📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ৪. মৃত্যু পরবর্তী জীবন (আখিরাত)

📄 ৪. মৃত্যু পরবর্তী জীবন (আখিরাত)


এই বিষয়টি প্রথম দিকের নাযিলকৃত ওহীসমূহে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করিয়া রহিয়াছে। প্রকৃতপক্ষে বিবেচনাধীন ১০টি সূরার সবগুলিতেই ইহার প্রাধান্যপূর্ণ উল্লেখ দেখা যায় এবং ইহা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ যে, মানুষের উৎপত্তি সম্পর্কে সূরা আল-'আলাক-এ উল্লেখ রহিয়াছে। সেখানেও মানুষের শেষ গন্তব্যের কথা উল্লিখিত হইয়াছে- “নিশ্চয় তুমি তোমার প্রভুর নিকট প্রত্যাবর্তন করিবে” (إِنَّ إِلَى رَبِّكَ الرُّجْعَى ) এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ অভিব্যক্তি একটি মূল সত্যকে তুলিয়া ধরে। তাহা হইতেছে পৃথিবীতে মানুষের জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব। ইহার বিপরীতে মানুষের পরকালীন জীবন অর্থাৎ আল-আখিরাতকে সর্বোত্তম ও অধিকতর স্থায়ী বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى “অথচ আখিরাতই উৎকৃষ্টতর ও স্থায়ী" (৮৭:১৭)। ৬৫ পরকালীন জীবনের শুরু হইতেছে ইহজগতের সমাপ্তি। ইহার পর মানুষের পুনরুত্থান (আল-বা'ছ) ও বিচারের দিন (আল-কিয়ামাহ; ইয়াওমুদ্দীন) কিয়ামতের দিনের একমাত্র মালিক হইবেন একমাত্র আল্লাহই। ঐ সকল অনিবার্য ঘটনাবলীর কিছু সংখ্যক স্পষ্ট বিবরণী প্রদান করা হইয়াছে। ৬৬ উদাহরণস্বরূপ আয়াত ৮১: ১-১৪ (সূরা আত-তাকবীর), ৭৩: ১২-১৪ (সূরাতুল মুয্যামমিল), ৭৪ঃ ৮-১০, ২৬- ৩১, ৩৫-৫১, ৫৩ (সূরাতুল মুদ্দাছছির), ৮৭: ১২-১৩ (সূরাতুল আ'লা), ৮৯: ২১-৩০ (সূরাতুল ফাজর) ও ৯২: ১৩-১৮ (সূরাতুল লায়ল)-এ এই বিষয়ে বিধৃত হইয়াছে। উদাহরণের জন্য প্রথমে উল্লেখিত আয়াতটির উদ্ধৃতি দেওয়া যাইতে পারে। আয়াতটি নিম্নরূপ:
اذا الشَّمْسُ كُورَتْ ، وَإِذَا النُّجُومُ انْكَدَرَتْ ، وَاذَا الجِبَالُ سَيِّرَتْ ، وَإِذَا الْعِشَارُ عطَلَتْ ، وَإِذَا الْوُحُوشِ حُشِرَتْ ، وَإِذَا الْبِحَارُ سُجِّرَتْ ، وَإِذَا النُّفُوسُ زُوجَتْ ، وَإِذَا الْمَوْعَدَةُ سُئِلَتْ ، بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ . وَإِذَا الصُّحُفُ نُشْرَتْ ، وَإِذَا السَّمَاءُ كُشِطَتْ ، وَإِذَا الْجَحِيمُ سُعْرَتْ ، وَإِذَا الْجَنَّةُ أَزْلَفَتْ ، عَلِمَتْ نَفْسٌ مَا أَحْضَرَتْ .
"সূর্য যখন নিষ্প্রভ হইবে, যখন নক্ষত্ররাজি খসিয়া পড়িবে, পর্বতসমূহকে যখন চলমান করা হইবে, যখন পূর্ণগর্ভা উষ্ট্রী উপেক্ষিত হইবে, যখন বন্য পশু একত্র করা হইবে, সমুদ্র যখন স্ফীত করা হইবে, দেহে যখন আত্মা পুনঃ সংযোজিত হইবে, যখন জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হইবে, কী অপরাধে উহাকে হত্যা করা হইয়াছিল? যখন ‘আমলনামা উন্মোচিত হইবে, যখন আকাশের আবরণ অপসারিত হইবে, জাহান্নামের অগ্নি যখন উদ্দীপিত করা হইবে, এবং জান্নাত যখন সমীপবর্তী করা হইবে, তখন প্রত্যেক ব্যক্তিই জানিবে সে কী লইয়া আসিয়াছে” (৮১:১-১৪)।
বস্তুতঃ মহানবী -এর উপর অর্পিত আল্লাহ কর্তৃক নির্দিষ্ট কাজের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হইতেছে মানুষকে তাহার পারলৌকিক জীবন সম্পর্কে স্মরণ করাইয়া দেওয়া, পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পর বিচারের দিনের এবং গুনাহগার বান্দাদিগের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা। একই সাথে তিনি নেক বান্দাগণকে অনন্ত কালব্যাপী পরম সুখের জীবনের সুসংবাদ দান করিয়াছেন। তাই কুরআনে তাঁহাকে প্রায়ই বাশীর ও নাযীর (যথাক্রমে সুসংবাদ দানকারী ও সতর্ককারী) হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে।

