📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর দয়ার্দ্রতা

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর দয়ার্দ্রতা


দয়ার্দ্রতা রাসূলুল্লাহ (স)-এর পূতপবিত্র জীবনাদর্শের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁহার সম্পর্কে রব্বুল 'আলামীন ঘোষণা করেন, "আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করিয়াছি” (২১:১০৭)।
দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তিনি ছিলেন পরম সহানুভূতিশীল এবং দয়ার্দ্র। উম্মুল-মু'মিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা) বলেন, "নবী করীম (স) সদাসর্বদা গরীব-মিসকীনদের মঙ্গল কামনা করিতেন। তিনি নিজে তাহাদের জীবিকা উপার্জনের ব্যবস্থা করিয়া দিতেন। কাহারো কোন কষ্ট দেখিলে তিনি অস্থির হইয়া পড়িতেন এবং ইহার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তাঁহার চেহারায় কোন প্রশান্তির চিহ্ন দেখা যাইত না” (সহীহ মুসলিম, আস্-সাদাকাত, ২খ., পৃ. ৪০৫, হাদীছ ১০১৭)।
দরিদ্র ও অসহায়দের প্রতি নবী করীম (স)-এর দয়ার্দ্রতা গুণ যে কত বেশী ছিল উহার প্রমাণ হইল, আল্লাহ্র দরবারে তাঁহার একটি বিশেষ মোনাজাত ৪ "হে আল্লাহ! আমাকে দরিদ্র অবস্থায় জীবিত রাখিও, দরিদ্র অবস্থায় মৃত্যু দান করিও এবং দরিদ্রদের সঙ্গে আমার হাশর করিও” (মিশকাত, ২খ., পৃ. ৬৬৫, হাদীছ ৫২৪৪)।
গনীমত হিসাবে নবী করীম (স)-এর নিকট কোন দাস-দাসী আসিলে তিনি তাঁহার নিজের আত্মীয়-স্বজন, এমনকি তাঁহার স্নেহময়ী কন্যা ফাতিমা (রা)-এর তুলনায়ও তাহাদের উপর দরিদ্রদের অধিকারকে অগ্রগণ্য মনে করিতেন। নবী করীম (স)-এর কন্যা চাক্কি পিযুক, কোমরে পানির মশক বহন করুক, ইহাতে তিনি রাজি ছিলেন। কিন্তু দরিদ্র অসহায় মানুষের তুলনায় তাঁহার কোন আত্মীয়-স্বজন বেশী সুযোগ-সুবিধা লাভ করুক উহা তিনি কখনও পছন্দ করিতেন না (ইবনুল আছীর, উসদুল-গাবা, প্রবন্ধ: উম্মু হাকীম)।
কেহ যদি কোন দরিদ্র অসহায় ব্যক্তিকে মন্দ বলিত তবে নবী করীম (স) খুবই অসন্তুষ্ট হইতেন এবং ইহাকে জাহিলী যুগের আচরণ বলিতেন (সুনান আবূ দাউد, ৫খ., পৃ. ৩৫৯, হাদীছ ১৫৫৭)।
হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-এর মত সাহাবীও যদি হযরত বিলাল (রা) কিংবা সুহায়ব (রা)-এর মত দরিদ্র সাহাবীদের মনে কোন রকম কষ্ট দিতেন তাহা হইলেও তিনি তাঁহাকে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ দিতেন এবং দরিদ্র অসহায়দের অসন্তুষ্টিকে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার অসন্তুষ্টি হিসাবে আখ্যায়িত করিতেন (সহীহ মুসলিম, ৪খ., পৃ. ১৯৪৭, হাদীছ ২৫০৪)।
কোন দরিদ্র ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর নবী করীম (স)-কে না জানাইয়া তাহাকে দাফন করিয়া ফেলিলে তিনি খুবই অসন্তুষ্ট হইতেন এবং তাহার কবরের পার্শ্বে দাঁড়াইয়া তাহার জন্য দু'আ করিতেন (সুনান নাসাঈ, কিতাবুল জানাইয; সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ৩৩৫)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর দয়ার্দ্রতাকে হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা) প্রবহমান বায়ু অপেক্ষাও অধিকতর গতিসম্পন্ন বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন, বিশেষত রমযান মাসের মুবারক দিনসমূহে (সহীহ বুখারী, ১খ., ওহী অধ্যায়)। হযরত জাবির (রা) বলিয়াছেন, নবী করীম (স)-এর নিকট যখনই কোন কিছু চাওয়া হইত, তিনি কখনও উহা দিতে অস্বীকার করিতেন না (সহীহ বুখারী, কিতাবুল মানাকিব)। হুনায়নের যুদ্ধে প্রায় চার হাজার অমুসলিম নরনারী বন্দী হয়। আরবের প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী তাহাদিগকে দাস-দাসী বানানো হইত। কিন্তু নবী করীম (س) তাহাদের সম্প্রদায়ের অন্যান্য লোকদের অনুরোধক্রমে তাহাদের সকলকে মুক্তি দেন (ইবন সা'দ, আত-তাবাকাত, পৃ. ১৫৩-১৫৫)। এতদ্ব্যতীত হুনায়নের যুদ্ধে গনীমত হিসাবে চব্বিশ হাজার উট, চল্লিশ হাজার বকরী এবং চার হাজার উকিয়া রৌপ্য পাওয়া গিয়াছিল। তিনি এই সমস্ত মাল মুজাহিদগণ এবং অন্যান্যদের মধ্যে বণ্টন কবিয়া দিয়াছিলেন (আল-ওয়াকিদী, আল-মাগাযী, ৩খ., পৃ. ১৪৯)। হুনায়নের যুদ্ধে বহু নও মুসলিম, এমনকি কতক অমুসলিমকে পর্যন্ত তিনি শত শত উট দান করিয়াছিলেন। সাফওয়ান ইবন উমায়্যাকে তিন শত উট দান করিয়াছিলেন (সহীহ মুসলিম, ৪খ., পৃ. ১৬০৬, হাদীছ ২৩১৩; কাদী 'ইয়াদ, আশ- শিফা, পৃ. ৪৯)।
একবার নবী করীম (স)-এর হাতে সত্তর হাজার দিরহাম আসিয়াছিল। তিনি সেইগুলি লইয়া মসজিদে প্রবেশ করিয়া চাটাইয়ের উপর ঢালিয়া দিয়া বণ্টন করিতে লাগিলেন এবং এইভাবেই উহা সাধারণ গরীব-দুঃখীদের মধ্যে বণ্টন করিয়া দেন। হযরত আনাস (রা) বলেন, নবী করীম (স) নিজ দয়ার্দ্রতার গুণের ফলে এত বেশী দান করিতেন যে, তাঁহার নিকট কোন কিছু পুঞ্জীভূত হইয়া থাকিত না।
একবার তিনি তাঁহার ব্যক্তিগত খাজাঞ্চী হযরত বিলাল (রা)-এর নিকট কিছু খেজুর জমা দেখিতে পাইয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "এইগুলি কি?” হযরত বিলাল (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিছু সঞ্চয় করিতেছি যাহাতে দুঃসময়ে কাজে আসে। তিনি বলিলেন, তোমার কি এই ভয় হয় না যে, উহা জাহান্নামের জ্বালানীও হইতে পারে? হে বিলাল। ইহা খরচ করিতে থাক, অভাবের আশংকা করিও না (ইবনুল-জাওযী, ২খ., পৃ. ৪৪২)। নবী করীম (স) একবার হযরত আব্বাস (রা)-কে এত বেশি পরিমাণ স্বর্ণ দান করিয়াছিলেন যে, তাঁহার পক্ষে উহা বহন করা কঠিন হইয়া পড়িয়াছিল। তাহার মধ্যে দয়ার্দ্রতা এত বেশী পরিমাণ ছিল যে, নিজের কাছে না থাকিলে তিনি ঋণ করিয়া হইলেও প্রার্থীকে দান করিতেন (কাদী 'ইয়াদ, আশ-শিফা, পৃ. ৫০)।
রাসূলুল্লাহ (স) মুসলিম-অমুসলিম, আত্মীয়-অনাত্মীয় সকলের প্রতি এত দয়ালু ছিলেন যে, তিনি তাঁহার ব্যক্তিগত শত্রুর উপরও কোন রকম প্রতিশোধ গ্রহণ করিতেন না (জামি' তিরমিযী, শামাইল)। মক্কা বিজয়ের পর তাঁহার রক্তপিপাসু শত্রুদের মার্জনা করা এবং তাঁহাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আগত ঘাতকদিগকে ক্ষমা করা তাঁহার দয়ার্দ্র হৃদয়েরই উজ্জ্বল নিদর্শন (জামি' তিরমিযী, গাযওয়া নববী)। মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি ইব্‌ন সুলুলের মৃত্যুর পর নবী করীম (س) দয়ার্দ্রতার কারণে তাহাকে শুধু ক্ষমাই করেন নাই, বরং মৃত্যুর পর তাহাকে স্বীয় জামা পরিধান করাইয়া তাহার দাফনকার্য সম্পন্ন করেন এবং তাহার জন্য সত্তর বারের অধিক ইস্তিগফার করিবার প্রতিশ্রুতিও দান করেন (সহীহ বুখারী, ১খ., কিতাবুল জানাইয)। সাহাবীগণ মুনাফিকীর কারণে তাহাকে একাধিকবার হত্যা করার অনুমতি চাহিলেও নবী করীম (স) অনুমতি দেন নাই (মুফতী মুহাম্মদ শফী, মা'আরিফুল কুরআন, সূরা মুনাফিকুন)। একবার এক বেদুঈন মসজিদে নববীতে পেশাব করিতে থাকিলে সাহাবীগণ তাহাকে মারিতে চাহিলেন। ইহাতে নবী করীম (س) তাঁহাদিগকে বাধা প্রদান এবং লোকটিকে তাহার প্রয়োজন শেষ করার অবকাশ প্রদান করেন। ইহার পর তিনি স্থানটি ধৌত করার নির্দেশ দেন এবং লোকটিকে বিনম্র ভাষায় মসজিদের পবিত্রতা সম্পর্কে বুঝাইয়া দেন (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ৭৬; সহীহ মুসলিম, ৪খ., পৃ. ২৩৬; সুনান আবু দাউদ, ৪খ., পৃ. ২৬৩-২৬৫, হাদীছ ৩৮০; জামি' তিরমিযী, ১খ., পৃ. ২৭৬, হাদীছ ১৪৭)। নবী করীম (س) নিজের দয়ার্দ্রতার কারণে তাঁহার খাদেমদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করিয়া দিতেন (সহীহ মুসলিম, ৪খ., ১৮০৫, হাদীছ ২৩১০)।
ইয়াতীম, বিধবা ও মিসকীনদের প্রতি নবী করীম (স) খুবই দয়া প্রদর্শন করিতেন। এই সম্পর্কে তিনি বলেন, ইয়াতীমের তত্ত্বাবধানকারী জান্নাতে আমার পাশাপাশি থাকিবে, যেমন হাতের দুইটি আঙ্গুল। তিনি আরও বলেন, যেই ব্যক্তি কোন বিধবা ও মিসকীনের কল্যাণে সচেষ্ট থাকে সেই ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদরত কিংবা ঐ ব্যক্তির মত যে দিনে রোযা রাখে এবং সারা রাত ইবাদতে কাটায় (জামি' তিরমিযী, ৪খ., পৃ. ৩২১, ৩৩৭, হাদীছ ১৯১৮ ও ১৯৫৪)।
বিধবাদের প্রতি তাঁহার কি পরিমাণ দয়া ও সহানুভূতি ছিল উহা উপলব্ধি করা যায় তাহাদের সার্বিক উন্নয়নে তাঁহার গৃহীত কর্মসূচী হইতে। তৎকালীন আরবের লোক বিধবাদিগকে বিবাহ করা পছন্দ করিত না; বরং তাহাদিগকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বঞ্চিত রাখিত। এই ধরনের সামাজিক অবিচার ও কুপ্রথা নিমূর্ল করার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (স) শুধু অন্যকেই বিধবা বিবাহে উৎসাহ প্রদান করেন নাই বরং তিনি নিজেও হযরত 'আইশা (রা) ব্যতীত বাকী সকল বিবাহ বিধবাগণকেই করিয়াছিলেন এবং এইভাবেই তিনি বিধবাদের নৈতিক ও সামাজিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছিলেন (ইসলামী বিশ্বকোষ সম্পাদনা পরিষদ, হযরত রাসূল করীম, জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ২৭৬)।
আর্তপীড়িতদের সেবা-শুশ্রূষার প্রতি রাসূলুল্লাহ (س) সবিশেষ যত্নবান ছিলেন। পাড়া-প্রতিবেশী বন্ধু-বন্ধব বা প্রিয়জনের অসুস্থতার খবর পাইলে তাহাকে দেখার জন্য তিনি
সেইখানে দ্রুত হাযির হইতেন। এই বিষয়ে তাঁহার নিকট আপন-পরের কোন ভেদাভেদ ছিল না। এমনকি কোন অমুসলিম ব্যক্তি অসুস্থ হইলে তাহাকেও তিনি দেখিতে যাইতেন। তিনি অসুস্থ ব্যক্তিদের মুখমণ্ডল ও বুকে-পিঠে হাত বুলাইয়া দিতেন এবং তাহার আরোগ্য কামনা করিয়া দু'আ করিতেন (সহীহ বুখারী, ৪খ., পৃ. ৪২, ৪৪)।
সমাজের নিম্ন স্তরের লোকদের প্রতি নবী করীম (স) খুবই দয়াপরবশ ছিলেন। এই স্তরের মানুষের মধ্যে দাস-দাসীদের বিষয়টি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। বিশ্ব ইতিহাসে মহানবী (স)-ই সর্বপ্রথম দাস-দাসীদিগকে তাহাদের বৈধ ও মৌলিক অধিকার প্রদানের জন্য নানাবিধ বাস্তব পন্থা অবলম্বন করেন। বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগী, মুক্তিপণ, কাফফারা ইত্যাদির মাধ্যমে দাসমুক্তির ব্যবস্থা করিয়া তাহাদের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করেন। এমনকি জীবনের শেষ ওসিয়াতেও তিনি তাহাদের অধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করিতে ভুলেন নাই। তিনি বলিয়াছেন, "দাস-দাসীরা তোমাদের মত মানুষ এবং তোমাদেরই ভাইবোন যাহাদিগকে আল্লাহ তা'আলা তোমাদের অধীন করিয়াছেন। তোমরা নিজেরা যাহা খাও তাহাদিগকে উহাই খাইতে দিবে, তোমরা নিজেরা যাহা পরিধান কর তাহাদিগকে উহাই পরিধান করিতে দিবে এবং সাধ্যের অধিক তাহাদের উপর কোন কাজ চাপাইয়া দিবে না। আগত্যা যদি দিতেই হয় তবে তোমরা নিজেরাও তাহাদিগকে সেই কাজে সাহায্য-সহায়তা করিবে (সুনান আবু দাউদ, ৫খ., পৃ. ৩৬০, হাদীছ ২১৫৮; সহীহ মুসলিম, ৩খ., ১২৮২, হাদীছ ১৬৬১; জামি' তিরমিযী, ৪খ., পৃ. ৩৪৪, হাদীছ ১৯৪)।
