তুলনায় তাহা একেবারেই নগণ্য। রাসূলুল্লাহ (স) একটি উদাহরণের মাধ্যমে সুন্দরভাবে তাহা বুঝাইয়া দিয়াছেন:
قال رسول الله ﷺ ما الدنيا في الآخرة الا مثل ما يجعل احدكم اصبعه في اليم فلينظر بماذا يرجع ( ترمذی، کتاب الزهد، رقم الحديث - ٢٣٢٦) .
"রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া হইল এইরূপ যে, তোমাদের কেহ সমুদ্রে তাহার আঙ্গুল ডুবাইয়া বাহির করিয়া আনিল। সে লক্ষ্য করিয়া দেখুক যে, সে তাহার আঙ্গুলে ভিজাইয়া সমুদ্রের কতটুকু 'পানি তুলিয়া আনিতে পারিয়াছে”।
এইসব কারণেই রাসূলুল্লাহ (স) নিজেও দুনিয়ায় সম্পদ সঞ্চয় করা পছন্দ করিতেন না এবং অন্যকেও তাহা করিতে নিরুৎসাহিত করিতেন। যেমন হাদীছে উল্লিখিত হইয়াছে:
عن عبد الله بن مسعود قال قال رسول الله ﷺ لا تتخذوا الضيعة فترغبوا في الدنيا (ترمذى، كتاب الزهد، رقم الحديث - ۲۳۳۱) .
"আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: তোমরা সহায়-সম্পত্তি অর্জন করিও না, তাহা হইলে দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হইয়া পড়িবে”।
রাসূলুল্লাহ (স) দুনিয়াকে ক্ষণিকের বিশ্রামাগারের সহিত তুলনা করিয়াছেন। এইজন্য তিনি স্বেচ্ছায় দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশ ত্যাগ করিয়াছেন। তিনি শক্ত বিছানায় শয়ন করিয়াছেন। কেহ নরম বিছানা দিতে চাহিলেও তিনি তাহা প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন। হাদীছে উল্লিখিত হইয়াছে:
عن عبد الله قال نام رسول الله ﷺ على حصیر فقام وقد اثر في جنبه فقلنا يا رسول الله لو اتخذنا لك وطاء فقال ما لى وما للدنيا ما انا في الدنيا الا كراكب استظل تحت شجرة ثم راح وتركها (ترمذی، کتاب الزهد ، رقم الحديث - ۲۳۸۰ ) .
'আবদুল্লাহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (س) একটি খেজুর পাতার চাটাইয়ের উপর ঘুমাইলেন। তিনি যখন (জাগ্রত হইয়া) দাঁড়াইলেন তখন তাঁহার পার্শ্বদেশে উহার দাগ পড়িয়া গিয়াছিল। আমরা বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার জন্য যদি আমরা একটি নরম বিছানা বানাইয়া দিতে পারিতাম! তিনি বলিলেন, আমার সঙ্গে দুনিয়ার সম্পর্ক কি? আমি তো দুনিয়ায় সেই এক আরোহীর মত, যে (গ্রীষ্মের দিনে) পথ চলিতে চলিতে একটি বৃক্ষের ছায়া তলে আশ্রয় লইল। ইহার পর আবার সে উহা ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেল”।
উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা)-এর বর্ণনায় ইহাও উল্লিখিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছিলেন : فلم يرجع اليها أبدا "উক্ত পথিক প্রস্থান করার পর আর কখনও উহার দিকে ফিরিয়া আসে না”।
আল্লাহ্র পক্ষ হইতে হযরত জিবরীল (আ) মক্কার বালুকাময় অঞ্চলসমূহ স্বর্ণ বানাইয়া দেওয়ার প্রস্তাব দেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (س) সবিনয়ে তাহা প্রত্যাখ্যান করেন। হযرت আবূ উমামা (রা) বর্ণিত দীর্ঘ একটি হাদীছের শেষে উল্লিখিত হইয়াছে:
قال عرض على ربي ليجعل لى بطحاء مكة ذهبا قلت لا يا رب ولكن أشبع يوما وأجوع يوما وقال ثلاثا أو نحو هذا . فاذا جعت تضرعت إليك وذكرتك وإذا شبعت شكرتك وحمدتك (ترمذى، كتاب الزهد ، رقم الحديث - ٢٣٥٠ ) .
"রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আমার প্রতিপালক আমাকে মক্কার বালুকাময় অঞ্চল স্বর্ণে পরিণত করিয়া দেওয়ার প্রস্তাব করিয়াছিলেন। কিন্তু আমি বলিলাম, হে আমার প্রতিপালক! না, বরং আমি একদিন তৃপ্তি সহকারে আহার করিব এবং একদিন ক্ষুধার্ত থাকিব। এই কথাটি তিনি তিনবার বা তদ্রূপ বলিয়াছেন। যখন ক্ষুধার্ত থাকিব তখন তোমারই কাছে কাকুতি-মিনতি করিব; তোমারই স্মরণ করিব। আর যখন তৃপ্তি সহকারে আহার করিব তখন তোমার শোকর করিব এবং তোমার প্রশংসা করিব”।
অন্য এক বর্ণনায় আসিয়াছে যে, জিবরীল (আ) মক্কার পাহাড়গুলিকে স্বর্ণে পরিণত করিয়া দেওয়ার প্রস্তাব দেন এবং ইহাও বলেন, আপনার বহন করার প্রয়োজন হইবে না, বরং সেইগুলিই আপনার সঙ্গে সঙ্গে চলিবে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) এই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেন। কাযী 'আয়ায তাঁহার আশ-শিফা গ্রন্থে হাদীছটি এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন:
ان جبريل نزل عليه فقال له ان الله تعالى يقرئك السلام ويقول لك اتحب ان اجعل هذه الجبال ذهبا وتكون معك حيثما كنت فاطرق ساعة ثم قال يا جبريل ان الدنيا دار من لا دار له ومال من لا مال له قد يجمعها من لا عقل له فقال له جبريل ثبتك الله يا محمد بالقول الثابت
"জিবরীল (আ) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিয়া বলিলেন, আল্লাহ আপনাকে সালাম দিয়াছেন এবং বলিয়াছেন, আপনি চাহিলে আমি এই সকল পর্বতকে স্বর্ণ বানাইয়া দিব। আর আপনি যেখানেই যান উহা আপনার সঙ্গেই থাকিবে। তখন তিনি কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন, অতঃপর বলিলেন, হে জিবরীল! দুনিয়া তাহার ঘর যাহার (পরকালে) কোন ঘর নাই; তাহার সম্পদ যাহার কোন সম্পদ নাই। আর তাহা সঞ্চয় করে সেই ব্যক্তি যাহার কোন বুদ্ধি নাই। তখন জিবরীল (আ) তাঁহাকে বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহ আপনাকে শাশ্বত বাণীর দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত রাখুন"।
রিযিকের প্রাচুর্য তিনি কখনও কামনা করেন নাই; বরং ইসলাম গ্রহণ, প্রয়োজন পরিমাণ রিযিক এবং অল্পে তুষ্ট থাকাকেই তিনি সফলতা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীছে উল্লিখিত হইয়াছে:
عن عبد الله بن عمرو ان رسول الله ﷺ قال قد افلح من اسلم وكان رزقه كفافا وقنعه الله
"আবদুল্লাহ ইব্ন আমর (را) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছেন: সেই ব্যক্তি সফলকাম যে ইসলাম কবুল করিয়াছে এবং প্রয়োজন পরিমাণ রিযিক পাইয়াছে আর আল্লাহ তাহাকে অল্পে তুষ্টি দান করিয়াছেন"।
এইজন্যই রাসূলুল্লাহ (س) স্বীয় বংশধর ও পরিবার-পরিজনদের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজন পরিমাণ রিযিকের জন্য দু'আ করিতেন:
عن ابى هريرة قال قال رسول الله الله اللهم اجعل رزق ال محمد قوتا. وفي رواية للبخارى اللهم ارزق آل محمد قوتا .
"আবু হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (س) বলিতেন, হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ (س)-এর পরিবার-পরিজনদেরকে প্রয়োজনীয় রিযিক দান কর”। রাসূলুল্লাহ (স) কখনও একবেলা খাওয়ার পর অন্য বেলার জন্য আহার্য রাখিয়া দিতেন না। আর কখনও তিনি একইসঙ্গে দুই জোড়া পোশাক ব্যবহার করেন নাই। হযরত 'আইশা (রা) বলেন:
ما رفع رسول الله ﷺ قط عشاء لغد ولا غداء لعشاء ولا اتخذ من شيئ زوجين ولا قميصين ولا ردائين ولا إزارين ولا من النعال . ولا رئى قط فارغا في بيته اما يخصف نعلا لرجل مسكين او يخيط ثوبا لأرملة .
"রাসূলুল্লাহ (স) কখনও রাত্রের খাবার সকালের জন্য তুলিয়া রাখিতেন না। আর না সকালের খাবার রাত্রির জন্য। তিনি কোনও জিনিসের এক জোড়া ব্যবহার করেন নাই, না দুইটি জামা একত্রে ব্যবহার করিয়াছেন, না দুইটি চাদর, না দুইটি লুঙ্গি আর না দুই জোড়া জুতা। আর তাঁহাকে কখনও গৃহে অবসর বসিয়া থাকিতে দেখা যায় নাই। হয় তিনি কোনও মিসকীনের জন্য জুতা সেলাই করিতেন অথবা বিধবা ও ইয়াতীমদের জন্য কাপড় সেলাই করিতেন”। এই মর্মে হযরত আনাস (রা) হইতেও একটি হাদীছ বর্ণিত আছে। তিনি বলেন:
كان النبي ﷺ لا يدخر شيئا لغد.
