📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অভিযানের কারণ

📄 অভিযানের কারণ


আল্লাহ্ বিধানকে উচ্চ করা এবং তাওহীদের প্রতিষ্ঠা করাই ছিল মহানবী (স)-কে প্রেরণের প্রধানতম উদ্দেশ্য। মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথ সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত ও বাধাহীন হইল। তাই মক্কা বিজয়ের পর রাসূলে কারীম (স) ঘোষণা করিলেন: যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী, সে যেন নিজ গৃহের মূর্তিসমূহ ভাঙ্গিয়া ফেলে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই ঘোষণার পর যাহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল তাহারা সকলেই নিজ নিজ গৃহের মূর্তিসমূহ ভাঙ্গিয়া ফেলে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত বড় বড় মূর্তিগুলিও ভাঙ্গিয়া ফেলিবার জন্য সাহাবীগণকে আদেশ করেন এবং এই উদ্দেশ্যে খণ্ড খণ্ড বাহিনী (সারিয়‍্যা) প্রেরণ করেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৬৬-১৬৮)।
'ফুল্ল্স' ছিল বানু তাঈ-এর পৌত্তলিকদের একটি প্রকাণ্ড দেবালয়। ইহাকে ধ্বংস করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আলী (রা)-কে একটি ক্ষুদ্র বাহিনীসহ বানু তাঈ-এর অভিমুখে প্রেরণ করেন। তাঁহার সহিত দেড় শত, বর্ণনান্তরে দুই শত অশ্বারোহী সৈনিক ছিল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৩১৩; সীরাতুল মুস্তাফা, ৩খ., পৃ. ৮১)। এই অভিযানে তাহাদের সঙ্গে ছিল ছোট শুভ্র পতাকা এবং বড় কৃষ্ণ পতাকা (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৮১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অভিযান

📄 অভিযান


৯ম হিজরীর রাবী'উল আখির/ ৬৩০ খৃ. হযরত আলী (রা) তাঁহার সহিত প্রেরিত বাহিনীসহ 'বানু তাঈ-এর আবাসভূমিতে পৌঁছিলেন। মুসলিম বাহিনীর আগমন সংবাদ পাইয়া তাঈ গোত্রের কতক লোক বাড়ী-ঘর ছাড়িয়া পলায়ন করিল। এমনকি তাই গোত্রের অন্যতম সর্দার বিখ্যাত দানবীর হাতিম তাঈ-এর পুত্র 'আদী ইব্‌ন হাতিমও পলায়ন করিল এবং সিরিয়ায় গাস্সানী খৃস্টানদের আশ্রয় গ্রহণ করিল। মুসলিম বাহিনীর আগমন সংবাদ পাইয়া সে এতই ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়াছিল যে, পলায়নকালে আপন ভগ্নী 'সাফ্ফানাকেও সঙ্গে লইবার ফুরসত পায় নাই।
হযরত আলী (রা) তাঁহার বাহিনীসহ ফজরের সময় (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৩১২), বর্ণনান্তরে রাত্রিবেলা তাঈ-এর ফুল্স দেব-মন্দির ও উহার দেবতার উপর হামলা করেন এবং উহাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করিয়া অতঃপর অগ্নি জ্বালাইয়া ভস্মীভূত করিয়া দেন (ইব্‌ন হিশাম, ২খ., পৃ. ৫৭৮)। মুসলিম সৈন্যগণ ফুল্স দেবালয় হইতে দুইটি' তরবারিও উদ্ধার করেন যাহা ইতোপূর্বে হারিছ ইব্‌ন শিমর 'ফুল্স' দেবতার নামে উৎসর্গ করিয়াছিল (সীরাতুল মুস্তাফা, ৩খ., পৃ. ৮১)।
