📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর ৯টি তরবারি ছিল

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর ৯টি তরবারি ছিল


১. আল-মাছুর; ২. আল-আদাব; ৩. যুল-ফিকার; ৪. কালঈ; ৫. আল-বিতার; ৬. আল- খানাফ; ৭. আর-রাসূব; ৮. আল-মিখদাম; ৯. আল-কুদায়ব। এইগুলির মধ্যে যুল-ফিকার তলোয়ারটি হযরত আলী (রা)-কে উপহার প্রদান করেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬৭)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি খাট ছিল। এই খাটটি হযরত আস'আদ ইব্‌ন যুরার। (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে হাদিয়াস্বরূপ প্রদান করিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬৯)।
উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা জানিতে পারিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (স) বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ, পরিচিত-অপরিচিত, প্রতিবেশী, সাহাবী ও আত্মীয়-স্বজনকে হাদিয়া বা উপঢৌকন প্রদান করিতেন। সাহাবীগণ ও বিভিন্ন দেশের মুসলিম-অমুসলিম শাসকগণ তাঁহার
নিকট উপঢৌকন প্রেরণ করিতেন, তিনি তাহা গ্রহণও করিতেন। হাদিয়া-তোহফা আদান- প্রদানের মাধ্যমে তাঁহারা ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হইয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই সুন্নত বা উত্তম আদর্শের আমল এখন বিলীন প্রায়। আমরাও যদি আমাদের প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও বিভিন দেশের রাজা-বাদশাহকে উপঢৌকন প্রদান করি, তহা হইলে আমরাও ভালবাসার সেই বন্ধনে আবন্ধ হইতে পারিব।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর কঠোরতা বর্জন

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর কঠোরতা বর্জন


কোমলতা আর কঠোরতা মানুষের দুইটি বিপরীতমুখী স্বভাবজাত প্রবৃত্তি। কোমলতা মানুষকে করে সুজন আর কঠোরতা করে দুর্জন। মানুষ সুজনের সহিত সখ্যতা করে আর দুর্জনের নিকট হইতে অবস্থান করে অনেক দূরে। মহানবী (স) ছিলেন বিশ্বমানবতার মহান শিক্ষক। তাই কোমলতাই ছিল তাঁহার আখলাকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি কঠোরতা পরিহার করার শিক্ষা প্রদান করিয়াছেন। নিজেও সদা-সর্বদা কঠোরতাকে বর্জন করিয়া চলিতেন। অবশ্য ধর্মীয় অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন বজ্রকঠোর।
হযরত মু'আয ইব্‌ন জাবাল (রা) বাস করিতেন পল্লীর এক নিভৃত মহল্লায়। তিনি ফজরের সালাতে তিলাওয়াত করিতেন দীর্ঘ কিরাআত। এক আনসার ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট তাঁহার বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করিলেন যে, তিনি সালাত আদায়কালে অতি দীর্ঘ কিরাআত তিলাওয়াত করেন যদ্দরুন তাঁহার পশ্চাতে সালাত আদায় করিতে আমি কষ্ট বোধ করি। হযরত আবূ আয়্যুব আনসারী (রা) বলেন, আমি ইতোপূর্বে রাসূলুল্লাহ (স)-কে এত রাগান্বিত হইতে দেখি নাই যেমনটি এই অভিযোগ শোনার পর তিনি হইয়াছিলেন। জনগণের প্রতি লক্ষ্য করিয়া তিনি বলিলেনঃ 'এমন কতক লোক আছে যাহারা মানুষকে বিরাগভাজন করিয়া তোলে। তোমাদের মধ্যে যাহারা ইমাম হইয়া সালাত আদায় করে তাহারা যেন সংক্ষেপে সালাত আদায় করে। কারণ সালাতে বৃদ্ধ, দুর্বল ও শ্রমজীবী লোকও অংশগ্রহণ করিয়া থাকে (আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুননবী, ২খ., পৃ. ৩২১)।
উম্মতের জন্য কঠোর অথবা অপসন্দনীয় হইবে এমন বিষয়গুলিও তিনি সহজতর করিয়া দিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, আমার উম্মতের ন্য কঠিন হইবে এমন আশঙ্কা যদি না করিতাম তাহা হইলে আমি প্রত্যেক সালাতের সময় তাহাদেরকে মেসওয়াক করিবার আদেশ করিতাম (আবূ দাউদ, ১খ., পৃ. ৪২)। তিনি স্বয়ং পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের সময় মেসওয়াক ব্যবহার করিতেন। তিনি বলিয়াছেন, 'তোমার সাধ্যে 'যাহাই সম্ভব হইবে তাহাই করিবে' (ফাতহুল-বারী, ১১খ., পৃ. ২৫১)। ইবাদত-বন্দেগীতে তিনি কঠোরতা পরিহার করিবার উপদেশ দিতেন। রাত্রি জাগিয়া জাগিয়া সালাত আদায় করিতেও তিনি নিষেধ করিতেন। যেমন, হযরত 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন আমর ইবন আল-আস
(রা) একবার বলিলেন, আমি রাত জাগিয়া সালাত আদায় করিব। মহান রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে রাত্রি জাগরণ করিয়া সালাত আদায় করিতে নিষেধ করিলেন।
আরবে সাহরী ও ইফতার ব্যতিরেকেই বিরতিহীনরূপে রোযা রাখার প্রথা পূর্ব হইতেই প্রচলিত ছিল। মহান রাসূল (স)-এর মান্যবর সহচরবৃন্দও এইরূপ রোযা রাখার ইচ্ছা পোষণ করিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদিগকে এইরূপ করিতে কঠোরভাবে নিষেধ করিয়াছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আমর (রা) ছিলেন একজন দৃঢ় মনোভাব সম্পন্ন ব্যক্তি। তিনি অঙ্গীকার করিয়াছিলেন যে, দিনভর রোযা রাখিবেন এবং সারারাত অতিবাহিত করিবেন ইবাদত-বন্দেগীতে। বিষয়টি মহানবী (স)-এর গোচরীভূত হইলে তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমরকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ব‍্যাপারটা কি সত্য? তিনি আরয করিলেন, হ্যাঁ। তিনি বলিলেন, তোমার দেহের একটি হক আছে, চোখের হক আছে, স্ত্রী-পরিবারেরও একটি হক আছে। কাজেই প্রতিমাসে তিন দিন রোযা রাখাই তোমার জন্য যথেষ্ট হইবে। ইহাতে হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা) আরয জানাইলেন, আমি ইহা অপেক্ষা অধিক রোযা রাখিতে সক্ষম। এরশাদ হইল, আচ্ছা ঠিক আছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর আরয করিলেন, আমি ইহা অপেক্ষা আরও অধিক রোযা রাখিতে সক্ষম। তিনি বলিলেন, ঠিক আছে, তুমি একদিন পরপর রোযা রাখিবে। নবী দাউদ (আ) এই ভাবেই রোযা রাখিতেন। আর এই ভাবে নফল রোযা রাখাই উত্তম (মুহাম্মদ ইব্‌ন ইসমাঈল, আস-সাহীহ, ১খ., পৃ. ২৬৫)।
