📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 চার: আত-তাবারীর বর্ণনা

📄 চার: আত-তাবারীর বর্ণনা


আল-ওয়াকিদীর রচনার এক শত বৎসরের ও অধিক কাল পরে আত্-তাবারী (২২৪-৩১০ হি.) ইবন ইসহাকের বিবরণী পুনরোল্লেখ করেন যাহা উপরে উল্লেখ করা হইয়াছে। পুনরোল্লেখের সময় শব্দের ঈষৎ পরিবর্তন এবং মূল পাঠের সামান্য সংযোজন ও বিয়োজন করা হয়। অন্যথায় তাহার নাম উল্লেখসহ যথাসাধ্য মূল পাঠের কাছাকাছি থাকিয়াছেন। ৩২ ইবন ইসহাকের বিবরণীর উপর তাহার বর্ণনা প্রকাশ করিবার পূর্বে আত্-তাবারী যাহা হউক ঘটনাটির আর একটি বিবরণ উপস্থাপন করিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি জানান যে, তিনি ইহা আহমাদ ইবন 'উছমান (আবূ জাওরা')-এর নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছেন। হাদীছটি সংগ্রহের পরম্পরা হইতেছে : ওয়াহব ইবন জারীর হইতে আহমাদ ইবন 'উছমান, ওয়াহ্হ্ ইবন জারীর তাহার পিতা জারীর হইতে, জারীর নু'মান ইব্‌ন রাশেদ হইতে, রাশেদ আয-যুহরী হইতে, তিনি 'উরওয়া হইতে, আর 'উরওয়া আয়েশা (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। ইবন ইসহাকের বিবরণী হইতে এই বিবরণীকে এরূপ তথ্য দ্বারা পৃথকভাবে চিহ্নিত করা যায় যে, পরবর্তী ব্যক্তির বিবরণীর সূত্র যেখানে উবায়দ ইব্‌ন উমার পর্যন্ত গিয়া শেষ হইয়াছে তাহা হইলে তাহা মুরসাল বলিয়া পরিগণিত হইবে। আত্-তাবারীর হাদীছটি আয-যুহরী ও 'উরওয়া-এর মাধ্যমে আয়েশা (রা) পর্যন্ত সম্প্রসারিত হইয়াছে। এই হাদীছের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ:
(ক) হাদীছের প্রথম অংশে বর্ণিত তথ্যসমূহ বুখারী শরীফে উল্লিখিত হাদীছের তথ্যের সহিত অবিকল মিল রহিয়াছে। যেমন : সত্য ও উত্তম স্বপ্ন দোখিবার প্রারম্ভিক কাল, ইহার পর মহানবী -এর নির্জনবাসের প্রতি অনুরাগ, তাঁহার একাকী ইবাদত এবং হেরার গুহায় একটানা কয়েক দিন ধরিয়া তাঁহার অবস্থান, গুহায় একাকী অবস্থানের উদ্দেশ্যে পরিবারের নিকট হইতে মাঝে মাঝে খাবার সংগ্রহের জন্য আগমন এবং তাঁহার নিকট সত্য উদ্ভাসিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁহার এই সকল কার্যক্রম। এই বিষয়টির আলোকে বুখারী শরীফে বর্ণিত হাদীছের সহিত ইহার যে অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হয় উহা নিম্নরূপ : মহানবী বলিয়াছেন বলিয়া বিবৃত হইয়াছে:
(খ) অতঃপর তিনি (ফেরেশতা) আমার নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল। আল্লাহ্র রাসূল বলিলেন, 'ইহা শুনিয়া আমি যদিও দাঁড়াইয়াছিলাম, কিন্তু হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া পড়িলাম। তারপর আমি আমার পরিবারের নিকট ফিরিয়া আসিলাম এবং আমার হৃৎপিণ্ড ধড়ফড় করিতেছিল। আমি খাদীজার নিকট গিয়া তাঁহাকে বলিলাম, আমাকে ঢাকিয়া দাও, আমাকে ঢাকিয়া দাও। আমার ভীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আমি কম্বলে ঢাকা অবস্থায় রহিলাম। তখন তিনি (ফেরেশতা) আমার নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল। মহানবী বলেন, 'ইহাতে আমার বোধ হইতেছিল যে, আমি যেন নিজকে পর্বতের উপর হইতে নিচে নিক্ষেপ করিতেছি এবং আমি যখন তেমনই করিতে চাহিলাম তখনই তিনি আমার নিকট আসিয়া বলিলেন, 'হে মুহাম্মাদ! আমি জিবরাঈল এবং আপনি আল্লাহ্র রাসূল।'
তখন তিনি আমাকে আদেশ করিলেন, "পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন"। অতঃপর আমি পড়িলাম। তারপর আমি খাদীজার নিকট আসিয়া তাহাকে বলিলাম, "আমি আমার জীবন সম্পর্কে শংকিত হইয়া পড়িয়াছি। তিনি বলিলেন ....."।
(গ) এই দফা হইতে বর্ণনাটি পুনঃ বুখারী শরীফে উল্লিখিত হাদীছের অনুরূপ অর্থাৎ মহানবী -এর প্রতি খাদীজার সান্ত্বনাসূচক কথাবার্তা, তাঁহাদের ওয়ারাকার নিকট গমন, ওয়ারাকার অভিমত যে, জিবরাঈল ফেরেশতা (নামূস) আল্লাহ্ ওহী লইয়া আসিয়াছিলেন, মহানবী -এর নিজের লোকেরা তাঁহার বিরুদ্ধাচরণ করিবে ইত্যাদি এবং বর্ণনার শেষে রহিয়াছে ওয়ারাকার মন্তব্য যে, তিনি সেই সময় পর্যন্ত যদি বাঁচিয়া থাকেন তাহা হইলে তিনি মহানবীকে সর্বতোভাবে সাহায্য করিবেন।
এই হাদীছটি যদিও আয়েশা (রা)-এর নিকট হইতে শুরু হইয়া আয-যুহরী ও 'উরওয়া'র মাধ্যমে পাওয়া গিয়াছে তবুও নিম্নের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বুখারী শরীফে উদ্ধৃত হাদীছের সহিত ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়:
১. ইহাতে বলা হইয়াছে যে, হিরা গুহায় মহানবীকে ফেরেশতা প্রথম যে কথা বলিয়াছিলেন তাহা হইতেছে তিনি (মহানবী) আল্লাহ্র রাসূল।
২. গুহা হইতে মহানবী বাড়ীতে ফিরিয়া আসিবার পর ফেরেশতা পুনঃ আবির্ভূত হন এবং বলেন যে, তিনি (মহানবী) আল্লাহ্র রাসূল।
৩. ফেরেশতার দ্বিতীয়বার উপস্থিত হওয়ার এবং মহানবীকে দ্বিতীয়বার আল্লাহ্ রাসূল হিসাবে অভিহিত করিবার পর তিনি (মহানবী) নিজকে পাহাড়ের উপর হইতে নিচে নিক্ষেপ করিবার বিষয়ে চিন্তা করেন।
৪. তিনি যখন প্রায় নিজকে নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত হন তখন জিবরাঈল ফেরেশতা তৃতীয়বার উপস্থিত হইয়া নিজকে জিবরাঈল বলিয়া পরিচয় প্রদান করেন এবং মহানবীকে নিশ্চয়তা প্রদান করেন যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল এবং তাঁহাকে সূরা 'আলাক-এর প্রথম আয়াত পাঠ করান।
৫. মহানবী যে পড়িতে অক্ষম ছিলেন ইহার কোথাও কোন উল্লেখ নাই।
৬. ওহী নাযিল হওয়ার বিরতি সম্পর্কে কোন উল্লেখ নাই।
অতএব ইহা এখন স্পষ্ট যে, আয়েশা (রা) অথবা এই বিষয়ে আয-যুহরী একই ঘটনার উপর দুইটি ভিন্ন ভিন্ন বিবরণী দিতে পারিতেন না। যদি এখানে বর্ণিত তথ্য সত্য হইয়া থাকে এবং তাহা যে কোনভাবেই হউক না কেন বাদ পড়িয়া গিয়া অথবা তাহাদের চক্ষু এড়াইয়া গিয়া থাকে তাহা হইলে তাহাদের পরবর্তী বর্ণনাকারীদের তাহাদের তথ্য সংগ্রহের সূত্রের উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু এই বিষয়ের কিছুই এখানে অথবা অন্য কোথাও উল্লেখ করা হয় নাই। এমনকি আয-যুহরী যেমন অনুমান করেন সে অনুযায়ী বুখারী শরীফে উল্লিখিত কথিত আত্মহত্যা প্রচেষ্টার
ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে এখানে বলা হইয়াছে। এইরূপে আয-যুহরী হয়ত উল্লেখ করিতে পারিতেন যে, ওহী নাযিল হইতে বিলম্বের কারণে মহানবী পাহাড়ের উপর হইতে নিচে লাফাইয়া পড়িয়া আত্মহত্যা করিবার ইচ্ছা পোষণ করেন এবং মহানবী তাহা করিতে নিজকে নিরস্ত্র করেন যখন জিবরাঈল (আ) উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে নিশ্চয়তা দেন যে, তিনি আল্লাহ্ রাসূল। পক্ষান্তরে বর্তমান বিবরণীটি কেবল ওহী নাযিল হওয়ার বিরতির কোন উল্লেখই করে নাই, ইহা আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছে যে, মহানবী আত্মহত্যা করিতে মনস্থ করিয়াছিলেন। কিন্তু ফেরেশতা জিবরাঈল দ্বিতীয়বার আবির্ভূত হইয়া মহানবীকে নিশ্চয়তা দেন যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল। এই বিবরণীর চরম অযৌক্তিকতা ছাড়াও ইহা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, আয-যুহরী নিজে ঘটনাটির কারণ ও ফলাফল সম্পর্কে এই ধরনের পরস্পরবিরোধী ও বিপরীতধর্মী বর্ণনা দিতে পারিতেন না।
তাই উহা স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, আয-যুহরীর পরবর্তী বর্ণনাকারিগণ অথবা তাহাদের মধ্যে কয়েকজনের মাধ্যমে আত-তাবারীর নিকট এই বিবরণী পৌঁছিয়াছে, তাহারা শুধু আয-যুহরীর নিজের বর্ণনাকেই তালগোল পাকাইয়া ফেলে নাই, বরং অন্য বিষয়ের সহিত মূল ঘটনাটিকে মিশাইয়া ফেলিয়াছে। বস্তুত কিছু সংখ্যক বর্ণনাকারী সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য মতামত সম্পূর্ণ এক নয়। উহাহরণস্বরূপ নু'মান ইব্‌ন রাশেদের নাম করা যাইতে পারে। বলা হইয়া থাকে যে, তিনি আয-যুহরীর নিকট হইতে ইহা শুনিয়াছেন। কিন্তু বেশ কিছু সংখ্যক যোগ্য পণ্ডিত নু'মান ইব্‌ন রাশেদকে খুবই 'দুর্বল ও বিভ্রান্ত' বলিয়া অভিহিত করেন। কারণ তিনি প্রচুর ভুল ও ভিত্তিহীন অনুমান করিতেন। এমনকি ইহাও বলা হয় যে, তিনি নিন্দনীয় ও অর্থহীন বিবরণ দিয়াছেন এবং তাহাকে পরিহার করা বাঞ্ছনীয় হইবে। ৩৩
অনুরূপভাবে জারীরকেও (ইবন হাযম ইব্‌ন আবদুল্লাহ ইব্‌ন শুজা আল-আযদী) প্রচুর ভুল করা, তাহার বর্ণনাকৃত হাদীছের সহিত স্বীয় অনুমানের মিশ্রণ, ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতার মধ্যে পরিবর্তন সাধন এবং এমনকি নিন্দনীয় বিবরণীর জন্য নির্ভরযোগ্য বলিয়া বিবেচনা করা হয় না। ৩৪ বলা হইয়া থাকে যে, তিনি আন-নু'মান ইব্‌ন রাশেদের নিকট হইতে ইহা গ্রহণ করিয়াছেন। তাহার পুত্র ওয়াহ্হ্বও ভুল করিতেন এবং তিনি তাহার পিতার নিকট হইতে কোন নজীর হিসাবে বিবরণী গ্রহণ করিতেন। জানা যায় যে, যাহাদের নিকট কোন হাদীছ শুনেন নাই তাহাদের নামে তাহার বর্ণনার উৎস হিসাবে উল্লেখ করিতেন। "শু'বা হইতে" তিনি এরূপ প্রায় চার হাজার হাদীছ বর্ণনা করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেইসব বর্ণনা ছিল আবদুর রহমান আর-রাসসাসী-এর। ৩৫
স্পষ্টতই এরূপ বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে প্রাপ্ত হাদীছসমূহ সতর্কতার সহিত গ্রহণ করা আবশ্যক এবং হাদীছ ব্যাখ্যার স্বীকৃত নিয়মানুযায়ী এই সকল বর্ণনাকে একই বিষয়ের উপর বর্ণনাকারীদের উপরে কোন মতেই স্থান দেওয়া যাইতে পারে না।
আত্-তাবারীর পরবর্তী কালে রচিত গ্রন্থাবলীতে যে বর্ণনা দেখিতে পাওয়া যায়, তাহা অনুসরণ করিবার তেমন কোন আবশ্যকতা নাই। কারণ মূল কাহিনীতে কোন কিছু নূতন বা নির্ভরযোগ্য
তথ্য সংযোজনে তাহাদের করণীয় কিছু নাই। সবকিছু বিচার করিয়া মহানবী -এর উপর প্রথম ওহী নাযিলের সবচাইতে নির্ভরযোগ্য বর্ণনা আয়েশা (রা) দিয়াছেন এবং তাহা বুখারী শরীফে লিপিবদ্ধ হইয়াছে। উপরে যে সকল বর্ণনা লক্ষ্য করা গিয়াছে তাহা এবং এই বর্ণনা হইতে নিচের তথ্যসমূহের উদ্ভব হইয়াছে। অবশ্য ইহার মধ্যে তাহারা যেসব বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করিয়াছেন তাহা অন্তর্ভুক্ত হয় নাই।
১. তাহার আহ্বানের প্রাক্কালে মহানবী চমকপ্রদ স্বপ্ন দেখিবার একটি প্রারম্ভিক পর্যায়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এই স্বপ্ন তাঁহার নিকট ভোরবেলার সূর্যালোকের ন্যায় উদ্ভাসিত হইত।
২. ইহার পর তিনি নির্জনবাস পছন্দ করিতে শুরু করেন এবং হেরা পর্বতের উপরে অবস্থিত গুহায় তিনি একাকী ইবাদত ও গভীর ধ্যানে একটি সময় অতিবাহিত করেন।
৩. হেরা পর্বতের গুহায় জিবরাঈল ফেরেশতা উপস্থিত হইয়া প্রথম ওহী নাযিল করেন।
৪. হেরার গুহায় প্রথম সাক্ষাতের পরপরই মহানবী জিবরাঈল (আ)-কে আকাশে আবির্ভূত হইতে দেখেন এবং জিবরাঈল (আ) তাঁহার নাম ধরিয়া আহ্বান করত স্বীয় পরিচয় প্রদান এবং তিনি (মহানবী) আল্লাহ্র রাসূল তাহার নিশ্চয়তা প্রদান করেন।
৫. মহানবী জিবরাঈল ফেরেশতার নিকট হইতে যাহা গ্রহণ করেন তাহা বাহিরের কোন বিষয়। বাহিরের সূত্র হইতে প্রাপ্ত ইহা ছিল একটি সুস্পষ্ট পাঠ এবং ইহা তাঁহার স্বীয় ধ্যান বা চিন্তা-প্রসূত কোন ফসল ছিল না। হেরা পর্বতের অনন্য অভিজ্ঞতা তাঁহার মানসিক প্রতিক্রিয়ার কোন দৃশ্য ছিল না।
৬. আল্লাহর তরফ হইতে নাযিলকৃত ওহী লাভের পর মহানবী -এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল একজন ব্যক্তির যিনি জীবনে এইরূপ ঘটনার কখনও প্রত্যাশা করেন নাই। তাঁহার নূতন অবস্থান ও মর্যাদা সম্পর্কে তিনি প্রথমদিকে নিশ্চিত ছিলেন না। ফেরেশতা জিবরাঈল (আ) আল্লাহ তাআলার নির্দেশে তাঁহাকে নিশ্চয়তা প্রদান করা এবং ওয়ারাকা ইবন নাওফাল-এর সহিত তাঁহার আলোচনার পর তাঁহার চিত্ত স্থিরতা লাভ করে।
৭. আল্লাহ্ ওহী লাভের পূর্বে মহানবী একজন নবীর ভূমিকা পালনের জন্য কোনরূপ চিন্তা বা পূর্ব পরিকল্পনা গ্রহণ করেন নাই।
৮. হেরার গুহায় প্রথম ওহী নাযিলের পর ওহী প্রাপ্তিতে একটি বিরতি ঘটে। ওহী লাভের এই বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার প্রথম ধাক্কা সামলাইয়া লইবার জন্য ইহা ছিল একটি দম ফেলার অবসর মাত্র।

