📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দুই: কুরআন-পূর্ব বক্তব্যসমূহ সম্পর্কে ধারণা

📄 দুই: কুরআন-পূর্ব বক্তব্যসমূহ সম্পর্কে ধারণা


দ্বিতীয় ধারণা সম্পর্কে বলা যায় যে, কুরআনের ৫৩: ১-১৮ আয়াত-এ "দৃশ্য” (visions) সম্পর্কে বর্ণনার পূর্বে রাসূলুল্লাহ কতিপয় পদ্ধতির কথা বলেন, কিন্তু কুরআনের বক্তব্য প্রকাশ করা অথবা কুরআনের "রচনা" সম্পর্কে কিছু বলেন নাই। এই সম্পর্কে বেল্-এর যুক্তিগুলি নিম্নে বর্ণনা করা হইল :
(ক) কুরআনের আয়াতে বর্ণিত 'ইয়ানতিকু' ينطق (আয়াত ৩) একটি সাধারণ শব্দ এবং শব্দটি কুরআনের আবৃত্তির ক্ষেত্রে কোন অনুষঙ্গ নহে”। (খ) 'কুরআন' শব্দটি সিরীয় ভাষার শব্দ Qeryånå হইতে উদ্ভূত। ঐ সময় হইতে কুরআন সরবরাহের ধারণা ধর্মশাস্ত্রের দ্বারা উপস্থাপিত, খৃস্টান চার্চে বাইবেল পাঠ হইতে এই ধারণা গ্রহণ করা হয়। এইভাবে রাসূলুল্লাহ কুরআন
পাঠের পূর্বেই লোকজনের সম্মেলন ঘটাইয়াছিলেন। (গ) আওহা )اَوْحَى( শব্দটি কুরআনের সূরা আন্-নাজম-এর ৪নং আয়াতে ব্যবহৃত হইয়াছে যাহা অপরিহার্যভাবে কুরআনের শব্দাবলী বুঝায় না। উপরন্তু ওহী, )وحی( শব্দের বহুমুখী ব্যবহার কুরআনে দেখানো হইয়াছে। যেমন ইহার অর্থ "ধারণা দেওয়া”, “বিস্মৃত শব্দ জাগাইয়া দেওয়া", "উদ্বুদ্ধ করা”। ১২
এক্ষণে বেল্-এর শেষ যুক্তি (গ) প্রধানত তাহার তৃতীয় ধারণার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত যাহা উপরে পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করা হইয়াছে। উদাহরণস্বরূপ, কুরআনের ওহী )وحی( -এর প্রকৃতি। অতএব এই যুক্তি পরবর্তী অংশে আলোচনা করা হইবে। বেল্-এর প্রথম যুক্তি (ক) সম্পর্কে, যেমন রাসূলুল্লাহ প্রাথমিক পর্যায়ে কেবল বিভিন্ন পন্থায় কথা বলিতেন, কুরআন অবতরণের কথা বলিতেন না এবং তিনি একদল লোক সংগ্রহ করার পর কুরআন অবতরণের কথা প্রকাশ করেন। ইহা মূইর-এর ধারণার সরল পুনরাবৃত্তি মাত্র, যাহা ইতোপূর্বে আলোচনা করা হইয়াছে এবং ঐ ধারণার ত্রুটিসমূহ নির্দেশ করা হইয়াছে। ১৩ এই সম্পর্কিত বর্ণনায় বেল-এর নিজস্ব যৌক্তিকতা যতটুকু বর্ণিত হইয়াছে সেই দিক হইতে ইহা বলা যায় যে, তিনি সূরা আন্-নাজম-এর ৩ নং আয়াতে (৫৩: ৩) দৃষ্ট ইয়ানতিকু () শব্দটির অত্যন্ত সংকীর্ণ ও ভুল অর্থ করিয়াছেন এবং আয়াতের সার্বিক অবস্থা হইতে এই শব্দটিকে পৃথক করিয়া ফেলিয়াছেন। আয়াতের নির্ভুল অন্তর্নিহিত অর্থে অবিশ্বাসীদের আপত্তির কারণে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়—ইহার ফল এই দাঁড়ায় যে, রাসূলুল্লাহ তাহাদের নিকট যে ঘোষণা দেন তাহা আল্লাহ্র কথা ছিল না, বরং রাসূলুল্লাহ -এর নিজের কথা ছিল। ইহার উত্তরে বলা যায় যে, "রাসূলুল্লাহ তাঁহার নিজ ইচ্ছা হইতে কিছু বলেন না। ইহা আর কিছুই নহে, বরং আল্লাহ্র ওহী যাহা তাঁহার নিকট পৌঁছানো হয়"। কুরআনের বক্তব্য মা ইয়ানতিকু' )مَا يَنْطق( -এর অর্থ 'তিনি বলেন না', শুধু ইয়ানতিকু )يَنْطق( নহে, ইয়ানতিকু-এর অর্থ 'তিনি বলেন'। এই বিষয় সংক্রান্ত বর্ণনায় ইহা একটি যথাযথ ভাষার প্রকাশভঙ্গি বা বাগবৈশিষ্ট্য। ইহা কেবল সাধারণ ধারণা প্রকাশ করণার্থে "বক্তব্য" প্রদানে ব্যবহৃত হয় না, যেমন বেল্ আমাদেরকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছেন এবং ইহা এই অর্থ প্রকাশ করে যে, রাসূলুল্লাহ "কেবল কতিপয় পদ্ধতি সম্পর্কে কথা বলিয়াছেন"। ইহা এই অর্থ প্রকাশ করে যে, রাসূলুল্লাহ তাঁহার বক্তব্যে দাবি করেন যে, আল্লাহর সঙ্গে তাঁহার যোগাযোগ রহিয়াছে, অথচ অবিশ্বাসিগণ তাঁহার এই দাবি সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপন করে। ফলে কুরআনের আয়াত এই অভিযোগ পর্যায়ক্রমে খণ্ডন করিয়া ইহা প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ নিজের মন হইতে কিছু বলেন না—এই বর্ণনা তাঁহার খেয়ালী কোন অদ্ভূত কল্পনা হইতে জন্মলাভ করে নাই, কিন্তু ওহী হইল আল্লাহ্ প্রত্যাদেশ যাহা তাঁহার নিকট নাযিল করা হইয়াছে। বেল্ এই বক্তব্যের সম্পূর্ণ অপব্যাখ্যা করিয়া আয়াতের আলোচ্য বিষয় হইতে ইহাকে পৃথক করিয়া ফেলিয়াছেন। যদি রাসূলুল্লাহ এই দাবি না করিতেন যে, তিনি যাহা প্রকাশ করিয়াছেন তাহা আল্লাহ্র কথা-কুরআন, তাহা হইলে অবিশ্বাসীদের আপত্তি উত্থাপনের কোন কারণ থাকিত।
না। সুতরাং এই আপত্তির বিরুদ্ধে পাল্টা জওয়াব দেওয়ার প্রয়োজন হইত না, যেমনটি এই আলোচ্য আয়াতে প্রশ্নাতীতভাবে বিদ্যমান রহিয়াছে।
বেল্ নিজেও এই ক্ষেত্রে তাঁহার নিজের বর্ণনা-বিশ্লেষণে কিছুটা দ্বিধান্বিত ও স্ববিরোধী। তিনি এই সম্পর্কিত বিষয়ে অনুমিত কুরআন-পূর্ব বক্তব্যে বলেন যে, ওহী শব্দের অর্থ "প্রত্যাদেশের মূল পাঠের শাব্দিক বিবরণ" নহে, বরং ইহার অর্থ "পরামর্শ দেওয়া" "প্রণোদিত করা" অথবা "উদ্বুদ্ধ করা" ইত্যাদি যাহা কোন ব্যক্তির মনে তাহার নিজস্ব সত্তার বাহির হইতে আসে"। ১৪ তিনি আরও বলেন যে, রাসূলুল্লাহ এই বিষয়ে আয়াত অবতরণের পূর্বে, কেবল "ওহীর মাধ্যমেই কথা বলেন এক স্বর্গীয় ব্যক্তিত্বের পরামর্শক্রমে" যাহাকে তিনি দেখিয়াছিলেন। বেল্ সুস্পষ্টভাবে এই বিবরণ দেন কুরআনের আয়াতের প্রামাণ্য সংশ্লেষ পরিহার করার মাধ্যমে, যাহা রাসূলুল্লাহ প্রকাশ করেন তাহা তাঁহার নিজের বক্তব্য ছিল না, বরং তাঁহার নিকট অবতীর্ণ ওহী ছিল। বেল্ এইরূপে জোরপূর্বক ওহীর ব্যাখ্যা দেন, ওহীকে তিনি বলেন, কুরআন-পূর্ব বক্তব্য। কিন্তু বেল্-এর এই ব্যাখ্যার ফলে কুরআন-পূর্ব বক্তব্য এবং ওহী অবতরণের মাধ্যমে যে কুরআন গঠিত হইয়াছে, এই উভয়ের মধ্যে পার্থক্য দূর করে। এইভাবে বেল্ দ্বিধান্বিত ও স্ববিরোধী। তিনি নিজে রাসূলুল্লাহ কর্তৃক কুরআন-পূর্ব বক্তব্য সম্বলিত তাহার ধারণাকে বাতিল ঘোষণা করেন।
এই সম্পর্কে বেল্-এর অন্যান্য ধারণা এই যে, রাসূলুল্লাহ কুরআন তিলাওয়াতের ধারণা খৃস্টান চার্চে বাইবেল পাঠ হইতে গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং তিনি কেবল এই "তিলাওয়াতের” চিন্তা উদ্ভাবন করেন, যখন তিনি তাঁহার চতুষ্পার্শ্বে সমবেত সাহাবীদের মধ্যে প্রকাশ্যে (তিলাওয়াত) করেন। ইহা কেবল একটি অযৌক্তিক প্রস্তাব, যাহা তিনি সুস্পষ্টরূপে যুগপৎ মূর-এর অযৌক্তিক ধারণা দ্বারা অনুপ্রাণিত হইয়া করিয়াছেন। ওহী-পূর্ব অথবা কুরআন-পূর্ব উচ্চারণ তত্ত্ব অনুযায়ী মূর বলেন, রাসূলুল্লাহ তাঁহার একদল অনুসারী সংগ্রহের পর নিজেকে একজন রাসূল হিসাবে পরিচিত করেন এবং আল্লাহ্ নামে কথা বলেন। ১৬ অনুরূপ আপত্তি বেল্-এর ব্যাপারেও প্রযোজ্য। ইহা তো চিন্তা করাই অযৌক্তিক যে, একদল মানুষ রাসূলুল্লাহ-এর অনুসরণের জন্য আসিবে এবং তাহারা তাঁহার মর্যাদা সম্পর্কে অর্থাৎ একজন স্বর্গীয়ভাবে প্রেরিত শিক্ষক এবং তাঁহার শিক্ষা সংশ্লিষ্ট উচ্চারণ প্রত্যাদেশ সংক্রান্ত বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ী না হয়। তদুপরি, যদি রাসূলুল্লাহ সমাবেশে বক্তব্য পেশ সংক্রান্ত ধারণা খৃস্টান চার্চে বাইবেল পাঠ হইতে পাইয়া থাকিতেন, তাহা হইলে ইহা তাঁহার জন্য অপরিহার্য নহে যে, তিনি তাঁহার চতুষ্পার্শ্বে অনুসারীদের একত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করিতেন যতক্ষণ না তিনি তাঁহার হস্তে প্রস্তুত এক প্রস্থ (স্বর্গীয়) বাণী পাইতেন।
পরিশেষে বেল্-এর বিবরণ, যাহা কুরআনের আয়াত ৫৩: ১-১৮-এর "দৃশ্য” (vision) পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার অগ্রবর্তী বর্ণনা। রাসূলুল্লাহ কেবল কতিপয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ইঙ্গিত দেন যে, ৫৩: ১-১৮ আয়াতসমূহ কুরআনের সর্বপ্রথম অবতরণকৃত আয়াতসমূহের অংশবিশেষ। যাহা
হউক, ঐ বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল। ওহী অবতরণের ক্রম সম্পর্কিত বর্ণনার পার্থক্য সত্ত্বেও এই তথ্য হাদীছ দ্বারা সমর্থিত নহে। এমনকি ইহা প্রাচ্যবিদদের নিজেদের দ্বারাও সমর্থিত নহে। এমনকি রিচার্ড বেল নিজেও এই ধারণার উপর দৃঢ় থাকেন নাই এবং তিনি দ্বিধান্বিত হইয়া কিছু দিন পূর্বে বলেন, "যদি মুহাম্মাদ কুরআন উপস্থাপনে (আবৃত্তিতে) প্রেরিত হইয়া থাকেন, তাহা হইলে ‘পড়’ (ইব্রা - Recite) এই নির্দেশটি স্বাভাবিকভাবেই প্রথমে আসার কথা। ঐ যুক্তি হয়ত এক্ষণে সমালোচনামূলক মনোভাবের আবেদন সৃষ্টি করে এবং বাস্তবিকভাবে অধিকাংশ ইউরোপীয় পণ্ডিত এই আয়াতসমূহ সর্বপ্রথম অবতরণকৃত আয়াতের অন্যতম বলিয়া মানিয়া লইয়াছেন। ১৭ প্রকৃতপক্ষে বেল্ বলিতেছেন যে, ৫৩: ১-১৮ আয়াতসমূহ অবতরণের পূর্বে কুরআনের اقْرَأْ )পড় - Recite) আয়াত নাযিল হইয়াছিল। হযরত মুহাম্মাদ শুধু এক পদ্ধতিতে কথা বলিতেছিলেন না, বরং কুরআন উপস্থাপন করিতেছিলেন ৫৩: ১-১৮ আয়াতের "দৃশ্য" (vision) সম্পর্কে তথাকথিত পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার পূর্বেই।

দ্বিতীয় ধারণা সম্পর্কে বলা যায় যে, কুরআনের ৫৩: ১-১৮ আয়াত-এ "দৃশ্য” (visions) সম্পর্কে বর্ণনার পূর্বে রাসূলুল্লাহ কতিপয় পদ্ধতির কথা বলেন, কিন্তু কুরআনের বক্তব্য প্রকাশ করা অথবা কুরআনের "রচনা" সম্পর্কে কিছু বলেন নাই। এই সম্পর্কে বেল্-এর যুক্তিগুলি নিম্নে বর্ণনা করা হইল :

(ক) কুরআনের আয়াতে বর্ণিত 'ইয়ানতিকু' ينطق (আয়াত ৩) একটি সাধারণ শব্দ এবং শব্দটি কুরআনের আবৃত্তির ক্ষেত্রে কোন অনুষঙ্গ নহে”। (খ) 'কুরআন' শব্দটি সিরীয় ভাষার শব্দ Qeryånå হইতে উদ্ভূত। ঐ সময় হইতে কুরআন সরবরাহের ধারণা ধর্মশাস্ত্রের দ্বারা উপস্থাপিত, খৃস্টান চার্চে বাইবেল পাঠ হইতে এই ধারণা গ্রহণ করা হয়। এইভাবে রাসূলুল্লাহ কুরআন

পাঠের পূর্বেই লোকজনের সম্মেলন ঘটাইয়াছিলেন। (গ) আওহা )اَوْحَى( শব্দটি কুরআনের সূরা আন্-নাজম-এর ৪নং আয়াতে ব্যবহৃত হইয়াছে যাহা অপরিহার্যভাবে কুরআনের শব্দাবলী বুঝায় না। উপরন্তু ওহী, )وحی( শব্দের বহুমুখী ব্যবহার কুরআনে দেখানো হইয়াছে। যেমন ইহার অর্থ "ধারণা দেওয়া”, “বিস্মৃত শব্দ জাগাইয়া দেওয়া", "উদ্বুদ্ধ করা”। ১২

এক্ষণে বেল্-এর শেষ যুক্তি (গ) প্রধানত তাহার তৃতীয় ধারণার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত যাহা উপরে পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করা হইয়াছে। উদাহরণস্বরূপ, কুরআনের ওহী )وحی( -এর প্রকৃতি। অতএব এই যুক্তি পরবর্তী অংশে আলোচনা করা হইবে। বেল্-এর প্রথম যুক্তি (ক) সম্পর্কে, যেমন রাসূলুল্লাহ প্রাথমিক পর্যায়ে কেবল বিভিন্ন পন্থায় কথা বলিতেন, কুরআন অবতরণের কথা বলিতেন না এবং তিনি একদল লোক সংগ্রহ করার পর কুরআন অবতরণের কথা প্রকাশ করেন। ইহা মূইর-এর ধারণার সরল পুনরাবৃত্তি মাত্র, যাহা ইতোপূর্বে আলোচনা করা হইয়াছে এবং ঐ ধারণার ত্রুটিসমূহ নির্দেশ করা হইয়াছে। ১৩ এই সম্পর্কিত বর্ণনায় বেল্-এর নিজস্ব যৌক্তিকতা যতটুকু বর্ণিত হইয়াছে সেই দিক হইতে ইহা বলা যায় যে, তিনি সূরা আন্-নাজম-এর ৩ নং আয়াতে (৫৩: ৩) দৃষ্ট ইয়ানতিকু () শব্দটির অত্যন্ত সংকীর্ণ ও ভুল অর্থ করিয়াছেন এবং আয়াতের সার্বিক অবস্থা হইতে এই শব্দটিকে পৃথক করিয়া ফেলিয়াছেন। আয়াতের নির্ভুল অন্তর্নিহিত অর্থে অবিশ্বাসীদের আপত্তির কারণে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়—ইহার ফল এই দাঁড়ায় যে, রাসূলুল্লাহ তাহাদের নিকট যে ঘোষণা দেন তাহা আল্লাহ্র কথা ছিল না, বরং রাসূলুল্লাহ -এর নিজের কথা ছিল। ইহার উত্তরে বলা যায় যে, "রাসূলুল্লাহ তাঁহার নিজ ইচ্ছা হইতে কিছু বলেন না। ইহা আর কিছুই নহে, বরং আল্লাহ্র ওহী যাহা তাঁহার নিকট পৌঁছানো হয়"। কুরআনের বক্তব্য মা ইয়ানতিকু' )مَا يَنْطق( -এর অর্থ 'তিনি বলেন না', শুধু ইয়ানতিকু )يَنْطق( নহে, ইয়ানতিকু-এর অর্থ 'তিনি বলেন'। এই বিষয় সংক্রান্ত বর্ণনায় ইহা একটি যথাযথ ভাষার প্রকাশভঙ্গি বা বাগবৈশিষ্ট্য। ইহা কেবল সাধারণ ধারণা প্রকাশ করণার্থে "বক্তব্য" প্রদানে ব্যবহৃত হয় না, যেমন বেল্ আমাদেরকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছেন এবং ইহা এই অর্থ প্রকাশ করে যে, রাসূলুল্লাহ "কেবল কতিপয় পদ্ধতি সম্পর্কে কথা বলিয়াছেন"। ইহা এই অর্থ প্রকাশ করে যে, রাসূলুল্লাহ তাঁহার বক্তব্যে দাবি করেন যে, আল্লাহর সঙ্গে তাঁহার যোগাযোগ রহিয়াছে, অথচ অবিশ্বাসিগণ তাঁহার এই দাবি সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপন করে। ফলে কুরআনের আয়াত এই অভিযোগ পর্যায়ক্রমে খণ্ডন করিয়া ইহা প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ নিজের মন হইতে কিছু বলেন না—এই বর্ণনা তাঁহার খেয়ালী কোন অদ্ভূত কল্পনা হইতে জন্মলাভ করে নাই, কিন্তু ওহী হইল আল্লাহ্ প্রত্যাদেশ যাহা তাঁহার নিকট নাযিল করা হইয়াছে। বেল্ এই বক্তব্যের সম্পূর্ণ অপব্যাখ্যা করিয়া আয়াতের আলোচ্য বিষয় হইতে ইহাকে পৃথক করিয়া ফেলিয়াছেন। যদি রাসূলুল্লাহ এই দাবি না করিতেন যে, তিনি যাহা প্রকাশ করিয়াছেন তাহা আল্লাহ্র কথা-কুরআন, তাহা হইলে অবিশ্বাসীদের আপত্তি উত্থাপনের কোন কারণ থাকিত।

না। সুতরাং এই আপত্তির বিরুদ্ধে পাল্টা জওয়াব দেওয়ার প্রয়োজন হইত না, যেমনটি এই আলোচ্য আয়াতে প্রশ্নাতীতভাবে বিদ্যমান রহিয়াছে।

