📄 এক: আল্লাহ্র নিকট হইতে ওহীলাভ
সন্দেহ নাই যে, হানীফ হিসাবে যাহাদের বর্ণনা করা হইয়াছে তাহাদের অধিকাংশই ছিলেন মহানবী -এর সমসাময়িক এবং যাহারা মক্কার অধিবাসী ছিলেন তাহাদের কাহারও সহিত তাঁহার যোগাযোগ ছিল। তাহাদের অনেকেই তাঁহার আত্মীয় ও পরিচিত ছিলেন। যেমন যায়দ ইব্ন 'আমর ইবন নুফায়ল, ওয়ারাকা ইবন নাওফাল ও উবায়দুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ। সূত্রসমূহ তাঁহার এইরূপ যোগাযোগ সম্পর্কে কোন বিস্তারিত তথ্য প্রদান করে নাই অথবা একের উপর অন্যের পারস্পরিক প্রভাব সম্পর্কে কোন স্পষ্ট ইংগিত দেয় নাই। কিন্তু এইরূপ সংযোগের প্রকৃতি যাহাই হউক না কেন ইহা স্পষ্ট যে, মহানবী খাঁটি ধর্মের অনুসন্ধানে সিরিয়ার মত দূরদেশে ভ্রমণের মাধ্যমে তাহাদের কাহারও অনুকরণ করেন নাই। ইহার সম্পূর্ণ বিপরীতে তাঁহার নবুওয়াত লাভের পূর্বে তাঁহার স্বাভাবিক প্রবণতা ও কার্যাবলী সম্পর্কে যাহা জানা যায় তাহা হইতেছে, তিনি ক্রমান্বয়ে নির্জনতা পছন্দ করিতে আরম্ভ করেন এবং একাকী নির্জনে হেরা পর্বতের উপরে অবস্থিত একটি গুহায় ইবাদত ও গভীর ধ্যানে (আত-তাহানু) নিমগ্ন থাকা। হেরা পর্বতটি কা'বা শরীফের তিন মাইল পূর্ব-উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত। ইহা এখন অবশ্য মক্কা নগরীর সীমানার অন্তর্ভুক্ত। গুহায় এইভাবে নির্জনে অবস্থানকালে তিনি একদিন ফেরেশতা জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে আল্লাহ্র নিকট হইতে ওহী লাভ করেন। তাঁহার জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সবচাইতে বিশ্বস্ত বিবরণ তাঁহার সহধর্মীনী আয়েশা (রা) কর্তৃক প্রদত্ত হইয়াছে এবং বুখারী (র) কর্তৃক সংকলিত সহীহ হাদীছ গ্রন্থে সংরক্ষিত আছে। এই ঘটনাটি তাঁহার ভাগিনা' উরওয়াহ ইবনুয যুবায়র (মৃ. ৯৪ হি.) কর্তৃক প্রচারিত হয়। তাঁহার নিকট হইতে ইব্ন শিহাব আয-যুহরী (মৃ. ১২৪ হি.), তাঁহার নিকট হইতে উকায়ল (মৃ. ১৪৪ হি.) এবং তাঁহার নিকট হইতে আল-লায়ছ (মৃ. ১৭৫ হি.), তাঁহার নিকট হইতে ইয়াহইয়া ইব্ন বুকায়র (মৃ. ২৩১ হি.) এবং তাঁহার নিকট হইতে ইমাম বুখারী (মৃ. ২৫৬ হি.) কর্তৃক ধারাবাহিকভাবে এই ঘটনা বর্ণিত হয়। ঘটনাটি নিম্নরূপঃ
"আয়েশা (রা) বলিলেন, আল্লাহ্র নিকট হইতে রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি ওহী নাযিল হওয়ার সূচনা হইয়াছিল ঘুমের মধ্যে সুস্বপ্নের মাধ্যমে। তারপর হইতে তিনি যে স্বপ্ন দেখিতেন তাহাই ঊষার আলোকের ন্যায় ইহা ঊষাকালে ভাস্মর হইয়া উঠিত। তারপর হইতে নির্জনতা তাঁহার আরও প্রিয় হইয়া উঠিল। তিনি হেরা পর্বতের গুহায় নির্জন অবস্থায় থাকিতেন এবং
আত-তাহান্নুছ অর্থাৎ ইবাদত ও আত্মসমর্পণ (তা'আব্বুদ)২ করিতেন। এইভাবে গুহাতে একাদিক্রমে অনেক রাত্রি যাপন করিতেন এবং কিছু পরিমাণ খাবার সংগ্রহের জন্য স্ত্রী খাদীজার নিকট ফিরিয়া আসিতেন, তারপর পুনঃ গুহায় প্রত্যাবর্তন করিতেন। এইভাবে তাঁহার নিকট সত্য ধর্ম অবতীর্ণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাঁহার নির্জনবাস ও ইবাদত চলিতে থাকে। ফেরেশতা তাঁহার নিকট আসিয়া বলিলেন, 'পড়'। তিনি উত্তর দিলেন مَا أَنا بقاری "আমি ত পড়ি নাই”। তিনি (মহানবী) বলিলেন: حَتَّى بَلَغَ مِنِّى الْجُهْدَ "ইহাতে ফেরেশতা আমাকে ধরিয়া এমনভাবে চাপ দিলেন যাহা সহ্য করা আমার জন্য কষ্টকর হইয়া পড়ে"। তারপর তিনি আমাকে ছাড়িয়া দিলেন এবং বলিলেন, “পড়”। আমি বলিলাম, আমি ত পড়ি নাই। তৎকারণে তিনি আমাকে দ্বিতীয়বার সবলে ধরিয়া চাপ দিলেন এবং এই চাপ সহ্য করিয়া থাকিবার পর্যন্ত ধরিয়া রাখিলেন। তারপর আমাকে ছাড়িয়া দিয়া বলিলেন, “পড়”। আমি উত্তর দিলাম, 'আমি পড়িতে জানি না'। এইবার তৃতীয়বার আমাকে জাপটাইয়া ধরিয়া চাপ প্রয়োগ করিলেন এবং কিছুক্ষণ পর ছাড়িয়া দিয়া পুনঃ বলিলেন, 'পড়, তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন, সৃষ্টি করিয়াছেন মানুষকে রক্তবিন্দু ('আলাক) হইতে। পড়; এবং তোমার প্রভু বড়ই করুণাময়। তখন আল্লাহর দূত ইহা লইয়া প্রত্যাবর্তন করেন )فَرَفَعَ بِهَا(। ভয়ে ও হতবুদ্ধি অবস্থায় তাঁহার হৃদয় তখন ধড়ফড় করিতেছিল )يَرْجُفُ فُوَادَهُ(। তিনি তখন খাদীজা বিনত খুওয়ায়লিদ (রা)-এর নিকট গিয়া তাঁহাকে বলিলেন, 'আমাকে চাদর দিয়া ঢাকিয়া দাও, ঢাকিয়া দাও।' তাঁহাকে চাদর দিয়া ঢাকিয়া দেওয়া হইল এবং তাঁহার ভয় দূর না হওয়া পর্যন্ত তিনি তদবস্থায় থাকিলেন। তিনি খাদীজাকে এই ঘটনা সম্পর্কে খুলিয়া বলিলেন এবং ইহার সহিত আরও যুক্ত করিলেন, "আমি আমার জীবনের আশংকা করিতেছি” (অর্থাৎ আমার উপর দুর্ঘটনা ঘটিবার আশংকা করিতেছি)।
খাদীজা ইহা শুনিয়া বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! তিনি (আল্লাহ) কখনও আপনাকে অপমানিত করিবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়দের খোঁজ-খবর রাখেন ও সাহায্য করেন, আপনি দুর্বলের বোঝা বহন করিয়া দেন, আপনি অসহায় নিঃস্ব গরীবদের অর্থ সাহায্য করেন, আপনি অতিথিপরায়ণ ও নিয়তির কষাঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আপনি আশ্রয়স্থল। তখন তিনি তাঁহার এক চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইবন নওফাল ইব্ন আসাদ ইব্ন 'আবদুল 'উযযা'র নিকট তাঁহাকে লইয়া গেলেন। ওয়ারাকা জাহিলিয়ার যুগে খৃস্টধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি হিব্রু ভাষায় ধর্মশাস্ত্র লিখিতেন এবং আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী হিব্রু ভাষায় ইনজীল গ্রন্থের অনুলিপি তৈয়ার করিতেন। ৫ তাহার অনেক বয়স হইয়াছিল এবং তিনি অন্ধ হইয়া গিয়াছিলেন। খাদীজা তাঁহাকে বলিলেন, 'হে আমার ভ্রাতা! আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রের কথা শুনুন।' ওয়ারাকা তখন তাঁহাকে (মহানবী ) বলিলেন, 'হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র! আপনি কি বলিতে চাহেন তাহা খুলিয়া বলুন'? তখন আল্লাহ্ রাসূল যাহা দেখিয়াছেন তাহা তাঁহার নিকট বর্ণনা করিলেন। তৎকারণে ওয়ারাকা তাঁহাকে বলিলেন, "ইনি হইতেছেন 'নামূস' (অর্থাৎ বার্তাবাহক ফেরেশতা জিবরীল) যাঁহাকে আল্লাহ তা'আলা মূসার নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন। হায়। আমি যদি তখন যুবক থাকিতাম! যখন আপনার
লোকেরা আপনাকে তাড়াইয়া দিবে তখন যদি আমি বাঁচিয়া থাকিতাম!” ইহা শুনিয়া আল্লাহ্র রাসূল জানিতে চাহিলেন, "তাহারা কি সত্যই আমাকে আপনার জন্মস্থান হইতে তাড়াইয়া দিবে?" ওয়ারাকা বলিলেন, "হাঁ! আপনি যে বিষয় লইয়া আসিয়াছেন আমার পূর্বে ইহা লইয়া যাহারাই আসিয়াছেন তাহারাই শত্রুতার লক্ষ্যবস্তু হইয়াছেন। যদি সেই সময় পর্যন্ত আমি বাঁচিয়া থাকি তাহা হইলে আমার সর্বোত্তম সাধ্যানুযায়ী আমি আপনাকে সাহায্য করিব।' এই ঘটনার কিছুকাল পর ওয়ারাকা ইন্তেকাল করেন এবং ওহী নাযিলে কিছু বিরতি ঘটে”। ৬
এখানে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, এই বর্ণনায় কেবল আয়েশা (রা) ও ওয়ারাকার বিবরণ অন্তর্ভুক্ত হয় নাই, বরং গুহাতে মহানবী যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হইয়াছিলেন, বিশেষ করিয়া ফেরেশতা কর্তৃক তাঁহাকে জোরপূর্বক জাপটাইয়া ধরিয়া বুকের মধ্যে তিনবার চাপ দেওয়া হইয়াছিল, তাহার বিবরণ রহিয়াছে। ইহা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ যে সত্তা মহানবী -এর সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছেন তিনি শুধু তাঁহাকে দেখিয়াছেন তাহা নহে, বরং শারীরিকভাবে তাঁহার অস্তিত্ব অনুভব করিয়াছেন এবং এই বিবরণীতে তাহার উল্লেখ আছে যে, তিনি একজন ফেরেশতা। ইহা ছাড়া এই বিবরণীতে সুস্পষ্টভাবে বেশ কিছু তথ্যের সন্নিবেশ ঘটিয়াছে। প্রথমত বলা হইয়াছে যে, হেরা পর্বতের গুহায় ওহী লাভের পূর্ববর্তী সময় ছিল ঊষার পূর্ব মুহূর্ত। প্রথম দিকের এই সময়ে ঘুমের মধ্যে মহানবী খুবই তাৎপর্যপূর্ণ স্বপ্ন দেখিতেন। প্রাতঃকালীন দিবালোকের ন্যায় উহা খুবই উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত ছিল। কোন কোন বিবরণীতে পাওয়া যায় যে, ওহী লাভের পূর্ববর্তী এই সময়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ মাস। অন্যান্য কিছু সংখ্যক বর্ণনায় দেখা যায় যে, মহানবী এই সময় যখন মক্কার রাস্তায় পদচারণা করিতেন তখন আকাশের দিক হইতে তাঁহাকে আহ্বান করিতেছেন এইরূপ একটি কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইতেন। তারপর তিনি যখন উপরের দিকে তাকাইতেন তখন বহু উপরে বেহেশতে অথবা দিগন্তে একটি প্রতিকৃতি দেখিতে পাইতেন এবং ঐ প্রতিকৃতি নিজকে জিবরাঈল নামে পরিচয় প্রদান করিতেন।৮
দ্বিতীয়ত, এই প্রারম্ভিক পর্যায়ের পর হেরা পর্বতের গুহায় নির্জনে ইবাদত ও ধ্যানে নিমগ্ন থাকার পর্যায় শুরু হয়। এই প্রসঙ্গে ব্যবহৃত আত-তাহান্নুছ (التَّحَنُّتُ) শব্দের প্রাচীন আমল এবং তৎসহ আধুনিক আমলের লেখকগণ কর্তৃক নানভাবে ব্যাখ্যা করা হইয়াছে। ৯ এই পরিভাষাটির সঠিক অর্থ যাহাই হউক না কেন এই নির্দিষ্ট বিবরণী বিবেচনা করা হইলে সেই অবস্থার ইহা ছিল একটি স্পষ্ট বর্ণনা যাহাতে মহানবী নিজে নির্জনে থাকিতে পছন্দ করিতেন। তিনি যখন গভীর ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখিতেন সেই প্রারম্ভিক পর্যায় অতিক্রম করিবার পর তাঁহার মধ্যে ক্রমান্বয়ে এই নির্জনবাসের প্রতি আগ্রহ জন্মে। এই বিবরণীতে আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করা যাইতে পারে, যেমন- পর্বতের গুহায় অবস্থানের উদ্দেশ্যে তিনি খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহের জন্য মাঝে মাঝে তাঁহার পরিবারে ফিরিয়া আসিতেন এবং একাদিক্রমে কয়েক দিন ও রাত নির্জনে অবস্থান ও ধ্যানে নিমগ্ন হইতেন-ইহা উক্ত বিবরণীতে উল্লিখিত হয়।
তৃতীয়ত, গুহার অভ্যন্তরে ইহা এমন একটি নির্জন অবস্থা ছিল যে, এই সময় ফেরেশতার আবির্ভাব ঘটে এবং তিনি তাঁহাকে আল্লাহর বাণী হস্তান্তর করেন। মহানবী -এর জাগ্রত ও পূর্ণ সচেতন অবস্থায় এই ঘটনাটি সংঘটিত হয়। ফেরেশতার সহিত তাঁহার অর্জিত অভিজ্ঞতার (অর্থাৎ তাঁহাকে তিনবার জাপটাইয়া ধরিয়া বুকে চাপ দেওয়ার) বিশদ বিবরণী হইতেই ইহা কেবল স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় নাই, বরং এই ঘটনা দ্বারা ইহা প্রমাণিত হয় যে, ঘুমের মধ্যে পূর্বের কোন স্বপ্ন হইতে এই অবস্থাকে পৃথকভাবে বিচিত্র করা হইয়াছে।