টিকাঃ
৩২. আত্-তাবারী, তারীখ, ২খ., ৩০০ ৩০২ (১/১১৪৯ – ১১৫৩).
৩৩. ইব্‌ন হাজার আল-আসকালানী, তাহযীবুত্ তাহযীব, ১০খ, হায়দারাবাদ ১২২৭ হি., পৃ. ১৫২, নং ৮১৯, সমালোচনার অংশবিশেষ নিম্নরূপ:
قال على ابن المدينى ذكره يحى القطان فضعفه جدا وقال عبد الله بن احمد سألت ابي عنه فقال مضطرب الحديث وروى احاديث مناكير وقال ابن معين ضعيف وقال مرة ليس بشئ وقال البخاري وابو حاتم في حديثه وهم كثير ......
৩৪. ঐ, ২খ., ৭১ - ৭২; নং ১১১.
৩৫. ঐ. ১১খ., ১৬১ - ১৬২, নং ২৭৩.

আল-ওয়াকিদীর রচনার এক শত বৎসরের ও অধিক কাল পরে আত্-তাবারী (২২৪-৩১০ হি.) ইবন ইসহাকের বিবরণী পুনরোল্লেখ করেন যাহা উপরে উল্লেখ করা হইয়াছে। পুনরোল্লেখের সময় শব্দের ঈষৎ পরিবর্তন এবং মূল পাঠের সামান্য সংযোজন ও বিয়োজন করা হয়। অন্যথায় তাহার নাম উল্লেখসহ যথাসাধ্য মূল পাঠের কাছাকাছি থাকিয়াছেন। ৩২ ইবন ইসহাকের বিবরণীর উপর তাহার বর্ণনা প্রকাশ করিবার পূর্বে আত্-তাবারী যাহা হউক ঘটনাটির আর একটি বিবরণ উপস্থাপন করিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি জানান যে, তিনি ইহা আহমাদ ইবন 'উছমান (আবূ জাওরা')-এর নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছেন। হাদীছটি সংগ্রহের পরম্পরা হইতেছে : ওয়াহব ইবন জারীর হইতে আহমাদ ইবন 'উছমান, ওয়াহ্হ্ ইবন জারীর তাহার পিতা জারীর হইতে, জারীর নু'মান ইব্‌ন রাশেদ হইতে, রাশেদ আয-যুহরী হইতে, তিনি 'উরওয়া হইতে, আর 'উরওয়া আয়েশা (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। ইবন ইসহাকের বিবরণী হইতে এই বিবরণীকে এরূপ তথ্য দ্বারা পৃথকভাবে চিহ্নিত করা যায় যে, পরবর্তী ব্যক্তির বিবরণীর সূত্র যেখানে উবায়দ ইব্‌ন উমার পর্যন্ত গিয়া শেষ হইয়াছে তাহা হইলে তাহা মুরসাল বলিয়া পরিগণিত হইবে। আত্-তাবারীর হাদীছটি আয-যুহরী ও 'উরওয়া-এর মাধ্যমে আয়েশা (রা) পর্যন্ত সম্প্রসারিত হইয়াছে। এই হাদীছের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ:

(ক) হাদীছের প্রথম অংশে বর্ণিত তথ্যসমূহ বুখারী শরীফে উল্লিখিত হাদীছের তথ্যের সহিত অবিকল মিল রহিয়াছে। যেমন : সত্য ও উত্তম স্বপ্ন দোখিবার প্রারম্ভিক কাল, ইহার পর মহানবী -এর নির্জনবাসের প্রতি অনুরাগ, তাঁহার একাকী ইবাদত এবং হেরার গুহায় একটানা কয়েক দিন ধরিয়া তাঁহার অবস্থান, গুহায় একাকী অবস্থানের উদ্দেশ্যে পরিবারের নিকট হইতে মাঝে মাঝে খাবার সংগ্রহের জন্য আগমন এবং তাঁহার নিকট সত্য উদ্ভাসিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁহার এই সকল কার্যক্রম। এই বিষয়টির আলোকে বুখারী শরীফে বর্ণিত হাদীছের সহিত ইহার যে অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হয় উহা নিম্নরূপ : মহানবী বলিয়াছেন বলিয়া বিবৃত হইয়াছে:

(খ) অতঃপর তিনি (ফেরেশতা) আমার নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল। আল্লাহ্র রাসূল বলিলেন, 'ইহা শুনিয়া আমি যদিও দাঁড়াইয়াছিলাম, কিন্তু হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া পড়িলাম। তারপর আমি আমার পরিবারের নিকট ফিরিয়া আসিলাম এবং আমার হৃৎপিণ্ড ধড়ফড় করিতেছিল। আমি খাদীজার নিকট গিয়া তাঁহাকে বলিলাম, আমাকে ঢাকিয়া দাও, আমাকে ঢাকিয়া দাও। আমার ভীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আমি কম্বলে ঢাকা অবস্থায় রহিলাম। তখন তিনি (ফেরেশতা) আমার নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল। মহানবী বলেন, 'ইহাতে আমার বোধ হইতেছিল যে, আমি যেন নিজকে পর্বতের উপর হইতে নিচে নিক্ষেপ করিতেছি এবং আমি যখন তেমনই করিতে চাহিলাম তখনই তিনি আমার নিকট আসিয়া বলিলেন, 'হে মুহাম্মাদ! আমি জিবরাঈল এবং আপনি আল্লাহ্র রাসূল।'