এই বিষয়টি প্রথম দিকের নাযিলকৃত ওহীসমূহে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করিয়া রহিয়াছে। প্রকৃতপক্ষে বিবেচনাধীন ১০টি সূরার সবগুলিতেই ইহার প্রাধান্যপূর্ণ উল্লেখ দেখা যায় এবং ইহা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ যে, মানুষের উৎপত্তি সম্পর্কে সূরা আল-'আলাক-এ উল্লেখ রহিয়াছে। সেখানেও মানুষের শেষ গন্তব্যের কথা উল্লিখিত হইয়াছে- “নিশ্চয় তুমি তোমার প্রভুর নিকট প্রত্যাবর্তন করিবে” (إِنَّ إِلَى رَبِّكَ الرُّجْعَى ) এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ অভিব্যক্তি একটি মূল সত্যকে তুলিয়া ধরে। তাহা হইতেছে পৃথিবীতে মানুষের জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব। ইহার বিপরীতে মানুষের পরকালীন জীবন অর্থাৎ আল-আখিরাতকে সর্বোত্তম ও অধিকতর স্থায়ী বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى “অথচ আখিরাতই উৎকৃষ্টতর ও স্থায়ী” (৮৭:১৭)। ৬৫ পরকালীন জীবনের শুরু হইতেছে ইহজগতের সমাপ্তি। ইহার পর মানুষের পুনরুত্থান (আল-বা'ছ) ও বিচারের দিন (আল-কিয়ামাহ; ইয়াওমুদ্দীন) কিয়ামতের দিনের একমাত্র মালিক হইবেন একমাত্র আল্লাহই। ঐ সকল অনিবার্য ঘটনাবলীর কিছু সংখ্যক স্পষ্ট বিবরণী প্রদান করা হইয়াছে। ৬৬ উদাহরণস্বরূপ আয়াত ৮১: ১-১৪ (সূরা আত-তাকবীর), ৭৩: ১২-১৪ (সূরাতুল মুয্যামমিল), ৭৪ঃ ৮-১০, ২৬- ৩১, ৩৫-৫১, ৫৩ (সূরাতুল মুদ্দাছছির), ৮৭: ১২-১৩ (সূরাতুল আ'লা), ৮৯: ২১-৩০ (সূরাতুল ফাজর) ও ৯২: ১৩-১৮ (সূরাতুল লায়ল)-এ এই বিষয়ে বিধৃত হইয়াছে। উদাহরণের জন্য প্রথমে উল্লেখিত আয়াতটির উদ্ধৃতি দেওয়া যাইতে পারে। আয়াতটি নিম্নরূপ:

اذا الشَّمْسُ كُورَتْ ، وَإِذَا النُّجُومُ انْكَدَرَتْ ، وَاذَا الجِبَالُ سَيِّرَتْ ، وَإِذَا الْعِشَارُ عطَلَتْ ، وَإِذَا الْوُحُوشِ حُشِرَتْ ، وَإِذَا الْبِحَارُ سُجِّرَتْ ، وَإِذَا النُّفُوسُ زُوجَتْ ، وَإِذَا الْمَوْعَدَةُ سُئِلَتْ ، بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ . وَإِذَا الصُّحُفُ نُشْرَتْ ، وَإِذَا السَّمَاءُ كُشِطَتْ ، وَإِذَا الْجَحِيمُ سُعْرَتْ ، وَإِذَا الْجَنَّةُ أَزْلَفَتْ ، عَلِمَتْ نَفْسٌ مَا أَحْضَرَتْ .

"সূর্য যখন নিষ্প্রভ হইবে, যখন নক্ষত্ররাজি খসিয়া পড়িবে, পর্বতসমূহকে যখন চলমান করা হইবে, যখন পূর্ণগর্ভা উষ্ট্রী উপেক্ষিত হইবে, যখন বন্য পশু একত্র করা হইবে, সমুদ্র যখন স্ফীত করা হইবে, দেহে যখন আত্মা পুনঃ সংযোজিত হইবে, যখন জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হইবে, কী অপরাধে উহাকে হত্যা করা হইয়াছিল? যখন ‘আমলনামা উন্মোচিত হইবে, যখন আকাশের আবরণ অপসারিত হইবে, জাহান্নামের অগ্নি যখন উদ্দীপিত করা হইবে, এবং জান্নাত যখন সমীপবর্তী করা হইবে, তখন প্রত্যেক ব্যক্তিই জানিবে সে কী লইয়া আসিয়াছে” (৮১:১-১৪)।