বেল্ নিজেও এই ক্ষেত্রে তাঁহার নিজের বর্ণনা-বিশ্লেষণে কিছুটা দ্বিধান্বিত ও স্ববিরোধী। তিনি এই সম্পর্কিত বিষয়ে অনুমিত কুরআন-পূর্ব বক্তব্যে বলেন যে, ওহী শব্দের অর্থ "প্রত্যাদেশের মূল পাঠের শাব্দিক বিবরণ" নহে, বরং ইহার অর্থ "পরামর্শ দেওয়া" "প্রণোদিত করা" অথবা "উদ্বুদ্ধ করা" ইত্যাদি যাহা কোন ব্যক্তির মনে তাহার নিজস্ব সত্তার বাহির হইতে আসে"। ১৪ তিনি আরও বলেন যে, রাসূলুল্লাহ এই বিষয়ে আয়াত অবতরণের পূর্বে, কেবল "ওহীর মাধ্যমেই কথা বলেন এক স্বর্গীয় ব্যক্তিত্বের পরামর্শক্রমে" যাহাকে তিনি দেখিয়াছিলেন। বেল্ সুস্পষ্টভাবে এই বিবরণ দেন কুরআনের আয়াতের প্রামাণ্য সংশ্লেষ পরিহার করার মাধ্যমে, যাহা রাসূলুল্লাহ প্রকাশ করেন তাহা তাঁহার নিজের বক্তব্য ছিল না, বরং তাঁহার নিকট অবতীর্ণ ওহী ছিল। বেল্ এইরূপে জোরপূর্বক ওহীর ব্যাখ্যা দেন, ওহীকে তিনি বলেন, কুরআন-পূর্ব বক্তব্য। কিন্তু বেল্-এর এই ব্যাখ্যার ফলে কুরআন-পূর্ব বক্তব্য এবং ওহী অবতরণের মাধ্যমে যে কুরআন গঠিত হইয়াছে, এই উভয়ের মধ্যে পার্থক্য দূর করে। এইভাবে বেল্ দ্বিধান্বিত ও স্ববিরোধী। তিনি নিজে রাসূলুল্লাহ কর্তৃক কুরআন-পূর্ব বক্তব্য সম্বলিত তাহার ধারণাকে বাতিল ঘোষণা করেন।

এই সম্পর্কে বেল্-এর অন্যান্য ধারণা এই যে, রাসূলুল্লাহ কুরআন তিলাওয়াতের ধারণা খৃস্টান চার্চে বাইবেল পাঠ হইতে গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং তিনি কেবল এই "তিলাওয়াতের” চিন্তা উদ্ভাবন করেন, যখন তিনি তাঁহার চতুষ্পার্শ্বে সমবেত সাহাবীদের মধ্যে প্রকাশ্যে (তিলাওয়াত) করেন। ইহা কেবল একটি অযৌক্তিক প্রস্তাব, যাহা তিনি সুস্পষ্টরূপে যুগপৎ মূর-এর অযৌক্তিক ধারণা দ্বারা অনুপ্রাণিত হইয়া করিয়াছেন। ওহী-পূর্ব অথবা কুরআন-পূর্ব উচ্চারণ তত্ত্ব অনুযায়ী মূর বলেন, রাসূলুল্লাহ তাঁহার একদল অনুসারী সংগ্রহের পর নিজেকে একজন রাসূল হিসাবে পরিচিত করেন এবং আল্লাহ্ নামে কথা বলেন। ১৬ অনুরূপ আপত্তি বেল্-এর ব্যাপারেও প্রযোজ্য। ইহা তো চিন্তা করাই অযৌক্তিক যে, একদল মানুষ রাসূলুল্লাহ-এর অনুসরণের জন্য আসিবে এবং তাহারা তাঁহার মর্যাদা সম্পর্কে অর্থাৎ একজন স্বর্গীয়ভাবে প্রেরিত শিক্ষক এবং তাঁহার শিক্ষা সংশ্লিষ্ট উচ্চারণ প্রত্যাদেশ সংক্রান্ত বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ী না হয়। তদুপরি, যদি রাসূলুল্লাহ সমাবেশে বক্তব্য পেশ সংক্রান্ত ধারণা খৃস্টান চার্চে বাইবেল পাঠ হইতে পাইয়া থাকিতেন, তাহা হইলে ইহা তাঁহার জন্য অপরিহার্য নহে যে, তিনি তাঁহার চতুষ্পার্শ্বে অনুসারীদের একত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করিতেন যতক্ষণ না তিনি তাঁহার হস্তে প্রস্তুত এক প্রস্থ (স্বর্গীয়) বাণী পাইতেন।

পরিশেষে বেল্-এর বিবরণ, যাহা কুরআনের আয়াত ৫৩: ১-১৮-এর "দৃশ্য” (vision) পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার অগ্রবর্তী বর্ণনা। রাসূলুল্লাহ কেবল কতিপয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ইঙ্গিত দেন যে, ৫৩: ১-১৮ আয়াতসমূহ কুরআনের সর্বপ্রথম অবতরণকৃত আয়াতসমূহের অংশবিশেষ। যাহা

হউক, ঐ বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল। ওহী অবতরণের ক্রম সম্পর্কিত বর্ণনার পার্থক্য সত্ত্বেও এই তথ্য হাদীছ দ্বারা সমর্থিত নহে। এমনকি ইহা প্রাচ্যবিদদের নিজেদের দ্বারাও সমর্থিত নহে। এমনকি রিচার্ড বেল নিজেও এই ধারণার উপর দৃঢ় থাকেন নাই এবং তিনি দ্বিধান্বিত হইয়া কিছু দিন পূর্বে বলেন, "যদি মুহাম্মাদ কুরআন উপস্থাপনে (আবৃত্তিতে) প্রেরিত হইয়া থাকেন, তাহা হইলে ‘পড়’ (ইব্রা - Recite) এই নির্দেশটি স্বাভাবিকভাবেই প্রথমে আসার কথা। ঐ যুক্তি হয়ত এক্ষণে সমালোচনামূলক মনোভাবের আবেদন সৃষ্টি করে এবং বাস্তবিকভাবে অধিকাংশ ইউরোপীয় পণ্ডিত এই আয়াতসমূহ সর্বপ্রথম অবতরণকৃত আয়াতের অন্যতম বলিয়া মানিয়া লইয়াছেন। ১৭ প্রকৃতপক্ষে বেল্ বলিতেছেন যে, ৫৩: ১-১৮ আয়াতসমূহ অবতরণের পূর্বে কুরআনের اقْرَأْ )পড় - Recite) আয়াত নাযিল হইয়াছিল। হযরত মুহাম্মাদ শুধু এক পদ্ধতিতে কথা বলিতেছিলেন না, বরং কুরআন উপস্থাপন করিতেছিলেন ৫৩: ১-১৮ আয়াতের "দৃশ্য" (vision) সম্পর্কে তথাকথিত পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার পূর্বেই।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তিন: ওহী সম্পর্কে বেল্-এর ধারণা

📄 তিন: ওহী সম্পর্কে বেল্-এর ধারণা


এই আলোচনা আমাদিগকে বেল-এর ধারণাসমূহের ধারাবাহিকতায় তৃতীয়টিতে পৌঁছায় অর্থাৎ ওহীর প্রকৃতি ও তাৎপর্য সম্পর্কে তাহার ধারণা। তিনি ওহী সম্পর্কিত অনেক ধারণার মধ্যে কতিপয় ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করেন। ইহাদের মধ্যে একটি পরিভাষা হইল 'ওহী' ও ইহার দ্বারা প্রাপ্ত বিষয়ের কুরআনে প্রয়োগ এবং এই ভিত্তির উপর নির্ভর করিয়া তিনি জোর দেন যে, এই শব্দটির সাধারণ অর্থ "পরামর্শ", "প্রণোদনা" অথবা "উদ্বুদ্ধকরণ"। তিনি ওহীর কতিপয় উদাহরণ উল্লেখ করেন, সেই উদাহরণসমূহে আল্লাহ তাঁহার রাসূলগণকে কতিপয় বিশেষ বিষয়ে কিছু নির্দেশনা দান করেন। যেমন হযরত নূহ (আ)-কে নৌকা নির্মাণ করিতে বলেন, হযরত মূসা (আ)-কে বলেন তাঁহার উম্মতসহ রাত্রিকালে যাত্রা করিবার জন্য এবং তাঁহার লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করার জন্য এবং হযরত মুহাম্মাদ -কে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম অনুসরণ করার জন্য। এই সমস্ত ঘটনার উপর ভিত্তি করিয়া আল্লাহ্ ওহী তাঁহার রাসূলগণের নিকট আসে। উপসংহারে বেল্ বলেন যে, ওহীর অর্থ "কর্মক্ষেত্রে পথ দেখানোর জন্য পরামর্শ অথবা প্রণোদনা দান করা"। ১৮ এখানে ওহীর সাধারণ অর্থ এবং কুরআনের ওহীর বিশেষ অর্থ আলোচনার পূর্বে বেল্-এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের কতিপয় বিশেষ ত্রুটি বিশ্লেষণ করা যায়। প্রথমেই বলা যায়, তিনি যখন যুক্তি দেখান যে, ওহীর অর্থ কর্মক্ষেত্রে পথ দেখানোর জন্য পরামর্শ দান করা, তখন আমরা বুঝি যে, বেল্ সঠিকভাবে সঠিক পথে অগ্রসর হন নাই এবং তিনি এই কথা ব্যাখ্যা করেন নাই যে, কিভাবে পরামর্শ অথবা প্রণোদনা যে কথাটি তিনি অগ্রাধিকার দেন, কেমন করিয়া রাসূলের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাইত? তদুপরি তিনি যদি "পরামর্শ" ও "প্রণোদনা" এই পরিভাষাসমূহ ব্যবহার করিতে অতি মাত্রায় অভ্যস্ত না হইতেন তাহা হইলে তিনি সহজেই দেখিতে পাইতেন, যে বিষয়গুলি তিনি উল্লেখ করিয়াছেন তাহার সবগুলিই আল্লাহ্র সুস্পষ্ট "নির্দেশনা” এবং তাঁহার রাসূলগণের প্রতি সরাসরি আদেশ এবং ইহা কোনক্রমেই পরামর্শ নহে। এইসব নির্দেশনা ও
আদেশ কার্যকরভাবে পথ দেখানোর জন্য। ইহাও বলা দরকার যে, এই শব্দটি আল্লাহ্র বিধিবদ্ধ শব্দ। إقرأ (পড় Recite), এই নির্দেশ সূচক শব্দটিও আল্লাহ কর্তৃক ব্যবহৃত, বেল্ ইহাকে কুরআনের সর্বপ্রথম শব্দ বলিয়া নিজেও স্বীকার করিয়াছেন।
বেল্ মনে হয় এই বিষয়টি স্বীকার করেন যখন তিনি বলেন যে, “কার্যকরী পরামর্শ অনেক সময় বাস্তবসম্মতভাবে সরাসরি বক্তব্য তৈয়ার করে" এবং অনেক "বিষয় রহিয়াছে যাহার নিয়মনীতি পথ দেখানোর চাইতে মতবাদের উৎস হইতে পারে"। ১৯ তাহা সত্তেও তিনি জোর দেন যে, এইসব নিয়মাবলী "সব সময় খুব সংক্ষিপ্ত এক প্রস্থ বা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বক্তব্য হইয়া থাকে....., যাহা অবশ্যম্ভাবীরূপে কোন বিষয়ের পর্যালোচনা করিয়া কোন প্রশ্ন বিবেচনার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনে আলোর ঝলক সৃষ্টি করে"। ২০ কেহ এই ক্ষেত্রে মন্তব্য করিতে পারে যে, যদি চূড়ান্ত ব্যাখ্যায় ওহী অর্থ হয় "বাবৈশিষ্ট্যপূর্ণ শব্দগুচ্ছ" যাহা কোন বিষয়ে বিচার-বিবেচনা করার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিষয়বস্তুর পর্যালোচনার পর কোন ব্যক্তির মনে আলোর ঝলক সৃষ্টি করে তখন এই ক্ষেত্রে আর আল্লাহ্ প্রসঙ্গ টানিয়া আনার অথবা কোন বাহ্যিক অস্তিত্বকেও দৃশ্যপথে স্থাপন করার এবং কোন ধারণা যোগ করার দরকার নাই। যেমন বেল্ পরে কতিপয় বাক্য এই বিষয়ে লিখেন, ওহীর অর্থ "পরামর্শ", প্রণোদনা" অথবা "উদ্বুদ্ধকরণ” যাহা "কোন ব্যক্তির মনে সম্ভবত বাহির হইতে" আসে। ২১ প্রকৃত বিষয় এই যে, ওহী শব্দটি ইহার পারিভাষা হিসাবে ভাষায় পরামর্শ, প্রণোদনা অথবা উদ্বুদ্ধকরণ ইত্যাদি অর্থ বহন করে না, কোন ব্যক্তির প্রজ্ঞা এবং কোন বিষয় বিচার-বিবেচনার পর উপসংহারে উপনীত হওয়ার অর্থও প্রকাশ করে না, বরং ইহা আল্লাহ্র সঙ্গে তাঁহার নবী-রাসূলগণের যোগাযোগের অর্থ বহন করে।
নিজের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অব্যাহত রাখিয়া বেল্ বলেন, ওহীর অর্থ হইল, "যে কোন অবস্থায় কুরআনের প্রাথমিক অংশ", এমন নহে যে, ইহা শাব্দিকরূপে রাসূলুল্লাহ-এর নিকট ব্যক্ত করা হইয়াছে; বরং "কুরআন রচনার ধারণা" এই যে, কুরআন সম্পর্কে তাঁহাকে পরামর্শ দেওয়া হইয়াছে। বেল্ পরে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ-এর "ওহীর তত্ত্ব উন্নতি লাভ করে"। তিনি "এই শব্দের গুরুত্ব সম্প্রসারিত করেন মৌখিক পদ্ধতিতে যোগাযোগের প্রয়োজন মিটানোর জন্য দীর্ঘ বিষয় সম্বলিত সূরার (passage) মাধ্যমে”। এইজন্য "কতিপয় সূরায় এই বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই অন্তর্নিহিত অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে"। যেমন ১১: ৪০, ১২: ১২০, ১৮: ২৭, এবং ২০ঃ ৪৫। ২২ এইভাবে বেল্ পরামর্শ দিতে আবির্ভূত হন যে, কুরআনের অংশবিশেষ আল্লাহ্ শাব্দিক যোগাযোগের মাধ্যম এবং বাকী অংশ তাহা নহে। কিন্তু তিনি নিজে বাস্তবিকপক্ষে ঐ প্রতিশ্রুত অবস্থানে থাকেন নাই। উপরের বর্ণনা প্রদান করিয়া তিনি ইহার ফলাফল এই বলিয়া সমন্বয় করিতে চেষ্টা করেন যে, কুরআনের যে সূরাগুলির উদ্ধৃতি দেওয়া হইয়াছে, "সেইগুলি সম্ভবত অনেক পরে অবতীর্ণ হইয়াছে এবং ইহাদের সবগুলির মধ্যে প্রকৃত শাব্দিক রূপ দেওয়ার বিষয়টি পরিহার করার চেষ্টা করা হইয়াছে"। ২৩ সুস্পষ্টভাবে এই ক্ষেত্রে বেল্ তাহার চূড়ান্ত ইচ্ছা প্রকাশ করিয়া বলিয়াছেন, "প্রকৃত শাব্দিক ধারণার অর্থ প্রদান" সংক্রান্ত
বিষয়টিকে যে কোন মূল্যে "পরিহার" করেন। হয়ত কেহ ইহা পর্যবেক্ষণ করিয়া বলিতে পারে যে, ইহা অবশ্যই বিকৃত বা "পরিহার” করা সম্ভব। কিন্তু ঐ অর্থ "তাহাদের প্রকৃতিগত অন্তর্নিহিত বিষয়", যেমন বেল্ স্বীকার করেন, সম্ভবত অসতর্কভাবে।
এই ব্যাপারে ইহাও বলা যাইতে পারে যে, যখন কুরআনের কোন আয়াত তাহার ধারণার বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে, তখন বেল্ হয় ইহাকে বিলম্বিত সময়ের, নয়ত অতি প্রাচীন বলিয়া অভিহিত করেন, অর্থাৎ তাহার উদ্দেশ্য সাধনে যখন যাহা সমীচীন মনে হয় তখন তাহাই বলিয়া থাকেন। উপরে যেসব আয়াতের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে, সবগুলিই মক্কায় অবতীর্ণ, এমনকি যদি যুক্তি প্রদর্শনের কারণে ইহা স্বীকার করা হয় যে, এইসব আয়াত "সম্ভবত যুক্তিসঙ্গতভাবে বিলম্বিত। বেল তাহার দাবিতে সঙ্গতি রক্ষা করিতে পারেন নাই যখন তিনি রাসূলুল্লাহ-এর ওহী অবতরণ তত্ত্বের উন্নয়ন ঘটাইয়া ওহী শব্দের গুরুত্ব বৃদ্ধি করেন শব্দিক বিষয় বুঝানোর জন্য। তাহার বক্তব্যের সমর্থনে তিনি ৪২ঃ ৫০ আয়াত (প্রকৃতপক্ষে ৪২: ৫১) উদ্ধৃত করেন। এই আয়াতে আল্লাহ বলেন : "কোন মানুষের সঙ্গে আল্লাহ কথা বলিবেন, একমাত্র ওহীর মাধ্যম ছাড়া অথবা পর্দার আড়াল হইতে অথবা তিনি দূত প্রেরণ করেন, যিনি তাঁহার (আল্লাহ্) ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁহার নিদের্শমত যোগাযোগ করেন..."। ২৪ এই আয়াতের প্রেক্ষিতে বেল্ বলেন, ওহী পরিভাষার মাধ্যমে শাব্দিক যোগাযোগের ধারণা প্রদান করা "অসম্ভব ব্যাপার"। ২৫ ইহার কিছু সময় পরেই তিনি এই আয়াত সম্পর্কে বলেন, অন্ততপক্ষে যে কেহ মুহাম্মাদ-এর নিকট কিভাবে ওহী আসে সেই সম্পর্কে মুহাম্মাদ-এর ধারণা বুঝিতে পারে, যাহা আমাদের দৃষ্টি সমক্ষে প্রতিভাত হয়...। ২৬ এইভাবে বেল্ আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহেন যে, রাসূলুল্লাহ -এর ওহী সংক্রান্ত ধারণা উন্নতি লাভ করিয়াছে, তিনি ইহার অর্থ সম্প্রসারিত করিয়া ইহাকে শাব্দিক যোগাযোগের অর্থে প্রয়োগ করিয়াছেন। একই সময়ে আবার তিনি (বেল্) বলেন যে, ওহীর অর্থ শাব্দিক যোগাযোগ হইতে পারে না।
প্রকৃত ঘটনা এই যে, না রাসূলুল্লাহ স্ববিরোধী ছিলেন, না কুরআন পরিবর্তনশীল। বেল্ স্বয়ং কুরআন প্রদত্ত ওহীর ধারণা বুঝিতে পারেন নাই। তিনি ৪২ঃ ৫১ আয়াতের অর্থ বুঝিতেও ভুল করেন। ইহা এই অর্থ বুঝায় না যে, ওহী কোনক্রমেই শাব্দিক যোগাযোগ হইতে পারে না। ইহা তো শুধু আল্লাহ্ বাণী মানুষের কাছে পৌঁছানো তথা যোগাযোগের রীতি ও পদ্ধতি বর্ণনা করে। ইহা অনুমিত হয়, যেমন কুরআনের আয়াত বলে যে, আল্লাহ্ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন না, অর্থাৎ মুখোমুখী কথা বলেন না। বেল্ ওহীর অর্থ করেন, ইংরেজী গ্রামারের নিয়ম অনুযায়ী, আল্লাহ্র "পরোক্ষ বক্তব্য"।
বেল্-এর ইংরেজী গ্রামারের নিয়ম অনুযায়ী (ওহীকে) "পরোক্ষ বক্তব্য" বলার পর এই 'বিষয়টি পরিষ্কার হয় যে, পরবর্তীতে তিনি তাহা প্রত্যক্ষণ করেন এই বলিয়া, ৪২: ৫১ আয়াত এই স্বীকৃতি দেয় যে, যে কয়টি আয়াতে আল্লাহ সরাসরি (প্রত্যক্ষ) বক্তব্য দেন সেইখানে
তিনি “প্রথম পুরুষ এক বচন” অনুযায়ী কথা বলেন, যাহা ভুল। বেল্ লিখেন, “কুরআন শরীফ এক অথবা দুইটি আয়াতে আল্লাহ্ তাঁহার নিজস্ব প্রথম পুরুষ একবচন অনুযায়ী কথা বলেন, তু. ৫১:৫৬-৫৮, ৭৪:১১-১৫। যদি রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি আল্লাহ্র এই সরাসরি বক্তব্য ভুল হইয়া থাকে, যেমন উপরের আয়াতে স্বীকার করা হইয়াছে বলিয়া মনে হয়, তাহা হইলে ইহার চাইতে আরও কঠিন যে দাবি করা হইয়াছে প্রকৃতপক্ষে তিনি (রাসূল) আল্লাহকে দেখিয়াছেন, তাহা কিভাবে সম্ভব”।২৭
ইহা এক্ষণে বলা উচিত যে, কুরআনের আয়াত ইহা বলে নাই যে, ওহী শাব্দিক যোগাযোগ হইতে পারে না। ইহা স্বীকার করা যে, কুরআনের বর্ণনা সরাসরি আল্লাহ্ বক্তব্য (ইংরেজী গ্রামারের নিয়ম অনুযায়ী), এই কথাটি ভুল। বেল-এর সার্বিক ধারণা এই যে, কুরআন রাসূলুল্লাহ -এর নিজস্ব রচনা, তাহা ভুল এবং এটিই আলোচনার বিষয়। এইখানে কেবল একটি অথবা দুইটি আয়াত উদ্ধৃত করা হয় নাই। এমনকি ঐ আয়াতগুলি যে শাব্দিক যোগাযোগের অর্থে প্রকাশ করে, তাহা বেল্ দ্বারা সমর্থিত নহে। কিন্তু সম্পূর্ণ কুরআন, চাই কোন আয়াত “প্রত্যক্ষ বক্তব্য” অথবা “অপ্রত্যক্ষ বক্তব্য”-এর ধারণায় বিন্যস্ত হউক অথবা না হউক, কুরআন আল্লাহ্র বাণীর শাব্দিক যোগাযোগ (নিঃসন্দেহে)। আরেকটি ধারণা যে, রাসূলুল্লাহ প্রাথমিক অবস্থায় দাবি করিয়াছিলেন যে, তিনি আল্লাহকে দেখিয়াছেন, ইহাও ভুল। যাহা হউক এই ধারণা গ্রহণ করার পর ইহা দেখিতে বাকী রহিল যে, প্রকৃতপক্ষে ওহীর তাৎপর্য কি যাহা স্বয়ং কুরআন হইতে ভাস্বর হইয়া উঠিয়াছে এবং বেল্ ভুল চিন্তা করিয়া বলেন, ওহীর অর্থ “পরামর্শ” অথবা “প্রণোদনা” অথবা “উদ্বুদ্ধকরণ”।

