📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর পাঁচটি খচ্চর ছিল

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর পাঁচটি খচ্চর ছিল


১. দুলদুল, মুকাওকিস্ রাসূলুল্লাহ (স)-কে হাদিয়াস্বরূপ প্রেরণ করিয়াছিল; ২. ফাদ্দা, ফারওয়া জুযামী কর্তৃক হাদিয়াস্বরূপ প্রেরিত; ৩. আইলা-রাজ কর্তৃক হাদিয়াস্বরূপ প্রেরিত খচ্চর; ৪. দূমাতুল জান্দাল কর্তৃক প্রেরিত খচ্চর। ৫. হাশ অধিপতি নাজাশী কর্তৃক প্রেরিত খচ্চর (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর তিনটি গাধা ছিল

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর তিনটি গাধা ছিল


১. আফরা, মুকাওকিস প্রেরিত গাধাটি—যাহা অন্যান্য • উপহারসামগ্রীর সহিত আসিয়া ছিল; ২. ফারওয়া জুযামী কর্তৃক হাদিয়াস্বরূপ গাধা; ৩. হযরত সা'দ ইবন উবাদা (রা) কর্তৃক হাদিয়াস্বরূপ প্রেরিত গাধা (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর ৯টি তরবারি ছিল

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর ৯টি তরবারি ছিল


১. আল-মাছুর; ২. আল-আদাব; ৩. যুল-ফিকার; ৪. কালঈ; ৫. আল-বিতার; ৬. আল- খানাফ; ৭. আর-রাসূব; ৮. আল-মিখদাম; ৯. আল-কুদায়ব। এইগুলির মধ্যে যুল-ফিকার তলোয়ারটি হযরত আলী (রা)-কে উপহার প্রদান করেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬৭)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি খাট ছিল। এই খাটটি হযরত আস'আদ ইব্‌ন যুরার। (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে হাদিয়াস্বরূপ প্রদান করিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬৯)।
উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা জানিতে পারিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (স) বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ, পরিচিত-অপরিচিত, প্রতিবেশী, সাহাবী ও আত্মীয়-স্বজনকে হাদিয়া বা উপঢৌকন প্রদান করিতেন। সাহাবীগণ ও বিভিন্ন দেশের মুসলিম-অমুসলিম শাসকগণ তাঁহার
নিকট উপঢৌকন প্রেরণ করিতেন, তিনি তাহা গ্রহণও করিতেন। হাদিয়া-তোহফা আদান- প্রদানের মাধ্যমে তাঁহারা ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হইয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই সুন্নত বা উত্তম আদর্শের আমল এখন বিলীন প্রায়। আমরাও যদি আমাদের প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও বিভিন দেশের রাজা-বাদশাহকে উপঢৌকন প্রদান করি, তহা হইলে আমরাও ভালবাসার সেই বন্ধনে আবন্ধ হইতে পারিব।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর কঠোরতা বর্জন

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর কঠোরতা বর্জন


কোমলতা আর কঠোরতা মানুষের দুইটি বিপরীতমুখী স্বভাবজাত প্রবৃত্তি। কোমলতা মানুষকে করে সুজন আর কঠোরতা করে দুর্জন। মানুষ সুজনের সহিত সখ্যতা করে আর দুর্জনের নিকট হইতে অবস্থান করে অনেক দূরে। মহানবী (স) ছিলেন বিশ্বমানবতার মহান শিক্ষক। তাই কোমলতাই ছিল তাঁহার আখলাকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি কঠোরতা পরিহার করার শিক্ষা প্রদান করিয়াছেন। নিজেও সদা-সর্বদা কঠোরতাকে বর্জন করিয়া চলিতেন। অবশ্য ধর্মীয় অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন বজ্রকঠোর।