দেবালয় ধ্বংসের পর মুসলিম বাহিনী পলায়নোদ্যত তাঈদের পশ্চাদ্ধাবন করেন এবং তাহাদের বহু সংখ্যক নর-নারীকে গ্রেফতার করেন এবং তাহাদের গৃহপালিত পশু হস্তগত করেন। বন্দীদের মধ্যে হাতিম তাঈর কন্যা 'আদী ইবন হাতিম-এর ভগ্নী 'সাফ্ফানাও ছিল। মুসলিম সৈন্যগণ 'আদী ইব্‌ন হাতিমের অস্ত্রাগার হইতে আরবের প্রসিদ্ধ তিনটি তরবারি ও তিনটি বর্ম হস্তগত করে। তরবারি তিনটির নাম রাসূব, মাখযাম ও ইয়ামানী (যুরকানী, ৩খ., পৃ. ৫৩)।
অভিযান শেষে হযরত আলী (রা) বন্দীদিগকে এবং তাহাদের আটককৃত গবাদি পশু লইয়া মদীনায় প্রতাবর্তন করেন। বন্দীদেরকে মদীনায় মসজিদে নববীর দরজার অদূরে এক বন্দীশালায় আটক রাখা হয় (যুরকানী, ৩খ., পৃ. ৫৩)।
হাতিমের কন্যা সাফ্ফানা অতিশয় বুদ্ধিমতি ও বিচক্ষণ নারী ছিলেন। বন্দীশালায় আটক থাকা অবস্থায় একবার রাসূলুল্লাহ (স) তাহার নিকট দিয়া যাইবার কালে তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-ডাকিয়া বলিলেন, হে মুহাম্মাদ। আমি দানবীর হাতিম-এর কন্যা। আমার পিতা কওমের সর্দার ছিলেন। আপনি আমাকে মুক্ত করিয়া দিন। আমি আমার ভাই 'আদীর নিকট চলিয়া যাইব। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আচ্ছা, আমি তোমাকে মুক্ত করিয়া দিতেছি। তবে তোমার ভাইয়ের নিকট যাওয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করিও না। দেখি তোমার গোত্রের বিশ্বস্ত কাহাকেও পাই কিনা। তোমাকে তাহার সহিত তোমার ভাইয়ের নিকট পাঠাইবার ব্যবস্থা করিব। তিনদিন পর 'তাঈ' গোত্রের সিরিয়াগামী একটি বাণিজ্যিক কাফেলার সন্ধান পাওয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে পথ খরচ, বাহন এবং কিছু পোশাক হাদিয়াস্বরূপ প্রদান করিয়া সযত্নে বিদায় দিলেন (ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১৬৪)।
সাফ্ফানা রাসূলুল্লাহ (স)-এর ব্যবহারে অত্যন্ত মুগ্ধ হইলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করিয়া নিজেকে সৌভাগ্যমণ্ডিত করিলেন। শত্রু গোত্রের লোকজনের প্রতি তাঁহার এইরূপ সম্মানবোধ ও মমতা দেখিয়া সাফ্ফানা রাসূলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে নিম্নোক্ত বক্তব্য পেশ করেন: শكرتك بدا فتقرت بعد تمنى ولا ملكتك يد استغنت بعد فقر واصاب الله بمعروفك مواضعه ولا جعل لك الى ليسم حاجبة ولا سلب نعمت عن كريم قوم الا وجصمك سببا لدوها عليه.