এই আলোচনা আমাদিগকে বেল-এর ধারণাসমূহের ধারাবাহিকতায় তৃতীয়টিতে পৌঁছায় অর্থাৎ ওহীর প্রকৃতি ও তাৎপর্য সম্পর্কে তাহার ধারণা। তিনি ওহী সম্পর্কিত অনেক ধারণার মধ্যে কতিপয় ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করেন। ইহাদের মধ্যে একটি পরিভাষা হইল 'ওহী' ও ইহার দ্বারা প্রাপ্ত বিষয়ের কুরআনে প্রয়োগ এবং এই ভিত্তির উপর নির্ভর করিয়া তিনি জোর দেন যে, এই শব্দটির সাধারণ অর্থ "পরামর্শ", "প্রণোদনা" অথবা "উদ্বুদ্ধকরণ"। তিনি ওহীর কতিপয় উদাহরণ উল্লেখ করেন, সেই উদাহরণসমূহে আল্লাহ তাঁহার রাসূলগণকে কতিপয় বিশেষ বিষয়ে কিছু নির্দেশনা দান করেন। যেমন হযরত নূহ (আ)-কে নৌকা নির্মাণ করিতে বলেন, হযরত মূসা (আ)-কে বলেন তাঁহার উম্মতসহ রাত্রিকালে যাত্রা করিবার জন্য এবং তাঁহার লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করার জন্য এবং হযরত মুহাম্মাদ -কে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম অনুসরণ করার জন্য। এই সমস্ত ঘটনার উপর ভিত্তি করিয়া আল্লাহ্ ওহী তাঁহার রাসূলগণের নিকট আসে। উপসংহারে বেল্ বলেন যে, ওহীর অর্থ "কর্মক্ষেত্রে পথ দেখানোর জন্য পরামর্শ অথবা প্রণোদনা দান করা"। ১৮ এখানে ওহীর সাধারণ অর্থ এবং কুরআনের ওহীর বিশেষ অর্থ আলোচনার পূর্বে বেল্-এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের কতিপয় বিশেষ ত্রুটি বিশ্লেষণ করা যায়। প্রথমেই বলা যায়, তিনি যখন যুক্তি দেখান যে, ওহীর অর্থ কর্মক্ষেত্রে পথ দেখানোর জন্য পরামর্শ দান করা, তখন আমরা বুঝি যে, বেল্ সঠিকভাবে সঠিক পথে অগ্রসর হন নাই এবং তিনি এই কথা ব্যাখ্যা করেন নাই যে, কিভাবে পরামর্শ অথবা প্রণোদনা যে কথাটি তিনি অগ্রাধিকার দেন, কেমন করিয়া রাসূলের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাইত? তদুপরি তিনি যদি "পরামর্শ" ও "প্রণোদনা" এই পরিভাষাসমূহ ব্যবহার করিতে অতি মাত্রায় অভ্যস্ত না হইতেন তাহা হইলে তিনি সহজেই দেখিতে পাইতেন, যে বিষয়গুলি তিনি উল্লেখ করিয়াছেন তাহার সবগুলিই আল্লাহ্র সুস্পষ্ট "নির্দেশনা” এবং তাঁহার রাসূলগণের প্রতি সরাসরি আদেশ এবং ইহা কোনক্রমেই পরামর্শ নহে। এইসব নির্দেশনা ও

আদেশ কার্যকরভাবে পথ দেখানোর জন্য। ইহাও বলা দরকার যে, এই শব্দটি আল্লাহ্র বিধিবদ্ধ শব্দ। إقرأ (পড় Recite), এই নির্দেশ সূচক শব্দটিও আল্লাহ কর্তৃক ব্যবহৃত, বেল্ ইহাকে কুরআনের সর্বপ্রথম শব্দ বলিয়া নিজেও স্বীকার করিয়াছেন।

বেল্ মনে হয় এই বিষয়টি স্বীকার করেন যখন তিনি বলেন যে, “কার্যকরী পরামর্শ অনেক সময় বাস্তবসম্মতভাবে সরাসরি বক্তব্য তৈয়ার করে" এবং অনেক "বিষয় রহিয়াছে যাহার নিয়মনীতি পথ দেখানোর চাইতে মতবাদের উৎস হইতে পারে"। ১৯ তাহা সত্তেও তিনি জোর দেন যে, এইসব নিয়মাবলী "সব সময় খুব সংক্ষিপ্ত এক প্রস্থ বা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বক্তব্য হইয়া থাকে....., যাহা অবশ্যম্ভাবীরূপে কোন বিষয়ের পর্যালোচনা করিয়া কোন প্রশ্ন বিবেচনার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনে আলোর ঝলক সৃষ্টি করে"। ২০ কেহ এই ক্ষেত্রে মন্তব্য করিতে পারে যে, যদি চূড়ান্ত ব্যাখ্যায় ওহী অর্থ হয় "বাবৈশিষ্ট্যপূর্ণ শব্দগুচ্ছ" যাহা কোন বিষয়ে বিচার-বিবেচনা করার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিষয়বস্তুর পর্যালোচনার পর কোন ব্যক্তির মনে আলোর ঝলক সৃষ্টি করে তখন এই ক্ষেত্রে আর আল্লাহ্ প্রসঙ্গ টানিয়া আনার অথবা কোন বাহ্যিক অস্তিত্বকেও দৃশ্যপটে স্থাপন করার এবং কোন ধারণা যোগ করার দরকার নাই। যেমন বেল্ পরে কতিপয় বাক্য এই বিষয়ে লিখেন, ওহীর অর্থ "পরামর্শ", প্রণোদনা" অথবা "উদ্বুদ্ধকরণ” যাহা "কোন ব্যক্তির মনে সম্ভবত বাহির হইতে" আসে। ২১ প্রকৃত বিষয় এই যে, ওহী শব্দটি ইহার পারিভাষা হিসাবে ভাষায় পরামর্শ, প্রণোদনা অথবা উদ্বুদ্ধকরণ ইত্যাদি অর্থ বহন করে না, কোন ব্যক্তির প্রজ্ঞা এবং কোন বিষয় বিচার-বিবেচনার পর উপসংহারে উপনীত হওয়ার অর্থও প্রকাশ করে না, বরং ইহা আল্লাহ্র সঙ্গে তাঁহার নবী-রাসূলগণের যোগাযোগের অর্থ বহন করে।

নিজের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অব্যাহত রাখিয়া বেল্ বলেন, ওহীর অর্থ হইল, "যে কোন অবস্থায় কুরআনের প্রাথমিক অংশ", এমন নহে যে, ইহা শাব্দিকরূপে রাসূলুল্লাহ-এর নিকট ব্যক্ত করা হইয়াছে; বরং "কুরআন রচনার ধারণা" এই যে, কুরআন সম্পর্কে তাঁহাকে পরামর্শ দেওয়া হইয়াছে। বেল্ পরে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ-এর "ওহীর তত্ত্ব উন্নতি লাভ করে"। তিনি "এই শব্দের গুরুত্ব সম্প্রসারিত করেন মৌখিক পদ্ধতিতে যোগাযোগের প্রয়োজন মিটানোর জন্য দীর্ঘ বিষয় সম্বলিত সূরার (passage) মাধ্যমে”। এইজন্য "কতিপয় সূরায় এই বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই অন্তর্নিহিত অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে"। যেমন ১১: ৪0, ১২: ১২০, ১৮: ২৭, এবং ২০ঃ ৪৫। ২২ এইভাবে বেল্ পরামর্শ দিতে আবির্ভূত হন যে, কুরআনের অংশবিশেষ আল্লাহ্ শাব্দিক যোগাযোগের মাধ্যম এবং বাকী অংশ তাহা নহে। কিন্তু তিনি নিজে বাস্তবিকপক্ষে ঐ প্রতিশ্রুত অবস্থানে থাকেন নাই। উপরের বর্ণনা প্রদান করিয়া তিনি ইহার ফলাফল এই বলিয়া সমন্বয় করিতে চেষ্টা করেন যে, কুরআনের যে সূরাগুলির উদ্ধৃতি দেওয়া হইয়াছে, "সেইগুলি সম্ভবত অনেক পরে অবতীর্ণ হইয়াছে এবং ইহাদের সবগুলির মধ্যে প্রকৃত শাব্দিক রূপ দেওয়ার বিষয়টি পরিহার করার চেষ্টা করা হইয়াছে"। ২৩ সুস্পষ্টভাবে এই ক্ষেত্রে বেল্ তাহার চূড়ান্ত ইচ্ছা প্রকাশ করিয়া বলিয়াছেন, "প্রকৃত শাব্দিক ধারণার অর্থ প্রদান" সংক্রান্ত

বিষয়টিকে যে কোন মূল্যে "পরিহার" করেন। হয়ত কেহ ইহা পর্যবেক্ষণ করিয়া বলিতে পারে যে, ইহা অবশ্যই বিকৃত বা "পরিহার” করা সম্ভব। কিন্তু ঐ অর্থ "তাহাদের প্রকৃতিগত অন্তর্নিহিত বিষয়", যেমন বেল্ স্বীকার করেন, সম্ভবত অসতর্কভাবে।

এই ব্যাপারে ইহাও বলা যাইতে পারে যে, যখন কুরআনের কোন আয়াত তাহার ধারণার বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে, তখন বেল্ হয় ইহাকে বিলম্বিত সময়ের, নয়ত অতি প্রাচীন বলিয়া অভিহিত করেন, অর্থাৎ তাহার উদ্দেশ্য সাধনে যখন যাহা সমীচীন মনে হয় তখন তাহাই বলিয়া থাকেন। উপরে যেসব আয়াতের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে, সবগুলিই মক্কায় অবতীর্ণ, এমনকি যদি যুক্তি প্রদর্শনের কারণে ইহা স্বীকার করা হয় যে, এইসব আয়াত "সম্ভবত যুক্তিসঙ্গতভাবে বিলম্বিত। বেল তাহার দাবিতে সঙ্গতি রক্ষা করিতে পারেন নাই যখন তিনি রাসূলুল্লাহ-এর ওহী অবতরণ তত্ত্বের উন্নয়ন ঘটাইয়া ওহী শব্দের গুরুত্ব বৃদ্ধি করেন শব্দিক বিষয় বুঝানোর জন্য। তাহার বক্তব্যের সমর্থনে তিনি ৪২ঃ ৫০ আয়াত (প্রকৃতপক্ষে ৪২: ৫১) উদ্ধৃত করেন। এই আয়াতে আল্লাহ বলেন : "কোন মানুষের সঙ্গে আল্লাহ কথা বলেন না, একমাত্র ওহীর মাধ্যম ছাড়া অথবা পর্দার আড়াল হইতে অথবা তিনি দূত প্রেরণ করেন, যিনি তাঁহার (আল্লাহ্) ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁহার নিদের্শমত যোগাযোগ করেন..."। ২৪ এই আয়াতের প্রেক্ষিতে বেল্ বলেন, ওহী পরিভাষার মাধ্যমে শাব্দিক যোগাযোগের ধারণা প্রদান করা "অসম্ভব ব্যাপার"। ২৫ ইহার কিছু সময় পরেই তিনি এই আয়াত সম্পর্কে বলেন, অন্ততপক্ষে যে কেহ মুহাম্মাদ-এর নিকট কিভাবে ওহী আসে সেই সম্পর্কে মুহাম্মাদ-এর ধারণা বুঝিতে পারে, যাহা আমাদের দৃষ্টি সমক্ষে প্রতিভাত হয়...। ২৬ এইভাবে বেল্ আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহেন যে, রাসূলুল্লাহ -এর ওহী সংক্রান্ত ধারণা উন্নতি লাভ করিয়াছে, তিনি ইহার অর্থ সম্প্রসারিত করিয়া ইহাকে শাব্দিক যোগাযোগের অর্থে প্রয়োগ করিয়াছেন। একই সময়ে আবার তিনি (বেল্) বলেন যে, ওহীর অর্থ শাব্দিক যোগাযোগ হইতে পারে না।

প্রকৃত ঘটনা এই যে, না রাসূলুল্লাহ স্ববিরোধী ছিলেন, না কুরআন পরিবর্তনশীল। বেল্ স্বয়ং কুরআন প্রদত্ত ওহীর ধারণা বুঝিতে পারেন নাই। তিনি ৪২ঃ ৫১ আয়াতের অর্থ বুঝিতেও ভুল করেন। ইহা এই অর্থ বুঝায় না যে, ওহী কোনক্রমেই শাব্দিক যোগাযোগ হইতে পারে না। ইহা তো শুধু আল্লাহ্ বাণী মানুষের কাছে পৌঁছানো তথা যোগাযোগের রীতি ও পদ্ধতি বর্ণনা করে। ইহা অনুমিত হয়, যেমন কুরআনের আয়াত বলে যে, আল্লাহ্ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন না, অর্থাৎ মুখোমুখী কথা বলেন না। বেল্ ওহীর অর্থ করেন, ইংরেজী গ্রামারের নিয়ম অনুযায়ী, আল্লাহ্র "পরোক্ষ বক্তব্য"।

বেল্-এর ইংরেজী গ্রামারের নিয়ম অনুযায়ী (ওহীকে) "পরোক্ষ বক্তব্য" বলার পর এই 'বিষয়টি পরিষ্কার হয় যে, পরবর্তীতে তিনি তাহা প্রত্যক্ষণ করেন এই বলিয়া, ৪২: ৫১ আয়াত এই স্বীকৃতি দেয় যে, যে কয়টি আয়াতে আল্লাহ সরাসরি (প্রত্যক্ষ) বক্তব্য দেন সেইখানে

তিনি “প্রথম পুরুষ এক বচন” অনুযায়ী কথা বলেন, যাহা ভুল। বেল্ লিখেন, “কুরআন শরীফ এক অথবা দুইটি আয়াতে আল্লাহ্ তাঁহার নিজস্ব প্রথম পুরুষ একবচন অনুযায়ী কথা বলেন, তু. ৫১:৫৬-৫৮, ৭৪:১১-১৫। যদি রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি আল্লাহ্র এই সরাসরি বক্তব্য ভুল হইয়া থাকে, যেমন উপরের আয়াতে স্বীকার করা হইয়াছে বলিয়া মনে হয়, তাহা হইলে ইহার চাইতে আরও কঠিন যে দাবি করা হইয়াছে প্রকৃতপক্ষে তিনি (রাসূল) আল্লাহকে দেখিয়াছেন, তাহা কিভাবে সম্ভব”।২৭

ইহা এক্ষণে বলা উচিত যে, কুরআনের আয়াত ইহা বলে নাই যে, ওহী শাব্দিক যোগাযোগ হইতে পারে না। ইহা স্বীকার করা যে, কুরআনের বর্ণনা সরাসরি আল্লাহ্ বক্তব্য (ইংরেজী গ্রামারের নিয়ম অনুযায়ী), এই কথাটি ভুল। বেল্-এর সার্বিক ধারণা এই যে, কুরআন রাসূলুল্লাহ -এর নিজস্ব রচনা, তাহা ভুল এবং এটিই আলোচনার বিষয়। এইখানে কেবল একটি অথবা দুইটি আয়াত উদ্ধৃত করা হয় নাই। এমনকি ঐ আয়াতগুলি যে শাব্দিক যোগাযোগের অর্থে প্রকাশ করে, তাহা বেল্ দ্বারা সমর্থিত নহে। কিন্তু সম্পূর্ণ কুরআন, চাই কোন আয়াত “প্রত্যক্ষ বক্তব্য” অথবা “অপ্রত্যক্ষ বক্তব্য”-এর ধারণায় বিন্যস্ত হউক অথবা না হউক, কুরআন আল্লাহ্র বাণীর শাব্দিক যোগাযোগ (নিঃসন্দেহে)। আরেকটি ধারণা যে, রাসূলুল্লাহ প্রাথমিক অবস্থায় দাবি করিয়াছিলেন যে, তিনি আল্লাহকে দেখিয়াছেন, ইহাও ভুল। যাহা হউক এই ধারণা গ্রহণ করার পর ইহা দেখিতে বাকী রহিল যে, প্রকৃতপক্ষে ওহীর তাৎপর্য কি যাহা স্বয়ং কুরআন হইতে ভাস্বর হইয়া উঠিয়াছে এবং বেল্ ভুল চিন্তা করিয়া বলেন, ওহীর অর্থ “পরামর্শ” অথবা “প্রণোদনা” অথবা “উদ্বুদ্ধকরণ”।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 চার: কুরআনে ওহী এবং কুরআনিক ওহী