হযরত মু'আয ইব্‌ন জাবাল (রা) বাস করিতেন পল্লীর এক নিভৃত মহল্লায়। তিনি ফজরের সালাতে তিলাওয়াত করিতেন দীর্ঘ কিরাআত। এক আনসার ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট তাঁহার বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করিলেন যে, তিনি সালাত আদায়কালে অতি দীর্ঘ কিরাআত তিলাওয়াত করেন যদ্দরুন তাঁহার পশ্চাতে সালাত আদায় করিতে আমি কষ্ট বোধ করি। হযরত আবূ আয়্যুব আনসারী (রা) বলেন, আমি ইতোপূর্বে রাসূলুল্লাহ (স)-কে এত রাগান্বিত হইতে দেখি নাই যেমনটি এই অভিযোগ শোনার পর তিনি হইয়াছিলেন। জনগণের প্রতি লক্ষ্য করিয়া তিনি বলিলেনঃ 'এমন কতক লোক আছে যাহারা মানুষকে বিরাগভাজন করিয়া তোলে। তোমাদের মধ্যে যাহারা ইমাম হইয়া সালাত আদায় করে তাহারা যেন সংক্ষেপে সালাত আদায় করে। কারণ সালাতে বৃদ্ধ, দুর্বল ও শ্রমজীবী লোকও অংশগ্রহণ করিয়া থাকে (আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুননবী, ২খ., পৃ. ৩২১)।
উম্মতের জন্য কঠোর অথবা অপসন্দনীয় হইবে এমন বিষয়গুলিও তিনি সহজতর করিয়া দিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, আমার উম্মতের ন্য কঠিন হইবে এমন আশঙ্কা যদি না করিতাম তাহা হইলে আমি প্রত্যেক সালাতের সময় তাহাদেরকে মেসওয়াক করিবার আদেশ করিতাম (আবূ দাউদ, ১খ., পৃ. ৪২)। তিনি স্বয়ং পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের সময় মেসওয়াক ব্যবহার করিতেন। তিনি বলিয়াছেন, 'তোমার সাধ্যে 'যাহাই সম্ভব হইবে তাহাই করিবে' (ফাতহুল-বারী, ১১খ., পৃ. ২৫১)। ইবাদত-বন্দেগীতে তিনি কঠোরতা পরিহার করিবার উপদেশ দিতেন। রাত্রি জাগিয়া জাগিয়া সালাত আদায় করিতেও তিনি নিষেধ করিতেন। যেমন, হযরত 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন আমর ইবন আল-আস
(রা) একবার বলিলেন, আমি রাত জাগিয়া সালাত আদায় করিব। মহান রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে রাত্রি জাগরণ করিয়া সালাত আদায় করিতে নিষেধ করিলেন।
আরবে সাহরী ও ইফতার ব্যতিরেকেই বিরতিহীনরূপে রোযা রাখার প্রথা পূর্ব হইতেই প্রচলিত ছিল। মহান রাসূল (স)-এর মান্যবর সহচরবৃন্দও এইরূপ রোযা রাখার ইচ্ছা পোষণ করিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদিগকে এইরূপ করিতে কঠোরভাবে নিষেধ করিয়াছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আমর (রা) ছিলেন একজন দৃঢ় মনোভাব সম্পন্ন ব্যক্তি। তিনি অঙ্গীকার করিয়াছিলেন যে, দিনভর রোযা রাখিবেন এবং সারারাত অতিবাহিত করিবেন ইবাদত-বন্দেগীতে। বিষয়টি মহানবী (স)-এর গোচরীভূত হইলে তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমরকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ব‍্যাপারটা কি সত্য? তিনি আরয করিলেন, হ্যাঁ। তিনি বলিলেন, তোমার দেহের একটি হক আছে, চোখের হক আছে, স্ত্রী-পরিবারেরও একটি হক আছে। কাজেই প্রতিমাসে তিন দিন রোযা রাখাই তোমার জন্য যথেষ্ট হইবে। ইহাতে হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা) আরয জানাইলেন, আমি ইহা অপেক্ষা অধিক রোযা রাখিতে সক্ষম। এরশাদ হইল, আচ্ছা ঠিক আছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর আরয করিলেন, আমি ইহা অপেক্ষা আরও অধিক রোযা রাখিতে সক্ষম। তিনি বলিলেন, ঠিক আছে, তুমি একদিন পরপর রোযা রাখিবে। নবী দাউদ (আ) এই ভাবেই রোযা রাখিতেন। আর এই ভাবে নফল রোযা রাখাই উত্তম (মুহাম্মদ ইব্‌ন ইসমাঈল, আস-সাহীহ, ১খ., পৃ. ২৬৫)।