হযরত আনাস (রা) তাঁহার বাল্যকালের ঘটনা বর্ণনা করিয়া বলেন, একদিন নবী করীম (স) আমাকে ডাকিয়া কোন একটি কাজে যাইতে বলিলেন। আমি তখন নেহায়েত বালকসুলভ ব্যবহার দেখাইয়া বলিলাম, না এখন যাইতে পারিব না। এই বলিয়া আমি বাহিরে গিয়া খেলাধুলা করিতে শুরু করিলাম। কিছুক্ষণ পর নবী করীম (স) পিছন দিক হইতে আসিয়া আমার কাঁধে হাত রাখিয়া হাসিমুখে বলিলেন, এখন যাইতে পারিবে তো? এইবার সম্মত হইয়া আমি বিনা দ্বিধায় কাজে চলিয়া গেলাম। হযরত আনাস (রা) আরও বলেন, বাল্যকালে আমি দীর্ঘ দশ বৎসর নবী করীম (স)-এর খেদমত করিয়াছি। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি একদিনও আমাকে কোন রকম তিরস্কার করেন নাই (আবূ দাউদ, সহীহ মুসলিম, কিতাবুল-আদাব)।
উহুদের যুদ্ধে যে ওয়াহ্শী সায়্যিদুশ-শুহাদা হযরত হামযা (রা)-কে শহীদ করিয়াছিল সে মক্কা বিজয়ের পর তায়েফের এক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মদীনায় আসিয়া ইসলাম গ্রহণ করে। নবী করীম (س) তাঁহার প্রিয়তম চাচার হত্যাকারী এই ওয়াহ্শীকেও ইসলাম গ্রহণ করার ফলে দয়ার্দ্র হৃদয়ে আশ্রয় প্রদান করিয়াছিলেন। তবে শুধু তাহাকে এতটুকু বলিয়া দিয়াছিলেন, সচরাচর তুমি আমার সামনে পড়িও না। কেননা তোমাকে দেখিলেই আমার প্রিয়তম চাচার কথা মনে পড়িয়া যায় (সহীহ বুখারী, হযরত হামযা (রা)-এর হত্যা)।
হিন্দ উহুদের যুদ্ধে হযরত হামযা (রা)-এর কলিজা চিবাইতে চিবাইতে নৃত্য করিয়াছিল। সেও মক্কা বিজয়ের পর নেকাব দিয়া মুখ ঢাকিয়া নবী করীম (স)-এর নিকট আসিয়া ইসলাম গ্রহণ করত কৌশলে নিরাপত্তার সনদ গ্রহণ করিয়া নিয়াছিল। নবী করীম (س) তাহাকে চিনিয়া ফেলিলেন। কিন্তু দয়াপরবশ হইয়া তাহাকে কিছু বলিলেন না। ইহাতে সেই পাষাণ হৃদয়ের নারীর মন গলিয়া গেল এবং স্বতস্ফূর্তভাবে বলিয়া উঠিল, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিছুক্ষণ পূর্ব পর্যন্ত আমার চোখে আপনার তাঁবুর চাইতে ঘৃণিত আর কোন তাঁবু ছিল না, কিন্তু এখন আপনার তাঁবুর চাইতে প্রিয়তম কোন তাঁবু আমার চোখে আর একটিও নাই” (সহীহ বুখারী, হিন্দ-এর বিবরণ)। ইসলাম গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত আবূ সুফ্যান নবী করীম (س) ও ইসলামের ঘোর শত্রু ছিলেন। মাক্কী জীবনে নবী করীম (س)-এর সব কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং হিজরতের পর বদরের যুদ্ধ হইতে শুরু করিয়া মক্কা বিজয় পর্যন্ত প্রতিটি যুদ্ধে শত্রু পক্ষের নেতৃত্বদান হইতে নিয়া ইসলাম ও নবী করীম (س)-এর বিরুদ্ধে যতগুলি ষড়যন্ত্র হইয়াছে উহার প্রায় প্রতিটির অগ্রভাগেই ছিলেন আবূ সুফ্যান। মক্কা বিজয়ের দিন তাহাকে গ্রেফতার করিয়া নবী করীম (س)-এর নিকট হাযির করা হইলে হযরত উমার (রা) আবু সুফ্যানকে হত্যা করার অনুমতি চাহিলেন। কিন্তু দয়ার সাগর নবী করীম (س) তাঁহার জীবনের এই প্রধান শত্রুকে হাতে পাওয়ার পর তাহার প্রতিশোধ না লইয়া শুধু তাহাকেই মুক্তিদান করিলেন না বরং ঘোষণা করিয়া দিলেন, "শুধু আবূ সুফ্যানই মুক্ত নয়, যাহারা তাহার গৃহে আশ্রয় গ্রহণ করিবে তাহারাও নিরাপদ” (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মক্কা বিজয় প্রসঙ্গ)।
নবী করীম (স) যখন ইসলামের দা'ওয়াত লইয়া তাইফে গমন করিলেন, তখন তাইফবাসীরা নানা রকম ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিয়া ইসলামের দা'ওয়াত প্রত্যাখ্যান করিল এবং নবী করীম (س)-এর সমস্ত শরীর রক্তাক্ত করিয়া তাঁহাকে শহর হইতে বাহির করিয়া দিল। এমন সময় আযাবের ফেরেস্তারা আসিয়া নবী করীম (স)-কে বলিল, আপনি যদি অনুমতি দেন তবে আমরা পাহাড় উল্টাইয়া দিয়া উহাদিগকে ধ্বংস করিয়া ফেলি। দয়ার নবী উত্তরে বলিলেন, উহা হয় না, উহারা না মানুক, হয়ত তাহাদের ভবিষ্যত বংশধরদের মধ্যে মহান আল্লাহর অনুগত বান্দা হইবে (সহীহ বুখারী, বরাতে আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, বঙ্গনুবাদ, পৃ. ৩৭৫)।
নবী করীম (স)-এর মদীনায় হিজরত করার সময় হুবার ইব্‌ন আসওয়াদ নামক এক দুষ্কৃতকারী তাঁহার সন্তান সম্ভবা কন্যা হযরত যায়নাব (রা)-কে রাস্তায় আটকাইয়া নির্যাতন করার এক পর্যায়ে উটের পিঠ হইতে নিচে ফেলিয়া দেয়। ফলে তাঁহার গর্ভপাত হইয়া যায়। ইহা ছাড়াও তাহার বিরুদ্ধে মুসলমানদের উপর বহু নির্যাতনের অভিযোগ ছিল। মক্কা বিজয়ের পর সে ইরানে পালাইয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু হিদায়াতের আলো তাহাকে আকর্ষণ করিয়া নবী করীম (س)-এর নিকট লইয়া আসে। নবী করীম (س)-এর নিকট আসিয়া সে বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! প্রাণভয়ে আমি দেশত্যাগ করিয়া পালাইয়া যাইতে চাহিয়াছিলাম। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পর আপনার অশেষ দয়ার কথা মনে পড়িয়া যাওয়ায় আমি ইসলাম গ্রহণ
করার জন্য ফিরিয়া আসিয়াছি। আমার সম্পর্কে আপনার নিকট যে সমস্ত অভিযোগ আসিয়াছে উহা সবই সত্য। আমার মূর্খতা ও অপরাধ- আমি অকপটে স্বীকার করিতেছি। অপরাধীর এই অনুশোচনামূলক কথায় রহমতে আলম নবী করীম (س)-এর মনে করুণা ও দয়ার উদ্রেক হইল। তিনি তাহার প্রতি হাত বাড়াইয়া বিনা দ্বিধায় তাহাকে তাঁহার রহমতের ছায়াতলে আশ্রয় প্রদান করেন (ইব্‌ন ইসহাক, হুবারের বর্ণনা, বরাতে আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, বঙ্গানুবাদ, পৃ. ৩৫৯)।
হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর মা মুশরিকা থাকা অবস্থায় নবী করীম (স)-কে খুব মন্দ বলিত। ইহাতে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) মনের কষ্টে একদিন খুব কাঁদিলেন এবং নবী করীম (স)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন, "আমার মা আপনার শানে বেআদবি করেন, আপনি তাহাকে বদ দু'আ করুন।" এই কথা শুনিয়া নবী করীম (স) দয়ার্দ্র কন্ঠে আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করিলেন, "হে আল্লাহ! তুমি আবূ হুরায়রার মা-কে হিদায়াত দান কর।" ইহার পর হযরত আবূ হুরায়রা বাড়ী ফিরিয়া গিয়া দেখিলেন, তাহার মায়ের গৃহের পরজা বন্ধ। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলিলে দেখা গেল তাহার মা গোসল করিয়া পাক-পবিত্র অবস্থায় ইসলামের কালেমা উচ্চারণ করিতেছেন (সহীহ মুসলিম, আবু হুরায়রার ফযীলত)।
কেবল মানবজাতির জন্যই নয়, বরং সমগ্র সৃষ্টির জন্যই রাসূলুল্লাহ (س)-এর হৃদয় দয়া ও রহমতে পরিপূর্ণ ছিল। তিনি জীবজন্তুর প্রতি যত্নবান হওয়ার জন্য সাহাবীগণকে সদাসর্বদা নির্দেশ দিতেন। কোন পশুকে দুরবস্থায় দেখিলে তিনি বলিতেন, "এই বোবা প্রাণীদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, উত্তমরূপে ইহাদের উপর আরোহণ কর এবং ইহাদিগকে প্রয়োজনীয় খাবার দাও” (সুনان আবূ দাউد, ৩খ., পৃ. ৪৯, হাদীছ ২৫৪৮)। নবী করীম (س) কোন পশুর মুখে দাগ লাগানো দেখিলে তিনি খুবই অসন্তুষ্ট হইয়া বলিতেন, "তোমরা কি শোন নাই, আমি নির্বাক প্রাণীর মুখে দাগ এবং উহাদের আকৃতি বিকৃত করিতে নিষেধ করিয়াছি" (মুসলিম, ৩খ., পৃ. ১৬৭৩, হাদীছ ২১১৭)?
প্রত্যুষে মোরগের ডাক শুনিয়া যদি কেহ বিরক্ত হইত তবে নবী করীম (স) বলিতেন, মোরগকে গালি দিও না, কেননা সে সালাতের জন্য মানুষকে ঘুম হইতে জাগ্রত করে। তিনি আরও বলিতেন, যখন তোমরা মোরগের ডাক শুনিবে তখন আল্লাহ তা'আলার নিকট তাঁহার রহমত কামনা করিবে। কেননা সে কোন রহমতের ফেরেশতা দেখিয়াই ডাকে (আবূ দাউদ, ৫খ., ৩৩১, হাদীছ ৫১০১ ও ৫১০২; সহীহ বুখারী, বাউ'ল-খালক, ৪খ., পৃ. ১৫৫; সহীহ মুসলিম, আয-যিকর, ৪খ., পৃ. ২০৯১, হাদীছ ২৭২৯)।
রহমাতুললিল 'আলামীন নবী মুহাম্মাদ (س) একদিকে জীবের প্রতি দয়ার শিক্ষা দিয়াছেন অন্যদিকে জাহিলী যুগের ঐ সমস্ত কুপ্রথারও মূল উৎপাটন করিয়াছেন যাহা জীবজন্তুকে কষ্ট ও যন্ত্রণা দিত। যেমন জীবিত জন্তুর গোশত কাটা, ইহার লেজ ও কেশর কাটা, ইহাদের মধ্যে পরস্পর লড়াই বাঁধানো, ইহাকে তীর নিক্ষেপের লক্ষ্য বানানো ইত্যাদি। এই সকল
কাজকে বর্বর ও নির্দয়ের কাজ বলিয়া অভিহিত করত তিনি ইহা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করিয়াছেন।
তৎকালীন আরবদের মধ্যে পাখীর বাসার ডিম চুরি বা ইহাদের ছোট ছোট ছানা ধরিয়া আনার ব্যাপক প্রচলন ছিল যাহার উপর তিনি কঠিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিয়াছিলেন (সুনান আবূ দাউদ, ৩খ., পৃ. ৪৬৯, হাদীছ ৩০৮৯; বরাত হযরত রাসূলে করীম (স) জীবন ও শিক্ষা)।
গ্রন্থপঞ্জী : (১) আল-কুরআনুল করীম, বঙ্গানুবাদ, ই.ফা.বা. সংস্করণ ১৯৯৭ খৃ., সূরা আম্বিয়া, আয়াত ১০৭; (২) মুফতী মুহাম্মاد শফী, মা'আরিফুল-কুরআন, সূরাতুল মুনাফিকূন; (৩) মুহাম্মاد ইব্‌ন ইসমাঈল আল-বুখারী, আল-জামি'উ'স-সাহীহ, লাইডেন (তা. বি); (৪) মুসলিম আন-নীশাপুরী, আস-সাহীহ, কায়রো ১৩৩০ হি.; (৫) আবূ 'ঈসা আত্-তিরমিযী, আল-জামি'উস-সুনান, বুলাক ১২৯১ হি. এবং ঐ শামাইলুত-তিরমিযী; (৬) আবূ দাউদ, আস-সুনান, দিল্লী ১৩৮৩ হি.; (৭) আন-নাসাঈ, আস-সুনান, লক্ষ্ণৌ ও দিল্লী সংস্করণ; (৮) মুহাম্মاد ইব্‌ন আবদিল্লাহ খাতীব তাবরীযী, মিশকাতুল মাসাবীহ, দামিশক- কায়রো; (৯) ইবনুল আছীর, উসুদুল-গাবা ফী মা'রিফাতিস্-সাহাবা, তেহরান; (১০) মুহাম্মاد ইবন সা'দ আল-কাতিব, কিতাবুত-তাবাকাতিল কাবীর (সং-লাইডেন, বৈরূত ১৩৮০/১৯৬০); (১১) আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল-মাগাযী, সম্পা. Mardson Jones, অক্সফোর্ড ১৯৬৬ খৃ.; (১২) আবুল ফাদল কাদী 'ইয়াদ, আশ-শিফা বি'তা'রিফি হুছকিল-মুস্তাফা (সং. কায়রো, দিমাশক ও বেরলী); (১৩) ইবনুল-জাওযী, আল-ওয়াফা বি-আহ'ওয়ালিল-মুস্তাফা, লাহোর ১৩৯৭ / ১৯৭৭; (১৪) আল্লামা শিবলী নু'মানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নদবী, সীরাতুন্নবী (س), বঙ্গানুবাদ মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, প্রকাশকাল ১৯৭৫ খৃ.; (১৫) ইসলামী বিশ্বকোষ সম্পাদনা পরিষদ, ই.ফা.বা., হযরত রাসূলে করীম (س) : জীবন ও শিক্ষা।
মুহাম্মদ মুফাজ্জল হুসাইন খান

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর দানশীলতা

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর দানশীলতা


দানশীলতা কুরআন কারীম নির্দেশিত একটি মহৎ গুণ। আল্লাহ্র রাস্তায় দান করিবার জন্য উহাতে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করা হইয়াছে। যথা ইরশাদ হইয়াছে: وَأَنْفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ
"তোমরা আল্লাহ্র পথে ব্যয় কর এবং নিজেদের হাতে নিজদিগকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করিও না” (২: ১৯৫)। يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنْفِقُوا مِمَّا رَزَقْنَكُمْ مِّنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَ يَوْمٌ لأَبَيْعٌ فِيْهِ وَلَا خُلَةٌ ولا شَفَاعَةُ.