চতুর্থত, তিনি আল্লাহ্র যে বাণী প্রাপ্ত হইয়া পর্বত হইতে অবতরণ করেন তাহা এমন একটি বিষয় ছিল না যে, ইহা তাঁহার গভীর চিন্তা ও ধ্যানের ফসল হিসাবে তাঁহার উপর প্রকাশিত হয়। ইহা ছিল একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বাণী যাহা একটি প্রত্যক্ষ সূত্র হইতে তাঁহাকে পাঠ করান হইয়াছিল। এই ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্বের সহিত প্রকাশের দাবি রাখে। কারণ ইহার বিপরীতে যেমন গৌতম বুদ্ধের ন্যায় অন্যান্য ধর্মীয় নেতার ক্ষেত্রে এইরূপ গভীর চিন্তা ও ধ্যানের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল তাঁহাদের আধ্যাত্মিক 'জ্ঞানালোক' প্রাপ্তি। কিন্তু মহানবী এর ক্ষেত্রে ইহা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে, তিনি যাহা প্রাপ্ত হইয়াছেন তাহা তাঁহার মানসিক, আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের ফল ছিল না, বরং ভিন্ন একটি সত্তা এই বাণী তাঁহাকে সমর্পণ করেন। এই প্রেক্ষিতে বাণীটি নিজেই উপযুক্ত প্রামাণিক সাক্ষ্য বহন করে। কারণ ইহা আধ্যাত্মিক জ্ঞানালোক প্রাপ্তি ভিন্ন অন্য কিছুরই অর্থ বহন করে না। পক্ষান্তরে ইহা মানুষকে তাহার সৃষ্টির উৎস সম্পর্কে অবহিত করে এবং মহানবীকে তাঁহার প্রভুর নামে পাঠ করিবার জন্য বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করে। বাস্তবিকই পাঠের জন্য এই সনির্বন্ধ প্রণোদনা এই অর্থ সূচিত করে যে, তাঁহাকে যাহা দেওয়া হইতেছিল তাহা ছিল আল্লাহ তা'আলার বাণী এবং তাহা পাঠ করিবার জন্য তাঁহার প্রতি আল্লাহর আদেশ ছিল। আল্লাহ তা'আলার বাণীর এই প্রামাণিক তথ্য হইতেছে চূড়ান্ত প্রমাণ যে, ইহা মহানবী -এর নিকট হইতে উদ্ভূত হয় নাই এবং বাণীটির সরল অন্তর্নিহিত অর্থ হইতে ইহা আরও প্রমাণিত হয়। বাণীটিতে পাঠের গুরুত্বের প্রতি জোর দেওয়া হইয়াছে। আর এই পাঠের অর্থ হইতেছে জ্ঞানার্জন। এই সাধারণ বার্তাটির আদান-প্রদানই যদি মহানবী-এর উদ্দেশ্য হইত, তাহা হইলে নির্জনবাস ও ধ্যানে নিমগ্ন না হইয়াই তিনি তাহা সম্পাদন করিতে পারিতেন এবং তাঁহার পক্ষে সামান্য চিন্তার মাধ্যমেই ইহা সাধন করা সম্ভব হইত।
পঞ্চমত, মহানবী-এর এই ঘটনার উপর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল স্পষ্টতই একজন ব্যক্তি বিশেষকে লইয়া যিনি এই ধরনের ঘটনার জন্য যেমন প্রস্তুত ছিলেন না তেমনি এই ব্যাপারে কোন প্রত্যাশা অথবা কোন পূর্ব অনুমানও করিতে পারেন নাই। এই কারণে তাঁহার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল আতঙ্কের ও হতবুদ্ধিকর এবং নিজের জীবন সম্পর্কে আশংকার। তাঁহার প্রতিক্রিয়া এই সত্যের দৃষ্টান্ত যে, তিনি যাহা পাইয়াছিলেন তাহা ছিল একটি বাহিরের সূত্র হইতে আগত এবং তাহা নিজের মনস্তাত্ত্বিক কোন নিদর্শন ছিল না। পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, কোন কৌশল অবলম্বন করিয়াই হউক না কেন নবী হিসেবে তাঁহার আত্মপ্রকাশের জন্য কোন
পরিকল্পনা বা উচ্চাকাংখার অনুপস্থিতিই ছিল ইহার প্রমাণ। ১০ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার বিষয়টি খাদীজার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ দ্বারা আরও জোরালো করা হইয়াছে এবং খাদীজা (রা) ও মহানবী কর্তৃক এই বিষয়ে ওয়ারাকার সহিত আলোচনা এবং ওয়ারাকার প্রতিক্রিয়া বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব প্রদান করিয়াছে।
সর্বশেষ হইলেও কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নহে যে, এই বিবরণী অন্য দুইটি সত্যকে প্রকাশ করিতেছে। ইহার একটি হইল মহানবী -এর পক্ষে পড়িতে পারিবার দক্ষতার অনুপস্থিতি। কারণ জিবরাঈল -এর পাঠ করিবার আদেশের উত্তরে তাঁহার স্বতঃস্ফূর্ত জবাব ছিল, "আমি সে নই যে পড়িতে পারে"। ১১ অন্য সত্যটি হইল, মহানবী -এর সহিত যোগাযোগের মূল বিষয়বস্তু এই পূর্ব ধারণা দেয় যে, মহানবী -এর এক আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস এবং আল্লাহ সম্পর্কে পূর্ব হইতেই জ্ঞান ছিল। আল্লাহ তা'আলার প্রকৃতি ও স্থিতি সম্পর্কে কোন পরিচিতি ও ব্যাখ্যা প্রদান না করিয়াই 'তোমার প্রভুর নামে' তাঁহাকে পড়িতে আদেশ করা হইতেছিল। ইহা মানিয়া লওয়া হইয়াছে যে, তাঁহার প্রভু কে সে সম্পর্কে তাঁহার জ্ঞান ছিল।
এই বর্ণনার সহিত বিবরণীটির সমাপ্তি ঘটে যে, হেরা পর্বতের গুহায় প্রথম যোগাযোগের পর ওহী অবতীর্ণ হইতে একটি বিরতি দেওয়া হয়। ইহা ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কারণ প্রথম ঘটনাটি অবশ্যই মহানবী -কে খুব গভীরভাবে আলোড়িত করিয়াছিল এবং স্পষ্টতই প্রথম আকস্মিক মানসিক অভিঘাত হইতে নিজকে সামলাইয়া লইবার জন্য তাঁহার জন্য কিছু অবকাশের প্রয়োজন ছিল। একই সাথে তিনি অবশ্যই স্বাভাবিকভাবে উৎসুক ছিলেন যে, হেরা পর্বতের গুহায় তাঁহার নিকট যোগাযোগের যে প্রথম পাঠ দেওয়া হইয়াছিল তাহার পুনরাবৃত্তি ঘটুক। আর এইভাবে তিনি পুনঃ নিশ্চিত হইতে চাহিয়াছিলেন তাঁহার লব্ধ অভিজ্ঞতার বাস্তবতা সম্পর্কে। কোন ব্যক্তির যখন কোন অস্বাভাবিক দৃশ্য বা ঘটনার সহিত সাক্ষাৎ ঘটে অথবা কোন নির্দিষ্ট স্থানে অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হইতে হয় তখন এইরূপ অবস্থায় ইহাই স্বাভাবিক। তিনি সেই স্থানে পুনরায় গমন করিতে উদ্বুদ্ধ হইবেন এই আশায় যে, তিনি পুনরায় সেখানে একইরূপ অভিজ্ঞতা যেন লাভ করিতে পারেন। অতএব ইহাতে আদৌ অবাক হওয়ার কিছু নাই যে, উৎস গ্রন্থের ভাষ্য অনুযায়ী তিনি বারংবার হেরা পর্বতের গুহায় ও পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে গিয়াছেন এবং নিঃসন্দেহে এই আশায় যে, তিনি জিবরাঈল (আ)-এর দ্বিতীয়বার সাক্ষাত লাভ করিবেন। বস্তুতপক্ষে হেরা পর্বতে প্রথম সাক্ষাতের পর খুব বেশি বিলম্ব হয় নাই তিনি দ্বিতীয়বার তাঁহার সাক্ষাত লাভ করেন। আয-যুহরী তাঁহার দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন:
তিনি বলেন, "আবূ সালামা ইব্ন আবদুর রহমান আমাকে অবহিত করেন যে, জাবির ইব্ন 'আবদুল্লাহ আল-আনসারী (রা) ওহী অবতীর্ণ হওয়ার বিরতি সম্পর্কে বলিতে গিয়া বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ্র রাসূল বলেন: 'আমি যখন পদচারণা করিতেছিলাম তখন আকাশে একটি কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইলাম। আমি চোখ তুলিয়া তাকাইলাম এবং দেখিলাম, আল্লাহ্ সেই ফেরেশতাকে যিনি হেরা পর্বতে আমার নিকট আসিয়াছিলেন। তিনি এখন আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যখানে একটি
চেয়ারে উপবিষ্ট আছেন। ইহা দেখিয়া আমি ভীত হইয়া পড়িলাম এবং আমার পরিবারের নিকট ফিরিয়া গিয়া বলিলাম, 'আমাকে ঢাকিয়া দাও'। তখন আল্লাহ আমার নিকট অবতীর্ণ করিলেন: “হে বস্ত্রাবৃত। উঠ ও সতর্ক কর এবং ঘৃণিত বিষয় পরিত্যাগ কর"। ১২ ইহার পর নিয়মিত এবং অব্যাহতভাবে ওহী অবতীর্ণ হইতে থাকে”।১৩
একটি স্থানে ইমাম বুখারী হেরা পর্বতে প্রথম ওহী অবতীর্ণ হওয়া সম্পর্কে বর্ণনার পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন। তাঁহার স্বপ্নের ব্যাখ্যা (তা'বীর) সম্পর্কিত অধ্যায়ে তিনি আয়েশা (রা) ইহা দেখিয়াছেন বলিয়া একটি অতিরিক্ত বর্ণনা ইহার সহিত যুক্ত করিয়াছেন। এই স্থানে তিনি দুইজন বর্ণনাকারী পরস্পরার উল্লেখ করিয়াছেন যাহাদের শেষোক্ত ব্যক্তি হইলেন আয-যুহরী। এই দুইজন হইলেন, (ক) ইয়াযীদ ইব্ন বুকায়র আল-লায়ছ 'উকায়ল আয-যুহরী এবং (খ) 'আবদুল্লাহ ইব্ মুহাম্মাদ 'আবদুর রাযযাক মা'মার আয-যুহরী। অতিরিক্ত যোজনাটি নিম্নরূপ:
“এবং তারপর ওহী অবতীর্ণ হইতে একটি বিরতি ঘটে এবং এই বিরতিকালে মহানবী যেমন আমাদিগকে অবহিত করা হইয়াছে )فَيْمًا بَلَغْنَا(, তখন তিনি খুবই বিষন্ন ছিলেন এবং একাধিকবার )مراراً( পাহাড়ের চূড়া হইতে নিজকে নিচে নিক্ষেপ করিবার উদ্দেশ্যে পাহাড়ে গমন করেন। "কিন্তু তিনি যখনই পর্বতশীর্ষে পৌছেন তখন জিবরাঈল (আ) তাঁহার নিকট আবির্ভূত হন এবং বলেন, "হে মুহাম্মাদ! আপনি সত্যই আল্লাহর রাসূল"। ইহাতে মহানবী-এর মন শান্ত হইত এবং পুনরায় তাঁহার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিত। কিন্তু ওহী অবতীর্ণ হইতে পুনঃ বিলম্ব হইলে তিনি অনুরূপভাবে পাহাড়ে যাইতেন এবং জিবরাঈল (আ) উপস্থিত হইয়া একইভাবে আশ্বাস প্রদান করিতেন”। ১৪
ওহী অবতীর্ণ হইতে বিলম্ব হওয়ার কারণে মহানবী চরম হতাশায় ভুগিতেন এবং ইহার ফলে তাঁহার কথিত আত্মহত্যা প্রচেষ্টার কাহিনীর আদৌ কোন বিশ্বাসযোগ্যতা নাই। ইবন হাজার আল-আসকালানী মত প্রকাশ করেন যে, এই কাহিনী আয-যুহরীর সংযোজন ও অনুমান ভিন্ন আর কিছুই নয়। মহানবী নিজে কখনও এইরূপ কোন ঘটনার বর্ণনা প্রদান করেন নাই এবং আয়েশা (রা) বা এমনকি 'উরওয়াহ ইব্ন আয-যুবায়র-এর সূত্রেও এইরূপ ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায় নাই। ১৫ মূল ঘটনার সহিত এই অতিরিক্ত সংযোজন মিশ্রিত হইয়া এমনভাবে তালগোল পাকাইয়া গিয়াছে যে, ইহাকে যেন মূল বর্ণনার অংশবিশেষ বলিয়া মনে হয়। কিন্তু ইহা যে আয-যুহরীর সংযোজন তাহা তাহার মন্তব্য সংবলিত উপবাক্য : من بلغات الزهرى وليس موصولا ("আমাদিগকে অবহিত করা হইয়াছে") হইতে বুঝা যায় এবং তিনি এই উপবাক্য বলিয়া কাহিনী শুরু করেন। যদি ইহা মহানবী অথবা আয়েশা (রা)-এর বর্ণনা হইত তাহা হইলে এই উপবাক্যটি সংযোজনের প্রয়োজন পড়িত না। কারণ বর্ণনাকারিগণের ধারাবাহিক ক্রম শুরুতেই উল্লেখ করা হইয়াছে।
এই কাহিনীর দ্বিতীয় প্রয়োগগত ত্রুটি মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী কর্তৃক উল্লেখ করা হইয়াছে। তিনি বলেন যে, ইহা একটি 'শায' (شاز = অদ্ভূত বা অস্বাভাবিক) বিবরণী। বর্ণনাকারিগণের পম্পরার মাধ্যমে ইহাতে মাত্র একবার তাহার নাম আসিয়াছে এবং শেষ হইয়াছে আয-যুহরীকে দিয়া। ইহাদের মধ্যে মা'মার আছেন। যেভাবে এই কাহিনীটি বিবৃত হইয়াছে এবং যদিও বর্ণনাকারীদের মধ্যে মা'মার -এর নাম উল্লিখিত হইয়াছে, তবুও কাহিনীর এই অতিরিক্ত সংযোজন মতাবিক কোন কিছুই ঘটে নাই। অথবা হাদীছ বর্ণনাকারীদের অবিচ্ছিন্ন পরম্পরায় কাহারও নিকট সাক্ষ্য হিসাবে উদ্ধৃতি দেওয়ার উপযুক্ত বলিয়া এই অতিরিক্ত সংযোজনকে অন্য কোথায়ও ব্যবহার করিতে দেখা যায় নাই। ১৬
পরিভাষাগত বিবেচনা ছাড়াও মহানবী -এর চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব তাঁহার পক্ষে এইরূপ আচরণ করা সমর্থন করে না। এই কাহিনীটি বিশ্বাসের একেবারেই অনুপযুক্ত। কারণ ইহাতে শুধু একবার কথিত আত্মহত্যা প্রচেষ্টার কথা বলা হয় নাই, বরং এইরূপ কয়েকবারের কথা বলা হইয়াছে। ইহার অর্থ এইরূপ দাঁড়ায় যেন জিবরাঈল (আ) কর্তৃক প্রদত্ত দ্বিতীয়বারের নিশ্চয়তা (অর্থাৎ জিবরাঈলের হেরা পর্বতের গুহায় প্রথম উপস্থিতির পর) মহানবী -কে সন্তুষ্ট করিতে পারে নাই। একজন পণ্ডিত ব্যক্তির মতে এই কাহিনীর উদ্ভব এইভাবে হইয়া থাকিতে পারে যে, কেহ হয়ত মহানবী -কে বারংবার পাহাড়ে গমন করিতে দেখিয়া বাস্তবে ওহী অবতীর্ণ হওয়ার বিরতিকালে তিনি হেরা পর্বতে গিয়াছিলেন, এইরূপ ধারণায় উপনীত হন যে, মহানবী হয়ত নিজকে পাহাড়ের উপর হইতে নিচে নিক্ষেপ করিতে পারেন। ১৭ এইরূপ একটি সন্দেহ একবার যখন প্রচারিত হয়, তখন পরবর্তী কালের বিবরণীসমূহে প্রকৃত তথ্য ও অসত্য ঘটনার আরও মিশ্রণ হইয়া স্বীয় স্থান করিয়া লয়। ১৮
মহানবী -এর আত্মহত্যা প্রচেষ্টার অনুমান একেবারে ভিত্তিহীন। কিন্তু ইহা সত্য যে, হেরা পর্বতে প্রথম ওহী লাভের কিছু পর তিনি ফেরেশতা জিবরাঈল (আ)-এর দ্বিতীয়বার সাক্ষাত লাভ করেন। পবিত্র কুরআনে নিম্নবর্ণিতভাবে এই ঘটনার সুস্পষ্ট উল্লেখ রহিয়াছে:
ক. وَلَقَدْ رَآهُ بِالْأُفُقِ الْمُبِينِ . "সে তো তাহাকে স্পষ্ট দিগন্তে দেখিয়াছে" (৮১: ২৩)।১৭
এখানে সে বলিতে হযরত মুহাম্মাদ-কে এবং তাহাকে বলিতে জিবরাঈল (আ)-কে বুঝান হইয়াছে।
খ. عَلَّمَهُ شَدِيدُ القوى . دُو مِرَّةٍ فَاسْتَوى ، وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى ، ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى . فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى .
"তাহাকে শিক্ষা দান করে শক্তিশালী, প্রজ্ঞাসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে স্থির হইয়াছিল, তখন সে ঊর্ধ্বদিগন্তে, অতঃপর সে তাহার নিকটবর্তী হইল, অতি নিকটবর্তী। ফলে তাহাদিগের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রহিল অথবা উহারও কম" (৫৩ঃ ৫-৯)। ২০
এই কাহিনী লইয়া আরও অগ্রসর হওয়ার পূর্বে মহানবী কর্তৃক প্রথম ওহী লাভ সম্পর্কে অন্যান্য বর্ণনা বিবেচনা করা বাঞ্ছনীয় হইবে। ইন্ন ইসহাক, ইন্ন সা'দ (অর্থাৎ আল-ওয়াকীদী'র) ও আত-তাবারীর বর্ণনা এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।
সন্দেহ নাই যে, হানীফ হিসাবে যাহাদের বর্ণনা করা হইয়াছে তাহাদের অধিকাংশই ছিলেন মহানবী -এর সমসাময়িক এবং যাহারা মক্কার অধিবাসী ছিলেন তাহাদের কাহারও সহিত তাঁহার যোগাযোগ ছিল। তাহাদের অনেকেই তাঁহার আত্মীয় ও পরিচিত ছিলেন। যেমন যায়দ ইব্ন 'আমর ইবন নুফায়ল, ওয়ারাকা ইবন নাওফাল ও উবায়দুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ। সূত্রসমূহ তাঁহার এইরূপ যোগাযোগ সম্পর্কে কোন বিস্তারিত তথ্য প্রদান করে নাই অথবা একের উপর অন্যের পারস্পরিক প্রভাব সম্পর্কে কোন স্পষ্ট ইংগিত দেয় নাই। কিন্তু এইরূপ সংযোগের প্রকৃতি যাহাই হউক না কেন ইহা স্পষ্ট যে, মহানবী খাঁটি ধর্মের অনুসন্ধানে সিরিয়ার মত দূরদেশে ভ্রমণের মাধ্যমে তাহাদের কাহারও অনুকরণ করেন নাই। ইহার সম্পূর্ণ বিপরীতে তাঁহার নবুওয়াত লাভের পূর্বে তাঁহার স্বাভাবিক প্রবণতা ও কার্যাবলী সম্পর্কে যাহা জানা যায় তাহা হইতেছে, তিনি ক্রমান্বয়ে নির্জনতা পছন্দ করিতে আরম্ভ করেন এবং একাকী নির্জনে হেরা পর্বতের উপরে অবস্থিত একটি গুহায় ইবাদত ও গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হন। হেরা পর্বতটি কা'বা শরীফের তিন মাইল পূর্ব-উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত। ইহা এখন অবশ্য মক্কা নগরীর সীমানার অন্তর্ভুক্ত। গুহায় এইভাবে নির্জনে অবস্থানকালে তিনি একদিন ফেরেশতা জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে আল্লাহ্র নিকট হইতে ওহী লাভ করেন। তাঁহার জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সবচাইতে বিশ্বস্ত বিবরণ তাঁহার সহধর্মীনী আয়েশা (রা) কর্তৃক প্রদত্ত হইয়াছে এবং বুখারী (র) কর্তৃক সংকলিত সহীহ হাদীছ গ্রন্থে সংরক্ষিত আছে। এই ঘটনাটি তাঁহার ভাগিনা' উরওয়াহ ইবনুয যুবায়র (মৃ. ৯৪ হি.) কর্তৃক প্রচারিত হয়। তাঁহার নিকট হইতে ইব্ন শিহাব আয-যুহরী (মৃ. ১২৪ হি.), তাঁহার নিকট হইতে উকায়ল (মৃ. ১৪৪ হি.) এবং তাঁহার নিকট হইতে আল-লায়ছ (মৃ. ১৭৫ হি.), তাঁহার নিকট হইতে ইয়াহইয়া ইব্ন বুকায়র (মৃ. ২৩১ হি.) এবং তাঁহার নিকট হইতে ইমাম বুখারী (মৃ. ২৫৬ হি.) কর্তৃক ধারাবাহিকভাবে এই ঘটনা বর্ণিত হয়। ঘটনাটি নিম্নরূপঃ
"আয়েশা (রা) বলিলেন, আল্লাহ্র নিকট হইতে রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি ওহী নাযিল হওয়ার সূচনা হইয়াছিল ঘুমের মধ্যে সুস্বপ্নের মাধ্যমে। তারপর হইতে তিনি যে স্বপ্ন দেখিতেন তাহাই ঊষার আলোকের ন্যায় ইহা ঊষাকালে ভাস্মর হইয়া উঠিত। তারপর হইতে নির্জনতা তাঁহার আরও প্রিয় হইয়া উঠিল। তিনি হেরা পর্বতের গুহায় নির্জন অবস্থায় থাকিতেন এবং
আত-তাহান্নুছ অর্থাৎ ইবাদত ও আত্মসমর্পণ (তা'আব্বুদ)২ করিতেন। এইভাবে গুহাতে একাদিক্রমে অনেক রাত্রি যাপন করিতেন এবং কিছু পরিমাণ খাবার সংগ্রহের জন্য স্ত্রী খাদীজার নিকট ফিরিয়া আসিতেন, তারপর পুনঃ গুহায় প্রত্যাবর্তন করিতেন। এইভাবে তাঁহার নিকট সত্য ধর্ম অবতীর্ণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাঁহার নির্জনবাস ও ইবাদত চলিতে থাকে। ফেরেশতা তাঁহার নিকট আসিয়া বলিলেন, 'পড়'। তিনি উত্তর দিলেন مَا أَنا بقاری "আমি ত পড়ি নাই”। তিনি (মহানবী) বলিলেন: حَتَّى بَلَغَ مِنِّى الْجُهْدَ "ইহাতে ফেরেশতা আমাকে ধরিয়া এমনভাবে চাপ দিলেন যাহা সহ্য করা আমার জন্য কষ্টকর হইয়া পড়ে"। তারপর তিনি আমাকে ছাড়িয়া দিলেন এবং বলিলেন, “পড়”। আমি বলিলাম, আমি ত পড়ি নাই। তৎকারণে তিনি আমাকে দ্বিতীয়বার সবলে ধরিয়া চাপ দিলেন এবং এই চাপ সহ্য করিয়া থাকিবার পর্যন্ত ধরিয়া রাখিলেন। তারপর আমাকে ছাড়িয়া দিয়া বলিলেন, “পড়”। আমি উত্তর দিলাম, 'আমি পড়িতে জানি না'। এইবার তৃতীয়বার আমাকে জাপটাইয়া ধরিয়া চাপ প্রয়োগ করিলেন এবং কিছুক্ষণ পর ছাড়িয়া দিয়া পুনঃ বলিলেন, 'পড়, তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন, সৃষ্টি করিয়াছেন মানুষকে রক্তবিন্দু ('আলাক) হইতে। পড়; এবং তোমার প্রভু বড়ই করুণাময়। তখন আল্লাহর দূত ইহা লইয়া প্রত্যাবর্তন করেন )فَرَفَعَ بِهَا(। ভয়ে ও হতবুদ্ধি অবস্থায় তাঁহার হৃদয় তখন ধড়ফড় করিতেছিল )يَرْجُفُ فُوَادَهُ(। তিনি তখন খাদীজা বিনত খুওয়ায়লিদ (রা)-এর নিকট গিয়া তাঁহাকে বলিলেন, 'আমাকে চাদর দিয়া ঢাকিয়া দাও, ঢাকিয়া দাও।' তাঁহাকে চাদর দিয়া ঢাকিয়া দেওয়া হইল এবং তাঁহার ভয় দূর না হওয়া পর্যন্ত তিনি তদবস্থায় থাকিলেন। তিনি খাদীজাকে এই ঘটনা সম্পর্কে খুলিয়া বলিলেন এবং ইহার সহিত আরও যুক্ত করিলেন, "আমি আমার জীবনের আশংকা করিতেছি” (অর্থাৎ আমার উপর দুর্ঘটনা ঘটিবার আশংকা করিতেছি)।
খাদীজা ইহা শুনিয়া বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! তিনি (আল্লাহ) কখনও আপনাকে অপমানিত করিবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়দের খোঁজ-খবর রাখেন ও সাহায্য করেন, আপনি দুর্বলের বোঝা বহন করিয়া দেন, আপনি অসহায় নিঃস্ব গরীবদের অর্থ সাহায্য করেন, আপনি অতিথিপরায়ণ ও নিয়তির কষাঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আপনি আশ্রয়স্থল। তখন তিনি তাঁহার এক চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইবন নওফাল ইব্ন আসাদ ইব্ন 'আবদুল 'উয্যা'র নিকট তাঁহাকে লইয়া গেলেন। ওয়ারাকা জাহিলিয়ার যুগে খৃস্টধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি হিব্রু ভাষায় ধর্মশাস্ত্র লিখিতেন এবং আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী হিব্রু ভাষায় ইনজীল গ্রন্থের অনুলিপি তৈয়ার করিতেন। ৫ তাহার অনেক বয়স হইয়াছিল এবং তিনি অন্ধ হইয়া গিয়াছিলেন। খাদীজা তাঁহাকে বলিলেন, 'হে আমার ভ্রাতা! আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রের কথা শুনুন।' ওয়ারাকা তখন তাঁহাকে (মহানবী ) বলিলেন, 'হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র! আপনি কি বলিতে চাহেন তাহা খুলিয়া বলুন'? তখন আল্লাহ্ রাসূল যাহা দেখিয়াছেন তাহা তাঁহার নিকট বর্ণনা করিলেন। তৎকারণে ওয়ারাকা তাঁহাকে বলিলেন, "ইনি হইতেছেন 'নামূস' (অর্থাৎ বার্তাবাহক ফেরেশতা জিবরীল) যাঁহাকে আল্লাহ তা'আলা মূসার নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন। হায়। আমি যদি তখন যুবক থাকিতাম! যখন আপনার
লোকেরা আপনাকে তাড়াইয়া দিবে তখন যদি আমি বাঁচিয়া থাকিতাম!” ইহা শুনিয়া আল্লাহ্র রাসূল জানিতে চাহিলেন, "তাহারা কি সত্যই আমাকে আপনার জন্মস্থান হইতে তাড়াইয়া দিবে?" ওয়ারাকা বলিলেন, "হাঁ! আপনি যে বিষয় লইয়া আসিয়াছেন আমার পূর্বে ইহা লইয়া যাহারাই আসিয়াছেন তাহারাই শত্রুতার লক্ষ্যবস্তু হইয়াছেন। যদি সেই সময় পর্যন্ত আমি বাঁচিয়া থাকি তাহা হইলে আমার সর্বোত্তম সাধ্যানুযায়ী আমি আপনাকে সাহায্য করিব।' এই ঘটনার কিছুকাল পর ওয়ারাকা ইন্তেকাল করেন এবং ওহী নাযিলে কিছু বিরতি ঘটে”। ৬
এখানে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, এই বর্ণনায় কেবল আয়েশা (রা) ও ওয়ারাকার বিবরণ অন্তর্ভুক্ত হয় নাই, বরং গুহাতে মহানবী যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হইয়াছিলেন, বিশেষ করিয়া ফেরেশতা কর্তৃক তাঁহাকে জোরপূর্বক জাপটাইয়া ধরিয়া বুকে চাপ দেওয়া হইয়াছিল, তাহার বিবরণ রহিয়াছে। ইহা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ যে সত্তা মহানবী -এর সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছেন তিনি শুধু তাঁহাকে দেখিয়াছেন তাহা নহে, বরং শারীরিকভাবে তাঁহার অস্তিত্ব অনুভব করিয়াছেন এবং এই বিবরণীতে তাহার উল্লেখ আছে যে, তিনি একজন ফেরেশতা। ইহা ছাড়া এই বিবরণীতে সুস্পষ্টভাবে বেশ কিছু তথ্যের সন্নিবেশ ঘটিয়াছে। প্রথমত বলা হইয়াছে যে, হেরা পর্বতের গুহায় ওহী লাভের পূর্ববর্তী সময় ছিল ঊষার পূর্ব মুহূর্ত। প্রথম দিকের এই সময়ে ঘুমের মধ্যে মহানবী খুবই তাৎপর্যপূর্ণ স্বপ্ন দেখিতেন। প্রাতঃকালীন দিবালোকের ন্যায় উহা খুবই উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত ছিল। কোন কোন বিবরণীতে পাওয়া যায় যে, ওহী লাভের পূর্ববর্তী এই সময়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ মাস। অন্যান্য কিছু সংখ্যক বর্ণনায় দেখা যায় যে, মহানবী এই সময় যখন মক্কার রাস্তায় পদচারণা করিতেন তখন আকাশের দিক হইতে তাঁহাকে আহ্বান করিতেছেন এইরূপ একটি কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইতেন। তারপর তিনি যখন উপরের দিকে তাকাইতেন তখন বহু উপরে বেহেশতে অথবা দিগন্তে একটি প্রতিকৃতি দেখিতে পাইতেন এবং ঐ প্রতিকৃতি নিজকে জিবরাঈল নামে পরিচয় প্রদান করিতেন।৮
দ্বিতীয়ত, এই প্রারম্ভিক পর্যায়ের পর হেরা পর্বতের গুহায় নির্জনে ইবাদত ও ধ্যানে নিমগ্ন থাকার পর্যায় শুরু হয়। এই প্রসঙ্গে ব্যবহৃত আত-তাহান্নুছ (التَّحَنُّتُ) শব্দের প্রাচীন আমল এবং তৎসহ আধুনিক আমলের লেখকগণ কর্তৃক নানভাবে ব্যাখ্যা করা হইয়াছে। এই পরিভাষাটির সঠিক অর্থ যাহাই হউক না কেন এই নির্দিষ্ট বিবরণী বিবেচনা করা হইলে সেই অবস্থার ইহা ছিল একটি স্পষ্ট বর্ণনা যাহাতে মহানবী নিজে নির্জনে থাকিতে পছন্দ করিতেন। তিনি যখন গভীর ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখিতেন সেই প্রারম্ভিক পর্যায় অতিক্রম করিবার পর তাঁহার মধ্যে ক্রমান্বয়ে এই নির্জনবাসের প্রতি আগ্রহ জন্মে। এই বিবরণীতে আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করা যাইতে পারে, যেমন- পর্বতের গুহায় অবস্থানের উদ্দেশ্যে তিনি খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহের জন্য মাঝে মাঝে তাঁহার পরিবারে ফিরিয়া আসিতেন এবং একাদিক্রমে কয়েক দিন ও রাত নির্জনে অবস্থান ও ধ্যানে নিমগ্ন হইতেন-ইহা উক্ত বিবরণীতে উল্লিখিত হয়।
তৃতীয়ত, গুহার অভ্যন্তরে ইহা এমন একটি নির্জন অবস্থা ছিল যে, এই সময় ফেরেশতার আবির্ভাব ঘটে এবং তিনি তাঁহাকে আল্লাহর বাণী হস্তান্তর করেন। মহানবী -এর জাগ্রত ও পূর্ণ সচেতন অবস্থায় এই ঘটনাটি সংঘটিত হয়। ফেরেশতার সহিত তাঁহার অর্জিত অভিজ্ঞতার (অর্থাৎ তাঁহাকে তিনবার জাপটাইয়া ধরিয়া বুকে চাপ দেওয়ার) বিশদ বিবরণী হইতেই ইহা কেবল স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় নাই, বরং এই ঘটনা দ্বারা ইহা প্রমাণিত হয় যে, ঘুমের মধ্যে পূর্বের কোন স্বপ্ন হইতে এই অবস্থাকে পৃথকভাবে বিচিত্র করা হইয়াছে।