"হস্ত সর্বদা আপনার প্রতি শুকরিয়াবনত থাকুক যাহা সুখ-সমৃদ্ধির পর আজ নিঃস্ব, নিঃসম্বল। ঐ হস্ত যেন আপনার উপর প্রভাব বিস্তার করিতে না পারে যাহা নিঃস্ব থাকার পর স্বচ্ছল হইয়াছে। আল্লাহ যেন সর্বদা আপনার অনুগ্রহ-অনুদান যথাস্থানে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করেন। তিনি যেন আপনাকে কখনও কোন ইতরের প্রতি মুখাপেক্ষী না করেন। আল্লাহ যেন কোন ভাল মানুষের নিয়ামত প্রত্যাহার না করেন; করিলেও আপনাকে যেন উহা পুন আনয়নের উসীলা করেন" (যুরকানী, ৩খ., পৃ. ৫৩)।
সাফফানা সিরিয়ায় পৌঁছিয়া তাঁহার ভাই 'আদী ইব্‌ন হাতিমের সাথে মিলিত হইলেন। 'আদী ভগ্নির মুখে রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই উদার চরিত্র ও সদ্ব্যবহারের কথা শুনিয়া স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্ট চিত্তে ইসলাম গ্রহণ করেন (ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১৬৪)।
ইবন ইসহাক 'আদী ইবন হাতিম হইতে তাঁহার ইসলাম গ্রহণের ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়াছেন। 'আদী ইবন হাতিম বলেন, আমি ছিলাম তাঈ গোত্রের সর্দার। খৃষ্ট ধর্মের প্রতি আমার ছিল অগাধ শ্রদ্ধা। সুতরাং মুহাম্মাদ (স)-কে আমি অতি ঘৃণার চোখে দেখিতাম। যখন তাঁহার বিজয়বার্তা আরবময় ছড়াইয়া পড়িল তখন আমি শঙ্কিত হইয়া পড়িলাম এবং গুপ্তচর নিযুক্ত করিয়া তাঁহার গতিবিধির খোঁজ-খবর সইতে লাগিলাম। হঠাৎ একদিন গুপ্তচর উপস্থিত হইয়া ভীত-সন্ত্রস্ত কণ্ঠে বলিতে লাগিল, "মুসলিম বাহিনী আসিতেছে। আমি স্বচক্ষে তাহাদের পতাকাবাহী সেনা দেখিয়া আসিয়াছি। যাহা করিতে হয় সত্বর করুন"।
আমি কালবিলম্ব না করিয়া পরিবার-পরিজনসহ উষ্ট্রপৃষ্ঠে আরোহণ করিয়া সিরিয়ার উপকণ্ঠে পৌছিয়া খৃস্টধর্মাবলম্বী গাস্সানী সম্প্রদায়ের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করিলাম। কিন্তু সাফ্ফানা নামক আমার একটি বোনকে স্বগৃহেই রাখিয়া আসিলাম। ঘটনাক্রমে সাফ্ফনা মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হইল এবং মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে নীত হইল। সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রার্থনা করিল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি বিখ্যাত দানবীর হাতিম তাঈ-এর কন্যা। আমার ভ্রাতা 'আদী আপনার সেনাবাহিনীর ভয়ে আমাকে ছাড়িয়া সিরিয়ায় পলায়ন করিয়াছেন। আমি এখন অসহায়। আমি কোন খিদমতেরও উপযোগী নই। অতএব আপনি আমার প্রতি দয়া করুন, আল্লাহ তা'আলা আপনার প্রতি দয়া করিবেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার আরয মনজুর করিলেন, তাহাকে সসম্মানে মুক্তি দিয়া নির্বিঘ্নে সিরিয়ায় পৌঁছিবার সুব্যবস্থা করিলেন, এমনকি বাহন হিসাবে তাহাকে একটি উটও প্রদান করিলেন। তাঁহার ব্যবহারে আমার বোন যারপরনাই