📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপঢৌকন আদান-প্রদান

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপঢৌকন আদান-প্রদান


রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপঢৌকন গ্রহণ ও প্রদান তাঁহার অসংখ্য গুণাবলীর অন্তর্ভুক্ত। কেহ হাদিয়া (উপঢৌকন) প্রদান করিলে তিনি অকুণ্ঠচিত্তে তাহা গ্রহণ করিতেন এবং তিনিও মানুষকে হাদিয়া প্রদান করিতেন প্রফুল্লচিত্তে। তিনি উপঢৌকন দিতেন আর্থিক কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই। মানুষের প্রতি তাঁহার উদারতা ও মমতাবোধ ছিল সীমাহীন। তাঁহার মধ্যে সকল প্রকার সৌন্দর্যের সমন্বয় ঘটিয়াছিল। তিনি সর্বাধিক মহানুভব ও প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। তিনি কাহারও নিকট হইতে হাদিয়া গ্রহণ করিলে তাহাকেও প্রদান করিতেন উহা হইতে অধিক পরিমাণ। হাদিয়া গ্রহণ ও প্রদান সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَاجَيْتُمُ الرَّسُولَ فَقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَى نَجْوكُمْ صَدَقَةً ذَلِكَ خَيْرٌ لَكُمْ وَأَطْهَرُ فَإِنْ لَّمْ تَجِدُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ. أَأَشْفَقْتُمْ أَنْ تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَى نَجْوَّكُمُ صَدَقْت فَإِذْ لَمْ تَفْعَلُوا وَتَابَ اللهُ عَلَيْكُمْ فَأَقِيمُوا الصَّلوةَ وَأتُوا الزَّكُوةَ وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ.
"হে মু'মিনগণ! তোমরা রাসূলের সহিত চুপি চুপি কথা বলিতে চাহিলে তাহার পূর্বে সাদাকা প্রদান করিবে; ইহাই তোমাদের জন্য শ্রেয় ও পরিশোধক। যদি তোমরা তাহাতে অক্ষম হও তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তোমরা কি চুপে চুপে কথা বলিবার পূর্বে সাদাকা প্রদানকে কষ্টকর মনে কর? যখন তোমরা সাদাকা দিতে পারিলে না, আর আল্লাহ তোমাদিগকে ক্ষমা করিয়া দিলেন, তখন তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের আনুগত্য কর। তোমরা যাহা কর আল্লাহ তাহা সম্যক অবগত” (৫৮: ১২-১৩)।
ইব্‌ন আবী হাতিম (র) বর্ণনা করিয়াছেন, হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, যখন হাদিয়া প্রদানের বিধান সম্বলিত এই আয়াত অবতীর্ণ হইল, তখন অনেকেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত অতিরিক্ত কথা বলা বন্ধ করিয়া দিল। ইমাম বাগাবী (র) লিখিয়াছেন, তখন লোকেরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত কথাবার্তা বলা হইতে বিরত রহিল। বিত্তহীনেরা কথাবার্তা বলিতে অক্ষম হইয়া গেল। আর বিত্তশালীরা বাক্যালাপ বন্ধ করিল হাদিয়া প্রদানের ভয়ে। বিশুদ্ধচিত্ত সাহাবীগণও অর্থাভাবে মৌনতা অবলম্বন করিলেন। বিষয়টি তাঁহাদের জন্য হইয়া গেল
পীড়াদায়ক। পরে অবশ্য তাহারা অর্থ প্রদান ছাড়াই বাক্যালাপের অনুমতি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন (তাফসীরে মাযহারী, ৯খ., পৃ. ২২৫)।
মুজাহিদ (র) বলিয়াছেন, কথা বলিতে হইলে উপঢৌকন প্রদান করিতে হইবে, এই বিধানটি নাযিল হওয়ার পর হযরত 'আলী (রা) সর্বপ্রথম এক দীনার হাদিয়া প্রদান করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত বাক্যালাপ করিয়াছিলেন। ইহার পর নাযিল হয় হাদিয়া ব্যতিরেকে কথা বলার অনুমতি। এই কারণেই হযরত আলী (রা) বলিতেন, আল-কুরআনুল কারীমে এমন একটি আয়াত রহিয়াছে যে আয়াতের উপর আমার আগে কেহ আমল করিতে পারে নাই, আর কেহ পারিবেও না। আর সেই আয়াত হইল এই আয়াত (যাহা পূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে)। ইব্‌ন আবী শায়বা তাঁহার আল-মুসান্নাফ কিতাবে এবং হাকেম তাঁহার আল্-মুসতাদ্রাক গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন, হযরত 'আলী (রা) বলিয়াছেন, আল্লাহর কিতাবে এমন একটি আয়াত রহিয়াছে যাহার উপর আমিই সর্বপ্রথম আমল করিয়াছি। আমার নিকট একটি দীনার ছিল। আমি সেইটিকে ভাংগাইয়া নিয়াছিলাম। যখনই আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত কথা বলিতাম, তখনই উপঢৌকন হিসাবে প্রদান করিতাম একটি করিয়া দিরহাম। তাফসীরে মাদারেকে রহিয়াছে, হযরত আলী (রা) বলিয়াছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রতিটি প্রশ্নের জন্য এক দিরহাম করিয়া হাদিয়া প্রদান করিতাম। এইভাবে আমি প্রশ্ন করিয়াছিলাম দশটি। তিনি সেইগুলির জবাব দিয়াছিলেন যথারীতি (তাফসীরে মাযহারী, ৯খ., পৃ. ২২৫; মা'আরিফুল-কুরআন, ৮খ., পৃ. ৩৪৭)।
আল্লাহর বাণী 'যালিকা খায়রুল লাকুম' ইহাই তোমাদের জন্য শ্রেয় 'ওয়া আতহারু' এবং পরিশোধক। ফাইল-লাম তাজিদু' যদি তাহাতে অক্ষম হও, 'ফা-ইন্নাল্লাহা গাফুরুর-রাহীম' আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। এইভাবে বক্তব্যটি দাঁড়ায়, 'আমার রাসূলের সহিত কথা বলিতে হাদিয়া নিবেদনের এই বিধানটি তোমাদের জন্য উপকারী। ইহার মাধ্যমে তোমরা নিজেদেরকে পরিশুদ্ধ করিয়া লইতে পারিবে। কিন্তু বিত্তবিবর্জিত হওয়ার কারণে যদি তোমরা বিধানটির উপর আমল করিতে সক্ষম না হও, তাহা হইলে তোমাদিগকে দোষী সাব্যস্ত করা হইবে না। কেননা আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল এবং পরম দয়াময়" (তাফসীরে মাযহারী, ৯খ., পৃ. ২২৬)।
হযরত আলী (রা) হইতে বর্ণিত আছে, যখন অবতীর্ণ হইল 'হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা রাসূলের সহিত চুপি চুপি কথা বলিতে চাহিলে তাহার পূর্বে সাদাকা প্রদান করিবে' তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হে আলী! তোমার অভিমত কি? হাদিয়ার পরিমাণ কি এক দীনার হওয়া উচিত? আমি বলিলাম, লোকেরা ইহার উপর আমল করিতে সক্ষম হইবে না। তিনি বলিলেন, তাহা হইলে কি অর্ধ দীনার? আমি বলিলাম, তাহাতেও সক্ষম হইবে না। তিনি বলিলেন, তাহা হইলে কত? আমি বলিলাম, একটি যব (এক পয়সার সমতুল্য)। তিনি বলিলেন, তোমাকে তো মনে হয় সাধনাকারীর মত (প্রাগুক্ত, ৯খ., পৃ. ২২৬)।
মুকাতিল ইব্‌ন হিব্বান বলিয়াছেন, বিধানটি বলবৎ ছিল দশ রাত পর্যন্ত। কালবী বলিয়াছেন, এক ঘণ্টার বেশী সময় এই বিধান কার্যকর ছিল না (প্রাগুক্ত, পৃ. ২২৬)।
হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন যুবায়র (রা) হইতে আহমাদ, বায্যার ও হাকেম কর্তৃক বর্ণিত এবং কেবল হাকেম কর্তৃক বিশুদ্ধ আখ্যায়িত এক হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে, জাহিলী যুগে কুতায়লা বিন্ত আবদুল উয্যা ছিল হযরত আবূ বকর (রা)-এর স্ত্রী। তিনি তাহাকে তালাক দিয়াছিলেন। সে একদিন তাহার কন্যা হযরত আসমা (রা)-র নিকট কিছু উপঢৌকন নিয়া দেখা করিতে আসিল। তিনি উপঢৌকন গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিলেন এবং তাহাকে ঘরে প্রবেশের অনুমতিও দিলেন না। তিনি হযরত আইশা (রা)-কে এই বলিয়া পাঠাইলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হইতে এই বিষয়ের বিধান জানিয়া নিয়া আমাকে জানাও। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে জানাইয়া দিলেন, উপঢৌকন গ্রহণ কর এবং তোমার মাকে ঘরে বসিতে দাও (তাফসীরে মা'আরেফুল-কুরআন, ৮খ., পৃ. ৪০৫; তাফসীরে মাযহারী, ৯খ., পৃ. ২৬২)।
হযরত আসমা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, আমার মাতা মুশরিক অবস্থায় আমার নিকট আসিলেন। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আরয করিলাম, আমার মাতা আমার নিকট আসিয়াছেন। মনে হয় তিনি আমার নিকট হইতে সহানুভূতি পাইবার আশা রাখেন। আমি কি তাঁহাকে সাহায্য-সহায়তা করিব? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হাঁ, তুমি তোমার মাতার প্রতি সহানুভূতি দেখাও (বুখারী, কিতাবুল হিবা, ১খ., পৃ. ৩৫৭)।
الَّذِينَ يَلْمِزُونَ الْمُطَوَّعِينَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقْتِ وَالَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ. "মু'মিনদের মধ্যে যাহারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাদাকা দেয় এবং যাহারা নিজ শ্রম ব্যতিরেকে কিছুই পায় না” (৯:৭৯)।
বাগাবী (র) লিখিয়াছেন, তাফসীরকারগণ বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) একবার সকলকে দান-খয়রাত করিতে অনুপ্রাণিত করিলেন। হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) চার হাজার দিরহাম নিয়া আসিয়া বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিকট আট হাজার দিরহাম ছিল। সেইগুলি হইতে আপনার জন্য চার হাজার দিরহাম নিয়া আসিয়াছি। আপনি এইগুলি আল্লাহর রাস্তায় খরচ করুন। অবশিষ্ট চার হাজার দিরহাম আমি আমার পরিজনের জন্য রাখিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি যাহা রাখিয়াছ এবং যাহা হাদিয়া দিয়াছ সবগুলিতে আল্লাহ বরকত দান করুন (তাফসীরে মাযহারী, ৪খ., পৃ. ২৭১)।
হযরত আসিম ইবন আদী 'আল্লানী আনিলেন এক শত ওয়াসাক খেজুর। হযরত আবী আকীল আনসারী আনিলেন মাত্র এক সা' যব। বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল। সারা রাত পানি টানার কাজ করিয়া আমি পারিশ্রমিক হিসাবে পাইয়াছি দুই সা' যব। সেইগুলি হইতে এক সা' আনিয়াছি আপনার খিদমতে। রাসূলুল্লাহ (স) ওই এক স' যবকে সাদাকার স্তূপের উপর রাখার নির্দেশ দিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭২)।
لَيْسَ عَلَيْكَ هُدَهُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ خَيْرٍ فَلَأَنْفُسِكُمْ وَمَا تُنْفِقُونَ إِلَّا ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللهِ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ خَيْرٍ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ.