"হে মু'মিনগণ! আমি যাহা তোমাদিগকে দিয়াছি তাহা হইতে তোমরা ব্যয় কর সেই দিন আসিবার পূর্বে যেই দিন ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধুত্ব ও সুপারিশ থাকিবে না" (২: ২৫৪)।
মানুষের উপার্জিত উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করিতে উৎসাহিত করত নিকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করিতে নিষেধ করা হইয়াছে। যথা ইরশাদ হইয়াছে: يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنْفِقُوا مِنْ طَيِّبَتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِّنَ الْأَرْضِ وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ مِنْهُ تُنْفِقُونَ
"হে মুমিনগণ! তোমরা যাহা উপার্জন কর এবং আমি যাহা ভূমি হইতে তোমাদের জন্য উৎপাদন করিয়া দেই তন্মধ্যে যাহা উৎকৃষ্ট তাহা ব্যয় কর এবং উহার নিকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করার সংকল্প করিও না” (২: ২৬৭)।
গোপনে বা প্রকাশ্যে আল্লাহর রাস্তায় ব্যয়কারীদের জন্য শুভ পরিণামের সুসংবাদ দেওয়া হইয়াছে। যথা: وَالَّذِينَ صَبَرُوا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلوةَ وَأَنْفَقُوا مِمَّا رَزَقْتُهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً وَيَدْرَءُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ أُولَئِكَ لَهُمْ عُقْبَى الدَّارِ .
"যাহারা তাহাদের প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভের জন্য ধৈর্য ধারণ করে, সালাত কায়েম করে, আমি তাহাদিগকে যে জীবনোপকরণ দিয়াছি তাহা হইতে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং যাহারা ভাল দ্বারা মন্দ দূরীভূত করে তাহাদের জন্য শুভ পরিণাম" (১৩: ২২)।
আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করাকে লাভজনক ব্যবসায়ের সহিত তুলনা করা হইয়াছে যাহাতে ক্ষতির কোন আশঙ্কা নাই। যথা ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّ الَّذِينَ يَتْلُونَ كِتَبَ اللهِ وَأَقَامُوا الصَّلوةَ وَانْفَقُوا مِمَّا رَزَقْتُهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً يُرْجُونَ تِجَارَةً لَنْ تَبُورَ.
"যাহারা আল্লাহ্ কিতاب পাঠ করে, সালাত কায়েম করে, আমি তাহাদিগকে যে রিযিক দিয়াছি তাহা হইতে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তাহারাই আশা করিতে পারে—তাহাদের এমন ব্যবসায়ের যাহার ক্ষয় নাই" (৩৫: ২৯)।
মৃত্যু আসিবার পূর্বেই আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করিবার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। নতুবা মৃত্যুক্ষণে আল্লাহ্র রাস্তায় দান না করার কারণে আফছোছ করিতে হইবে-মহান আল্লাহ এই কথা অবহিত করিয়া ইরশাদ করেন :
وَأَنْفِقُوا مِنْ مَّا رَزَقْنَكُمْ مِّنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ فَيَقُولُ رَبِّ لَوْلَا أَخَّرْتَنِي إِلَى اجل قَرِيبٍ فَاصْدِّقَ وَاكُنْ مِّنَ الصَّلِحِينَ.
"আমি তোমাদিগকে যে রিযিক দিয়াছি তোমরা তাহা হইতে ব্যয় করিবে তোমাদের কাহারও মৃত্যু আসিবার পূর্বে, অন্যথায় মৃত্যু আসিলে সে বলিবে, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আরও কিছু কালের জন্য অবকাশ দিলে আমি সাদাকা দিতাম এবং সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত হইতাম" (৬৩:১০)।
রাসূলে কারীম (স)-এর সমগ্র জীবন ছিল আল-কুরআনুল কারীমেরই বাস্তব প্রতিচ্ছবি। 'আইশা (রা)-এর নিকট কতিপয় ব্যক্তি আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর চরিত্র কেমন ছিল? তিনি বলিলেন, তোমরা কি কুরআন পাঠ কর নাই? তাঁহার চরিত্র ছিল আল-কুরআন (সুবুলুল-হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৭খ., পৃ. ৬)।
তাই কুরআন কারীমে উল্লিখিত দানশীলতার গুণটি তিনি পরিপূর্ণভাবে আয়ত্ত করিয়াছিলেন। তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। দানের ক্ষেত্রে তাঁহার কোনও তুলনা চলে না। কেহই তাঁহার সমকক্ষ ছিল না। তাই সাহাবায়ে কিরাম তাঁহার দানকে বসন্তের মৃদু সমীরণের সহিত তুলনা করত তাহা হইতেও অধিক বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। যথাঃ
عن ابن عباس قال كان رسول الله ﷺ اجود الناسن وكان أجود ما يكون في رمضان حين يلقاه جبريل وكان يلقاه في كل ليلة من رمضان فيدارسه القرآن فلرسول الله ﷺ اجود بالخير من الريح المرسلة.
"ইব্‌ন 'আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। রমযানে তিনি আরও বেশী দানশীল হইতেন যখন জিবরাঈল (আ) তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতেন। আর রমযানের প্রতি রাত্রেই জibরাঈল (আ) তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতেন এবং তাঁহারা পরস্পর কুরআন তিলাওয়াত করিয়া শুনাইতেন। নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ্ (স) প্রবহমান
বাতাস হইতেও অধিক দানশীল ছিলেন” (বুখারী, কিতাবু বাদইল ওয়াহ'য়ি, হাদীছ সং ৬, কিতাবুস সাওম, হাদীছ নং ১৯০২; মুসলিম, ফাদাইল, হাদীছ নং ৫৬০৪; শামাইল তিরমিযী, হাদীছ নং ৪২৯৪)।
রাসূলে কারীম (স) এতই দানশীল ছিলেন যে, জীবনে কখনো কোন প্রার্থীকে তিনি 'না' বলিয়া ফেরত দেন নাই। জাবির (রা) হইতে এই বিষয়ে হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে:
عن ابن المنكدر قال سمعت جابرا يقول ما سئل النبي ﷺ عن شيئ قط فقال لا .
"ইবনুল মুনকাদির (র) বলেন, আমি জাবির (রা)-কে বলিতে শুনিয়াছি, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট কিছু চাওয়া হইলে কখনও তিনি 'না' বলেন নাই” (বুখারী, কিতাবুল আদাব, বাবু হুসনিল খুলুক ওয়াস-সাখা, হাদীছ নং ৬০৩৪; মুসলিম, কিতাবুল ফাদাইল, হাদীছ নং ৫৮১১; আত-তিরমিযী, আশ-শামাইল, হাদীছ নং ৪২৯৩)।
হযরত আনাস (রা) ও সাহল ইবন সা'দ আস্-সা'ইদী (রা) হইতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে (কাযী 'ইয়াদ, আশ-শিফা বি-তারীফি হুকুকিল মুসতাফা, ১খ., পৃ. ১১১)।
সাধ্য থাকিলে রাসূলুল্লাহ্ (স) এত বেশী দান করিতেন যাহা সাধারণ মানুষ কল্পনাও করিতে পারে না। ইসলামের দ্রুত প্রসারে তাঁহার এই দানশীলতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিয়াছিল। বিশেষত কেহ ইসলাম গ্রহণের পর কিছু চাহিলে তিনি অবশ্যই তাহাকে তাহা দান করিতেন। ইহার একটি নযীর পেশ করিয়া আনাস (রা) বলেন:..