"নবী করীম (স) আগামী দিনের জন্য কোনও জিনিস জমা করিয়া রাখিতেন না"। তিনি একাধারে তিন দিন পরিতৃপ্ত হইয়া আহার করেন নাই। উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা) বলেন:
ما شبع رسول الله ﷺ ثلاثة ايام تباعا من خبز بر حتى مضى لسبيله (مسلم) کتاب الزهد والرقائق رقم الحديث - ٧١٧٥) .
"রাসূলুল্লাহ (স) একাধারে তিন দিন গমের রুটি পেট ভরিয়া আহার করেন নাই। এই অবস্থায়ই তিনি তাঁহার পথে চলিয়া গিয়াছেন"। ইমাম বুখারী হাদীছটি এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন:
ما شبع ال محمد ﷺ منذ قدم المدينة من طعام البر ثلاث ليال تباعا حتى قبض .
"মুহাম্মদ (স)-এর পরিবার যখন মদীনায় আগমন করিয়াছেন তখন হইতে তাঁহার ইনতিকাল পর্যন্ত একাধারে তিন রাত্র গমের রুটি পেট ভরিয়া আহার করেন নাই"।
একাধারে দুই দিনও তিনি এবং তাঁহার পরিবারের লোকজনও পরিতৃপ্ত হইয়া আহার করেন নাই। হযরত 'আইশা (রা) বর্ণনা করেন:
مَا شَبِعَ آلُ مُحَمَّدِ اللهُ مِنْ خُبْزِ شَعِيرٍ يَوْمَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ حَتَّى قُبِضَ رَسُولُ اللهِ ﷺ (মুসলিম, رقم الحديث - ٧١٧٦).
"মুহাম্মদ (স)-এর পরিবার পরপর দুই দিন কখনও যবের রুটি পেট পুরিয়া আহার করেন নাই। এই অবস্থায়ই রাসূলুল্লাহ (س) ইনতিকাল করেন"। তিনি ময়দার রুটি তথা বিলাসী আহার গ্রহণ করিতেন না, সবচাইতে নিম্ন মানের যে রুটি অর্থাৎ যবের রুটিই খাইতেন। হাদীছে উক্ত হইয়াছে যে, ময়দার রুটি খাওয়া তো দূরের কথা, তিনি তাহা দেখেনও নাই। যবের রুটি তাহাও চালুনিতে ছাঁকিয়া নহে, বরং ফুঁ দিয়া উহার খোসা উড়াইয়া তাহারই মণ্ড তৈরী করত রুটি বানাইয়া খাইতেন।
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ اَنَّهُ قِيلَ لَهُ اَكَلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ النَّقِىَّ يَعْنِى الْحُوَارِىَّ فَقَالَ سَهْلُ مَا رَأَى رَسُولُ اللهِ ﷺ النَّقِىَّ حَتَّى لَقِىَ اللهَ. فَقِيلَ لَهُ هَلْ كَانَتْ لَكُمْ مَنَاخِلُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ ﷺ قَالَ مَا كَانَتْ لَنَا مَنَاخِلَ . قِيلَ كَيْفَ كُنْتُمْ تَصْنَعُونَ بِالشَّعِيرِ . قَالَ كُنَّا نَنْفُخُهُ فَيَطِيرُ مِنْهُ مَا طَارَ ثُمَّ نَثْرِيهِ فَنَعْجِنُهُ .
"সাহল ইবন সা'দ (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হইল, রাসূলুল্লাহ (س) কি কখনও ময়দা খাইয়াছেন? সাহল (রা) বলিলেন, আল্লাহ্র সঙ্গে সাক্ষাৎ করা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (س) ময়দা দেখেন নাই। তাঁহাকে বলা হইল, রাসূলুল্লাহ (س)-এর যুগে আপনাদের চালনি জাতীয় কিছু ছিল কি? তিনি বলিলেন, না, আমাদের চালনি ছিল না। বলা হইল, তাহা হইলে আপনারা যব লইয়া কি করিতেন? তিনি বলিলেন, আমরা তাহাতে ফুঁক দিতাম। ইহাতে যাহা উড়িয়া যাওয়ার উড়িয়া যাইত। ইহার পর পানি ঢালিয়া তাহা মণ্ড করিয়া লইতাম"।
রাসুলুল্লাহ (স) জীবনে কখনও পাতলা রুটি খান নাই এবং টেবিলে বসিয়াও তিনি আহার করেন নাই। যেমন হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
عن انس قال لم يأكل النبي ﷺ على خوان حتى مات وما أكل خبزا مرفقا حتى مات .
"আনাস (রা) বলেন, নবী করীম (স) মৃত্যু পর্যন্ত কখনও টেবিলে আহার করেন নাই। আর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি কখনও পাতলা রুটি আহার করেন নাই"।
হযরত আনাস (রা) হইতে ইমাম তিরমিযী (র) বর্ণনা করেন :
ما اكل رسول الله ﷺ على خوان ولا اكل خبزا مرققا حتى مات .