বস্তুতঃ মহানবী -এর উপর অর্পিত আল্লাহ কর্তৃক নির্দিষ্ট কাজের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হইতেছে মানুষকে তাহার পারলৌকিক জীবন সম্পর্কে স্মরণ করাইয়া দেওয়া, পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পর বিচারের দিনের এবং গুনাহগার বান্দাদিগের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা। একই সাথে তিনি নেক বান্দাগণকে অনন্ত কালব্যাপী পরম সুখের জীবনের সুসংবাদ দান করিয়াছেন। তাই কুরআনে তাঁহাকে প্রায়ই বাশীর ও নাযীর (যথাক্রমে সুসংবাদ দানকারী ও সতর্ককারী) হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ৫. ব্যক্তিগত জবাবদিহি

📄 ৫. ব্যক্তিগত জবাবদিহি


শেষ বিচারের দিনে প্রত্যেক ব্যক্তি একাকী ও ব্যক্তিগতভাবে তাহার কাজের জন্য দায়ী থাকিবে। সেই দিন সে ব্যতীত অন্য কেহ তাহার পক্ষে মধ্যস্থতাকারী অথবা প্রায়শ্চিত্যকারী হিসাবে কোন কাজে আসিবে না। পৃথিবীতে স্বীয় কাজের ফলাফল অনুসারে প্রত্যেক ব্যক্তি পুরষ্কৃত অথবা শাস্তিপ্রাপ্ত হইবে। উপরে উদ্ধৃত সূরার শেষ আয়াতে স্পষ্টভাবে ইহা উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহার সহিত আয়াত ৭৪ : ৩৮-এও উদ্ধৃত হইয়াছে:
كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ “প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের (ভালমন্দ) দায়ে আবদ্ধ”।

শেষ বিচারের দিনে প্রত্যেক ব্যক্তি একাকী ও ব্যক্তিগতভাবে তাহার কাজের জন্য দায়ী থাকিবে। সেই দিন সে ব্যতীত অন্য কেহ তাহার পক্ষে মধ্যস্থতাকারী অথবা প্রায়শ্চিত্যকারী হিসাবে কোন কাজে আসিবে না। পৃথিবীতে স্বীয় কাজের ফলাফল অনুসারে প্রত্যেক ব্যক্তি পুরষ্কৃত অথবা শাস্তিপ্রাপ্ত হইবে। উপরে উদ্ধৃত সূরার শেষ আয়াতে স্পষ্টভাবে ইহা উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহার সহিত আয়াত ৭৪ : ৩৮-এও উদ্ধৃত হইয়াছে:

كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ “প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের (ভালমন্দ) দায়ে আবদ্ধ”।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ৬. ধনবানদের সামাজিক দায়িত্ব