ما سئل رسول الله ﷺ على الاسلام شيئا إلا أعطاه قال فجاءه رجل فأعطاه غنما بين جبلين فرجع إلى قومه فقال ياقوم أسلموا فان محمدا يعطى عطاء لا يخشى الفاقة. "রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করার পর কেহ কিছু চাহিলে তিনি অবশ্যই তাহাকে উহা দান করিতেন। আনাস (রা) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট আগমন করিল। তিনি তাঁহাকে এত বেশী ছাগল দান করিলেন যাহাতে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ হইয়া যাইবে। অতঃপর সেই ব্যক্তি তাহার সম্প্রদায়ের নিকট গিয়া তাহাদিগকে বলিল, হে আমার কওম! তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। কেননা মুহাম্মাদ (স) এত বেশী দান করেন যাহার পর আর অভাবের ভয় থাকে না” (মুসলিম, কিতাবুল ফাদাইল, হাদীছ নং ৫৮১৩, ৫৮১৪)।
• এক বর্ণনামতে হাদীছে বর্ণিত ব্যক্তিটির নাম ছিল সাফওয়ান ইবন উমায়্যা। অন্য এক বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ্ (স) অন্য একজনকে এক শতটি উট দান করেন এবং সাফওয়ানকে দান করেন তিন শত উট (কাযী 'ইয়াদ, আশ-শিফা বি-তা'রীফি হুকূকিল মুসতাফা, ১খ., পৃ. ১১২)
নন্‌ওয়াত প্রাপ্তির পূর্বেও রাসূলে কারীম (স) সম্প্রসারিত হস্তে দান করিতেন। মধূওয়াত প্রাপ্তির পনের বৎসর পূর্বে মক্কার ধনাঢ্য বণিক ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী খাদীজা (রা)-এর সহিত
তাঁহার বিবাহ হয়। বিবাহের পর খাদীজা (রা) তাঁহার অঢেল সম্পদ রাসূলুল্লাহ (স)-এর পদতলে সমর্পণ করেন আর তিনি অকাতরে গরীব-দুঃখীদের মধ্যে দুই হাতে তাহা বিলাইয়া দেন। তাই প্রথম ওহী লাভের পর যখন তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া গৃহে ফিরেন তখন খাদীজা (রা) তাঁহার কিছু সদগুণের উল্লেখপূর্বক তাঁহাকে সান্ত্বনা দান করেন। সেইসব গুণের মধ্যে দানশীলতা ছিল অন্যতম। তিনি বলেন:
كلا والله ما يخزيك الله أبدا إنك لتصل الرحم وتحمل الكل وتكسب المعدوم وتقرى الضيف وتعين على نوائب الحق
"আল্লাহর কসম। কখনও নহে। মহান আল্লাহ্ আপনাকে কখনও অপমানিত করিবেন না। আপনি তো আত্মীয় স্বজনের সহিত সদ্ব্যবহার করেন, অসহায়-দুর্বলের দায়িত্ব বহন করেন, নিঃস্বকে সাহায্য করেন, মেহমানের মেহমানদারী করেন এবং দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন" (বুখারী, কিতাবু বাদইল ওয়াহয়ি, হাদীছ নং ৪)। উল্লেখ্য যে, এইখানে উল্লিখিত পাঁচটি গুণের মধ্যে চারটিই দানশীলতার সহিত সম্পর্কিত।
হুনায়নের যুদ্ধে হাওয়াযিন গোত্র মুসলিম বাহিনীর নিকট শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে। ফলে মুসলমানগণ গনীমত হিসাবে তাহাদের নিকট হইতে অঢেল সম্পদ লাভ করেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় বদান্যতায় তাহাদের ছয় হাজার যুদ্ধবন্দী, চব্বিশ হাজার উট, চল্লিশ হাজারেরও অধিক বকরী ও চার হাজার উকিয়া রৌপ্য তাহাদিগকে ফেরৎ দেন যাহা না দিলে তাহাদের কিছুই করার ছিল না (আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ১১২-১১৩)। অপর এক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হুনায়ন যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (স) সাফওয়ান ইবন উমায়্যাকে গনীমতের সম্পদ হইতে এক শত এক শত করিয়া তিনবার তিন শত উট দান করেন (মুসলিম, কিতাবুল ফাদাইল, হাদীছ নং ৫৮১৫)।
"আব্বাস (রা)-কে একবার তিনি এত পরিমাণ স্বর্ণ দান করেন যাহা বহন করিয়া লইয়া যাওয়ার ক্ষমতা তাঁহার ছিল না। আনাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, বাহরায়ন হইতে একবার প্রচুর সম্পদ আসিল। তিনি নির্দেশ দিলেন, মসজিদের আঙ্গিনায় উহা ঢালিয়া দাও। অতঃপর তিনি মসজিদে চলিয়া গেলেন। কিন্তু উহার প্রতি ভ্রূক্ষেপও করিলেন না। সালাত শেষে তিনি উক্ত সম্পদের নিকট গিয়া বসিলেন। তিনি যাহাকেই পাইতেছিলেন তাহাকেই উহা হইতে দান করিতেছিলেন। এমনিভাবে এক সময় 'আব্বাস (রা) আসিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। আমাকে কিছু দিন। কারণ আমি আমার নিজের পক্ষ হইতে এবং আকীলের পক্ষ হইতে মুক্তিপণ দিয়াছি। তিনি বলিলেন, গ্রহণ করুন। অতঃপর আব্বাস (রা) কাপড় ভর্তি করিয়া লইলেন। তিনি উহা বহন করিতে চেষ্টা করিলেন কিন্তু পারিলেন না। তখন বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! কাহাকেও আমার কাঁধে উঠাইয়া দিতে নির্দেশ দিন। তিনি বলিলেন, না। 'আব্বাস (রা) বলিলেন, তবে আপনি নিজে উঠাইয়া দিন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি পারিব না। অতঃপর 'আব্বাস (রা) উহা হইতে কিছু কমাইয়া পুনরায় উঠাইতে চেষ্টা করিলেন কিন্তু ইহার পরও উঠাইতে পারিলেন না। তখন বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। কাহাকেও আমার কাঁধে উঠাইয়া দিতে নির্দেশ দিন। তিনি বলিলেন, না। অতঃপর তিনি উহা হইতে কিছু হ্রাস করিয়া কাঁধে
তুলিয়া লইলেন এবং উহা লইয়া চলিয়া গেলেন। তাঁহার অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (স) আনন্দভরে তাঁহার গমন পথের দিকে তাঁকাইয়া রহিলেন। এক দিরহাম বাকী থাকিতেও রাসূলুল্লাহ (স) সেখান হইতে উঠিলেন না (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৭খ., পৃ. ৫১)।
সম্পদ থাকিতে তিনি কাহাকেও উহা হইতে বঞ্চিত করিতেন না। উহা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি মানুষের মধ্যে উহা বিতরণ করিতে থাকিতেন। ইহার প্রমাণ উপরিউক্ত বর্ণনা ছাড়াও আরো বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়। যেমন, একবার তাঁহার নিকট নব্বই হাজার দিরহাম আসিল। উহা একটি চাটাইয়ের উপর রাখা হইল এবং রাসুলুল্লাহ (স) উহার সম্মুখে গমন করিয়া দাঁড়াইলেন। অতঃপর তিনি উহা বণ্টন করিতে শুরু করিলেন। উহা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন প্রার্থীকে তিনি ফেরত দেন নাই (কাদী 'ইয়াদ, আশ-শিফা বি-তারীফি হুকুকিল মুসতাফা, ১খ., পৃ. ১১৩; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৭খ., পৃ. ৫১)।
নিজের নিকট না থাকিলেও তিনি কোনও প্রার্থীকে বিমুখ করিতেন না। একবার তাঁহার নিকট এক লোক আসিয়া কিছু চাহিল। তিনি বলিলেন, আমার নিকট তো কিছুই নাই। তবে তুমি আমার নামে ধারে কিছু ক্রয় করিয়া লইয়া যাও। অতঃপর আমার নিকট কোন সম্পদ আসিলে আমি উহা পরিশোধ করিয়া দিব। তখন 'উমার (রা) তাঁহাকে বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি যাহার সামর্থ্য রাখেন না তাহা দান করিতে তো আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে বাধ্য করেন নাই। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার এই কথা পছন্দ করিলেন না। তখন আনসারদের এক লোক বলিলেন, يَا رَسُولَ اللهِ وَلَا تَخَفْ مِنْ ذِي الْعَرْشِ اِقْلَالًا "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি খরচ করিতে থাকুন এবং আরশের মালিক সম্পর্কে কম প্রদানের ভয় করিবেন না"।
ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) মুক্তি হাসিলেন। আনসারীর কথায় তাঁহার চেহারায় সন্তুষ্টির চিহ্ন ফুটিয়া উঠিল। অতঃপর তিনি বলিলেন, بهذا امرت "আমাকে তো এইরূপই নির্দেশ হইয়াছে” (তিরমিযী, আশ-শামাইল, হাদীছ নং ৪২৯৬)।
রাসূলুল্লাহ (স) কখনও আগামী কল্যের জন্য কিছু সঞ্চয় করিয়া রাখিতেন না। তাঁহার নিকট যাহা থাকিত; আগামী কল্য আসিবার পূর্বেই তাহা বিলাইয়া দিতেন। তাঁহার খাদেম আনাস (রা) যিনি দীর্ঘ দশ বৎসর যাবত তাঁহার খিদমত করিয়াছেন, তিনি বলেন:
كان النبي ﷺ لا يدخر شيئا لغد "রাসূলুল্লাহ (স)-এর অভ্যাস ছিল যে, তিনি আগামী কল্যের জন্য কিছু সঞ্চয় করিয়া রাখিতেন না” (তিরমিযী, আশ-শামাইল, হাদীছ নং ৪২৯৫)।
কেহ আগ্রহভরে রাসূলুল্লাহ (س)-কে কোন উপঢৌকন দিলে তিনি তাহা গ্রহণ করিতেন। তবে তাহার অনেক বেশী প্রতিদান তিনি উপঢৌকনদাতাকে দিতেন।
عن عائشة إن النبي كان يقبل الهدية ويثيب عليها . "আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) উপঢৌকন গ্রহণ করিতেন এবং উহার প্রতিদান দিতেন” (তিরমিযী, আশ-শامائل, হাদীছ নং ৪২৯৮)।
বিভিন্ন হাদীছে উপঢৌকন গ্রহণ করত উহার বেশী প্রতিদান প্রদানের কথা বর্ণিত হইয়াছে। যেমন:
عن الربيع بنت معوذ بن عفراء قالت اتيت النبى الله بقناع من رطب واجر رغب فاعطا نی ملأ كفه حليا وذهبا .
"রুবায়্যি বিনত মু'আওবিয ইবন 'আফরা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক পাত্র খেজুর এবং কিছু হালকা-পাতলা শসা লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইলাম। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে এক মুষ্টি অলংকার ও স্বর্ণ দান করিলেন" (তিরমিযী, আশ-শামائل, হাদীছ নং ৪২৯৭)।
দান করিবার জন্য কখনও কখনও তিনি কৌশল গ্রহণ করিতেন। এমনও ঘটনা তাঁহার জীবনে সংঘটিত হইয়াছে যে, তিনি কাহাকেও কিছু দান করিবার ইচ্ছা করিয়াছেন কিন্তু সরাসরি দান করিলে তাহার ব্যক্তিত্বে আঘাত লাগিতে পারে অথবা সে লজ্জিত হইতে পারে বা বিষয়টি দৃষ্টিকটু হইতে পারে, তাই তিনি এই কৌশল অবলম্বন করিয়াছেন যে, কোনও জিনিস তাহার নিকট হইতে ক্রয় করিয়া উহার মূল্য পরিশোধ করিয়াছেন ঠিকই; কিন্তু সেই ক্রয়কৃত বস্তুটিই তিনি তাহাকে উপঢৌকন দিয়াছেন। যেমন জাবির (রা) হইতে বর্ণিত যে, তিনি একদা তাঁহার উটের উপর আরোহণ করিয়া সফর করিতেছিলেন। উটটি চলিতে অক্ষম হইয়া পড়িয়াছিল। রাসূলে কারীম (স) সেই পথ দিয়া যাইতেছিলেন। তিনি উটটিকে মৃদু আঘাত করিলেন এবং উহার জন্য দু'আ করিলেন। তখন উটটি এমন দ্রুতবেগে চলিতে লাগিল যে, ইতোপূর্বে উহা ঐরূপ কখনও চলে নাই। অতঃপর তিনি বলিলেন, উহাকে আমার নিকট এক উকিয়া মূল্যে বিক্রয় কর। আমি বলিলাম, না। তিনি আবারও বলিলেন, উহা আমার নিকট এক উকিয়া মূল্যে বিক্রয় কর। অতঃপর আমি তাঁহার নিকট উহা বিক্রয় করিলাম, তবে উহাতে আরোহণ করিয়া আমার পরিবারের নিকট যাওয়ার শর্ত করিলাম। অতঃপর আমরা মদীনায় আগমন করিলে আমি উটটি লইয়া তাঁহার নিকট গেলাম। তিনি আমাকে উহার নগদ মূল্য প্রদান করিলেন। আমি ফিরিয়া আসিলাম। অতঃপর সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমার নিকট বলিয়া পাঠাইলেন, আমি তোমার উট গ্রহণ করিব না। তোমার ঐ উট তুমিই গ্রহণ কর। উহা তোমার সম্পদ (বুখারী, কিতাবুশ শুরূত, হাদীছ নং ২৭১৮)।
অপর এক বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ (স) জাবির (রা)-কে কোনও এক সফরে বলিলেন, আমার নিকট তোমার উটটি বিক্রয় কর। জাবির (রা) বলিলেন, উহা আপনারই ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার মাতা-পিতা আপনার জন্য কুরবান হউক! তিনি বলিলেন, উহা আমার নিকট বিক্রয় কর। অতঃপর জাবির (রা) উহা তাঁহার নিকট বিক্রয় করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) বিলাল (রা)-কে নির্দেশ দিলেন উহার নগদ মূল্য পরিশোধ করিয়া দিতে। বিলাল (রা) উহার নগদ মূল্য পরিশোধ করিয়া দিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি মূল্য ও উট (উভয়টিই) লইয়া যাও। আল্লাহ্ তোমাকে উভয়টিতে বরকত দান করুন। রাসূলুল্লাহ (স) ইহা তাঁহার এই কথার প্রতিদান দেওয়ার জন্য করিয়াছিলেন যে, তিনি বলিয়াছিলেন, "উহা আপনার জন্যই"।
অতঃপর তিনি তাহাকে উটের মূল্য প্রদান করেন, উটটিও তাহাকে ফেরৎ দেন এবং অতিরিক্ত আরো বরকতের দু'আ করেন (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৭খ., পৃ. ৫১)।
