📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর মধ্যমপন্থা অবলম্বন
মানুষের আচার-আচরণ, কার্যকলাপ, ইবাদত-বন্দেগী সকল কিছুতেই মধ্যমপন্থা উত্তম। মধ্যমপন্থা অবলম্বনের জন্য ইসলাম জোর তাকিদ দেয়। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মধ্যমপন্থা অবলম্বন করার অপূর্ব নজীর স্থাপন করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, মধ্যমপন্থা সকল ক্ষেত্রেই উত্তম। তিনি ছিলেন সকলের জন্যই সর্ববিষয়ে উত্তম আর্দশ। একজন সাধারণ মানুষের মত মধ্যম ধরনের জীবন যাত্রায় তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। আর অনুরূপ জীবনাদর্শ অনুকরণ করার তাকিদ দিতেন তাঁহার সাহাবীগণকে। হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত, মহানবী (স) বলিয়াছেন, "কাজ-কর্মের উত্তম পদ্ধতি, শালীন আচার-আচরণ আর মধ্যম পন্থার সমন্বয়ে গড়িয়া উঠে নবুওয়তের এক চতুর্থাংশ (আফযালুর রহমান, হযরত মুহাম্মদ (স) জীবনী বিশ্বকোষ, বাংলা, ১খ., পৃ. ৩১১)। হজরত লুকমান (আ) তদীয় সন্তানকে দৈনন্দিন জীবন-যাপন সম্পর্কে বিভিন্ন উপদেশ দান করিয়াছিলেন। এই প্রসঙ্গে আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে,
وَاقْصِدْ فِي مَشْيِكَ - "তুমি সংযতভাবে বিচরণ করিও” (৩১ঃ১৯)।
অর্থাৎ তুমি এমন দাপটের সহিত চলিবে না যাহাতে মনে হইবে তুমি একজন অহংকারী ব্যক্তি। আবার এমন চঞ্চল ভাবে পদচারণা করিবে না যাহাতে মনে হইবে তুমি একজন চপল ব্যক্তি; বরং তুমি এমন সংযম অবলম্বন করিবে যাহাতে ধারণা করা হইবে তুমি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন নিরহংকার ব্যক্তি। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, "চঞ্চল পদচারণা বিশ্বাসীদের জন্য মর্যাদা হানিকর (কাযী ছানাউল্লাহ্ পানিপথি, তাফসীরে মাযহারী, ৭খ., পৃ. ২৫৯)।
ইবন সা'দের বর্ণনায় আসিয়াছে, হযরত ইয়াযীদ ইব্ন মারছাদ বর্ণনা করিয়াছেন, "রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্বাভাবিক পদচারণাও আমাদের নিকট মনে হইত দ্রুততর।” হযরত আবূ মূসা আশ'আরী (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, "পদ বিক্ষেপ সংযত করিও। চলাচলে মধ্যম গতি বজায় রাখিও” (প্রাগুক্ত)।
ধনসম্পদ ব্যয় করার ক্ষেত্রেও তিনি তাঁহার সাহাবীদিগকে সাধ্যানুসারে ব্যয় করার পরামর্শ দান করিয়াছেন এবং নিষেধ করিয়াছেন অমিতব্যয়ী অথবা ব্যয়কুণ্ঠ হইতে। বস্তুতপক্ষে তিনি মানব জাতিকে সীমাতিরিক্ত ব্যয়, পক্ষান্তরে ব্যয় কুণ্ঠ হওয়ার মত দুইটি ঘৃণ্য অভ্যাসের মধ্যে সর্বদা মধ্যমপন্থা অবলম্বনের নীতি শিক্ষা দিয়াছেন। হযরত উমর (রা) বর্ণনা করিয়াছেন,
রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, "খরচে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা একজনের অর্ধেক জীবিকার সমতুল্য। সাধারণ খরচাদি এমনকি পরহিতকর কাজের বেলায়ও অমিতব্যয়ী অথবা কার্পণ্য করিতে তিনি নিষেধ করিয়াছেন। আর এই শ্রেণীর লোকদের সাধুবাদ দেওয়া হইয়াছে পবিত্র কুরআনে। উল্লেখ হইয়াছে:
وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا .
“এবং যখন তাহারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না, কার্পণ্যও করে না বরং তাহারা আছে এতদুভয়ের মাঝে মধ্যমপন্থায়" (২৫:৬৭)।
রাসূলুল্লাহ (স) পানাহার, লেবাস-পোশাক, ইবাদত-বন্দেগী হইতে শুরু করিয়া জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মধ্যপন্থার নীতি অবলম্বন করিয়াছিলেন। মহানবী (স)-এর কিছু সংখ্যক সাহাবী চরম কৃচ্ছতার জীবন যাপন ও সর্বপ্রকার পার্থিব আরাম-আয়েশ পরিহার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মহানবী (স) তাঁহাদের এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারটা জানিতে পারিলেন। তিনি তাঁহাদিগকে ডাকিয়া বলিলেন, "তোমরা ঐরূপ করিও না; বরং তোমরা কখনও রোযা রাখ, কখনও পানাহার কর। রাতের বেলা কখনও ঘুমাও কখনও ইবাদত কর। কারণ তোমার উপর তোমার শরীরেরও একটি অধিকার আছে। না ঘুমাইলে তোমাদের শরীর দুর্বল হইয়া পড়িবে। এতদ্ব্যতীত স্ত্রী-পরিবার, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজনেরও একটি হক আছে। জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ ও তৃপ্তিকে পরিহার করা, সারাক্ষণ রোযা, সালাত, যিকর-আযকারে লিপ্ত থাকাকে তিনি নিষিদ্ধ বলিয়া ঘোষণা দিয়াছেন। তিনি মুসলমানদিগকে একজন সাধারণ মানুষের মত জীবন যাপনের পরামর্শ দান করিয়াছেন।
একদা হযরত আবূ হুরায়রা (রা) রাসূলুল্লাহ (স) সমীপে উপস্থিত হইয়া নিবেদন জানাইলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! আমি একজন নবীন যুবক। বিবাহ করিবার সামর্থ্য নাই। আবার প্রবৃত্তির দিক হইতেও আমি সম্পূর্ণ নিরাপদ নই। রাসূলুল্লাহ (স) নিশ্চুপ রহিলেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা) পুনরায় একই নিবেদন পেশ করিলেন। এবারেও তিনি নিশ্চুপ। অতঃপর হযরত আবূ হুরায়রা (রা) তৃতীয়বার একই আরয পেশ করিলে তিনি বলিলেন, "তোমার নিয়তি কার্যকর হইবেই। আল্লাহর বিধান টলিতে পারে না (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৭৫৯)। বাহিলা গ্রোত্রের জনৈক ব্যক্তি মহানবী (স)-এর সান্নিধ্যে উপস্থিত হইয়া স্বীয় প্রয়োজন সমাধা পূর্বক নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন। এক বৎসর পর তিনি পুনরায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইলেন, কিন্তু সেই সময় তাঁহার আকার-আকৃতি এমনই পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে চিনিতে পারিতেছিলেন না। তিনি স্বীয় পরিচয় প্রদান করিলে রাসূলুল্লাহ (স) বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি ত খুবই সুন্দর ছিলে। ইতোমধ্যে তোমার স্বাস্থ্য এমন পরিবর্তিত হইল কেন? তিনি আরয করিলেন, আমি- আপনার নিকট হইতে বিদায় লওয়ার পর হইতে বিরতীহীন রোযা রাখিতে শুরু করিয়াছিলাম। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, তুমি এইভাবে নিজেকে শাস্তি দিতেছ কেন? মনে রাখিও, রমযান মাস ব্যতীত প্রতিমাসে একদিন রোযা রাখাই তোমার জন্য যথেষ্ট। তিনি বলিলেন, ইহা অপেক্ষা অধিক রোযা রাখিবার সামর্থ্য আমার
আছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আরও একদিন যোগ করিয়া লও। তিনি আরও অধিক বাড়াইবার জন্য আবেদন করিলেন। মহানবী (স) তিন দিনের অনুমতি প্রদান করিলেন। ইহাতেও তিনি সন্তুষ্ট হওয়াতে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে হারাম চারি মাসের (যিলকদ, যিলহাজ্জ, মুহাররম, রজব) রোযা রাখার অনুমতি প্রদান করিলেন (সুলাইমান ইব্ন আশ'আছ, সুনানে আবু দাউদ, পৃ. ২২২)।
হযরত আনাস ইবন মালিক বলেন, একদা তিন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইবাদত-বন্দেগীর প্রকৃতি জানার জন্য উম্মাহাতুল মু'মিনীনদের নিকট উপস্থিত হইল। তাহারা তাঁহার ইবাদতের প্রকৃতি সম্পর্কে জানিতে চাহিলে তাহাদিগকে উহা জানানো হইল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইবাদত-বন্দেগী তাহাদের নিকট অপ্রতুল মনে হইল। তাহারা বলিতে নাগিল, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত আমাদের কি কোন তুলনা হইতে পারে? আল্লাহ পাক তাঁহার পূর্বাপর যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি মার্জনা করিয়া দিয়াছেন। তাহাদের মধ্য হইতে একজন বলিল, আমি রাতভর সালাত আদায় করিব। অপর একজন বলিল, আমি জীবনভর বিরতীহীন রোযা রাখিব। অপর জন বলিল, আমি জীবনে বিবাহই করিব না। ইত্যবসরে সেখানে মহানবী (س)-এর শুভাগমন ঘটিল। তিনি বলিলেন, তোমরা এই ধরনের কথাবার্তা বলিতেছিলে, তাই না? তিনি আরও বলিলেন, আল্লাহর শপথ, আমি তোমাদের অপেক্ষা আল্লাহকে অধিক ভয় করি, সমীহও করি। তবু আমি রোযাও রাখি, পানাহারও করি। সালাত আদায় করি, আবার নিদ্রাও যাই। বিবাহও করিয়াছি। তবে যে আমার সুন্নত অনুসরণ করে না, সে আমার দলভুক্ত নহে (মুহাম্মদ ইব্ন ইসমাঈল, আস্-সাহীহ, ২খ., পৃ. ৭৫৭; ইবন সা'দ, আত্-তাবাকাতুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৩৭২)।
তাবুক যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তন পথে একজন সাহাবী একটি কূপের সন্ধান পাইলেন। কূপে প্রচুর পানি। ছায়াঘন নিরিবিলি জায়গা। আশেপাশে কতকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পল্লী। মনোরম পরিবেশ। এক সাহাবী রাসূলূল্লাহ (س)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া নিবেদন জানাইলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! আমি একটি কূপের সন্ধান লাভ করিয়াছি। সেখানে প্রয়োজনীয় পানি বিদ্যমান আছে বলিয়া আমার ধারণা। সদয় অনুমতি পাইলে সেখানে আমি একাকী জীবন যাপন করি। এই অভিশপ্ত দুনিয়ার সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া দেই। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "আমি ইয়াহুদীবাদ ও খৃস্টবাদ লইয়া আবির্ভূত হই নাই। আমি লইয়া আসিয়াছি সহজতর আরামপ্রদ মাযহাবে ইবরাহীমী (আল্লামা শিবলী নু'মানী ও সুলাইমান নদভী, সীরাতুন-নবী, ২খ., পৃ. ১৯৭)। দান দক্ষিণা, পরহিতকর কাজে যদিও তিনি অমিতব্যয়ী অথবা কাপণ্য নিষেধ করিতেন, কিন্তু স্বভাবগত ভাবে দানের বেলায় তিনি ছিলেন মুক্ত হস্ত। তাঁহার নিকট যাহা কিছুই থাকিত অম্লান বদনে তাহাই তিনি বিলাইয়া দিতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা)-এর উদ্ধৃতিতে ইব্ন মারদুবিয়া বলেন, একদা এক যুবক মহানবী (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া আরয জানাইলেন, আমার আম্মা আপনার নিকট হইতে কিছু খাদ্য, বস্ত্র ও নগদ অর্থ চাহিয়া পাঠাইয়াছেন। তিনি বলিলেন, এখন তো আমার নিকট কিছুই নাই। যুবকটি বলিলেন, আমার আম্মা বলিয়াছেন, আপনার নিকট দিবার মত কিছু না থাকিলে যেন আপনি আপনার পরিধেয় জামাটি খুলিয়া দেন। মহানবী (স) তৎক্ষণাত তাঁহার জামাটি খুলিয়া দিলেন। অতঃপর গৃহাঙ্গণে প্রবেশ করিলেন অনাবৃত দেহে। আর ঠিক তখনই ওহী অবতীর্ণ হয়,
وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَى عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطُهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُوْمًا مَّحْسُوْرًا.
