📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ৩. রিসালাহ (অর্থাৎ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নবুওয়াত ও রিসালাত)

📄 ৩. রিসালাহ (অর্থাৎ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নবুওয়াত ও রিসালাত)


একেবারে প্রথম দিকের ওহীসমূহে তৃতীয় যে বিষয়টি উপস্থাপন করা হইয়াছে তাহা হইতেছে মুহাম্মাদ-কে আল্লাহ প্রেরিত রাসূল হিসাবে বিশেষ দায়িত্ব প্রদান। ইসলামী বাচনভঙ্গীতে একজন নবী (পয়গাম্বর) ও একজন রাসূল (বার্তাবাহক)-এর মধ্যে পরিভাষাগত পার্থক্য এই যে, নবী ও রাসূল উভয়ে আল্লাহ্র নিকট হইতে ওহী লাভ করেন, কিন্তু রাসূলকে তাহা মানুষকে অর্পণ ও প্রচারের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সূরা আল-মুদ্দাছছির-এর প্রথম কয়েকটি আয়াত নাযিল করিয়া মুহাম্মাদকে এই বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। মুহাম্মাদকে সম্বোধন করিয়া নাযিলকৃত আয়াতটি (নং৭৪: ১-৩) এইভাবে শুরু হইয়াছে:
يأَيُّهَا المُدثَرُ . قُمْ فَانْذِرْ ، وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ .
“হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! উঠ, সতর্কবাণী প্রচার কর এবং তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর" (৭৪:১-৩)।
এখানে একটি সুনির্দিষ্ট আদেশ দেওয়া হইয়াছে। তাহা হইতেছে জনগণকে তাহাদের কৃতকর্মের পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করা এবং নাযিলকৃত ওহীতে যে সকল নির্দেশ রহিয়াছে তাহা জানান। বাস্তবিকপক্ষে একেবারে প্রথম ও সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাটি এখানে বিশেষভাবে
উল্লেখ করা হইয়াছে। তাহা হইতেছে, "এবং তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর"। ইহার অর্থ দাঁড়ায়, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ (আল্লাহু আকবার = اَللهُ أَكْبَرُ( এই ঘোষণা জনসমক্ষে প্রচারের জন্য মহানবীকে আদেশ দেওয়া হইয়াছিল। অন্য কথায় তাঁহাকে ঘোষণা করিতে হইত যে, কল্পিত দেব-দেবীসহ অন্য সব কিছুই আল্লাহ্র অধীন। ইহা তাওহীদ সংক্রান্ত আদেশও বটে।
সকল ভাষ্যকার (তাফসীরকারবৃন্দ) এই বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, সূরা আল-মুদ্দাছিরের উপরিউক্ত আয়াতে মহানবীকে সুনির্দিষ্টভাবে রিসালাতের দায়িত্ব অর্পণ করা হইয়াছে। ইহার সহিত সংযোজন করা যাইতে পারে যে, রিসালাত-এর ভাবধারাটি অন্তর্নিহিত এবং এমনকি নাযিলকৃত প্রথম ওহীতেও বর্তমান। কারণ 'পড়িবার' জন্য নির্দেশ দান এবং কলমের প্রসঙ্গ উত্থাপনের মধ্যে উক্ত ভাবধারাটি রহিয়াছে যাহাতে মহানবী একটি আসমানী কিতাব প্রাপ্তির দ্বারপ্রান্তে রহিয়াছেন এবং এই কিতাব তিনি জনসমক্ষে প্রচার করিবেন। তিনি এই কিতাব সংরক্ষণ করিয়া ইহার জ্ঞান কলমের সাহায্যে প্রচার করিবেন।
আল্লাহর রাসূল হিসাবে মুহাম্মাদ-এর দায়িত্ব প্রাপ্তি এবং তাঁহার ভূমিকা সম্পর্কে আরও কিছু প্রাসঙ্গিক আয়াত ৭৪: ৫২-৫৪ (সূরা আল-মুদ্দাছছির), ৮১: ১৫-১৯ (সূরা আত-তাকবীর) ও ৮৭: ১৮-১৯ (সূরা আল-আ'লা)-তে আলোচিত হইয়াছে। আয়াত ৭৪: ৫২-৫৩-তে মক্কার কাফিরদের বিরক্তিকর উত্যক্তকারী দাবির প্রসঙ্গটি আসিয়াছে। তাহাদের দাবি যে, তাহাদের প্রত্যেককে নাযিলকৃত ওহীর প্রকাশ্যে লিখিত কাগজ )صحف منشرة( দেওয়া হউক এবং আয়াতগুলি গুরুত্বারোপ করে যে, ইহা কখনও হইতে পারে না এবং মহানবী তাহাদিগকে যাহা অর্পণ করিতেছেন তাহা )كلا انه تذكرة( "নিশ্চিতভাবে একটি স্মারক চিহ্ন"। অনুরূপভাবে আয়াত ৮১: ১৫- ২৯ কাফিরদের নানাবিধ অভিযোগের মুকাবিলায় ঘোষণা করে যে, মহানবী
وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَيْطَانٍ নিজে যেমন ভূতাবিষ্ট (মجنون) হন নাই তেমনি তিনি কোন শয়তানের কথাও ঘোষণা করিতেছেন না; বরং তিনি ফেরেশতার মাধ্যমে যে ওহী লাভ করেন তাহাই জনগণের সম্মুখে উপস্থাপন করিতেছেন। তিনি ফেরেশতাকে আকাশের স্পষ্ট দিগন্তে (بالأفق المُبين) দেখিতে পান এবং প্রকৃতপক্ষে ইহা সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য ছিল প্রত্যাদেশ (انْ هُوَ اِلَّا ذِكْرُ لِّلْعَلَمِينَ) । এই আয়াতে তাই মহানবী যে ওহী লাভ করিয়াছেন, তাহাই তিনি জনগণের নিকট প্রচার করেন বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। এই বিষয়ে আরও সুনির্দিষ্টভাবে আয়াত ৮৭:৯-এ মহানবী -কে আদেশ করা হইয়াছে। উহা এইরূপ: فَذَكِّرْ إِنْ نَفَعَت الذكرى . “অতএব উপদেশ দাও, যদি উপদেশ ফলপ্রসূ হয়” (৮৭:৯)।