"রাসূলুল্লাহ (স) মৃত্যু পর্যন্ত টেবিলে রাখিয়া আহার করেন নাই এবং কখনও পাতলা রুটিও আহার করেন না।"
যবের রুটিও আবার সব সময় মিলিত না। ফলে মাসাধিক কাল অতিবাহিত হইয়া যাইত, কিন্তু ঘরে চুলা জ্বলিত না। শুধুমাত্র খেজুর ও পানি দ্বারাই ক্ষুন্নিবৃত্তি করিতে হইত। উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা) বলেন :
ان كنا ال محمد لنمكث شهرا ما نستوقد بنار إن هو الا التمر والماء.
"আমরা মুহাম্মাদ (স)-এর পরিবার কোন মাস এমনভাবেও কাটাইতাম যে, আমরা আগুনও জ্বালাইতাম না। আমরা শুধু খেজুর ও পানি খাইয়াই কাটাইয়া দিতাম"।
ইহার সহিত মাঝেমধ্যে প্রতিবেশীদের নিকট হইতে সামান্য দুধ হাদিয়া আসিলে তাহাই পরিবারের সকলে মিলিয়া পান করিতেন। এই কথাই খুব করুণভাবে হযরত 'আইশা (রা) তাঁহার আদরের ভাগিনেয় ও সুযোগ্য ছাত্র 'উরওয়া ইবনুয যুবায়র (রা)-কে বলিয়াছেন :
عن عروة عن عائشة انها كانت تقول والله يا ابن أختى ان كنا لننظر إلى الهلال ثم الهلال ثم الهلال ثلاثة اهلة فى شهرين وما أقدت في أبيات رسول الله ﷺ نار قال فقلت يا خالة فما كان يعيشكم ؟ قالت الأسودان الماء والتمر الا أنه قد كان لرسول الله ﷺ جيران من الانصار وكانت لهم منائح فكانوا يرسلون الى رسول الله ﷺ من البانها فيسقيناه .
"উরওয়া (র) হযরত 'আইশা (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, 'হে আমার ভগ্নি-পুত্র। আমরা নূতন চাঁদ দেখিতাম, অতঃপর পুনরায় নূতন চাঁদ দেখিতাম, তারপর আবার নূতন চাঁদ দেখিতাম-দুইমাসে তিনবার নূতন চাঁদ দেখিতাম। অথচ রাসূলুল্লাহ (স)-এর ঘরসমূহে আগুন জ্বালানো হইত না। তিনি (উরওয়া) বলেন, আমি বলিলাম, হে খালা! আপনারা কিভাবে দিন যাপন করিতেন? তিনি বলিলেন, দুইটি কালো জিনিস-খেজুর ও পানি দ্বারা। তবে তাঁহার কিছু আনসার প্রতিবেশী ছিল। তাহাদের কিছু দুগ্ধবতী উষ্ট্রী ও বকরী ছিল। তাহারা তাহা দোহন করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পাঠাইতেন। তাহাই তিনি আমাদিগকে পান করাইতেন”।
আবার যখন আহারের সংস্থান হইত, চুলা জ্বলিত, রুটি পাকানো হইত তখনও দুই বেলা পেট পুরিয়া তিনি আহার করেন নাই। হযরত 'আইশা (রা) বলেন:
لقد مات رسول الله ﷺ وما شبع من خبز وزيت في يوم واحد مرتين .
"রাসূলুল্লাহ (স) ইনতিকাল করিলেন অথচ তিনি একদিন দুই বেলা রুটি ও যায়তুন দ্বারা কখনও পরিতৃপ্ত হইয়া আহার করেন নাই”।
أذكر الحال التي فارق عليها رسول الله ﷺ الدنيا . والله ما شبع من خبز ولحم مرتين في يوم .
"রাসূলুল্লাহ (স) যে অবস্থায় দুনিয়া ত্যাগ করিয়া গিয়াছেন তাহা আমার মনে পড়িতেছে। আল্লাহ্র কসম! তিনি দিনে দুই বেলা কখনও রুটি-গোস্ত পেট পুরিয়া খাইতে পারেন নাই”।
কখনও কখনও আহার করার মত কোনও খাদ্যই জুটিত না। ফলে পরিবারসহ সকলেই অনাহারেই কাটাইয়া দিতেন এবং ক্ষুধার তাড়নায় অস্থির থাকিতেন। যেমন সিমাক ইব্ন হারব (র) বলেনঃ
سمعت النعمان بن بشير يخطب قال ذكر عمر ما اصاب الناس من الدنيا فقال لقد رأيت رسول الله ﷺ يظل اليوم يلتوى ما يجد دقلا يملأ به بطنه .