📄 ৬. ধনবানদের সামাজিক দায়িত্ব


পার্থিব জীবনে গভীরভাবে নিমগ্ন থাকা এবং অন্ধ বস্তুবাদের অনুসরণ ও অত্যধিক ধনলিপ্সা হেতু মানুষ পারলৌকিক জীবন ও আল্লাহ্র অবদান সম্পর্কে বিস্মৃত হইয়া পড়ে। ইহা তাহাকে শুধুমাত্র দুর্ভাগা স্বগোত্রীয়দের প্রতি স্বার্থপর, উদ্ধত ও নিষ্ঠুরই করে নাই, এমনকি তাহাকে নিজের আত্মীয়-স্বজনের প্রতিও নিষ্ঠুর করিয়াছে। এই সর্বনাশা সামাজিক ও নৈতিক ব্যাধি সম্পর্কে প্রথম দিকের ওহীসমূহে উল্লিখিত হইয়াছে এবং মানুষকে ইহার বিরুদ্ধে সতর্ক করা হইয়াছে। আয়াত নং ৮৭ : ১৬-১৭-তে মন্তব্য করা হইয়াছে :
بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَوةَ الدُّنْيَا “কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ আখিরাতই উৎকৃষ্টতর ও স্থায়ী”। ৬৭
অতঃপর ধন-সম্পদের সহিত যে প্রভুত সামাজিক দায়িত্বের সম্পর্ক রহিয়াছে তাহা তাহাকে স্মরণ করাইয়া দেওয়া হয়। এখানে উল্লেখ করা হয় যে, পরকালে সে একটি সফল ও সুখী জীবন
লাভ করিতে পারিবে যদি সে তাহার উপর ন্যস্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে। ৯২:৫-১১ নং আয়াতে উল্লেখ আছে :
فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى . وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى . فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى ، وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنى . وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى . فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى ، وَمَا يُغْنِي عَنْهُ مَالُهُ إِذَا تَرَدَّى .
“সুতরাং কেহ দান করিলে, মুত্তাকী হইলে এবং যাহা উত্তম তাহা গ্রহণ করিলে, আমি তাহার জন্য সুগম করিয়া দিব সহজ পথ (একত্ববাদের৬৬)। এবং কেহ কার্পণ্য করিলে ও নিজকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করিলে, আর যাহা উত্তম তাহা অস্বীকার করিলে, তাহার জন্য আমি সুগম করিয়া দিব কঠোর পরিণামের পথ। এবং তাহার সম্পদ তাহার কোন কাজে আসিবে না, যখন সে ধ্বংস হইবে” (৯২:৫-১১)।
এই ভাবধারাকে আরও সম্প্রসারিত করিয়া এই একই সূরাতে আরও বলা হইয়াছে, যাহারা তাহাদের কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয় তাহারা প্রকৃতপক্ষে দুর্ভাগা (الشقی) এবং তাহারাই প্রজ্জ্বলিত অগ্নিতে প্রবেশ করিবে। পক্ষান্তরে যাহারা আত্মশুদ্ধিকল্পে আল্লাহ্র পথে তাহাদের সম্পদ ব্যয় করিবে তাহাদিগকে আল্লাহ্র প্রতি সবচাইতে বেশি উৎসর্গীকৃত (الأثقی) হিসাবে গণ্য করা হইবে। ﴿ وَلسَوْفَ يَرْضى “এবং তাহারা শীঘ্রই সুখী ও সন্তুষ্ট হইবে" ৬৯
সমৃদ্ধি প্রকৃতপক্ষে মানুষের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। আল্লাহ তাআলার অনুগৃহীত ব্যক্তি হিসাবে নিজকে মনে করিয়া ইহা লইয়া গর্বে স্ফীত হওয়া তাহার উচিত নয় কিংবা দারিদ্র্য পীড়িত হইয়া পড়িলেও আল্লাহ্ সম্পর্কে হতাশ হওয়া ঠিক নয়। মানুষের ধন-দৌলতের দাস হওয়া উচিত নয় এবং ভাগ্যে যাহা তাহার প্রাপ্য নয় তাহার জন্য অন্যায়ভাবে দাবি করাও অনুচিত; বরং দরিদ্র, এতিম ও অভাবগ্রস্তদের সাহায্যার্থে তাহার সর্বদা দায়িত্ব সচেতন হওয়া কর্তব্য। মানুষের জন্য করণীয় এই শিক্ষাগুলি খুবই কার্যকরভাবে আয়াত ৯০:১৫ ২৩-এ বিধৃত হইয়াছে :
فَأَمَّا الْإِنْسَانُ إِذَا مَا ابْتَلُهُ رَبُّهُ فَاكْرَمَهُ وَنَعْمَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَكْرَمَنِ . وَأَمَّا إِذَا مَا ابْتَلُهُ فَقَدَرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَهَانَنِ . كَلأَ بَلْ لا تُكْرِمُونَ الْيَتِيمَ ، وَلَا تَحضُّونَ عَلَى طعام المسكين . وَتَأْكُلُونَ التُّرَاثَ اكلا لما . وَتُحِبُّونَ الْمَالَ حُبًّا جَمَّا . كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا . وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا . وَجَائَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ ، يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنْسَانُ وَأَنِّي لَهُ الذِّكْرَى .
“মানুষ তো এইরূপ যে, তাহার প্রতিপালক যখন তাহাকে পরীক্ষা করেন সম্মান ও অনুগ্রহ দান করিয়া, তখন সে বলে, 'আমার প্রতিপালক আমাকে সম্মানিত করিয়াছেন'। এবং যখন তাহাকে পরীক্ষা করেন তাহার জীবন উপকরণ সংকুচিত করিয়া, তখন সে বলে, 'আমার
প্রতিপালক আমাকে হীন করিয়াছেন'। না, কখনও নহে; বরং তোমরা ইয়াতীমকে সম্মান কর না এবং তোমরা অভাবগ্রস্তদিগের প্রাপ্য সম্পদ সম্পূর্ণরূপে ভক্ষণ করিয়া ফেল এবং তোমরা ধন-সম্পদ অতিশয় ভালবাস; ইহা সংগত নহে। পৃথিবীকে যখন চূর্ণবিচূর্ণ করা হইবে এবং যখন তোমার প্রতিপালক উপস্থিত হইবেন ও সারিবদ্ধভাবে ফেরেশতাগণও। সেই দিন জাহান্নামকে আনা হইবে এবং সেই দিন মানুষ উপলব্ধি করিবে, তখন এই উপলব্ধি তাহার কী কাজে আসিবে?” (৮৯: ১৫-২৩)?