একেবারে প্রথম দিকের ওহীসমূহে তৃতীয় যে বিষয়টি উপস্থাপন করা হইয়াছে তাহা হইতেছে মুহাম্মাদ-কে আল্লাহ প্রেরিত রাসূল হিসাবে বিশেষ দায়িত্ব প্রদান। ইসলামী বাচনভঙ্গীতে একজন নবী (পয়গাম্বর) ও একজন রাসূল (বার্তাবাহক)-এর মধ্যে পরিভাষাগত পার্থক্য এই যে, নবী ও রাসূল উভয়ে আল্লাহ্র নিকট হইতে ওহী লাভ করেন, কিন্তু রাসূলকে তাহা মানুষকে অর্পণ ও প্রচারের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সূরা আল-মুদ্দাছছির-এর প্রথম কয়েকটি আয়াত নাযিল করিয়া মুহাম্মাদকে এই বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। মুহাম্মাদকে সম্বোধন করিয়া নাযিলকৃত আয়াতটি (নং৭৪: ১-৩) এইভাবে শুরু হইয়াছে:

يأَيُّهَا المُدثَرُ . قُمْ فَانْذِرْ ، وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ .

“হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! উঠ, সতর্কবাণী প্রচার কর এবং তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর" (৭৪:১-৩)।

এখানে একটি সুনির্দিষ্ট আদেশ দেওয়া হইয়াছে। তাহা হইতেছে জনগণকে তাহাদের কৃতকর্মের পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করা এবং নাযিলকৃত ওহীতে যে সকল নির্দেশ রহিয়াছে তাহা জানান। বাস্তবিকপক্ষে একেবারে প্রথম ও সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাটি এখানে বিশেষভাবে

উল্লেখ করা হইয়াছে। তাহা হইতেছে, "এবং তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর"। ইহার অর্থ দাঁড়ায়, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ (আল্লাহু আকবার = اَللهُ أَكْبَرُ( এই ঘোষণা জনসমক্ষে প্রচারের জন্য মহানবীকে আদেশ দেওয়া হইয়াছিল। অন্য কথায় তাঁহাকে ঘোষণা করিতে হইত যে, কল্পিত দেব-দেবীসহ অন্য সব কিছুই আল্লাহ্র অধীন। ইহা তাওহীদ সংক্রান্ত আদেশও বটে।

সকল ভাষ্যকার (তাফসীরকারবৃন্দ) এই বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, সূরা আল-মুদ্দাছছির-এর উপরিউক্ত আয়াতে মহানবীকে সুনির্দিষ্টভাবে রিসালাতের দায়িত্ব অর্পণ করা হইয়াছে। ইহার সহিত সংযোজন করা যাইতে পারে যে, রিসালাত-এর ভাবধারাটি অন্তর্নিহিত এবং এমনকি নাযিলকৃত প্রথম ওহীতেও বর্তমান। কারণ 'পড়িবার' জন্য নির্দেশ দান এবং কলমের প্রসঙ্গ উত্থাপনের মধ্যে উক্ত ভাবধারাটি রহিয়াছে যাহাতে মহানবী একটি আসমানী কিতাব প্রাপ্তির দ্বারপ্রান্তে রহিয়াছেন এবং এই কিতাব তিনি জনসমক্ষে প্রচার করিবেন। তিনি এই কিতাব সংরক্ষণ করিয়া ইহার জ্ঞান কলমের সাহায্যে প্রচার করিবেন।

আল্লাহর রাসূল হিসাবে মুহাম্মাদকে যে দায়িত্বভার অর্পণ করা হইয়াছে সূরা আল-মুয্যামমিলের ১৫ নং আয়াতে সরাসরি তাহার উল্লেখ দেখা যায়।

إِنَّا أَرْسَلْنَا إِلَيْكُمُ رَسُولاً شَاهِدًا عَلَيْكُمْ كَمَا أَرْسَلْنَا إِلَى فِرْعَوْنَ رَسُولاً .