একবার তিনি 'উমার (রা)-এর নিকট হইতে উট ক্রয় করত তখনই উহা 'উমার (রা)-এর পুত্র 'আবদুল্লাহকে উপঢৌকন দেন (বুখারী, ২খ., পৃ. ২৮২; শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নাবী, ২খ., পৃ. ১৮৮)।
বস্তুত রাসূলে কারীম (স) ছিলেন সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক দানশীল। এই কথাও তিনি উম্মতকে অবহিত করিয়া গিয়াছেন। আনাস (রা) হইতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি কি তোমাদিগকে সর্বাধিক দাতা কে তাহা বলিব? আল্লাহই সর্বাধিক দাতা আর আমি-আদম সন্তানের মধ্যে সর্বাধিক দাতা। আমার পর সর্বাধিক দাতা সেই ব্যক্তি যে 'ইল্ম শিক্ষা করে এবং স্বীয় ইলমের প্রচার-প্রসার করে। কিয়ামতের দিন সে একাই একটি উম্মত হিসাবে উঠিবে। আর সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদ করিয়া শহীদ হইয়াছে (মাজমা'উষ- যাওয়াইদ, ১খ., পৃ. ১৬৬)। আনাস (রা) হইতে আরও একটি রিওয়ায়াত বর্ণিত হইয়াছে:
كان رسول الله ﷺ اجود الناس "রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক দাতা” (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৭খ., পৃ. ৫৩)।
নির্জের যতই পছন্দনীয় জিনিস হউক না কেন কেহ তাহা চাহিলে সঙ্গে সঙ্গে তাহা তাহাকে দান করিতেন। সাহল ইবন সা'দ আস্-সা'ইদী (রা) বলেন, একদা জনৈক মহিলা একটি চাদর লইয়া আসিল যাহার প্রান্তভাগ ছিল হস্ত দ্বারা বয়ন করা। মহিলাটি বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি ইহা আপনাকে পরিধান করিবার জন্য দিতেছি। রাসূলুল্লাহ (স) আগ্রহভরে উহা গ্রহণ করিলেন এবং উহা পরিধান করিলেন। এক সাহাবী তাঁহাকে ইহা পরিহিত দেখিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। ইহা কত সুন্দর! আমাকে ইহা পরিধান করিতে দিন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হাঁ, ইহা তোমাকে দিব। রাসূলুল্লাহ (س) যখন উঠিয়া গেলেন তখন সাহাবীগণ তাহাকে ভর্ৎসনা করিয়া বলিলেন, কাজটি তুমি ভাল কর নাই। যখন তুমি দেখিলে যে, তিনি আগ্রহভরে উহা গ্রহণ করিয়াছেন, তাহার পরও তুমি তাহা চাহিলে। অথচ তুমি তো জান, তাঁহার নিকট কোন জিনিস চাহিলে তিনি প্রার্থীকে ফিরাইয়া দেন না। সাহাবী বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (س) যেহেতু উহা পরিধান করিয়াছেন তাই আমি উহার বরকত গ্রহণ করিতে চাহিয়াছি যাহাতে উক্ত কাপড়ে আমার কাফন দেওয়া হয় (বুখারী, কিতাবুল আদাব, হাদীছ নং ৬০৩৬)।
অপর এক বর্ণনায় উল্লিখিত হইয়াছে যে, তিনি বলিলেন, আমি উহা পরিধান করিবার জন্য চাহি নাই। এইজন্য চাহিয়াছি যাহাতে উহা আমার কাফন হয়। সা'দ (রা) বলেন, অতঃপর উহাই তাহার কাফন হইয়াছিল (বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুল জানাইয, হাদীছ নং ১২৭৭)।
পানাহারের সামান্যতম জিনিসও তিনি একাকী খাইতেন না; বরং সঙ্গের সকল সাহাবীকে উহাতে শরীক করিতেন। এক যুদ্ধে ১৩০জন সাহাবী তাঁহার সঙ্গী ছিলেন। তিনি একটি বকরী ক্রয় করিয়া যবেহ করিলেন এবং উহার কলিজা ভূনা করিবার নির্দেশ দিলেন। খাবার প্রস্তুত
হইবার পর সাহাবীগণকে উহাতে শরীক করিলেন। যাহারা খাওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন না তাহাদের অংশ পৃথক করিয়া রাখিয়া দিলেন (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নাবী, ২খ., পৃ. ১৮৮)।
তাঁহার অভ্যাস ছিল, গৃহে অর্থকড়ি ও সম্পদ যাহাই থাকিত তাহা আল্লাহ্র রাস্তায় দান না করা পর্যন্ত তিনি-গৃহে আরাম করিতেন না। ফাদাকের নেতা একবার চারটি উট বোঝাই করিয়া খাদ্যশস্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রেরণ করিল। বিলাল (রা) উহার কিছু অংশ বাজারে বিক্রয় করিয়া এক ইয়াহুদীর ঋণ পরিশোধ করিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া তাহা বিবৃত করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, উহা সব বিক্রয় করিয়া ফেল নাই? বিলাল (রা) বলিলেন, না। উহা হইতে কিছু বিক্রয় করিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যতক্ষণ না সম্পূর্ণ বিক্রিত হইবে ততক্ষণ আমি এখান হইতে যাইতে পারি না। বিলাল (রা) বলিলেন, আমি কি করিব, কোনও প্রার্থীও তো আসিতেছে না। রাসূলুল্লাহ (স) সেই রাত্রি মসজিদে অতিবাহিত করিলেন। পরদিন বিলাল (রা) আসিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আল্লাহ আপনাকে মুক্ত করিয়াছেন অর্থাৎ যাহা ছিল সবই বণ্টন হইয়া গিয়াছে। তখন রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহর শোকর আদায় করিলেন এবং গৃহে গমন করিলেন (আবূ দাউদ, আস-সুনান, বাবু হাদায়াল-মুশরিকীন)।
একবার 'আসরের সালাতশেষে তিনি দ্রুত গৃহে গমন করিলেন এবং একটু পরই ফিরিয়া আসিলেন। লোকজন বিস্মিত হইয়া গেল। তিনি বলিলেন, সালাতে আমার খেয়াল হইল যে, কিছু স্বর্ণ আমার গৃহে রহিয়া গিয়াছে। উহা গৃহে থাকিতেই যেন রাত্রি আসিয়া না যায় এইজন্য গৃহে গিয়া উহা দান করার কথা বলিয়া আসিলাম (বুখারী, কিতাবুস সালাত, বাব তাফাক-কুরু রাজুলিশ-শায়আ ফিস-সালাত, হাদীছ নং ১২২১)।
দানশীলতার বিপরীত গুণ হইল কৃপণতা। কৃপণতা ছিল তাঁহার স্বভাব বিরোধী। কখনও তিনি কৃপণতা করিতেন না। এমনকি যে দান পাওয়ার উপযুক্ত নহে, সে আসিয়া কিছু চাহিলেও তিনি তাহাকে দান করিতেন। 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) হইতে বর্ণিত : তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) একবার কতিপয় লোককে কিছু সম্পদ বণ্টন করিয়া দিলেন। আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। ইহাদের তুলনায় অন্যরা এই দান পাওয়ার বেশী হকদার ছিল। তিনি বলিলেন, ইহারা আমাকে দুইটি বিষয়ের এখতিয়ার দিয়াছে: হয় তাহারা নির্লজ্জভাবে চাহিবে অথবা আমাকে কৃপণ বানাইবে। আমি তো কৃপণ নহি (মুসলিম, আস-সাহীহ, কিতাবুষ-যাকাত, হাদীছ নং ২২৯৫)।
জুবায়র ইবন মুতইম (রা) বলেন, একদা তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সফরসঙ্গী ছিলেন। হুনায়নের যুদ্ধ হইতে (যে গনীমত সম্পদ লাভ করিয়াছিলেন তাহা সবই দান করিয়া তিনি) ফিরিয়া আসিতেছিলেন। পথিমধ্যে বেদুঈনগণ খবর পাইল যে, এই পথ দিয়া রাসূলুল্লাহ (স) গমন করিতেছেন। অতঃপর পার্শ্ববর্তী এলাকা হইতে লোকজন দৌড়াইয়া আসিয়া নিবেদন করিল, আমাদিগকেও কিছু দান করুন। লোকের ভীড় লক্ষ্য করিয়া তিনি একটি বৃক্ষের আড়ালে দাঁড়াইলেন। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাদর ধরিয়া টান দিল, ফলে উহা তাঁহার শরীর হইতে খুলিয়া গিয়া তাহাদের হাতেই রহিয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, আমার চাদর ফিরাইয়া
দাও। আল্লাহ্র কসম! বনের বৃক্ষের সমপরিমাণ উটও যদি আমার হাতে আসিত তবে অবশ্যই আমি তাহা তোমাদিগকে দান করিতাম। তবুও তোমরা আমাকে কৃপণরূপে বা মিথ্যাবাদীরূপে অথবা ভীরুরূপে পাইতে না (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, বাবুশ শুজা'আতি ফিল-হারবি ওয়াল-জুবুন, হাদীছ নং ২৮২১)।
একবার তিনি সাহাবীদের সহিত বসাছিলেন। এক বেদুঈন আসিয়া তাঁহার চাদর ধরিয়া সজোরে টান দিয়া বলিল, হে মুহাম্মাদ! আমাকে কিছু দান কর। এই সম্পদ তো তোমারও নহে, তোমার পিতারও নহে। আমাকে এই উটদ্বয় বোঝাই করিয়া দাও। রাসূলুল্লাহ (স) একজনকে ডাকিয়া বলিলেন, তাহার উট দুইটি খেজুর ও যব দ্বারা বোঝাই করিয়া দাও (আবু দাউদ, কিতাবুল আদাব, ২খ., পৃ. ৬৫৮-৫৯)।
ইবন 'আদিয়্যি 'আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন 'উমার (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমার নিকট যদি তিহামার পর্বতরাজির সমপরিমাণ স্বর্ণও থাকিত তবে অবশ্যই আমি তাহা তোমাদের মধ্যে বণ্টন করিয়া দিতাম। অতঃপর তোমরা আমাকে মিথ্যাবাদী বা কৃপণরূপে পাইতে না (সুবুলুল-হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৭খ., পৃ. ৫৩)।
ঋণ পরিশোধের পরিমাণ অর্থ ছাড়া আর কোনও টাকা-পয়সা তাঁহার গৃহে থাকুক ইহা তিনি পছন্দ করিতেন না। দুই হাতে তিনি উহা দান করিতে ভালবাসিতেন। আবূ যার (রা) বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (س)-এর সঙ্গে মদীনার কঙ্করময় প্রান্তরে হাঁটিতেছিলাম। ইতোমধ্যে উহুদ পাহাড় আমাদের সম্মুখে পড়িল। তিনি বলিলেন, হে আবু যার! আমি বলিলাম, লাব্বায়ক ইয়া রাসূলাল্লাহ্। তিনি বলিলেন:
ما يسرني ان عندى مثل أحد هذا ذهبا تمضى على ثالثة وعندى منه دينار إلا شيئا ارصده لدين الا ان اقول به في عباد الله هكذا وهكذا وهكذا عن يمينه وعن شماله ومن خلفه
"আমার নিকট এই উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ হউক আর ঋণ পরিশোধের উদ্দেশ্য ব্যতীত তাহা হইতে একটি দীনারও আমার নিকট জমা থাকুক এবং এই অবস্থায় তিন দিন অতিবাহিত হউক তাহা আমাকে আনন্দিত করিবে না; বরং আমি উহা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এইভাবে ডান দিকে, বাম দিকে ও পিছন দিকে বিতরণ করিয়া দিব” (বুখারী, কিতাবুর রিকাক, হাদীছ নং ৬৪৪৪)।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতেও অনুরূপ একটি হাদীছ বর্ণিত আছে:
قال رسول الله ﷺ لوكان لى مثل أحد ذهبا ما يسرني ان لا تمر على ثلث ليال وعندى منه شيئ الا شيئا ارصده لدين "রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমার নিকট উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকিলেও তাহা তিন রাত্রি অতিবাহিত হইবে আর আমার নিকট উহার কিছু অংশও অবশিষ্ট থাকিবে তাহা
আমাকে আনন্দিত করিবে না। তবে ঋণ পরিশোধের জন্য রাখা ভিন্ন কথা" (প্রাগুক্ত, হাদীছ নং ৬৪৪৫)।
তিনি এতই দানশীল ছিলেন যে, কেহ ঋণগ্রস্ত অবস্থায় ইনতিকাল করিলে তাহার ঋণ পরিশোধের যিম্মাদারি তিনি লইতেন আর ত্যাজ্য সম্পত্তি তাহার ওয়ারিছদিগকে প্রদান করিতেন। তিনি ঘোষণা করিয়াছিলেন: انا اولى بالمؤمنين من انفسهم فمن توفى من المؤمنين فترك دينا فعلى قضاؤه ومن ترك مالا فلورثته
"আমি মু'মিনদের তাহাদের নিজ হইতেও শুভাকাঙ্ক্ষী। তাই মু'মিনদের যে ইনতিকাল করিবে, সে ঋণ রাখিয়া গেলে তাহা পরিশোধ করা আমার যিম্মায়। আর সে যে সম্পদ রাখিয়া যাইবে তাহা তাহার ওয়ারিছদের জন্য" (বুখারী, কিতাবুল-কাফালা, বাবুদ-দায়ন, হাদীছ নং ২২৯৮)।
নিজের হকও তিনি অন্যকে অকাতরে দান করিয়া দিতেন। ইসলামের বিধান হইল, কোন মুক্ত দাস ইন্তিকাল করিলে তাহার ত্যাজ্য সম্পদ তাহাকে আযাদকারী মনিব পাইবে। একবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর এমন একজন দাস ইনতিকাল করিল। লোকজন তাহার ত্যাজ্য সম্পদ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আনিয়া হাজির করিল। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের মধ্যে তাহার স্বদেশী কেহ আছে কি? লোকজন উত্তর করিল, হাঁ। তিনি বলিলেন, এই সবকিছুই তাহাকে দিয়া দাও (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, ২খ., পৃ. ১৯০)।
