📄 এক: ওহী আগমন সংক্রান্ত হাদীছ সম্পর্কে
ওহী অবতরণ সংক্রান্ত হাদীছসমূহ সম্পর্কে রিচার্ড বেল্-এর আপত্তি প্রথম হইতেই চলিতে থাকে এবং চূড়ান্তভাবে তাহা শেষ হয় (রিচার্ড বেল্-এর) অপর একটি ধারণাকে কেন্দ্র করিয়া। ঐ ধারণাটি এই যে, (রিচার্ড বেল্-এর মতে) কুরআনের ৫৩: ১-১৮ আয়াতসমূহের মর্ম অনুযায়ী বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ প্রথমে দাবি করিয়াছিলেন যে, তিনি আল্লাহকে দেখিয়াছেন এবং পরবর্তী কালে তিনি তাঁহার ঐ দাবির সংশোধন করেন। উভয় ধারণার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, যেমন তিনি ইতোমধ্যে (আল্লাহকে) দেখিয়াছেন এবং পরে তাহা স্পষ্ট করা হয় অর্থাৎ সংশোধন করা হয়, এই বক্তব্য যথার্থতার অনেক দূরে। কিন্তু ইহা ছাড়াও ওহী আগমন সংক্রান্ত বিষয়ের হাদীছসমূহের বর্ণনাকে বর্জন করার জন্য রিচার্ড বেল্ নিম্নোক্ত কারণগুলি বর্ণনা করেন:
(এক) তিনি বলেন যে, হযরত আয়েশা (রা) যিনি এই সংক্রান্ত হাদীছ বর্ণনার মূল উৎস, তিনি রাসূলুল্লাহ কর্তৃক এই হাদীছ বলার সময় "জন্মগ্রহণই করেন নাই। তিনি বড়জোর এই ঘটনার বর্ণনা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ-এর নিকট হইতে জানিতে পারিয়াছিলেন মাত্র"। তদুপরি পরবর্তী কালে "এই বক্তব্যটি তাঁহার প্রতি আরোপিত করা হইয়াছে, যাহা সম্ভবত তিনি কখনও বলেন নাই"।৪
(দুই) যে বর্ণনাটি আমাদের নিকট আসিয়াছে, তাহার "প্রাচীনতম বর্ণনা" ইব্ন ইসহাক/ইব্ন হিশাম সেখানে হযরত আয়েশা (রা)-কে উহার "প্রথম অংশের জন্য দায়বদ্ধ করিয়াছেন"। অর্থাৎ
আল্লাহ্র রাসূল নিদ্রাবস্থায় সত্য দৃশ্যাবলী দেখিতে শুরু করেন। ঐ দৃশ্যগুলি তাঁহার নিকট প্রত্যূষের আলোকের মত ভাস্বর হইয়া উঠে এবং ফলে তিনি নির্জনতা পছন্দ করিতে শুরু করেন। ঘটনার শেষদিকের বর্ণনাটি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেওয়া হইয়াছে এবং তাহা তুলনামূলকভাবে অনেক কম অনির্ভরযোগ্য সনদের মাধ্যমে"। ৯
(তিন) এই বর্ণনা, যাহা তাহান্নুছ (تَحْنُتْ) নামে অভিহিত (হেরা গুহায় নির্জন অবস্থান ও প্রার্থনা), তাহা ছিল প্রাক্-ইসলামী যুগের কুরায়শদের সাধনা রীতি, ইবন ইসহাকের বর্ণনায় যেমনটি বলা হইয়াছে, তাহা সঠিক নহে। "এই ধরনের সাধনার কঠোর যোগ-তপস্যা মুহাম্মাদ -এর স্বভাবে পুরোপুরি বেমানান ছিল" এবং "উপবাসব্রত সহযোগে” ইহা করার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে কোন সমর্থন মিলে না। "মুহাম্মাদ-এর মাদানী জীবনের পূর্বে উপবাসব্রত বা সাওম পালনের রীতি প্রবর্তিত হয় নাই, বরং তাহা ইয়াহুদীদের অনুকরণে প্রবর্তিত হয়"। ৬
(চার) উল্লিখিত Nâmûs (নামূস) শব্দটি গ্রীক পরিভাষা nomos হইতে উদ্ভূত। ইহার অর্থ 'ইয়াহুদী আইন'। এই কথিত শব্দটি ওয়ারাকা ইবন নাওফাল রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে তাঁহার কথিত আলাপ-আলোচনার সময় ব্যবহার করেন নাই। পবিত্র কুরআনে এই ধরনের শব্দ নাই। এবং রিচার্ড বেল্-এর মতে, রাসূলুল্লাহ ধর্মীয় কৌশলগত পরিভাষা "ধার করিতে আগ্রহী ছিলেন। ইহা মনে করা সঙ্গত যে, তিনি যদি শব্দটির সঙ্গে পরিচিত হইতেন তাহা হইলে ইহা ব্যবহার করিতেন, বিশেষ করিয়া ওয়ারাকা যদি ইহা তাঁহার জীবনের সেই বিশেষ স্মরণীয় মুহূর্তে ব্যবহার করিতেন”। অতএব ঐ সময় হইতে "পুরা বর্ণনা পরবর্তী যুগের উদ্ভাবন"। ৭
এই শেষ যুক্তি প্রদর্শনে (চার) সুস্পষ্টভাবে দাবি করা হয় যে, অপর তিনটি যুক্তি প্রমাণ করার পূর্বে এই চতুর্থ যুক্তিটি সঠিক যুক্তি হিসাবে প্রমাণস্বরূপ উল্লেখযোগ্য। ঐ যুক্তিগুলি হইল: (ক) রাসূলুল্লাহ্ নিজেই কুরআন রচনা করেন; (খ) তিনি বিজাতীয় ধর্মীয় কৌশলগত পরিভাষা ধার করিতে অভ্যস্ত ছিলেন এবং (গ) যে সকল অপরিচিত পরিভাষা (غرائب) হাদীছ সাহিত্যে দৃষ্ট হয় এইসব শব্দ অপরিবর্তনীয়রূপে কুরআনে পাওয়া যাইত। ইহা বলা নিষ্প্রয়োজন যে, এই ধারণাগুলির একটিও প্রতিষ্ঠিত নহে এবং গ্রহণযোগ্যও নহে। বিশেষ করিয়া সম্পূর্ণ যুক্তি-তর্কের মধ্যে বিভ্রান্তিকর বিষয় এই যে, রাসূলুল্লাহ নিজেই কুরআন রচনা করিয়াছেন, এই বক্তব্যটি এই বিষয়ের সবচাইতে গুরুতর দিক। অতএব ইহা কেবল ঘটনা হিসাবে প্রথম ধারণাগত বিষয় নহে। এই ঘটনাকে সপ্রমাণের কেন্দ্রবিন্দু করা প্রয়োজন নাই। রিচার্ড বেল্ এই ক্ষেত্রে মনে হয় A. Jeffery-এর ধারণার উপর নির্ভর করিয়াছেন। ৮
প্রকৃতপক্ষে Nâmûs সম্পর্কে এই গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি রিচার্ড বেল্-এর উপরই প্রতিক্ষিপ্ত হয় এবং এই ধারণা তাহার গবেষণা অভিসন্দর্ভটিকে ধ্বংস করে। কারণ তিনি মনে করেন, রাসূলুল্লাহ -এর নিকট ওহী আগমন সংক্রান্ত হাদীছ পরবর্তী কালের উদ্ভাবন। যদি Nâmûs শব্দটি গ্রীক ভাষাভুক্ত হয়, যেমনটি রিচার্ড বেল্ বলেন এবং অর্থ হয় 'ইয়াহুদী আইন' এবং যদি রাসূলুল্লাহ
এই মিথ্যা গল্পটি বানাইয়া (অথবা অন্য কেহ) বলিয়া থাকেন, যখন অভিযোগের বর্ণনায় বলা হয়, রাসূলুল্লাহ আল্লাহকে দেখিয়াছেন বলিয়া যে দাবি করা হয়, তাহা পরে অভিযোগের প্রেক্ষিতে পরিবর্তন করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে ফেরেশতাকে ওহী প্রদানকারী হিসাবে উপস্থাপন করা হয়, তাহা হইলে তিনি তাঁহার বর্ণনায় অপরিচিত শব্দের পরিবর্তে সুনির্দিষ্টভাবে ফেরেশতা অথবা জিবরাঈল পরিভাষাটি ব্যবহার করিতেন। Nâmûs শব্দটির যে অর্থ করা হইয়াছে তাহা শব্দটির প্রকৃত অর্থের সঙ্গে বেমানান। অনুরূপভাবে রিচার্ড বেল তাহার নিজস্ব মতে Nâmûs শব্দটি এই অর্থে ব্যবহৃত নহে বলিয়া মনে করেন যে সময় হইতে ইহা হাদীছে বর্ণিত হইয়া আসিতেছে। যদিও শব্দটি গ্রীক ভাষার মূল শব্দ, ইহার অর্থ ইয়াহুদী আইন (ইহা স্মরণযোগ্য যে, বিদেশী ভাষার মূল শব্দ অন্য ভাষায় গৃহীত হওয়ার পদ্ধতিতে অর্থের পরিবর্তন ঘটে এবং অন্য ভাষার সঙ্গে খাপ খাওয়াইয়া লয়)। তদুপরি হাদীছে শব্দটির (Nâmûs) ব্যবহার হইয়াছে ওয়ারাকা ইবন নাওফাল-এর বক্তব্যে, রাসূলুল্লাহ অথবা হযরত আয়েশা (রা)-এর বক্তব্যে নহে। ইহাই এই শব্দটির সঠিক প্রয়োগের দৃষ্টান্ত।
রিচার্ড বেল্-এর ১ নং যুক্তি সম্পর্কে বলা যায় যে, ইহা অবশ্যম্ভাবীরূপে সত্য যে, হযরত আয়েশা (রা) ঘটনার বর্ণনা সরাসরি রাসূলুল্লাহ-এর নিকট হইতে শ্রবণ করিয়াছেন। ইহা ঠিক যে, তাঁহার নামে (হযরত আয়েশা'র) পরবর্তী কালে কতিপয় বিষয় চালাইয়া দেওয়া হইয়াছে, যাহা সম্ভবত তিনি কখনও বলেন নাই। হযরত আয়েশা (রা) হইতে বর্ণিত সকল হাদীছকে সন্দেহযুক্ত মনে না করিয়া কেবল ইহার সনদের অধিকতর সতর্ক পরীক্ষা-নিরীক্ষার দাবি রাখে।
রিচার্ড বেল্ সম্পূর্ণ বর্ণনাকে অস্বীকার করিতে চাহেন এই ভিত্তিতে যে, তাহানুছ প্রাক-ইসলামী যুগের কুরায়শদের সাধনা রীতি ছিল না, যেমন ইবন ইসহাকের রচনার বর্ণনায় বর্ণিত হইয়াছে এবং ইহা উপবাসব্রতও ছিল না, যাহা এতদসঙ্গে ইতোপূর্বে বলা হইয়াছে। এই রীতি মদীনায় হিজরতের পূর্ব পর্যন্ত পরিবর্তিত হয় নাই। এক্ষণে কোন আলোচনা ছাড়াই বলা যায় যে, হয় প্রাক-ইসলামী আরবে উপবাসব্রত অপরিচিত থাকুক, নয়তো ইয়াহুদীদের অনুকরণে প্রবর্তিত হউক, তাহানুছ সম্পর্কে হযরত আয়েশা (রা)-র বর্ণনা, যাহা বুখারী শরীফে বর্ণিত হইয়াছে, সেই বর্ণনায় ইহা নির্দিষ্ট করিয়া বলা হয় নাই যে, হয় প্রাক-ইসলামী যুগের কুরায়শদের সাধনারীতি ছিল, অথবা উপবাসব্রতের অপরিহার্য অংশ হিসাবেও ইহাকে পরোক্ষভাবেও বর্ণনা করা হয় নাই। ইহাও উল্লেখ্য যে, ইবন ইসহাকের রচনায় বর্ণনাকারিগণ তাহাদের বর্ণনার বিষয়বস্তু হযরত আয়েশা (রা)-এর নিকট হইতে প্রাপ্ত হইয়াছেন বলিয়াও দাবি করেন নাই। এইভাবে রিচার্ডের যুক্তি-তর্ক দ্বৈত পদ্ধতিগত ত্রুটি দ্বারা আক্রান্ত। তিনি হযরত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনায় আস্থা স্থাপন করিতে চাহেন নাই এমন এক বর্ণনার উপর ভিত্তি করিয়া যে বর্ণনাটির কোথায়ও হযরত আয়েশা (রা) দ্বারা বর্ণিত হইয়াছে, তাহা দাবি করা হয় নাই এবং আরও একটি বর্ণনার উপর ভিত্তি করিয়া যাহা তিনি নিজে (রিচার্ড বেল্) স্বীকার করেন যে, "ঐ সনদ অত্যন্ত অনির্ভরযোগ্য ছিল"।
আরও দেখা যায়, মনে হয় রিচার্ড বেল হযরত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনার প্রথম অংশের যথার্থতা সমর্থন করেন যাহা ইবন ইসহাকের রচনায় পুনঃ উল্লিখিত হইয়াছে। কারণ বেল্- এর
মতে, এই বর্ণনাটি এইখানে "প্রাচীনতম কাঠামোতে" পাওয়া গিয়াছে। এই বর্ণনায় হযরত আয়েশা (রা) বলেন, যেমন বেল্ বর্ণনাটির বিবরণ দেন, "আল্লাহ্র রাসূল তাঁহার নিদ্রাবস্থায় সত্য দৃশ্য দেখিতে শুরু করেন। তিনি দেখেন যে, তাহারা তাঁহার নিকট প্রত্যূষের আলোর মত আসে এবং তিনি নির্জনতা পছন্দ করিতে শুরু করেন"। ৯ বেল্ জোর দিয়া বলেন, এই প্রাচীনতম ভাষ্যটি অন্য যে কোন ভাষ্যের জন্য তাঁহাকে (আয়েশাকে) দায়ী করে না। ইহা বলা যায় যে, বেল্ হাদীছের এই অংশ الرُّؤْيَا الصَّادِقَةُ (আর-রুইয়া আস্-সাদিকা)-এর সম্পূর্ণ নির্ভুল অনুবাদ করিতে পারেন নাই। তিনি ইহার অনুবাদ করেন, "সত্য দৃশ্য"। ইহার সঠিক অর্থ হইল, "সত্য স্বপ্ন," রু'ইয়া ইন স্লিপ-এর অর্থ স্বপ্ন, দৃশ্য নহে। বেল্ নিম্নলিখিত বক্তব্যটিরও যথার্থ অনুবাদ করিতে পারেন নাই, যেমন তিনি جَاءَتْهُ مِثْلَ فَلَقِ الصَّباح -এর অনুবাদ করেন, "তাহারা তাঁহার নিকট প্রত্যূষের আলোর ন্যায় আসে"। ইহার সঠিক অর্থ হইল, "তাহারা ভোরের আলোর মত সত্য হইয়া আসে"। উহা এমন হইতে পারে, এই বর্ণনা সম্পর্কে দুইটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন। (এক) ইহা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনার একটি অংশ মাত্র, ইহার সম্পূর্ণ অংশ নহে। রাসূলুল্লাহ কী করিয়াছিলেন অথবা তিনি (রাসূলুল্লাহ) নির্জনতা অবলম্বন করার পর তাঁহার কী হইয়াছিল, ইত্যাদি বর্ণনা করিয়া হযরত আয়েশা (রা) আকস্মিকভাবে থামিয়া যান নাই। তিনি সম্ভবত বর্ণনা ধারায় এবং ঘটনা বর্ণনার সমাপ্তিতে ইহা বলিয়াছিলেন। (দুই) নিদ্রার মধ্যে রু'ইয়া (الروا) -এর ধরন যাহাই হউক না কেন, এই ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ -এর সম্মুখে ঐ প্রেক্ষাপটে কোনও কিছু অস্তিত্বশীল বস্তুর উপস্থিতির সংকেত ছিল না। বেল্ অনুমান করিতে পারেন নাই যে, কোন বিষয়টিকে তিনি visions (দৃশ্যাবলী) অর্থে অনুবাদ করিবেন। যাহা তিনি ধারণা করেন, তাহাই কুরআনের আয়াতে (৫৩:১ - ১৮) বর্ণনা করা হইয়াছে। ইহা যদি কেবল নিদ্রাবস্থায় দৃশ্য অবলোকন করার বিষয় হইত অর্থাৎ একটি স্বপ্ন হইত, তাহা হইলে কেহই ইহা লইয়া বিতর্ক করার অথবা ইহা অস্বীকার করার বিষয়ে মাথা ঘামাইত না। প্রত্যেকের নিদ্রাবস্থায় অসাধারণ যে কোন স্বপ্নের অভিজ্ঞতা থাকিতে পারে। সুস্পষ্টভাবে বলা যায়, দৃশ্য (vision) শব্দটিই বিতর্কের বিষয় হিসাবে প্রাধান্য পাইয়াছে কুরআনের: ৫৩: ১-১৮ আয়াতে, যাহা অবশ্যই নিদ্রাবস্থায় স্বপ্ন দেখার (দৃশ্যাবলী; 'visions') চাইতে ভিন্ন এবং ইহা উপরোল্লিখিত সূরার আয়াতের বর্ণনায় স্থান পাইয়াছে।
এই ক্ষেত্রে সাধারণত যে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় তাহা এই যে, কী করিয়া এবং কখন রাসূলুল্লাহ এই অভিজ্ঞতা লাভ করেন যাহা তিনি জনসাধারণ্যে প্রকাশ করেন এবং যাহা সমালোচনার জন্ম দেয়, ঐভাবে আয়াতের মর্মে উত্থাপিত প্রশ্ন তাঁহার জন্য বর্ণনা করা" এবং সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজনীয় করিয়া তোলে। বেল কখনও নিজে এই প্রশ্ন করেন নাই, কিন্তু হযরত আয়েশা (রা)-এর যে বর্ণনা ইবন ইসহাকের রচনায় উদ্ধৃত করা হইয়াছে এবং বেল্-এর নিজস্ব তত্ত্ব এই দুইটিই এই বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে যে, এই বর্ণনার সমাপ্তিলগ্নে আরও কিছু বলার বাকী
আছে। ঐ আরও কিছু বলার বিষয় বাকী থাকার বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে হযরত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনার সঙ্গে সম্পৃক্ত যাহা বুখারী শরীফে নির্ভুল ও পরিপূর্ণভাবে দেওয়া হইয়াছে, কিন্তু ইব্ন ইসহাকের রচনায় ইহা ভিন্নভাবে এবং অনির্ভরযোগ্য পদ্ধতিতে এমন বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে দেওয়া যাহাদের অন্তত ন্যূনতম এই সততাটুকু ছিল যে, তাহারা এই বিবরণের সূত্র হিসাবে হযরত আয়েশা (রা)-র নাম উল্লেখ করেন নাই।