"তাহাদের সৎপথ গ্রহণের দায়িত্ব তোমার নহে; বরং আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন। যে ধন-সম্পদ তোমরা ব্যয় কর তাহা তোমাদের নিজেদের জন্য এবং তোমরা তো শুধু আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভার্থেই ব্যয় করিয়া থাক। যে ধন-সম্পদ তোমরা ব্যয় কর তাহার পুরস্কার তোমাদিগকে পুরাপুরিভাবে প্রদান করা হইবে এবং তোমাদের প্রতি জুলুম করা হইবে না" (২৪ ২৭২)।
নাসাঈ, তাবারানী, বায্যার ও হাকেম হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, প্রথমদিকে সাহাবীগণ তাঁহাদের কাফির আত্মীয়-স্বজনকে হাদিয়া প্রদান করিতে অনীহা প্রকাশ করিতেন। রাসূলুল্লাহ (স) ইহা করিতে নিষেধ করেন। ইব্‌ন আবী শায়বা মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়া হইতে মুরসাল হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। ইব্‌ন আবী হাতিম ও ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) কেবল মুসলমানদেরকে দান করিতে বলিয়াছিলেন। এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর সকল সম্প্রদায়কে হাদিয়া প্রদানের অনুমতি দেন (তাফসীরে মাযহারী, ১খ., পৃ. ৩৯০)।
ইবন আবী শায়বা হযরত সা'ঈদ ইব্‌ন যুবায়র হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, নিজ ধর্মানুসারী ছাড়া অন্যকে হাদিয়া প্রদান করিও না। কালবী বলিয়াছেন, মুসলমানদের কিছু ইয়াহুদী আত্মীয় ছিল। মুসলমানদের সাহায্য-সহানুভূতি ব্যতীত তাহারা ছিল নিরুপায়। মুসলমানগণ এই উদ্দেশ্যে হাদিয়া প্রদান হইতে বিরত রহিল যে, তাহারা যেন মুসলমান হইয়া যায়। তখন এই আয়াত নাযিল হয়। অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করিয়া কাহাকেও ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা যাইবে না। 'আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন'। ইহাতে বুঝা যায় যে, সৎপথ প্রাপ্তি আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাতেই হইয়া থাকে।
ফরয দান-যাকাত, 'উশর, ফিতরা কেবল মুসলমানদিগকে দিতে হইবে। ইহা ছাড়া অন্য সকল প্রকার দান, হাদিয়া বা উপঢৌকন মুসলমান-অমুসলমান নির্বিশেষে সকলকে দেয়া জাইয (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৯০)।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত: রাসulullad (স) বলিয়াছেন, "হে মুসলিম মহিলাগণ! কোন মহিলা প্রতিবেশিনী যেন অপর মহিলা প্রতিবেশিনীর প্রদত্ত হাদিয়া তুচ্ছ মনে না করে, এমনকি তহা স্বল্প গোশ্‌তবিশিষ্ট বকরীর হাঁড় হইলেও” (বুখারী, কিতাবুল হিবা ওয়া ফাদলিহা ওয়াত্- তাহরীদ 'আলায়হা, ১খ., পৃ. ৩৪৯)।
আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি একবার উরওয়া (র)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে ভাগিনা। আমরা নূতন চাঁদ দেখিতাম, আবার নূতন চাঁদ দেখিতাম। এইভাবে দুই মাসে তিনটি নূতন চাঁদ দেখিতাম। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (س)-এর কোন গৃহেই আগুন জ্বালানো হইত না। (উরওয়া বলেন) আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, হে খালা! আপনারা তাহা হইলে বাঁচিয়া থাকিতেন কিভাবে? তিনি বলিলেন, দুইটি কালো জিনিস অর্থাৎ খেজুর ও পানিই শুধু আমাদের বাঁচাইয়া রাখিত। অবশ্য কয়েক ঘর আনসার পরিবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতিবেশী ছিল। তাহাদের
কিছু দুধওয়ালা উটনী ও বকরী ছিল। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য দুধ হাদিয়া পাঠাইত। তিনি আমাদিগকে তাহাই পান করিতে দিতেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪৯)।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত: নবী করীম (স) বলিয়াছেন, যদি আমাকে হালাল পশুর পায়া বা হাতা খাইতে আহবান করা হয় তবুও তাহা আমি গ্রহণ করিব। আর যদি আমাকে পায়া বা হাতা উপঢৌকন দেওয়া হয়, তাহা হইলেও আমি তাহা গ্রহণ করিব (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪৯)।
আবূ কাতাদা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমার নিকট হইতে শিকারকৃত পশুর একটি বাহু হাদিয়াস্বরূপ গ্রহণ করিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫০)।
হযরত আনাস (রা) বলেন, মাউয-যাহারান নামক স্থানে আমরা একটি খরগোশ তাড়া করিলাম। লোকেরা সেইটার পিছনে ধাওয়া করিয়া ক্লান্ত হইয়া পড়িল। অবশেষে আমি উহাকে নাগালে পাইয়া ধরিয়া আবূ তালহা (রা)-এর নিকট নিয়া গেলাম। তিনি উহাকে যবেহ করিয়া দুইটি রান রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে পাঠাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহা গ্রহণ করিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫০)।
হযরত ইব্‌ন 'আব্বাস (রা) বলেন, ইবন 'আব্বাসের খালা উম্মু হুফায়দ (রা) একবার নবী করীম (স)-এর খিদমতে পনীর, ঘি ও গুইসাপ উপঢৌকন পাঠাইলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (س) শুধু পনীর ও ঘি খাইলেন আর গুইসাপ রুচি বিরুদ্ধ হওয়ার কারণে রাখিয়া দিলেন (বুখারী, ১খ., কিতাবুল হিবা, পৃ. ৩৫০)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে কোন খাবার আনয়ন করা হইলে তিনি জিজ্ঞাসা করিতেন, ইহা হাদিয়া না সাদাকা? যদি বলা হইত সাদাকা, তাহা হইলে সাহাবীদিগকে তিনি বলিতেন, তোমরা খাও, কিন্তু তিনি খাইতেন না। আর যদি বলা হইত হাদিয়া, তাহা হইলে তিনিও হাত বাড়াইতেন এবং তাঁহাদের সাথে খাওয়ায় শরীক হইতেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫০)।
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, নবী করীম (س)-এর খিদমতে কিছু গোশত আনা হইল এবং বলা হইল, ইহা আসলে বারীরার নিকট সাদাকারূপে আসিয়াছিল। তিনি বলিলেন, ইহা তাঁহার জন্য সাদাকা আর আমাদের জন্য হাদিয়া (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫০)।
হযরত উম্মু আতিয়‍্যা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (س) হযরত 'আইশা (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের নিকট কোন খাবার আছে কি? তিনি বলিলেন, না, তবে সেই বকরীর কিছু গোস্ত উন্মু আতিয়্যা পাঠাইয়াছেন যাহা আপনি তাহাকে সাদাকাস্বরূপ পাঠাইয়াছেন। তিনি বলিলেন, সাদাকা তো যথাস্থানে পৌঁছিয়া গিয়াছে। সুতরাং আমাদের জন্য ইহা সাদাকা নয়, উপঢৌকন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫১)।
হযরত 'আইশা (রা) বলেন, নবী করীম (স)-এর স্ত্রীগণ দুই দলে বিভক্ত ছিলেন। একদলে ছিলেন 'আইশা, হাফসা, সাফিয়্যা ও সাওদা (রা)। অপর দলে ছিলেন উম্মে সালামা (রা) সহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যান্য স্ত্রী। 'আইশা (রা)-এর প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিশেষ ভালবাসার
কথা সাহাবীগণ জানিতেন। তাই তাঁহাদের মধ্যে কেহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হাদিয়া পাঠাইতে চাহিলে তাহা বিলম্বিত করিতেন। যেই দিন রাসূলুল্লাহ (س) হযরত 'আইশা (রা)-এর ঘরে অবস্থান করিতেন সেই দিন হাদিয়া দানকারী ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হযরত 'আইশা (রা)-এর ঘরে পাঠাইয়া দিতেন। উম্মে সালামা (রা)-এর দল তাহা নিয়া আলোচনা করিতেন। উম্মে সালামা (রা)-কে তাহারা বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত এই বিষয়ে আপনি আলাপ করুন, তিনি যেন লোকদিগকে বলিয়া দেন, যাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হাদিয়া পাঠাইতে চায় তাহারা যেন তাঁহার নিকট পাঠাইয়া দেয়, যে স্ত্রীর ঘরেই তিনি থাকুন না কেন। উম্মে সালামা (রা) তাহাদের প্রস্তাব নিয়া তাঁহার সহিত আলাপ করিলেন। কিন্তু তিনি তাঁহাকে কোন জওয়াব দিলেন না। পরে সবাই তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন, তিনি তাঁহাকে কোন জওয়াব দেন নাই। তখন তাঁহারা তাঁহাকে বলিলেন, তিনি কোন জওয়াব না দেওয়া পর্যন্ত আপনি বলিতে থাকুন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার ঘরে গেলে আবার তিনি সেই প্রসঙ্গ তুলিলেন। এইবার তিনি তাঁহাকে বলিলেন, 'আইশার ব্যাপার নিয়া তোমরা আমাকে কষ্ট দিও না। জানিয়া রাখ, 'আইশা ছাড়া আর কোন স্ত্রীর বস্ত্রাচ্ছাদনে থাকা অবস্থায় আমার উপর ওহী নাযিল হয় নাই। 'আইশা (রা) বলেন, এই কথা শুনিয়া উম্মু সালামা (রা) বলিলেন- হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে কষ্ট দেওয়ার অপরাধ হইতে আমি আল্লাহ্র নিকট তওবা করিতেছি।
ইহার পর সকলে হযরত ফাতিমা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট এই কথা বলার জন্য পাঠাইলেন, আপনার স্ত্রীগণ আল্লাহর দোহাই দিয়া আবূ বকর (রা)-এর কন্যা সম্পর্কে ইনসাফের আবেদন জানাইয়াছেন। ফাতিমা (রা) ইহা পেশ করিলে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হে প্রিয় কন্যা! আমি যাহা পসন্দ করি, তুমি কি তাহা পসন্দ কর না? তিনি বলিলেন, অবশ্যই করি। তারপর তিনি তাঁহাদের নিকট গিয়া তাঁহাদিগকে আদ্যোপান্ত অবহিত করিলেন। তাঁহারা তাঁহাকে বলিলেন, তুমি আবার যাও। কিন্তু এইবার তিনি যাইতে অস্বীকার করিলেন।
