📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্নেহ-মমতা

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্নেহ-মমতা


রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্তর ছিল সর্বাধিক স্নেম-মমতায় ভরপুর। যে ব্যক্তি তাঁহার সংস্পর্শ লাভ করিত সেই ধন্য হইত। বিশেষত শিশুদের প্রতি তাঁহার স্নেহ এবং বিপদগ্রস্তদের প্রতি তাঁহার মমতা ছিল অবারিত। এতদ্ব্যতীত সকল মুমিনের প্রতিই তিনি ছিলেন স্নেহময়। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন:
لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوْفٌ رَّحِيمٌ
"নিশ্চয় তোমাদের মধ্য হইতে এক রাসূল আসিয়াছে, তোমাদেরকে যাহা কষ্ট দেয় তাহা তাহাকে পীড়া দেয়, তোমাদের মঙ্গলের ব্যাপারে তিনি আকাঙ্ক্ষাকারী এবং মু'মিনদের জন্য তিনি অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু" (৯:১২৮)।
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ .
"আল্লাহর রহমতের বদৌলতেই তুমি তাহাদের প্রতি কোমল হৃদয় হইয়াছিলে। যদি তুমি রুঢ়ভাষী ও কঠোর অন্তরের হইতে তাহা হইলে তোমার পার্শ্ব হইতে দূরে সরিয়া পড়িত" (৩:১৫৯)।
আল্লাহ্ প্রিয়নবী (স) সর্বোতভাবে ছিলেন স্নেহ-মমতার বাস্তব প্রতিচ্ছবি। তাঁহার অনুপম স্নেহ ও অসীম মমতার পরশে শিশু-কিশোর ও দুস্থ-নিপীড়িত জনগণ প্রাণ ভরিয়া স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করিয়াছে। বঞ্চিত, নিঃস্ব ও আশ্রয়হীন শিশুরা তাহাদের চাহিদামত অবস্থান লাভ করিয়াছে। পৃথিবীর ইতিহাসে তাঁহার চাইতে অধিক স্নেহ-মমতার স্বাক্ষর কেহই রাখিতে পারে নাই। আরবের তৎকালীন তিমির অমানিশায় তিনি স্নেহ-মমতার এমন উজ্জ্বল জ্যোতি প্রদর্শন করিয়াছেন যাহার ফলে আজও পৃথিবী আলোকময় হইয়া রহিয়াছে। কিছু ঘটনা, বিবরণ ও বাস্তব প্রেক্ষাপটে তাঁহার স্নেহ-মমতার কিঞ্চিত নির্দশন এইখানে লিপিবদ্ধ করা হইল।
হযরত রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্নেহের পরশ ছিল পৃথিবীর সকল স্নেহ-মমতা হইতে অত্যাধিক। এই প্রসঙ্গে হযরত যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, তাঁহার আট বৎসর বয়সে তাঁহাকে আরবের হুব্বাশাহ (حباشة) বন্দরে বিক্রয় করা হয়। হযরত খাদীজা (রা)-র ভ্রাতুষ্পুত্র হাকীম ইব্‌ন হিযাম এক কাফেলা হইতে তাঁহাকে ক্রয় করেন। খাদীজা (রা) এই কিশোরকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতের জন্য তাঁহাকে প্রদান করেন। বালকটিকে নবী
করীম (স) অত্যন্ত ভালবাসিতেন এবং স্বীয় পুত্রবৎ স্নেহ-মমতায় লালন-পালন করিয়াছেন।
দীর্ঘদিন পর তাঁহার পিতা হারিছা ও চাচা কা'ব তাঁহার অবস্থান সম্পর্কে অবহিত হইয়া পুনরায় ক্রয় করিবার জন্য মক্কায় আগমন করে। তখনও ইসলাম প্রকাশিত হয় নাই। তাহারা নবী করীম (স)-এর নিকট নিজেদের মনোভাব ব্যক্ত করেন এবং বিনিময়ে অর্থকড়ি দিতে ইচ্ছা করেন। নবী করীম (স) বলিলেন, আচ্ছা! তাহাকে ডাকিয়া তাহার ইচ্ছা ব্যক্ত করিতে বলুন। যদি যায়দ আমার নিকট অবস্থান করিতে চাহে তবে থাকিতে পারিবে; আর যদি আপনাদের সাথে চলিয়া যাইতে চাহে তবে আপনাদের সহিত চলিয়া যাইতে পারিবে। অতঃপর যায়দ (রা) উপস্থিত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, উপস্থিত মহোদয়গণকে তুমি কি চিন? তিনি পিতা হারিছা ইব্‌ন শুরাহবীল আর অন্য একজনের দিকে ইঙ্গিত করিয়া দেখাইয়া বলিলেন, তিনি হইলেন আমার পিতৃব্য কা'ব ইব্‌ন শুরাহবীল। অতঃপর নবী করীম (স) বলিলেন, আমি তোমাকে স্বাধীনতা দিলাম। তুমি ইচ্ছা করিলে তাহাদের সহিত চলিয়া যাইতে পার, আর ইচ্ছা করিলে আমার সহিত অবস্থান করিতে পার। যায়দ (রা) বলিলেন, আমি বরং আপনার সাথে থাকাই পছন্দ করি। শুনিয়া তাঁহার পিতা বলিলেন, স্নেহের যায়দ! তুমি কি মুক্ত জীবন যাপন পছন্দ কর না? তোমার পিতা-মাতা, জন্মস্থান, সম্প্রদায় সবাইকে পছন্দ করিলে না? তখন যায়দ (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখাইয়া বলিলেন, আমি কখনও এই মহৎ ব্যক্তিকে ছাড়িয়া যাইতে পারিব না। রাসূলুল্লাহ (স) তখন কুরায়শদের বৈঠকে উপস্থিত হইয়া বলিলেন, তোমরা সাক্ষী থাক। এই বালক আমার পুত্র, সে আমার সম্পদের উত্তরাধিকারীও হইবে। ইহা শুনিয়া যায়দ (রা)-এর পিতা ও চাচা আশাতীত আনন্দিত হইয়া স্বতঃস্ফূর্ত মনে স্বদেশে গমন করেন (আর-রাওদুল উনুফ, ১খ., পৃ. ৪২৮)।
আনাস (রা) হইতে আরও বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) মদীনা শরীফে আগমন করিলে আবু তালহা (রা) আমাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া গেলেন। তিনি বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আনাস বুদ্ধিমান বালক। তাহাকে আপনার খিদমতের জন্য রাখিতে পারেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মতিক্রমে তখন হইতে আমি তাঁহার খিদমতে থাকিতে লাগিলাম। সফরে, গৃহে, প্রবাসে আমি তাঁহার সাথী হইলাম। দীর্ঘ নয় বৎসর যাবত তাঁহার নিকট থাকা অবস্থায় কখনও তিনি আমাকে বলেন নাই, এই কাজ কেন করিয়াছ? ঐরূপ কেন কর নাই? তাঁহাকে আমার কাজে ত্রুটি নির্ণয় করিতে কখনও দেখি নাই (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পৃ. ৩৭)।
শিশুদিগকে স্নেহভরে হযরত রাসূলুল্লাহ (স) কখনও স্বীয় উরুর উপর বসাইতেন। এই প্রসঙ্গে 'উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা) হইতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (স) একদা আমাকে কোলে লইয়া তাঁহার এক উরুর উপর বসাইলেন এবং হাসান (রা)-কে অপর উরুর উপর বসাইলেন। এমতাবস্থায় তিনি দু'আ করিলেন: الهم ارحمهما فاني ارحمهما.
"হে আল্লাহ! আপনি তাহাদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, আমি তো তাহাদের উপর দয়া করিয়াছি” (বুখারী, বাবু ওয়াদইস সাবিয়িও 'আলাল-ফাখিযি, হাদীছ নং ৫৬৫৭)।
সালাত আদায়কালেও রাসূলুল্লাহ (স) শিশুদিগকে স্নেহ-মমতা প্রদর্শন করিয়াছেন, তাহাদিগকে কোলে লইয়াছেন। এই প্রসঙ্গে আবু কাতাদা (রা) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় কন্যা যায়নাবের শিশু কন্যা উমামাকে কৌলে রাখিয়া সালাত আদায় করিতেছিলেন। যখন তিনি দাঁড়াইতেন, তাহাকে কোলে তুলিতেন, আবার সিজদায় যাওয়ার সময় তাহাকে নামাইয়া রাখিতেন (ইমাম মুসলিম, আস-সাহীহ, বাবু জিওয়াযি হামলিস- সিবয়ানি ফীস-সালাতি, হাদীছ নং-৫৪৩)। শিশুদিগকে স্নেহ-মমতার সহিত তিনি দীন শিক্ষা দিতেন। এই প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত আছে, তিনি একদা উম্মুল মু'মিনীন হযরত মায়মুনা (রা)-এর গৃহে রাত্রিযাপন করিলেন। রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ (স) সালাত আদায় করিতে লাগিলেন। ইহাতে আবদুল্লাহও উৎসাহিত হইলেন এবং নবী করীম (স)-এর বাম দিকে আসিয়া সালাতে দাঁড়াইলেন। তখন তিনি (স) তাঁহার মাথায় সস্নেহে হাত রাখিয়া নিজের ডানপার্শ্বে তাহাকে দাঁড় করাইয়া দিলেন (ইমাম নাসাঈ, সুনান, বাবুল-ইমামাহ, মাওকাফুল ইমাম ইযা কানা মা'আহু সাবিয়্যুন ওয়া ইমরাআতুন)।
হযরত রাসূলুল্লাহ (স) বালকদিগকে খুবই ভালবাসিতেন, তাহাদিগকে আদর কবিয়া নিজের পার্শ্বে বসাইতেন। শৈশবকালে হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন জা'ফার, কণছাম ইব্‌ন আব্বাস ও উবায়দুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস একদা খেলা করিতেছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) উটের পিঠে আরোহণ করিয়া তাহাদের নিকট দিয়া যাইতেছিলেন। তিনি (স) তাহাদিগকে দেখিয়া উৎফুল্ল হইলেন এবং প্রথমে আবদুল্লাহ ইব্‌ন জা'ফারকে নিজের পাশে সওয়ারীতে বসাইলেন, ইহার পরে, কণছাম ও উবায়দুল্লাহকেও বাহনের উপরে তুলিয়া তাহাদিগকে স্নেহভরে আদর করিয়া আবার নামাইয়া দিলেন। ইহাতে এই শিশুরা খুবই প্রীত হইল (আল-ইসাবা ফী তাময়ীষিস সাহাবা, ৪খ., ৩৯৮)।
হযরত রাসূলুল্লাহ (স) সময়ে সময়ে শিশুদিগকে মমতার পরশে আপন করিয়া লইতেন। তাঁহার পবিত্র পরশ স্থায়ী নির্দশন হইয়াও কাহারও জীবনে চিরভাস্বর হইত। সাইব ইব্‌ন ইয়াযীদ নামক জনৈক সাহাবীর মাথায় চুল ও দাড়ির এক পার্শ্ব সাদা ও একপার্শ্ব কাল রং-এর ছিল। একদা তাঁহার মুক্তদাস 'আতা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনার চুল ও দাঁড়ির রং-এ এইরূপ বৈচিত্র্যের কোন কারণ আছে কি? সা'ইব (রা) বলিলেন, আমি শৈশবকালে একদা কতিপয় শিশুর সহিত খেলা করিতেছিলাম। হযরত রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের পাশ দিয়া গমন করিতেছিলেন। আমি তাঁহার নিকট আগমন করিলাম এবং ভক্তিভরে তাঁহাকে সালাম দিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমার উপরও সালাম, তুমি কে? আমি বলিলাম, সাইব ইবন ইয়াযীদ। তিনি (স) আমার মাথায় তাঁহার পবিত্র হাত বুলাইয়া দিলেন এবং বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে বরকত দান করুন। হযরত রাসূলুল্লাহ (স)-এর পরশ লাভে ধন্য আমার চুল-দাড়িগুলি সাদা হয় নাই, সর্বদা সেইগুলি সতেজ রহিয়া গিয়াছে। তাই এইগুলির একাংশ সাদা এবং অন্য অংশ কাল বর্ণের রহিয়াছে (দালাইলুন-নবৃওয়াত, ১খ., পৃ. ১৭৩)।
শিশুসুলভ আনন্দ করার জন্য হযরত রাসূলুল্লাহ (স) সুযোগ দিতেন, এমনকি সমবয়সীদের সহিত কিঞ্চিত মনোরঞ্জনেরও ব্যবস্থা করিতেন। উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, আমি হযরত রাসূলুল্লাহ (স)-এর ঘরে মেয়েদের সহিত খেলাধুলা করিতাম। আমার বান্ধবী হিসাবে তাহাদের অনেকেই আমার নিকট আসা-যাওয়া করিত। যখনই হযরত রাসূলুল্লাহ (স)- কে তাহারা দেখিত লজ্জাবনত হইয়া দ্রুত প্রস্থান করিত। নবী করীম (স) ইহাতে খুশী হইতেন। আবার তিনি (স) চলিয়া গেলে তাহারা পুনরায় হাজির হইত (আখলাকুন্নাবিয়্যি, পৃ. ১০৬)।
ঘরের সকলের প্রতি নবী করীম (স) অতন্ত স্নেহপরায়ণ ছিলেন। চাকর-বাকরদিগকেও তিনি স্নেহ করিতেন। হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, আমি একাধারে নয় বৎসর রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমত করিয়াছি। এই সুদীর্ঘ কালে আমার কাজ করা বা না করার ব্যাপারে তিনি কখনও কৈফিয়ত তলব করেন নাই, এমনকি কখনও ভর্ৎসনাও করেন নাই অর্থাৎ তিনি (স) কখনও নির্দয় আচরণ করেন নাই (পূর্বোক্ত বরাত, পৃ. ১০৮)।
হযরত রাসূলুল্লাহ (স) শিশুদিগকে স্নেহ করিতেন। হযরত সাইব ইবন ইয়াযীদ (রা) হইতে এই প্রসঙ্গে বর্ণিত হইয়াছে, একদা তিনি স্বীয় খালার সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গেলেন। তাঁহার খালা আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার বোনের এই ছেলেটি অসুস্থ। নবী করীম (স) তাহার মাথায় তাঁহার পবিত্র হাত বুলাইয়া দিলেন এবং তাহার জন্য বরকতের দু'আ করিলেন। ইহার পর তিনি উযূ করিলেন। সে তাঁহার উযূর পানি স্পর্শ করিল। সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর পশ্চাতে আসিয়া দাঁড়াইয়া তাহার মুহরে নবুওয়াত প্রত্যক্ষ করিয়া দেখিল যে, উহা চমকাইতেছে (ইমাম তিরমিযী, আল-জামি, আবওয়াবুল-মানাকিব রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাবু মা জাআ ফী খাতিমিন- নাবুওয়‍্যাতি, বাব-৪২, পৃ. ২০৫, হাদীছ নং ৩৭২৩)।
এই হাদীছ হইতে বুঝা যায়, শিশুদের সহিত প্রথমেই নবী করীম (সা) স্নেহ-মমতার মাধ্যমে আপন হইয়া যাইতেন। শিশুরা স্বাচ্ছন্দে তাঁহার নিকট ঘুরাফেরা করিত, কখনও তিনি কোন প্রকার কর্কশ আচরণ করিতেন না।
হযরত আনাস ইব্‌ন মালিক (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে থাকিয়া তাঁহাকে অত্যন্ত নিকট হইতে দেখার সুযোগ পাইয়াছেন। তাঁহার স্নেহ-মমতা সম্পর্কে তিনি বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু। তাঁহার কাছে কেহ কোন প্রয়োজনে আগমন করিলে তিনি তাহার জন্য কিছু না কিছু করিতেন, তাঁহার উপস্থাপিত বক্তব্যকে তিনি কাজে পরিণত করিতেন। তাঁহার নিকট সম্পদ থাকিলে তিনি উহা হইতে দানের ব্যাপারে কাহাকেও বারণ করিতেন না (কানযুল-উম্মাল, ৭খ, হাদীছ নং ১৮৪১০)।
রুগ্ন শিশুদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স) খুবই সদয় ছিলেন। এমনকি অসুস্থ অমুসলিম শিশুদিগকেও তিনি দেখিতে যাইতেন। এই প্রসঙ্গে হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, এক ইয়াহুদী বালক প্রায়ই রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট আসিত এবং তাহার খেদমত করিত। সে অসুস্থ হইয়া পড়িলে রাসূলুল্লাহ (সা) তাহাকে দেখিতে তাহার গৃহে গমন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) স্নেহভরে তাহাকে বলিলেন, তুমি ইসলাম গ্রহণ কর। ইহা শুনিয়া
বালকটি তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করিল (সহীহ বুখারী, বাব 'ইয়াদাতিল মুশরিক, হাদীছ নং ৫৩৩৩)। শিশুদের দুঃখে নবী করীম (স) বিশেষভাবে সান্ত্বনা দিতেন এবং এই স্নেহে তাহারা দুঃখ বিস্মৃত হইত। হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, আমার একটি ছোট ভাই ছিল যাহার নাম ছিল আবূ উমায়র। নুগায়র নামে তাহার একটি পোষা পাখী ছিল। পাখীটিকে হারাইয়া বিমর্ষ চিত্তে সে একদা কাঁদিতেছিল। হযরত রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে দেখিয়া বলিলেনঃ
يا ابا عمير ما فعل النغير . "ওহে আবূ উমায়র! তোমার নুগায়রটি কি করিল?" ইহাতে শিশু আবূ উমায়র খুব প্রীত হইল (যাখাইরুল-উকবা ফী মানাকি'বি যাবিল কুবা, ১খ., পৃ. ২১৯)।
রাসূলুল্লাহ (স) শিশুদিগকে স্নেহ-মমতা করিতেন এবং অন্যদিগকেও তাহা শিক্ষা দিয়াছেন। হযরত উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা) হইতে এই প্রসঙ্গে বর্ণিত হইয়াছে, একদা রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণের সহিত আলোচনাশেষে দাঁড়াইলেন, সাহাবীগণও তাঁহার সহিত দাঁড়াইলেন। নবী করীম (স)-এর নিকট একটি শিশুকে আগাইয়া দেওয়া হইল। শিশুটিকে তিনি তাঁহার ক্রোড়ে তুলিয়া লইলেন। ইহাতে শিশুর অভিভাবক তাঁহার সম্মানে শিশুটির থেকে কি আচরণ প্রকাশ হয় তাহা নিয়া খুবই চিন্তিত হইলেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হইয়া উঠিল। তখন সা'দ (রা) জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ। ইহা কি? তিনি (স) বলিলেন, ইহা মহান আল্লাহর রহমতেরই প্রতিফলন, মহান আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা করেন তাহার অন্তরেই শুধু ইহা ঢালিয়া দেন। মহান আল্লাহ তাঁহার বান্দাদের মধ্যে শুধু দয়া ও মমতার অধিকারী ব্যক্তিগণের প্রতি দয়া প্রদর্শন করিয়া থাকেন (ইমাম বুখারী, আল-জামি আস-সাহীহ, কিতাবুল মারদা, বাব ইয়াদাতিস-সিয়ান, হাদীছ নং ৫৩৩৩)। শিশুদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র পরশ ও আদর-মমতার কথা সাহাবীগণ স্মরণ করিয়া উৎফুল্ল হইতেন। হযরত জাবির ইবন সামুরা (রা) হইতে বর্ণিত, একদা একদল শিশু রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া ছোটাছুটি করিতে লাগিল। কেহ তাঁহার চেহারা মুবারক স্পর্শ করিল, আবার কেহ তাঁহার দুই পার্শ্ব স্পর্শ করিল। আমিও তাঁহার মমতা লাভের উদ্দেশ্যে নিকটে আসিলাম। তিনি আমার গালে মমতাভরে হাত বুলাইলেন। তিনি আমার মুখমণ্ডলের যেই পার্শ্ব স্পর্শ করিয়াছিলেন উহা চিরদিন অপর পার্শ্ব হইতে সুন্দর ও তুলতুলে রহিয়া গেল (দালাইলুন-নুবৃওয়াহ, ১খ., পৃ. ১৭৩)।
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মমতার বদৌলতে তাৎক্ষণিকভাবে অনেকে আরোগ্যও লাভ করিতেন। হযরত জারহাদ আল-আসলামী (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিলেন, তাঁহার সম্মুখে আহার প্রস্তুত ছিল। তিনি (জারহাদ) বাম হাত বাড়াইয়া গ্রহণ করিতে চাহিলেন। তিনি বলিলেন, তুমি ডান হাতে খাও। জারহাদ বলিলেন, হে রাসূলুল্লাহ! আমার ডান হাত রোগাক্রান্ত। নবী করীম (স) তাঁহার ডান হাতে ফুঁ দিলেন। ইহার
পর হইতে কয়েক বৎসর পর্যন্ত আর কখনো তাঁহার হাতে অসুবিধা দেখা যায় নাই (দালাইলুন-নুবৃওয়াহ, ৯খ., পৃ. ১৭৩)।
হযরত আবু যায়দ (রা) বলেন, শৈশবকালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আমি আগমন করিলাম। তিনি (স) বলিলেন, তুমি কাছে আস। আমি নিকটবর্তী হইলে তিনি আমার পিঠ মুছিয়া দিলেন। ইহার পর আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর পিঠ মুবারক মুছিতে লাগিলাম। ইহাতে তিনি হাসিতে লাগিলেন (আত-তারাতীবুল- ইদারিয়‍্যা ১খ., পৃ. ৩৮)।
হযরত বাশীর ইবন 'আকরাবা আল-জুহানী (রা) বলেন, আমার পিতা উহুদ যুদ্ধে শাহাদাত লাভ করিলে আমি কাঁদিতে লাগিলাম এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট আসিলাম। তিনি আমাকে বলিলেন, তোমাকে কোন্ দুঃখ কাঁদাইতেছে? তুমি কি এই ব্যাপারে খুশী হইবে না যে, আমি তোমার পিতা, আইশা তোমার মাতা। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া দিলেন। তাহার মাথায় যে অংশে নবী করীম (স)-এর হাত মুবারকের ছোঁয়া লাগিয়াছিল সেখানকার চুলগুলি বৃদ্ধাবস্থায়ও সতেজ ছিল, সেইগুলি কখনও সাদা হয় নাই।
তিনি কিছুটা তোতলাইয়া কথা বলিতেন, নবী করীম (স) নিজ মুখের থু থু তাঁহার মুখে দিলেন, সঙ্গে সঙ্গে তাহার তোতলাভাব দূরীভূত হইয়া গেল। নবী করীম (স) আবার বলিলেন, বলতো তোমার নাম কি? আমি বলিলাম, বুজায়র। তিনি বলিলেন, বরং এখন হইতে তোমার নাম বাশীর (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৯)।
রাসূলুল্লাহ (স) স্নেহ-মমতার মাধ্যমে শিশুদিগকে খুবই কাছে টানিয়া লইতেন এবং বিশেষভাবে দু'আ করিতেন, যাহার ফল তাঁহারা বয়োবৃদ্ধকালেও ভোগ করিতেন। হযরত আমর ইনুল-হুমক আল-খুযাঈ (রা) হইতে বর্ণিত। একদা তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে কিছু দুধ আনিয়া দিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (স)-দু'আ করিলেন: اللَّهُمَّ مَتِّعَهُ بِشَبَابِهِ
"হে আল্লাহ! তাহার যৌবনকে আপনি (স্থায়ীভাবে) উপভোগ করার সুযোগ প্রদান করুন"। দীর্ঘ আশি বৎসর বয়স হইলেও তাহার একটি চুল-দাড়িও শুভ্র বর্ণ ধারণ করে নাই (পূর্বোক্ত দালাইল, পৃ. ১৭৩)।
আবূ যায়দ আল-আনসারী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমার মাথায় ও দাড়িতে মমতাবশে স্বীয় হাত বুলাইলেন, তাহার পর দু'আ করিলেন, 'হে আল্লাহ! আপনি তাহাকে সৌন্দর্য প্রদান করুন'। তাহার পর তিনি দীর্ঘ হায়াত লাভ করেন, এমনকি এক শত বৎসরের বেশী বয়সে তাঁহার কোন দাড়িতে শুভ্রতা দেখা যায় নাই। অর্থাৎ নবী করীম (স)-এর মমতার পরশ তাঁহার শরীরে চিরস্থায়ী হইয়া রহিল (ইমাম সুয়ূতী, কিফায়াতুত- তালিবিল-লাবীব ফী খাসাইসিল হাবীব, ২খ., পৃ. ১৩৯)।
নবী করীম (স) কাহারও বিপদের সময়ে স্নেহ-মমতার কোমল স্পর্শ দান করিতেন। তাঁহার মমতায় দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তি নিজেকে হালকা ও স্বাভাবিক মনে করিত। রাসূলুল্লাহ (স) জা'ফার ইব্‌ন আবী তালিব (রা)-এর ইয়াতীম সন্তানদের মাথায় নিজের হাত বুলাইয়া দেন। মুহাম্মাদ ও
আবদুল্লাহ ইব্‌ন জা'ফার (রা) যখন পিতার শাহাদাতের সংবাদ শুনিয়া শোকবিহল হইলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে স্নেহ-মমতায় বুকে জড়াইয়া ধরিলেন এবং বলিলেন, "আমি দুনিয়া ও আখিরাতে তাহাদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করিলাম" (আত-তারাতীবুল ইদারিয়্যা, ২খ., পৃ. ২৩৮)।
সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র পরশে স্নেহধন্য হইতেন। তাঁহাদের নিকট এই স্মৃতি চিরস্থায়ী হইত। কেহ কেহ এই স্মৃতিকে ধারণ করণার্থে ব্যতিক্রমী কার্যও করিতেন। সাফিয়্যা বিন্ত বাহ্রা (রা) বলেন, হযরত আবূ মাহনূর (রা) বসিলে তাঁহার চুলের একাংশ মাটি স্পর্শ করিত। তাঁহার এই দীর্ঘ চুলের ব্যাপারে আমি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি উত্তর দিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমার মাথায় শৈশবে হাত বুলাইয়া ছিলেন। তাঁহার পবিত্র পরশ সমৃদ্ধ চুলগুলি আমি কাটি নাই, তাই তাহা দীর্ঘ হইয়াছে (আখবার মাক্কা ফী কপদীমিদ- দাহরি ওয়া হপদীছিহী, ২খ., পৃ. ১৪০)।
ইয়াতীমদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স) খুবই স্নেহ-মমতা প্রদর্শন করিতেন। ইয়াতীমের রক্ষণাবেক্ষণে তিনি ইরশাদ করিয়াছেন:
انا وكافل اليتيم كهاتين في الجنة
"আমি ও ইয়াতীমের অভিভাবক জান্নাতে এইভাবে (তাঁহার দুই আঙ্গুল একত্র করিয়া দেখাইলেন) থাকিব।” অর্থাৎ ইয়াতীমের প্রতি সদাচরণ করিয়া যদি কেহ তাহাদের লালন- পালন করে তাহা হইলে সে জান্নাতে থাকিতে পারিবে (আবূ দাউد, কিতাবুল আদাব, باب في من ضم اليتيم ,হাদীছ নং ৫১৫০)।
অনাথ শিশুদের সম্পদের ক্ষেত্রেও রাসূলুল্লাহ (স) অত্যন্ত মমতাপূর্ণ উদার নীতি নির্ধারণ করিয়াছেন। তিনি ইয়াতীমের অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলিয়াছেন:
الا من ولى يتيما له مال فليتجر فيه ولا يتركه حتى تاكله الصدقة
"সাবধান! কোন ব্যক্তি যদি সম্পদশালী ইয়াতীমের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করে, সে যেন তাহার সম্পদের দ্বারা ব্যবসা-বাণিজ্য করে, সম্পদ ফেলিয়া না রাখে; অন্যথা যাকাত সম্পদকে গ্রাস করিয়া ফেলিবে” (তিরমিযী, বাব মা জাআ ফী যাকাতি মালিল-ইয়াতীম, হাদীছ নং ৬৩৬)।
শিশুদিগকে যত্নের সহিত লালন-পালনের পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ (স) বিশেষভাবে তাহাদের জন্য দু'আ করিতেন। এই প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) হাসান ও হুসায়ন (রা)-এর জন্য পানাহ চাহিয়া দু'আ করিতেন:
اعيذ كما يكلمات الله التامة من كل شيطان وهامة ومن كل عين لامة
"আল্লাহর পূর্ণ বাণীসমূহ দ্বারা তোমাদের উভয়ের জন্য শয়তান ও হিংসুকের অনিষ্ট হইতে আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি এবং প্রতিটি ক্ষতিকর দৃষ্টি হইতে পানাহ চাহিতেছি।”
ইহার পর জানাইলেন, তোমাদের পূর্বপুরুষ পিতা ইবরাহীম ও স্বীয় দুই' পুত্র 'ইসমাঈল ও ইসহাকের জন্যও এই দু'আ করিতেন” (আল-আযকারুন নাবাবিয়্যা باب ما يعوذ به الصبيان وايرهم, হাদীছ নং ৩৪২)।
শিশুদের প্রতি অভিভাবকদের সতর্ক দৃষ্টি রাখিতে রাসূলুল্লাহ (স) নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন। জাবির (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করিয়াছেন : كفوا صبيانكم عند العشاء فان للجن انتشارا وحفظة .