একদা হযরত আবূ হুরায়রা (রা) রাসূলুল্লাহ (স) সমীপে উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (স)! আমি একজন নবীন যুবক, আমার বিবাহ করিবার সামর্থ্য নাই। আবার প্রবৃত্তির দিক হইতেও আমি সম্পূর্ণ নিরাপদ নই। রাসূলুল্লাহ (স) চুপ করিয়া রহিলেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) পুনরায় একই আবেদন পেশ করিলেন। এবারেও তিনি নিশ্চুপ রহিলেন। অতঃপর হযরত আবূ হুরায়রা (রা) তৃতীয়বার আরজী পেশ করিলে রাসূলুল্লাহ (সা) এরশাদ করিলেন, আবু হুরায়রাহ! তোমার ভাগ্য কার্যকর হইবেই। আল্লাহর বিধান টলিতে পারে না (মুহাম্মদ ইব্‌ন ইসমাঈল, সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৭৫৯)। বাহিলা গ্রোত্রের জনৈক ব্যক্তি মহানবী (স)-এর সান্নিধ্যে উপস্থিত হইয়া স্বীয় প্রয়োজন সমাধা পূর্বক নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন। এক বৎসর পর তিনি পুনরায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইলেন, কিন্তু সেই সময় তাঁহার আকার-আকৃতি এমনই পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে চিনিতে পারিতেছিলেন না। তিনি স্বীয় পরিচয় প্রদান করিলে রাসূলুল্লাহ (স) বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি ত খুবই সুন্দর ছিলে। ইতোমধ্যে তোমার স্বাস্থ্য এমন পরিবর্তিত হইল কেন? তিনি আরয করিলেন, আমি- আপনার নিকট হইতে বিদায় লওয়ার পর হইতে বিরতীহীন রোযা রাখিতে শুরু করিয়াছিলাম। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, তুমি এইভাবে নিজেকে শাস্তি দিতেছ কেন? মনে রাখিও, রমযান মাস ব্যতীত প্রতিমাসে একদিন রোযা রাখাই তোমার জন্য যথেষ্ট। তিনি বলিলেন, ইহা অপেক্ষা অধিক রোযা রাখিবার সামর্থ্য আমার
আছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আরও একদিন যোগ করিয়া লও। তিনি আরও অধিক বাড়াইবার জন্য আবেদন করিলেন। মহানবী (স) তিন দিনের অনুমতি প্রদান করিলেন। ইহাতেও তিনি সন্তুষ্ট হওয়াতে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে হারাম চারি মাসের (যিলকদ, যিলহাজ্জ, মুহাররম, রজব) রোযা রাখার অনুমতি প্রদান করিলেন (সুলাইমান ইব্‌ন আশ'আছ, সুনানে আবু দাউদ, পৃ. ২২২)।
হযরত আনাস ইবন মালিক বলেন, একদা তিন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইবাদত-বন্দেগীর প্রকৃতি জানার জন্য উম্মাহাতুল মু'মিনীনদের নিকট উপস্থিত হইল। তাহারা তাঁহার ইবাদতের প্রকৃতি সম্পর্কে জানিতে চাহিলে তাহাদিগকে উহা জানানো হইল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইবাদত-বন্দেগী তাহাদের নিকট অপ্রতুল মনে হইল। তাহারা বলিতে নাগিল, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত আমাদের কি কোন তুলনা হইতে পারে? আল্লাহ পাক তাঁহার পূর্বাপর যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি মার্জনা করিয়া দিয়াছেন। তাহাদের মধ্য হইতে একজন বলিল, আমি রাতভর সালাত আদায় করিব। অপর একজন বলিল, আমি জীবনভর বিরতীহীন রোযা রাখিব। অপর জন বলিল, আমি জীবনে বিবাহই করিব না। ইত্যবসরে সেখানে মহানবী (স)-এর শুভাগমন ঘটিল। তিনি বলিলেন, তোমরা এই ধরনের কথাবার্তা বলিতেছিলে, তাই না? তিনি আরও বলিলেন, আল্লাহর শপথ, আমি তোমাদের অপেক্ষা আল্লাহকে অধিক ভয় করি, সমীহও করি। তবু আমি রোযাও রাখি, পানাহারও করি। সালাত আদায় করি, আবার নিদ্রাও যাই। বিবাহও করিয়াছি। তবে যে আমার সুন্নত অনুসরণ করে না, সে আমার দলভুক্ত নহে (মুহাম্মদ ইব্‌ন ইসমাঈল, আস্-সাহীহ, ২খ., পৃ. ৭৫৭; ইবন সা'দ, আত্-তাবাকাতুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৩৭২)।