আনন্দিত হইল এবং সিরিয়ায় পৌঁছিয়া আমার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া তাঁহার অশেষ প্রশংসা করিতে লাগিল। সাফ্ফানা বলিল, "রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের পিতার ন্যায় অতি হৃদয়বান লোক। তাঁহার সদয় ব্যবহার দেখিলে শত্রু-মিত্র কেহ তাঁহার প্রশংসা না করিয়া থাকিতে পারে না। আমি স্বচক্ষে দেখিলাম তাঁহার নিকট অমুক আসিল, তিনি এই ব্যবহার করিলেন। আপনিও তাঁহার সহিত অতি সত্বর সাক্ষাত করুন। আশা করি নিশ্চয় আপনিও তাঁহার বদান্যতামূলক আচরণ পাইবেন"।
'আদী বলেন, বোনের কথায় উৎসাহিত হইয়া আমি নিরাপত্তার কোন আশ্বাস বা লিখিত কোন অভয়বাণী ছাড়াই মদীনায় পৌঁছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে নববীতে অবস্থান করিতেছিলেন। আমি তাঁহার খিদমতে উপস্থিত হইলাম। আমাকে দেখিয়া লোকজন বলাবলি করিতে লাগিল, 'আদী ইবন হাতিম আসিয়াছেন। মহানবী (স) 'আদীর পরিচয় পাইয়া তাহাকে সম্মান ও সৌজন্য সহকারে অভ্যর্থনা জানাইলেন এবং তাহার হাত মহানবী (স)-এর হাতের মুঠায় চাপিয়া ধরিলেন। মহানবী (স) প্রথমেই বলিয়াছিলেন, আল্লাহ তা'আলা অচিরেই আদী ইব্‌ন হাতিমের হাত আমার মুঠায় আনাইয়া দিবেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) 'আদীকে নিজের হাতে ধরিয়া লইয়া তাঁহার গৃহাভিমুখে রওয়ানা হইলেন। এমন সময় এক বৃদ্ধা তাহার শিশু সন্তানকে সাথে লইয়া আসিল এবং আরয করিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি বিশেষ সংকটে পড়িয়া আপনার নিকট আসিয়াছি। তিনি তৎক্ষণাৎ আমার হাত ছাড়িয়া দিয়া বৃদ্ধার সহিত তাহার কাজ সমাধার জন্য চলিয়া গেলেন। দীর্ঘ সময় পর তিনি ফিরিয়া আসিলেন এবং পুনরায়ঃ আমাকে হাতে ধরিয়া লইয়া গৃহাভিমুখে রওয়ানা হইলেন। গৃহে পৌঁছিয়া তিনি খেজুরের ছোবড়াবিশিষ্ট একটি গদিতে বসিলেন এবং আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে বসিলাম। অতঃপর তিনি আমাকে তিনবার বলিলেন, "আদী! তুমি ইসলাম গ্রহণ কর, শান্তি লাভ করিবে"। "আমি বলিলাম, "আমি তো খৃস্ট ধর্মে আছি"। তিনি বলিলেন, "ইহা প্রকৃত ধর্ম নহে। তুমি মাত্র কতগুলি বিকৃত সামাজিক প্রথাকে ধর্ম বলিয়া মনে করিতেছ”। তিনি আরও বলিলেন, "হে 'আদী! আমার সাহাবাগণ মর্যাদাহীন, দীন-দরিদ্র ও সংখ্যালঘিষ্ট। এইজন্যই বোধ করি তুমি ইসলাম গ্রহণে আপত্তি করিতেছ। 'আদী! মনে রাখিও, এমন একদিন আসিবে যখন। তাহাদের ধন-দৌলত জলস্রোতের ন্যায় প্রবাহিত হইবে। গ্রহণকারীর অভাবে তাহারা যাকাতও আদায় করিতে অসুবিধায় পড়িবে। এমন একদিন আসিবে যে, 'হীরা' হইতে একজন যুবতী নারী একা মক্কা আসিয়া হজ্জ করিয়া যাইবে, তাহার দিকে কেহ চক্ষু উঠাইয়াও দেখিবে না। এমন একদিন আসিবে যে, তাহারা বাবেল নগরের শ্বেত প্রাসাদ পর্যন্ত জয় করিবে”। 'আদী ইব্‌ন হাতিম বলেন, তাঁহার এই কথা শুনিয়া আমি মুসলমান হইয়া গেলাম।