একদা হযরত আবূ হুরায়রা (রা) রাসূলুল্লাহ (স) সমীপে উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (স)! আমি একজন নবীন যুবক, আমার বিবাহ করিবার সামর্থ্য নাই। আবার প্রবৃত্তির দিক হইতেও আমি সম্পূর্ণ নিরাপদ নই। রাসূলুল্লাহ (স) চুপ করিয়া রহিলেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) পুনরায় একই আবেদন পেশ করিলেন। এবারেও তিনি নিশ্চুপ রহিলেন। অতঃপর হযরত আবূ হুরায়রা (রা) তৃতীয়বার আরজী পেশ করিলে রাসূলুল্লাহ (সা) এরশাদ করিলেন, আবু হুরায়রাহ! তোমার ভাগ্য কার্যকর হইবেই। আল্লাহর বিধান টলিতে পারে না (মুহাম্মদ ইব্‌ন ইসমাঈল, সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৭৫৯)। বাহিলা গ্রোত্রের জনৈক ব্যক্তি মহানবী (স)-এর সান্নিধ্যে উপস্থিত হইয়া স্বীয় প্রয়োজন সমাধা পূর্বক নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন। এক বৎসর পর তিনি পুনরায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইলেন, কিন্তু সেই সময় তাঁহার আকার-আকৃতি এমনই পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে চিনিতে পারিতেছিলেন না। তিনি স্বীয় পরিচয় প্রদান করিলে রাসূলুল্লাহ (স) বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি ত খুবই সুন্দর ছিলে। ইতোমধ্যে তোমার স্বাস্থ্য এমন পরিবর্তিত হইল কেন? তিনি আরয করিলেন, আমি- আপনার নিকট হইতে বিদায় লওয়ার পর হইতে বিরতীহীন রোযা রাখিতে শুরু করিয়াছিলাম। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, তুমি এইভাবে নিজেকে শাস্তি দিতেছ কেন? মনে রাখিও, রমযান মাস ব্যতীত প্রতিমাসে একদিন রোযা রাখাই তোমার জন্য যথেষ্ট। তিনি বলিলেন, ইহা অপেক্ষা অধিক রোযা রাখিবার সামর্থ্য আমার
আছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আরও একদিন যোগ করিয়া লও। তিনি আরও অধিক বাড়াইবার জন্য আবেদন করিলেন। মহানবী (স) তিন দিনের অনুমতি প্রদান করিলেন। ইহাতেও তিনি সন্তুষ্ট হওয়াতে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে হারাম চারি মাসের (যিলকদ, যিলহাজ্জ, মুহাররম, রজব) রোযা রাখার অনুমতি প্রদান করিলেন (সুলাইমান ইব্‌ন আশ'আছ, সুনানে আবু দাউদ, পৃ. ২২২)।
হযরত আনাস ইবন মালিক বলেন, একদা তিন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইবাদত-বন্দেগীর প্রকৃতি জানার জন্য উম্মাহাতুল মু'মিনীনদের নিকট উপস্থিত হইল। তাহারা তাঁহার ইবাদতের প্রকৃতি সম্পর্কে জানিতে চাহিলে তাহাদিগকে উহা জানানো হইল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইবাদত-বন্দেগী তাহাদের নিকট অপ্রতুল মনে হইল। তাহারা বলিতে নাগিল, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত আমাদের কি কোন তুলনা হইতে পারে? আল্লাহ পাক তাঁহার পূর্বাপর যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি মার্জনা করিয়া দিয়াছেন। তাহাদের মধ্য হইতে একজন বলিল, আমি রাতভর সালাত আদায় করিব। অপর একজন বলিল, আমি জীবনভর বিরতীহীন রোযা রাখিব। অপর জন বলিল, আমি জীবনে বিবাহই করিব না। ইত্যবসরে সেখানে মহানবী (স)-এর শুভাগমন ঘটিল। তিনি বলিলেন, তোমরা এই ধরনের কথাবার্তা বলিতেছিলে, তাই না? তিনি আরও বলিলেন, আল্লাহর শপথ, আমি তোমাদের অপেক্ষা আল্লাহকে অধিক ভয় করি, সমীহও করি। তবু আমি রোযাও রাখি, পানাহারও করি। সালাত আদায় করি, আবার নিদ্রাও যাই। বিবাহও করিয়াছি। তবে যে আমার সুন্নত অনুসরণ করে না, সে আমার দলভুক্ত নহে (মুহাম্মদ ইব্‌ন ইসমাঈল, আস্-সাহীহ, ২খ., পৃ. ৭৫৭; ইবন সা'দ, আত্-তাবাকাতুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৩৭২)।
তাবুক যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তন পথে একজন সাহাবী একটি কূপের সন্ধান পাইলেন, কূপে প্রচুর পানি। ছায়াঘন নিরিবিলি জায়গা। আশেপাশে কতকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পল্লী। মনোরম পরিবেশ। এক সাহাবী রাসূলূল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া নিবেদন জানাইলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! আমি একটি কূপের সন্ধান লাভ করিয়াছি। সেখানে প্রয়োজনীয় পানি বিদ্যমান আছে বলিয়া আমার ধারণা। সদয় অনুমতি পাইলে সেখানে আমি একাকী জীবন যাপন করিতে পারি। এই অভিশপ্ত দুনিয়ার সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া দিতে চাই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, আমি ইয়াহুদীবাদ ও খৃস্টাবাদের ন্যায় বৈরাগ্য লইয়া আবির্ভূত হই নাই, বরং আমি লইয়া আসিয়াছি সহজতর আরামপ্রদ মাযহাবে ইব্রাহীমি (আহমদ ইব্‌ন হাম্বল, মুসনাদ, ৫খ., পৃ. ২৬৬)।
রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন 'রাহমাতুল লিল-আলামীন'-দয়া ও করুণার আধার। ধারণা করা যায় না যে, মানুষের ব্যবহারিক জীবনে তিনি সহজতর পন্থা পরিহার করিয়া কঠিনতর পন্থার প্রবর্তন করিবেন। তাঁহার উম্মতগণ কষ্টসাধ্য ইবাদতের মানত করিলেও সেক্ষেত্রে তিনি সহজতর পন্থা অবলম্বন করার পরামর্শ দান করিয়াছেন। যেমন, মক্কা বিজয়ের দিন এক ব্যক্তি তাঁহার সান্নিধ্যে উপস্থিত হইয়া আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (স)। আমি মানত করিয়াছিলাম, আল্লাহ পাক আপনাকে মক্কা মু'আজ্জামার বিজয় দান করিলে আমি বায়তুল-মাকদিসে সালাত আদায় করিব। তিনি বলিলেন, তুমি এইখানেই সালাত আদায় করিবে। লোকটি দুইতিন