গ্রন্থপঞ্জী ৪ (১) আল-কুরআনুল কারীম, স্থা; (২) আল-বুখারী, আস-সাহীহ, দারুস-সালাম, রিয়াদ, সৌদী আরব ১৪১৭/১৯৯৭, ১ম সং; (৩) মুসলিম, আস-সাহীহ, কুতুবখানায়ে রাহীমিয়‍্যা, দেওবান্দ, ইউ. পি., তা. বি.; (৪) আত-তিরমিযী, আল-জামি' আস-সাহীহ, কুতুবখানায়ে রাহীমিয়্যা, দেওবানদ, ইউ. পি., তা. বি.; (৫) আবূ দাউদ, আস্-সুনان, কুতুবখানায়ে রাহীমিয়্যা, দেওবানদ, ইউ.পি., তা. বি.; (৬) মুহাম্মاد ইব্‌ন ইউসুফ আস-সালিহী আশ-শামী, সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশاد ফী সীরাতি খায়রিল-'ইবাদ, বৈরূত, লেবানন ১৪১৪/১৯৯৩, ১ম সং; (৭) কাদী 'ইয়াদ, আশ-শিফা বি-তা'রীফি হুকুকি, 'ل-মুসতাফা, দারুল-কুতুব আল-'ইলমিয়্যা, বৈরূত, লেবানن তা. বি.; (৮) ইউসুফ ইব্‌ন ইসমাঈল আন-নারহানী, হায়াতু রাসূলিল্লাহ (س) ওয়া ফাদাইলুহু, মু'আসসাসা-'ইয্যুদ-দীন, বৈরূত, লেবানন ১৪০৭/১৯৮৬; (৯) আবদুর রাহমান ইবনুল-জাওযী, আল-ওয়াফা বিআহওয়ালিল-মুস্তাফা, মাকতাবা নূরিয়্য রিদাবিয়্যা, পাকিস্তান, ১৩৯৭/১৯৭৭, ২য় সং; (১০) শিবলী নু'مانী ও সায়ي‍्यদ সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন্-নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলায়হি ওয়াসাল্লাম, দারুল ইশা'আত, করাচী ১৯৮৫ খৃ., ১ম সংস্করণ।
ড. আবদুল জলীল

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর বীরত্ব ও সাহসিকতা

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর বীরত্ব ও সাহসিকতা


রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্পূর্ণ জীবনই ছিল বীরত্ব ও সাহসিকতার বহিঃপ্রকাশ। তাঁহার আগমনের সময় হইতে শুরু করিয়া ওয়াফাতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কথা ও কাজে তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বীরত্ব ও সাহসিকতার নজীর স্থাপন করিয়াছেন। তিনি ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে যতগুলি যুদ্ধ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন উহার প্রতিটিতে (হুনায়ন যুদ্ধ ব্যতীত) মুসলিম বাহিনীর তুলনায় শত্রু বাহিনীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশী ছিল। উহা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (س) এক মুহূর্তের জন্যও বিচলিত হন নাই, পশ্চাদগমনও করেন নাই এবং শত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হইয়া ভীত-সন্ত্রস্ত হন নাই, বরং নিঃসংকোচে শান্ত মনে ময়দানে স্থির থাকিয়া সাহসিকতা ও বীরত্বের সাক্ষর রাখিয়াছেন। 'আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর তুলনায় শ্রেষ্ঠ বীর, সাহসী, দানবীর ও অল্পে তুষ্ট আর কাহাকেও দেখি নাই (মুল্লা আলী আল-কারী, শারহুশ-শিফা, ১খ., পৃ. ২৫৭; কাযী ইয়ায, শিফা, ১খ., পৃ. ১১৬)। রাসূলুল্লাহ (س) সালাতের পর আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করিয়া বলিতেন : اللهم اني أعوذ بك من الجبن “হে আল্লাহ! আমি ভীরুতা ও কাপুরুষতা হইতে আপনার আশ্রয় ভিক্ষা করিতেছি" (বুখারী, ১খ., পৃ. ৩৯৬)।
হযরত আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করিতেন : اللهم اني أعوذ بك من العجز والكسل والجبن والهرم “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট অক্ষমতা, অলসতা, কাপুরুষতা ও বার্ধক্য হইতে ক্ষমা প্রার্থনা করি” (বুখারী, ১খ, পৃ. ৩৯৬)।
রাসূলুল্লাহ (স) আরো বলেন : لا تجدنى بخيلا ولا كذوبا ولا جبانا "তুমি আমাকে কৃপণ, মিথ্যুক ও কাপুরষ পাইবে না” (বুখারী, ১খ, পৃ.৩৯৬)।
হযরত আনাস (রা), হইতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ فضلت على الناس باربع بالسخاء والشجاعة وكثرة الجماع وشدة البطش
"আমাকে চারটি বৈশিষ্ট্য দ্বারা মানুষের উপর অধিক সম্মানিত করা হইয়াছে : দানশীলতা, সাহসিকতা, অধিক রতিশক্তি ও কঠোর পাকড়াও-এর ক্ষমতা" (তারীখে বাগদাদ, ৮খ., পৃ. ৭০; কাযী 'ইয়াদ, শিফা, ১খ., পৃ. ৯১)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনের প্রথম স্তরে দুধমাতা হালীমা সা'দিয়া (রা)-এর গৃহে অবস্থানকালে তাঁহার দুধ ভাই ও অন্যান্য বালকদের সহিত খেলা-ধুলায় অংশগ্রহণ করিয়া বীরত্ব
প্রকাশ করিয়াছেন (ইবন জাওযী, আল- ওয়াফা, ১খ., পৃ. ১১২)। শুধু তাহাই নহে, তিনি ছাগল ও মেষ চরাইয়াছিলেন (ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল-কুবরা, ১খ, পৃ. ১২৫)। তিনি বার বৎসর বয়সে চাচা আবু তালিব ও অন্যান্য মক্কাবাসীর সহিত সিরিয়া গমন করিয়া ব্যবসায় অংশগ্রহণ করিবার ইচ্ছা পোষণ করিলে আবু তালিব তাঁহাকে সিরিয়ার সফর সঙ্গী হিসাবে গ্রহণ করিতে সম্মত হইলেন (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ১৩৪; ইবনুল-জাওযী, আল-ওয়াফা, ১খ., পৃ. ১৩১)। তাঁহার চৌদ্দ কিংবা বিশ বৎসর বয়সকালে 'হারবুল- ফিজার নামক চতুর্থ যুদ্ধে উপস্থিত থাকিয়া তীর সংগ্রহ করেন এবং পিতৃব্যদের নিকট তাহা প্রদান করেন (আত-তাবাকাতুল-কুবরা, ১খ, পৃ. ১২৮)। এই প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, كنت انبل على اعمامي يوم الفجار (Ki fapt, sakh, 5. soss; fa feras, Av-firasata- fa fia- সীরাতুন- নাবাবিয়‍্যা, ১খ., পৃ. ১৩৮)।
বাণিজ্য সফরকালে একবার এক ব্যক্তি তাঁহার সহিত লাত ও উয্যা-র নামে কসম করিল। তখন তিনি বলিলেন, “মা হালফত বেহা কাত্ত ওয়ানি লামার বেহা ফালা আলতাফিত ইলাইহা তাদের নামে কসম করি নাই। আমি যখন লাত ও উয্যার পাশ দিয়া অতিক্রম করি তখন ঐগুলির প্রতি দৃষ্টিপাত করি না" (ইবনুল-জাওযী, আল-ওয়াফা, ১খ, পৃ. ১৪৩)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর বীরত্ব ও সাহসিকতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রমাণ হইল কুস্তিতে অংশগ্রহণ। বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) অনেকের সঙ্গে কুস্তিতে অংশগ্রহণ করিয়াছেন। তন্মধ্যে রুকানা ছাড়াও আবু রুকানা, আবু জাহল, ইয়াযীদ ইব্‌ন রুকানা উল্লেখযোগ্য (কাযী 'ইয়াদ, শিফা, ১খ., পৃ. ৬৯; টীকা)। তিনি রুকানা ইব্‌ন ইয়াযীদ পাহলোয়ানের সঙ্গেও কুস্তিতে অংশগ্রহণ করিয়াছেন। সে অত্যন্ত সুঠামদেহী শক্তিশালী ব্যক্তি ছিল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর পূর্বে আরবে কেহই তাহাকে পরাজিত করিতে পারে নাই। রাসূলুল্লাহ (স) রুকানা ইবন 'আবদ ইয়াযীদ-এর সহিত কয়েক দফায় মল্লযুদ্ধ করিয়াছিলেন। প্রথম দফা রাসূলুল্লাহ (স) রুকানাকে ইসলামের দা'ওয়াত দিলে সে সন্দেহ প্রকাশ করে এবং কুস্তিতে অংশগ্রহণের প্রস্তাব দেয়। রুকানা কুস্তিতে পরাজিত হইলে ইসলাম গ্রহণ করিবে বলিয়া সম্মতি প্রকাশ করে। সে দুই বার মল্লযুদ্ধে পরাজিত হইল এবং রাসূলুল্লাহ (স)-কে যাদুকর বলিয়া বিদায় নিল।
দ্বিতীয় দফায় সে ও রাসূলুল্লাহ (স) একসঙ্গে আবু তালিবের ছাগল চরাইতেছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) ও সে একটি ছাগলের শর্তে কুস্তি লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। রুকানা পরাজিত হইল। এমনিভাবে পরপর আরো দুইবার কুস্তিতে অংশগ্রহণ করিয়া সে পরাজিত হইল। ফলে রাসূলুল্লাহ (স) এখানে জয়লাভ করার কারণে তিনটি ছাগল গ্রহণ করিলেন। পরবর্তী কালে রাসূলুল্লাহ (স) প্রশ্ন করিলেন, রুকানা! কি হইল? সে উত্তরে বলিল, আমি পরাজিত, তিনবারের পর আবারো কুস্তিতে অংশগ্রহণ করার সাহস নাই।
তৃতীয় দফা: রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের প্রথমদিকে ইসলামের দা'ওয়াতকে অবহেলা করিয়া রুকানা রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে দশটি ছাগলের শর্তে কুস্তিতে অংশগ্রহণের প্রস্তাব দিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার প্রস্তাবে সম্মত হইলেন এবং বলিলেন, যদি তুমি তাহাই চাও তাহা হইলে আমিও লড়াই করিতে প্রস্তুত আছি। অতঃপর মল্লযুদ্ধ শুরু হইল। রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করিলেন আর রুকানা লাত ও উয্যার ডাক দিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ধরাশায়ী করিয়া পরাজিত করিলেন। এমনিভাবে পরপর আরো দুইবার কুস্তিতে অংশ গ্রহণ করিবার প্রস্তাব দিলে রাসূলুল্লাহ (স) প্রতিবারই রাযী হইলেন। প্রত্যেকবারেই রুকানা পরাজিত হইল (আল-খাসাইসুল-কুবরা, ১খ., পৃ. ১২৯-১৩০, বাবুল আয়াতি ফী মুছারিআতিহী (স) রুকানা)।
মক্কা নগরীতে প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের সূচনা লগ্নে চাচা আবু তালিব ব্যতীত অন্য কেহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর পাশে ছিল না মক্কার কাফির সম্প্রদায় তাঁহাকে পাগল, যাদুকর ও কবি বলিয়া আখ্যায়িত করে। অপরদিকে 'তাহারা ইসলাম প্রচারের কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য আবূ তালিবের কাছে আবেদন করিল। তিনি তাহাদের আবেদন অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই কাজ হইতে বিরত থাকিবার কথা বলিলে রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, "হে চাচা জান!
والله لو وضعوا الشمس في يمينى والقمر في يسارى على ان أترك هذا الأمر حتى يظهره الله أو أهلك ما تركته.
"আল্লাহর কসম! ধর্ম প্রচার ছাড়িয়া দেওয়ার জন্য তাহারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য ও বাম হাতে চন্দ্রও তুলিয়া দেয় তবুও আমি এই কাজ হইতে বিরত থাকিব না যতক্ষণ না আল্লাহ ইহাকে বিজয়ী করেন বা ধ্বংস করেন" (ইব্‌ন হিশام, আস-সীরাতুন-নাবابিয়্যা, ১খ., পৃ. ১৯৫)।
হযরত আলী (রা) বর্ণনা করেন, আমি দেখিলাম, বদর যুদ্ধের দিন আমরা (সাহাবাগণ) রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকটে গিয়া আশ্রয় গ্রহণ করিতেছি আর তিনি শত্রু সেনার সর্বাধিক নিকটবর্তী ছিলেন (ইবনুল-জাওযী, ২খ., পৃ. ৪৪৩; মুল্লা 'আলী আল-কারী, শারহুশ- শিফা, ১খ, পৃ. ২৫৮)। হযরত আলী আরো বর্ণনা করেন, যুদ্ধ যখন চরম আকার ধারণ করিল, এক পক্ষ অপর পক্ষকে আক্রমণ করিল, তখন আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে আশ্রয় নিতেছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স)-এর তুলনায় অন্য কেহ শত্রুর নিকটবর্তী ছিল না (ইবনুল-জাওযী, আল-ওয়াফা, ২খ., পৃ. ৪৪৩)।
হযরত বারা'আ (রা) বলেন, আল্লাহ্র শপথ! যুদ্ধ যখন চরম পর্যায়ে উপনীত হইল তখন আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর পাশে আশ্রয় নিতেছিলাম। আমাদের মধ্যে তিনিই বীর হিসাবে পরিচিত হইতেন যিনি রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকটবর্তী হইতেন। কেননা তিনি শত্রুর নিকটতম স্থানেই অবস্থান করিতেছিলেন (আল-ওয়াফা, ২খ., পৃ. ৪৪৩; শারহুশ-শিফা, ১খ.,
উহুদ যুদ্ধের দিন সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (স)-কে মদীনার বাহিরে গিয়া যুদ্ধ করিবার ইচ্ছা জ্ঞাপন করিল, অপরদিকে রাসূলুল্লাহ (স) মদীনা হইতে বাহিরে না যাওয়ার মত প্রকাশ করিলেন। পরিশেষে অধিকাংশ সাহাবীর মত অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদেরকে যুদ্ধের প্রস্তুতির আদেশ দিলেন। তিনি নিজেও সুদৃঢ় লৌহবর্ম ও স্কন্ধে তরবারি ঝুলাইয়া যুদ্ধ করিবার জন্য প্রস্তুত হইলেন। অবস্থা দেখিয়া সাহাবীগণ নিজেদের কৃতকর্মের উপর অনুতপ্ত হইলেন এবং বলিলেন, আপনার অভিমতের বাহিরে সিদ্ধান্ত লওয়া আমাদের ঠিক হয় নাই। সুতরাং আপনি আপনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করুন। তখন রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন :
لا ينبغي لنبي إذا لبس لأمته أن يضعها حتى يحكم الله بينه وبين عدوه
"কোন নবী যখন যুদ্ধের পোশাক পরিধান করেন তখন শত্রুদের সহিত একটা ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত তিনি উহা খোলেন না" (কাস্তাল্লানী, আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ২০৫; বুখারী, সাহীহ, ২খ., পৃ. ১০৯৫)।
বদর যুদ্ধে কাফির সৈনিক উবায় ইবন খালাফ বন্দী হওয়ায় রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিয়াছিল, আমি আপনাকে হত্যা করিব। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন :
بل أنا أقتلك ان شاء الله .
