📄 সারিয়যা আবদুল্লাহ ইব্ন হুযাফা
রাসূলুল্লাহ (স) প্রেরিত একটি সারিয়্যা। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সারিয়্যাসমূহের মধ্যে ইহা ৭২তম (দ্র. ড. মুহাম্মাদ ইয়াসীন মাজহার সিদ্দিকী, রাসূল মুহাম্মদ (স)-এর সরকার কাঠামো, পৃ. ৩৫৬)। হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন হুযাফা (রা) এই সারিয়্যার অধিনায়ক ছিলেন (দ্র. প্রাগুক্ত)।
বুখারী ও মুসলিম শরীফসহ বিভিন্ন কিতাবে এই সারিয়্যার উল্লেখ রহিয়াছে। হযরত 'আলী (রা) বলেন, কোন এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স) একদল সৈন্য প্রেরণ করেন। একজন আনসারী সাহাবীকে তিনি উহার সেনাপতি নিযুক্ত করেন। যাত্রাকালে রাসূলুল্লাহ (স) সৈন্যদিগকে সেনাপতির আদেশ মানিয়া চলিবার নির্দেশ প্রদান করেন। বিশেষ কোন কারণে সেনাপতি সৈন্যদের উপর অসন্তুষ্ট হইলে তিনি সৈন্যদিগকে জ্বালানী কাঠ সংগ্রহ করিতে নির্দেশ দিলেন। তাহারা সেনাপতির আদেশানুযায়ী এক স্থানে জ্বালানী কাষ্ঠ স্তূপীকৃত করিলেন। অতঃপর সেনাপতি উহাতে আগুন জ্বালাইতে বলিলে তাহারা আগুন জ্বালাইল। এইবার সেনাপতি বলিলেন, "তোমরা এই অগ্নিতে প্রবেশ কর"। নেতার আদেশানুযায়ী তাহারা আগুনে প্রবেশ করিতে মনস্থ করিল। এমতাবস্থায় কেহ কেহ একে অপরকে বাধা দিয়া বলিতেছিল, "আমরা তো আগুন হইতে রক্ষা পাইবার জন্যই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়াছি"। ইতোমধ্যে আগুন নিস্তেজ হইয়া পড়িল এবং সেনাপতির ক্রোধও প্রশমিত হইল। পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ (স) এই ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হইয়া বলিলেন, "যদি তাহারা উহাতে প্রবেশ করিত তবে কিয়ামত পর্যন্ত উহা হইতে আর বাহির হইতে পারিত না। প্রকৃতপক্ষে আনুগত্যের বিষয়টি সৎকর্মের সহিত সংশ্লিষ্ট" (দ্র. আল-বুখারী, আস-সাহীহ, ২খ., পৃ. ৬২২; অনুরূপ বর্ণনার জন্য আরও দ্র. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২২৫; ইমাম আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১খ., পৃ. ৪০৪)।
অপর এক বর্ণনায় সেনাপতির আগুনে ঝাপ দেওয়ার নির্দেশ মান্য করিবার ব্যাপারে একজন তরুণ সৈন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর মতামত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করিয়া বলেন, "তোমরা আগুন হইতে ভাগিয়াই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়াছ। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাত না করিয়া তোমরা ইহা করিও না। যদি তিনি নির্দেশ দেন তাহা হইলে তোমরা আগুনে প্রবেশ করিও"। অতঃপর তাহারা ফিরিয়া আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে বলিলেন, "যদি তোমরা উহাতে প্রবেশ করিতে তাহা হইলে কোন দিনই উহা হইতে আর বাহির হইতে পারিতে না" (দ্র. মুখতাসার তাফসীরিল কুরআনিল 'আযীম, ১খ., পৃ. ৪০৬-৪০৭)।
উল্লেখ্য যে, বিভিন্ন কিতাবে সারিয়্যা 'আবদুল্লাহ ইবন হুযাফার বর্ণনায় উপরিউক্ত ঘটনা বর্ণিত হইলেও হযরত আলী (রা)-এর বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইব্ন হুযাফার নাম উল্লেখ নাই, বরং এক আনসারী সাহাবীর কথা উল্লেখ করা হইয়াছে। অথচ ইহা স্পষ্ট যে, আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা (রা) ছিলেন কুরায়শ বংশীয়, সেই হিসাবে তিনি মুহাজির। এই পার্থক্যের উপর ভিত্তি করিয়া ইন হাজার (র) ফাতহুল বারীতে হযরত আলী (রা) কর্তৃক বর্ণিত পূর্বোক্ত ঘটনাকে আবদুল্লাহ ইবন হুযাফার ঘটনা নহে বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। আবদুল্লাহ ইবন হুযাফার সারিয়্যা হিসাবে তিনি হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা) হইতে বর্ণিত "সারিয়্যা 'আলকামা ইবন মুজাযযিষ"-এর বর্ণনায় উল্লেখ করিয়াছেন। একদল হাবশী মক্কা শরীফের শহরতলী আক্রমণ ও লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে জেদ্দায় সমবেত হইয়াছিল। আলকামা ইবন মুজাযয্যি্য (রা)-এর নেতৃত্বে রাসূলুল্লাহ (স) একটি সারিয়্যা ৯ম হিজরীতে তাহাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করিয়াছিলেন। অতঃপর হাবশীদল পলায়ন করে। উক্ত সারিয়্যা শেষে তাহাদের মধ্য হইতে একটি অংশ বাড়ি ফিরিবার ব্যাপারে অতি ব্যস্ত হইয়া পড়িলে 'আলকামা (রা) ঐ অতি ব্যস্ত অংশের উপর আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা (রা)-কে নেতৃত্ব দিয়া পাঠাইয়া দেন। ইহাই ছিল সারিয়্যা আবদিল্লাহ ইব্ন্ন হুযাফা। এই অভিযানেই হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন হুযাফা (রা) নিজ সৈন্যদের আগুন প্রজ্জ্বলিত করাইয়া তাহদিগকে উহাতে ঝাপাইয়া পড়িতে আদেশ দিয়াছিলেন (দ্র. ফাতহুল বারী, ৪খ., পৃ. ৭৩)।
তবে এক্ষেত্রে 'আলিমগণ একমত নহেন। প্রথমত, সারিয়্যা আবদুল্লাহ ইবন হুযাফার ঘটনাকে প্রকৃতপক্ষে আবদুল্লাহ ইবন হুযাফার ঘটনা নহে বলিয়া যে যুক্তি দেখানো হইয়াছে যে, তিনি কুরায়শ বংশীয় বা মুহাজির, আর উল্লিখিত সারিয়্যার সেনাপতি ছিলেন একজন আনসারী (انصاری), এই যুক্তিকে এইভাবে খণ্ডন করা হইয়াছে যে, এইখানে আনসারী (انصاری) বলিতে শাব্দিক অর্থ অর্থাৎ সাহায্যকারী। আর প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাহাবীগণের প্রত্যেকেই তাঁহার সাহায্যকারী ছিলেন। অথবা তিনি আনসারদের চুক্তিবদ্ধ মিত্র গোত্রের সাহায্যকারী ছিলেন। এই হিসাবে তাহাকে আনসারী বলা হইয়াছে (সীরাতে মুহাম্মদিয়্যা, উর্দু অনু. মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়্যা, ১খ., পৃ. ৫৬৮)। হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা)-এর উক্তিতে ইহার সমর্থন পাওয়া যায়।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ.
"হে মু'মিনগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তাহাদের যাহারা তোমাদের মধ্যে ক্ষমতার অধিকারী। কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটিলে তাহা উপস্থাপিত কর আল্লাহ ও রাসূলের নিকট" (৪: ৫৯; সীরাতে মুহাম্মাদিয়্যা, উর্দু অনুবাদ মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়্যা, ১খ., পৃ. ৫৬৮)।
দ্বিতীয়ত, ইব্ন জাওযী (র)-সহ কাহারও কাহারও মতে হযরত আলী (রা) বর্ণিত সারিয়্যা এবং হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী (রা) বর্ণিত সারিয়্যা 'আলকামা-এর শেষের অংশ একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা (দ্র. ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, পৃ. ৯৮৩)।
প্রকৃতপক্ষে হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা (রা) কর্তৃক সঙ্গীদিগকে আগুনে ঝাঁপ দিবার আদেশ প্রদানের সহিত সাদৃশ্যের উপর ভিত্তি করিয়া কতিপয় 'আলিম "সারিয়্যা 'আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা"-কে 'সারিয়্যা 'আলকামা-এর অংশ হিসাবে মন্তব্য করিয়াছেন। এমনকি ইমাম বুখারী (র) সারিয়্যা আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা-এর বর্ণনার ক্ষেত্রে শিরোনাম দিয়াছেন : باب سرية عبد الله بن حذافة وعلقمة بن المجزز المدلجى )দ্র. তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম, বুখারী ২খ., পৃ. ৬২২)।
বুখারী শরীফের হাশিয়ায় ইবন হাজারের উদ্ধৃতি দিয়া বলা হইয়াছে, এই সারিয়্যা প্রেরণের কারণ ছিল এই যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট সংবাদ পৌছাইল যে, কতিপয় হাবশী জিদ্দা উপকূলের নিকট সমবেত হইয়াছে, তাহারা মক্কার জনগণের উপর আক্রমণ করিবে। তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের বিরুদ্ধে হযরত 'আলকামা (রা)-কে তিন শত সৈন্যসহ প্রেরণ করিয়াছিলেন (দ্র. ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, প্রাগুক্ত; বুখারী শরীফের পাদটীকা, ২খ., পৃ. ৬২২)। অথচ এই কারণের উপর ভিত্তি করিয়াই রাসূলুল্লাহ (স) 'আলকামা ইব্ন মুজাযযি'য (রা)-কে "সারিয়্যা আলকামায়" পাঠাইয়াছিলেন (সীরাতে হালাবিয়্যা, ৬খ., পৃ. ২০৪)।
উপরিউক্ত সাদৃশ্যের উপর ভিত্তি করিয়া সারিয়্যা আবদুল্লাহ ইবন হুযাফাকে "সারিয়্যা আলকামার” অংশবিশেষ বলা হইলেও কতিপয় বিষয়ে উভয়ের মধ্যে বৈসাদৃশ্যও বিদ্যমান। যেমন (১) সারিয়্যা আবদুল্লাহ ইবন হুযাফার বর্ণনায় আছে যে, কোন এক ব্যাপারে সেনাপতিকে ক্রোধান্বিত করিবার কারণে সেনাপতি তাহাদিগকে আগুন জ্বালাইবার ও উহাতে ঝাঁপ দিতে হুকুম করেন। কিন্তু সারিয়্যা 'আলকামার বর্ণনায় আছে যে, সৈন্যরা তাহাদের কোন প্রয়োজনে আগুন জ্বালাইয়াছিল। (২) সারিয়্যা আবদুল্লাহ ইব্ন হুযাফার বর্ণনায় সেনাপতি ক্রোধান্বিত হইয়া আগুনে প্রবেশের হুকুম দিয়াছেন। আর সারিয়্যা 'আলকামার বর্ণনায় সেনাপতি তামাশাচ্ছলে আগুনে প্রবেশের হুকুম দিয়াছিলেন। (৩) সারিয়্যা আবদুল্লাহ ইব্ন হুযাফার বর্ণনা অনুযায়ী সেনাপতি নির্বাচন করিয়াছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)। আর সারিয়্যা আলকামার বর্ণনা অনুযায়ী আবদুল্লাহ ইব্ন হুযাফাকে সেনাপতি নির্বাচন করিয়াছিলেন 'আলকামা (রা)। উপরিউক্ত বৈপরীত্যের দিকে লক্ষ্য করিলে প্রতীয়মান হয় যে, সারিয়্যা 'আবদুল্লাহ ইব্ন হুযাফা সারিয়্যা 'আলকামার অংশ নহে বা দুইটি বর্ণনা একটি সারিয়্যাকে কেন্দ্র করিয়া নহে। ইব্ন কায়্যিম-এর ইহাই অভিমত (দ্র. তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম, প্রাগুক্ত)। কিন্তু যাহারা দুইটি বর্ণনাকে একই সারিয়্যার বলিয়া মনে করেন তাহারা উপরিউক্ত বৈপরীত্যগুলিকে এইভাবে সমাধান করেন যে, প্রকৃতপক্ষে লক্ষণীয় বিষয় হইল মূল ঘটনা, ঘটনার কোন ক্ষুদ্র অংশ নয় (তাকমিলা, প্রাগুক্ত)। তাহাছাড়া সেনাপতি নির্বাচনের যে বৈপরীত্য রহিয়াছে তাহার সমাধান এইভাবে করা যায়, যেহেতু 'আলকামা (রা) নিজে রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক নির্বাচিত সেনাপতি ছিলেন সেহেতু তাহার নির্বাচিত সেনাপতি 'আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা (রা)-ও যেন রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃকই নির্বাচিত।