তাহানুছ সম্পর্কিত ঘটনার সম্ভাবনা বাতিল এবং ওয়ারাকার সঙ্গে রাসূলুল্লাহ-এর কথোপকথনের সম্ভাবনা বাতিল করার সময় বেল্ তাহার বক্তব্যের কোথায়ও ওয়ারাকার সঙ্গে রাসূলুল্লাহ-এর যোগাযোগ করার সম্ভাবনার কথা বাতিল করেন নাই এবং একইভাবে খৃস্টবাদের জ্ঞানসম্পন্ন ও ইহার ধর্মশাস্ত্রে অভিজ্ঞ অন্যান্য মানুষের সঙ্গেও তাঁহার (রাসূলের) যোগাযোগের কথা বাতিল করেন নাই। প্রকৃতপক্ষে এই ধরনের যোগাযোগের বিষয় বেল্-এর অপর এক থিসিস "The Origin of Islam in its Christian Environment" -এ সন্দেহাতীতভাবে বর্ণিত হইয়াছে। ১০ যাহা হউক, সম্ভবত এখানেও তিনি এই ইঙ্গিত দেন যে, রাসূলুল্লাহ তাঁহার নবুওয়াতী জীবনধারার প্রাথমিক অভিজ্ঞতার বর্ণনা করিয়াছিলেন। যেমন, তিনি যদি এই রকম ঘটনার উপলক্ষ না হইতেন অর্থাৎ তাঁহার যদি এই রকম ঘটনার অভিজ্ঞতা না থাকিত, তাহা হইলে এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার কোন প্রয়োজন হইত না। সুতরাং এই ক্ষেত্রে কতিপয় প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। কাহার নিকট রাসূলুল্লাহ সর্বপ্রথম তাঁহার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন, ইহা যদি না হয়, যেমন তাঁহার স্ত্রী হযরত খাদীজা (রা) এবং তাহাদের আত্মীয় ওয়ারাকা, যিনি সর্বতোভাবে অন্যতম একজন হিসাবে সহানুভূতি ও মনোযোগের সঙ্গে তাঁহার কথা শ্রবণ করেন। হেরা পর্বতের গুহায় তাহান্নুছ-এর অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তীতে ওয়ারাকার সঙ্গে আলোচনা এই উভয় ঘটনাই হযরত আয়েশা (রা)-র বর্ণনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এইভাবে এই বিষয়ের মূল প্রকৃতি মূর্ত হইয়া উঠিয়াছে এবং সর্বোপরি বেল্-এর নিজস্ব যুক্তি-পদ্ধতির সঙ্গে ইহার মিল রহিয়াছে।
ওহী অবতরণ সংক্রান্ত হাদীছসমূহ সম্পর্কে রিচার্ড বেল্-এর আপত্তি প্রথম হইতেই চলিতে থাকে এবং চূড়ান্তভাবে তাহা শেষ হয় (রিচার্ড বেল্-এর) অপর একটি ধারণাকে কেন্দ্র করিয়া। ঐ ধারণাটি এই যে, (রিচার্ড বেল্-এর মতে) কুরআনের ৫৩: ১-১৮ আয়াতসমূহের মর্ম অনুযায়ী বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ প্রথমে দাবি করিয়াছিলেন যে, তিনি আল্লাহকে দেখিয়াছেন এবং পরবর্তী কালে তিনি তাঁহার ঐ দাবির সংশোধন করেন। উভয় ধারণার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, যেমন তিনি ইতোমধ্যে (আল্লাহকে) দেখিয়াছেন এবং পরে তাহা স্পষ্ট করা হয় অর্থাৎ সংশোধন করা হয়, এই বক্তব্য যথার্থতার অনেক দূরে। কিন্তু ইহা ছাড়াও ওহী আগমন সংক্রান্ত বিষয়ের হাদীছসমূহের বর্ণনাকে বর্জন করার জন্য রিচার্ড বেল্ নিম্নোক্ত কারণগুলি বর্ণনা করেন:
(এক) তিনি বলেন যে, হযরত আয়েশা (রা) যিনি এই সংক্রান্ত হাদীছ বর্ণনার মূল উৎস, তিনি রাসূলুল্লাহ কর্তৃক এই হাদীছ বলার সময় "জন্মগ্রহণই করেন নাই। তিনি বড়জোর এই ঘটনার বর্ণনা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ-এর নিকট হইতে জানিতে পারিয়াছিলেন মাত্র"। তদুপরি পরবর্তী কালে "এই বক্তব্যটি তাঁহার প্রতি আরোপিত করা হইয়াছে, যাহা সম্ভবত তিনি কখনও বলেন নাই"।৪
(দুই) যে বর্ণনাটি আমাদের নিকট আসিয়াছে, তাহার "প্রাচীনতম বর্ণনা" ইব্ন ইসহাক/ইব্ন হিশাম সেখানে হযরত আয়েশা (রা)-কে উহার "প্রথম অংশের জন্য দায়বদ্ধ করিয়াছেন"। অর্থাৎ
আল্লাহ্র রাসূল নিদ্রাবস্থায় সত্য দৃশ্যাবলী দেখিতে শুরু করেন। ঐ দৃশ্যগুলি তাঁহার নিকট প্রত্যূষের আলোকের মত ভাস্বর হইয়া উঠে এবং ফলে তিনি নির্জনতা পছন্দ করিতে শুরু করেন। ঘটনার শেষদিকের বর্ণনাটি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেওয়া হইয়াছে এবং তাহা তুলনামূলকভাবে অনেক কম অনির্ভরযোগ্য সনদের মাধ্যমে"। ৯
(তিন) এই বর্ণনা, যাহা তাহান্নুছ (تَحْنُتْ) নামে অভিহিত (হেরা গুহায় নির্জন অবস্থান ও প্রার্থনা), তাহা ছিল প্রাক্-ইসলামী যুগের কুরায়শদের সাধনা রীতি, ইবন ইসহাকের বর্ণনায় যেমনটি বলা হইয়াছে, তাহা সঠিক নহে। "এই ধরনের সাধনার কঠোর যোগ-তপস্যা মুহাম্মাদ -এর স্বভাবে পুরোপুরি বেমানান ছিল" এবং "উপবাসব্রত সহযোগে” ইহা করার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে কোন সমর্থন মিলে না। "মুহাম্মাদ-এর মাদানী জীবনের পূর্বে উপবাসব্রত বা সাওম পালনের রীতি প্রবর্তিত হয় নাই, বরং তাহা ইয়াহুদীদের অনুকরণে প্রবর্তিত হয়"। ৬
(চার) উল্লিখিত Nâmûs (নামূস) শব্দটি গ্রীক পরিভাষা nomos হইতে উদ্ভূত। ইহার অর্থ 'ইয়াহুদী আইন'। এই কথিত শব্দটি ওয়ারাকা ইবন নাওফাল রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে তাঁহার কথিত আলাপ-আলোচনার সময় ব্যবহার করেন নাই। পবিত্র কুরআনে এই ধরনের শব্দ নাই। এবং রিচার্ড বেল্-এর মতে, রাসূলুল্লাহ ধর্মীয় কৌশলগত পরিভাষা "ধার করিতে আগ্রহী ছিলেন। ইহা মনে করা সঙ্গত যে, তিনি যদি শব্দটির সঙ্গে পরিচিত হইতেন তাহা হইলে ইহা ব্যবহার করিতেন, বিশেষ করিয়া ওয়ারাকা যদি ইহা তাঁহার জীবনের সেই বিশেষ স্মরণীয় মুহূর্তে ব্যবহার করিতেন”। অতএব ঐ সময় হইতে "পুরা বর্ণনা পরবর্তী যুগের উদ্ভাবন"। ৭
এই শেষ যুক্তি প্রদর্শনে (চার) সুস্পষ্টভাবে দাবি করা হয় যে, অপর তিনটি যুক্তি প্রমাণ করার পূর্বে এই চতুর্থ যুক্তিটি সঠিক যুক্তি হিসাবে প্রমাণস্বরূপ উল্লেখযোগ্য। ঐ যুক্তিগুলি হইল: (ক) রাসূলুল্লাহ্ নিজেই কুরআন রচনা করেন; (খ) তিনি বিজাতীয় ধর্মীয় কৌশলগত পরিভাষা ধার করিতে অভ্যস্ত ছিলেন এবং (গ) যে সকল অপরিচিত পরিভাষা (غرائب) হাদীছ সাহিত্যে দৃষ্ট হয় এইসব শব্দ অপরিবর্তনীয়রূপে কুরআনে পাওয়া যাইত। ইহা বলা নিষ্প্রয়োজন যে, এই ধারণাগুলির একটিও প্রতিষ্ঠিত নহে এবং গ্রহণযোগ্যও নহে। বিশেষ করিয়া সম্পূর্ণ যুক্তি-তর্কের মধ্যে বিভ্রান্তিকর বিষয় এই যে, রাসূলুল্লাহ নিজেই কুরআন রচনা করিয়াছেন, এই বক্তব্যটি এই বিষয়ের সবচাইতে গুরুতর দিক। অতএব ইহা কেবল ঘটনা হিসাবে প্রথম ধারণাগত বিষয় নহে। এই ঘটনাকে সপ্রমাণের কেন্দ্রবিন্দু করা প্রয়োজন নাই। রিচার্ড বেল্ এই ক্ষেত্রে মনে হয় A. Jeffery-এর ধারণার উপর নির্ভর করিয়াছেন। ৮
প্রকৃতপক্ষে Nâmûs সম্পর্কে এই গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি রিচার্ড বেল্-এর উপরই প্রতিক্ষিপ্ত হয় এবং এই ধারণা তাহার গবেষণা অভিসন্দর্ভটিকে ধ্বংস করে। কারণ তিনি মনে করেন, রাসূলুল্লাহ -এর নিকট ওহী আগমন সংক্রান্ত হাদীছ পরবর্তী কালের উদ্ভাবন। যদি Nâmûs শব্দটি গ্রীক ভাষাভুক্ত হয়, যেমনটি রিচার্ড বেল্ বলেন এবং অর্থ হয় 'ইয়াহুদী আইন' এবং যদি রাসূলুল্লাহ
এই মিথ্যা গল্পটি বানাইয়া (অথবা অন্য কেহ) বলিয়া থাকেন, যখন অভিযোগের বর্ণনায় বলা হয়, রাসূলুল্লাহ আল্লাহকে দেখিয়াছেন বলিয়া যে দাবি করা হয়, তাহা পরে অভিযোগের প্রেক্ষিতে পরিবর্তন করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে ফেরেশতাকে ওহী প্রদানকারী হিসাবে উপস্থাপন করা হয়, তাহা হইলে তিনি তাঁহার বর্ণনায় অপরিচিত শব্দের পরিবর্তে সুনির্দিষ্টভাবে ফেরেশতা অথবা জিবরাঈল পরিভাষাটি ব্যবহার করিতেন। Nâmûs শব্দটির যে অর্থ করা হইয়াছে তাহা শব্দটির প্রকৃত অর্থের সঙ্গে বেমানান। অনুরূপভাবে রিচার্ড বেল তাহার নিজস্ব মতে Nâmûs শব্দটি এই অর্থে ব্যবহৃত নহে বলিয়া মনে করেন যে সময় হইতে ইহা হাদীছে বর্ণিত হইয়া আসিতেছে। যদিও শব্দটি গ্রীক ভাষার মূল শব্দ, ইহার অর্থ ইয়াহুদী আইন (ইহা স্মরণযোগ্য যে, বিদেশী ভাষার মূল শব্দ অন্য ভাষায় গৃহীত হওয়ার পদ্ধতিতে অর্থের পরিবর্তন ঘটে এবং অন্য ভাষার সঙ্গে খাপ খাওয়াইয়া লয়)। তদুপরি হাদীছে শব্দটির (Nâmûs) ব্যবহার হইয়াছে ওয়ারাকা ইবন নাওফাল-এর বক্তব্যে, রাসূলুল্লাহ অথবা হযরত আয়েশা (রা)-এর বক্তব্যে নহে। ইহাই এই শব্দটির সঠিক প্রয়োগের দৃষ্টান্ত।
রিচার্ড বেল্-এর ১ নং যুক্তি সম্পর্কে বলা যায় যে, ইহা অবশ্যম্ভাবীরূপে সত্য যে, হযরত আয়েশা (রা) ঘটনার বর্ণনা সরাসরি রাসূলুল্লাহ-এর নিকট হইতে শ্রবণ করিয়াছেন। ইহা ঠিক যে, তাঁহার নামে (হযরত আয়েশা'র) পরবর্তী কালে কতিপয় বিষয় চালাইয়া দেওয়া হইয়াছে, যাহা সম্ভবত তিনি কখনও বলেন নাই। হযরত আয়েশা (রা) হইতে বর্ণিত সকল হাদীছকে সন্দেহযুক্ত মনে না করিয়া কেবল ইহার সনদের অধিকতর সতর্ক পরীক্ষা-নিরীক্ষার দাবি রাখে।
রিচার্ড বেল্ সম্পূর্ণ বর্ণনাকে অস্বীকার করিতে চাহেন এই ভিত্তিতে যে, তাহান্নুছ প্রাক-ইসলামী যুগের কুরায়শদের সাধনা রীতি ছিল না, যেমন ইবন ইসহাকের রচনার বর্ণনায় বর্ণিত হইয়াছে এবং ইহা উপবাসব্রতও ছিল না, যাহা এতদসঙ্গে ইতোপূর্বে বলা হইয়াছে। এই রীতি মদীনায় হিজরতের পূর্ব পর্যন্ত পরিবর্তিত হয় নাই। এক্ষণে কোন আলোচনা ছাড়াই বলা যায় যে, হয় প্রাক-ইসলামী আরবে উপবাসব্রত অপরিচিত থাকুক, নয়তো ইয়াহুদীদের অনুকরণে প্রবর্তিত হউক, তাহান্নুছ সম্পর্কে হযরত আয়েশা (রা)-র বর্ণনা, যাহা বুখারী শরীফে বর্ণিত হইয়াছে, সেই বর্ণনায় ইহা নির্দিষ্ট করিয়া বলা হয় নাই যে, হয় প্রাক-ইসলামী যুগের কুরায়শদের সাধনারীতি ছিল, অথবা উপবাসব্রতের অপরিহার্য অংশ হিসাবেও ইহাকে পরোক্ষভাবেও বর্ণনা করা হয় নাই। ইহাও উল্লেখ্য যে, ইবন ইসহাকের রচনায় বর্ণনাকারিগণ তাহাদের বর্ণনার বিষয়বস্তু হযরত আয়েশা (রা)-এর নিকট হইতে প্রাপ্ত হইয়াছেন বলিয়াও দাবি করেন নাই। এইভাবে রিচার্ডের যুক্তি-তর্ক দ্বৈত পদ্ধতিগত ত্রুটি দ্বারা আক্রান্ত। তিনি হযরত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনায় আস্থা স্থাপন করিতে চাহেন নাই এমন এক বর্ণনার উপর ভিত্তি করিয়া যে বর্ণনাটির কোথায়ও হযরত আয়েশা (রা) দ্বারা বর্ণিত হইয়াছে, তাহা দাবি করা হয় নাই এবং আরও একটি বর্ণনার উপর ভিত্তি করিয়া যাহা তিনি নিজে (রিচার্ড বেল্) স্বীকার করেন যে, "ঐ সনদ অত্যন্ত অনির্ভরযোগ্য ছিল"।
আরও দেখা যায়, মনে হয় রিচার্ড বেল হযরত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনার প্রথম অংশের যথার্থতা সমর্থন করেন যাহা ইবন ইসহাকের রচনায় পুনঃ উল্লিখিত হইয়াছে। কারণ বেল্- এর
মতে, এই বর্ণনাটি এইখানে "প্রাচীনতম কাঠামোতে" পাওয়া গিয়াছে। এই বর্ণনায় হযরত আয়েশা (রা) বলেন, যেমন বেল্ বর্ণনাটির বিবরণ দেন, "আল্লাহ্র রাসূল তাঁহার নিদ্রাবস্থায় সত্য দৃশ্য দেখিতে শুরু করেন। তিনি দেখেন যে, তাহারা তাঁহার নিকট প্রত্যূষের আলোর মত আসে এবং তিনি নির্জনতা পছন্দ করিতে শুরু করেন"। ৯ বেল্ জোর দিয়া বলেন, এই প্রাচীনতম ভাষ্যটি অন্য যে কোন ভাষ্যের জন্য তাঁহাকে (আয়েশাকে) দায়ী করে না। ইহা বলা যায় যে, বেল্ হাদীছের এই অংশ الرُّؤْيَا الصَّادِقَةُ (আর-রুইয়া আস্-সাদিকা)-এর সম্পূর্ণ নির্ভুল অনুবাদ করিতে পারেন নাই। তিনি ইহার অনুবাদ করেন, "সত্য দৃশ্য"। ইহার সঠিক অর্থ হইল, "সত্য স্বপ্ন," রু'ইয়া ইন স্লিপ-এর অর্থ স্বপ্ন, দৃশ্য নহে। বেল্ নিম্নলিখিত বক্তব্যটিরও যথার্থ অনুবাদ করিতে পারেন নাই, যেমন তিনি جَاءَتْهُ مِثْلَ فَلَقِ الصباح -এর অনুবাদ করেন, "তাহারা তাঁহার নিকট প্রত্যূষের আলোর ন্যায় আসে"। ইহার সঠিক অর্থ হইল, "তাহারা ভোরের আলোর মত সত্য হইয়া আসে"। উহা এমন হইতে পারে, এই বর্ণনা সম্পর্কে দুইটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন। (এক) ইহা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনার একটি অংশ মাত্র, ইহার সম্পূর্ণ অংশ নহে। রাসূলুল্লাহ কী করিয়াছিলেন অথবা তিনি (রাসূলুল্লাহ) নির্জনতা অবলম্বন করার পর তাঁহার কী হইয়াছিল, ইত্যাদি বর্ণনা করিয়া হযরত আয়েশা (রা) আকস্মিকভাবে থামিয়া যান নাই। তিনি সম্ভবত বর্ণনা ধারায় এবং ঘটনা বর্ণনার সমাপ্তিতে ইহা বলিয়াছিলেন। (দুই) নিদ্রার মধ্যে রু'ইয়া (الروا) -এর ধরন যাহাই হউক না কেন, এই ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ -এর সম্মুখে ঐ প্রেক্ষাপটে কোনও কিছু অস্তিত্বশীল বস্তুর উপস্থিতির সংকেত ছিল না। বেল্ অনুমান করিতে পারেন নাই যে, কোন বিষয়টিকে তিনি visions (দৃশ্যাবলী) অর্থে অনুবাদ করিবেন। যাহা তিনি ধারণা করেন, তাহাই কুরআনের আয়াতে (৫৩:১ - ১৮) বর্ণনা করা হইয়াছে। ইহা যদি কেবল নিদ্রাবস্থায় দৃশ্য অবলোকন করার বিষয় হইত অর্থাৎ একটি স্বপ্ন হইত, তাহা হইলে কেহই ইহা লইয়া বিতর্ক করার অথবা ইহা অস্বীকার করার বিষয়ে মাথা ঘামাইত না। প্রত্যেকের নিদ্রাবস্থায় অসাধারণ যে কোন স্বপ্নের অভিজ্ঞতা থাকিতে পারে। সুস্পষ্টভাবে বলা যায়, দৃশ্য (vision) শব্দটিই বিতর্কের বিষয় হিসাবে প্রাধান্য পাইয়াছে কুরআনের: ৫৩: ১-১৮ আয়াতে, যাহা অবশ্যই নিদ্রাবস্থায় স্বপ্ন দেখার (দৃশ্যাবলী; 'visions') চাইতে ভিন্ন এবং ইহা উপরোল্লিখিত সূরার আয়াতের বর্ণনায় স্থান পাইয়াছে।
এই ক্ষেত্রে সাধারণত যে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় তাহা এই যে, কী করিয়া এবং কখন রাসূলুল্লাহ এই অভিজ্ঞতা লাভ করেন যাহা তিনি জনসাধারণ্যে প্রকাশ করেন এবং যাহা সমালোচনার জন্ম দেয়, ঐভাবে আয়াতের মর্মে উত্থাপিত প্রশ্ন তাঁহার জন্য বর্ণনা করা" এবং সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজনীয় করিয়া তোলে। বেল কখনও নিজে এই প্রশ্ন করেন নাই, কিন্তু হযরত আয়েশা (রা)-এর যে বর্ণনা ইবন ইসহাকের রচনায় উদ্ধৃত করা হইয়াছে এবং বেল্-এর নিজস্ব তত্ত্ব এই দুইটিই এই বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে যে, এই বর্ণনার সমাপ্তিলগ্নে আরও কিছু বলার বাকী