পুনরায় তাঁহারা হযরত যয়নাব বিনত জাহ্শ (রা)-কে পাঠাইলেন। তিনি তাঁহার নিকট গিয়া কঠোর ভাষা ব্যবহার করিলেন এবং বলিলেন, আপনার স্ত্রীগণ আল্লাহর দোহাই দিয়া আবূ বকরের কন্যা সম্পর্কে ইনসাফের আবেদন জানাইয়াছেন। ইহার পর তিনি গলার স্বর উচু করিলেন, এমনকি 'আইশা (রা)-কে জড়াইয়াও কিছু বলিলেন। 'আইশা (রা) সেইখানে বসা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) 'আইশা (রা)-এর দিকে তাকাইয়া দেখিতেছিলেন তিনি কিছু বলেন কি না। বর্ণনাকারী বলেন, যয়নাব (রা)-এর কথার প্রতিবাদে তিনি কথা বলিতে শুরু করিলেন এবং তাঁহাকে চুপ করিয়া দিলেন। 'আইশা (রা) বলেন, নবী করীম (স) তখন 'আইশা (রা)-এর দিকে তাকাইয়া বলিলেন, এই হইল আবু বকরের কন্যা। আবূ মারওয়ান গাসসানী (র)
হিশাম-এর সূত্রে উরওয়া (র) হইতে বলেন, লোকেরা তাহাদের হাদিয়াসমূহ নিয়া 'আইশা (রা)-এর জন্য নির্ধারিত দিনের অপেক্ষা করিত (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫১)।
হযরত আয়া ইব্‌ন ছাবিত আনসারী (রা) বলেন, আমি একদিন ছুমামা ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রা)-এর নিকট গেলাম। তিনি আমাকে সুগন্ধি দিলেন এবং বলিলেন, আনাস (রা) কখনো সুগন্ধি ফিরাইয়া দিতেন না। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (س) সুগন্ধি ফিরাইয়া দিতেন না (বুখারী, হেরা, পৃ. ৩৫১)।
হযরত 'আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) হাদিয়া কবুল করিতেন এবং তাহার প্রতিদানও দিতেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫২)।
হযরত 'আইশা (রা) বলেন, আমি আরয করিলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার দুইজন প্রতিবেশী আছে। এই দুইজনের কাহাকে আমি উপঢৌকন দিব? তিনি বলিলেন, এই দুইজনের মধ্যে যাহার দরজা তোমার অধিক নিকটবর্তী (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫৩)।
আবূ হুমায়দ সাইদী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আব্দ গোত্রের ইনুল লুতবিয়্যা নামক এক ব্যক্তিকে সাদাকা সংগ্রহের কাজে নিয়োগ করিয়াছিলেন। তিনি ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন, এইগুলি আপনাদের (সাদাকার মাল) আর এইগুলি আমাকে উপঢৌকন দেওয়া হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে তাহার বাবার ঘরে অথবা তাহার মায়ের ঘরে কেন বসিয়া থাকিল না? তখন সে দেখিত তাহাকে কেহ হাদিয়া দেয় কি না? যাঁহার পবিত্র হাতে আমার প্রাণ, সেই সত্তার কসম! সাদাকার মাল হইতে সামান্য পরিমাণও যে আত্মসাত করিবে, সে তাহা কাঁধে করিয়া কিয়ামতের দিন হাযির হইবে (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫৩)।
আবীদা (রা) বলেন, দানকারী ব্যক্তি হাদিয়া সামগ্রী পৃথক' করিয়া হাদিয়া প্রাপকের জীবদ্দশায় মারা গেলে তাহা হাদিয়া প্রাপকের ওয়ারিছদের হক হইবে। (যদি প্রাপক ইতোমধ্যে মারা গিয়া থাকে) আর পৃথক না করিয়া থাকিলে হাদিয়া দাতার ওয়ারিছদের হক হইবে। আর হাসান (র) বলিয়াছেন, উভয়ের কোন একজন মারা গেলে এবং প্রাপক কর্তৃক নিয়োজিত ব্যক্তি উক্ত হাদিয়া সামগ্রী নিজ অধিকারে নিয়া নিলে তাহা প্রাপকের ওয়ারিছদের হক হইবে (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫৩)।
হযরত মিসওয়ার ইবন মাখরামা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) একবার কিছু কাবা (পোশাক বিশেষ) বণ্টন করিলেন। কিন্তু মাখরামাকে তাহা হইতে একটিও দিলেন না। মাখরামা (রা) তখন তাঁহার ছেলেকে বলিলেন, প্রিয় বৎস! আমাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট নিয়া চল। মিসওয়ার (রা) বলেন, আমি তাহার সঙ্গে গেলাম। তিনি আমাকে বলিলেন, যাও ভিতরে গিয়া তাঁহাকে আমার জন্য আহবান জানাও। মিসওয়ার বলেন, ইহার পর আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে ডাকিলাম। তিনি যখন বাহিরে আসিলেন তখন তাঁহার নিকট ছিল একটি কাবা। তিনি বলিলেন, ইহা আমি তোমার জন্য পৃথক করিয়া রাখিয়াছিলাম। মাখরামা উহা তাকাইয়া দেখিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, মাখরামা খুশি হইয়া গিয়াছে (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫৪)।
আবূ হুরায়রা (রা) রাসূলুল্লাহ (স) হইতে বর্ণনা করেন, ইব্রাহীম (আ) তাঁহার স্ত্রী সারাকে নিয়া হিজরতকালে এমন এক জনপদে উপনীত হইলেন যেখানে ছিল এক বাদশাহ অথবা
বর্ণনাকারী বলেন, প্রতাপশালী শাসক। তিনি সারার খেদমতের জন্য উপহারস্বরূপ হাজারকে দান করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-কে বিষ মিশ্রিত বকরীর গোস্ত হাদিয়া দেওয়া হইয়াছিল। আবূ হুমায়দ (রা) বলেন, আইলার শাসক রাসূলুল্লাহ (س)-কে একটি শ্বেত খচ্চর উপহার দিয়াছিলেন। প্রতিদানে তিনি তাহাকে একটি চাদর উপঢৌকন দিয়াছিলেন আর সেখানকার শাসক হিসাবে তাহাকে নিয়োগ পত্র লিখিয়া দিয়াছিলেন (বুখারী, ১খ., পৃ. ৩৫৬)।
হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (س)-কে একটি রেশমী জুব্বা উপঢৌকন দেওয়া হইল। অথচ তিনি রেশমী কাপড় ব্যবহার করিতে নিষেধ করিলেন। তিনি বলিলেন, সেই সত্তার কসম যাঁহার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! জান্নাতে সা'দ ইব্‌ন মু'আযের রুমাল ইহার চেয়ে অধিক উৎকৃষ্ট। সা'ঈদ (র) কাতাদা (ر)-এর বরাতে আনাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, দূমার উকায়দির রাসূলুল্লাহ (স)-কে উহা হাদিয়া দিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫৬)।
হযرت আবদুল্লাহ ইব্‌ন 'উমার (রা) বলেন, 'উমার (را) জনৈক ব‍্যক্তিকে রেশমী কাপড় বিক্রি করিতে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, এই জোড়াটি খরিদ করিয়া নিন। জুমু'আর দিন এবং যখন আপনার নিকট কোন প্রতিনিধি দল আসে তখন তাহা পরিধান করিবেন। তিনি বলিলেন, এইসব তো তাহারাই পরিধান করে যাহাদের আখিরাতে কোন হিস্সা নাই। পরে রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট কয়েক জোড়া রেশমী কাপড় আসিল। সেইগুলি হইতে এক জোড়া তিনি 'উমার (را)-এর নিকট পাঠাইলেন। তখন 'উমার (را) বলিলেন, ইহা কিভাবে পরিধান করিব, অথচ এই সম্পর্কে আপনি যাহা বলিবার বলিয়াছেন। তিনি বলিলেন, ইহা তোমাকে পরিধান করিবার জন্য দেই নাই। হয় ইহা বিক্রি করিবে, নচেৎ কাহাকেও হাদিয়া দিবে। অতএব 'উমার (را) উহা মক্কায় বসবাসকারী তাঁহার এক দুধ ভাইকে ইসলাম গ্রহণের পূর্বে হাদিয়া পাঠাইলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫৭)।
হযরত আলী (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে রেশমী ডোরাবিশিষ্ট এক জোড়া কাপড় হাদিয়া দিলেন। আমি উহা পরিধান করিলাম, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (س)-এর মুখমণ্ডলে অসন্তুষ্টির ভাব লক্ষ্য করিলাম। পরে ঐ কাপড় জোড়া খণ্ড খণ্ড করিয়া মহিলাদের ব্যবহারোপযোগী পরিধেয় বানাইয়া দিলাম (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫৬)।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, একদা রাসূলুল্লাহ (س) ফাতিমা (রা)-এর গৃহে আসিলেন, কিন্তু গৃহে প্রবেশ না করিয়া চলিয়া গেলেন। আলী (রা) বাড়ি আসিয়া ফাতিমা (রা)-কে চিন্তিত দেখিলেন। ফাতিমা (রা) তাঁহার নিকট উক্ত ঘটনা বর্ণনা করিলেন। আলী (را) রাসূলুল্লাহ (س)-কে ফাতিমা (রা)-র অবস্থা ব্যক্ত করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি তাহার ঘরের দরজায় নক্শাকৃত পর্দা লটকান দেখিয়াছি। অর্থাৎ অনাবশ্যক জাঁকজমক আমি পসন্দ করি না, তাই ফিরিয়া আসিয়াছি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, দুনিয়ার জাঁকজমকের সহিত আমার কোন সম্বন্ধ নাই। আলী (রা) ফাতিমা (রা)-এর নিকট সমস্ত বিষয় খুলিয়া বলিলেন। ফাতিমা (রা) বলিলেন, এই পর্দা সম্পর্কে আব্বা যাহা আদেশ
করিবেন আমি তাহাই করিব। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইহা অমুক পরিবারের লোকদিগকে হাদিয়া হিসাবে প্রদান কর (বুখারী, পৃ. ৩৫৬)।
হযরত ইবন 'আব্বাস (রা)-এর আযাদকৃত গোলাম কুরায়ব হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্ত্রী মায়মূনা (রা) তাঁহার এক বাঁদীকে আযাদ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তখন তাঁহাকে বলিলেন, তুমি যদি তাহাকে তোমার মামাদের কাউকে হাদিয়া প্রদান করিতে তাহা হইলে তোমরা ছওয়াব বেশী হইত।
হযরত জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) হাদিয়া দাতা হিসাবে সর্বাধিক উত্তম ছিলেন (আখলাকুন নবী (স), অনু. ই. ফা. বা,. পৃ. ৩২৪)।
হযরত 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) হইতে বর্ণিত: তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট কোন হাদিয়া আসিলে তাঁহার সঙ্গী-সাথীরা না খাওয়া পর্যন্ত তিনি তাহা খাইতেন না।
আবু শায়খ আল-ইসফাহানী এই হাদীছের ব্যাখ্যায় বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (س) হাদিয়া দানকারীকে প্রথমে হাদিয়াকৃত খাদ্য খাইতে বলিতেন। রাসূলুল্লাহ (স) এই নিয়ম করিয়াছিলেন তাঁহাকে বিষাক্ত বকরীর গোস্ত দেওয়ার পর হইতে। প্রতারণামূলকভাবে তাঁহাকে বিষ মিশ্রিত বকরীর গোশত হাদিয়া দেওয়া হইয়াছিল। এই ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সতর্ক করিয়া দেওয়ায় তিনি তাহা খাওয়া হইতে বিরত থাকেন এবং অন্যদিগকেও নিষেধ করেন। এই ঘটনার পর হইতে তিনি সাবধানতার জন্য নিয়ম করিয়া নিয়াছিলেন যে, হাদিয়া দাতা নিজে প্রথমে তাহার হাদিয়াকৃত খাদ্য খাইবে, তাহার পর রাসূলুল্লাহ (স) সেই খাদ্য গ্রহণ করিবেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২৬)।