বিভিন্ন সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের কারণে সারিয়্যা আবদুল্লাহ ইব্ন হুযাফা এবং সারিয়্যা 'আলকামা ইব্ন মুজাযযিয কাহারও মতে অভিন্ন এবং কাহারও মতে ভিন্ন। দুইটি সারিয়্যা হিসাবে মন্তব্য করা যুক্তিগ্রাহ্য হইলেও ঘটনা দুইটির মুখ্য বিষয় এক। তাহা হইল আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা (রা) কর্তৃক সৈন্যদিগকে আগুনে ঝাপ দেওয়ার মত একটি শরী'আত বহির্ভূত বিষয়ে হুকুম প্রদান। এই হিসাবে প্রকৃত সারিয়্যার বর্ণনা হইল "সারিয়্যা 'আলকামা"। সারিয়্যা আবদুল্লাহ ইবন হুযাফার বর্ণনা প্রকৃতপক্ষে সারিয়্যার বর্ণনা হিসাবে নয়। এইজন্যই অনেক গুরুত্বপূর্ণ সীরাতের কিতাবে ইহার বর্ণনা পাওয়া যায় না। মূলত সারিয়্যা আবদুল্লাহ ইব্ন হুযাফার প্রকৃত উদ্দেশ্য হইল নেতৃত্বের অপপ্রয়োগের একটি ঘটনার উপর ভিত্তি করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক নেতৃত্বের যে প্রকৃত প্রকৃতি নির্দেশিত হইয়াছে, তাহা আলোচনা করা। আর তাহা হইল انما الطاعة في المعروف (নেতার আনুগত্য হইল সৎকর্মের ক্ষেত্রে); সুতরাং من امركم منهم بمعصية الله فلا تطيعوه (কোন নেতা যদি আল্লাহর নাফারমানীর ব্যাপারে কোন হুকুম দেয় সেই হুকুম মান্য করা যাইবে না)।
গ্রন্থপঞ্জীঃ (১) আল-বুখারী, আস-সহীহ, তাজিরানে কুতুব, কলিকাতা, তা. বি., ২খ., পৃ. ৬২২; (২) ইমাম আহমাদ, আল-মুসনাদ, দারুল হাদীছ, কায়রো, তা. বি, ১খ., পৃ. ৪০৪; (৩) ইন্ন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল 'আযীম (মুখতাসার), তাহকীক: মুহাম্মাদ আলী আস-সাবুনী, দারুল কলম, ৫ম সং, বৈরূত ১৪০৬ হি./১৯৮৬ খৃ, ১খ., পৃ. ৪০৬-৪০৭; (৪) ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, কায়রো, তা. বি, ৪খ., পৃ. ৪০৪; (৫) ইবনুল জাওযী, যাদুল মাঙ্গীর ফী ইলমিত তাফসীর, আল-মাকতাবুল ইসলামী, বৈরূত, ১ম সং, ১৩৮৪ হি./ ১৯৬৪খৃ., ২খ., পৃ. ২২৫; (৬) ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, আলামুল কুতুব, লন্ডন, ৩খ., পৃ. ৯৮৩; (৭) মুহাম্মাদ তাকী উছমানী, তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম, মাকতাবাতু দারুল উলূম, ৩য় সং, করাচী ১৪১২হি., ৩খ., পৃ. ৩২০-৩২২; (৮) আলী ইব্ন বুরহানুদ্দীন, সীরাতে হালাবিয়্যা, বৈরূত তা. বি., ৩খ., পৃ. ২০৪-২০৫; (৯) মাওলানা 'আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, সামাদ বুক ডিপো, ভারত, তা. বি, পৃ. ২২১; (১০) মুহাম্মদ 'আলী, সীরাতে মুহাম্মাদিয়্যা (উর্দু অনুবাদ-আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা), কারখানায়ে ইসলামী কুতুব, করাচী, তা.বি, ১খ., পৃ. ৫৬৮; (১১) ডঃ ইয়াসীন মাজহার সিদ্দকী, রাসূল মুহাম্মদ (স)-এর সরকার কাঠামো, অনুবাদঃ মুহাম্মদ ইব্রাহিম ভূইয়া, ই. ফা. বা. ঢাকা. ১৪১৫হি./ ১৯৯৪খৃ., পৃ. ৩৫৬।
📄 গাযওয়া খন্দক (আহ্যাব)
খন্দক (خندق) আরবীকৃত একটি শব্দ, যাহার মূল আর্য-হিন্দী বলিয়া গণ্য করা হয়। উর্দু শব্দ খুদ (کهود), বাংলা শব্দ খাড়া এবং ফার্সী শব্দ কান্দাহ-এর সঙ্গে ইহার সম্পর্ক রহিয়াছে বলিয়া মনে করা হয়। খৃস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে সুরয়ানী ভাষায় রচিত কিতাবুল হিময়ারিয়্যীন (মাওবুর্গ সং, পৃ. ৩০) গ্রন্থেও শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে। কোন শহর বা ছাউনির নিরাপত্তা বিধানের উদ্দেশ্যে উহার চতুর্দিকে যে পরিখা খনন করা হয় তাহাকে খন্দক বলে (দাইরাতুল মা'আরিফিল ইসলামিয়্যা, ১খ., পৃ. ৬৯; শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ১খ., ৪১৯; ইসলামী বিশ্বকোষ, ৯খ., পৃ. ৫০৮)।
এই যুদ্ধে মুসলমানগণ পারস্যের ইস্পাহান এলাকার অধিবাসী সালমান ফারসী (রা)-এর পরামর্শক্রমে যুদ্ধের অভিনব কৌশল হিসাবে মদীনার সম্ভাব্য শত্রু প্রবেশপথের বিস্তৃত এলাকায় খন্দক তথা পরিখা খনন করিয়াছিলেন বিধায় এই যুদ্ধকে "খন্দকের যুদ্ধ" নামে অভিহিত করা হয় (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ২৭১; ফাতহুল-বারী, ৮খ., পৃ. ৩৯৫; উমদাতুল-কারী, ১২খ., পৃ. ১৩৬; আশ-শাওকানী, ফাতহুল-কাদীর, ৪খ., পৃ. ৩২৮; তাফসীর ২খ., পৃ. ১৬৩)।
এই যুদ্ধে ইয়াহুদী ও কুরায়শদের বিভিন্ন গোত্র ও দল ঐক্যবদ্ধ হইয়া মুসলমানদের নির্মূল করিবার দৃঢ় সংকল্প লইয়া মদীনা আক্রমণ করিয়াছিল বলিয়া এই যুদ্ধকে গাযওয়া আহযাব বা সম্মিলিত বাহিনীর যুদ্ধ নামকরণ করা হইয়াছে (দ্র. ৩৩: ২০)। আহযাব আরবী শব্দ হিযবুন (حزب)-এর বহুবচন, যাহার অর্থ বহু দল বা বাহিনী (সীরাতে মুহাম্মাদিয়্যা, ১খ., পৃ. ৪০২; ইসলামী বিশ্বকোষ, ৯খ., পৃ. ৫০৮)।
খন্দকের যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকরী ঘটনা। রাসূলুল্লাহ (স)-এর মদীনায় হিজরতের পর মুসলমান ও মক্কার কুরায়শ বাহিনীর সাথে উপর্যুপরি সামরিক অভিযান ও আক্রমণ কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে আরব উপদ্বীপে মুসলমানদের অনেকটা অনুকূল ও নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি হইয়াছিল। কিন্তু যেই সকল ইয়াহুদী নিজেদের দুষ্কর্ম ও চক্রান্তের কারণে বিবিধ অপমান ও লাঞ্ছনার সম্মুখীন হইয়াছিল তখনও তাহাদের চৈতন্যদয় হয় নাই। বিশ্বাসঘাতকতা, শঠতা, অঙ্গীকার ভঙ্গ, ধোঁকাবাজি, ষড়যন্ত্র ইত্যাদি নানাবিধ অপকর্মের অশুভ পরিণতি হইতে কোন শিক্ষাই তাহারা গ্রহণ করে নাই। কাজেই মদীনা শরীফ হইতে বহিষ্কৃত হইয়া ইয়াহুদী গোত্র বনূ নাযীর খায়বারে অবস্থানের পর মুসলমান ও মূর্তিপূজকদের মধ্যে যে সামরিক টানাপড়েন বা বিদ্বেষ চলিতেছিল তাহার ফলাফল কি দাঁড়ায় তাহা জানিবার জন্য তাহারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করিতেছিল। কিন্তু যখন তাহারা দেখিল যে, পরিস্থিতি ক্রমেই মুসলমানদের অনুকূলে ধাবিত হইতেছে এবং তাহাদের শাসন ক্ষমতা দিন দিন বিস্তৃতি লাভ করিতেছে, তখন তাহারা হিংসার ক্রোধানলে জ্বলিয়া-পুড়িয়া মরিতে লাগিল এবং নানা প্রকার হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইল। শেষবারের মত মুসলমানদের উপর এমন এক চরম আঘাত হানার জন্য তাহারা প্রস্তুতি শুরু করিল যাহাতে মুসলমানদের জীবন প্রদীপ চিরদিনের জন্য নির্বাপিত হইয়া যায় (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩০১)।
দীর্ঘ কাল যাবৎ পরাধীন থাকিবার ফলে নীচ প্রবৃত্তি ও কাপুরুষতা ইয়াহুদী জাতির মজ্জাগত হইয়া পড়িয়াছিল। এইজন্য তাহারা কোন দিনই মুসলমানদে বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ লড়াই-এ অগ্রসর হওয়ার সাহস করে নাই। কিন্তু লোকদিগকে কুমন্ত্রণা দিয়া উত্তেজিত করিতে এবং গোপনে গোপনে ষড়যন্ত্র পাকাইতে তাহারা ছিল যথেষ্ট সিদ্ধহস্ত। শেষচেষ্টা হিসাবে তাহারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরায়শ ও অন্যান্য বিধর্মী গোত্রকে উত্তেজিত ও সংঘবদ্ধ করার বক্র পথটি বাছিয়া নেয়। এই প্রেক্ষাপটেই মুসলমান ও সম্মিলিত মুশরিক বাহিনীর সাথে আহযাব বা খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
খন্দকের যুদ্ধের সন-তারিখ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছু মতভেদ রহিয়াছে। ইব্ন ইসহাক, ইব্ন উরওয়া, ইব্ন যুবায়র, কাতাদা, বায়হাকীসহ অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও সীরাত বিশেষজ্ঞের মতে পঞ্চম হিজরীর শাওয়াল মাস মুতাবিক ফেব্রুয়ারী ৬২৬ খৃ. ইহা সংঘটিত হয় (ফাতহুল বারী, ৮খ., ৩৯৭; সীরাতে ইবন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ৩৪৫; সীরাতে ইবনে হিশাম, ২খ., পৃ. ১২৫; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ৯৫)। ইমাম যাহাবী ও ইবনুল কায়্যিম (র) ইহাকে সঠিক অভিমত বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন (ইদরীস কান্ধলাবী, সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., পৃ. ৩০৯)। মূসা ইব্ন উকবা বলেন, খন্দকের যুদ্ধ চতুর্থ হিজরীর শাওয়াল মাসে সংঘটিত হয়। ইমাম বুখারীও এই মতকে সমর্থন করিয়াছেন (সীরাতে মুহাম্মাদিয়্যা, ১খ., পৃ. ৪০৩)। ঐতিহাসিক বালাযুরী চতুর্থ হিজরী যুল-কা'দা মাসে এই যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছে বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন (আনসাবুল আশরাফ, ১খ., পৃ. ৩৪৩; ইসলামী বিশ্বকোষ, ৯খ., পৃ. ৫০৮)। ইবন সা'দ ও ওয়াকিদীর মতে পঞ্চম হিজরীর যুল-কা'দা মাসে এই যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয় (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৬৫; শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১০৩)। ইব্ন ইসহাকসহ অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে উহুদ যুদ্ধ তৃতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসে এবং খন্দকের যুদ্ধ পঞ্চম হিজরীর শাওয়াল মাসে সংঘটিত হয় এবং ইহাই বিশুদ্ধ মত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৯৫)। আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) বর্ণিত হাদীছের ভিত্তিতে ইমাম বুখারী (র) মূসা ইব্ন উকবার মতকে প্রাধান্য দিয়াছেন। আবদুল্লাহ্ ইবন উমার (রা) বলেন, আমি উহুদ যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট যুদ্ধে গমনের অনুমতি প্রার্থনা করিয়াছিলাম। তখন আমার বয়স ছিল চৌদ্দ বৎসর। তিনি আমাকে অনুমতি প্রদান করেন নাই। খন্দক যুদ্ধের দিন তাঁহার সমীপে উপস্থিত হইয়াছিলাম তখন আমার বয়স ১৫ বৎসর। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে এই যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করিয়াছেন (সহীহ আল-বুখারী, ২খ., ৫৮৮)।