বার তাঁহার আবেদনের পুনরাবৃত্তি করিলেন। পরিশেষে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন ঠিক আছে, তুমি যাহা ভাল বুঝ তাহাই কর (আবু দাউদ, সুলায়মান ইব্‌ন আশআছ, সুনান আবু দাউদ, ৩খ., ৬০২)।
হযরত আবু হুরায়রা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন,-মসজিদে হারাম ব্যতীত পৃথিবীর অন্যান্য যে কোন মসজিদ অপেক্ষা আমার মসজিদে (নববীতে) পঠিত সালাতের মর্যাদা এক হাযার গুণ বেশী। হযরত আনাস কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছেন, স্বগৃহে আদায়কৃত সালাত অপেক্ষা লোকালয়ের মসজিদে সালাত আদায়ের গুরুত্ব পঁচিশ গুণ বেশি। আর জামে মসজিদে পাঁচ শত গুণ মসজিদে আকসায় এক হাজার গুণ বেশি। আমার মসজিদে পঞ্চাশ হাজার গুণ আর মসজিদে হারামে এক লক্ষ গুণ বেশী (আবূ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ, আল-মিশকাতুল মাসাবীহ, পৃ. ৭২)। উল্লেখ্য যে, মর্যাদার বর্ণিত তারতম্য ফরয সালাতের ক্ষেত্রে, নফল সালাতের ক্ষেত্রে নহে। হযরত যায়দ ইব্‌ন ছাবিত কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছেন, ফরয নামায ব্যতীত অন্যান্য সালাত আমার মসজিদে আদায় করা অপেক্ষা স্বগৃহে আদায় করাই উত্তম (আবূ ঈসা মুহম্মদ ইব্‌ন ঈসা, জামিউত্-তিরমিযী, ২খ., পৃ. ১৪৭)।
হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ভাষণ দান কালে একবার দেখিলেন, এক ব্যক্তি রৌদ্রে দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। তিনি লোকটির রৌদ্রে দাঁড়াইবার কারণ জানিতে চাহিলেন। তখন উপস্থিত জনতার মধ্য হইতে একজন বলিল, আবূ ইসরাঈল মানত করিয়াছে যে, সে রোযা পালন কালে বৃক্ষ ছায়াতে উপবেশন করিবেনা এবং কাহারও সহিত কথা বলিবে না। তাই সে রৌদ্রে দণ্ডায়মান। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, লোকটিকে বলিয়া দাও, সে যেন বৃক্ষ ছায়াতে উপবেশন করে, জনগণের সহিত কথাবার্তা বলে এবং রোযাও পালন করে (মুহাম্মদ ইব্‌ন ইসমাঈল বুখারী, সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৯৯১)।
হযরত উকবা ইব্‌ন আমির জুহানী বর্ণনা করেন, একবার আমার ভগ্নি মানত করিল যে, সে অনাবৃত মস্তকে ও নগ্ন পায়ে হাঁটিয়া হজ্জ করিবে। হজ্জ পালনের সময় তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স) দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ব্যাপার কি? এই অবস্থায় যাত্রা করিয়াছ কেন? তাহার সহযাত্রীদের মধ্য হইতে একজন জানাইল-সে এইরূপ অবস্থায় হজ্জ পালনের মানত করিয়াছে। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) নির্দেশ দিলেন, তাহাকে বলিয়া দাও- সে যেন বাহনে আরোহন করে এবং মস্তকও আবৃত করে (মুহাম্মদ ইব্‌ন ইসমাঈল, সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৯৯১; সুলায়মান ইব্‌ আশ'আছ, সুনান আবু দাউদ, ৩খ., পৃ. ৫৯৬)।
হযরত ইব্‌ন আব্বাস কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সা) লক্ষ্য করিলেন-এক লোক তাহার দুই পুত্রের কাঁধে ভর করিয়া হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কাভিমুখে যাত্রা করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, লোকটি এইভাবে চলিয়াছে কেন? জনৈক সাহাবী জবাব দিলেন, সে এই অবস্থাতেই হজ্জব্রত পালন করার মানত করিয়াছে। মহানবী (সা) বলিলেন,
মহান আল্লাহ্র কি প্রয়োজন লোকটিকে এইরূপ শাস্তি দেওয়ার। অতঃপর তিনি লোকটিকে বাহনের উপর আরোহন করার নির্দেশ দিলেন (মুহাম্মদ ইব্‌ন ইসমাঈল, সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৯৯২; আবু দাউদ সুলায়মান ইব্‌ন আশ'আছ, সুনানে আবু দাউদ, ৩খ., পৃ. ৫৯৯)।
লক্ষ্য করা যায়, অপরাধের দণ্ডবিধি কার্যকর করার ক্ষেত্রে মহানবী (স) অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করিতেন। সর্বদা আসামীর পক্ষ অবলম্বন করিয়া কঠোরতা পরিহার করিতেন, দণ্ডবিধানের সহজতর উপায় উদ্ভাবনের চেষ্টা করিতেন। অনেক ক্ষেত্রে মার্জনা করিয়াও দিতেন।
বর্ণিত আছে, মা'ইয আসলামী নামক এক ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হইয়া বিচার প্রত্যাশায় রাসূলুল্লাহ (স) সমীপে মসজিদে নববীতে উপস্থিত হইলেন। তিনি আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি অপকর্ম করিয়া ফেলিয়াছি। তিনি তাঁহার চেহারা মোবারক অন্যদিকে ফিরাইয়া লইলেন। লোকটি পুনরায় তাঁহার সম্মুখে গিয়া বলিলেন, আমি ব্যভিচার করিয়া ফেলিয়াছি। হে আল্লাহর রসূল (স)। আপনি প্রতিবিধান করুন। তিনি পুনরায় তাঁহার পবিত্র মুখমণ্ডল ফিরাইয়া লইলেন। লোকটি আবারও তাঁহার সম্মুখে আগমন করিয়া বলিলেন, আমি ব্যভিচার করিয়া ফেলিয়াছি। হে আল্লাহর রাসূল (স)! আপনি বিচার করুন। এইবার রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি পাগল নওতো। তিনি বলিলেন, না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি বিবাহ করিয়াছ? তিনি বলিলেন, হ্যাঁ। অতঃপর জিজ্ঞাসা করিলেন, সম্ভবত তুমি শুধু স্পর্শ করিয়াছ। তিনি বলিলেন, না, বরং আমি অপকর্মই করিয়াছি। অবশেষে নিরুপায় হইয়া রাসূলুল্লাহ (স) লোকটিকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করিবার নির্দেশ প্রদান করিলেন (ওয়ালী উদ্দীন ইব্‌ন মুহাম্মদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ, মিশকাতুল-মাসাবীহ, পৃ. ৩১০)।