হযরত জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রা) বলেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত যুহর ও আসরের সালাত আদায় করিলাম। সালাম ফিরাইয়া তিনি বলিলেন, প্রত্যেকে নিজ নিজ স্থানে বসিয়া থাক। রাসূলুল্লাহ (س)-কে এক হাঁড়ি হালুয়া হাদিয়া দেওয়া হইয়াছিল। তিনি প্রত্যেককে এক চামচ করিয়া হালুয়া দিতে থাকিলেন। তিনি আমার নিকট আসিয়া আমাকেও এক চামচ হালুয়া খাওয়াইলেন। আমি তখন ছোট ছিলাম। তিনি বলিলেন, তোমাকে আরো দেই? আমি বলিলাম, হাঁ। আমি ছোট হওয়ার কারণে তিনি আমাকে আরো এক চামচ দিলেন। এইভাবে তিনি শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত উহা বিতরণ করিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২৭)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (স)-কে খেজুর গাছের সর্বপ্রথম ফল উপহার দেওয়া হইলে তিনি এই দোআ করিতেন: হে আল্লাহ! আমাদের শহরে বরকত দান কর, আমাদের মুদ্দ ও সা'-এ অধিক বরকত দান কর। অতঃপর তিনি উক্ত ফল উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে কম বয়স্ক শিশুটিকে দিতেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২৭)।
হযরত 'আইশা (রা)-এর নিকট জনৈক ভিক্ষুক আসিয়া কিছু ভিক্ষা চাহিল। তিনি রোযা রাখিয়াছিলেন। ঘরে মাত্র একটি রুটি ব্যতীত কিছুই ছিল না। তিনি স্বীয় দাসীকে বলিলেন, উহা ফকীরকে দিয়া দাও। দাসী বলিল, আপনার ইফতারের জন্য আর কিছুই থাকিবে না। তিনি
বলিলেন, দিয়া দাও। অতঃপর দাসী সেই রুটি ফকীরকে দিয়া দিলেন। দাসী বলেন, সন্ধ্যার সময় কোন এক বাড়ী হইতে বা কোন এক ব্যক্তি হাদিয়া পাঠাইলেন ছাগলের ভুনা গোস্ত। হযরত 'আইশা (রা) আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, খাও। ইহা তোমার রুটি হইতে উত্তম (ইমাম মালিক, মুওয়াত্তা, ২খ., পৃ. ৫১৯)।
- হযরত আনাস (রা) বলেন, উম্মুল-মু'মিনীন হযরত যয়নব (রা)-এর বিবাহের সময় হযরত উম্মু সুলায়ম (রা) হায়স ভর্তি একটি বড় পেয়ালা আমাকে দিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে পাঠাইয়া দিলেন। হায়স হইল খেজুর, ঘি ও ছাতু মিশ্রিত এক বিশেষ ধরনের আহার্য। উন্মু সুলায়ম হযরত আনাস (রা)-কে বলিলেন, হে আনাস! এইগুলি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে লইয়া যাও এবং বলিও, আমার আম্মাজান এই খাবার আপনার জন্য উপঢৌকন পাঠাইয়াছেন এবং আপনার নিকট তিনি সালাম পেশ করিয়াছেন। হযরত আনাস (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হাদিয়া পেশ করিলেন। তিনি বলিলেন, রাখিয়া দাও (মাদারিজুন-নবৃওয়াত, ১খ., পৃ. ৩৩৭)।
হযরত জাবির (রা) হইতে বর্ণিত : উম্মু মালিক নামের জনৈক আনসারী মহিলা মাঝে-মধ্যে রাসুলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে এক পেয়ালা ঘি হাদিয়া পাঠাইতেন। তিনি সর্বদা পেয়ালা ভর্তি ঘি দেখিতে পাইতেন। একদিন উম্মু মালিকের সন্তানেরা খাওয়ার জন্য ব্যঞ্জন চাহিল। কিন্তু ঘরে সেই সময় কোন ব্যঞ্জন ছিল না। সেদিন তিনি সেই পেয়ালা হইতে সবটুকু ঘি ঢালিয়া সন্তানদিগকে দিয়া দিলেন। কিন্তু পরে আর তাহাতে ঘি জমা করিতে পারিলেন না। তিনি রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট সমস্ত ঘটনা খুলিয়া বলিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি তো সমস্ত ঘি নিংড়াইয়া নিয়াছিলে, তাই এমন হইয়াছে। সামান্য কিছু রাখিয়া দিলে সর্বদাই ঘি পাইতে (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩৯)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাহাবীগণ তাঁহাকে খাদ্যসামগ্রী, বাহন জন্তু বা অন্যবিধ নিত্য-ব্যবহার্য দ্রব্যাদি উপঢৌকন দিতেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহা গ্রহণ করিতেন। রাজা-বাদশাহগণও তাহার দরবারে উপঢৌকন প্রেরণ করিয়াছেন এবং তিনি তাহা গ্রহণও করিয়াছেন। রাজা-বাদশাহদের উপঢৌকন সামগ্রী তিনি সাহাবীগণের মধ্যে বণ্টন করিতেন। আর যে বস্তু তাঁহার পসন্দ হইত তাহা তিনি নিজের জন্য রাখিতেন। মিসরের শাসক মুকাওকিস বা মাকুকাস রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপঢৌকন সামগ্রী প্রেরণ করেন। এইগুলির মধ্যে মারিয়া কিক্রিয়া এবং শিরীনও ছিলেন। আরও ছিল একটি খচ্চর, একটি গাধা এবং কিছু দ্রব্যসামগ্রী। রাসূলুল্লাহ (স) মারিয়া কিস্তিয়াকে নিজের জন্য পসন্দ করেন এবং শিরীনকে তিনি হযরত হাসানের হাতে তুলিয়া দেন। আবিসিনিয়ার (ইথিওপিয়া) বাদশাহ নাজাশী রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য হাদিয়া প্রেরণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ (স) তাহা কবুল করেন। বিনিময়ে তিনিও আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশীর জন্য হাদিয়া প্রেরণ করেন। হাদিয়া প্রেরণকালে তিনি ইহাও বলিয়াছিলেন, এইগুলি পৌছিবার পূর্বেই নাজাশীর মৃত্যু হইবে, তাহাই হইয়াছিল। ফারওয়া ইব্‌ নুফাছা জুযামী রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য হাদিয়াস্বরূপ শ্বেতবর্ণের একটি মাদী খচ্চর পাঠাইয়াছিলেন। অন্য
বর্ণনায় আছে, আয়লার বাদশাহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য শ্বেতবর্ণের একটি মাদী খচ্চর উপহার পাঠাইয়াছিলেন (আসাহ্হুস-সিয়ার, পৃ. ৩৮৯-৯০)।
আবূ সুফয়ান রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য হাদিয়া প্রেরণ করেন। রাসূলুল্লাহ (س) উহা গ্রহণও করিয়াছিলেন। কিন্তু আমির ইবন মালিক একটি ঘোড়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য হাদিয়াস্বরূপ প্রেরণ করিলে তিনি এই বলিয়া প্রত্যাখ্যান করিলেন যে, আমরা কোন পৌত্তলিকের উপহার গ্রহণ করিনা। অনুরূপভাবে আয়ায মাজাশিঈ তাঁহাকে হাদিয়া দিতে চাহিলে তিনি তাহা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাইলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯০)।
আবূ উবায়দ বলেন, আবূ সুফয়ানের হাদিয়া তিনি এইজন্য গ্রহণ করিয়াছিলেন যে, তখন সময়টা ছিল হুদায়বিয়ার সন্ধির পর। সেই সময় কুরায়শদের সহিত যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ ছিল। মুকাওকিসের হাদিয়াও তিনি এইজন্য গ্রহণ করিয়াছিলেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর দূত হাতিব ইব্‌ন আবী বালতা'আর সহিত মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করিয়াছিলেন এবং তিনি যে সত্য সত্যই আল্লাহর নবী এই কথাও স্বীকার করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু বৈরী মুশরিকের হাদিয়া তিনি কোন দিন গ্রহণ করেন নাই (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯০)।
মুসলিম জাতির নেতাকে হাদিয়া বা উপঢৌকন প্রদানের ব্যাপারে মতভেদ রহিয়াছে। ইমাম মালিক (র)-এর কতিপয় শিষ্য এইরূপ অভিমত পোষণ করেন যে, রোমের বাদশাহ যদি মুসলিম জাতির নেতার নিকট কোন হাদিয়া প্রেরণ করেন তবে তাহা তাঁহার ব্যক্তিগত হাদিয়া হিসাবেই গণ্য হইবে। কিন্তু ইমাম আওযাঈ বলেন, তাহা মুসলমানদের জাতীয় সম্পদ এবং তাহা বায়তুল মালে জমা থাকিবে। ইমাম আহমাদ বলেন, ইমাম বা সেনাপতিকে কাফিরদের প্রদত্ত উপঢৌকন সামগ্রী গনীমত বলিয়া গণ্য হইবে এবং গনীমতের মালের বিধানই তাহাতে প্রযোজ্য হইবে (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯০-৯১)।
ইমাম নববী বলেন, যাকাত উশুলের জন্য নির্ধারিত আমেল ছাড়া অন্যরা হাদিয়া গ্রহণ করিতে পারেন, বরং হাদিয়া, উপঢৌকন কবুল করা মুস্তাহাব (আসাহহুস- সিয়ার, পৃ. ৩৯১)।
ইয়াদ ইবন হিমার (রা) হইতে বর্ণিত, তিনি নবী করীম (স)-কে কিছু হাদিয়া দিলেন, বর্ণনান্তরে- একটি উট হাদিয়া দিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তখন তাঁহাকে বলিলেন, তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছ? সে বলিল, না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, মুশরিকদের হাদিয়া গ্রহণ করিতে আমাকে নিষেধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। ইমাম আবূ ঈসা (র) বলেন, হাদীছটি হাসান-সহীহ। রাসূলুল্লাহ (স) হইতে বর্ণিত রহিয়াছে যে, তিনি মুশরিকদের হাদিয়া গ্রহণ করিতেন। এই হাদীছে তাহা মাকরূহ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহারও সম্ভাবনা রহিয়াছে যে, তিনি মুশরিকদের হাদিয়া গ্রহণ করিতেন, পরে তাহাদের হাদিয়া গ্রহণ করা নিষিদ্ধ করিয়া দেওয়া হয় (আত্-তিরমিযী, ৪খ., অভিযান অধ্যায়, বাব মুশরিকদের হাদিয়া গ্রহণ করা, পৃ. ১৪০)।
ফুরাত ইব্‌ন মুসলিম বর্ণনা করিয়াছেন, একদা 'উমার ইব্‌ন আবদুল আযীয (র) ছেব আপেল ফল খাওয়ার ইচ্ছা করিলেন। কিন্তু তখন তাঁহার নিকট তেমন অর্থ ছিল না যাহা দ্বারা তিনি ছেব ফল ক্রয় করিবেন। একদিন আমরা তাঁহার সঙ্গে কোথাও রওয়ানা হইলাম। এমন সময় এক ক্রীতদাস একটি খাঞ্চা ভরিয়া ছেব ফল লইয়া তাঁহার নিকট উপস্থিত হইল যাহা কেহ হাদিয়াস্বরূপ পাঠাইয়াছিল। তিনি উহা হইতে একটি ছেব ফল হাতে উঠাইয়া নাড়াচাড়া করিলেন এবং উহার সুঘ্রাণ গ্রহণ করিলেন, অতঃপর উহা খাঞ্চার মধ্যেই রাখিয়া দিলেন। আমি তাহাকে উহা গ্রহণের অনুরোধ করিলে তিনি বলিলেন, আমি ইহা গ্রহণ করিব না। আমি বলিলাম, রাসূলুল্লাহ (س) এবং আবূ বকর (রা) ও উমার (রা) হাদিয়া গ্রহণ করিতেন না কি? তিনি বলিলেন, তাঁহাদের যুগে তাঁহাদিগকে প্রদত্ত হাদিয়া প্রকৃতই হাদিয়া ছিল। কিন্তু তাহাদের সেই যুগ অতিবাহিত হওয়ার পর শাসন ক্ষমতাধারীদের জন্য হাদিয়া নামীয় বস্তুসমূহ প্রকৃত প্রস্তাবে উৎকোচ হইয়া গিয়াছে (ফাতহুল-বারী দ্র., বুখারী, অনু. আজিজুল হক, ৩খ., পৃ. ২৩)।