আছে। ঐ আরও কিছু বলার বিষয় বাকী থাকার বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে হযরত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনার সঙ্গে সম্পৃক্ত যাহা বুখারী শরীফে নির্ভুল ও পরিপূর্ণভাবে দেওয়া হইয়াছে, কিন্তু ইব্ন ইসহাকের রচনায় ইহা ভিন্নভাবে এবং অনির্ভরযোগ্য পদ্ধতিতে এমন বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে দেওয়া যাহাদের অন্তত ন্যূনতম এই সততাটুকু ছিল যে, তাহারা এই বিবরণের সূত্র হিসাবে হযরত আয়েশা (রা)-র নাম উল্লেখ করেন নাই।
তাহান্নুছ সম্পর্কিত ঘটনার সম্ভাবনা বাতিল এবং ওয়ারাকার সঙ্গে রাসূলুল্লাহ-এর কথোপকথনের সম্ভাবনা বাতিল করার সময় বেল্ তাহার বক্তব্যের কোথায়ও ওয়ারাকার সঙ্গে রাসূলুল্লাহ-এর যোগাযোগ করার সম্ভাবনার কথা বাতিল করেন নাই এবং একইভাবে খৃস্টবাদের জ্ঞানসম্পন্ন ও ইহার ধর্মশাস্ত্রে অভিজ্ঞ অন্যান্য মানুষের সঙ্গেও তাঁহার (রাসূলের) যোগাযোগের কথা বাতিল করেন নাই। প্রকৃতপক্ষে এই ধরনের যোগাযোগের বিষয় বেল্-এর অপর এক থিসিস "The Origin of Islam in its Christian Environment" -এ সন্দেহাতীতভাবে বর্ণিত হইয়াছে। ১০ যাহা হউক, সম্ভবত এখানেও তিনি এই ইঙ্গিত দেন যে, রাসূলুল্লাহ তাঁহার নবুওয়াতী জীবনধারার প্রাথমিক অভিজ্ঞতার বর্ণনা করিয়াছিলেন। যেমন, তিনি যদি এই রকম ঘটনার উপলক্ষ না হইতেন অর্থাৎ তাঁহার যদি এই রকম ঘটনার অভিজ্ঞতা না থাকিত, তাহা হইলে এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার কোন প্রয়োজন হইত না। সুতরাং এই ক্ষেত্রে কতিপয় প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। কাহার নিকট রাসূলুল্লাহ সর্বপ্রথম তাঁহার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন, ইহা যদি না হয়, যেমন তাঁহার স্ত্রী হযরত খাদীজা (রা) এবং তাহাদের আত্মীয় ওয়ারাকা, যিনি সর্বতোভাবে অন্যতম একজন হিসাবে সহানুভূতি ও মনোযোগের সঙ্গে তাঁহার কথা শ্রবণ করেন। হেরা পর্বতের গুহায় তাহান্নুছ-এর অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তীতে ওয়ারাকার সঙ্গে আলোচনা এই উভয় ঘটনাই হযরত আয়েশা (রা)-র বর্ণনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এইভাবে এই বিষয়ের মূল প্রকৃতি মূর্ত হইয়া উঠিয়াছে এবং সর্বোপরি বেল্-এর নিজস্ব যুক্তি-পদ্ধতির সঙ্গে ইহার মিল রহিয়াছে।
📄 দুই: কুরআন-পূর্ব বক্তব্যসমূহ সম্পর্কে ধারণা
দ্বিতীয় ধারণা সম্পর্কে বলা যায় যে, কুরআনের ৫৩: ১-১৮ আয়াত-এ "দৃশ্য” (visions) সম্পর্কে বর্ণনার পূর্বে রাসূলুল্লাহ কতিপয় পদ্ধতির কথা বলেন, কিন্তু কুরআনের বক্তব্য প্রকাশ করা অথবা কুরআনের "রচনা" সম্পর্কে কিছু বলেন নাই। এই সম্পর্কে বেল্-এর যুক্তিগুলি নিম্নে বর্ণনা করা হইল :
(ক) কুরআনের আয়াতে বর্ণিত 'ইয়ানতিকু' ينطق (আয়াত ৩) একটি সাধারণ শব্দ এবং শব্দটি কুরআনের আবৃত্তির ক্ষেত্রে কোন অনুষঙ্গ নহে”। (খ) 'কুরআন' শব্দটি সিরীয় ভাষার শব্দ Qeryånå হইতে উদ্ভূত। ঐ সময় হইতে কুরআন সরবরাহের ধারণা ধর্মশাস্ত্রের দ্বারা উপস্থাপিত, খৃস্টান চার্চে বাইবেল পাঠ হইতে এই ধারণা গ্রহণ করা হয়। এইভাবে রাসূলুল্লাহ কুরআন
পাঠের পূর্বেই লোকজনের সম্মেলন ঘটাইয়াছিলেন। (গ) আওহা )اَوْحَى( শব্দটি কুরআনের সূরা আন্-নাজম-এর ৪নং আয়াতে ব্যবহৃত হইয়াছে যাহা অপরিহার্যভাবে কুরআনের শব্দাবলী বুঝায় না। উপরন্তু ওহী, )وحی( শব্দের বহুমুখী ব্যবহার কুরআনে দেখানো হইয়াছে। যেমন ইহার অর্থ "ধারণা দেওয়া”, “বিস্মৃত শব্দ জাগাইয়া দেওয়া", "উদ্বুদ্ধ করা”। ১২
এক্ষণে বেল্-এর শেষ যুক্তি (গ) প্রধানত তাহার তৃতীয় ধারণার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত যাহা উপরে পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করা হইয়াছে। উদাহরণস্বরূপ, কুরআনের ওহী )وحی( -এর প্রকৃতি। অতএব এই যুক্তি পরবর্তী অংশে আলোচনা করা হইবে। বেল্-এর প্রথম যুক্তি (ক) সম্পর্কে, যেমন রাসূলুল্লাহ প্রাথমিক পর্যায়ে কেবল বিভিন্ন পন্থায় কথা বলিতেন, কুরআন অবতরণের কথা বলিতেন না এবং তিনি একদল লোক সংগ্রহ করার পর কুরআন অবতরণের কথা প্রকাশ করেন। ইহা মূইর-এর ধারণার সরল পুনরাবৃত্তি মাত্র, যাহা ইতোপূর্বে আলোচনা করা হইয়াছে এবং ঐ ধারণার ত্রুটিসমূহ নির্দেশ করা হইয়াছে। ১৩ এই সম্পর্কিত বর্ণনায় বেল-এর নিজস্ব যৌক্তিকতা যতটুকু বর্ণিত হইয়াছে সেই দিক হইতে ইহা বলা যায় যে, তিনি সূরা আন্-নাজম-এর ৩ নং আয়াতে (৫৩: ৩) দৃষ্ট ইয়ানতিকু () শব্দটির অত্যন্ত সংকীর্ণ ও ভুল অর্থ করিয়াছেন এবং আয়াতের সার্বিক অবস্থা হইতে এই শব্দটিকে পৃথক করিয়া ফেলিয়াছেন। আয়াতের নির্ভুল অন্তর্নিহিত অর্থে অবিশ্বাসীদের আপত্তির কারণে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়—ইহার ফল এই দাঁড়ায় যে, রাসূলুল্লাহ তাহাদের নিকট যে ঘোষণা দেন তাহা আল্লাহ্র কথা ছিল না, বরং রাসূলুল্লাহ -এর নিজের কথা ছিল। ইহার উত্তরে বলা যায় যে, "রাসূলুল্লাহ তাঁহার নিজ ইচ্ছা হইতে কিছু বলেন না। ইহা আর কিছুই নহে, বরং আল্লাহ্র ওহী যাহা তাঁহার নিকট পৌঁছানো হয়"। কুরআনের বক্তব্য মা ইয়ানতিকু' )مَا يَنْطق( -এর অর্থ 'তিনি বলেন না', শুধু ইয়ানতিকু )يَنْطق( নহে, ইয়ানতিকু-এর অর্থ 'তিনি বলেন'। এই বিষয় সংক্রান্ত বর্ণনায় ইহা একটি যথাযথ ভাষার প্রকাশভঙ্গি বা বাগবৈশিষ্ট্য। ইহা কেবল সাধারণ ধারণা প্রকাশ করণার্থে "বক্তব্য" প্রদানে ব্যবহৃত হয় না, যেমন বেল্ আমাদেরকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছেন এবং ইহা এই অর্থ প্রকাশ করে যে, রাসূলুল্লাহ "কেবল কতিপয় পদ্ধতি সম্পর্কে কথা বলিয়াছেন"। ইহা এই অর্থ প্রকাশ করে যে, রাসূলুল্লাহ তাঁহার বক্তব্যে দাবি করেন যে, আল্লাহর সঙ্গে তাঁহার যোগাযোগ রহিয়াছে, অথচ অবিশ্বাসিগণ তাঁহার এই দাবি সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপন করে। ফলে কুরআনের আয়াত এই অভিযোগ পর্যায়ক্রমে খণ্ডন করিয়া ইহা প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ নিজের মন হইতে কিছু বলেন না—এই বর্ণনা তাঁহার খেয়ালী কোন অদ্ভূত কল্পনা হইতে জন্মলাভ করে নাই, কিন্তু ওহী হইল আল্লাহ্ প্রত্যাদেশ যাহা তাঁহার নিকট নাযিল করা হইয়াছে। বেল্ এই বক্তব্যের সম্পূর্ণ অপব্যাখ্যা করিয়া আয়াতের আলোচ্য বিষয় হইতে ইহাকে পৃথক করিয়া ফেলিয়াছেন। যদি রাসূলুল্লাহ এই দাবি না করিতেন যে, তিনি যাহা প্রকাশ করিয়াছেন তাহা আল্লাহ্র কথা-কুরআন, তাহা হইলে অবিশ্বাসীদের আপত্তি উত্থাপনের কোন কারণ থাকিত।
না। সুতরাং এই আপত্তির বিরুদ্ধে পাল্টা জওয়াব দেওয়ার প্রয়োজন হইত না, যেমনটি এই আলোচ্য আয়াতে প্রশ্নাতীতভাবে বিদ্যমান রহিয়াছে।
বেল্ নিজেও এই ক্ষেত্রে তাঁহার নিজের বর্ণনা-বিশ্লেষণে কিছুটা দ্বিধান্বিত ও স্ববিরোধী। তিনি এই সম্পর্কিত বিষয়ে অনুমিত কুরআন-পূর্ব বক্তব্যে বলেন যে, ওহী শব্দের অর্থ "প্রত্যাদেশের মূল পাঠের শাব্দিক বিবরণ" নহে, বরং ইহার অর্থ "পরামর্শ দেওয়া" "প্রণোদিত করা" অথবা "উদ্বুদ্ধ করা" ইত্যাদি যাহা কোন ব্যক্তির মনে তাহার নিজস্ব সত্তার বাহির হইতে আসে"। ১৪ তিনি আরও বলেন যে, রাসূলুল্লাহ এই বিষয়ে আয়াত অবতরণের পূর্বে, কেবল "ওহীর মাধ্যমেই কথা বলেন এক স্বর্গীয় ব্যক্তিত্বের পরামর্শক্রমে" যাহাকে তিনি দেখিয়াছিলেন। বেল্ সুস্পষ্টভাবে এই বিবরণ দেন কুরআনের আয়াতের প্রামাণ্য সংশ্লেষ পরিহার করার মাধ্যমে, যাহা রাসূলুল্লাহ প্রকাশ করেন তাহা তাঁহার নিজের বক্তব্য ছিল না, বরং তাঁহার নিকট অবতীর্ণ ওহী ছিল। বেল্ এইরূপে জোরপূর্বক ওহীর ব্যাখ্যা দেন, ওহীকে তিনি বলেন, কুরআন-পূর্ব বক্তব্য। কিন্তু বেল্-এর এই ব্যাখ্যার ফলে কুরআন-পূর্ব বক্তব্য এবং ওহী অবতরণের মাধ্যমে যে কুরআন গঠিত হইয়াছে, এই উভয়ের মধ্যে পার্থক্য দূর করে। এইভাবে বেল্ দ্বিধান্বিত ও স্ববিরোধী। তিনি নিজে রাসূলুল্লাহ কর্তৃক কুরআন-পূর্ব বক্তব্য সম্বলিত তাহার ধারণাকে বাতিল ঘোষণা করেন।
এই সম্পর্কে বেল্-এর অন্যান্য ধারণা এই যে, রাসূলুল্লাহ কুরআন তিলাওয়াতের ধারণা খৃস্টান চার্চে বাইবেল পাঠ হইতে গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং তিনি কেবল এই "তিলাওয়াতের” চিন্তা উদ্ভাবন করেন, যখন তিনি তাঁহার চতুষ্পার্শ্বে সমবেত সাহাবীদের মধ্যে প্রকাশ্যে (তিলাওয়াত) করেন। ইহা কেবল একটি অযৌক্তিক প্রস্তাব, যাহা তিনি সুস্পষ্টরূপে যুগপৎ মূর-এর অযৌক্তিক ধারণা দ্বারা অনুপ্রাণিত হইয়া করিয়াছেন। ওহী-পূর্ব অথবা কুরআন-পূর্ব উচ্চারণ তত্ত্ব অনুযায়ী মূর বলেন, রাসূলুল্লাহ তাঁহার একদল অনুসারী সংগ্রহের পর নিজেকে একজন রাসূল হিসাবে পরিচিত করেন এবং আল্লাহ্ নামে কথা বলেন। ১৬ অনুরূপ আপত্তি বেল্-এর ব্যাপারেও প্রযোজ্য। ইহা তো চিন্তা করাই অযৌক্তিক যে, একদল মানুষ রাসূলুল্লাহ-এর অনুসরণের জন্য আসিবে এবং তাহারা তাঁহার মর্যাদা সম্পর্কে অর্থাৎ একজন স্বর্গীয়ভাবে প্রেরিত শিক্ষক এবং তাঁহার শিক্ষা সংশ্লিষ্ট উচ্চারণ প্রত্যাদেশ সংক্রান্ত বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ী না হয়। তদুপরি, যদি রাসূলুল্লাহ সমাবেশে বক্তব্য পেশ সংক্রান্ত ধারণা খৃস্টান চার্চে বাইবেল পাঠ হইতে পাইয়া থাকিতেন, তাহা হইলে ইহা তাঁহার জন্য অপরিহার্য নহে যে, তিনি তাঁহার চতুষ্পার্শ্বে অনুসারীদের একত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করিতেন যতক্ষণ না তিনি তাঁহার হস্তে প্রস্তুত এক প্রস্থ (স্বর্গীয়) বাণী পাইতেন।
পরিশেষে বেল্-এর বিবরণ, যাহা কুরআনের আয়াত ৫৩: ১-১৮-এর "দৃশ্য” (vision) পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার অগ্রবর্তী বর্ণনা। রাসূলুল্লাহ কেবল কতিপয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ইঙ্গিত দেন যে, ৫৩: ১-১৮ আয়াতসমূহ কুরআনের সর্বপ্রথম অবতরণকৃত আয়াতসমূহের অংশবিশেষ। যাহা
হউক, ঐ বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল। ওহী অবতরণের ক্রম সম্পর্কিত বর্ণনার পার্থক্য সত্ত্বেও এই তথ্য হাদীছ দ্বারা সমর্থিত নহে। এমনকি ইহা প্রাচ্যবিদদের নিজেদের দ্বারাও সমর্থিত নহে। এমনকি রিচার্ড বেল নিজেও এই ধারণার উপর দৃঢ় থাকেন নাই এবং তিনি দ্বিধান্বিত হইয়া কিছু দিন পূর্বে বলেন, "যদি মুহাম্মাদ কুরআন উপস্থাপনে (আবৃত্তিতে) প্রেরিত হইয়া থাকেন, তাহা হইলে ‘পড়’ (ইব্রা - Recite) এই নির্দেশটি স্বাভাবিকভাবেই প্রথমে আসার কথা। ঐ যুক্তি হয়ত এক্ষণে সমালোচনামূলক মনোভাবের আবেদন সৃষ্টি করে এবং বাস্তবিকভাবে অধিকাংশ ইউরোপীয় পণ্ডিত এই আয়াতসমূহ সর্বপ্রথম অবতরণকৃত আয়াতের অন্যতম বলিয়া মানিয়া লইয়াছেন। ১৭ প্রকৃতপক্ষে বেল্ বলিতেছেন যে, ৫৩: ১-১৮ আয়াতসমূহ অবতরণের পূর্বে কুরআনের اقْرَأْ )পড় - Recite) আয়াত নাযিল হইয়াছিল। হযরত মুহাম্মাদ শুধু এক পদ্ধতিতে কথা বলিতেছিলেন না, বরং কুরআন উপস্থাপন করিতেছিলেন ৫৩: ১-১৮ আয়াতের "দৃশ্য" (vision) সম্পর্কে তথাকথিত পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার পূর্বেই।
দ্বিতীয় ধারণা সম্পর্কে বলা যায় যে, কুরআনের ৫৩: ১-১৮ আয়াত-এ "দৃশ্য” (visions) সম্পর্কে বর্ণনার পূর্বে রাসূলুল্লাহ কতিপয় পদ্ধতির কথা বলেন, কিন্তু কুরআনের বক্তব্য প্রকাশ করা অথবা কুরআনের "রচনা" সম্পর্কে কিছু বলেন নাই। এই সম্পর্কে বেল্-এর যুক্তিগুলি নিম্নে বর্ণনা করা হইল :
(ক) কুরআনের আয়াতে বর্ণিত 'ইয়ানতিকু' ينطق (আয়াত ৩) একটি সাধারণ শব্দ এবং শব্দটি কুরআনের আবৃত্তির ক্ষেত্রে কোন অনুষঙ্গ নহে”। (খ) 'কুরআন' শব্দটি সিরীয় ভাষার শব্দ Qeryånå হইতে উদ্ভূত। ঐ সময় হইতে কুরআন সরবরাহের ধারণা ধর্মশাস্ত্রের দ্বারা উপস্থাপিত, খৃস্টান চার্চে বাইবেল পাঠ হইতে এই ধারণা গ্রহণ করা হয়। এইভাবে রাসূলুল্লাহ কুরআন
পাঠের পূর্বেই লোকজনের সম্মেলন ঘটাইয়াছিলেন। (গ) আওহা )اَوْحَى( শব্দটি কুরআনের সূরা আন্-নাজম-এর ৪নং আয়াতে ব্যবহৃত হইয়াছে যাহা অপরিহার্যভাবে কুরআনের শব্দাবলী বুঝায় না। উপরন্তু ওহী, )وحی( শব্দের বহুমুখী ব্যবহার কুরআনে দেখানো হইয়াছে। যেমন ইহার অর্থ "ধারণা দেওয়া”, “বিস্মৃত শব্দ জাগাইয়া দেওয়া", "উদ্বুদ্ধ করা”। ১২