পার্থিব জীবনে গভীরভাবে নিমগ্ন থাকা এবং অন্ধ বস্তুবাদের অনুসরণ ও অত্যধিক ধনলিপ্সা হেতু মানুষ পারলৌকিক জীবন ও আল্লাহ্র অবদান সম্পর্কে বিস্মৃত হইয়া পড়ে। ইহা তাহাকে শুধুমাত্র দুর্ভাগা স্বগোত্রীয়দের প্রতি স্বার্থপর, উদ্ধত ও নিষ্ঠুরই করে নাই, এমনকি তাহাকে নিজের আত্মীয়-স্বজনের প্রতিও নিষ্ঠুর করিয়াছে। এই সর্বনাশা সামাজিক ও নৈতিক ব্যাধি সম্পর্কে প্রথম দিকের ওহীসমূহে উল্লিখিত হইয়াছে এবং মানুষকে ইহার বিরুদ্ধে সতর্ক করা হইয়াছে। আয়াত নং ৮৭ : ১৬-১৭-তে মন্তব্য করা হইয়াছে :

بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَوةَ الدُّنْيَا “কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ আখিরাতই উৎকৃষ্টতর ও স্থায়ী”। ৬৭

অতঃপর ধন-সম্পদের সহিত যে প্রভুত সামাজিক দায়িত্বের সম্পর্ক রহিয়াছে তাহা তাহাকে স্মরণ করাইয়া দেওয়া হয়। এখানে উল্লেখ করা হয় যে, পরকালে সে একটি সফল ও সুখী জীবন

লাভ করিতে পারিবে যদি সে তাহার উপর ন্যস্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে। ৯২:৫-১১ নং আয়াতে উল্লেখ আছে :

فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى . وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى . فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى ، وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنى . وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى . فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى ، وَمَا يُغْنِي عَنْهُ مَالُهُ إِذَا تَرَدَّى .

“সুতরাং কেহ দান করিলে, মুত্তাকী হইলে এবং যাহা উত্তম তাহা গ্রহণ করিলে, আমি তাহার জন্য সুগম করিয়া দিব সহজ পথ (একত্ববাদের৮৮)। এবং কেহ কার্পণ্য করিলে ও নিজকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করিলে, আর যাহা উত্তম তাহা অস্বীকার করিলে, তাহার জন্য আমি সুগম করিয়া দিব কঠোর পরিণামের পথ। এবং তাহার সম্পদ তাহার কোন কাজে আসিবে না, যখন সে ধ্বংস হইবে” (৯২:৫-১১)।

এই ভাবধারাকে আরও সম্প্রসারিত করিয়া এই একই সূরাতে আরও বলা হইয়াছে, যাহারা তাহাদের কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয় তাহারা প্রকৃতপক্ষে দুর্ভাগা (الشقی) এবং তাহারাই প্রজ্জ্বলিত অগ্নিতে প্রবেশ করিবে। পক্ষান্তরে যাহারা আত্মশুদ্ধিকল্পে আল্লাহ্র পথে তাহাদের সম্পদ ব্যয় করিবে তাহাদিগকে আল্লাহ্র প্রতি সবচাইতে বেশি উৎসর্গীকৃত (الأثقی) হিসাবে গণ্য করা হইবে। ﴿ وَلسَوْفَ يَرْضى “এবং তাহারা শীঘ্রই সুখী ও সন্তুষ্ট হইবে" ৬৯

সমৃদ্ধি প্রকৃতপক্ষে মানুষের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। আল্লাহ তাআলার অনুগৃহীত ব্যক্তি হিসাবে নিজকে মনে করিয়া ইহা লইয়া গর্বে স্ফীত হওয়া তাহার উচিত নয় কিংবা দারিদ্র্য পীড়িত হইয়া পড়িলেও আল্লাহ্ সম্পর্কে হতাশ হওয়া ঠিক নয়। মানুষের ধন-দৌলতের দাস হওয়া উচিত নয় এবং ভাগ্যে যাহা তাহার প্রাপ্য নয় তাহার জন্য অন্যায়ভাবে দাবি করাও অনুচিত; বরং দরিদ্র, এতিম ও অভাবগ্রস্তদের সাহায্যার্থে তাহার সর্বদা দায়িত্ব সচেতন হওয়া কর্তব্য। মানুষের জন্য করণীয় এই শিক্ষাগুলি খুবই কার্যকরভাবে আয়াত ৯০:১৫ ২৩-এ বিধৃত হইয়াছে :

فَأَمَّا الْإِنْسَانُ إِذَا مَا ابْتَلُهُ رَبُّهُ فَاكْرَمَهُ وَنَعْمَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَكْرَمَنِ . وَأَمَّا إِذَا مَا ابْتَلُهُ فَقَدَرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَهَانَنِ . كَلأَ بَلْ لا تُكْرِمُونَ الْيَتِيمَ ، وَلَا تَحضُّونَ عَلَى طعام المسكين . وَتَأْكُلُونَ التُّرَاثَ اكلا لما . وَتُحِبُّونَ الْمَالَ حُبًّا جَمَّا . كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا . وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا . وَجَائَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ ، يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنْسَانُ وَأَنِّي لَهُ الذِّكْرَى .