তৎপর জনৈক আনসারী সাহাবীর গৃহে আমি মেহমানরূপে কিছু দিন অবস্থান করিলাম। প্রত্যহ সকালে ও বিকালে আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাজির হইতাম। একদিন তাঁহার খিদমতে একদল লোক আসিয়া উপস্থিত হইল। তিনি নামাযশেষে তাহাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন: "লোকসকল। আল্লাহ্ তা'আলা ধন-সম্পদ দান করিয়া তোমাদের প্রতি করুণা করিয়াছেন। তোমরা এক সা' বা অর্ধ সা' বা তদপেক্ষাও কম দান করিয়া আল্লাহর বান্দাদিগকে সাহায্য কর। ইহাই তোমাদিগকে জাহান্নামের আগুন হইতে রক্ষা করিবে। একটি খেজুর অথবা খেজুরের একটি টুকরা হইলেও আল্লাহ্র রাস্তায় দান কর। ইহাও যদি সম্ভব না হয় তবে ভাল কথা দ্বারা মানুষের সহিত সদ্ব্যবহার কর। তোমাদের প্রত্যেককেই আল্লাহ তা'আলার সম্মুখে হাযির হইতে হইবে। তখন তিনি তোমাদিগকে এই কথাই বলিবেন, যাহা আমি বলিতেছি। আল্লাহ তা'আলা বলিবেন, আমি কি তোমাদিগকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দান করি নাই? বান্দা বলিবে, হাঁ। তখন আল্লাহ তা'আলা বলিবেন, অদ্যকার জন্য তোমরা কি সঞ্চয় করিয়াছ? সে ডানে বামে সম্মুখে ও পশ্চাতে দৃষ্টিপাত করিয়া কিছুই পাইবে না যাহা দ্বারা সে নিজেকে জাহান্নাম হইতে রক্ষা করিতে পারিবে। এমনকি একটি খেজুর বা ভাল কথাও না।
ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) আরও বলিলেন, হে লোকসকল! তোমরা অভাবগ্রস্ত হইয়া দুর্ভিক্ষে মারা যাইবে এই আশংকা আমি করি না; বরং আল্লাহ তা'আলা তোমাদের সহায় থাকিবেন। তিনি তোমাদিগকে এমন সম্পদশালী বানাইয়া দিবেন যে, একজন নারী মদীনা হইতে একাকী হীরা (ইরাকের একটি নগর) পর্যন্ত বরং তদপেক্ষাও দূরবর্তী পথ ভ্রমণ করিবে, অথচ তাহার অন্তরে চুরি-ডাকাতির কোন ভয়-সংকোচ থাকিবে না। হযরত 'আদী ইব্‌ন হাতিম (রা) বলেন, তখন আমি মনে মনে ভাবিতেছিলাম, তাঈ গোত্রের চোরগুলি তখন কোথায় থাকিবে (ইবন ইসহাক-এর বরাতে আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৩১৩-৩১৫)! রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই ভবিষ্যদ্বাণী শুনিয়া 'আদী ইব্‌ন হাতিমের এইরূপ আশ্চর্য হইবার কারণ এই যে, জাহিলী যুগে আরবের অধিকাংশ গোত্র চুরি-ডাকাতি ও লুটতরাজ করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিত। এই সমস্ত অপকর্ম তাহাদের নিকট দূষণীয় বলিয়া পরিগণিত হইত না। তাঈ বংশীয় লোকগণ এই কর্মে বিশেষ কুখ্যাত ছিল। 'আদী ছিলেন তাঈ বংশীয় সর্দার। সুতরাং তাঈদের এই অপকর্মের কথা তাহার অজানা ছিল না। অতএব এই চোর-ডাকাতদের আড্ডার মধ্য দিয়া একাই একজন নারী নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে মদীনা হইতে সুদূর হীরা পর্যন্ত ভ্রমণ করিবে কিরূপে? এই চোর-ডাকাতরা তখন কোথায় যাইবে? তাহাদের কী হইবে? এই সমস্ত কথা চিন্তা করিয়া 'আদী আশ্চর্যান্বিত হইয়াছিলেন। কিন্তু তিনি কয়েক বৎসর পরেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই ভবিষ্যতবাণীর সত্যতা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিতে পারিয়াছিলেন (সীরাতে মুস্তাফা, মোল্লা মাজদুদ্দীন, ২খ., পৃ. ৫৮)।