📄 চার: কুরআনে ওহী এবং কুরআনিক ওহী


ইহা এক সাধারণ জ্ঞানের বিষয় যে, কুরআনের সত্তর-এরও অধিক স্থানে ওহী শব্দটি (ইহার ভিন্ন ভিন্ন শব্দরূপ অনুযায়ী) উল্লিখিত হইয়াছে। কুরআনের মূল পাঠ ও বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে ওহী শব্দটি বিস্তৃত বহুমুখী অর্থ ও ধারণা বহন করে, ইহা অত্যন্ত স্বাভাবিক। প্রত্যেক ভাষায়ই কতগুলি বিশেষ শব্দ রহিয়াছে, যে শব্দের প্রত্যেকটি বহুমুখী অর্থে ব্যবহৃত হয়। কোন কোন সময় এমনও হয় যে, পরিবেশ-পরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিকতা অনুসারে একটি শব্দ সরাসরি অন্য শব্দের বিপরীতমুখী অর্থ প্রকাশ করে। এই ধরনের অবস্থায় একটি শব্দের নির্দিষ্ট অর্থ বাহির করা সহজসাধ্যও নহে, এমনকি সম্ভবত প্রত্যাশিতও নহে অথবা এমন অর্থ নিশ্চিত করা যাহা সকল প্রেক্ষিত ও অবস্থায় ইহার ব্যবহারের সঙ্গে যথার্থ হইবে। বেল্ ওহীর পরিভাষা সম্পর্কে ঐ রকম কিছু প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন। তিনি কুরআনের কতিপয় আয়াতের উদাহরণ উল্লেখ করেন যেসব আয়াতে ঐ ধরনের শব্দ দৃষ্ট হয়, যেমন মধু মক্ষিকার প্রতি ওহী, এক শয়তানের অন্য শয়তানের প্রতি ওহী, পৃথিবীর প্রতি ওহী ইত্যাদি। এবং পরে তিনি বলেন, এই সকল উদাহরণের ভিত্তিতে ওহী পরিভাষার শুদ্ধ ইংরেজী রূপান্তর হওয়া উচিত “পরামর্শ”, “প্রণোদনা” অথবা “উদ্বুদ্ধকরণ”।
কুরআন সম্পর্কে যাহাদের মোটামুটি জ্ঞান আছে তাহাদের সকলের নিকট ইহা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হওয়া উচিত যে, কুরআনের শব্দ ব্যবহার রীতি সম্পর্কে বেল্-এর জরিপ কোনভাবেই বুদ্ধিমত্তাপূর্ণও নহে, এমনকি বস্তুনিষ্ঠও নহে। তিনি তাহার আলোচনার মূল বিষয়ের সহায়তার জন্য এমন কিছু আয়াত নির্বাচন করিয়াছেন, যে ক্ষেত্রে সেই শব্দটি মূল পাঠের শাব্দিক যোগাযোগের অর্থ বুঝায় না। এইজন্য সে বিষয়টি তিনি "পরিহার" করার ইচ্ছায় স্বীকার করিয়া লইয়াছেন, সেই ক্ষেত্রেও ঐ ধারণা একটি "স্বাভাবিক" বিষয়। ইহার পরেও তিনি তাহার বক্তব্যে যে অর্থ উপস্থাপন করিয়াছেন সেই অর্থ তাহার উদ্ধৃত দৃষ্টান্তের ব্যাপারে যথেষ্টও নহে এবং যথাযথও নহে। তদ্রূপ রাসূলুল্লাহ-এর উপর ওহী নাযিলের দৃষ্টান্ত যাহাকে তিনি বাস্তব আচরণের দিক বলেন, যাহা প্রথমেই বর্ণিত হইয়াছে, এই পরিভাষার অর্থ সেই রকমই হওয়া উচিত যেমন আদেশ অথবা নির্দেশনা এবং কেবল পরামর্শ অথবা প্রণোদনার অর্থ নহে। আরও বলা যায় যে, 'ইব্রা' সূরায় ওহী শব্দটি দৃষ্ট হয় না। কিন্তু বেল্ নিজে এই সূরা 'ইকরা'-কে ওহীর অংশ হিসাবে স্বীকার করেন এবং এইখানে ওহীর অর্থ (অর্থাৎ 'ইকরা'র অর্থ করেন আদেশ, পরামর্শ নহে। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় যে, পৃথিবীকে প্রেরিত শেষ বিচারের দিন সম্পর্কিত ওহীর অর্থ পরামর্শ অথবা প্রণোদনা হইতে পারে। প্রকৃতপক্ষে রিচার্ড বেল্ এই বলিয়া একটি ভুল করেন যে, পৃথিবী (মাটি) ইহার মধ্যস্থ মরদেহগুলি বাহির করিয়া দিতে প্রণোদিত হইবে-৯৯৪ ৪-৫ আয়াতের অর্থ, "ঐ দিন সে ইহার বিষয়গুলি সম্পর্কে বলিতে থাকিবে। কারণ তোমার প্রভু ইহার নিকট ওহী প্রেরণ করিবেন"। এইখানে সুস্পষ্ট অর্থ এই যে, আল্লাহ্ পৃথিবীকে আদেশ করিবেন, একই সাথে পৃথিবীকে ইহার বিষয়গুলি সম্পর্কে কথা বলার ক্ষমতাও দান করিবেন। এইখানে ওহী দ্বৈত অর্থ বহন করে। প্রত্যেকেরই এই কথা জানা আছে যে, পৃথিবী বর্তমানে যে অবস্থায় আছে তাহাতে ইহার কথা বলার ক্ষমতা নাই এবং কেবল কোন পরামর্শ অথবা প্রণোদনা ইহাকে কথা বলাইতে পারিবে না। এই ক্ষেত্রে বেল্-এর জরীপের বাহিরে কেবল একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যাইতে পারে, "ঐগুলি অদৃশ্য সংবাদের মধ্য হইতে কতিপয় বিষয় যাহা আমি তোমাকে ওহীর মাধ্যমে জ্ঞাত করিয়াছি"। ৩:৪৪ ... ذلك مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوْحِيه اليْك। ২৮ এইখানে 'ওহী' পরিভাষাটির সুস্পষ্ট অর্থ হইল, কতিপয় বিষয় সম্পর্কে যোগাযোগ অর্থবা তথ্যগত বর্ণনা অদৃশ্য (অজ্ঞাত) বিষয় সম্পর্কে এবং ইহা কোনক্রমেই অজ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া অথবা উদ্বুদ্ধ করা নহে।
অথচ বেল্ কর্তৃক কথিত অর্থ বর্ণিত বিষয়ের সঠিক ধারণা যথাযথভাবে এবং পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করে না, যদিও উদাহরণস্বরূপ তিনি ইহার দৃষ্টান্তসমূহ উল্লেখ করিয়াছেন। বাস্তবিকপক্ষে যদি আরবী 'ওহী' শব্দের তুল্য ইংরেজী শব্দের প্রয়োজন হয়, তাহা হইলে পরামর্শ, প্রণোদনা ইত্যাদি শব্দের চাইতে এই শব্দ হওয়া উচিত "যোগাযোগ" (Communication)। এই শব্দটি সকল অবস্থায় যথাযথ হইবে।
যে সময় 'হইতে ওহী শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন বিষয় ও পরিস্থিতি বুঝাইতে, ইহার দ্বারা কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের অর্থ বুঝাইতে হইলে ইহার ব্যবহার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে
একমাত্র ঐ নির্দিষ্ট বিষয়েই ব্যবহার করিতে হইবে। ঐ বিষয়ের ভিত্তিতে ইসলাম ধর্মীয় আলাপ-আলোচনায় ওহী পরিভাষাটি কেবল আল্লাহ তাঁহার প্রেরিত নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে যোগাযোগের বিষয় বুঝাইতে প্রযোজ্য। অন্য কথায় বলা যায়, ওহী শব্দটির পারিভাষিক অর্থ ইহার সাধারণ অর্থ হইতে পৃথক। ইহার অর্থ আল্লাহ্র সঙ্গে তাঁহার রাসূলগণের যোগাযোগ এবং তদ্রূপ ইংরেজী শব্দ Communication। ওহীর অর্থ যোগাযোগের কাজ অথবা যোগাযোগের পদ্ধতি —এই উভয়টিই (ক্রিয়া অনুযায়ী) হইতে পারে এবং অনুরূপভাবে যাহা যোগাযোগ স্থাপন করে (অর্থাৎ যোগোযোগের বিষয়বস্তু)। এইভাবে ওহী শব্দটি ইহার যোগাযোগের ধরন অথবা পদ্ধতির বিভিন্ন প্রকারভেদ ব্যবহার হইতে পারে। এমনকি বিষয়বস্তুর প্রকৃতিভেদে ব্যবহারবিধি ভিন্নও হইতে পারে।
উপরোল্লিখিত পবিত্র কুরআনের ৪২: ৫১ আয়াতে রাসূলগণের নিকট ওহী আগমনের ধরন অথবা পদ্ধতি সম্পর্কে বলা হইয়াছে। এই আয়াত তিনটি পদ্ধতি নির্দেশ করে, এই পদ্ধতিতেই আল্লাহর বাণী তাঁহার নির্বাচিত ব্যক্তির নিকট পৌঁছায়। যেমন পদ্ধতি ৩টি এইঃ (ক) প্রত্যক্ষ ওহীর মাধ্যমে, (খ) পর্দার আড়াল হইতে এবং (গ) দূত প্রেরণের মাধ্যমে ফেরেশতা জিবরীল (আ)-এর মাধ্যমে যিনি "আল্লাহ্র আদেশ ও আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী যোগাযোগ (Communication) করেন"। ইহা লক্ষ্য করা যাইতে পারে যে, প্রথম পদ্ধতির ওহীর ধরনের কথা এখানে আর বিস্তারিত বলা হয় নাই। সুস্পষ্টভাবে ইহার মধ্যে অপর দুইটি পদ্ধতি ছাড়া বাকী সকল পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ -এর বর্ণনা অনুযায়ী, ওহী কোন কোন সময় তাঁহার নিকট ঘন্টাধ্বনির মত প্রতিধ্বনিত হইয়া )صلصلة الجرس( আসিত এবং ইহা এমন একটি পদ্ধতি ছিল যাহা তাঁহার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হইত। ২৯ এই পদ্ধতিকেই প্রথম পদ্ধতি হিসাবে আখ্যায়িত করা যাইতে পারে। ওহীর দ্বিতীয় পদ্ধতির একটি উদাহরণ হযরত মূসা (আ)-এর সঙ্গে আল্লাহ্ কথোপকথনের ঘটনা, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আ)-এর দৃষ্টির আড়ালে থাকিয়া কথা বলেন। ওহী অবতরণের তৃতীয় পদ্ধতি, স্বব্যাখ্যা প্রদানযোগ্য বিষয় এবং এই পদ্ধতি নিউ টেস্টামেন্টে উল্লেখ করা হইয়াছে।
অনুরূপভাবে যোগাযোগের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করিয়া ওহী বিভিন্ন ধরনের হইতে পারে এবং এই বিভিন্ন পদ্ধতি বিষয়বস্তু অনুযায়ী হয়। ওহীর একমাত্র বিশেষ পদ্ধতিতে বাইবেল বিন্যস্তকৃত অথবা পঠন (Recitation) পদ্ধতি হইতে )وَحَى مَتْلُو( কুরআন বিন্যস্ত (কুরআন( অনুরূপ হযরত মূসা (আ)-কে যখন বাস্তব জীবনের একটি আচরণ অনুসরণ করিতে বলা হয়, যেমন তাঁহার লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করা, উহা অবশ্যই ওহী ছিল, কেবল তাওরাত নহে। উহা একমাত্র তাহাই যাহা সুনির্দিষ্টভাবে তাওরাত হিসাবে যোগাযোগযোগ্য ছিল এবং উহা তাওরাতই ছিল। তেমনি অনেক ধরনের ওহী কেবল হযরত মুহাম্মাদ -এর নিকট আসিয়াছে, যাহা কুরআন হিসাবে যোগাযোগযোগ্য এবং তাহা কেবল কুরআনই এবং এই পদ্ধতির
ওহীকেই 'কুরআনিক ওহী' বলা হয়। এই কারণে যে, যখন কুরআনের প্রতিটি শব্দ সন্দেহতীতভাবে ওহী। তবে হযরত মুহাম্মাদ -এর নিকট আগত প্রতিটি ওহীই কুরআন নহে। তাঁহার প্রতি অবতারিত এই ধরনের অনেক কুরআন বহির্ভূত ওহীর উদাহরণ রহিয়াছে, যেমন হাদাছে কুদ্‌সী, রাসূলুল্লাহ-এর হিজরতের স্থানের ধরন সম্পর্কে স্বপ্নে তাঁহাকে জানানো সংক্রান্ত ওহী ইত্যাদি।
উপরের আলোচনা হইতে ইহা পরিষ্কার হওয়া উচিত যে, কুরআনিক ওহীর ধরন বুঝিতে হইলে আমাদের মনোযোগ কেবল কুরআনের সেই আয়াতের প্রতি নিবদ্ধ করা দরকার যে, আয়াতে ওহীকে 'রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে আল্লাহ্র যোগাযোগ' বলা হয় এবং সেই আয়াতসমূহ নহে যে আয়াতে ওহী পরিভাষাটি ইহার সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে বলিয়া দৃষ্ট হয়। যদি আমরা এইরূপ করি তাহা হইলে দেখা যাইবে যে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আয়াতে রাসূলুল্লাহ-এর নিকট কুরআন অবতরণের কথা বলা হইয়াছে এবং সেই সকল আয়াতে সুনির্দিষ্টভাবে ওহী পরিভাষাটিও ব্যবহৃত হইয়াছে। ইহা ছাড়া এমন অনেক সংখ্যক আয়াত রহিয়াছে যেইগুলিতে রাসূলুল্লাহ -এর নিকট কুরআন আগমন সম্পর্কে বলা হইয়াছে, কিন্তু ওহী পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয় নাই। প্রকৃতপক্ষে ঐগুলি পরবর্তী সময়ে নাযিলকৃত আয়াত, সে সব আয়াত কুরআনের ওহীর ধরন সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা সম্বলিত।
পবিত্র কুরআনের প্রায় ৪০টি আয়াতে ওহী পরিভাষাটি রাসূলুল্লাহ -এর নিকট ওহী নাযিল সম্পর্কিত বর্ণনায় ব্যবহৃত হইয়াছে। পক্ষান্তরে এই সকল আয়াতের বেশীরভাগে কুরআনের ওহীর ধরন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত নাই। অন্ততপক্ষে এক ডজন আয়াত ওহীর ধরন সম্পর্কিত ব্যাখ্যা সম্বলিত। এইসব আয়াত পর্যালোচনা করিয়া নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত পৌছা যায়:
(এক) স্বয়ং কুরআন ওহী এবং অন্য কিছু নহে, যাহা আবৃত্তি/পঠিত হয়। كَذَلِكَ أَرْسَلْتُكَ فِي أُمَّةٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهَا أُمَمٌ لِتَتْلُوا عَلَيْهِمُ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ....
"এইভাবে আমি তোমাকে পাঠাইয়াছি এক জাতির প্রতি যাহার পূর্বে বহু জাতি গত হইয়াছে, উহাদিগের নিকট আবৃত্তি করিবার জন্য, যাহা আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করিয়াছি” (১৩: ৩০)।
এইখানে পরিষ্কার ইঙ্গিত আছে যে, ইহা ঐ ধরনের ওহী যাহা পঠিত বিষয়। উহার অর্থ এই যে, ইহা পাঠযোগ্য বিষয়ের আঙ্গিকে বিদ্যমান এবং ইহা কেবল একটি পরামর্শ নহে যাহা কার্যে পরিণত করা হয় এবং ইহা সম্পূর্ণ নির্ভুল ও স্পষ্ট। কারণ এই ধরনের ওহী তিলাওয়াত করা হয় এবং পড়া হয়, ইহার অপর নাম কুরআন, পাঠ করা অথবা আবৃত্তি করার বস্তু।
(দুই) ইহা একটি ধর্মগ্রন্থ (পুস্তক), যাহা ওহী করা হইয়াছে অর্থাৎ ওহীর মাধ্যমে আসিয়াছে এবং যাহা পাঠযোগ্য।
وَاتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنْ كِتَابِ رَبِّكَ لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَتِهِ... (۲۷ : ۱۸) “তুমি তোমার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট তোমার প্রতিপালকের কিতাব হইতে আবৃত্তি কর। তাঁহার বাক্য পরিবর্তন করিবার কেহই নাই” (১৮: ২৭)।
أَتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الكتب... (٤٥ : ۲۹) "তুমি তোমার প্রত্যাদিষ্ট কিতাব হইতে আবৃত্তি কর” (২৯: ৪৫)।
وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ مِنَ الكتب هُوَ الْحَقُّ... (٣٥ : ٣١) “আমি তোমার প্রতি যে কিতাব অবতীর্ণ করিয়াছি তাহা সত্য” (৩৫: ৩১)।
এইভাবে যে বক্তব্যের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ -এর সঙ্গে যোগাযোগ (ওহীর মাধ্যমে) করা হয়, তাহা একটি গ্রন্থ। এমন নহে যে, তাঁহাকে একটি পুস্তক রচনার পরামর্শ দেওয়া হইয়াছিল। ইহাও উল্লেখ্য যে, এই সূরার প্রথম আয়াতে কুরআনের ওহীকে "আল্লাহর কথা" (কালিমাতিহি = كلمته) বলা হইয়াছে। জোর দিয়া বলা হইয়াছে যে, তাঁহার কথা পরিবর্তন করার শক্তি কাহারও নাই।
(তিন) যাহা ওহী করা হইয়াছে তাহা "পঠিত, পাঠযোগ্য/আবৃত্তি-কুরআন" এবং ইহা এক বিশেষ ভাষাশৈলীর মাধ্যমে।
وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ قُرْآنًا عَرَبِيًّا ... (٤٢ : ٧) "এইভাবে আমি তোমার প্রতি কুরআঁন অবতীর্ণ করিয়াছি আরবী ভাষায়" (৪২ঃ ৭)।
এইভাবে "পঠিত/ আবৃত্তিকৃত” বর্ণনা রাসূলুল্লাহ -এর নিকট ওহী করা হইয়াছে, এমন নহে যে, পাঠযোগ্য কিছু রচনা করার জন্য তাহাকে ওহী করা হইয়াছে।
(চার) রাসূলুল্লাহ প্রথমে শুনিয়া লইতেন তাঁহার নিকট কী ওহী করা হইল? ওহীর মাধ্যমে যোগাযোগ সমাপ্ত হওয়ার পূর্বে তিনি ইহা পুনরাবৃত্তি/আবৃত্তি করার জন্য তাড়াহুড়া করিতেন না।
وَلَا تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يُقْضَى إِلَيْكَ وَحْيُهُ... (١٩٤ : ٢٠) "তোমার প্রতি আল্লাহ্ ওহী সম্পূর্ণ হইবার পূর্বে কুরআন পাঠে তুমি ত্বরা করিও না" (২০: ১১৪)।
(পাঁচ) উহা কুরআনিক ওহী এবং কেবল সাধারণ কুরআন (পাঠযোগ্য) নহে, ইহা বর্ণনা/ বিবরণ সম্বলিত।
نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ بِمَا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ هَذَا الْقُرْآنَ... (১২ : ৩) "আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করিতেছি ওহীর মাধ্যমে তোমার নিকট এই কুরআন প্রেরণ করিয়া" (১২ঃ৩)।
এই আয়াতে” উত্তম বিবরণসমূহ" (the best of narrative = أَحْسَنَ الْقَصَصِ) হই ওহীর বর্ণনা যাহা কুরআন হিসাবে যোগাযোগযোগ্য। প্রকৃতপক্ষে আয়াতে উল্লিখিত শব্দ نَقُصُ )আমরা বর্ণনা করি) এবং أَوْحَيْنَا )আমরা ওহী প্রেরণ করি) শব্দ দুইটি মোটামুটি একই পরিধিযুক্ত।
(ছয়) একই বাস্তবতায় আয়াতসমূহে কুরআনের ওহীই বর্ণিত এবং কেবল কুরআনের সাধারণ বর্ণনা নহে, বরং এই কুরআনের বিভিন্ন ঘটনা ও বিষয়ের সংবাদ/বর্ণনা সম্বলিত।
تِلْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهَا إِلَيْكَ... (١1 : ৪৯) "এই সমস্ত অদৃশ্যলোকের সংবাদ আমি তোমাকে ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি" (১১:৪৯)।
ذَلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ... (১২ : ১০২) "ইহা অদৃশ্যলোকের সংবাদ-যাহা তোমাকে আমি ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি" (১২: ১০২)।
(সাত) সর্বশেষ, তবে কম গুরুত্বপূর্ণ নহে যে, কুরআন রাসূলুল্লাহ-এর নিজের রচনা নহে এবং ইহা তাহার জন্য কোন গুরুতর পাপকাজ হইবে যদি তিনি ইহাকে আল্লাহর বাণী হিসোবে ঘোষণা করেন-যাহা তাঁহার প্রতি অবতীর্ণ করা হয় নাই।
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ قَالَ أُوحِيَ إِلَيَّ وَلَمْ يُوحَ إِلَيْهِ شَيْئً وَمَنْ قَالَ سَأُنْزِلُ مِثْلَ مَا أَنْزَلَ اللهُ ... (২ : ৯৩) "যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে কিংবা বলে, আমার নিকট ওহী হয়, যদিও তাহার প্রতি নাযিল হয় না এবং সে বলে, আল্লাহ যাহা নাযিল করিয়াছেন আমিও উহার অনুরূপ নাযিল করিব-তাহার চেয়ে বড় যালিম আর কে আছে” (৬ঃ ৯৩)!
উপরে উদ্ধৃত আয়াতসমূহে কুরআনিক ওহীর বর্ণনা দেওয়া হইয়াছেঃ (ক) ইহা কতিপয় সুনির্দিষ্ট মূলপাঠ যাহা উদ্ধৃত করা হইয়াছে; (খ) উহা এমন এক গ্রন্থ যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে এবং যাহা আল্লাহ্ বাণী (কালিমাতিহি); (গ) ইহা আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করা হইয়াছে; (ঘ) রাসূলুল্লাহ দ্রুত পুনরাবৃত্তি করার আগে ওহী মনোযোগ দিয়া শুনিতেন; (ঙ) কোন কোন সময় ওহী
'বর্ণনা' এবং "প্রতিবেদন" সম্বলিত হইত; (চ) এই ওহী রাসূলুল্লাহ নিজের রচনা নহে। রাসূলের জন্য ইহা হইতে অধিক গুরুতর কোন পাপ হইত না যদি তিনি কোন পাঠ নিজে তৈরি করিয়া ইহা আল্লাহ্ বলিয়া ঘোষণা করিতেন। সকল ঘটনা বর্ণনায় নির্ভুলভাবে গ্রন্থের মূল পাঠ সংক্রান্ত বিষয়ে এবং শাব্দিক যোগাযোগের বিষয়ে জোর দেওয়া হইয়াছে এবং সকল ধারণাগত যোগাযোগ সম্পর্কে অথবা চিন্তা-ভাবনাগত বিষয়ে জোর দেওয়া হয় নাই, সর্বোপরি ওহীকে “পরামর্শ", "প্রণোদনা", "উদ্বুদ্ধকরণ" "অনুভূতি" ইত্যাদি বলা হয় নাই।
এই ঘটনাবলী কেবল ঐ ধরনের আয়াতসমূহ হইতে উদ্ধৃত করা হইয়াছে যেইগুলি 'ওহী' পরিভাষা সম্বলিত (ইহার বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারের পদ্ধতি অনুযায়ী)। যেমন রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে যোগাযোগ সংক্রান্ত ঘটনাবলী। যাহা হউক, এই আয়াতসমূহ অত্যন্ত জোরালোভাবে সম্পূরক এবং সত্য বলিয়া দৃঢ়ভাবে সমর্থনকারী অসংখ্য আয়াত দ্বারা সমর্থিত হইয়াছে। এই আয়াতগুলিও একই বিষয় আলোচনা করিয়াছে, কিন্তু ওহী পরিভাষাটি ব্যবহার করে নাই এবং সুস্পষ্টভাবে এই বিষয়টি দেখাইয়াছে যে, কুরআন রাসূলুল্লাহ-এর নিকট আক্ষরিক এবং সুনির্দিষ্ট মূল পাঠ আকারে অবতীর্ণ হইয়াছে। এই সকল আয়াত পরবর্তী সময়ে ওয়াট-এর ধারণাসমূহের উপর আলোচনার সময় পর্যালোচনা করা হইবে। তখন ইহা দেখা যাইবে যে, ওয়াট তাহার নিজস্ব ধারায় এই বিষয়টিতেই বেল্-এর ধারণা প্রমাণ করার চেষ্টা করিয়াছেন। যাহা হউক, উপরের আলোচনা হইতে ইহা সুস্পষ্ট যে, বেল্-এর বিভ্রান্তি ও ভুল-ভ্রান্তি নিম্নোক্ত বিষয়ে ধরা পড়িয়াছে:
(ক) কুরআনের পরিভাষার সাধারণ ব্যবহারের উপর তাহার মনোযোগ নিবদ্ধ হওয়া; (খ) তিনি এই কথা প্রকাশ করিতে ব্যর্থ হন যে, যে অর্থ তিনি নির্দেশ করিয়াছেন তাহা বক্তব্যের ধারণা বা অর্থ যথাযথভাবে প্রকাশ করে না, এমনকি তিনি যে বিষয় উদ্ধৃত করিয়াছেন সেই বিষয়েও নহে (অর্থাৎ দুনিয়ার প্রতি ওহী অবতরণ বিষয়ে); (গ) তাহার এই পরিভাষা সাধারণ ধারণার বা অর্থ ও পারিভাষিক অর্থের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করিতে না পারা; (ঘ) তাহার একদিকে কুরআনের ওহী এবং অপরদিকে রাসূলুল্লাহ-এর প্রতি অবতারিত কুরআন বহির্ভূত আরেক ধরনের ওহীর মধ্যে পার্থক্য চিহ্নিত করিতে না পারা; (ঙ) তিনি ঐসব আয়াতের যথাযথ বিশ্লেষণ করিতে পারেন নাই যে সব আয়াতে ওহী পরিভাষাটি ব্যবহৃত হইয়াছে এবং রাসূলুল্লাহ-এর উপর কুরআনের অবতরণের কথা বলা হইয়াছে এবং সর্বশেষ (চ) তিনি অনুরূপ বিষয়ের বহু সংখ্যক আয়াত বিবেচনায় আনেন নাই যেসব আয়াতে ওহী পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয় নাই কিন্তু 'ওহী' শব্দটি ছাড়া অন্য শব্দ প্রয়োগ ও ব্যবহার করিয়া কুরআনের 'ওহীর' প্রকৃতি সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে বিশদ বলা হইয়াছে।
উপসংহারে বলা যায়, কেহ বিশ্বাস করুক বা না করুক, কুরআন আল্লাহ্ বাণী। কিন্তু যদি কেহ কুরআনের উদাহরণের উপর ভিত্তি করিয়া ইহার প্রকৃত মতামত ঘোষণা করার চেষ্টা করে
তাহা হইলে তাহাকে ইহার উদাহরণসমূহের সার্বিক বিষয় বিবেচনায় আনিতে হইবে এবং নিজেকে কেবল ঐ সব বিষয়ের দ্বারা সন্তুষ্ট করা উচিত হইবে না যাহা যথাযথ নহে। এবং আরও বলা যায়, “স্বভাবজাত” ধারণার যে কোন বক্তব্য অথবা বর্ণনা গ্রহণ করার পরিবর্তে বিকৃতি সাধন বা ভুল অর্থ করা উচিত নহে।