"আমি তোমাদিগের নিকট পাঠাইয়াছি এক রাসূল তোমাদিগের জন্য সাক্ষীস্বরূপ, যেমন সাক্ষী পাঠাইয়াছিলাম ফিরআওনের নিকট" (৭৩:১৫)।

এই আহ্বান স্পষ্টতই মুহাম্মাদ-এর সমকালীন ব্যক্তি এবং তৎসহ পরবর্তী মানবগোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে করা হয়। ফির'আওনের নিকট প্রেরিত আল্লাহর রাসূল অর্থাৎ মূসা (আ)-এর সহিত এখানে যে তুলনা করা হইয়াছে তাহা তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁহার মত মুহাম্মাদ-ও একজন রাসূল বা বার্তাবহক যাঁহাকে আল্লাহ্র কিতাব দেওয়া হইয়াছে এবং এই কিতাবে নীতি সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশাবলী ও মানব আচরণবিধি অন্তর্ভুক্ত আছে।

আল্লাহ্র রাসূল হিসাবে মুহাম্মাদ-এর দায়িত্ব প্রাপ্তি এবং তাঁহার ভূমিকা সম্পর্কে আরও কিছু প্রাসঙ্গিক আয়াত ৭৪: ৫২-৫৪ (সূরা আল-মুদ্দাছছির), ৮১: ১৫-১৯ (সূরা আত-তাকবীর) ও ৮৭: ১৮-১৯ (সূরা আল-আ'লা)-তে আলোচিত হইয়াছে। আয়াত ৭৪: ৫২-৫৩-তে মক্কার কাফিরদের বিরক্তিকর উত্যক্তকারী দাবির প্রসঙ্গটি আসিয়াছে। তাহাদের দাবি যে, তাহাদের প্রত্যেককে নাযিলকৃত ওহীর প্রকাশ্যে লিখিত কাগজ )صحف منشرة( দেওয়া হউক এবং আয়াতগুলি গুরুত্বারোপ করে যে, ইহা কখনও হইতে পারে না এবং মহানবী তাহাদিগকে যাহা অর্পণ করিতেছেন তাহা )كلا انه تذكرة( "নিশ্চিতভাবে একটি স্মারক চিহ্ন"। অনুরূপভাবে আয়াত ৮১: ১৫- ২৯ কাফিরদের নানাবিধ অভিযোগের মুকাবিলায় ঘোষণা করে যে, মহানবী

وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَيْطَانٍ নিজে যেমন ভূতাবিষ্ট (مجنون) হন নাই তেমনি তিনি কোন শয়তানের কথাও ঘোষণা করিতেছেন না; বরং তিনি ফেরেশতার মাধ্যমে যে ওহী লাভ করেন তাহাই জনগণের সম্মুখে উপস্থাপন করিতেছেন। তিনি ফেরেশতাকে আকাশের স্পষ্ট দিগন্তে (بالأفق المُبين) দেখিতে পান এবং প্রকৃতপক্ষে ইহা সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য ছিল প্রত্যাদেশ (انْ هُوَ اِلَّا ذِكْرُ لِّلْعَلَمِينَ) । এই আয়াতে তাই মহানবী যে ওহী লাভ করিয়াছেন, তাহাই তিনি জনগণের নিকট প্রচার করেন বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। এই বিষয়ে আরও সুনির্দিষ্টভাবে আয়াত ৮৭:৯-এ মহানবী -কে আদেশ করা হইয়াছে। উহা এইরূপ: فَذَكِّرْ إِنْ نَفَعَت الذكرى . "অতএব উপদেশ দাও, যদি উপদেশ ফলপ্রসূ হয়" (৮৭:৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ৪. মৃত্যু পরবর্তী জীবন (আখিরাত)

📄 ৪. মৃত্যু পরবর্তী জীবন (আখিরাত)