তখন তিনি আমাকে আদেশ করিলেন, "পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন"। অতঃপর আমি পড়িলাম। তারপর আমি খাদীজার নিকট আসিয়া তাহাকে বলিলাম, "আমি আমার জীবন সম্পর্কে শংকিত হইয়া পড়িয়াছি। তিনি বলিলেন ....."।

(গ) এই দফা হইতে বর্ণনাটি পুনঃ বুখারী শরীফে উল্লিখিত হাদীছের অনুরূপ অর্থাৎ মহানবী -এর প্রতি খাদীজার সান্ত্বনাসূচক কথাবার্তা, তাঁহাদের ওয়ারাকার নিকট গমন, ওয়ারাকার অভিমত যে, জিবরাঈল ফেরেশতা (নামূস) আল্লাহ্ ওহী লইয়া আসিয়াছিলেন, মহানবী -এর নিজের লোকেরা তাঁহার বিরুদ্ধাচরণ করিবে ইত্যাদি এবং বর্ণনার শেষে রহিয়াছে ওয়ারাকার মন্তব্য যে, তিনি সেই সময় পর্যন্ত যদি বাঁচিয়া থাকেন তাহা হইলে তিনি মহানবীকে সর্বতোভাবে সাহায্য করিবেন।

এই হাদীছটি যদিও আয়েশা (রা)-এর নিকট হইতে শুরু হইয়া আয-যুহরী ও 'উরওয়া'র মাধ্যমে পাওয়া গিয়াছে তবুও নিম্নের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বুখারী শরীফে উদ্ধৃত হাদীছের সহিত ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়:

১. ইহাতে বলা হইয়াছে যে, হিরা গুহায় মহানবীকে ফেরেশতা প্রথম যে কথা বলিয়াছিলেন তাহা হইতেছে তিনি (মহানবী) আল্লাহ্র রাসূল।

২. গুহা হইতে মহানবী বাড়ীতে ফিরিয়া আসিবার পর ফেরেশতা পুনঃ আবির্ভূত হন এবং বলেন যে, তিনি (মহানবী) আল্লাহ্র রাসূল।

৩. ফেরেশতার দ্বিতীয়বার উপস্থিত হওয়ার এবং মহানবীকে দ্বিতীয়বার আল্লাহ্ রাসূল হিসাবে অভিহিত করিবার পর তিনি (মহানবী) নিজকে পাহাড়ের উপর হইতে নিচে নিক্ষেপ করিবার বিষয়ে চিন্তা করেন।

৪. তিনি যখন প্রায় নিজকে নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত হন তখন জিবরাঈল ফেরেশতা তৃতীয়বার উপস্থিত হইয়া নিজকে জিবরাঈল বলিয়া পরিচয় প্রদান করেন এবং মহানবীকে নিশ্চয়তা প্রদান করেন যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল এবং তাঁহাকে সূরা 'আলাক-এর প্রথম আয়াত পাঠ করান।

৫. মহানবী যে পড়িতে অক্ষম ছিলেন ইহার কোথাও কোন উল্লেখ নাই।

৬. ওহী নাযিল হওয়ার বিরতি সম্পর্কে কোন উল্লেখ নাই।

অতএব ইহা এখন স্পষ্ট যে, আয়েশা (রা) অথবা এই বিষয়ে আয-যুহরী একই ঘটনার উপর দুইটি ভিন্ন ভিন্ন বিবরণী দিতে পারিতেন না। যদি এখানে বর্ণিত তথ্য সত্য হইয়া থাকে এবং তাহা যে কোনভাবেই হউক না কেন বাদ পড়িয়া গিয়া অথবা তাহাদের চক্ষু এড়াইয়া গিয়া থাকে তাহা হইলে তাহাদের পরবর্তী বর্ণনাকারীদের তাহাদের তথ্য সংগ্রহের সূত্রের উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু এই বিষয়ের কিছুই এখানে অথবা অন্য কোথাও উল্লেখ করা হয় নাই। এমনকি আয-যুহরী যেমন অনুমান করেন সে অনুযায়ী বুখারী শরীফে উল্লিখিত কথিত আত্মহত্যা প্রচেষ্টার

ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে এখানে বলা হইয়াছে। এইরূপে আয-যুহরী হয়ত উল্লেখ করিতে পারিতেন যে, ওহী নাযিল হইতে বিলম্বের কারণে মহানবী পাহাড়ের উপর হইতে নিচে লাফাইয়া পড়িয়া আত্মহত্যা করিবার ইচ্ছা পোষণ করেন এবং মহানবী তাহা করিতে নিজকে নিরস্ত্র করেন যখন জিবরাঈল (আ) উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে নিশ্চয়তা দেন যে, তিনি আল্লাহ্ রাসূল। পক্ষান্তরে বর্তমান বিবরণীটি কেবল ওহী নাযিল হওয়ার বিরতির কোন উল্লেখই করে নাই, ইহা আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছে যে, মহানবী আত্মহত্যা করিতে মনস্থ করিয়াছিলেন। কিন্তু ফেরেশতা জibraঈল দ্বিতীয়বার আবির্ভূত হইয়া মহানবীকে নিশ্চয়তা দেন যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল। এই বিবরণীর চরম অযৌক্তিকতা ছাড়াও ইহা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, আয-যুহরী নিজে ঘটনাটির কারণ ও ফলাফল সম্পর্কে এই ধরনের পরস্পরবিরোধী ও বিপরীতধর্মী বর্ণনা দিতে পারিতেন না।

তাই উহা স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, আয-যুহরীর পরবর্তী বর্ণনাকারিগণ অথবা তাহাদের মধ্যে কয়েকজনের মাধ্যমে আত-তাবারীর নিকট এই বিবরণী পৌঁছিয়াছে, তাহারা শুধু আয-যুহরীর নিজের বর্ণনাকেই তালগোল পাকাইয়া ফেলে নাই, বরং অন্য বিষয়ের সহিত মূল ঘটনাটিকে মিশাইয়া ফেলিয়াছে। বস্তুত কিছু সংখ্যক বর্ণনাকারী সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য মতামত সম্পূর্ণ এক নয়। উহাহরণস্বরূপ নু'মান ইব্‌ন রাশেদের নাম করা যাইতে পারে। বলা হইয়া থাকে যে, তিনি আয-যুহরীর নিকট হইতে ইহা শুনিয়াছেন। কিন্তু বেশ কিছু সংখ্যক যোগ্য পণ্ডিত নু'মান ইব্‌ন রাশেদকে খুবই 'দুর্বল ও বিভ্রান্ত' বলিয়া অভিহিত করেন। কারণ তিনি প্রচুর ভুল ও ভিত্তিহীন অনুমান করিতেন। এমনকি ইহাও বলা হয় যে, তিনি নিন্দনীয় ও অর্থহীন বিবরণ দিয়াছেন এবং তাহাকে পরিহার করা বাঞ্ছনীয় হইবে। ৩৩

অনুরূপভাবে জারীরকেও (ইবন হাযম ইব্‌ন আবদুল্লাহ ইব্‌ন শুজা আল-আযদী) প্রচুর ভুল করা, তাহার বর্ণনাকৃত হাদীছের সহিত স্বীয় অনুমানের মিশ্রণ, ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতার মধ্যে পরিবর্তন সাধন এবং এমনকি নিন্দনীয় বিবরণীর জন্য নির্ভরযোগ্য বলিয়া বিবেচনা করা হয় না। ৩৪ বলা হইয়া থাকে যে, তিনি আন-নু'মান ইব্‌ন রাশেদের নিকট হইতে ইহা গ্রহণ করিয়াছেন। তাহার পুত্র ওয়াহ্হ্বও ভুল করিতেন এবং তিনি তাহার পিতার নিকট হইতে কোন নজীর হিসাবে বিবরণী গ্রহণ করিতেন। জানা যায় যে, যাহাদের নিকট কোন হাদীছ শুনেন নাই তাহাদের নামে তাহার বর্ণনার উৎস হিসাবে উল্লেখ করিতেন। "শু'বা হইতে" তিনি এরূপ প্রায় চার হাজার হাদীছ বর্ণনা করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেইসব বর্ণনা ছিল আবদুর রহমান আর-রাসসাসী-এর। ৩৫

স্পষ্টতই এরূপ বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে প্রাপ্ত হাদীছসমূহ সতর্কতার সহিত গ্রহণ করা আবশ্যক এবং হাদীছ ব্যাখ্যার স্বীকৃত নিয়মানুযায়ী এই সকল বর্ণনাকে একই বিষয়ের উপর বর্ণনাকারীদের উপরে কোন মতেই স্থান দেওয়া যাইতে পারে না।

আল-ওয়াকিদীর রচনার এক শত বৎসরের ও অধিক কাল পরে আত্-তাবারী (২২৪-৩১০ হি.) ইবন ইসহাকের বিবরণী পুনরোল্লেখ করেন যাহা উপরে উল্লেখ করা হইয়াছে। পুনরোল্লেখের সময় শব্দের ঈষৎ পরিবর্তন এবং মূল পাঠের সামান্য সংযোজন ও বিয়োজন করা হয়। অন্যথায় তাহার নাম উল্লেখসহ যথাসাধ্য মূল পাঠের কাছাকাছি থাকিয়াছেন। ৩২ ইবন ইসহাকের বিবরণীর উপর তাহার বর্ণনা প্রকাশ করিবার পূর্বে আত্-তাবারী যাহা হউক ঘটনাটির আর একটি বিবরণ উপস্থাপন করিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি জানান যে, তিনি ইহা আহমাদ ইবন 'উছমান (আবূ জাওরা')-এর নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছেন। হাদীছটি সংগ্রহের পরম্পরা হইতেছে : ওয়াহব ইবন জারীর হইতে আহমাদ ইবন 'উছমান, ওয়াহ্হ্ ইবন জারীর তাহার পিতা জারীর হইতে, জারীর নু'মান ইব্‌ন রাশেদ হইতে, রাশেদ আয-যুহরী হইতে, তিনি 'উরওয়া হইতে, আর 'উরওয়া আয়েশা (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। ইবন ইসহাকের বিবরণী হইতে এই বিবরণীকে এরূপ তথ্য দ্বারা পৃথকভাবে চিহ্নিত করা যায় যে, পরবর্তী ব্যক্তির বিবরণীর সূত্র যেখানে উবায়দ ইব্‌ন উমার পর্যন্ত গিয়া শেষ হইয়াছে তাহা হইলে তাহা মুরসাল বলিয়া পরিগণিত হইবে। আত্-তাবারীর হাদীছটি আয-যুহরী ও 'উরওয়া-এর মাধ্যমে আয়েশা (রা) পর্যন্ত সম্প্রসারিত হইয়াছে। এই হাদীছের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ:

(ক) হাদীছের প্রথম অংশে বর্ণিত তথ্যসমূহ বুখারী শরীফে উল্লিখিত হাদীছের তথ্যের সহিত অবিকল মিল রহিয়াছে। যেমন : সত্য ও উত্তম স্বপ্ন দোখিবার প্রারম্ভিক কাল, ইহার পর মহানবী -এর নির্জনবাসের প্রতি অনুরাগ, তাঁহার একাকী ইবাদত এবং হেরার গুহায় একটানা কয়েক দিন ধরিয়া তাঁহার অবস্থান, গুহায় একাকী অবস্থানের উদ্দেশ্যে পরিবারের নিকট হইতে মাঝে মাঝে খাবার সংগ্রহের জন্য আগমন এবং তাঁহার নিকট সত্য উদ্ভাসিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁহার এই সকল কার্যক্রম। এই বিষয়টির আলোকে বুখারী শরীফে বর্ণিত হাদীছের সহিত ইহার যে অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হয় উহা নিম্নরূপ : মহানবী বলিয়াছেন বলিয়া বিবৃত হইয়াছে:

(খ) অতঃপর তিনি (ফেরেশতা) আমার নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল। আল্লাহ্র রাসূল বলিলেন, 'ইহা শুনিয়া আমি যদিও দাঁড়াইয়াছিলাম, কিন্তু হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া পড়িলাম। তারপর আমি আমার পরিবারের নিকট ফিরিয়া আসিলাম এবং আমার হৃৎপিণ্ড ধড়ফড় করিতেছিল। আমি খাদীজার নিকট গিয়া তাঁহাকে বলিলাম, আমাকে ঢাকিয়া দাও, আমাকে ঢাকিয়া দাও। আমার ভীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আমি কম্বলে ঢাকা অবস্থায় রহিলাম। তখন তিনি (ফেরেশতা) আমার নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল। মহানবী বলেন, 'ইহাতে আমার বোধ হইতেছিল যে, আমি যেন নিজকে পর্বতের উপর হইতে নিচে নিক্ষেপ করিতেছি এবং আমি যখন তেমনই করিতে চাহিলাম তখনই তিনি আমার নিকট আসিয়া বলিলেন, 'হে মুহাম্মাদ! আমি জিবরাঈল এবং আপনি আল্লাহ্র রাসূল।'

তখন তিনি আমাকে আদেশ করিলেন, "পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন"। অতঃপর আমি পড়িলাম। তারপর আমি খাদীজার নিকট আসিয়া তাহাকে বলিলাম, "আমি আমার জীবন সম্পর্কে শংকিত হইয়া পড়িয়াছি। তিনি বলিলেন ....."।

(গ) এই দফা হইতে বর্ণনাটি পুনঃ বুখারী শরীফে উল্লিখিত হাদীছের অনুরূপ অর্থাৎ মহানবী -এর প্রতি খাদীজার সান্ত্বনাসূচক কথাবার্তা, তাঁহাদের ওয়ারাকার নিকট গমন, ওয়ারাকার অভিমত যে, জিবরাঈল ফেরেশতা (নামূস) আল্লাহ্ ওহী লইয়া আসিয়াছিলেন, মহানবী -এর নিজের লোকেরা তাঁহার বিরুদ্ধাচরণ করিবে ইত্যাদি এবং বর্ণনার শেষে রহিয়াছে ওয়ারাকার মন্তব্য যে, তিনি সেই সময় পর্যন্ত যদি বাঁচিয়া থাকেন তাহা হইলে তিনি মহানবীকে সর্বতোভাবে সাহায্য করিবেন।

এই হাদীছটি যদিও আয়েশা (রা)-এর নিকট হইতে শুরু হইয়া আয-যুহরী ও 'উরওয়া'র মাধ্যমে পাওয়া গিয়াছে তবুও নিম্নের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বুখারী শরীফে উদ্ধৃত হাদীছের সহিত ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়:

১. ইহাতে বলা হইয়াছে যে, হিরা গুহায় মহানবীকে ফেরেশতা প্রথম যে কথা বলিয়াছিলেন তাহা হইতেছে তিনি (মহানবী) আল্লাহ্র রাসূল।

২. গুহা হইতে মহানবী বাড়ীতে ফিরিয়া আসিবার পর ফেরেশতা পুনঃ আবির্ভূত হন এবং বলেন যে, তিনি (মহানবী) আল্লাহ্র রাসূল।

৩. ফেরেশতার দ্বিতীয়বার উপস্থিত হওয়ার এবং মহানবীকে দ্বিতীয়বার আল্লাহ্ রাসূল হিসাবে অভিহিত করিবার পর তিনি (মহানবী) নিজকে পাহাড়ের উপর হইতে নিচে নিক্ষেপ করিবার বিষয়ে চিন্তা করেন।

৪. তিনি যখন প্রায় নিজকে নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত হন তখন জিবরাঈল ফেরেশতা তৃতীয়বার উপস্থিত হইয়া নিজকে জিবরাঈল বলিয়া পরিচয় প্রদান করেন এবং মহানবীকে নিশ্চয়তা প্রদান করেন যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল এবং তাঁহাকে সূরা 'আলাক-এর প্রথম আয়াত পাঠ করান।

৫. মহানবী যে পড়িতে অক্ষম ছিলেন ইহার কোথাও কোন উল্লেখ নাই।

৬. ওহী নাযিল হওয়ার বিরতি সম্পর্কে কোন উল্লেখ নাই।

অতএব ইহা এখন স্পষ্ট যে, আয়েশা (রা) অথবা এই বিষয়ে আয-যুহরী একই ঘটনার উপর দুইটি ভিন্ন ভিন্ন বিবরণী দিতে পারিতেন না। যদি এখানে বর্ণিত তথ্য সত্য হইয়া থাকে এবং তাহা যে কোনভাবেই হউক না কেন বাদ পড়িয়া গিয়া অথবা তাহাদের চক্ষু এড়াইয়া গিয়া থাকে তাহা হইলে তাহাদের পরবর্তী বর্ণনাকারীদের তাহাদের তথ্য সংগ্রহের সূত্রের উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু এই বিষয়ের কিছুই এখানে অথবা অন্য কোথাও উল্লেখ করা হয় নাই। এমনকি আয-যুহরী যেমন অনুমান করেন সে অনুযায়ী বুখারী শরীফে উল্লিখিত কথিত আত্মহত্যা প্রচেষ্টার

ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে এখানে বলা হইয়াছে। এইরূপে আয-যুহরী হয়ত উল্লেখ করিতে পারিতেন যে, ওহী নাযিল হইতে বিলম্বের কারণে মহানবী পাহাড়ের উপর হইতে নিচে লাফাইয়া পড়িয়া আত্মহত্যা করিবার ইচ্ছা পোষণ করেন এবং মহানবী তাহা করিতে নিজকে নিরস্ত্র করেন যখন জিবরাঈল (আ) উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে নিশ্চয়তা দেন যে, তিনি আল্লাহ্ রাসূল। পক্ষান্তরে বর্তমান বিবরণীটি কেবল ওহী নাযিল হওয়ার বিরতির কোন উল্লেখই করে নাই, ইহা আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছে যে, মহানবী আত্মহত্যা করিতে মনস্থ করিয়াছিলেন। কিন্তু ফেরেশতা জibraঈল দ্বিতীয়বার আবির্ভূত হইয়া মহানবীকে নিশ্চয়তা দেন যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল। এই বিবরণীর চরম অযৌক্তিকতা ছাড়াও ইহা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, আয-যুহরী নিজে ঘটনাটির কারণ ও ফলাফল সম্পর্কে এই ধরনের পরস্পরবিরোধী ও বিপরীতধর্মী বর্ণনা দিতে পারিতেন না।

তাই উহা স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, আয-যুহরীর পরবর্তী বর্ণনাকারিগণ অথবা তাহাদের মধ্যে কয়েকজনের মাধ্যমে আত-তাবারীর নিকট এই বিবরণী পৌঁছিয়াছে, তাহারা শুধু আয-যুহরীর নিজের বর্ণনাকেই তালগোল পাকাইয়া ফেলে নাই, বরং অন্য বিষয়ের সহিত মূল ঘটনাটিকে মিশাইয়া ফেলিয়াছে। বস্তুত কিছু সংখ্যক বর্ণনাকারী সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য মতামত সম্পূর্ণ এক নয়। উহাহরণস্বরূপ নু'মান ইব্‌ন রাশেদের নাম করা যাইতে পারে। বলা হইয়া থাকে যে, তিনি আয-যুহরীর নিকট হইতে ইহা শুনিয়াছেন। কিন্তু বেশ কিছু সংখ্যক যোগ্য পণ্ডিত নু'মান ইব্‌ন রাশেদকে খুবই 'দুর্বল ও বিভ্রান্ত' বলিয়া অভিহিত করেন। কারণ তিনি প্রচুর ভুল ও ভিত্তিহীন অনুমান করিতেন। এমনকি ইহাও বলা হয় যে, তিনি নিন্দনীয় ও অর্থহীন বিবরণ দিয়াছেন এবং তাহাকে পরিহার করা বাঞ্ছনীয় হইবে। ৩৩

অনুরূপভাবে জারীরকেও (ইবন হাযম ইব্‌ন আবদুল্লাহ ইব্‌ন শুজা আল-আযদী) প্রচুর ভুল করা, তাহার বর্ণনাকৃত হাদীছের সহিত স্বীয় অনুমানের মিশ্রণ, ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতার মধ্যে পরিবর্তন সাধন এবং এমনকি নিন্দনীয় বিবরণীর জন্য নির্ভরযোগ্য বলিয়া বিবেচনা করা হয় না। ৩৪ বলা হইয়া থাকে যে, তিনি আন-নু'মান ইব্‌ন রাশেদের নিকট হইতে ইহা গ্রহণ করিয়াছেন। তাহার পুত্র ওয়াহ্হ্বও ভুল করিতেন এবং তিনি তাহার পিতার নিকট হইতে কোন নজীর হিসাবে বিবরণী গ্রহণ করিতেন। জানা যায় যে, যাহাদের নিকট কোন হাদীছ শুনেন নাই তাহাদের নামে তাহার বর্ণনার উৎস হিসাবে উল্লেখ করিতেন। "শু'বা হইতে" তিনি এরূপ প্রায় চার হাজার হাদীছ বর্ণনা করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেইসব বর্ণনা ছিল আবদুর রহমান আর-রাসসাসী-এর। ৩৫

স্পষ্টতই এরূপ বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে প্রাপ্ত হাদীছসমূহ সতর্কতার সহিত গ্রহণ করা আবশ্যক এবং হাদীছ ব্যাখ্যার স্বীকৃত নিয়মানুযায়ী এই সকল বর্ণনাকে একই বিষয়ের উপর বর্ণনাকারীদের উপরে কোন মতেই স্থান দেওয়া যাইতে পারে না।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পাঁচ: প্রথম প্রত্যাদেশ বা ওহী নাযিলের তারিখ