"তোমরা সন্ধ্যার সময় তোমাদের শিশুদিগকে আটকাইয়া রাখ। কেননা জিন জাতি এই সময়ে ছড়াইয়া পড়ে ও ক্রোধান্বিত থাকে” (কানযুল উম্মাল, ১৬খ., হাদীছ নং ৪৫৩১৬)।
শিশুদিগকে যত্নের সহিত লালন-পালন প্রসঙ্গে আনাস (রা) হইতে বর্ণিত। নবী করীম (স) ইরশাদ করিয়াছেন : من عال جاريتين حتى تبلغا جاء يوم القيامة انا وهو كهاتين
“যে ব্যক্তি বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত দুইটি কন্যা সন্তানের লালন-পালন করিবে, সে এবং আমি কিয়ামতের দিন এইরূপ অর্থাৎ খুব নিকটে থাকিব" (মুসলিম, বাবু ফাদলিল ইহসান ইলাল-বানাত, হাদীছ নং ১৪৯)।
শিশু ছেলে বা মেয়ে যাহাই হউক, তাহাদের প্রতি মমতাপূর্ণ আচরণ করার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে হযরত 'আইশা সিদ্দীকা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি (স) বলিয়াছেন : ان اولادكم من كسبكم وهبه الله لكم يهب لمن يشاء اناثا ويهب لمن يشاء الذكور .
"নিশ্চয় তোমাদের সন্তান-সন্ততি তোমাদের উপার্জিত ধন। আল্লাহ তাহা তোমাদিগকে দান করিয়াছেন। তিনি যাহাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন, আর যাহাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন" (মুল্লা 'আলী আল-কপরী, শারহু মুসনাদি আবী হানীফা, বাব ان اولادكم من كسبكم
শিশু সন্তানের লালন-পালন প্রক্রিয়া এবং ইহাতে ছেলে-মেয়েদের জন্য বিশেষ নীতি রাসূলুল্লাহ (স) শিক্ষা দিয়াছেন। আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি (স) ইরশাদ করিয়াছেন : من كانت له انثى فلم يئدها ولم يهنها ولم يؤثر عليها (قال يعني الذكور) ادخله الجنة .
"যাহার কন্যা সন্তান রহিয়াছে তাহাকে সে জীবন্ত কবরস্থ করে নাই এবং তাহাকে অপমানও করে নাই, তাহার উপর ছেলে সন্তানকেও অগ্রাধিকার দেয় নাই, আল্লাহ তাহাকে জান্নাতে প্রবেশ করাইবেন” (আবূ দাউদ, বাব নং ১৩০, হাদীছ নং ৫১৪৬)।
নবী করীম (স) কন্যা সন্তানের প্রতি অত্যধিক মমতা প্রদর্শন করিতেন। জাহিলী যুগে কন্যাদিগকে হেয় ও লাঞ্ছিত করা হইত। আর রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের প্রতিপালনের সম্পর্কে বলিয়াছেন:
من عال ثلاث بنات فأدبهن وزوجهن واحسن اليهن فله الجنة . “যেই ব্যক্তির তিনটি কন্যা সন্তান রহিয়াছে, সে তাহাদিগকে লালন-পালন করিয়া শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়াছে ও বিবাহ দিয়াছে এবং সে তাহাদের প্রতি মমতা প্রদর্শন করিয়াছে, তাহার জন্য জান্নাত” (আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা) কর্তৃক বর্ণিত—আবু দাউদ, কিতাবুল আদাব, হাদীছ নং ৫১৪৭)।
বালকদিগকে স্নেহের পরশে রাসূলুল্লাহ (স) হাত বুলাইয়া দিতেন এবং বিশেষভাবে দু'আ করিতেন। যেমন হযরত 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন 'আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, নবী করীম (স) আমার বক্ষে তাঁহার হাত মুছিয়া দু'আ করিলেন : ا اللهم علمه الحكمة
"হে আল্লাহ! আপনি তাহাকে প্রজ্ঞা শিখাইয়া দিন” (বুখারী, হাদীছ নং ৩৫৪৬)।
বালকদিগকে স্নেহভরে রাসূলুল্লাহ (স) সালাম প্রদান করিতেন। আনাস (রা) বলেন, আমি একদা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত পথ চলিতেছিলাম। কিছু সংখ্যক শিশু দেখিয়া তিনি (স) তাহদিগকে সালাম দিলেন (তিরমিযী, বাব মা জাআ ফীত- তাসলীম 'আলাস-সিবয়ান, হাদীছ নং ২৮৩৭)।
অন্য বর্ণনায় বালকদের খেলারত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে সালাম দিলেন (আবু দাউد, হাদীছ নং ৫২০২)।
রাসূলুল্লাহ (স) স্নেহভরে শিশুদিগকে কোলে তুলিয়া লইতেন, কখনও বা ঘাড়ে চড়াইতেন। এই প্রসঙ্গে বারাআ ইব্‌ন 'আযিব (রা) বলেন, আমি একদা হাসান ইব্‌ন আলী (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ঘাড়ের উপর উপবিষ্ট দেখিতে পাইলাম। নবীজী (স) তখন বলিতেছিলেনঃ
اللهم اني احبه فاحبه “হে আল্লাহ! আমি তাহাকে ভালবাসি, তাই আপনিও তাহাকে ভালবাসুন।” (বুখারী, কিতাবু ফadailis সাহাবা, বাব মানাকি বিল হাসান ওয়াল-হুসায়ন, হাদীছ নং ৩৫৩৯)।
হযরত রাসূলুল্লাহ (স) শিশুদিগকে স্নেহভরে চুম্বন করিতেন। তিনি হাসান ও হুসায়ন (রা) সম্পর্কে বলিয়াছেন:- هما ريحانتاى من الدنيا "তাহারা দুইজন পৃথিবীতে আমার সুগন্ধ" (পূর্বোক্ত, হাদীছ নং ৩৫৪৩)।
মমতার সম্পূর্ণ ব্যবহার ও ব্যাপক অবস্থান সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন:
الراحمون يرحمهم الرحمن ارحموا من في الارض يرحمكم من في السماء الرحم شجنة من الرحمن فمن وصلها وصله الله ومن قطعها قطعه الله
"দয়ালুদের প্রতি দয়াময় আল্লাহ দয়া করেন। পৃথিবীবাসীর প্রতি তোমরা দয়া কর, তাহা হইলে আকাশবাসী (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়াপরবশ হইবেন। রহম শব্দটি রহমান শব্দ হইতে নির্গত। যে আত্মীয়তা বজায় রাখে সে আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করে। আর যে ব্যক্তি তাহা ছিন্ন করে আল্লাহ তাহাকে ছিন্ন করিয়া দেন" (তিরমিযী, বাব মা জা'আ ফী রাহমাতিন্নাস, হাদীছ নং ১৯৮৯)।
শিশুরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর কোলে পেশাব করিয়া দিলে তিনি উহা সহজে পবিত্র করিয়া লইতেন। তিনি শিশুদিগকে কোনরূপ কষ্ট দিতেন না। হযরত আইশা (রা) হইতে বর্ণিত: একদা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট একটি শিশু আনা হইলে শিশুটি তাঁহার কাপড়ে পেশাব করিয়া দিল। তিনি পানি আনাইলেন এবং কাপড়ে পানি ঢালিয়া তাহা পবিত্র করিয়া নিলেন (বুখারী, বাব বাওলিস সিবয়ান, হাদীছ নং ২২০)।
শিশুদিগকে তিনি মমতাভরে কোলে নিতেন। শিশুরা তাঁহার নিকট আসিতে খুবই আনন্দ পাইত। উম্মু কায়স বিন্ত মিহসান (রা) হইতে বর্ণিত: তাহার শিশু পুত্রকে লইয়া তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে আদর করিয়া কোলে বসাইলে শিশুটি তাঁহার পরিধেয় বস্ত্রে পেশাব করিয়া দিল। তিনি সেই স্থানে কিছু পানি ঢালিয়া দিলেন (পূর্বোক্ত, হাদীছ নং ২২১)।
শিশুদের অসুবিধা যাহাতে না হয় সেইজন্য রাসূলুল্লাহ (স) সালাতের কিরাআত দীর্ঘ করিতেন না। আবু কাতাদা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: اَنّى لأَقُوْمُ فِى الصَّلوةِ اُرِيْدُ أَنْ أُطَوِّلَ فِيْهَا فَاسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِىَّ فَاتَجَوَّزُ فِيْ صَلاتِى كَرَاهِيَةَ اَنْ أَشُقَّ عَلى أُمِّهِ .
"আমি সালাতে দাঁড়াইলে উহা দীর্ঘ করিয়া আদায় করিবার ইচ্ছা করি। কিন্তু যখন আমি শিশুর কান্না শুনিতে পাই তখন আমার সালাতকে সংক্ষিপ্তভাবে আদায় করি যাহাতে শিশুর মাতার কষ্ট না হয়" (বুখারী, বাব মান আখাফ্ফাস সালাতা 'ইনদা বুকাইস সাবিয়্যি, হাদীছ নং-৬৭৫)।
রাসূলুল্লাহ (স) শিশুদেরকে চুম্বন করিতেন এবং তাহাদিগকে নাকের কাছে নিতেন। আনাস (রা) হইতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় পুত্র ইবরাহীমকে কোলে নিলেন, ইহার পর তাহাকে চুম্বন করিলেন এবং তাহাকে শুকিলেন (পূর্বোক্ত, হাদীছ নং ৫৬৪৮, বাব রাহমাতিল ওয়ালাদি ওয়া তাকবীলিhi ওয়া মু'আনাকাতিহি)।
শিশুদেরকে স্নেহ করার প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা) গুরুত্ব দিতেন। তৎসঙ্গে বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করারও নিদের্শ দিয়াছেন। আনাস ইবন মালিক (রা) হইতে বর্ণিত: একদা এক বৃদ্ধ রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দরবারে আসিয়া তাহার নিকট যাইতে চাহিল। কিন্তু লোকজন তাহাকে যাওয়ার পথ করিয়া দিল না। তখন তিনি (স) বলিলেন:
হবরত মুহাম্মাদ (স) ১০৫
লَيْسَ مِنَّا مَنْ لَّمْ يُجِلَّ كَبِيْرَنَا وَيَرْحَمْ صَغِيْرَنَا
"যাহারা বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে না এবং ছোটদেরকে স্নেহ করে না তাহারা আমাদের দলভুক্ত নহে" (আবু দাউদ, কিতাবুল আদাব, বাব ফী রাহমাতিন্নাছ, হাদীছ নং ৪২৯৬)।
রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন সকল মানবজাতির প্রতি দয়া ও মমতার প্রতীক। সমগ্র সৃষ্টি জগতে তাঁহার মত দয়া ও মমতার অধিকারী আর কেহই ছিল না। তাঁহার পরশ লাভ করিয়া সকল ধরনের মানুষ শান্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করিত। শুধু মুসলিম জাতিই নয়, অন্যান্য ধর্মাবলম্বীও তাঁহার দয়া ও মমতার পরশ লাভ করিয়াছে। এমনকি পশুপাখি, জীবজন্তুও তাঁহার দয়া ও মমতার ছায়ায় শান্তি উপভোগ করিয়াছে।
একদিন রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণকে সঙ্গে লইয়া মদীনার উপকণ্ঠ হইতে ফিরিয়া আসিতেছিলেন। পথিমধ্যে কয়েকটি খেজুর গাছ ছিল। তিনি সেইগুলি হইতে কিছু খেজুর আহরণ করিলেন। সেই স্থানেই কিছু ছোট ছোট শিশু খেজুরগুলি খাইতেছিল। তিনি তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি আমাকে ভালবাস? তাহারা বলিল, হ্যাঁ। তিনি বলিলেন, আমিও তোমাদেরকে ভালবাসি। তারপর তিনি তাহাদেরকে সেই খেজুরগুলি দিলেন। শিশুরা আনন্দে উৎফুল্ল হইল।
একবার হযরত আয়েশা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আখলাক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি বলেন, তাঁহার আখলাক ছিল আল-কুরআন। তিনি আরও বলেন, "রাসূলুল্লাহ (স) কখনও নিজ হাতে কোন ব্যক্তিকে প্রহার করেন নাই। হ্যাঁ, যদি তিনি জিহাদ করিতেন তাহা হইলে ভিন্ন কথা। কোন মহিলাকে অথবা কোন খাদেমকে তিনি কখনও প্রহার করেন নাই" (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফাদাইল, বাব ২০, হাদীছ ২৩২৮)।
একদা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জনৈক ব্যক্তি আগমন করিয়া জানাইল যে, তাহার পিতা বৃদ্ধ হইয়া গিয়াছেন। তিনি নিজের কাজ নিজে করিতে পারেন না। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন, পিতা তোমার জান্নাত ও জাহান্নাম। অর্থাৎ পিতার খিদমত করার মাধ্যমে জান্নাত অর্জন করিতে পারিবে, আর তাঁহার নাফরমানীর মাধ্যমে জাহান্নামে যাইবে। অন্য বর্ণনায় আসিয়াছে: সে তোমার মধ্যম দরজা। যদি তুমি ইচ্ছা কর তাহা হইলে উহাকে নষ্ট করিতে পারো, আর যদি তুমি ইচ্ছা কর তাহা হইলে উহাকে সংরক্ষণ করিতে পারো" (তিরমিযী, আবওয়াবুল বির ওয়াস-সিলা, বাব মা জাআ ফী ফাদলিল ওয়ালদিন, হাদীছ ১৯০১)।
বৃদ্ধ পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করিতে রাসূলুল্লাহ (স) নির্দেশ দিয়াছেন। তিনি বলেন, "পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার কর, তাহা হইলে তোমাদের সন্তানরাও তোমাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করিবে" (আল-মু'জামুল আওসাত, ২খ., পৃ. ৫৯৯, হাদীছ ৪৭৪৭)।
রাসূলুল্লাহ (স) কেবল ওয়াজ-নসীহত ও উপদেশের মাধ্যমে এই গুণের শিক্ষা দেন নাই, বরং তাঁহার পবিত্র জীবনে ইহার বাস্তব উদাহরণ ও অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন। ছোটদের প্রতি তাঁর স্নেহ, ভালবাসা, দয়া ও মমতার অগণিত ঘটনা হাদীছ ও সীরাত গ্রন্থে বর্ণিত হইয়াছে।
তিনি বৃদ্ধ ও প্রবীণদের সম্মান প্রদর্শন করিতেন। এমন কি সাহাবীগণ বৃদ্ধদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মান প্রদর্শনের ঘটনা ব্যক্ত করিয়াছেন। হযরত আনাস (রা) বলেন, একদা এক বৃদ্ধ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলেন। তখন সাহাবীগণ তাঁহার জন্য স্থান তৈরি করিতে কিছুটা বিলম্ব করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "যাহারা ছোটদের প্রতি স্নেহ-মমতা প্রদর্শন করে না এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করে না, তাহারা আমাদের দলভুক্ত নহে" (আল-জামি লি-তিরমিযী, প্রাগুক্ত)।
সকল উম্মতের জন্যই তিনি অত্যন্ত মমতার স্বাক্ষর রাখিয়াছেন, এমনকি শারী'আতের বিধানগুলি যাহাতে দুর্বল উম্মতের জন্য কষ্টসাধ্য না হয় সেইজন্যও তিনি ছিলেন অত্যন্ত চিন্তিত। আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য মসজিদে নববীতে রাত্রিতে একটি পর্দা করিয়া দেওয়া হইত। তিনি তাহাতে সালাত আদায় করিতেন। দেখিতে দেখিতে অনেক সাহাবী গভীর রাত্রিতে মসজিদে একত্র হইতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুকরণে তাঁহারাও সালাত আদায় করিতেন। এক রাত্রে তিনি সাহাবীদের দিকে ফিরিয়া দেখিলেন, তাহারা অধিক সংখ্যক উপস্থিত হইয়াছেন। তখন তিনি বলিলেন:
ايها الناس عليكم بما تطيقون من الاعمال فان الله عز وجل لا يمل حتى تملوا وان خير الاعمال ما دووم عليها وان قل (ثم قال ما منعني من ان اصلى ههنا الا اني اخشى ان ينزل على شئ لا تطيقونه
“ওহে লোকেরা! তোমরা সামর্থ্য অনুসারে আমল কর। তোমরা অপারগ না হওয়া পর্যন্ত মহামহিম আল্লাহ (তোমাদের প্রতিদান প্রদানে) অপারগ হন না। মহিমান্বিত আল্লাহ ততক্ষণ পূর্ণরূপে কার্য গ্রহণ করেন না যতক্ষণ না তোমরা পূর্ণ কর। উত্তম কর্মরূপে তাহাই স্বীকৃত যাহা অল্প হইলেও অনবরত করা যায়। রাসূলুল্লাহ (স) আরো বলিলেন, এইখানে তোমাদের কাছে আসিয়া সালাত আদায়ে আমাকে অন্য কিছু বিরত রাখে নাই। আমি শুধু মনে মনে ভয় করিয়াছি, (তোমাদের উৎসাহে) আমার উপর এমন নির্দেশের অবতরণ হয় যাহা পালন করিতে তোমাদের সামর্থ্য থাকিবে না” (আখলাকুন্নাবী (স), পৃ. ৪৬৩)।
মযলুমের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রেও রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন অত্যন্ত মমতাময়। মযলুম ব্যক্তি সহজেই স্বীয় অধিকার লাভে তাঁহার সহযোগিতা পাইত। একদা আবু জাহল জনৈক ব্যক্তির নিকট হইতে একটি উট ক্রয় করিবে বলিয়া তাহাকে লইয়া গেল, অথচ কোন মূল্য পরিশোধ করিল না। লোকটি দাঁড়াইয়া বলিতে লাগিল, হে কুরায়শ সম্প্রদায়। আমার প্রাপ্য আদায় করিয়া দেওয়ার মত তোমাদের মধ্যে কোন লোক আছেন কি? তাহারা লোকটিকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট যাইতে বলিল। কাফিররা বিষয়টি লইয়া উপহাস করিতে উদ্যত হইল। রাসূলুল্লাহ (স) উহা শুনিয়া লোকটিকে সাথে লইয়া আবু জাহলের গৃহদ্বারে পৌছিয়া উহা খট খট করিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) আবূ জাহলের উদ্দেশ্যে বলিলেন, লোকটির পাওনা আদায় করিয়া দাও। সে বলিল, হাঁ এখনই পরিশোধ করিতেছি। লোকটির অধিকার দেওয়ার পর অন্যরা তাহাকে বলিল, আবু জাহল! তুমি কেন এত সহজেই পাওনা পরিশোধ করিয়া দিলে? সে বলিল, আমি তখন আমার মাথার উপর প্রকাণ্ড উটের একটি মুখ হা করিয়া থাকিতে দেখিয়াছি। আমি দিতে অস্বীকার করিলে ভয় হইতেছিল, উহা আমাকে গিলিয়া ফেলিবে। এইভাবে রাসূলুল্লাহ (স) ঝুঁকি লইয়া দুর্বলের অধিকার প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন এবং মযলুমের আশ্রয়স্থল হিসাবে পরিগণিত
হইয়াছেন। পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে সকলেই তাঁহার মমতার পরশে ধন্য হইত (ওয়াসীলাতুল ইসলাম বিন্নাবিয়্যি 'আলায়হিস সালাতু ওয়াসসালাম, ১খ., পৃ. ১২৮)।
সব ধরনের লোকজনের বিপদাপদে রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্নেহ-মমতার পরশ সর্বদা অবারিত থাকিত। একদা এক মাতা স্বীয় পুত্রকে লইয়া তাঁহার নিকট আগমন করিলেন এবং বলিলেন, ছেলেটির জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পাইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) কুলি করিয়া সামান্য পানি পাত্রে দিলেন এবং বলিলেন, তাহাকে এই পানি পান করাও। মাতা শিশুকে তাহা পান করাইলে ক্রমে ছেলেটি লোকজনের মধ্যে অন্যতম জ্ঞানী হিসাবে পরিগণিত হইল। এই প্রসঙ্গে উতবা ইব্‌ন ফারকাদ (রা) হইতে বর্ণিত : একদা আমার শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হইল। আমি তখন হযরত রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গমন করিলাম। তিনি আমার হাতে তাঁহার মুখ নিঃসৃত থু থু দিলেন এবং আমার পিঠে ও পেটে মুছিয়া দিলেন, তৎক্ষণাৎ আমার ব্যথা দূরীভূত হইয়া গেল। এতদ্ব্যতীত মিশক আম্বর হইতেও সুগন্ধ সর্বদা আমার শরীর হইতে বহিতে লাগিল (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩২)।
মৃত মু'মিনের দাফনের পরও রাসূলুল্লাহ (স) মমতাপূর্ণ দু'আ করিয়া তাহার পরকালীন শাস্তি সুনিশ্চিত করিতেন। এই প্রসঙ্গে উছমান ইব্‌ন আফফান (রা) হইতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (স) কোন মৃত্যের দাফনকার্য হইতে অবসর হইয়া বলিতেন :