তাবুক যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তন পথে একজন সাহাবী একটি কূপের সন্ধান পাইলেন, কূপে প্রচুর পানি। ছায়াঘন নিরিবিলি জায়গা। আশেপাশে কতকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পল্লী। মনোরম পরিবেশ। এক সাহাবী রাসূলূল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া নিবেদন জানাইলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! আমি একটি কূপের সন্ধান লাভ করিয়াছি। সেখানে প্রয়োজনীয় পানি বিদ্যমান আছে বলিয়া আমার ধারণা। সদয় অনুমতি পাইলে সেখানে আমি একাকী জীবন যাপন করিতে পারি। এই অভিশপ্ত দুনিয়ার সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া দিতে চাই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, আমি ইয়াহুদীবাদ ও খৃস্টাবাদের ন্যায় বৈরাগ্য লইয়া আবির্ভূত হই নাই, বরং আমি লইয়া আসিয়াছি সহজতর আরামপ্রদ মাযহাবে ইব্রাহীমি (আহমদ ইব্‌ন হাম্বল, মুসনাদ, ৫খ., পৃ. ২৬৬)।
রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন 'রাহমাতুল লিল-আলামীন'-দয়া ও করুণার আধার। ধারণা করা যায় না যে, মানুষের ব্যবহারিক জীবনে তিনি সহজতর পন্থা পরিহার করিয়া কঠিনতর পন্থার প্রবর্তন করিবেন। তাঁহার উম্মতগণ কষ্টসাধ্য ইবাদতের মানত করিলেও সেক্ষেত্রে তিনি সহজতর পন্থা অবলম্বন করার পরামর্শ দান করিয়াছেন। যেমন, মক্কা বিজয়ের দিন এক ব্যক্তি তাঁহার সান্নিধ্যে উপস্থিত হইয়া আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (স)। আমি মানত করিয়াছিলাম, আল্লাহ পাক আপনাকে মক্কা মু'আজ্জামার বিজয় দান করিলে আমি বায়তুল-মাকদিসে সালাত আদায় করিব। তিনি বলিলেন, তুমি এইখানেই সালাত আদায় করিবে। লোকটি দুইতিন
বার তাঁহার আবেদনের পুনরাবৃত্তি করিলেন। পরিশেষে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন ঠিক আছে, তুমি যাহা ভাল বুঝ তাহাই কর (আবু দাউদ, সুলায়মান ইব্‌ন আশআছ, সুনান আবু দাউদ, ৩খ., ৬০২)।
হযরত আবু হুরায়রা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন,-মসজিদে হারাম ব্যতীত পৃথিবীর অন্যান্য যে কোন মসজিদ অপেক্ষা আমার মসজিদে (নববীতে) পঠিত সালাতের মর্যাদা এক হাযার গুণ বেশী। হযরত আনাস কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছেন, স্বগৃহে আদায়কৃত সালাত অপেক্ষা লোকালয়ের মসজিদে সালাত আদায়ের গুরুত্ব পঁচিশ গুণ বেশি। আর জামে মসজিদে পাঁচ শত গুণ মসজিদে আকসায় এক হাজার গুণ বেশি। আমার মসজিদে পঞ্চাশ হাজার গুণ আর মসজিদে হারামে এক লক্ষ গুণ বেশী (আবূ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ, আল-মিশকাতুল মাসাবীহ, পৃ. ৭২)। উল্লেখ্য যে, মর্যাদার বর্ণিত তারতম্য ফরয সালাতের ক্ষেত্রে, নফল সালাতের ক্ষেত্রে নহে। হযরত যায়দ ইব্‌ন ছাবিত কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছেন, ফরয নামায ব্যতীত অন্যান্য সালাত আমার মসজিদে আদায় করা অপেক্ষা স্বগৃহে আদায় করাই উত্তম (আবূ ঈসা মুহম্মদ ইব্‌ন ঈসা, জামিউত্-তিরমিযী, ২খ., পৃ. ১৪৭)।
হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ভাষণ দান কালে একবার দেখিলেন, এক ব্যক্তি রৌদ্রে দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। তিনি লোকটির রৌদ্রে দাঁড়াইবার কারণ জানিতে চাহিলেন। তখন উপস্থিত জনতার মধ্য হইতে একজন বলিল, আবূ ইসরাঈল মানত করিয়াছে যে, সে রোযা পালন কালে বৃক্ষ ছায়াতে উপবেশন করিবেনা এবং কাহারও সহিত কথা বলিবে না। তাই সে রৌদ্রে দণ্ডায়মান। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, লোকটিকে বলিয়া দাও, সে যেন বৃক্ষ ছায়াতে উপবেশন করে, জনগণের সহিত কথাবার্তা বলে এবং রোযাও পালন করে (মুহাম্মদ ইব্‌ন ইসমাঈল বুখারী, সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৯৯১)।