এক্ষণে বেল্-এর শেষ যুক্তি (গ) প্রধানত তাহার তৃতীয় ধারণার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত যাহা উপরে পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করা হইয়াছে। উদাহরণস্বরূপ, কুরআনের ওহী )وحی( -এর প্রকৃতি। অতএব এই যুক্তি পরবর্তী অংশে আলোচনা করা হইবে। বেল্-এর প্রথম যুক্তি (ক) সম্পর্কে, যেমন রাসূলুল্লাহ প্রাথমিক পর্যায়ে কেবল বিভিন্ন পন্থায় কথা বলিতেন, কুরআন অবতরণের কথা বলিতেন না এবং তিনি একদল লোক সংগ্রহ করার পর কুরআন অবতরণের কথা প্রকাশ করেন। ইহা মূইর-এর ধারণার সরল পুনরাবৃত্তি মাত্র, যাহা ইতোপূর্বে আলোচনা করা হইয়াছে এবং ঐ ধারণার ত্রুটিসমূহ নির্দেশ করা হইয়াছে। ১৩ এই সম্পর্কিত বর্ণনায় বেল্-এর নিজস্ব যৌক্তিকতা যতটুকু বর্ণিত হইয়াছে সেই দিক হইতে ইহা বলা যায় যে, তিনি সূরা আন্-নাজম-এর ৩ নং আয়াতে (৫৩: ৩) দৃষ্ট ইয়ানতিকু () শব্দটির অত্যন্ত সংকীর্ণ ও ভুল অর্থ করিয়াছেন এবং আয়াতের সার্বিক অবস্থা হইতে এই শব্দটিকে পৃথক করিয়া ফেলিয়াছেন। আয়াতের নির্ভুল অন্তর্নিহিত অর্থে অবিশ্বাসীদের আপত্তির কারণে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়—ইহার ফল এই দাঁড়ায় যে, রাসূলুল্লাহ তাহাদের নিকট যে ঘোষণা দেন তাহা আল্লাহ্র কথা ছিল না, বরং রাসূলুল্লাহ -এর নিজের কথা ছিল। ইহার উত্তরে বলা যায় যে, "রাসূলুল্লাহ তাঁহার নিজ ইচ্ছা হইতে কিছু বলেন না। ইহা আর কিছুই নহে, বরং আল্লাহ্র ওহী যাহা তাঁহার নিকট পৌঁছানো হয়"। কুরআনের বক্তব্য মা ইয়ানতিকু' )مَا يَنْطق( -এর অর্থ 'তিনি বলেন না', শুধু ইয়ানতিকু )يَنْطق( নহে, ইয়ানতিকু-এর অর্থ 'তিনি বলেন'। এই বিষয় সংক্রান্ত বর্ণনায় ইহা একটি যথাযথ ভাষার প্রকাশভঙ্গি বা বাগবৈশিষ্ট্য। ইহা কেবল সাধারণ ধারণা প্রকাশ করণার্থে "বক্তব্য" প্রদানে ব্যবহৃত হয় না, যেমন বেল্ আমাদেরকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছেন এবং ইহা এই অর্থ প্রকাশ করে যে, রাসূলুল্লাহ "কেবল কতিপয় পদ্ধতি সম্পর্কে কথা বলিয়াছেন"। ইহা এই অর্থ প্রকাশ করে যে, রাসূলুল্লাহ তাঁহার বক্তব্যে দাবি করেন যে, আল্লাহর সঙ্গে তাঁহার যোগাযোগ রহিয়াছে, অথচ অবিশ্বাসিগণ তাঁহার এই দাবি সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপন করে। ফলে কুরআনের আয়াত এই অভিযোগ পর্যায়ক্রমে খণ্ডন করিয়া ইহা প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ নিজের মন হইতে কিছু বলেন না—এই বর্ণনা তাঁহার খেয়ালী কোন অদ্ভূত কল্পনা হইতে জন্মলাভ করে নাই, কিন্তু ওহী হইল আল্লাহ্ প্রত্যাদেশ যাহা তাঁহার নিকট নাযিল করা হইয়াছে। বেল্ এই বক্তব্যের সম্পূর্ণ অপব্যাখ্যা করিয়া আয়াতের আলোচ্য বিষয় হইতে ইহাকে পৃথক করিয়া ফেলিয়াছেন। যদি রাসূলুল্লাহ এই দাবি না করিতেন যে, তিনি যাহা প্রকাশ করিয়াছেন তাহা আল্লাহ্র কথা-কুরআন, তাহা হইলে অবিশ্বাসীদের আপত্তি উত্থাপনের কোন কারণ থাকিত।
না। সুতরাং এই আপত্তির বিরুদ্ধে পাল্টা জওয়াব দেওয়ার প্রয়োজন হইত না, যেমনটি এই আলোচ্য আয়াতে প্রশ্নাতীতভাবে বিদ্যমান রহিয়াছে।
বেল্ নিজেও এই ক্ষেত্রে তাঁহার নিজের বর্ণনা-বিশ্লেষণে কিছুটা দ্বিধান্বিত ও স্ববিরোধী। তিনি এই সম্পর্কিত বিষয়ে অনুমিত কুরআন-পূর্ব বক্তব্যে বলেন যে, ওহী শব্দের অর্থ "প্রত্যাদেশের মূল পাঠের শাব্দিক বিবরণ" নহে, বরং ইহার অর্থ "পরামর্শ দেওয়া" "প্রণোদিত করা" অথবা "উদ্বুদ্ধ করা" ইত্যাদি যাহা কোন ব্যক্তির মনে তাহার নিজস্ব সত্তার বাহির হইতে আসে"। ১৪ তিনি আরও বলেন যে, রাসূলুল্লাহ এই বিষয়ে আয়াত অবতরণের পূর্বে, কেবল "ওহীর মাধ্যমেই কথা বলেন এক স্বর্গীয় ব্যক্তিত্বের পরামর্শক্রমে" যাহাকে তিনি দেখিয়াছিলেন। বেল্ সুস্পষ্টভাবে এই বিবরণ দেন কুরআনের আয়াতের প্রামাণ্য সংশ্লেষ পরিহার করার মাধ্যমে, যাহা রাসূলুল্লাহ প্রকাশ করেন তাহা তাঁহার নিজের বক্তব্য ছিল না, বরং তাঁহার নিকট অবতীর্ণ ওহী ছিল। বেল্ এইরূপে জোরপূর্বক ওহীর ব্যাখ্যা দেন, ওহীকে তিনি বলেন, কুরআন-পূর্ব বক্তব্য। কিন্তু বেল্-এর এই ব্যাখ্যার ফলে কুরআন-পূর্ব বক্তব্য এবং ওহী অবতরণের মাধ্যমে যে কুরআন গঠিত হইয়াছে, এই উভয়ের মধ্যে পার্থক্য দূর করে। এইভাবে বেল্ দ্বিধান্বিত ও স্ববিরোধী। তিনি নিজে রাসূলুল্লাহ কর্তৃক কুরআন-পূর্ব বক্তব্য সম্বলিত তাহার ধারণাকে বাতিল ঘোষণা করেন।
এই সম্পর্কে বেল্-এর অন্যান্য ধারণা এই যে, রাসূলুল্লাহ কুরআন তিলাওয়াতের ধারণা খৃস্টান চার্চে বাইবেল পাঠ হইতে গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং তিনি কেবল এই "তিলাওয়াতের” চিন্তা উদ্ভাবন করেন, যখন তিনি তাঁহার চতুষ্পার্শ্বে সমবেত সাহাবীদের মধ্যে প্রকাশ্যে (তিলাওয়াত) করেন। ইহা কেবল একটি অযৌক্তিক প্রস্তাব, যাহা তিনি সুস্পষ্টরূপে যুগপৎ মূর-এর অযৌক্তিক ধারণা দ্বারা অনুপ্রাণিত হইয়া করিয়াছেন। ওহী-পূর্ব অথবা কুরআন-পূর্ব উচ্চারণ তত্ত্ব অনুযায়ী মূর বলেন, রাসূলুল্লাহ তাঁহার একদল অনুসারী সংগ্রহের পর নিজেকে একজন রাসূল হিসাবে পরিচিত করেন এবং আল্লাহ্ নামে কথা বলেন। ১৬ অনুরূপ আপত্তি বেল্-এর ব্যাপারেও প্রযোজ্য। ইহা তো চিন্তা করাই অযৌক্তিক যে, একদল মানুষ রাসূলুল্লাহ-এর অনুসরণের জন্য আসিবে এবং তাহারা তাঁহার মর্যাদা সম্পর্কে অর্থাৎ একজন স্বর্গীয়ভাবে প্রেরিত শিক্ষক এবং তাঁহার শিক্ষা সংশ্লিষ্ট উচ্চারণ প্রত্যাদেশ সংক্রান্ত বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ী না হয়। তদুপরি, যদি রাসূলুল্লাহ সমাবেশে বক্তব্য পেশ সংক্রান্ত ধারণা খৃস্টান চার্চে বাইবেল পাঠ হইতে পাইয়া থাকিতেন, তাহা হইলে ইহা তাঁহার জন্য অপরিহার্য নহে যে, তিনি তাঁহার চতুষ্পার্শ্বে অনুসারীদের একত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করিতেন যতক্ষণ না তিনি তাঁহার হস্তে প্রস্তুত এক প্রস্থ (স্বর্গীয়) বাণী পাইতেন।
পরিশেষে বেল্-এর বিবরণ, যাহা কুরআনের আয়াত ৫৩: ১-১৮-এর "দৃশ্য” (vision) পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার অগ্রবর্তী বর্ণনা। রাসূলুল্লাহ কেবল কতিপয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ইঙ্গিত দেন যে, ৫৩: ১-১৮ আয়াতসমূহ কুরআনের সর্বপ্রথম অবতরণকৃত আয়াতসমূহের অংশবিশেষ। যাহা
হউক, ঐ বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল। ওহী অবতরণের ক্রম সম্পর্কিত বর্ণনার পার্থক্য সত্ত্বেও এই তথ্য হাদীছ দ্বারা সমর্থিত নহে। এমনকি ইহা প্রাচ্যবিদদের নিজেদের দ্বারাও সমর্থিত নহে। এমনকি রিচার্ড বেল নিজেও এই ধারণার উপর দৃঢ় থাকেন নাই এবং তিনি দ্বিধান্বিত হইয়া কিছু দিন পূর্বে বলেন, "যদি মুহাম্মাদ কুরআন উপস্থাপনে (আবৃত্তিতে) প্রেরিত হইয়া থাকেন, তাহা হইলে ‘পড়’ (ইব্রা - Recite) এই নির্দেশটি স্বাভাবিকভাবেই প্রথমে আসার কথা। ঐ যুক্তি হয়ত এক্ষণে সমালোচনামূলক মনোভাবের আবেদন সৃষ্টি করে এবং বাস্তবিকভাবে অধিকাংশ ইউরোপীয় পণ্ডিত এই আয়াতসমূহ সর্বপ্রথম অবতরণকৃত আয়াতের অন্যতম বলিয়া মানিয়া লইয়াছেন। ১৭ প্রকৃতপক্ষে বেল্ বলিতেছেন যে, ৫৩: ১-১৮ আয়াতসমূহ অবতরণের পূর্বে কুরআনের اقْرَأْ )পড় - Recite) আয়াত নাযিল হইয়াছিল। হযরত মুহাম্মাদ শুধু এক পদ্ধতিতে কথা বলিতেছিলেন না, বরং কুরআন উপস্থাপন করিতেছিলেন ৫৩: ১-১৮ আয়াতের "দৃশ্য" (vision) সম্পর্কে তথাকথিত পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার পূর্বেই।
📄 তিন: ওহী সম্পর্কে বেল্-এর ধারণা
এই আলোচনা আমাদিগকে বেল-এর ধারণাসমূহের ধারাবাহিকতায় তৃতীয়টিতে পৌঁছায় অর্থাৎ ওহীর প্রকৃতি ও তাৎপর্য সম্পর্কে তাহার ধারণা। তিনি ওহী সম্পর্কিত অনেক ধারণার মধ্যে কতিপয় ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করেন। ইহাদের মধ্যে একটি পরিভাষা হইল 'ওহী' ও ইহার দ্বারা প্রাপ্ত বিষয়ের কুরআনে প্রয়োগ এবং এই ভিত্তির উপর নির্ভর করিয়া তিনি জোর দেন যে, এই শব্দটির সাধারণ অর্থ "পরামর্শ", "প্রণোদনা" অথবা "উদ্বুদ্ধকরণ"। তিনি ওহীর কতিপয় উদাহরণ উল্লেখ করেন, সেই উদাহরণসমূহে আল্লাহ তাঁহার রাসূলগণকে কতিপয় বিশেষ বিষয়ে কিছু নির্দেশনা দান করেন। যেমন হযরত নূহ (আ)-কে নৌকা নির্মাণ করিতে বলেন, হযরত মূসা (আ)-কে বলেন তাঁহার উম্মতসহ রাত্রিকালে যাত্রা করিবার জন্য এবং তাঁহার লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করার জন্য এবং হযরত মুহাম্মাদ -কে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম অনুসরণ করার জন্য। এই সমস্ত ঘটনার উপর ভিত্তি করিয়া আল্লাহ্ ওহী তাঁহার রাসূলগণের নিকট আসে। উপসংহারে বেল্ বলেন যে, ওহীর অর্থ "কর্মক্ষেত্রে পথ দেখানোর জন্য পরামর্শ অথবা প্রণোদনা দান করা"। ১৮ এখানে ওহীর সাধারণ অর্থ এবং কুরআনের ওহীর বিশেষ অর্থ আলোচনার পূর্বে বেল্-এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের কতিপয় বিশেষ ত্রুটি বিশ্লেষণ করা যায়। প্রথমেই বলা যায়, তিনি যখন যুক্তি দেখান যে, ওহীর অর্থ কর্মক্ষেত্রে পথ দেখানোর জন্য পরামর্শ দান করা, তখন আমরা বুঝি যে, বেল্ সঠিকভাবে সঠিক পথে অগ্রসর হন নাই এবং তিনি এই কথা ব্যাখ্যা করেন নাই যে, কিভাবে পরামর্শ অথবা প্রণোদনা যে কথাটি তিনি অগ্রাধিকার দেন, কেমন করিয়া রাসূলের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাইত? তদুপরি তিনি যদি "পরামর্শ" ও "প্রণোদনা" এই পরিভাষাসমূহ ব্যবহার করিতে অতি মাত্রায় অভ্যস্ত না হইতেন তাহা হইলে তিনি সহজেই দেখিতে পাইতেন, যে বিষয়গুলি তিনি উল্লেখ করিয়াছেন তাহার সবগুলিই আল্লাহ্র সুস্পষ্ট "নির্দেশনা” এবং তাঁহার রাসূলগণের প্রতি সরাসরি আদেশ এবং ইহা কোনক্রমেই পরামর্শ নহে। এইসব নির্দেশনা ও
আদেশ কার্যকরভাবে পথ দেখানোর জন্য। ইহাও বলা দরকার যে, এই শব্দটি আল্লাহ্র বিধিবদ্ধ শব্দ। إقرأ (পড় Recite), এই নির্দেশ সূচক শব্দটিও আল্লাহ কর্তৃক ব্যবহৃত, বেল্ ইহাকে কুরআনের সর্বপ্রথম শব্দ বলিয়া নিজেও স্বীকার করিয়াছেন।
বেল্ মনে হয় এই বিষয়টি স্বীকার করেন যখন তিনি বলেন যে, “কার্যকরী পরামর্শ অনেক সময় বাস্তবসম্মতভাবে সরাসরি বক্তব্য তৈয়ার করে" এবং অনেক "বিষয় রহিয়াছে যাহার নিয়মনীতি পথ দেখানোর চাইতে মতবাদের উৎস হইতে পারে"। ১৯ তাহা সত্তেও তিনি জোর দেন যে, এইসব নিয়মাবলী "সব সময় খুব সংক্ষিপ্ত এক প্রস্থ বা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বক্তব্য হইয়া থাকে....., যাহা অবশ্যম্ভাবীরূপে কোন বিষয়ের পর্যালোচনা করিয়া কোন প্রশ্ন বিবেচনার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনে আলোর ঝলক সৃষ্টি করে"। ২০ কেহ এই ক্ষেত্রে মন্তব্য করিতে পারে যে, যদি চূড়ান্ত ব্যাখ্যায় ওহী অর্থ হয় "বাবৈশিষ্ট্যপূর্ণ শব্দগুচ্ছ" যাহা কোন বিষয়ে বিচার-বিবেচনা করার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিষয়বস্তুর পর্যালোচনার পর কোন ব্যক্তির মনে আলোর ঝলক সৃষ্টি করে তখন এই ক্ষেত্রে আর আল্লাহ্ প্রসঙ্গ টানিয়া আনার অথবা কোন বাহ্যিক অস্তিত্বকেও দৃশ্যপথে স্থাপন করার এবং কোন ধারণা যোগ করার দরকার নাই। যেমন বেল্ পরে কতিপয় বাক্য এই বিষয়ে লিখেন, ওহীর অর্থ "পরামর্শ", প্রণোদনা" অথবা "উদ্বুদ্ধকরণ” যাহা "কোন ব্যক্তির মনে সম্ভবত বাহির হইতে" আসে। ২১ প্রকৃত বিষয় এই যে, ওহী শব্দটি ইহার পারিভাষা হিসাবে ভাষায় পরামর্শ, প্রণোদনা অথবা উদ্বুদ্ধকরণ ইত্যাদি অর্থ বহন করে না, কোন ব্যক্তির প্রজ্ঞা এবং কোন বিষয় বিচার-বিবেচনার পর উপসংহারে উপনীত হওয়ার অর্থও প্রকাশ করে না, বরং ইহা আল্লাহ্র সঙ্গে তাঁহার নবী-রাসূলগণের যোগাযোগের অর্থ বহন করে।
নিজের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অব্যাহত রাখিয়া বেল্ বলেন, ওহীর অর্থ হইল, "যে কোন অবস্থায় কুরআনের প্রাথমিক অংশ", এমন নহে যে, ইহা শাব্দিকরূপে রাসূলুল্লাহ-এর নিকট ব্যক্ত করা হইয়াছে; বরং "কুরআন রচনার ধারণা" এই যে, কুরআন সম্পর্কে তাঁহাকে পরামর্শ দেওয়া হইয়াছে। বেল্ পরে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ-এর "ওহীর তত্ত্ব উন্নতি লাভ করে"। তিনি "এই শব্দের গুরুত্ব সম্প্রসারিত করেন মৌখিক পদ্ধতিতে যোগাযোগের প্রয়োজন মিটানোর জন্য দীর্ঘ বিষয় সম্বলিত সূরার (passage) মাধ্যমে”। এইজন্য "কতিপয় সূরায় এই বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই অন্তর্নিহিত অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে"। যেমন ১১: ৪০, ১২: ১২০, ১৮: ২৭, এবং ২০ঃ ৪৫। ২২ এইভাবে বেল্ পরামর্শ দিতে আবির্ভূত হন যে, কুরআনের অংশবিশেষ আল্লাহ্ শাব্দিক যোগাযোগের মাধ্যম এবং বাকী অংশ তাহা নহে। কিন্তু তিনি নিজে বাস্তবিকপক্ষে ঐ প্রতিশ্রুত অবস্থানে থাকেন নাই। উপরের বর্ণনা প্রদান করিয়া তিনি ইহার ফলাফল এই বলিয়া সমন্বয় করিতে চেষ্টা করেন যে, কুরআনের যে সূরাগুলির উদ্ধৃতি দেওয়া হইয়াছে, "সেইগুলি সম্ভবত অনেক পরে অবতীর্ণ হইয়াছে এবং ইহাদের সবগুলির মধ্যে প্রকৃত শাব্দিক রূপ দেওয়ার বিষয়টি পরিহার করার চেষ্টা করা হইয়াছে"। ২৩ সুস্পষ্টভাবে এই ক্ষেত্রে বেল্ তাহার চূড়ান্ত ইচ্ছা প্রকাশ করিয়া বলিয়াছেন, "প্রকৃত শাব্দিক ধারণার অর্থ প্রদান" সংক্রান্ত
বিষয়টিকে যে কোন মূল্যে "পরিহার" করেন। হয়ত কেহ ইহা পর্যবেক্ষণ করিয়া বলিতে পারে যে, ইহা অবশ্যই বিকৃত বা "পরিহার” করা সম্ভব। কিন্তু ঐ অর্থ "তাহাদের প্রকৃতিগত অন্তর্নিহিত বিষয়", যেমন বেল্ স্বীকার করেন, সম্ভবত অসতর্কভাবে।