استغفروا لاخيكم واسئالوا له التثبيت فانه الآن يسأل "তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য (আল্লাহর নিকট) ক্ষমা প্রার্থনা কর। সে এখন প্রশ্নের সম্মুখীন হইবে। তাই তাহার জন্য দৃঢ় থাকার দু'আ কর” (রিয়াদুস-সালিহীন, কিতাবু 'ইয়াদাতিল মারীদ, বাবুদ-দু'আ লিল-মায়্যিত বা'দা দাফানিহি ওয়াল-কুউ ইনদা কণবরিহি, হাদীছ ৯৪৬)।
রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন অত্যন্ত মমতাময়। তিনি তাঁহার কারণে কাহারও সামান্য অসুবিধা হওয়াও পছন্দ করিতেন না। হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ (স) আবূ আয়্যুব আল-আনসারী (রা)-এর আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। তিনি ঘরের নিচতলায় থাকা পছন্দ করিলেন আর আবূ আয়্যব (রা)-কে পরিজনসহ উপর তলায় অবস্থান গ্রহণ করিতে বলিলেন। সেখানে হঠাৎ পাত্র হইতে কিছু পানি পড়িয়া গেল। ইহাতে আবূ আয়্যব (রা) ও তাঁহার স্ত্রী চিন্তিত হইয়া পড়িলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর কোনরূপ অসুবিধা হইতেছে কিনা তাহা দেখিতে উভয়ে নিচের কক্ষে অবতরণ করিলেন। তখন তাহারা ছিলেন ভীত ও বিমর্ষ। তাহারা আসিয়া বলিতে লাগিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের আপনার উপরের তলায় রাত্রিতে অবস্থান করাটাতো উচিৎ বলিয়া মনে হইতেছে না। তাহার এই বক্তব্যে রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় সরঞ্জামাদি স্থানান্তর করিয়া লইতে বলিলেন। তাঁহার সরঞ্জামাদিও ছিল খুবই স্বল্প (কিতাবু দালাইলিন- নুবৃওয়াহ, ১খ., পৃ. ৪৬০)।
রাসূলুল্লাহ (স) সাধারণভাবেই ছিলেন সকলের প্রতি মমতাময়। তিনি গভীরভাবে অসুবিধা হওয়ার দিকগুলি চিন্তা করিতেন এবং তাঁহার প্রতিনিধিগণকে তাহা জানাইয়া দিতেন। এই প্রসঙ্গে মু'আয ইব্‌ন জাবাল (রা) হইতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ইয়ামানের গভর্ণর হিসাবে প্রেরণের প্রাক্কালে বলিয়াছেন-
يا معاذ اذا كان في الشتاء فغلس بالفجر واطل القراءة قدر ما يطيق الناس ولا تملهم فاذا كان الصيف فاسفر بالفجر فالليل قصير والناس ينامون فامهلهم حتى يدار كوا
"ওহে মু'আয! শীতকালে ফজরের সালাত অন্ধকার থাকিতেই আদায় করিও, কিরা'আত মানুষের সহনীয় পরিমাণ দীর্ঘ করিও, তাহাদিগকে বিরক্ত করিও না এবং গ্রীষ্মকালে ফজর ফর্সা হইলে আদায় করিও। কেননা তখন রাত অপেক্ষাকৃত স্বল্প দীর্ঘ হয় এবং লোকজন ঘুমাইয়া থাকে। তাই তাহাদিগকে সুযোগ দিও যাহাতে তাহারা স্বচ্ছন্দে সালাতের জামা'আতে শামিল হইতে পারে" (আখলাকুন্নাবিয়্যি (সা), পৃ. ৪৫১)।
উপস্থিতি ক্ষেত্রেও কাহারো কোন অসুবিধা দেখিলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহার সমস্যা নিরসন করিতেন। এই সম্পর্কে আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী (রা) হইতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (স) একদা সাহাবীগণকে সঙ্গে লইয়া সফরে রওয়ানা হইতেছিলেন। সেই সময় সওয়ারী এক ব্যক্তি আসিয়া ডানে ও বামে বিক্ষিপ্তভাবে তাকাইতেছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যাহার নিকট অতিরিক্ত বাহন আছে সে যেন বাহন দ্বারা অন্য লোককে উপকৃত করে। যাহার নিকট অতিরিক্ত খাদ্য রহিয়াছে সে যেন তাহা এমন লোককে দেয় যাহার খাদ্য নাই। এরপর তিনি আরো কয়েকটি সম্পদের উল্লেখ করিলেন। ইহাতে আমাদের ধারণা হইল যে, অতিরিক্ত কোন সম্পদ রাখিবার অধিকার কাহারো নাই (রিয়াদুস-সালিহীন, কিতাবু আদাবিস-সাফার, হাদীছ ৯৬৯)।
সর্বোপরি রাসূলুল্লাহ (স) নিজ উম্মতের জন্য অত্যধিক মমতাময় ও উদারচিত্তের ধারক ছিলেন। তিনি তাঁহার সর্বস্ব গুনাহগার উম্মাতদের মায়ায় ও কল্যাণে উৎসর্গ করিয়াছেন। তাঁহার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা সকল মাখলুকের মধ্যে শ্রেষ্ঠতর, কিন্তু তিনি উম্মাতের পরকালীন শান্তির উদ্দেশ্যে স্বীয় আরাম-আয়েশ, এমনকি সাধারণ স্বাচ্ছন্দ্যও পরিত্যাগ করিয়াছেন। এই প্রসঙ্গ আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত: হযরত রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করিয়াছেন, আমাকে এমন বিশেষ পাঁচটি নি'আমত প্রদান করা হইয়াছে যেগুলি আমার পূর্বেকার কোন নবী (আ)-কে দেওয়া হয় নাই। পৃথিবীর সম্পূর্ণটাই আমার জন্য সালাত আদায়ের স্থান করা হইয়াছে, অথচ অন্যান্য নবীগণ নির্ধারিত স্থানে যাইয়া সালাত আদায় না করিলে কবুল হইত না। এক মাসের পথ দূরত্বে থাকিতেই শত্রুদের মনে ত্রাসের সঞ্চার হয়, আমি তাহা দ্বারা সাহায্য প্রাপ্ত হইয়াছি। পূর্বেকার নবীগণ বিশেষ কোন গোত্রের বা এলাকার জন্য প্রেরিত হইতেন, আর আমি সকল জিন ও মানুষের উদ্দেশ্যে প্রেরিত হইয়াছি। গনীমতের খুমুসকে আমার দরিদ্র উম্মতের মাঝে বণ্টন করার জন্য আমি আদিষ্ট হইয়াছি। কিন্তু পূর্বেকার নবীগণ তাহা খোলা আকাশের নিচে জমা করিতেন এবং আগুনের ঝলক তাহা জ্বালাইয়া দিত। প্রত্যেক নবী যেই দু'আ করিতেন তাহাই প্রাপ্ত হইতেন। আমি আমার মূল দু'আকে বিশেষভাবে আখিরাতে আমার উম্মতের শাফা'আতস্বরূপ বিলম্বিত করিয়াছি (সুয়ূতী, আল- খাসাইস, ২খ.,
পৃ. ৩২০; ইহা ছাড়া ইমাম বুখারী স্বীয় তারীখে, বায়হাকী ও আবু নু'আয়ম স্ব স্ব গ্রন্থে এ হাদীছ সংকলন করিয়াছেন)।
মূলকথা, রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় উম্মতের জন্য কত বেশী মমতা রাখেন ও নিঃস্বদেরকে কত অধিক স্নেহ করেন তাহার যথাযথ বর্ণনা করার ভাষা আমাদের জানা নাই।
গ্রন্থপঞ্জী : (১) আল-কুরআনুল-কারীম; (২) আবূ জা'ফার আহমাদ ইব্‌ন আবদিল্লাহ আত্-তাবারী, রিয়াদুন-নাদিরাহ্ ফী মানাকি'বিল আশারাহ, দারুল-গারবিল-ইসলামী, বৈরূত ১৯৯৭ খৃ.; (৩) 'আবদুল মালিক ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা লিইবনি হিশাম, দারুল-জায়ল, বৈরূত ১৪১১ হি.; (৪) আবুল-ফাদল জালালুদ্দীন "আবদুর রাহমান আস-সুয়ূতী, কিফায়াতুত-তালিবিল-লাবীৰ ফী খাসাইসিল-হাবীব (আল-খাসাইসুল কুবরা), দারুল-কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরূত ১৯৮৫ খৃ.; (৫) মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক ইব্‌ন ইয়াসার, কিতাবুল মাবদা ওয়াল-মাবআছ ওয়াল-মাগাযী, মাহাদুদ-দিরাসাতি ওয়াল-আবহাছি লিত- তা'রীবি, সম্পাদনা মুহাম্মাদ হামীদুল্লা, সি.ডি. আস্-সীরাতুন ন্নাবায়ি‍্যা; (৬) আবুল-ফারূক আবদুর রাহমান ইব্‌ন আলী, সাফতওয়াতুস-সাফাওয়াহ, দারুল মারিফা, বৈরূত ১৯৭৯ খৃ.; (৭) আবূ বাক্‌র জাফর ইবন মুহাম্মাদ ইবনিল হাসান, দালাইলুন নুবৃওয়্যা, দারু হিরা' মক্কা আল-মুকাররামা ১৪০৬ হি.; (৮) আবূ 'উমার খালীফা ইব্‌ন খায়্যাত আল-লায়ছী, তারীখু খালীফা, দারুল-কালাম, দামিশক ১৩৯৭ হি.; (৯) আবুল-ফিদা ইসমাঈল ইবন 'উমার ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, মাকতাবাতুল মা'আরিফ, বৈরূত, তা.বি.; (১০) আবূ বাক্র আহমاد ইবন 'আমর আশ-শায়বানী, আল-আহاد ওয়াল-মাছানী, দারুর-রায়া, রিয়াদ ১৯৯১ খৃ.; (১১) আবূ মুহাম্মাদ 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন মুহাম্মাদ ইব্‌ন জা'ফার ইব্‌ন হিব্বান আল-ইসবাহানী, আখলাকুননাবীয়্যি সাল্লাল্লাহু 'আলায়হি ওয়াসাল্লাম ওয়া আদাবুহু, দারুল-মুসলিম, রিয়াদ ১৯৯৮ খৃ.; (১২) আবদুর রাহমান ইব্‌ন আবদিল্লাহ আল-খাছ'আমী আস-সুহায়লী, আর- রাওদুল-উনুফ ফী তাফসীরিস-সীরাতিন-নাবাবিয়্যা লিইবনি হিশام, দারুল-কুতবিল 'ইলমিয়্যা, বৈরূত ১৪১৮/১৯৯৭; (১৩) আবুল-আব্বাস আহমাদ ইব্‌ন আহমাদ আল-খাতীব, ওয়াসীলাতুল ইসলামি বিন্নাবিয়্যি 'আলায়হিস-সালাতু ওয়াস-সালাম, দারুল গারবিল-ইসলামী, বৈরূত ১৯৮৪ খৃ.; (১৪) আলী ইব্‌ন বুরহানুদ্দীন আল-হালাবী, আস-সীরাতুল হালবিয়্যা ফী সীরাতিল- আমীনিল- মা'মূন, দারুল-মা'রিফা, বৈরূত ১৪০০ হি.; (১৫) আবূ আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ ইব্‌ন সা'দ ইব্‌ন মানী আয-যুহরী, আত-তাবাকাতুল- কুবরা, দারু সাদির, বৈরূত, তা.বি.; (১৬) সিহাহ সিত্তাহ ও প্রসিদ্ধ হাদীছ গ্রন্থাদি।
মোঃ কামরুল হাসান

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর লজ্জাশীলতা

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর লজ্জাশীলতা


লজ্জা মানুষের একটি সহজাত বৈশিষ্ট্য। লজ্জাবোধই মানুষকে অনুপ্রাণিত করে সত্য, সুন্দর, কল্যাণকর ও মার্জিত জীবনাদর্শে অভ্যস্ত হইতে এবং বিরত রাখে অন্যায়, অসত্য, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও বেলেল্লাপনার নিকৃষ্ট ও গর্হিত কার্যাবলী হইতে। আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন লজ্জাশীলতার উত্তম নমুনা। কুমারী মেয়ে অপেক্ষাও অধিক লাজুক ছিলেন তিনি। লজ্জাহীনতা, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনাকে তিনি অত্যন্ত ঘৃণা করিতেন। তাঁহার প্রতিটি কথা ও কাজ ছিল শালীন ও মার্জিত। এক কথায় তিনি ছিলেন লজ্জাশীলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
"লজ্জা”-এর আরবী প্রতিশব্দ الحياء । আভিধানিক অর্থ হইল শরম, লজ্জাবোধ, শালীনতাবোধ, কুণ্ঠাবোধ প্রভৃতি। পারিভাষিক অর্থে حيا বা লজ্জাকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করা হইয়াছে।
حقيقة الحياء خلق يبعث على ترك القبيم ويمنع من التقصير في حق ذي الحق . "লজ্জা হইল মানুষের এমন একটি বৈশিষ্ট্য যাহা তাহাকে মন্দ ও গর্হিত জিনিস বর্জন করিতে উদ্বুদ্ধ করে এবং হকদারের হক যথাযথ আদায় করিতে উৎসাহিত করে” (আল-মাওয়াহিবুল- লাদুন্নিয়্যা, ২খ., পৃ. ৩৫৯; 'উমদাতুল- কারী, ১খ., পৃ. ১২৯; শরহে রিয়াদুস-সালিহীন, ২খ., পৃ. ১১; জাম'উল ওয়াসাইল ফী শারহিশ-শামাইল, ২খ., পৃ. ১৭৪)।
আবার কেহ কেহ বলিয়াছেন :
الحياء رقة نعترى وجه الانسان عند فعل ما يتوقع كراهيته او ما يكون تركه خيرا من فعله . "লজ্জা হইল মানুষের এমন একটি সূক্ষ্মানুভূতি যাহা মন্দের আশংকা রহিয়াছে এমন কোন কাজ সম্পাদনের সময় মানুষের চেহারাকে ফ্যাকাশে করিয়া দেয় অথবা এমন অনুভূতি সৃষ্টি করে যে, কাজটি সম্পাদন করার চেয়ে না করাই উত্তম" (কাদী 'ইয়াদ, আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ২৪১; জাম'উল-ওয়াসাইল ফী শারহিশ-শামাইল, ২খ., পৃ. ১৭৪)।
قال ذو النون الحياء وجود الهيئة في القلب مع وحشة ما يسبق منك الى ربك .
"লজ্জা হইল অন্তরে বিদ্যমান এমন একটি ভীতিপ্রদ অবস্থা যাহা তোমাকে ব্যক্তিসত্তা হইতে পৃথক করিয়া প্রতিপালকের দিকে অগ্রসর করিয়া দেয়” (আল-মাওয়াহিবুল- লাদুন্নিয়্যা, ২খ., পৃ. ৩৫৯)।
আবুল কাসিম আল-জুনায়د (র) বলিয়াছেন: الحياء روية الآلاء ورعية التقصير فيولد بينهما حالة يسنى الحياء
"লজ্জা হইল অন্তরে বিদ্যমান এমন একটি ভীতিপ্রদ অবস্থা যাহা তোমাকে ব্যক্তিসত্তা হইতে পৃথক করিয়া প্রতিপালকের দিকে অগ্রসর করিয়া দেয়” (আল-মাওয়াহিবুল- লাদুন্নিয়্যা, ২খ., পৃ. ৩৫৯)।
আবুল কাসিম আল-জুনায়د (র) বলিয়াছেন: الحياء روية الآلاء ورعية التقصير فيولد بينهما حالة يسنى الحياء
"মানুষ প্রথমত আল্লাহ্র অপরিসীম দয়া, অনুগ্রহ এবং অসংখ্য নিম্নামত প্রত্যক্ষ করিবে, তারপর নিজের ত্রুটি ও অক্ষমতার কথা গভীরভাবে চিন্তা করিবে, এতদুভয় চিন্তার ফলে মানসপটে যে ভাবের উদয় হয় তাহাই লজ্জা" (শারহে রিয়াদুস-সালেহীন, ২খ., পৃ. ১১; জাম'উল ওয়াসাইল ফী শারহিস- শামায়িল, ২খ., পৃ. ১৭৪)।
মোটকথা লজ্জা হইল মানুষের অন্তরে সৃষ্ট এক ধরনের ঘৃণাবোধ যাহা অন্তর হইতে উৎসারিত হইয়া ব্যক্তির সামগ্রিক ক্রিয়া-কর্মে ইহার বহিপ্রকাশ ঘটে। তবে মানুষের অন্তরের অবস্থা অনুসারে এই হায়া বা লজ্জাবোধের তারতম্য হইয়া থাকে। হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন অতিশয় লজ্জাশীল ব্যক্তিত্ব। তাঁহার প্রতিটি কথা ও কাজে লজ্জাশীলতা প্রতিভাত হইত। পাপ-পঙ্কিলতা, নির্লজ্জ ও বেহায়াপনা বেলেল্লাপনায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত সমাজে সলজ্জ ও শালীন জীবন যাপন করিয়া তিনি বিশ্ববাসীর জন্য লজ্জাশীলতার এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়া গিয়াছেন (আফযালুর রহমান, হযরত মুহাম্মাদ (স) জীবনী বিশ্বকোষ, পৃ. ১০৬; শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, বাংলা অনু., ২খ., পৃ. ৫৭১)।
লজ্জানুভূতি ও সম্ভ্রমশীলতা মানুষের চারিত্রিক ভূষণ। ইহা একটি সহজাত প্রাকৃতিক গুণ। এই লজ্জাশীলতার সুবাদে মানুষ বহুবিধ নৈতিক সৎ গুণাবলী অর্জন করিয়া থাকে। ইহার দ্বারা পবিত্রতা, নির্মলতা ও স্বচ্ছতার বিকাশ সাধিত হয়। সকল প্রকার মলিনতা হইতে মুক্ত থাকা যায়। যথাযথ লজ্জাশীল ব্যক্তিবর্গ অত্যন্ত নম্র, ভদ্র, শান্ত ও শালীন হইয়া থাকেন। তাহাদের সকল ক্রিয়াকলাপ হয় প্রশংসনীয়। তাহারা অপরের হক নষ্ট করেন না, আবেদনকারীদের বঞ্চিত করেন না। তাহারা আপোষে একে অপরের সহিত মানবতাবোধ প্রকাশ করেন। সকল অপরাধ ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে অবলোকন করেন। এমনকি এই মহৎ গুণের ফলে মানুষ বহুবিধ গুনাহ হইতে বাঁচিয়া থাকিতে পারে (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ৮খ., পৃ. ১৪৬)।
লজ্জাশীলতার এই মহৎ গুণটি মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই জন্মলাভ করে। বাল্যকাল হইতেই বিভিন্ন ক্রিয়াকর্মে উহার বহিপ্রকাশ ঘটিতে থাকে। যদি ইহাকে প্রয়োজনীয় লালন ও পরিচর্যা করা হয় তাহা হইলে উহা মানব জীবনকে সুন্দরভাবে প্রতিষ্ঠা করিতে পারে। শুধু তাহাই নহে, বরং উহা পরিবর্ধিতও হইতে পারে এবং এক সময় বিরাট মহীরূহে ও পত্র- পল্লবে সুশোভিত হইয়া লজ্জাশীলতার সুফল বিস্তার করিতে থাকে। আর যদি সৎ সান্নিধ্য পাওয়া না যায় তবে লজ্জা ও সম্ভ্রমসুলভ সৎ গুণের বিলুপ্তি ঘটে (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ৮খ., পৃ. ১৪৭)।
এইজন্য ইসলাম লজ্জা ও সম্ভ্রমশীলতার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করিয়াছে। হাদীছ শরীফে বর্ণিত হইয়াছে, মহানবী (স) বলেনঃ
الحياء شعبة من الايمان
"লজ্জা হইল ঈমানের একটি অঙ্গ” (ইবন মাজা, ১খ., পৃ. ২২; ইমাম বুখারী, আল- আদাবুল মুফরাদ, হাদীছ ৬০০, ২খ., পৃ. ২১b; আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ৩৯৮)।
লজ্জাশীলতার এই মহৎ গুণটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনে শিশুকাল হইতেই প্রকাশিত হয়। তখনও তিনি শিশু ছিলেন, কৈশোরে পদার্পণ করেন নাই। সমাজের আর দশজন শিশুর মত উলঙ্গ থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তখনও তিনি উলঙ্গ থকিতেন বা উলঙ্গ হইয়া চলাফিরা করিতেন এমন কোন প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায় নাই, তবে একবার কাপড় খোলার ইচ্ছা করিতেই বেহুঁশ হইয়া মাটিতে পড়িয়া যান। হাদীছ শরীফে তাহার বর্ণনা রহিয়াছে। বর্ণিত হইয়াছে:
لما بنيت الكعبة ذهب النبي الله وعباس ينقلان الحجارة فقال العباس للنبي اجعل ازارك على رقبتيك فخر النبى الله الى الارض فطمحت عيناه الى السماء فقال آزاری آزاری فشده علیه
"তখন পবিত্র কা'বা ঘরের সংস্কার কাজ চলিতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাঁহার চাচা আব্বাস (রা) বলিলেন, তুমি তোমার তহবন্দ খুলিয়া কাঁধের উপর রাখ, ইহাতে তোমার কাঁধের উপর দাগ পড়িবে না। তখন রাসূলুল্লাহ (স) কাপড় খোলার জন্য হাত বাড়াইতে হঠাৎ বেহুঁশ হইয়া মাটিতে পড়িয়া গেলেন। পরে জ্ঞান ফিরিয়া আসিলে তিনি বলিয়া উঠেন, আমার তহবন্দ, আমার তহবন্দ। অতঃপর আব্বাস (রা) তৎক্ষণাৎ তাহা বাঁধিয়া দিলেন" (ইমাম বুখারী, হাদীছ ১৫৮২, পৃ. ৩১৫; শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ৮খ., পৃ. ১৪৮)।
এই তো গেল রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাল্যকালের লজ্জাশীলতার কথা। বাল্যকালেই যদি তাঁহার লজ্জাশীলতার এমন পরিচয় পাওয়া যায় তাহা হইলে নবুওয়াতের পরে তাঁহার লজ্জাশীলতার অবস্থা কেমন ছিল সহজেই অনুমান করা যায়। রাসূলুল্লাহ (স)-এর লজ্জাশীলতার বর্ণনা প্রায় সকল বিশুদ্ধ হাদীছ গ্রন্থে নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হইয়াছে। যেমন বর্ণিত হইয়াছে:
كان رسول الله الله اشد حياء من عزراء في حدرها فاذا كان كره شيئا عرفناه في وجهه ..