চতুর্থত, তিনি আল্লাহ্র যে বাণী প্রাপ্ত হইয়া পর্বত হইতে অবতরণ করেন তাহা এমন একটি বিষয় ছিল না যে, ইহা তাঁহার গভীর চিন্তা ও ধ্যানের ফসল হিসাবে তাঁহার উপর প্রকাশিত হয়। ইহা ছিল একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বাণী যাহা একটি প্রত্যক্ষ সূত্র হইতে তাঁহাকে পাঠ করান হইয়াছিল। এই ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্বের সহিত প্রকাশের দাবি রাখে। কারণ ইহার বিপরীতে যেমন গৌতম বুদ্ধের ন্যায় অন্যান্য ধর্মীয় নেতার ক্ষেত্রে এইরূপ গভীর চিন্তা ও ধ্যানের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল তাঁহাদের আধ্যাত্মিক 'জ্ঞানালোক' প্রাপ্তি। কিন্তু মহানবী এর ক্ষেত্রে ইহা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে, তিনি যাহা প্রাপ্ত হইয়াছেন তাহা তাঁহার মানসিক, আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের ফল ছিল না, বরং ভিন্ন একটি সত্তা এই বাণী তাঁহাকে সমর্পণ করেন। এই প্রেক্ষিতে বাণীটি নিজেই উপযুক্ত প্রামাণিক সাক্ষ্য বহন করে। কারণ ইহা আধ্যাত্মিক জ্ঞানালোক প্রাপ্তি ভিন্ন অন্য কিছুরই অর্থ বহন করে না। পক্ষান্তরে ইহা মানুষকে তাহার সৃষ্টির উৎস সম্পর্কে অবহিত করে এবং মহানবীকে তাঁহার প্রভুর নামে পাঠ করিবার জন্য বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করে। বাস্তবিকই পাঠের জন্য এই সনির্বন্ধ প্রণোদনা এই অর্থ সূচিত করে যে, তাঁহাকে যাহা দেওয়া হইতেছিল তাহা ছিল আল্লাহ তা'আলার বাণী এবং তাহা পাঠ করিবার জন্য তাঁহার প্রতি আল্লাহর আদেশ ছিল। আল্লাহ তা'আলার বাণীর এই প্রামাণিক তথ্য হইতেছে চূড়ান্ত প্রমাণ যে, ইহা মহানবী -এর নিকট হইতে উদ্ভূত হয় নাই এবং বাণীটির সরল অন্তর্নিহিত অর্থ হইতে ইহা আরও প্রমাণিত হয়। বাণীটিতে পাঠের গুরুত্বের প্রতি জোর দেওয়া হইয়াছে। আর এই পাঠের অর্থ হইতেছে জ্ঞানার্জন। এই সাধারণ বার্তাটির আদান-প্রদানই যদি মহানবী-এর উদ্দেশ্য হইত, তাহা হইলে নির্জনবাস ও ধ্যানে নিমগ্ন না হইয়াই তিনি তাহা সম্পাদন করিতে পারিতেন এবং তাঁহার পক্ষে সামান্য চিন্তার মাধ্যমেই ইহা সাধন করা সম্ভব হইত।
পঞ্চমত, মহানবী-এর এই ঘটনার উপর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল স্পষ্টতই একজন ব্যক্তি বিশেষকে লইয়া যিনি এই ধরনের ঘটনার জন্য যেমন প্রস্তুত ছিলেন না তেমনি এই ব্যাপারে কোন প্রত্যাশা অথবা কোন পূর্ব অনুমানও করিতে পারেন নাই। এই কারণে তাঁহার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল আতঙ্কের ও হতবুদ্ধিকর এবং নিজের জীবন সম্পর্কে আশংকার। তাঁহার প্রতিক্রিয়া এই সত্যের দৃষ্টান্ত যে, তিনি যাহা পাইয়াছিলেন তাহা ছিল একটি বাহিরের সূত্র হইতে আগত এবং তাহা নিজের মনস্তাত্ত্বিক কোন নিদর্শন ছিল না। পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, কোন কৌশল অবলম্বন করিয়াই হউক না কেন নবী হিসেবে তাঁহার আত্মপ্রকাশের জন্য কোন
পরিকল্পনা বা উচ্চাকাংখার অনুপস্থিতিই ছিল ইহার প্রমাণ। ১০ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার বিষয়টি খাদীজার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ দ্বারা আরও জোরালো করা হইয়াছে এবং খাদীজা (রা) ও মহানবী কর্তৃক এই বিষয়ে ওয়ারাকার সহিত আলোচনা এবং ওয়ারাকার প্রতিক্রিয়া বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব প্রদান করিয়াছে।
সর্বশেষ হইলেও কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নহে যে, এই বিবরণী অন্য দুইটি সত্যকে প্রকাশ করিতেছে। ইহার একটি হইল মহানবী -এর পক্ষে পড়িতে পারিবার দক্ষতার অনুপস্থিতি। কারণ জিবরাঈল -এর পাঠ করিবার আদেশের উত্তরে তাঁহার স্বতঃস্ফূর্ত জবাব ছিল, "আমি সে নই যে পড়িতে পারে"। ১১ অন্য সত্যটি হইল, মহানবী -এর সহিত যোগাযোগের মূল বিষয়বস্তু এই পূর্ব ধারণা দেয় যে, মহানবী -এর এক আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস এবং আল্লাহ সম্পর্কে পূর্ব হইতেই জ্ঞান ছিল। আল্লাহ তা'আলার প্রকৃতি ও স্থিতি সম্পর্কে কোন পরিচিতি ও ব্যাখ্যা প্রদান না করিয়াই 'তোমার প্রভুর নামে' তাঁহাকে পড়িতে আদেশ করা হইতেছিল। ইহা মানিয়া লওয়া হইয়াছে যে, তাঁহার প্রভু কে সে সম্পর্কে তাঁহার জ্ঞান ছিল।
এই বর্ণনার সহিত বিবরণীটির সমাপ্তি ঘটে যে, হেরা পর্বতের গুহায় প্রথম যোগাযোগের পর ওহী অবতীর্ণ হইতে একটি বিরতি দেওয়া হয়। ইহা ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কারণ প্রথম ঘটনাটি অবশ্যই মহানবী -কে খুব গভীরভাবে আলোড়িত করিয়াছিল এবং স্পষ্টতই প্রথম আকস্মিক মানসিক অভিঘাত হইতে নিজকে সামলাইয়া লইবার জন্য তাঁহার জন্য কিছু অবকাশের প্রয়োজন ছিল। একই সাথে তিনি অবশ্যই স্বাভাবিকভাবে উৎসুক ছিলেন যে, হেরা পর্বতের গুহায় তাঁহার নিকট যোগাযোগের যে প্রথম পাঠ দেওয়া হইয়াছিল তাহার পুনরাবৃত্তি ঘটুক। আর এইভাবে তিনি পুনঃ নিশ্চিত হইতে চাহিয়াছিলেন তাঁহার লব্ধ অভিজ্ঞতার বাস্তবতা সম্পর্কে। কোন ব্যক্তির যখন কোন অস্বাভাবিক দৃশ্য বা ঘটনার সহিত সাক্ষাৎ ঘটে অথবা কোন নির্দিষ্ট স্থানে অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হইতে হয় তখন এইরূপ অবস্থায় ইহাই স্বাভাবিক। তিনি সেই স্থানে পুনরায় গমন করিতে উদ্বুদ্ধ হইবেন এই আশায় যে, তিনি পুনরায় সেখানে একইরূপ অভিজ্ঞতা যেন লাভ করিতে পারেন। অতএব ইহাতে আদৌ অবাক হওয়ার কিছু নাই যে, উৎস গ্রন্থের ভাষ্য অনুযায়ী তিনি বারংবার হেরা পর্বতের গুহায় ও পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে গিয়াছেন এবং নিঃসন্দেহে এই আশায় যে, তিনি জিবরাঈল (আ)-এর দ্বিতীয়বার সাক্ষাত লাভ করিবেন। বস্তুতপক্ষে হেরা পর্বতে প্রথম সাক্ষাতের পর খুব বেশি বিলম্ব হয় নাই তিনি দ্বিতীয়বার তাঁহার সাক্ষাত লাভ করেন। আয-যুহরী তাঁহার দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন:
তিনি বলেন, "আবূ সালামা ইব্ন আবদুর রহমান আমাকে অবহিত করেন যে, জাবির ইব্ন 'আবদুল্লাহ আল-আনসারী (রা) ওহী অবতীর্ণ হওয়ার বিরতি সম্পর্কে বলিতে গিয়া বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ্র রাসূল বলেন: 'আমি যখন পদচারণা করিতেছিলাম তখন আকাশে একটি কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইলাম। আমি চোখ তুলিয়া তাকাইলাম এবং দেখিলাম, আল্লাহ্ সেই ফেরেশতাকে যিনি হেরা পর্বতে আমার নিকট আসিয়াছিলেন। তিনি এখন আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যখানে একটি
চেয়ারে উপবিষ্ট আছেন। ইহা দেখিয়া আমি ভীত হইয়া পড়িলাম এবং আমার পরিবারের নিকট ফিরিয়া গিয়া বলিলাম, 'আমাকে ঢাকিয়া দাও'। তখন আল্লাহ আমার নিকট অবতীর্ণ করিলেন: “হে বস্ত্রাবৃত। উঠ ও সতর্ক কর এবং ঘৃণিত বিষয় পরিত্যাগ কর"। ১২ ইহার পর নিয়মিত এবং অব্যাহতভাবে ওহী অবতীর্ণ হইতে থাকে”।১৩
একটি স্থানে ইমাম বুখারী হেরা পর্বতে প্রথম ওহী অবতীর্ণ হওয়া সম্পর্কে বর্ণনার পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন। তাঁহার স্বপ্নের ব্যাখ্যা (তা'বীর) সম্পর্কিত অধ্যায়ে তিনি আয়েশা (রা) ইহা দেখিয়াছেন বলিয়া একটি অতিরিক্ত বর্ণনা ইহার সহিত যুক্ত করিয়াছেন। এই স্থানে তিনি দুইজন বর্ণনাকারী পরস্পরার উল্লেখ করিয়াছেন যাহাদের শেষোক্ত ব্যক্তি হইলেন আয-যুহরী। এই দুইজন হইলেন, (ক) ইয়াযীদ ইব্ন বুকায়র আল-লায়ছ 'উকায়ল আয-যুহরী এবং (খ) 'আবদুল্লাহ ইব্ মুহাম্মাদ 'আবদুর রাযযাক মা'মার আয-যুহরী। অতিরিক্ত যোজনাটি নিম্নরূপ:
“এবং তারপর ওহী অবতীর্ণ হইতে একটি বিরতি ঘটে এবং এই বিরতিকালে মহানবী যেমন আমাদিগকে অবহিত করা হইয়াছে )فَيْمًا بَلَغْنَا(, তখন তিনি খুবই বিষন্ন ছিলেন এবং একাধিকবার )مراراً( পাহাড়ের চূড়া হইতে নিজকে নিচে নিক্ষেপ করিবার উদ্দেশ্যে পাহাড়ে গমন করেন। এইভাবে যখনই তিনি পাহাড় হইতে নিচে লাফাইয়া পড়িবার জন্য গিয়াছেন তখন জিবরাঈল (আ) তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া বলিলেন, "হে মুহাম্মাদ! আপনি সত্যই আল্লাহর রাসূল"। ইহাতে মহানবী-এর মন শান্ত হইত এবং পুনরায় তাঁহার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিত। কিন্তু ওহী অবতীর্ণ হইতে পুনঃ বিলম্ব হইলে তিনি অনুরূপভাবে পাহাড়ে যাইতেন এবং জিবরাঈল (আ) উপস্থিত হইয়া একইভাবে আশ্বাস প্রদান করিতেন”। ১৪
ওহী অবতীর্ণ হইতে বিলম্ব হওয়ার কারণে মহানবী চরম হতাশায় ভুগিতেন এবং ইহার ফলে তাঁহার কথিত আত্মহত্যা প্রচেষ্টার কাহিনীর আদৌ কোন বিশ্বাসযোগ্যতা নাই। ইবন হাজার আল-আসকালানী মত প্রকাশ করেন যে, এই কাহিনী আয-যুহরীর সংযোজন ও অনুমান ভিন্ন আর কিছুই নয়। মহানবী নিজে কখনও এইরূপ কোন ঘটনার বর্ণনা প্রদান করেন নাই এবং আয়েশা (রা) বা এমনকি 'উরওয়াহ ইব্ন আয-যুবায়র-এর সূত্রেও এইরূপ ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায় নাই। ১৫ মূল ঘটনার সহিত এই অতিরিক্ত সংযোজন মিশ্রিত হইয়া এমনভাবে তালগোল পাকাইয়া গিয়াছে যে, ইহাকে যেন মূল বর্ণনার অংশবিশেষ বলিয়া মনে হয়। কিন্তু ইহা যে আয-যুহরীর সংযোজন তাহা তাহার মন্তব্য সংবলিত উপবাক্য : من بلغات الزهرى وليس موصولا )"আমাদিগকে অবহিত করা হইয়াছে") হইতে বুঝা যায় এবং তিনি এই উপবাক্য বলিয়া কাহিনী শুরু করেন। যদি ইহা মহানবী অথবা আয়েশা (রা)-এর বর্ণনা হইত তাহা হইলে এই উপবাক্যটি সংযোজনের প্রয়োজন পড়িত না। কারণ বর্ণনাকারিগণের ধারাবাহিক ক্রম শুরুতেই উল্লেখ করা হইয়াছে।
এই কাহিনীর দ্বিতীয় প্রয়োগগত ত্রুটি মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী কর্তৃক উল্লেখ করা হইয়াছে। তিনি বলেন যে, ইহা একটি 'শায' (شاز = অদ্ভূত বা অস্বাভাবিক) বিবরণী। বর্ণনাকারিগণের পম্পরার মাধ্যমে ইহাতে মাত্র একবার তাহার নাম আসিয়াছে এবং শেষ হইয়াছে আয-যুহরীকে দিয়া। ইহাদের মধ্যে মা'মার আছেন। যেভাবে এই কাহিনীটি বিবৃত হইয়াছে এবং যদিও বর্ণনাকারীদের মধ্যে মা'মার -এর নাম উল্লিখিত হইয়াছে, তবুও কাহিনীর এই অতিরিক্ত সংযোজন মতাবিক কোন কিছুই ঘটে নাই। অথবা হাদীছ বর্ণনাকারীদের অবিচ্ছিন্ন পরম্পরায় কাহারও নিকট সাক্ষ্য হিসাবে উদ্ধৃতি দেওয়ার উপযুক্ত বলিয়া এই অতিরিক্ত সংযোজনকে অন্য কোথায়ও ব্যবহার করিতে দেখা যায় নাই। ১৬
পরিভাষাগত বিবেচনা ছাড়াও মহানবী -এর চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব তাঁহার পক্ষে এইরূপ আচরণ করা সমর্থন করে না। এই কাহিনীটি বিশ্বাসের একেবারেই অনুপযোগী। কারণ ইহাতে শুধু একবার কথিত আত্মহত্যা প্রচেষ্টার কথা বলা হয় নাই, বরং এইরূপ কয়েকবারের কথা বলা হইয়াছে। ইহার অর্থ এইরূপ দাঁড়ায় যেন জিবরাঈল (আ) কর্তৃক প্রদত্ত দ্বিতীয়বারের নিশ্চয়তা (অর্থাৎ জিবরাঈলের হেরা পর্বতের গুহায় প্রথম উপস্থিতির পর) মহানবী -কে সন্তুষ্ট করিতে পারে নাই। একজন পণ্ডিত ব্যক্তির মতে এই কাহিনীর উদ্ভব এইভাবে হইয়া থাকিতে পারে যে, কেহ হয়ত মহানবী -কে বারংবার পাহাড়ে গমন করিতে দেখিয়া বাস্তবে ওহী অবতীর্ণ হওয়ার বিরতিকালে তিনি হেরা পর্বতে গিয়াছিলেন, এইরূপ ধারণায় উপনীত হন যে, মহানবী হয়ত নিজকে পাহাড়ের উপর হইতে নিচে নিক্ষেপ করিতে পারেন। ১৭ এইরূপ একটি সন্দেহ একবার যখন প্রচারিত হয়, তখন পরবর্তী কালের বিবরণীসমূহে প্রকৃত তথ্য ও অসত্য ঘটনার আরও মিশ্রণ হইয়া স্বীয় স্থান করিয়া লয়। ১৮
মহানবী -এর আত্মহত্যা প্রচেষ্টার অনুমান একেবারে ভিত্তিহীন। কিন্তু ইহা সত্য যে, হেরা পর্বতে প্রথম ওহী লাভের কিছু পর তিনি ফেরেশতা জিবরাঈল (আ)-এর দ্বিতীয়বার সাক্ষাত লাভ করেন। পবিত্র কুরআনে নিম্নবর্ণিতভাবে এই ঘটনার সুস্পষ্ট উল্লেখ রহিয়াছে:
ক. وَلَقَدْ رَآهُ بِالْأُفُقِ الْمُبِينِ . "সে তো তাহাকে স্পষ্ট দিগন্তে দেখিয়াছে" (৮১: ২৩)।১৭
এখানে সে বলিতে হযরত মুহাম্মাদ-কে এবং তাহাকে বলিতে জিবরাঈল (আ)-কে বুঝান হইয়াছে।
খ. عَلَّمَهُ شَدِيدُ القوى . دُو مِرَّةٍ فَاسْتَوى ، وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى ، ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى . فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى .
"তাহাকে শিক্ষা দান করে শক্তিশালী, প্রজ্ঞাসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে স্থির হইয়াছিল, তখন সে ঊর্ধ্বদিগন্তে, অতঃপর সে তাহার নিকটবর্তী হইল, অতি নিকটবর্তী। ফলে তাহাদিগের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রহিল অথবা উহারও কম" (৫৩ঃ ৫-৯)। ২০
এই কাহিনী লইয়া আরও অগ্রসর হওয়ার পূর্বে মহানবী কর্তৃক প্রথম ওহী লাভ সম্পর্কে অন্যান্য বর্ণনা বিবেচনা করা বাঞ্ছনীয় হইবে। ইন্ন ইসহাক, ইন্ন সা'দ (অর্থাৎ আল-ওয়াকীদী'র) ও আত-তাবারীর বর্ণনা এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।
সন্দেহ নাই যে, হানীফ হিসাবে যাহাদের বর্ণনা করা হইয়াছে তাহাদের অধিকাংশই ছিলেন মহানবী -এর সমসাময়িক এবং যাহারা মক্কার অধিবাসী ছিলেন তাহাদের কাহারও সহিত তাঁহার যোগাযোগ ছিল। তাহাদের অনেকেই তাঁহার আত্মীয় ও পরিচিত ছিলেন। যেমন যায়দ ইব্ন 'আমর ইবন নুফায়ল, ওয়ারাকা ইবন নাওফাল ও উবায়দুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ। সূত্রসমূহ তাঁহার এইরূপ যোগাযোগ সম্পর্কে কোন বিস্তারিত তথ্য প্রদান করে নাই অথবা একের উপর অন্যের পারস্পরিক প্রভাব সম্পর্কে কোন স্পষ্ট ইংগিত দেয় নাই। কিন্তু এইরূপ সংযোগের প্রকৃতি যাহাই হউক না কেন ইহা স্পষ্ট যে, মহানবী খাঁটি ধর্মের অনুসন্ধানে সিরিয়ার মত দূরদেশে ভ্রমণের মাধ্যমে তাহাদের কাহারও অনুকরণ করেন নাই। ইহার সম্পূর্ণ বিপরীতে তাঁহার নবুওয়াত লাভের পূর্বে তাঁহার স্বাভাবিক প্রবণতা ও কার্যাবলী সম্পর্কে যাহা জানা যায় তাহা হইতেছে, তিনি ক্রমান্বয়ে নির্জনতা পছন্দ করিতে আরম্ভ করেন এবং একাকী নির্জনে হেরা পর্বতের উপরে অবস্থিত একটি গুহায় ইবাদত ও গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হন। হেরা পর্বতটি কা'বা শরীফের তিন মাইল পূর্ব-উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত। ইহা এখন অবশ্য মক্কা নগরীর সীমানার অন্তর্ভুক্ত। গুহায় এইভাবে নির্জনে অবস্থানকালে তিনি একদিন ফেরেশতা জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে আল্লাহ্র নিকট হইতে ওহী লাভ করেন। তাঁহার জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সবচাইতে বিশ্বস্ত বিবরণ তাঁহার সহধর্মীনী আয়েশা (রা) কর্তৃক প্রদত্ত হইয়াছে এবং বুখারী (র) কর্তৃক সংকলিত সহীহ হাদীছ গ্রন্থে সংরক্ষিত আছে। এই ঘটনাটি তাঁহার ভাগিনা' উরওয়াহ ইবনুয যুবায়র (মৃ. ৯৪ হি.) কর্তৃক প্রচারিত হয়। তাঁহার নিকট হইতে ইব্ন শিহাব আয-যুহরী (মৃ. ১২৪ হি.), তাঁহার নিকট হইতে উকায়ল (মৃ. ১৪৪ হি.) এবং তাঁহার নিকট হইতে আল-লায়ছ (মৃ. ১৭৫ হি.), তাঁহার নিকট হইতে ইয়াহইয়া ইব্ন বুকায়র (মৃ. ২৩১ হি.) এবং তাঁহার নিকট হইতে ইমাম বুখারী (মৃ. ২৫৬ হি.) কর্তৃক ধারাবাহিকভাবে এই ঘটনা বর্ণিত হয়। ঘটনাটি নিম্নরূপঃ
"আয়েশা (রা) বলিলেন, আল্লাহ্র নিকট হইতে রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি ওহী নাযিল হওয়ার সূচনা হইয়াছিল ঘুমের মধ্যে সুস্বপ্নের মাধ্যমে। তারপর হইতে তিনি যে স্বপ্ন দেখিতেন তাহাই ঊষার আলোকের ন্যায় ইহা ঊষাকালে ভাস্মর হইয়া উঠিত। তারপর হইতে নির্জনতা তাঁহার আরও প্রিয় হইয়া উঠিল। তিনি হেরা পর্বতের গুহায় নির্জন অবস্থায় থাকিতেন এবং
আত-তাহান্নুছ অর্থাৎ ইবাদত ও আত্মসমর্পণ (তা'আব্বুদ)২ করিতেন। এইভাবে গুহাতে একাদিক্রমে অনেক রাত্রি যাপন করিতেন এবং কিছু পরিমাণ খাবার সংগ্রহের জন্য স্ত্রী খাদীজার নিকট ফিরিয়া আসিতেন, তারপর পুনঃ গুহায় প্রত্যাবর্তন করিতেন। এইভাবে তাঁহার নিকট সত্য ধর্ম অবতীর্ণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাঁহার নির্জনবাস ও ইবাদত চলিতে থাকে। ফেরেশতা তাঁহার নিকট আসিয়া বলিলেন, 'পড়'। তিনি উত্তর দিলেন مَا أَنا بقاری "আমি ত পড়ি নাই”। তিনি (মহানবী) বলিলেন: حَتَّى بَلَغَ مِنِّى الْجُهْدَ "ইহাতে ফেরেশতা আমাকে ধরিয়া এমনভাবে চাপ দিলেন যাহা সহ্য করা আমার জন্য কষ্টকর হইয়া পড়ে"। তারপর তিনি আমাকে ছাড়িয়া দিলেন এবং বলিলেন, “পড়”। আমি বলিলাম, আমি ত পড়ি নাই। তৎকারণে তিনি আমাকে দ্বিতীয়বার সবলে ধরিয়া চাপ দিলেন এবং এই চাপ সহ্য করিয়া থাকিবার পর্যন্ত ধরিয়া রাখিলেন। তারপর আমাকে ছাড়িয়া দিয়া বলিলেন, “পড়”। আমি উত্তর দিলাম, 'আমি পড়িতে জানি না'। এইবার তৃতীয়বার আমাকে জাপটাইয়া ধরিয়া চাপ প্রয়োগ করিলেন এবং কিছুক্ষণ পর ছাড়িয়া দিয়া পুনঃ বলিলেন, 'পড়, তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন, সৃষ্টি করিয়াছেন মানুষকে রক্তবিন্দু ('আলাক) হইতে। পড়; এবং তোমার প্রভু বড়ই করুণাময়। তখন আল্লাহর দূত ইহা লইয়া প্রত্যাবর্তন করেন )فَرَفَعَ بِهَا(। ভয়ে ও হতবুদ্ধি অবস্থায় তাঁহার হৃদয় তখন ধড়ফড় করিতেছিল )يَرْجُفُ فُوَادَهُ(। তিনি তখন খাদীজা বিনত খুওয়ায়লিদ (রা)-এর নিকট গিয়া তাঁহাকে বলিলেন, 'আমাকে চাদর দিয়া ঢাকিয়া দাও, ঢাকিয়া দাও।' তাঁহাকে চাদর দিয়া ঢাকিয়া দেওয়া হইল এবং তাঁহার ভয় দূর না হওয়া পর্যন্ত তিনি তদবস্থায় থাকিলেন। তিনি খাদীজাকে এই ঘটনা সম্পর্কে খুলিয়া বলিলেন এবং ইহার সহিত আরও যুক্ত করিলেন, "আমি আমার জীবনের আশংকা করিতেছি” (অর্থাৎ আমার উপর দুর্ঘটনা ঘটিবার আশংকা করিতেছি)।
খাদীজা ইহা শুনিয়া বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! তিনি (আল্লাহ) কখনও আপনাকে অপমানিত করিবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়দের খোঁজ-খবর রাখেন ও সাহায্য করেন, আপনি দুর্বলের বোঝা বহন করিয়া দেন, আপনি অসহায় নিঃস্ব গরীবদের অর্থ সাহায্য করেন, আপনি অতিথিপরায়ণ ও নিয়তির কষাঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আপনি আশ্রয়স্থল। তখন তিনি তাঁহার এক চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইবন নওফাল ইব্ন আসাদ ইব্ন 'আবদুল 'উয্যা'র নিকট তাঁহাকে লইয়া গেলেন। ওয়ারাকা জাহিলিয়ার যুগে খৃস্টধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি হিব্রু ভাষায় ধর্মশাস্ত্র লিখিতেন এবং আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী হিব্রু ভাষায় ইনজীল গ্রন্থের অনুলিপি তৈয়ার করিতেন। ৫ তাহার অনেক বয়স হইয়াছিল এবং তিনি অন্ধ হইয়া গিয়াছিলেন। খাদীজা তাঁহাকে বলিলেন, 'হে আমার ভ্রাতা! আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রের কথা শুনুন।' ওয়ারাকা তখন তাঁহাকে (মহানবী ) বলিলেন, 'হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র! আপনি কি বলিতে চাহেন তাহা খুলিয়া বলুন'? তখন আল্লাহ্ রাসূল যাহা দেখিয়াছেন তাহা তাঁহার নিকট বর্ণনা করিলেন। তৎকারণে ওয়ারাকা তাঁহাকে বলিলেন, "ইনি হইতেছেন 'নামূস' (অর্থাৎ বার্তাবাহক ফেরেশতা জিবরীল) যাঁহাকে আল্লাহ তা'আলা মূসার নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন। হায়। আমি যদি তখন যুবক থাকিতাম! যখন আপনার
লোকেরা আপনাকে তাড়াইয়া দিবে তখন যদি আমি বাঁচিয়া থাকিতাম!” ইহা শুনিয়া আল্লাহ্র রাসূল জানিতে চাহিলেন, "তাহারা কি সত্যই আমাকে আপনার জন্মস্থান হইতে তাড়াইয়া দিবে?" ওয়ারাকা বলিলেন, "হাঁ! আপনি যে বিষয় লইয়া আসিয়াছেন আমার পূর্বে ইহা লইয়া যাহারাই আসিয়াছেন তাহারাই শত্রুতার লক্ষ্যবস্তু হইয়াছেন। যদি সেই সময় পর্যন্ত আমি বাঁচিয়া থাকি তাহা হইলে আমার সর্বোত্তম সাধ্যানুযায়ী আমি আপনাকে সাহায্য করিব।' এই ঘটনার কিছুকাল পর ওয়ারাকা ইন্তেকাল করেন এবং ওহী নাযিলে কিছু বিরতি ঘটে”। ৬
এখানে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, এই বর্ণনায় কেবল আয়েশা (রা) ও ওয়ারাকার বিবরণ অন্তর্ভুক্ত হয় নাই, বরং গুহাতে মহানবী যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হইয়াছিলেন, বিশেষ করিয়া ফেরেশতা কর্তৃক তাঁহাকে জোরপূর্বক জাপটাইয়া ধরিয়া বুকে চাপ দেওয়া হইয়াছিল, তাহার বিবরণ রহিয়াছে। ইহা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ যে সত্তা মহানবী -এর সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছেন তিনি শুধু তাঁহাকে দেখিয়াছেন তাহা নহে, বরং শারীরিকভাবে তাঁহার অস্তিত্ব অনুভব করিয়াছেন এবং এই বিবরণীতে তাহার উল্লেখ আছে যে, তিনি একজন ফেরেশতা। ইহা ছাড়া এই বিবরণীতে সুস্পষ্টভাবে বেশ কিছু তথ্যের সন্নিবেশ ঘটিয়াছে। প্রথমত বলা হইয়াছে যে, হেরা পর্বতের গুহায় ওহী লাভের পূর্ববর্তী সময় ছিল ঊষার পূর্ব মুহূর্ত। প্রথম দিকের এই সময়ে ঘুমের মধ্যে মহানবী খুবই তাৎপর্যপূর্ণ স্বপ্ন দেখিতেন। প্রাতঃকালীন দিবালোকের ন্যায় উহা খুবই উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত ছিল। কোন কোন বিবরণীতে পাওয়া যায় যে, ওহী লাভের পূর্ববর্তী এই সময়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ মাস। অন্যান্য কিছু সংখ্যক বর্ণনায় দেখা যায় যে, মহানবী এই সময় যখন মক্কার রাস্তায় পদচারণা করিতেন তখন আকাশের দিক হইতে তাঁহাকে আহ্বান করিতেছেন এইরূপ একটি কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইতেন। তারপর তিনি যখন উপরের দিকে তাকাইতেন তখন বহু উপরে বেহেশতে অথবা দিগন্তে একটি প্রতিকৃতি দেখিতে পাইতেন এবং ঐ প্রতিকৃতি নিজকে জিবরাঈল নামে পরিচয় প্রদান করিতেন।৮
দ্বিতীয়ত, এই প্রারম্ভিক পর্যায়ের পর হেরা পর্বতের গুহায় নির্জনে ইবাদত ও ধ্যানে নিমগ্ন থাকার পর্যায় শুরু হয়। এই প্রসঙ্গে ব্যবহৃত আত-তাহান্নুছ (التَّحَنُّتُ) শব্দের প্রাচীন আমল এবং তৎসহ আধুনিক আমলের লেখকগণ কর্তৃক নানভাবে ব্যাখ্যা করা হইয়াছে। এই পরিভাষাটির সঠিক অর্থ যাহাই হউক না কেন এই নির্দিষ্ট বিবরণী বিবেচনা করা হইলে সেই অবস্থার ইহা ছিল একটি স্পষ্ট বর্ণনা যাহাতে মহানবী নিজে নির্জনে থাকিতে পছন্দ করিতেন। তিনি যখন গভীর ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখিতেন সেই প্রারম্ভিক পর্যায় অতিক্রম করিবার পর তাঁহার মধ্যে ক্রমান্বয়ে এই নির্জনবাসের প্রতি আগ্রহ জন্মে। এই বিবরণীতে আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করা যাইতে পারে, যেমন- পর্বতের গুহায় অবস্থানের উদ্দেশ্যে তিনি খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহের জন্য মাঝে মাঝে তাঁহার পরিবারে ফিরিয়া আসিতেন এবং একাদিক্রমে কয়েক দিন ও রাত নির্জনে অবস্থান ও ধ্যানে নিমগ্ন হইতেন-ইহা উক্ত বিবরণীতে উল্লিখিত হয়।
তৃতীয়ত, গুহার অভ্যন্তরে ইহা এমন একটি নির্জন অবস্থা ছিল যে, এই সময় ফেরেশতার আবির্ভাব ঘটে এবং তিনি তাঁহাকে আল্লাহর বাণী হস্তান্তর করেন। মহানবী -এর জাগ্রত ও পূর্ণ সচেতন অবস্থায় এই ঘটনাটি সংঘটিত হয়। ফেরেশতার সহিত তাঁহার অর্জিত অভিজ্ঞতার (অর্থাৎ তাঁহাকে তিনবার জাপটাইয়া ধরিয়া বুকে চাপ দেওয়ার) বিশদ বিবরণী হইতেই ইহা কেবল স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় নাই, বরং এই ঘটনা দ্বারা ইহা প্রমাণিত হয় যে, ঘুমের মধ্যে পূর্বের কোন স্বপ্ন হইতে এই অবস্থাকে পৃথকভাবে বিচিত্র করা হইয়াছে।
চতুর্থত, তিনি আল্লাহ্র যে বাণী প্রাপ্ত হইয়া পর্বত হইতে অবতরণ করেন তাহা এমন একটি বিষয় ছিল না যে, ইহা তাঁহার গভীর চিন্তা ও ধ্যানের ফসল হিসাবে তাঁহার উপর প্রকাশিত হয়। ইহা ছিল একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বাণী যাহা একটি প্রত্যক্ষ সূত্র হইতে তাঁহাকে পাঠ করান হইয়াছিল। এই ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্বের সহিত প্রকাশের দাবি রাখে। কারণ ইহার বিপরীতে যেমন গৌতম বুদ্ধের ন্যায় অন্যান্য ধর্মীয় নেতার ক্ষেত্রে এইরূপ গভীর চিন্তা ও ধ্যানের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল তাঁহাদের আধ্যাত্মিক 'জ্ঞানালোক' প্রাপ্তি। কিন্তু মহানবী এর ক্ষেত্রে ইহা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে, তিনি যাহা প্রাপ্ত হইয়াছেন তাহা তাঁহার মানসিক, আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের ফল ছিল না, বরং ভিন্ন একটি সত্তা এই বাণী তাঁহাকে সমর্পণ করেন। এই প্রেক্ষিতে বাণীটি নিজেই উপযুক্ত প্রামাণিক সাক্ষ্য বহন করে। কারণ ইহা আধ্যাত্মিক জ্ঞানালোক প্রাপ্তি ভিন্ন অন্য কিছুরই অর্থ বহন করে না। পক্ষান্তরে ইহা মানুষকে তাহার সৃষ্টির উৎস সম্পর্কে অবহিত করে এবং মহানবীকে তাঁহার প্রভুর নামে পাঠ করিবার জন্য বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করে। বাস্তবিকই পাঠের জন্য এই সনির্বন্ধ প্রণোদনা এই অর্থ সূচিত করে যে, তাঁহাকে যাহা দেওয়া হইতেছিল তাহা ছিল আল্লাহ তা'আলার বাণী এবং তাহা পাঠ করিবার জন্য তাঁহার প্রতি আল্লাহর আদেশ ছিল। আল্লাহ তা'আলার বাণীর এই প্রামাণিক তথ্য হইতেছে চূড়ান্ত প্রমাণ যে, ইহা মহানবী -এর নিকট হইতে উদ্ভূত হয় নাই এবং বাণীটির সরল অন্তর্নিহিত অর্থ হইতে ইহা আরও প্রমাণিত হয়। বাণীটিতে পাঠের গুরুত্বের প্রতি জোর দেওয়া হইয়াছে। আর এই পাঠের অর্থ হইতেছে জ্ঞানার্জন। এই সাধারণ বার্তাটির আদান-প্রদানই যদি মহানবী-এর উদ্দেশ্য হইত, তাহা হইলে নির্জনবাস ও ধ্যানে নিমগ্ন না হইয়াই তিনি তাহা সম্পাদন করিতে পারিতেন এবং তাঁহার পক্ষে সামান্য চিন্তার মাধ্যমেই ইহা সাধন করা সম্ভব হইত।