"তুমি তোমার হস্ত তোমার গ্রীবায় আবদ্ধ করিয়া রাখিও না এবং উহা সম্পূর্ণ প্রসারিতও করিও না। তাহা হইলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হইয়া যাইবে" (১৭: ২৯)।
অর্থাৎ হে আমার রাসূল! আপনি কৃপণ অথবা অমিতব্যয়ী কোনটাই হইবেন না। চলিবেন এতদুভয়ের মাঝপথে। এই রকম সুসমঞ্জস্য মধ্যমপন্থাই প্রশংসনীয় ও শোভন। কার্পণ্য ও অমিতব্যয়ী মানুষকে যেমন নিন্দিত করে, তেমনই নিঃস্ব করিয়া দেয় (কাযী ছানাউল্লাহ পানিপথি, তাফসীরে মাযহারী, ৫খ., পৃ. ৪৩৫)।
এমন আরও একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় উক্ত তাফসীরে। ইব্ন আবী হাতিম বর্ণনা করিয়াছেন, হযরত আবু উসামা বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) একবার উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা)-কে লক্ষ করিয়া বলিলেন, 'আইশা! যাহা কিছু পাও সঙ্গে সঙ্গে খরচ করিয়া ফেলিও। 'আইশা (রা) আরয করিলেন, তবে তো আমরা একেবারে নিঃস্ব হইয়া পড়িব। তাঁহাদের ঈদৃশ কথোপকথনের প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয় আলোচ্য আয়াত (প্রাগুক্ত)।
লক্ষ্য করা যায়, অনেক মহাপুরুষ অতি মাত্রায় আগাইয়া যান, কৃচ্ছ সাধনার কষ্টকর পথ অবলম্বন করেন। কিন্তু মহানবী (স)-এর জীবনে এমনটি ঘটে নাই কখনও। এই জগতে মানবের কল্যাণময় জীবনের উত্থানের পথে সকল কিছুরই সমন্বয় সাধন করিয়া গিয়াছেন তিনি।
তিনি ছিলেন একজন পরিপূর্ণ সংসারী মানুষ যিনি পরিবার লইয়া জীবন যাপন করিয়াছেন, আস্বাদন করিয়াছেন সংসারের পরিপূর্ণ স্বাদ।
মধ্যমপন্থা অবলম্বন করার তাকিদে তিনি আরও বলিয়াছেন, “তোমার সাধ্যে যাহা কুলায় তাহারই বোঝা উত্তোলন কর” (ওয়ালীউদ্দীন ইব্ন আবদুল্লাহ, মিশকাতুল মাসাবীহ্, পৃ. ১১০)। এখানে যাহা বলিতে ফরয, ওয়াজিব, সুন্নত, নফল ইত্যাদি সকল ধরনের ইবাদত অনুষ্ঠানকে বুঝানো হইয়াছে (ইবন হাজার আল-আসকালানী, ফাতহুল-বারী, ১১খ., পৃ. ২৫১)।
হযরত হুযায়ফা (রা) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, প্রাচুর্যের মধ্যে মধ্যমপন্থা কত উত্তম, দারিদ্র্যের মধ্যে মধ্যমপন্থা কত উৎকৃষ্ট এবং ইবাদতের বেলায় মধ্যমপন্থা কত উপাদেয় (আলাউদ্দীন আলী ইব্ন হুসসামুদ্দীন, কানযুল-উম্মাল, ২খ., পৃ. ৭)। অর্থাৎ এখন বিত্তশালী হওয়া যাইবে না যাহাতে নামিয়া আসিবে আল্লাহ বিরোধী ও খোদা বিমুখতার অভিশাপ। পক্ষান্তরে দারিদ্র্যের কষাঘাতে নিষ্পেষিত হইলে পরিণতিতে সে হইবে অসহায়, বঞ্চিত হইবে সত্য হইতে।
ইবাদত-বন্দেগীতে সীমাতিক্রম করা যাইবে না। যেমন উল্লেখ হইয়াছে হযরত উছমান ইব্ন মাযউনের বর্ণনায়। তিনি সালাতের মধ্য দিয়ে বিনিদ্র রজনী কাটাইতেন। বিষয়টি মহানবী (স)-এর গোচরীভূত হইলে তিনি তাঁহাকে এই ধরনের ইবাদত করিতে নিষেধ করেন। মধ্যমপন্থা অবলম্বনের জন্য তাকিদ দেন। তিনি আরও বলেন, "তোমার দায়িত্বে আরও কিছু করার আছে।” আল্লামা শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নদভী, সীরাতুন্-নবী, ৬খ., পৃ. ৫৩০)।
প্রাচীন ধর্মমতগুলি বিশ্ববাসীকে দ্বিধাবিভক্ত করিয়াছে। একটি সংসার বিরাগী গীর্জা জীবন, অপরটি পরিপূর্ণ সংসারী পার্থিব জীবন। দীন ও দুনিয়ার মধ্যে রচনা করিয়াছিল দুস্তর ব্যবধান। এই দুইটি দল জগদ্বাসীর মধ্যে সৃষ্টি করিয়াছিল অলংঘণীয় অন্তরাল তথা দুর্ভেদ্য প্রাচীর। একদলের ধারণা, গীর্জা জীবনই একমাত্র সফল জীবন। অপর দলের ধারণা সম্পদ আহরণই একমাত্র কামিয়াবী। উভয় দলের মধ্যে বিদ্যমান ছিল রক্তারক্তি, হানাহানির সম্পর্ক। ঠিক সেই নাযুক মুহূর্তেই আবির্ভূত হইয়াছিলেন দীন-দুনিয়ার মধ্যে সমন্বয়কারী মহাপুরুষ মহানবী হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)।
📄 ছিদ্রান্বেষণ ও পরনিন্দা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا .
"হে মু'মিনগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান হইতে দূরে থাক। অনুমান কোন কোন ক্ষেত্রে পাপ এবং তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করিও না এবং একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা করিও না” (৪৯:১২)।
আলোচ্য আয়াতে এই কথাটির দ্বারা কাহারও অনুপস্থিতিতে তাহার দোষ চর্চা করা নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। অপরের দোষ চর্চা করা একটি মন্দ স্বভাব। ইহা পরিবারে ও সমাজে সৃষ্টি করে চরম বিশৃঙ্খলা যাহার বিষময় ফলে বিপন্ন হয় বহু পরিবার। সমাজে ঝগড়া, ফাসাদ, কোন্দলের সৃষ্টি হয়। ইহা হত্যা অপেক্ষা গুরুতর অপরাধ। পরনিন্দার জঘন্যতম ব্যাধিতে আক্রান্ত হইয়া অতীতে অনেক জাতি দুর্দশাগ্রস্ত হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর পুণ্যময় স্বভাবে পরনিন্দার প্রাদুর্ভাব অচিন্ত্যনীয়। পরন্তু তিনি আজীবন পরনিন্দার নিন্দা জ্ঞাপন করিয়াছেন।
হযরত আবূ হুরায়রাহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) একবার আমাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি জানো, পরচর্চা কি? আমরা বলিলাম, আল্লাহপাক ও তাঁহার রাসূল উত্তম জানেন। তিনি এরশাদ করিলেন, তোমাদের কোন ভ্রাতার অনুপস্থিতিতে তাহার অপসন্দনীয় কিছু বলার নামই পরচর্চা। আমি বলিলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল (স)! যদি বাস্তবেও ঐ দোষটি তাহার মধ্যে থাকিয়া থাকে, তবুও? তিনি বলিলেন, হ্যাঁ, তবুও। আর তাহার মধ্যে যদি বাস্তবে দোষটি না থাকিয়া থাকে তাহা হইলে তুমি তাহাকে অপবাদ দিলে (কাযী ছানাউল্লাহ্ পানিপথি, তাফসীরে মাযহারী, ৯খ., পৃ. ৫৫;, সুলায়মান ইব্ন আশ'আছ, সুনানে আবূ দাউদ, ৪খ., পৃ. ২৬৯)।
হযরত আনাস ইব্ন মালিক বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, মি'রাজ রজনীতে পরিভ্রমণের সময় আমি একস্থানে একদল লোককে দেখিলাম। তাহাদের হাতের নখগুলি ছিল তাম্রনির্মিত। ঐ নখগুলি দ্বারা তাহারা স্বীয় মুখমণ্ডল ও দেহের গোশতগুলি টানিয়া টানিয়া ছিড়িতেছিল। আমি জিবরাঈলকে জিজ্ঞাসা করিলাম, ইহারা কাহারা? তিনি বলিলেন, ইহারা ঐ সকল লোক যাহারা পৃথিবীতে তাহাদের মৃত ভ্রাতার গোশত ভক্ষণ করিত, মানুষের অসাক্ষাতে তাহাদের দোষ বর্ণনা করিয়া তাহাদের সম্মানহানী করিত (সুলায়মান ইব্ন আশ'আছ, সুনানে আবু দাউদ, ৪খ., পৃ. ২৭০)।
উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা) বলেন, একদা আমি আমার সতীন সাফিয়্যা সম্পর্কে বলিয়াছিলাম- সেতো 'এইরকম' অর্থাৎ বেঁটে। এই উক্তি শ্রবণ করা মাত্র রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমিতো গীবত করিলে। তোমার এই কথা যদি সাগরের পানিতে মিশ্রিত করা হয়, তবে সাগরের পানিও তিক্ত হইয়া যাইবে (সুলায়মান ইব্ন আশ'আছ, সুনানে আবু দাউদ, ৪খ., পৃ. ২৬৯)।
হযরত আবূ সাঈদ খুদরী ও হযরত জাবির (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) একবার বলিলেন, গীবত ব্যাভিচার অপেক্ষাও ঘৃণ্য। উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ আরয করিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (س)! ব্যাভিচার অপেক্ষা গীবত গুরুতর কিভাবে? তিনি বলিলেন, কোন ব্যক্তি ব্যভিচার করার পর তওবা করিলে আল্লাহ মার্জনা করিয়া দেন। পক্ষান্তরে পরচর্চাকারী তওবা করিলেও আল্লাহ মার্জনা করিয়া দেন না যতক্ষণ না যাহার দোষ চর্চা করিয়াছে সে মার্জনা করিয়া দেয় (কাযী ছানাউল্লাহ পানিপথি, তাফসীরে মাযহারী, ৯খ., পৃ. ৫৬)।
হাম্মাম ইবন হারিছ বর্ণনা করেন, একদা আমরা হযরত হুযায়ফা (রা)-র সঙ্গে ছিলাম। তাঁহার নিকট এক ব্যক্তির নামে অভিযোগ পেশ করা হইল যে, লোকটি খলীফা হযরত উছমান (রা)-এর নিকট লোকদের নামে দূর্নাম রটাইত। তখন হুযায়ফা বলেন, আমি মহানবী (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি, “পরচর্চাকারী জান্নাতে প্রবেশ করিবে না” (মুহাম্মাদ ইব্ন্ন ইসমাঈল, আস্-সাহীহ, ২খ., পৃ. ৮৯৫)।
হযরত ইব্ন আব্বাস (را) বলেন, একদা মহানবী (স) দুইটি কবরের মাঝখান দিয়া যাইতেছিলেন। তিনি বলিলেন, কবর দুইটির অধিবাসী বিপদে আছে। তবে তেমন কিছু গুরুতর অপরাধের কারণে নহে বরং তাহাদের একজন প্রস্রাব করার পর যথাযথ পবিত্রতা অর্জন করিত না, অপর জন পরনিন্দা করিয়া বেড়াইত (মুহাম্মদ ইব্ন ইসমাঈল, আস্-সাহীহ, ২খ., পৃ. ৮৯)।
হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) মদীনা নগরীর কোন প্রাচীরের পাশ দিয়া গমন করিতেছিলেন। সেখানে তিনি কবরের মধ্যে দুইজন মৃতের শাস্তি কবলিত হওয়ার শব্দ শুনিতে পান। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, কবরের অধিবাসী দুইজন চরম শাস্তি কবলিত। বৃহৎ কোন অপরাধের কারণে তাহারা শাস্তিগ্রস্ত নহে বরং তাহাদের একজন প্রস্রাবের অপবিত্রতা হইতে নিরাশঙ্ক থাকিত আর অপরজন পরনিন্দা করিয়া বেড়াইত। অতঃপর মহানবী (স) একটি অথবা দুইটি বৃক্ষ শাখা সংগ্রহ করিলেন এবং তাহা দুই টুকরা করিয়া দুইটি কবরে পুঁতিয়া দিলেন। অতঃপর বলিলেন, সম্ভবত এই বৃক্ষশাখাগুলি না শুকানো পর্যন্ত দুইটিতে শাস্তি কিছুটা লঘুতর হইবে (মুহাম্মাদ ইব্ন ইসমাঈল, আস্-সাহীহ্, ২খ., পৃ. ৮৯৫)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, তোমরা কুধারণা পরিত্যাগ করিয়া চলিবে। কেননা কুধারণা অতিরঞ্জন। কাহারও দোষ অন্বেষণে ব্যাপৃত
হইওনা। একে অপরকে ঘৃণা করিও না। পরস্পরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করিও না। একে অপরের প্রতি বিমুখ হইও না। সকলেই আল্লাহর বান্দা, পরস্পর ভাই ভাই হইয়া যাও। একজনের বিবাহের প্রস্তাবের উপর আর একজন প্রস্তাব দিবে না। তাহার প্রস্তাব গৃহীত হইতে পারে, আবার প্রত্যাখ্যাতও হইতে পারে। হাদীছটি ইমাম মালিক, আহমদ, ইব্ন মাজা, আবু দাউদ ও তিরমিযী কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে (কাযী ছানাউল্লাহ পানিপথি, তাফসীরে মাযহারী, ৯খ., পৃ. ৫৫)।
হযরত ইবন উমার (রা) কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে, মহানবী (স) ইরশাদ করিয়াছেন, হে কপটাচারিগণ! যাহারা শুধু মুখে ঈমানের কথা উচ্চারণ করিয়াছে, এখনও যাহাদের অন্তঃকরণে ঈমান প্রবিষ্ট হয় নাই তাহারা উত্তমরূপে শুনিয়া রাখ, মুসলমানদের গীবত করিও না। তাহাদের গোপন বিষয় অনুসন্ধানে লিপ্ত হইওনা। যে ব্যক্তি অপরের গোপন বিষয় প্রকাশ করিতে চাহিবে, আল্লাহ তাহার গোপন বিষয় প্রকাশ করিয়া দিবেন, অতঃপর তাহাকে লাঞ্ছিত করিবেন (প্রাগুক্ত)।
হযরত মু'আষ ইব্ন জাবাল (রা) হইতে হযরত খালিদ ইব্ন মা'দান বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, যে ব্যক্তি তাহার ভ্রাতার এমন পাপের কথা প্রকাশ করত তাহাকে লাঞ্ছিত করে যাহা হইতে সে তওবা করিয়াছে, ঐ ব্যক্তিও তাহার মৃত্যুর পূর্বে ঐ রকম পাপে জড়িত হইয়া পড়ে (প্রাগুক্ত)।
উপরিউক্ত আলোচনা হইতে এই কথা প্রতীয়মান হয় যে, মহানবী (স) পরনিন্দা বা অপরের ছিদ্রান্বেষণ সম্পর্কে কঠোর ভাবে নিষেধ করিয়াছেন।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর সরল ও অনাড়ম্বর জীবনাচার
রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত। কথাবার্তা, চালচলন, আচার-আচরণ, আহার-বিহার, পোশাক-পরিচ্ছদসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনাড়ম্বর জীবন যাপনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনের সকল স্তরে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর মহান জীবনাদর্শই অনুসরণীয়। মহানবী (স)-এর জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগ ছিল এই সকল সদগুণে পরিপূর্ণ। তাঁহার মহান চরিত্র ছিল সকল অবস্থায় অনুপম আদর্শ, দোষ-ত্রুটির লেশমাত্রও উহাকে স্পর্শ করে নাই। আল্লাহ তা'আলা আল-কুরআনে ইরশাদ করিয়াছেন:
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى أَنَّمَا الْهُكُمْ إِلهُ وَاحِدُ .