এই বিষয়টি প্রথম দিকের নাযিলকৃত ওহীসমূহে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করিয়া রহিয়াছে। প্রকৃতপক্ষে বিবেচনাধীন ১০টি সূরার সবগুলিতেই ইহার প্রাধান্যপূর্ণ উল্লেখ দেখা যায় এবং ইহা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ যে, মানুষের উৎপত্তি সম্পর্কে সূরা আল-'আলাক-এ উল্লেখ রহিয়াছে। সেখানেও মানুষের শেষ গন্তব্যের কথা উল্লিখিত হইয়াছে- “নিশ্চয় তুমি তোমার প্রভুর নিকট প্রত্যাবর্তন করিবে” (إِنَّ إِلَى رَبِّكَ الرُّجْعَى ) এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ অভিব্যক্তি একটি মূল সত্যকে তুলিয়া ধরে। তাহা হইতেছে পৃথিবীতে মানুষের জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব। ইহার বিপরীতে মানুষের পরকালীন জীবন অর্থাৎ আল-আখিরাতকে সর্বোত্তম ও অধিকতর স্থায়ী বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى “অথচ আখিরাতই উৎকৃষ্টতর ও স্থায়ী" (৮৭:১৭)। ৬৫ পরকালীন জীবনের শুরু হইতেছে ইহজগতের সমাপ্তি। ইহার পর মানুষের পুনরুত্থান (আল-বা'ছ) ও বিচারের দিন (আল-কিয়ামাহ; ইয়াওমুদ্দীন) কিয়ামতের দিনের একমাত্র মালিক হইবেন একমাত্র আল্লাহই। ঐ সকল অনিবার্য ঘটনাবলীর কিছু সংখ্যক স্পষ্ট বিবরণী প্রদান করা হইয়াছে। ৬৬ উদাহরণস্বরূপ আয়াত ৮১: ১-১৪ (সূরা আত-তাকবীর), ৭৩: ১২-১৪ (সূরাতুল মুয্যামমিল), ৭৪ঃ ৮-১০, ২৬- ৩১, ৩৫-৫১, ৫৩ (সূরাতুল মুদ্দাছছির), ৮৭: ১২-১৩ (সূরাতুল আ'লা), ৮৯: ২১-৩০ (সূরাতুল ফাজর) ও ৯২: ১৩-১৮ (সূরাতুল লায়ল)-এ এই বিষয়ে বিধৃত হইয়াছে। উদাহরণের জন্য প্রথমে উল্লেখিত আয়াতটির উদ্ধৃতি দেওয়া যাইতে পারে। আয়াতটি নিম্নরূপ:
اذا الشَّمْسُ كُورَتْ ، وَإِذَا النُّجُومُ انْكَدَرَتْ ، وَاذَا الجِبَالُ سَيِّرَتْ ، وَإِذَا الْعِشَارُ عطَلَتْ ، وَإِذَا الْوُحُوشِ حُشِرَتْ ، وَإِذَا الْبِحَارُ سُجِّرَتْ ، وَإِذَا النُّفُوسُ زُوجَتْ ، وَإِذَا الْمَوْعَدَةُ سُئِلَتْ ، بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ . وَإِذَا الصُّحُفُ نُشْرَتْ ، وَإِذَا السَّمَاءُ كُشِطَتْ ، وَإِذَا الْجَحِيمُ سُعْرَتْ ، وَإِذَا الْجَنَّةُ أَزْلَفَتْ ، عَلِمَتْ نَفْسٌ مَا أَحْضَرَتْ .
"সূর্য যখন নিষ্প্রভ হইবে, যখন নক্ষত্ররাজি খসিয়া পড়িবে, পর্বতসমূহকে যখন চলমান করা হইবে, যখন পূর্ণগর্ভা উষ্ট্রী উপেক্ষিত হইবে, যখন বন্য পশু একত্র করা হইবে, সমুদ্র যখন স্ফীত করা হইবে, দেহে যখন আত্মা পুনঃ সংযোজিত হইবে, যখন জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হইবে, কী অপরাধে উহাকে হত্যা করা হইয়াছিল? যখন ‘আমলনামা উন্মোচিত হইবে, যখন আকাশের আবরণ অপসারিত হইবে, জাহান্নামের অগ্নি যখন উদ্দীপিত করা হইবে, এবং জান্নাত যখন সমীপবর্তী করা হইবে, তখন প্রত্যেক ব্যক্তিই জানিবে সে কী লইয়া আসিয়াছে” (৮১:১-১৪)।
বস্তুতঃ মহানবী -এর উপর অর্পিত আল্লাহ কর্তৃক নির্দিষ্ট কাজের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হইতেছে মানুষকে তাহার পারলৌকিক জীবন সম্পর্কে স্মরণ করাইয়া দেওয়া, পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পর বিচারের দিনের এবং গুনাহগার বান্দাদিগের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা। একই সাথে তিনি নেক বান্দাগণকে অনন্ত কালব্যাপী পরম সুখের জীবনের সুসংবাদ দান করিয়াছেন। তাই কুরআনে তাঁহাকে প্রায়ই বাশীর ও নাযীর (যথাক্রমে সুসংবাদ দানকারী ও সতর্ককারী) হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে।