ইহা এক সাধারণ জ্ঞানের বিষয় যে, কুরআনের সত্তর-এরও অধিক স্থানে ওহী শব্দটি (ইহার ভিন্ন ভিন্ন শব্দরূপ অনুযায়ী) উল্লিখিত হইয়াছে। কুরআনের মূল পাঠ ও বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে ওহী শব্দটি বিস্তৃত বহুমুখী অর্থ ও ধারণা বহন করে, ইহা অত্যন্ত স্বাভাবিক। প্রত্যেক ভাষায়ই কতগুলি বিশেষ শব্দ রহিয়াছে, যে শব্দের প্রত্যেকটি বহুমুখী অর্থে ব্যবহৃত হয়। কোন কোন সময় এমনও হয় যে, পরিবেশ-পরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিকতা অনুসারে একটি শব্দ সরাসরি অন্য শব্দের বিপরীতমুখী অর্থ প্রকাশ করে। এই ধরনের অবস্থায় একটি শব্দের নির্দিষ্ট অর্থ বাহির করা সহজসাধ্যও নহে, এমনকি সম্ভবত প্রত্যাশিতও নহে অথবা এমন অর্থ নিশ্চিত করা যাহা সকল প্রেক্ষিত ও অবস্থায় ইহার ব্যবহারের সঙ্গে যথার্থ হইবে। বেল্ ওহীর পরিভাষা সম্পর্কে ঐ রকম কিছু প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন। তিনি কুরআনের কতিপয় আয়াতের উদাহরণ উল্লেখ করেন যেসব আয়াতে ঐ ধরনের শব্দ দৃষ্ট হয়, যেমন মধু মক্ষিকার প্রতি ওহী, এক শয়তানের অন্য শয়তানের প্রতি ওহী, পৃথিবীর প্রতি ওহী ইত্যাদি। এবং পরে তিনি বলেন, এই সকল উদাহরণের ভিত্তিতে ওহী পরিভাষার শুদ্ধ ইংরেজী রূপান্তর হওয়া উচিত “পরামর্শ”, “প্রণোদনা” অথবা “উদ্বুদ্ধকরণ”।

কুরআন সম্পর্কে যাহাদের মোটামুটি জ্ঞান আছে তাহাদের সকলের নিকট ইহা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হওয়া উচিত যে, কুরআনের শব্দ ব্যবহার রীতি সম্পর্কে বেল্-এর জরিপ কোনভাবেই বুদ্ধিমত্তাপূর্ণও নহে, এমনকি বস্তুনিষ্ঠও নহে। তিনি তাহার আলোচনার মূল বিষয়ের সহায়তার জন্য এমন কিছু আয়াত নির্বাচন করিয়াছেন, যে ক্ষেত্রে সেই শব্দটি মূল পাঠের শাব্দিক যোগাযোগের অর্থ বুঝায় না। এইজন্য সে বিষয়টি তিনি "পরিহার" করার ইচ্ছায় স্বীকার করিয়া লইয়াছেন, সেই ক্ষেত্রেও ঐ ধারণা একটি "স্বাভাবিক" বিষয়। ইহার পরেও তিনি তাহার বক্তব্যে যে অর্থ উপস্থাপন করিয়াছেন সেই অর্থ তাহার উদ্ধৃত দৃষ্টান্তের ব্যাপারে যথেষ্টও নহে এবং যথাযথও নহে। তদ্রূপ রাসূলুল্লাহ-এর উপর ওহী নাযিলের দৃষ্টান্ত যাহাকে তিনি বাস্তব আচরণের দিক বলেন, যাহা প্রথমেই বর্ণিত হইয়াছে, এই পরিভাষার অর্থ সেই রকমই হওয়া উচিত যেমন আদেশ অথবা নির্দেশনা এবং কেবল পরামর্শ অথবা প্রণোদনার অর্থ নহে। আরও বলা যায় যে, 'ইব্রা' সূরায় ওহী শব্দটি দৃষ্ট হয় না। কিন্তু বেল্ নিজে এই সূরা 'ইকরা'-কে ওহীর অংশ হিসাবে স্বীকার করেন এবং এইখানে ওহীর অর্থ (অর্থাৎ 'ইকরা'র অর্থ করেন আদেশ, পরামর্শ নহে। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় যে, পৃথিবীকে প্রেরিত শেষ বিচারের দিন সম্পর্কিত ওহীর অর্থ পরামর্শ অথবা প্রণোদনা হইতে পারে। প্রকৃতপক্ষে রিচার্ড বেল্ এই বলিয়া একটি ভুল করেন যে, পৃথিবী (মাটি) ইহার মধ্যস্থ মরদেহগুলি বাহির করিয়া দিতে প্রণোদিত হইবে-৯৯৪ ৪-৫ আয়াতের অর্থ, "ঐ দিন সে ইহার বিষয়গুলি সম্পর্কে বলিতে থাকিবে। কারণ তোমার প্রভু ইহার নিকট ওহী প্রেরণ করিবেন"। এইখানে সুস্পষ্ট অর্থ এই যে, আল্লাহ্ পৃথিবীকে আদেশ করিবেন, একই সাথে পৃথিবীকে ইহার বিষয়গুলি সম্পর্কে কথা বলার ক্ষমতাও দান করিবেন। এইখানে ওহী দ্বৈত অর্থ বহন করে। প্রত্যেকেরই এই কথা জানা আছে যে, পৃথিবী বর্তমানে যে অবস্থায় আছে তাহাতে ইহার কথা বলার ক্ষমতা নাই এবং কেবল কোন পরামর্শ অথবা প্রণোদনা ইহাকে কথা বলাইতে পারিবে না। এই ক্ষেত্রে বেল্-এর জরীপের বাহিরে কেবল একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যাইতে পারে, "ঐগুলি অদৃশ্য সংবাদের মধ্য হইতে কতিপয় বিষয় যাহা আমি তোমাকে ওহীর মাধ্যমে জ্ঞাত করিয়াছি"। ৩:৪৪ ... ذلك مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوْحِيه اليْك। ২৮ এইখানে 'ওহী' পরিভাষাটির সুস্পষ্ট অর্থ হইল, কতিপয় বিষয় সম্পর্কে যোগাযোগ অর্থবা তথ্যগত বর্ণনা অদৃশ্য (অজ্ঞাত) বিষয় সম্পর্কে এবং ইহা কোনক্রমেই অজ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া অথবা উদ্বুদ্ধ করা নহে।

অথচ বেল্ কর্তৃক কথিত অর্থ বর্ণিত বিষয়ের সঠিক ধারণা যথাযথভাবে এবং পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করে না, যদিও উদাহরণস্বরূপ তিনি ইহার দৃষ্টান্তসমূহ উল্লেখ করিয়াছেন। বাস্তবিকপক্ষে যদি আরবী 'ওহী' শব্দের তুল্য ইংরেজী শব্দের প্রয়োজন হয়, তাহা হইলে পরামর্শ, প্রণোদনা ইত্যাদি শব্দের চাইতে এই শব্দ হওয়া উচিত "যোগাযোগ" (Communication)। এই শব্দটি সকল অবস্থায় যথাযথ হইবে।

যে সময় 'হইতে ওহী শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন বিষয় ও পরিস্থিতি বুঝাইতে, ইহার দ্বারা কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের অর্থ বুঝাইতে হইলে ইহার ব্যবহার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে

একমাত্র ঐ নির্দিষ্ট বিষয়েই ব্যবহার করিতে হইবে। ঐ বিষয়ের ভিত্তিতে ইসলাম ধর্মীয় আলাপ-আলোচনায় ওহী পরিভাষাটি কেবল আল্লাহ তাঁহার প্রেরিত নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে যোগাযোগের বিষয় বুঝাইতে প্রযোজ্য। অন্য কথায় বলা যায়, ওহী শব্দটির পারিভাষিক অর্থ ইহার সাধারণ অর্থ হইতে পৃথক। ইহার অর্থ আল্লাহ্র সঙ্গে তাঁহার রাসূলগণের যোগাযোগ এবং তদ্রূপ ইংরেজী শব্দ Communication। ওহীর অর্থ যোগাযোগের কাজ অথবা যোগাযোগের পদ্ধতি —এই উভয়টিই (ক্রিয়া অনুযায়ী) হইতে পারে এবং অনুরূপভাবে যাহা যোগাযোগ স্থাপন করে (অর্থাৎ যোগোযোগের বিষয়বস্তু)। এইভাবে ওহী শব্দটি ইহার যোগাযোগের ধরন অথবা পদ্ধতির বিভিন্ন প্রকারভেদ ব্যবহার হইতে পারে। এমনকি বিষয়বস্তুর প্রকৃতিভেদে ব্যবহারবিধি ভিন্নও হইতে পারে।

উপরোল্লিখিত পবিত্র কুরআনের ৪২: ৫১ আয়াতে রাসূলগণের নিকট ওহী আগমনের ধরন অথবা পদ্ধতি সম্পর্কে বলা হইয়াছে। এই আয়াত তিনটি পদ্ধতি নির্দেশ করে, এই পদ্ধতিতেই আল্লাহর বাণী তাঁহার নির্বাচিত ব্যক্তির নিকট পৌঁছায়। যেমন পদ্ধতি ৩টি এইঃ (ক) প্রত্যক্ষ ওহীর মাধ্যমে, (খ) পর্দার আড়াল হইতে এবং (গ) দূত প্রেরণের মাধ্যমে ফেরেশতা জিবরীল (আ)-এর মাধ্যমে যিনি "আল্লাহ্র আদেশ ও আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী যোগাযোগ (Communication) করেন"। ইহা লক্ষ্য করা যাইতে পারে যে, প্রথম পদ্ধতির ওহীর ধরনের কথা এখানে আর বিস্তারিত বলা হয় নাই। সুস্পষ্টভাবে ইহার মধ্যে অপর দুইটি পদ্ধতি ছাড়া বাকী সকল পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ -এর বর্ণনা অনুযায়ী, ওহী কোন কোন সময় তাঁহার নিকট ঘন্টাধ্বনির মত প্রতিধ্বনিত হইয়া )صلصلة الجرس( আসিত এবং ইহা এমন একটি পদ্ধতি ছিল যাহা তাঁহার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হইত। ২৯ এই পদ্ধতিকেই প্রথম পদ্ধতি হিসাবে আখ্যায়িত করা যাইতে পারে। ওহীর দ্বিতীয় পদ্ধতির একটি উদাহরণ হযরত মূসা (আ)-এর সঙ্গে আল্লাহ্ কথোপকথনের ঘটনা, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আ)-এর দৃষ্টির আড়ালে থাকিয়া কথা বলেন। ওহী অবতরণের তৃতীয় পদ্ধতি, স্বব্যাখ্যা প্রদানযোগ্য বিষয় এবং এই পদ্ধতি নিউ টেস্টামেন্টে উল্লেখ করা হইয়াছে।

অনুরূপভাবে যোগাযোগের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করিয়া ওহী বিভিন্ন ধরনের হইতে পারে এবং এই বিভিন্ন পদ্ধতি বিষয়বস্তু অনুযায়ী হয়। ওহীর একমাত্র বিশেষ পদ্ধতিতে বাইবেল বিন্যস্তকৃত অথবা পঠন (Recitation) পদ্ধতি হইতে )وَحَى مَتْلُو( কুরআন বিন্যস্ত (কুরআন( অনুরূপ হযরত মূসা (আ)-কে যখন বাস্তব জীবনের একটি আচরণ অনুসরণ করিতে বলা হয়, যেমন তাঁহার লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করা, উহা অবশ্যই ওহী ছিল, কেবল তাওরাত নহে। উহা একমাত্র তাহাই যাহা সুনির্দিষ্টভাবে তাওরাত হিসাবে যোগাযোগযোগ্য ছিল এবং উহা তাওরাতই ছিল। তেমনি অনেক ধরনের ওহী কেবল হযরত মুহাম্মাদ -এর নিকট আসিয়াছে, যাহা কুরআন হিসাবে যোগাযোগযোগ্য এবং তাহা কেবল কুরআনই এবং এই পদ্ধতির

ওহীকেই 'কুরআনিক ওহী' বলা হয়। এই কারণে যে, যখন কুরআনের প্রতিটি শব্দ সন্দেহতীতভাবে ওহী। তবে হযরত মুহাম্মাদ -এর নিকট আগত প্রতিটি ওহীই কুরআন নহে। তাঁহার প্রতি অবতারিত এই ধরনের অনেক কুরআন বহির্ভূত ওহীর উদাহরণ রহিয়াছে, যেমন হাদাছে কুদ্‌সী, রাসূলুল্লাহ-এর হিজরতের স্থানের ধরন সম্পর্কে স্বপ্নে তাঁহাকে জানানো সংক্রান্ত ওহী ইত্যাদি।

উপরের আলোচনা হইতে ইহা পরিষ্কার হওয়া উচিত যে, কুরআনিক ওহীর ধরন বুঝিতে হইলে আমাদের মনোযোগ কেবল কুরআনের সেই আয়াতের প্রতি নিবদ্ধ করা দরকার যে, আয়াতে ওহীকে 'রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে আল্লাহ্র যোগাযোগ' বলা হয় এবং সেই আয়াতসমূহ নহে যে আয়াতে ওহী পরিভাষাটি ইহার সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে বলিয়া দৃষ্ট হয়। যদি আমরা এইরূপ করি তাহা হইলে দেখা যাইবে যে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আয়াতে রাসূলুল্লাহ-এর নিকট কুরআন অবতরণের কথা বলা হইয়াছে এবং সেই সকল আয়াতে সুনির্দিষ্টভাবে ওহী পরিভাষাটিও ব্যবহৃত হইয়াছে। ইহা ছাড়া এমন অনেক সংখ্যক আয়াত রহিয়াছে যেইগুলিতে রাসূলুল্লাহ -এর নিকট কুরআন আগমন সম্পর্কে বলা হইয়াছে, কিন্তু ওহী পরিভাষাটি ব্যবহার করে নাই। প্রকৃতপক্ষে ঐগুলি পরবর্তী সময়ে নাযিলকৃত আয়াত, সে সব আয়াত কুরআনের ওহীর ধরন সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা সম্বলিত।

পবিত্র কুরআনের প্রায় ৪০টি আয়াতে ওহী পরিভাষাটি রাসূলুল্লাহ -এর নিকট ওহী নাযিল সম্পর্কিত বর্ণনায় ব্যবহৃত হইয়াছে। পক্ষান্তরে এই সকল আয়াতের বেশীরভাগে কুরআনের ওহীর ধরন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত নাই। অন্ততপক্ষে এক ডজন আয়াত ওহীর ধরন সম্পর্কিত ব্যাখ্যা সম্বলিত। এইসব আয়াত পর্যালোচনা করিয়া নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত পৌছা যায়:

(এক) স্বয়ং কুরআন ওহী এবং অন্য কিছু নহে, যাহা আবৃত্তি/পঠিত হয়। كَذَلِكَ أَرْسَلْتُكَ فِي أُمَّةٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهَا أُمَمٌ لِتَتْلُوا عَلَيْهِمُ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ....

"এইভাবে আমি তোমাকে পাঠাইয়াছি এক জাতির প্রতি যাহার পূর্বে বহু জাতি গত হইয়াছে, উহাদিগের নিকট আবৃত্তি করিবার জন্য, যাহা আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করিয়াছি” (১৩: ৩০)।

এইখানে পরিষ্কার ইঙ্গিত আছে যে, ইহা ঐ ধরনের ওহী যাহা পঠিত বিষয়। উহার অর্থ এই যে, ইহা পাঠযোগ্য বিষয়ের আঙ্গিকে বিদ্যমান এবং ইহা কেবল একটি পরামর্শ নহে যাহা কার্যে পরিণত করা হয় এবং ইহা সম্পূর্ণ নির্ভুল ও স্পষ্ট। কারণ এই ধরনের ওহী তিলাওয়াত করা হয় এবং পড়া হয়, ইহার অপর নাম কুরআন, পাঠ করা অথবা আবৃত্তি করার বস্তু।

(দুই) ইহা একটি ধর্মগ্রন্থ (পুস্তক), যাহা ওহী করা হইয়াছে অর্থাৎ ওহীর মাধ্যমে আসিয়াছে এবং যাহা পাঠযোগ্য।

وَاتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنْ كِتَابِ رَبِّكَ لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَتِهِ... (۲۷ : ۱۸) “তুমি তোমার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট তোমার প্রতিপালকের কিতাব হইতে আবৃত্তি কর। তাঁহার বাক্য পরিবর্তন করিবার কেহই নাই” (১৮: ২৭)।

أَتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الكتب... (٤٥ : ۲۹) "তুমি তোমার প্রত্যাদিষ্ট কিতাব হইতে আবৃত্তি কর” (২৯: ৪৫)।

وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ مِنَ الكتب هُوَ الْحَقُّ... (٣٥ : ٣١) "আমি তোমার প্রতি যে কিতাব অবতীর্ণ করিয়াছি তাহা সত্য" (৩৫: ৩১)।

এইভাবে যে বক্তব্যের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ -এর সঙ্গে যোগাযোগ (ওহীর মাধ্যমে) করা হয়, তাহা একটি গ্রন্থ। এমন নহে যে, তাঁহাকে একটি পুস্তক রচনার পরামর্শ দেওয়া হইয়াছিল। ইহাও উল্লেখ্য যে, এই সূরার প্রথম আয়াতে কুরআনের ওহীকে "আল্লাহর কথা" (কালিমাতিহি = كلمته) বলা হইয়াছে। জোর দিয়া বলা হইয়াছে যে, তাঁহার কথা পরিবর্তন করার শক্তি কাহারও নাই।

(তিন) যাহা ওহী করা হইয়াছে তাহা "পঠিত, পাঠযোগ্য/আবৃত্তি-কুরআন" এবং ইহা এক বিশেষ ভাষাশৈলীর মাধ্যমে।

وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ قُرْآنًا عَرَبِيًّا ... (٤٢ : ٧) "এইভাবে আমি তোমার প্রতি কুরআঁন অবতীর্ণ করিয়াছি আরবী ভাষায়" (৪২ঃ ৭)।

এইভাবে "পঠিত/ আবৃত্তিকৃত” বর্ণনা রাসূলুল্লাহ -এর নিকট ওহী করা হইয়াছে, এমন নহে যে, পাঠযোগ্য কিছু রচনা করার জন্য তাহাকে ওহী করা হইয়াছে।

(চার) রাসূলুল্লাহ প্রথমে শুনিয়া লইতেন তাঁহার নিকট কী ওহী করা হইল? ওহীর মাধ্যমে যোগাযোগ সমাপ্ত হওয়ার পূর্বে তিনি ইহা পুনরাবৃত্তি/আবৃত্তি করার জন্য তাড়াহুড়া করিতেন না।

وَلَا تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يُقْضَى إِلَيْكَ وَحْيُهُ... (١٩٤ : ٢٠) "তোমার প্রতি আল্লাহ্ ওহী সম্পূর্ণ হইবার পূর্বে কুরআন পাঠে তুমি ত্বরা করিও না" (২০: ১১৪)।

(পাঁচ) উহা কুরআনিক ওহী এবং কেবল সাধারণ কুরআন (পাঠযোগ্য) নহে, ইহা বর্ণনা/ বিবরণ সম্বলিত।

نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ بِمَا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ هَذَا الْقُرْآنَ... (১২ : ৩) "আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করিতেছি ওহীর মাধ্যমে তোমার নিকট এই কুরআন প্রেরণ করিয়া" (১২ঃ৩)।

এই আয়াতে” উত্তম বিবরণসমূহ" (the best of narrative = أَحْسَنَ الْقَصَصِ) হই ওহীর বর্ণনা যাহা কুরআন হিসাবে যোগাযোগযোগ্য। প্রকৃতপক্ষে আয়াতে উল্লিখিত শব্দ نَقُصُ )আমরা বর্ণনা করি) এবং أَوْحَيْنَا )আমরা ওহী প্রেরণ করি) শব্দ দুইটি মোটামুটি একই পরিধিযুক্ত।

(ছয়) একই বাস্তবতায় আয়াতসমূহে কুরআনের ওহীই বর্ণিত এবং কেবল কুরআনের সাধারণ বর্ণনা নহে, বরং এই কুরআনের বিভিন্ন ঘটনা ও বিষয়ের সংবাদ/বর্ণনা সম্বলিত।

تِلْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهَا إِلَيْكَ... (١1 : ৪৯) "এই সমস্ত অদৃশ্যলোকের সংবাদ আমি তোমাকে ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি" (১১:৪৯)।

ذَلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ... (১২ : ১০২) "ইহা অদৃশ্যলোকের সংবাদ-যাহা তোমাকে আমি ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি" (১২: ১০২)।

(সাত) সর্বশেষ, তবে কম গুরুত্বপূর্ণ নহে যে, কুরআন রাসূলুল্লাহ-এর নিজের রচনা নহে এবং ইহা তাহার জন্য কোন গুরুতর পাপকাজ হইবে যদি তিনি ইহাকে আল্লাহর বাণী হিসোবে ঘোষণা করেন-যাহা তাঁহার প্রতি অবতীর্ণ করা হয় নাই।

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ قَالَ أُوحِيَ إِلَيَّ وَلَمْ يُوحَ إِلَيْهِ شَيْئً وَمَنْ قَالَ سَأُنْزِلُ مِثْلَ مَا أَنْزَلَ اللهُ ... (২ : ৯৩) "যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে কিংবা বলে, আমার নিকট ওহী হয়, যদিও তাহার প্রতি নাযিল হয় না এবং সে বলে, আল্লাহ যাহা নাযিল করিয়াছেন আমিও উহার অনুরূপ নাযিল করিব-তাহার চেয়ে বড় যালিম আর কে আছে” (৬ঃ ৯৩)!