উক্ত বর্ণনার দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, উহুদ এবং খন্দকের যুদ্ধের মধ্যে এক বৎসরের ব্যবধান। সুতরাং উহুদের যুদ্ধ তৃতীয় হিজরীতে হইলে খন্দকের যুদ্ধ চতুর্থ হিজরীতে হওয়ারই কথা। অধিকাংশ সীরাত বিশেষজ্ঞ ও ঐতিহাসিক এই ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করিয়াছেন যে, খন্দক যুদ্ধ পঞ্চম হিজরীতেই সংঘটিত হইয়াছিল। ইমাম বায়হাকী ইহার সমাধানকল্পে বলেন, ইহা আশ্চর্যের বিষয় নয় যে, আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমার (রা) উহুদ যুদ্ধের সময় পূর্ণ চৌদ্দ বৎসর বয়স্ক ছিলেন না, বরং তখন চৌদ্দ বৎসরে কেবল পদার্পণ করিয়াছিলেন। আর খন্দকের যুদ্ধের সময় তিনি পূর্ণ ১৫ (পনের) বৎসরে উপনীত হন। এই হিসাবমতে উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধের মধ্যে দুই বৎসরের ব্যবধান হয় (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৯৩; যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ২১৮; সীরাতে মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩০৯-৩১০)। সুতরাং খন্দকের যুদ্ধ পঞ্চম হিজরীর শাওয়াল মাসেই সংঘটিত হইয়াছিল।
এই যুদ্ধের মূল কারণ ছিল নির্বাসিত ইয়াহুদী গোত্র বানু নাযীরের বিশজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। যথা সালাম ইব্ন আবিল হুকায়ক, হুয়াই ইব্ন আখতাব, কিনানা ইব্নুর রবী', হাওযা ইব্ন কায়স আল-ওয়াইলী, আবূ আম্মার আল-ওয়াইলী এবং বানু ওয়াইলের আরও কিছু সংখ্যক লোক ঐক্যবদ্ধ হইয়া মুসলমানদিগকে সমূলে উৎখাত করিবার ষড়যন্ত্রে একটি শক্তিশালী সম্মিলিত বাহিনী গঠন করে (তারীখ তাবারী, ২খ., পৃ. ২৩৩; আল-কামিল ফিত-তারীখ, ২খ., পৃ. ১৭৮)।
উহুদ যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তনকালে আবূ সুফ্যান ঘোষণ করিয়াছিল যে, আগামী বৎসর বদর প্রান্তরে আবার দেখা হইবে। কিন্তু পরে অনুধাবন করিল যে, একটি শক্তিশালী সুদৃঢ় বাহিনী ব্যতীত মুসলমানদের মুকাবিলা করা অসম্ভব। তাই পরবর্তী বৎসর বদর প্রান্তরে তাহারা যুদ্ধের জন্য যায় নাই। উহুদ যুদ্ধে কুরায়শদের আংশিক বিজয় ও পুনরায় যুদ্ধের হুমকি খয়বারের ইয়াহুদীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাহারা পরিকল্পনামত প্রথমে মক্কায় গিয়া কুরায়শদের সহিত সাক্ষাত করে এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য তাহাদিগকে প্ররোচিত করে। তাহারা বলে, তোমাদের সার্বিক সহযোগিতা পাইলে আমরা ঐক্যবদ্ধ হইয়া মুহাম্মদ (স)-কে সমূলে উৎখাত করিতে পারিব (সীরাত ইব্ন হিশাম, ২খ., পৃ. ১২৫; নবীয়ে-রহমত, পৃ. ২৫০)। যেহেতু উহুদ যুদ্ধের দিন কুরায়শরা পুনরায় মুসলমানদের সঙ্গে বদরে মুকাবিলা করিবার প্রতিশ্রুতি দিয়াও তাহা পালন করিতে ব্যর্থ হয় এবং ইহার ফলে যোদ্ধা হিসাবে তাহাদের সুখ্যাতির যে হানি হয় তাহা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে বানু নাযীরের এই প্রস্তাব তাহাদিগকে উৎসাহিত করে (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩০১)। কুরায়শরা তাহাদিগকে বলিল, হে ইয়াহুদী সম্প্রদায়! তোমরা প্রথম কিতাবধারী, মুহাম্মাদের সাথে আমাদের বিরোধের কারণ তোমাদের অজানা নয়। আচ্ছা তোমরা বল, আমাদের ধর্ম উত্তম, না মুহাম্মাদ (স)-এর ধর্ম উত্তম? তাহারা বলিল, তোমাদের ধর্মই তাঁহার ধর্ম অপেক্ষা উৎকৃষ্ট এবং তোমরাই সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত আছ (ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৪৪২; সীরাত ইব্ন হিশাম, ২খ., পৃ. ১২৫-১২৬)। ইহাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِّنَ الْكِتَابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ وَيَقُولُونَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا هُؤُلَاءِ أَهْدَى مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا سَبِيلًا أُولَئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ وَمَنْ تَلْعَنِ اللَّهُ فَلَنْ تَجِدَ لَهُ نَصِيرًا .
"তুমি কি তাহাদিগকে দেখ নাই, যাহাদিগকে কিতাবের এক অংশ দেওয়া হইয়াছিল, তাহারা জিন্ত ও তাগূতে (প্রতিমার নাম) বিশ্বাস করে? তাহারা কাফিরদের সম্বন্ধে বলে, ইহাদের পথ মু'মিনদের অপেক্ষা প্রকৃষ্টতর। ইহারাই তাহারা যাহাদিগকে আল্লাহ্ লা'নত করিয়াছেন এবং আল্লাহ যাহাকে লা'নত করেন তুমি কখনও তাহার কোন সাহায্যকারী পাইবে না" (৪: ৫১-৫২)।
তাহাদের বক্তব্য শুনিয়া কুরায়শরা ভীষণ খুশী হইল এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে তাহাদের যুদ্ধ প্রস্তাবও তাহারা সানন্দে গ্রহণ করিল। অতঃপর সকলে একমত হইয়া যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইতে থাকে (সীরাত ইব্ন হিশাম, ২খ., পৃ. ১২৬)।
ইয়াহুদীদের এই দলটি বনী গাতাফান গোত্রের নিকট গমন করে এবং কুরায়শদের ন্যায় তাহাদিগকেও যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করিতে থাকে (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩০১, ৩০৮)। গাতাফান গোত্রের লোকেরা পূর্ব হইতেই মুসলমানদের শত্রু ছিল। উপরন্তু ইয়াহুদীরা বন্ গাতাফানের কাছে তাহাদের সহযোগিতা ও সমর্থনের নিদর্শনস্বরূপ খায়বারের উৎপাদিত এক বৎসরের খেজুর প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিল। ইহাতে তাহারা সাগ্রহে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করিল (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ১খ., পৃ. ২৪৪; ফাতহুল বারী, ৮খ., পৃ. ৩৯৫)। আসাদ গোত্রের সহিত গাতাফানীদের মিত্রতা ছিল। সুলায়ম গোত্রের সহিত কুরায়শদের আত্মীয়তা ছিল এবং সা'দ গোত্র ইয়াহুদীদের মিত্র ছিল। ফলে এই গোত্রগুলিও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হইয়া যুদ্ধে যোগদান করিল (কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৪৪২)।
সিদ্ধান্ত মুতাবিক সর্বপ্রথম আবূ সুফয়ান তিন শত ঘোড়া, এক হাজার পাঁচ শত উট এবং চার হাজার সুদক্ষ কুরায়শ সেনা লইয়া মক্কা হইতে বাহির হইল। দারুন-নদওয়ায় কুরায়শদের পতাকা তৈরী করা হইল এবং উছমান ইব্ন তালহা ইব্ন আবী তালহাকে পতাকা প্রদান করা হইল (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৬৬; আল-ওয়াফা বিআহওয়ালিল মুস্তফা, পৃ. ৬৯২)। তাহার পিতা তালহা উহুদ যুদ্ধে কুরায়শদের পতাকা বহনকালে মুসলমাদের হাতে নিহত হইয়াছিল বলিয়া এই যুদ্ধে তাহার পুত্র উছমানকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়। কুরায়শ ও ইয়াহুদী দলের আহবানে সাড়া দিয়া সুফয়ান ইব্ন আবদ শামসের নেতৃত্বে বনূ সুলায়মের সাত শত সৈন্য, উয়ায়না ইব্ন হিস্স-এর নেতৃত্বে বনূ ফাযারার এক হাজার উষ্ট্রসহ কয়েক শত অনুচর, মাসউদ ইব্ন রুখায়লার নেতৃত্বে আশজা গোত্রের চার শত সৈন্য, আল-হারিছ ইব্ন আওফের নেতৃত্বে বনূ মুররার চার শত সৈন্য, তালহা ইব্ন খুওয়ায়লিদ-এর নেতৃত্বে বনূ আসাদের বেশ কিছু সংখ্যক সৈন্য, জুর ও মাগাবার মধ্যবর্তী রুমা-এর মুজতামিউল আছিয়ালে সমবেত হয় (উমদাতুল কারী, ১২খ., পৃ. ১৩৬; আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৬৬; রূহুল মা'আনী, ১২খ., পৃ. ১৫৫; ফাতহুল কাদীর, ৪খ., পৃ. ৩২৮; যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ২৭১; জালাল মাজহার, মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (সা), পৃ. ২৩৫)।
আবূ সুফয়ান ইব্ন হারব-এর নেতৃত্বে সম্মিলিত বাহিনীর দশ হাজার সৈন্য (তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., পৃ. ২৩৬; কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৪৪৪), মতান্তরে ১২ (বার) বা ১৫ (পনের) হাজার সৈন্যের (জামিউল-বায়ান ফী তাফসীরিল কুরআন, ২খ., পৃ. ১৬৩; জিহাদের ময়দানে রাসূল মুহাম্মদ (স), পৃ. ৭৫) বিশাল বাহিনী মদীনার উপকণ্ঠে রুমাহ্-এর পশ্চিমে জুরফ ও যাগা-এর সংযোগ স্থলে অবস্থান গ্রহণ করে (মু'জামুল বুলদান, ৪খ., পৃ. ৩৩৬; মুফরাদাতুত তারীখিল উমাম আল-ইসলামিয়্যা, ১খ., পৃ. ১১৯; কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৪৪৪)।
আবূ সুফ্যানের নেতৃত্বে সম্মিলিত বাহিনীর মদীনা অভিমুখে যাত্রা সম্পর্কে খুযা'আ গোত্রের কিছু সংখ্যক লোকের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (স) অবহিত হইলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) উদ্ভুত পরিস্থিতি লইয়া সাহাবীদের সহিত পরামর্শ বৈঠকে বসিলেন। শত্রুবাহিনীর প্রতিরোধকল্পে মদীনার বাহিরে গিয়া যুদ্ধ করা সমীচীন হইবে কিনা এই বিষয়ে পক্ষ-বিপক্ষের আলোচনা শেষে বিগত উহুদ যুদ্ধের অভিজ্ঞতার আলোকে মদীনার ভিতরে থাকিয়া শহর প্রতিরক্ষার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হইল। সাথে সাথে শত্রু প্রতিরোধের অভিনব পদ্ধতি হিসাবে সালমান ফারসী (রা) -এর খন্দক খননের প্রস্তাবও গৃহীত হইল (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৬৬; দাইরাতুল মা'আরিফিল ইসলামিয়্যা, ৮খ., পৃ. ৪৬৩)। সালমান ফারসী (রা)-এর প্রস্তাবটি ছিল নিম্নরূপঃ يا رسول الله انا كنا بأرض فارس اذا حوصرنا خندقنا علينا.