"রাসূলুল্লাহ (স) পর্দানশীন কুমারী মেয়ে অপেক্ষা অধিক লাজুক ছিলেন। তিনি যখন কোন কিছু অপসন্দ করিতেন আমরা তাহা তাঁহার চেহারা দেখিয়াই বুঝিয়া নিতাম" (সুনান ইব্‌ন মাজা, হাদীছ ৪১৮০, ১খ., ১৩৯৯; আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদীছ ৬০১, ২খ., পৃ. ২১৮; ফাতহুল-বারী, হাদীছ ৬১১৯, ১০খ., পৃ. ৫২১; বুখারী, হাদীছ ৬১১৯, পৃ. ১২৯৮)।
লজ্জাশীলতা ইসলামী সভ্যতার মানদণ্ড। ইসলামী বিধানে নারী-পুরুষের একান্ত ব্যক্তিগত গোপন জীবনেও লজ্জা-শরম বাদ পড়ে নাই। তাই হাদীছ শরীফে বর্ণিত হইয়াছে: قال رسول الله ﷺ اذا اتى احدكم اهله فليستر ولا يتجرد تجرد العيرين "রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, তোমাদের কেহ স্বীয় স্ত্রীর সহিত মিলিত হইতে চাহিলে সে যেন গোপনে মিলিত হয় এবং গাধার মত উলঙ্গ না হয়" (সুনানু ইবন মাজা, হাদীছ ১৯২১, ১খ., পৃ. ৬১৯)।
এই কথা বাস্তব সত্য যে, একজন লজ্জাশীল মানুষের সামনে অন্য ব্যক্তি লজ্জাশীল হইয়া উঠে। বিশেষ করিয়া পারিবারিক জীবনে স্বামী যদি লজ্জাশীল হয় তাহা হইলে লজ্জাশীল স্বামীর নৈতিক চরিত্রের প্রভাব স্ত্রীর মাঝেও প্রতিফলিত হয়। পক্ষান্তরে স্বামী যদি নির্লজ্জ, বেহায়া ও উলঙ্গ সভ্যতার বাহক হয় তবে তাহার উলঙ্গ সভ্যতা স্ত্রীর মাঝেও বিস্তার লাভ করিবে সন্দেহ নাই। রাসূলুল্লাহ (স)-এর লজ্জাশীলতার প্রভাব তাঁহার পুণ্যবান স্ত্রীদের মাঝেও প্রতিফলিত হইয়াছিল। হাদীছ শরীফে বর্ণিত হইয়াছে: عن عائشة قالت ما رأيت فرج النبى ﷺ او ما نظرت الى فرج النبي ﷺ قط "হযরত আইশা (রা) বলিয়াছেন, আমি কখনও রাসূলুল্লাহ (স)-এর লজ্জাস্থানের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া নাই অথবা আমি তাঁহার লজ্জাস্থান দেখি নাই" (ইমাম আহমাদ ইব্‌ন হাম্বল, মুসনাদ, হাদীছ ২৩৮২৩, ৭খ., পৃ. ৯৩; সুনান ইবন মাজা, হাদীছ ১৯২২, ১খ., পৃ. ৬১৯; কাদী ইয়াদ, আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ২৪৩)।
সুতরাং বুঝা গেল, রাসূলুল্লাহ (স) স্ত্রীদের নিকট যদি এত লজ্জাশীল হইয়া থাকেন তবে অন্যদের বেলায় কত লজ্জাশীল ছিলেন তাহা সহজেই অনুমেয়। আর ইহাও জানা গেল যে, তাঁহার স্ত্রীগণ তাঁহার লজ্জাশীলতায় প্রভাবান্বিত ছিলেন বিধায় কখনও তাঁহার লজ্জাস্থানের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন নাই।
* অতিশয় লাজুক হওয়ার দরুন রাসূলুল্লাহ (স) কখনও কখনও বিশেষ অসুবিধার সম্মুখীন হইয়াছেন। নিজের ব্যক্তিগত অসুবিধা আর কষ্টকে তিনি হাসিমুখেই বরণ করিয়া নিতেন। লোকজনকে নিজের নিকট হইতে উঠিয়া যাইতে বলিতেন না কখনও। কারণ উত্তম নৈতিক চরিত্র এবং সহমর্মিতার বরখেলাপ ছিল। এইজন্য তিনি নিজে লজ্জাবোধ করিতেন, তবে তাহার পরও তিনি তাহাদের প্রয়োজনীয় আলোচনা ধৈর্যের সহিত শ্রবণ করিতেন (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ১৪৯)।
রাসূলুল্লাহ (স) হযরত যয়নব (রা)-এর বিবাহ উপলক্ষে ওলীমার (বিবাহ ভোজ) আয়োজন করিয়াছিলেন। সাহাবায়ে কিরাম উক্ত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হইয়াছিলেন। তাঁহাদের প্রায় সকলেই আসিয়া আহার করিয়া চলিয়া গিয়াছিলেন। তবে কয়েকজন সাহাবী খানাপিনার পরও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বসিয়া গল্প-গুজব করিতেছিলেন যাহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট কষ্টকর ছিল।
কিন্তু সহজাত স্বভাব লজ্জার কারণে তিনি তাহা প্রকাশ করিতে পারিতেছিলেন না। অবশেষে বাধ্য হইয়া এক সময় তাহাদের নিকট হইতে বাহির হইয়া হযরত আইশা (রা)-এর হুজরায় চলিয়া যান। সেইখানে কিছুক্ষণ সময় আলোচনা করিয়া কাটাইলেন। তাহার পর আবার ফিরিয়া আসেন কিন্তু দেখিলেন, তাহারা পূর্ববৎ আলোচনায় লিপ্ত রহিয়াছেন। এইভাবে বিনা প্রয়োজনে জমিয়া বসিয়া থাকা সাধারণত নৈতিকতার, বিশেষত নবুওয়াতের আদব ও শিষ্টাচারের বরখেলাফ তাহা তাহারা কিছুতেই উপলব্ধি করিতে পারিতেছিলেন না। তাই আল্লাহ রব্বুল আলামীন ওহীর মাধ্যমে বিষয়টি তাহাদিগকে জানাইয়া দিলেন (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, ৮খ., পৃ. ১৪৯; বুখারী, হাদীছ ৪৭৯৩, পৃ. ১০২০; মা'আরিফুল-কুরআন, সংক্ষিপ্ত, পৃ. ১০৯২)।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَدْخُلُوا بُيُوتَ النَّبِيِّ إِلَّا أَنْ يُؤْذَنَ لَكُمْ إِلَى طَعَامٍ غَيْرَ نُظِرِينَ إِنَّهُ وَلَكِنْ إِذَا دُعِيْتُمْ فَادْخُلُوا فَإِذَا طَعِمْتُمْ فَانْتَشِرُوا وَلَا مُسْتَأْنِسِيْنَ لِحَدِيثٍ إِنَّ ذَلِكُمْ كَانَ يُؤْذِي النَّبِيِّ فَيَسْتَحْيِي مِنْكُمْ وَاللَّهُ لَا يَسْتَحْيِي مِنَ الْحَقِّ.
“হে মুমিনগণ! তোমাদেরকে অনুমতি দেওয়া হইলে তোমরা আহার্য প্রস্তুতির জন্য অপেক্ষা না করিয়া ভোজনের জন্য নবী গৃহে প্রবেশ করিও না। তবে তোমাদেরকে আহ্বান করিলে তোমরা প্রবেশ করিও এবং ভোজনশেষে তোমরা চলিয়া যাইও। তোমরা কথাবার্তায় মশগুল হইয়া পড়িও না। তোমাদের এই আচরণ নবীকে পীড়া দেয়। তিনি তোমাদেরকে উঠাইয়া দিতে সংকোচ বোধ করেন। কিন্তু আল্লাহ সত্য বলিতে সংকোচ বোধ করেন না" (৩৩: ৫৩)।
রাসূলুল্লাহ (স) অতিশয় লজ্জাশীল ছিলেন সন্দেহ নাই। তাই বলিয়া এই লজ্জাবোধ কখনও তাঁহার কর্তব্য কর্ম সম্পাদনে বাধা হইয়া দাঁড়াইত না এবং দা'ওয়াত-তাবলীগ, শিক্ষা-দীক্ষা ও সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ করিতে কখনও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিত না। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট অনেক লোকজন নানা সমস্যা সমাধানের জন্য আসিত। তাহাদের সমস্যাবলী তিনি ধৈর্য সহকারে শ্রবণ করিতেন এবং যথাযথ সমাধান করিয়া দিতেন। অনেক সময় দেখা যাইত যে, সমস্যাটি এমন যাহা একান্তই লজ্জাজনক। ইহার পরও তিনি সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে সামান্যতম কুণ্ঠিত হইতেন না, শালীনতা বজায় রাখিয়াই সমাধান করিয়া দিতেন। হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
عن على بن أبي طالب قال كنت رجلا مذاء فامرت المقداد ان يسال النبي ﷺ فساله فقال فيه الوضوء .
"আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার অধিক পরিমাণে মযী (বীর্যরস) বাহির হইত। এই ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করিবার জন্য মিকদাদ (রা)-কে বলিলাম। তিনি
তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইহাতে কেবল উযু করিতে হইবে" (বুখারী (বাংলা), হাদীছ ১৩৪, ১খ., পৃ. ৯১)।
অপর একটি হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
عن ام سلمة قالت جاءت ام سليم إلى رسول الله ﷺ فقالت يا رسول الله ﷺ ان الله لا يستحى من الحق فهل على المرأة من غسل اذا احتلمت قال النبي ﷺ اذا رات الماء فغطت ام سلمة تعنى وجهها وقالت يا رسول الله اذ تحتلم المرأة قال نعم تربيت يمينك فيم يشبهها ولدها .
***"উম্মু সালামা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উম্মু সুলায়ম (রা) আসিয়া প্রশ্ন করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তা'আলা হক কথা প্রকাশ করিতে লজ্জাবোধ করেন না। স্ত্রীলোকের স্বপ্নদোষ হইলে তাহাকে কি গোসল করিতে হইবে? রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, হাঁ অবশ্যই, যখন সে বীর্য দেখিতে পাইবে। তখন উম্মু সালামা' লজ্জায় তাহার মুখ ঢাকিয়া নিলেন এবং বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মহিলাদেরও কি স্বপ্নদোষ হয়? তিনি বলিলেন, হাঁ, তোমার ডান হাতে মাটি পড়ুক। তাহা না হইলে তাহার সন্তান তাহার আকৃতি পায় কিরূপে" (ইমাম বুখারী, আস-সাহীহ, বাংলা, হাদীছ ১৩২, ১খ., পৃ. ৯০)।
* এইভাবে রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট হাজারো প্রশ্ন উত্থাপন করা হইত। পুরুষের পাশাপাশি মহিলাগণও তাহাদের সমস্যার কথা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট নিজেরাই উত্থাপন করিতেন। আর সমস্যার সমাধান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করাটাকে তাহারা নিজেদের নৈতিক দায়িত্ব মনে করিতেন। এই প্রসঙ্গে হযরত 'আইশা (রা) বলেন:
نعم النساء نساء الانصار لم يمنعهن الحياء ان يتفقهن في الدين .
"আনসার মহিলারা কতই না উত্তম। লজ্জা তাহাদেরকে দীনের জ্ঞান অর্জন হইতে ফিরাইয়া রাখিতে পারে নাই” (ইমাম বুখারী, আস-সাহীহ, বাংলা, ১খ., পৃ. ৯০; শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ৮খ., পৃ. ১৫০)।
সুতরাং বুঝা গেল সাহাবা-ই কিরাম ধর্মীয় ব্যাপারে কখনও লজ্জাবোধ করিতেন না। হাদীছ শরীফে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন:
ان رسول الله ﷺ بينما هي جالس في المسجد والناس معه اذ اقبل ثلاثة نفر فاقبل اثنان التي رسول الله ﷺ وذهب واحد قال فوقفا على رسول الله ماما أحدهما فرى فرجة في الحلقة فجلس فيها واما الآخر فجلس خلفهم وأما الثالث فادير ذاهها فلما فرغ رسول الله ﷺ قال الا اخبركم عن النفر الثلاثة اما احدهم فاوى الى
আল্লাহ فاواه الله واما الآخر فاستحيا فاستحيا الله منه واما الاخر فاعرض فاعرض الله منه
“রাসূলুল্লাহ (স) একদা মসজিদে বসা ছিলেন। তাঁহার সঙ্গে লোকজনও ছিল। ইতোমধ্যে তিনজন লোক আসিল। তাহাদের মধ্যে দুইজন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে আগাইয়া আসিল এবং অপরজন চলিয়া গেল। রাবী বলেন, তাহারা দুইজন রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল। ইহার পর তাহাদের একজন মজলিসের মাঝে কিছুটা জায়গা দেখিয়া সেইখানে বসিয়া পড়িল। আর অন্যজন তাহাদের পিছনে বসিল। আর তৃতীয়জন ফিরিয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) মজলিস শেষে সাহাবায়ে কিরামকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আমি কি তোমাদেরকে এই তিন ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু বলিব? তাহাদের একজন আল্লাহর দিকে আগাইয়া আসিয়াছে, তাই আল্লাহ তা'আলাও তাহাকে স্থান দিয়াছেন। অন্যজন লজ্জাবোধ করিয়াছে, তাই আল্লাহ তা'আলাও তাহার ব্যাপারে লজ্জাবোধ করিয়াছেন (অর্থাৎ তাহাকে শাস্তি দিতে এবং রহমত হইতে বঞ্চিত করিতে লজ্জাবোধ করিয়াছেন)। আর অপরজন মুখ ফিরাইয়া নিয়াছে, তাই আল্লাহও তাহার হইতে মুখ ফিরাইয়া নিয়াছেন (সুনان আত-তিরমিযী, হাদীছ ২৭২৪, ৫খ., পৃ. ৭৩; ইমাম বুখারী, আস-সাহীহ (বাংলা), হাদীছ ৬৬, ১খ., পৃ. ৫৫; শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ৮খ., পৃ. ১৪৬-১৪৭; লুবাবুল-আদাব, পৃ. ২৮১)।
রাসূলুল্লাহ (স) নির্লজ্জতায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত আরববাসীকে নগ্নতা ও অশ্লীলতা হইতে মুক্ত করিতে এবং বিশ্ববাসীকে লজ্জাশীলতার শিক্ষা দান প্রসঙ্গে বলিয়াছেন:
قال احفظ عوراتك الا من زوجتك او ما ملكت يمينك قالت قلت يا رسول الله ﷺ اذا كان القوم بعضهم في بعض قال استطعت ان لا يراها احد فلا ترينها احدا قال قلت يا نبي الله ان كان احدنا خاليا قال فالله احق أن تستحيى منه من الناس
“রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, তুমি তোমার স্ত্রী এবং ক্রীতদাসী ব্যতীত অন্য কাহারও সামনে সতর উন্মুক্ত করিবে না। বর্ণনাকারী বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! অনেক লোক যখন একসাথে থাকে এবং মানুষ তাহার সতর রক্ষা করায় পুরাপুরি সক্ষম না হয় তাহা হইলে কি করিবে? তিনি বলিলেন, যথাসম্ভব চেষ্টা করিতে হইবে যাহাতে কেহ তাহার লজ্জাস্থান না দেখে। আমি আবার বলিলাম, কেহ যখন একাকী থাকে তখনও কি সতর ঢাকিতে হইবে? তিনি উত্তরে বলিলেন, তখন তো আল্লাহ থাকেন। আর মানুষের তুলনায় লজ্জা করিবার বেশি উপযুক্ত হইলেন আল্লাহ তা'আলা" (সুনান ইব্‌ন মাজা, হাদীছ ১৯২০, ১খ., পৃ. ৬১৮)।
অপর একটি হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে, একদা রাসূলুল্লাহ (স) এক ব্যক্তিকে উন্মুক্ত প্রান্তরে উলঙ্গাবস্থায় গোসল করিতে দেখিলেন। সেইখান হইতে ফিরিয়া আসিয়া তিনি বলিলেনঃ
قال أن الله عز وجل حليم حيى ستير يحب الحياء والستير فاذا اغتسل احدكم فليستر "নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা ধৈর্যশীল, লজ্জাশীল এবং অধিক পর্দাচ্ছাদনকারী। লজ্জাশীলতা ও পর্দাকেই তিনি অধিক পসন্দ করেন। সুতরাং তোমাদের কেহ যখন গোসল করিবে তখন সে যেন পর্দা করে" (শারহুস-সুনান আন-নাসাঈ, ১খ., পৃ. ২০১; লুবাবুল-আদাব, পৃ. ২৮২)।
ইসলাম কোনক্রমেই লজ্জাহীনতা ও অশ্লীলতাকে সমর্থন করে না। তাই তো জাহিলিয়াতের সকল বেহায়াপনা ও বেলেল্লাপনার বিরুদ্ধে ঘোষিত হইল:
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى "আর তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করিবে এবং প্রথম প্রাচীন (জাহিলী) মত নিজদিগকে প্রদর্শন করিয়া বেড়াইবে না" (৩৩: ৩৩)।
উক্ত আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, জাহিলী যুগ ছিল নগ্নতা ও অশ্লীলতার যুগ যাহা ইসলামী যুগে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। নবী পত্নীগণকে লক্ষ্য করিয়া যে পথনির্দেশনা প্রদান করা হইয়াছে তাহা শুধু তাহাদের জন্য খাস নহে, বরং সর্বকালের সমগ্র নারী জাতিকেই উদ্দেশ্য করা হইয়াছে (তাফসীরে নূরুল কুরআন, ২২খ., পৃ. ১১)।
ইসলাম লজ্জা-সম্ভ্রমের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করিয়াছে। বিশেষ করিয়া মহিলাদের অঙ্গাবয়বের সম্ভ্রম রক্ষার্থে দৃষ্টিকে অধোগামী করা, লজ্জাহীন বাক্যালাপ হইতে বিরত রাখার চেষ্টা করা, উলঙ্গপনাকে প্রশ্রয় না দেওয়া, এমনকি গোসলখানা ও একান্ত দেহ পরিচর্যার স্থলে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ না করার মূলে রহিয়াছে দৃষ্টিকে লজ্জাহীনতা হইতে রক্ষা করা, লজ্জাহীনতার পথ সামগ্রিকভাবে রুদ্ধ করা এবং সামান্যতম লজ্জাহীনতার দুঃসাহসকে চিরতরে অবদমিত করা যাহাতে মানুষ কোনক্রমেই লজ্জাহীনতার দিকে ঝুঁকিয়া না যায় এবং তাহাদের মাঝে লজ্জাসুলভ সৌজন্যবোধ সৃষ্টি হয় (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ৮খ., পৃ. ১৪৮)। কুরআন মজীদে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হইয়াছে-
قُلْ لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ. "মু'মিন নারীদেরকে বল, তাহারা যেন তাহাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাহাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে" (২৪:৩১)।
কেবল মহিলাদেরকেই নয়, পাশাপাশি পুরুষদেরকেও নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে:
قُلْ لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ.
"মু’মিনদেরকে বল, তাহারা যেন তাহাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাহাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। ইহাই তাহাদের জন্য উত্তম। উহারা যাহা করে নিশ্চয় আল্লাহ সেই বিষয়ে সম্যক অবহিত” (২৪ : ৩০)।
দুইটি আয়াতেই দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ এবং লজ্জাস্থানের পবিত্রতা সংরক্ষণ করিতে আদেশ করা হইয়াছে। আর লজ্জাশীলতার বহিপ্রকাশ এই দুইটি মাধ্যমেই হইয়া থাকে। এই দুইটির অনিয়ন্ত্রিত বলগাহীন ব্যবহার মানুষকে মনুষ্যত্বের পর্যায় হইতে পশুত্বের পর্যায়ে পৌঁছাইয়া দেয়। রাসূলুল্লাহ (س) লজ্জাশীল ছিলেন, লজ্জাশীলতার ব্যাপারেও ছিলেন আপোষহীন, লজ্জাহীনতা ঘৃণা করিতেন। মানুষ লজ্জাহীনতা বর্জন করিয়া শালীন জীবন যাপন করুক তাহাই তিনি কামনা করিতেন। তাই তিনি লজ্জাশীলতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করিয়া ইরশাদ করেন:
قال رسول الله ﷺ استحيوا من الله حق الحياء قال قلنا يا نبي الله انا لنستحيي والحمد الله قال ليس ذلك ولكن الاستحياء من الله حق الحياء ان تحفظ الراس وما وعى وتحفظ البطن وما حوى ولتذكر الموت والبلى ومن أراد الاخرة ترك زينة الدنيا فمن فعل ذلك فقد استحياء من الله حق الحياء .
“রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, তোমরা আল্লাহ্র ব্যাপারে লজ্জিত হও, যথার্থ লজ্জিত। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা বলিলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা তো আল্লাহ্র ব্যাপারে লজ্জিত। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, না, ইহা নয়। আল্লাহ তা’আলা সম্পর্কে পরিপূর্ণ লজ্জাবোধ হইল এই যে, তোমার মাথাকে রক্ষা করিবে এবং উহা যাহা ধারণ করে তাহাও। তোমার পেটকে এবং উহা যাহাকে অন্তর্ভুক্ত করে তাহাও। আর যে ব্যক্তি পরকাল কামনা করিবে, তাহাকে দুনিয়ার চাকচিক্য ত্যাগ করিতে হইবে। আর যে ব্যক্তি ঐসকল কার্যাবলী সম্পাদন করিবে সে-ই আল্লাহর ব্যাপারে পরিপূর্ণ লজ্জাশীল হইবে" (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ৪০০; লুবাবুল- আদাব, পৃ. ২৮২)।
অপর একটি হাদীছে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন:
الحياء شعبة من الايمان لا ايمان لمن لاحياء له .
"লজ্জা হইল ঈমানের একটি অঙ্গ। আর যাহার লজ্জা-শরম নাই তাহার ঈমান নাই” (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ৪০০)।
আলোচ্য হাদীছে লজ্জাকে ঈমানের অঙ্গ হিসাবে বর্ণনা করা হইয়াছে। ঈমান যেমন মানুষকে যাবতীয় লজ্জাহীনতা ও হীনমন্যতার স্পর্শ হইতে রক্ষা করিয়া থাকে, তদ্রূপ লজ্জাও মানুষকে ঐসকল বস্তু হইতে বিরত রাখে যাহা অশিষ্টতা, নগ্নতা ও লজ্জাহীনতার পরিচায়ক (শিবলী নু’মানী, সীরাতুন-নবী, ৮খ., পৃ. ১৪৯; আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ.
এখানে যে লজ্জাকে ঈমানের অংশ হিসাবে বর্ণনা করা হইয়াছে তাহা হইল শারী'আত সম্মত লজ্জা। সুতরাং যে সকল লোকের মাঝে স্বভাবগত সহজাত লজ্জানুভূতির উপাত্ত ও উপায় বিদ্যমান রহিয়াছে তাহার পক্ষে শারী'আতসম্মত লজ্জা যা ঈমানের অঙ্গ, অর্জন করা সহজ হইবে (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ৮খ., পৃ. ১৪৯)।
অপর একটি হাদীছে রাসূলুল্লাহ (স) লজ্জা এবং ঈমানের মাঝে যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান রহিয়াছে তাহা বর্ণনা করিয়াছেন: ان النبي ﷺ قال ان الحياء والايمان قرناء جميعا فاذا رفع احدهما رفع الآخر وفي رواية اذا سلب احدهما تبعه الآخر .
"রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, নিশ্চয় লজ্জা ও ঈমান একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। একটি উঠিয়া বা দূর হইয়া গেলে অপরটিও দূর হইয়া যায়। অন্য বর্ণনায় রহিয়াছে, যখন একটিকে ছিনাইয়া নেওয়া হয় তখন অপরটিও তাহার অনুগামী হয়" (মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীছ ৫০৯৩, ৩খ., পৃ. ১৪১১; আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ৪০০)।
লজ্জা-শরম মানুষের জীবনে এক মূল্যবান সম্পদ। এই সম্পদে সম্পদশালী ব্যক্তি সকল প্রকার গর্হিত ও মানবতা বিরোধী ক্রিয়াকলাপ হইতে মুক্ত। তাহাদের কাজে, কর্মে, জীবনের সকল স্তরেই এই সৎগুণের বহিপ্রকাশ ঘটিয়া থাকে। তাহারা পশুর মত নির্লজ্জ হইয়া কোন কাজ করিতে পারে না। বস্তুত লজ্জাই হইল মানুষ ও পশুর মাঝে পার্থক্যের ভিত্তি। সেইজন্যই ইসলাম লজ্জাশীলতার প্রতি অত্যধিক গুরুত্বারোপ করিয়াছে। হাদীছ শরীফে বর্ণিত হইয়াছে: قال رسول الله ﷺ الحياء لا ياتي الابخير .