"নু'মান ইব্ন বাশীর (রা)-কে বক্তৃতারত অবস্থায় আমি এই কথা বলিতে শুনিয়াছি যে, 'উমার (রা) বলিয়াছেন, মানুষ কী পরিমাণ দুনিয়া কামাই করিয়াছে! অথচ রাসূলুল্লাহ (স)-কে আমি দেখিয়াছি যে, তিনি ক্ষুধার তাড়নায় সারাদিন অস্থির থাকিতেন। পেটে ভরিবার মত নিম্ন মানের একটি খেজুরও তিনি পাইতেন না”।
কখনওবা তিনি একাধারে রাত্রির পর রাত্রি পরিবারসহ না খাইয়া শুইয়া থাকিতেন এবং অনাহারেই রাত্র কাটাইয়া দিতেন। হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
عن ابن عباس قال كان رسول الله ﷺ يبيت الليالي المتتابعة طاويا واهله لا يجدون عشاء وكان أكثر خبزهم خبز الشعير.
"ইবন 'আব্বাস (را) বলেন, রাসূলুল্লাহ (س) এবং তাঁহার পরিবারের সদস্যগণ পরপর কয়েক রাত্রি ক্ষুধার্ত অবস্থায় কাটাইতেন। তাঁহাদের জন্য রাত্রির আহারের সংস্থান হইত না। অধিকাংশ দিন যবের রুটিই ছিল তাহাদের খাদ্য”।
এমনকি ইনতিকালের সময়ও তিনি সামান্য বব ব্যতীত তেমন কিছু রাখিয়া যান নাই যাহা খাইয়া তাঁহার পরিবারবর্গ জীবন ধারণ করিতে পারেন। উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা) বলেন:
توفى رسول الله ﷺ وما في رفى من شيئ يأكله ذوكبد الا شطر شعير في رف لي فأكلت منه حتى طال على فكلته ففنى .
"রাসूलুল্লাহ (س) দুনিয়া হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়াছেন তখন আমার পাত্রে সামান্য কিছু যব ব্যতীত কোন প্রাণীর আহার করার মত কিছুই ছিল না। তাহা হইতেই আমি আহার করিতাম। এইভাবে অনেক দিন চলিয়া যায়। অতঃপর আমি তাহা ওযন করিলাম, ফলে উহা শেষ হইয়া গেল”।
অনাহারে থাকাটাই তাঁহার নিকট পছন্দনীয় ছিল। তাই রাত্রে অনাহারে থাকিয়াও দিনের বেলা তিনি রোযা রাখিতেন। পৃথিবীর ধনভাণ্ডার, ফল-ফলাদি ও বিত্তবৈভব স্বীয় প্রতিপালকের নিকট চাহিলেই তিনি পাইতেন, কিন্তু তাহা তিনি করেন নাই। এই মর্মে হযরত 'আইশা (রা) হইতে একটি দীর্ঘ হাদীছ কাযী 'আয়ায তাঁহার আশ-শিফা গ্রন্থে উদ্ধৃত করিয়াছেন:
عن عائشة قالت لم يمتلئئ جوف النبي ﷺ شبعا قط ولم يبث شكوى إلى أحد وكانت الفاقة أحب اليه من الغنى وان كان ليظل جائعايلتوى طول ليلته من الجوع فلا يمنعه صيام يومه . ولو شاء سأل ربه جميع كنوز الارض وثمارها ورغد عيشها .. ولقد كنت ابكى له رحمة مما ارى به وامسح بيدى على بطنه مما به من الجوع واقول نفسى لك الفداء لو تبلغت من الدنيا مما يقوتك فيقول يا عائشة مالي وللدنيا ؟ اخواني من اولى العزم من الرسل صبروا على ما هو اشد من هذا فمضوا على حالهم فقدموا على ربهم فاكرم مابهم واجزل ثوابهم فاجدني استحيى ان ترفهت في معيشتي ان يقصربي غدا دونهم وما من شيئ هو احب الى من اللحوق باخواني واخلائي قالت فما أقام بعد لإشهرا حتى توفى ﷺ.