"হে আল্লাহ্র রাসূল! পারস্যে যখন আমাদিগকে অবরোধ করা হইত তখন আমরা আমাদের পার্শ্ববর্তী স্থানে পরিখা খনন করিতাম" (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩০৩; তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., পৃ. ২৩৪)।
খন্দক খননের এই কৌশল ছিল তাঁহাদের নিকট অজ্ঞাত। এই প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স) তাহা বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিলেন। মদীনার তিনদিক পাহাড়, খেজুর বাগান, টিলা ও বাড়ি-ঘর দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। ঐ সমস্ত খেজুর বাগান প্রাচীরের কাজ করিতেছিল। অশ্বারোহী সৈন্যের আক্রমণ প্রতিহত করিবার জন্য ইহার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। অভ্যন্তরস্থ রাস্তাগুলি এতই সরু ও সংকীর্ণ ছিল যে, শত্রুসৈন্যদের ঐদিক দিয়া আক্রমণ করা ছিল অসম্ভব। শুধু মদীনার উত্তরাঞ্চল তথা সিরিয়ার দিকটি ছিল উন্মুক্ত (আহমদ বাশমীল, গাযওয়া আহযাব, পৃ. ৪৫; আল-কাশাফ, ৩খ., পৃ. ৫২৬; ফী যিলালিল কুরআন, ৫খ., পৃ. ২৮৩৩; মাদারিকুত তানযীল, ৩খ., পৃ. ৪৮৫)। কাজেই শুধু এইদিকে পরিখা খনন করিলে অতি সহজে শহর ও শহরবাসীকে অক্ষত অবস্থায় রাখা যাইবে।
সুতরাং রাসূলুল্লাহ (স) মদীনার অদূরে সালা' পাহাড়ের সম্মুখে হাররাতুল-ওয়াকিম ও হাররাতুল-ওয়াবরার মধ্যস্থলে পরিখা খনন করিবার নির্দেশ দিলেন (কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৪৪৫)।
খননকার্যে তিন হাজার মুসলিম মুজাহিদ অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। প্রতি দশজনের উপর চল্লিশ হাত দীর্ঘ পরিখা খননের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিন শত ক্ষুদ্র দলের প্রত্যেক দল-বিশ গজ বা চল্লিশ হাত করিয়া মোট ছয় হাজার গজ বা বার হাজার হাত তথা প্রায় সাড়ে তিন মাইল দীর্ঘ পরিখা খনন করেন। ঐতিহাসিকগণ পরিখার প্রন্থের কোন বর্ণনা উল্লেখ করেন নাই। কিন্তু "ঘোড়া লাফ দিয়া অতিক্রম করিতে পারিবে না" এই ব্যাখ্যা দ্বারা সম্ভবত ইহা বলা যাইতে পারে যে, পরিখা দশ গজ চওড়া এবং পাঁচ গজ গভীর ছিল (ইসলামী বিশ্বকোষ, ৯খ., পৃ. ৫১০)। ইবন হাজার (র) বলেন, পরিখা এত পরিমাণ গভীর ছিল যে, ইহাতে সাতার কাটা যাইত (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩০৫)। এই বিষয়ে সুস্পষ্ট কোন বর্ণনা না থাকিলেও বলা যায় যে, পরিখাটি ঐ পরিমাণ গভীর ও প্রশস্ত ছিল যাহাতে শত্রুসৈন্য সহজে তাহা অতিক্রম করিতে সক্ষম না হয় (হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা (স): সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৬০৭)।
সালমান ফারসী (রা) যেহেতু পরিখা খনন পরিকল্পনার উদ্ভাবক ও এই বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন এবং তিনি মুহাজির ও আনসার কোন দলেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না, তাই তাঁহাকে নিজ নিজ দলভুক্ত করিবার জন্য মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে কিছুটা প্রতিযোগিতার ভাব পরিলক্ষিত হয়। রাসূলুল্লাহ (স) ইহার সমাধান করিতে গিয়া বলেন, "সালমান আমার পরিবারভুক্ত” (উসদুল গাবা, ২খ., পৃ. ৩৩১; কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৪৪৬)।
পরিখা খননের সময়পর্ব সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। ইব্ন সা'দ (র)-এর বর্ণনামতে ছয় দিনে এই পরিখা খননকার্য সম্পন্ন হয় (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৬৭)। মূসা ইব্ন উকবা বলেন, বিশ দিনে খন্দক খননকার্য সম্পন্ন হয় (সীরাতে মুহাম্মাদিয়্যা, ১খ., পৃ. ৪০৭)। আল্লামা সামুহূদী বলেন, সঠিক মত হইল, খন্দক খনন ছয় দিনেই সম্পন্ন হয়। বিশ দিন ছিল সর্বমোট অবরোধের সময় (শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১১০)। রাসূলুল্লাহ (স) খন্দক খননকার্যে স্বয়ং মুসলিম সৈন্যদের সহিত অংশগ্রহণ করিয়া তাহদিগকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেন। মুসলিম সৈন্যসংখ্যা ছিল তিন হাজার। মুহাজিরদের পতাকা যায়দ ইব্ন হারিছা (রা)-র হাতে এবং আনসারগণের পতাকা সা'দ ইব্ন উবাদা (রা)-র হাতে ছিল (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৬৭)। রাসূলুল্লাহ (স) সর্বপ্রথম যমিনে কোদাল মারিয়া খননকার্যের শুভ সূচনা করেন এবং আবৃত্তি করেন: بسم الله وبه بدينا + ولو عبدنا غيره شقينا حبذا ربا وحبذا دينا.
"আল্লাহ্র নামে আরম্ভ করিতেছি। তাঁহাকে ছাড়া অন্য কাহারও উপাসনা করিলে আমাদের বদনসীব। অথচ তিনিই উত্তম প্রভু এবং তাঁহার মনোনীত ধর্মই উত্তম ধর্ম" (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩০৪; সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩)।
মুসলিম বাহিনী পূর্ণ উদ্যম ও নিষ্ঠার সাথে খননকার্য চালাইয়া যাইতেছিলেন। কিন্তু কতিপয় মুনাফিক ইহাতে গড়িমসি শুরু করিল। তাহারা ছোটখাট অজুহাত দেখাইয়া খননকার্য হইতে সরিয়া দাঁড়াইল। এমনকি রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিনা অনুমতিতে তাহারা ফাঁকি দিয়া স্বীয় পরিবারবর্গের নিকট চলিয়া গেল। আল্লাহ তা'আলা তাহাদের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করিয়া দিয়া ইরশাদ করেন: لَا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُمْ بَعْضًا قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ يَتَسَلَّلُوْنَ مِنْكُمْ لِوَاذًا فَلَيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبُهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ.
"রাসূলের আহ্বানকে তোমরা তোমাদের একে অপরের প্রতি আহ্হ্বানের মত গণ্য করিও না; তোমাদের মধ্যে যাহারা চুপি চুপি সরিয়া পড়ে আল্লাহ তাহাদিগকে জানেন। সুতরাং যাহারা তাহার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তাহারা সতর্ক হউক যে, বিপর্যয় তাহাদের উপর আপতিত হইবে অথবা আপতিত হইবে তাহাদের উপর মর্মান্তিক শাস্তি” (২৪ঃ ৬৩)।
পক্ষান্তরে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের ও পরকালে ছওয়াবের আশায় মুসলিম সৈন্যগণ সকল বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করিয়া আন্তরিকতার সাথে খননকার্যে অংশগ্রহণ করেন। তাঁহাদের কোন জরুরী প্রয়োজন দেখা দিলে তাহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর গোচরীভূত করিতেন এবং মহানবী (স)-এর অনুমতি গ্রহণ করিয়া প্রয়োজন সারিয়া পুনরায় কার্যে যোগদান করিতেন। তাঁহাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন: إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِذَا كَانُوا مَعَهُ عَلَى أَمْرٍ جَامِعٍ لَّمْ يَذْهَبُوا حَتَّى يَسْتَأْذِنُوهُ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَأْذِنُونَكَ أُولَئِكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ فَإِذَا اسْتَأْذَنُوكَ لِبَعْضٍ شَأْنِهِمْ فَإِذَنْ لِمَنْ شِئْتَ مِنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمُ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ.