“মানুষ তো এইরূপ যে, তাহার প্রতিপালক যখন তাহাকে পরীক্ষা করেন সম্মান ও অনুগ্রহ দান করিয়া, তখন সে বলে, 'আমার প্রতিপালক আমাকে সম্মানিত করিয়াছেন'। এবং যখন তাহাকে পরীক্ষা করেন তাহার জীবন উপকরণ সংকুচিত করিয়া, তখন সে বলে, 'আমার

প্রতিপালক আমাকে হীন করিয়াছেন'। না, কখনও নহে; বরং তোমরা ইয়াতীমকে সম্মান কর না এবং তোমরা অভাবগ্রস্তদিগের প্রাপ্য সম্পদ সম্পূর্ণরূপে ভক্ষণ করিয়া ফেল এবং তোমরা ধন-সম্পদ অতিশয় ভালবাস; ইহা সংগত নহে। পৃথিবীকে যখন চূর্ণবিচূর্ণ করা হইবে এবং যখন তোমার প্রতিপালক উপস্থিত হইবেন ও সারিবদ্ধভাবে ফেরেশতাগণও। সেই দিন জাহান্নামকে আনা হইবে এবং সেই দিন মানুষ উপলব্ধি করিবে, তখন এই উপলব্ধি তাহার কী কাজে আসিবে?” (৮৯: ১৫-২৩)?

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ৭. মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি বিশেষ নির্দেশাবলী