"লজ্জা-শরম মানবজীবনে বিপুল কল্যাণই আনে” (বুখারী, হাদীছ ৬১১৭, পৃ. ১২৯৮; সুনান আবী দাউد, হাদীছ ৪৭৯৬, ৫খ., পৃ. ১৪৭; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীছ ৫০৭১, ৩খ., পৃ. ১৪০৭)।
লজ্জাশীলতার এই গুরুত্বের কথা বিবেচনা করিয়া রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছেন: ان لكل دين خلقا وخلق الاسلام الحياء
"প্রত্যেক ধর্মেরই একটা সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য আছে। আর ইসলামের বৈশিষ্ট্য হইল লজ্জাশীলতা" (সুনান ইবন মাজা, হাদীছ ৪১৮১, ২খ., পৃ. ১৩৯৯; আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ৩৯৯)।
অপর একটি হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে, একদা রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট লজ্জা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হইল: يا رسول الله الحياء من الايمان فقال رسول الله ﷺ بل هو الدين كله
"ইয়া রাসূলাল্লাহ! লজ্জা কি ঈমানের অংশ? রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, (লজ্জা শুধু ঈমানের অংশই নয়), বরং লজ্জাই পরিপূর্ণ দীন" (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ৩৯৯)।
ইসলামে লজ্জার গুরুত্ব অপরিসীম। একটি হাদীছে বিষয়টির গুরুত্ব স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে এইভাবে : قال النبي ﷺ ان الله عز وجل اذا اراد ان يهلك عبدا نزع منه الحياء فاذا نزع منه الحياء لم تلقه الا مقيتا
"নবী (স) বলিয়াছেন, যদি আল্লাহ তা'আলা কোন বান্দাকে ধ্বংস করিতে চাহেন তবে তাহার লজ্জা-শরুম উঠাইয়া নেন। যখন তাহার লজ্জা শরম উঠিয়া যায় তখন সে ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই পায় না" (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ৪০১)।
লজ্জাহীনতা মানুষকে নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে লইয়া যায়। কেননা লজ্জাবোধের অভাব হইলে মানুষের নৈতিকতাবোধের অভাব হয়। নৈতিক অধপতনই তাহাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাইয়া দেয়। নির্লজ্জ ব্যক্তি পশুর ন্যায় যাহা ইচ্ছা তাহাই করিয়া থাকে। এইজন্য রাসূলুল্লাহ (স) লজ্জাহীনতার অবশ্যম্ভাবী পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করিয়া ইরশাদ করেন: عن إنس أن رسول الله ﷺ قال ما كان الفحش في شيئ قط الا شانه ولا كان الحياء في شيئ قط الا زانه ..
"আনাস (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, কোন বিষয়ে অশ্লীলতা তাহার মূল্যহানি করে। পক্ষান্তরে লজ্জাশীলতা সকল কিছুর মর্যাদা ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করিয়া থাকে” (সুনان ইবন মাজা, হাদীছ ৪১৮৫, ২খ., পৃ. ১৪০০; আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদীছ ৬০৪, ২খ., পৃ. ২২০; তিরমিযী, বাংলা, হাদীছ ১৯২৪, ৩খ., পৃ. ৪০)।
এই লজ্জাশীলতা এমন একটি বিষয় 'যাহা পূর্ববর্তী নবীদের ধর্মেও ছিল। তাহাদের অনেক বিধান রহিত হইয়া গেলেও লজ্জাশীলতার বিধান কোন শারী'আতেই রহিত হয় নাই। হাদীছ শরীফে বর্ণিত হইয়াছে : عن ابن مسعود قال قال رسول الله ﷺ ان مما ادرك الناس من كلام النبوة الأولى اذا لم تستحى فاصنع ما شئت
"ইবন মাস'উদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, মানুষ পূর্ববর্তী নবীদের বাণীসমূহ হইতে যাহা পাইয়াছে তাহা হইতে একটি হইল: যখন তুমি লজ্জাবোধ করিবে না তখন তুমি যাহা ইচ্ছা তাহাই করিবে” (সুনان আবী দাউد, হাদীছ ৪৭৯৭, ৫খ., পৃ. ১৪৮-১৪৯; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীছ ৫০৭২, ৩খ., পৃ. ১৪০৭; ফাতহুল বারী, ১০খ., পৃ. ৫২৩; লুবাবুল আদাব, পৃ. ২৮২)।
জয়রত মুহাম্মাদ (স) ১২১
লজ্জাশীলতা মু'মিনের বড় পরিচয়। সেইজন্য ইসলামে লজ্জাশীলতার স্থান সকল কিছুর ঊর্ধ্বে। হাদীছ শরীফে বর্ণিত হইয়াছে:
قال رسول الله ﷺ الحياء من الايمان والايمان في الجنة والبذاء من الجفاء والجفاء في النار
"রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছেন, লজ্জা হইল ঈমানের অঙ্গ আর ঈমান মানুষকে জান্নাতে দাখিল করে। পক্ষান্তরে নির্লজ্জতা জুলুমের অঙ্গ। আর জুলুমের স্থান জাহান্নام" (তিরমিযী, বাংলা অনু, হাদীছ ১৯৫৮, ৩খ., পৃ. ৪১৬; মিশকাতুল-মাসাবীহ, হাদীছ ৫০৮৮, ৩খ., পৃ. ১৪০৮; আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ৩৯৮)।
নির্লজ্জতা মু'মিনের বৈশিষ্ট্য নয়। ইহা দিগম্বর সভ্যতার বৈশিষ্ট্য। লজ্জাশীলতা ও নির্লজ্জতার প্রভাব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করিয়াছেন:
عن عائشة قالت قال رسول الله ﷺ يا عائشة لوكان الحياو رجلا لكان رجلا صالحا ولو كان الفحش رجلا لكان رجلا سوء .
"হযরত 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, হে 'আইশা?' যদি লজ্জা মানুষ হইত তবে উহা একজন সৎ মানুষ হইত। আর যদি নির্লজ্জ মানুষ হইত তবে উহা অবশ্যই একটি মন্দ লোক হইত" (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ৩৯৯)।
উল্লিখিত হাদীছ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, লজ্জাশীলতার প্রভাবে মানুষ সৎ, মহৎ ও উত্তম নৈতিক চরিত্রে ভূষিত হইয়া থাকে। আর নির্লজ্জতার প্রভাবে মানুষ অসৎ ও চরিত্রহীন হইয়া থাকে।
আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) একদা এক আনসার ব্যক্তির নিকট দিয়া গমন করিতেছিলেন। তিনি তখন তাহার এক ভাইকে অত্যধিক লজ্জা না করিবার জন্য নসীহত করিতেছিলেন। উল্লেখ্য যে, যাহাকে নসীহত করা হইতেছিল তিনি ছিলেন খুবই লাজুক ব্যক্তি। আর নসীহতকারী তাহাকে অত্যধিক লজ্জার জন্য তিরস্কার করিতেছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে বলিলেন, دعه فان الحياء من الايمان "তাহাকে ছাড়িয়া দাও। কেননা লজ্জা হইল ঈমানের অঙ্গ" (ইমাম মালিক, মুওয়াত্তা, বাংলা অনু., হাদীছ ২৭০২, ৪৩৫; সুনান আবী দাউد, হাদীছ ৪৭৯৫, ৫খ., পৃ. ১৪৭; মিশকাতুল-খাসাবীহ, হাদীছ ৫০৭০, ৩খ., পৃ. ১৪০৭; সুনان ইবন মাজা, হাদীছ ৫৭, ১খ., পৃ. ২২; কানযুল-উম্মাল, হাদীছ ৮৫১৯, ৩খ., পৃ. ৭০৮; আল-আদাবুল-মুফরাদ, হাদীছ ৬০৫, ২খ., পৃ. ২২১)।
রাসূলুল্লাহ (س) লজ্জাশীলতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। সা'ঈদ ইবন যায়দ (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, একদা এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিল:
اوصنى قال استحيى من الله كما تستحى رجلا صالحا من قومك
"আমাকে কিছু উপদেশ দিন। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে বলিলেন, তুমি আল্লাহ্ ব্যাপারে লজ্জাবোধ করিবে যেমন তুমি গোত্রের কোন সৎ লোকের বেলায় লজ্জাবোধ করিয়া থাক” (লুবাবুল-আদাব, পৃ. ২৮২)।
ইবন উমার (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, একদা তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গমন করিলেন এবং দেখিলেন, তিনি কাঁদিতেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কেন কাঁদিতেছেন? রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, জিবরাঈল (আ) আমাকে সংবাদ দিয়া গেলেন যে, আল্লাহ তা'আলা ঐ যুবককে কষ্ট দিতে লজ্জাবোধ করেন যে তাহার যৌবনকাল ইসলামের উপর অতিবাহিত করে, অথচ সে বৃদ্ধাবস্থায় পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে সামান্যতম লজ্জাবোধ করিবে না? অথচ ইসলামের উপরই সে বাড়িয়া উঠিয়াছে (লুবাবুল আদাব, পৃ. ২৮৩)।
পরিশেষে বলা যায়, লজ্জাশীলতা হইল মানবীয় সৎ গুণাবলীর অন্যতম। ইসলাম লজ্জাশীলতার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করিয়াছে। লজ্জাশীলতার এই গুরুত্বের বিষয় বিবেচনা করিয়া প্রসিদ্ধ হাদীছ গ্রন্থসমূহের সম্মানিত গ্রন্থকারগণ স্ব স্ব কিতাবে পৃথক পৃথক পুরিচ্ছেদে লজ্জা সম্পর্কে আলোকপাত করিয়াছেন। এই সকল হাদীছ গ্রন্থে বর্ণিত প্রায় সকল হাদীছেই লজ্জাশীলতার গুরুত্বের পাশাপাশি নির্লজ্জতার ভয়াবহ পরিণতির কথাও বর্ণনা করা হইয়াছে।
গ্রন্থপঞ্জী : (১) আল-কুরআন আল-কারীম; (২) হাফেজ ইমাদুদ্দীন ইব্‌ন কাছীর, তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, অনু. ডঃ মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান, প্রকাশকাল ১৯৯৭ খৃ. / হিজরী ১৪১৮; (৩) মাওলানা আমিনুল ইসলাম, তাফসীরে নূরুল-কুরআন, ২২খ., আল-বালাগ পাবলিকেশন্স, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ১৯৯৫ খৃ. / ১৪০৪ হি.; (৪) মাওঃ মুফতী মুহাম্মাদ শফী, তাফসীরে মা'আরেফুল কুরআন, অনু. মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, ই.ফা.বা. ১৯৯৪ খৃ. / ১৪১৫ হি.; (৫) ইমাম আবু দাউد, সুনان আবী দাউد, দারুল-কুতুব আল-ইলমিয়‍্যা, বৈরূত, লেবানন, প্রথম প্রকাশ ১৮৭৪ খৃ. / ১৩৯৪ হি.; (৬) ইমাম তিরমিযী, আল-জামে', দারু ইহয়াইত-তুরাছ আল-আরাবী, বৈরূত, লেবানন, তা. বি.; (৭) ইমাম ইবন মাজা, সুনান ইবন মাজা, দারুল ফিক্স, তা.বি.; (৮) ইমাম বুখারী, আস-সাহীহ, দারুস-সালাম, রিয়াদ, প্রথম সংস্করণ, ১৯৯৭ খৃ. / ১৪১৭ হি.; (৯) ইমাম মালিক ইব্‌ন আনাস, আল-মুওয়াত্তা, অনুবাদ মুহাম্মاد রিজাউল করীম ইসলামাবাদী, ই.ফা.বা., প্রথম সংস্করণ ১৯৮৭ খৃ. / ১৪১৬ হি.; (১০) ইমাম বুখারী, আল- আদাবুল মুফরাদ, অনু. ই.ফা.বা., প্রথম সংস্করণ ১৯৯৪ খৃ. / ১৪১৪ হি.; (১১) ইমাম তিরমিযী, তিরমিযী শরীফ (বাংলা), বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, প্রকাশকাল ১৯৯৭ খৃ. / ১৪১৮ হি.; (১২) ইমাম ওয়ালীউদ্দীন আল-খাতীব, মিশকাতুল মাসাবীহ, আল-মাকতাবুল ইসলামী, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৭৯ খৃ. / ১৩৯৯ হি.; (১৩) কাদী 'ইয়াদ, আশ-শিফা, মাকতাবাতুল- ফারাবী, দামিশ্ক, তা. বি.; (১৪) আলাউদ্দীন আলী আল-মুত্তাকী, কানযুল-উম্মাল, মাকতাবাতুত-তুরাছ আল-ইসলামী,
হালাব, প্রথম সংস্করণ, ১৯৭০ খৃ. / ১৩৯০ হি.; (১৫) ইব্‌ন হাজার আল-আসকালানী, ফাতহুল-বারী, দারুল মা'রিফা, বৈরূত, লেবানন, তা.বি.; (১৬) বাদরুদ্দীন আল-আয়নী, উমদাতুল-কারী, দারু ইহয়াইত-তুরাছ আল-আরাবী, বৈরূত, লেবানন, তা.বি.; (১৭) ইমাম সুয়ূতী, শরহুস-সুনان আন-নাসাঈ, দারুল-ফিক্‌র, বৈরূত, লেবানন তা.বি.; (১৮) ইমাম আহমاد ইবন হাম্বল, আল-মুসনাদ, দারু ইহয়াইত-তুরাছ আল-আরাবী, বৈরূত, লেবানন, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৯৩ খৃ.; (১৯) উসামা ইব্‌ন মুনকিদ, লুবাবুল আলবাব, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যা, বৈরুত, লেবানন ১৯৮০ খৃ. / ১৪০০ হি.; (২০) ইমাম যাকীউদ্দীন আবদুল-আজীম আল-মুনযিরী, আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, দারু ইহয়াইত-তুরাছ আল-আরাবী, বৈরূত, লেবানন, তা.বি.; (২১) আল্লামা শিবলী নু'মানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন-নবী, ২খ., অনুবাদ এ.কে.এম. ফজলুর রহমান মুন্সী, বাংলাদেশ তাজ কোং লিঃ, ঢাকা ১৯৮৮ খৃ.; (২২) ইমাম মুসলিম, সাহীহ মুসলিম, দারুল মা'রিফা, বৈরুত, লেবানন তা.বি.; (২৩) সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন নবী (উর্দু), মাতবা'আ মা'আরিফ, আজমগড়; (২৪) শায়খুল হাদীছ মাওঃ মুহাম্মاد তফাজ্জল হোসাইন ও ড. এ. এইচ. এম. মুজতবা হোসাইন, হযরত মুহাম্মاد মুস্তফা' (س) : সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ ১৯৯৮ খৃ. / ১৪১৮ হি.; (২৫) আফযালুর রহমান, হযরত মুহাম্মاد (س) জীবনী বিশ্বকোষ, ই. ফা. বা., প্রকাশকাল ১৯৮৯ খৃ. / ১৪১০ হি.; (২৬) আল- কাসতাল্লানী, আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়‍্যা আল-মাকতাবুল ইসলামী, প্রথম সংস্করণ ১৯৯১ খৃ. / ১৪১৬ হি.; (২৭) আবূ উসামা সালীম ইব্‌ন ঈদ আল-হিলালী, শারহু রিয়ادিস-সালেহীন, দারু ইবনিল-জাওযী, প্রথম সংস্করণ ১৯৯৪ খৃ. / ১৪১৫ হি.; (২৮) ইমাম বুখারী; বাংলা বুখারী, ই. ফা. বা. দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৯৫ খৃ. / ১৪১৫ হি.; (২৯) শায়খ মুসলিহ উদ্দীন সাদী সীরাজী, বুস্তা, কুতুব-ই পাহলাবী, তা.বি.; (৩০) ইমাম গাযালী, কীমিয়া-ই সা'আদাত, অনুবাদ মাওলানা নূরুর রহমান, এমদাদিয়া লাইব্রেরী, ঢাকা, ষষ্ঠ প্রকাশ ১৯৯৫ খৃ.; (৩১) হযরত রাসূল করীম (স), জীবন ও শিক্ষা, ইসলামী বিশ্বকোষ সম্পাদনা পরিষদ, ই.ফা.বা., প্রথম সংস্করণ ১৯৯৭ খৃ. / ১৪১৮ হি।
মুহাঃ মুজিবুর রহমান

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিনয় ও নম্রতা

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিনয় ও নম্রতা


لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُفٌ رَّحِيمُ .
"অবশ্যই তোমাদের মধ্য হইতেই তোমাদের নিকট এক রাসূল আসিয়াছে। তোমাদেরকে যাহা বিপন্ন করে উহা তাহার জন্য কষ্টদায়ক। সে তোমাদের কল্যাণকামী। মু'মিনদের প্রতি সে দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু" (৯: ১২৮)।
আলোচ্য আয়াতের মর্মানুযায়ী মানবজাতির বিপদগ্রস্ত হওয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক। হযরত ইবন 'আব্বাস (রা) বলেন, তোমাদের বিপদাপদ রাসুলুল্লাহ (স)-এর জন্য কষ্টদায়ক। কুতায়বী বলেন, তোমাদের বিপদ রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য অস্বস্তিকর (তাফসীরে মাযহারী, ৪খ., পৃ. ৩২৮)।
আয়াতে উল্লিখিত 'রাউফ' শব্দের অর্থ অনুকম্পাশীল। আর 'রাহীম' শব্দের অর্থ অপরিসীম দয়ালু। 'রাউফে' রহিয়াছে অনুরাগসঞ্জাত দয়ার্দ্রতা আর 'রাহীমের' মধ্যে করুণাসঞ্জাত আশীর্বাদ। কেহ কেহ বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার প্রিয়তম সহচরগণের প্রতি 'রাউফ' ছিলেন, আর অবিশ্বাসীদের প্রতি 'রাহীম' ছিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যিনি দয়ার্দ্র ছিলেন তিনি বিনয়ী এবং বিনম্রও ছিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২৮)।
অহংকারের বিপরীত শব্দ বিনয়। বিনয় ও নম্রতা মানুষের একটি গুণ। একজন মানুষ তাহার মর্যাদাকে সকলের ঊর্ধ্বে মনে করিলে তাহা হইবে অহংকার। আর যদি স্বীয় মর্যাদাকে সকলের নিম্নে মনে করে তবে তাহাই হইবে বিনয় ও নম্রতা (মাদারিজুন নুবৃওয়াহ, ১খ., পৃ. ৭৯)।
একদা জুনায়দ বাগদাদীকে কেহ জিজ্ঞাসা করিয়াছিল- বিনয় বা নম্রতা কি? তিনি বলিয়াছিলেন, স্কন্ধদ্বয় অবনমিত করা। পার্শ্বদেশে ঝুঁকিয়া থাকার নামই বিনয় বা নম্রতা। তিনি আরও বলিয়াছেন, বিনয়ী ব্যক্তি সত্যের প্রতি অনুগত হইবে। তোমার কর্তব্য হইবে, সে যে সত্য বলিবে, তুমি তাহা গ্রহণ করিবে। তাহার পক্ষ হইতে যাহাই বলা হইবে, বিনা বাক্য ব্যয়ে তাহাই তুমি মান্য করিবে।
এই বিনয় ও নম্রতার মুকুটমণি ছিলেন সায়্যিদুল আম্বিয়া মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)। তিনি সতত আল্লাহ পাকের সমীপে মিনতি জানাইতেন, "আয় আল্লাহ! তুমি আমার চোখে আমাকে
তুচ্ছ করিয়া দেখাও আর শ্রেষ্ঠ করিয়া দেখাও অপরাপর মানুষের চোখে” (মাদারিজুন নুবুওয়াহ, ১খ., পৃ. ৭৯)।
হযরত উমার (রা) বলেন, আল্লাহ পাক মহানবী (স)-কে এই স্বাধীনতা দান করিয়াছিলেন যে, তিনি নবী-বাদশাহ হইবেন, না নবী-বান্দা। মহানবী (স) নিজেকে নবী-বান্দা হওয়াই শ্রেয় মনে করিয়াছিলেন (কাযী 'ইয়াদ, আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ১৩০)। "যে ব্যক্তি আল্লাহ্ উদ্দেশ্যে বিনয়ী হয়, আল্লাহ পাক তাহার মর্যাদা উন্নত করিয়া দেন" এই বাণীর মর্মানুযায়ী মহানবী (স) গ্রহণ করিয়াছিলেন বিনয় ও নম্রতা। আর তাই আল্লাহ পাকও তাঁহাকে দান করিয়াছিলেন সমগ্র সৃষ্টির উপর এক বিশেষ মর্যাদা। মানুষের শ্রেষ্ঠতম নেতারূপে তাঁহাকে অধিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। তিনি- তাঁহার প্রিয়তম সহচরবৃন্দকে বলিতেন, "তোমরা আমার প্রশংসায় অতিরঞ্জন করিবে না, সীমা লঙ্গনও করিবে না। যেমন খৃস্টান সমাজ মরিয়ম তনয় নবী 'ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্র পুত্র বলে। পূর্ণতা ও শ্রেষ্ঠ মর্যাদা অর্জন করা সত্ত্বেও আমি আল্লাহ্রই বান্দা। তাই তোমরাও আমাকে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল বলিও” (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ২০৪)। একদা জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সান্নিধ্যে উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে দেখামাত্রই ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িল। এতদ্দর্শনে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে বলিলেন, আমি মহাপরাক্রশালী কোন রাজা-বাদশাহ নই। আমি এক মহিলার সন্তান যিনি শুকনা গোশত রান্না করিয়া ভক্ষণ করিতেন। হযরত 'আইশা (রা) বলেন, যে কোন ধরনের লোক তাঁহাকে আহ্বান করিলে তিনি তাহার আহ্বানে সাড়া দিতেন (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ২খ., পৃ. ২০৪; হাকেম, আল-মুসতাদরাক, ৩খ., পৃ. ৪৮)।
হযরত আবূ উমামা আল-বাহিলী (রা) বলেন, একদা মহানবী (س) লাঠিতে ভর দিয়া আমাদের নিকট আসিলেন। তাঁহার সম্মানার্থে আমরা দাঁড়াইয়া গেলাম। তিনি আমাদিগকে বলিলেন, অনারব লোকেরা কাহাকেও সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে যেইভাবে দাঁড়াইয়া যায়, তোমরা সেইভাবে দাঁড়াইবে না (কাযী 'ইয়াদ, আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ২৬৩)। তিনি আরও বলিলেন, আমি আল্লাহর বান্দা, তাঁহার অন্যান্য বান্দাদের মতই পানাহার করি। আমিও সেইভাবে উপবেশন করি যেইভাবে তাহারা উপবেশন করে (কাযী 'ইয়াদ, আশ-শিফা ১খ., ২৬৩)। মহানবী (স)-এর এই বাণীতে তাঁহার বিনয়-নম্রতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়াছে।
রাসূলুল্লাহ (স) ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত নম্র, সদাচারী, সদালাপী ও রুচিবোধসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। হযরত 'আইশা, হযরত আলী, হযরত আনাস (রা)-সহ তাঁহার অনেক সাহাবীর বর্ণনা হইতে জানা যায়, তিনি বরাবরই একজন খোশমেযাজী লোক ছিলেন। তাঁহার আচরণে কখনও অসৌজন্যের প্রকাশ ঘটিতে দেখা যায় নাই। প্রায় সময়ই উৎফুল্লচিত্ত ও হাসি-খুশী থাকিতেন। তাঁহার পবিত্র নয়ন-যুগল হইতে সর্বদা আনন্দঘন উজ্জ্বল দীপ্তি ঝরিয়া পড়িত। আবূ ইসহাক বর্ণনা করেন, একবার হযরত বারাআ ইবন 'আযিবকে জিজ্ঞাসা করা হইল, মহানবী (স)-এর দেহ মোবারকের ঔজ্জ্বল্য শাণিত তরবারির দীপ্তির মত ছিল কিনা। প্রত্যুত্তরে তিনি বলেন, না, বরং তাহা পূর্ণিমার চন্দ্রের ন্যায় স্নিগ্ধ ছিল। হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আমর (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (س) কখনও অশোভন ও অমার্জিত ভাষা মুখে উচ্চারণই
করেন নাই। অভ্যাস বশত এবং অসতর্কভাবে কখনও অশালীন বচন তাঁহার যবান হইতে বাহির হয় নাই (আত্-তাবাকাতুল-কুবরা, ১খ., পৃ. ৩৭৮)!