এই বিষয়টি প্রথম দিকের নাযিলকৃত ওহীসমূহে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করিয়া রহিয়াছে। প্রকৃতপক্ষে বিবেচনাধীন ১০টি সূরার সবগুলিতেই ইহার প্রাধান্যপূর্ণ উল্লেখ দেখা যায় এবং ইহা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ যে, মানুষের উৎপত্তি সম্পর্কে সূরা আল-'আলাক-এ উল্লেখ রহিয়াছে। সেখানেও মানুষের শেষ গন্তব্যের কথা উল্লিখিত হইয়াছে- “নিশ্চয় তুমি তোমার প্রভুর নিকট প্রত্যাবর্তন করিবে” (إِنَّ إِلَى رَبِّكَ الرُّجْعَى ) এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ অভিব্যক্তি একটি মূল সত্যকে তুলিয়া ধরে। তাহা হইতেছে পৃথিবীতে মানুষের জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব। ইহার বিপরীতে মানুষের পরকালীন জীবন অর্থাৎ আল-আখিরাতকে সর্বোত্তম ও অধিকতর স্থায়ী বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى “অথচ আখিরাতই উৎকৃষ্টতর ও স্থায়ী” (৮৭:১৭)। ৬৫ পরকালীন জীবনের শুরু হইতেছে ইহজগতের সমাপ্তি। ইহার পর মানুষের পুনরুত্থান (আল-বা'ছ) ও বিচারের দিন (আল-কিয়ামাহ; ইয়াওমুদ্দীন) কিয়ামতের দিনের একমাত্র মালিক হইবেন একমাত্র আল্লাহই। ঐ সকল অনিবার্য ঘটনাবলীর কিছু সংখ্যক স্পষ্ট বিবরণী প্রদান করা হইয়াছে। ৬৬ উদাহরণস্বরূপ আয়াত ৮১: ১-১৪ (সূরা আত-তাকবীর), ৭৩: ১২-১৪ (সূরাতুল মুয্যামমিল), ৭৪ঃ ৮-১০, ২৬- ৩১, ৩৫-৫১, ৫৩ (সূরাতুল মুদ্দাছছির), ৮৭: ১২-১৩ (সূরাতুল আ'লা), ৮৯: ২১-৩০ (সূরাতুল ফাজর) ও ৯২: ১৩-১৮ (সূরাতুল লায়ল)-এ এই বিষয়ে বিধৃত হইয়াছে। উদাহরণের জন্য প্রথমে উল্লেখিত আয়াতটির উদ্ধৃতি দেওয়া যাইতে পারে। আয়াতটি নিম্নরূপ:

اذا الشَّمْسُ كُورَتْ ، وَإِذَا النُّجُومُ انْكَدَرَتْ ، وَاذَا الجِبَالُ سَيِّرَتْ ، وَإِذَا الْعِشَارُ عطَلَتْ ، وَإِذَا الْوُحُوشِ حُشِرَتْ ، وَإِذَا الْبِحَارُ سُجِّرَتْ ، وَإِذَا النُّفُوسُ زُوجَتْ ، وَإِذَا الْمَوْعَدَةُ سُئِلَتْ ، بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ . وَإِذَا الصُّحُفُ نُشْرَتْ ، وَإِذَا السَّمَاءُ كُشِطَتْ ، وَإِذَا الْجَحِيمُ سُعْرَتْ ، وَإِذَا الْجَنَّةُ أَزْلَفَتْ ، عَلِمَتْ نَفْسٌ مَا أَحْضَرَتْ .

"সূর্য যখন নিষ্প্রভ হইবে, যখন নক্ষত্ররাজি খসিয়া পড়িবে, পর্বতসমূহকে যখন চলমান করা হইবে, যখন পূর্ণগর্ভা উষ্ট্রী উপেক্ষিত হইবে, যখন বন্য পশু একত্র করা হইবে, সমুদ্র যখন স্ফীত করা হইবে, দেহে যখন আত্মা পুনঃ সংযোজিত হইবে, যখন জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হইবে, কী অপরাধে উহাকে হত্যা করা হইয়াছিল? যখন ‘আমলনামা উন্মোচিত হইবে, যখন আকাশের আবরণ অপসারিত হইবে, জাহান্নামের অগ্নি যখন উদ্দীপিত করা হইবে, এবং জান্নাত যখন সমীপবর্তী করা হইবে, তখন প্রত্যেক ব্যক্তিই জানিবে সে কী লইয়া আসিয়াছে” (৮১:১-১৪)।

বস্তুতঃ মহানবী -এর উপর অর্পিত আল্লাহ কর্তৃক নির্দিষ্ট কাজের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হইতেছে মানুষকে তাহার পারলৌকিক জীবন সম্পর্কে স্মরণ করাইয়া দেওয়া, পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পর বিচারের দিনের এবং গুনাহগার বান্দাদিগের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা। একই সাথে তিনি নেক বান্দাগণকে অনন্ত কালব্যাপী পরম সুখের জীবনের সুসংবাদ দান করিয়াছেন। তাই কুরআনে তাঁহাকে প্রায়ই বাশীর ও নাযীর (যথাক্রমে সুসংবাদ দানকারী ও সতর্ককারী) হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ৫. ব্যক্তিগত জবাবদিহি