📄 পাঁচ: প্রথম প্রত্যাদেশ বা ওহী নাযিলের তারিখ


নির্ভরযোগ্য পণ্ডিতবর্গ সাধারণভাবে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, হেরা পর্বতে মহানবী যখন প্রথম ওহী লাভ করেন তখন তাঁহার বয়স ৪০ বৎসর পূর্ণ হইয়াছিল। ৩৬ একজন বিশেষজ্ঞ
পণ্ডিতের মতে ৩৭ কুরআনের ৪৬ : ১৫ নং আয়াতে এই তথ্য সম্পর্কে একটি পরোক্ষ ইঙ্গিত লক্ষ্য করা যায়। ইহাতে বলা হইয়াছে যে, বয়স চল্লিশ বৎসর পূর্ণ হইলে তাহা মহান আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ লাভের জন্য একজন বান্দার আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উপযুক্ত সময় বলিয়া বিবেচিত হয়। বলা হইয়াছে যে, মহানবী রবীউল আওয়াল মাসে জন্মগ্রহণ করেন। ইহার ভিত্তিতে হিসাব করিলে তাঁহার বয়সের চল্লিশতম বৎসর ঐ সালের ঠিক ঐ মাসেই পূর্ণ হয়। যদি তাঁহার বয়স চল্লিশ বৎসর পূর্ণ হওয়ার সময় তিনি তাঁহার চমকপ্রদ ও প্রকৃত স্বপ্ন দেখিবার প্রারম্ভিক কাল আরম্ভ হয় এবং যদি হেরা পর্বতের গুহায় তাঁহার তাহান্নুছ পালনকাল হিসাবে গণ্য করা হয় তাহা হইলে ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, তাঁহার চল্লিশ বৎসর বয়স পূর্ণ হওয়ার কয়েক মাস পর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে ওহী লাভের ঘটনা ঘটে। ৩৮ কবুআনের আনুপূর্বিক বর্ণনার সহিত ইহার চমৎকার সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। যেমন কুরআন রমযান মাসে অবতীর্ণ হয় (অর্থাৎ রবীউল আওয়ালের পর ষষ্ঠ মাসে)। কুরআনের আয়াতটি নিম্নরূপ:
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ . "রামাদান মাস, ইহাতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কুরআন অবতীর্ণ হইয়াছে” (২ঃ ১৮৫)।
কিছু সংখ্যক পণ্ডিত ব্যক্তি অবশ্য এই আয়াতে 'ফী' )فی( অব্যয়টি 'সম্বন্ধে' এই ভাবধারায় ব্যাখ্যা করেন এবং তাহারা বলেন যে, আয়াতটির অর্থ হইতেছে রমযান 'বিষয়ে' কুরআন অবতীর্ণ হইয়াছে (এবং এই মাসে রোযা রাখিতে হইবে)। ৩৯ লক্ষ্য করা যাইতে পারে যে, সংশ্লিষ্ট অব্যয়টি 'সম্বন্ধ' বা 'বিষয়ের' ভাবধারায় কখনও কখনও ব্যবহৃত হইলেও এই ভাবধারায় ইহার অর্থটি এখানে অতি দূরবর্তী ও অপ্রাসঙ্গিক হইয়া পড়ে। কারণ আয়াতটিকে মানবজাতির পথ প্রদর্শক হিসাবে কুরআনকে উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহা দ্বারা ইহাই প্রতিপন্ন করা হইয়াছে যে, আয়াতটির অর্থগত সমগ্র দায়িত্ব রমযান মাসের উপর নয়, কুরআনের উপর অর্পিত হইয়াছে। অবশ্য এইরূপ একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করান হইলে তাহা অনুরূপ অন্যান্য বিষয়সমূহ, যথা তাওহীদ, সালাত ও যাকাত-এর প্রাসঙ্গিক গুরুত্বের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ হইবে না। কুরআনে এই বিষয়সমূহের উপর সবিস্তার আলোচনা হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে যদি কোন একটি একক বিষয়কে চিহ্নিত করিয়া যাহার সম্বন্ধে কুরআন নাযিল হইয়াছে বলিয়া উল্লেখ করা যায় তাহা হইলে সেই বিষয়টি হইবে তাওহীদ। কারণ সমগ্র কুরআন যে কোনভাবে হউক ইহার সহিত সম্পর্কযুক্ত। অবশ্য সালাত ও যাকাতের উপর কুরআনে বারবার ও বিশেষ জোরের সহিত গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে। তবুও কুরআনের কোথাও আমরা ইহার উল্লেখ দেখিতে পাই না যে, এই বিষয়সমূহের যে কোন একটির প্রেক্ষিতে কুরআন অবতীর্ণ হইয়াছে। অতএব ইহা আয়াতটির বর্ণনা প্রসঙ্গ এবং কুরআনের সামগ্রিক বিষয়বস্তুর সহিত সঙ্গতিহীন হইত যদি সংশ্লিষ্ট আয়াতটির ব্যাখ্যা করিতে গিয়া কুরআন রমযান সম্বন্ধে নাযিল হইয়াছে বলা হয়। ৪০
যাহা হউক, ইহা কেবল উপরোল্লিখিত আয়াতটিতেই নয়, বরং কুরআনের অন্য দুইটি আয়াতেও সুনির্দিষ্টভাবে রমযান মাসে কুরআন নাযিল হইয়াছে বলিয়া উল্লিখিত হওয়া এবং মাসটির সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী অংশকে বুঝান হইয়াছে। আয়াত দুইটি নিম্নরূপ:
حم . والكتب المُبينِ . إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَة .. "হা-মীম, শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের! আমি তো ইহা অবতীর্ণ করিয়াছি এক মুবারক রজনীতে... (৪৪: ১-৩)"।
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ... "আমি ইহা অবতীর্ণ করিয়াছি মহিমান্বিত রজনীতে..." (৯৭: ১)।
এই দুইটি আয়াত, বিশেষ করিয়া প্রথমটি সুস্পষ্টভাবে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করিয়াছে। কারণ আয়াতের ঠিক পূর্বে (অর্থাৎ ৪৪: ২) বিশেষভাবে কিতাবের কথা বলা হইয়াছে। অবশ্য উপরে উদ্ধৃত উভয় আয়াতের সুস্পষ্ট সংশ্লিষ্টতা কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার প্রারম্ভকে প্রকাশ করে। কারণ ইহা সুপরিচিত যে, সমগ্র কুরআন মহানবী-এর নিকট তেইশ বৎসর ধরিয়া কিস্তিতে অবতীর্ণ হইয়াছে। আরও উল্লিখিত হইতে পারে যে, কুরআন ও কিতাব পরিভাষাদ্বয় কুরআনের সর্বত্র 'সমগ্র ও ইহার অংশবিশেষ' অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে।
এইভাবে ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, মহানবী-এর নিকট রমযান মাসে কুরআন অবতীর্ণ হয়। আরও স্পষ্ট করিয়া বলিতে গেলে ইহা 'শক্তির রাত্রে' অথবা 'মহিমান্বিত রাত্রে' অবতীর্ণ হইয়াছিল। ৪১ বেশ কিছু সংখ্যক বিবরণীতে উল্লেখ করা হয় যে, এই রাতটি রমযান মাসের শেষ দশ দিনের কোন একটি রাত হইবে। ৪২ একটি বিবরণে নির্দিষ্ট করিয়া উল্লেখ করা হয় যে, রমযান মাসের ২১ তারিখে মহানবী-এর নিকট প্রথম ওহী নাযিল হয়। ৪৩ অন্য আরও একাধিক বিবরণীতে উল্লেখ দেখা যায় যে, মহানবী বলেন, তিনি সোমবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং এই সোমবারেই প্রথম ওহী লাভ করেন। ৪৪ একটি সাম্প্রতিক হিসাবে দেখা যায় যে, রমযান মাসের ২০ তারিখের পর প্রথম সোমবার মহানবী-এর বয়সের ৪১তম বৎসর ২১ রমযান হয়। অতঃপর ইহা বলা যাইতে পারে যে, হেরা পর্বতে নাযিলকৃত প্রথম ওহী মহানবী-এর ৪১ বৎসর বয়সে (৬১০ - ৬১১ খৃস্টীয় বৎসর) ২১ রমযানের রাত্রে আসে। এই প্রসঙ্গে ৩টি বিবরণীর নজীর উল্লেখ করা যাইতে পারে, যেখানে যথাক্রমে ১৭, ১৮ ও ২৪ রমযানকে প্রথম ওহী নাযিলের তারিখ হিসাবে বর্ণনা করা হইয়াছে। ৪৫ লক্ষ্য করা যাইতে পারে যে, এই বিবরণসমূহের কোনটিই নির্ভরযোগ্য নয়। কারণ এই সকল হাদীছ বর্ণনাকারীদের কেহই মহানবী-এর সময়কার নহেন এবং তাহাদের ধারাবাহিক ক্রমে হয় অপরিচিত (মجهول) নতুবা অবিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তাই এই সকল বর্ণনাকে পূর্বোল্লিখিত নির্ভরযোগ্য হাদীছের উপরে স্থান দেওয়া যাইতে পারে না।
এখানে আরও উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, ওহী নাযিলের শুরু বর্ণনা করিতে গিয়া ইব্‌ন ইসহাক উদ্ধৃতি দিয়াছেন, উপরে উল্লিখিত আয়াত ছাড়াও ৮ : ৪১ (সূরা আনফাল)-এ বলা হইয়াছে, “...... যদি তোমরা ঈমান রাখ আল্লাহে এবং তাহাতে যাহা মীমাংসার দিন আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করিয়াছিলাম যখন দুই দল পরস্পরের সম্মুখীন হইয়াছিল...” । ইবন ইসহাক সম্ভবত “যাহা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করিয়া ছিলাম” ইহার অর্থ করিয়াছেন, মহানবী -এর নিকট কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার বিষয়টি এবং চিহ্নিত করিয়াছেন যে, এখানে যে দিনের প্রসঙ্গ উল্লিখিত হইয়াছে তাহা বদর যুদ্ধের এবং এই যুদ্ধ ১৭ রমযান শুক্রবার (২ হি.) অনুষ্ঠিত হয়।৪৬ এই হাদীছের সমর্থনে আত-তাবারীও এই আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়াছেন যাহাতে প্রথম ওহী নাযিলের তারিখ ১৭ রমযান বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।৪৭ তাহাদের অনুসরণ করিয়া কিছু সংখ্যক আধুনিক পণ্ডিত এই আয়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন যে, রমযান মাসের ১৭ তারিখে প্রথম ওহী অবতীর্ণ হয়। অধিকন্তু আয়াত ৪৪ : ৩ ও ৯৭ : ১-এ যাহা বলা হইয়াছে তাহার সহিত তারিখের সমতা রাখিবার জন্য অভিমত ব্যক্ত করা হইয়াছে যে, ঐ বৎসরে ‘মহিমান্বিত রাত্রি’ বা ‘শক্তির রাত্রি’ ১৭ রমযান তারিখে ছিল।৪৮
এখন ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, আয়াত ৮ : ৪১-এ বদর যুদ্ধের প্রসঙ্গ উল্লিখিত হইয়াছে। কিন্তু আয়াতের “যাহা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করিয়াছিলাম পার্থক্য করিবার দিনে ......” ইত্যাদি এই অর্থ করে না যে, ইহাতে কুরআন নাযিলের সূচনা হইয়াছিল। ইহার বিষয়বস্তুর সহিত উহা প্রাসঙ্গিকও নয়। ইহার অর্থ হইতেছে মহানবী -এর প্রতি ঐদিন আল্লাহ প্রেরিত অদৃশ্য সাহায্য আসিয়াছিল। বদর যুদ্ধের গনীমতের মাল বিতরণের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে যে আদেশ জারী করেন তাহাও এই প্রসঙ্গে উল্লিখিত হইয়াছে। বস্তুতপক্ষে সংশ্লিষ্ট বিবরণীটি কেবল একটি দীর্ঘ আয়াতের সমাপ্তিকালীন অংশ যাহা বিষয়টির নিয়ম-কানুনের বিস্তারিত বর্ণনা দ্বারা শুরু হইয়াছে। এই প্রসঙ্গে যে সমস্ত নিয়ম-কানুন প্রণীত হইয়াছে তাহা মানিয়া চলার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব আরোপ করিয়া “যদি তোমরা বিশ্বাস কর” ইত্যাদি শব্দাবলী যুক্ত করা হইয়াছে। কুরআনের স্বীকৃত তাফসীরকারদের মধ্যে কেহই চিন্তা করেন নাই যে, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার প্রতি এখানে পরোক্ষ উল্লেখ করা হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে আত-তাবারীসহ ৪৯ তাহাদের সকলেই সেই দিনে আল্লাহ্র সাহায্য (ফেরেশতাদের প্রেরণ ইত্যাদি) এবং যুদ্ধলব্ধ গনীমতের মাল বিতরণের নির্দেশ এই অর্থে সংশ্লিষ্ট ভাষ্যের ব্যাখ্যা করিয়াছেন।৫০ ইহাও লক্ষণীয় যে, আয়াত ৮:৪১-এ ব্যবহৃত পরিভাষাটি হইতেছে ইয়াওম (দিন); এবং যদিও আরবী ভাষায় ইয়াওম বলিতে দিনের সহিত রাতকেও অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু যেখানে নির্দিষ্টভাবে রাতের উল্লেখ করা হয় সেখানে শুধু রাতকেই বুঝান হয় এবং ইহার সহিত দিন অন্তর্ভুক্ত হয় না। প্রথম ওহী নাযিলের সময় আয়াত ৪৪ : ৩ ও ৯৭ : ১-এ সুনির্দিষ্টভাবে রাতের উল্লেখ করা হইয়াছে এবং এই ঘটনার প্রসঙ্গে ইহার সহিত দিন যুক্ত করা হয় নাই। এই
যুক্তিতেও প্রথম ওহী নাযিলের তারিখের সমর্থনে আয়াত ৮ : ৪১-এর বিবরণ নজির হিসাবে উল্লেখ করা যথাযথ হইবে না।
ওহীর (প্রত্যাদেশ) ধারণা ও ইহার প্রকৃতি নির্দিষ্ট করিয়া কুরআনের ওহীর ধরন সম্বন্ধে পরবর্তী অধ্যায়ে আমাদের আলোচনা করিবার সুযোগ ঘটিবে। এখানে একেবারে প্রথম দিকের প্রত্যাদেশ সম্পর্কে আলোচনা করা বাঞ্ছনীয় হইবে এবং এই আলোচনায় ঐ সকল প্রত্যাদেশের প্রধান প্রধান উপদেশসমূহও স্থান পাইবে।