উম্মুল মু'মিনীন হযরত আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলিতেন, তোমাদের মধ্যে তাহারাই উত্তম যাহারা উত্তম চরিত্রের অধিকারী (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৯১)। তিনি আরও বলিয়াছেন, চরিত্রে মাধুর্যের চরম উৎকর্ষতার উদ্দেশ্যেই আমি আবির্ভূত হইয়াছি। তিনি আরও বলিয়াছেন, ইহজগতে বিনয়কে অধিক হাল্কা মনে হইলেও পরজগতে উহার ওজন অত্যধিক ভারী হইবে (আত্-তাবাকাতুল-কুবরা, ১খ., পৃ. ৩৭৭)।
হযরত জারীর ইবন আবদুল্লাহ (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, ইসলাম গ্রহণ করার পর যখনই আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সান্নিধ্যে উপস্থিত হইতাম, তখনই তিনি আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানাইতেন। আমাকে সাধুবাদ জানাইবার সময় তাঁহাকে আমি হাস্যোজ্জ্বল দেখিতাম। হযরত 'আইশা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) অপেক্ষা অধিকতর বিনয়ী দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি আমার নজরে গড়ে নাই। যে কোন লোকের সহিত সাক্ষাত হইলে প্রথমেই তিনি সালাম জানাইতেন। আগন্তুকের কুশলবার্তা তিনি জিজ্ঞাসা করিতেন। কোন ব্যক্তি একান্তে তাঁহার সহিত কথা বলিতে চাহিলে তাহার কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এবং স্বেচ্ছায় প্রস্থান না করা পর্যন্ত তিনি তাহার দিক হইতে মুখ ফিরাইতেন না। কাহারও সহিত করমর্দনকালে তিনি স্বীয় হস্ত সরাইতেন না যতক্ষণ পর্যন্ত সেই লোকটি তাহার হস্ত সরাইয়া না লইত। সাহাবীদের সহিত উপবেশনকালে তিনি এমনভাবে উপবেশন করিতেন যাহাতে তাঁহাকে তাঁহাদেরই একজন বলিয়া মনে হইত। তিনি কখনও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত উচ্চাসন কিম্বা স্থানে উপবেশন করিতেন না। সাহাবীদের দিকে কদম মুবারক ফিরাইয়া বসিতেন না। বৈদেশিক প্রতিনিধিদলসহ অনেক লোক তাঁহার সহিত সাক্ষাত করার উদ্দেশ্যে মদীনায় আগমন করিত। দেখা যাইত, তিনি মসজিদে বসিয়া তাঁহার সাহাবীদের সহিত আলাপ-আলোচনা করিতেছেন। তাঁহার সাধারণ পোশাক ও বসিবার ধরন-ধারণের কারণে তাঁহাকে সনাক্ত করা প্রতিনিধিদলের পক্ষে কষ্টকর হইত (আত্-তাবাকাতুল-কুবরা, ১খ., পৃ. ৩৭৮)।
একবার আবিসিনিয়ার সম্রাটের কয়েকজন দূত তাঁহার সহিত সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে মদীনায় আগমন করেন। মহানবী (س) মেহমান হিসাবে তাহাদেরকে নিজের কাছেই রাখেন, স্বহস্তে তাহাদের সেবা ও দেখাশুনা করেন। তাঁহার সাহাবীগণের অনেকেই মেহমানবর্গের আতিথেয়তার দায়িত্ব তাঁহাদের উপর ছাড়িয়া দেওয়ার প্রস্তাব করিলে তিনি বলেন, ইহারা একদিন আবিসিনিয়ায় আশ্রয় গ্রহণকারী আমার সাহাবীগণের সেবাযত্ন করিয়াছিল। সুতরাং তাহাদের সেবার দায়িত্ব পালনও আমার নিজেকেই করিতে হইবে (মাদারিজুন-নুবৃওয়াহ, ১খ., পৃ. ৮৩)।
বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবী ছিলেন হযরত 'ইতবান ইবন মালিক (রা)। তাঁহার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হইয়া আসিলে একবার তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আমাদের লোকালয়ের মসজিদে নামায পড়াইতাম। বৃষ্টি নামিলে মসজিদে উপস্থিত হওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব হইয়া পড়ে। আপনি আজ আমার
বাড়িতে উপস্থিত হইয়া সালাত আদায় করেন, তাহা হইলে আপনার সালাত আদায়ের স্থানকে আমার নামাযের স্থান নির্ধারণ করিয়া সেখানেই আমি সালাত আদায় করিব। পরদিন বেলা উপরে উঠিলে রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহার একান্ত ঘনিষ্ঠ সাহাবী হযরত আবূ বকর (রা)-কে সঙ্গে লইয়া হযরত ইতবানের বাড়িতে গমন করেন। গৃহদ্বারে উপস্থিত হইয়া ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাহিলেন। ভিতর হইতে অনুমতি আসিলে তিনি প্রবেশ করিয়া ইতবানকে বলিলেন, সালাত কোথায় আদায় করিব দেখাইয়া দাও। সালাতের স্থান দেখাইয়া দেওয়া হইলে তিনি তাকবীর পাঠ করিয়া দুই রাকাত সালাত আদায় করিলেন। সালাতঅন্তে জনগণ তাঁহাকে আহারের জন্য অনুরোধ করিতে লাগিল। কীমার উপর আটার প্রলেপে তৈরীকৃত খামীরা উপস্থিত করা হইল। জনপদের সকলেই ভোজনে অংশগ্রহণ করিলেন। ভোজনপর্ব সম্পন্ন হওয়ার পর জনগণের মধ্য হইতে একজন বলিল, মালিক ইবনুদ্‌-দুখায়শিনকে দেখা যাইতেছে না কেন? অপর একজন বলিল, সে তো মুনাফিক। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, তোমরা এইভাবে কথা বলিবে না। সেও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলিয়াছে। জনগণ বলিল, তাহার আচরণ কপটাচারী প্রকৃতির। ইহাতে মহানবী (س) বলিলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ পাককে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলে, আল্লাহ পাক তাঁহার উপর নরকানল হারাম করিয়া দেন (আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, ২খ, পৃ. ১৮০; সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ৬১; সালাত, বাব আল-মাসজিদ ফিল বুয়ূত)।
হিজরতের প্রাথমিক অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) মুহাজিরদিগকে লাইয়া আনসারগণের বাড়িতে মেহমান হিসাবে অবস্থান করিতেন। দশজন লোকের একটি দল একজন আনসারীর বাড়িতে থাকিবার নিয়ম ছিল। হযরত মিকদাদ ইব্‌ন আসওয়াদ বলেন, আমিও সেই দলে ছিলাম যে দলে মহানবী (س) ছিলেন। বাড়ীর মালিকের ছিল কয়েকটি ছাগল। ঐ ছাগলের দুধ দ্বারাই সমাধা হইত নিত্যদিনের আহার পর্ব। ছাগলের দুধ দোহন করার পর প্রত্যেকেই স্ব স্ব অংশ পান করিত আর রাসূলুল্লাহ (س)-এর অংশ রক্ষিত থাকিত দুধের পাত্রেই। একদিনের ঘটনা, মহানবী (স)-এর আগমনে কিছুটা বিলম্ব হইল। অন্যান্য সকলে স্ব স্ব দুধ পান করিয়া শয্যাগমন করিল। মহানবী (س) প্রত্যাবর্তন করিয়া লক্ষ করিলেন যে, পাত্রে কোন দুধ নাই। কিছুক্ষণ তিনি নীরব থাকার পর বলিলেন, হে আল্লাহ্! আজ আমাকে যে ভোজন করাইবে তুমি তাহাকে ভোজন করাইও। এই কথা শ্রবণমাত্র হযরত মিকদাদ শাণিত অস্ত্রসহ গাত্রোত্থান করিলেন এই উদ্দেশ্যে যে একটি ছাগল যবেহ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে আপ্যায়িত করিবেন। মহানবী (স) ইহাতে বাধা দিলেন এবং ছাগল দোহন করিয়া যতটুকু দুধ পাইলেন তাহা পান করিয়া নীরবে শয্যাগ্রহণ করিলেন (আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ২খ., পৃ. ১৮০)।
হযরত আবূ শু'আয়ব ছিলেন একজন আনসারী সাহাবী। তাঁহার ক্রীতদাস বাজারে গোশত বিক্রয় করিতেন। একদা হযরত আবূ শু'আয়ব সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে মহানবী (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া তাঁহার শরীরে ক্ষুধার লক্ষণ প্রত্যক্ষ করিলেন। গৃহে প্রত্যাবর্তন করিয়া ক্রীতদাসকে পাঁচজনের আহার্য প্রস্তুত করিবার নির্দেশ দিলেন। আহার্য প্রস্তুত হইলে তিনি মহানবী (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া আতিথ্য গ্রহণের নিবেদন জানাইলেন। উপস্থিত সাহাবী
পাঁচজন ছিলেন। তাঁহাদেরকে সঙ্গে লইয়া মহানবী (স) যাত্রা করিলে পথে আরও একজন সঙ্গী জুটিল। তিনি আবূ শু'আয়বকে বলিলেন, এই লোকটি আমাদের সঙ্গে আসিয়াছে। তুমি ইচ্ছা করিলে তাহাকে অনুমতি দিতে পার, অন্যথা তাহাকে বিদায় দিতে পার। হযরত আবূ শু'আয়ব বলিলেন, বরং আমি তাহাকে অনুমতি দিলাম (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৮২১, শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ১৮০)।
রাসূলুল্লাহ (س) উকবা ইব্‌ন আমেরকে সঙ্গে লইয়া একটি সংকীর্ণ গিরিপথ অতিক্রম করিতেছিলেন। তিনি উটের পিঠে আরোহী ছিলেন। কিছু দূর যাওয়ার পর পালা হিসাবে তিনি উকবাকে উটের পিঠে আরোহণ করিতে বলিলেন। কিন্তু উকবা উটের পিঠে আরোহণ করা সঙ্গত মনে করিলেন না। কারণ, রাসূলুল্লাহ (স) চলিবেন পায়ে হাঁটিয়া আর তিনি থাকিবেন উটের পিঠে আরামে বসিয়া, বিষয়টি তিনি কোনক্রমে মানিয়া লইতে পারিতেছিলেন না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (س) উটের পিঠ হইতে অবতরণ করিলেন এবং হযরত উকবা ইব্‌ন আমেরকে বাধ্য করিলেন উটের পিঠে আরোহণ করিতে (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ১৮০)।
মহানবী (স)-এর উল্লিখিত সদাচরণ এমন পর্যায়ের ছিল যে, সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে জনগণের অসৌজন্যমূলক আচরণ ও অশালীন বাক্যও তিনি নীরবে সহ্য করিতেন। এইসব ব্যাপারে কখনও তাঁহাকে কোনরূপ অনুযোগ করিতেও দেখা যায় নাই। উম্মুল মু'মিনীন হযরত যয়নাব (রা)-র বিবাহ উপলক্ষে ওলীমার ভোজনানুষ্ঠানে তিনি বেশ কিছু লোককে দাওয়াত করিয়াছিলেন। ভোজন পর্ব সম্পন্ন হওয়ার পর কিছু সংখ্যক মেহমান গভীর রাত পর্যন্ত নানাবিধ খোশগল্পে নিমগ্ন ছিল। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) বেশ অসুবিধা বোধ করিতেছিলেন এবং পায়চারী করিতেছিলেন-একবার বহির্বাটিতে একবার অন্দর মহলে। নিতান্ত অসুবিধা সত্ত্বেও তিনি গল্পরত মেহমানদিগকে কিছুই বলেন নাই। এমনকি তাঁহার পবিত্র মুখমণ্ডলেও কোন অসন্তুষ্টির ভাব পরিলক্ষিত হয় নাই। এই ঘটনার পরপরই সামাজিক আচরণে মুসলমানদিগকে অধিক মার্জিত হইতে শিক্ষাদানের লক্ষ্যে আল্লাহ পাকের পক্ষ হইতে নির্দেশনা আসে:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتَ النَّبِيَّ إِلَّا أَنْ يُؤْذَنَ لَكُمْ إِلَى طَعَامٍ غَيْرَ نَظَرِينَ آنَاهُ وَلَكِنْ إِذَا دُعِيْتُمْ فَادْخُلُوا فَإِذَا طَعِمْتُمْ فَانْتَشِرُوا وَلَا مُسْتَأْنِسِينَ لِحَدِيْثِ إِنَّ ذَلِكُمْ كَانَ يُؤْذِي النَّبِيَّ فَيَسْتَحْيِي مِنْكُمْ وَاللَّهُ لَا يَسْتَحْيِي مِنَ الْحَقِّ.
"হে মু'মিনগণ! তোমাদিগকে অনুমতি দেওয়া না হইলে তোমরা আহার্য প্রস্তুতির জন্য অপেক্ষা না করিয়া ভোজনের জন্য নবীগৃহে প্রবেশ করিও না এবং ভোজন শেষে তোমরা চলিয়া যাইও, কথাবার্তায় মশগুল হইয়া পড়িও না। কারণ তোমাদের এই আচরণ নবীকে পীড়া দেয়। সে তোমাদিগকে উঠাইয়া দিতে সংকোচবোধ করে। কিন্তু আল্লাহ সত্য বলিতে সংকোচবোধ করেন না" (৩৩ঃ ৫৩; তাফসীরে মাযহারী, ৭খ., পৃ. ৩৭০)।
একদা জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর গৃহে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করিল। তিনি তাঁহার পরিবারের সম্মানিত সদস্যবৃন্দকে জানাইলেন, লোকটি তাহার গোত্রের নিকট সুধীজন
বলিয়া বিবেচিত নয়। তিনি তাহাকে প্রবেশের অনুমতি প্রদান করিলেন। সে প্রবেশ করিলে তিনি অত্যন্ত সৌজন্যসুলভ ভাষায় তাহার সাথে কথাবার্তা বলিলেন। লোকটির বিদায় হওয়ার পর হযরত 'আইশা (রা) মহানবী (স)-এর নিকট সবিস্ময়ে নিবেদন করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! লোকটি যদি অশালীনই হয় তবে আপনি কেন তাহার সহিত অন্তরঙ্গভাবে বাক্য বিনিময় করিলেন? জওয়াবে রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করিলেন, 'আইশা! মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বাধিক নিকৃষ্ট যাহার কটূক্তির ভয়ে মানুষ তাহার নিকট হইতে দূরে থাকে, তাহার সহিত মেলামেশা বন্ধ করিয়া দেয় (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৯৪)।
অস্বীকার করার উপায় নাই যে, ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি ইয়াহুদীদিগের বিদ্বেষমূলক শত্রুতা একটি সত্য বিষয় ছিল। তৎসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সহিত সদা সদ্ব্যবহার করিতেন, খোলামনে তাহাদিগকে অভ্যর্থনা জানাইতেন। অথচ ইয়াহুদীরা বারংবার মুসলিম মহিলাদেরকে উত্যক্ত করিত। রাসূলুল্লাহ (س) সম্পর্কে তাহারা কুৎসিত ভাষায় কথাবার্তা বলিত, তাঁহার দুর্নাম রটাইত, এমনকি একাধিক বার তাঁহার প্রাণনাশেরও চেষ্টা করিতে কুণ্ঠিত হয় নাই। এতদসত্ত্বেও ইয়াহূদীদিগের প্রতি তাঁহার আচরণে বিন্দুমাত্র অসৌজন্যের প্রকাশ ঘটিতে দেখা যায় নাই। হযরত 'আইশা (রা) বলিয়াছেন, একদা একদল ইয়াহুদী রাসুলুল্লাহ (س)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া 'আসামু 'আলায়কুম' (তোমার মৃত্যু আসুক) বলিয়া সালাম-জানাইল। হযরত 'আইশা (রা) বলেন, আমি তাহাদের সম্বোধন যথার্থ উপলব্ধি করিয়া ক্রোধান্বিত হইয়া তাহাদের উদ্দেশ্যে বলিলাম, তোমাদের উপরও মৃত্যু আসুক। আমার কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলিলেন, ক্ষান্ত হও, 'আইশা, শান্ত হও। আল্লাহ পাক সব ক্ষেত্রেই নম্রতাকে পসন্দ করেন। হযরত 'আইশা (রা) বলেন, আমি আরয করিলাম, তাহারা যাহা বলিয়াছে আপনি নিশ্চিয় উহা শুনিয়াছেন। তিনি বলিলেন, আমিও তাহাদিগকে সমুচিত জবাব দিয়াছি। বলিয়াছি, তোমাদের উপরও (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৯০)।
একজন আনসারী একবার এক ইয়াহুদীকে এইরূপ কথা বলিতে শুনিলেন-আল্লাহর শপথ। যিনি হযরত মূসা (আ)-কে সকল মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেন। সাহাবী ধারণা করিলেন, কথাটির দ্বারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর অবমাননা করা হইতেছে। তিনি ক্রোধবশত ইয়াহুদীটিকে একটি চড় মারিলেন। ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমীপে সেই আনসারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করিল। রাসূলুল্লাহ (স) আনসারীকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। তিনি উপস্থিত হইলে ঘটনার সত্যতা যাচাই করিয়া বলিলেন, তোমরা আমাকে সকল নবীর উপর ফযীলত দিও না (হাকেম, আল-মুসতাদরাক, ৪খ., পৃ. ৩১৭; শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ২০৪)।
রাসূলুল্লাহ (س)-এর দরবার সর্বদা লোকজনে পরিপূর্ণ থাকিত। যাহারা বিলম্বে আসিত, তাহাদের জন্য খুব একটা খালি জায়গা থাকিত না। তাঁহার সাহাবীগণ তড়িঘড়ি করিয়া আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকটবর্তী স্থানে বসিয়া পড়িতেন। অতঃপর যাহারা পরে আসিত তাহাদের জন্য রাসূলুল্লাহ (س) স্বীয় কম্বল বিছাইয়া দিতেন। একবার জি'ইররানা' নামক স্থানে তিমি জনগণের মধ্যে গোশত বণ্টন করিতেছিলেন। এমন সময় এক মহিলা তাঁহার সহিত সাক্ষাত
করার উদ্দেশ্যে তথায় আগমন করিল। সম্মানের সাথে তিনি মহিলাকে অভ্যর্থনা জানাইলেন। স্বীয় চাদর বিছাইয়া তাহাকে বসিতে দিলেন। এই ঘটনার বর্ণনাকারী অনুসন্ধান করিয়া জানিতে পারিয়াছিলেন যে, সেই আগন্তুক মহিলা ছিলেন তাঁহার দুধমাতা বিবি হালীমা (রা) (ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৪১৮)।
গৃহের কাজকর্ম তিনি স্বহস্তে সমাধা করিতেন। ঘর ঝাড়ু দিতেন, কাপড়ে তালি লাগাইতেন, দুধ দোহন করিতেন। বাজার হইতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করিয়া আনিতেন। জুতা ছিঁড়িয়া গেলে নিজেই সেলাই করিতেন। গাধার উপরে আরোহণ করিতেও তিনি কুণ্ঠাবোধ করিতেন না। ক্রীতদাস ও অভাবীদের সঙ্গে তিনি একত্রে বসিতেন এবং তাহাদের সহিত বসিয়া আহার করিতেও দ্বিধাবোধ করিতেন না। দীন-দরিদ্রও যদি রোগাক্রান্ত হইত তিনি তাহাদের দেখার জন্য নির্দ্বিধায় গমন করিতেন। তাঁহার মহান ব্যক্তিত্বের পার্থক্য বুঝা যাইত না। কোন সভায় গমন করিলে তিনি যেখানেই স্থান পাইতেন সেখানেই বসিয়া পড়িতেন (জামি'উত্-তিরমিযী, পৃ. ২০১)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিনয়-নম্রতা সুলভ আচরণের দৃষ্টান্ত এমনই ছিল যে, কখনও কখনও তিনি মাটিতে বসিয়া আহার করিতেন। তিনি বলিতেন, আমি আল্লাহর একজন বান্দা, একজন সাধারণ বান্দার মতই বসি ও আহার করি। একবার কোন এক ভোজানুষ্ঠানে বসিবার স্থান ছিল স্বল্প পরিসরের আর জনসমাগম ছিল অধিক। তিনি এক কোণে গিয়া বসিয়া পড়িলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল এক বেদুঈন। সে বলিল, হে মুহাম্মাদ! ইহা কেমন ধরনের বসা হইল তিনি বলিলেন, "আল্লাহ পাক আমাকে বিনয়ী বান্দারূপে সৃষ্টি করিয়াছেন, অত্যাচারী ও সীমালঙ্ঘনকারীরূপে সৃষ্টি করেন নাই" (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ২০৪)।
মহানবী (স)-এর স্বভাবে বিনয়-নম্রতা এতই প্রবল ছিল যে, তিনি তাঁহার সম্পর্কে বৈধ সম্মানসূচক সম্বোধনও পসন্দ করিতেন না। একবার জনৈক ব্যক্তি তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, হে আমাদের মহান পরিচালক। আমাদের পরিচালকের মহান সন্তান। তিনি বলিলেন, হে জনমণ্ডলী। তোমরা আল্লাহভীরুতা অবলম্বন কর। শয়তান তোমাদিগকে পদস্খলিত করিতে পারিবে না। আমি আবদুল্লাহ তনয় মুহাম্মাদ। আল্লাহর বান্দা ও তাঁহার রাসূল। আল্লাহ পাক আমাকে যে মর্যাদা দান করিয়াছেন, আমি পসন্দ করি না যে, তোমরা তদপেক্ষা বাড়াইয়া বল (ইবন হাম্বাল, মুসনাদ, ৩খ., পৃ. ৭৩)।
একবার জনৈক ব্যক্তি 'হে সৃষ্টির সর্বোত্তম' বলিয়া মহানবী (স)-কে সম্বোধন করিল। প্রত্যুত্তরে তিনি বলিলেন- তিনি ছিলেন পিতা ইব্রাহীম (আল-মিশকাতুল মাসাবীহ, পৃ. ৪১৭)।
হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন সুখায়র বলেন, আমের গোত্রের প্রতিনিধি দলের সহিত আমরা যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিলাম, আপনি আমাদের মহান নেতা। তিনি বলিলেন, মহান নেতা একমাত্র আল্লাহ পাক। অতঃপর আমরা পুনরায় আরয
করিলাম, আপনি আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তিনি বলিলেন, তোমরা যখন কথা বলিবে, তখন খেয়াল রাখিবে শয়তান তোমাদেরকে প্রতারণা করিতেছে কি না (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ২০৪)।
এক সময় এক মতিচ্ছন্ন মহিলা মদীনাতে বসবাস করিত। সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমীপে উপস্থিত হইয়া বলিল, আপনার সাথে একান্তে আমার কিছু কথা আছে। তিনি বলিলেন, তুমি আমাকে যেখানে যাইতে বলিবে আমি সেইখানেই যাইব। মহিলাটি রাসূলুল্লাহ (স)-কে সঙ্গে লইয়া একটি গলির মধ্যে গেল এবং সেখানেই সে বসিয়া পড়িল। রাসূলুল্লাহ (স)-ও সেখানে বসিয়া পড়িলেন। মহিলাটির যাহা প্রয়োজন উহা তিনি সমাধা করিয়া দিলেন (প্রাগুক্ত)।
হযরত মাখরামা (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রিয়তম সাহাবী। একবার তিনি তদীয় সন্তান সিজওয়ার (রা)-কে বলিলেন, বৎস! রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট কোথাও হইতে বেশ কিছু চাদর আসিয়াছে। তিনি তাহা বিতরণ করিতেছেন। চল, আমরাও তাঁহার নিকট যাই। অতঃপর তাঁহারা উভয়ে রওয়ানা হইলেন। তাহারা উপস্থিত হইয়া দেখেন, তিনি অন্দর মহলে প্রবেশ করিতেছেন। পিতা পুত্রকে বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-কে ডাক দাও। তিনি বলিলেন, আব্বা। আমার কি সেই যোগ্যতা আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স)-কে আহ্বান করিব? পিতা বলিলেন, বৎস! তিনি অত্যাচারী, বদমেযাজী নহেন। তুমি তাহাকে ডাক দাও। পিতার পক্ষ হইতে সাহস পাইয়া হযরত সিজওয়ার (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে ডাক দিলেন। ডাক শুনিয়া সঙ্গে সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (س) বাহির হইয়া আসিলেন। তাঁহাকে একটি রেশমী জুব্বা দান করিলেন যাহার বুতাম ছিল সোনালী রঙের (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৭১)।
হযরত আদী ইব্‌ন হাতিম (রা) একবার রাসূলুল্লাহ (স)-কে দাওয়াত করিয়া স্বগৃহে লইয়া আসিলেন। তাঁহাকে হেলান দেওয়ার জন্য এক দাসী একটি বালিশ আগাইয়া দিল। রাসূলুল্লাহ (স) বালিশটি আদী এবং নিজের মাঝে স্থাপন করিয়া তিনি মাটিতেই বসিয়া পড়িলেন। হযরত আদী বলেন, ইহাতেই আমি বুঝিতে পারিলাম যে, তিনি কোন রাজা-বাদশাহ নহেন (যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৪০)।
হযরত আনাস বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) পীড়িতের সেবা করিতেন, জানাযায় অংশগ্রহণ করিতেন এবং গাধার উপর আরোহণও করিতেন। ক্রীতদাসদের দাওয়াত গ্রহণ করিতেন (ইব্‌ন সা'দ, আত্-তাবাকাতুল-কুবরা, ১খ., পৃ. ৩৮২)।
হযরত আনাস (রা) আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-কে যবের রুটি ও স্বাদবিহীন ব্যঞ্জনের দাওয়াত করা হইলেও তিনি সাগ্রহে তাহা মঞ্জুর করিতেন (আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ১৩১)।
হযরত আনাস (রা)-এর আরও একটি বর্ণনায় আসিয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেন, আমি একজন বান্দা আর বান্দার মতই আহার ও উপবেশন করি (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ১০১)।
একবার প্রবাস যাত্রাকালে পথিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গী-সাথিগণ খাইবার উদ্দেশ্যে একটি ছাগল যবেহ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন। কাজের দায়িত্ব তাঁহারা নিজেদের মধ্যে বণ্টন
করিয়া লইলেন। একজন যবেহ করিবেন, একজন চামড়া ছাড়াইবেন এবং রান্না করিবেন আর একজন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি জ্বালানীর কাঠ সংগ্রহ করিয়া আনিব। সাহাবীগণ সবিনয় আপত্তি জানাইলেন যে, সে কাজটিও তাঁহারাই করিবেন, মহানবী (স)-কে কিছুই করিতে হইবে না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি জানি, তোমরা আমার কর্মটি অতি আগ্রহের সহিত করিবে। তবে সকলের মধ্যে আমি এইরূপ একজন বিশেষ ব্যক্তি হিসাবে অবস্থান গ্রহণ করিতে পসন্দ করি না। আর আল্লাহ পাকও উহা পসন্দ করেন না (মাদারিজুন নুবুওয়াহ, ১খ., পৃ. ৮২)।
হযরত আনাস (রা) বলেন, বানু কুরায়যার যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স) গাধার পিঠে আরোহণ করিয়া গমন করিয়াছিলেন। উহার গদি ও লাগাম খেজুরের আঁশ ও পাতার তৈরী ছিল (প্রাগুক্ত)।
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) একটি উটের পিঠে পুরাতন গদির উপর আরূঢ় অবস্থায় বিদায় হজ্জ পালন করিয়াছিলেন। তাঁহার পরিধানে অতি সাধারণ পোশাক ছিল; যাহার মূল্য চারি দিরহামের বেশী ছিল না। তিনি আল্লাহ পাকের নিকট দু'আ করিয়াছিলেন, হে আল্লাহ! তুমি আমার এই হজ্জকে গ্রহণ করিও, খ্যাতির অনিষ্টতা হইতে রক্ষা করিও (প্রাগুক্ত)। উল্লেখ্য যে, তাঁহার হৃদয়োৎসারিত এই প্রার্থনা ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের বিনয়-নম্রতা ও আনুগত্য প্রকাশ।
হযরত আনাস (রা) আরও বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রিয়তম সাহাবীবৃন্দ বিশ্বের সকল কিছু অপেক্ষা তাঁহাকে অধিক ভালবাসিতেন। তিনি অপসন্দ করিতেন বলিয়া তাঁহার আগমনের সময় কেহই দাঁড়াইতেন না (প্রাগুক্ত)।
মক্কার অধিবাসীরা একদিন রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাঁহার প্রিয় জন্মভূমি হইতে তাড়াইয়া দিয়াছিল। পরবর্তীতে তিনি সেই পুণ্যভূমি মক্কা নগরীতে প্রবেশ করেন বিজয়ী বেশে। কিন্তু তিনি একজন চিরাচরিত বিজয়ীর ন্যায় গর্ব ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেন নাই বরং তাঁহার বিনয় ও সৌজন্যের অভিব্যক্তি এমন পর্যায়ে পৌছিয়াছিল যে, বিনয়ের ভারে মস্তক অবনত হইয়া উটের গদির কাষ্ঠ পর্যন্ত নামিয়া আসিয়াছিল। অনুরূপভাবে খায়বার বিজয়ের পর যখন তিনি বিজয়ী বেশে নিজ শহরে প্রবেশ করিলে দেখা গেল, এমন একজন বিজয়ী যোদ্ধার বাহন ছিল একটি গাধা এবং উহার লাগাম ছিল খেজুর ডালের আশের তৈরি (প্রাগুক্ত)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, জনগণের উচিত তাহারা যেন তাহাদের পূর্বপুরুষদিগকে লইয়া গর্ববোধ না করে। তাহারা নরকের ইন্ধন বৈ আর কিছুই নয়। এমনকি আল্লাহ পাকের নিকট তাহাদের গুরুত্ব তুচ্ছ। তোমাদের ইসলাম-পূর্ব যুগের গৌরব ও তোমাদের পূর্বপুরুষদের লইয়া গর্ববোধ করিতে আল্লাহ পাক নিষেধ করেন। একজন মানুষের পরিচয়, হয় সে ধার্মিক মু'মিন নয়তো দুর্দশাগ্রস্ত অধার্মিক। তবে সকল মানুষই আদম সন্তান। আর আদমের সৃষ্টি মৃত্তিকা হইতে (আল-মিশকাতুল মাসাবীহ, পৃ. ৪১৮)।
মহানবী (স) বিনয় ও নম্রতার অনুকরণীয় প্রতীক ছিলেন। আরবজাতিকে তিনি শিক্ষা দান করিয়া গিয়াছেন বিনয়-নম্রতা অবলম্বনের। আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন:
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا إِلَى أَمْرٍ مِّنْ قَبْلِكَ فَأَخَذْتُهُمْ بِالْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ لَعَلَّهُمْ يَتَضَرَّعُونَ.