📄 ৫. ব্যক্তিগত জবাবদিহি


শেষ বিচারের দিনে প্রত্যেক ব্যক্তি একাকী ও ব্যক্তিগতভাবে তাহার কাজের জন্য দায়ী থাকিবে। সেই দিন সে ব্যতীত অন্য কেহ তাহার পক্ষে মধ্যস্থতাকারী অথবা প্রায়শ্চিত্যকারী হিসাবে কোন কাজে আসিবে না। পৃথিবীতে স্বীয় কাজের ফলাফল অনুসারে প্রত্যেক ব্যক্তি পুরষ্কৃত অথবা শাস্তিপ্রাপ্ত হইবে। উপরে উদ্ধৃত সূরার শেষ আয়াতে স্পষ্টভাবে ইহা উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহার সহিত আয়াত ৭৪ : ৩৮-এও উদ্ধৃত হইয়াছে:
كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ “প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের (ভালমন্দ) দায়ে আবদ্ধ”।

শেষ বিচারের দিনে প্রত্যেক ব্যক্তি একাকী ও ব্যক্তিগতভাবে তাহার কাজের জন্য দায়ী থাকিবে। সেই দিন সে ব্যতীত অন্য কেহ তাহার পক্ষে মধ্যস্থতাকারী অথবা প্রায়শ্চিত্যকারী হিসাবে কোন কাজে আসিবে না। পৃথিবীতে স্বীয় কাজের ফলাফল অনুসারে প্রত্যেক ব্যক্তি পুরষ্কৃত অথবা শাস্তিপ্রাপ্ত হইবে। উপরে উদ্ধৃত সূরার শেষ আয়াতে স্পষ্টভাবে ইহা উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহার সহিত আয়াত ৭৪ : ৩৮-এও উদ্ধৃত হইয়াছে:

كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ “প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের (ভালমন্দ) দায়ে আবদ্ধ”।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ৬. ধনবানদের সামাজিক দায়িত্ব