হযরত উকবা ইব্‌ন আমির জুহানী বর্ণনা করেন, একবার আমার ভগ্নি মানত করিল যে, সে অনাবৃত মস্তকে ও নগ্ন পায়ে হাঁটিয়া হজ্জ করিবে। হজ্জ পালনের সময় তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স) দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ব্যাপার কি? এই অবস্থায় যাত্রা করিয়াছ কেন? তাহার সহযাত্রীদের মধ্য হইতে একজন জানাইল-সে এইরূপ অবস্থায় হজ্জ পালনের মানত করিয়াছে। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) নির্দেশ দিলেন, তাহাকে বলিয়া দাও- সে যেন বাহনে আরোহন করে এবং মস্তকও আবৃত করে (মুহাম্মদ ইব্‌ন ইসমাঈল, সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৯৯১; সুলায়মান ইব্‌ আশ'আছ, সুনান আবু দাউদ, ৩খ., পৃ. ৫৯৬)।
হযরত ইব্‌ন আব্বাস কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সা) লক্ষ্য করিলেন-এক লোক তাহার দুই পুত্রের কাঁধে ভর করিয়া হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কাভিমুখে যাত্রা করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, লোকটি এইভাবে চলিয়াছে কেন? জনৈক সাহাবী জবাব দিলেন, সে এই অবস্থাতেই হজ্জব্রত পালন করার মানত করিয়াছে। মহানবী (সা) বলিলেন,
মহান আল্লাহ্র কি প্রয়োজন লোকটিকে এইরূপ শাস্তি দেওয়ার। অতঃপর তিনি লোকটিকে বাহনের উপর আরোহন করার নির্দেশ দিলেন (মুহাম্মদ ইব্‌ন ইসমাঈল, সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৯৯২; আবু দাউদ সুলায়মান ইব্‌ন আশ'আছ, সুনানে আবু দাউদ, ৩খ., পৃ. ৫৯৯)।
লক্ষ্য করা যায়, অপরাধের দণ্ডবিধি কার্যকর করার ক্ষেত্রে মহানবী (স) অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করিতেন। সর্বদা আসামীর পক্ষ অবলম্বন করিয়া কঠোরতা পরিহার করিতেন, দণ্ডবিধানের সহজতর উপায় উদ্ভাবনের চেষ্টা করিতেন। অনেক ক্ষেত্রে মার্জনা করিয়াও দিতেন।
বর্ণিত আছে, মা'ইয আসলামী নামক এক ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হইয়া বিচার প্রত্যাশায় রাসূলুল্লাহ (স) সমীপে মসজিদে নববীতে উপস্থিত হইলেন। তিনি আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি অপকর্ম করিয়া ফেলিয়াছি। তিনি তাঁহার চেহারা মোবারক অন্যদিকে ফিরাইয়া লইলেন। লোকটি পুনরায় তাঁহার সম্মুখে গিয়া বলিলেন, আমি ব্যভিচার করিয়া ফেলিয়াছি। হে আল্লাহর রসূল (স)। আপনি প্রতিবিধান করুন। তিনি পুনরায় তাঁহার পবিত্র মুখমণ্ডল ফিরাইয়া লইলেন। লোকটি আবারও তাঁহার সম্মুখে আগমন করিয়া বলিলেন, আমি ব্যভিচার করিয়া ফেলিয়াছি। হে আল্লাহর রাসূল (স)! আপনি বিচার করুন। এইবার রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি পাগল নওতো। তিনি বলিলেন, না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি বিবাহ করিয়াছ? তিনি বলিলেন, হ্যাঁ। অতঃপর জিজ্ঞাসা করিলেন, সম্ভবত তুমি শুধু স্পর্শ করিয়াছ। তিনি বলিলেন, না, বরং আমি অপকর্মই করিয়াছি। অবশেষে নিরুপায় হইয়া রাসূলুল্লাহ (স) লোকটিকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করিবার নির্দেশ প্রদান করিলেন (ওয়ালী উদ্দীন ইব্‌ন মুহাম্মদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ, মিশকাতুল-মাসাবীহ, পৃ. ৩১০)।