বর্ণিত হইয়াছে, একদা জনৈকি ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (س)-এর সান্নিধ্যে উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (س)! আমি পাপ করিয়াছি, আপনি অনুগ্রহ পূর্বক বিচার করুন। রাসূলুল্লাহ (স) নিশ্চুপ রহিলেন। সালাতের সময় হইল। সালাত সুসম্পন্ন হওয়ার পর লোকটি পুনরায় আবেদন পেশ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন-তুমি কি সালাত আদায় কর নাই? তিনি উত্তর করিলেন, হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, আল্লাহ পাক তোমার পাপ মার্জনা করিয়া দিয়াছেন (মুহাম্মদ ইব্‌ন ইসমাঈল, সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ১০০৮)।
বর্ণিত হইয়াছে, গামিদ গোত্রের এক মহিলা রাসূলুল্লাহ (س) সমীপে উপস্থিত হইয়া জানাইলেন, আমি অশ্লীল কর্ম করিয়াছি। তিনি বলিলেন, যাও। মহিলাটি দ্বিতীয়বার আসিয়া পুনরায় বলিল, আমাকে কি গামিরের মত অব্যাহতি দিতে চান? আল্লাহ্ শপথ, আমি অন্তস্বত্তা হইয়াছি। তিনি বলিলেন, যাও যাও, চলিয়া যাও। তৃতীয় দিন আসিয়া মহিলাটি একই অনুযোগ পেশ করিলেন। ইহাতে মহানবী (س) বলিলেন, বিদায় হও। শিশুটি ভূমিষ্ট হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর। প্রসবের পর সদ্য প্রসূত শিশুটিকে কোলে লইয়া মহিলাটি পুনরায় আগমন করিলে রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহাকে বলিলেন, স্তন্য পান শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রতীক্ষা করিতে থাক। স্তন্যপান শেষে মহিলাটি রাসূলুল্লাহ (স) সমীপে উপস্থিত হইলেন। এইবার রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে
প্রস্তরাঘাতে হত্যা করিবার নির্দেশ প্রদান করিলেন। লোকজন তাহার প্রতি প্রস্তর নিক্ষেপ করিতে লাগিল। একজনের পাথর তাঁহার মুখমণ্ডলে আঘাত করিলে ফিনকি দিয়া রক্ত প্রবাহিত হইয়া আঘাতকারীর দেহে লাগিল। লোকটি দণ্ডপ্রাপ্তা মহিলাটিকে গালি দিলেন। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, কথা বন্ধ কর। আল্লাহর শপথ, সে এমন তওবা করিয়াছে, একজন লুণ্ঠনকারী দস্যুও যদি তেমন তওবা করিত, তাহা হইলে তাহাকেও মার্জনা করিয়া দেওয়া হইত (আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, ২খ., পৃ. ৭৫২)।
একদা একজন সাহাবী রমযানের একমাসের 'ঈলা' (স্ত্রীর সাথে মিলিত না হওয়ার শপথ) করিলেন। নির্দিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই তিনি স্বীয় স্ত্রীর সহিত সম্মিলিত হইলেন। অতঃপর শপথ ভঙ্গের বিষয়টি লোকজনকে জানাইয়া বলিলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া চলুন। দেখি, তিনি ইহার কি প্রতিবিধান করেন। লোকজন তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া যাইতে অস্বীকৃতি জানাইল। অগত্যা তিনি নিজেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার আনুপূর্বিক ঘটনা শ্রবণে বিস্মিত হইলেন। অতঃপর দণ্ডস্বরূপ তাহাকে একটি ক্রীতদাস মুক্ত করার আদেশ প্রদান করিলেন। সাহাবী ইহাতে অক্ষমতা প্রকাশ করিলে তিনি তাঁহাকে একাধারে দুইমাস রোযা রাখিবার নির্দেশ দিলেন। লোকটি বলিলেন-রমযানে রোযার কারণেই তো আমার এই বিপদ ঘটিয়াছে। কাজেই আমি ইহাতেও অক্ষম। অনন্তর তিনি তাঁহাকে ৬০ জন অভাবী লোককে আহার প্রদানের নির্দেশ দিলেন। লোকটি উত্তর করিলেন, আমি নিজেই অনাহারে থাকি। এতগুলি লোককে আহার প্রদান করা আমার পক্ষে কঠিন। পরিশেষে মহানবী (স) তাঁহাকে বলিলেন, কোষাগারের অর্থ সচিবের নিকট যাও। সে তোমাকে এক ওয়াসাক খেজুর দিবে। সেইগুলি তুমি ষাটজন অভাবী লোকের মধ্যে বণ্টন করিয়া দিবে। যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে, তাহা পরিবার- পরিজনের জন্য খরচ করিবে। ইহাতে সাহাবী অন্যান্যদের প্রতি কটাক্ষ করিয়া বলিলেন, তোমরা সকলেই কঠোর মনোভাবসম্পন্ন লোক। তোমরা আমাকে মহানবী (স)-এর সভাগৃহে উপস্থিতই করিলে না। অথচ আমি তাঁহাকে পাইলাম অত্যন্ত স্বজন বৎসল, সহৃদয় ও সহজতর ব্যক্তি হিসাবে (সুনানে আবূ দাউদ, ১খ., পৃ. ২২০; আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ৩২৩)।
একদা জনৈক সাহাবী রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (স)! আমি ধ্বংস হইয়া গিয়াছি। রোযা অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করিয়াছি। রাসূলে করীম (স) বলিলেন, একজন ক্রীতদাস মুক্ত করিতে পারিবে? আবেদনকারী অক্ষমতা প্রকাশ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, একাধারে দুই মাস রোযা রাখিতে পারিবে? লোকটি বলিলেন, না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ষাটজন অভাবীকে ভোজন করাইতে পারিবে? সাহাবী উত্তর করিলেন, সম্ভব নহে। মহানবী (স) চিন্তাযুক্ত হইলেন। ইত্যবসরে কোথা হইতে উপঢৌকনস্বরূপ এক ঝুড়ি খেজুর সেখানে উপস্থিত হইল। রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, লোকটি কোথায়? সাহাবী বলিলেন, আমি এখানেই উপস্থিত আছি। তিনি বলিলেন, যাও, খেজুরগুলি দরিদ্রদের মধ্যে বন্টন করিয়া দাও। লোকটি আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ
(স)! মদীনা মুনাওয়ারাতে আমা অপেক্ষা দরিদ্র আর কেহ নাই। তাহার এই অকপট সরলতা দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) হাসি সংবরণ করিতে পারলেন না। হাসিতে হাসিতে তিনি বলিলেন, যাও, তবে তোমার পরিবারের লোকদিগকেই বণ্টন করিয়া দাও (বুখারী, হাদীছ নং ৬০৮, পৃ. ১২৯২)।
মহানবী (স)-এর গোত্রের লোকজন যখন তাঁহার প্রতি অসত্যারোপ করিয়াছিল, ফেরেশতা জিবরাঈল তখন আবির্ভূত হইয়া তাঁহাকে জানাইলেন আপনার জাতি আপনার প্রতি যাহা বলিয়াছে, স্বয়ং আল্লাহ পাক তাহা শ্রবণ করিয়াছেন। সুতরাং আপনি পাহাড়কে আদেশ করুন, পাহাড় তাহাদিগকে নিশ্চিহ্ন করিয়া দিবে। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি বরং আশা করি ইহাদের দেশে বংশে এমনই ব্যক্তির আগমন ঘটিবে, যে আল্লাহপাকের ইবাদত করিবে (কাযী ইয়ায, আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ১২৫)।