📄 ৭. মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি বিশেষ নির্দেশাবলী


প্রথম দিকের ওহীসমূহের অন্য আরেকটি বিষয় ছিল মহানবী-এর প্রতি সান্ত্বনাসূচক বাণী ও বিশেষ নির্দেশসমূহ। এই প্রসঙ্গে প্রথম যে বিষয়টি লক্ষণীয় তাহা হইতেছে, একেবারে প্রথম দিকের দুইটি ক্ষেত্রে মহানবী -কে অত্যন্ত স্নেহপূর্ণ ভাষায় আহ্বান জানান হইয়াছে। সূরাতুল-মুদ্দাছছির (সূরা ৭৪) ও সূরাতুল মুয্যামমিল (সূরা ৭৩)-এর প্রথম কয়েকটি আয়াতে ইহার প্রমাণ মিলিবে। মহানবী -কে আহ্বানের ভাষার বহিঃপ্রকাশ যথাক্রমে নিম্নরূপ : “হে মুহাম্মাদ" অথবা হে নবীর পরিবর্তে “হে বস্ত্রাচ্ছাদিত!” এবং “হে বস্ত্রাবৃত!” বলা হইয়াছে। এই সূরা দুইটির আয়াত নাযিলের প্রসঙ্গে বর্ণনা করা হইয়াছে যে, আকাশে জিবরাঈল (আ)-কে তাহার মূল আকৃতিতে দেখিয়া মহানবী ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পড়েন এবং দ্রুত বাড়িতে ফিরিয়া চাদর বা কম্বল দ্বারা নিজকে ঢাকিয়া রাখেন। তাই এই ধরনের আহ্বান জানান হইয়াছে। কিন্তু ঘটনা বা অবস্থা যাহাই হউক না কেন ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, আহ্বানের এই সুনির্দিষ্ট ধরন ছিল মহানবী -এর প্রতি প্রগাঢ় স্নেহ ও সদয় বিবেচনা প্রকাশ করা এবং সর্বত্র স্নেহপূর্ণ আচরণই তাঁহার সহিত করা হইয়াছে। আর তাঁহাকে নিশ্চয়তা দেওয়া হইয়াছে যে, তিনিই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্র মনোনীত।
এই সূরাতুল মুদ্দাছছিরে (অর্থাৎ ইহার প্রথম ৭টি আয়াতে) মহানবী-এর প্রতি দুইটি বিশেষ নির্দেশ রহিয়াছে। ইহা ধর্ম প্রচারের কাজের সহিত সম্পর্কিত। ইহার দ্বিতীয় আয়াতে এই দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তাঁহাকে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। উহা নিম্নরূপঃ "অনুকম্পা প্রদর্শন করিও না, এই আশায় যে, প্রতিদান কালে ইহার বৃদ্ধি ঘটিবে"। অন্য কথায়, যদিও এই ওহী যাহা প্রকাশের জন্য মহানবীকে দায়িত্ব প্রদান করা হইয়াছে, মানবজাতির জন্য এক মহা আশীর্বাদ ছিল। মহানবী তাঁহার কাজের জন্য পার্থিব সুখ-সুবিধার আশা করিতে পারেন না। একেবারে শুরু হইতেই এইরূপ গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে যে, মহানবী-এর ধর্ম প্রচারের কাজ একমাত্র আল্লাহ্র জন্য, ইহাতে তাঁহার কোন ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য ছিল না।
নির্দেশের দ্বিতীয় বিষয়টি ৭ নং আয়াতে বিধৃত হইয়াছে। উহা নিম্নরূপ: وَلِرَبِّكَ فَاصْبِرْ "এবং তোমার প্রভুর (কারণে) জন্য সহিষ্ণু হও ও অবিচলিত থাক"। ইহা ছিল খুবই সময়োচিত ও গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ এবং তৎসহ আগামীতে আসিতেছে এই বিষয়সমূহ গঠন সম্পর্কে পূর্ব
সতর্কবাণী। ইহার অর্থ এই দাঁড়ায়, যে দায়িত্ব তাঁহার উপর অর্পিত হইয়াছে (অর্থাৎ প্রচার ও সতর্কীকরণ) তাহা পালন করিতে তাঁহাকে প্রচণ্ড কষ্টস্বীকার, বিরোধিতা ও অন্যের শত্রুতার মোকাবিলা করিতে হইবে। আর এই সকল প্রতিবন্ধকতা কাটাইয়া উঠিবার জন্য তাঁহাকে আল্লাহ্র নিমিত্ত পরিপূর্ণ ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা অবলম্বন করিতে হইবে। এই একই সতর্কতামূলক নির্দেশ আয়াত ৭৩ : ৫-এ দেখা যায়। ইহাতে বলা হইয়াছে, إِنَّا سَنُلْقَى عَلَيْكَ قَوْلًا ثَقِيلاً "শীঘ্রই আমি তোমার নিকট গুরুভারসম্পন্ন বাণী প্রেরণ করিব"।
অন্য যে সকল নির্দেশ ও সান্ত্বনামূলক বাণী প্রথম দিকের নাযিলকৃত সূরাসমূহে রহিয়াছে তাহা কাফিরদের বিরোধিতা ও অবাধ্যতা সম্পর্কে বর্ণনা করা হইয়াছে। পরবর্তী পরিচ্ছেদে যখন এই বিষয় লইয়া আলোচনা করা হইবে তখন ইহা বিবেচনা করা হইবে। এখানে শুধুমাত্র ইহাই উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, উপরে উপদেশমূলক বিষয়বস্তুর যে বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে তাহা কেবল ১০টি সূরার উপর ভিত্তি করিয়া রচিত হইয়াছে এবং ইহা এই অধ্যায়ের শুরুতেই উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহা বলা অনাবশ্যক যে, কুরআনে বিধৃত বিষয়বস্তুর বেশির ভাগ অংশ হইতে এই একই উপদেশ বাণী ও নির্দেশাবলী গ্রহণ করা হইয়াছে এবং অবশিষ্ট সূরাসমূহে প্রচুর সংখ্যক সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বর্ণনা দ্বারা তাহা পুনরাবৃত্ত ও বিশদীকৃত হইয়াছে।
মহানবী কিভাবে ধর্ম প্রচারের কার্যাবলী শুরু করেন এবং তাহার ফলাফল কি হইয়াছিল তাহা দেখিবার জন্য অগ্রসর হওয়ার পূর্বে সাধারণভাবে ওহী সম্পর্কে প্রাচ্যবিদ পণ্ডিতবর্গের মতামত ও ধারণাসমূহ সম্পর্কে এখানে উল্লেখ করা যথাযথ হইবে বলিয়া মনে করা যায়।

প্রথম দিকের ওহীসমূহের অন্য আরেকটি বিষয় ছিল মহানবী-এর প্রতি সান্ত্বনাসূচক বাণী ও বিশেষ নির্দেশসমূহ। এই প্রসঙ্গে প্রথম যে বিষয়টি লক্ষণীয় তাহা হইতেছে, একেবারে প্রথম দিকের দুইটি ক্ষেত্রে মহানবী -কে অত্যন্ত স্নেহপূর্ণ ভাষায় আহ্বান জানান হইয়াছে। সূরাতুল-মুদ্দাছছির (সূরা ৭৪) ও সূরাতুল মুয্যামমিল (সূরা ৭৩)-এর প্রথম কয়েকটি আয়াতে ইহার প্রমাণ মিলিবে। মহানবী -কে আহ্বানের ভাষার বহিঃপ্রকাশ যথাক্রমে নিম্নরূপ : “হে মুহাম্মাদ" অথবা হে নবীর পরিবর্তে “হে বস্ত্রাচ্ছাদিত!” এবং “হে বস্ত্রাবৃত!” বলা হইয়াছে। এই সূরা দুইটির আয়াত নাযিলের প্রসঙ্গে বর্ণনা করা হইয়াছে যে, আকাশে জিবরাঈল (আ)-কে তাহার মূল আকৃতিতে দেখিয়া মহানবী ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পড়েন এবং দ্রুত বাড়িতে ফিরিয়া চাদর বা কম্বল দ্বারা নিজকে ঢাকিয়া রাখেন। তাই এই ধরনের আহ্বান জানান হইয়াছে। কিন্তু ঘটনা বা অবস্থা যাহাই হউক না কেন ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, আহ্বানের এই সুনির্দিষ্ট ধরন ছিল মহানবী -এর প্রতি প্রগাঢ় স্নেহ ও সদয় বিবেচনা প্রকাশ করা এবং সর্বত্র স্নেহপূর্ণ আচরণই তাঁহার সহিত করা হইয়াছে। আর তাঁহাকে নিশ্চয়তা দেওয়া হইয়াছে যে, তিনিই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্র মনোনীত।