উপরে উদ্ধৃত আয়াতসমূহে কুরআনিক ওহীর বর্ণনা দেওয়া হইয়াছেঃ (ক) ইহা কতিপয় সুনির্দিষ্ট মূলপাঠ যাহা উদ্ধৃত করা হইয়াছে; (খ) উহা এমন এক গ্রন্থ যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে এবং যাহা আল্লাহ্ বাণী (কালিমাতিহি); (গ) ইহা আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করা হইয়াছে; (ঘ) রাসূলুল্লাহ দ্রুত পুনরাবৃত্তি করার আগে ওহী মনোযোগ দিয়া শুনিতেন; (ঙ) কোন কোন সময় ওহী

'বর্ণনা' এবং "প্রতিবেদন" সম্বলিত হইত; (চ) এই ওহী রাসূলুল্লাহ নিজের রচনা নহে। রাসূলের জন্য ইহা হইতে অধিক গুরুতর কোন পাপ হইত না যদি তিনি কোন পাঠ নিজে তৈরি করিয়া ইহা আল্লাহ্ বলিয়া ঘোষণা করিতেন। সকল ঘটনা বর্ণনায় নির্ভুলভাবে গ্রন্থের মূল পাঠ সংক্রান্ত বিষয়ে এবং শাব্দিক যোগাযোগের বিষয়ে জোর দেওয়া হইয়াছে এবং সকল ধারণাগত যোগাযোগ সম্পর্কে অথবা চিন্তা-ভাবনাগত বিষয়ে জোর দেওয়া হয় নাই, সর্বোপরি ওহীকে “পরামর্শ", "প্রণোদনা", "উদ্বুদ্ধকরণ" "অনুভূতি" ইত্যাদি বলা হয় নাই।

এই ঘটনাবলী কেবল ঐ ধরনের আয়াতসমূহ হইতে উদ্ধৃত করা হইয়াছে যেইগুলি 'ওহী' পরিভাষা সম্বলিত (ইহার বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারের পদ্ধতি অনুযায়ী)। যেমন রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে যোগাযোগ সংক্রান্ত ঘটনাবলী। যাহা হউক, এই আয়াতসমূহ অত্যন্ত জোরালোভাবে সম্পূরক এবং সত্য বলিয়া দৃঢ়ভাবে সমর্থনকারী অসংখ্য আয়াত দ্বারা সমর্থিত হইয়াছে। এই আয়াতগুলিও একই বিষয় আলোচনা করিয়াছে, কিন্তু ওহী পরিভাষাটি ব্যবহার করে নাই এবং সুস্পষ্টভাবে এই বিষয়টি দেখাইয়াছে যে, কুরআন রাসূলুল্লাহ-এর নিকট আক্ষরিক এবং সুনির্দিষ্ট মূল পাঠ আকারে অবতীর্ণ হইয়াছে। এই সকল আয়াত পরবর্তী সময়ে ওয়াট-এর ধারণাসমূহের উপর আলোচনার সময় পর্যালোচনা করা হইবে। তখন ইহা দেখা যাইবে যে, ওয়াট তাহার নিজস্ব ধারায় এই বিষয়টিতেই বেল্-এর ধারণা প্রমাণ করার চেষ্টা করিয়াছেন। যাহা হউক, উপরের আলোচনা হইতে ইহা সুস্পষ্ট যে, বেল্-এর বিভ্রান্তি ও ভুল-ভ্রান্তি নিম্নোক্ত বিষয়ে ধরা পড়িয়াছে:

(ক) কুরআনের পরিভাষার সাধারণ ব্যবহারের উপর তাহার মনোযোগ নিবদ্ধ হওয়া; (খ) তিনি এই কথা প্রকাশ করিতে ব্যর্থ হন যে, যে অর্থ তিনি নির্দেশ করিয়াছেন তাহা বক্তব্যের ধারণা বা অর্থ যথাযথভাবে প্রকাশ করে না, এমনকি তিনি যে বিষয় উদ্ধৃত করিয়াছেন সেই বিষয়েও নহে (অর্থাৎ দুনিয়ার প্রতি ওহী অবতরণ বিষয়ে); (গ) তাহার এই পরিভাষা সাধারণ ধারণার বা অর্থ ও পারিভাষিক অর্থের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করিতে না পারা; (ঘ) তাহার একদিকে কুরআনের ওহী এবং অপরদিকে রাসূলুল্লাহ-এর প্রতি অবতারিত কুরআন বহির্ভূত আরেক ধরনের ওহীর মধ্যে পার্থক্য চিহ্নিত করিতে না পারা; (ঙ) তিনি ঐসব আয়াতের যথাযথ বিশ্লেষণ করিতে পারেন নাই যে সব আয়াতে ওহী পরিভাষাটি ব্যবহৃত হইয়াছে এবং রাসূলুল্লাহ-এর উপর কুরআনের অবতরণের কথা বলা হইয়াছে এবং সর্বশেষ (চ) তিনি অনুরূপ বিষয়ের বহু সংখ্যক আয়াত বিবেচনায় আনেন নাই যেসব আয়াতে ওহী পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয় নাই কিন্তু 'ওহী' শব্দটি ছাড়া অন্য শব্দ প্রয়োগ ও ব্যবহার করিয়া কুরআনের 'ওহীর' প্রকৃতি সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে বিশদ বলা হইয়াছে।

উপসংহারে বলা যায়, কেহ বিশ্বাস করুক বা না করুক, কুরআন আল্লাহ্ বাণী। কিন্তু যদি কেহ কুরআনের উদাহরণের উপর ভিত্তি করিয়া ইহার প্রকৃত মতামত ঘোষণা করার চেষ্টা করে

তাহা হইলে তাহাকে ইহার উদাহরণসমূহের সার্বিক বিষয় বিবেচনায় আনিতে হইবে এবং নিজেকে কেবল ঐ সব বিষয়ের দ্বারা সন্তুষ্ট করা উচিত হইবে না যাহা যথাযথ নহে। এবং আরও বলা যায়, “স্বভাবজাত” ধারণার যে কোন বক্তব্য অথবা বর্ণনা গ্রহণ করার পরিবর্তে বিকৃতি সাধন বা ভুল অর্থ করা উচিত নহে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পাঁচ: আল্লাহকে চাক্ষুস দেখা সম্পর্কে বেল্-এর থিওরী