" 'আইশা (রা) বলেন, নবী করীম (س)-এর পেট কখনও পরিতৃপ্ত হইয়া পূর্ণ হয় নাই। কাহারও নিকট তিনি অভিযোগও করেন নাই। ধনাঢ্যতা হইতে অনাহারে থাকাই তাঁহার নিকট পছন্দনীয় ছিল। কখনও তিনি ক্ষুধায় সারারাত্রি কষ্ট করিতেন। কিন্তু ইহা তাঁহাকে দিনের বেলার রোযা রাখা হইতে বিরত রাখিতে পারিত না। তিনি ইচ্ছা করিলে পৃথিবীর সকল ধনভাণ্ডার, ফল-ফলাদি এবং উহার আরাম-আয়েশের সামগ্রী তাঁহার প্রতিপালক হইতে চাহিয়া লইতে পারিতেন। তাঁহার অবস্থা দেখিয়া আমি কাঁদিতাম এবং ক্ষুধার কারণে আমার হাত দ্বারা তাঁহার পেট মর্দন করিয়া দিতাম আর বলিতাম, আপনার জন্য আমার জান কুরবান হউক! আপনি যদি দুনিয়া হইতে আপনার প্রয়োজনমত রিযিক গ্রহণ করিতেন। তিনি বলিতেন, হে 'আইশা। আমার ও দুনিয়ার মধ্যে সম্পর্ক কি? আমার ভ্রাতা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূল্লগণ ইহা হইতেও কঠিন ও কষ্টকর বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করিয়াছেন। অতঃপর তাঁহারা সেই অবস্থায়ই চলিয়া গিয়াছেন। তাঁহারা তাঁহাদের প্রতিপালকের নিকট গমন করিয়াছেন। অতঃপর তিনি তাহাদিগকে সম্মানজনক স্থানে অধিষ্ঠিত করিয়াছেন এবং তাঁহাদিগকে পরিপূর্ণ হাওয়াব দান করিয়াছেন। তাই আমি লজ্জাবোধ করি যে, আমি যদি আমার জীবনধারায় ভোগবিলাস আনয়ন করি তাহা হইলে আগামী দিনে হয়ত বা তাঁহাদের তুলনায় আমার মর্যাদা কমাইয়া দেওয়া হইবে। আমার ভ্রাতা ও বন্ধুবর্গের সহিত মিলিত হওয়ার তুলনায় অধিক পছন্দনীয় আমার নিকট আর কিছুই নাই। 'আইশা (রা) বলেন, ইহার পর তিনি মাত্র একমাস জীবিত ছিলেন, অতঃপর তিনি ইনতিকাল করেন"।
রাসূলুল্লাহ (س) শয়ন করিতেন অত্যন্ত মামুলী ধরনের বিছানায়। তাঁহার বিছানা সম্পর্কে উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা) বলেন:
كان فراش رسول الله ﷺ من آدم وحشوه ليف .
"রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিছানা ছিল চামড়ার। আর উহার ভিতর খেজুর গাছের আশ ভর্তি ছিল”।
কখনও বা একটি চট দুই ভাঁজ করিয়া বিছাইয়া দেওয়া হইত, তাহারই উপর তিনি নিদ্রা যাইতেন। একটু আরামের জন্য একদিন তাহা চার ভাঁজ করিয়া দিলে প্রভাতে উঠিয়াই তিনি এইরূপ করিতে নিষেধ করেন এবং পূর্বের ন্যায় করিতে নির্দেশ দেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা (রা) হইতে এই মর্মে হাদীছ বর্ণিত আছেঃ
سئلت حفصة ما كان فراش رسول الله الله في بيتك قالت مسحا نثنيه ثنتين فينام عليه فلما كان ذات ليلة قلت لو ثنيته اربع ثنيات كان أوطأ له فثنيناه باربع ثنيات فلما اصبح قال ما فرشتموني الليلة ؟ قالت قلنا هو فراشك الا انا ثنيناه باربع ثنيات قلنا اوطأ لك قال ردوه لحاله الاولى فانه منعتنى وطأته صلوتي الليلة .
"হাফসা (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হইল, আপনার গৃহে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিছানা কিরূপ ছিল? তিনি বলিলেন, আমি তাঁহাকে একটি চট দুই ভাঁজ করিয়া বিছাইয়া দিতাম। তিনি উহার উপর নিদ্রা যাইতেন। এক রাত্রে আমি মনে করিলাম, চার ভাঁজ করিয়া বিছাইয়া দিলে উহা নরম হইবে। তাই আমি উহা চার ভাঁজ করিয়াই তাঁহাকে শুইতে দিলাম। পরদিন প্রর্তাতে তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, গত রাত্রে তোমরা আমাকে কিরূপ বিছানা দিয়াছিলে? আমরা বলিলাম, আপনার সেই বিছানা, তবে উহা চার ভাঁজ করিয়া দিয়াছিলাম যাহাতে কিছুটা নরম হয়। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, পূর্বের মতই করিও। কারণ উহার নরম অবস্থা আমার রাত্রের সালাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিয়াছে”।
নিজ হইতে কেহ আরামদায়ক ভাল বিছানা দিলেও তিনি তাহা গ্রহণ করিতেন না। উদ্বুল মু'মিনীন 'আইশা (রা) হইতে এই মর্মে হাদীছ বর্ণিত আছে:
عن عائشة قالت دخلت على امرأة من الانصار فرأت على فراش رسول الله ﷺ قطيفة مثنية فانطلقت فبعثت الى بفراش خشوه الصوف فدخل على رسول الله ﷺ فقال ما هذا يا عائشة فقلت يا رسول الله فلانة الانصارية دخلت على فرات فراشك فذهبت فبعثت الى بهذا فقال ردّيه قالت فلم ارده وقد اعجبني ان يكون في بيتي حتى قال ذالك ثلاث مرات قالت فقال رديه يا عائشة فوالله لو شئت لاجرى الله معى الجبال ذهبا وفضة .