ইব্‌ন মুনকাদির বর্ণনা করেন, অবিশ্বাসীরা যখন রাসূলুল্লাহ (স)-কে বিভিন্নরূপ ক্লেশ দ্বারা জর্জরিত করিতেছিল, তখন জিবরাঈল (আ) আগমন পূর্বক রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, আল্লাহ পাক আকাশ-পৃথিবী- পাহাড়কে আপনার অনুগত করিয়া দিয়াছেন। আপনি ইহাদের দ্বারা আপনার প্রাণের শত্রুদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করিতে পারেন। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (س) বলেন, আমার উম্মতদের নিকট হইতে ঐগুলিকে দূরে সরাইয়া রাখুন। হইতে পারে, আল্লাহ পাক তাহাদের তওবা কবুল করিবেন (শায়খ আবদুল হক, মাদারিজুন-নবুওয়াহ্, ১খ, পৃ. ১০৩)।
পরিশেষে একথা অবশ্যই বলা যাইতে পারে যে, মহানবী (স) কঠোরতা বর্জন করিয়া চলিতেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর মধ্যমপন্থা অবলম্বন

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর মধ্যমপন্থা অবলম্বন


মানুষের আচার-আচরণ, কার্যকলাপ, ইবাদত-বন্দেগী সকল কিছুতেই মধ্যমপন্থা উত্তম। মধ্যমপন্থা অবলম্বনের জন্য ইসলাম জোর তাকিদ দেয়। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মধ্যমপন্থা অবলম্বন করার অপূর্ব নজীর স্থাপন করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, মধ্যমপন্থা সকল ক্ষেত্রেই উত্তম। তিনি ছিলেন সকলের জন্যই সর্ববিষয়ে উত্তম আর্দশ। একজন সাধারণ মানুষের মত মধ্যম ধরনের জীবন যাত্রায় তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। আর অনুরূপ জীবনাদর্শ অনুকরণ করার তাকিদ দিতেন তাঁহার সাহাবীগণকে। হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত, মহানবী (স) বলিয়াছেন, "কাজ-কর্মের উত্তম পদ্ধতি, শালীন আচার-আচরণ আর মধ্যম পন্থার সমন্বয়ে গড়িয়া উঠে নবুওয়তের এক চতুর্থাংশ (আফযালুর রহমান, হযরত মুহাম্মদ (স) জীবনী বিশ্বকোষ, বাংলা, ১খ., পৃ. ৩১১)। হজরত লুকমান (আ) তদীয় সন্তানকে দৈনন্দিন জীবন-যাপন সম্পর্কে বিভিন্ন উপদেশ দান করিয়াছিলেন। এই প্রসঙ্গে আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে,
وَاقْصِدْ فِي مَشْيِكَ - "তুমি সংযতভাবে বিচরণ করিও” (৩১ঃ১৯)।
অর্থাৎ তুমি এমন দাপটের সহিত চলিবে না যাহাতে মনে হইবে তুমি একজন অহংকারী ব্যক্তি। আবার এমন চঞ্চল ভাবে পদচারণা করিবে না যাহাতে মনে হইবে তুমি একজন চপল ব্যক্তি; বরং তুমি এমন সংযম অবলম্বন করিবে যাহাতে ধারণা করা হইবে তুমি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন নিরহংকার ব্যক্তি। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, "চঞ্চল পদচারণা বিশ্বাসীদের জন্য মর্যাদা হানিকর (কাযী ছানাউল্লাহ্ পানিপথি, তাফসীরে মাযহারী, ৭খ., পৃ. ২৫৯)।
ইবন সা'দের বর্ণনায় আসিয়াছে, হযরত ইয়াযীদ ইব্‌ন মারছাদ বর্ণনা করিয়াছেন, "রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্বাভাবিক পদচারণাও আমাদের নিকট মনে হইত দ্রুততর।” হযরত আবূ মূসা আশ'আরী (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, "পদ বিক্ষেপ সংযত করিও। চলাচলে মধ্যম গতি বজায় রাখিও” (প্রাগুক্ত)।
ধনসম্পদ ব্যয় করার ক্ষেত্রেও তিনি তাঁহার সাহাবীদিগকে সাধ্যানুসারে ব্যয় করার পরামর্শ দান করিয়াছেন এবং নিষেধ করিয়াছেন অমিতব্যয়ী অথবা ব্যয়কুণ্ঠ হইতে। বস্তুতপক্ষে তিনি মানব জাতিকে সীমাতিরিক্ত ব্যয়, পক্ষান্তরে ব্যয় কুণ্ঠ হওয়ার মত দুইটি ঘৃণ্য অভ্যাসের মধ্যে সর্বদা মধ্যমপন্থা অবলম্বনের নীতি শিক্ষা দিয়াছেন। হযরত উমর (রা) বর্ণনা করিয়াছেন,
রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, "খরচে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা একজনের অর্ধেক জীবিকার সমতুল্য। সাধারণ খরচাদি এমনকি পরহিতকর কাজের বেলায়ও অমিতব্যয়ী অথবা কার্পণ্য করিতে তিনি নিষেধ করিয়াছেন। আর এই শ্রেণীর লোকদের সাধুবাদ দেওয়া হইয়াছে পবিত্র কুরআনে। উল্লেখ হইয়াছে:
وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا .
“এবং যখন তাহারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না, কার্পণ্যও করে না বরং তাহারা আছে এতদুভয়ের মাঝে মধ্যমপন্থায়" (২৫:৬৭)।
রাসূলুল্লাহ (স) পানাহার, লেবাস-পোশাক, ইবাদত-বন্দেগী হইতে শুরু করিয়া জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মধ্যপন্থার নীতি অবলম্বন করিয়াছিলেন। মহানবী (স)-এর কিছু সংখ্যক সাহাবী চরম কৃচ্ছতার জীবন যাপন ও সর্বপ্রকার পার্থিব আরাম-আয়েশ পরিহার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মহানবী (স) তাঁহাদের এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারটা জানিতে পারিলেন। তিনি তাঁহাদিগকে ডাকিয়া বলিলেন, "তোমরা ঐরূপ করিও না; বরং তোমরা কখনও রোযা রাখ, কখনও পানাহার কর। রাতের বেলা কখনও ঘুমাও কখনও ইবাদত কর। কারণ তোমার উপর তোমার শরীরেরও একটি অধিকার আছে। না ঘুমাইলে তোমাদের শরীর দুর্বল হইয়া পড়িবে। এতদ্ব্যতীত স্ত্রী-পরিবার, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজনেরও একটি হক আছে। জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ ও তৃপ্তিকে পরিহার করা, সারাক্ষণ রোযা, সালাত, যিকর-আযকারে লিপ্ত থাকাকে তিনি নিষিদ্ধ বলিয়া ঘোষণা দিয়াছেন। তিনি মুসলমানদিগকে একজন সাধারণ মানুষের মত জীবন যাপনের পরামর্শ দান করিয়াছেন।