টিকাঃ
৩৬. ইব্‌ন হিশাম, ১খ., ২৩৩; ইবন সা'দ, ১খ., ১৯০, ১৯৪; আত্-তাবারী, তারীখ, ২খ., ২৯০- ২৯২ (১/১১৩৯-১১৪১)। আত-তাবারী অবশ্য তিনটি বিবরণ দিয়াছেন (প্রকৃতপক্ষে ২টি, কারণ এই ২টি বর্ণনা একই ব্যক্তি অর্থাৎ সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব-এর নিকট হইতে পাওয়া গিয়াছে)। ইহাতে বলা হইয়াছে যে, মহানবী-এর ৪০ বৎসর বয়সে প্রথম ওহী নাযিল হইয়াছিল (আত-তাবারী, তারীখ, পূর্বোক্ত, ২৯২)। যাহা হউক এই বিবরণসমূহ সম্পূর্ণরূপে সঠিক নয় এবং তাহা মহানবী-এর প্রকাশ্যে ধর্ম প্রচার ও কুরায়শদের সহিত তাঁহার বিরোধের সময় হইতে শুরু হইয়াছে বলিয়া দেখা যায়.
৩৭. মুহাম্মাদ ইযযাত দারওয়াযাহ, সীরাতুর রাসূল, ১খ., বৈরুত, তা. বি. (১৪০০ হি.) পৃ. ১২৯-১৩০.
৩৮. দ্র. ফাতহুল বারী, ১খ., পৃ. ৩৬; আল-বায়হাকী, দালাইল, ২খ., ১৪৩.
৩৯. দ্র. আল-বায়দাবী, তাফসীর, ১খ., পৃ. ১০৫। আলোচনার জন্য দ্র. আকরাম খান, পূর্বোক্ত পৃ. ৩১১-৩১৩.
৪০. তাহারা এই দূরবর্তী অর্থ গ্রহণ করেন যাহারা মনে করেন যে, মহানবী-এর বয়স ৪০ বৎসর পূর্ণ হওয়ার পরপরই তাঁহার নিকট ওহী নাযিল হয়। ইহা রবীউল আওয়াল মাসের ৮ তারিখে, কিন্তু রমযান মাসে নয়। তবে এইরূপ মত পোষণ কুরআনের স্পষ্ট আয়াতের পরিপন্থী.
৪১. আয়াত ৪৪: ৩-এ উল্লিখিত মহিমান্বিত রাত সম্পর্কে কোন কোন ব্যক্তি মধ্য শা'বান মাসের কোন এক রাত বুঝাইয়াছেন। এইরূপ মতের পক্ষে কোন নির্ভরযোগ্য হাদীছ নাই। অধিকন্তু এইরূপ মত ৪৪ : ৩ ও ৯৭ : ১ আয়াত দুইটিকে পরস্পর মুখামুখি দাঁড় করাইয়া দেয়। কারণ 'শক্তির রাত' হিসাবে (রমযান মাস) হওয়ার ব্যাপারে কোন দ্বিমত নাই। যেহেতু এই উভয় আয়াতই কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার কথা বলিয়াছেন, তাই ইহাতে দুইটি তারিখ হওয়ার কোন সুযোগ নাই.
৪২. উদাহরণস্বরূপ দ্র. ইব্‌ন কাছীর, তাফসীর, ৮ খ., ৪৬৮ - ৪৭০.
৪৩. আল-হাকেম, আল-মুসতাদরাক, ৩খ., ১৪৩.
৪৪. ইবন সা'দ, ১খ., ১৯৩-১৯৪; আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ২৯৩ (১/১১৪১-১১৪২).
৪৫. ইবন সা'দ, ১খ., ১৯৪; আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ২৯৩-২৯৪ (১/১১৪২-১১৪৩).
৪৬. ইব্‌ন হিশাম, ১খ. পৃ. ২৪০.
৪৭. আত্-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ২৯৪.
৪৮. উদাহরণস্বরূপ দ্র. মুহাম্মাদ ইব্‌ন মুহাম্মাদ আবূ শাহবাহ, সীরাতুর রাসূল ফী দাওয়িল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ, ১খ., দামেস্ক ১৪০৯/১৯৮৮, পৃ. ২৫৯ - ২৬০.
৪৯. আত-তাবারী, তাফসীর, ১০খ., ৮-৯.
৫০. এই আয়াতের (৮৪ : ১) উপর বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থের ভাষ্য দ্র., যথা ইব্‌ন কাছীর, আল-কুরতুবী, আয-যামাখশারী, আল-বায়দাবী, আশ-শাওকানী, আল-বাগাবী, আস-সুয়ূতী ও ইবনুল জাওযী.

নির্ভরযোগ্য পণ্ডিতবর্গ সাধারণভাবে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, হেরা পর্বতে মহানবী যখন প্রথম ওহী লাভ করেন তখন তাঁহার বয়স ৪০ বৎসর পূর্ণ হইয়াছিল। ৩৬ একজন বিশেষজ্ঞ

পণ্ডিতের মতে ৩৭ কুরআনের ৪৬ : ১৫ নং আয়াতে এই তথ্য সম্পর্কে একটি পরোক্ষ ইঙ্গিত লক্ষ্য করা যায়। ইহাতে বলা হইয়াছে যে, বয়স চল্লিশ বৎসর পূর্ণ হইলে তাহা মহান আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ লাভের জন্য একজন বান্দার আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উপযুক্ত সময় বলিয়া বিবেচিত হয়। বলা হইয়াছে যে, মহানবী রবীউল আওয়াল মাসে জন্মগ্রহণ করেন। ইহার ভিত্তিতে হিসাব করিলে তাঁহার বয়সের চল্লিশতম বৎসর ঐ সালের ঠিক ঐ মাসেই পূর্ণ হয়। যদি তাঁহার বয়স চল্লিশ বৎসর পূর্ণ হওয়ার সময় তিনি তাঁহার চমকপ্রদ ও প্রকৃত স্বপ্ন দেখিবার প্রারম্ভিক কাল আরম্ভ হয় এবং যদি হেরা পর্বতের গুহায় তাঁহার তাহান্নুছ পালনকাল হিসাবে গণ্য করা হয় তাহা হইলে ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, তাঁহার চল্লিশ বৎসর বয়স পূর্ণ হওয়ার কয়েক মাস পর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে ওহী লাভের ঘটনা ঘটে। ৩৮ কবুআনের আনুপূর্বিক বর্ণনার সহিত ইহার চমৎকার সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। যেমন কুরআন রমযান মাসে অবতীর্ণ হয় (অর্থাৎ রবীউল আওয়ালের পর ষষ্ঠ মাসে)। কুরআনের আয়াতটি নিম্নরূপ:

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ . "রামাদান মাস, ইহাতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কুরআন অবতীর্ণ হইয়াছে” (২ঃ ১৮৫)।

কিছু সংখ্যক পণ্ডিত ব্যক্তি অবশ্য এই আয়াতে 'ফী' )فی( অব্যয়টি 'সম্বন্ধে' এই ভাবধারায় ব্যাখ্যা করেন এবং তাহারা বলেন যে, আয়াতটির অর্থ হইতেছে রমযান 'বিষয়ে' কুরআন অবতীর্ণ হইয়াছে (এবং এই মাসে রোযা রাখিতে হইবে)। ৩৯ লক্ষ্য করা যাইতে পারে যে, সংশ্লিষ্ট অব্যয়টি 'সম্বন্ধ' বা 'বিষয়ের' ভাবধারায় কখনও কখনও ব্যবহৃত হইলেও এই ভাবধারায় ইহার অর্থটি এখানে অতি দূরবর্তী ও অপ্রাসঙ্গিক হইয়া পড়ে। কারণ আয়াতটিকে মানবজাতির পথ প্রদর্শক হিসাবে কুরআনকে উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহা দ্বারা ইহাই প্রতিপন্ন করা হইয়াছে যে, আয়াতটির অর্থগত সমগ্র দায়িত্ব রমযান মাসের উপর নয়, কুরআনের উপর অর্পিত হইয়াছে। অবশ্য এইরূপ একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করান হইলে তাহা অনুরূপ অন্যান্য বিষয়সমূহ, যথা তাওহীদ, সালাত ও যাকাত-এর প্রাসঙ্গিক গুরুত্বের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ হইবে না। কুরআনে এই বিষয়সমূহের উপর সবিস্তার আলোচনা হইয়াছে। তবুও কুরআনের কোথাও আমরা ইহার উল্লেখ দেখিতে পাই না যে, এই বিষয়সমূহের যে কোন একটির প্রেক্ষিতে কুরআন অবতীর্ণ হইয়াছে। অতএব ইহা আয়াতটির বর্ণনা প্রসঙ্গ এবং কুরআনের সামগ্রিক বিষয়বস্তুর সহিত সঙ্গতিহীন হইত যদি সংশ্লিষ্ট আয়াতটির ব্যাখ্যা করিতে গিয়া কুরআন রমযান সম্বন্ধে নাযিল হইয়াছে বলা হয়। ৪০