পঞ্চমত, মহানবী-এর এই ঘটনার উপর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল স্পষ্টতই একজন ব্যক্তি বিশেষকে লইয়া যিনি এই ধরনের ঘটনার জন্য যেমন প্রস্তুত ছিলেন না তেমনি এই ব্যাপারে কোন প্রত্যাশা অথবা কোন পূর্ব অনুমানও করিতে পারেন নাই। এই কারণে তাঁহার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল আতঙ্কের ও হতবুদ্ধিকর এবং নিজের জীবন সম্পর্কে আশংকার। তাঁহার প্রতিক্রিয়া এই সত্যের দৃষ্টান্ত যে, তিনি যাহা পাইয়াছিলেন তাহা ছিল একটি বাহিরের সূত্র হইতে আগত এবং তাহা নিজের মনস্তাত্ত্বিক কোন নিদর্শন ছিল না। পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, কোন কৌশল অবলম্বন করিয়াই হউক না কেন নবী হিসেবে তাঁহার আত্মপ্রকাশের জন্য কোন
পরিকল্পনা বা উচ্চাকাংখার অনুপস্থিতিই ছিল ইহার প্রমাণ। ১০ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার বিষয়টি খাদীজার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ দ্বারা আরও জোরালো করা হইয়াছে এবং খাদীজা (রা) ও মহানবী কর্তৃক এই বিষয়ে ওয়ারাকার সহিত আলোচনা এবং ওয়ারাকার প্রতিক্রিয়া বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব প্রদান করিয়াছে।
সর্বশেষ হইলেও কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নহে যে, এই বিবরণী অন্য দুইটি সত্যকে প্রকাশ করিতেছে। ইহার একটি হইল মহানবী -এর পক্ষে পড়িতে পারিবার দক্ষতার অনুপস্থিতি। কারণ জিবরাঈল -এর পাঠ করিবার আদেশের উত্তরে তাঁহার স্বতঃস্ফূর্ত জবাব ছিল, "আমি সে নই যে পড়িতে পারে"। ১১ অন্য সত্যটি হইল, মহানবী -এর সহিত যোগাযোগের মূল বিষয়বস্তু এই পূর্ব ধারণা দেয় যে, মহানবী -এর এক আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস এবং আল্লাহ সম্পর্কে পূর্ব হইতেই জ্ঞান ছিল। আল্লাহ তা'আলার প্রকৃতি ও স্থিতি সম্পর্কে কোন পরিচিতি ও ব্যাখ্যা প্রদান না করিয়াই 'তোমার প্রভুর নামে' তাঁহাকে পড়িতে আদেশ করা হইতেছিল। ইহা মানিয়া লওয়া হইয়াছে যে, তাঁহার প্রভু কে সে সম্পর্কে তাঁহার জ্ঞান ছিল।
এই বর্ণনার সহিত বিবরণীটির সমাপ্তি ঘটে যে, হেরা পর্বতের গুহায় প্রথম যোগাযোগের পর ওহী অবতীর্ণ হইতে একটি বিরতি দেওয়া হয়। ইহা ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কারণ প্রথম ঘটনাটি অবশ্যই মহানবী -কে খুব গভীরভাবে আলোড়িত করিয়াছিল এবং স্পষ্টতই প্রথম আকস্মিক মানসিক অভিঘাত হইতে নিজকে সামলাইয়া লইবার জন্য তাঁহার জন্য কিছু অবকাশের প্রয়োজন ছিল। একই সাথে তিনি অবশ্যই স্বাভাবিকভাবে উৎসুক ছিলেন যে, হেরা পর্বতের গুহায় তাঁহার নিকট যোগাযোগের যে প্রথম পাঠ দেওয়া হইয়াছিল তাহার পুনরাবৃত্তি ঘটুক। আর এইভাবে তিনি পুনঃ নিশ্চিত হইতে চাহিয়াছিলেন তাঁহার লব্ধ অভিজ্ঞতার বাস্তবতা সম্পর্কে। কোন ব্যক্তির যখন কোন অস্বাভাবিক দৃশ্য বা ঘটনার সহিত সাক্ষাৎ ঘটে অথবা কোন নির্দিষ্ট স্থানে অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হইতে হয় তখন এইরূপ অবস্থায় ইহাই স্বাভাবিক। তিনি সেই স্থানে পুনরায় গমন করিতে উদ্বুদ্ধ হইবেন এই আশায় যে, তিনি পুনরায় সেখানে একইরূপ অভিজ্ঞতা যেন লাভ করিতে পারেন। অতএব ইহাতে আদৌ অবাক হওয়ার কিছু নাই যে, উৎস গ্রন্থের ভাষ্য অনুযায়ী তিনি বারংবার হেরা পর্বতের গুহায় ও পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে গিয়াছেন এবং নিঃসন্দেহে এই আশায় যে, তিনি জিবরাঈল (আ)-এর দ্বিতীয়বার সাক্ষাত লাভ করিবেন। বস্তুতপক্ষে হেরা পর্বতে প্রথম সাক্ষাতের পর খুব বেশি বিলম্ব হয় নাই তিনি দ্বিতীয়বার তাঁহার সাক্ষাত লাভ করেন। আয-যুহরী তাঁহার দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন:
তিনি বলেন, "আবূ সালামা ইব্ন আবদুর রহমান আমাকে অবহিত করেন যে, জাবির ইব্ন 'আবদুল্লাহ আল-আনসারী (রা) ওহী অবতীর্ণ হওয়ার বিরতি সম্পর্কে বলিতে গিয়া বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ্র রাসূল বলেন: 'আমি যখন পদচারণা করিতেছিলাম তখন আকাশে একটি কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইলাম। আমি চোখ তুলিয়া তাকাইলাম এবং দেখিলাম, আল্লাহ্ সেই ফেরেশতাকে যিনি হেরা পর্বতে আমার নিকট আসিয়াছিলেন। তিনি এখন আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যখানে একটি
চেয়ারে উপবিষ্ট আছেন। ইহা দেখিয়া আমি ভীত হইয়া পড়িলাম এবং আমার পরিবারের নিকট ফিরিয়া গিয়া বলিলাম, 'আমাকে ঢাকিয়া দাও'। তখন আল্লাহ আমার নিকট অবতীর্ণ করিলেন: “হে বস্ত্রাবৃত। উঠ ও সতর্ক কর এবং ঘৃণিত বিষয় পরিত্যাগ কর"। ১২ ইহার পর নিয়মিত এবং অব্যাহতভাবে ওহী অবতীর্ণ হইতে থাকে”।১৩
একটি স্থানে ইমাম বুখারী হেরা পর্বতে প্রথম ওহী অবতীর্ণ হওয়া সম্পর্কে বর্ণনার পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন। তাঁহার স্বপ্নের ব্যাখ্যা (তা'বীর) সম্পর্কিত অধ্যায়ে তিনি আয়েশা (রা) ইহা দেখিয়াছেন বলিয়া একটি অতিরিক্ত বর্ণনা ইহার সহিত যুক্ত করিয়াছেন। এই স্থানে তিনি দুইজন বর্ণনাকারী পরস্পরার উল্লেখ করিয়াছেন যাহাদের শেষোক্ত ব্যক্তি হইলেন আয-যুহরী। এই দুইজন হইলেন, (ক) ইয়াযীদ ইব্ন বুকায়র আল-লায়ছ 'উকায়ল আয-যুহরী এবং (খ) 'আবদুল্লাহ ইব্ মুহাম্মাদ 'আবদুর রাযযাক মা'মার আয-যুহরী। অতিরিক্ত যোজনাটি নিম্নরূপ:
“এবং তারপর ওহী অবতীর্ণ হইতে একটি বিরতি ঘটে এবং এই বিরতিকালে মহানবী যেমন আমাদিগকে অবহিত করা হইয়াছে )فَيْمًا بَلَغْنَا(, তখন তিনি খুবই বিষন্ন ছিলেন এবং একাধিকবার )مراراً( পাহাড়ের চূড়া হইতে নিজকে নিচে নিক্ষেপ করিবার উদ্দেশ্যে পাহাড়ে গমন করেন। এইভাবে যখনই তিনি পাহাড় হইতে নিচে লাফাইয়া পড়িবার জন্য গিয়াছেন তখন জিবরাঈল (আ) তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া বলিলেন, "হে মুহাম্মাদ! আপনি সত্যই আল্লাহর রাসূল"। ইহাতে মহানবী-এর মন শান্ত হইত এবং পুনরায় তাঁহার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিত। কিন্তু ওহী অবতীর্ণ হইতে পুনঃ বিলম্ব হইলে তিনি অনুরূপভাবে পাহাড়ে যাইতেন এবং জিবরাঈল (আ) উপস্থিত হইয়া একইভাবে আশ্বাস প্রদান করিতেন”। ১৪
ওহী অবতীর্ণ হইতে বিলম্ব হওয়ার কারণে মহানবী চরম হতাশায় ভুগিতেন এবং ইহার ফলে তাঁহার কথিত আত্মহত্যা প্রচেষ্টার কাহিনীর আদৌ কোন বিশ্বাসযোগ্যতা নাই। ইবন হাজার আল-আসকালানী মত প্রকাশ করেন যে, এই কাহিনী আয-যুহরীর সংযোজন ও অনুমান ভিন্ন আর কিছুই নয়। মহানবী নিজে কখনও এইরূপ কোন ঘটনার বর্ণনা প্রদান করেন নাই এবং আয়েশা (রা) বা এমনকি 'উরওয়াহ ইব্ন আয-যুবায়র-এর সূত্রেও এইরূপ ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায় নাই। ১৫ মূল ঘটনার সহিত এই অতিরিক্ত সংযোজন মিশ্রিত হইয়া এমনভাবে তালগোল পাকাইয়া গিয়াছে যে, ইহাকে যেন মূল বর্ণনার অংশবিশেষ বলিয়া মনে হয়। কিন্তু ইহা যে আয-যুহরীর সংযোজন তাহা তাহার মন্তব্য সংবলিত উপবাক্য : من بلغات الزهرى وليس موصولا )"আমাদিগকে অবহিত করা হইয়াছে") হইতে বুঝা যায় এবং তিনি এই উপবাক্য বলিয়া কাহিনী শুরু করেন। যদি ইহা মহানবী অথবা আয়েশা (রা)-এর বর্ণনা হইত তাহা হইলে এই উপবাক্যটি সংযোজনের প্রয়োজন পড়িত না। কারণ বর্ণনাকারিগণের ধারাবাহিক ক্রম শুরুতেই উল্লেখ করা হইয়াছে।
এই কাহিনীর দ্বিতীয় প্রয়োগগত ত্রুটি মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী কর্তৃক উল্লেখ করা হইয়াছে। তিনি বলেন যে, ইহা একটি 'শায' (شاز = অদ্ভূত বা অস্বাভাবিক) বিবরণী। বর্ণনাকারিগণের পম্পরার মাধ্যমে ইহাতে মাত্র একবার তাহার নাম আসিয়াছে এবং শেষ হইয়াছে আয-যুহরীকে দিয়া। ইহাদের মধ্যে মা'মার আছেন। যেভাবে এই কাহিনীটি বিবৃত হইয়াছে এবং যদিও বর্ণনাকারীদের মধ্যে মা'মার -এর নাম উল্লিখিত হইয়াছে, তবুও কাহিনীর এই অতিরিক্ত সংযোজন মতাবিক কোন কিছুই ঘটে নাই। অথবা হাদীছ বর্ণনাকারীদের অবিচ্ছিন্ন পরম্পরায় কাহারও নিকট সাক্ষ্য হিসাবে উদ্ধৃতি দেওয়ার উপযুক্ত বলিয়া এই অতিরিক্ত সংযোজনকে অন্য কোথায়ও ব্যবহার করিতে দেখা যায় নাই। ১৬
পরিভাষাগত বিবেচনা ছাড়াও মহানবী -এর চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব তাঁহার পক্ষে এইরূপ আচরণ করা সমর্থন করে না। এই কাহিনীটি বিশ্বাসের একেবারেই অনুপযোগী। কারণ ইহাতে শুধু একবার কথিত আত্মহত্যা প্রচেষ্টার কথা বলা হয় নাই, বরং এইরূপ কয়েকবারের কথা বলা হইয়াছে। ইহার অর্থ এইরূপ দাঁড়ায় যেন জিবরাঈল (আ) কর্তৃক প্রদত্ত দ্বিতীয়বারের নিশ্চয়তা (অর্থাৎ জিবরাঈলের হেরা পর্বতের গুহায় প্রথম উপস্থিতির পর) মহানবী -কে সন্তুষ্ট করিতে পারে নাই। একজন পণ্ডিত ব্যক্তির মতে এই কাহিনীর উদ্ভব এইভাবে হইয়া থাকিতে পারে যে, কেহ হয়ত মহানবী -কে বারংবার পাহাড়ে গমন করিতে দেখিয়া বাস্তবে ওহী অবতীর্ণ হওয়ার বিরতিকালে তিনি হেরা পর্বতে গিয়াছিলেন, এইরূপ ধারণায় উপনীত হন যে, মহানবী হয়ত নিজকে পাহাড়ের উপর হইতে নিচে নিক্ষেপ করিতে পারেন। ১৭ এইরূপ একটি সন্দেহ একবার যখন প্রচারিত হয়, তখন পরবর্তী কালের বিবরণীসমূহে প্রকৃত তথ্য ও অসত্য ঘটনার আরও মিশ্রণ হইয়া স্বীয় স্থান করিয়া লয়। ১৮
মহানবী -এর আত্মহত্যা প্রচেষ্টার অনুমান একেবারে ভিত্তিহীন। কিন্তু ইহা সত্য যে, হেরা পর্বতে প্রথম ওহী লাভের কিছু পর তিনি ফেরেশতা জিবরাঈল (আ)-এর দ্বিতীয়বার সাক্ষাত লাভ করেন। পবিত্র কুরআনে নিম্নবর্ণিতভাবে এই ঘটনার সুস্পষ্ট উল্লেখ রহিয়াছে:
ক. وَلَقَدْ رَآهُ بِالْأُفُقِ الْمُبِينِ . "সে তো তাহাকে স্পষ্ট দিগন্তে দেখিয়াছে" (৮১: ২৩)।১৭
এখানে সে বলিতে হযরত মুহাম্মাদ-কে এবং তাহাকে বলিতে জিবরাঈল (আ)-কে বুঝান হইয়াছে।
খ. عَلَّمَهُ شَدِيدُ القوى . دُو مِرَّةٍ فَاسْتَوى ، وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى ، ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى . فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى .
"তাহাকে শিক্ষা দান করে শক্তিশালী, প্রজ্ঞাসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে স্থির হইয়াছিল, তখন সে ঊর্ধ্বদিগন্তে, অতঃপর সে তাহার নিকটবর্তী হইল, অতি নিকটবর্তী। ফলে তাহাদিগের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রহিল অথবা উহারও কম" (৫৩ঃ ৫-৯)। ২০
এই কাহিনী লইয়া আরও অগ্রসর হওয়ার পূর্বে মহানবী কর্তৃক প্রথম ওহী লাভ সম্পর্কে অন্যান্য বর্ণনা বিবেচনা করা বাঞ্ছনীয় হইবে। ইন্ন ইসহাক, ইন্ন সা'দ (অর্থাৎ আল-ওয়াকীদী'র) ও আত-তাবারীর বর্ণনা এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।
📄 দুই: ইব্ন ইসহাক প্রদত্ত বর্ণনা
বিষয়টি লইয়া আলোচনা করিতে গিয়া ইবন ইসহাক প্রথমে বুখারী উদ্ধৃত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনার অংশবিশেষের পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন। উপরে যেভাবে উদ্ধৃত করা হইয়াছে সেইভাবে ইন ইসহাক উল্লেখ করিয়াছেন যে, মহানবী ঘুমের মধ্যে চমকপ্রদ স্বপ্ন দেখিতেন এবং তাহা যেন ভোরবেলার আলোর মত উদ্ভাসিত হইত। তারপর নির্জনতা তাঁহার নিকট প্রিয় হইয়া উঠে এবং উহা এতই প্রিয় ছিল যে, উহার চাইতে আর কিছুই তাঁহার প্রিয় ছিল না। ১৯ এই পর্যন্ত আসিয়া ইবন ইসহাক ঘটনাটির বর্ণনায় ক্ষান্ত দিয়াছেন এবং 'যে সমস্ত লোক জানে' তাহাদের জানার ভিত্তিতে তিনি আরেকটি ঘটনার অনুপ্রবেশ ঘটাইয়াছেন বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তাঁহার বর্ণনায় কিছু অস্বাভাবিক ঘটনার অবতারণা করিয়াছেন। যেমন বৃক্ষাদি ও পাথরসমূহ সম্ভাব্য রাসূল -কে সালাম করিতেছে। ২২ তারপর ইবন ইসহাক আরেকটি বর্ণনার ভিত্তিতে ওহী অবতীর্ণ হওয়ার কাহিনী শুরু করিয়াছেন। তিনি ওয়াহ্হ্ব ইন্ন কায়সান (মৃ. ১২৭ হি.)-এর নিকট হইতে এই বর্ণনা গ্রহণ করেন। বলা হইয়া থাকে যে, এই ওয়াহ্হ্ব ইন্ন কায়সান এই বিষয়ে আবদুল্লাহ ইনুষ যুবায়রকে উবায়দ ইবন উমায়র ইব্ন্ন কাতাদা আল-লায়ছী ২৩ (মৃ. ৬৮ হি.)-এর মাধ্যমে বলিতে শুনিয়াছেন যেখানে 'উবায়দ ঘটনাটি নিম্নরূপে বর্ণনা করেন:
"আল্লাহ্র রাসূল প্রতি বৎসর এক মাসের জন্য হেরা পর্বতের গুহায় (يُجاور) নির্জনে সময় কাটাইতেন। জাহিলিয়া যুগে কুরায়শগণ এইরূপ এক মাস ধরিয়া তাহান্নুছ-এ সময় কাটাইতে অভ্যস্ত ছিল। ২৪ সুতরাং আল্লাহ্র রাসূল বৎসরের ঐ সময় নির্জনতায় অতিবাহিত করিতেন। ঐ সময় তাঁহার নিকট সাহায্যপ্রার্থী গরীবদিগকে তিনি আহার করাইতেন। যখন আল্লাহ্র রাসূল মাসব্যাপী সময় যাপন সম্পন্ন করিতেন তখন বাড়ী ফিরিয়া আসিবার পূর্বে তিনি প্রথম যে কাজটি করিতেন তাহা হইতেছে, কা'বাঘরে গিয়া ইহাকে সাতবার প্রদক্ষিণ করিতেন অথবা আল্লাহ যতবার চাহিতেন ততবারই তিনি ইহার তাওয়াফ করিতেন। এই অভ্যাস তিনি ঐ মাস পর্যন্ত বজায় রাখিয়াছিলেন যে মাসে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সম্মানিত করিতে ইচ্ছা করেন। বৎসরের ঐ মাসে আল্লাহ তাঁহাকে নবুওয়াত দান করেন এবং সেই মাসটি হইতেছে রমযান (রামাদান)। সুতরাং আল্লাহ্র রাসূল বরাবরের ন্যায় হেরা পর্বতের উদ্দেশে গমন করেন এবং তাঁহার পরিবার তাঁহার সাথে ছিল। সেখানে তাঁহার অবস্থিতিকালে এক রাত্রে আল্লাহ