উমার ইব্‌ন আবদুল আযীয (র) বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (س)-এর যুগে হাদিয়া প্রকৃতই হাদিয়া ছিল, কিন্তু আজকাল তাহা উৎকোচে পরিণত হইয়াছে (বুখারী, কিতাবুল হিবা, ১খ., পৃ. ৩৫৩)।
রাসূলুল্লাহ (س) মুআল্লাফাতুল-কুলুবদেরকে অনেক উপঢৌকন প্রদান করেন। মুআল্লাফাতুল কুলুবরা ছিলেন প্রধানত বিভিন্ন গোত্রের গোত্রপতি ও বিভিন্ন দলের নেতা। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স) এবং ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি চরম বিদ্বেষ পোষণ করিত। তাহাদের কেহ কেহ ইসলাম গ্রহণ করে নাই। আবার এমনও কেহ কেহ ছিল যাহারা বাহ্যত ইসলাম গ্রহণ করিলেও ভিতরে ভিতরে পুরাদস্তর ইসলামের শত্রু ছিল। এতসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে হাদিয়া প্রদান করেন (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৩১২)।
আবূ সুফ্যান ইব্‌ন হারবকে রাসূলুল্লাহ (س) চল্লিশ উকিয়া রৌপ্য এবং এক শত উট প্রদান করেন। তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পুত্র ইয়াযীদকেও প্রদান করুন। তিনি তাহাকেও দিলেন চল্লিশ উকিয়া রৌপ্য এবং এক শত উট। সে পুনরায় বলিল, আমার পুত্র মু'আবিয়াকেও প্রদান করুন। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকেও চল্লিশ উকিয়া রৌপ্য এবং এক শত উট প্রদানের নির্দেশ দেন। হাকীম ইবন হিযামকে তিনি এক শত উট প্রদান করেন। সে আরও এক শত উট চাহিলে তাহাকে আরও এক শত উট দিলেন। হারিছ ইবন হিশামকে এক শত উট, সুহায়ল ইবন আমরকে এক শত উট, হুয়ায়ত ইব্‌ন আবদুল-উয্যাকে এক শত উট, আলা ইব্‌ন জারিয়া আছ-ছাকাফীকে এক শত উট, উয়ায়না ইন্ন হিসন ফাজারীকে এক শত উট, আকরা' ইব্‌ন হাবিস তামীমীকে এক শত উট, মালিক ইব্‌ন আওফ নাদ্রীকে এক শত উট এবং সাওয়ান ইবন উমায়‍্যাকে এক শত উট প্রদান করেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩১২)।
ইবন ইসহাক, ইন্ন শিহাব যুহরী উপহারাদি প্রাপকদের অপর একটি তালিকা তৈরি করিয়াছেন। তাঁহাদের মতে উপঢৌকন প্রাপ্তরা হইতেছেন:
১. আবূ সুফ্যান ইব্‌ন হারব; ২. তুলায়ক ইব্‌ন সুফ্যান; ৩. খালিদ ইব্‌ন উসায়দ; ৪. শায়বা ইব্‌ন উছমান ইব্‌ন আবু তালহা; ৫. আবুস্-সানাবিল ইব্‌ন জাকাক; ৬. ইকরামা ইব্‌ন আমের; ৭. যুহায়র ইবন আবূ উমায়‍্যা ইবনুল-মুগীরা; ৮. হারিছ ইবন হিশাম ইব্‌ন মুগীরা; ৯. খালিদ ইব্‌ন হিশাম ইব্‌ন মুগীরা; ১০. হিশাম ইব্‌দুল ওয়ালীদ ইব্‌ন মুগীরা; ১১. সুফ্যান ইন্ন আবদুল-আসাদ; ১২. সাইব ইব্‌ন আবু সাইব; ১৩. মৃতী ইবনুল-আসওয়াদ ইব্‌ন হারিছা; ১৪. আবূ জাহ্ম ইব্‌ন হুযায়ফা ইব্‌ন গানিম; ১৫. সাফওয়ান ইবন উমায়্যা; ১৬. উহায়হা ইব্‌ন উমায়‍্যা; ১৭. আদী ইব্‌ন কায়স সাহমী; ১৮. হুওয়ায়তিব ইব্‌ন আবদুল-উয্যা; ১৯. হিশাম ইবন উমার ইবন রাবী'আ।
কুরায়শ ব্যতিত অন্যান্য গোত্রের উপহার প্রাপ্তরা হইলেন:
২০. নাওফাল ইব্‌ন মু'আবিয়া আদ-দীলী; ২১. 'আলকামা ইব্‌ন আলাছা ইব্‌ন আওফ কিলাবী; ২২. খালিদ ইবন হাওযা; ২৩. হারমালা ইবন হাওযা; ২৪. মালিক ইবন 'আওফ আন-নাদরী; ২৫. আব্বাস ইব্‌ন মিরদাস আসলামী; ২৬. উয়ায়না ইন্ন হিসন ফাজারী ও ২৭. আকরা' ইবন হাবিস হানজালী তামীমী।
রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করা হইল, আপনি উয়ায়না ইন্ন হিসন এবং আকরা' ইন্ন হাবিসকে এক শত উট দিলেন অথচ জু'আয়িল ইব্‌ন সুরাকাকে কিছুই দিলেন না। তিনি বলিলেন, হাঁ, জু'আয়িল ইন্ন সুরাকার ইসলামের ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। সুতরাং তাহার মনোরনের জন্য কোন উপঢৌকন প্রয়োজন নাই।
ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কাহাকেও এক শত, আবার কাহাকেও তাহার চেয়ে কমও দিয়াছেন। যাহাদের এক'শত-এর কম দিয়াছেন তাহারা হইল: মাখরামা ইবন নাওফাল আয-যুহরী, উমায়র ইব্‌ন ওয়াহাব আল-জুমাহী, হিশাম ইবন 'উমার এবং তাহার ভাই। তাহদিগকে কয়টি করিয়া উট প্রদান করা হইয়াছিল তাহা জানা যায় নাই। তবে আদী ইব্‌ কায়স আস্-সাহমীকে পঞ্চাশটি এবং আব্বাস ইব্‌ন মিরদাসকে চল্লিশটি উট প্রদান করিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩১৩)।
রাসূলুল্লাহ (স) জি'রানায় কুরায়শ এবং অন্যান্য কবীলার সরদারগণকে যে মহামূল্যবান উপঢৌকনাদি প্রদান করিলেন তাহার তাৎপর্য অনুধাবনে ব্যর্থ হইয়া কেহ কেহ অশোভনীয় মন্তব্যও করিয়া বসে।
ইবন ইসহাক লিখেন, তামীম বংশীয় এক ব্যক্তি যুলখুয়ায়সিরা উপহারসামগ্রী বণ্টনের সময় দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া প্রত্যক্ষ করিয়া বলিল, হে মুহাম্মাদ! আজ আপনি যাহা করিলেন তাহা আমি লক্ষ্য করিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি কি লক্ষ্য করিলে? সে বলিল, আপনি সুবিচার করেন নাই। অসন্তোষে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চেহারা মোবারক লাল হইয়া গেল। তিনি বলিলেন, আমিই যদি সুবিচার না করি দুনিয়ায় আর সুবিচার করিবে কে? হযরত উমার (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অনুমতি দিন, আমি এই অপদার্থকে খতম করিয়া ফেলি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহাকে যাইতে দাও। তাহার বংশধরদের মধ্যে সাচ্চা মুসলমান পয়দা হইবে (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ৩১৪)।
আল্লামা শিবলী নু'মানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নন্দরী উল্লেখ করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) বন্ধু-বান্ধবদের নিকট হইতে হাদিয়া ও তোহফা গ্রহণ করিতেন। তিনি ইহাকে ভালবাসা বৃদ্ধির উপকরণ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, পরস্পর হাদিয়া আদান-প্রদান কর। তাহা হইলে একের সহিত অন্যের মহব্বত পয়দা হইবে। এইজন্য সাহাবীগণ প্রত্যহ কিছু না কিছু হাদিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে প্রেরণ করিতেন (সীরাতুন-নবী, ২খ., পৃ. ১৯৪)।
একবার এক মহিলা একটি চাদর রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে পেশ করিলেন, তিনি তাহা গ্রহণ করিলেন। তখনই এক ব্যক্তি উহা কামনা করিল। রাসূলুল্লাহ (س) চাদরটি তাহাকে দান করিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৪)।
পার্শ্ববর্তী দেশের শাসকগণও তাঁহার নিকট হাদিয়া প্রেরণ করিতেন। একবার একজন আমীর রাসুলুল্লাহ (س)-কে এক জোড়া মোজা উপহার দিয়াছিলেন। রোম সম্রাট রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য এক প্রন্থ কাপড় উপঢৌকন পাঠাইয়াছিলেন। ইহাতে হালকা রেশমের কারুকাজ খচিত ছিল। চাদরটি তিনি অল্প সময়ের জন্য পরিধান করিয়াছিলেন। পরে তাহা খুলিয়া হযরত আলী (রা)-এর ভাই হযরত জা'ফর (রা)-এর নিকট পাঠাইয়া দেন। হযরত জা'ফর (রা) চাদরটি গায়ে দিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলে তিনি বলিলেন, চাদরটি এইজন্য দেওয়া হয় নাই যে, তুমি তাহা ব্যবহার করিবে। তিনি আরয করিলেন, তাহা কি করিব? তিনি বলিলেন, প্রিয় ভাই হাবশার বাদশাহ্ নাজাশীর জন্য উপঢৌকন পাঠাও (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৪)।
ইয়ামানের বাদশা সীয়েজেন, যিনি হাবশী শাসনের অবসান ঘটাইয়া ইরানীদের অধীনে মুসলিম শাসন কায়েম করিয়াছিলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য একটি দামী জামা উপহারস্বরূপ পাঠাইয়াছিলেন যাহার মূল্য ছিল ২৩টি উটের সমান। রাসূলুল্লাহ (س) তাহা কবুল করিয়াছিলেন এবং তাহার নিকটও একটি দামী জামা প্রেরণ করিলেন যাহারা মূল্য ছিল ২০টি উটের সমান (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৪)।
একবার কাজায়াহ গোত্রের এক লোক রাসূলুল্লাহ (س)-এর খেদমতে হাদিয়াস্বরূপ একটি উটনী প্রেরণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-ও তাহার নিকট বিনিময়ে কিছু উপঢৌকন পাঠাইলেন। ইহাতে সে নারাজ হইল। রাসূলুল্লাহ (স) মিম্বরের উপর দাঁড়াইয়া খুতবা দিলেন এবং বলিলেন, তোমরা আমার নিকট হাদিয়া পাঠাও, আমিও সাধ্যমত উহার বিনিময়ে কিছু প্রদান করি। ইহাতে তোমরা আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হও। ভবিষ্যতে আমি কুরায়শ, আনসার, ছাকীফ এবং আওস গোত্র ব্যতীত আর কোন গোত্রের নিকট হইতে হাদিয়া গ্রহণ করিব না (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৪)।
হযরত আবূ আয়্যব আনসারী (রা) অধিকাংশ সময় খাদ্যসামগ্রী রাসূলুল্লাহ (স)-এর গৃহে প্রেরণ করিতেন। রাসূলুল্লাহ (স) পড়শী ও প্রতিবেশীদের গৃহেও হাদিয়া পাঠাইতেন.. আসহাবে সুফফার সদস্যগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাদিয়া গ্রহণ করিতেন (সীরাতুন-নবী, ২খ.,