যাহা হউক, ইহা কেবল উপরোল্লিখিত আয়াতটিতেই নয়, বরং কুরআনের অন্য দুইটি আয়াতেও সুনির্দিষ্টভাবে রমযান মাসে কুরআন নাযিল হইয়াছে বলিয়া উল্লিখিত হওয়া এবং মাসটির সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী অংশকে বুঝান হইয়াছে। আয়াত দুইটি নিম্নরূপ:

حم . والكتب المُبينِ . إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَة .. "হা-মীম, শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের! আমি তো ইহা অবতীর্ণ করিয়াছি এক মুবারক রজনীতে... (৪৪: ১-৩)"।

إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ... "আমি ইহা অবতীর্ণ করিয়াছি মহিমান্বিত রজনীতে..." (৯৭: ১)।

এই দুইটি আয়াত, বিশেষ করিয়া প্রথমটি সুস্পষ্টভাবে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করিয়াছে। কারণ আয়াতের ঠিক পূর্বে (অর্থাৎ ৪৪: ২) বিশেষভাবে কিতাবের কথা বলা হইয়াছে। অবশ্য উপরে উদ্ধৃত উভয় আয়াতের সুস্পষ্ট সংশ্লিষ্টতা কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার প্রারম্ভকে প্রকাশ করে। কারণ ইহা সুপরিচিত যে, সমগ্র কুরআন মহানবী-এর নিকট তেইশ বৎসর ধরিয়া কিস্তিতে অবতীর্ণ হইয়াছে। আরও উল্লিখিত হইতে পারে যে, কুরআন ও কিতাব পরিভাষাদ্বয় কুরআনের সর্বত্র 'সমগ্র ও ইহার অংশবিশেষ' অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে।

এইভাবে ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, মহানবী-এর নিকট রমযান মাসে কুরআন অবতীর্ণ হয়। আরও স্পষ্ট করিয়া বলিতে গেলে ইহা 'শক্তির রাত্রে' অথবা 'মহিমান্বিত রাত্রে' অবতীর্ণ হইয়াছিল। ৪১ বেশ কিছু সংখ্যক বিবরণীতে উল্লেখ করা হয় যে, এই রাতটি রমযান মাসের শেষ দশ দিনের কোন একটি রাত হইবে। ৪২ একটি বিবরণে নির্দিষ্ট করিয়া উল্লেখ করা হয় যে, রমযান মাসের ২১ তারিখে মহানবী-এর নিকট প্রথম ওহী নাযিল হয়। ৪৩ অন্য আরও একাধিক বিবরণীতে উল্লেখ দেখা যায় যে, মহানবী বলেন, তিনি সোমবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং এই সোমবারেই প্রথম ওহী লাভ করেন। ৪৪ একটি সাম্প্রতিক হিসাবে দেখা যায় যে, রমযান মাসের ২০ তারিখের পর প্রথম সোমবার মহানবী-এর বয়সের ৪১তম বৎসর ২১ রমযান হয়। অতঃপর ইহা বলা যাইতে পারে যে, হেরা পর্বতে নাযিলকৃত প্রথম ওহী মহানবী-এর ৪১ বৎসর বয়সে (৬১০ - ৬১১ খৃস্টীয় বৎসর) ২১ রমযানের রাত্রে আসে। এই প্রসঙ্গে ৩টি বিবরণীর নজীর উল্লেখ করা যাইতে পারে, যেখানে যথাক্রমে ১৭, ১৮ ও ২৪ রমযানকে প্রথম ওহী নাযিলের তারিখ হিসাবে বর্ণনা করা হইয়াছে। ৪৫ লক্ষ্য করা যাইতে পারে যে, এই বিবরণসমূহের কোনটিই নির্ভরযোগ্য নয়। কারণ এই সকল হাদীছ বর্ণনাকারীদের কেহই মহানবী-এর সময়কার নহেন এবং তাহাদের ধারাবাহিক ক্রমে হয় অপরিচিত (মجهول) নতুবা অবিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তাই এই সকল বর্ণনাকে পূর্বোল্লিখিত নির্ভরযোগ্য হাদীছের উপরে স্থান দেওয়া যাইতে পারে না।

এখানে আরও উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, ওহী নাযিলের শুরু বর্ণনা করিতে গিয়া ইব্‌ন ইসহাক উদ্ধৃতি দিয়াছেন, উপরে উল্লিখিত আয়াত ছাড়াও ৮ : ৪১ (সূরা আনফাল)-এ বলা হইয়াছে, “...... যদি তোমরা ঈমান রাখ আল্লাহে এবং তাহাতে যাহা মীমাংসার দিন আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করিয়াছিলাম যখন দুই দল পরস্পরের সম্মুখীন হইয়াছিল...” । ইবন ইসহাক সম্ভবত “যাহা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করিয়া ছিলাম” ইহার অর্থ করিয়াছেন, মহানবী -এর নিকট কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার বিষয়টি এবং চিহ্নিত করিয়াছেন যে, এখানে যে দিনের প্রসঙ্গ উল্লিখিত হইয়াছে তাহা বদর যুদ্ধের এবং এই যুদ্ধ ১৭ রমযান শুক্রবার (২ হি.) অনুষ্ঠিত হয়।৪৬ এই হাদীছের সমর্থনে আত-তাবারীও এই আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়াছেন যাহাতে প্রথম ওহী নাযিলের তারিখ ১৭ রমযান বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।৪৭ তাহাদের অনুসরণ করিয়া কিছু সংখ্যক আধুনিক পণ্ডিত এই আয়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন যে, রমযান মাসের ১৭ তারিখে প্রথম ওহী অবতীর্ণ হয়। অধিকন্তু আয়াত ৪৪ : ৩ ও ৯৭ : ১-এ যাহা বলা হইয়াছে তাহার সহিত তারিখের সমতা রাখিবার জন্য অভিমত ব্যক্ত করা হইয়াছে যে, ঐ বৎসরে ‘মহিমান্বিত রাত্রি’ বা ‘শক্তির রাত্রি’ ১৭ রমযান তারিখে ছিল।৪৮

এখন ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, আয়াত ৮ : ৪১-এ বদর যুদ্ধের প্রসঙ্গ উল্লিখিত হইয়াছে। কিন্তু আয়াতের “যাহা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করিয়াছিলাম পার্থক্য করিবার দিনে ......” ইত্যাদি এই অর্থ করে না যে, ইহাতে কুরআন নাযিলের সূচনা হইয়াছিল। ইহার বিষয়বস্তুর সহিত উহা প্রাসঙ্গিকও নয়। ইহার অর্থ হইতেছে মহানবী -এর প্রতি ঐদিন আল্লাহ প্রেরিত অদৃশ্য সাহায্য আসিয়াছিল। বদর যুদ্ধের গনীমতের মাল বিতরণের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে যে আদেশ জারী করেন তাহাও এই প্রসঙ্গে উল্লিখিত হইয়াছে। বস্তুতপক্ষে সংশ্লিষ্ট বিবরণীটি কেবল একটি দীর্ঘ আয়াতের সমাপ্তিকালীন অংশ যাহা বিষয়টির নিয়ম-কানুনের বিস্তারিত বর্ণনা দ্বারা শুরু হইয়াছে। এই প্রসঙ্গে যে সমস্ত নিয়ম-কানুন প্রণীত হইয়াছে তাহা মানিয়া চলার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব আরোপ করিয়া “যদি তোমরা বিশ্বাস কর” ইত্যাদি শব্দাবলী যুক্ত করা হইয়াছে। কুরআনের স্বীকৃত তাফসীরকারদের মধ্যে কেহই চিন্তা করেন নাই যে, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার প্রতি এখানে পরোক্ষ উল্লেখ করা হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে আত-তাবারীসহ ৪৯ তাহাদের সকলেই সেই দিনে আল্লাহ্র সাহায্য (ফেরেশতাদের প্রেরণ ইত্যাদি) এবং যুদ্ধলব্ধ গনীমতের মাল বিতরণের নির্দেশ এই অর্থে সংশ্লিষ্ট ভাষ্যের ব্যাখ্যা করিয়াছেন।৫০ ইহাও লক্ষণীয় যে, আয়াত ৮:৪১-এ ব্যবহৃত পরিভাষাটি হইতেছে ইয়াওম (দিন); এবং যদিও আরবী ভাষায় ইয়াওম বলিতে দিনের সহিত রাতকেও অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু যেখানে নির্দিষ্টভাবে রাতের উল্লেখ করা হয় সেখানে শুধু রাতকেই বুঝান হয় এবং ইহার সহিত দিন অন্তর্ভুক্ত হয় না। প্রথম ওহী নাযিলের সময় আয়াত ৪৪ : ৩ ও ৯৭ : ১-এ সুনির্দিষ্টভাবে রাতের উল্লেখ করা হইয়াছে এবং এই ঘটনার প্রসঙ্গে ইহার সহিত দিন যুক্ত করা হয় নাই। এই

যুক্তিতেও প্রথম ওহী নাযিলের তারিখের সমর্থনে আয়াত ৮ : ৪১-এর বিবরণ নজির হিসাবে উল্লেখ করা যথাযথ হইবে না।

নির্ভরযোগ্য পণ্ডিতবর্গ সাধারণভাবে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, হেরা পর্বতে মহানবী যখন প্রথম ওহী লাভ করেন তখন তাঁহার বয়স ৪০ বৎসর পূর্ণ হইয়াছিল। ৩৬ একজন বিশেষজ্ঞ

পণ্ডিতের মতে ৩৭ কুরআনের ৪৬ : ১৫ নং আয়াতে এই তথ্য সম্পর্কে একটি পরোক্ষ ইঙ্গিত লক্ষ্য করা যায়। ইহাতে বলা হইয়াছে যে, বয়স চল্লিশ বৎসর পূর্ণ হইলে তাহা মহান আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ লাভের জন্য একজন বান্দার আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উপযুক্ত সময় বলিয়া বিবেচিত হয়। বলা হইয়াছে যে, মহানবী রবীউল আওয়াল মাসে জন্মগ্রহণ করেন। ইহার ভিত্তিতে হিসাব করিলে তাঁহার বয়সের চল্লিশতম বৎসর ঐ সালের ঠিক ঐ মাসেই পূর্ণ হয়। যদি তাঁহার বয়স চল্লিশ বৎসর পূর্ণ হওয়ার সময় তিনি তাঁহার চমকপ্রদ ও প্রকৃত স্বপ্ন দেখিবার প্রারম্ভিক কাল আরম্ভ হয় এবং যদি হেরা পর্বতের গুহায় তাঁহার তাহান্নুছ পালনকাল হিসাবে গণ্য করা হয় তাহা হইলে ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, তাঁহার চল্লিশ বৎসর বয়স পূর্ণ হওয়ার কয়েক মাস পর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে ওহী লাভের ঘটনা ঘটে। ৩৮ কবুআনের আনুপূর্বিক বর্ণনার সহিত ইহার চমৎকার সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। যেমন কুরআন রমযান মাসে অবতীর্ণ হয় (অর্থাৎ রবীউল আওয়ালের পর ষষ্ঠ মাসে)। কুরআনের আয়াতটি নিম্নরূপ:

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ . "রামাদান মাস, ইহাতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কুরআন অবতীর্ণ হইয়াছে” (২ঃ ১৮৫)।