তাঁহার বাণী প্রেরণ করিয়া তাঁহাকে সম্মানিত করেন এবং এইভাবে তাঁহার বান্দাগণকে সৌভাগ্যে ভূষিত করেন। আল্লাহ্র আদেশে জিবরাঈল (আ) তাঁহার নিকট আসেন। আল্লাহ্র রাসূল বলেন, "জিবরাঈল আমার নিকট আসেন, আমি তখন নিদ্রিত ছিলাম। তাহার হাতে লিখনসহ একটি রেশমী কৌটা ছিল। তিনি আমাকে বলিলেন, 'পড়'। আমি (মহানবী) বলিলাম, 'আমি পড়িতে পারি না।' ইহাতে তিনি আমাকে এত সজোরে আলিঙ্গন করিলেন যে, আমার মনে হইতেছিল আমি মরিয়া যাইব। তারপর তিনি আমাকে আলিঙ্গনমুক্ত করিয়া বলিলেন, 'পড়।' আমি উত্তর দিলাম, 'আমি পড়িতে পারি না।' ইহাতে তিনি পুন অত্যন্ত শক্তভাবে আমাকে আলিঙ্গন করিলেন এবং আমার দম বন্ধ হইবার উপক্রম হইল। তিনি আমাকে ছাড়িয়া দিয়া আবার আদেশ করিলেন, 'পড়'। তখন আমি বলিলাম, 'আমি কী পড়িব?' ইহাতে আবারও তিনি জোরে আমাকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া ছাড়িয়া দিলেন এবং বলিলেন, "পড়! তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন, সৃষ্টি করিয়াছেন মানুষকে 'আলাক' হইতে। পড়, এবং তোমার প্রভু মহা মহিমান্বিত; যিনি শিক্ষা দিয়াছেন কলমের সাহায্যে; শিক্ষা দিয়াছেন মানুষকে, যাহা সে জানিত না"।
মহানবী বলেন, 'অতঃপর আমি ইহা পাঠ করিলাম।' তাহার পর ইহার সমাপ্তি ঘটিল, তিনি আমাকে ছাড়িয়া গেলে আমি ঘুম হইতে জাগিয়া উঠিলাম। আমার নিকট এইরূপ বোধ হইতেছিল যেন একটি বিরল লিখন আমার হৃদয়ে অংকিত হইয়া গিয়াছে। তারপর আমি গুহা হইতে বাহির হইয়া আসিলাম। পর্বতের মাঝামাঝি জায়গায় থাকাকালে আকাশ হইতে একটি কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইলাম এবং কে যেন বলিতেছেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল এবং আমি জিবরাঈল।' আকাশের দিকে তাকাইবার জন্য আমি মাথা উপরের দিকে উঠাইলাম এবং স্পষ্টভাবে মানুষের আকৃতিতে জিবরাঈলকে দেখিতে পাইলাম। তাঁহার দুই পা দিগন্তে বিস্তার করিয়া রহিয়াছে। তিনি বলিতেছেন, 'হে মুহাম্মাদ। আপনি আল্লাহ্র রাসূল এবং আমি জিবরাঈল।' ইহাতে আমি তাঁহার দিকে তাকাইয়া রহিলাম এবং সামনে বা পিছনে না গিয়া একভাবে স্থির হইয়া থাকিলাম। তাহার দিক হইতে দৃষ্টি সরাইয়া আমি দিগন্তে দৃষ্টি স্থাপন করিলাম এবং আমি যেদিকেই তাকাই না কেন তাহাকে একই অবস্থানে দেখিতে পাইলাম। সামনে বা পিছনে এক চুলও না নড়িয়া আমি দাঁড়াইয়া রহিলাম এবং আমার খোঁজে খাদীজা তাহার লোক প্রেরণ না করা পর্যন্ত ঐ অবস্থায় থাকিলাম। খাদীজার লোকেরা মক্কার উচ্চ অঞ্চলে অনুসন্ধান করিয়া ফিরিয়া গেলেও আমি ঐ স্থানে পূর্ববত দাঁড়াইয়া রহিলাম। তারপর জিবরাঈল আমাকে ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলেন।"
"আমি স্থানটি ত্যাগ করিয়া আমার পরিবারে ফিরিয়া আসিলাম এবং খাদীজাকে স্পর্শ করিয়া ও তাহাকে হেলান দিয়া বসিয়া পড়িলাম। তিনি (খাদীজা) বলিলেন, 'হে আবুল কাসিম! আপনি কোথায় ছিলেন? আল্লাহর শপথ! আমি আপনার অনুসন্ধানে আমার লোকদের মক্কার উচ্চ এলাকায় প্রেরণ করিয়াছি। কিন্তু তাহারা আপনাকে না পাইয়া ফিরিয়া আসিয়াছে'। তখন আমি যাহা দেখিয়াছি তাহা সবিস্তারে তাহার নিকট বর্ণনা করি। ইহাতে খাদিজা বলিল, "হে আমার পিতার
ভ্রাতুষ্পুত্র! তাঁহার (আল্লাহ্) শপথ যাঁহার হাতে খাদীজার জীবন! আমার মনে হয় আপনি এই সকল লোকের নবী হইবেন"।
"তারপর তিনি উঠিয়া পোশাক পরিধান করিলেন এবং ওয়ারাকা ইন্ন নওফাল ইন্ন আসাদ ইন্ন 'আবদুল 'উয্যা ইন্ন কুসায়্যি-এর নিকট গেলেন। ওয়ারাকা ছিলেন তাঁহার চাচার পুত্র এবং খৃস্টান। তিনি বাইবেল পাঠ করিয়াছিলেন এবং তাওরাত ও ইনজীল গ্রন্থের পণ্ডিত ব্যক্তিদের নিকট হইতে শুনিয়াছিলেন। আল্লাহর রাসূল যাহা দেখিয়াছেন ও শুনিয়াছেন এবং যাহা তাঁহাকে বর্ণনা করিয়াছেন খাদীজা অবিকল তাহা ওয়ারাকাকে বিবৃত করেন। ইহা শুনিয়া ওয়ারাকা বলিয়া উঠেন : পবিত্র, পবিত্র, যাঁহার হাতে ওয়ারাকার জীবন সেই পরম সত্তার শপথ! হে খাদীজা, যদি তুমি সত্য বলিয়া থাক তবে অবশ্যই সেই মহান নামূস (জিবরাঈল) যিনি মূসার নিকট আসিতেন, তিনি মুহাম্মাদের নিকট আসিয়াছেন। নিশ্চয় তিনি এই লোকদের নবী। সুতরাং তাঁহাকে নিশ্চিন্ত থাকিতে বল।"
তারপর খাদীজা আল্লাহ্র রাসূল-এর নিকট ফিরিয়া আসিয়া ওয়ারাকা ইবন নাওফাল-এর সহিত আলোচনার বিষয়বস্তু তাঁহাকে অবহিত করেন। তারপর আল্লাহ্র রাসূল তাঁহার বিশ্রাম ত্যাগ করিয়া (জাওয়ারা) কা'বাঘরে গমন করেন এবং কা'বাঘরে যে কাজ করিতে অভ্যস্ত অর্থাৎ কা'বাঘর প্রদক্ষিণ করিতে থাকেন। সেখানে কা'বাঘর প্রদক্ষিণকারী ওয়ারাকার সহিত তাঁহার সাক্ষাত ঘটে। ওয়ারাকা তাঁহাকে বলেন, "হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র! তুমি যাহা দেখিয়াছ ও শুনিয়াছ তাহা আমাকে বল”। আল্লাহ্র রাসূল তাঁহাকে সকল বিষয় খুলিয়া বলিলেন। ওয়ারাকা তাঁহাকে বলিলেন, "যাহার হাতে আমার জীবন তাঁহার শপথ! তুমি প্রকৃতই এই লোকদের নবী এবং মূসার নিকট যিনি আসিয়াছিলেন সেই মহান নামূস তোমার নিকট আসিয়াছেন। তোমাকে লোকেরা বিশ্বাস করিবে না, তোমাকে কষ্ট দেওয়া হইবে, তুমি নিজ জন্মস্থান হইতে বিতাড়িত হইবে এবং তোমার সহিত যুদ্ধ হইবে। আমি যদি সেই পর্যন্ত জীবিত থাকি তাহা হইলে, যেমন আল্লাহ জানেন, আমি অবশ্যই আল্লাহ্ দীনের সাহায্য করিব"। তখন ওয়ারাকা মহানবী -এর দিকে স্বীয় মাথা ঝুঁকাইয়া তাঁহার কপালের মধ্যখানে চুম্বন করিলেন। তারপর আল্লাহ্র রাসূল তাঁহার গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন”। ২৫
ইহা স্পষ্টভাবে বোধগম্য যে, এই ঘটনা বুখারী শরীফে প্রদত্ত ও ইতোপূর্বে উল্লিখিত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনা হইতে অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। এই বিভিন্নতা প্রকৃত তথ্যের বিচ্যুতি, অতিরিক্ত সংযোজন এবং ঈষৎ পরিবর্তনের মধ্যে দৃষ্ট হয়। তথ্যের বিচ্যুতি প্রসঙ্গে ইবন ইসহাক প্রদত্ত বিবরণে হেরা পর্বতের গুহায় মহানবী-এর তাহান্নুছ পালন কালের পূর্বে উত্তম ও প্রকৃত স্বপ্ন দেখিবার সময়ের কোন উল্লেখ নাই। দ্বিতীয়ত, জিবরাঈল (আ)-এর সহিত সাক্ষাত ও অভিজ্ঞতার পরিণতির প্রেক্ষিতে মহানবী -এর মধ্যে সৃষ্ট ভীতি ও হতভম্ব হওয়ার কোন
ইঙ্গিত দেখা যায় না। সর্বশেষ হেরার গুহায় প্রথম ওহী লাভের পর পরবর্তী ওহী লাভে যে বিরতি ঘটে সে সম্পর্কেও কোন উল্লেখ নাই।
অতিরিক্ত বক্তব্য প্রসঙ্গে প্রথম যে বিষয়টি লক্ষ্য করা যায় তাহা হইতেছে, এই বিবরণে হেরা পর্বতের গুহায় মহানবী-এর সাময়িক অবস্থানের কথা বলা হইয়াছে এবং তাহা ছিল প্রত্যেক বৎসর রমযান মাসে কুরায়শগণ কর্তৃক মহানবী-এর অনুরূপ তাহান্নুছ পালনের প্রথা। ইহাতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, মহানবী ইহা প্রতি বৎসরই পালন করিতেন। দ্বিতীয়ত, আরও বলা হইয়াছে যে, মহানবী যখন গুহা হইতে নিচে নামিয়া আসিতেছিলেন এবং পাহাড়ের মাঝামাঝি স্থানে পৌঁছাইলে জিবরাঈল (আ) আকাশে পুনঃ আবির্ভূত হইলেন এবং মহানবীকে নাম ধরিয়া ডাকিয়া তাঁহাকে নিশ্চয়তা দিলেন যে, তিনি প্রকৃতই আল্লাহ্ রাসূল। তৃতীয়ত, বিবরণীটি উল্লেখ করে যে, হেরা পর্বত হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া তিনি প্রথম যে কাজটি করেন তাহা হইল, কা'বাঘরে গমন ও ইহার প্রদক্ষিণ। অবশেষে ওয়ারাকার সহিত খাদীজার সাক্ষাতকার এবং কা'বার চত্বরে ওয়ারাকা মহানবী-এর সহিত কথোপকথনে ইতোপূর্বে খাদীজার নিকট যে মতামত প্রকাশ করেন তাহাই এখানে পুনর্ব্যক্ত করেন। এই বিষয় বিবরণীতে উল্লিখিত হইয়াছে।
আরও লক্ষণীয় যে, ইহার পরিবর্তনসমূহ যাহা আয়েশা (রা)-এর বর্ণনাতে যে সকল তথ্যের প্রকাশ ঘটিয়াছে তাহা এই বিবরণীতে আসিয়াছে। প্রথমত উল্লেখ করা যায় যে, তাহান্নুছ-এর জন্য মহানবী যখন হেরার গুহায় গমন করেন তখন তাঁহার সহিত তাঁহার পরিবারবর্গ ছিলেন। দ্বিতীয়ত এবং অধিকতর গুরুত্বপূর্ণভাবে উল্লিখিত হইয়াছে যে, মহানবী হেরার গুহায় যখন নিদ্রা যাইতেছিলেন তখন জিবরাঈল (আ) আসিয়া তাঁহাকে ওহী প্রদান করেন। ইহাতে আরও উল্লেখ করা হইয়াছে যে, জিবরাঈল (আ) মহানবীকে চারবার সজোরে আলিঙ্গন করেন। অন্য বিবরণীতে তিনবারের উল্লেখ আছে এবং দুইবার মহানবী জিবরাঈল (আ)-কে বলেন যে, তিনি পড়িতে জানেন না এবং দুইবার জিবরাঈল (আ)-কে জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, তিনি কী পড়িবেন। তৃতীয়ত, এই বিবরণীতে খাদীজা (রা) একাকী ওয়ারাকার নিকট গিয়া তাঁহার স্বামীর ঘটনার বিষয়ে ওয়ারাকার মতামত প্রার্থনা করেন।
এখানে লক্ষ্য করা বাঞ্ছনীয় হইবে যে, এই বিবরণীর চূড়ান্ত প্রামাণ্য সাক্ষী হইতেছেন 'উবায়দ ইবন 'উমায়র ইব্ন কাতাদা যিনি একজন তাবিঈ। তিনি কিন্তু তাঁহার বর্ণিত তথ্যের কোন সূত্রের উল্লেখ করেন নাই। বিবরণীটি তাই যুক্তির দিক হইতে মুরসাল অর্থাৎ মহানবী-এর পর কেবল দ্বিতীয় স্তরের। ব্যাখ্যা প্রদানের ইহা একটি স্বীকৃত নীতি যে, যদি একটি মুরসাল বিবরণ এমন একটি বিবরণের সহিত ভিন্নতর হয় যাহার ইসনাদ মহানবী পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যতা ও ধারাবাহিকতা ভঙ্গ করে নাই (মাওসূল, মারফু) তাহা হইলে শেষোক্তটি গ্রহণযোগ্য হইবে। অতঃপর ইবন ইসহাক কর্তৃক উদ্ধৃত 'উবায়দ ইব্ন উমায়র-এর বর্ণনাটির বুখারী শরীফে উল্লিখিত
বর্ণনাটির সহিত ভিন্নতা রহিয়াছে এবং সেই ক্ষেত্রে বুখারী শরীফের বর্ণনাটি গ্রহণযোগ্যতা পাইবে।
যাহাই হউক না কেন, মহানবী -এর নিদ্রিত অবস্থায় হেরা পর্বতের গুহায় প্রথম ওহী লাভ এবং সেই সময় তিনি স্বপ্নাবস্থায় ছিলেন এইরূপ বিবরণী আয়েশা (আ)-এর স্পষ্ট বর্ণনার প্রেক্ষিতে কোন মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আয়েশা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন যে, মহানবী-এর জাগ্রত অবস্থায় এবং পূর্ণ সচেতনতায় প্রথম ওহী নাযিল হইয়াছিল। কোন কোন ভাষ্যকার অবশ্য এই দুইটি ঘটনার মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করিয়াছেন। তাহারা বলেন, প্রথমে স্বপ্নে এবং পরে জাগ্রত অবস্থায় ওহী গৃহীত হইয়াছিল। এই ব্যাখ্যায় যদিও হেরা গুহায় ওহী লাভ করিবার পূর্বেকার সময়ে সুস্বপ্ন দেখার তথ্যের সহিত কিছু পরিমাণ মিল রহিয়াছে তবুও এই তথ্যকে উপেক্ষা করা হইয়াছে যে, উবায়দ ইবন উমায়র এই স্বপ্নের ঘটনাটি হেরার গুহার বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।
বস্তুত বিবেচনাধীন বর্ণনাটি মহানবী -এর প্রাথমিক পর্যায়ের স্বপ্ন দেখার সহিত দ্বিতীয় পর্যায়ের নির্জন ইবাদত ও ধ্যানের (তাহান্নুছ) সহিত তালগোল পাকাইয়া গিয়াছে। ইহার সহিত আরও একটি বিষয় যুক্ত হইয়াছে। তাহা হইল, মহানবী -এর জাগ্রত ও পূর্ণ সচেতন অবস্থায় হেরা পর্বতের গুহায় প্রথম ওহী নাযিল হইয়াছিল। ঘটনাটির আরেকটি প্রেক্ষিতে তথ্যের এই মিশ্রণ মোটামুটি স্পষ্ট হইয়া উঠে। ইহাতে দেখা যায় যে, মহানবী কথিত স্বপ্ন দেখিবার পরপরই তিনি গুহা হইতে বাহির হইয়া আসেন এবং পর্বতের মাঝামাঝি স্থানে আসিবার পর তিনি জিবরাঈল (আ)-কে আকাশে দেখিতে পান। তবে অন্য বর্ণনামতে ইহা প্রথম ওহী নাযিলের বিরতির পরে ছিল না। ২৬
অবশ্য ইহাও সঠিক বলিয়া প্রতিপন্ন হয় না যে, কুরায়শগণ প্রতি বৎসর রমযান মাসে তাহানুছে নিজদিগকে নিমগ্ন রাখিত এবং কুরায়শদের এই প্রথার অনুকরণে মহানবী নিজকে হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানে নিরত রাখিতেন। তদুপরি তিনি তাঁহার পরিবারসহ নির্জনে কাল কাটাইতেন—এই বক্তব্য নির্জনে অবস্থান ও ইবাদতের ধারণার সহিত সঙ্গতিহীন। কারণ নির্জনে গভীর ধ্যান ও ইবাদত তাহানুছের একমাত্র উদ্দেশ্য। অন্য আর একটি বিবরণী যথা খাদীজা (রা) মহানবী-এর অনুসন্ধানে তাঁহার লোকদের প্রেরণ করেন এবং তিনি পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে দাঁড়াইয়া থাকা অবস্থায় আকাশে অবস্থানকারী জibraঈল (আ)-এর দিকে তাকাইয়াছিলেন, ইহা গ্রহণযোগ্য নয়। এই বর্ণনা হইতে এমন ধারণা করা যায় যে, মহানবী যখন গুহায় অবস্থান করিতেছিলেন তখন তাঁহার পরিবার পর্বতের আরেকটি অবস্থানে ছিলেন। এই অবস্থানস্থলটি পর্বতের ব্যাপ্তি বা আকার দ্বারা যেমন প্রভাবিত হয় না তেমনি জনহীন পর্বতে তাহাদিগকে টানিয়া আনিবার কোন উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। এমনকি তারপরও ইহা অসম্ভব যে, খাদীজা (রা) যদি আদৌ পর্বতে গিয়া থাকেন তবুও মহানবী-এর অবস্থান সম্পর্কে তিনি অনবহিত ছিলেন।
স্পষ্টতই এখানে একটি ঘটনাকে মিশ্রিত করিয়া ফেলা হইয়াছে যাহা আরেকটি প্রসঙ্গে ঘটিয়াছিল। ইহা খুব সম্ভব ওহী নাযিলের বিরতিকালে মহানবী-এর হেরা পর্বতে যাতায়াতকালে ঘটিয়া থাকিতে পারে।
টিকাঃ
১৯. ইবন হিশাম, ১খ., ২৩৪.