বর্ণিত হইয়াছে, একদা জনৈকি ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (س)-এর সান্নিধ্যে উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (س)! আমি পাপ করিয়াছি, আপনি অনুগ্রহ পূর্বক বিচার করুন। রাসূলুল্লাহ (স) নিশ্চুপ রহিলেন। সালাতের সময় হইল। সালাত সুসম্পন্ন হওয়ার পর লোকটি পুনরায় আবেদন পেশ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন-তুমি কি সালাত আদায় কর নাই? তিনি উত্তর করিলেন, হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, আল্লাহ পাক তোমার পাপ মার্জনা করিয়া দিয়াছেন (মুহাম্মদ ইব্‌ন ইসমাঈল, সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ১০০৮)।
বর্ণিত হইয়াছে, গামিদ গোত্রের এক মহিলা রাসূলুল্লাহ (س) সমীপে উপস্থিত হইয়া জানাইলেন, আমি অশ্লীল কর্ম করিয়াছি। তিনি বলিলেন, যাও। মহিলাটি দ্বিতীয়বার আসিয়া পুনরায় বলিল, আমাকে কি গামিরের মত অব্যাহতি দিতে চান? আল্লাহ্ শপথ, আমি অন্তস্বত্তা হইয়াছি। তিনি বলিলেন, যাও যাও, চলিয়া যাও। তৃতীয় দিন আসিয়া মহিলাটি একই অনুযোগ পেশ করিলেন। ইহাতে মহানবী (س) বলিলেন, বিদায় হও। শিশুটি ভূমিষ্ট হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর। প্রসবের পর সদ্য প্রসূত শিশুটিকে কোলে লইয়া মহিলাটি পুনরায় আগমন করিলে রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহাকে বলিলেন, স্তন্য পান শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রতীক্ষা করিতে থাক। স্তন্যপান শেষে মহিলাটি রাসূলুল্লাহ (স) সমীপে উপস্থিত হইলেন। এইবার রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে
প্রস্তরাঘাতে হত্যা করিবার নির্দেশ প্রদান করিলেন। লোকজন তাহার প্রতি প্রস্তর নিক্ষেপ করিতে লাগিল। একজনের পাথর তাঁহার মুখমণ্ডলে আঘাত করিলে ফিনকি দিয়া রক্ত প্রবাহিত হইয়া আঘাতকারীর দেহে লাগিল। লোকটি দণ্ডপ্রাপ্তা মহিলাটিকে গালি দিলেন। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, কথা বন্ধ কর। আল্লাহর শপথ, সে এমন তওবা করিয়াছে, একজন লুণ্ঠনকারী দস্যুও যদি তেমন তওবা করিত, তাহা হইলে তাহাকেও মার্জনা করিয়া দেওয়া হইত (আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, ২খ., পৃ. ৭৫২)।
একদা একজন সাহাবী রমযানের একমাসের 'ঈলা' (স্ত্রীর সাথে মিলিত না হওয়ার শপথ) করিলেন। নির্দিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই তিনি স্বীয় স্ত্রীর সহিত সম্মিলিত হইলেন। অতঃপর শপথ ভঙ্গের বিষয়টি লোকজনকে জানাইয়া বলিলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া চলুন। দেখি, তিনি ইহার কি প্রতিবিধান করেন। লোকজন তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া যাইতে অস্বীকৃতি জানাইল। অগত্যা তিনি নিজেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার আনুপূর্বিক ঘটনা শ্রবণে বিস্মিত হইলেন। অতঃপর দণ্ডস্বরূপ তাহাকে একটি ক্রীতদাস মুক্ত করার আদেশ প্রদান করিলেন। সাহাবী ইহাতে অক্ষমতা প্রকাশ করিলে তিনি তাঁহাকে একাধারে দুইমাস রোযা রাখিবার নির্দেশ দিলেন। লোকটি বলিলেন-রমযানে রোযার কারণেই তো আমার এই বিপদ ঘটিয়াছে। কাজেই আমি ইহাতেও অক্ষম। অনন্তর তিনি তাঁহাকে ৬০ জন অভাবী লোককে আহার প্রদানের নির্দেশ দিলেন। লোকটি উত্তর করিলেন, আমি নিজেই অনাহারে থাকি। এতগুলি লোককে