একদা হযরত আবূ হুরায়রা (রা) রাসূলুল্লাহ (স) সমীপে উপস্থিত হইয়া নিবেদন জানাইলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! আমি একজন নবীন যুবক। বিবাহ করিবার সামর্থ্য নাই। আবার প্রবৃত্তির দিক হইতেও আমি সম্পূর্ণ নিরাপদ নই। রাসূলুল্লাহ (স) নিশ্চুপ রহিলেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা) পুনরায় একই নিবেদন পেশ করিলেন। এবারেও তিনি নিশ্চুপ। অতঃপর হযরত আবূ হুরায়রা (রা) তৃতীয়বার একই আরয পেশ করিলে তিনি বলিলেন, "তোমার নিয়তি কার্যকর হইবেই। আল্লাহর বিধান টলিতে পারে না (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৭৫৯)। বাহিলা গ্রোত্রের জনৈক ব্যক্তি মহানবী (স)-এর সান্নিধ্যে উপস্থিত হইয়া স্বীয় প্রয়োজন সমাধা পূর্বক নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন। এক বৎসর পর তিনি পুনরায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইলেন, কিন্তু সেই সময় তাঁহার আকার-আকৃতি এমনই পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে চিনিতে পারিতেছিলেন না। তিনি স্বীয় পরিচয় প্রদান করিলে রাসূলুল্লাহ (স) বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি ত খুবই সুন্দর ছিলে। ইতোমধ্যে তোমার স্বাস্থ্য এমন পরিবর্তিত হইল কেন? তিনি আরয করিলেন, আমি- আপনার নিকট হইতে বিদায় লওয়ার পর হইতে বিরতীহীন রোযা রাখিতে শুরু করিয়াছিলাম। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, তুমি এইভাবে নিজেকে শাস্তি দিতেছ কেন? মনে রাখিও, রমযান মাস ব্যতীত প্রতিমাসে একদিন রোযা রাখাই তোমার জন্য যথেষ্ট। তিনি বলিলেন, ইহা অপেক্ষা অধিক রোযা রাখিবার সামর্থ্য আমার
আছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আরও একদিন যোগ করিয়া লও। তিনি আরও অধিক বাড়াইবার জন্য আবেদন করিলেন। মহানবী (স) তিন দিনের অনুমতি প্রদান করিলেন। ইহাতেও তিনি সন্তুষ্ট হওয়াতে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে হারাম চারি মাসের (যিলকদ, যিলহাজ্জ, মুহাররম, রজব) রোযা রাখার অনুমতি প্রদান করিলেন (সুলাইমান ইব্‌ন আশ'আছ, সুনানে আবু দাউদ, পৃ. ২২২)।
হযরত আনাস ইবন মালিক বলেন, একদা তিন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইবাদত-বন্দেগীর প্রকৃতি জানার জন্য উম্মাহাতুল মু'মিনীনদের নিকট উপস্থিত হইল। তাহারা তাঁহার ইবাদতের প্রকৃতি সম্পর্কে জানিতে চাহিলে তাহাদিগকে উহা জানানো হইল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইবাদত-বন্দেগী তাহাদের নিকট অপ্রতুল মনে হইল। তাহারা বলিতে নাগিল, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত আমাদের কি কোন তুলনা হইতে পারে? আল্লাহ পাক তাঁহার পূর্বাপর যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি মার্জনা করিয়া দিয়াছেন। তাহাদের মধ্য হইতে একজন বলিল, আমি রাতভর সালাত আদায় করিব। অপর একজন বলিল, আমি জীবনভর বিরতীহীন রোযা রাখিব। অপর জন বলিল, আমি জীবনে বিবাহই করিব না। ইত্যবসরে সেখানে মহানবী (س)-এর শুভাগমন ঘটিল। তিনি বলিলেন, তোমরা এই ধরনের কথাবার্তা বলিতেছিলে, তাই না? তিনি আরও বলিলেন, আল্লাহর শপথ, আমি তোমাদের অপেক্ষা আল্লাহকে অধিক ভয় করি, সমীহও করি। তবু আমি রোযাও রাখি, পানাহারও করি। সালাত আদায় করি, আবার নিদ্রাও যাই। বিবাহও করিয়াছি। তবে যে আমার সুন্নত অনুসরণ করে না, সে আমার দলভুক্ত নহে (মুহাম্মদ ইব্‌ন ইসমাঈল, আস্-সাহীহ, ২খ., পৃ. ৭৫৭; ইবন সা'দ, আত্-তাবাকাতুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৩৭২)।
তাবুক যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তন পথে একজন সাহাবী একটি কূপের সন্ধান পাইলেন। কূপে প্রচুর পানি। ছায়াঘন নিরিবিলি জায়গা। আশেপাশে কতকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পল্লী। মনোরম পরিবেশ। এক সাহাবী রাসূলূল্লাহ (س)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া নিবেদন জানাইলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! আমি একটি কূপের সন্ধান লাভ করিয়াছি। সেখানে প্রয়োজনীয় পানি বিদ্যমান আছে বলিয়া আমার ধারণা। সদয় অনুমতি পাইলে সেখানে আমি একাকী জীবন যাপন করি। এই অভিশপ্ত দুনিয়ার সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া দেই। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "আমি ইয়াহুদীবাদ ও খৃস্টবাদ লইয়া আবির্ভূত হই নাই। আমি লইয়া আসিয়াছি সহজতর আরামপ্রদ মাযহাবে ইবরাহীমী (আল্লামা শিবলী নু'মানী ও সুলাইমান নদভী, সীরাতুন-নবী, ২খ., পৃ. ১৯৭)। দান দক্ষিণা, পরহিতকর কাজে যদিও তিনি অমিতব্যয়ী অথবা কাপণ্য নিষেধ করিতেন, কিন্তু স্বভাবগত ভাবে দানের বেলায় তিনি ছিলেন মুক্ত হস্ত। তাঁহার নিকট যাহা কিছুই থাকিত অম্লান বদনে তাহাই তিনি বিলাইয়া দিতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা)-এর উদ্ধৃতিতে ইব্‌ন মারদুবিয়া বলেন, একদা এক যুবক মহানবী (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া আরয জানাইলেন, আমার আম্মা আপনার নিকট হইতে কিছু খাদ্য, বস্ত্র ও নগদ অর্থ চাহিয়া পাঠাইয়াছেন। তিনি বলিলেন, এখন তো আমার নিকট কিছুই নাই। যুবকটি বলিলেন, আমার আম্মা বলিয়াছেন, আপনার নিকট দিবার মত কিছু না থাকিলে যেন আপনি আপনার পরিধেয় জামাটি খুলিয়া দেন। মহানবী (স) তৎক্ষণাত তাঁহার জামাটি খুলিয়া দিলেন। অতঃপর গৃহাঙ্গণে প্রবেশ করিলেন অনাবৃত দেহে। আর ঠিক তখনই ওহী অবতীর্ণ হয়,
وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَى عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطُهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُوْمًا مَّحْسُوْرًا.