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, একদিন আমি প্রচণ্ড ক্ষুধায় মদীনার প্রধান রাস্তায় বসিয়াছিলাম। হযরত আবূ বকর (রা) সেই স্থান দিয়া যাইতেছিলেন। আমি তাঁহাকে বিনীতভাবে আল-কুরআনুল কারীমের একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলাম। তিনি উত্তর দিয়া চলিয়া গেলেন, কিন্তু আমার অবস্থা বুঝিতে পারিলেন না। হযরত উমার (রা)-ও তাহাই করিলেন। এই সময় রাসূলুল্লাহ (স) সেই পথে আসিলেন। তিনি আমাকে দেখিয়া মৃদু হাসিলেন ও বলিলেন, আমার সাথে আইস। তিনি ঘরে পৌছিয়া এক পাত্র দুধ দেখিতে পাইলেন। জিজ্ঞাসা করিয়া জানিতে পারিলেন যে, তাহা হাদিয়া হিসাবে আসিয়াছে। তিনি আমাকে সুফফার সকল লোককে ডাকিয়া আনিতে বলিলেন। আমি তাহাদের সকলকে লইয়া হাজির হইলাম। তিনি দুধের পাত্রটি আমার হাতে দিয়া সকলকে বিতরণ করিয়া দিতে বলিলেন। সেই এক বাটি দুধ সকলেই তৃপ্তি সহকারে পান করিলেন (আফযালুর রহমান, হযরত মুহাম্মদ (স) জীবনী বিশ্বকোষ, পৃ. ৯২)।
একদিন আল্লাহর রাসূল (স) সুফফার সকলকে লইয়া হযরত 'আইশা (রা)-এর ঘরে আসিলেন এবং ঘরে যাহা খাবার ছিল তাহা আনিতে বলিলেন। হযরত 'আইশা (রা) যাহা রান্না করিয়াছিলেন সবই দিয়া দিলেন। তিনি আরো কিছু খাবার চাহিলে হযরত 'আইশা (রা) কিছু খেজুর আনিয়া দিলেন। ইহার পর একটি পাত্র ভরিয়া দুধ লইয়া আসিলেন, তাহা ছিল ঘরের সর্বশেষ খাবার। এইভাবেই রাসূলুল্লাহ (স) সকল কিছু বিতরণ করিতেন (আফযালুর রহমান, হযরত মুহাম্মদ (স) জীবনী বিশ্বকোষ, পৃ. ৯২)।
'বারযা' হইতে আগত একটি কাফেলা মদীনার উপকণ্ঠে থামিয়া গেল। আজিকার মত তাহারা ডেরা (তাঁবু) ফেলিল সেখানে বিশ্রাম নিয়া ক্লান্ত শরীরটাকে তাজা করিয়া আগামী দিন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট যাইবে। কাফেলাটি বেশ বড়, পুরুষ আছে অনেকজন। মহিলার সংখ্যাও নগণ্য নয়। উট আছে, অশ্ব আছে, আর আছে একটি বিশেষ সম্পদ- লোহিত বর্ণের উষ্ট্র। মরুর দেশে লাল উট যেমন দুর্লভ, তেমনি উহার কদর। এই উটটি তাহারা বিক্রয় করার জন্য সঙ্গে করিয়া আনিয়াছে।
কাফেলা বিশ্রাম করিতেছিল, এমন সময় একজন আগন্তুক আসিলেন এবং সালাম করিয়া লাল উটটির পাশে দাঁড়াইলেন। সর্বাঙ্গে সাদা পোশাক। সুশ্রী মানুষ। অত্যন্ত অভিজাত চেহারা। কাফেলার পুরুষদের নিকট আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, এই উট কি আপনারা বিক্রয় করিবেন? তাহারা বলিল, হাঁ। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, দাম কত? কাফেলার তরফ হইতে দাম জানানো হইল। দাম শুনিয়া তিনি আর কোন কথা বলিলেন না। সেই মূল্য স্বীকার করিয়া উটের লাগাম ধরিয়া শহরের দিকে আগাইয়া চলিলেন।
বেশ কিছু পরে লোকটি যখন দৃষ্টিসীমার বাহিরে চলিয়া গেলেন তখন কাফেলার একজন আরেকজনকে প্রশ্ন করিল, আচ্ছা লোকটিকে চিন কি? সে উত্তর দিল, না। শেষে সকলকে জিজ্ঞাসা করা হইল, তাহারা কেহই লোকটি সম্পর্কে কিছুই জানে না। অবশেষে তাহাদের মধ্যে শুরু হইল আফসোস-অনুশোচনা। কেহই চিনে না অথচ একজন অজানা-অচেনা লোকের হাতে উটটি চলিয়া গেল। তারপর ইহা লইয়া তাহাদের মধ্যে শুরু হইল আত্মকলহ।
সেই কাফেলায় একজন মহিলা ছিলেন, তিনি ছিলেন খুবই বুদ্ধিমতী। তিনি সকলকে সান্ত্বনা দিয়া দৃঢ়কণ্ঠে বলিলেন, তোমরা থাম। আমি জীবনে এমন সুদর্শন ও জ্যোতির্ময় পুরুষ দেখি নাই। আল্লাহর কসম! এমন অভিজাত পবিত্র চেহারার মানুষ কখনও প্রবঞ্চক হইতে পারেন না।
রাত একটু গভীর হইবার মুখে হঠাৎ কোন ব্যক্তির পদধ্বনি শোনা গেল। কাফেলার সকলেই উৎকর্ণ হইল। লাল উটতো গেছেই, কোন ঠকবাজের পাল্লায় পড়িয়া অন্য উটগুলি না চলিয়া যায়। চুরি হইতে পারে, সুতরাং কাফেলার সকলেই মুহূর্তে সতর্ক হইয়া গেল। ক্রুর চোখে তাকাইয়া থাকিল আগন্তুকের পথের দিকে। আগন্তুক ধীরে ধীরে সামনে আসিয়া দাঁড়াইলেন। সকলের উদ্দেশ্যে সালাম জানাইয়া বলিলেন, উট তো আপনাদেরই? হাঁ, কেন কি হইয়াছে? আগন্তুক বলিলেন, এই নিন আপনাদের উটের দাম, যিনি উট লইয়া গিয়াছিলেন তিনি পাঠাইয়াছেন। আর উটের দামের সহিত হাদিয়াস্বরূপ পাঠাইয়াছেন আজিকার রাতের খানা। আল্লাহর নবী সত্যের বাহক হযরত মুহাম্মাদ (স) উটের মূল্য আর রাশিকৃত খাদ্যবস্তু উপঢৌকন পাঠাইয়া সকলকে নির্বাক করিয়া দিয়াছিলেন (আবদুল আযীয আল-আমান, আলোর আবাবিল, পৃ. ২৫, ২৬)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতিবেশীদের মধ্যে যে সকল ধনী সমাজপতি বাস করিতেন তাহাদের মধ্যে হযরত সা'দ ইবন উবাদা (রা), হযরত সা'দ ইবন মু'আয (রা), হযরত আম্মার ইবন হাযম (রা) এবং হযরত আবূ আয়্যুব আনসারী (রা)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে দুধ প্রেরণ করিতেন, আর ইহাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রধান আহার্য দ্রব্য। হযরত সা'দ ইবন 'উবাদা (রা) নিয়মিতভাবে তাঁহার গৃহ হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য বড় পাত্রে আহার্য পাঠাইতেন। কখনও ইহাতে ব্যাঞ্জন, আবার কখনও দুধভর্তি থাকিত (শিবলী নু'মানী ও সৈয়দ সুলায়মান নদবী, সীরাতুন নবী, ১খ., পৃ. ১৬৯; তাবাকাত ইবন সা'দ, কিতাবুন-নিসা, পৃ. ১১৬)।
হযরত আনাস (রা)-র মাতা উম্মে আনাস (রা) তাঁহার সম্পত্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে পেশ করিলে তিনি তাহা গ্রহণ করেন এবং উহা তাঁহার ধাত্রী হযরত উম্মে আয়মান (রা)-কে প্রদান করেন। স্বয়ং তিনি সাধারণ জীবন যাপন করিতেন (বুখারী, কিতাবুল-হিবা, পৃ. ৩৫৮)।
সা'ঈদ ইব্‌ন জুবায়র (র) বলেন, একদা ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, বৃহস্পতিবার, হায়রে বৃহস্পতিবার! এই বলিয়া তিনি কাঁদিতে লাগিলেন। এমনকি তাঁহার অশ্রু ধারায় কংকর ভিজিয়া যায়। আমি বলিলাম, হে আবূ আব্বাস! বৃহস্পতিবারের রহস্য কি? তিনি বলিলেন, সেই দিন রাসূলুল্লাহ (স)-এর পীড়া বৃদ্ধি পায়। তখন তিনি বলিলেন, আমার নিকট আস, আমি তোমাদিগকে এমন একটি লিপি লিখিয়া দেই, যাহাতে আমার পরে তোমরা আর পথভ্রষ্ট হইবে না। তখন উপস্থিত সাহাবীগণ পরস্পর বিতর্কে লিপ্ত হইলেন। অথচ রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে তর্ক-বিতর্ক করা উচিত ছিল না। তাঁহারা বলিলেন, নবী করীম (স)-এর অবস্থা এখন কীরূপ? তিনি কি অর্থহীন কথা বলিতেছেন? তোমরা তাঁহার কথা বুঝার চেষ্টা কর। রাবী বলেন,
রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা আমাকে বিতর্ক হইতে মুক্ত থাকিতে দাও। কেননা আমি যে অবস্থায় রহিয়াছি তাহাই উত্তম। আমি তোমাদিগকে তিনটি বিষয়ে ওসীয়াত করিতেছি: মুশরিকদিগকে আরব উপদ্বীপ হইতে বহিষ্কার কর, প্রতিনিধি দলকে উপঢৌকন দাও যেমন আমি তাহাদিগকে উপঢৌকন দিতাম। বর্ণনাকারী তৃতীয়টি প্রকাশ করেন নাই (মুসলিম, কিতাবুল ওয়াসিয়াত, পৃ. ৪২, ৪৩)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে যী-মুররা হইতে তেরজন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল আসে। তাহাদের সরদার ছিলেন হারিছ ইবন 'আওফ (রা)। তাহারা আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আপনার গোত্রেরই লোক। আমরা লুআই ইব্‌ন গালিবের বংশধর। এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) মৃদু হাসিলেন এবং হারিছকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, পরিবার-পরিজন কোথায় রাখিয়া আসিয়াছ? তিনি বলিলেন, সালাহ্ নামক স্থানে। তিনি আবার বলিলেন, তোমাদের দেশের অবস্থা কি? তিনি বলিলেন, নিদারুন খরায় দেশ বিরান হইয়া গেল, পশুর মগজ পর্যন্ত শুকাইয়া গিয়াছে। দয়া করিয়া আমাদের জন্য দোয়া করুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হে আল্লাহ! তাহাদিগকে বৃষ্টি দ্বারা তৃপ্ত করুন।
তাহারা বেশ কয়েক দিন মদীনায় অবস্থান করিয়া দেশে ফিরিয়া যাইতে ইচ্ছা করিল। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত বিলাল (রা)-কে ডাকিয়া বলিলেন, তাহাদিগকে উপঢৌকন প্রদান কর। তাহাদের প্রত্যেককে দশ উকিয়া এবং হারিছ ইব্‌ন আওফকে বার উকিয়া প্রদানের নির্দেশ দেন। তাহারা দেশে ফিরিয়া জানিল যে, যেই দিন রাসূলুল্লাহ (স) দো'আ করিয়াছিলেন সেই দিনই বৃষ্টি হইয়াছিল (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৪৫৭)।
দশম হিজরীর শা'বান মাসে খাওলানের প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়। তাঁহাদের সাহিত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। তাঁহারা যখন বিদায় নিল তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদিগকে হাদিয়া প্রদান করেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫৭-৪৫৮)।
দশম হিজরীর রমযান মাসে গাস্সানের তিন ব্যক্তি আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করেন। তাহারা বলেন, জানি না আমাদের স্বজাতির লোকজন ইসলাম গ্রহণ করিবে কিনা। তাহারা তো তাহাদের রাজত্ব রক্ষা এবং রোমক সম্রাটের নৈকট্যের জন্য লালায়িত। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের বিদায়ের সময়ও উপহারসামগ্রী প্রদান করেন।
সাত সদস্যবিশিষ্ট সালমান প্রতিনিধি দল আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাত করেন- এবং তাহাদের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন। হাবীব ইবন উমার (রা)-ও তাঁহাদের মধ্যে ছিলেন। তাঁহারা বর্ণনা করেন, আমরা তিন দিন মদীনায় ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) তিন দিনই আমাদের জন্য হাদিয়া প্রেরণ করেন। যখন বিদায়ের সময় হইল তখন হযরত বিলাল (রা) তাঁহার নির্দেশক্রমে আমাদের প্রত্যেককে পাঁচ উকিয়া করিয়া উপঢৌকন প্রদান করেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬৩)।
তুজীব কবিলার তের ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হন। তাহারা সাথে লইয়া আসেন তাহাদের উপর যাকাতের সম্পদ ও পশুপাল। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে কতিপয়