"তাহারাই মু'মিন যাহারা আল্লাহ এবং তাঁহার রাসূলে ঈমান আনে এবং রাসূলের সংগে সমষ্টিগত ব্যাপারে একত্র হইলে তাঁহারা অনুমতি ব্যতীত সরিয়া পড়ে না। যাহারা তোমার অনুমতি প্রার্থনা করে তাহারাই আল্লাহ এবং তাঁহার রাসূলে বিশ্বাসী। অতএব তাহারা তাহাদের কোন কাজে বাহিরে যাইবার জন্য তোমার অনুমতি চাহিলে তাহাদিগের মধ্যে যাহাদের ইচ্ছা তুমি অনুমতি দিও এবং তাহাদিগের জন্য আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিও। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (২৪ঃ ৬২)।
রাসূলুল্লাহ (স) স্বয়ং সাহাবীগণের সঙ্গে পরিখা খনন করেন। শৈত্যপ্রবাহ ছিল খুব তীব্র এবং ঐ বৎসরটি ছিল দুর্ভিক্ষের। আর্থিক দৈন্যতার দরুন খাদ্যের পরিমাণও ছিল তাহাদের প্রয়োজনের তুলনায় নেহায়েত অল্প (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩০৩)। হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, পরিখা খননরত মুসলমানদের জন্য যে সামান্য পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য আনা হইয়াছিল তাহা ছিল খুব নিম্নমানের। উহাই তাহারা ভক্ষণ করিয়াছিলেন (সহীহ্ আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৮৮)। মুসলমানগণ অত্যন্ত কষ্টক্লেশ ও ক্ষুধার যন্ত্রণা উপেক্ষা করিয়া খন্দক খননে আত্মনিয়োগ করেন। আবূ তালহা (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে ক্ষুধার কথা বলিলাম এবং নিজেদের পেট দেখাইলাম। পেটে তখন পাথর বাঁধা ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) তখন তাঁহার পেটের উপর হইতে কাপড় সরাইয়া দিলেন, দেখিলাম তাহাতে দুইটি পাথর বাঁধা আছে (মিশকাতুল মাসাবীহ, ২খ., পৃ. ৪৪৮)। সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের উজ্জ্বল আদর্শ স্থাপন করিলেন মহানবী (স) খন্দক খননে সক্রিয় অংশগ্রহণ করিয়া। মাটির ঝুড়ি কাঁধে লইয়া অতি উৎসাহ ও উদ্দীপনার সহিত তিনি নিম্নের কবিতাটি আবৃত্তি করিলেন : اللهم لولا انت ما اهتدينا + ولا تصدقنا ولا صلينا فأنزل سكينة علينا + وثبت الاقدام ان لاقينا ان الأولى قد بغوا علينا + وان ارادوا فتنة أبينا
“হে আল্লাহ! তুমি না হইলে আমরা হিদায়াত লাভ করিতে পারিতাম না, সাদাকা দিতে এবং সালাত আদায় করিতে জানতাম না। হে প্রভু! তুমি আমাদের প্রতি শান্তি অবতীর্ণ কর এবং শত্রুর সহিত যুদ্ধকালে আমাদিগকে অটল ও দৃঢ় রাখ। মুশরিকরা আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করিয়াছে। আর তাহারা বিপর্যয় সৃষ্টির সংকল্প করিলে আমরা তাহাতে অসম্মতি প্রকাশ করি” (সহীহ আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৪৯; সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ১১২)।
ক্ষুধার্ত সাহাবীগণের অক্লান্ত পরিশ্রম ও কষ্ট দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর কোমল হৃদয় বিগলিত হইয়া পড়িত। এই মর্মস্পর্শী করুণ দৃশ্য দেখিয়া উৎকণ্ঠিত স্বরে তিনি বলিয়া উঠেন : اللهم لا عيش الا عيش الآخرة + فاغفر الانصار والمهاجرة
“হে আল্লাহ্! আখেরাতের জীবনই প্রকৃত জীবন। অতএব তুমি আনসার ও মুহাজিরদিগকে ক্ষমা কর” (সহীহ্ আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৮৮; সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ১১৩)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই দু'আ শ্রবণ করিয়া সাহাবীগণ সান্ত্বনা পাইতেন এবং দ্রুতবেগে মাটির ঝুড়ি মাথায় লইয়া দৌড়াইতেন আর আবৃত্তি করিতেন : نحن الذين بايعوا محمدا + على الجهاد ما بقينا ابدا.
"আমরা তো মুহাম্মাদ (স)-এর হাতে আজীবন জিহাদ করিবার শপথ গ্রহণ করিয়াছি” (সহীহ্ মুসলিম, ২খ., পৃ. ১১৩)।
কোন কোন সময় রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহাদিগকে উৎসাহিত করিয়া বলিয়াছিলেন : اللهم انه لاخير الا خير الاخرة + فبارك في الانصار والمهاجرة.
“হে আল্লাহ! আখেরাতের কল্যাণই আসল কল্যাণ। সুতরাং তুমি আনসার ও মুহাজিরদিগকে বরকত দান কর" (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৪; উমদাতুল কারী, ১৪খ., পৃ. ১৩২)।
মুসলমানদের ঈমান সুদৃঢ়করণ ও নবুওয়াতের প্রত্যয়ন হিসাবে খন্দক খননকালে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর মাধ্যমে কিছু মু'জিযার প্রকাশ ঘটে।
জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ (রা) বলেন, খন্দক খননকালে আমি নবী করীম (স)-কে অত্যন্ত ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখিতে পাইলাম। আমি বাড়ি গিয়া স্ত্রীকে বলিলাম : তোমার কাছে কি খাওয়ার মত কিছু আছে? রাসূলুল্লাহ (স) অত্যন্ত ক্ষুধার্ত। তখন সে একটা চামড়ার পাত্র আনিয়া তাহা হইতে এক সা' পরিমাণ যব বাহির করিল। আমাদের একটা বকরীর বাচ্চা ছিল। আমি বকরীর বাচ্চাটি যবেহ করিলাম এবং গোশত ডেকচিতে উঠাইলাম। আমার স্ত্রীও যব পিষিয়া আটা তৈরি করিল। আমরা একইসাথে কাজ দুইটি সম্পন্ন করিলাম। অতঃপর নবী (স)-এর কাছে ফিরিয়া গেলাম। আমার স্ত্রী বলিল, আমাকে রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার সাহাবীদের নিকট লজ্জিত করিও না। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে গোপনে বলিলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! বাড়ীতে আমরা ছোট একটি বকরীর বাচ্চা যবাহ্ করিয়াছি। ঘরে এক সা'পরিমাণ যব ছিল। আমার স্ত্রী তাহা পিষিয়া আটা তৈরি করিয়াছে। আপনি আরো কয়েকজনকে সাথে লইয়া চলুন। এই কথা শুনিয়া নবী করীম (স) উচ্চস্বরে সকলকে ডাকিয়া বলিলেন, হে পরিখা খননকারিগণ! তাড়াতাড়ি চল। জাবির তোমাদের জন্য খাবার প্রস্তুত করিয়াছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলিলেন : তুমি যাও, তবে আমি না আসা পর্যন্ত গোশতের ডেকচি চুলা হইতে নামাইবে না এবং খামীর হইতে রুটিও তৈরি করিও না। অতঃপর আমি বাড়িতে আসিলাম। কিছুক্ষণ পর রাসূলুল্লাহ (স)-ও সাহাবীগণকে লইয়া উপস্থিত হইলেন। আমি আমার স্ত্রীর কাছে গেলে সে বলিল, আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। তুমি ইহা কি করিলে? আমি বলিলাম, তুমি যাহা বলিয়াছিলে আমি তাহাই করিয়াছি। অর্থাৎ তোমার আশংকা রাসূলুল্লাহ (স)-কে অবহিত করিয়াছি। অতঃপর আমার স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আটার খামীর আগাইয়া দিলে তিনি তাহাতে মুখের লালা মিশাইলেন এবং বরকতের জন্য দু'আ করিলেন। অতঃপর ডেকচির কাছে আগাইয়া গিয়া তাহাতেও লালা মিশাইলেন এবং বরকতের জন্য দু'আ করিলেন এবং বলিলেনঃ হে জাবির! রুটি প্রস্তুতকারীকে ডাক। সে আমার পাশে থাকিয়া রুটি তৈরি করুক এবং চুলার উপর হইতে ডেকচি না নামাইয়া গোশ্ত পরিবেশন করুক। জাবির (রা) বর্ণনা করেন, সাহাবীদের সংখ্যা ছিল এক হাজার। আমি আল্লাহ্র কসম করিয়া বলিতেছি, সবাই তৃপ্তি সহকারে খাওয়ার পরও ডেকচি ভর্তি গোস্ত টগবগ করিয়া ফুটিতেছিল এবং আটার খামীর হইতেও রুটি প্রস্তুত হইতেছিল (সহীহ আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৮৮-৫৮৯)।
ইবন ইসহাক বলেন, সাঈদ ইব্ন মীনা আমার নিকট বর্ণনা করেন, বাশীর ইবন সা'দের জনৈকা কন্যা অর্থাৎ নু'মান ইব্ন বাশীর (রা) -এর বোন বলেন, আমার মাতা আমরাহ্ বিন্ত রাওয়াহা আমাকে ডাকিয়া আমার কাপড়ে এক মুষ্টি খেজুর ঢালিয়া দিলেন। অতঃপর বলিলেন, বৎস! তুমি এইগুলি তোমার পিতা ও তোমার মামা আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহার কাছে নিয়া যাও, তাহারা সকালের খাবার খাইবেন। আমি সেইগুলি নিয়া রওয়ানা হইলাম। আমি তাহাদের খোঁজাখুঁজি করিতেছি, এমন সময় রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে আমার দেখা হইল। তিনি বলিলেনঃ বৎস, এইদিকে আস! তোমার কাছে এইগুলি কি? আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এইগুলি খেজুর। আমার পিতা বাশীর ইব্ন সা'দ ও মামা আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহার আহারের জন্য আমার মা এইগুলি পাঠাইয়াছেন। তিনি বলিলেন: আমার কাছে নিয়া আস। আমি সেইগুলি তাঁহার হাতে দিলাম। কিন্তু তাহা পরিমাণে এতই কম ছিল যে, তাঁহার হাত ভরে নাই। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) একটি কাপড় বিছাইতে বলিলেন। তাহা বিছানো হইল। তিনি খেজুরগুলি সেই কাপড়ের উপর ছড়াইয়া দিলেন। অতঃপর পার্শ্বে উপস্থিত একজনকে বলিলেন, খন্দক খননকারীদেরকে দুপুরের খাবারের জন্য আহ্বান কর। সকলে আসিয়া খেজুর খাওয়া শুরু করিলেন। কিন্তু আশ্চর্য! তাহারা যতই খান, খেজুর ততই বাড়িতে থাকে। অবশেষে খন্দক খননকারিগণের তৃপ্তিসহ খাওয়া শেষ হইলেও কাপড়ের চারপাশ হইতে খেজুর তখনও উপচাইয়া পড়িতেছিল (সীরাতে ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৩৬)।
সালমান ফারসী (রা) বলেন, আমি পরিখার এক প্রান্তে খননকার্যে লিপ্ত ছিলাম। ঘটনাক্রমে একটি কঠিন পাথর আমার সামনে পড়িল। রাসূলুল্লাহ (স) আমার কাছেই ছিলেন। তিনি দেখিলেন, আমি উপর্যুপরি কোদাল মারিতেছি, কিন্তু পাথরটি ভাঙ্গিতে পারিতেছি না। অবশেষে রাসূলুল্লাহ (স) নিজে কোদাল মারিলেন, ফলে পাথরটি বালুকায় পরিণত হইল (সহীহ আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৮৮)।
সুনান আন্-নাসাঈর বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ (স) উক্ত পাথরের উপর তিনবার কোদাল মারিয়াছিলেন। প্রত্যেক বারই বিদ্যুৎ প্রবাহের ন্যায় আলো বাহির হইয়াছিল এবং সেই আলোতে যথাক্রমে সিরিয়া, পারস্য ও ইয়ামানের প্রাসাদসমূহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর দৃষ্টিগোচর হইয়াছিল এবং তিনি উক্ত রাজ্যত্রয় মুসলমানদের অধীনস্থ হওয়ার সুসংবাদ প্রদান করিয়াছিলেন (ইব্ন কাছীর, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ১৬৪; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩৪২)।