📄 ৬. ধনবানদের সামাজিক দায়িত্ব


পার্থিব জীবনে গভীরভাবে নিমগ্ন থাকা এবং অন্ধ বস্তুবাদের অনুসরণ ও অত্যধিক ধনলিপ্সা হেতু মানুষ পারলৌকিক জীবন ও আল্লাহ্র অবদান সম্পর্কে বিস্মৃত হইয়া পড়ে। ইহা তাহাকে শুধুমাত্র দুর্ভাগা স্বগোত্রীয়দের প্রতি স্বার্থপর, উদ্ধত ও নিষ্ঠুরই করে নাই, এমনকি তাহাকে নিজের আত্মীয়-স্বজনের প্রতিও নিষ্ঠুর করিয়াছে। এই সর্বনাশা সামাজিক ও নৈতিক ব্যাধি সম্পর্কে প্রথম দিকের ওহীসমূহে উল্লিখিত হইয়াছে এবং মানুষকে ইহার বিরুদ্ধে সতর্ক করা হইয়াছে। আয়াত নং ৮৭ : ১৬-১৭-তে মন্তব্য করা হইয়াছে :
بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَوةَ الدُّنْيَا “কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ আখিরাতই উৎকৃষ্টতর ও স্থায়ী”। ৬৭
অতঃপর ধন-সম্পদের সহিত যে প্রভুত সামাজিক দায়িত্বের সম্পর্ক রহিয়াছে তাহা তাহাকে স্মরণ করাইয়া দেওয়া হয়। এখানে উল্লেখ করা হয় যে, পরকালে সে একটি সফল ও সুখী জীবন
লাভ করিতে পারিবে যদি সে তাহার উপর ন্যস্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে। ৯২:৫-১১ নং আয়াতে উল্লেখ আছে :
فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى . وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى . فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى ، وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنى . وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى . فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى ، وَمَا يُغْنِي عَنْهُ مَالُهُ إِذَا تَرَدَّى .
“সুতরাং কেহ দান করিলে, মুত্তাকী হইলে এবং যাহা উত্তম তাহা গ্রহণ করিলে, আমি তাহার জন্য সুগম করিয়া দিব সহজ পথ (একত্ববাদের৬৬)। এবং কেহ কার্পণ্য করিলে ও নিজকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করিলে, আর যাহা উত্তম তাহা অস্বীকার করিলে, তাহার জন্য আমি সুগম করিয়া দিব কঠোর পরিণামের পথ। এবং তাহার সম্পদ তাহার কোন কাজে আসিবে না, যখন সে ধ্বংস হইবে” (৯২:৫-১১)।
এই ভাবধারাকে আরও সম্প্রসারিত করিয়া এই একই সূরাতে আরও বলা হইয়াছে, যাহারা তাহাদের কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয় তাহারা প্রকৃতপক্ষে দুর্ভাগা (الشقی) এবং তাহারাই প্রজ্জ্বলিত অগ্নিতে প্রবেশ করিবে। পক্ষান্তরে যাহারা আত্মশুদ্ধিকল্পে আল্লাহ্র পথে তাহাদের সম্পদ ব্যয় করিবে তাহাদিগকে আল্লাহ্র প্রতি সবচাইতে বেশি উৎসর্গীকৃত (الأثقی) হিসাবে গণ্য করা হইবে। ﴿ وَلسَوْفَ يَرْضى “এবং তাহারা শীঘ্রই সুখী ও সন্তুষ্ট হইবে" ৬৯
সমৃদ্ধি প্রকৃতপক্ষে মানুষের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। আল্লাহ তাআলার অনুগৃহীত ব্যক্তি হিসাবে নিজকে মনে করিয়া ইহা লইয়া গর্বে স্ফীত হওয়া তাহার উচিত নয় কিংবা দারিদ্র্য পীড়িত হইয়া পড়িলেও আল্লাহ্ সম্পর্কে হতাশ হওয়া ঠিক নয়। মানুষের ধন-দৌলতের দাস হওয়া উচিত নয় এবং ভাগ্যে যাহা তাহার প্রাপ্য নয় তাহার জন্য অন্যায়ভাবে দাবি করাও অনুচিত; বরং দরিদ্র, এতিম ও অভাবগ্রস্তদের সাহায্যার্থে তাহার সর্বদা দায়িত্ব সচেতন হওয়া কর্তব্য। মানুষের জন্য করণীয় এই শিক্ষাগুলি খুবই কার্যকরভাবে আয়াত ৯০:১৫ ২৩-এ বিধৃত হইয়াছে :
فَأَمَّا الْإِنْسَانُ إِذَا مَا ابْتَلُهُ رَبُّهُ فَاكْرَمَهُ وَنَعْمَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَكْرَمَنِ . وَأَمَّا إِذَا مَا ابْتَلُهُ فَقَدَرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَهَانَنِ . كَلأَ بَلْ لا تُكْرِمُونَ الْيَتِيمَ ، وَلَا تَحضُّونَ عَلَى طعام المسكين . وَتَأْكُلُونَ التُّرَاثَ اكلا لما . وَتُحِبُّونَ الْمَالَ حُبًّا جَمَّا . كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا . وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا . وَجَائَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ ، يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنْسَانُ وَأَنِّي لَهُ الذِّكْرَى .
“মানুষ তো এইরূপ যে, তাহার প্রতিপালক যখন তাহাকে পরীক্ষা করেন সম্মান ও অনুগ্রহ দান করিয়া, তখন সে বলে, 'আমার প্রতিপালক আমাকে সম্মানিত করিয়াছেন'। এবং যখন তাহাকে পরীক্ষা করেন তাহার জীবন উপকরণ সংকুচিত করিয়া, তখন সে বলে, 'আমার
প্রতিপালক আমাকে হীন করিয়াছেন'। না, কখনও নহে; বরং তোমরা ইয়াতীমকে সম্মান কর না এবং তোমরা অভাবগ্রস্তদিগের প্রাপ্য সম্পদ সম্পূর্ণরূপে ভক্ষণ করিয়া ফেল এবং তোমরা ধন-সম্পদ অতিশয় ভালবাস; ইহা সংগত নহে। পৃথিবীকে যখন চূর্ণবিচূর্ণ করা হইবে এবং যখন তোমার প্রতিপালক উপস্থিত হইবেন ও সারিবদ্ধভাবে ফেরেশতাগণও। সেই দিন জাহান্নামকে আনা হইবে এবং সেই দিন মানুষ উপলব্ধি করিবে, তখন এই উপলব্ধি তাহার কী কাজে আসিবে?” (৮৯: ১৫-২৩)?

পার্থিব জীবনে গভীরভাবে নিমগ্ন থাকা এবং অন্ধ বস্তুবাদের অনুসরণ ও অত্যধিক ধনলিপ্সা হেতু মানুষ পারলৌকিক জীবন ও আল্লাহ্র অবদান সম্পর্কে বিস্মৃত হইয়া পড়ে। ইহা তাহাকে শুধুমাত্র দুর্ভাগা স্বগোত্রীয়দের প্রতি স্বার্থপর, উদ্ধত ও নিষ্ঠুরই করে নাই, এমনকি তাহাকে নিজের আত্মীয়-স্বজনের প্রতিও নিষ্ঠুর করিয়াছে। এই সর্বনাশা সামাজিক ও নৈতিক ব্যাধি সম্পর্কে প্রথম দিকের ওহীসমূহে উল্লিখিত হইয়াছে এবং মানুষকে ইহার বিরুদ্ধে সতর্ক করা হইয়াছে। আয়াত নং ৮৭ : ১৬-১৭-তে মন্তব্য করা হইয়াছে :

بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَوةَ الدُّنْيَا “কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ আখিরাতই উৎকৃষ্টতর ও স্থায়ী”। ৬৭

অতঃপর ধন-সম্পদের সহিত যে প্রভুত সামাজিক দায়িত্বের সম্পর্ক রহিয়াছে তাহা তাহাকে স্মরণ করাইয়া দেওয়া হয়। এখানে উল্লেখ করা হয় যে, পরকালে সে একটি সফল ও সুখী জীবন

লাভ করিতে পারিবে যদি সে তাহার উপর ন্যস্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে। ৯২:৫-১১ নং আয়াতে উল্লেখ আছে :

فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى . وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى . فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى ، وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنى . وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى . فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى ، وَمَا يُغْنِي عَنْهُ مَالُهُ إِذَا تَرَدَّى .