প্রশ্নও করেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর প্রদান করেন। তাহাদের বিদায়ের প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত বিলাল (রা)-কে বলিলেন, তাহাদের পাথেয় ও উপঢৌকন প্রদান কর। হযরত বিলাল (রা) অন্যান্য প্রতিনিধি দলের তুলনায় তাহাদিগকে বেশী করিয়া উপঢৌকন প্রদান করেন।
বিদায়ের মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি উপহার সামগ্রী হইতে বাকী রহিল না তো? তাহারা বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে সর্বকণিষ্ঠ এক তরুণকে আমাদের বাহন ও আসবাবপত্রের নিকট রাখিয়া আসিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকেও ডাকিয়া পাঠাইলেন। তারপর তিনি তাহাকেও তাহার সাথীদের মতো উপঢৌকন দিয়া সকলকে একই সঙ্গে বিদায় দিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪৮, ৪৪৯)।
আল-ওয়াকিদী আবূ নু'মান প্রমুখাৎ বর্ণনা করেন এবং তিনি তাঁহার পিতার প্রমুখাৎ- যিনি নিজে বানু সা'দ হুযায়মের লোক ছিলেন, বর্ণনা করেন, আমি আমার সম্প্রদায়ের কতিপয় লোককে নিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাযির হই। এখন গোটা আরবে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অপ্রতিহত সাফল্য। দেশে দুই প্রকারের লোক ছিল: কেহ স্বেচ্ছায় স্বতস্ফূর্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল, আবার কেহ তরবারির ভয়ে আনুগত্য স্বীকার করিয়াছিল।
আমরা যখন মদীনায় আসিলাম তখন শহরের বাহিরেই অবস্থান করিলাম, তারপর ধীরে ধীরে মসজিদের দিকে আগাইয়া গেলাম। যখন মসজিদের দরজায় পৌছিলাম তখন রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদের ভিতরে জানাযার সালাত আদায় করিতেছিলেন। সালাতশেষে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত কথা হইল। তারপর আমরা সকলে আনুষ্ঠানিকভাবে রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাতে বায়'আত গ্রহণ করিলাম। তারপর আমরা অবতরণ স্থলে ফিরিয়া আসিলাম। আমাদের মালপত্রের হিফাজতের জন্য একটি ছেলেকে রাখিয়া আসিয়াছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) আমাদিগকে আবার ডাকিলেন, আমরা আমাদের সাথীকে নিয়া গেলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাহারও বায়'আত নিলেন। যখন আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হইতে বিদায় নিতে উদ্যত হইলাম তখন তিনি হযরত বিলাল (রা)-কে আমাদের প্রত্যেককে কয়েক উকিয়া করিয়া রৌপ্য হাদিয়া প্রদানের নির্দেশ দিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫০, ৪৫১)।
আল-ওয়াকিদী কারীমা বিন্ত মিকদাদ হইতে বর্ণনা করেন যে, তাহার মা দাবা'আ বিন্ত যুবায়র ইব্‌ন আবদুল-মুত্তালিব তাঁহার নিকট বর্ণনা করেন যে, ইয়ামানের বাহরা কবীলার প্রতিনিধি দল যখন আগমন করেন তখন সেই দলে তেরজন সদস্য ছিলেন। তাহারা তাহাদের সওয়ারীসহ মিকদাদ ইবনুল-আসওয়াদের দরজা পর্যন্ত আসিলেন। ঐ সময় আমরা সকলেই নিজ নিজ ঘরে ছিলাম। মিকদাদ বাহির হইয়া তাহাদিগকে মারহাবা বলিলেন এবং তাহাদিগকে সেখানেই অবতরণ করিতে বলিলেন। তাহার পর তিনি ঘরে আসিয়া কিছু পাকানো খাদ্য তাহাদের জন্য লইয়া যান। তাহারা অত্যন্ত তৃপ্তির সহিত আহার করিলেন। পেয়ালা যখন ফেরত আসিল তখন তাহাতে অল্প কিছু খাদ্য অবশিষ্ট ছিল। মিকদাদ তনয়া বলেন, অবশিষ্ট খাদ্যটুকু আমরা একটি ছোট পেয়ালায় করিয়া আমাদের বাঁদী সিদরার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ
(স)-এর খিদমতে হাদিয়া পাঠাইলাম। রাসূলুল্লাহ (স) তখন উম্মু সালামা (রা)-এর ঘরে অবস্থান করিতেছিলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন, দাবা'আ পাঠাইয়াছে নাকি? সিদরা বলিল, হাঁ। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আচ্ছা! রাখিয়া দাও। তাঁহার পর তিনি মেহমানদের অবস্থা জিজ্ঞাসা করিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (س) এবং উপস্থিত সকলেই তাহা তৃপ্তির সহিত খাইলেন। সিদরাও তাহা হইতে খাইল। তাহার পরও একাংশ অবশিষ্ট রহিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, মেহমানদের জন্য এইটুকু লইয়া যাও। সিদরা বলেন, ইহার পর আমি তাহা লইয়া গেলাম এবং যত দিন পর্যন্ত মেহমানরা সেইখানে ছিল প্রত্যেকবারই আমি ঐ অবশিষ্ট খাদ্যাংশ তাহাদের জন্য লইয়া খাইতাম, অথচ তাহা একটুও হ্রাস পাইত না। মেহমানরা হযরত মিকদাদ (রা)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে আবু মা'বাদ! এমন সুস্বাদু খাবার তুমি আমাদেরকে খাওয়াইলে যাহা আমরা জীবনে কোন দিন কোথাও খাই নাই। আবূ মা'বাদ তাহাদিগকে সব খুলিয়া বলিলেন। আরও বলিলেন, এই স্বাদ হইতেছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অঙ্গুলীসমূহের বরকতে। এই ঘটনা শুনিয়া তাহারা সকলেই মুসলমান হইয়া গেলেন। তাহাদের মনে এই দৃঢ় প্রতীতি জন্মাইল যে, রাসূলুল্লাহ (স) সত্য সত্যই আল্লাহর রাসূল। তাহার পর তাহারা সেইখানে কয়েক দিন অবস্থান করেন এবং দীনের জ্ঞান অর্জন করেন। তাহাদের বিদায়ের সময় অন্যান্য প্রতিনিধি দলসমূহের ন্যায় তাহাদিগকেও যথারীতি উপঢৌকন সামগ্রী দিয়া বিদায় দিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫৪)।
নবম হিজরীর সফর মাসে বার সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করেন। হামযা ইবন নু'মান (রা)-ও তাহাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) জিজ্ঞাসা করিলেন, কোন কবীলার লোক? তাহাদের ভাষ্যকার জানাইলেন, আমরা উফ্রা গোত্রের লোক, মাতার দিক হইতে যিনি কুসাঈর ভাই ছিলেন। ইহাদের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাদিগকে সিরিয়া বিজয়ের সুসংবাদ দেন। তিনি আরও জানান যে, হিরাক্লিয়াস এই দেশ হইতে পালাইয়া যাইবে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে ভবিষ্যদ্বক্তার নিকট যাইতে নিষেধ করিলেন এবং তাহাদের মধ্যে কুরবানী সংক্রান্ত প্রচলিত নানা প্রথা হইতে বিরত থাকিতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, কুরবানী ছাড়া আর কোনরূপ পশু বলি যেন তাহারা না দেয়। তাহারা কয়েক দিন পর্যন্ত অবস্থান করেন। বিদায় বেলায় অন্যান্য প্রতিনিধি দলের মত তাহাদিগকেও উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয় (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫৫)।
নবম হিজরীর রবীউল আওওয়াল মাসে বালিয়িয় কবিলার প্রতিনিধি দল আগমন করেন। রুওয়ায়ফি' ইব্‌ন ছাবিত বালাবী (রা) যেহেতু এই গোত্রেরই লোক ছিলেন তাই তিনি তাঁহাদিগকে তাহারই বাড়ীতে রাখেন এবং নিজেই তাহাদিগকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে লইয়া যান। সেখানে গিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইহারা আমার গোত্রীয়। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, তোমাকে এবং তোমার স্বগোত্রীয়দিগকে স্বাগতম। তাহারা সবাই মুসলমান হইয়া যান এবং রাসূলুল্লাহ (স)-কে বিভিন্ন বিষয় প্রশ্ন করেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সকল প্রশ্নের যথাযথ উত্তর প্রদান করেন।
রুওয়ায়ফি' (রা) বলেন, তাহারা আমার ঘরে ফিরিয়া আসিলেন। কিছুক্ষণ পরই রাসূলুল্লাহ (স) হাদিয়াস্বরূপ কিছু খেজুর লইয়া আমার বাড়ীতে উপস্থিত হইলেন এবং তাহাদিগকে তাহা দিলেন। উহার পর তাহারা আরও তিন দিন ছিলেন। তাহারা যেইদিন চলিয়া যাইবেন সেই দিন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বিদায় নিতে গেলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে উপহারসামগ্রী প্রদান করিয়া বিদায় দিলেন। উপহারসামগ্রী লইয়া তাহারা তাহাদের এলাকায় ফিরিয়া গেলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫৫, ৪৫৬)।
মক্কা বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহ (স) কতিপয় লোককে হত্যা করার নির্দেশ দিয়াছিলেন। কা'ব ইব্‌ন যুহায়র ছিলেন তাহাদের অন্তর্ভুক্ত। ইবন ইসহাক লিখেন, রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাইফ হইতে প্রত্যাবর্তন করিলেন তখন বুজায়র ইবন যুহায়র তাঁহার ভাই কা'ব ইব্‌ন যুহায়রকে লিখিলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর কুৎসা রটনাকারী সকল কবি ইতোমধ্যে নিহত হইয়াছে। কুরায়শ বংশের কবিদের মধ্যে কেবল ইবনুয-যুবআরী এবং হুবায়রা ইব্‌ন ওয়াত্বাব তখনও বাঁচিয়া রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর রীতি হইল, যাহারা অনুতপ্ত ও মুসলমান হইয়া তাঁহার দরবারে উপস্থিত হয় তিনি তাহাদিগকে হত্যা করেন না। এখন তোমার যদি বাঁচিবার ইচ্ছা থাকে তাহা হইলে শীঘ্র ক্ষমাপ্রার্থী হও। ইহা ছাড়া উপায় নাই। বুজায়র ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে তাহাকে উৎসাহ দিয়া কবিতার কয়েকটি পংক্তিও রচনা করেন। গত্যন্তর না দেখিয়া কা'ব ইব্‌ন যুহায়র রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রশস্তিমূলক একটি কবিতা রচনা করিয়া মদীনায় আসিলেন এবং জুহায়নার পূর্ব পরিচিত বন্ধুর নিকট উঠিলেন। প্রত্যূষে তিনি তাহাকে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) সালাত সমাপ্ত করিলে কা'ব তাঁহার সামনে উপস্থিত হইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) কা'বকে চিনিতেন না। তাই তাঁহার বন্ধু কা'ব- এর হাত ধরিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কা'ব ইব্‌ন যুহায়র তওবা করিয়া মুসলমান হইয়া আপনার দরবারে উপস্থিত হইয়া অভয় প্রার্থনা করিতেছে। আপনি কি তাহাকে অভয় দিবেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হাঁ। তখন কা'বও নিজ পরিচয় ব্যক্ত করিয়া বলিলেন, আমি কা'ব ইন্ন যুহায়র।