"বল, আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষই। তবে পার্থক্য এইটুক, আমার প্রতি ওহী হয় যে, তোমাদের ইলাহ একমাত্র ইলাহ” (১৮:১১০, ৪১:৬)।
যে তোমাদের আল্লাহ রব্বুল আলামীন বুঝাইতে চাহিয়াছেন যে, নবীগণও মানুষ ছিলেন, সমাজের আর দশজন মানুষের মত রক্ত-মাংসে গড়া। তোমাদের মত মানবীয় স্বভাব-চরিত্র তাঁহাদের মাঝেও বিদ্যমান ছিল। তাঁহারা খাদ্য খাইতেন, নিদ্রা যাইতেন, পায়খানা-পেশাব করিতেন। তাঁহাদেরও ছিল জৈবিক চাহিদা প্রভৃতি। এক কথায়, মানুষের জন্য প্রেরিত রাসূলগণও মানুষই ছিলেন (মুফতী শফী, তাফসীরে মা'আরেফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত, পৃ.-৭৯২)।
عن ابي امامة قال قال رسول الله عرض على ربي عز وجل ليجعل لي بطحاء مكة ذهبا فقلت لا يارب لكن أجوع يوما واشبع يوما فاذا شبعت شكرتك و حمدتك فاذا جعت تضرعت اليك وذكرتك.
"আবু উমামা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: মক্কার উপত্যকাকে স্বর্ণে পরিণত করিয়া আমার সামনে পেশ করা হইলে আমি বলিলাম, 'না', হে আমার রব! বরং আমি একদিন অনাহারে থাকিব এবং একদিন তৃপ্তি সহকারে আহার করিব। যখন আহার করিয়া পরিতৃপ্ত হইব তখন আপনার শোকর ও প্রশংসা করিব এবং উপবাস থাকিলে আপনাকে স্মরণ করিব এবং আপনার নিকট অনুনয় করিব” (তিরমিযী, বাংলা অনু., কিতাবুল যুহদ, হা. ২৩৫০, ৪খ., পৃ. ৬২১)।
মূলত পার্থিব ধন-সম্পদ, ভালবাসা ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কামনা করা নিন্দনীয় নয়, বরং ইহা মানুষের জন্মগত চাহিদা। তবে সীমা ছাড়াইয়া যাওয়া এবং তাহাতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হইয়া
যাওয়াই নিন্দনীয়। তবে একথা সত্য যে, যাহারা সম্পদের পিছনে দৌড়ায়, তাহারা সম্পদের মোহে অন্ধ হইয়া যায়। একমাত্র সম্পদই তাহাদের চাওয়া পাওয়া।
মহানবী (স) পার্থিব বিত্ত-বৈভব কামনা করিতেন না। তারপর যদি কোন সূত্রে তাঁহার নিকট সম্পদ আসিত তবে তিনি তাহা কি করিতেন এবং তাঁহার অবস্থা কি হইত তাহা নিম্নোক্ত হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে এইভাবে—
عن ابى هريرة عن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال لو كان لى مثل احد ذهبا لسرنى ان لا تمر على ثلاث ليال عندى منه شيئ الا شيئ ارصده لدين.
“হযরত আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, আমার নিকট যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকে, তাহা হইলে তিনদিন যাইতে না যাইতেই আমার নিকট ইহার কিছুই অবশিষ্ট থাকিবে না, ইহাতেই আমি আনন্দিত হইব। তবে ঋণ পরিশোধের জন্য কিছু অংশ বাকী থাকিতে পারে” (ইব্ন মাজাহ, হা. নং ৪১৩২, ২খ., পৃ. ১০৬৪)।
শুধু তাই নয়, দুনিয়া ও তাহাতে যাহা কিছু রহিয়াছে এই সম্পর্কে তিনি বলিয়াছেন :
عن ابى هريرة قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول الدنيا ملعونة وملعونة ما فيها الا ما ابتغى به وجه الله عز وجل .
“হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলিয়াছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি : দুনিয়া অভিশপ্ত আর তাহাতে যাহা কিছু রহিয়াছে তাহাও অভিশপ্ত। তবে যাহার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা হয় তাহা ব্যতীত” (ইব্ন মাজাহ, হা. নং- ৪১১১, ২খ., পৃ. ১০৭৭)।
দুনিয়া অভিশপ্ত বিধায় তাহা কেবল কাফিরদেরকে দেওয়া হইয়াছে। তবে আল্লাহর প্রিয় বান্দারাও নিয়ামত লাভ করিয়া থাকেন। আর পরকালের নিয়ামত শুধুমাত্র মুত্তাকী ও পরহেযগার লোকেরাই লাভ করিবে।
যদি আশঙ্কা না থাকিত যে, দুনিয়ার সকল মানুষ কাফির হইয়া যাইবে, তবে দুনিয়ার সকল নিয়ামত শুধু কাফিরদেরকেই দেওয়া হইত। আর দুনিয়া আল্লাহ পাকের পছন্দীয় হইলে কাফিরদেরকে ইহার সামান্যতম অংশেও দেওয়া হইত না (তফসীরে নূরুল কুরআন, ২৭খ., পৃ. ৩৮১)।
রাসূলুল্লাহ (স) জাঁকজমক, জৌলুস, বিলাসিতা ও আড়ম্বরপূর্ণ জীবনের স্পর্শ হইতে যেমন মুক্ত ছিলেন, তাঁহার পরিবারবর্গও তেমনি বিলাসী জীবন হইতে অনেক দূরে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন মহামানব আর তাঁহার পূণ্যাত্মা স্ত্রীগণও ছিলেন মহামানবী। তাঁহারা তাঁহার সংস্পর্শে আসিয়া আরো পুত পবিত্র উঠেন সন্দেহ নাই। রাসূলুল্লাহ (স)-কে কম হাসিতে পাইয়া যেন তাঁহাদের সকল চাওয়া-পাওয়া পূর্ণ হইত। তাঁহাদের ছিল না কোন হা-হুতাশ, না ছিল অন্যায় আবদার। অর্থাৎ চাওয়া পাওয়ার বাহুল্যতো তাঁহাদের একেবারেই ছিল না।
হউক না রাসূলুল্লাহ (সা)-এর স্ত্রী, ইহার পরও মানুষ হিসেবে তাঁহাদের কিছু না কিছু চাওয়া-পাওয়ার অবশ্যই ছিল। তবে এই সকল চাহিদার কোনটি লঘু, আবার কোনটি ছিল গুরু। লঘু না সাধারণ চাহিদাসমূহের ব্যাপারে কাহারও কিছু বলিবার নাই। রাসূলুল্লাহ (সা) নিজেও নিরব ছিলেন। তবে অস্বাভাবিক কিছু চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারে যাহা পূর্ণ করা তাঁহার পক্ষে কষ্ট সাধ্য ছিল, আল্লাহ সেই ব্যাপারে তাঁহাদেরকে সতর্ক করেন। যেমন কুবরআনের আয়াত:
يَأَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لأَزْوَاجِكَ إِنْ كُنْتُنَّ تُرِدْنَ الْحَيَوةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ أُمَتِّعْكُنَّ وَأَسَبِّحْكُنَّ سَرَاحًا جَمِيلاً .
"হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদিগকে বল, তোমরা যদি পার্থিক জীবন ও উহার ভূষণ কামনা কর তবে আইস, আমির তোমাদের ভোগ-সামগ্রীর ব্যবস্থা করিয়া দেই এবং সৌজন্যের সহিত তোমাদিগকে বিদায় দেই” (৩৩: ২৮)।
ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, বনু কুরায়জা বনূ নাদীরের যুদ্ধের পর, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করায় মুসলমানদের জীবনে স্বচ্ছন্দ অনেকটা ফিরিয়া আসে। আর্থিক অভাব-অনটন বহুলাংশে লাঘব হয়। এতদ্দর্শনে উম্মাহাতুল মু'মিনীন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট তাহাদের খোরপোষ বৃদ্ধির আরজি পেশ করিলেন। তাঁহারা বলিয়াছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পারস্য ও রোমের সম্রাজ্ঞীরা নানাবিধ গহনাপত্র ও বহু মূল্যবান পোশাক-পরিচ্ছদ ব্যবহার করিয়া থাকে। তাহাদের সেবা-যত্নের জন্য রহিয়াছে অগণিত দাসদাসী। আমাদের দারিদ্র্যপীড়িত জীর্ণ-শীর্ণ করুণ অবস্থা তো আপনি নিজেই দেখিতে পাইতেছেন। তাই আমাদের জীবিকা ও অন্যান্য খরচাদির বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করুন। তাঁহাদের এই আবদার রাসূলুল্লাহ (স)-এর অপছন্দ হইল এবং তিনি তাহাতে মনঃক্ষুণ্ণও হইলেন। তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আয়াত নাযিল করিয়া জানাইয়া দিলেন, হে রাসূল! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে সুস্পষ্টভাবে বলিয়া দিন, যদি তোমরা দুনিয়ার জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আনন্দ-উল্লাস, আরাম-আয়েশ, মূল্যবান পোশাক- পরিচ্ছদ, সৌন্দর্য উপকরণ, অলংকার প্রভৃতি কামনা কর, তবে আইস ভদ্রভাবে আমি তোমাদের বিদায় করিয়া দেই। কাম্য বস্তু অর্জনে তোমরা যেইখানে ইচ্ছা যাইতে পারিবে। আমার নিকট রাখিয়া তোমাদেরকে সহজ সরল অনাড়ম্বর জীবন যাপনে বাধ্য করা সমীচিন হইবে না; বরং তোমাদের বিদায় দেওয়াই হইবে অধিক যুক্তিযুক্ত (তাফসীরে নূরুল কুরআন, ২১খ., পৃ. ৪১৬-১৭; তাসীরে মাআরেফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত, পৃ. ১০৭৫)।
পার্থিব জীবনে খোরপোষ বৃদ্ধির দাবি অবৈধ ছিল না। ইহার পর এত বড় ধমক দেওয়ার কারণ ইহা বৈ অন্য কিছু নয় যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্ত্রীদের দুনিয়ার সম্পদের মোহ আল্লাহ্র নিকট অপছন্দ হইয়াছিল। উক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পর তাঁহারা নিজেদের ভুল বুঝিতে পারিয়া আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সন্তুষ্টি কামনা করিয়া পার্থিব সম্পদের মোহ ত্যাগ করিলেন।
চিরস্থায়ী যিন্দেগীর অনন্ত অসীম সম্পদকে প্রাধান্য দিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহজ-সরল ও অনাড়ম্বর জীবনকেই গ্রহণ করিলেন (তাফসীরে মা'আরেফুল কুরআন, ৫খ., পৃ. ৪৮১-৪৮২; তাফসীরে নূরুল কুরআন, ২১খ., পৃ. ৪১৮)।
অলঙ্কার নারীর ভূষণ, সৌন্দর্য বর্ধনে সহায়ক। আর তাহা পরিধান করাও শারী'আতসম্মত। রাসূলুল্লাহ (স) কখনও চাহিতেন না "আহলে বায়ত”-এর কোন সদস্য তাহা পরিধান করুক। তাহা এইজন্য যে, আভিজাত্যবোধ হইতে মুক্ত থাকিয়া সহজ-সরল, অনাড়ম্বর জীবন যাপন নবী করীম (স) পছন্দ করিতেন।
একবার হযরত 'আইশা (রা)-এর হাতে স্বর্ণের কংকন দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যদি তুমি ওয়ারস (এক প্রকার তৃণ)-এর কাঁকনকে যা'ফরান রঙে রঞ্জিত করিয়া পরিধান করিতে, তবে তাহা উত্তম হইত" (নাসাঈ শরীফ, ২খ., পৃ. ২৮৪)।
অন্য একটি বর্ণনায় আসিয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার কন্যা ফাতিমা (রা)-এর গলায় সোনার হার দেখিতে পাইয়া বলিলেন, লোকেরা যদি বলে যে, আল্লাহ্র রাসূলের কন্যা গলায় আগুনের হার পরিধান করিয়াছে তুমি কি তাহা পছন্দ করিবে (নাসাঈ শরীফ, ২খ., পৃ. ২৮৩)?
রাসূলুল্লাহ (স)-এর সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপনের বহিঃপ্রকাশ তাঁহার স্ত্রীদের মাঝেও প্রকাশ পাইয়াছিল। হাদীছে আছে:
حدثنا سعيد بن كثير ابن عبيد قال حدثني ابي قال دخلت على عائشة ام المؤمنين رضى الله عنها فقالت امسك حتى اخيط نقبتي فامسكت فقلت یا ام المؤمنين لو اخرجت فاخبرنهم لعدوه منك بخلا قالت ابصر شأنك انه لا جديد لمن لا يلبس الخلف.
"হযরত সাঈদ ইব্ন কাছীর বলিয়াছেন, আমার পিতা বর্ণনা করিয়াছেন, আমি উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা)-এর নিকট উপস্থিত হইলাম। তিনি আমাকে বলিলেন, একটু অপেক্ষা কর, আমি আমার নেকাবটি সেলাই করিয়া লই। আমি অপেক্ষা করিলাম এবং বলিলাম, হে উম্মুল মু'মিনীন! আমি যদি বাহিরে গিয়া লোকজনকে উহা অবগত করাই তবে তাহারা তো আপনাকে কৃপণ বলিবে। তিনি বলিলেন, লোকে কি বলিবে সে কথায় কাজ নাই। নিজের অবস্থা দেখ। যে ব্যক্তি পুরাতন কাপড় পরিধান করে নাই তাহার জন্য নূতন কাপড় নাই” (আল-আদাবুল মুফরাদ, ২খ., পৃ. ১৩২)।
মহানবী (স) জাঁকজমক, আরাম-আয়েশ, বিলাসিতা, আড়ম্বরতা হইতে শুধু নিজেই দূরে থাকিতেন তাহা নয়, বরং আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও সাহাবীদেরকেও তাহা হইতে দূরে থাকিতে নির্দেশ দিতেন। হাদীছ শরীফে বর্ণিত হইয়াছে-
عن ابن عمر قال اخذ رسول الله ﷺ بمنكبي فقال كن في الدنيا كانك غريب او عابر سبيل.