"আইশা (রা) বলেন, এক আনসারী মহিলা আমার নিকট আসিল এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিছানায় একটি ভাঁজ করা মোটা খসখসে চাদর দেখিল। সে বাড়ী ফিরিয়া গিয়া আমার নিকট একটি বিছানা পাঠাইয়া দিল যাহার ভিতরে ছিল পশম। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ (স) আমার নিকট আসিলেন। তিনি বলিলেন, হে 'আইশা! ইহা কি? আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অমুক আনসারী মহিলা আমার নিকট আগমন করিয়াছিল। সে আপনার বিছানা দেখিয়া বাড়ি ফিরিয়া গিয়া আমার নিকট ইহা পাঠাইয়া দিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, উহা ফেরত দাও। 'আইশা (রা) বলেন, কিন্তু আমি তাহা ফেরত দিলাম না। উহা আমার ঘরে থাকুক, আমি তাহাই পছন্দ করিতেছিলাম। তিনবার তিনি ঐরূপ বলিলেন। আইশা (রা) বলেন, অতঃপর তিনি বলিলেন, ইহা ফেরত দাও হে 'আইশা। আল্লাহ্র কসম! তুমি যদি চাও তবে আল্লাহ তা'আলা পর্বতকে স্বর্ণ বানাইয়া আমার সঙ্গে চলিবার ব্যবস্থা করিয়া দিবেন” (আল-মুনযিরী, আত-তারগীব ওয়াত- তারহীব, ৪খ., ২০১-২০২; ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., ৬২)।
খোদ 'আইশা (রা) একটু আরামদায়ক বিছানা তৈরী করিয়া দিলেও তিনি তাহা সরাইয়া ফেলার নির্দেশ দেন:
عن عائشة قالت كان الرسول الله ﷺ فراش رث غلیظ فاردت ان اجعل له فراشا اخر ليكون اوطأ لرسول الله ﷺ فجعلته فقال ما هذا يا عائشة فقلت رأيت فراشك رثا غليظا فاردت ان يكون هذا اوطأ لك فقال آخريه اثنتين والله لا اقعد عليه حتى ترفعيه قال فرفعت الأعلى الذي صنعت .
"আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি শক্ত চাদরের বিছানা ছিল। আমি তাঁহাকে আর একটি বিছানা বানাইয়া দিতে ইচ্ছা করিলাম যাহাতে তাহা রাসূলুল্লাহ (س)-এর জন্য একটু আরামদায়ক হয়। অতএব আমি তাহাই করিলাম। তিনি বলিলেন, হে 'আইশা। ইহা কি? আমি বলিলাম, আমি আপনার শক্ত বিছানা দেখিয়া মনে করিলাম, আপনার জন্য একটু নরম বিছানা হউক। তিনি বলিলেন, উহা সরাইয়া দাও। আল্লাহর কসম! তুমি উহা না উঠানো পর্যন্ত আমি উহাতে বসিব না। রাবী বলেন, তিনি উপর হইতে সে বিছানা উঠাইয়া ফেলিলেন যাহা তিনি বানাইয়াছিলেন”।
একটি রাষ্ট্রের অধিনায়ক হইয়াও তিনি কখনওবা শুধু চাটাইয়ের উপর শুইয়া থাকিতেন, যাহার দাগ পড়িয়া যাইত তাঁহার শরীর মুবারকে যাহা দেখিয়া 'উমার (রা)-এর ন্যায় একজন কঠোর হৃদয়ের সাহাবীও তাঁহার অশ্রু সংবরণ করিতে পারেন নাই। একটি দীর্ঘ হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলেন:
فدخلت على رسول الله ﷺ وهو مضطجع على حصير فجلست فادنی علیه آزاره وليس عليه غيره واذا الحصير قد اثر في جنبه فنظرت ببصری خزانة رسول الله ﷺ فاذا انا بقبضة من شعير نحو الصاع ومثلها قرظا في ناحية الغرفة واذا افيق معلق قال فابتدرت عيناي قال ما يبكيك يا ابن الخطاب قلت يا نبي الله وما لي لا ابكي وهذا الحصير قد اثر في جنبك وهذه خزانتك لا ارى فيها الا ما ارنى وذك كسرى وقيصر في الثمار والانهار وانت نبي الله وصفواته وهذه خزانتك قال يا ابن الخطاب الاترضى ان تكون لنا الآخرة ولهم الدنيا قلت بلى .
"অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রবেশ করিলাম। তখন তিনি একটি চাটাইয়ের উপর কাত হইয়া শোয়া ছিলেন। আমি সেখানে বসিয়া পড়িলাম। তিনি তাঁহার পরনের চাদরখানি তাঁহার শরীরের উপরের দিকে টানিয়া দিলেন। তখন ইহা ছাড়া তাঁহার পরনে অন্য কোন কাপড় ছিল না। তাঁহার বাহুতে চাটাইয়ের দাগ বসিয়া গিয়াছিল। আমি স্বচক্ষে রাসূলুল্লাহ (س)-এর সামানপত্রের দিকে তাকাইলাম। আমি সেইখানে একটি পাত্রে এক সা'-এর কাছাকাছি কয়েক মুষ্টি যব দেখিতে পাইলাম। অনুরূপ সালাম বৃক্ষের কিছু পাতা কামরার এক কোণায় পড়িয়া থাকিতে দেখিলাম। আরও দেখিতে পাইলাম, ঝুলন্ত একখানি চামড়া যাহা পাকা করা হয় নাই। উমার (রা) বলেন, এইসব দেখিয়া আমার চক্ষু অশ্রুসিক্ত হইয়া গেল। তিনি বলিলেন, হে খাত্তাবের পুত্র! কিসে তোমার কান্না পাইয়াছে? আমি বলিলাম, হে আল্লাহ্ নবী! আমি কেন কাঁদিব না! এই যে চাটাই আপনার শরীরে দাগ কাটিয়া দিয়াছে। আর এই হইল আপনার কোষাগার। এখানে সামান্য কিছু যাহা দেখিলাম তাহা ছাড়া তো আর কিছুই নাই। পক্ষান্তরে ঐ যে রোম ও পারস্যের বাদশাহগণ কত বিলাস-ব্যসনে ফলমূল ও ঝরনায় পরিবেষ্টিত হইয়া আড়ম্বরপূর্ণ জীবন যাপন করিতেছে। আর আপনি আল্লাহ্র রাসূল (স) ও প্রশংসনীয় হইয়াও আপনার গৃহের আসবাবপত্রের এই দুরবস্থা? তিনি ইরশাদ করিলেন, হে ইবনুল খাত্তাব! তোমার কি ইহা পছন্দ নহে যে, আমাদের জন্য রহিয়াছে আখিরাত আর তাহাদের জন্য দুনিয়া? আমি বলিলাম, নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট”।
অপর একটি বর্ণনা মতে তিনি হযরত উমর (রা)-কে বলিলেন-
مالي وللدنيا يا عمر انما انا فيها كراكب استظل تحت شجرة ثم راح وتركها .
"হে উমার! দুনিয়ার সাথে আমার কি সম্পর্ক? দুনিয়াতে আমি তো একজন পথিকের ন্যায় যে কোন গাছের ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণ করে, অতঃপর তাহা ত্যাগ করিয়া চলিয়া যায়”।
অতএব রাসূলুল্লাহ (স)-এর শয্যা ছিল খুবই সাধারণ। চাটাই-এর উপর শয়ন করিতেন। শয্যা ত্যাগ করিলে দেখা যাইত যে, শরীরে ইহার দাগ পড়িয়া গিয়াছে। বর্ণিত হইয়াছে:
عن عبد الله بن مسعود قال نام رسول الله ﷺ على حصیر فقام وقد اثر في جنبه .
"হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) একটি চাটাই-এর উপর ঘুমাইলেন। তিনি শয্যা ত্যাগ করিতেন, দেখা যাইত যে শরীরের পার্শ্বদেশে চাটাইয়ের দাগ পড়িয়া গিয়াছে”।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিছানাটি ছিল চামড়ার তৈরী যাহার ভিতরে ছিল খেজুর গাছের আঁশ। যেমন বর্ণিত হইয়াছে:
عن عائشة قالت كان فراش رسول الله ﷺ آدم حشوه ليف .
"হযরত 'আইশা (রা) বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিছানা ছিল চামড়ার তৈরী। ইহার ভিতরে ছিল খেজুর গাছের আঁশ”।
রাসূলুল্লাহ (স) বিশ্ববাসীর জন্য সরলতা ও অনাড়ম্বরতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়া গিয়াছেন। তাঁহার মহান জীবনাদর্শ ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রত্যেকের অনুসরণ করা একান্ত প্রয়োজন। কেবল তিনি নিজেই সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন না, তাঁহার পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজনসহ সাহাবা-ই কিরামদিগকেও তিনি সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনে অনুপ্রাণিত করিয়াছিলেন। সেইজন্যই তো তাঁহারা সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপনের পরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছিলেন।
ইতিহাস পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, নিজের বেলায় অনাড়ম্বর জীবনাভ্যস্ত হইয়া সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম-আয়েশসহ পৃথিবীর যাবতীয় বাহুল্য পরিত্যাগ করা যত সহজ, নিজ পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততিদিগকেও অনুরূপ স্বভাবাদর্শে গড়িয়া তোলা তত সহজ নয়। তবে এই ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (স)-এর পরিবার-পরিজন ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তাঁহাদের প্রত্যেকেই ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর মহান জীবনাদর্শে অনুপ্রাণিত। উত্তম আহার, জাকজমকপূর্ণ পোশাক, অঢেল প্রাচুর্য ও লোভ-লালসা কখনও তাহাদের মনকে প্রলুব্ধ করিতে পারে নাই; বরং তাহারা অনাড়ম্বর জীবনাদর্শকে অবনত মস্তকে গ্রহণ করিয়া আল্লাহ্র সন্তোষ লাভের পথে অগ্রসর হইয়াছেন।