শায়খ 'আবদুল হক মুহাদ্দিছ দিহলাবী লিখেন, কা'ব ইব্‌ন যুহায়র তখন তাঁহার রচিত কবিতা "বানাত সু'আদ" আবৃত্তি করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) অত্যন্ত প্রীত হইলেন এবং স্বীয় চাদর মুবারক তাঁহাকে উপহারস্বরূপ প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সেই চাদরখানি কা'ব ইন্ন যুহায়র আজীবন সযত্নে রক্ষা করেন। হযরত মু'আবিয়া (রা) চাদরখানি দশ হাজার দিরহামের বিনিময়ে তাহার নিকট হইতে চাহেন, কিন্তু তিনি কোনমতেই তাহাতে রাজী হন নাই। তাঁহার ইন্তিকালের পর অবশেষে মু'আবিয়া (রা) তাঁহার উত্তরাধিকারীদের নিকট হইতে বিশ হাজার দিরহামের বিনিময়ে উহা হস্তগত করেন। দীর্ঘকাল পর্যন্ত ঐ চাদর মুবারক মুসলমান শাসকদের নিকট সংরক্ষিত ছিল (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ৩৩০-৩২)।
রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আলী (রা)-কে বানু তাঈ গোত্রের দেবালয় ধ্বংস করার জন্য প্রেরণ করেন। তাঁহার সহিত দেড় শত অশ্বারোহী ছিল। তাহাদের সহিত সাদা ছোট পতাকা ও কালো বড় পতাকা ছিল। তাঁহারা 'কুল্স'-এর দেবালয়ে পৌছিয়া ফজরের সময় হামলা করিয়া
দেবালয়টি ধ্বংস করিয়া দেন। তারপর তাহাদের নারীদের গ্রেফতার করিয়া প্রচুর উট ও বক্রী লাভ করেন। বন্দীদের মধ্যে বিখ্যাত হাতিম তাই-এর কন্যাও ছিল।
সে বন্দী হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে নীত হইলে পর আরয করিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা পরলোকগত। আমার অভিভাবক আমাকে একা ফেলিয়া নিরুদ্দিষ্ট। আমি দুর্বল নারী, আমার দ্বারা কোন খেদমতও হইবে না। আপনি আমার প্রতি সদয় হউন। আল্লাহ আপনার প্রতি সদয় হইবেন। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার অভিভাবক কে? সে বলিল, 'আদী ইব্‌ন হাতিম। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে মুক্ত করিয়া দিলেন এবং তাহার ফেরত আসার জন্য হাদিয়াস্বরূপ একটি উট প্রদান করিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২৮-২৯)।
হাতিব ইব্‌ন আবূ বালতা'আ (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) আলেকজান্দ্রিয়ার বাদশাহ্ মুকাওকিসের নিকট প্রেরণ করেন। তিনি ছিলেন কিবতীদের সরদার। তিনি অত্যন্ত সম্ভ্রমের সহিত হযরত হাতিব (রা)-এর সহিত সাক্ষাত করেন এবং উপঢৌকনস্বরূপ তিনজন কুমারী কন্যা (মারিয়া কিবতিয়া এবং তাঁহার দুই বোন, একজনের নাম ছিল সিরীন এবং অপর জনের নাম কায়সারী) এক হাজার মিছকাল স্বর্ণ, বিশটি কিবতী বস্ত্র, একটি শ্বেত মাদী খচ্চর অর্থাৎ দুলদুল, একটি শ্বেত গাধা, আফীর ও মাবুর নামক জনৈক নপুংসক গোলাম, লাযযাত নামক একটি ঘোড়া, একটি কাঁচের পেয়ালা মধু প্রেরণ করেন। সকল উপঢৌকনসামগ্রী গ্রহণ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, খবীছ রাজ্যের লোভে আত্মবিস্মৃত হইয়াছে, অথচ ইহা নশ্বর (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০০)।
সালীত ইব্‌ন 'আমর (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) হাওযা ইব্‌ন আলীর নিকট ইয়ামামায় প্রেরণ করেন। তিনি যথেষ্ট সম্ভ্রমপূর্ণ আচরণ করেন এবং হিজর এলাকায় প্রস্তুতকৃত উন্নত মানের পরিধেয় বস্ত্র রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য উপঢৌকন প্রদান করেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০০)।
ফারওয়া ইব্‌ন আমর আল-জুহানী রোমের কায়সারের পক্ষ হইতে মা'আন-এর গভর্নর ছিল। এলাকার শামী ও আরব অঞ্চলসমূহের উপরও তাহার আধিপত্য ছিল। কোন কোন রিওয়ায়াত অনুসারে তাহার নিকটও রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাসিদ পৌছিয়াছিলেন। পক্ষান্তরে ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন যে, তিনি স্বয়ং মাস'উদ ইবন সা'দকে রাসূলুল্লাহ (س)-এর খিদমতে প্রেরণ করেন এবং নিজের ইসলাম গ্রহণের সংবাদও তাঁহাকে অবগত করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য উপঢৌকনসামগ্রীও প্রেরণ করিয়াছিলেন। তন্মধ্যে ফায্যা নামক একটি ঘোড়া এবং শ্বেত বর্ণের একটি খচ্চরও ছিল। আয-যারব নামক অন্য একটি ঘোড়া, ইয়াফুর নামক একটি গাধা, কিছু বস্ত্র এবং স্বর্ণের কারুকাজ সম্বলিত রেশমী কুবাও সেই উপহারসামগ্রীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) সেই উপহারসামগ্রী গ্রহণ করেন এবং বাহক মাস'উদ ইবন সা'দকে বার উকিয়া এবং এক নশ হাদিয়া প্রদান করেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০২-৪০৩)।
ইবন ইসহাক বলেন, ইয়াযীদ ইবন উবায়দ সা'দী আমার নিকট বর্ণনা করিয়াছেন, তাহারা কোন এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দুধবোন শায়মাকে বন্দী করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট
উপস্থিত করিলেন। তখন তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার দুধবোন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইহার নিদর্শন কি? জবাবে শায়মা বলিলেন, আপনি যে শিশুকালে আমার পিঠে কামড় দিয়াছিলেন তাহার দাগ এখনো আমার পিঠে বিদ্যমান রহিয়াছে। রাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) নিদর্শনটি শনাক্ত করিতে সমর্থ হন। তিনি তাঁহার জন্য চাদর বিছাইয়া দিলেন এবং তাঁহাকে ইহার উপর বসাইলেন। তিনি তাঁহাকে দুইটি প্রস্তাব দিয়া বলিলেন, তুমি যদি আমার নিকট থাকিতে পসন্দ কর তাহা হইলে প্রাণঢালা ভালবাসা ও সম্মান পাইবে। আর তুমি যদি তোমার সম্প্রদায়ের নিকট আমার দেওয়া উপহারসামগ্রী লইয়া ফিরিয়া যাইতে চাও তাহা হইলে তোমাকে তাহাই দিব। শায়মা বলিলেন, উপহারসামগ্রীসহ আমার সম্প্রদায়ের নিকট ফিরাইয়া দিন। সেইমতে রাসূলুল্লাহ (স) প্রচুর উপঢৌকনসহ তাঁহাকে তাঁহার সম্প্রদায়ের নিকট পাঠাইয়া দিলেন।
বানূ সা'দের লোকেরা বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) শায়মাকে মাকতুল নামক এক গোলাম এবং তাহার সহিত একজন বাঁদীকেও উপহারস্বরূপ প্রদান করেন (ইন হিশাম, আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৪খ., পৃ. ৬০, ৬১)।
শুকরান (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর আযাদকৃত গোলাম সাহাবী। ইনি হাবশী ছিলেন। নাম ছিল সালেহ্ ইব্‌ন আদী। হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) তাঁহাকে হাদিয়াস্বরূপ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৭১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর পাঁচটি খচ্চর ছিল

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর পাঁচটি খচ্চর ছিল


১. দুলদুল, মুকাওকিস্ রাসূলুল্লাহ (স)-কে হাদিয়াস্বরূপ প্রেরণ করিয়াছিল; ২. ফাদ্দা, ফারওয়া জুযামী কর্তৃক হাদিয়াস্বরূপ প্রেরিত; ৩. আইলা-রাজ কর্তৃক হাদিয়াস্বরূপ প্রেরিত খচ্চর; ৪. দূমাতুল জান্দাল কর্তৃক প্রেরিত খচ্চর। ৫. হাশ অধিপতি নাজাশী কর্তৃক প্রেরিত খচ্চর (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর তিনটি গাধা ছিল

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর তিনটি গাধা ছিল


১. আফরা, মুকাওকিস প্রেরিত গাধাটি—যাহা অন্যান্য • উপহারসামগ্রীর সহিত আসিয়া ছিল; ২. ফারওয়া জুযামী কর্তৃক হাদিয়াস্বরূপ গাধা; ৩. হযরত সা'দ ইবন উবাদা (রা) কর্তৃক হাদিয়াস্বরূপ প্রেরিত গাধা (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর ৯টি তরবারি ছিল

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর ৯টি তরবারি ছিল


১. আল-মাছুর; ২. আল-আদাব; ৩. যুল-ফিকার; ৪. কালঈ; ৫. আল-বিতার; ৬. আল- খানাফ; ৭. আর-রাসূব; ৮. আল-মিখদাম; ৯. আল-কুদায়ব। এইগুলির মধ্যে যুল-ফিকার তলোয়ারটি হযরত আলী (রা)-কে উপহার প্রদান করেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬৭)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি খাট ছিল। এই খাটটি হযরত আস'আদ ইব্‌ন যুরার। (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে হাদিয়াস্বরূপ প্রদান করিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬৯)।
উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা জানিতে পারিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (স) বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ, পরিচিত-অপরিচিত, প্রতিবেশী, সাহাবী ও আত্মীয়-স্বজনকে হাদিয়া বা উপঢৌকন প্রদান করিতেন। সাহাবীগণ ও বিভিন্ন দেশের মুসলিম-অমুসলিম শাসকগণ তাঁহার
নিকট উপঢৌকন প্রেরণ করিতেন, তিনি তাহা গ্রহণও করিতেন। হাদিয়া-তোহফা আদান- প্রদানের মাধ্যমে তাঁহারা ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হইয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই সুন্নত বা উত্তম আদর্শের আমল এখন বিলীন প্রায়। আমরাও যদি আমাদের প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও বিভিন দেশের রাজা-বাদশাহকে উপঢৌকন প্রদান করি, তহা হইলে আমরাও ভালবাসার সেই বন্ধনে আবন্ধ হইতে পারিব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00