এই ব্যাপারে ইহাও বলা যাইতে পারে যে, যখন কুরআনের কোন আয়াত তাহার ধারণার বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে, তখন বেল্ হয় ইহাকে বিলম্বিত সময়ের, নয়ত অতি প্রাচীন বলিয়া অভিহিত করেন, অর্থাৎ তাহার উদ্দেশ্য সাধনে যখন যাহা সমীচীন মনে হয় তখন তাহাই বলিয়া থাকেন। উপরে যেসব আয়াতের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে, সবগুলিই মক্কায় অবতীর্ণ, এমনকি যদি যুক্তি প্রদর্শনের কারণে ইহা স্বীকার করা হয় যে, এইসব আয়াত "সম্ভবত যুক্তিসঙ্গতভাবে বিলম্বিত। বেল তাহার দাবিতে সঙ্গতি রক্ষা করিতে পারেন নাই যখন তিনি রাসূলুল্লাহ-এর ওহী অবতরণ তত্ত্বের উন্নয়ন ঘটাইয়া ওহী শব্দের গুরুত্ব বৃদ্ধি করেন শব্দিক বিষয় বুঝানোর জন্য। তাহার বক্তব্যের সমর্থনে তিনি ৪২ঃ ৫০ আয়াত (প্রকৃতপক্ষে ৪২: ৫১) উদ্ধৃত করেন। এই আয়াতে আল্লাহ বলেন : "কোন মানুষের সঙ্গে আল্লাহ কথা বলিবেন, একমাত্র ওহীর মাধ্যম ছাড়া অথবা পর্দার আড়াল হইতে অথবা তিনি দূত প্রেরণ করেন, যিনি তাঁহার (আল্লাহ্) ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁহার নিদের্শমত যোগাযোগ করেন..."। ২৪ এই আয়াতের প্রেক্ষিতে বেল্ বলেন, ওহী পরিভাষার মাধ্যমে শাব্দিক যোগাযোগের ধারণা প্রদান করা "অসম্ভব ব্যাপার"। ২৫ ইহার কিছু সময় পরেই তিনি এই আয়াত সম্পর্কে বলেন, অন্ততপক্ষে যে কেহ মুহাম্মাদ-এর নিকট কিভাবে ওহী আসে সেই সম্পর্কে মুহাম্মাদ-এর ধারণা বুঝিতে পারে, যাহা আমাদের দৃষ্টি সমক্ষে প্রতিভাত হয়...। ২৬ এইভাবে বেল্ আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহেন যে, রাসূলুল্লাহ -এর ওহী সংক্রান্ত ধারণা উন্নতি লাভ করিয়াছে, তিনি ইহার অর্থ সম্প্রসারিত করিয়া ইহাকে শাব্দিক যোগাযোগের অর্থে প্রয়োগ করিয়াছেন। একই সময়ে আবার তিনি (বেল্) বলেন যে, ওহীর অর্থ শাব্দিক যোগাযোগ হইতে পারে না।
প্রকৃত ঘটনা এই যে, না রাসূলুল্লাহ স্ববিরোধী ছিলেন, না কুরআন পরিবর্তনশীল। বেল্ স্বয়ং কুরআন প্রদত্ত ওহীর ধারণা বুঝিতে পারেন নাই। তিনি ৪২ঃ ৫১ আয়াতের অর্থ বুঝিতেও ভুল করেন। ইহা এই অর্থ বুঝায় না যে, ওহী কোনক্রমেই শাব্দিক যোগাযোগ হইতে পারে না। ইহা তো শুধু আল্লাহ্ বাণী মানুষের কাছে পৌঁছানো তথা যোগাযোগের রীতি ও পদ্ধতি বর্ণনা করে। ইহা অনুমিত হয়, যেমন কুরআনের আয়াত বলে যে, আল্লাহ্ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন না, অর্থাৎ মুখোমুখী কথা বলেন না। বেল্ ওহীর অর্থ করেন, ইংরেজী গ্রামারের নিয়ম অনুযায়ী, আল্লাহ্র "পরোক্ষ বক্তব্য"।
বেল্-এর ইংরেজী গ্রামারের নিয়ম অনুযায়ী (ওহীকে) "পরোক্ষ বক্তব্য" বলার পর এই 'বিষয়টি পরিষ্কার হয় যে, পরবর্তীতে তিনি তাহা প্রত্যক্ষণ করেন এই বলিয়া, ৪২: ৫১ আয়াত এই স্বীকৃতি দেয় যে, যে কয়টি আয়াতে আল্লাহ সরাসরি (প্রত্যক্ষ) বক্তব্য দেন সেইখানে
তিনি “প্রথম পুরুষ এক বচন” অনুযায়ী কথা বলেন, যাহা ভুল। বেল্ লিখেন, “কুরআন শরীফ এক অথবা দুইটি আয়াতে আল্লাহ্ তাঁহার নিজস্ব প্রথম পুরুষ একবচন অনুযায়ী কথা বলেন, তু. ৫১:৫৬-৫৮, ৭৪:১১-১৫। যদি রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি আল্লাহ্র এই সরাসরি বক্তব্য ভুল হইয়া থাকে, যেমন উপরের আয়াতে স্বীকার করা হইয়াছে বলিয়া মনে হয়, তাহা হইলে ইহার চাইতে আরও কঠিন যে দাবি করা হইয়াছে প্রকৃতপক্ষে তিনি (রাসূল) আল্লাহকে দেখিয়াছেন, তাহা কিভাবে সম্ভব”।২৭
ইহা এক্ষণে বলা উচিত যে, কুরআনের আয়াত ইহা বলে নাই যে, ওহী শাব্দিক যোগাযোগ হইতে পারে না। ইহা স্বীকার করা যে, কুরআনের বর্ণনা সরাসরি আল্লাহ্ বক্তব্য (ইংরেজী গ্রামারের নিয়ম অনুযায়ী), এই কথাটি ভুল। বেল-এর সার্বিক ধারণা এই যে, কুরআন রাসূলুল্লাহ -এর নিজস্ব রচনা, তাহা ভুল এবং এটিই আলোচনার বিষয়। এইখানে কেবল একটি অথবা দুইটি আয়াত উদ্ধৃত করা হয় নাই। এমনকি ঐ আয়াতগুলি যে শাব্দিক যোগাযোগের অর্থে প্রকাশ করে, তাহা বেল্ দ্বারা সমর্থিত নহে। কিন্তু সম্পূর্ণ কুরআন, চাই কোন আয়াত “প্রত্যক্ষ বক্তব্য” অথবা “অপ্রত্যক্ষ বক্তব্য”-এর ধারণায় বিন্যস্ত হউক অথবা না হউক, কুরআন আল্লাহ্র বাণীর শাব্দিক যোগাযোগ (নিঃসন্দেহে)। আরেকটি ধারণা যে, রাসূলুল্লাহ প্রাথমিক অবস্থায় দাবি করিয়াছিলেন যে, তিনি আল্লাহকে দেখিয়াছেন, ইহাও ভুল। যাহা হউক এই ধারণা গ্রহণ করার পর ইহা দেখিতে বাকী রহিল যে, প্রকৃতপক্ষে ওহীর তাৎপর্য কি যাহা স্বয়ং কুরআন হইতে ভাস্বর হইয়া উঠিয়াছে এবং বেল্ ভুল চিন্তা করিয়া বলেন, ওহীর অর্থ “পরামর্শ” অথবা “প্রণোদনা” অথবা “উদ্বুদ্ধকরণ”।
এই আলোচনা আমাদিগকে বেল-এর ধারণাসমূহের ধারাবাহিকতায় তৃতীয়টিতে পৌঁছায় অর্থাৎ ওহীর প্রকৃতি ও তাৎপর্য সম্পর্কে তাহার ধারণা। তিনি ওহী সম্পর্কিত অনেক ধারণার মধ্যে কতিপয় ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করেন। ইহাদের মধ্যে একটি পরিভাষা হইল 'ওহী' ও ইহার দ্বারা প্রাপ্ত বিষয়ের কুরআনে প্রয়োগ এবং এই ভিত্তির উপর নির্ভর করিয়া তিনি জোর দেন যে, এই শব্দটির সাধারণ অর্থ "পরামর্শ", "প্রণোদনা" অথবা "উদ্বুদ্ধকরণ"। তিনি ওহীর কতিপয় উদাহরণ উল্লেখ করেন, সেই উদাহরণসমূহে আল্লাহ তাঁহার রাসূলগণকে কতিপয় বিশেষ বিষয়ে কিছু নির্দেশনা দান করেন। যেমন হযরত নূহ (আ)-কে নৌকা নির্মাণ করিতে বলেন, হযরত মূসা (আ)-কে বলেন তাঁহার উম্মতসহ রাত্রিকালে যাত্রা করিবার জন্য এবং তাঁহার লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করার জন্য এবং হযরত মুহাম্মাদ -কে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম অনুসরণ করার জন্য। এই সমস্ত ঘটনার উপর ভিত্তি করিয়া আল্লাহ্ ওহী তাঁহার রাসূলগণের নিকট আসে। উপসংহারে বেল্ বলেন যে, ওহীর অর্থ "কর্মক্ষেত্রে পথ দেখানোর জন্য পরামর্শ অথবা প্রণোদনা দান করা"। ১৮ এখানে ওহীর সাধারণ অর্থ এবং কুরআনের ওহীর বিশেষ অর্থ আলোচনার পূর্বে বেল্-এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের কতিপয় বিশেষ ত্রুটি বিশ্লেষণ করা যায়। প্রথমেই বলা যায়, তিনি যখন যুক্তি দেখান যে, ওহীর অর্থ কর্মক্ষেত্রে পথ দেখানোর জন্য পরামর্শ দান করা, তখন আমরা বুঝি যে, বেল্ সঠিকভাবে সঠিক পথে অগ্রসর হন নাই এবং তিনি এই কথা ব্যাখ্যা করেন নাই যে, কিভাবে পরামর্শ অথবা প্রণোদনা যে কথাটি তিনি অগ্রাধিকার দেন, কেমন করিয়া রাসূলের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাইত? তদুপরি তিনি যদি "পরামর্শ" ও "প্রণোদনা" এই পরিভাষাসমূহ ব্যবহার করিতে অতি মাত্রায় অভ্যস্ত না হইতেন তাহা হইলে তিনি সহজেই দেখিতে পাইতেন, যে বিষয়গুলি তিনি উল্লেখ করিয়াছেন তাহার সবগুলিই আল্লাহ্র সুস্পষ্ট "নির্দেশনা” এবং তাঁহার রাসূলগণের প্রতি সরাসরি আদেশ এবং ইহা কোনক্রমেই পরামর্শ নহে। এইসব নির্দেশনা ও
আদেশ কার্যকরভাবে পথ দেখানোর জন্য। ইহাও বলা দরকার যে, এই শব্দটি আল্লাহ্র বিধিবদ্ধ শব্দ। إقرأ (পড় Recite), এই নির্দেশ সূচক শব্দটিও আল্লাহ কর্তৃক ব্যবহৃত, বেল্ ইহাকে কুরআনের সর্বপ্রথম শব্দ বলিয়া নিজেও স্বীকার করিয়াছেন।
বেল্ মনে হয় এই বিষয়টি স্বীকার করেন যখন তিনি বলেন যে, “কার্যকরী পরামর্শ অনেক সময় বাস্তবসম্মতভাবে সরাসরি বক্তব্য তৈয়ার করে" এবং অনেক "বিষয় রহিয়াছে যাহার নিয়মনীতি পথ দেখানোর চাইতে মতবাদের উৎস হইতে পারে"। ১৯ তাহা সত্তেও তিনি জোর দেন যে, এইসব নিয়মাবলী "সব সময় খুব সংক্ষিপ্ত এক প্রস্থ বা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বক্তব্য হইয়া থাকে....., যাহা অবশ্যম্ভাবীরূপে কোন বিষয়ের পর্যালোচনা করিয়া কোন প্রশ্ন বিবেচনার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনে আলোর ঝলক সৃষ্টি করে"। ২০ কেহ এই ক্ষেত্রে মন্তব্য করিতে পারে যে, যদি চূড়ান্ত ব্যাখ্যায় ওহী অর্থ হয় "বাবৈশিষ্ট্যপূর্ণ শব্দগুচ্ছ" যাহা কোন বিষয়ে বিচার-বিবেচনা করার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিষয়বস্তুর পর্যালোচনার পর কোন ব্যক্তির মনে আলোর ঝলক সৃষ্টি করে তখন এই ক্ষেত্রে আর আল্লাহ্ প্রসঙ্গ টানিয়া আনার অথবা কোন বাহ্যিক অস্তিত্বকেও দৃশ্যপটে স্থাপন করার এবং কোন ধারণা যোগ করার দরকার নাই। যেমন বেল্ পরে কতিপয় বাক্য এই বিষয়ে লিখেন, ওহীর অর্থ "পরামর্শ", প্রণোদনা" অথবা "উদ্বুদ্ধকরণ” যাহা "কোন ব্যক্তির মনে সম্ভবত বাহির হইতে" আসে। ২১ প্রকৃত বিষয় এই যে, ওহী শব্দটি ইহার পারিভাষা হিসাবে ভাষায় পরামর্শ, প্রণোদনা অথবা উদ্বুদ্ধকরণ ইত্যাদি অর্থ বহন করে না, কোন ব্যক্তির প্রজ্ঞা এবং কোন বিষয় বিচার-বিবেচনার পর উপসংহারে উপনীত হওয়ার অর্থও প্রকাশ করে না, বরং ইহা আল্লাহ্র সঙ্গে তাঁহার নবী-রাসূলগণের যোগাযোগের অর্থ বহন করে।
নিজের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অব্যাহত রাখিয়া বেল্ বলেন, ওহীর অর্থ হইল, "যে কোন অবস্থায় কুরআনের প্রাথমিক অংশ", এমন নহে যে, ইহা শাব্দিকরূপে রাসূলুল্লাহ-এর নিকট ব্যক্ত করা হইয়াছে; বরং "কুরআন রচনার ধারণা" এই যে, কুরআন সম্পর্কে তাঁহাকে পরামর্শ দেওয়া হইয়াছে। বেল্ পরে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ-এর "ওহীর তত্ত্ব উন্নতি লাভ করে"। তিনি "এই শব্দের গুরুত্ব সম্প্রসারিত করেন মৌখিক পদ্ধতিতে যোগাযোগের প্রয়োজন মিটানোর জন্য দীর্ঘ বিষয় সম্বলিত সূরার (passage) মাধ্যমে”। এইজন্য "কতিপয় সূরায় এই বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই অন্তর্নিহিত অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে"। যেমন ১১: ৪0, ১২: ১২০, ১৮: ২৭, এবং ২০ঃ ৪৫। ২২ এইভাবে বেল্ পরামর্শ দিতে আবির্ভূত হন যে, কুরআনের অংশবিশেষ আল্লাহ্ শাব্দিক যোগাযোগের মাধ্যম এবং বাকী অংশ তাহা নহে। কিন্তু তিনি নিজে বাস্তবিকপক্ষে ঐ প্রতিশ্রুত অবস্থানে থাকেন নাই। উপরের বর্ণনা প্রদান করিয়া তিনি ইহার ফলাফল এই বলিয়া সমন্বয় করিতে চেষ্টা করেন যে, কুরআনের যে সূরাগুলির উদ্ধৃতি দেওয়া হইয়াছে, "সেইগুলি সম্ভবত অনেক পরে অবতীর্ণ হইয়াছে এবং ইহাদের সবগুলির মধ্যে প্রকৃত শাব্দিক রূপ দেওয়ার বিষয়টি পরিহার করার চেষ্টা করা হইয়াছে"। ২৩ সুস্পষ্টভাবে এই ক্ষেত্রে বেল্ তাহার চূড়ান্ত ইচ্ছা প্রকাশ করিয়া বলিয়াছেন, "প্রকৃত শাব্দিক ধারণার অর্থ প্রদান" সংক্রান্ত
বিষয়টিকে যে কোন মূল্যে "পরিহার" করেন। হয়ত কেহ ইহা পর্যবেক্ষণ করিয়া বলিতে পারে যে, ইহা অবশ্যই বিকৃত বা "পরিহার” করা সম্ভব। কিন্তু ঐ অর্থ "তাহাদের প্রকৃতিগত অন্তর্নিহিত বিষয়", যেমন বেল্ স্বীকার করেন, সম্ভবত অসতর্কভাবে।
এই ব্যাপারে ইহাও বলা যাইতে পারে যে, যখন কুরআনের কোন আয়াত তাহার ধারণার বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে, তখন বেল্ হয় ইহাকে বিলম্বিত সময়ের, নয়ত অতি প্রাচীন বলিয়া অভিহিত করেন, অর্থাৎ তাহার উদ্দেশ্য সাধনে যখন যাহা সমীচীন মনে হয় তখন তাহাই বলিয়া থাকেন। উপরে যেসব আয়াতের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে, সবগুলিই মক্কায় অবতীর্ণ, এমনকি যদি যুক্তি প্রদর্শনের কারণে ইহা স্বীকার করা হয় যে, এইসব আয়াত "সম্ভবত যুক্তিসঙ্গতভাবে বিলম্বিত। বেল তাহার দাবিতে সঙ্গতি রক্ষা করিতে পারেন নাই যখন তিনি রাসূলুল্লাহ-এর ওহী অবতরণ তত্ত্বের উন্নয়ন ঘটাইয়া ওহী শব্দের গুরুত্ব বৃদ্ধি করেন শব্দিক বিষয় বুঝানোর জন্য। তাহার বক্তব্যের সমর্থনে তিনি ৪২ঃ ৫০ আয়াত (প্রকৃতপক্ষে ৪২: ৫১) উদ্ধৃত করেন। এই আয়াতে আল্লাহ বলেন : "কোন মানুষের সঙ্গে আল্লাহ কথা বলেন না, একমাত্র ওহীর মাধ্যম ছাড়া অথবা পর্দার আড়াল হইতে অথবা তিনি দূত প্রেরণ করেন, যিনি তাঁহার (আল্লাহ্) ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁহার নিদের্শমত যোগাযোগ করেন..."। ২৪ এই আয়াতের প্রেক্ষিতে বেল্ বলেন, ওহী পরিভাষার মাধ্যমে শাব্দিক যোগাযোগের ধারণা প্রদান করা "অসম্ভব ব্যাপার"। ২৫ ইহার কিছু সময় পরেই তিনি এই আয়াত সম্পর্কে বলেন, অন্ততপক্ষে যে কেহ মুহাম্মাদ-এর নিকট কিভাবে ওহী আসে সেই সম্পর্কে মুহাম্মাদ-এর ধারণা বুঝিতে পারে, যাহা আমাদের দৃষ্টি সমক্ষে প্রতিভাত হয়...। ২৬ এইভাবে বেল্ আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহেন যে, রাসূলুল্লাহ -এর ওহী সংক্রান্ত ধারণা উন্নতি লাভ করিয়াছে, তিনি ইহার অর্থ সম্প্রসারিত করিয়া ইহাকে শাব্দিক যোগাযোগের অর্থে প্রয়োগ করিয়াছেন। একই সময়ে আবার তিনি (বেল্) বলেন যে, ওহীর অর্থ শাব্দিক যোগাযোগ হইতে পারে না।