"তুমি তোমার হস্ত তোমার গ্রীবায় আবদ্ধ করিয়া রাখিও না এবং উহা সম্পূর্ণ প্রসারিতও করিও না। তাহা হইলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হইয়া যাইবে" (১৭: ২৯)।
অর্থাৎ হে আমার রাসূল! আপনি কৃপণ অথবা অমিতব্যয়ী কোনটাই হইবেন না। চলিবেন এতদুভয়ের মাঝপথে। এই রকম সুসমঞ্জস্য মধ্যমপন্থাই প্রশংসনীয় ও শোভন। কার্পণ্য ও অমিতব্যয়ী মানুষকে যেমন নিন্দিত করে, তেমনই নিঃস্ব করিয়া দেয় (কাযী ছানাউল্লাহ পানিপথি, তাফসীরে মাযহারী, ৫খ., পৃ. ৪৩৫)।
এমন আরও একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় উক্ত তাফসীরে। ইব্‌ন আবী হাতিম বর্ণনা করিয়াছেন, হযরত আবু উসামা বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) একবার উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা)-কে লক্ষ করিয়া বলিলেন, 'আইশা! যাহা কিছু পাও সঙ্গে সঙ্গে খরচ করিয়া ফেলিও। 'আইশা (রা) আরয করিলেন, তবে তো আমরা একেবারে নিঃস্ব হইয়া পড়িব। তাঁহাদের ঈদৃশ কথোপকথনের প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয় আলোচ্য আয়াত (প্রাগুক্ত)।
লক্ষ্য করা যায়, অনেক মহাপুরুষ অতি মাত্রায় আগাইয়া যান, কৃচ্ছ সাধনার কষ্টকর পথ অবলম্বন করেন। কিন্তু মহানবী (স)-এর জীবনে এমনটি ঘটে নাই কখনও। এই জগতে মানবের কল্যাণময় জীবনের উত্থানের পথে সকল কিছুরই সমন্বয় সাধন করিয়া গিয়াছেন তিনি।
তিনি ছিলেন একজন পরিপূর্ণ সংসারী মানুষ যিনি পরিবার লইয়া জীবন যাপন করিয়াছেন, আস্বাদন করিয়াছেন সংসারের পরিপূর্ণ স্বাদ।
মধ্যমপন্থা অবলম্বন করার তাকিদে তিনি আরও বলিয়াছেন, “তোমার সাধ্যে যাহা কুলায় তাহারই বোঝা উত্তোলন কর” (ওয়ালীউদ্দীন ইব্‌ন আবদুল্লাহ, মিশকাতুল মাসাবীহ্, পৃ. ১১০)। এখানে যাহা বলিতে ফরয, ওয়াজিব, সুন্নত, নফল ইত্যাদি সকল ধরনের ইবাদত অনুষ্ঠানকে বুঝানো হইয়াছে (ইবন হাজার আল-আসকালানী, ফাতহুল-বারী, ১১খ., পৃ. ২৫১)।
হযরত হুযায়ফা (রা) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, প্রাচুর্যের মধ্যে মধ্যমপন্থা কত উত্তম, দারিদ্র্যের মধ্যে মধ্যমপন্থা কত উৎকৃষ্ট এবং ইবাদতের বেলায় মধ্যমপন্থা কত উপাদেয় (আলাউদ্দীন আলী ইব্‌ন হুসসামুদ্দীন, কানযুল-উম্মাল, ২খ., পৃ. ৭)। অর্থাৎ এখন বিত্তশালী হওয়া যাইবে না যাহাতে নামিয়া আসিবে আল্লাহ বিরোধী ও খোদা বিমুখতার অভিশাপ। পক্ষান্তরে দারিদ্র্যের কষাঘাতে নিষ্পেষিত হইলে পরিণতিতে সে হইবে অসহায়, বঞ্চিত হইবে সত্য হইতে।
ইবাদত-বন্দেগীতে সীমাতিক্রম করা যাইবে না। যেমন উল্লেখ হইয়াছে হযরত উছমান ইব্‌ন মাযউনের বর্ণনায়। তিনি সালাতের মধ্য দিয়ে বিনিদ্র রজনী কাটাইতেন। বিষয়টি মহানবী (স)-এর গোচরীভূত হইলে তিনি তাঁহাকে এই ধরনের ইবাদত করিতে নিষেধ করেন। মধ্যমপন্থা অবলম্বনের জন্য তাকিদ দেন। তিনি আরও বলেন, "তোমার দায়িত্বে আরও কিছু করার আছে।” আল্লামা শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নদভী, সীরাতুন্-নবী, ৬খ., পৃ. ৫৩০)।
প্রাচীন ধর্মমতগুলি বিশ্ববাসীকে দ্বিধাবিভক্ত করিয়াছে। একটি সংসার বিরাগী গীর্জা জীবন, অপরটি পরিপূর্ণ সংসারী পার্থিব জীবন। দীন ও দুনিয়ার মধ্যে রচনা করিয়াছিল দুস্তর ব্যবধান। এই দুইটি দল জগদ্বাসীর মধ্যে সৃষ্টি করিয়াছিল অলংঘণীয় অন্তরাল তথা দুর্ভেদ্য প্রাচীর। একদলের ধারণা, গীর্জা জীবনই একমাত্র সফল জীবন। অপর দলের ধারণা সম্পদ আহরণই একমাত্র কামিয়াবী। উভয় দলের মধ্যে বিদ্যমান ছিল রক্তারক্তি, হানাহানির সম্পর্ক। ঠিক সেই নাযুক মুহূর্তেই আবির্ভূত হইয়াছিলেন দীন-দুনিয়ার মধ্যে সমন্বয়কারী মহাপুরুষ মহানবী হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ছিদ্রান্বেষণ ও পরনিন্দা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)

📄 ছিদ্রান্বেষণ ও পরনিন্দা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)


يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا .
"হে মু'মিনগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান হইতে দূরে থাক। অনুমান কোন কোন ক্ষেত্রে পাপ এবং তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করিও না এবং একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা করিও না” (৪৯:১২)।
আলোচ্য আয়াতে এই কথাটির দ্বারা কাহারও অনুপস্থিতিতে তাহার দোষ চর্চা করা নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। অপরের দোষ চর্চা করা একটি মন্দ স্বভাব। ইহা পরিবারে ও সমাজে সৃষ্টি করে চরম বিশৃঙ্খলা যাহার বিষময় ফলে বিপন্ন হয় বহু পরিবার। সমাজে ঝগড়া, ফাসাদ, কোন্দলের সৃষ্টি হয়। ইহা হত্যা অপেক্ষা গুরুতর অপরাধ। পরনিন্দার জঘন্যতম ব্যাধিতে আক্রান্ত হইয়া অতীতে অনেক জাতি দুর্দশাগ্রস্ত হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর পুণ্যময় স্বভাবে পরনিন্দার প্রাদুর্ভাব অচিন্ত্যনীয়। পরন্তু তিনি আজীবন পরনিন্দার নিন্দা জ্ঞাপন করিয়াছেন।
হযরত আবূ হুরায়রাহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) একবার আমাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি জানো, পরচর্চা কি? আমরা বলিলাম, আল্লাহপাক ও তাঁহার রাসূল উত্তম জানেন। তিনি এরশাদ করিলেন, তোমাদের কোন ভ্রাতার অনুপস্থিতিতে তাহার অপসন্দনীয় কিছু বলার নামই পরচর্চা। আমি বলিলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল (স)! যদি বাস্তবেও ঐ দোষটি তাহার মধ্যে থাকিয়া থাকে, তবুও? তিনি বলিলেন, হ্যাঁ, তবুও। আর তাহার মধ্যে যদি বাস্তবে দোষটি না থাকিয়া থাকে তাহা হইলে তুমি তাহাকে অপবাদ দিলে (কাযী ছানাউল্লাহ্ পানিপথি, তাফসীরে মাযহারী, ৯খ., পৃ. ৫৫;, সুলায়মান ইব্‌ন আশ'আছ, সুনানে আবূ দাউদ, ৪খ., পৃ. ২৬৯)।