📄 পাঁচ: আল্লাহকে চাক্ষুস দেখা সম্পর্কে বেল্-এর থিওরী


পবিত্র কুরআনের ৫৩ : ১-১৮ (সূরা আন্-নাজম্)-এর বক্তব্য সম্পর্কে বেল্-এর ধারণা এই যে, রাসূলুল্লাহ প্রথমে দাবি করিয়াছিলেন যে, তিনি আল্লাহকে দেখিয়াছেন। ইহা মারগোলিয়থের ধারণার একটি বিশদ ব্যাখ্যা মাত্র। আর এই ধারণাটি সম্পূর্ণরূপে উক্ত আয়াতের ভুল ব্যাখ্যার উপর নির্ভরশীল এই আয়াতের দৃঢ় ও অন্তর্নিহিত অর্থ ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। ৩২ এইখানে বেল্-এর যুক্তি-তর্ক ও পর্যবেক্ষণসমূহ বিবেচনায় আনা হইল :
বেল্ সূরা আন্-নাজম-এর ৪ নং আয়াতের (عَلَمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى) অর্থ করিয়াছেন : "There taught him (or it) one strong in power".
"তাঁহাকে (অথবা ইহাকে) শিক্ষা দিয়াছেন একজন ক্ষমতায় শক্তিশালী"।
এই আয়াতের সরল অনুবাদ হওয়া উচিত : "Onestrong in power taught him".
"একজন ক্ষমতায় শক্তিশালী তাঁহাকে শিক্ষা দিয়াছেন"। আয়াতের অর্থ করার সময় বাক্যের শুরুতে "There" শব্দটি প্রবিষ্ট করার প্রয়োজন নাই। তিনি যাহা বলেন, তাহার বর্ণনার জন্য "দৃশ্য" শব্দটি পরবর্তী আরও দুইটি আয়াতে আসিয়াছে অর্থাৎ ৭-৯ নং আয়াতে। যাহা হউক, বেল-এর মূল যুক্তি সূরার ১০ নং আয়াতকে কেন্দ্র করিয়া বর্ণিত : فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى
তিনি মুসলিম ভাষ্যকারদের ব্যাখ্যা এই বলিয়া বাতিল করেন যে, আওহা (awha = أوحى) ক্রিয়ার কর্তা জিবরাঈল, পক্ষান্তরে 'আবদিহি (عبده=abdihi)-এর সহিত সংযুক্ত সর্বনাম আল্লাহকে নির্দেশ করে এবং ইহা একটি "ভাষার অস্বাভাবিক ব্যবহার"। তিনি স্বীকার করেন যে, কার্যত 'আবdihi শব্দের মধ্যে আল্লাহ্ সর্বনাম এবং পরে তিনি বলেন যে, ইহা এই অর্থ নির্দেশ করে যে, আল্লাহ্ শব্দটি ক্রিয়ার কর্তা এবং প্রকৃতপক্ষে সবকিছু অনুরূপভাবে বলা হইয়াছে। ৩৩
এই স্থানে এই বিষয়টি পরিষ্কার করিয়া বলা দরকার যে, ইহা ইংরেজীতে অসদৃশ, আরবী সর্বনামসমূহে সব সময় ইহা যথা পূর্ববর্তী শব্দের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নহে এবং একক বাক্যের সকল ক্রিয়ার ব্যাপারে একই উদ্দেশ্যের মধ্যে ধারণা করা যায় না। সর্বনামের এই ধরনের উদাহরণ আধুনিক আরবীতেও প্রচুর। এমকি ইংরেজীতেও এই বিশেষ ব্যাকরণগত নিয়ম সব সময় সঠিকভাবে পরিলক্ষিত হয় না এবং কোন বক্তব্যের অর্থ কেবল ইহার মূল পাঠের সম্পর্কের
মাধ্যমে এবং ঘটনাবলীর পটভূমি সম্পর্কিত জ্ঞানের মাধ্যমে যথাযথভাবে বোধগম্য হইতে পারে। ৩৪ যাহা হউক, যতদূর আরবী ভাষার সম্পৃক্ততা রহিয়াছে এই ক্ষেত্রে "ভাষার অস্বাভাবিক ব্যবহার" হয় নাই। প্রশ্নাধীন আয়াতে আওহা (awha=أوحى) ক্রিয়ার জন্য প্রশ্নাধীন একটি সর্বনাম এবং অপর একটি সর্বনাম 'আবদিহি (Abdihi = عبده) শব্দে রহিয়াছে।
প্রকৃতপক্ষে স্বাভাবিক অস্তিত্বের উল্লেখ যে ৫-৯ নং আয়াতে রহিয়াছে তাহা বর্ণনার ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে বুঝা উচিত, একমাত্র ১০ নং আয়াতের ভিত্তিতে নহে। এই বিষয়টি ৫-৬ নং আয়াতে এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে : "একজন ক্ষমতায় শক্তিশালী” এবং “জ্ঞানে ভূষিত (অথবা মানসিক ও শারীরিকভাবে যোগ্যতাসম্পন্ন)।" বেল্ নিজে স্বীকার করেন যে, ৬ নং আয়াতে 'মিরা' পরিভাষাটি 'ফিটনেস' (যোগ্যতা) অর্থে নেওয়া হইয়াছে, এই 'ফিটনেস' (যোগ্যতা) হয় শারীরিক অথবা জ্ঞান-বুদ্ধির দিক হইতে যোগ্যতা। ৩৫ যেমন ইতোপূর্বে ব্যাখ্যা করা হইয়াছে, ৩৬ এইসব বিশেষণ স্পষ্টতই বৈশিষ্টগতভাবে আপেক্ষিক। কোনরূপ কল্পনায়ও এইগুলিকে আল্লাহ্ গুণাবলী বলিয়া গ্রহণ করা যায় না। কুরআনের কোথায়ও আল্লাহকে এই ধরনের পরিভাষায় ও গুণাবলীর দ্বারা বর্ণনা করা হয় নাই। অপরদিকে ফেরেশতাদেরকে, অন্যান্যদের মত 'শাদীদ' এবং ইহার বহুবচন' শিদাদ' বিশেষণ দ্বারা বর্ণনা করা হইয়াছে। ৩৭ এইভাবে যদি এই বিষয় সম্পর্কিত হাদীছসমূহ এই আয়াতের আলোচনায় না আনাও হয় তাহা হইলে ইহার অভ্যন্তরীণ প্রমাণ নিশ্চিতভাবে যে কোন ধরনের প্রতিকূলে শক্তিসম্পন্ন হইয়া পড়িবে, যেক্ষত্রে অস্তিত্ব বলিতে আল্লাহকে বুঝানো হইয়াছে। ইহার বিপরীতে বর্ণনামূলক বাগ্বিধি মনে ধারণ করিয়া এবং এই বর্ণনাকে একই সূরার ১৮ নং আয়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করিলে যাহা তিনি দেখিয়াছেন, সেই সম্পর্কে এই আয়াত কথা বলে, যেমন- "তাঁহার প্রভুর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন," এবং প্রভু নিজে নহেন, অপরিহার্য অর্থ এই যে, কথিত অস্তিত্বশীল সত্তা হইল ফেরেশতা। পরবর্তীতে এই বিষয়টি কুরআনের ৮১ : ১৯-২৭ আয়াতের দ্বারা সুস্পষ্ট করা হইয়াছে, যে আয়াতসমূহ ইতোপূর্বে আলোচিত হইয়াছে। ৩৮ এই আয়াতসমূহ এই আলোচনার মধ্যে বিবেচনায় আনা দরকার। এই আয়াতে অস্তিত্বশীল সত্তা বলিতে "মহৎ দূত" বুঝানো হইয়াছে, যদিও তাঁহাকে একজন "ক্ষমতাশালী" (ذی قوة) সত্তা হিসাবেও বর্ণনা করা হইয়াছে। বেল্ পরামর্শ দেন যে, সূরা আন-নাজম-এর ১৮ নং আয়াত, ৮১ : ১৯-২৭ (সূরা আত-তাকবীর) নং আয়াত এবং ফেরেশতা জিবরাঈল সব কিছুই পরবর্তী পটভূমিকা হিসাবে বর্ণিত। কিন্তু যে পটভূমিতে এই ধারণাসমূহ তৈয়ার করা হইয়াছে, এই সব কিছুই অসমর্থনীয় যেমন শীঘ্রই দেখা যাইবে।
বেল্ তাহার ধারণা এমন বক্তব্যের দ্বারা সমর্থনযোগ্য করিতে চাহেন, যে বক্তব্যে রাসূলুল্লাহ এই দাবি করেন যে, তিনি আল্লাহকে দেখিয়াছেন, পরবর্তী সময়ে তিনি তাঁহার ভুল বুঝিতে পারেন এবং তিনি এই বক্তব্য সম্পর্কে আপত্তির মুখোমুখিও হন। এই ঘটনার প্রামাণ্যতার অভাবজনিত "অস্বস্তিকর" ও "আপত্তিকর” অবস্থার প্রেক্ষিতে বেল্ ১৭ : ৬০ (৬২) আয়াত উদ্ধৃত করেন যাহা বেল-এর অনুবাদ অনুযায়ী পাঠ করা যাইতে পারে : "আমরা এমন একটি দৃশ্য
(vision) প্রদর্শন করিয়াছিলাম যাহার মধ্যে আমরা তোমাকে মানুষের জন্য কেবল একটি পরীক্ষাস্বরূপ প্রদর্শন করিয়াছি"। ৩৯
বেল্ যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, এই আয়াত ইস্রা এবং মি'রাজের প্রতি ইঙ্গিত করে না যাহা ১৭: ১ আয়াতে পরোক্ষভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে, যেমন-মুসলিম ভাষ্যকারগণ ধারণা পোষণ করেন। কিন্তু সূরা আন-নাজ্য-এ "দৃশ্য" (vision)-এর বর্ণনা করা হইয়াছে। বেল্-এর মতে ১৭: ১ আয়াত কোন "দৃশ্য”-এর কথা বলে নাই। ৪০ যাহা হউক বেল্-এর এই যুক্তি সমর্থনযোগ্য নহে, ১৭: ১ আয়াত "দৃশ্য" (vision) সম্পর্কে বলে এবং এই "দৃশ্য”-কে আল্লাহ্ কতিপয় 'নিদর্শন' হিসাবে চিহ্নিত করে لِرِيهِ مِنْ آيَاتِنَا "এইভাবে আমরা অবশ্যই তাহাকে আমাদের নিদর্শনসমূহের মধ্যে কতিপয় নিদর্শন দেখাইব"। এমনিভাবে যুক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে বেল্ সূরা আন-নাজ্য-এর "দৃশ্য (vision) সম্পর্কে তাঁহার যে "অস্বস্তিকর” ও “আপত্তিকর" ধারণা বিনির্মাণ করেন তাহা ভুল।
বেল্-এর এই দুইটি ভুল ধারণার ভিত্তিতে আরও অগ্রসর হইয়া বলা যায়, যেমন একটি ভুল ধারণা এই যে, সূরা আন-নাজম-এ রাসূলুল্লাহ প্রথমে আল্লাহকে দেখার দাবি করিয়াছিলেন এবং ঐ দাবির ফলে "অস্বস্তিকর" ও "আপত্তিকর" পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছিল। বেল্ মনে করেন যে, রাসূলুল্লাহ পরবর্তী সময়ে তাঁহার অবস্থান সংশোধন করেন এবং এই সংশোধন সূরার ১১-১৮ নং আয়াতে প্রকাশিত হইয়াছে। বেল্ সূরার ১১ নং আয়াত مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى -এর এইভাবে অনুবাদ করেন: "The heart did not falsify what it saw". "অন্তর যাহা দেখে তাহা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না"। এবং তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ এইভাবে তাঁহার "আধ্যাত্মিক প্রকাশ"-এর ধারণা প্রদানের চেষ্টা করেন। ৪১
বেল্ পুনরায় সর্বনাম সম্পর্কে ভুল করিয়াছেন مَا رَأَى -এর ক্রিয়াপদের মধ্যস্থ সর্বনাম সন্দেহাতীতভাবে রাসূলুল্লাহ্, 'ইহা' নহে অর্থাৎ অন্তর নহে। স্বাভাবিক কারণ এই যে, ইহা বাস্তবিকভাবে এই ধারণা সৃষ্টিপূর্বক বলে না যে, অন্তর কখনও কোন কিছুকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না অর্থাৎ দৃশ্যকে উন্মোচিত করে মাত্র, যদি ইচ্ছার উপর জোর দিয়া বলা হইত যে, ইহা ছিল কেবল মানসিকভাবে দৃশ্য অবলোকন। ইহার বিপরীতে বলা হইয়াছে যে, যে সময় হইতে 'দৃশ্য' (ভিশন) অত্যন্ত বাস্তব ছিল, তখন ইহাকে জোর দিয়া বলা হইয়াছে যে, অন্তর ইহাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে নাই অর্থাৎ ইহা ভুল ধারণা ছিল না, এমনকি অবিমিশ্র ধারণাও নহে। তিনি যাহা দেখিয়াছেন তাহার দিক হইতে ইহা অলীক অস্তিত্বে বিশ্বাস নহে। রাসূলুল্লাহ্-এর দৃশ্য দর্শন (vision) রহস্যপূর্ণ নহে, তাঁহার এতদসংক্রান্ত বর্ণনা এইখানে কেবল বাস্তব অভিজ্ঞতাকেই জোরালো করিয়া তোলে। এই অর্থে رَأَى -এর মধ্যস্থিত সর্বনাম রাসূলুল্লাহ। ইহা ছিল একক ধরনের চাক্ষুস দর্শনের অভিজ্ঞতা, এই অভিজ্ঞতা পুনরায় ১৩ নং আয়াতে বর্ণিত হইয়াছে।
যাহা আর একটি "অবতরণের" কথা বলে। এবং পরবর্তী ১৭ নং আয়াতে সুনির্দিষ্টভাবে "بصر (চক্ষু) শব্দটি উল্লেখ করা হইয়াছে যাহা দেখার বা দর্শন করিবার একটি অঙ্গ। এইখানে যদি রহস্যপূর্ণ করার অথবা সংশোধন করার তাহার কোন ইচ্ছা থাকিত তাহা হইলে তথাকথিত সংশোধনী বিবৃতিতে দ্বিতীয় "অবতরণ অথবা চক্ষু"-র আদৌ উল্লেখ করিতেন না। অভিযোগে বর্ণিত সংশোধনী সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন এবং ১৩, ১৭, ও ১৮ নং আয়াত কোন কিছুকেই সংশোধন করে নাই।
তদুপরি যে বিষয়টি ইতোমধ্যে বর্ণনা করা হইয়াছে তাহা সূরা ৫৩ : ১-১৮ (আন-নাজম)-কে ৮১: ১৯-২৭ (সূরা আত-তাকবীর)-এর সঙ্গে যুগ্মভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত, যে আয়াত "সম্মানিত দূত” অর্থাৎ একজন ফেরেশতা সম্পর্কে বলিয়াছে, যিনি ওহী বহনকারী ছিলেন। ৪২ বেল্ পরামর্শ দান করেন যে, এই আয়াত দ্বারা ৫৩: ১-১৮ আয়াতের ব্যাখ্যাকে প্রভাবিত করার বিষয়টি মানিয়া নেওয়া উচিত নহে। তাহার এই পরামর্শ দানের কারণগুলি এই : (ক) মদীনার জীবনকাল শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত হযরত জিবরাঈলের উল্লেখ করা হইত না; (খ) যখন মক্কার অবিশ্বাসিগণ আপত্তি উত্থাপন করে, বেল্-এর মতে "একজন ফেরেশতাকে রাসূল হিসাবে পাঠানো উচিত ছিল অথবা অন্ততপক্ষে একজন ফেরেশতাকে যুগ্মভাবে তাঁহার (মুহাম্মাদের) সঙ্গে পাঠানো উচিত ছিল"। এই সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ -এর উত্তর ছিল, কোন ফেরেশতা প্রকৃতপক্ষে তাঁহার (রাসূলুল্লাহ্) নিকট ওহী লইয়া আসেন না, বরং তাঁহার পূর্ববর্তী রাসূলগণও মানুষই ছিলেন (১৬:৪৩); অথবা যদি একজন ফেরেশতা প্রেরণ করা হইত তাহা হইলে ঘটনার শেষ পর্যায়ে এবং তখন সেই ক্ষেত্রে কোন অবকাশ থাকিত না (৬:৮)। ৪৩ বেল্ পরবর্তী পর্যায়ে বলেন, ফেরেশতাদের "সম্পূর্ণ নূতন পরিমণ্ডল" রাসূলুল্লাহ -এর নিকট অনেক পরে "উন্মুক্ত হয়"। তিনি যেমন পছন্দ করেন, তেমন তিনি তাঁহার নূতন সৃষ্টিতে সংযোজন ঘটান। যেমন সম্ভাব্য বর্ণনা এই যে, “যে সৃষ্টির কথা বলা হইয়াছিল তাহা মুহাম্মাদ -এর নিকট নূতন ছিল"। ৪৪ এইভাবে যুক্তি প্রদর্শনের পর বেল উপসংহার টানিয়া বলেন, "৮১ নং সূরায় বর্ণিত দূত ফেরেশতা, ৫৩ নং সূরায় বর্ণিত দূত ফেরেশতার বর্ণনার পরবর্তী বর্ণনা এবং ইহার ব্যাখ্যাকে প্রভাবিত করার বিষয়টি অনুমোদন করা উচিত নহে”। ৪৫
এক্ষণে এই ক্ষেত্রে বেল্ তাহার সকল ধারণায় সম্পূর্ণ ভুল, যেমন- (ক) রাসূলুল্লাহ সূরা আন-নাজম তিলাওয়াতের পরবর্তী সময়ে ফেরেশতার অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত হন; (খ) মক্কার অবিশ্বাসিগণের একজন দূত ফেরেশতার দাবির প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা এবং (গ) এই রকম ধারণা করা যে, জিবরাঈল কেবল মদীনায় ওহী অবতরণকারী হিসাবে চিহ্নিত ছিলেন।
প্রথম ধারণা সম্পর্কে বলা যায় যে, ইহা যুক্তিতর্ক দ্বারা চূড়ান্তভাবে ভুল প্রমাণিত হইয়াছে, যাহা বেল্ নিজে তাঁহার অভিসন্দর্ভে স্বীকার করিয়াছেন। ঘটনা এই যে, মক্কাবাসী দূতরূপে একজন ফেরেশতা অথবা রাসূলের সঙ্গে একজন ফেরেশতাকে তাঁহার সহকারী হিসাবে দেখিতে চাওয়ায়
(প্রমাণিত হয় যে), মক্কার অবিশ্বাসীরা রাসূলুল্লাহ -এর কথা বাদ দিলেও ফেরেশতার অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত ছিল। প্রকৃতপক্ষে সূরা আন্-নাজম্-এর তিনটি স্থানে দেখা গিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ ফেরেশতাদের সম্পর্কে অবিশ্বাসীদের ভ্রান্ত ধারণা সংশোধন করার জন্য কথা বলিয়াছেন, চেষ্টা করিয়াছেন। অনুরূপ ২১ নং আয়াতে তাহাদের ভ্রান্ত ধারণা সম্পর্কে বলা হইয়াছে যেখানে তাহারা বলিয়াছিল যে, ফেরেশতারা আল্লাহ্র কন্যা। ৪৬ ২৬ নং আয়াতে বলা হইয়াছে যে, প্রকৃতপক্ষে জান্নাতে অনেক ফেরেশতা রহিয়াছেন, তাহাদের কোন সুপারিশ ফলপ্রসূ হয় না, যতক্ষণ আল্লাহ যাহার জন্য ইচ্ছা ও যাহাকে পছন্দ করেন তাহাকে অনুমতি না দেন। ৪৭ এবং ২৭ নং আয়াতে বর্ণনা করা হয় যে, "যাহারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাহারা ফেরেশতাদেরকে নারীবাচক নাম দিয়া থাকে”। ৪৮ মক্কায় প্রথমদিকে অবতীর্ণ কুরআনের এক বিরাট সংখ্যক সূরায় দেখানো হইয়াছে যে, ফেরেশতার অস্তিত্ব সম্পর্কিত জ্ঞান বা ধারণা আরবে সুবিদিত ছিল, বিশেষ করিয়া প্রাক-ইসলমী যুগ হইতে মক্কায়। ৪৯ অতএব ইহা সত্য হইতে অধিক দূরে এবং যুক্তির দিক হইতে অধিকতর ভ্রান্তিপূর্ণ যে, মুহাম্মাদের নিকট সূচিত হয় যে, ফেরেশতার অস্তিত্ব তাঁহার জীবনের পরবর্তী সময়ের ঘটনা।
অনুরূপভাবে বেল্ ১৬:৪৫ এবং ৬:৮ আয়াতসমূহের ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করেন যে, আয়াতগুলি অবিশ্বাসীদের এমন দাবির সঙ্গে সম্পৃক্ত যাহাতে অবিশ্বাসীরা দাবি করে যে, ফেরেশতা তাহাদের নিকট রাসূল হিসাবে প্রেরিত হইতে পারে। উপরিউক্ত আয়াত দ্বারা তাহাদের দাবিব উত্তর দেওয়া হইয়াছে। ইহা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই বিষয় লইয়া কুরআনের এই দুইটি আয়াতই কেবল আলোচনা করে না, এতসম্পর্কিত বিষয়ে কমপক্ষে আরও ১০টি আয়াতে আলোচনা রহিয়াছে। ৫০ এইসব আয়াতে বলা হইয়াছে যে, ফেরেশতা আছে কি না, একজন ফেরেশতা তাঁহার নিকট আল্লাহ্র বাণী লইয়া আসিয়াছিলেন কিনা, রাসূলুল্লাহ সেই প্রশ্ন পরিহার করেন ভাসা ভাসা দৃষ্টিতে। এইসব আয়াত লক্ষ্য করিলে বিষয়টি নির্ভুলভাবে পরিষ্কার হইয়া উঠিবে যে, অবিশ্বাসীদের দাবি তাহাদের দিক হইতে দুইটি ধারণাকে কেন্দ্র করিয়া উত্থাপিত হইয়াছে। তাহারা ইহা বিশ্বাস করিতে অস্বীকার করে যে, তাহাদের মত একজন মানুষ আল্লাহর রাসূল হইতে পারেন। তাহারা রাসূলুল্লাহকে এই বলিয়াও ব্যর্থ হিসাবে চিহ্নিত করিতে চাহে যে, যদি সত্যই একজন ফেরেশতা আল্লাহর বাণী তাঁহার নিকট নাযিল করিয়া থাকেন তাহা হইলে ফেরেশতা রাসূলের নিকট আগমন না করিয়া তাহাদের নিকট আসিলেন না কেন? অথবা অন্ততপক্ষে মুহাম্মাদ -এর সঙ্গে একজন সহ-সতর্ককারী প্রেরিত হইলেন না কেন? ইহা বলা আবশ্যক যে, মক্কার অবিশ্বাসীরা তাহাদের প্রতি একজন ফেরেশতা দূত হিসাবে প্রেরিত হইবেন, এমন ধারণা তাহারা নিজেরাও পোষণ করিতে পারে নাই। কারণ ঐ সময় পর্যন্ত তাহারা কেবল এই ধারণাই পোষণ করিত যে, ফেরেশতারা আল্লাহ্র কন্যা এবং তাহাদের প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল আল্লাহ্ ও মানবজাতির সঙ্গে মধ্যস্থতা করা। এই ধারণা যে, একজন ফেরেশতা আল্লাহর দূত হিসাবে প্রেরিত হইতে পারেন, সুতরাং এই ঘটনাটি তাহাদের কাছে তখনই প্রকাশিত হইল যখন মুহাম্মাদ দাবি করিলেন যে, একজন ফেরেশতা বাস্তবিকই তাঁহার নিকট আল্লাহর বাণী
পৌঁছাইয়াছেন। যে কোন বিচারে তাহাদের এই দাবি ছিল সুস্পষ্টভাবে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দাবি যাহা রাসূলুল্লাহ-এর দৃপ্ত ঘোষণার বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়।
অবিশ্বাসীদের আপত্তি ও চ্যালেঞ্জের ধরন ২৫ঃ ৭ (সূরাতুল ফুরকান) এবং ১৫: ৬-৭ (সূরাতুল হিজ্ব) হইতে উদ্ধৃত করা যাইতে পারে। নিম্নে পর্যায়ক্রমে আয়াতগুলি উদ্ধৃত করা হইলঃ وَقَالُوا مَا لِهَذَا الرَّسُولِ يَأْكُلُ الطَّعَامَ وَيَمْشِي فِي الْأَسْوَاقِ لَوْلَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مَلَكُ فَيَكُونَ مَعَهُ نَذِيرًا
"এবং তাহারা বলে, এ কেমন রাসূল যে আহার করে এবং হাটে-বাজারে চলাফেরা করে? তাহার নিকট কোন ফেরেশতা নাযিল করা হইল না কেন যে তাহার সংগে সতর্ককারীরূপে থাকিত" (২৫:৭)? وَقَالُوا يَأَيُّهَا الَّذِي نُزِّلَ عَلَيْهِ الذِّكْرُ إِنَّكَ لَمَجْنُونٌ . لَوْمَا تَأْتِينَا بِالْمَلْئِكَةِ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّدِقِينَ .
"তাহারা বলেন, ওহে যাহার প্রতি কুরআন নাযিল হইয়াছে-নিশ্চয় আপনি একজন উন্মাদ। তুমি সত্যবাদী হইলে আমাদের নিকট ফেরেশতাদিগকে উপস্থিত করিতেছ না কেন" (১৫:৬-৭)?
প্রথম আয়াতে এই কথা স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে যে, একজন মানুষ যে আল্লাহর রাসূল হইতে পারেন, অবিশ্বাসীদের মনে এই প্রত্যয় জন্মায় নাই। দ্বিতীয় আয়াত অবিশ্বাসীদের দাবির সমুচিত জওয়াব প্রদান করিয়াছে। দ্বিতীয় আয়াতে অবিশ্বাসীদের বক্তব্যের ধরন প্রকাশিত হইয়াছে "ওহে যাহার প্রতি কুরআন নাযিল হইয়াছে", এই বক্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইহার আর কোন বিকল্প নাই যে, এই কথায় অর্থাৎ রাসূলের উপর যে কুরআন নাযিল হইয়াছে তাহার উপর তাহারা বিশ্বাস স্থাপন করে। ইহা কেবল এক উপহাসপূর্ণ দ্বিরুক্তি যাহা তাহারা বলিয়াছে, যেমন আল্লাহ্ বাণী তাঁহার প্রতি "প্রেরিত" হয়। ৫১
নুযাযিলা (نُزِّلَ) শব্দটির অর্থ "নাযিল করা হইয়াছে"। এই শব্দটি এমন অন্তর্নিহিত অর্থ প্রকাশ করে যাহাতে কুরআন অবতরণকারীর কতিপয় মাধ্যম চিহ্নিত করা হইয়াছে। পরবর্তী আয়াত (১৫: ৭)-এর দ্বারা ইহা স্পষ্ট হয়। এই আয়াতে দাবি করা হইয়াছে যে, যদি রাসূলুল্লাহ তাহার এই দাবিতে "সত্যবাদী" হন তাহা হইলে তিনি তাঁহার সঙ্গে কেন একজন ফেরেশতা রাখেন না। অর্থাৎ তিনি যদি তাঁহার বর্ণনা সত্য বলিয়া উল্লেখ করেন যে, একজন ফেরেশতা তাঁহার নিকট পবিত্র কুরাআন লইয়া আসেন। রাসূলুল্লাহ-এর দাবির ধরন, সমুচিত জওয়াব দেওয়ার ধরন হইতে পার্থক্য করা বা উপলব্ধি করার যোগ্য। নিশ্চিতভাবে অবিশ্বাসীরা তাহাদের নিকট ফেরেশতা আসার কামনা করে নাই। যদি রাসূলুল্লাহ তাদেরকে এই কথা বলিতেন
যে, তিনি কুরআনের আয়াত সরাসরি আল্লাহ্র নিকট হইতে প্রাপ্ত হন। অনুরূপ কুরআনের আয়াত বেল্ -এর উত্থাপিত দুইটি ধারণাকেই নিশ্চিতভাবে ভুল প্রমাণ করে। একটি ধারণা এই : রাসূলুল্লাহ প্রাথমিক পর্যায়ে এই দাবি করিয়াছিলেন যে, তিনি সরাসরি আল্লাহ্র নিকট হইতে কুরআন প্রাপ্ত হন এবং দ্বিতীয় ধারণাটি এই—তিনি শুধু নবী জীবনের পরবর্তী সময়ে ফেরেশতার অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত হন।
অবিশ্বাসীদের দাবির প্রেক্ষিতে দুইটি উত্তর প্রদান করার পর বেল্ এই আলোচনার সঙ্গে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বিষয় সংক্রান্ত অপর একটি বিষয়ের উল্লেখ করেন নাই যাহা তাহার উদ্ধৃত পরবর্তী আয়াতেই বর্ণিত হইয়াছে, যেমন ৬:৯ আয়াত। এই আয়াতে বলা হইয়াছে, যদি একজন ফেরেশতা মানুষের কাছে প্রেরণ করা হয় তবে তিনি অবশ্যই একজন মানুষের আকৃতিতে প্রেরিত হইবেন এবং ঐ বিষয়ে তাহাদের সন্দেহ কোনক্রমেই হ্রাস পাইত না। তাহাদের মূর্খতাপূর্ণ দাবি পরবর্তী পর্যায়ে ১৭:৯৫ আয়াতে বিশ্লেষণ করা হয়। এই আয়াতে বলা হয়—যদি পৃথিবীতে ফেরেশতাগণ শান্তি ও স্বচ্ছন্দে বিচরণ করিত তাহা হইলে আমি আকাশ হইতে কোন ফেরেশতাকেই পয়গাম্বর করিয়া প্রেরণ করিতাম। এইসব আপত্তি খণ্ডনে যাহা বলা হইতেছে তাহা এই নহে যে, ফেরেশতা আছেন কিনা বরং যদি একজন ফেরেশতা বাস্তবিকই আল্লাহর বাণী মুহাম্মাদ -এর নিকট প্রদান করেন তাহা হইলে কেন একজন ফেরেশতা শারীরিকভাবে মানুষের নিকট আল্লাহ্র দূত (রাসূল) হিসাবে উপস্থিত হন অথবা মুহাম্মাদ -এর সঙ্গে অন্ততপক্ষে সহ-দূত হিসাবে আগমন করেন না? অন্য কথায় মুহাম্মাদ একজন ফেরেশতাকে তাঁহার অনুকূলে সাক্ষীরূপে তাঁহার অনুসারীদের নিকট আগমনের জন্য কেন বলেন না?
এইরূপ ধারণা করা যে, রাসূলুল্লাহ প্রাথমিক অবস্থায় দাবি করেন যে, তিনি আল্লাহকে দেখিয়াছেন, কারণ তিনি ঐ অবস্থায় ফেরেশতার অস্তিত্ব সম্পর্কে অনবহিত ছিলেন এবং ৫৩: ১-১৮ নং আয়াতের বক্তব্য অনুযায়ী অর্থাৎ এই আয়াতসমূহ এই ধরনের "দৃশ্য”-এর তথ্য সম্পর্কিত এবং ইহার পরবর্তী "সংশোধনীসমূহ" সম্পূর্ণরূপের অন্যায্য ও অসমর্থনীয়।
যাহা হউক, এই বিশেষ ধারণা পরিত্যাগ করার পূর্বে বেল্-এর আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা যাইতে পারে। তিনি বলেন, ওহী আগমন সংক্রান্ত হাদীছসমূহ পরবর্তী কালের উদ্ভাবন। বেল্ একই সময়ে এই বিষয়ে বুখারী শরীফে৫২ উদ্ধৃত জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ (রা)-এর ব নিার দ্বারা তাহার ধারণার স্বপক্ষে সাহায্য লওয়া হইতে বিরত থাকেন নাই। তিনি বলেন, জাবির (রা)-এর বর্ণনা এই অর্থ প্রকাশ করে যে, ঐ দৃশ্য ছিল এক আল্লাহর, তিনি ইহার মধ্যে যোগ করেন, যেমন ইহা "গোঁড়া অনুভূতির বিরোধী"। ইহা "নিশ্চিতভাবে গোঁড়া ঐতিহ্য নির্দ্ধারিত হওয়ার পূর্বে অস্তিত্ব লাভ করে"। ৫৩ বেল্ এই কথা বলেন নিম্নোক্ত হাদীছের বক্তব্যের ভিত্তিতে যাহা বর্ণনায় উল্লিখিত হয় :
فَإِذَا هُوَ جَالِسٌ عَلَى كُرْسِي .
তিনি উক্ত বাক্যের অনুবাদ করেন এইভাবে : "And there He was sitting upon the Throne". "এবং সেইখানে তিনি সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন" এবং তিনি যুক্তি দেখান যে, "সিংহাসন” আল্লাহ্ জন্যই প্রযোজ্য"। ৫৪
এক্ষণে ইহা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন যে, বর্ণনায় 'কুরসী' শব্দটি অনির্দিষ্ট আকারে আসিয়াছে। ইহার অর্থ “একটি চেয়ার" এবং নির্দিষ্ট ফর্মে নহে যাহার অর্থ "চেয়ারটি”। বেল্ ইহার ভুল অনুবাদ করেন। এইরূপে ইহা কেবল আল্লাহর জন্য "প্রযোজ্য” হওয়ার ব্যাপারে কোন যুক্তি নাই। এই বিষয়ে আরও বলা আবশ্যক যে, বুখারী শরীফে একই ধরনের বর্ণনায় দুইটি অংশে (অর্থাৎ ৪৯৯৪ নং এবং ৪৯৯৫ নং) ইহা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, তিনি যে সত্তাকে দেখিয়াছিলেন, তাহা ছিল "এই সেই ফেরেশতা যে হেরা গুহায় আমার নিকট আসিয়াছিল" فاذا الْمَلَكَ الَّذِي جَاءَنِي بِحْرَاء। বেল এই ঘটনা সম্পর্কে পূর্ণরূপে অবহিত। কিন্তু তিনি ইহাকে এই বলিয়া অন্যভাবে ব্যাখ্যা করিতে চাহেন যে, হযরত জিবরাঈল (আ) প্রথমেই এই বিবরণ স্বচ্ছভাবে লইয়া আসেন। ৫৫ ইহা একটি অবাঞ্ছিত বিবরণ। তিনি এখনও এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন নাই যে, প্রথমে স্বচ্ছভাবে (Fairly early)-এর দ্বারা তিনি কি বুঝাইতে চহিয়াছেন। তিনি কি ইহা বলিতে চাহেন যে, এই ঘটনাটি হযরত জাবির (রা)-এর সুনির্দিষ্ট বর্ণনা আসার পূর্বে ঘটিয়াছে? কিন্তু তাহা সত্ত্বেও ইহা সব সমস্যার সমাধান করিতে পারিবে না। হযরত জাবির (রা) একজন আনসারী সাহাবী ছিলেন (মৃ. ৭৪ হি.) এবং রাসূলুল্লাহ মদীনায় হিজরত করার পর তিনি তাঁহার সান্নিধ্যে আসেন। জাবির (রা) সুনির্দিষ্টভাবে বলেন যে, তিনি তাঁহার তথ্যাবলী স্বয়ং রাসূলুল্লাহ-এর নিকট হইতে প্রাপ্ত হন। এক্ষণে বেল্ যেমন বলেন যে, রাসূলুল্লাহ আপত্তির মুখে "দৃশ্য” (ভিশন) সংক্রান্ত প্রাথমিক ধারণার বর্ণনা সংশোধন করেন এবং এই ঘটনা সুস্পষ্টভাবে মক্কায় সংঘটিত হয়, তিনি আল্লাহকে দেখিয়াছেন এই ধরনের কোন ধারণা জাবির (রা)-কে প্রদান করেন নাই। প্রকৃতপক্ষে জাবির (রা)-এর বর্ণনার কোন অংশই এই অর্থ প্রকাশ করে না যে, “দৃশ্যটি” এক আল্লাহ্র ছিল। বেল্-এর বর্ণনা ছিল তথাকথিত “গোঁড়া হাদীছ” যাহা জাবির (রা)-র বর্ণনার পরে আসিয়াছে এবং ঐ বর্ণনায় জিবরাঈল (আ)-কে Fairly early হিসাবে বর্ণনা করা হইয়াছে যাহা স্ববিরোধী ও সন্দেহপূর্ণ। বেল্-এর নিজস্ব ধারণা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ হিজরতের পূর্বে তাঁহার অবস্থান সংশোধন করেন। ঐ সময় হইতে তথাকথিত গোঁড়া বর্ণনা সম্পর্কে আর কোন প্রশ্ন উত্থাপিত হয় নাই যাহা পরবর্তী সময়ে জাবির (রা)-এর বর্ণনার পরে আসিয়াছে। জাবির (রা)-র ৪টি বর্ণনা একসঙ্গে করিলে ইহা পরিষ্কার হয় যে, রাসূলুল্লাহ যে সত্তাকে দেখিয়াছিলেন তিনি হযরত জিবরাঈল (আ), আল্লাহ নহেন।