প্রকৃত ঘটনা এই যে, না রাসূলুল্লাহ স্ববিরোধী ছিলেন, না কুরআন পরিবর্তনশীল। বেল্ স্বয়ং কুরআন প্রদত্ত ওহীর ধারণা বুঝিতে পারেন নাই। তিনি ৪২ঃ ৫১ আয়াতের অর্থ বুঝিতেও ভুল করেন। ইহা এই অর্থ বুঝায় না যে, ওহী কোনক্রমেই শাব্দিক যোগাযোগ হইতে পারে না। ইহা তো শুধু আল্লাহ্ বাণী মানুষের কাছে পৌঁছানো তথা যোগাযোগের রীতি ও পদ্ধতি বর্ণনা করে। ইহা অনুমিত হয়, যেমন কুরআনের আয়াত বলে যে, আল্লাহ্ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন না, অর্থাৎ মুখোমুখী কথা বলেন না। বেল্ ওহীর অর্থ করেন, ইংরেজী গ্রামারের নিয়ম অনুযায়ী, আল্লাহ্র "পরোক্ষ বক্তব্য"।
বেল্-এর ইংরেজী গ্রামারের নিয়ম অনুযায়ী (ওহীকে) "পরোক্ষ বক্তব্য" বলার পর এই 'বিষয়টি পরিষ্কার হয় যে, পরবর্তীতে তিনি তাহা প্রত্যক্ষণ করেন এই বলিয়া, ৪২: ৫১ আয়াত এই স্বীকৃতি দেয় যে, যে কয়টি আয়াতে আল্লাহ সরাসরি (প্রত্যক্ষ) বক্তব্য দেন সেইখানে
তিনি “প্রথম পুরুষ এক বচন” অনুযায়ী কথা বলেন, যাহা ভুল। বেল্ লিখেন, “কুরআন শরীফ এক অথবা দুইটি আয়াতে আল্লাহ্ তাঁহার নিজস্ব প্রথম পুরুষ একবচন অনুযায়ী কথা বলেন, তু. ৫১:৫৬-৫৮, ৭৪:১১-১৫। যদি রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি আল্লাহ্র এই সরাসরি বক্তব্য ভুল হইয়া থাকে, যেমন উপরের আয়াতে স্বীকার করা হইয়াছে বলিয়া মনে হয়, তাহা হইলে ইহার চাইতে আরও কঠিন যে দাবি করা হইয়াছে প্রকৃতপক্ষে তিনি (রাসূল) আল্লাহকে দেখিয়াছেন, তাহা কিভাবে সম্ভব”।২৭
ইহা এক্ষণে বলা উচিত যে, কুরআনের আয়াত ইহা বলে নাই যে, ওহী শাব্দিক যোগাযোগ হইতে পারে না। ইহা স্বীকার করা যে, কুরআনের বর্ণনা সরাসরি আল্লাহ্ বক্তব্য (ইংরেজী গ্রামারের নিয়ম অনুযায়ী), এই কথাটি ভুল। বেল্-এর সার্বিক ধারণা এই যে, কুরআন রাসূলুল্লাহ -এর নিজস্ব রচনা, তাহা ভুল এবং এটিই আলোচনার বিষয়। এইখানে কেবল একটি অথবা দুইটি আয়াত উদ্ধৃত করা হয় নাই। এমনকি ঐ আয়াতগুলি যে শাব্দিক যোগাযোগের অর্থে প্রকাশ করে, তাহা বেল্ দ্বারা সমর্থিত নহে। কিন্তু সম্পূর্ণ কুরআন, চাই কোন আয়াত “প্রত্যক্ষ বক্তব্য” অথবা “অপ্রত্যক্ষ বক্তব্য”-এর ধারণায় বিন্যস্ত হউক অথবা না হউক, কুরআন আল্লাহ্র বাণীর শাব্দিক যোগাযোগ (নিঃসন্দেহে)। আরেকটি ধারণা যে, রাসূলুল্লাহ প্রাথমিক অবস্থায় দাবি করিয়াছিলেন যে, তিনি আল্লাহকে দেখিয়াছেন, ইহাও ভুল। যাহা হউক এই ধারণা গ্রহণ করার পর ইহা দেখিতে বাকী রহিল যে, প্রকৃতপক্ষে ওহীর তাৎপর্য কি যাহা স্বয়ং কুরআন হইতে ভাস্বর হইয়া উঠিয়াছে এবং বেল্ ভুল চিন্তা করিয়া বলেন, ওহীর অর্থ “পরামর্শ” অথবা “প্রণোদনা” অথবা “উদ্বুদ্ধকরণ”।
📄 চার: কুরআনে ওহী এবং কুরআনিক ওহী
ইহা এক সাধারণ জ্ঞানের বিষয় যে, কুরআনের সত্তর-এরও অধিক স্থানে ওহী শব্দটি (ইহার ভিন্ন ভিন্ন শব্দরূপ অনুযায়ী) উল্লিখিত হইয়াছে। কুরআনের মূল পাঠ ও বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে ওহী শব্দটি বিস্তৃত বহুমুখী অর্থ ও ধারণা বহন করে, ইহা অত্যন্ত স্বাভাবিক। প্রত্যেক ভাষায়ই কতগুলি বিশেষ শব্দ রহিয়াছে, যে শব্দের প্রত্যেকটি বহুমুখী অর্থে ব্যবহৃত হয়। কোন কোন সময় এমনও হয় যে, পরিবেশ-পরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিকতা অনুসারে একটি শব্দ সরাসরি অন্য শব্দের বিপরীতমুখী অর্থ প্রকাশ করে। এই ধরনের অবস্থায় একটি শব্দের নির্দিষ্ট অর্থ বাহির করা সহজসাধ্যও নহে, এমনকি সম্ভবত প্রত্যাশিতও নহে অথবা এমন অর্থ নিশ্চিত করা যাহা সকল প্রেক্ষিত ও অবস্থায় ইহার ব্যবহারের সঙ্গে যথার্থ হইবে। বেল্ ওহীর পরিভাষা সম্পর্কে ঐ রকম কিছু প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন। তিনি কুরআনের কতিপয় আয়াতের উদাহরণ উল্লেখ করেন যেসব আয়াতে ঐ ধরনের শব্দ দৃষ্ট হয়, যেমন মধু মক্ষিকার প্রতি ওহী, এক শয়তানের অন্য শয়তানের প্রতি ওহী, পৃথিবীর প্রতি ওহী ইত্যাদি। এবং পরে তিনি বলেন, এই সকল উদাহরণের ভিত্তিতে ওহী পরিভাষার শুদ্ধ ইংরেজী রূপান্তর হওয়া উচিত “পরামর্শ”, “প্রণোদনা” অথবা “উদ্বুদ্ধকরণ”।
কুরআন সম্পর্কে যাহাদের মোটামুটি জ্ঞান আছে তাহাদের সকলের নিকট ইহা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হওয়া উচিত যে, কুরআনের শব্দ ব্যবহার রীতি সম্পর্কে বেল্-এর জরিপ কোনভাবেই বুদ্ধিমত্তাপূর্ণও নহে, এমনকি বস্তুনিষ্ঠও নহে। তিনি তাহার আলোচনার মূল বিষয়ের সহায়তার জন্য এমন কিছু আয়াত নির্বাচন করিয়াছেন, যে ক্ষেত্রে সেই শব্দটি মূল পাঠের শাব্দিক যোগাযোগের অর্থ বুঝায় না। এইজন্য সে বিষয়টি তিনি "পরিহার" করার ইচ্ছায় স্বীকার করিয়া লইয়াছেন, সেই ক্ষেত্রেও ঐ ধারণা একটি "স্বাভাবিক" বিষয়। ইহার পরেও তিনি তাহার বক্তব্যে যে অর্থ উপস্থাপন করিয়াছেন সেই অর্থ তাহার উদ্ধৃত দৃষ্টান্তের ব্যাপারে যথেষ্টও নহে এবং যথাযথও নহে। তদ্রূপ রাসূলুল্লাহ-এর উপর ওহী নাযিলের দৃষ্টান্ত যাহাকে তিনি বাস্তব আচরণের দিক বলেন, যাহা প্রথমেই বর্ণিত হইয়াছে, এই পরিভাষার অর্থ সেই রকমই হওয়া উচিত যেমন আদেশ অথবা নির্দেশনা এবং কেবল পরামর্শ অথবা প্রণোদনার অর্থ নহে। আরও বলা যায় যে, 'ইব্রা' সূরায় ওহী শব্দটি দৃষ্ট হয় না। কিন্তু বেল্ নিজে এই সূরা 'ইকরা'-কে ওহীর অংশ হিসাবে স্বীকার করেন এবং এইখানে ওহীর অর্থ (অর্থাৎ 'ইকরা'র অর্থ করেন আদেশ, পরামর্শ নহে। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় যে, পৃথিবীকে প্রেরিত শেষ বিচারের দিন সম্পর্কিত ওহীর অর্থ পরামর্শ অথবা প্রণোদনা হইতে পারে। প্রকৃতপক্ষে রিচার্ড বেল্ এই বলিয়া একটি ভুল করেন যে, পৃথিবী (মাটি) ইহার মধ্যস্থ মরদেহগুলি বাহির করিয়া দিতে প্রণোদিত হইবে-৯৯৪ ৪-৫ আয়াতের অর্থ, "ঐ দিন সে ইহার বিষয়গুলি সম্পর্কে বলিতে থাকিবে। কারণ তোমার প্রভু ইহার নিকট ওহী প্রেরণ করিবেন"। এইখানে সুস্পষ্ট অর্থ এই যে, আল্লাহ্ পৃথিবীকে আদেশ করিবেন, একই সাথে পৃথিবীকে ইহার বিষয়গুলি সম্পর্কে কথা বলার ক্ষমতাও দান করিবেন। এইখানে ওহী দ্বৈত অর্থ বহন করে। প্রত্যেকেরই এই কথা জানা আছে যে, পৃথিবী বর্তমানে যে অবস্থায় আছে তাহাতে ইহার কথা বলার ক্ষমতা নাই এবং কেবল কোন পরামর্শ অথবা প্রণোদনা ইহাকে কথা বলাইতে পারিবে না। এই ক্ষেত্রে বেল্-এর জরীপের বাহিরে কেবল একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যাইতে পারে, "ঐগুলি অদৃশ্য সংবাদের মধ্য হইতে কতিপয় বিষয় যাহা আমি তোমাকে ওহীর মাধ্যমে জ্ঞাত করিয়াছি"। ৩:৪৪ ... ذلك مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوْحِيه اليْك। ২৮ এইখানে 'ওহী' পরিভাষাটির সুস্পষ্ট অর্থ হইল, কতিপয় বিষয় সম্পর্কে যোগাযোগ অর্থবা তথ্যগত বর্ণনা অদৃশ্য (অজ্ঞাত) বিষয় সম্পর্কে এবং ইহা কোনক্রমেই অজ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া অথবা উদ্বুদ্ধ করা নহে।
অথচ বেল্ কর্তৃক কথিত অর্থ বর্ণিত বিষয়ের সঠিক ধারণা যথাযথভাবে এবং পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করে না, যদিও উদাহরণস্বরূপ তিনি ইহার দৃষ্টান্তসমূহ উল্লেখ করিয়াছেন। বাস্তবিকপক্ষে যদি আরবী 'ওহী' শব্দের তুল্য ইংরেজী শব্দের প্রয়োজন হয়, তাহা হইলে পরামর্শ, প্রণোদনা ইত্যাদি শব্দের চাইতে এই শব্দ হওয়া উচিত "যোগাযোগ" (Communication)। এই শব্দটি সকল অবস্থায় যথাযথ হইবে।
যে সময় 'হইতে ওহী শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন বিষয় ও পরিস্থিতি বুঝাইতে, ইহার দ্বারা কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের অর্থ বুঝাইতে হইলে ইহার ব্যবহার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে
একমাত্র ঐ নির্দিষ্ট বিষয়েই ব্যবহার করিতে হইবে। ঐ বিষয়ের ভিত্তিতে ইসলাম ধর্মীয় আলাপ-আলোচনায় ওহী পরিভাষাটি কেবল আল্লাহ তাঁহার প্রেরিত নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে যোগাযোগের বিষয় বুঝাইতে প্রযোজ্য। অন্য কথায় বলা যায়, ওহী শব্দটির পারিভাষিক অর্থ ইহার সাধারণ অর্থ হইতে পৃথক। ইহার অর্থ আল্লাহ্র সঙ্গে তাঁহার রাসূলগণের যোগাযোগ এবং তদ্রূপ ইংরেজী শব্দ Communication। ওহীর অর্থ যোগাযোগের কাজ অথবা যোগাযোগের পদ্ধতি —এই উভয়টিই (ক্রিয়া অনুযায়ী) হইতে পারে এবং অনুরূপভাবে যাহা যোগাযোগ স্থাপন করে (অর্থাৎ যোগোযোগের বিষয়বস্তু)। এইভাবে ওহী শব্দটি ইহার যোগাযোগের ধরন অথবা পদ্ধতির বিভিন্ন প্রকারভেদ ব্যবহার হইতে পারে। এমনকি বিষয়বস্তুর প্রকৃতিভেদে ব্যবহারবিধি ভিন্নও হইতে পারে।
উপরোল্লিখিত পবিত্র কুরআনের ৪২: ৫১ আয়াতে রাসূলগণের নিকট ওহী আগমনের ধরন অথবা পদ্ধতি সম্পর্কে বলা হইয়াছে। এই আয়াত তিনটি পদ্ধতি নির্দেশ করে, এই পদ্ধতিতেই আল্লাহর বাণী তাঁহার নির্বাচিত ব্যক্তির নিকট পৌঁছায়। যেমন পদ্ধতি ৩টি এইঃ (ক) প্রত্যক্ষ ওহীর মাধ্যমে, (খ) পর্দার আড়াল হইতে এবং (গ) দূত প্রেরণের মাধ্যমে ফেরেশতা জিবরীল (আ)-এর মাধ্যমে যিনি "আল্লাহ্র আদেশ ও আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী যোগাযোগ (Communication) করেন"। ইহা লক্ষ্য করা যাইতে পারে যে, প্রথম পদ্ধতির ওহীর ধরনের কথা এখানে আর বিস্তারিত বলা হয় নাই। সুস্পষ্টভাবে ইহার মধ্যে অপর দুইটি পদ্ধতি ছাড়া বাকী সকল পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ -এর বর্ণনা অনুযায়ী, ওহী কোন কোন সময় তাঁহার নিকট ঘন্টাধ্বনির মত প্রতিধ্বনিত হইয়া )صلصلة الجرس( আসিত এবং ইহা এমন একটি পদ্ধতি ছিল যাহা তাঁহার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হইত। ২৯ এই পদ্ধতিকেই প্রথম পদ্ধতি হিসাবে আখ্যায়িত করা যাইতে পারে। ওহীর দ্বিতীয় পদ্ধতির একটি উদাহরণ হযরত মূসা (আ)-এর সঙ্গে আল্লাহ্ কথোপকথনের ঘটনা, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আ)-এর দৃষ্টির আড়ালে থাকিয়া কথা বলেন। ওহী অবতরণের তৃতীয় পদ্ধতি, স্বব্যাখ্যা প্রদানযোগ্য বিষয় এবং এই পদ্ধতি নিউ টেস্টামেন্টে উল্লেখ করা হইয়াছে।
অনুরূপভাবে যোগাযোগের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করিয়া ওহী বিভিন্ন ধরনের হইতে পারে এবং এই বিভিন্ন পদ্ধতি বিষয়বস্তু অনুযায়ী হয়। ওহীর একমাত্র বিশেষ পদ্ধতিতে বাইবেল বিন্যস্তকৃত অথবা পঠন (Recitation) পদ্ধতি হইতে )وَحَى مَتْلُو( কুরআন বিন্যস্ত (কুরআন( অনুরূপ হযরত মূসা (আ)-কে যখন বাস্তব জীবনের একটি আচরণ অনুসরণ করিতে বলা হয়, যেমন তাঁহার লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করা, উহা অবশ্যই ওহী ছিল, কেবল তাওরাত নহে। উহা একমাত্র তাহাই যাহা সুনির্দিষ্টভাবে তাওরাত হিসাবে যোগাযোগযোগ্য ছিল এবং উহা তাওরাতই ছিল। তেমনি অনেক ধরনের ওহী কেবল হযরত মুহাম্মাদ -এর নিকট আসিয়াছে, যাহা কুরআন হিসাবে যোগাযোগযোগ্য এবং তাহা কেবল কুরআনই এবং এই পদ্ধতির
ওহীকেই 'কুরআনিক ওহী' বলা হয়। এই কারণে যে, যখন কুরআনের প্রতিটি শব্দ সন্দেহতীতভাবে ওহী। তবে হযরত মুহাম্মাদ -এর নিকট আগত প্রতিটি ওহীই কুরআন নহে। তাঁহার প্রতি অবতারিত এই ধরনের অনেক কুরআন বহির্ভূত ওহীর উদাহরণ রহিয়াছে, যেমন হাদাছে কুদ্সী, রাসূলুল্লাহ-এর হিজরতের স্থানের ধরন সম্পর্কে স্বপ্নে তাঁহাকে জানানো সংক্রান্ত ওহী ইত্যাদি।
উপরের আলোচনা হইতে ইহা পরিষ্কার হওয়া উচিত যে, কুরআনিক ওহীর ধরন বুঝিতে হইলে আমাদের মনোযোগ কেবল কুরআনের সেই আয়াতের প্রতি নিবদ্ধ করা দরকার যে, আয়াতে ওহীকে 'রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে আল্লাহ্র যোগাযোগ' বলা হয় এবং সেই আয়াতসমূহ নহে যে আয়াতে ওহী পরিভাষাটি ইহার সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে বলিয়া দৃষ্ট হয়। যদি আমরা এইরূপ করি তাহা হইলে দেখা যাইবে যে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আয়াতে রাসূলুল্লাহ-এর নিকট কুরআন অবতরণের কথা বলা হইয়াছে এবং সেই সকল আয়াতে সুনির্দিষ্টভাবে ওহী পরিভাষাটিও ব্যবহৃত হইয়াছে। ইহা ছাড়া এমন অনেক সংখ্যক আয়াত রহিয়াছে যেইগুলিতে রাসূলুল্লাহ -এর নিকট কুরআন আগমন সম্পর্কে বলা হইয়াছে, কিন্তু ওহী পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয় নাই। প্রকৃতপক্ষে ঐগুলি পরবর্তী সময়ে নাযিলকৃত আয়াত, সে সব আয়াত কুরআনের ওহীর ধরন সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা সম্বলিত।
পবিত্র কুরআনের প্রায় ৪০টি আয়াতে ওহী পরিভাষাটি রাসূলুল্লাহ -এর নিকট ওহী নাযিল সম্পর্কিত বর্ণনায় ব্যবহৃত হইয়াছে। পক্ষান্তরে এই সকল আয়াতের বেশীরভাগে কুরআনের ওহীর ধরন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত নাই। অন্ততপক্ষে এক ডজন আয়াত ওহীর ধরন সম্পর্কিত ব্যাখ্যা সম্বলিত। এইসব আয়াত পর্যালোচনা করিয়া নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত পৌছা যায়:
(এক) স্বয়ং কুরআন ওহী এবং অন্য কিছু নহে, যাহা আবৃত্তি/পঠিত হয়। كَذَلِكَ أَرْسَلْتُكَ فِي أُمَّةٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهَا أُمَمٌ لِتَتْلُوا عَلَيْهِمُ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ....