"তোমার পূর্বেও আমি বহু জাতির নিকট রাসূল প্রেরণ করিয়াছি। অতঃপর তাহাদিগকে অর্থসঙ্কট ও দুঃখ-ক্লেশ দ্বারা পীড়িত করিয়াছি যাহাতে তাহারা বিনীত হয়" (৬:৪২)।
ইহার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মানুষের জন্য বিনয়-নম্রতা একটি অপরিহার্য গুণ যাহা অর্জন করা মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক। আল্লাহ পাক মানুষকে বিপদাপদের সম্মুখীন করিয়াও নম্র স্বভাবে অভ্যস্ত করিতে চাহেন। দুর্বিনীত হওয়া মানুষের জন্য নিষিদ্ধ।
হযরত মূসা (আ)-ও তাঁহার অনুসারীবৃন্দকে বিনয়ী হওয়ার উপদেশ প্রদান করিতেন। যেমন কুরআন পাকের ভাষায় উল্লেখ হইয়াছে:
وَإِذَا قِيْلَ لَهُمُ اسْكُنُوا هَذِهِ الْقَرْيَةَ وَكُلُوا مِنْهَا حَيْثُ شِئْتُمْ وَقُولُوا حِطَةً وَادْخُلُوا الْبَابَ سُجَّدًا نَّغْفِرْ لَكُمْ خَطِيئَتِكُمْ وَ سَنَزِيدُ الْمُحْسِنِينَ.
"স্মরণ কর, তাহাদিগকে বলা হইয়াছিল, তোমরা এই জনপদে বাস কর ও যেথা ইচ্ছা আহার কর এবং বল, 'ক্ষমা চাই' এবং নতশিরে দ্বারে প্রবেশ কর। আমি তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করিব। আমি সৎকর্মপরায়ণদিগকে আরও অধিক দান করিব" (৭:১৬১)।
ইহাতে বুঝা যায়, ন্যায় ও সৎকর্মপরায়ণ এবং ধার্মিক লোকের জন্য বিনয়-নম্রতা একটি বিশেষ গুণ।
মহানবী (স)-এর বিনয়ের প্রকৃতি ছিল এই রকম: তিনি সাহাবীদিগকেও কখনও ধমক দিয়া কিছু বলিতেন না। হযরত আনাস (রা) বলেন, আমি দশ বৎসর যাবৎ মহানবী (স)-এর খেদমতে অবস্থান করিয়াছিলাম। তিনি কখনও ভর্ৎসনার সুরে কথা বলেন নাই। এমন কথাও বলেন নাই যে, 'তুমি এমনটি করিয়াছ কেন অথবা তুমি এমনটি কর নাই কেন' (সহীহ্ বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৯২)। পরিবার-পরিজনদের প্রতিও তিনি এমন অনুকম্পাশীল ছিলেন যাহার কোন দৃষ্টান্ত বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। হযরত 'আইশা (রা) বলেন, একমাত্র রণক্ষেত্র ব্যতীত তিনি কখনও কাহাকেও স্বীয় হস্ত দ্বারা প্রহার করেন নাই। ধর্মীয় অধিকার ব্যতিরেকে ব্যক্তিগত কারণে তিনি কাহারও নিকট হইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করেন নাই (মাদারিজুন নুবৃওয়াহ, ১খ., ৮২)।
মহানবী (স)-এর বিনয় ও নম্রতা এমনই আকর্ষণীয় ছিল যে, তিনি তাঁহার সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের মন জয় করিয়াছিলেন। তিনি কখনও কাহারও প্রতি অসন্তুষ্টির ভাব প্রকাশ করেন নাই। গোত্রপ্রধানদিগকে তিনি সম্মান প্রদর্শন করিতেন। তাঁহাদের উপরই ন্যস্ত করিতেন গোত্র পরিচালনার দায়িত্ব। তিনি সকলের জন্যই ছিলেন পরম পিতৃতুল্য বরং তাহা
অপেক্ষাও অধিকতর স্নেহশীল। তবে অধিকার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সকল মানুষই তাঁহার নিকট সমান ছিলেন।
হযরত আইশা (রা) বলেন, নন্দিত স্বভাবের ক্ষেত্রে মহানবী (স) অপেক্ষা অগ্রণী আর কেহই ছিল না। হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আবীল হুমামা (রা) বর্ণনা করেন, নবুওয়ত প্রাপ্তির পূর্বে আমি একবার মহানবী (স)-এর নিকট হইতে একটি বস্তু ক্রয় করিয়াছিলাম। মূল্য কিছু বাকী ছিল। আমি তাঁহার নিকট অঙ্গীকারাবদ্ধ হইয়াছিলাম যে, অমুক স্থানে গিয়া আমি আপনার বাকী পাওনা পরিশোধ করিব। অঙ্গীকারটি আমি বেমালুম ভুলিয়া গেলাম। তিন দিন পর অঙ্গীকারটি আমার স্মরণে আসিলে আমি তথায় উপস্থিত হইলাম। দেখিলাম, তিনি সেখানে সশরীরে উপস্থিত। আমি তো দিশাহারা হইয়া পড়িলাম। হায় হায়! তিনি যে আমাকে কি বলেন! দেখা গেল তিনি আমাকে শুধু এতটুকুই বলিলেন, তুমি আমাকে কঠিন অবস্থায় ফেলিয়া রাখিয়াছ। আজ তিন দিন যাবৎ তোমার প্রতীক্ষায় আমি এখানে বসিয়া আছি (আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ১২৬)। ঘটনাটি হইতে একজন মহামানবের সীমাহীন বিনয়, ধৈর্য ও অঙ্গীকার রক্ষার বিরল দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করা যায়।
রাসূলে পাক (স)-এর আর একটি নন্দিত স্বভাব ছিল, তাঁহার নিকট আগত আগন্তুককে তিনিই সর্বপ্রথম সালাম করিতেন। কদাচিৎ কেহ তাঁহাকে আগেই সালাম দিয়া ফেলিলে অতি সৌজন্যের সহিত তিনি সালামের প্রত্যুত্তর করিতেন। ইহাও ছিল তাঁহার বিনয়েরই এক চরম নিদর্শন।
আল্-ওয়াকিদী তদীয় গ্রন্থে যুদ্ধ বিষয়ক অধ্যায়ে উল্লেখ করিয়াছেন, হযরত 'আইশা (রা)-র মুক্ত এক দাস বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) হযরত 'আইশা (রা)-র সম্মুখে এক বন্দীকে উপস্থিত করিয়া বলিলেন, ইহাকে সর্বদা সর্বোচ্চ সতর্ক পাহারায় রাখিতে হইবে। এইটুকু বলিয়াই তিনি অন্যত্র প্রস্থান করিলেন। হযরত 'আইশা (রা) বন্দীটির প্রতি সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখিতেছিলেন। হঠাৎ আগন্তুক এক মহিলার সহিত আলাপ করিতে গিয়া তিনি কিছুটা অন্যমনস্ক হইয়া পড়িয়াছিলেন। ইত্যবসরে বন্দীটি পলায়ন করিল। কিছুক্ষণ পরই রাসূলুল্লাহ (স) অন্দর মহলে প্রবেশ করিলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন, বন্দী লোকটিকে দেখিতেছি না কেন? প্রত্যুত্তরে হযরত 'আইশা (রা) বলিলেন, লোকটি এখানেই তো ছিল। গেল কোথায়? ইহাতে মহানবী (স) কিছুটা উৎকণ্ঠিত হইয়া বলিলেন, 'আল্লাহ পাক তোমার হাতটা কাটিয়া ফেলুক'। এই বলিয়া তিনি দ্রুত প্রস্থান করিলেন। অপেক্ষমান সাহাবীদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, মালযামের পশ্চাদ্ভূমি হইতে শীঘ্রই বন্দী লোকটিকে খুঁজিয়া বাহির করিয়া লইয়া আস। নির্দেশ শোনামাত্র অনুসন্ধানকারিগণ দ্রুত বাহির হইয়া পড়িলেন এবং তাহাকে বন্দী করিয়া পুনরায় রাসূলুল্লাহ (স) সমীপে উপস্থিত করিলেন। ইহার পর তিনি শান্ত মনে অন্দর মহলে প্রবেশ করিলেন। তিনি লক্ষ্য করিলেন, হযরত 'আইশা (রা) এক স্থানে নীরবে বসিয়া তাহার হাত দুইখানি এপিঠ ওপিঠ করিয়া দেখিতেছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, ব্যাপার কি 'আইশা? এইভাবে হাতে উলট-পালট
করিয়া কি দেখিতেছ? প্রত্যুত্তরে হযরত 'আইশা (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ। আপনি আমার হাত কাটিয়া পড়ার জন্য বদদো'আ করিয়াছেন। আপনার বদদো'আ কার্যকর হওয়ার প্রতীক্ষায় আমি প্রহর গুনিতেছি। কখন আমার হাতটি কাটিয়া পড়ে। সাথে সাথে মহানবী (স)-এর হৃদয়খানি বিনম্র হইয়া গলিয়া গেল। তিনি হাত দুইখানি ঊর্ধ্বে উত্তোলন করিয়া দো'আ করিতে লাগিলেন, হে আমার আল্লাহ! আমি তো একজন মানুষ। সুতরাং ভুল, ক্রোধ প্রভৃতি মানবিক বৃত্তিগুলি কখনও কখনও আমার স্বভাবে ছায়াপাত করিতে পারে। কাজেই হে আমার একমাত্র জীবনাধিকারী। আমি যদি কোন ঈমানদার নর বা নারীর জন্য বদদো'আ করি, তবে তুমি আমার সেই বদদো'আ তাহার জন্য নেকদো'আয় পরিণত করিয়া দিও (আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল-মাগাযী, ২খ., ৫৫৪)।
উপরিউক্ত আলোচনা হইতে আমরা মহানবী (স)-এর বিনয় ও নম্রতা সম্পর্কে সম্যক অবগত হইতে পারি।
গ্রন্থপঞ্জী : (১) মুহাম্মাদ ইব্‌ন ইসমাঈল, সহীহ বুখারী, দরিয়াগঞ্জ প্রকাশনী, নতুন দিল্লী, তা.বি.; (২) মুহাম্মাদ ইব্‌ন ঈসা, শামাইলুন-নবী, ইয়াহ্ইয়া কুতুবখানা, মাযাহিরুল-উলুম মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট, কানপুর, ভারত, তা. বি.; (৩) আবূ দাউد সুলায়মান ইব্‌ন আশ'আছ, সুনান আবূ দাউد, প্রকাশক, দারু ইহয়াউস-সুন্নাহ, দরিয়াগঞ্জ, নতুন দিল্লী; (৪) আহমاد ইব্‌ন হাম্বাল, মুসনাদ, মাকতাবা-ই ইসলামী, বৈরূত, তা. বি.; (৫) কাযী ছানাউল্লাহ পানিপথি, তাফসীরে মাযহারী, রাশীদিয়া প্রকাশনী, কোয়েটা, পাকিস্তান, তা. বি.; (৬) কাযী 'ইয়াদ ইব্‌ন মূসা, আশ-শিফা, আল-ফারাবী প্রকাশনী, দামেশক সোয়াজ-বা পৃ. ২৩৮২; (৭) ইসমাঈল ইব্‌ন কাছীর দামেশকী, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ইহয়াউত তুরাছুল-আরাবী প্রকাশনী, ১৯৮৮ খৃ.; (৮) ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা, যাদুল-মা'আদ, মাকতাবা ইসলামী, বৈরূত তা.বি.; (৯) শায়খ আবদুল হক, মাদারিজুন-নুবৃওয়াহ্, প্রকাশক, সাঈদ কোম্পানী, চকবাজার, করাচী, পাকিস্তান, তা. বি.; (১০) আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল-মাগাযী, অক্সফোর্ড ইউনিভারসিটি প্রেস, লণ্ডন, ১৯৬৬ খৃ.; (১১) ওয়ালীউদ্দীন ইব্‌ন মুহাম্মাদ ইব্‌ন আব্দুল্লাহ, আল-মিশকাতুল-মাসাবীহ, আল- মুজতাবায়ী প্রকাশনী, দিল্লী।
মোহাম্মদ তালেব আলী

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর দয়ার্দ্রতা

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর দয়ার্দ্রতা


দয়ার্দ্রতা রাসূলুল্লাহ (স)-এর পূতপবিত্র জীবনাদর্শের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁহার সম্পর্কে রব্বুল 'আলামীন ঘোষণা করেন, "আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করিয়াছি” (২১:১০৭)।
দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তিনি ছিলেন পরম সহানুভূতিশীল এবং দয়ার্দ্র। উম্মুল-মু'মিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা) বলেন, "নবী করীম (স) সদাসর্বদা গরীব-মিসকীনদের মঙ্গল কামনা করিতেন। তিনি নিজে তাহাদের জীবিকা উপার্জনের ব্যবস্থা করিয়া দিতেন। কাহারো কোন কষ্ট দেখিলে তিনি অস্থির হইয়া পড়িতেন এবং ইহার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তাঁহার চেহারায় কোন প্রশান্তির চিহ্ন দেখা যাইত না” (সহীহ মুসলিম, আস্-সাদাকাত, ২খ., পৃ. ৪০৫, হাদীছ ১০১৭)।
দরিদ্র ও অসহায়দের প্রতি নবী করীম (স)-এর দয়ার্দ্রতা গুণ যে কত বেশী ছিল উহার প্রমাণ হইল, আল্লাহ্র দরবারে তাঁহার একটি বিশেষ মোনাজাত ৪ "হে আল্লাহ! আমাকে দরিদ্র অবস্থায় জীবিত রাখিও, দরিদ্র অবস্থায় মৃত্যু দান করিও এবং দরিদ্রদের সঙ্গে আমার হাশর করিও” (মিশকাত, ২খ., পৃ. ৬৬৫, হাদীছ ৫২৪৪)।
গনীমত হিসাবে নবী করীম (স)-এর নিকট কোন দাস-দাসী আসিলে তিনি তাঁহার নিজের আত্মীয়-স্বজন, এমনকি তাঁহার স্নেহময়ী কন্যা ফাতিমা (রা)-এর তুলনায়ও তাহাদের উপর দরিদ্রদের অধিকারকে অগ্রগণ্য মনে করিতেন। নবী করীম (স)-এর কন্যা চাক্কি পিযুক, কোমরে পানির মশক বহন করুক, ইহাতে তিনি রাজি ছিলেন। কিন্তু দরিদ্র অসহায় মানুষের তুলনায় তাঁহার কোন আত্মীয়-স্বজন বেশী সুযোগ-সুবিধা লাভ করুক উহা তিনি কখনও পছন্দ করিতেন না (ইবনুল আছীর, উসদুল-গাবা, প্রবন্ধ: উম্মু হাকীম)।
কেহ যদি কোন দরিদ্র অসহায় ব্যক্তিকে মন্দ বলিত তবে নবী করীম (স) খুবই অসন্তুষ্ট হইতেন এবং ইহাকে জাহিলী যুগের আচরণ বলিতেন (সুনান আবূ দাউد, ৫খ., পৃ. ৩৫৯, হাদীছ ১৫৫৭)।
হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-এর মত সাহাবীও যদি হযরত বিলাল (রা) কিংবা সুহায়ব (রা)-এর মত দরিদ্র সাহাবীদের মনে কোন রকম কষ্ট দিতেন তাহা হইলেও তিনি তাঁহাকে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ দিতেন এবং দরিদ্র অসহায়দের অসন্তুষ্টিকে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার অসন্তুষ্টি হিসাবে আখ্যায়িত করিতেন (সহীহ মুসলিম, ৪খ., পৃ. ১৯৪৭, হাদীছ ২৫০৪)।
কোন দরিদ্র ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর নবী করীম (স)-কে না জানাইয়া তাহাকে দাফন করিয়া ফেলিলে তিনি খুবই অসন্তুষ্ট হইতেন এবং তাহার কবরের পার্শ্বে দাঁড়াইয়া তাহার জন্য দু'আ করিতেন (সুনান নাসাঈ, কিতাবুল জানাইয; সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ৩৩৫)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর দয়ার্দ্রতাকে হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা) প্রবহমান বায়ু অপেক্ষাও অধিকতর গতিসম্পন্ন বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন, বিশেষত রমযান মাসের মুবারক দিনসমূহে (সহীহ বুখারী, ১খ., ওহী অধ্যায়)। হযরত জাবির (রা) বলিয়াছেন, নবী করীম (স)-এর নিকট যখনই কোন কিছু চাওয়া হইত, তিনি কখনও উহা দিতে অস্বীকার করিতেন না (সহীহ বুখারী, কিতাবুল মানাকিব)। হুনায়নের যুদ্ধে প্রায় চার হাজার অমুসলিম নরনারী বন্দী হয়। আরবের প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী তাহাদিগকে দাস-দাসী বানানো হইত। কিন্তু নবী করীম (س) তাহাদের সম্প্রদায়ের অন্যান্য লোকদের অনুরোধক্রমে তাহাদের সকলকে মুক্তি দেন (ইবন সা'দ, আত-তাবাকাত, পৃ. ১৫৩-১৫৫)। এতদ্ব্যতীত হুনায়নের যুদ্ধে গনীমত হিসাবে চব্বিশ হাজার উট, চল্লিশ হাজার বকরী এবং চার হাজার উকিয়া রৌপ্য পাওয়া গিয়াছিল। তিনি এই সমস্ত মাল মুজাহিদগণ এবং অন্যান্যদের মধ্যে বণ্টন কবিয়া দিয়াছিলেন (আল-ওয়াকিদী, আল-মাগাযী, ৩খ., পৃ. ১৪৯)। হুনায়নের যুদ্ধে বহু নও মুসলিম, এমনকি কতক অমুসলিমকে পর্যন্ত তিনি শত শত উট দান করিয়াছিলেন। সাফওয়ান ইবন উমায়্যাকে তিন শত উট দান করিয়াছিলেন (সহীহ মুসলিম, ৪খ., পৃ. ১৬০৬, হাদীছ ২৩১৩; কাদী 'ইয়াদ, আশ- শিফা, পৃ. ৪৯)।
একবার নবী করীম (স)-এর হাতে সত্তর হাজার দিরহাম আসিয়াছিল। তিনি সেইগুলি লইয়া মসজিদে প্রবেশ করিয়া চাটাইয়ের উপর ঢালিয়া দিয়া বণ্টন করিতে লাগিলেন এবং এইভাবেই উহা সাধারণ গরীব-দুঃখীদের মধ্যে বণ্টন করিয়া দেন। হযরত আনাস (রা) বলেন, নবী করীম (স) নিজ দয়ার্দ্রতার গুণের ফলে এত বেশী দান করিতেন যে, তাঁহার নিকট কোন কিছু পুঞ্জীভূত হইয়া থাকিত না।
একবার তিনি তাঁহার ব্যক্তিগত খাজাঞ্চী হযরত বিলাল (রা)-এর নিকট কিছু খেজুর জমা দেখিতে পাইয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "এইগুলি কি?” হযরত বিলাল (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিছু সঞ্চয় করিতেছি যাহাতে দুঃসময়ে কাজে আসে। তিনি বলিলেন, তোমার কি এই ভয় হয় না যে, উহা জাহান্নামের জ্বালানীও হইতে পারে? হে বিলাল। ইহা খরচ করিতে থাক, অভাবের আশংকা করিও না (ইবনুল-জাওযী, ২খ., পৃ. ৪৪২)। নবী করীম (স) একবার হযরত আব্বাস (রা)-কে এত বেশি পরিমাণ স্বর্ণ দান করিয়াছিলেন যে, তাঁহার পক্ষে উহা বহন করা কঠিন হইয়া পড়িয়াছিল। তাহার মধ্যে দয়ার্দ্রতা এত বেশী পরিমাণ ছিল যে, নিজের কাছে না থাকিলে তিনি ঋণ করিয়া হইলেও প্রার্থীকে দান করিতেন (কাদী 'ইয়াদ, আশ-শিফা, পৃ. ৫০)।