"হযরত ইবন উমার (রা) বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমার ঘাড় ধরিয়া বলিলেন, দুনিয়াতে এমনভাবে বসবাস কর যেন তুমি একজন আগন্তুক অথবা পথিক মাত্র” (ইবন মাজা, হা. নং- ৪১৪, ২খ., পৃ. ১৩৭৮)।
عن عبد الله بن مسعود قال قال رسول الله ﷺ لا تتخذوا الضيعة فترغبوا في الدنيا .
“হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: তোমরা সম্পদ সংগ্রহে মত্ত হইও না। তাহা হইলে তোমরা দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হইয়া পড়িবে” (বাংলা তিরমিযী শরীফ, হা. নং ২৩৩১, ৪খ., পৃ. ২৩৩১; মিশকাত শরীফ, হা. নং ৫১৭৮; ৩খ., ১৪৩১)।
মানুষ স্বভাবতই স্বচ্ছলতার প্রত্যাশী। আর্থিক দৈন্যদশা ঘুচিয়া স্বচ্ছলতা আসুক, তাহাই সকলে কামনা করে। বিশেষ করিয়া যখন সে তাহার চেয়ে স্বচ্ছল কোন লোককে সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতেছে দেখে, তাহার আরাম-আয়েশ, বিলাসিতা ও আড়ম্বরপূর্ণ জীবন যাপন প্রত্যক্ষ করিয়া নিজের অনাড়ম্বর জীবনের প্রতি তাহার ঘৃণা জন্মিতে থাকে এবং আড়ম্বরপূর্ণ জীবনের প্রতি ক্রমেই মোহ জন্মিতে থাকে। এই অবস্থায় মানুষের করণীয় কি, তাহাই রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন এইভাবে-
عن ابي هريرة قال قال رسول الله ﷺ انظروا الى من هو اسفل منكم ولا تنظروا الى من هو فوقكم فهو اجدر ان لا تزدروا نعمة الله عليكم. وفي رواية اخرى اذا نظر احدكم الى من فضل عليه في المال والخلق فلينظر الى من هو اسفل منه.
"হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, যাহারা তোমাদের চেয়ে নিম্নবিত্ত তাহাদের দিকে তাকাও এবং তাহাদের দিকে তাকাইও না যাহারা তোমাদের চেয়ে উচ্চবিত্ত। কেননা ইহা তোমাদিগকে ঘৃণা হইতে রক্ষা করিবে এবং আল্লাহর রহমত পাওয়ার যোগ্য করিয়া দিবে।” অপর বর্ণনায় আসিয়াছে, "তোমাদের কেহ যখন এমন কোন ব্যক্তির দিকে তাকায় যাহাকে আল্লাহ তা'আলা সম্পদ ও সৌন্দর্য দ্বারা অনুগ্রহ করিয়াছেন তখন সে যেন নিজের চেয়ে হীন ব্যক্তির দিকে তাকায়" (ইবন মাজা, হা. নং ৪১৪২, ২খ., পৃ. ১৩৮৭; মুসলিম শরীফ, বাংলা, হা. নং ৭১৬১, ৭১৫৯, ৮খ., পৃ. ৪৭৯; আস-সাহীহ, হা. নং ৬৪৯১, পৃ. ১৩৭০)।
রাসূলুল্লাহ (স) আর্থিক স্বচ্ছলতা কামনা করিতেন না কখনও, বরং তিনি পার্থিব সুখ-স্বচ্ছন্দ, ধনৈশ্বর্যকে বিসর্জন দিয়ে অতি সাধারণভাবে দিনাতিপাত করিতে পছন্দ করিতেন।
কুরায়শ নেতৃবৃন্দ দফায় দফায় তাঁহার চাচার সহিত বৈঠক করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাঁহার ধর্মপ্রচার বন্ধ করিতে অনুরোধ করিল। শুধু তাই নয়, অবশেষে তাহারা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাত করিয়া কিছু লোভনীয় ও আকর্ষণীয় প্রস্তাব পেশ করিল। তাহারা বলিল, হে মুহাম্মাদ! তোমার প্রচারিত দীন-এর পিছনে যদি ধন-সম্পদ অর্জন করাই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হইয়া থাকে, তাহা হইলে আমরা তোমাকে এত অধিক পরিমাণ ধনসম্পদ দিব যে, তুমি হইবে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী ব্যক্তি। আর যদি সম্মান ও খ্যাতি অর্জন করা উদ্দেশ্য হইয়া থাকে তাহা হইলে আমরা তোমাকে আমাদের নেতা বানাইব। আর যদি বাদশাহী চাও, তাহা হইলে আমরা তোমাকে রাজক্ষমতা দিয়া বাদশাহ বানাইব। আর যদি কোন জিন বা প্রেতাত্মা ইত্যাদি আছর করিয়া থাকে, যাহার চিকিৎসা করিতে তুমি অক্ষম, তাহা হইলে ইহার চিকিৎসা করিতে যত অর্থের প্রয়োজন হইবে আমরা তাহা খরচ করিয়া তোমাকে পরিপূর্ণ সুস্থ করিয়া তুলিব। তাহার পরও তিনি তাহাদের সহিত কোনরূপ আপোষ করিলেন না, বরং বলিলেন-
يا عم والله لو وضعوا الشمس في يميني والقمر فى يسرى على ان اترك هذا الامر حتى يظهره الله او اهلك فيه.
“হে চাচাজান, আল্লাহ্র কসম! যদি তাহারা আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চাঁদও তুলিয়া দেয় এবং তাহারা যদি চায় যে, আমি এই কাজ ছাড়িয়া দেই, তবুও আমি ততক্ষণ পর্যন্ত এই কাজ হইতে বিরত হইব না যতক্ষণ না আল্লাহ এই কাজকে বিজয়ী করেন অথবা আমি এই পথে ধ্বংস হইয়া যাই” (সীরাত ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ২৬৫-৬৬, ২৯৩-৯৪)।
একদিকে কুরায়শ সম্প্রদায়ের আকর্ষণীয় প্রস্তাব, পাশাপাশি পার্থিব জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দের হাতছানি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বিন্দুমাত্র টলাইতে পারে নাই। পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে:
لا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ زَهْرَةَ الحَياةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيْهِ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَى.
"তুমি তোমার চক্ষুদ্বয় কখনও প্রসারিত করিও না উহার প্রতি যাহা আমি তাহাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসাবে দিয়াছি তদ্দ্বারা তাহাদিগকে পরীক্ষা করিবার জন্য। তোমার প্রতিপালক প্রদত্ত জীবনোপকরণ উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী” (২০: ১৩১)।
عن كعب بن عياض قال سمعت رسول الله الله يقول ان لكل امة فتنة وفتنة امتى المال.
"হযরত কা'ব ইব্ন ইয়াদ (রা) বলিয়াছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি: সকল উম্মতের জন্য একটি বিপর্যয় রহিয়াছে। আমার উম্মতের বিপর্যয় হইল সম্পদ” (তিরমিযী শরীফ, বাংলা, হা. নং ২৩৩৯, ৪খ., পৃ. ৬১৬)।
عن كعب بن مالك قال قال رسول الله ﷺ ما ذنبان جائعان ارسلا في غنم فافسد لها من حرص المرء على المال والشرف لدينه.
"হযরত কা'ব ইব্ন মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: ধন-সম্পদ ও আভিজাত্যের লালসা মানুষের ধর্মের জন্য যতখানি ক্ষতিকর, দুইটি ক্ষুধার্ত বাঘ বকরীর পালের মধ্যে ছাড়িয়া দিলে উহা পালের জন্য ততখানি ক্ষতিকর নয়” (তিরমিযী শরীফ, বাংলা, যুহদ, হা. নং ২৩৭৯, ৪খ., পৃ. ৬৩৪; ইসলামিক সেন্টার অনু. নং ২৩১৭)।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, অনাড়ম্বর জীবনাচারের নামে পার্থিব জীবন ও জীবনোপকরণকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ কাম্য নয়, বরং বাহুল্যতা বর্জনই উদ্দেশ্য। কতটুকু সম্পদ অনাড়ম্বরতার মাপকাঠি তাহা নিশ্চিত করিয়া বলা মুশকিল। তবে নিম্নোক্ত হাদীছখানাকে আমরা সরল ও অনাড়ম্বর জীবনের মাপকাঠি হিসাবে ধরিয়া নিতে পারি।
عن عثمان بن عفان قال ان النبى ﷺ قال ليس لابن ادم حق في سوى هذه الخصال بيت يسكنه وثوب يوارى عوراته وجلف الخبز والماء.
"উছমান ইব্ন আফফান (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: তিনটি জিনিস ব্যতীত অন্য কিছুর উপর বনী আদমের কোন অধিকার বা দাবি নাইঃ (১) ঘর যাহাতে সে বসবাস করিবে; (২) বস্ত্র যাহা দ্বারা সে লজ্জা নিবারণ করিবে; (৩) এক টুকরা রুটি এবং (৪) পানি” (তিরমিযী শরীফ, বাংলা, হা. নং ২৩৪৪, যুহদ, ৪খ., পৃ. ৬১৮; ইসলামিক সেন্টার অনু. নং ২২৮৩)।
সরলতা ও অনাড়ম্বরতা তাঁহার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল বিধায় তিনি অতি সাধারণ পোশাক পরিধান করিতেন। তিনি কখনও এমন পোশাক পরিধান করেন নাই যাহা অশালীন, অপরিষ্কার ও অপরিচ্ছন্ন। হাদীছ শরীফে বর্ণিত আছে:
عن عبد الله بن عمر أن عمر بن الخطاب رائ حلة سيراء عند باب المسجد تباع فقال يا رسول الله لو اشتريت هذه فلبستها يوم الجمعة وللوفد اذا قدموا عليك فقال رسول الله ﷺ انما يلبس هذه من لا خلاق له في الآخرة ثم جاء رسول الله ﷺ منها حلل فاعطى عمر بن الخطاب منها حلة فقال عمر يا رسول الله كسوتنيها وقد قلت في حلة عطارد ما قلت فقال رسول الله ﷺ اني لم اكسكها لتلبسها فكساها عمر اخا له مشركا بمكة.
"হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) মসজিদের দরজায় একটি লাল রঙের জুব্বা বিক্রি হইতেছে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! যদি আপনি ইহা খরিদ করিতেন তবে তাহা পরিধান করিয়া জুমু'আর সালাত এবং আপনার নিকট প্রতিনিধিদলের আগমনকালে পরিতে পারিতেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এই জাতীয় পোশাক তাহারাই পরিতে পারে পরকালে যাহাদের কোন অংশ নাই। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট কিছু জুব্বা আসিলে তিনি উমার (রা)-কে তাহা হইতে একটি জুব্বা দান করেন। তখন উমর (রা) বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি আমাকে এটা পরিতে দিলেন, অথচ এই জubba সম্পর্কে সেইদিন বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করিয়াছেন। তিনি বলিলেন, আমি তোমাকে উহা পরিধান করিতে দেই নাই। অতএব উমার (রা) ইহা মক্কায় বসবাসরত তাহার এক মুশরিক ভাইকে ব্যবহারের জন্য দিলেন” (আবু দাউদ, হা. নং- ৪০৪০, ৪খ., পৃ. ৩২০; মুসলিম, হা. নং ২০৬৮; নাসাঈ, হা. নং ৫২৯৭)।
রাসূলুল্লাহ (স) কি ধরনের পোশাক পরিধান করিতেন তাহার স্পষ্ট বর্ণনা দিয়াছেন উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা) এইভাবে: عن أبي موسى الاشعري قال اخرجت لنا عائشة كساء وازارا غليظا قالت قبض رسول الله ﷺ في هذين ثوبين.
"হযরত আবূ মূসা আল-আশআরী (রা) বলেন, হযরত 'আইশা (রা) একটি চাদর এবং একটি মোটা লুঙ্গি আমাদিগকে বাহির করিয়া দেখাইলেন এবং বলিলেন, ওফাতের সময় এই পোশাক রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পরিধানে ছিল” (আবু দাউদ, হা. নং ৪০৩৬, ৪খ., পৃ. ৩১৭; মুসলিম, হা. নং- ২০৮০, ইবন মাজা, হা. নং- ৩৫৫১, ২খ., পৃ. ১১৭৬)।
হযরত নবী করীম (স) সাতাশটি উটের বিনিময়ে এক সেট পোশাক খরিদ করিয়াছিলেন এবং তাহা পরিধান করিয়াছিলেন (আখলাকুন নবী, হাদীছ নং ২৭৭, পৃ. ১৭৪)। অন্য হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে: عن انس بن مالك ان ذايزان اهدى الى النبي الله حلة اشتريت بثلاثة وثلاثيين بعيرا فلبسها مرة.
"হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) হইতে বর্ণিত। যু-ইয়াযান নবী করীম (স)-কে একটি পোশাক হাদিয়া দেন যাহা তেত্রিশটি উটের বিনিময়ে খরিদ করা হইয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) এই জুব্বা একবার মাত্র পরিধান করিয়াছিলেন" (প্রাগুক্ত, হা. নং ২৫১ পৃ. ১৬৩০)।
লুঙ্গি, চাদর ইত্যাদি ছিল আরবের সাধারণ পোশাক যাহা সচরাচর লোকেরা পরিধান করিত। রাসূলুল্লাহ (স)-ও সেই সাধারণ পোশাকই অধিকাংশ সময় পরিধান করিতেন, পাশাপাশি মূল্যবান পোশাকও পরিধান করিতেন। তবে তা সব সময় নয়। এই সকল মূল্যবান
পোশাক উপহার হিসাবেই আসিত। আর তিনি তাহা একবার কিংবা বিশেষ কোন উপলক্ষে পরিধান করিতেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর ব্যবহৃত পোশাকটির মূল্য হাদীছের ভাষ্যানুসারে সাতাশটি উটের সমমূল্যের যাহা তিনি নিজে খরিদ করিয়াছিলেন। আর তাঁহাকে হাদিয়া হিসাবে প্রদত্ত পোশাক জোড়ার দাম ছিল তেত্রিশটি উটের সমমূল্যের। এত মূল্যবান পোশাক খরিদ করিয়া পরিধান করার ক্ষমতা থাকার পরও তিনি অতি সাধারণ পোশাক পরিধান করিয়া অতি সহজ, সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপন করিতেন। যেমন হাদীছ শরীফে আসিয়াছে-
عن انس بن مالك قال لبس رسول الله ﷺ الصوف واحتذى المخصوف ولبس خشـنـا واكل بشعا سالت الحسن ما البشع قال غليظ الشعير ما كان يسيغه الا بجرعة ماء.
"হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) পশমী কাপড়, তালি দেওয়া জুতা ও মোটা বস্ত্র পরিধান করিতেন এবং সাধারণ খাবার খাইতেন। রাবী বলেন, আমি হাসানকে জিজ্ঞাসা করিলাম, সাধারণ খাবার কি? তিনি বলেন, মোটা যব যা পানি ছাড়া গলাধকরণ করা যায় না” (আখলাকুন নবী, হা. নং ৩১৫, পৃ. ১৮৭; সুনানু ইব্ন্ন মাজা, হা. নং ৩৩৪৮, ২খ., পৃ. ১১১১)।
পৃথিবীতে বাঁচিয়া থাকিতে হইলে খাদ্য গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন। মানুষ হিসাবে রাসূলুল্লাহ (স) খাদ্য গ্রহণ করিতেন, যখন যে খাদ্য জুটিত তাহাই খাইতেন। এমনকি যখন তিনি সমগ্র আরব জাহানের একচ্ছত্র অধিপতি তখনও তাঁহার খাবার ছিল আটার রুটি। আবার কখনও শুধু খেজুর খাইয়াই দিনের পর দিন অতিবাহিত করিতেন।
সকল ধরনের হালাল খাবারই তিনি গ্রহণ করিতেন। তবে যে সকল হালাল খাদ্য তাঁহার অপছন্দ হইত তাহা তিনি মাঝে মাঝে পরিহার করিতেন। যেমন কাঁচা পিঁয়াজ-রসুন ইত্যাদি তিনি আহার করিতেন না, যদিও এইগুলি হালাল বস্তু। আর নিজে আহার করেন নাই বলিয়া তিনি এইগুলিকে হারামও ঘোষণা করেন নাই।
عن ابى هريرة قال ما عاب رسول الله ﷺ طعاما قط وان اشتهـاه اكلـهـا وان كرهه تركه
"হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) কখনও কোন খাবারকে খারাপ বলেন নাই, পছন্দ হইলে খাইয়াছেন, আর অপছন্দ হইলে ত্যাগ করিয়াছেন” (আবূ দাউদ, হা. নং- ৩৭৬৩, ৪খ., ১৩৭; ইবন মাজা, হা. নং ৩২৫৭; তিরমিযী, হা. নং- ২০৩২, মুসলিম, বাংলা, হা. নং ৫২০৭, ৮খ., পৃ. ৮৭)।
রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহ্র নিকট পরিবার-পরিজনের জন্য রিযিক প্রার্থনা করিতেন। কেননা তিনিই সকল জীবের রিযিকদাতা। যেমন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللهِ رِزْقُهَا .
"ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী সকলের জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহ্রই" (১১:৬)।
তবে তিনি রিযিক প্রার্থনা করিতেন ততটুকু যতটুকু তাঁহার পরিবার-পরিজনের প্রয়োজন, ইহার অধিক নহে। হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে-
عن ابي هريرة قال قال رسول الله الله اللهم اجعل رزق ال محمد قوقا .
“হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ (স)-এর পরিবারবর্গের জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু রিযিক প্রদান কর” (ইবন মাজা, হা. নং ৪১৩৭, ২খ., পৃ. ১৩৮৭; মুসলিম, বাংলা, হা. নং ৭১৭১, ও ৭১৭২, ৮খ., পৃ. ৪৮৬; তিরমিযী, বাংলা, হা. নং ২৩৬৪, ৪খ., পৃ. ৬২৬; বুখারী, আস-সাহীহ, হা. নং ৬৪৬০, পৃ. ১৩৬৫)।
রাসূলুল্লাহ (স) দারিদ্র্যকে স্বেচ্ছায় বরণ করিয়াছিলেন বিধায় সপরিবারে দিনের পর দিন অনাহারে অর্ধাহারে কাটাইতেন, এমনকি মাসের পর মাস চলিয়া যাইত কিন্তু ঘরে খাবার তৈরি হইত না, খেজুর ও পানি দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিতেন। এক সময় তাঁহার পরিবারে সচ্ছলতা আসিয়াছিল, কিন্তু সম্পদের মোহ হইতে তিনি মুক্ত ছিলেন। সচ্ছলতা থাকা সত্ত্বেও তিনি অনাড়ম্বর জীবন যাপন করিয়া বিশ্ববাসীর জন্য সরলতা ও অনাড়ম্বরতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়া গিয়াছেন। বিভিন্ন হাদীছ গ্রন্থে ইহার বিস্তারিত বর্ণনা রহিয়াছে।
عن ابن عباس قال كان رسول الله الله يبيت الليالي المتتابعة طاويا اهله ولا تجدون عشاء وكان أكثر خبزهم خبز الشعير.
"হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার পরিবারবর্গ রাতের পর রাত অনাহারে কাটাইতেন। তাহাদের জন্য রাতের খাবারের সংস্থান হইত না, আর তাহাদের অধিকাংশ খাবার ছিল যবের রুটি” (তিরমিযী শরীফ, বাংলা, হা. নং ২৩৬৩, ৪খ., পৃ. ৬২৫)।
عن عائشة قالت ما شبع ال محمد الله من خبز شعير يومين متتابعين حتى قبض وفي رواية اخرى منذ قدم المدينة.
"উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা) বলেন, মুহাম্মাদ (স)-এর পরিবার-পরিজন একাধারে দুই দিন পেট পুরিয়া যবের রুটি খাইতে পারেন নাই। এই অবস্থায় তিনি ইন্তিকাল করেন। অন্য বর্ণনায় রহিয়াছ, মদীনায় হিজরতের পর হইতে” (মুসলিম শরীফ, বাংলা, হা. নং- ৭১৭৬, ৮খ., পৃ. ৪৮৮, তিরমিযী শরীফ, বাংলা, হা. নং ২৩৬০, ৪খ., পৃ. ৬২৫; বুখারী, আস-সাহীহ, হা. নং ১৪৫৪, পৃ. ১৩৬৪)।
عن عائشة أنها كانت تقول كان يمر بنا هلال هلال هلال وما يوقد في منزلة رسول الله ﷺ نار قلت اى خالتى على اى شئ تعيشون قالت على الاسودان الماء والتمر.
"উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা) বলিতেন, আমরা মুহাম্মাদ (স)-এর পরিবারবর্গের উপর একের পর এক চাঁদ উঠিত, অথচ আমাদের ঘরে আগুন জ্বলিত না। রাবী বলেন, জিজ্ঞাসা করিলাম, হে খালাজান! তখন আপনারা কি খাইয়া বাঁচিতেন? তিনি বলেন, দুইটি কাল বস্তু, খেজুর ও পানি” (ইবন মাজা, হা. নং- ৪১৪৪, ২খ., পৃ. ১৩৮৮; মুসলিম শরীফ, বাংলা, হা. নং- ৭১৮৩, ৮খ., পৃ. ৪৮৯)।
عن سهل بن سعد انه قيل له أكل رسول الله ﷺ النقى يعنى الحواري فقال سهل ما رأى رسول الله ﷺ النقى فقيل له هل كانت لكم مناخل على عهد رسول الله ﷺ قال ما كانت لنا مناخل فقيل فكيف كنتم تصنعون بالشعير قال كنا نفضحه فيطير ما طار ثم نثر به فنعجنه.
"হযরত সাহল ইবন সা'দ (রা) হইতে বর্ণিত। তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করা হইল, রাসূলুল্লাহ (স) কি কখনও ময়দার রুটি খাইয়াছেন? সাহল (রা) বলিলেন, আল্লাহ্ সঙ্গে সাক্ষাত করা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (স) কখনও ময়দা দেখেন নাই। তাঁহাকে প্রশ্ন করা হইল, রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুগে কি তোমাদের চালুনী ছিল? তিনি বলিলেন, না। আমাদের কোন চালুনি ছিল না। বলা হইল, তাহা হইল যব নিয়ে কি করিতেন? তিনি বলেন, আমরা তাহাতে ফুঁ দিতাম। যাহা কিছু উড়িয়া যাইবার উড়িয়া যাইত। ইহার পর উহাতে পানি ঢালিয়া মণ্ড করিয়া নিতাম” (তিরমিযী শরীফ, বাংলা, হা. নং- ২৩৬৭, ৪খ., পৃ. ৬২৭।)।
عن انس قال لم يأكل النبي ﷺ على خوان حتى مات وما أكل خبزا مرفقا حتى مات .
"আনাস (রা) বলেন, নবী করীম (স) মৃত্যু পর্যন্ত কখনও টেবিলে আহার করেন নাই। আর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি কখনও পাতলা রুটি আহার করেন নাই" (বুখারী, কিতাবুর রিকাক', হাদীছ নং ৬৪৫০)।
হযরত আনাস (রা) হইতে ইমাম তিরমিযী (র) বর্ণনা করেন :
ما اكل رسول الله ﷺ على خوان ولا اكل خبزا مرققا حتى مات .
"রাসূলুল্লাহ (স) মৃত্যু পর্যন্ত টেবিলে রাখিয়া আহার করেন নাই এবং কখনও পাতলা রুটিও আহার করেন নাই” (তিরমিযী, প্রাগুক্ত, হাদীছ নং ২৩৬৬)।
যবের রুটিও আবার সব সময় মিলিত না। ফলে মাসাধিক কাল অতিবাহিত হইয়া যাইত, কিন্তু ঘরে চুলা জ্বলিত না। শুধুমাত্র খেজুর ও পানি দ্বারাই ক্ষুন্নিবৃত্তি করিতে হইত। উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা) বলেন :
ان كنا ال محمد لنمكث شهرا ما نستوقد بنار إن هو الا التمر والماء.
"আমরা মুহাম্মাদ (স)-এর পরিবার কোন মাস এমনভাবেও কাটাইতাম যে, আমরা আগুনও জ্বালাইতাম না। আমরা শুধু খেজুর ও পানি খাইয়াই কাটাইয়া দিতাম" (মুসলিম, প্রাগুক্ত, হাদীছ নং ৭১৮০)।
ইহার সহিত মাঝেমধ্যে প্রতিবেশীদের নিকট হইতে সামান্য দুধ হাদিয়া আসিলে তাহাই পরিবারের সকলে মিলিয়া পান করিতেন। এই কথাই খুব করুণভাবে হযরত 'আইশা (রা) তাঁহার আদরের ভাগিনেয় ও সুযোগ্য ছাত্র 'উরওয়া ইবনুয যুবায়র (রা)-কে বলিয়াছেন :
عن عروة عن عائشة انها كانت تقول والله يا ابن أختى ان كنا لننظر إلى الهلال ثم الهلال ثم الهلال ثلاثة اهلة فى شهرين وما أقدت في أبيات رسول الله ﷺ نار قال فقلت يا خالة فما كان يعيشكم ؟ قالت الأسودان التمر والماء الا أنه قد كان لرسول الله ﷺ جيران من الانصار وكانت لهم منائح فكانوا يرسلون الى رسول الله ﷺ من البانها فيسقيناه .
"উরওয়া (র) হযরত 'আইশা (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, 'হে আমার ভগ্নি-পুত্র। আমরা নূতন চাঁদ দেখিতাম, অতঃপর পুনরায় নূতন চাঁদ দেখিতাম, তারপর আবার নূতন চাঁদ দেখিতাম-দুইমাসে তিনবার নূতন চাঁদ দেখিতাম। অথচ রাসূলুল্লাহ (স)-এর ঘরসমূহে আগুন জ্বালানো হইত না। তিনি (উরওয়া) বলেন, আমি বলিলাম, হে খালা! আপনারা কিভাবে দিন যাপন করিতেন? তিনি বলিলেন, দুইটি কালো জিনিস-খেজুর ও পানি দ্বারা। তবে তাঁহার কিছু আনসার প্রতিবেশী ছিল। তাহাদের কিছু দুগ্ধবতী উষ্ট্রী ও বকরী ছিল। তাহারা তাহা দোহন করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পাঠাইতেন। তাহাই তিনি আমাদিগকে পান করাইতেন” (বুখারী, কিতাবুর রিকাক, হাদীছ নং ৬৪৫৯; মুসলিম, প্রাগুক্ত, হাদীছ নং ৭১৮৩)।
আবার যখন আহারের সংস্থান হইত, চুলা জ্বলিত, রুটি পাকানো হইত তখনও দুই বেলা পেট পুরিয়া তিনি আহার করেন নাই। হযরত 'আইশা (রা) বলেন:
لقد مات رسول الله ﷺ وما شبع من خبز وزيت في يوم واحد مرتين .
"রাসূলুল্লাহ (স) ইনতিকাল করিলেন অথচ তিনি একদিন দুই বেলা রুটি ও যায়তুন দ্বারা কখনও পরিতৃপ্ত হইয়া আহার করেন নাই” (মুসলিম, প্রাগুক্ত, হাদীছ নং ৭১৮৪)।
أذكر الحال التي فارق عليها رسول الله ﷺ الدنيا . والله ما شبع من خبز ولحم مرتين في يوم .