তারীখে তাবারীর অন্য এক বর্ণনায় দেখা যায়: আম্র ইব্ন আওফ (রা) বলেন, 'আমি সালমান ফারসী, হুযায়ফা ইবনুল-ইয়ামান, নু'মান ইব্ন মুকাররিন (مقرن) আল-মুযানী এবং আনসারদের আর ছয় ব্যক্তি, এই দশজনের একটি ক্ষুদ্র দলের উপরও ৪০ গজ খন্দক খননের দায়িত্ব পড়ে। আমরা যুবাব নামক স্থানের নিম্নদেশ হইতে খন্দক খনন শুরু করিয়া নাদা নামক স্থান পর্যন্ত পৌছিলাম। আল্লাহ তা'আলা খন্দকের ভিতর হইতে একটি চকচকে সাদা পাথর বাহির করিয়া দিলেন। চেষ্টা করিয়াও পাথরটি আমরা ভাঙ্গিতে পারিলাম না। সালমান ফারসী (রা)-কে বিষয়টি নবী করীম (স)-কে অবহিত করিতে বলিলাম। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে পাথরের বিষয়টি অবহিত করিলেন এবং বলিলেন, আমরা যথাশক্তি প্রয়োগ করিয়া উপর্যুপরি উহার উপর আঘাত করিয়াছি, কিন্তু পাথরটি ভাঙ্গিতে পারি নাই। আপনি আমাদিগকে সাহায্য করুন। রাসূলুল্লাহ (স) সালমান ফারসীর সাথেই খন্দকে নামিয়া আসিলেন। আমরা বাকী নয়জন খন্দকের কিনারায় ছিলাম। নবী করীম (স) সালমান (রা)-এর নিকট হইতে কোদাল লইয়া পাথরে আঘাত করিলেন, ফলে উহার এক অংশ ভাঙ্গিয়া গেল এবং উহা হইতে বিদ্যুৎ চমকাইয়া মদীনার দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থান আলোকিত হইয়া গেল। গভীর অন্ধকার ঘরে যেন সকালের শুভ্র আলো পতিত হইল। রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহু আকবার বলিলেন, মুসলমানগণও তাকবীর দিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) দ্বিতীয়বার ঐ পাথরে আঘাত করিলেন। এইবার উহার একটি অংশ ভাঙ্গিয়া পড়িল এবং বিদ্যুৎ চমকাইয়া পূর্বের ন্যায় দুই পাহাড়ের মধ্যখানে আলো ছড়াইয়া পড়িল। রাসূলুল্লাহ্ (স) আল্লাহু আকবার বলিলেন, মুসলমানগণও তাকবীর ধ্বনি দিলেন। তৃতীয়বার নবী করীম (স) পাথরে আঘাত করিলেন। পাথর ভাঙ্গিয়া এইবারও উহা হইতে বিদ্যুৎ বিচ্ছুরিত হইল। মহানবী (স) আল্লাহু আকবার বলিলেন। সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানগণও তাকবীর দিলেন।
অতঃপর মহানবী (স) সালমান (রা)-এর হাত ধরিলে তিনি বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমার পিতা-মাতা আপনার প্রতি কুরবান হউক। আমি এমন কিছু দেখিয়াছি, যাহা পূর্বে কখনও দেখি নাই। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) মুসলমানদের লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: সালমান যাহা বলিল, তাহা কি তোমরা দেখিয়াছ? সাহাবীগণ বলিলেন: হাঁ, হে আল্লাহ্র রাসূল। আমাদের পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হউক। আমরা আপনাকে পাথরে আঘাত করিতে এবং উহা হইতে তরঙ্গের ন্যায় বিদ্যুৎ চমকাইতে দেখিয়াছি। অতঃপর আপনি তাকবীর দিয়াছেন এবং আমরাও তাকবীর দিয়াছি। ইহা ছাড়া আর কিছু আমরা দেখি নাই। নবী করীম (স) বলিলেন: তোমরা সত্য বলিয়াছ। আমি প্রথম যখন পাথরে আঘাত করি তখন উহা হইতে বিদ্যুৎ চমকায় যাহা তোমরা দেখিয়াছ। উহাতে আমাকে হীরা এবং কিস্সার রাজপ্রসাদ দেখান হয়। তাহা যেন কুকুরের দন্তের ন্যায়। অতঃপর জিবরাঈল (আ) আমাকে সংবাদ দেন যে, আমার উম্মত কর্তৃক উহা বিজিত হইবে।
অতঃপর দ্বিতীয়বার ঐ পাথরে আঘাত করিলে উহা হইতে আলো চমকাইয়া উঠে এবং উহাতে আমি রোমের রাজপ্রাসাদ দেখিতে পাই যেন তাহা কুকুরের দন্তের ন্যায়। জিবরাঈল (আ) সংবাদ দিলেন যে, আমার উম্মতের হাতে ইহাও বিজিত হইবে। অতঃপর তৃতীয়বার আঘাত করিলে পাথর ভাঙ্গিয়া আলো চমকায় এবং সান'আর রাজপ্রাসাদ ভাসিয়া উঠে, যেন তাহা কুকুরের দন্তের ন্যায়। জিবরাঈল (আ) আমাকে জানইলেন যে, আমার উম্মত এই সাম্রাজ্য জয় করিবে। তোমরা আনন্দিত হও যে, মুসলমানদের বিজয় সমাগত। ইহাতে মুসলমানগণ আনন্দিত হইলেন এবং কৃতজ্ঞস্বরে বলিলেন, সকল প্রশংসা আল্লাহ্ জন্যই। ইহা সত্য প্রতিশ্রুতি যাহার কোন ব্যতিক্রম হইবে না (তারীখ তাবারী, ২খ, পৃ. ২৩৫-৩৬)। ইহার প্রতি ইঙ্গিত করিয়া আল্লাহ তাআলা বলেন: وَلَمَّا رَأَ الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزَابَ قَالُوا هَذَا مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَصَدَقَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَمَا زَادَهُمُ الأَ إِيْمَانًا وَتَسْلِيمًا.
"মু'মিনগণ যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখিল, উহারা বলিয়া উঠিল, ইহা তো তাহাই, আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূল আমাদের সঙ্গে যাহার ওয়াদা করিয়াছেন। আল্লাহ্ এবং তাঁহার রাসূল সত্যই বলিয়াছেন। আর ইহাতে তাহাদের ঈমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পাইল" (৩৩ : ২২)।
ইহা দ্বারা আল্লাহ্ তা'আলা এই কথা প্রমাণ করিয়া দিলেন যে, কোন কাজই আল্লাহ্র সাহায্য ব্যতীত সম্পন্ন করা সম্ভব নহে। আর মুনাফিকরা বলিল, তোমরা কি আশ্চর্যান্বিত হইতেছ না যে, মুহাম্মাদ তোমাদেরকে মিথ্যা সংবাদ ও প্রতিশ্রুতি দিতেছে এবং বলিতেছে যে, মদীনায় থাকিয়াই তিনি হীরা ও কিসরার রাজপ্রসাদ প্রত্যক্ষ করিতেছেন, আর তোমরা তাহা জয় করিবে। অথচ তোমরা খন্দক খনন করিতেছ এবং ইহা হইতে বাহির হইতে পারিতেছ না (তারীখে তাবারী, ২খ., পৃ. ২৩৬)। এই সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা অবতীর্ণ করিলেন: وَإِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ مَّا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ إِلَّا غُرُورًا .
"আর স্মরণ কর মুনাফিকরা ও যাহাদের অন্তরে ছিল ব্যাধি, তাহারা বলিতেছিল, আল্লাহ এবং তাঁহার রাসূল আমাদিগকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন তাহা প্রতারণা ব্যতীত কিছুই নহে” (৩৩ : ১২)।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি উমার ও উছমান (রা)-এর শাসনামলে উল্লিখিত সাম্রাজ্যগুলি বিজয় হইলে বলিতেন, সেই আল্লাহ্র কসম, যাঁহার হাতে আবূ হুরায়রার প্রাণ! তোমরা সেই সকল শহর বিজয় করিয়াছ এবং কিয়ামত পর্যন্ত যাহা তোমরা বিজয় করিবে, এই সকল কিছুর চাবি অনেক পূর্বেই রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেওয়া হইয়াছে (তারীখ তাবারী, ২খ., পৃ. ২৩৬)। ইবন ইসহাক বলেন, অনেক কষ্ট ও পরিশ্রমের পর মুসলমানগণ পরিখা খননকার্য শেষ করিলেন। জু'আয়ল নামক একজন মুসলিমকে নিয়া এই দিন তাহারা সমবেত কণ্ঠে রণোদ্দীপক কবিতা আবৃত্তি করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) জু'আয়ল-এর নাম পরিবর্তন করিয়া রাখিয়াছিলেন আমর। তাঁহাকে কেন্দ্র করিয়া আবৃত্তিকৃত কবিতাটি ছিল নিম্নরূপ: سماه من بعد جعيل عمروا + وكان للبائس يوما ظهرا.
"রাসূলুল্লাহ্ (স) জু'আয়লের নাম পরিবর্তন করিয়া রাখেন আমর, সেদিন তিনি দুর্বলদের জন্য শক্তিতে পরিণত হন।" যখন সাহাবীগণ "আমরান” বলিতেন তখন রাসূলুল্লাহ্ (স)-ও তাহাদের সঙ্গে "আমরান" বলিতেন। আর যখন তাঁহারা "যাহরান" বলিতেন, তখন তিনিও "যাহরান” বলিতেন (তারীখ তাবারী, ২খ., পৃ. ২৩৫; সীরাত ইন্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ২১০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৯৫)।
কাফির বাহিনী মদীনায় পৌছার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (স) নারী ও শিশুদেরকে সুরক্ষিত ও নিরাপদ একটি দুর্গে রাখেন। এই সময় আবদুল্লাহ্ ইব্ন উম্মে মাকতুম (রা)-কে মদীনার ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক নিযুক্ত করেন। বিশ্বাসঘাতক ইয়াহুদীদের উপর মুসলমানগণ ইতোমধ্যে আস্থা হারাইয়া ফেলিয়াছিলেন। বনু কায়নুকা ও বনূ নাযীরকে দেশান্তরিত করা হইয়াছিল বটে, কিন্তু বনু কুরায়যা তখনও মদীনায় অবস্থান করিতেছিল। ইতোপূর্বে একাধিকবার তাহারা সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করিয়া বিশ্বাসঘাতকতার চেষ্টা করিয়াছে। এইবারও সুযোগ পাইলে বিশ্বাসঘাতকতা করিতে পারে, সতত এই সন্দেহ রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর মনে উদ্রেক হইতেছিল। আবার অন্যান্য গোত্রের মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কেও তিনি নিশ্চিন্ত ছিলেন না। সুতরাং ইহার প্রতিরোধকল্পে এবং নারী ও শিশুদের রক্ষার্থে যায়দ ইব্ন হারিছা (রা)-এর নেতৃত্বে তিন শত এবং মাসলামা ইব্ন আস্লামের নেতৃত্বে দুই শত সৈন্য নিযুক্ত করিলেন (খিদরী বেক, নূরুল ইয়াকীন, পৃ. ১৩৮)।
তিন হাজার মুসলিম সৈন্যের বাকী আড়াই হাজার সৈন্য লইয়া রাসূলুল্লাহ্ (স) সালা পাহাড়কে পশ্চাতে এবং পরিখাকে সামনে রাখিয়া শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধকল্পে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করিলেন। মুসলমানদের সাংকেতিক চিহ্ন (কোড) ছিল حم لا ينصرون "হামীম ! তাহাদিগকে সাহায্য করা হইবে না।” অপরদিকে কাফির বাহিনী মদীনার উপকণ্ঠে আসিয়া উপনীত হইল। কিনানা গোত্র এবং তিহামাবাসীদের সমন্বয়ে কুরায়শগণ জুরফ ও যিআবার মধ্যবর্তী উপত্যকা রুমাহ্-এ অবতরণ করিল। বনূ গাতাফান নাজদীদিগকে লইয়া উহুদ প্রান্তরের পাদদেশে তাঁবু স্থাপন করিল। শত্রুবাহিনীর দশ হাজার সুসজ্জিত সৈন্য মহা পরাক্রমে মদীনার দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল (নাদবী, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, পৃ. ২১৭; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩০৬)।
তাহাদের সাথে ছিল সাড়ে চার হাজার উট এবং তিন শত ঘোড়া (আকর শাহ খান নজীবআবাদী, তারীখে ইসলাম, ১খ., পৃ. ১৫৯)। অপরপক্ষে আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূল (স)-এর উপর দৃঢ় প্রত্যয়ী আড়াই হাজার সৈন্যের মুসলিম বাহিনী ঈমানের বলে বলীয়ান হইয়া শত্রুদের মুকাবিলায় পাহাড়ের ন্যায় দণ্ডায়মান হইলেন। কিন্তু কিছু দুর্বল ঈমানদার ও কপট মুনাফিক বিশাল কুরায়শ বাহিনীর ভয়ে শংকিত হইয়া যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পালাইবার বাহানা তালাশ করিতে লাগিল। ভীত-বিহবল হৃদয়ে তাহারা যেন মৃত্যুর বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করিতে লাগিল। তাহাদের এই অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়া আল্লাহ তা'আলা বলেন: إِذْ جَاءُوكُمْ مِنْ فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللَّهِ الظُّنُونَا . هُنَالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْزَالاً شَدِيدًا. وَإِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ مَّا وَعَدَنَا اللهُ وَرَسُولُهُ الأَ غُرُورًا، وَإِذْ قَالَتْ طَائِفَةً مِّنْهُمْ يُأَهْلَ يَشْرِبَ لَا مُقَامَ لَكُمْ فَارْجِعُوا وَيَسْتَأْذِنُ فَرِيقٌ مِّنْهُمُ النَّبِيِّ يَقُولُونَ إِنَّ بُيُوتَنَا عَوْرَةً وَمَا هِيَ بِعَوْرَةٍ إِنْ يُرِيدُونَ إِلَّا فِرَاراً.