আল্লামা যুরকানী বর্ণনা করিয়াছেন, 'আদী ইবন হাতিমের বোন সাফ্ফানা সিরিয়ায় পৌছিয়া 'আদীকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে ঘটিত যাবতীয় অবস্থা অবহিত করিলে 'আদী বলিল, আচ্ছা! তুমি বল এখন আমার করণীয় কি? সাফ্ফানা উত্তরে বলিলেন: "আমি মনে করি, আপনি শীঘ্রই তাঁহার সহিত সাক্ষাত করুন। যদি তিনি নবী হন, তবে তো নবীর নিকট সর্বাগ্রে আগমনকারীর বিশেষ মর্যাদা অর্জিত হইয়াই থাকে। আর যদি তিনি বাদশাহ হন তখন তো আপনি স্থায়ীভাবে সম্মান ও ইযযতের আসনে প্রতিষ্ঠিত হইবেন। আপনার মর্যাদাই হইবে তখন ভিন্নতর"।
বোনের কথা যুক্তিসংগত বিবেচনা করিয়া 'আদী রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হইবার উদ্দেশ্যে মদীনাভিমুখে রওয়ানা হইলেন (যুরকানী, ৩খ., পৃ. ৫৩)।
এই সারিয়‍্যায় অর্জিত গনীমত হযরত আলী (রা) মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করিয়া দেন এবং উদ্ধারকৃত তরবারিগুলি হইতে রাসূব ও মাখযান নামীয় তরবারি দুইটি 'সাফী' (রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য নির্ধারিত অংশ) হিসাবে রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য নির্ধারণ করেন। হাতিমের পরিজনকে কিছুই দেওয়া হয় নাই (মুহাম্মাদ (স), পৃ. ৩৩৫)।

গ্রন্থপঞ্জী ঃ (১) ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, মাতবা'আ মুস্তাফা বাবিল হালাবী, মিসর ১৯৫৫ খৃ., ২খ., পৃ. ৫৭৮-৫৮১; (২) ইবন ইসহাক, সীরাত? (৩) ইবন সা'দ, তাবাকাত, মাতবা'আ ব্রিল, লাইডেন ১৩২২ হি, ২খ., পৃ. ১৬৪; (৪) ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা, যাদুল মা'আদ, রিসলা ফাউন্ডেশন, বৈরূত ১৯৮৬ খৃ.; (৫) শায়খ মুহাম্মাদ খাদারী বিক, নূরুল ইয়াকীন, মাতবা'আ মুস্তাফা মুহাম্মাদ, ১৯২৬ খৃ., পৃ. ২০৬-২০৭; (৬) দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, মাকতাবা থানবী, দেওবন্দ তা. বি., ৩১৩-৩১৫; (৭) ইদরীস কান্ধলাবী, সীরাতুল মুস্তাফা, মুহাম্মদী কুতুবখানা, সিলেট, তা. বি., ৩খ., পৃ. ৮১-৮২; (৮) যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়্যা, দারুল মা'রিফা, বৈরূত ১৯৭৩ খৃ., ৩খ., পৃ. ৫২-৫৩; (৯) মোল্লা মাজদুদ্দীন, সীরাতে মুস্তাফা, মাকতাবা উছমানিয়া, দিল্লী ১৯৫৭ খৃ., পৃ. ৫৮; (১০) মুহাম্মদ রিদা, মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ্ (স), দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরূত ১৯৭৫ খৃ., পৃ. ৩৩৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00