কিছু সংখ্যক পণ্ডিত ব্যক্তি অবশ্য এই আয়াতে 'ফী' )فی( অব্যয়টি 'সম্বন্ধে' এই ভাবধারায় ব্যাখ্যা করেন এবং তাহারা বলেন যে, আয়াতটির অর্থ হইতেছে রমযান 'বিষয়ে' কুরআন অবতীর্ণ হইয়াছে (এবং এই মাসে রোযা রাখিতে হইবে)। ৩৯ লক্ষ্য করা যাইতে পারে যে, সংশ্লিষ্ট অব্যয়টি 'সম্বন্ধ' বা 'বিষয়ের' ভাবধারায় কখনও কখনও ব্যবহৃত হইলেও এই ভাবধারায় ইহার অর্থটি এখানে অতি দূরবর্তী ও অপ্রাসঙ্গিক হইয়া পড়ে। কারণ আয়াতটিকে মানবজাতির পথ প্রদর্শক হিসাবে কুরআনকে উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহা দ্বারা ইহাই প্রতিপন্ন করা হইয়াছে যে, আয়াতটির অর্থগত সমগ্র দায়িত্ব রমযান মাসের উপর নয়, কুরআনের উপর অর্পিত হইয়াছে। অবশ্য এইরূপ একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করান হইলে তাহা অনুরূপ অন্যান্য বিষয়সমূহ, যথা তাওহীদ, সালাত ও যাকাত-এর প্রাসঙ্গিক গুরুত্বের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ হইবে না। কুরআনে এই বিষয়সমূহের উপর সবিস্তার আলোচনা হইয়াছে। তবুও কুরআনের কোথাও আমরা ইহার উল্লেখ দেখিতে পাই না যে, এই বিষয়সমূহের যে কোন একটির প্রেক্ষিতে কুরআন অবতীর্ণ হইয়াছে। অতএব ইহা আয়াতটির বর্ণনা প্রসঙ্গ এবং কুরআনের সামগ্রিক বিষয়বস্তুর সহিত সঙ্গতিহীন হইত যদি সংশ্লিষ্ট আয়াতটির ব্যাখ্যা করিতে গিয়া কুরআন রমযান সম্বন্ধে নাযিল হইয়াছে বলা হয়। ৪০

যাহা হউক, ইহা কেবল উপরোল্লিখিত আয়াতটিতেই নয়, বরং কুরআনের অন্য দুইটি আয়াতেও সুনির্দিষ্টভাবে রমযান মাসে কুরআন নাযিল হইয়াছে বলিয়া উল্লিখিত হওয়া এবং মাসটির সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী অংশকে বুঝান হইয়াছে। আয়াত দুইটি নিম্নরূপ:

حم . والكتب المُبينِ . إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَة .. "হা-মীম, শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের! আমি তো ইহা অবতীর্ণ করিয়াছি এক মুবারক রজনীতে... (৪৪: ১-৩)"।

إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ... "আমি ইহা অবতীর্ণ করিয়াছি মহিমান্বিত রজনীতে..." (৯৭: ১)।

এই দুইটি আয়াত, বিশেষ করিয়া প্রথমটি সুস্পষ্টভাবে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করিয়াছে। কারণ আয়াতের ঠিক পূর্বে (অর্থাৎ ৪৪: ২) বিশেষভাবে কিতাবের কথা বলা হইয়াছে। অবশ্য উপরে উদ্ধৃত উভয় আয়াতের সুস্পষ্ট সংশ্লিষ্টতা কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার প্রারম্ভকে প্রকাশ করে। কারণ ইহা সুপরিচিত যে, সমগ্র কুরআন মহানবী-এর নিকট তেইশ বৎসর ধরিয়া কিস্তিতে অবতীর্ণ হইয়াছে। আরও উল্লিখিত হইতে পারে যে, কুরআন ও কিতাব পরিভাষাদ্বয় কুরআনের সর্বত্র 'সমগ্র ও ইহার অংশবিশেষ' অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে।

এইভাবে ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, মহানবী-এর নিকট রমযান মাসে কুরআন অবতীর্ণ হয়। আরও স্পষ্ট করিয়া বলিতে গেলে ইহা 'শক্তির রাত্রে' অথবা 'মহিমান্বিত রাত্রে' অবতীর্ণ হইয়াছিল। ৪১ বেশ কিছু সংখ্যক বিবরণীতে উল্লেখ করা হয় যে, এই রাতটি রমযান মাসের শেষ দশ দিনের কোন একটি রাত হইবে। ৪২ একটি বিবরণে নির্দিষ্ট করিয়া উল্লেখ করা হয় যে, রমযান মাসের ২১ তারিখে মহানবী-এর নিকট প্রথম ওহী নাযিল হয়। ৪৩ অন্য আরও একাধিক বিবরণীতে উল্লেখ দেখা যায় যে, মহানবী বলেন, তিনি সোমবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং এই সোমবারেই প্রথম ওহী লাভ করেন। ৪৪ একটি সাম্প্রতিক হিসাবে দেখা যায় যে, রমযান মাসের ২০ তারিখের পর প্রথম সোমবার মহানবী-এর বয়সের ৪১তম বৎসর ২১ রমযান হয়। অতঃপর ইহা বলা যাইতে পারে যে, হেরা পর্বতে নাযিলকৃত প্রথম ওহী মহানবী-এর ৪১ বৎসর বয়সে (৬১০ - ৬১১ খৃস্টীয় বৎসর) ২১ রমযানের রাত্রে আসে। এই প্রসঙ্গে ৩টি বিবরণীর নজীর উল্লেখ করা যাইতে পারে, যেখানে যথাক্রমে ১৭, ১৮ ও ২৪ রমযানকে প্রথম ওহী নাযিলের তারিখ হিসাবে বর্ণনা করা হইয়াছে। ৪৫ লক্ষ্য করা যাইতে পারে যে, এই বিবরণসমূহের কোনটিই নির্ভরযোগ্য নয়। কারণ এই সকল হাদীছ বর্ণনাকারীদের কেহই মহানবী-এর সময়কার নহেন এবং তাহাদের ধারাবাহিক ক্রমে হয় অপরিচিত (মجهول) নতুবা অবিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তাই এই সকল বর্ণনাকে পূর্বোল্লিখিত নির্ভরযোগ্য হাদীছের উপরে স্থান দেওয়া যাইতে পারে না।

এখানে আরও উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, ওহী নাযিলের শুরু বর্ণনা করিতে গিয়া ইব্‌ন ইসহাক উদ্ধৃতি দিয়াছেন, উপরে উল্লিখিত আয়াত ছাড়াও ৮ : ৪১ (সূরা আনফাল)-এ বলা হইয়াছে, “...... যদি তোমরা ঈমান রাখ আল্লাহে এবং তাহাতে যাহা মীমাংসার দিন আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করিয়াছিলাম যখন দুই দল পরস্পরের সম্মুখীন হইয়াছিল...” । ইবন ইসহাক সম্ভবত “যাহা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করিয়া ছিলাম” ইহার অর্থ করিয়াছেন, মহানবী -এর নিকট কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার বিষয়টি এবং চিহ্নিত করিয়াছেন যে, এখানে যে দিনের প্রসঙ্গ উল্লিখিত হইয়াছে তাহা বদর যুদ্ধের এবং এই যুদ্ধ ১৭ রমযান শুক্রবার (২ হি.) অনুষ্ঠিত হয়।৪৬ এই হাদীছের সমর্থনে আত-তাবারীও এই আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়াছেন যাহাতে প্রথম ওহী নাযিলের তারিখ ১৭ রমযান বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।৪৭ তাহাদের অনুসরণ করিয়া কিছু সংখ্যক আধুনিক পণ্ডিত এই আয়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন যে, রমযান মাসের ১৭ তারিখে প্রথম ওহী অবতীর্ণ হয়। অধিকন্তু আয়াত ৪৪ : ৩ ও ৯৭ : ১-এ যাহা বলা হইয়াছে তাহার সহিত তারিখের সমতা রাখিবার জন্য অভিমত ব্যক্ত করা হইয়াছে যে, ঐ বৎসরে ‘মহিমান্বিত রাত্রি’ বা ‘শক্তির রাত্রি’ ১৭ রমযান তারিখে ছিল।৪৮

এখন ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, আয়াত ৮ : ৪১-এ বদর যুদ্ধের প্রসঙ্গ উল্লিখিত হইয়াছে। কিন্তু আয়াতের “যাহা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করিয়াছিলাম পার্থক্য করিবার দিনে ......” ইত্যাদি এই অর্থ করে না যে, ইহাতে কুরআন নাযিলের সূচনা হইয়াছিল। ইহার বিষয়বস্তুর সহিত উহা প্রাসঙ্গিকও নয়। ইহার অর্থ হইতেছে মহানবী -এর প্রতি ঐদিন আল্লাহ প্রেরিত অদৃশ্য সাহায্য আসিয়াছিল। বদর যুদ্ধের গনীমতের মাল বিতরণের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে যে আদেশ জারী করেন তাহাও এই প্রসঙ্গে উল্লিখিত হইয়াছে। বস্তুতপক্ষে সংশ্লিষ্ট বিবরণীটি কেবল একটি দীর্ঘ আয়াতের সমাপ্তিকালীন অংশ যাহা বিষয়টির নিয়ম-কানুনের বিস্তারিত বর্ণনা দ্বারা শুরু হইয়াছে। এই প্রসঙ্গে যে সমস্ত নিয়ম-কানুন প্রণীত হইয়াছে তাহা মানিয়া চলার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব আরোপ করিয়া “যদি তোমরা বিশ্বাস কর” ইত্যাদি শব্দাবলী যুক্ত করা হইয়াছে। কুরআনের স্বীকৃত তাফসীরকারদের মধ্যে কেহই চিন্তা করেন নাই যে, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার প্রতি এখানে পরোক্ষ উল্লেখ করা হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে আত-তাবারীসহ ৪৯ তাহাদের সকলেই সেই দিনে আল্লাহ্র সাহায্য (ফেরেশতাদের প্রেরণ ইত্যাদি) এবং যুদ্ধলব্ধ গনীমতের মাল বিতরণের নির্দেশ এই অর্থে সংশ্লিষ্ট ভাষ্যের ব্যাখ্যা করিয়াছেন।৫০ ইহাও লক্ষণীয় যে, আয়াত ৮:৪১-এ ব্যবহৃত পরিভাষাটি হইতেছে ইয়াওম (দিন); এবং যদিও আরবী ভাষায় ইয়াওম বলিতে দিনের সহিত রাতকেও অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু যেখানে নির্দিষ্টভাবে রাতের উল্লেখ করা হয় সেখানে শুধু রাতকেই বুঝান হয় এবং ইহার সহিত দিন অন্তর্ভুক্ত হয় না। প্রথম ওহী নাযিলের সময় আয়াত ৪৪ : ৩ ও ৯৭ : ১-এ সুনির্দিষ্টভাবে রাতের উল্লেখ করা হইয়াছে এবং এই ঘটনার প্রসঙ্গে ইহার সহিত দিন যুক্ত করা হয় নাই। এই

যুক্তিতেও প্রথম ওহী নাযিলের তারিখের সমর্থনে আয়াত ৮ : ৪১-এর বিবরণ নজির হিসাবে উল্লেখ করা যথাযথ হইবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00