"যখন উহারা তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হইয়াছিল উচ্চ অঞ্চল ও নিম্ন অঞ্চল হইতে, তোমাদের চক্ষু বিস্ফারিত হইয়াছিল, তোমাদের প্রাণ হইয়া পড়িয়াছিল কণ্ঠাগত এবং তোমরা আল্লাহ্ সম্বন্ধে নানাবিধ ধারণা পোষণ করিতেছিলে। তখন মু'মিনগণ পরীক্ষিত হইয়াছিল এবং তাহারা ভীষণভাবে প্রকম্পিত হইয়াছিল। আর স্মরণ কর, মুনাফিকরা ও যাহাদের অন্তরে ছিল ব্যাধি, তাহারা বলিতেছিল, আল্লাহ এবং তাঁহার রাসূল আমাদিগকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন, তাহা প্রতারণা ব্যতীত কিছুই নহে। আর উহাদের একদল বলিয়াছিল, হে ইয়াছরিববাসী! এখানে তোমাদিগের কোন স্থান নাই, তোমরা ফিরিয়া চল এবং উহাদিগের মধ্যে একদল নবীর নিকট অব্যাহতি প্রার্থনা করিয়া বলিতেছিল, আমাদের বাড়ি-ঘর অরক্ষিত। অথচ ঐগুলি অরক্ষিত ছিল না। আসলে পলায়ন করাই ছিল উহাদিগের উদ্দেশ্য” (৩৩: ১০-১৩)।
অথচ যাহারা খাঁটি ঈমানদার ছিলেন তাহারা মোটেও ভীত-সন্ত্রস্ত হন নাই। তাঁহাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَلَمَّا رَأَى الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزَابَ قَالُوا هَذَا مَا وَعَدَنَا اللهُ وَرَسُولُهُ وَصَدَقَ اللهُ وَرَسُولُهُ وَمَا زَادَهُمْ إِلا أَيْمَانًا وَتَسْلِيمًا. "মু'মিগণ যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখিল উহারা বলিয়া উঠিল, ইহা তো তাহাই আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল যাহার প্রতিশ্রুতি আমাদিগকে দিয়াছিলেন এবং আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূল সত্যই বলিয়াছিলেন। আর ইহাতে তাহাদের ঈমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পাইল" (৩৩: ২২)।
এই সংকটময় মুহূর্তে মুসলমানদের সহিত চুক্তিবদ্ধ ইয়াহুদী গোত্র বনু কুরায়যাও বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া সম্মিলিত বাহিনীর সহিত হাত মিলাইল। আল্লাহ্র দুশন হুয়াই ইবন আখতাবের উপর্যুপরি প্ররোচনায় বনু কুরায়যা সর্দার কাব ইব্ন আশরাফ চুক্তি ভঙ্গ করিয়া কাফির বাহিনীর সঙ্গে আঁতাত করিল। মুসলমানদের নিকট কা'বের বিশ্বাসঘাতকতার সংবাদ পৌছিলে রাসূলুল্লাহ (স) ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আওস গোত্রের নেতা সা'দ ইব্ন মু'আয, খাযরাজ গোত্রের নেতা সা'দ ইবন উবাদা (রা), যিনি বনূ সা'দ ইব্ন কা'ব ইন্ন খাযরাজের লোক ছিলেন এবং তাহাদের সাথে হারিছ ইব্ন খাদ্রাজ গোত্রের আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা (রা) ও আমর ইব্ন আওফ গোত্রের খাওয়াত ইন্ন জুবায়র (রা)-কে প্রেরণ করিলেন। তিনি তাহাদিগকে বলিলেন, ঘটনা তদন্ত করিয়া দেখ। যদি সত্য হয় তবে এমন এক সংকেতে তাহা আমাকে জানাইবে যাহা কেবল আমিই বুঝিতে পারিব। সাবধান! মানুষের মনোবল নষ্ট করিবে না। আর সে যদি চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে তাহা হইলে সকলের সামনে প্রকাশ্যে এই সংবাদ বর্ণনা করিবে। প্রতিনিধিদল সেখানে গিয়া দেখিলেন, যাহা শুনিয়াছেন বাস্তব অবস্থা তাহার চেয়ে খারাপ। রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে তাহারা নানারূপ কটূক্তি পর্যন্ত করিতেছে। তাহারা অবজ্ঞাভরে বলে, রাসূল আবার কে? মুহাম্মাদের সাথে আমাদের কোন চুক্তি বা অংগীকার হয় নাই (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৮; সীরাত ইন্ন হিশাম, ২খ., ১৩২; আন-নাদবী, সীরাতুন-নাববিয়্যা, পৃ. ২১৭)। বিশ্বাসঘাতক বনু কুরায়জা সদলবলে শত্রুবাহিনীতে যোগ দিল (আসাহহুস্ সিয়ার, পৃ. ১৪৬; যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ২৭২)।
উহুদ পাহাড় সম্মিলিত কাফির বাহিনী
খন্দক যুদ্ধ
বনূ আসাদ বনূ ফাযারা কুরায়শ বনূ আশজী বনূ গাতফান বনূ সুলায়ম দুর্গম প্রস্তর প্রান্তর
হিজাযের পাহাড়ী ভূমি মুসলিম বাহিনীর অবস্থান
এই পথে বদর প্রান্তর
খেজুর বাগান
বনু কুরায়যা
মক্কা গমনের পূর্ব দিকের পথ
হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স) : সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৬১১ হইতে গৃহীত।
📄 গাযওয়া বানু লিয়ান
বানু লিহয়ান (বা লাহয়ান) কুরায়শের অন্যতম পূর্বপুরুষ মুদার ইন্ন নিযারের প্রপৌত্র হুযায়লের বংশধর (ইবন হাম্, জামহারাতু আনসাবিল আরাব, ৩খ., পৃ. ১৯৬)। আরব বংশবিশারদ হামদানীর মতে, তাহারা মূলত জুরহুমের সন্তান-সন্ততি। কিন্তু হুযায়ল গোত্রে অনুপ্রবেশ করিয়াছিল বলিয়া তাহাদেরকেও হুযায়লের দিকে সম্বন্ধ করা হইত (আল-আয়নী, উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৬৯)। বানু লিহয়ান হিজাযের বিস্তীর্ণ উপত্যকা গুরানে (غران) বসবাস করিত। ইহা ওয়াদিল-আযরাক (وادی الازرق) নামেও পরিচিত ছিল। ইহা মক্কার নিকটে আমজ (أمج) ও 'উসফানের (عسفان) মধ্যে সায়াহ (سایة) পর্যন্ত বিস্তৃত ৫ মাইল ব্যাপী একটি বিশাল জনপদ (ইয়াকৃত আল-হামাবী, মুজামুল বুলদান, ৪খ., পৃ. ১৯১)। তাহারা হিজরী ৪র্থ সালের সফর মাসে (মে ৬২৫ খৃ.) আর-রাজী' নামক স্থানে প্রতারণার মাধ্যমে হযরত 'আসিম ইব্ন ছাবিত (রা) ও তাঁহার সফর সঙ্গীকে গ্রেফতার করে, হযরত যায়দ ও খুবায়বকে বন্দী করিয়া মক্কায় লইয়া যায় এবং নৃশংসভাবে হত্যা করে। পরে ঐ দুইজনকেও হত্যা করে। ইহার অব্যবহিত পরে সেই একই মাসে, মতান্তরে ইহার পূর্ববর্তী (মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্, ১৯৭৫ খৃ., পৃ. ২৪৩) মুহাররম মাসে হুযায়ল গোত্রের এলাকার অন্তর্গত বি'রে মা'উনায় (بئر معونة)-ও ৭০ জন কুরআন বিশেষজ্ঞ সাহাবী অনুরূপভাবে প্রতারণার শিকার হইয়া নৃশংসভাবে শাহাদাত বরণ করেন (যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৪৭)। মহানবী (স) এই দুইটি ঘটনায় অত্যন্ত মর্মাহত হন। তাই তিনি এই শহীদদের রক্তের প্রতিশোধ লওয়ার জন্য মদীনায় আব্দুল্লাহ্ ইবনু উম্মে মাকতুম (রা)-কে তাঁহার স্থলাভিষিক্ত করিয়া নিজেই বিশজন অশ্বারোহীসহ দুই শতজন আনসার ও মুহাজির সমভিব্যাহারে বানু লিয়ানের উদ্দেশে অভিযানে বাহির হন (প্রাগুক্ত)।
এই অভিযান কোন সালে এবং কোন মাসে সংঘটিত হয় সেই সম্পর্কে সীরাতবিশারদ ও ইতিহাসবিদদের বিভিন্ন মত পরিলক্ষিত হয়। ইবন সা'দের মতে রাসূলুল্লাহ (স) ৬ষ্ঠ হিজরীর ১ রাবীউল আওয়াল (জুলাই ৬২৭ খৃ.) বান্ লিহয়ানের উদ্দেশে বাহির হন (যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৪৬)। ইন্ন ইসহাক, ইন্ন হিশাম, ইবনুল আছীর, তাবারী ও ইবন 'আবদুল-বারর প্রমুখ প্রসিদ্ধ সীরাতবেত্তাদের মতে, ইহা হিজরী ৫ম সালের যুল-হিজ্জা মাসে (এপ্রিল-মে ৬২৭ খৃ.) সংঘটিত বানু কুরায়মার যুদ্ধে জয়লাভ করার ছয়মাস পর হিজরী ৬ষ্ঠ সালের জুমাদাল-উলায় (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ৬২৭ খৃ.) সংঘটিত হয় (ইব্ন হিশাম, আস-সীরা)। হাফিজ ইবন হাযম বলেন, "বিশুদ্ধ অভিমত অনুসারে ইহা হিজরী ৫ম সালে সংঘটিত হয়” (প্রাগুক্ত; ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ২খ., পৃ. ১৮৮)। যুরকানী বলেন, "কাহারো কাহারো মতে ইহা হিজরী ৪র্থ সালে সংঘটিত হয়। কাহারো মতে ইহা রজব মাসে, আর কাহারো মতে শা'বান মাসে সংঘটিত হয়” (প্রাগুক্ত)।
এই সফরে রাসূলুল্লাহ (স) কোনদিকে রওয়ানা হইবেন, যুদ্ধকৌশল হিসাবে তাহা প্রথমে প্রকাশ করেন নাই। কারণ, ইহাতে শত্রুরা তাঁহার অভিযানের উদ্দেশ্য জানিয়া ফেলার আশংকা ছিল। তাই তিনি মদীনা হইতে বাহির হওয়ার সময় মদীনার উত্তর প্রান্তে সিরিয়ার রাস্তায় অবস্থিত গুরাব (غراب) পর্বতের পথ ধরিয়া অগ্রসর হন। অতঃপর তিনি মাহীস (محيص) হইয়া রাত্রা (بتراء)-য় আসেন। এখানে পৌঁছিয়া তিনি বামদিকে গতি পরিবর্তন করেন এবং মদীনার বায়ন (بین) উপত্যকা হইয়া সুখায়রাতুল ইয়ামামে (صخيرات اليمام) গিয়া পৌঁছেন এখানে আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স) দক্ষিণে সোজা মক্কার দিকে দ্রুত গতিতে চলিতে শুরু করেন। এইভাবে তিনি তাঁহার সৈন্যদল লইয়া বানু লিয়ানদের আবাসভূমি গুরান উপত্যকায় পৌঁছেন (ইব্ন হিশাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩৩)। এইখানেই রাজী' নামক প্রস্রবণের পাশে আসিম ইন্ন ছাবিত (রা) ও তাঁহার সাথীগণ প্রতারণার শিকার হন এবং শাহাদাত বরণ করেন। রাসূলুল্লাহ (স) এখানে পৌঁছিয়া তাঁহাদের জন্য রহমত ও মাগফিরাতের দু'আ করেন (ইবন কায়্যিম, যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১১৯)।