এই সূরাতুল মুদ্দাছছিরে (অর্থাৎ ইহার প্রথম ৭টি আয়াতে) মহানবী-এর প্রতি দুইটি বিশেষ নির্দেশ রহিয়াছে। ইহা ধর্ম প্রচারের কাজের সহিত সম্পর্কিত। ইহার দ্বিতীয় আয়াতে এই দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তাঁহাকে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। উহা নিম্নরূপঃ "অনুকম্পা প্রদর্শন করিও না, এই আশায় যে, প্রতিদান কালে ইহার বৃদ্ধি ঘটিবে"। অন্য কথায়, যদিও এই ওহী যাহা প্রকাশের জন্য মহানবীকে দায়িত্ব প্রদান করা হইয়াছে, মানবজাতির জন্য এক মহা আশীর্বাদ ছিল। মহানবী তাঁহার কাজের জন্য পার্থিব সুখ-সুবিধার আশা করিতে পারেন না। একেবারে শুরু হইতেই এইরূপ গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে যে, মহানবী-এর ধর্ম প্রচারের কাজ একমাত্র আল্লাহ্র জন্য, ইহাতে তাঁহার কোন ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য ছিল না।

নির্দেশের দ্বিতীয় বিষয়টি ৭ নং আয়াতে বিধৃত হইয়াছে। উহা নিম্নরূপ: وَلِرَبِّكَ فَاصْبِرْ "এবং তোমার প্রভুর (কারণে) জন্য সহিষ্ণু হও ও অবিচলিত থাক"। ইহা ছিল খুবই সময়োচিত ও গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ এবং তৎসহ আগামীতে আসিতেছে এই বিষয়সমূহ গঠন সম্পর্কে পূর্ব

সতর্কবাণী। ইহার অর্থ এই দাঁড়ায়, যে দায়িত্ব তাঁহার উপর অর্পিত হইয়াছে (অর্থাৎ প্রচার ও সতর্কীকরণ) তাহা পালন করিতে তাঁহাকে প্রচণ্ড কষ্টস্বীকার, বিরোধিতা ও অন্যের শত্রুতার মোকাবিলা করিতে হইবে। আর এই সকল প্রতিবন্ধকতা কাটাইয়া উঠিবার জন্য তাঁহাকে আল্লাহ্র নিমিত্ত পরিপূর্ণ ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা অবলম্বন করিতে হইবে। এই একই সতর্কতামূলক নির্দেশ আয়াত ৭৩ : ৫-এ দেখা যায়। ইহাতে বলা হইয়াছে, إِنَّا سَنُلْقَى عَلَيْكَ قَوْلاً ثَقِيلاً "শীঘ্রই আমি তোমার নিকট গুরুভারসম্পন্ন বাণী প্রেরণ করিব"।

অন্য যে সকল নির্দেশ ও সান্ত্বনামূলক বাণী প্রথম দিকের নাযিলকৃত সূরাসমূহে রহিয়াছে তাহা কাফিরদের বিরোধিতা ও অবাধ্যতা সম্পর্কে বর্ণনা করা হইয়াছে। পরবর্তী পরিচ্ছেদে যখন এই বিষয় লইয়া আলোচনা করা হইবে তখন ইহা বিবেচনা করা হইবে। এখানে শুধুমাত্র ইহাই উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, উপরে উপদেশমূলক বিষয়বস্তুর যে বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে তাহা কেবল ১০টি সূরার উপর ভিত্তি করিয়া রচিত হইয়াছে এবং ইহা এই অধ্যায়ের শুরুতেই উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহা বলা অনাবশ্যক যে, কুরআনে বিধৃত বিষয়বস্তুর বেশির ভাগ অংশ হইতে এই একই উপদেশ বাণী ও নির্দেশাবলী গ্রহণ করা হইয়াছে এবং অবশিষ্ট সূরাসমূহে প্রচুর সংখ্যক সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বর্ণনা দ্বারা তাহা পুনরাবৃত্ত ও বিশদীকৃত হইয়াছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00