হযরত আনাস ইব্‌ন মালিক বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, মি'রাজ রজনীতে পরিভ্রমণের সময় আমি একস্থানে একদল লোককে দেখিলাম। তাহাদের হাতের নখগুলি ছিল তাম্রনির্মিত। ঐ নখগুলি দ্বারা তাহারা স্বীয় মুখমণ্ডল ও দেহের গোশতগুলি টানিয়া টানিয়া ছিড়িতেছিল। আমি জিবরাঈলকে জিজ্ঞাসা করিলাম, ইহারা কাহারা? তিনি বলিলেন, ইহারা ঐ সকল লোক যাহারা পৃথিবীতে তাহাদের মৃত ভ্রাতার গোশত ভক্ষণ করিত, মানুষের অসাক্ষাতে তাহাদের দোষ বর্ণনা করিয়া তাহাদের সম্মানহানী করিত (সুলায়মান ইব্‌ন আশ'আছ, সুনানে আবু দাউদ, ৪খ., পৃ. ২৭০)।
উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা) বলেন, একদা আমি আমার সতীন সাফিয়্যা সম্পর্কে বলিয়াছিলাম- সেতো 'এইরকম' অর্থাৎ বেঁটে। এই উক্তি শ্রবণ করা মাত্র রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমিতো গীবত করিলে। তোমার এই কথা যদি সাগরের পানিতে মিশ্রিত করা হয়, তবে সাগরের পানিও তিক্ত হইয়া যাইবে (সুলায়মান ইব্‌ন আশ'আছ, সুনানে আবু দাউদ, ৪খ., পৃ. ২৬৯)।
হযরত আবূ সাঈদ খুদরী ও হযরত জাবির (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) একবার বলিলেন, গীবত ব্যাভিচার অপেক্ষাও ঘৃণ্য। উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ আরয করিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (س)! ব্যাভিচার অপেক্ষা গীবত গুরুতর কিভাবে? তিনি বলিলেন, কোন ব্যক্তি ব্যভিচার করার পর তওবা করিলে আল্লাহ মার্জনা করিয়া দেন। পক্ষান্তরে পরচর্চাকারী তওবা করিলেও আল্লাহ মার্জনা করিয়া দেন না যতক্ষণ না যাহার দোষ চর্চা করিয়াছে সে মার্জনা করিয়া দেয় (কাযী ছানাউল্লাহ পানিপথি, তাফসীরে মাযহারী, ৯খ., পৃ. ৫৬)।
হাম্মাম ইবন হারিছ বর্ণনা করেন, একদা আমরা হযরত হুযায়ফা (রা)-র সঙ্গে ছিলাম। তাঁহার নিকট এক ব্যক্তির নামে অভিযোগ পেশ করা হইল যে, লোকটি খলীফা হযরত উছমান (রা)-এর নিকট লোকদের নামে দূর্নাম রটাইত। তখন হুযায়ফা বলেন, আমি মহানবী (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি, “পরচর্চাকারী জান্নাতে প্রবেশ করিবে না” (মুহাম্মাদ ইব্‌ন্ন ইসমাঈল, আস্-সাহীহ, ২খ., পৃ. ৮৯৫)।
হযরত ইব্‌ন আব্বাস (را) বলেন, একদা মহানবী (স) দুইটি কবরের মাঝখান দিয়া যাইতেছিলেন। তিনি বলিলেন, কবর দুইটির অধিবাসী বিপদে আছে। তবে তেমন কিছু গুরুতর অপরাধের কারণে নহে বরং তাহাদের একজন প্রস্রাব করার পর যথাযথ পবিত্রতা অর্জন করিত না, অপর জন পরনিন্দা করিয়া বেড়াইত (মুহাম্মদ ইব্‌ন ইসমাঈল, আস্-সাহীহ, ২খ., পৃ. ৮৯)।
হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) মদীনা নগরীর কোন প্রাচীরের পাশ দিয়া গমন করিতেছিলেন। সেখানে তিনি কবরের মধ্যে দুইজন মৃতের শাস্তি কবলিত হওয়ার শব্দ শুনিতে পান। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, কবরের অধিবাসী দুইজন চরম শাস্তি কবলিত। বৃহৎ কোন অপরাধের কারণে তাহারা শাস্তিগ্রস্ত নহে বরং তাহাদের একজন প্রস্রাবের অপবিত্রতা হইতে নিরাশঙ্ক থাকিত আর অপরজন পরনিন্দা করিয়া বেড়াইত। অতঃপর মহানবী (স) একটি অথবা দুইটি বৃক্ষ শাখা সংগ্রহ করিলেন এবং তাহা দুই টুকরা করিয়া দুইটি কবরে পুঁতিয়া দিলেন। অতঃপর বলিলেন, সম্ভবত এই বৃক্ষশাখাগুলি না শুকানো পর্যন্ত দুইটিতে শাস্তি কিছুটা লঘুতর হইবে (মুহাম্মাদ ইব্‌ন ইসমাঈল, আস্-সাহীহ্, ২খ., পৃ. ৮৯৫)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, তোমরা কুধারণা পরিত্যাগ করিয়া চলিবে। কেননা কুধারণা অতিরঞ্জন। কাহারও দোষ অন্বেষণে ব্যাপৃত
হইওনা। একে অপরকে ঘৃণা করিও না। পরস্পরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করিও না। একে অপরের প্রতি বিমুখ হইও না। সকলেই আল্লাহর বান্দা, পরস্পর ভাই ভাই হইয়া যাও। একজনের বিবাহের প্রস্তাবের উপর আর একজন প্রস্তাব দিবে না। তাহার প্রস্তাব গৃহীত হইতে পারে, আবার প্রত্যাখ্যাতও হইতে পারে। হাদীছটি ইমাম মালিক, আহমদ, ইব্‌ন মাজা, আবু দাউদ ও তিরমিযী কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে (কাযী ছানাউল্লাহ পানিপথি, তাফসীরে মাযহারী, ৯খ., পৃ. ৫৫)।
হযরত ইবন উমার (রা) কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে, মহানবী (স) ইরশাদ করিয়াছেন, হে কপটাচারিগণ! যাহারা শুধু মুখে ঈমানের কথা উচ্চারণ করিয়াছে, এখনও যাহাদের অন্তঃকরণে ঈমান প্রবিষ্ট হয় নাই তাহারা উত্তমরূপে শুনিয়া রাখ, মুসলমানদের গীবত করিও না। তাহাদের গোপন বিষয় অনুসন্ধানে লিপ্ত হইওনা। যে ব্যক্তি অপরের গোপন বিষয় প্রকাশ করিতে চাহিবে, আল্লাহ তাহার গোপন বিষয় প্রকাশ করিয়া দিবেন, অতঃপর তাহাকে লাঞ্ছিত করিবেন (প্রাগুক্ত)।
হযরত মু'আষ ইব্‌ন জাবাল (রা) হইতে হযরত খালিদ ইব্‌ন মা'দান বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, যে ব্যক্তি তাহার ভ্রাতার এমন পাপের কথা প্রকাশ করত তাহাকে লাঞ্ছিত করে যাহা হইতে সে তওবা করিয়াছে, ঐ ব্যক্তিও তাহার মৃত্যুর পূর্বে ঐ রকম পাপে জড়িত হইয়া পড়ে (প্রাগুক্ত)।
উপরিউক্ত আলোচনা হইতে এই কথা প্রতীয়মান হয় যে, মহানবী (স) পরনিন্দা বা অপরের ছিদ্রান্বেষণ সম্পর্কে কঠোর ভাবে নিষেধ করিয়াছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00