ঘটনাক্রমে বান্ লিয়ান গোত্রের লোকেরা অনেক আগে হইতেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর আগমনের সংবাদ পাইয়া যায় (তাবারী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০৫)। সম্ভবত রাসূলুল্লাহ (স) যেই স্থান হইতে গতি পরিবর্তন করিয়া উত্তর দিক হইতে দক্ষিণ দিকে রওয়ানা হন সেখানে বানূ লিয়ান গোত্রের কোন লোক তাহা দেখিয়া ফেলে। সে অতি দ্রুত আসিয়া তাহার গোত্রের লোকদেরকে এই খবর দেয়। তাহারা এই খবর পাইয়া অত্যন্ত ভীত হইয়া পড়ে এবং নিজেদের গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র লইয়া বিভিন্ন পাহাড়ের চূড়ায় গিয়া আত্মগোপন করে (ড. মুহাম্মাদ হ'সায়ন হায়কাল, বাংলা অনু. মহানবীর জীবন চরিত, পৃ. ৪৫৯)। তিনি তাহাদের এলাকায় দুই দিন (হালাবী, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৬৭৭), মতান্তরে একদিন (কান্ধলবী, সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ২৯) অবস্থান করেন এবং তাহাদের পশ্চাদ্ধাবনের উদ্দেশ্যে এখান হইতে বিভিন্ন দিকে ছোট ছোট কয়েকটি অভিযান প্রেরণ করেন। কিন্তু কোথাও তাহাদের খোঁজ পাওয়া যায় নাই (দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৫৩)।
অবশেষে তাহাদের সঙ্গে সাক্ষাতের আশা ত্যাগ করিয়া মক্কার দিকে অগ্রসর হন এবং উসফান উপত্যকায় গিয়া পৌঁছেন। ইহার পিছনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উদ্দেশ্য ছিল, মক্কাবাসীরা দেখিবে যে, মুসলমানগণ মক্কায় আসিয়াছেন এবং ইহার ফলে তাহারা বিচলিত ও ভীতসন্ত্রস্ত হইয়া পড়িবে (ইবনুল আছীর, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৮৮)। উসফান হইতে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আবূ বাক্স (রা) (যুরকানী, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪৭) কিংবা হযরত সা'দ ইবন উবাদা'র নেতৃত্বে দুইজন (ইবন হিশাম, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৩৩৩), মতান্তরে দশজন (ইবনুল কায়্যিম, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১১৯) অশ্বারোহীকে অথবা দুইজনেরই নেতৃত্বে দুইটি পৃথক অশ্বারোহী দলকে আরও সম্মুখে প্রেরণ করেন (যুরকানী, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪৭)। তাহারা নির্বিঘ্নে কুরা'উল গামীম (كراع الغميم) পর্যন্ত গিয়া ফিরিয়া আসেন (মুখতাসার তারীখির রাসূল, পৃ. ২৯২)। রাসূলুল্লাহ (স) সম্পূর্ণ নিরাপদ ও নির্ঝঞ্ঝাট অবস্থায় সৈন্যবাহিনীসহ মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন (কান্ধলবী, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ২৯)। এই সফরে রাসূলুল্লাহ (স) ১৪ দিন মদীনার বাহিরে অবস্থান করেন, (দানাপুরী, প্রাগুক্ত, ১৫৪)। হযরত জাবির ইবন 'আবদুল্লাহ (রা) বলেন, মদীনার দিকে প্রত্যাবর্তনের সময় আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই দু'আ পাঠ করিতে শুনিয়াছি: آئبون تائبون إن شاء الله لربنا حامدون أعوذ بالله من وعثاء السفر وكآبة المنقلب وسوء المنظر في الأهل والمال.
"আমরা ফিরিয়া আসিয়াছি। আল্লাহ চাহিলে আমরা ফিরিয়া গমন করিব। আমরা আমাদের প্রতিপালকের প্রশংসা করিতেছি। আমি সফরের দুঃখ-কষ্ট, খারাপ পরিণাম এবং পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদের বেহাল অবস্থা দর্শন হইতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি” (ইবন হিশam, প্রাগুক্ত, ২খ., ৩৩৩)।
গ্রন্থপঞ্জীঃ (১) ইব্ন হাযম আল-আন্দালুসী, জামহারাতু আন্সابিল আরাব, বৈরূত ১৯৮৩ খৃ.; (২) আল-'আয়নী বাদরুদ্দীন আবূ মুহাম্মাদ, 'উমদাতুল কারী, বৈরূত, ১৭খ.; (৩) আবূ 'আবদুল্লাহ ইয়াকৃত, আল-হামাবী মু'জামুল বুলদান, বৈরূত ১৯৫৭ খৃ., ৪খ.; (৪) আয-যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়্যা, বৈরূত ১৯৭৩ খৃ., ২খ., (৫) মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, বৈরূত ১৯৭৫ খৃ., পৃ. ২৪৩; (৬) ইব্ন হিশام, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা (অনু. 'আবদুল জলীল সিদ্দীকী ও অন্যান্য), দিল্লী ১৯৯৫ খৃ., ২খ.; (৭) আত-তাবারী, তারীখু তাবারী (অনু. সায়্যিদ মুহাম্মাদ ইব্রাহীম নাদনী), করাচী ১৯৮৭ খৃ., ১খ. (সীরাতুন্নবী), পৃ. ৩০৫; (৮) ইবনুল আহীর, আল-কামিল ফিত্-তারীখ, বৈরূত ১৯৬৫ খৃ., ২খ. পৃ. ১৮৮; (৯) ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা, যাদুল মা'আদ, বৈরূত তা. বি, ২খ, পৃ. ১১৯; (১০) হায়কাল ডঃ মুহাম্মাদ হোসায়ন, The Life of Muhammad (বাংলা অনু. মহানবীর জীবন চরিত), বাংলাদেশ (ই.. ফা.বা), ১৯৯৮ খৃ., পৃ. ৪৫৯; (১১) কান্ধলাবী, মুহাম্মাদ ইদ্রীস, সীরাতুল মুসতাফা, দিল্লী ১৯৯৫ খৃ., ২খ.; (১২) আবুল বারাকাত আবদুর রাউফ, আসাহ্হুস সিয়ার, কলিকাতা ১৯৮২ খৃ.; (১৩) আবদুল্লাহ, মুখতাসারু সীরাতির, রাসূল, লাহোর ১৯৭৯খৃ., পৃ. ২৯২।
📄 সারিয়্যা উক্বাশা ইন্ন মিহসান (রা)
ইহা ৬ষ্ঠ হিজরী সনের রবীউল আওয়াল মাসে সংঘটিত হইয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত উক্বাশা ইব্ন মিহসান আল-আসাদী (রা)-কে চল্লিশজনের একটি দলসহ বানু আসাদের মুকাবিলায় গামার নামক স্থানে প্রেরণ করেন। গামার বানু আসাদের কূপের নাম। মদীনা হইতে তাহা দুই রাত্রের দূরত্বে অবস্থিত ('উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ১০৩-৪; শারহু মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ২খ., পৃ. ১৫৩-৫৪)। এই অভিযানে ছাবিত ইব্ন আকরাম, সিবা' ইব্ন ওয়াহ্হ্ব (মতান্তরে শুয়া ইন্ন ওয়াত্ব) ও ইয়াযীদ ইব্ন্ন রুকায়শও ছিলেন (কিতাবুল-মাগাযী ২খ., পৃ. ৫৫০; 'উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ১০৪)। তাহারা অতি ক্ষিপ্রতার সহিত গামার অভিমুখে রওয়ানা হন। কিন্তু বানু আসাদের লোকেরা তাহাদের আগমন সংবাদ পাইয়া স্বীয় ঘরবাড়ি শূন্য করিয়া পাহাড়ের দিকে পলায়ন করে। মুসলিম বাহিনী তথায় পৌঁছিয়া বানু আসাদের ঘরবাড়ি শূন্য দেখিতে পান এবং কাহাকেও খুঁজিয়া না পাইয়া শুজা' ইব্ন ওয়াহ্হ্বকে প্রকৃত ব্যাপার জানিবার জন্য প্রেরণ করেন। তিনি তাহাদের কাহাকেও পাইলেন না, তবে এক ব্যক্তিকে পাকড়াও করেন এবং তাহাদের গৃহপালিত পশু ও উহার চারণভূমির সন্ধান পান। আর সেই ব্যক্তিকে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়। অতঃপর তাহাকে লইয়া বানু আসাদের চারণভূমিতে গিয়া দুই শত উট গনীমত হিসাবে লাভ করেন। পরে সেইগুলি মদীনায় লইয়া আসেন এবং রাসুলুল্লাহ (স)-এর নিকট পেশ করেন। পথে তাহারা আর কোন প্রতিরোধের সম্মুখীন হন নাই (উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ১০৩-৪; শারহু মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ২খ., পৃ. ১৫৩-৫৪; তাবাকাতে ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ৮৪-৮৫; কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৫৫০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১৯৪)।
ইব্ন আয়্যব বলেন, এই সারিয়ার আমীর ছিলেন ছাবিত ইন্ন আকরাম (রা) এবং তাঁহার সঙ্গে উককাশা ইন্ন মিহসান আল-আসাদী (রা)। সম্ভবত তাঁহারা উভয়ে আমীর ছিলেনঃ অভিযানের শুরুতে ছিলেন একজন এবং অভিযানের শেষদিকে ছিলেন আরেকজন আমীর (শারহু মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ২খ., পৃ. ১৫৩)।
গ্রন্থপঞ্জী: বরাত নিবন্ধগর্ভে প্রদত্ত হইয়াছে।