"বরং আমি তোমাকে হত্যা করিব ইনশাআল্লাহ"।
উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স) যুবায়র ইবনুল 'আওয়াম (রা) বা হারিছ ইবনুস্-সিম্মাহ্ হইতে বর্শা লইয়া তাহাকে আঘাত করেন। ফলে সে ভূপাতিত হয়। কাফির সম্প্রদায় তাহাকে বহন করিয়া লওয়ার পথে মক্কা হইতে ছয় মাইল দূরে 'সারিফ' নামক জায়গায় সে মারা যায় (আল-ওয়াফা, ২খ., পৃ. ৬৮৭; কাযী 'ইয়াদ, শিফা, ১খ., পৃ. ১১৭; আবূ না'ঈম আল-ইসরাহানী, দালাইলুন-নুবৃওয়াত, পৃ. ৪১৭)। খন্দক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স) তিন হাজার সৈনিক লইয়া পরিখা খননের কাজ শুরু করিলেন আর কাফিরদের সৈন্যসংখ্যা ছিল দশ হাজার (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩৪০)। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)-ও পেটে পাথর বাধিয়া পরিখা খননে অংশগ্রহণ করেন। পরিখা খননের সময় এক স্থানে একটি বিরাট পাথর দেখা দিল। সাহাবীগণের মধ্যে কেহই কোদাল দিয়া উহা ভাঙ্গিতে পারে নাই। পরিশেষে রাসূলুল্লাহ (স) উপস্থিত হইয়া কোদাল মারিয়া উহাকে বালুকা স্তূপে পরিণত করিলেন (আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ২৩৫; আত-তাফসীরুল কাবীর, ৮খ., পৃ. ৪)।
৮ম হিজরী শাওয়াল মাসে অনুষ্ঠিত হুনায়ন যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স) অসাধারণ বীরত্বের নযীর স্থাপন করেন। সেই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে চারজন সাহাবী হযরত আলী (রা), চাচা 'আব্বাস (রা), আবূ সুফ্যান (রা) ও ইবন মাস'উদ (রা) ব্যতীত কেহই যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত ছিলেন না (বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১৭, টীকা ৯)। হযরত বারা'আ ইব্‌ 'আষিব (রা) হইতে বর্ণিত আছে, কায়ন গোত্রের এক ব্যক্তি তাহাকে বলিল, হুনায়ন যুদ্ধের দিন
বানু হাওয়াযিনের তীরন্দাযদের অবিরাম তীর বর্ষণে তোমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হইতে পলায়ন করিয়াছ কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত ছিলেন, পলায়ন করেন নাই। হযরত বারা'আ ইবন 'আযিব (রা) বলেন, আমরা যখন তাহাদের উপর আক্রমণ করিলাম তাহারা পরাজিত হইল, তখন আমরা গনীমতের মাল গ্রহণ করিলাম। ইত্যবসরে আমরা তাহাদের তীরের দ্বারা আক্রান্ত হইলাম তখন রাসূলুল্লাহ (স) একটি সাদা খচ্চরের উপর আরোহণ করিয়া বীরত্বের সাথে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিতেছিলেন আর বলিলেন-
ان النبي لاكذب + انا ابن عبد المطلب . "আমি নবী এতে বিন্দুমাত্র মিথ্যার অবকাশ নাই। আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর" (ইবন হাম্বাল, মুসনাদ, হাদীছ নং ১৮৭৩৩)।
এইরূপ ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তিনি বিন্দুমাত্র ভীত-সন্ত্রস্ত হন নাই, বরং তিনি তাঁহার খচ্চরকে ঐ দিন কাফিরদের দিকে ধাওয়া করিলেন (শারহুশ-শিফা, ১খ., পৃ. ২৫৭)। ঐদিন কোন ব্যক্তিকেও রাসূলুল্লাহ (স) অপেক্ষা বেশী শক্তিশালী ও বীর পুরুষ দেখা যায় নাই (প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৬)।
হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) সর্বশ্রেষ্ঠ বীর ও দানশীল ছিলেন। একবার মদীনা মুনাওয়ারায় গভীর রাত্রে বিকট শব্দে ভীতি ও ত্রাসের সঞ্চার হইল। অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য কয়েক ব্যক্তি ইহার সন্ধানে বাহির হইল। ঐ আওয়াজকে লক্ষ্য করিয়া তাহারা অনুসন্ধান চালাইল, দেখিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) গলদেশে তলোয়ার ঝুলাইয়া হযরত আবু তালহার ঘোড়ার উপর আরোহণ করিয়া শহরের উপকণ্ঠ হইতে প্রত্যাগমন করিতেছেন এবং বলিতেছেন, ভয় করিও না, বিপদের কোন আশংকা নাই (মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৫২; বুখারী, ১খ., পৃ. ৩৯৫)। রাসূলুল্লাহ (س) যুদ্ধের ময়দানে শুধু যুদ্ধ পরিচালনা করিয়াছেন তাহাই নহে বরং সুযোগমত কাফিরদিগকে প্রতিরোধ করিয়া বীরত্বের নযীর স্থাপন করিয়াছেন। সাহাবীদের মধ্যে বীরত্ব ও সাহাসিকতার গুণাবলী সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তিনি ঘোষণা দিয়াছেন: الجنة تحت ظلال السيوف "জান্নাত তলোয়ারের ছায়াতলে” (বুখারী, ১খ, ৩৯৫; ফাতহুল-বারী, ৬খ., হাদীছ নং ২৮১৮)।
গ্রন্থপঞ্জী: (১) কাযী আবুল ফাদল 'ইয়াদ, আশ-শিফা বিতা'রীফি হুক্কিল-মুসতাফা, দারুল কুতুবিল-'ইলমিয়‍্যা, তা. বি., ১খ., পৃ. ৯১, ১১৪-১১৮, ৬৯; (২) মুল্লা 'আলী আল-কারী, শারহুশ-শিফা, বৈরূত, দারুল কুতুবিল, ইসলামিয়্যা, তা. বি., ১খ., ২৫৭-২৫৮; (৩) আবূ আবদুল্লাহ মুহাম্মاد ইব্‌ন ইসমাঈল আল-বুখারী, আস-সহীহ, ১খ., পৃ. ৩৯৫-৩৯৬, কিতাবুল- জিহاد, বাবুশ-শাজা'আতি ফিল-হারবি ওয়াল-জুবনি, ২খ., পৃ. ৬১৭, ১০৯৫; (8) হাফিজ আবু বকর আহমাদ ইব্‌ন আলী আল-খাতীব আল-বাগদাদী, তারীখ বাগদাদ, বৈরূত, দারুল- কুতুবিল ইসলামিয়্যা, তা. বি., ৮খ., পৃ. ৭০; (৫) ইমাম আবুল ফারাজ আবদুর রহমান
ইবনুল-জাওযী, আল-ওয়াফা বি-আহওয়ালিল-মুসতাফা, আল-মাকতাবাতুন নুরিইয়্যাতুর রিদবিয়্যা, পাকিস্তান, ১৯৭৭ খৃ. / ১৩৯৭ হি., ২য় সংস্করণ, ১খ., পৃ. ১১২, ১৩১, ১৩৫, ১৪০ ও ২খ., পৃ. ৪৪২-৪৪৩, আল- বাবুল আশিরু ফী যিকরি শাজা'আতি রাসূলিল্লাহ (س), পৃ. ৬৮৭; (৬) ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল-কুবরা, বৈরূত, দার সাদির, তা. বি., ১খ., পৃ. ১২৫, ১২৮; (৭) ইবন হিশام, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরূত, ১৯৯৮ খৃ. / ১৪১৮ হি., ১খ., পৃ. ১৩৪, ১৩৮; (৮) জালালুদ্দীন সুয়ূতী, আল-খাসাইসুল- কুবরা, ১খ., দারুল- কিতাবিল- আরাবী, পৃ. ১২৯-৩০; বাবুল আয়াতি ফী মাসারি'আতি রাসূলিল্লাহ (س) রুকানা; উর্দু অনুবাদঃ হাকীম গোলাম মুঈনুদ্দীন নাঈমী, করাচী : মদীনা পাবলিকেশন্স কোম্পানী, পৃ. ২৮৬-২৮৭; ঐ, বাংলা অনু., অনুবাদ মুহিউদ্দীন খান, সীরাত গবেষণা ও প্রচার সংস্থা, ঢাকা ১৯৯৮ খৃ. / ১৪১৯ হি., ১খ., পৃ. ২৩৯-২৪২; (৯) শায়খ আহমাদ ইব্‌ন মুহাম্মাদ আল-কাস্তাল্লানী, আল-মাওয়াহিবুল-লাদুন্নিয়্যা বিল-মিনাহিল মুহাম্মাদিয়্যা, দারূল কুতুবিল 'ইলমিয়্যা, ১৯৯৬ খৃ. / ১৪১৬ হি.; ১ম সংস্করণ, ১খ., পৃ. ২০৫;
(১০) সফিউর রাহমান মুবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুম, মক্কা আল-মুকাররামা, রাবিতাতুল 'আলামিল ইসলামী, ১৯৯৪ খৃ. / ১৪১৫ হি.; ৫ম সংস্করণ, পৃ. ৩৪০; (১১) আবু না'ঈম আল-ইসবাহানী, দালাইলুন-নুবৃওয়াহ, আলেপ্পো, তা. বি., পৃ. ৪১৭; (১২) ইমাম আবূ জা'ফার মুহাম্মاد ইব্‌ন জারীর আত-তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল-মুল্‌ক, মুআস্সাসাতুল আলামী, তা.বি., ২খ., পৃ. ২৩৫; (১৩) ইমাম ফাখরুদ্দীন-রাযী, আত-তাফসীরুল কবীর, ৮খ., পৃ. ৪; (১৪) ইব্‌ن হাম্বল, মুসনাদ, বৈরূত, দারুল কুতুবিল 'ইলমিয়্যা ৪খ, হাদীছ নং ১৮৭৩৩; (১৫) মুসলিম, আস-সাহীহ, দিল্লী, আল-মাক্তাবাতুর- রাশীদিয়্যা, তা. বি.; ২খ., পৃ. ২৫২; কিতাবুল ফাদাইল, বাব শাজা'আতু রাসূলাল্লাহ (س); (১৬) ইব্‌ن হাজার আল-আসকালানী, ফাতহুল-বারী, দারুল-মা'রিফা, বৈরূত, ৬খ., হাদীছ নং ২৮১৮ এবং ৭খ., পৃ. ৪২৭ (দারুস-সালাম, রিয়اد, তা.বি.)।
ড. মোহাম্মদ আবদুল মালেক

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য সাদাকাহ গ্রহণ নিষিদ্ধ

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য সাদাকাহ গ্রহণ নিষিদ্ধ


রাসূলুল্লাহ (স)-এর কতিপয় বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি ছিল এই যে, তিনি সাদাকাহ গ্রহণ করিতেন না, তবে হাদিয়া (উপহার-উপঢৌকন) গ্রহণ করিতেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাদাকাহ গ্রহণ না করা এবং হাদিয়া গ্রহণ করার বৈশিষ্ট্যটি পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহে বিবৃত তাঁহার নবুওয়াতের আলামতসমূহের মধ্যে বর্ণিত হইয়াছিল। প্রখ্যাত সাহাবী সালমান ফারসী. (রা) জন্মগতভাবে পারস্যে প্রচলিত 'যরদশ্ত' (অগ্নি উপাসনা) ধর্মের অনুসারী ছিলেন। এক সময় তিনি যরদশ্ত ধর্মের প্রতি আস্থা হারাইয়া সত্য ধর্মের অন্বেষণে নানা দেশ ভ্রমণ করিতে আরম্ভ করেন। এই সময় তিনি ইয়াহুদী ও নাসারাদের পাদ্রী ও ধর্মবিশেষজ্ঞদের নিকট হইতে শুনিতে পাইলেন যে, শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ মুসতাফা (স) হিজাযে আবির্ভূত হইবেন। ইয়াহুদী ও নাসারা পণ্ডিতগণ তাহাকে আরও জানাইল যে, এই প্রতীক্ষিত শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর সত্যতার প্রমাণ ও বৈশিষ্ট্য হইবে : ক. তিনি সাদাকাহ গ্রহণ করিবেন না। খ. তিনি হাদিয়া বা উপঢৌকন গ্রহণ করিবেন। গ. তাঁহার পৃষ্ঠদেশে মোহরে নবুওয়াত থাকিবে।
হযরত সালমান (রা) এই নবীর সন্ধানে বাহির হইলেন। পথিমধ্যে তিনি দাস ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়িয়া কয়েক দফা বিক্রি হন এবং সর্বশেষে মদীনার এক ইয়াহুদী তাঁহাকে দাসরূপে খরিদ করে। রাসূলুল্লাহ (স) যখন হিজরত করিয়া মদীনায় আসেন তখন সালমান তাঁহার আগমন বার্তা শুনিয়া কিছু ফল লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাযির হইলেন এবং বলিলেন, "আমি আপনাকে এই ফলগুলি সাদাকাস্বরূপ দান করিলাম, আপনি মেহেরবানী পূর্বক গ্রহণ করুন।" রাসূলুল্লাহ (স) উত্তরে বলিলেন, "আমি সাদাকাহ গ্রহণ করি না।" সালমান (রা) তাঁহার নবুওয়াতের সত্যতার প্রথম প্রমাণ ও বৈশিষ্ট্যের সন্ধান পাইয়া গেলেন। কিছুদিন পর দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য প্রমাণের জন্য তিনি কিছু ফল লইয়া আবার মহানবী (স)-এর খidমতে হাযির হইয়া বলিলেন, "হে আল্লাহ্র রাসূল! ইহা আপনার জন্য আমার পক্ষ হইতে হাদিয়া, দয়া করিয়া কবুল করুন।" রাসূলুল্লাহ (স) তাহার হাদিয়া কবুল করিলেন। এইভাবে দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য প্রমাণের পর হযরত সালমান (রা) মহানবী (স)-এর তৃতীয় প্রমাণ প্রত্যক্ষ করার জন্য যখন আগ্রহী হইলেন তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে তাঁহার মোহরে নবুওয়াত প্রত্যক্ষ করিবার সুযোগ দিলেন। হযরত সালমান (রা) তাঁহার তৃতীয় বৈশিষ্ট্যের প্রমাণ পাইয়া তৎক্ষণাত ইসলাম গ্রহণ করিলেন। এই হাদীছ প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাদাকাহ গ্রহণ না করার বিষয়টি পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থসমূহে উল্লিখিত ছিল এবং ইহা ছিল তাঁহার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আল্-কুরআন এবং আল্-হাদীছে সাদাকাহ শব্দটি দুইটি অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। (এক) সাদাকাহ প্রায়শ যাকাত শব্দের প্রতিশব্দরূপে ব্যবহৃত হইয়াছে। (দুই) স্বতস্ফূর্ত ঐচ্ছিক দান-খয়রাত অর্থেও ইহা ব্যবহৃত হইয়াছে।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন:
انا لا تحل لنا الصدقة "আমাদের জন্য (মুহাম্মাদ (স), তাঁহার পরিবার-পরিজন ও তাঁহার বংশীয় লোকজন) সাদাকাহ গ্রহণ করা নিষিদ্ধ” (মুসলিম, পৃ. ৩৪৪)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর উপরে উল্লিখিত বক্তব্য সাদাকাহ )الصدقة( শব্দটি নিঃশর্ত ব্যাপকার্থে ব্যবহৃত হইয়াছে যাহা ফরয সাদাকাহ, যথা যাকাত এবং নফল সাদাকাহ, যথা: ব্যক্তির স্বতঃস্ফূর্ত দান-খয়রাত ইত্যাদিকে অন্তর্ভুক্ত করে। তাই রাসূলুল্লাহ (স) ফরয সাদাকাহ (যাকাত) এবং নফল সাদাকাহ (তথা সাধারণ দান-খয়রাত) কোনটিই গ্রহণ করিতেন না। উভয়বিধ সাদাকাহ গ্রহণ না করাই ছিল তাঁহার বৈশিষ্ট্য।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, একদিন রাসূলে কারীম (স)-এর নাতি হযরত হাসান ইবন 'আলী (রা) একটি সাদাকাহ্ খেজুর হাতে লইয়া মুখে দিয়া ফেলিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) ইহা দেখামাত্র বলিয়া উঠিলেন, ছি! ছি!! অর্থাৎ যাহা কিছু মুখে দিয়াছ তাহা ফেলিয়া দাও। হাসান (রা) মুখ হইতে খেজুরটি বাহির করিয়া ফেলিলেন। কোন কোন বর্ণনা মুতাবিক স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার হাত দ্বারা হাসানের মুখ হইতে খেজুরটি বাহির করিয়া ফেলিয়া দেন। অতঃপর তিনি বলিলেন: “তুমি জান না, আমরা (নবী-পরিবার) সাদাকাহ গ্রহণ করি না"।
একবার হযরত আবদুল মুত্তালিব ইবন রাবী'আ (রা) এবং হযরত ফযল ইব্‌ন আব্বাস (রা) রাসূলে কারীম (স)-এর খিদমতে হাযির হইয়া আরয করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাদিগকে যাকাত আদায়কারীর পদে নিয়োগ দিন। ইহাতে আমরা পারিশ্রমিক হিসাবে কিছু সাদাকাহ লাভ করিতে পারি। উত্তরে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
ان الصدقة لا ينبغى لال محمد وانما هو أوساخ الناس "মুহাম্মাদ (স)-এর পরিবার-পরিজনের জন্য সাদাকাহ গ্রহণ করা সমীচীন নহে। কারণ সাদাকাহ্ দ্রব্য মানুষের ময়লা-আবর্জনাস্বরূপ” (মুসলিম, পৃ. ৩৪৪)।
রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার পরিবার-পরিজন এবং বংশীয়দের জন্য সাদাকাহ্ গ্রহণ করা সমীচীন না হওয়ার কারণসমূহ নিম্নরূপ:
১. সাদাকাহ মূলত মানুষের ধন-সম্পদের ময়লা ও আবর্জনাস্বরূপ। যেমন আল্লাহ তা'আলা যাকাতের উপকারিতা ও নির্দেশ বিধিবদ্ধ হওয়ার কারণ প্রসঙ্গে বলিয়াছেন:
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ إِنَّ صَلَونَكَ سَكَنٌ لَهُمْ وَاللهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ .
"তুমি উহাদিগের (মুমিনদিগের) সম্পদ হইতে সাদাকাহ গ্রহণ কর। ইহার দ্বারা তুমি উহাদিগকে পবিত্র করিবে এবং পরিশোধিত করিবে। তুমি উহাদিগকে দু'আ করিবে। তোমার দু'আ তো উহাদিগের জন্য চিত্ত স্বস্তিকর। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ” (৯: ২০৩)।
একটি হাদীছে রাসূলুল্লাহ (স) বানু হাশিমকে সম্বোধন করিয়া বলেন:
يا بنو هاشم ان الله كره لكم عسالة ايدى الناس واوساخهم وهوضكم منا بخمس الخمس .
"হে বনু হাশিম! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদিগের জন্য মানুষের উপার্জিত ধন-সম্পদের ময়লা ও বর্জ্য গ্রহণ করা অপসন্দ করেন। তিনি তোমাদিগকে উহার প্রতিদানে বায়তুল-মালের 'খুমুস' (গনীমতের সম্পদ হইতে বায়তুল-মালের জন্য রক্ষিত এক-পঞ্চমাংশ) হইতে সম্মানী ভাতার ব্যবস্থা করিয়াছেন"।
উল্লেখিত আলোচনা হইতে ইহাই প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (স) এবং তাঁহার পরিবার- পরিজন ও বংশীয়দের জন্য সাদাকাহ গ্রহণ নিষিদ্ধ হওয়ার উদ্দেশ্য হইল তাঁহাদের বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার স্বীকৃতি প্রদান করা। যেহেতু তাঁহারা ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে রাসূলুল্লাহ (স)-কে সম্ভাব্য সকল প্রকারে সহযোগিতা দান করিয়াছেন, সুতরাং মানুষের ধন-সম্পদের ময়লা ও বর্জ্য দ্বারা তাঁহাদিগের জীবিকার বন্দোবস্ত করা তাঁহাদের মর্যাদার পরিপন্থী। তাই তাঁহাদের জন্য সাদাকাহ গ্রহণ নিষিদ্ধ করা হইয়াছে।
যেহেতু এই বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্বের বুনিয়াদ হইল ইসলামের জন্য ত্যাগ ও কুরবানী, অতএব রাসূলুল্লাহ (স) সেই সকল আত্মীয়-স্বজন এবং বংশীয়দিগকে তাঁহার এই ঘোষণায় অন্তর্ভুক্ত করিয়াছেন যাঁহারা ইসলাম প্রতিষ্ঠায় তাঁহাকে সাধ্যমত সহযোগিতা করিয়াছেন। তাই আবু লাহাব ও তাহার বংশধরদের জন্য এই মর্যাদা কার্যকর হয় নাই।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন:
لا قرابة بيننا وبين ابي لهب فانه اتو علينا الأفجوين .
"আমাদের ও আবু লাহাবের মাঝে কোন আত্মীয়তার বন্ধন নাই। কারণ সে আমাদের উপর পাপিষ্ঠদিগকে অগ্রাধিকার দিয়াছে"।
২. আল্-কুরআনুল-কারীমে নবী-রাসূল এবং দীনের দাঈগণের বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হইয়াছে এইভাবে:
وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَلَمِينَ .
"আমি ইহার (সত্যের প্রতি আহ্বানের) জন্য তোমাদের নিকট কোন প্রতিদান চাহি না; আমার পুরস্কার তো জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকটই আছে" (২৬ঃ ১৬৪)।
আয়াতের মমার্থ এই যে, নবী-রাসূল এবং দীনের দাঈগণ তাঁহাদের মহান দাওয়াতী দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে মানুষের নিকট হইতে কোন বিনিময় কামনা করেন না। সুতরাং নবী-রাসূলগণ যদি সাদাকাহ গ্রহণ করেন তাহা হইলে ইহাতে তাহাদিগের সমালোচিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
৩. রাসূলুল্লাহ (স) এবং তাঁহার পরিবার-পরিজন ও বংশীয়দের জন্য সাদাকাহ গ্রহণ নিষিদ্ধ হওয়ার আরেকটি কারণ এই যে, যাহা মানুষ অপরকে অনুগ্রহ করিয়া ছওয়াবের আশায় প্রদান করে তাহাই সাদাকাহ। পক্ষান্তরে হাদিয়া হইল যাহা মানুষ অপরের সম্মানার্থে বা অপরের সহিত আন্তরিকতা ও হৃদ্যতা বৃদ্ধির জন্য প্রদান করিয়া থাকে। যদিও ইহাতে ছওয়াব রহিয়াছে, তথাপি ছওয়াবটা এখানে মুখ্য নয়। সাদাকাহ ও হাদিয়ার মধ্যে এই মৌলিক পার্থক্যের কারণে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন:
اليد العليا خير من اليد السفلي "সাদাকাহ গ্রহীতার হাত নীচু পক্ষান্তরে দাতার হাত উচু"।
মোটকথা, সাদাকাহ্ গ্রহণের ক্ষেত্রে রহিয়াছে সাদাকাহ গ্রহীতার মর্যাদার হীনতা আর দাতার শ্রেষ্ঠত্ব। ইহা নবীর শানের পরিপন্থী। কারণ প্রত্যেক নবী তাঁহার যুগের সর্বোৎকৃষ্ট ব্যক্তি। নবী কাহারও অনুগ্রহের পাত্র নহেন, বরং সকলেই নবীর অনুগ্রহে ধন্য। এই কারণে নবীর জন্য সাদাকাহ গ্রহণ পসন্দ করা হয় নাই।
রাসূলুল্লাহ (স) সাদাকাহ গ্রহণ করিতেন না। কেহ কোন কিছু তাঁহার খিদমতে পেশ করিলে তিনি প্রথমে জিজ্ঞাসা করিতেন, ইহা হাদিয়া না সাদাকাহ্? যদি উত্তরে বলা হইত হাদিয়া, তবে গ্রহণ করিতেন। আর যদি বলা হইত, সাদাকাহ, তাহা হইলে তিনি উহা গ্রহণ করিতেন না বরং উপস্থিত লোকজনের মধ্যে সাদাকাহ গ্রহণের উপযুক্ত কাউকে দেখাইয়া দিতেন।
কখনও কোন অবস্থাতেই যেন তাঁহার হাতে সাদাকাহ আসিয়া না যায় এবং সাদাকার বিন্দুমাত্রও তাঁহার উদ্‌দ্রস্থ না হয় সেই দিকে তিনি সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখিতেন। ইসলামী রাষ্ট্র মদীনার যাকাত, সাদাকাহ ইত্যাদি স্বাভাবিক কারণেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জমা করা হইত এবং তাঁহার তত্ত্বাবধানে উহা বণ্টন করা হইত। খেজুর বাগান সমৃদ্ধ মদীনায় যাকাত ও সাদাকাহরূপে খেজুরের আমদানী হইত সর্বাপেক্ষা বেশী। রাসূলুল্লাহ (স)-এর গৃহে বা গৃহচত্বরে উহার বণ্টনকার্য হইত। এই কারণে কখনও কখনও দেখা যাইত যে, তাঁহার গৃহে বা গৃহচত্বরে দুই-একটি খেজুর পড়িয়া রহিয়াছে। এই পতিত খেজুর যেমন সাদাকাহ ও যাকাতের অংশ হইতে পারে তেমনি তাঁহার গৃহের খেজুরও হইতে পারে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) বলিতেন, আমি কখনও কখনও আমার গৃহে প্রত্যাবর্তন করিয়া দেখিতে পাইতাম যে, এখানে সেখানে দুই-একটি খেজুর পড়িয়া রহিয়াছে। আমি উহা হাতে উঠাইয়া লইতাম; অতঃপর "ইহা সাদাকার খেজুর হইবে" ভাবিয়া রাখিয়া দিতাম। রাসূলুল্লাহ (স)-এর তীব্র প্রয়োজন ও চাহিদা থাকা সত্ত্বেও তিনি উহা খাওয়া হইতে বিরত থাকিতেন।
হযরত আনাস (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) একটি খেজুর পতিত অবস্থায় দেখিতে পাইয়া বলিলেন, "খেজুরটি সাদাকার না হইলে আমি উহা খাইতাম"।
রাসূলুল্লাহ (স) সাদাকার ক্ষেত্রে নিজের ব্যাপারে যেমন অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন, তদ্রূপ তাঁহার পরিবারবর্গ ও বংশীয় অন্যান্যদের ব্যাপারেও অত্যধিক সচেতন থাকিতেন। এমনকি যাহার মধ্যে সাদakাহ হওয়ার বিন্দুমাত্র সংশয় থাকিত তাহাও তিনি নিষেধ করিতেন।
পূর্বে উল্লেখ হইয়াছে যে, সাদাকাহ দুই প্রকার: ফরয সাদাকাহ তথা যাকাত এবং নফল সাদাকাহ অর্থাৎ স্বতঃস্ফূর্ত দান-খয়রাত। রাসূলুল্লাহ (স) উভয়বিধ সাদাকাহ পরিহার করিতেন। তবে তাঁহার পরিবারবর্গ এবং বংশীয়দের জন্য কেবল ফরয সাদাকাহ নিষিদ্ধ ছিল। তাঁহারা নফল সাদাকাহ গ্রহণ করিতে পারিতেন।
সাদাকার ক্ষেত্রে একটি শার'ঈ নীতি এই যে, সাদাকাহ গ্রহণের উপযুক্ত ব্যক্তি উহা গ্রহণের পর যখন তাহার পূর্ণ অধিকারে চলিয়া আসে, তখন সে উহা কোন সচ্ছল ব্যক্তিকে প্রদান করিলে সচ্ছল ব্যক্তির জন্য উহা সাদাকাহ্ বলিয়া বিবেচিত হইবে না বরং উহা তাহার জন্য হাদিয়ারূপে সম্পূর্ণ জায়েয গণ্য হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) এবং তাঁহার পবিত্র স্ত্রীগণের অধিকারভুক্ত দাস-দাসিগণ কখনও কখনও এইরূপ নফল সাদাকাহ্ প্রাপ্ত হইতেন। তাহারা উহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাদিয়ারূপে পেশ করিলে তিনি তাহা গ্রহণ করিতেন। একবার হযরত 'আইশা (রা)-এর মুক্ত দাসী বারীরা (রা) সাদাকাহ হিসাবে প্রাপ্ত গোশতের অংশবিশেষ আহারের জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-কে পেশ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) উহা গ্রহণে আগ্রহী হইলে 'আইশা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! ইহা তো বারীরা সাদাকারূপে পাইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, لك صدقة ولنا هدية "হাঁ, ইহা তোমার (বারীরা) জন্য সাদাকাহ্,, আমাদের জন্য হাদিয়া” (মুসলিম, ৩৪৩; বুখারী, পৃ. ২০২)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর স্ত্রী হযরত জুওয়ায়রিয়া (রা) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (স) আমার গৃহে তাশরীফ আনিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, গৃহে কোন খাবার আছে কি? আমি বলিলাম, হে আল্লাহর রাসূল! গৃহে কোন খাবার নাই। তবে বকরীর এক টুকরা গোশত রহিয়াছে যাহা আমার দাসী সাদাকারূপে পাইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, উহা আমাকে দিতে পার। কারণ সাদাকাহ্ উহার প্রকৃত হকদারের নিকট পৌছিয়াছে। অর্থাৎ এখন সে উহা আমাদিগকে প্রদান করিলে আমাদের জন্য উহা সাদাকাহরূপে বিবেচিত হইবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00