আহার প্রদান করা আমার পক্ষে কঠিন। পরিশেষে মহানবী (স) তাঁহাকে বলিলেন, কোষাগারের অর্থ সচিবের নিকট যাও। সে তোমাকে এক ওয়াসাক খেজুর দিবে। সেইগুলি তুমি ষাটজন অভাবী লোকের মধ্যে বণ্টন করিয়া দিবে। যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে, তাহা পরিবার- পরিজনের জন্য খরচ করিবে। ইহাতে সাহাবী অন্যান্যদের প্রতি কটাক্ষ করিয়া বলিলেন, তোমরা সকলেই কঠোর মনোভাবসম্পন্ন লোক। তোমরা আমাকে মহানবী (স)-এর সভাগৃহে উপস্থিতই করিলে না। অথচ আমি তাঁহাকে পাইলাম অত্যন্ত স্বজন বৎসল, সহৃদয় ও সহজতর ব্যক্তি হিসাবে (সুনানে আবূ দাউদ, ১খ., পৃ. ২২০; আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ৩২৩)।
একদা জনৈক সাহাবী রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (স)! আমি ধ্বংস হইয়া গিয়াছি। রোযা অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করিয়াছি। রাসূলে করীম (স) বলিলেন, একজন ক্রীতদাস মুক্ত করিতে পারিবে? আবেদনকারী অক্ষমতা প্রকাশ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, একাধারে দুই মাস রোযা রাখিতে পারিবে? লোকটি বলিলেন, না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ষাটজন অভাবীকে ভোজন করাইতে পারিবে? সাহাবী উত্তর করিলেন, সম্ভব নহে। মহানবী (স) চিন্তাযুক্ত হইলেন। ইত্যবসরে কোথা হইতে উপঢৌকনস্বরূপ এক ঝুড়ি খেজুর সেখানে উপস্থিত হইল। রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, লোকটি কোথায়? সাহাবী বলিলেন, আমি এখানেই উপস্থিত আছি। তিনি বলিলেন, যাও, খেজুরগুলি দরিদ্রদের মধ্যে বন্টন করিয়া দাও। লোকটি আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ
(স)! মদীনা মুনাওয়ারাতে আমা অপেক্ষা দরিদ্র আর কেহ নাই। তাহার এই অকপট সরলতা দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) হাসি সংবরণ করিতে পারলেন না। হাসিতে হাসিতে তিনি বলিলেন, যাও, তবে তোমার পরিবারের লোকদিগকেই বণ্টন করিয়া দাও (বুখারী, হাদীছ নং ৬০৮, পৃ. ১২৯২)।
মহানবী (স)-এর গোত্রের লোকজন যখন তাঁহার প্রতি অসত্যারোপ করিয়াছিল, ফেরেশতা জিবরাঈল তখন আবির্ভূত হইয়া তাঁহাকে জানাইলেন আপনার জাতি আপনার প্রতি যাহা বলিয়াছে, স্বয়ং আল্লাহ পাক তাহা শ্রবণ করিয়াছেন। সুতরাং আপনি পাহাড়কে আদেশ করুন, পাহাড় তাহাদিগকে নিশ্চিহ্ন করিয়া দিবে। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি বরং আশা করি ইহাদের দেশে বংশে এমনই ব্যক্তির আগমন ঘটিবে, যে আল্লাহপাকের ইবাদত করিবে (কাযী ইয়ায, আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ১২৫)।
ইব্‌ন মুনকাদির বর্ণনা করেন, অবিশ্বাসীরা যখন রাসূলুল্লাহ (স)-কে বিভিন্নরূপ ক্লেশ দ্বারা জর্জরিত করিতেছিল, তখন জিবরাঈল (আ) আগমন পূর্বক রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, আল্লাহ পাক আকাশ-পৃথিবী- পাহাড়কে আপনার অনুগত করিয়া দিয়াছেন। আপনি ইহাদের দ্বারা আপনার প্রাণের শত্রুদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করিতে পারেন। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (س) বলেন, আমার উম্মতদের নিকট হইতে ঐগুলিকে দূরে সরাইয়া রাখুন। হইতে পারে, আল্লাহ পাক তাহাদের তওবা কবুল করিবেন (শায়খ আবদুল হক, মাদারিজুন-নবুওয়াহ্, ১খ, পৃ. ১০৩)।
পরিশেষে একথা অবশ্যই বলা যাইতে পারে যে, মহানবী (স) কঠোরতা বর্জন করিয়া চলিতেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00