রাসূলুল্লাহ (স) মুসলিম-অমুসলিম, আত্মীয়-অনাত্মীয় সকলের প্রতি এত দয়ালু ছিলেন যে, তিনি তাঁহার ব্যক্তিগত শত্রুর উপরও কোন রকম প্রতিশোধ গ্রহণ করিতেন না (জামি' তিরমিযী, শামাইল)। মক্কা বিজয়ের পর তাঁহার রক্তপিপাসু শত্রুদের মার্জনা করা এবং তাঁহাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আগত ঘাতকদিগকে ক্ষমা করা তাঁহার দয়ার্দ্র হৃদয়েরই উজ্জ্বল নিদর্শন (জামি' তিরমিযী, গাযওয়া নববী)। মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি ইব্‌ন সুলুলের মৃত্যুর পর নবী করীম (س) দয়ার্দ্রতার কারণে তাহাকে শুধু ক্ষমাই করেন নাই, বরং মৃত্যুর পর তাহাকে স্বীয় জামা পরিধান করাইয়া তাহার দাফনকার্য সম্পন্ন করেন এবং তাহার জন্য সত্তর বারের অধিক ইস্তিগফার করিবার প্রতিশ্রুতিও দান করেন (সহীহ বুখারী, ১খ., কিতাবুল জানাইয)। সাহাবীগণ মুনাফিকীর কারণে তাহাকে একাধিকবার হত্যা করার অনুমতি চাহিলেও নবী করীম (স) অনুমতি দেন নাই (মুফতী মুহাম্মদ শফী, মা'আরিফুল কুরআন, সূরা মুনাফিকুন)। একবার এক বেদুঈন মসজিদে নববীতে পেশাব করিতে থাকিলে সাহাবীগণ তাহাকে মারিতে চাহিলেন। ইহাতে নবী করীম (س) তাঁহাদিগকে বাধা প্রদান এবং লোকটিকে তাহার প্রয়োজন শেষ করার অবকাশ প্রদান করেন। ইহার পর তিনি স্থানটি ধৌত করার নির্দেশ দেন এবং লোকটিকে বিনম্র ভাষায় মসজিদের পবিত্রতা সম্পর্কে বুঝাইয়া দেন (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ৭৬; সহীহ মুসলিম, ৪খ., পৃ. ২৩৬; সুনান আবু দাউদ, ৪খ., পৃ. ২৬৩-২৬৫, হাদীছ ৩৮০; জামি' তিরমিযী, ১খ., পৃ. ২৭৬, হাদীছ ১৪৭)। নবী করীম (س) নিজের দয়ার্দ্রতার কারণে তাঁহার খাদেমদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করিয়া দিতেন (সহীহ মুসলিম, ৪খ., ১৮০৫, হাদীছ ২৩১০)।
ইয়াতীম, বিধবা ও মিসকীনদের প্রতি নবী করীম (স) খুবই দয়া প্রদর্শন করিতেন। এই সম্পর্কে তিনি বলেন, ইয়াতীমের তত্ত্বাবধানকারী জান্নাতে আমার পাশাপাশি থাকিবে, যেমন হাতের দুইটি আঙ্গুল। তিনি আরও বলেন, যেই ব্যক্তি কোন বিধবা ও মিসকীনের কল্যাণে সচেষ্ট থাকে সেই ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদরত কিংবা ঐ ব্যক্তির মত যে দিনে রোযা রাখে এবং সারা রাত ইবাদতে কাটায় (জামি' তিরমিযী, ৪খ., পৃ. ৩২১, ৩৩৭, হাদীছ ১৯১৮ ও ১৯৫৪)।
বিধবাদের প্রতি তাঁহার কি পরিমাণ দয়া ও সহানুভূতি ছিল উহা উপলব্ধি করা যায় তাহাদের সার্বিক উন্নয়নে তাঁহার গৃহীত কর্মসূচী হইতে। তৎকালীন আরবের লোক বিধবাদিগকে বিবাহ করা পছন্দ করিত না; বরং তাহাদিগকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বঞ্চিত রাখিত। এই ধরনের সামাজিক অবিচার ও কুপ্রথা নিমূর্ল করার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (স) শুধু অন্যকেই বিধবা বিবাহে উৎসাহ প্রদান করেন নাই বরং তিনি নিজেও হযরত 'আইশা (রা) ব্যতীত বাকী সকল বিবাহ বিধবাগণকেই করিয়াছিলেন এবং এইভাবেই তিনি বিধবাদের নৈতিক ও সামাজিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছিলেন (ইসলামী বিশ্বকোষ সম্পাদনা পরিষদ, হযরত রাসূল করীম, জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ২৭৬)।
আর্তপীড়িতদের সেবা-শুশ্রূষার প্রতি রাসূলুল্লাহ (س) সবিশেষ যত্নবান ছিলেন। পাড়া-প্রতিবেশী বন্ধু-বন্ধব বা প্রিয়জনের অসুস্থতার খবর পাইলে তাহাকে দেখার জন্য তিনি
সেইখানে দ্রুত হাযির হইতেন। এই বিষয়ে তাঁহার নিকট আপন-পরের কোন ভেদাভেদ ছিল না। এমনকি কোন অমুসলিম ব্যক্তি অসুস্থ হইলে তাহাকেও তিনি দেখিতে যাইতেন। তিনি অসুস্থ ব্যক্তিদের মুখমণ্ডল ও বুকে-পিঠে হাত বুলাইয়া দিতেন এবং তাহার আরোগ্য কামনা করিয়া দু'আ করিতেন (সহীহ বুখারী, ৪খ., পৃ. ৪২, ৪৪)।
সমাজের নিম্ন স্তরের লোকদের প্রতি নবী করীম (স) খুবই দয়াপরবশ ছিলেন। এই স্তরের মানুষের মধ্যে দাস-দাসীদের বিষয়টি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। বিশ্ব ইতিহাসে মহানবী (স)-ই সর্বপ্রথম দাস-দাসীদিগকে তাহাদের বৈধ ও মৌলিক অধিকার প্রদানের জন্য নানাবিধ বাস্তব পন্থা অবলম্বন করেন। বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগী, মুক্তিপণ, কাফফারা ইত্যাদির মাধ্যমে দাসমুক্তির ব্যবস্থা করিয়া তাহাদের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করেন। এমনকি জীবনের শেষ ওসিয়াতেও তিনি তাহাদের অধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করিতে ভুলেন নাই। তিনি বলিয়াছেন, "দাস-দাসীরা তোমাদের মত মানুষ এবং তোমাদেরই ভাইবোন যাহাদিগকে আল্লাহ তা'আলা তোমাদের অধীন করিয়াছেন। তোমরা নিজেরা যাহা খাও তাহাদিগকে উহাই খাইতে দিবে, তোমরা নিজেরা যাহা পরিধান কর তাহাদিগকে উহাই পরিধান করিতে দিবে এবং সাধ্যের অধিক তাহাদের উপর কোন কাজ চাপাইয়া দিবে না। আগত্যা যদি দিতেই হয় তবে তোমরা নিজেরাও তাহাদিগকে সেই কাজে সাহায্য-সহায়তা করিবে (সুনান আবু দাউদ, ৫খ., পৃ. ৩৬০, হাদীছ ২১৫৮; সহীহ মুসলিম, ৩খ., ১২৮২, হাদীছ ১৬৬১; জামি' তিরমিযী, ৪খ., পৃ. ৩৪৪, হাদীছ ১৯৪)।
হযরত আনাস (রা) তাঁহার বাল্যকালের ঘটনা বর্ণনা করিয়া বলেন, একদিন নবী করীম (স) আমাকে ডাকিয়া কোন একটি কাজে যাইতে বলিলেন। আমি তখন নেহায়েত বালকসুলভ ব্যবহার দেখাইয়া বলিলাম, না এখন যাইতে পারিব না। এই বলিয়া আমি বাহিরে গিয়া খেলাধুলা করিতে শুরু করিলাম। কিছুক্ষণ পর নবী করীম (স) পিছন দিক হইতে আসিয়া আমার কাঁধে হাত রাখিয়া হাসিমুখে বলিলেন, এখন যাইতে পারিবে তো? এইবার সম্মত হইয়া আমি বিনা দ্বিধায় কাজে চলিয়া গেলাম। হযরত আনাস (রা) আরও বলেন, বাল্যকালে আমি দীর্ঘ দশ বৎসর নবী করীম (স)-এর খেদমত করিয়াছি। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি একদিনও আমাকে কোন রকম তিরস্কার করেন নাই (আবূ দাউদ, সহীহ মুসলিম, কিতাবুল-আদাব)।
উহুদের যুদ্ধে যে ওয়াহ্শী সায়্যিদুশ-শুহাদা হযরত হামযা (রা)-কে শহীদ করিয়াছিল সে মক্কা বিজয়ের পর তায়েফের এক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মদীনায় আসিয়া ইসলাম গ্রহণ করে। নবী করীম (س) তাঁহার প্রিয়তম চাচার হত্যাকারী এই ওয়াহ্শীকেও ইসলাম গ্রহণ করার ফলে দয়ার্দ্র হৃদয়ে আশ্রয় প্রদান করিয়াছিলেন। তবে শুধু তাহাকে এতটুকু বলিয়া দিয়াছিলেন, সচরাচর তুমি আমার সামনে পড়িও না। কেননা তোমাকে দেখিলেই আমার প্রিয়তম চাচার কথা মনে পড়িয়া যায় (সহীহ বুখারী, হযরত হামযা (রা)-এর হত্যা)।
হিন্দ উহুদের যুদ্ধে হযরত হামযা (রা)-এর কলিজা চিবাইতে চিবাইতে নৃত্য করিয়াছিল। সেও মক্কা বিজয়ের পর নেকাব দিয়া মুখ ঢাকিয়া নবী করীম (স)-এর নিকট আসিয়া ইসলাম গ্রহণ করত কৌশলে নিরাপত্তার সনদ গ্রহণ করিয়া নিয়াছিল। নবী করীম (س) তাহাকে চিনিয়া ফেলিলেন। কিন্তু দয়াপরবশ হইয়া তাহাকে কিছু বলিলেন না। ইহাতে সেই পাষাণ হৃদয়ের নারীর মন গলিয়া গেল এবং স্বতস্ফূর্তভাবে বলিয়া উঠিল, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিছুক্ষণ পূর্ব পর্যন্ত আমার চোখে আপনার তাঁবুর চাইতে ঘৃণিত আর কোন তাঁবু ছিল না, কিন্তু এখন আপনার তাঁবুর চাইতে প্রিয়তম কোন তাঁবু আমার চোখে আর একটিও নাই” (সহীহ বুখারী, হিন্দ-এর বিবরণ)। ইসলাম গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত আবূ সুফ্যান নবী করীম (س) ও ইসলামের ঘোর শত্রু ছিলেন। মাক্কী জীবনে নবী করীম (س)-এর সব কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং হিজরতের পর বদরের যুদ্ধ হইতে শুরু করিয়া মক্কা বিজয় পর্যন্ত প্রতিটি যুদ্ধে শত্রু পক্ষের নেতৃত্বদান হইতে নিয়া ইসলাম ও নবী করীম (س)-এর বিরুদ্ধে যতগুলি ষড়যন্ত্র হইয়াছে উহার প্রায় প্রতিটির অগ্রভাগেই ছিলেন আবূ সুফ্যান। মক্কা বিজয়ের দিন তাহাকে গ্রেফতার করিয়া নবী করীম (س)-এর নিকট হাযির করা হইলে হযরত উমার (রা) আবু সুফ্যানকে হত্যা করার অনুমতি চাহিলেন। কিন্তু দয়ার সাগর নবী করীম (س) তাঁহার জীবনের এই প্রধান শত্রুকে হাতে পাওয়ার পর তাহার প্রতিশোধ না লইয়া শুধু তাহাকেই মুক্তিদান করিলেন না বরং ঘোষণা করিয়া দিলেন, "শুধু আবূ সুফ্যানই মুক্ত নয়, যাহারা তাহার গৃহে আশ্রয় গ্রহণ করিবে তাহারাও নিরাপদ” (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মক্কা বিজয় প্রসঙ্গ)।
নবী করীম (স) যখন ইসলামের দা'ওয়াত লইয়া তাইফে গমন করিলেন, তখন তাইফবাসীরা নানা রকম ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিয়া ইসলামের দা'ওয়াত প্রত্যাখ্যান করিল এবং নবী করীম (س)-এর সমস্ত শরীর রক্তাক্ত করিয়া তাঁহাকে শহর হইতে বাহির করিয়া দিল। এমন সময় আযাবের ফেরেস্তারা আসিয়া নবী করীম (স)-কে বলিল, আপনি যদি অনুমতি দেন তবে আমরা পাহাড় উল্টাইয়া দিয়া উহাদিগকে ধ্বংস করিয়া ফেলি। দয়ার নবী উত্তরে বলিলেন, উহা হয় না, উহারা না মানুক, হয়ত তাহাদের ভবিষ্যত বংশধরদের মধ্যে মহান আল্লাহর অনুগত বান্দা হইবে (সহীহ বুখারী, বরাতে আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, বঙ্গনুবাদ, পৃ. ৩৭৫)।
নবী করীম (স)-এর মদীনায় হিজরত করার সময় হুবার ইব্‌ন আসওয়াদ নামক এক দুষ্কৃতকারী তাঁহার সন্তান সম্ভবা কন্যা হযরত যায়নাব (রা)-কে রাস্তায় আটকাইয়া নির্যাতন করার এক পর্যায়ে উটের পিঠ হইতে নিচে ফেলিয়া দেয়। ফলে তাঁহার গর্ভপাত হইয়া যায়। ইহা ছাড়াও তাহার বিরুদ্ধে মুসলমানদের উপর বহু নির্যাতনের অভিযোগ ছিল। মক্কা বিজয়ের পর সে ইরানে পালাইয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু হিদায়াতের আলো তাহাকে আকর্ষণ করিয়া নবী করীম (س)-এর নিকট লইয়া আসে। নবী করীম (س)-এর নিকট আসিয়া সে বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! প্রাণভয়ে আমি দেশত্যাগ করিয়া পালাইয়া যাইতে চাহিয়াছিলাম। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পর আপনার অশেষ দয়ার কথা মনে পড়িয়া যাওয়ায় আমি ইসলাম গ্রহণ
করার জন্য ফিরিয়া আসিয়াছি। আমার সম্পর্কে আপনার নিকট যে সমস্ত অভিযোগ আসিয়াছে উহা সবই সত্য। আমার মূর্খতা ও অপরাধ- আমি অকপটে স্বীকার করিতেছি। অপরাধীর এই অনুশোচনামূলক কথায় রহমতে আলম নবী করীম (س)-এর মনে করুণা ও দয়ার উদ্রেক হইল। তিনি তাহার প্রতি হাত বাড়াইয়া বিনা দ্বিধায় তাহাকে তাঁহার রহমতের ছায়াতলে আশ্রয় প্রদান করেন (ইব্‌ন ইসহাক, হুবারের বর্ণনা, বরাতে আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, বঙ্গানুবাদ, পৃ. ৩৫৯)।
হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর মা মুশরিকা থাকা অবস্থায় নবী করীম (স)-কে খুব মন্দ বলিত। ইহাতে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) মনের কষ্টে একদিন খুব কাঁদিলেন এবং নবী করীম (স)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন, "আমার মা আপনার শানে বেআদবি করেন, আপনি তাহাকে বদ দু'আ করুন।" এই কথা শুনিয়া নবী করীম (স) দয়ার্দ্র কন্ঠে আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করিলেন, "হে আল্লাহ! তুমি আবূ হুরায়রার মা-কে হিদায়াত দান কর।" ইহার পর হযরত আবূ হুরায়রা বাড়ী ফিরিয়া গিয়া দেখিলেন, তাহার মায়ের গৃহের পরজা বন্ধ। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলিলে দেখা গেল তাহার মা গোসল করিয়া পাক-পবিত্র অবস্থায় ইসলামের কালেমা উচ্চারণ করিতেছেন (সহীহ মুসলিম, আবু হুরায়রার ফযীলত)।
কেবল মানবজাতির জন্যই নয়, বরং সমগ্র সৃষ্টির জন্যই রাসূলুল্লাহ (س)-এর হৃদয় দয়া ও রহমতে পরিপূর্ণ ছিল। তিনি জীবজন্তুর প্রতি যত্নবান হওয়ার জন্য সাহাবীগণকে সদাসর্বদা নির্দেশ দিতেন। কোন পশুকে দুরবস্থায় দেখিলে তিনি বলিতেন, "এই বোবা প্রাণীদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, উত্তমরূপে ইহাদের উপর আরোহণ কর এবং ইহাদিগকে প্রয়োজনীয় খাবার দাও” (সুনان আবূ দাউد, ৩খ., পৃ. ৪৯, হাদীছ ২৫৪৮)। নবী করীম (س) কোন পশুর মুখে দাগ লাগানো দেখিলে তিনি খুবই অসন্তুষ্ট হইয়া বলিতেন, "তোমরা কি শোন নাই, আমি নির্বাক প্রাণীর মুখে দাগ এবং উহাদের আকৃতি বিকৃত করিতে নিষেধ করিয়াছি" (মুসলিম, ৩খ., পৃ. ১৬৭৩, হাদীছ ২১১৭)?
প্রত্যুষে মোরগের ডাক শুনিয়া যদি কেহ বিরক্ত হইত তবে নবী করীম (স) বলিতেন, মোরগকে গালি দিও না, কেননা সে সালাতের জন্য মানুষকে ঘুম হইতে জাগ্রত করে। তিনি আরও বলিতেন, যখন তোমরা মোরগের ডাক শুনিবে তখন আল্লাহ তা'আলার নিকট তাঁহার রহমত কামনা করিবে। কেননা সে কোন রহমতের ফেরেশতা দেখিয়াই ডাকে (আবূ দাউদ, ৫খ., ৩৩১, হাদীছ ৫১০১ ও ৫১০২; সহীহ বুখারী, বাউ'ল-খালক, ৪খ., পৃ. ১৫৫; সহীহ মুসলিম, আয-যিকর, ৪খ., পৃ. ২০৯১, হাদীছ ২৭২৯)।
রহমাতুললিল 'আলামীন নবী মুহাম্মাদ (س) একদিকে জীবের প্রতি দয়ার শিক্ষা দিয়াছেন অন্যদিকে জাহিলী যুগের ঐ সমস্ত কুপ্রথারও মূল উৎপাটন করিয়াছেন যাহা জীবজন্তুকে কষ্ট ও যন্ত্রণা দিত। যেমন জীবিত জন্তুর গোশত কাটা, ইহার লেজ ও কেশর কাটা, ইহাদের মধ্যে পরস্পর লড়াই বাঁধানো, ইহাকে তীর নিক্ষেপের লক্ষ্য বানানো ইত্যাদি। এই সকল
কাজকে বর্বর ও নির্দয়ের কাজ বলিয়া অভিহিত করত তিনি ইহা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করিয়াছেন।
তৎকালীন আরবদের মধ্যে পাখীর বাসার ডিম চুরি বা ইহাদের ছোট ছোট ছানা ধরিয়া আনার ব্যাপক প্রচলন ছিল যাহার উপর তিনি কঠিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিয়াছিলেন (সুনান আবূ দাউদ, ৩খ., পৃ. ৪৬৯, হাদীছ ৩০৮৯; বরাত হযরত রাসূলে করীম (স) জীবন ও শিক্ষা)।
গ্রন্থপঞ্জী : (১) আল-কুরআনুল করীম, বঙ্গানুবাদ, ই.ফা.বা. সংস্করণ ১৯৯৭ খৃ., সূরা আম্বিয়া, আয়াত ১০৭; (২) মুফতী মুহাম্মاد শফী, মা'আরিফুল-কুরআন, সূরাতুল মুনাফিকূন; (৩) মুহাম্মاد ইব্‌ন ইসমাঈল আল-বুখারী, আল-জামি'উ'স-সাহীহ, লাইডেন (তা. বি); (৪) মুসলিম আন-নীশাপুরী, আস-সাহীহ, কায়রো ১৩৩০ হি.; (৫) আবূ 'ঈসা আত্-তিরমিযী, আল-জামি'উস-সুনান, বুলাক ১২৯১ হি. এবং ঐ শামাইলুত-তিরমিযী; (৬) আবূ দাউদ, আস-সুনান, দিল্লী ১৩৮৩ হি.; (৭) আন-নাসাঈ, আস-সুনান, লক্ষ্ণৌ ও দিল্লী সংস্করণ; (৮) মুহাম্মاد ইব্‌ন আবদিল্লাহ খাতীব তাবরীযী, মিশকাতুল মাসাবীহ, দামিশক- কায়রো; (৯) ইবনুল আছীর, উসুদুল-গাবা ফী মা'রিফাতিস্-সাহাবা, তেহরান; (১০) মুহাম্মاد ইবন সা'দ আল-কাতিব, কিতাবুত-তাবাকাতিল কাবীর (সং-লাইডেন, বৈরূত ১৩৮০/১৯৬০); (১১) আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল-মাগাযী, সম্পা. Mardson Jones, অক্সফোর্ড ১৯৬৬ খৃ.; (১২) আবুল ফাদল কাদী 'ইয়াদ, আশ-শিফা বি'তা'রিফি হুছকিল-মুস্তাফা (সং. কায়রো, দিমাশক ও বেরলী); (১৩) ইবনুল-জাওযী, আল-ওয়াফা বি-আহ'ওয়ালিল-মুস্তাফা, লাহোর ১৩৯৭ / ১৯৭৭; (১৪) আল্লামা শিবলী নু'মানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নদবী, সীরাতুন্নবী (س), বঙ্গানুবাদ মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, প্রকাশকাল ১৯৭৫ খৃ.; (১৫) ইসলামী বিশ্বকোষ সম্পাদনা পরিষদ, ই.ফা.বা., হযরত রাসূলে করীম (س) : জীবন ও শিক্ষা।
মুহাম্মদ মুফাজ্জল হুসাইন খান

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00