"রাসূলুল্লাহ (স) যে অবস্থায় দুনিয়া ত্যাগ করিয়া গিয়াছেন তাহা আমার মনে পড়িতেছে। আল্লাহ্র কসম! তিনি দিনে দুই বেলা কখনও রুটি-গোস্ত পেট পুরিয়া খাইতে পারেন নাই” (তিরমিযী, প্রাগুক্ত, হাদীছ নং ২৩৫৯)।
কখনও কখনও আহার করার মত কোনও খাদ্যই জুটিত না। ফলে পরিবারসহ সকলেই অনাহারেই কাটাইয়া দিতেন এবং ক্ষুধার তাড়নায় অস্থির থাকিতেন। যেমন সিমাক ইব্ন হারব (র) বলেনঃ
سمعت النعمان بن بشير يخطب قال ذكر عمر ما اصاب الناس من الدنيا فقال لقد رأيت رسول الله ﷺ يظل اليوم يلتوى ما يجد دقلا يملأ به بطنه .
"নু'মান ইব্ন বাশীর (রা)-কে বক্তৃতারত অবস্থায় আমি এই কথা বলিতে শুনিয়াছি যে, 'উমার (রা) বলিয়াছেন, মানুষ কী পরিমাণ দুনিয়া কামাই করিয়াছে! অথচ রাসূলুল্লাহ (স)-কে আমি দেখিয়াছি যে, তিনি ক্ষুধার তাড়নায় সারাদিন অস্থির থাকিতেন। পেটে ভরিবার মত নিম্ন মানের একটি খেজুরও তিনি পাইতেন না” (মুসলিম, প্রাগুক্ত, হাদীছ নং ৭১৯২)।
কখনওবা তিনি একাধারে রাত্রির পর রাত্রি পরিবারসহ না খাইয়া শুইয়া থাকিতেন এবং অনাহারেই রাত্র কাটাইয়া দিতেন। হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
عن ابن عباس قال كان رسول الله ﷺ يبيت الليالي المتتابعة طاويا واهله لا يجدون عشاء وكان أكثر خبزهم خبز الشعير .
"ইবন 'আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) এবং তাঁহার পরিবারের সদস্যগণ পরপর কয়েক রাত্রি ক্ষুধার্ত অবস্থায় কাটাইতেন। তাঁহাদের জন্য রাত্রির আহারের সংস্থান হইত না। অধিকাংশ দিন যবের রুটিই ছিল তাহাদের খাদ্য” (তিরমিযী, প্রাগুক্ত, হাদীছ নং ২৩৬৩)।
এমনকি ইনতিকালের সময়ও তিনি সামান্য বব ব্যতীত তেমন কিছু রাখিয়া যান নাই যাহা খাইয়া তাঁহার পরিবারবর্গ জীবন ধারণ করিতে পারেন। উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা) বলেন:
توفى رسول الله ﷺ وما في رفى من شيئ يأكله ذوكبد الا شطر شعير في رف لي فأكلت منه حتى طال على فكلته ففنى .
"রাসূলুল্লাহ (স) দুনিয়া হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়াছেন তখন আমার পাত্রে সামান্য কিছু যব ব্যতীত কোন প্রাণীর আহার করার মত কিছুই ছিল না। তাহা হইতেই আমি আহার করিতাম। এইভাবে অনেক দিন চলিয়া যায়। অতঃপর আমি তাহা ওযন করিলাম, ফলে উহা শেষ হইয়া গেল” (মুসলিম, প্রাগুক্ত, হাদীছ নং ৭১৮২)।
অনাহারে থাকাটাই তাঁহার নিকট পছন্দনীয় ছিল। তাই রাত্রে অনাহারে থাকিয়াও দিনের বেলা তিনি রোযা রাখিতেন। পৃথিবীর ধনভাণ্ডার, ফল-ফলাদি ও বিত্তবৈভব স্বীয় প্রতিপালকের নিকট চাহিলেই তিনি পাইতেন, কিন্তু তাহা তিনি করেন নাই। এই মর্মে হযরত 'আইশা (রা) হইতে একটি দীর্ঘ হাদীছ কাযী 'আয়ায তাঁহার আশ-শিফা গ্রন্থে উদ্ধৃত করিয়াছেন:
عن عائشة قالت لم يمتلئئ جوف النبي ﷺ شبعا قط ولم يبث شكوى إلى أحد وكانت الفاقة أحب اليه من الغنى وان كان ليظل جائعايلتوى طول ليلته من الجوع فلا يمنعه صيام يومه . ولو شاء سأل ربه جميع كنوز الارض وثمارها ورغد عيشها .. ولقد كنت ابكى له رحمة مما ارى به وامسح بيدى على بطنه مما به من الجوع واقول نفسى لك الفداء لو تبلغت من الدنيا مما يقوتك فيقول يا عائشة مالي وللدنيا ؟ اخواني من اولى العزم من الرسل صبروا على ما هو اشد من هذا فمضوا على حالهم فقدموا على ربهم فاكرم مابهم واجزل ثوابهم فاجدني استحيى ان ترفهت في معيشتي ان يقصربي غدا دونهم وما من شيئ هو احب الى من اللحوق باخواني واخلائي قالت فما أقام بعد لإشهرا حتى توفى ﷺ.
" 'আইশা (রা) বলেন, নবী করীম (স)-এর পেট কখনও পরিতৃপ্ত হইয়া পূর্ণ হয় নাই। কাহারও নিকট তিনি অভিযোগও করেন নাই। ধনাঢ্যতা হইতে অনাহারে থাকাই তাঁহার নিকট পছন্দনীয় ছিল। কখনও তিনি ক্ষুধায় সারারাত্রি কষ্ট করিতেন। কিন্তু ইহা তাঁহাকে দিনের বেলার রোযা রাখা হইতে বিরত রাখিতে পারিত না। তিনি ইচ্ছা করিলে পৃথিবীর সকল ধনভাণ্ডার, ফল-ফলাদি এবং উহার আরাম-আয়েশের সামগ্রী তাঁহার প্রতিপালক হইতে চাহিয়া লইতে পারিতেন। তাঁহার অবস্থা দেখিয়া আমি কাঁদিতাম এবং ক্ষুধার কারণে আমার হাত দ্বারা তাঁহার পেট মর্দন করিয়া দিতাম আর বলিতাম, আপনার জন্য আমার জান কুরবান হউক! আপনি যদি দুনিয়া হইতে আপনার প্রয়োজনমত রিযিক গ্রহণ করিতেন। তিনি বলিতেন, হে 'আইশা। আমার ও দুনিয়ার মধ্যে সম্পর্ক কি? আমার ভ্রাতা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূল্লগণ ইহা হইতেও কঠিন ও কষ্টকর বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করিয়াছেন। অতঃপর তাঁহারা সেই অবস্থায়ই চলিয়া গিয়াছেন। তাঁহারা তাঁহাদের প্রতিপালকের নিকট গমন করিয়াছেন। অতঃপর তিনি তাহাদিগকে সম্মানজনক স্থানে
অধিষ্ঠিত করিয়াছেন এবং তাঁহাদিগকে পরিপূর্ণ হাওয়াব দান করিয়াছেন। তাই আমি লজ্জাবোধ করি যে, আমি যদি আমার জীবনধারায় ভোগবিলাস আনয়ন করি তাহা হইলে আগামী দিনে হয়ত বা তাঁহাদের তুলনায় আমার মর্যাদা কমাইয়া দেওয়া হইবে। আমার ভ্রাতা ও বন্ধুবর্গের সহিত মিলিত হওয়ার তুলনায় অধিক পছন্দনীয় আমার নিকট আর কিছুই নাই। 'আইশা (রা) বলেন, ইহার পর তিনি মাত্র একমাস জীবিত ছিলেন, অতঃপর তিনি ইনতিকাল করেন" (আশা-শিফা বি-তা'রীফি হু'কূ'কি'ল মুসতাফা, ১খ, ১৪২-১৪৩)।
রাসূলুল্লাহ (স) শয়ন করিতেন অত্যন্ত মামুলী ধরনের বিছানায়। তাঁহার বিছানা সম্পর্কে উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা) বলেন:
كان فراش رسول الله ﷺ من آدم وحشوه ليف .
"রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিছানা ছিল চামড়ার। আর উহার ভিতর খেজুর গাছের আশ ভর্তি ছিল” (বুখারী, কিতাবুর-রিকশাক', হাদীছ নং ৬৪৫৬; তু. তিরমিযী, আবওয়াবুশ-শামাইল, বাব মা জাআ ফী ফিরাশি রাসুলিল্লাহ (স), হাদীছ নং ৪২৬৯)।
কখনও বা একটি চট দুই ভাঁজ করিয়া বিছাইয়া দেওয়া হইত, তাহারই উপর তিনি নিদ্রা যাইতেন। একটু আরামের জন্য একদিন তাহা চার ভাঁজ করিয়া দিলে প্রভাতে উঠিয়াই তিনি এইরূপ করিতে নিষেধ করেন এবং পূর্বের ন্যায় করিতে নির্দেশ দেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা (রা) হইতে এই মর্মে হাদীছ বর্ণিত আছেঃ
سئلت حفصة ما كان فراش رسول الله الله في بيتك قالت مسحا نثنيه ثنتين فينام عليه فلما كان ذات ليلة قلت لو ثنيته اربع ثنيات كان أوطأ له فثنيناه باربع ثنيات فلما اصبح قال ما فرشتموني الليلة ؟ قالت قلنا هو فراشك الا انا ثنيناه باربع ثنيات قلنا اوطأ لك قال ردوه لحاله الاولى فانه منعتنى وطأته صلوتي الليلة .
"হাফসা (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হইল, আপনার গৃহে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিছানা কিরূপ ছিল? তিনি বলিলেন, আমি তাঁহাকে একটি চট দুই ভাঁজ করিয়া বিছাইয়া দিতাম। তিনি উহার উপর নিদ্রা যাইতেন। এক রাত্রে আমি মনে করিলাম, চার ভাঁজ করিয়া বিছাইয়া দিলে উহা নরম হইবে। তাই আমি উহা চার ভাঁজ করিয়াই তাঁহাকে শুইতে দিলাম। পরদিন প্রর্তাতে তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, গত রাত্রে তোমরা আমাকে কিরূপ বিছানা দিয়াছিলে? আমরা বলিলাম, আপনার সেই বিছানা, তবে উহা চার ভাঁজ করিয়া দিয়াছিলাম যাহাতে কিছুটা নরম হয়। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, পূর্বের মতই করিয়া দিও। কারণ উহার নরম অবস্থা আমার রাত্রের সালাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিয়াছে” (তিরমিযী, প্রাগুক্ত, হাদীছ নং ৪২৭০)।
নিজ হইতে কেহ আরামদায়ক ভাল বিছানা দিলেও তিনি তাহা গ্রহণ করিতেন না। উদ্বুল মু'মিনীন 'আইশা (রা) হইতে এই মর্মে হাদীছ বর্ণিত আছে:
عن عائشة قالت دخلت على امرأة من الانصار فرأت على فراش رسول الله ﷺ قطيفة مثنية فانطلقت فبعثت الى بفراش خشوه الصوف فدخل على رسول الله ﷺ فقال ما هذا يا عائشة فقلت يا رسول الله فلانة الانصارية دخلت على فرات فراشك فذهبت فبعثت الى بهذا فقال ردّيه قالت فلم ارده وقد اعجبني ان يكون في بيتي حتى قال ذالك ثلاث مرات قالت فقال رديه يا عائشة فوالله لو شئت لاجرى الله معى الجبال ذهبا وفضة .
"আইশা (রা) বলেন, এক আনসারী মহিলা আমার নিকট আসিল এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিছানায় একটি ভাঁজ করা মোটা খসখসে চাদর দেখিল। সে বাড়ী ফিরিয়া গিয়া আমার নিকট একটি বিছানা পাঠাইয়া দিল যাহার ভিতরে ছিল পশম। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ (স) আমার নিকট আসিলেন। তিনি বলিলেন, হে 'আইশা! ইহা কি? আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অমুক আনসারী মহিলা আমার নিকট আগমন করিয়াছিল। সে আপনার বিছানা দেখিয়া বাড়ি ফিরিয়া গিয়া আমার নিকট ইহা পাঠাইয়া দিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, উহা ফেরত দাও। 'আইশা (রা) বলেন, কিন্তু আমি তাহা ফেরত দিলাম না। উহা আমার ঘরে থাকুক, আমি তাহাই পছন্দ করিতেছিলাম। তিনবার তিনি ঐরূপ বলিলেন। আইশা (রা) বলেন, অতঃপর তিনি বলিলেন, ইহা ফেরত দাও হে 'আইশা। আল্লাহ্র কসম! তুমি যদি চাও তবে আল্লাহ তা'আলা পর্বতকে স্বর্ণ বানাইয়া আমার সঙ্গে চলিবার ব্যবস্থা করিয়া দিবেন” (আল-মুনযিরী, আত-তারগীব ওয়াত- তারহীব, ৪খ., ২০১-২০২; ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., ৬২)।
খোদ 'আইশা (রা) একটু আরামদায়ক বিছানা তৈরী করিয়া দিলেও তিনি তাহা সরাইয়া ফেলার নির্দেশ দেন:
عن عائشة قالت كان الرسول الله ﷺ فراش رث غلیظ فاردت ان اجعل له فراشا اخر ليكون اوطأ لرسول الله ﷺ فجعلته فقال ما هذا يا عائشة فقلت رأيت فراشك رثا غلیظا فاردت ان يكون هذا اوطأ لك فقال آخريه اثنتين والله لا اقعد عليه حتى ترفعيه قال فرفعت الأعلى الذي صنعت .
"আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি শক্ত চাদরের বিছানা ছিল। আমি তাঁহাকে আর একটি বিছানা বানাইয়া দিতে ইচ্ছা করিলাম যাহাতে তাহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য একটু আরামদায়ক হয়। অতএব আমি তাহাই করিলাম। তিনি বলিলেন, হে 'আইশা। ইহা কি? আমি
বলিলাম, আমি আপনার শক্ত বিছানা দেখিয়া মনে করিলাম, আপনার জন্য একটু নরম বিছানা হউক। তিনি বলিলেন, উহা সরাইয়া দাও। আল্লাহর কসম! তুমি উহা না উঠানো পর্যন্ত আমি উহাতে বসিব না। রাবী বলেন, তিনি উপর হইতে সে বিছানা উঠাইয়া ফেলিলেন যাহা তিনি বানাইয়াছিলেন” (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৭খ., ৮০)।
একটি রাষ্ট্রের অধিনায়ক হইয়াও তিনি কখনওবা শুধু চাটাইয়ের উপর শুইয়া থাকিতেন, যাহার দাগ পড়িয়া যাইত তাঁহার শরীর মুবারকে যাহা দেখিয়া 'উমার (রা)-এর ন্যায় একজন কঠোর হৃদয়ের সাহাবীও তাঁহার অশ্রু সংবরণ করিতে পারেন নাই। একটি দীর্ঘ হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলেন: فدخلت على رسول الله ﷺ وهو مضطجع على حصير فجلست فادنی علیه آزاره وليس عليه غيره واذا الحصير قد اثر في جنبه فنظرت ببصری خزانة رسول الله ﷺ فاذا انا بقبضة من شعير نحو الصاع ومثلها قرظا في ناحية الغرفة واذا افيق معلق قال فابتدرت عيناي قال ما يبكيك يا ابن الخطاب قلت يا نبي الله وما لي لا ابكي وهذا الحصير قد اثر في جنبك وهذه خزانتك لا ارى فيها الا ما ارى وذاك قيصر وكسرى في الثمار والانهار وانت نبي الله وصفواته وهذه خزانتك قال يا ابن الخطاب الا ترضى ان تكون لنا الآخرة ولهم الدنيا قلت بلى .
"অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রবেশ করিলাম। তখন তিনি একটি চাটাইয়ের উপর কাত হইয়া শোয়া ছিলেন। আমি সেখানে বসিয়া পড়িলাম। তিনি তাঁহার পরনের চাদরখানি তাঁহার শরীরের উপরের দিকে টানিয়া দিলেন। তখন ইহা ছাড়া তাঁহার পরনে অন্য কোন কাপড় ছিল না। তাঁহার বাহুতে চাটাইয়ের দাগ বসিয়া গিয়াছিল। আমি স্বচক্ষে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামানপত্রের দিকে তাকাইলাম। আমি সেইখানে একটি পাত্রে এক সা'-এর কাছাকাছি কয়েক মুষ্টি যব দেখিতে পাইলাম। অনুরূপ সালাম বৃক্ষের কিছু পাতা কামরার এক কোণায় পড়িয়া থাকিতে দেখিলাম। আরও দেখিতে পাইলাম, ঝুলন্ত একখানি চামড়া যাহা পাকা করা হয় নাই। উমার (রা) বলেন, এইসব দেখিয়া আমার চক্ষু অশ্রুসিক্ত হইয়া গেল। তিনি বলিলেন, হে খাত্তাবের পুত্র! কিসে তোমার কান্না পাইয়াছে? আমি বলিলাম, হে আল্লাহ্ নবী! আমি কেন কাঁদিব না! এই যে চাটাই আপনার শরীরে দাগ কাটিয়া দিয়াছে। আর এই হইল আপনার কোষাগার। এখানে সামান্য কিছু যাহা দেখিলাম তাহা ছাড়া তো আর কিছুই নাই। পক্ষান্তরে ঐ যে রোম ও পারস্যের বাদশাহগণ কত বিলাস-ব্যসনে ফলমূল ও ঝরনায় পরিবেষ্টিত হইয়া আড়ম্বরপূর্ণ জীবন যাপন করিতেছে। আর আপনি হইলেন আল্লাহর রাসূল ও তাঁহার মনোনীত পুরুষ। আর এই হইল আপনার কোষাগার! তিনি
বলিলেন, হে খাত্তাবের পুত্র! তুমি কি ইহাতে সন্তুষ্ট নহ যে, আমাদের জন্য রহিয়াছে আখিরাত আর তাহাদের জন্য দুনিয়া? আমি বলিলাম, নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট” (মুসলিম, কিতাবুত তালাক, হাদীছ নং ৩৫৫৪)।
এইভাবে রাসূলুল্লাহ (স)-এর গোটা জীবন পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, খানাপিনা, লেবাস-পোশাক সর্বক্ষেত্রেই তিনি অতি নগণ্য পরিমাণ লইয়াই সন্তুষ্ট ছিলেন এবং সাহাবায়ে কিরামকেও সেই শিক্ষাই দান করিয়াছেন।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর দৃঢ়চিত্ততা
পবিত্র কুরআনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূলদের প্রশংসা করা হইয়াছে। মহানবী (স)-কে উদ্দেশ্য করিয়া আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُوا الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ وَلَا تَسْتَعْجِلْ لَهُمْ. "আপনি ধৈর্য ধারণ করুন যেমন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন রাসূলগণ ধৈর্য ধারণ করিয়াছেন এবং তাহাদের বিষয়ে তড়িঘড়ি করিবেন না" (৪৬: ৩৫)।
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এবং খাতিমুল-আম্বিয়া বা সবশেষ নবী হিসাবে আল্লাহ তা'আলা এই পবিত্র গুণটি তাঁহাকে প্রদান করিয়াছিলেন। শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত ইসলামের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে তিনি কথা ও কাজে এমন দৃঢ়তার পরিচয় দিয়াছিলেন যাহা অন্য কাহারও পক্ষে সম্ভব নহে। আরব মরুর প্রতিটি ধূলিকণা যেন প্রতিবন্ধকতার পাহাড়-সম হইয়া তাঁহার সামনে দাঁড়াইয়াছিল। কিন্তু নবৃওয়াতের মর্যাদা এবং আল্লাহপ্রদত্ত দৃঢ়তার কাছে এইগুলি হুমড়ি খাইয়া পড়িয়া যাইত এবং বিরুদ্ধবাদীদের সকল ক্ষমতা ও শক্তি ইহার সামনে ভাঙ্গিয়া খান খান হইয়া যাইত। তাঁহার কর্মতৎপর জীবনে এইরূপ বহু সংকটজনক পরিস্থিতির উদ্ভব হইয়াছে যখন তাঁহার দৃঢ়চিত্ততা ও অটল সংকল্পের অভিব্যক্তি ঘটিয়াছে।
রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাঁহার কাজ যথারীতি চালাইয়া যাইতে লাগিলেন এবং লোকজনকে আল্লাহর দীনের দিকে আহ্বান করিতে লাগিলেন তখন কুরায়শদের আক্রোশও দিন দিন বাড়িয়া যাইতে লাগিল। তাঁহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর তীব্র সমালোচনায় মাতিয়া উঠিল এবং পরস্পরকে তাঁহার বিরুদ্ধে উস্কানী দিতে আরম্ভ করিল। তাহারা আবু তালিবের কাছে উপস্থিত হইয়া বলিল, হে আবূ তালিব! আপনি আমাদের মধ্যে প্রবীণ ও মুরব্বী। আমরা আপনাকে শ্রদ্ধা ও মান্য করি। আমরা বলিয়াছিলাম, আপনার ভাতিজাকে নিষেধ করুন, কিন্তু আপনি তাহা করিলেন না। আল্লাহ্র কসম! আমরা তাঁহাকে এইভাবে আর চলিতে দিতে পারি না। সে আমাদের দেব-দেবীর নিন্দা ও আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে বোকামী ঠাওরানোর যে দৃষ্টতা প্রদর্শন করিতেছে তাহা আমরা আর সহ্য করিতে পারি না। এখন হয় আপনি তাহাকে নিবৃত্ত করুন, নচেৎ আমরা আপনাকেসহ তাঁহার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইব এবং একপক্ষ ধ্বংস হইয়া যাওয়ার আগে আর থামিব না। তখন আবূ তালিব রাসূলুল্লাহ (স)-কে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন:
يا ابن اخي ان قومك قد جاءونى فقالوا لى كذا وكذا للذى كانوا قالوا له فابق على وعلى نفسك ولا تحملني من الامر لا أطيق.
“হে ভাতিজা! তোমার সম্প্রদায় আমার নিকট আসিয়া এইভাবে এইভাবে বলিয়াছে। অতএব অবস্থা এই পর্যায়ে উপনীত হইয়াছে। কাজেই তুমি নিজেকে সংযত করিয়া চল। আমার উপর আমার সাধ্যের বেশি কোন কিছু চাপাইয়া দিও না”।
রাসূলুল্লাহ (স) ভাবিলেন, চাচা মত পাল্টাইয়া ফেলিয়াছেন এবং কুরায়শদের মুকাবিলায় তাঁহাকে সাহায্য করিতে অক্ষম হইয়া পড়িয়াছেন।
ইহা ছিল তাঁহার চিন্তা ও চেতনার শেষ সময় এবং দৃঢ়তা ও অটলতার সর্বশেষ পরীক্ষা। এই সময় তাহার কথার প্রত্যুত্তরে তিনি যেই সকল কথা বলিয়াছেন, এই নিখিল বিশ্বে দৃঢ়তা ও দৃঢ়চিত্ততার জন্য ইহার চেয়ে বেশি কিছু প্রত্যাশা করা অবান্তর। তিনি বলিলেন, চাচাজান! والله لو وضعوا الشمس في يمينى والقمر في يسارى على ان أترك هذا الأمر حتى يظهره الله او أهلك فيه ما تركته.
“আল্লাহ্র শপথ! যদি তাহারা (কুরায়শরা) আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চন্দ্রও আনিয়া দেয় তবুও আমি দীন প্রচার হইতে বিরত থাকিব না—যেই পর্যন্ত এই প্রচারের দায়িত্ব শেষ না হইবে কিংবা আমার মৃত্যু না ঘটিবে"।
একদা কুরায়শ নেতাগণ কা'বা শরীফের নিকট জমায়েত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে আহ্বান করিলে তিনি সেইখানে উপস্থিত হইলেন। তাহারা বলিল, “হে মুহাম্মাদ! তোমার সাথে কিছু কথা বলিবার জন্য আমরা তোমাকে ডাকিয়া পাঠাইয়াছি। আল্লাহর শপথ! তুমি তোমার সম্প্রদায়ের মধ্যে যে বিভেদ সৃষ্টি করিয়াছ তেমন আর কোন আরব কখনও করিয়াছে বলিয়া আমাদের জানা নাই। তুমি পূর্বপুরুষদের ভর্ৎসনা করিয়াছ, প্রচলিত ধর্মের নিন্দা করিয়াছ, দেব-দেবীকে গালি-গালাজ করিয়াছ, বুদ্ধিমান লোকদের বোকা ঠাওরাইয়াছ এবং জাতির ঐক্যে ভাঙ্গন ধরাইয়াছ।
“এখন কথা হইল, এইসব কথা বলিয়া তুমি যদি সম্পদ অর্জন করিতে চাও, তাহা হইলে আমরা তোমাকে বিত্তশালী করিয়া দেই। আর যদি পদমর্যাদার প্রত্যাশী হও, তাহা হইলে আমরা তোমাকে নেতা বানাইয়া দেই। অথবা যদি রাজা-বাদশাহ্ হইতে চাও, তাহা হইলে আমরা তোমাকে রাজা বানাইয়া নেই।” রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের এই সকল লোভনীয় প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিলেন, "তোমরা যাহা যাহা বলিয়াছ তাহার কোনটাই আমি চাই না। আমার দাওয়াতের উদ্দেশ্য এই নয় যে, আমি তোমাদের সম্পদ বা পদমর্যাদা চাই কিংবা রাজা হইতে চাই; বরং আমি তোমাদের কাছে রাসূল হিসাবে প্রেরিত হইয়াছি। এখন তোমরা যদি আমার এই দাওয়াত গ্রহণ কর তাহা হইলে ইহা তোমাদের জন্য ইহকালীন শান্তি ও পরাকালীন মুক্তির ফয়সালা হইয়া যাইবে। আর যদি প্রত্যাখ্যান কর তাহা হইলে তোমাদের ও আমার ব্যাপারে আল্লাহর চূড়ান্ত ফয়সালা না আসা পর্যন্ত আমি ধৈর্য ধারণ করিব"।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর দৃঢ়চিত্ততার আরো সমুজ্জ্বল নিদর্শন পাওয়া যায় তাঁহার শি'বে আবী তালিব-এ অবস্থানকালীন সময়ে। কুরায়শগণ যখন দেখিতে পাইল যে, প্রতিরোধ, নির্যাতন ও নৃশংসতায় কিছুই হইতেছে না বরং দিন দিন ইসলামের দাওয়াত সম্প্রসারিত হইতেছে। ইতোমধ্যে হযরত উমার (রা) ও হযরত হামযা (রা)-এর মত ব্যক্তিত্ব ঈমান আনয়ন করিয়াছেন। নাজাশীও মুসলমানদিগকে আশ্রয় দান করিয়াছেন। তাই তাহারা এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল যে, মুসলমানদিগকে অবরুদ্ধ করিয়া ধ্বংস করিয়া ফোলতে হইবে। এই উপলক্ষে মক্কার সকল গোত্র একজোট হইয়া চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করিল। শর্ত ছিল কোন ব্যক্তি হাশেমী গোত্রের সাথে কোন প্রকার আত্মীয়তা স্থাপন করিবে না, তাহাদের কাছে কোন প্রকার জিনিস-পত্র বেচা-কেনা করিবে না তাহাদের সহিত মিলিত হইবে না, তাহাদের কাছে কোন প্রকার পানাহার সামগ্রী যাইতে দিবে না, যতক্ষণ না তাহারা হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে হত্যার জন্য কুরায়শদের হস্তে সমর্পণ করিবে। এই চুক্তিপত্রটি মানসূর ইবন ইকরিমা লিখিয়া কা'বা শরীফের দেওয়ালে টানাইয়া দিল।
আবু তালিব বাধ্য হইয়া খান্দানের সকল সদস্যসহ 'শি'বে আবী তালিব'-এ আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। দীর্ঘ তিন বৎসর বানু হাশিম গোত্র অবরুদ্ধ জীবন যাপন করিল। হাদীছ শরীফে বর্ণিত আছে, মুসলমানগণ সেই সময় কাটাযুক্ত গাছের পাতা ভক্ষণ করিয়া দিন অতিবাহিত করিতেন, যাহার ফলে তাঁহাদের অনেকের মল ছাগলের মলের ন্যায় হইয়া গিয়াছিল। এত প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও মহানবী (স) দীন প্রচার হইতে একটুও পিছপা হন নাই। ইহা হইতে অধিক দৃঢ়চিত্ততার উদাহরণ আর কি-ইবা হইতে পারে?