“সুতরাং কেহ দান করিলে, মুত্তাকী হইলে এবং যাহা উত্তম তাহা গ্রহণ করিলে, আমি তাহার জন্য সুগম করিয়া দিব সহজ পথ (একত্ববাদের৮৮)। এবং কেহ কার্পণ্য করিলে ও নিজকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করিলে, আর যাহা উত্তম তাহা অস্বীকার করিলে, তাহার জন্য আমি সুগম করিয়া দিব কঠোর পরিণামের পথ। এবং তাহার সম্পদ তাহার কোন কাজে আসিবে না, যখন সে ধ্বংস হইবে” (৯২:৫-১১)।

এই ভাবধারাকে আরও সম্প্রসারিত করিয়া এই একই সূরাতে আরও বলা হইয়াছে, যাহারা তাহাদের কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয় তাহারা প্রকৃতপক্ষে দুর্ভাগা (الشقی) এবং তাহারাই প্রজ্জ্বলিত অগ্নিতে প্রবেশ করিবে। পক্ষান্তরে যাহারা আত্মশুদ্ধিকল্পে আল্লাহ্র পথে তাহাদের সম্পদ ব্যয় করিবে তাহাদিগকে আল্লাহ্র প্রতি সবচাইতে বেশি উৎসর্গীকৃত (الأثقی) হিসাবে গণ্য করা হইবে। ﴿ وَلسَوْفَ يَرْضى “এবং তাহারা শীঘ্রই সুখী ও সন্তুষ্ট হইবে" ৬৯

সমৃদ্ধি প্রকৃতপক্ষে মানুষের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। আল্লাহ তাআলার অনুগৃহীত ব্যক্তি হিসাবে নিজকে মনে করিয়া ইহা লইয়া গর্বে স্ফীত হওয়া তাহার উচিত নয় কিংবা দারিদ্র্য পীড়িত হইয়া পড়িলেও আল্লাহ্ সম্পর্কে হতাশ হওয়া ঠিক নয়। মানুষের ধন-দৌলতের দাস হওয়া উচিত নয় এবং ভাগ্যে যাহা তাহার প্রাপ্য নয় তাহার জন্য অন্যায়ভাবে দাবি করাও অনুচিত; বরং দরিদ্র, এতিম ও অভাবগ্রস্তদের সাহায্যার্থে তাহার সর্বদা দায়িত্ব সচেতন হওয়া কর্তব্য। মানুষের জন্য করণীয় এই শিক্ষাগুলি খুবই কার্যকরভাবে আয়াত ৯০:১৫ ২৩-এ বিধৃত হইয়াছে :

فَأَمَّا الْإِنْسَانُ إِذَا مَا ابْتَلُهُ رَبُّهُ فَاكْرَمَهُ وَنَعْمَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَكْرَمَنِ . وَأَمَّا إِذَا مَا ابْتَلُهُ فَقَدَرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَهَانَنِ . كَلأَ بَلْ لا تُكْرِمُونَ الْيَتِيمَ ، وَلَا تَحضُّونَ عَلَى طعام المسكين . وَتَأْكُلُونَ التُّرَاثَ اكلا لما . وَتُحِبُّونَ الْمَالَ حُبًّا جَمَّا . كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا . وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا . وَجَائَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ ، يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنْسَانُ وَأَنِّي لَهُ الذِّكْرَى .

“মানুষ তো এইরূপ যে, তাহার প্রতিপালক যখন তাহাকে পরীক্ষা করেন সম্মান ও অনুগ্রহ দান করিয়া, তখন সে বলে, 'আমার প্রতিপালক আমাকে সম্মানিত করিয়াছেন'। এবং যখন তাহাকে পরীক্ষা করেন তাহার জীবন উপকরণ সংকুচিত করিয়া, তখন সে বলে, 'আমার

প্রতিপালক আমাকে হীন করিয়াছেন'। না, কখনও নহে; বরং তোমরা ইয়াতীমকে সম্মান কর না এবং তোমরা অভাবগ্রস্তদিগের প্রাপ্য সম্পদ সম্পূর্ণরূপে ভক্ষণ করিয়া ফেল এবং তোমরা ধন-সম্পদ অতিশয় ভালবাস; ইহা সংগত নহে। পৃথিবীকে যখন চূর্ণবিচূর্ণ করা হইবে এবং যখন তোমার প্রতিপালক উপস্থিত হইবেন ও সারিবদ্ধভাবে ফেরেশতাগণও। সেই দিন জাহান্নামকে আনা হইবে এবং সেই দিন মানুষ উপলব্ধি করিবে, তখন এই উপলব্ধি তাহার কী কাজে আসিবে?” (৮৯: ১৫-২৩)?

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00