পবিত্র কুরআনের ৫৩ : ১-১৮ (সূরা আন্-নাজম্)-এর বক্তব্য সম্পর্কে বেল্-এর ধারণা এই যে, রাসূলুল্লাহ প্রথমে দাবি করিয়াছিলেন যে, তিনি আল্লাহকে দেখিয়াছেন। ইহা মারগোলিয়থের ধারণার একটি বিশদ ব্যাখ্যা মাত্র। আর এই ধারণাটি সম্পূর্ণরূপে উক্ত আয়াতের ভুল ব্যাখ্যার উপর নির্ভরশীল এই আয়াতের দৃঢ় ও অন্তর্নিহিত অর্থ ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। ৩২ এইখানে বেল্-এর যুক্তি-তর্ক ও পর্যবেক্ষণসমূহ বিবেচনায় আনা হইল :

বেল্ সূরা আন্-নাজম-এর ৪ নং আয়াতের (عَلَمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى) অর্থ করিয়াছেন : "There taught him (or it) one strong in power".

"তাঁহাকে (অথবা ইহাকে) শিক্ষা দিয়াছেন একজন ক্ষমতায় শক্তিশালী"।

এই আয়াতের সরল অনুবাদ হওয়া উচিত : "Onestrong in power taught him".

"একজন ক্ষমতায় শক্তিশালী তাঁহাকে শিক্ষা দিয়াছেন"। আয়াতের অর্থ করার সময় বাক্যের শুরুতে "There" শব্দটি প্রবিষ্ট করার প্রয়োজন নাই। তিনি যাহা বলেন, তাহার বর্ণনার জন্য "দৃশ্য" শব্দটি পরবর্তী আরও দুইটি আয়াতে আসিয়াছে অর্থাৎ ৭-৯ নং আয়াতে। যাহা হউক, বেল-এর মূল যুক্তি সূরার ১০ নং আয়াতকে কেন্দ্র করিয়া বর্ণিত : فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى

তিনি মুসলিম ভাষ্যকারদের ব্যাখ্যা এই বলিয়া বাতিল করেন যে, আওহা (awha = أوحى) ক্রিয়ার কর্তা জিবরাঈল, পক্ষান্তরে 'আবদিহি (عبده=abdihi)-এর সহিত সংযুক্ত সর্বনাম আল্লাহকে নির্দেশ করে এবং ইহা একটি "ভাষার অস্বাভাবিক ব্যবহার"। তিনি স্বীকার করেন যে, কার্যত 'আবদিহি শব্দের মধ্যে আল্লাহ্ সর্বনাম এবং পরে তিনি বলেন যে, ইহা এই অর্থ নির্দেশ করে যে, আল্লাহ্ শব্দটি ক্রিয়ার কর্তা এবং প্রকৃতপক্ষে সবকিছু অনুরূপভাবে বলা হইয়াছে। ৩৩

এই স্থানে এই বিষয়টি পরিষ্কার করিয়া বলা দরকার যে, ইহা ইংরেজীতে অসদৃশ, আরবী সর্বনামসমূহে সব সময় ইহা যথা পূর্ববর্তী শব্দের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নহে এবং একক বাক্যের সকল ক্রিয়ার ব্যাপারে একই উদ্দেশ্যের মধ্যে ধারণা করা যায় না। সর্বনামের এই ধরনের উদাহরণ আধুনিক আরবীতেও প্রচুর। এমকি ইংরেজীতেও এই বিশেষ ব্যাকরণগত নিয়ম সব সময় সঠিকভাবে পরিলক্ষিত হয় না এবং কোন বক্তব্যের অর্থ কেবল ইহার মূল পাঠের সম্পর্কের

মাধ্যমে এবং ঘটনাবলীর পটভূমি সম্পর্কিত জ্ঞানের মাধ্যমে যথাযথভাবে বোধগম্য হইতে পারে। ৩৪ যাহা হউক, যতদূর আরবী ভাষার সম্পৃক্ততা রহিয়াছে এই ক্ষেত্রে "ভাষার অস্বাভাবিক ব্যবহার" হয় নাই। প্রশ্নাধীন আয়াতে আওহা (awha=أوحى) ক্রিয়ার জন্য প্রশ্নাধীন একটি সর্বনাম এবং অপর একটি সর্বনাম 'আবদিহি (Abdihi = عبده) শব্দে রহিয়াছে।

প্রকৃতপক্ষে স্বাভাবিক অস্তিত্বের উল্লেখ যে ৫-৯ নং আয়াতে রহিয়াছে তাহা বর্ণনার ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে বুঝা উচিত, একমাত্র ১০ নং আয়াতের ভিত্তিতে নহে। এই বিষয়টি ৫-৬ নং আয়াতে এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে : "একজন ক্ষমতায় শক্তিশালী” এবং “জ্ঞানে ভূষিত (অথবা মানসিক ও শারীরিকভাবে যোগ্যতাসম্পন্ন)।" বেল্ নিজে স্বীকার করেন যে, ৬ নং আয়াতে 'মিরা' পরিভাষাটি 'ফিটনেস' (যোগ্যতা) অর্থে নেওয়া হইয়াছে, এই 'ফিটনেস' (যোগ্যতা) হয় শারীরিক অথবা জ্ঞান-বুদ্ধির দিক হইতে যোগ্যতা। ৩৫ যেমন ইতোপূর্বে ব্যাখ্যা করা হইয়াছে, ৩৬ এইসব বিশেষণ স্পষ্টতই বৈশিষ্টগতভাবে আপেক্ষিক। কোনরূপ কল্পনায়ও এইগুলিকে আল্লাহ্ গুণাবলী বলিয়া গ্রহণ করা যায় না। কুরআনের কোথায়ও আল্লাহকে এই ধরনের পরিভাষায় ও গুণাবলীর দ্বারা বর্ণনা করা হয় নাই। অপরদিকে ফেরেশতাদেরকে, অন্যান্যদের মত 'শাদীদ' এবং ইহার বহুবচন' শিদাদ' বিশেষণ দ্বারা বর্ণনা করা হইয়াছে। ৩৭ এইভাবে যদি এই বিষয় সম্পর্কিত হাদীছসমূহ এই আয়াতের আলোচনায় না আনাও হয় তাহা হইলে ইহার অভ্যন্তরীণ প্রমাণ নিশ্চিতভাবে যে কোন ধরনের প্রতিকূলে শক্তিসম্পন্ন হইয়া পড়িবে, যেক্ষত্রে অস্তিত্ব বলিতে আল্লাহকে বুঝানো হইয়াছে। ইহার বিপরীতে বর্ণনামূলক বাগ্বিধি মনে ধারণ করিয়া এবং এই বর্ণনাকে একই সূরার ১৮ নং আয়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করিলে যাহা তিনি দেখিয়াছেন, সেই সম্পর্কে এই আয়াত কথা বলে, যেমন- "তাঁহার প্রভুর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন," এবং প্রভু নিজে নহেন, অপরিহার্য অর্থ এই যে, কথিত অস্তিত্বশীল সত্তা হইল ফেরেশতা। পরবর্তীতে এই বিষয়টি কুরআনের ৮১ : ১৯-২৭ আয়াতের দ্বারা সুস্পষ্ট করা হইয়াছে, যে আয়াতসমূহ ইতোপূর্বে আলোচিত হইয়াছে। ৩৮ এই আয়াতসমূহ এই আলোচনার মধ্যে বিবেচনায় আনা দরকার। এই আয়াতে অস্তিত্বশীল সত্তা বলিতে "মহৎ দূত" বুঝানো হইয়াছে, যদিও তাঁহাকে একজন "ক্ষমতাশালী" (ذی قوة) সত্তা হিসাবেও বর্ণনা করা হইয়াছে। বেল্ পরামর্শ দেন যে, সূরা আন-নাজম-এর ১৮ নং আয়াত, ৮১ : ১৯-২৭ (সূরা আত-তাকবীর) নং আয়াত এবং ফেরেশতা জিবরাঈল সব কিছুই পরবর্তী পটভূমিকা হিসাবে বর্ণিত। কিন্তু যে পটভূমিতে এই ধারণাসমূহ তৈয়ার করা হইয়াছে, এই সব কিছুই অসমর্থনীয় যেমন শীঘ্রই দেখা যাইবে।

বেল্ তাহার ধারণা এমন বক্তব্যের দ্বারা সমর্থনযোগ্য করিতে চাহেন, যে বক্তব্যে রাসূলুল্লাহ এই দাবি করেন যে, তিনি আল্লাহকে দেখিয়াছেন, পরবর্তী সময়ে তিনি তাঁহার ভুল বুঝিতে পারেন এবং তিনি এই বক্তব্য সম্পর্কে আপত্তির মুখোমুখিও হন। এই ঘটনার প্রামাণ্যতার অভাবজনিত "অস্বস্তিকর" ও "আপত্তিকর” অবস্থার প্রেক্ষিতে বেল্ ১৭ : ৬০ (৬২) আয়াত উদ্ধৃত করেন যাহা বেল-এর অনুবাদ অনুযায়ী পাঠ করা যাইতে পারে : "আমরা এমন একটি দৃশ্য

(vision) প্রদর্শন করিয়াছিলাম যাহার মধ্যে আমরা তোমাকে মানুষের জন্য কেবল একটি পরীক্ষাস্বরূপ প্রদর্শন করিয়াছি"। ৩৯

বেল্ যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, এই আয়াত ইস্রা এবং মি'রাজের প্রতি ইঙ্গিত করে না যাহা ১৭: ১ আয়াতে পরোক্ষভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে, যেমন-মুসলিম ভাষ্যকারগণ ধারণা পোষণ করেন। কিন্তু সূরা আন-নাজ্য-এ "দৃশ্য" (vision)-এর বর্ণনা করা হইয়াছে। বেল্-এর মতে ১৭: ১ আয়াত কোন "দৃশ্য”-এর কথা বলে নাই। ৪০ যাহা হউক বেল্-এর এই যুক্তি সমর্থনযোগ্য নহে, ১৭: ১ আয়াত "দৃশ্য" (vision) সম্পর্কে বলে এবং এই "দৃশ্য”-কে আল্লাহ্ কতিপয় 'নিদর্শন' হিসাবে চিহ্নিত করে لِرِيهِ مِنْ آيَاتِنَا "এইভাবে আমরা অবশ্যই তাহাকে আমাদের নিদর্শনসমূহের মধ্যে কতিপয় নিদর্শন দেখাইব"। এমনিভাবে যুক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে বেল্ সূরা আন-নাজ্য-এর "দৃশ্য (vision) সম্পর্কে তাঁহার যে "অস্বস্তিকর” ও “আপত্তিকর" ধারণা বিনির্মাণ করেন তাহা ভুল।

বেল্-এর এই দুইটি ভুল ধারণার ভিত্তিতে আরও অগ্রসর হইয়া বলা যায়, যেমন একটি ভুল ধারণা এই যে, সূরা আন-নাজম-এ রাসূলুল্লাহ প্রথমে আল্লাহকে দেখার দাবি করিয়াছিলেন এবং ঐ দাবির ফলে "অস্বস্তিকর" ও "আপত্তিকর" পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছিল। বেল্ মনে করেন যে, রাসূলুল্লাহ পরবর্তী সময়ে তাঁহার অবস্থান সংশোধন করেন এবং এই সংশোধন সূরার ১১-১৮ নং আয়াতে প্রকাশিত হইয়াছে। বেল্ সূরার ১১ নং আয়াত مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى -এর এইভাবে অনুবাদ করেন: "The heart did not falsify what it saw". "অন্তর যাহা দেখে তাহা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না"। এবং তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ এইভাবে তাঁহার "আধ্যাত্মিক প্রকাশ"-এর ধারণা প্রদানের চেষ্টা করেন। ৪১

বেল্ পুনরায় সর্বনাম সম্পর্কে ভুল করিয়াছেন مَا رَأَى -এর ক্রিয়াপদের মধ্যস্থ সর্বনাম সন্দেহাতীতভাবে রাসূলুল্লাহ্, 'ইহা' নহে অর্থাৎ অন্তর নহে। স্বাভাবিক কারণ এই যে, ইহা বাস্তবিকভাবে এই ধারণা সৃষ্টিপূর্বক বলে না যে, অন্তর কখনও কোন কিছুকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না অর্থাৎ দৃশ্যকে উন্মোচিত করে মাত্র, যদি ইচ্ছার উপর জোর দিয়া বলা হইত যে, ইহা ছিল কেবল মানসিকভাবে দৃশ্য অবলোকন। ইহার বিপরীতে বলা হইয়াছে যে, যে সময় হইতে 'দৃশ্য' (ভিশন) অত্যন্ত বাস্তব ছিল, তখন ইহাকে জোর দিয়া বলা হইয়াছে যে, অন্তর ইহাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে নাই অর্থাৎ ইহা ভুল ধারণা ছিল না, এমনকি অবিমিশ্র ধারণাও নহে। তিনি যাহা দেখিয়াছেন তাহার দিক হইতে ইহা অলীক অস্তিত্বে বিশ্বাস নহে। রাসূলুল্লাহ্-এর দৃশ্য দর্শন (vision) রহস্যপূর্ণ নহে, তাঁহার এতদসংক্রান্ত বর্ণনা এইখানে কেবল বাস্তব অভিজ্ঞতাকেই জোরালো করিয়া তোলে। এই অর্থে رَأَى -এর মধ্যস্থিত সর্বনাম রাসূলুল্লাহ। ইহা ছিল একক ধরনের চাক্ষুস দর্শনের অভিজ্ঞতা, এই অভিজ্ঞতা পুনরায় ১৩ নং আয়াতে বর্ণিত হইয়াছে।

যাহা আর একটি "অবতরণের" কথা বলে। এবং পরবর্তী ১৭ নং আয়াতে সুনির্দিষ্টভাবে "بصر (চক্ষু) শব্দটি উল্লেখ করা হইয়াছে যাহা দেখার বা দর্শন করিবার একটি অঙ্গ। এইখানে যদি রহস্যপূর্ণ করার অথবা সংশোধন করার তাহার কোন ইচ্ছা থাকিত তাহা হইলে তথাকথিত সংশোধনী বিবৃতিতে দ্বিতীয় "অবতরণ অথবা চক্ষু"-র আদৌ উল্লেখ করিতেন না। অভিযোগে বর্ণিত সংশোধনী সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন এবং ১৩, ১৭, ও ১৮ নং আয়াত কোন কিছুকেই সংশোধন করে নাই।

তদুপরি যে বিষয়টি ইতোমধ্যে বর্ণনা করা হইয়াছে তাহা সূরা ৫৩ : ১-১৮ (আন-নাজম)-কে ৮১: ১৯-২৭ (সূরা আত-তাকবীর)-এর সঙ্গে যুগ্মভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত, যে আয়াত "সম্মানিত দূত” অর্থাৎ একজন ফেরেশতা সম্পর্কে বলিয়াছে, যিনি ওহী বহনকারী ছিলেন। ৪২ বেল্ পরামর্শ দান করেন যে, এই আয়াত দ্বারা ৫৩: ১-১৮ আয়াতের ব্যাখ্যাকে প্রভাবিত করার বিষয়টি মানিয়া নেওয়া উচিত নহে। তাহার এই পরামর্শ দানের কারণগুলি এই : (ক) মাদানী জীবনকাল শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত হযরত জিবরাঈলের উল্লেখ করা হইত না; (খ) যখন মক্কার অবিশ্বাসিগণ আপত্তি উত্থাপন করে, বেল্-এর মতে "একজন ফেরেশতাকে রাসূল হিসাবে পাঠানো উচিত ছিল অথবা অন্ততপক্ষে একজন ফেরেশতাকে যুগ্মভাবে তাঁহার (মুহাম্মাদের) সঙ্গে পাঠানো উচিত ছিল"। এই সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ -এর উত্তর ছিল, কোন ফেরেশতা প্রকৃতপক্ষে তাঁহার (রাসূলুল্লাহ্) নিকট ওহী লইয়া আসেন না, বরং তাঁহার পূর্ববর্তী রাসূলগণও মানুষই ছিলেন (১৬:৪৩); অথবা যদি একজন ফেরেশতা প্রেরণ করা হইত তাহা হইলে ঘটনার শেষ পর্যায়ে এবং তখন সেই ক্ষেত্রে কোন অবকাশ থাকিত না (৬:৮)। ৪৩ বেল্ পরবর্তী পর্যায়ে বলেন, ফেরেশতাদের "সম্পূর্ণ নূতন পরিমণ্ডল" রাসূলুল্লাহ -এর নিকট অনেক পরে "উন্মুক্ত হয়"। তিনি যেমন পছন্দ করেন, তেমন তিনি তাঁহার নূতন সৃষ্টিতে সংযোজন ঘটান। যেমন সম্ভাব্য বর্ণনা এই যে, “যে সৃষ্টির কথা বলা হইয়াছিল তাহা মুহাম্মাদ -এর নিকট নূতন ছিল"। ৪৪ এইভাবে যুক্তি প্রদর্শনের পর বেল উপসংহার টানিয়া বলেন, "৮১ নং সূরায় বর্ণিত দূত ফেরেশতা, ৫৩ নং সূরায় বর্ণিত দূত ফেরেশতার বর্ণনার পরবর্তী বর্ণনা এবং ইহার ব্যাখ্যাকে প্রভাবিত করার বিষয়টি অনুমোদন করা উচিত নহে”। ৪৫

এক্ষণে এই ক্ষেত্রে বেল্ তাহার সকল ধারণায় সম্পূর্ণ ভুল, যেমন- (ক) রাসূলুল্লাহ সূরা আন-নাজম তিলাওয়াতের পরবর্তী সময়ে ফেরেশতার অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত হন; (খ) মক্কার অবিশ্বাসিগণের একজন দূত ফেরেশতার দাবির প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা এবং (গ) এই রকম ধারণা করা যে, জিবরাঈল কেবল মদীনায় ওহী অবতরণকারী হিসাবে চিহ্নিত ছিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00