হিজরতের পূর্বে একবার সাহাবীগণ কাফিরদের জ্বালা-যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে তাহাদের জন্য বদ-দু'আ করিবার অনুরোধ করিলে তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে বলিলেন:
قَدْ كَانَ مِنْ قَبْلِكُمْ يُؤْخَذُ الرَّجُلُ فَيُحْفَرُ لَهُ فِي الْأَرْضِ ثُمَّ يُؤْتَى بِالْمِنْشَارِ فَيُجْعَلُ عَلَى رَأْسِهِ فَيُجْعَلُ فِرْقَتَيْنِ مَا يَصْرِفُهُ ذَالِكَ عَنْ دِيْنِهِ وَيُمَشِّطُ بِأَمْشَاطِ الْحَدِيدِ مَا دُوْنَ عِظَمِهِ مِنْ لَحْمٍ وَعَصَبٍ مَا يَصْرِفُهُ ذَالِكَ عَنْ دِيْنِهِ - وَاللهِ لَيُتِمَّنَّ اللهُ هَذَا لْأَمْرَ حَتَّى يَسِير الرَّاكِبُ مَا بَيْنَ صَنْعَاءَ وَحَضْرِ مَوْتَ مَا يَخَافُ إِلَّا اللهَ تَعَالَى.
"তোমাদের পূর্বে যেই সকল ধর্মপরায়ণ লোক চলিয়া গিয়াছে, তাহাদের জন্য মাটিতে গর্ত খনন করা হইত। অতঃপর তাহাদেরকে করাত দ্বারা চিরিয়া দুই টুকরা করিয়া ফেলা হইত। কিন্তু তবুও ইহা তাহাদিগকে ধর্মচ্যুত করিতে পারিত না। তাহাদের শরীরে লোহার চিরুনী চালনা করা হইত যাহার ফলে দেহ হইতে চর্ম বিচ্ছিন্ন হইয়া যাইত। তবুও ইহা তাহাদিগকে ধর্মচ্যুত করিতে পারিত না। আল্লাহর শপথ! দীন ইসলাম পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করিবেই। এমনকি সান'আ হইতে হাদারামাওত পর্যন্ত ভ্রমণকারিগণ নির্ভয়ে চলিয়া আসিবে। তাহাদের অন্তরে আল্লাহ ব্যতীত আর কাহারও ভয় থাকিবে না"। কী পরিমাণ দৃঢ়চিত্ত হইলে এই ধরনের উক্তি করিতে পারেন তাহা সহজেই অনুমেয়।
বদর যুদ্ধসহ সকল যুদ্ধে (হুনায়ন যুদ্ধে ব্যতীত) মুসলিম বাহিনীর তুলনায় শত্রু সৈন্য ছিল কয়েক গুণ বেশী। তথাপি রাসূলুল্লাহ (স) এক মুহূর্তের জন্যও তাঁহার সংকল্পে বিচলিত হন নাই বরং দৃঢ়চিত্তে এই সকল যুদ্ধ মুকাবিলা করিয়াছেন। বদর যুদ্ধে যখন তিন শত তেরজন মুসলিম সৈন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র-শস্ত্রহীন অবস্থায় এক হাজার সশস্ত্র কাফির সৈন্যের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে লিপ্ত হইলেন। তখন কাফির বাহিনী সংখ্যাধিক্য ও শক্তির দাপটে মুহুর্মুহু আক্রমণ করিতেছিল এবং মুসলিম বাহিনী আত্মরক্ষামূলক কৌশল অবলম্বন করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সন্নিকটে ব্যূহ রচনা করিতেছিলেন, তখনও তিনি দৃঢ়চিত্তে তাহা সম্পূর্ণরূপে মুকাবিলা করিয়াছিলেন।
উদের যুদ্ধে কতিপয় সাহাবীর পরামর্শে মদীনার বাহিরে গিয়া শত্রুদের প্রতিরোধ করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হইলে রাসূলুল্লাহ (স) গৃহে প্রবেশ করিলেন এবং যুদ্ধের বর্ম পরিধান করিয়া বাহিরে আসিলেন। এই দৃশ্য দেখিয়া উপরিউক্ত সাহাবীগণ অনুতপ্ত কণ্ঠে তাঁহাকে তাঁহার ইচ্ছানুযায়ী মদীনায় থাকিয়া প্রতিরোধ করিবার অনুরোধ করিলেন। তখন তিনি দৃঢ়চিত্তে বলিলেন:
لا ينبغي لنبي إذ لبس لأمته ان يضعها حتى يحكم الله بينه وبين أعدائه فانظروا ما امرتکم به فافعلوه وامضوا على اسم الله فلكم النصر ما صبرتم.
"নবী যখন যুদ্ধের বর্ম পরিধান করেন তখন শত্রুদের সাথে আল্লাহ্ একটা ফয়সালা না করিয়া দেওয়া পর্যন্ত তাঁহার উহা পরিত্যাগ করা শোভনীয় নয়। অতএব যেই ব্যাপারে আমি তোমাদিগকে নির্দেশ দিয়াছি তাহা ভাবিয়া দেখ এবং আল্লাহর নামে উহা বাস্তবায়ন কর। তোমাদের জন্যই রহিয়াছে সাহায্য যতক্ষণ তোমরা ধৈর্য ধারণ কর।
হুনায়ন যুদ্ধে হাওয়াযিন গোত্রের বীর সিপাহীরা যখন একযোগে বৃষ্টির মত তীর নিক্ষেপ করিতে শুরু করিল তখন কতিপয় সাহাবী ভীত-বিহবল হইয়া পড়িলেন। কিন্তু মহানবী (স) অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে কয়েকজন সাহসী সাহাবীর সাথে যুদ্ধের ময়দানে অটল ছিলেন। হাদীছ শরীফে বর্ণনাটি নিম্নোক্তভাবে আসিয়াছে:
عن ابي اسحاق سمع البراء وسأله رجل من قيس أفررتم عن رسول الله ﷺ يوم حنين ؟ فقال لكن رسول الله الله لم يفر كانت هوازن رماة وإنا لما حملنا عليهم انكشفرا فاكببنا على الغنائم فاستقبلنا بالسهام ولقد رأيت النبي على بغلته البيضاء وان ابا سفيان بن الحارث اخذ بزمامها وهو يقول انا النبى لا كذب. وفي رواية زاد انا ابن عبد المطلب.
"আবূ ইস্হাক হইতে বর্ণিত। তিনি বারাআ (রা)-কে বলিতে শুনিয়াছেন যে, তাহাকে কায়স গোত্রের জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, হুনায়ন যুদ্ধের দিন আপনারা কি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হইতে পলায়ন করিয়াছিলেন? তিনি বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়ন করেন নাই। হাওয়াযিন গোত্রের লোকগণ ছিল সুদক্ষ তীরন্দাজ। আমরা যখন তাহাদের উপর আক্রমণ করিলাম তখন তাহারা ছত্রভঙ্গ হইয়া পালাইতে আরম্ভ করিল। আমরা যখন গনীমত সংগ্রহ করিতে শুরু করিলাম ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা (অতর্কিতভাবে) তাহাদের তীরন্দাজ বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হইলাম। তখন আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাঁহার সাদা বর্ণের খচ্চরটির উপর আরোহিত অবস্থায় দেখিয়াছি আর আবূ সুফ্যান ইবনুল হারিছ তাঁহার খচ্চরের লাগাম ধরিয়াছিলেন। তখন তিনি বলিয়াছিলেন, আমি আল্লাহর নবী, ইহাতে কোন মিথ্যা নাই। আবু ইসহাকের অপর বর্ণনায়: আমি তো আবদুল মুত্তালিবের সন্তান"।
তাঁহার এই সুদৃঢ় মনোবল ও দৃঢ় সংকল্প মুসলমানদের অনুকূলে যুদ্ধের মোড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়াছিল।
অপর একটি ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর দৃঢ়চিত্ততার একটি বিরল দৃষ্টান্ত পরিলক্ষিত হয়। রাসূলুল্লাহ (স) নাজদ এলাকায় কোন এক যুদ্ধশেষে প্রত্যাবর্তনকালে একটি বাবলা গাছের নিচে অবস্থান করিয়া তরবারিখানা গাছে লটকাইয়া রাখিলেন। এমন সময় এক কাফির তাঁহার ঘুমন্ত অবস্থার সুযোগে শাণিত তরবারি উত্তোলন করিয়া বলিল, হে মুহাম্মাদ!
من يمنعك منى ؟ قلت له الله. "এখন তোমাকে আমার হাত হইতে কে রক্ষা করিবে? তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন, আল্লাহ!"।
এই দৃঢ়তা, নির্ভয়তা, সাহস ও বীরত্ব অবলোকন করিয়া কাফির এতই ভীত-সন্ত্রস্ত হইল যে, তৎক্ষণাত তাহার হাত হইতে তরবারিটি পড়িয়া গেল। মহানবী (স) তরবারিখানা উত্তোলন করিয়া বলিলেন, এখন তোমাকে আমার হাত হইতে কে রক্ষা করিবে? সে বলিল, আপনি আমাকে ক্ষমা করিয়া উত্তম তরবারি ধারণকারী হওয়ার পরিচয় দিন। অতঃপর তিনি তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিলেন। এই উপবিষ্ট ব্যক্তিই হইল সেই ব্যক্তি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার কোন প্রতিশোধ গ্রহণ করেন নাই।
হিজরতের প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (স) যখন আবু বকর (রা)-কে নিয়া ছওর পর্বতের গুহায় অবস্থান করিতেছিলেন তখন কাফিররা তাঁহাদের খোঁজে গুহার নিকটবর্তী হইলে আবু বকর (রা) মহানবী (স)-কে বলিলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি তাহাদের কেহ পা উঠায় তাহা হইলে আমাদিগকে দেখিয়া ফেলিবে। জবাবে রাসূলুল্লাহ (স) যাহা বলিলেন দৃঢ়চিত্ততা প্রমাণের জন্য ইহা হইতে বড় উক্তি আর কী-ই-বা হইতে পারে? তিনি বলিলেন:
ما ظنك باثنين الله ثالثهما ؟
"এমন দুইজন সম্পর্কে তোমার ধারণা কি যাহাদের তৃতীয়জন স্বয়ং আল্লাহ” (ইমাম বুখারী, আস-সাহীহ্, পৃ. ৯৭০)।
আর উক্ত ঘটনাটি আল্লাহ রব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করিয়াছেন। তিনি বলেন:
إِلَّا تَنْصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْهُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا فَأَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُودٍ لَمْ تَرَوْهَا .
“যদি তোমরা তাহাকে (রাসূলকে) সাহায্য না কর তবে (মনে রাখিও) আল্লাহ তো তাহাকে সাহায্য করিয়াছিলেন যখন কাফিররা তাহাকে (মক্কা হইতে) বহিষ্কার করিয়াছিল। তিনি ছিলেন দুইজনের দ্বিতীয় দ্বিতীয়জন যখন তাহারা গুহার মধ্যে ছিলেন। তিনি তখন তাহার সঙ্গীকে বলিয়ালেন, বিষণ্ণ হইও না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁহার প্রতি স্বীয় প্রশান্তি অবতীর্ণ করিলেন এবং তাঁহাকে শক্তিশালী করেন। এমন এক সৈন্য বাহিনী দ্বারা যাহা তোমরা দেখ নাই” (৯:৪০)।
হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত উছমান (রা)-কে আবূ সুফ্যান ও অন্যান্য কুরায়শ নেতাদের সাথে দেখা করিবার জন্য প্রেরণ করিলেন। তাহারা বলিল, দেখ উছমান! তুমি যদি কা'বা তাওয়াফ করিতে চাও তবে তাওয়াফ করিয়া লও।' উছমান (রা) বলিলেন, 'রাসূলুল্লাহ (স) তাওয়াফ না করা পর্যন্ত আমি তাওয়াফ করিব না।' ইহাতে কুরায়শরা ক্ষিপ্ত হইয়া হযরত উছমান (রা)-কে আটক করিয়া রাখিল।
ঐদিকে রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানদের নিকট এই সংবাদ পৌঁছিল যে, হযরত উছমান (রা) শাহাদাত বরণ করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) এই সংবাদ শোনামাত্র অল্প সংখ্যক সাহাবী থাকা সত্ত্বেও দৃঢ়চিত্তে বলিলেন, لا نبرح حتى نناجز القوم “কুরায়শদের সাথে লড়াই না করিয়া এই স্থান ত্যাগ করিব না” এই বলিয়া মুসলমানদিগকে লড়াইয়ের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করাইলেন যেইটিকে আমরা بيعة الشجرة বা بيعة الرضوان বলিয়া থাকি। রাসূলুল্লাহ (স)-এর তাৎক্ষণিক এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও দৃঢ়চিত্ততা আল্লাহ্র নিকট এতই পছন্দ হইল যে, তিনি তাঁহার প্রশংসা করিয়া পবিত্র কুরআনের আয়াত নাযিল করিলেন:
لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنْزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَآثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا
"আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হইলেন যখন তাহারা বৃক্ষের নীচে আপনার কাছে বায়'আত গ্রহণ করিল। তাহাদের অন্তরে যাহা ছিল তাহা তিনি অবগত ছিলেন। অতঃপর তিনি তাহাদের প্রতি প্রশান্তি নাযিল করিলেন এবং তাহাদিগকে আসন্ন বিজয় দান করিলেন" (৪৮: ১৮)।
তাঁহার এই ধরনের অসংখ্য দৃঢ়চিত্ততার উদাহরণ আমাদিগকে দৃঢ়চিত্ত হইতে পথ-নির্দেশ করে।