"এইভাবে আমি তোমাকে পাঠাইয়াছি এক জাতির প্রতি যাহার পূর্বে বহু জাতি গত হইয়াছে, উহাদিগের নিকট আবৃত্তি করিবার জন্য, যাহা আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করিয়াছি” (১৩: ৩০)।
এইখানে পরিষ্কার ইঙ্গিত আছে যে, ইহা ঐ ধরনের ওহী যাহা পঠিত বিষয়। উহার অর্থ এই যে, ইহা পাঠযোগ্য বিষয়ের আঙ্গিকে বিদ্যমান এবং ইহা কেবল একটি পরামর্শ নহে যাহা কার্যে পরিণত করা হয় এবং ইহা সম্পূর্ণ নির্ভুল ও স্পষ্ট। কারণ এই ধরনের ওহী তিলাওয়াত করা হয় এবং পড়া হয়, ইহার অপর নাম কুরআন, পাঠ করা অথবা আবৃত্তি করার বস্তু।
(দুই) ইহা একটি ধর্মগ্রন্থ (পুস্তক), যাহা ওহী করা হইয়াছে অর্থাৎ ওহীর মাধ্যমে আসিয়াছে এবং যাহা পাঠযোগ্য।
وَاتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنْ كِتَابِ رَبِّكَ لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَتِهِ... (۲۷ : ۱۸) “তুমি তোমার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট তোমার প্রতিপালকের কিতাব হইতে আবৃত্তি কর। তাঁহার বাক্য পরিবর্তন করিবার কেহই নাই” (১৮: ২৭)।
أَتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الكتب... (٤٥ : ۲۹) "তুমি তোমার প্রত্যাদিষ্ট কিতাব হইতে আবৃত্তি কর” (২৯: ৪৫)।
وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ مِنَ الكتب هُوَ الْحَقُّ... (٣٥ : ٣١) “আমি তোমার প্রতি যে কিতাব অবতীর্ণ করিয়াছি তাহা সত্য” (৩৫: ৩১)।
এইভাবে যে বক্তব্যের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ -এর সঙ্গে যোগাযোগ (ওহীর মাধ্যমে) করা হয়, তাহা একটি গ্রন্থ। এমন নহে যে, তাঁহাকে একটি পুস্তক রচনার পরামর্শ দেওয়া হইয়াছিল। ইহাও উল্লেখ্য যে, এই সূরার প্রথম আয়াতে কুরআনের ওহীকে "আল্লাহর কথা" (কালিমাতিহি = كلمته) বলা হইয়াছে। জোর দিয়া বলা হইয়াছে যে, তাঁহার কথা পরিবর্তন করার শক্তি কাহারও নাই।
(তিন) যাহা ওহী করা হইয়াছে তাহা "পঠিত, পাঠযোগ্য/আবৃত্তি-কুরআন" এবং ইহা এক বিশেষ ভাষাশৈলীর মাধ্যমে।
وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ قُرْآنًا عَرَبِيًّا ... (٤٢ : ٧) "এইভাবে আমি তোমার প্রতি কুরআঁন অবতীর্ণ করিয়াছি আরবী ভাষায়" (৪২ঃ ৭)।
এইভাবে "পঠিত/ আবৃত্তিকৃত” বর্ণনা রাসূলুল্লাহ -এর নিকট ওহী করা হইয়াছে, এমন নহে যে, পাঠযোগ্য কিছু রচনা করার জন্য তাহাকে ওহী করা হইয়াছে।
(চার) রাসূলুল্লাহ প্রথমে শুনিয়া লইতেন তাঁহার নিকট কী ওহী করা হইল? ওহীর মাধ্যমে যোগাযোগ সমাপ্ত হওয়ার পূর্বে তিনি ইহা পুনরাবৃত্তি/আবৃত্তি করার জন্য তাড়াহুড়া করিতেন না।
وَلَا تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يُقْضَى إِلَيْكَ وَحْيُهُ... (١٩٤ : ٢٠) "তোমার প্রতি আল্লাহ্ ওহী সম্পূর্ণ হইবার পূর্বে কুরআন পাঠে তুমি ত্বরা করিও না" (২০: ১১৪)।
(পাঁচ) উহা কুরআনিক ওহী এবং কেবল সাধারণ কুরআন (পাঠযোগ্য) নহে, ইহা বর্ণনা/ বিবরণ সম্বলিত।
نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ بِمَا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ هَذَا الْقُرْآنَ... (১২ : ৩) "আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করিতেছি ওহীর মাধ্যমে তোমার নিকট এই কুরআন প্রেরণ করিয়া" (১২ঃ৩)।
এই আয়াতে” উত্তম বিবরণসমূহ" (the best of narrative = أَحْسَنَ الْقَصَصِ) হই ওহীর বর্ণনা যাহা কুরআন হিসাবে যোগাযোগযোগ্য। প্রকৃতপক্ষে আয়াতে উল্লিখিত শব্দ نَقُصُ )আমরা বর্ণনা করি) এবং أَوْحَيْنَا )আমরা ওহী প্রেরণ করি) শব্দ দুইটি মোটামুটি একই পরিধিযুক্ত।
(ছয়) একই বাস্তবতায় আয়াতসমূহে কুরআনের ওহীই বর্ণিত এবং কেবল কুরআনের সাধারণ বর্ণনা নহে, বরং এই কুরআনের বিভিন্ন ঘটনা ও বিষয়ের সংবাদ/বর্ণনা সম্বলিত।
تِلْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهَا إِلَيْكَ... (١1 : ৪৯) "এই সমস্ত অদৃশ্যলোকের সংবাদ আমি তোমাকে ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি" (১১:৪৯)।
ذَلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ... (১২ : ১০২) "ইহা অদৃশ্যলোকের সংবাদ-যাহা তোমাকে আমি ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি" (১২: ১০২)।
(সাত) সর্বশেষ, তবে কম গুরুত্বপূর্ণ নহে যে, কুরআন রাসূলুল্লাহ-এর নিজের রচনা নহে এবং ইহা তাহার জন্য কোন গুরুতর পাপকাজ হইবে যদি তিনি ইহাকে আল্লাহর বাণী হিসোবে ঘোষণা করেন-যাহা তাঁহার প্রতি অবতীর্ণ করা হয় নাই।
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ قَالَ أُوحِيَ إِلَيَّ وَلَمْ يُوحَ إِلَيْهِ شَيْئً وَمَنْ قَالَ سَأُنْزِلُ مِثْلَ مَا أَنْزَلَ اللهُ ... (২ : ৯৩) "যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে কিংবা বলে, আমার নিকট ওহী হয়, যদিও তাহার প্রতি নাযিল হয় না এবং সে বলে, আল্লাহ যাহা নাযিল করিয়াছেন আমিও উহার অনুরূপ নাযিল করিব-তাহার চেয়ে বড় যালিম আর কে আছে” (৬ঃ ৯৩)!
উপরে উদ্ধৃত আয়াতসমূহে কুরআনিক ওহীর বর্ণনা দেওয়া হইয়াছেঃ (ক) ইহা কতিপয় সুনির্দিষ্ট মূলপাঠ যাহা উদ্ধৃত করা হইয়াছে; (খ) উহা এমন এক গ্রন্থ যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে এবং যাহা আল্লাহ্ বাণী (কালিমাতিহি); (গ) ইহা আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করা হইয়াছে; (ঘ) রাসূলুল্লাহ দ্রুত পুনরাবৃত্তি করার আগে ওহী মনোযোগ দিয়া শুনিতেন; (ঙ) কোন কোন সময় ওহী
'বর্ণনা' এবং "প্রতিবেদন" সম্বলিত হইত; (চ) এই ওহী রাসূলুল্লাহ নিজের রচনা নহে। রাসূলের জন্য ইহা হইতে অধিক গুরুতর কোন পাপ হইত না যদি তিনি কোন পাঠ নিজে তৈরি করিয়া ইহা আল্লাহ্ বলিয়া ঘোষণা করিতেন। সকল ঘটনা বর্ণনায় নির্ভুলভাবে গ্রন্থের মূল পাঠ সংক্রান্ত বিষয়ে এবং শাব্দিক যোগাযোগের বিষয়ে জোর দেওয়া হইয়াছে এবং সকল ধারণাগত যোগাযোগ সম্পর্কে অথবা চিন্তা-ভাবনাগত বিষয়ে জোর দেওয়া হয় নাই, সর্বোপরি ওহীকে “পরামর্শ", "প্রণোদনা", "উদ্বুদ্ধকরণ" "অনুভূতি" ইত্যাদি বলা হয় নাই।
এই ঘটনাবলী কেবল ঐ ধরনের আয়াতসমূহ হইতে উদ্ধৃত করা হইয়াছে যেইগুলি 'ওহী' পরিভাষা সম্বলিত (ইহার বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারের পদ্ধতি অনুযায়ী)। যেমন রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে যোগাযোগ সংক্রান্ত ঘটনাবলী। যাহা হউক, এই আয়াতসমূহ অত্যন্ত জোরালোভাবে সম্পূরক এবং সত্য বলিয়া দৃঢ়ভাবে সমর্থনকারী অসংখ্য আয়াত দ্বারা সমর্থিত হইয়াছে। এই আয়াতগুলিও একই বিষয় আলোচনা করিয়াছে, কিন্তু ওহী পরিভাষাটি ব্যবহার করে নাই এবং সুস্পষ্টভাবে এই বিষয়টি দেখাইয়াছে যে, কুরআন রাসূলুল্লাহ-এর নিকট আক্ষরিক এবং সুনির্দিষ্ট মূল পাঠ আকারে অবতীর্ণ হইয়াছে। এই সকল আয়াত পরবর্তী সময়ে ওয়াট-এর ধারণাসমূহের উপর আলোচনার সময় পর্যালোচনা করা হইবে। তখন ইহা দেখা যাইবে যে, ওয়াট তাহার নিজস্ব ধারায় এই বিষয়টিতেই বেল্-এর ধারণা প্রমাণ করার চেষ্টা করিয়াছেন। যাহা হউক, উপরের আলোচনা হইতে ইহা সুস্পষ্ট যে, বেল্-এর বিভ্রান্তি ও ভুল-ভ্রান্তি নিম্নোক্ত বিষয়ে ধরা পড়িয়াছে:
(ক) কুরআনের পরিভাষার সাধারণ ব্যবহারের উপর তাহার মনোযোগ নিবদ্ধ হওয়া; (খ) তিনি এই কথা প্রকাশ করিতে ব্যর্থ হন যে, যে অর্থ তিনি নির্দেশ করিয়াছেন তাহা বক্তব্যের ধারণা বা অর্থ যথাযথভাবে প্রকাশ করে না, এমনকি তিনি যে বিষয় উদ্ধৃত করিয়াছেন সেই বিষয়েও নহে (অর্থাৎ দুনিয়ার প্রতি ওহী অবতরণ বিষয়ে); (গ) তাহার এই পরিভাষা সাধারণ ধারণার বা অর্থ ও পারিভাষিক অর্থের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করিতে না পারা; (ঘ) তাহার একদিকে কুরআনের ওহী এবং অপরদিকে রাসূলুল্লাহ-এর প্রতি অবতারিত কুরআন বহির্ভূত আরেক ধরনের ওহীর মধ্যে পার্থক্য চিহ্নিত করিতে না পারা; (ঙ) তিনি ঐসব আয়াতের যথাযথ বিশ্লেষণ করিতে পারেন নাই যে সব আয়াতে ওহী পরিভাষাটি ব্যবহৃত হইয়াছে এবং রাসূলুল্লাহ-এর উপর কুরআনের অবতরণের কথা বলা হইয়াছে এবং সর্বশেষ (চ) তিনি অনুরূপ বিষয়ের বহু সংখ্যক আয়াত বিবেচনায় আনেন নাই যেসব আয়াতে ওহী পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয় নাই কিন্তু 'ওহী' শব্দটি ছাড়া অন্য শব্দ প্রয়োগ ও ব্যবহার করিয়া কুরআনের 'ওহীর' প্রকৃতি সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে বিশদ বলা হইয়াছে।
উপসংহারে বলা যায়, কেহ বিশ্বাস করুক বা না করুক, কুরআন আল্লাহ্ বাণী। কিন্তু যদি কেহ কুরআনের উদাহরণের উপর ভিত্তি করিয়া ইহার প্রকৃত মতামত ঘোষণা করার চেষ্টা করে
তাহা হইলে তাহাকে ইহার উদাহরণসমূহের সার্বিক বিষয় বিবেচনায় আনিতে হইবে এবং নিজেকে কেবল ঐ সব বিষয়ের দ্বারা সন্তুষ্ট করা উচিত হইবে না যাহা যথাযথ নহে। এবং আরও বলা যায়, “স্বভাবজাত” ধারণার যে কোন বক্তব্য অথবা বর্ণনা গ্রহণ করার পরিবর্তে বিকৃতি সাধন বা ভুল অর্থ করা উচিত নহে।
ইহা এক সাধারণ জ্ঞানের বিষয় যে, কুরআনের সত্তর-এরও অধিক স্থানে ওহী শব্দটি (ইহার ভিন্ন ভিন্ন শব্দরূপ অনুযায়ী) উল্লিখিত হইয়াছে। কুরআনের মূল পাঠ ও বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে ওহী শব্দটি বিস্তৃত বহুমুখী অর্থ ও ধারণা বহন করে, ইহা অত্যন্ত স্বাভাবিক। প্রত্যেক ভাষায়ই কতগুলি বিশেষ শব্দ রহিয়াছে, যে শব্দের প্রত্যেকটি বহুমুখী অর্থে ব্যবহৃত হয়। কোন কোন সময় এমনও হয় যে, পরিবেশ-পরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিকতা অনুসারে একটি শব্দ সরাসরি অন্য শব্দের বিপরীতমুখী অর্থ প্রকাশ করে। এই ধরনের অবস্থায় একটি শব্দের নির্দিষ্ট অর্থ বাহির করা সহজসাধ্যও নহে, এমনকি সম্ভবত প্রত্যাশিতও নহে অথবা এমন অর্থ নিশ্চিত করা যাহা সকল প্রেক্ষিত ও অবস্থায় ইহার ব্যবহারের সঙ্গে যথার্থ হইবে। বেল্ ওহীর পরিভাষা সম্পর্কে ঐ রকম কিছু প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন। তিনি কুরআনের কতিপয় আয়াতের উদাহরণ উল্লেখ করেন যেসব আয়াতে ঐ ধরনের শব্দ দৃষ্ট হয়, যেমন মধু মক্ষিকার প্রতি ওহী, এক শয়তানের অন্য শয়তানের প্রতি ওহী, পৃথিবীর প্রতি ওহী ইত্যাদি। এবং পরে তিনি বলেন, এই সকল উদাহরণের ভিত্তিতে ওহী পরিভাষার শুদ্ধ ইংরেজী রূপান্তর হওয়া উচিত “পরামর্শ”, “প্রণোদনা” অথবা “উদ্বুদ্ধকরণ”।
কুরআন সম্পর্কে যাহাদের মোটামুটি জ্ঞান আছে তাহাদের সকলের নিকট ইহা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হওয়া উচিত যে, কুরআনের শব্দ ব্যবহার রীতি সম্পর্কে বেল্-এর জরিপ কোনভাবেই বুদ্ধিমত্তাপূর্ণও নহে, এমনকি বস্তুনিষ্ঠও নহে। তিনি তাহার আলোচনার মূল বিষয়ের সহায়তার জন্য এমন কিছু আয়াত নির্বাচন করিয়াছেন, যে ক্ষেত্রে সেই শব্দটি মূল পাঠের শাব্দিক যোগাযোগের অর্থ বুঝায় না। এইজন্য সে বিষয়টি তিনি "পরিহার" করার ইচ্ছায় স্বীকার করিয়া লইয়াছেন, সেই ক্ষেত্রেও ঐ ধারণা একটি "স্বাভাবিক" বিষয়। ইহার পরেও তিনি তাহার বক্তব্যে যে অর্থ উপস্থাপন করিয়াছেন সেই অর্থ তাহার উদ্ধৃত দৃষ্টান্তের ব্যাপারে যথেষ্টও নহে এবং যথাযথও নহে। তদ্রূপ রাসূলুল্লাহ-এর উপর ওহী নাযিলের দৃষ্টান্ত যাহাকে তিনি বাস্তব আচরণের দিক বলেন, যাহা প্রথমেই বর্ণিত হইয়াছে, এই পরিভাষার অর্থ সেই রকমই হওয়া উচিত যেমন আদেশ অথবা নির্দেশনা এবং কেবল পরামর্শ অথবা প্রণোদনার অর্থ নহে। আরও বলা যায় যে, 'ইব্রা' সূরায় ওহী শব্দটি দৃষ্ট হয় না। কিন্তু বেল্ নিজে এই সূরা 'ইকরা'-কে ওহীর অংশ হিসাবে স্বীকার করেন এবং এইখানে ওহীর অর্থ (অর্থাৎ 'ইকরা'র অর্থ করেন আদেশ, পরামর্শ নহে। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় যে, পৃথিবীকে প্রেরিত শেষ বিচারের দিন সম্পর্কিত ওহীর অর্থ পরামর্শ অথবা প্রণোদনা হইতে পারে। প্রকৃতপক্ষে রিচার্ড বেল্ এই বলিয়া একটি ভুল করেন যে, পৃথিবী (মাটি) ইহার মধ্যস্থ মরদেহগুলি বাহির করিয়া দিতে প্রণোদিত হইবে-৯৯৪ ৪-৫ আয়াতের অর্থ, "ঐ দিন সে ইহার বিষয়গুলি সম্পর্কে বলিতে থাকিবে। কারণ তোমার প্রভু ইহার নিকট ওহী প্রেরণ করিবেন"। এইখানে সুস্পষ্ট অর্থ এই যে, আল্লাহ্ পৃথিবীকে আদেশ করিবেন, একই সাথে পৃথিবীকে ইহার বিষয়গুলি সম্পর্কে কথা বলার ক্ষমতাও দান করিবেন। এইখানে ওহী দ্বৈত অর্থ বহন করে। প্রত্যেকেরই এই কথা জানা আছে যে, পৃথিবী বর্তমানে যে অবস্থায় আছে তাহাতে ইহার কথা বলার ক্ষমতা নাই এবং কেবল কোন পরামর্শ অথবা প্রণোদনা ইহাকে কথা বলাইতে পারিবে না। এই ক্ষেত্রে বেল্-এর জরীপের বাহিরে কেবল একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যাইতে পারে, "ঐগুলি অদৃশ্য সংবাদের মধ্য হইতে কতিপয় বিষয় যাহা আমি তোমাকে ওহীর মাধ্যমে জ্ঞাত করিয়াছি"। ৩:৪৪ ... ذلك مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوْحِيه اليْك। ২৮ এইখানে 'ওহী' পরিভাষাটির সুস্পষ্ট অর্থ হইল, কতিপয় বিষয় সম্পর্কে যোগাযোগ অর্থবা তথ্যগত বর্ণনা অদৃশ্য (অজ্ঞাত) বিষয় সম্পর্কে এবং ইহা কোনক্রমেই অজ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া অথবা উদ্বুদ্ধ করা নহে।
অথচ বেল্ কর্তৃক কথিত অর্থ বর্ণিত বিষয়ের সঠিক ধারণা যথাযথভাবে এবং পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করে না, যদিও উদাহরণস্বরূপ তিনি ইহার দৃষ্টান্তসমূহ উল্লেখ করিয়াছেন। বাস্তবিকপক্ষে যদি আরবী 'ওহী' শব্দের তুল্য ইংরেজী শব্দের প্রয়োজন হয়, তাহা হইলে পরামর্শ, প্রণোদনা ইত্যাদি শব্দের চাইতে এই শব্দ হওয়া উচিত "যোগাযোগ" (Communication)। এই শব্দটি সকল অবস্থায় যথাযথ হইবে।
যে সময় 'হইতে ওহী শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন বিষয় ও পরিস্থিতি বুঝাইতে, ইহার দ্বারা কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের অর্থ বুঝাইতে হইলে ইহার ব্যবহার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে
একমাত্র ঐ নির্দিষ্ট বিষয়েই ব্যবহার করিতে হইবে। ঐ বিষয়ের ভিত্তিতে ইসলাম ধর্মীয় আলাপ-আলোচনায় ওহী পরিভাষাটি কেবল আল্লাহ তাঁহার প্রেরিত নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে যোগাযোগের বিষয় বুঝাইতে প্রযোজ্য। অন্য কথায় বলা যায়, ওহী শব্দটির পারিভাষিক অর্থ ইহার সাধারণ অর্থ হইতে পৃথক। ইহার অর্থ আল্লাহ্র সঙ্গে তাঁহার রাসূলগণের যোগাযোগ এবং তদ্রূপ ইংরেজী শব্দ Communication। ওহীর অর্থ যোগাযোগের কাজ অথবা যোগাযোগের পদ্ধতি —এই উভয়টিই (ক্রিয়া অনুযায়ী) হইতে পারে এবং অনুরূপভাবে যাহা যোগাযোগ স্থাপন করে (অর্থাৎ যোগোযোগের বিষয়বস্তু)। এইভাবে ওহী শব্দটি ইহার যোগাযোগের ধরন অথবা পদ্ধতির বিভিন্ন প্রকারভেদ ব্যবহার হইতে পারে। এমনকি বিষয়বস্তুর প্রকৃতিভেদে ব্যবহারবিধি ভিন্নও হইতে পারে।
উপরোল্লিখিত পবিত্র কুরআনের ৪২: ৫১ আয়াতে রাসূলগণের নিকট ওহী আগমনের ধরন অথবা পদ্ধতি সম্পর্কে বলা হইয়াছে। এই আয়াত তিনটি পদ্ধতি নির্দেশ করে, এই পদ্ধতিতেই আল্লাহর বাণী তাঁহার নির্বাচিত ব্যক্তির নিকট পৌঁছায়। যেমন পদ্ধতি ৩টি এইঃ (ক) প্রত্যক্ষ ওহীর মাধ্যমে, (খ) পর্দার আড়াল হইতে এবং (গ) দূত প্রেরণের মাধ্যমে ফেরেশতা জিবরীল (আ)-এর মাধ্যমে যিনি "আল্লাহ্র আদেশ ও আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী যোগাযোগ (Communication) করেন"। ইহা লক্ষ্য করা যাইতে পারে যে, প্রথম পদ্ধতির ওহীর ধরনের কথা এখানে আর বিস্তারিত বলা হয় নাই। সুস্পষ্টভাবে ইহার মধ্যে অপর দুইটি পদ্ধতি ছাড়া বাকী সকল পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ -এর বর্ণনা অনুযায়ী, ওহী কোন কোন সময় তাঁহার নিকট ঘন্টাধ্বনির মত প্রতিধ্বনিত হইয়া )صلصلة الجرس( আসিত এবং ইহা এমন একটি পদ্ধতি ছিল যাহা তাঁহার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হইত। ২৯ এই পদ্ধতিকেই প্রথম পদ্ধতি হিসাবে আখ্যায়িত করা যাইতে পারে। ওহীর দ্বিতীয় পদ্ধতির একটি উদাহরণ হযরত মূসা (আ)-এর সঙ্গে আল্লাহ্ কথোপকথনের ঘটনা, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আ)-এর দৃষ্টির আড়ালে থাকিয়া কথা বলেন। ওহী অবতরণের তৃতীয় পদ্ধতি, স্বব্যাখ্যা প্রদানযোগ্য বিষয় এবং এই পদ্ধতি নিউ টেস্টামেন্টে উল্লেখ করা হইয়াছে।
অনুরূপভাবে যোগাযোগের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করিয়া ওহী বিভিন্ন ধরনের হইতে পারে এবং এই বিভিন্ন পদ্ধতি বিষয়বস্তু অনুযায়ী হয়। ওহীর একমাত্র বিশেষ পদ্ধতিতে বাইবেল বিন্যস্তকৃত অথবা পঠন (Recitation) পদ্ধতি হইতে )وَحَى مَتْلُو( কুরআন বিন্যস্ত (কুরআন( অনুরূপ হযরত মূসা (আ)-কে যখন বাস্তব জীবনের একটি আচরণ অনুসরণ করিতে বলা হয়, যেমন তাঁহার লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করা, উহা অবশ্যই ওহী ছিল, কেবল তাওরাত নহে। উহা একমাত্র তাহাই যাহা সুনির্দিষ্টভাবে তাওরাত হিসাবে যোগাযোগযোগ্য ছিল এবং উহা তাওরাতই ছিল। তেমনি অনেক ধরনের ওহী কেবল হযরত মুহাম্মাদ -এর নিকট আসিয়াছে, যাহা কুরআন হিসাবে যোগাযোগযোগ্য এবং তাহা কেবল কুরআনই এবং এই পদ্ধতির
ওহীকেই 'কুরআনিক ওহী' বলা হয়। এই কারণে যে, যখন কুরআনের প্রতিটি শব্দ সন্দেহতীতভাবে ওহী। তবে হযরত মুহাম্মাদ -এর নিকট আগত প্রতিটি ওহীই কুরআন নহে। তাঁহার প্রতি অবতারিত এই ধরনের অনেক কুরআন বহির্ভূত ওহীর উদাহরণ রহিয়াছে, যেমন হাদাছে কুদ্সী, রাসূলুল্লাহ-এর হিজরতের স্থানের ধরন সম্পর্কে স্বপ্নে তাঁহাকে জানানো সংক্রান্ত ওহী ইত্যাদি।
উপরের আলোচনা হইতে ইহা পরিষ্কার হওয়া উচিত যে, কুরআনিক ওহীর ধরন বুঝিতে হইলে আমাদের মনোযোগ কেবল কুরআনের সেই আয়াতের প্রতি নিবদ্ধ করা দরকার যে, আয়াতে ওহীকে 'রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে আল্লাহ্র যোগাযোগ' বলা হয় এবং সেই আয়াতসমূহ নহে যে আয়াতে ওহী পরিভাষাটি ইহার সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে বলিয়া দৃষ্ট হয়। যদি আমরা এইরূপ করি তাহা হইলে দেখা যাইবে যে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আয়াতে রাসূলুল্লাহ-এর নিকট কুরআন অবতরণের কথা বলা হইয়াছে এবং সেই সকল আয়াতে সুনির্দিষ্টভাবে ওহী পরিভাষাটিও ব্যবহৃত হইয়াছে। ইহা ছাড়া এমন অনেক সংখ্যক আয়াত রহিয়াছে যেইগুলিতে রাসূলুল্লাহ -এর নিকট কুরআন আগমন সম্পর্কে বলা হইয়াছে, কিন্তু ওহী পরিভাষাটি ব্যবহার করে নাই। প্রকৃতপক্ষে ঐগুলি পরবর্তী সময়ে নাযিলকৃত আয়াত, সে সব আয়াত কুরআনের ওহীর ধরন সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা সম্বলিত।
পবিত্র কুরআনের প্রায় ৪০টি আয়াতে ওহী পরিভাষাটি রাসূলুল্লাহ -এর নিকট ওহী নাযিল সম্পর্কিত বর্ণনায় ব্যবহৃত হইয়াছে। পক্ষান্তরে এই সকল আয়াতের বেশীরভাগে কুরআনের ওহীর ধরন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত নাই। অন্ততপক্ষে এক ডজন আয়াত ওহীর ধরন সম্পর্কিত ব্যাখ্যা সম্বলিত। এইসব আয়াত পর্যালোচনা করিয়া নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত পৌছা যায়:
(এক) স্বয়ং কুরআন ওহী এবং অন্য কিছু নহে, যাহা আবৃত্তি/পঠিত হয়। كَذَلِكَ أَرْسَلْتُكَ فِي أُمَّةٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهَا أُمَمٌ لِتَتْلُوا عَلَيْهِمُ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ....
"এইভাবে আমি তোমাকে পাঠাইয়াছি এক জাতির প্রতি যাহার পূর্বে বহু জাতি গত হইয়াছে, উহাদিগের নিকট আবৃত্তি করিবার জন্য, যাহা আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করিয়াছি” (১৩: ৩০)।
এইখানে পরিষ্কার ইঙ্গিত আছে যে, ইহা ঐ ধরনের ওহী যাহা পঠিত বিষয়। উহার অর্থ এই যে, ইহা পাঠযোগ্য বিষয়ের আঙ্গিকে বিদ্যমান এবং ইহা কেবল একটি পরামর্শ নহে যাহা কার্যে পরিণত করা হয় এবং ইহা সম্পূর্ণ নির্ভুল ও স্পষ্ট। কারণ এই ধরনের ওহী তিলাওয়াত করা হয় এবং পড়া হয়, ইহার অপর নাম কুরআন, পাঠ করা অথবা আবৃত্তি করার বস্তু।
(দুই) ইহা একটি ধর্মগ্রন্থ (পুস্তক), যাহা ওহী করা হইয়াছে অর্থাৎ ওহীর মাধ্যমে আসিয়াছে এবং যাহা পাঠযোগ্য।
وَاتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنْ كِتَابِ رَبِّكَ لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَتِهِ... (۲۷ : ۱۸) “তুমি তোমার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট তোমার প্রতিপালকের কিতাব হইতে আবৃত্তি কর। তাঁহার বাক্য পরিবর্তন করিবার কেহই নাই” (১৮: ২৭)।
أَتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الكتب... (٤٥ : ۲۹) "তুমি তোমার প্রত্যাদিষ্ট কিতাব হইতে আবৃত্তি কর” (২৯: ৪৫)।
وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ مِنَ الكتب هُوَ الْحَقُّ... (٣٥ : ٣١) "আমি তোমার প্রতি যে কিতাব অবতীর্ণ করিয়াছি তাহা সত্য" (৩৫: ৩১)।
এইভাবে যে বক্তব্যের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ -এর সঙ্গে যোগাযোগ (ওহীর মাধ্যমে) করা হয়, তাহা একটি গ্রন্থ। এমন নহে যে, তাঁহাকে একটি পুস্তক রচনার পরামর্শ দেওয়া হইয়াছিল। ইহাও উল্লেখ্য যে, এই সূরার প্রথম আয়াতে কুরআনের ওহীকে "আল্লাহর কথা" (কালিমাতিহি = كلمته) বলা হইয়াছে। জোর দিয়া বলা হইয়াছে যে, তাঁহার কথা পরিবর্তন করার শক্তি কাহারও নাই।
(তিন) যাহা ওহী করা হইয়াছে তাহা "পঠিত, পাঠযোগ্য/আবৃত্তি-কুরআন" এবং ইহা এক বিশেষ ভাষাশৈলীর মাধ্যমে।
وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ قُرْآنًا عَرَبِيًّا ... (٤٢ : ٧) "এইভাবে আমি তোমার প্রতি কুরআঁন অবতীর্ণ করিয়াছি আরবী ভাষায়" (৪২ঃ ৭)।
এইভাবে "পঠিত/ আবৃত্তিকৃত” বর্ণনা রাসূলুল্লাহ -এর নিকট ওহী করা হইয়াছে, এমন নহে যে, পাঠযোগ্য কিছু রচনা করার জন্য তাহাকে ওহী করা হইয়াছে।
(চার) রাসূলুল্লাহ প্রথমে শুনিয়া লইতেন তাঁহার নিকট কী ওহী করা হইল? ওহীর মাধ্যমে যোগাযোগ সমাপ্ত হওয়ার পূর্বে তিনি ইহা পুনরাবৃত্তি/আবৃত্তি করার জন্য তাড়াহুড়া করিতেন না।
وَلَا تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يُقْضَى إِلَيْكَ وَحْيُهُ... (١٩٤ : ٢٠) "তোমার প্রতি আল্লাহ্ ওহী সম্পূর্ণ হইবার পূর্বে কুরআন পাঠে তুমি ত্বরা করিও না" (২০: ১১৪)।
(পাঁচ) উহা কুরআনিক ওহী এবং কেবল সাধারণ কুরআন (পাঠযোগ্য) নহে, ইহা বর্ণনা/ বিবরণ সম্বলিত।
نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ بِمَا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ هَذَا الْقُرْآنَ... (১২ : ৩) "আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করিতেছি ওহীর মাধ্যমে তোমার নিকট এই কুরআন প্রেরণ করিয়া" (১২ঃ৩)।
এই আয়াতে” উত্তম বিবরণসমূহ" (the best of narrative = أَحْسَنَ الْقَصَصِ) হই ওহীর বর্ণনা যাহা কুরআন হিসাবে যোগাযোগযোগ্য। প্রকৃতপক্ষে আয়াতে উল্লিখিত শব্দ نَقُصُ )আমরা বর্ণনা করি) এবং أَوْحَيْنَا )আমরা ওহী প্রেরণ করি) শব্দ দুইটি মোটামুটি একই পরিধিযুক্ত।
(ছয়) একই বাস্তবতায় আয়াতসমূহে কুরআনের ওহীই বর্ণিত এবং কেবল কুরআনের সাধারণ বর্ণনা নহে, বরং এই কুরআনের বিভিন্ন ঘটনা ও বিষয়ের সংবাদ/বর্ণনা সম্বলিত।
تِلْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهَا إِلَيْكَ... (١1 : ৪৯) "এই সমস্ত অদৃশ্যলোকের সংবাদ আমি তোমাকে ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি" (১১:৪৯)।
ذَلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ... (১২ : ১০২) "ইহা অদৃশ্যলোকের সংবাদ-যাহা তোমাকে আমি ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি" (১২: ১০২)।
(সাত) সর্বশেষ, তবে কম গুরুত্বপূর্ণ নহে যে, কুরআন রাসূলুল্লাহ-এর নিজের রচনা নহে এবং ইহা তাহার জন্য কোন গুরুতর পাপকাজ হইবে যদি তিনি ইহাকে আল্লাহর বাণী হিসোবে ঘোষণা করেন-যাহা তাঁহার প্রতি অবতীর্ণ করা হয় নাই।
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ قَالَ أُوحِيَ إِلَيَّ وَلَمْ يُوحَ إِلَيْهِ شَيْئً وَمَنْ قَالَ سَأُنْزِلُ مِثْلَ مَا أَنْزَلَ اللهُ ... (২ : ৯৩) "যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে কিংবা বলে, আমার নিকট ওহী হয়, যদিও তাহার প্রতি নাযিল হয় না এবং সে বলে, আল্লাহ যাহা নাযিল করিয়াছেন আমিও উহার অনুরূপ নাযিল করিব-তাহার চেয়ে বড় যালিম আর কে আছে” (৬ঃ ৯৩)!
উপরে উদ্ধৃত আয়াতসমূহে কুরআনিক ওহীর বর্ণনা দেওয়া হইয়াছেঃ (ক) ইহা কতিপয় সুনির্দিষ্ট মূলপাঠ যাহা উদ্ধৃত করা হইয়াছে; (খ) উহা এমন এক গ্রন্থ যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে এবং যাহা আল্লাহ্ বাণী (কালিমাতিহি); (গ) ইহা আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করা হইয়াছে; (ঘ) রাসূলুল্লাহ দ্রুত পুনরাবৃত্তি করার আগে ওহী মনোযোগ দিয়া শুনিতেন; (ঙ) কোন কোন সময় ওহী
'বর্ণনা' এবং "প্রতিবেদন" সম্বলিত হইত; (চ) এই ওহী রাসূলুল্লাহ নিজের রচনা নহে। রাসূলের জন্য ইহা হইতে অধিক গুরুতর কোন পাপ হইত না যদি তিনি কোন পাঠ নিজে তৈরি করিয়া ইহা আল্লাহ্ বলিয়া ঘোষণা করিতেন। সকল ঘটনা বর্ণনায় নির্ভুলভাবে গ্রন্থের মূল পাঠ সংক্রান্ত বিষয়ে এবং শাব্দিক যোগাযোগের বিষয়ে জোর দেওয়া হইয়াছে এবং সকল ধারণাগত যোগাযোগ সম্পর্কে অথবা চিন্তা-ভাবনাগত বিষয়ে জোর দেওয়া হয় নাই, সর্বোপরি ওহীকে “পরামর্শ", "প্রণোদনা", "উদ্বুদ্ধকরণ" "অনুভূতি" ইত্যাদি বলা হয় নাই।
এই ঘটনাবলী কেবল ঐ ধরনের আয়াতসমূহ হইতে উদ্ধৃত করা হইয়াছে যেইগুলি 'ওহী' পরিভাষা সম্বলিত (ইহার বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারের পদ্ধতি অনুযায়ী)। যেমন রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে যোগাযোগ সংক্রান্ত ঘটনাবলী। যাহা হউক, এই আয়াতসমূহ অত্যন্ত জোরালোভাবে সম্পূরক এবং সত্য বলিয়া দৃঢ়ভাবে সমর্থনকারী অসংখ্য আয়াত দ্বারা সমর্থিত হইয়াছে। এই আয়াতগুলিও একই বিষয় আলোচনা করিয়াছে, কিন্তু ওহী পরিভাষাটি ব্যবহার করে নাই এবং সুস্পষ্টভাবে এই বিষয়টি দেখাইয়াছে যে, কুরআন রাসূলুল্লাহ-এর নিকট আক্ষরিক এবং সুনির্দিষ্ট মূল পাঠ আকারে অবতীর্ণ হইয়াছে। এই সকল আয়াত পরবর্তী সময়ে ওয়াট-এর ধারণাসমূহের উপর আলোচনার সময় পর্যালোচনা করা হইবে। তখন ইহা দেখা যাইবে যে, ওয়াট তাহার নিজস্ব ধারায় এই বিষয়টিতেই বেল্-এর ধারণা প্রমাণ করার চেষ্টা করিয়াছেন। যাহা হউক, উপরের আলোচনা হইতে ইহা সুস্পষ্ট যে, বেল্-এর বিভ্রান্তি ও ভুল-ভ্রান্তি নিম্নোক্ত বিষয়ে ধরা পড়িয়াছে:
(ক) কুরআনের পরিভাষার সাধারণ ব্যবহারের উপর তাহার মনোযোগ নিবদ্ধ হওয়া; (খ) তিনি এই কথা প্রকাশ করিতে ব্যর্থ হন যে, যে অর্থ তিনি নির্দেশ করিয়াছেন তাহা বক্তব্যের ধারণা বা অর্থ যথাযথভাবে প্রকাশ করে না, এমনকি তিনি যে বিষয় উদ্ধৃত করিয়াছেন সেই বিষয়েও নহে (অর্থাৎ দুনিয়ার প্রতি ওহী অবতরণ বিষয়ে); (গ) তাহার এই পরিভাষা সাধারণ ধারণার বা অর্থ ও পারিভাষিক অর্থের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করিতে না পারা; (ঘ) তাহার একদিকে কুরআনের ওহী এবং অপরদিকে রাসূলুল্লাহ-এর প্রতি অবতারিত কুরআন বহির্ভূত আরেক ধরনের ওহীর মধ্যে পার্থক্য চিহ্নিত করিতে না পারা; (ঙ) তিনি ঐসব আয়াতের যথাযথ বিশ্লেষণ করিতে পারেন নাই যে সব আয়াতে ওহী পরিভাষাটি ব্যবহৃত হইয়াছে এবং রাসূলুল্লাহ-এর উপর কুরআনের অবতরণের কথা বলা হইয়াছে এবং সর্বশেষ (চ) তিনি অনুরূপ বিষয়ের বহু সংখ্যক আয়াত বিবেচনায় আনেন নাই যেসব আয়াতে ওহী পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয় নাই কিন্তু 'ওহী' শব্দটি ছাড়া অন্য শব্দ প্রয়োগ ও ব্যবহার করিয়া কুরআনের 'ওহীর' প্রকৃতি সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে বিশদ বলা হইয়াছে।
উপসংহারে বলা যায়, কেহ বিশ্বাস করুক বা না করুক, কুরআন আল্লাহ্ বাণী। কিন্তু যদি কেহ কুরআনের উদাহরণের উপর ভিত্তি করিয়া ইহার প্রকৃত মতামত ঘোষণা করার চেষ্টা করে
তাহা হইলে তাহাকে ইহার উদাহরণসমূহের সার্বিক বিষয় বিবেচনায় আনিতে হইবে এবং নিজেকে কেবল ঐ সব বিষয়ের দ্বারা সন্তুষ্ট করা উচিত হইবে না যাহা যথাযথ নহে। এবং আরও বলা যায়, “স্বভাবজাত” ধারণার যে কোন বক্তব্য অথবা বর্ণনা গ্রহণ করার পরিবর্তে বিকৃতি সাধন বা ভুল অর্থ করা উচিত নহে।