বিষয়টি লইয়া আলোচনা করিতে গিয়া ইবন ইসহাক প্রথমে বুখারী উদ্ধৃত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনার অংশবিশেষের পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন। উপরে যেভাবে উদ্ধৃত করা হইয়াছে সেইভাবে ইন ইসহাক উল্লেখ করিয়াছেন যে, মহানবী ঘুমের মধ্যে চমকপ্রদ স্বপ্ন দেখিতেন এবং তাহা যেন ভোরবেলার আলোর মত উদ্ভাসিত হইত। তারপর নির্জনতা তাঁহার নিকট প্রিয় হইয়া উঠে এবং উহা এতই প্রিয় ছিল যে, উহার চাইতে আর কিছুই তাঁহার প্রিয় ছিল না। ১৯ এই পর্যন্ত আসিয়া ইবন ইসহাক ঘটনাটির বর্ণনায় ক্ষান্ত দিয়াছেন এবং 'যে সমস্ত লোক জানে' তাহাদের জানার ভিত্তিতে তিনি আরেকটি ঘটনার অনুপ্রবেশ ঘটাইয়াছেন বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তাঁহার বর্ণনায় কিছু অস্বাভাবিক ঘটনার অবতারণা করিয়াছেন। যেমন বৃক্ষাদি ও পাথরসমূহ সম্ভাব্য রাসূল -কে সালাম করিতেছে। ২২ তারপর ইবন ইসহাক আরেকটি বর্ণনার ভিত্তিতে ওহী অবতীর্ণ হওয়ার কাহিনী শুরু করিয়াছেন। তিনি ওয়াহ্হ্ব ইন্ন কায়সান (মৃ. ১২৭ হি.)-এর নিকট হইতে এই বর্ণনা গ্রহণ করেন। বলা হইয়া থাকে যে, এই ওয়াহ্হ্ব ইন্ন কায়সান এই বিষয়ে আবদুল্লাহ ইনুষ যুবায়রকে উবায়দ ইবন উমায়র ইব্ন্ন কাতাদা আল-লায়ছী ২৩ (মৃ. ৬৮ হি.)-এর মাধ্যমে বলিতে শুনিয়াছেন যেখানে 'উবায়দ ঘটনাটি নিম্নরূপে বর্ণনা করেন:
"আল্লাহ্র রাসূল প্রতি বৎসর এক মাসের জন্য হেরা পর্বতের গুহায় (يُجاور) নির্জনে সময় কাটাইতেন। জাহিলিয়া যুগে কুরায়শগণ এইরূপ এক মাস ধরিয়া তাহান্নুছ-এ সময় কাটাইতে অভ্যস্ত ছিল। ২৪ সুতরাং আল্লাহ্র রাসূল বৎসরের ঐ সময় নির্জনতায় অতিবাহিত করিতেন। ঐ সময় তাঁহার নিকট সাহায্যপ্রার্থী গরীবদিগকে তিনি আহার করাইতেন। যখন আল্লাহ্র রাসূল মাসব্যাপী সময় যাপন সম্পন্ন করিতেন তখন বাড়ী ফিরিয়া আসিবার পূর্বে তিনি প্রথম যে কাজটি করিতেন তাহা হইতেছে, কা'বাঘরে গিয়া ইহাকে সাতবার প্রদক্ষিণ করিতেন অথবা আল্লাহ যতবার চাহিতেন ততবারই তিনি ইহার তাওয়াফ করিতেন। এই অভ্যাস তিনি ঐ মাস পর্যন্ত বজায় রাখিয়াছিলেন যে মাসে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সম্মানিত করিতে ইচ্ছা করেন। বৎসরের ঐ মাসে আল্লাহ তাঁহাকে নবুওয়াত দান করেন এবং সেই মাসটি হইতেছে রমযান (রামাদান)। সুতরাং আল্লাহ্র রাসূল বরাবরের ন্যায় হেরা পর্বতের উদ্দেশে গমন করেন এবং তাঁহার পরিবার তাঁহার সাথে ছিল। সেখানে তাঁহার অবস্থিতিকালে এক রাত্রে আল্লাহ
তাঁহার বাণী প্রেরণ করিয়া তাঁহাকে সম্মানিত করেন এবং এইভাবে তাঁহার বান্দাগণকে সৌভাগ্যে ভূষিত করেন। আল্লাহ্র আদেশে জিবরাঈল (আ) তাঁহার নিকট আসেন। আল্লাহ্র রাসূল বলেন, “জিবরাঈল আমার নিকট আসেন, আমি তখন নিদ্রিত ছিলাম। তাহার হাতে লিখনসহ একটি রেশমী কৌটা ছিল। তিনি আমাকে বলিলেন, 'পড়'। আমি (মহানবী) বলিলাম, 'আমি পড়িতে পারি না।' ইহাতে তিনি আমাকে এত সজোরে আলিঙ্গন করিলেন যে, আমার মনে হইতেছিল আমি মরিয়া যাইব। তারপর তিনি আমাকে আলিঙ্গনমুক্ত করিয়া বলিলেন, 'পড়।' আমি উত্তর দিলাম, 'আমি পড়িতে পারি না।' ইহাতে তিনি পুন অত্যন্ত শক্তভাবে আমাকে আলিঙ্গন করিলেন এবং আমার দম বন্ধ হইবার উপক্রম হইল। তিনি আমাকে ছাড়িয়া দিয়া আবার আদেশ করিলেন, 'পড়'। তখন আমি বলিলাম, 'আমি কী পড়িব?' ইহাতে আবারও তিনি জোরে আমাকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া ছাড়িয়া দিলেন এবং বলিলেন, "পড়! তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন, সৃষ্টি করিয়াছেন মানুষকে 'আলাক' হইতে। পড়, এবং তোমার প্রভু মহা মহিমান্বিত; যিনি শিক্ষা দিয়াছেন কলমের সাহায্যে; শিক্ষা দিয়াছেন মানুষকে, যাহা সে জানিত না"।
মহানবী বলেন, 'অতঃপর আমি ইহা পাঠ করিলাম।' তাহার পর ইহার সমাপ্তি ঘটিল, তিনি আমাকে ছাড়িয়া গেলে আমি ঘুম হইতে জাগিয়া উঠিলাম। আমার নিকট এইরূপ বোধ হইতেছিল যেন একটি বিরল লিখন আমার হৃদয়ে অংকিত হইয়া গিয়াছে। তারপর আমি গুহা হইতে বাহির হইয়া আসিলাম। পর্বতের মাঝামাঝি জায়গায় থাকাকালে আকাশ হইতে একটি কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইলাম এবং কে যেন বলিতেছেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল এবং আমি জিবরাঈল।' আকাশের দিকে তাকাইবার জন্য আমি মাথা উপরের দিকে উঠাইলাম এবং স্পষ্টভাবে মানুষের আকৃতিতে জিবরাঈলকে দেখিতে পাইলাম। তাঁহার দুই পা দিগন্তে বিস্তার করিয়া রহিয়াছে। তিনি বলিতেছেন, 'হে মুহাম্মাদ। আপনি আল্লাহ্র রাসূল এবং আমি জিবরাঈল।' ইহাতে আমি তাঁহার দিকে তাকাইয়া রহিলাম এবং সামনে বা পিছনে না গিয়া একভাবে স্থির হইয়া থাকিলাম। তাহার দিক হইতে দৃষ্টি সরাইয়া আমি দিগন্তে দৃষ্টি স্থাপন করিলাম এবং আমি যেদিকেই তাকাই না কেন তাহাকে একই অবস্থানে দেখিতে পাইলাম। সামনে বা পিছনে এক চুলও না নড়িয়া আমি দাঁড়াইয়া রহিলাম এবং আমার খোঁজে খাদীজা তাহার লোক প্রেরণ না করা পর্যন্ত ঐ অবস্থায় থাকিলাম। খাদীজার লোকেরা মক্কার উচ্চ অঞ্চলে অনুসন্ধান করিয়া ফিরিয়া গেলেও আমি ঐ স্থানে পূর্ববত দাঁড়াইয়া রহিলাম। তারপর জিবরাঈল আমাকে ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলেন।"
"আমি স্থানটি ত্যাগ করিয়া আমার পরিবারে ফিরিয়া আসিলাম এবং খাদীজাকে স্পর্শ করিয়া ও তাহাকে হেলান দিয়া বসিয়া পড়িলাম। তিনি (খাদীজা) বলিলেন, 'হে আবুল কাসিম! আপনি কোথায় ছিলেন? আল্লাহর শপথ! আমি আপনার অনুসন্ধানে আমার লোকদের মক্কার উচ্চ এলাকায় প্রেরণ করিয়াছি। কিন্তু তাহারা আপনাকে না পাইয়া ফিরিয়া আসিয়াছে'। তখন আমি যাহা দেখিয়াছি তাহা সবিস্তারে তাহার নিকট বর্ণনা করি। ইহাতে খাদিজা বলিল, "হে আমার পিতার
ভ্রাতুষ্পুত্র! তাঁহার (আল্লাহ্) শপথ যাঁহার হাতে খাদীজার জীবন! আমার মনে হয় আপনি এই সকল লোকের নবী হইবেন"।
"তারপর তিনি উঠিয়া পোশাক পরিধান করিলেন এবং ওয়ারাকা ইন্ন নওফাল ইন্ন আসাদ ইন্ন 'আবদুল 'উয্যা ইন্ন কুসায়্যি-এর নিকট গেলেন। ওয়ারাকা ছিলেন তাঁহার চাচার পুত্র এবং খৃস্টান। তিনি বাইবেল পাঠ করিয়াছিলেন এবং তাওরাত ও ইনজীল গ্রন্থের পণ্ডিত ব্যক্তিদের নিকট হইতে শুনিয়াছিলেন। আল্লাহর রাসূল যাহা দেখিয়াছেন ও শুনিয়াছেন এবং যাহা তাঁহাকে বর্ণনা করিয়াছেন খাদীজা অবিকল তাহা ওয়ারাকাকে বিবৃত করেন। ইহা শুনিয়া ওয়ারাকা বলিয়া উঠেন : পবিত্র, পবিত্র, যাঁহার হাতে ওয়ারাকার জীবন সেই পরম সত্তার শপথ! হে খাদীজা, যদি তুমি সত্য বলিয়া থাক তবে অবশ্যই সেই মহান নামূস (জিবরাঈল) যিনি মূসার নিকট আসিতেন, তিনি মুহাম্মাদের নিকট আসিয়াছেন। নিশ্চয় তিনি এই লোকদের নবী। সুতরাং তাঁহাকে নিশ্চিন্ত থাকিতে বল।"
তারপর খাদীজা আল্লাহ্র রাসূল-এর নিকট ফিরিয়া আসিয়া ওয়ারাকা ইবন নাওফাল-এর সহিত আলোচনার বিষয়বস্তু তাঁহাকে অবহিত করেন। তারপর আল্লাহ্র রাসূল তাঁহার বিশ্রাম ত্যাগ করিয়া (জাওয়ারা) কা'বাঘরে গমন করেন এবং কা'বাঘরে যে কাজ করিতে অভ্যস্ত অর্থাৎ কা'বাঘর প্রদক্ষিণ করিতে থাকেন। সেখানে কা'বাঘর প্রদক্ষিণকারী ওয়ারাকার সহিত তাঁহার সাক্ষাত ঘটে। ওয়ারাকা তাঁহাকে বলেন, "হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র! তুমি যাহা দেখিয়াছ ও শুনিয়াছ তাহা আমাকে বল”। আল্লাহ্র রাসূল তাঁহাকে সকল বিষয় খুলিয়া বলিলেন। ওয়ারাকা তাঁহাকে বলিলেন, "যাহার হাতে আমার জীবন তাঁহার শপথ! তুমি প্রকৃতই এই লোকদের নবী এবং মূসার নিকট যিনি আসিয়াছিলেন সেই মহান নামূস তোমার নিকট আসিয়াছেন। তোমাকে লোকেরা বিশ্বাস করিবে না, তোমাকে কষ্ট দেওয়া হইবে, তুমি নিজ জন্মস্থান হইতে বিতাড়িত হইবে এবং তোমার সহিত যুদ্ধ হইবে। আমি যদি সেই পর্যন্ত জীবিত থাকি তাহা হইলে, যেমন আল্লাহ জানেন, আমি অবশ্যই আল্লাহ্ দীনের সাহায্য করিব"। তখন ওয়ারাকা মহানবী -এর দিকে স্বীয় মাথা ঝুঁকাইয়া তাঁহার কপালের মধ্যখানে চুম্বন করিলেন। তারপর আল্লাহ্র রাসূল তাঁহার গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন”। ২৫
ইহা স্পষ্টভাবে বোধগম্য যে, এই ঘটনা বুখারী শরীফে প্রদত্ত ও ইতোপূর্বে উল্লিখিত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনা হইতে অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। এই বিভিন্নতা প্রকৃত তথ্যের বিচ্যুতি, অতিরিক্ত সংযোজন এবং ঈষৎ পরিবর্তনের মধ্যে দৃষ্ট হয়। তথ্যের বিচ্যুতি প্রসঙ্গে ইবন ইসহাক প্রদত্ত বিবরণে হেরা পর্বতের গুহায় মহানবী-এর তাহান্নুছ পালন কালের পূর্বে উত্তম ও প্রকৃত স্বপ্ন দেখিবার সময়ের কোন উল্লেখ নাই। দ্বিতীয়ত, জিবরাঈল (আ)-এর সহিত সাক্ষাত ও অভিজ্ঞতার পরিণতির প্রেক্ষিতে মহানবী -এর মধ্যে সৃষ্ট ভীতি ও হতভম্ব হওয়ার কোন
ইঙ্গিত দেখা যায় না। সর্বশেষ হেরার গুহায় প্রথম ওহী লাভের পর পরবর্তী ওহী লাভে যে বিরতি ঘটে সে সম্পর্কেও কোন উল্লেখ নাই।
অতিরিক্ত বক্তব্য প্রসঙ্গে প্রথম যে বিষয়টি লক্ষ্য করা যায় তাহা হইতেছে, এই বিবরণে হেরা পর্বতের গুহায় মহানবী-এর সাময়িক অবস্থানের কথা বলা হইয়াছে এবং তাহা ছিল প্রত্যেক বৎসর রমযান মাসে কুরায়শগণ কর্তৃক মহানবী-এর অনুরূপ তাহান্নুছ পালনের প্রথা। ইহাতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, মহানবী ইহা প্রতি বৎসরই পালন করিতেন। দ্বিতীয়ত, আরও বলা হইয়াছে যে, মহানবী যখন গুহা হইতে নিচে নামিয়া আসিতেছিলেন এবং পাহাড়ের মাঝামাঝি স্থানে পৌঁছাইলে জিবরাঈল (আ) আকাশে পুনঃ আবির্ভূত হইলেন এবং মহানবীকে নাম ধরিয়া ডাকিয়া তাঁহাকে নিশ্চয়তা দিলেন যে, তিনি প্রকৃতই আল্লাহ্ রাসূল। তৃতীয়ত, বিবরণীটি উল্লেখ করে যে, হেরা পর্বত হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া তিনি প্রথম যে কাজটি করেন তাহা হইল, কা'বাঘরে গমন ও ইহার প্রদক্ষিণ। অবশেষে ওয়ারাকার সহিত খাদীজার সাক্ষাতকার এবং কা'বার চত্বরে ওয়ারাকা মহানবী-এর সহিত কথোপকথনে ইতোপূর্বে খাদীজার নিকট যে মতামত প্রকাশ করেন তাহাই এখানে পুনর্ব্যক্ত করেন। এই বিষয় বিবরণীতে উল্লিখিত হইয়াছে।
আরও লক্ষণীয় যে, ইহার পরিবর্তনসমূহ যাহা আয়েশা (রা)-এর বর্ণনাতে যে সকল তথ্যের প্রকাশ ঘটিয়াছে তাহা এই বিবরণীতে আসিয়াছে। প্রথমত উল্লেখ করা যায় যে, তাহান্নুছ-এর জন্য মহানবী যখন হেরার গুহায় গমন করেন তখন তাঁহার সহিত তাঁহার পরিবারবর্গ ছিলেন। দ্বিতীয়ত এবং অধিকতর গুরুত্বপূর্ণভাবে উল্লিখিত হইয়াছে যে, মহানবী হেরার গুহায় যখন নিদ্রা যাইতেছিলেন তখন জিবরাঈল (আ) আসিয়া তাঁহাকে ওহী প্রদান করেন। ইহাতে আরও উল্লেখ করা হইয়াছে যে, জিবরাঈল (আ) মহানবীকে চারবার সজোরে আলিঙ্গন করেন। অন্য বিবরণীতে তিনবারের উল্লেখ আছে এবং দুইবার মহানবী জিবরাঈল (আ)-কে বলেন যে, তিনি পড়িতে জানেন না এবং দুইবার জিবরাঈল (আ)-কে জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, তিনি কী পড়িবেন। তৃতীয়ত, এই বিবরণীতে খাদীজা (রা) একাকী ওয়ারাকার নিকট গিয়া তাঁহার স্বামীর ঘটনার বিষয়ে ওয়ারাকার মতামত প্রার্থনা করেন।
এখানে লক্ষ্য করা বাঞ্ছনীয় হইবে যে, এই বিবরণীর চূড়ান্ত প্রামাণ্য সাক্ষী হইতেছেন 'উবায়দ ইবন 'উমায়র ইব্ন কাতাদা যিনি একজন তাবিঈ। তিনি কিন্তু তাঁহার বর্ণিত তথ্যের কোন সূত্রের উল্লেখ করেন নাই। বিবরণীটি তাই যুক্তির দিক হইতে মুরসাল অর্থাৎ মহানবী-এর পর কেবল দ্বিতীয় স্তরের। ব্যাখ্যা প্রদানের ইহা একটি স্বীকৃত নীতি যে, যদি একটি মুরসাল বিবরণ এমন একটি বিবরণের সহিত ভিন্নতর হয় যাহার ইসনাদ মহানবী পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যতা ও ধারাবাহিকতা ভঙ্গ করে নাই (মাওসূল, মারফু) তাহা হইলে শেষোক্তটি গ্রহণযোগ্য হইবে। অতঃপর ইবন ইসহাক কর্তৃক উদ্ধৃত 'উবায়দ ইব্ন উমায়র-এর বর্ণনাটির বুখারী শরীফে উল্লিখিত
বর্ণনাটির সহিত ভিন্নতা রহিয়াছে এবং সেই ক্ষেত্রে বুখারী শরীফের বর্ণনাটি গ্রহণযোগ্যতা পাইবে।
যাহাই হউক না কেন, মহানবী -এর নিদ্রিত অবস্থায় হেরা পর্বতের গুহায় প্রথম ওহী লাভ এবং সেই সময় তিনি স্বপ্নাবস্থায় ছিলেন এইরূপ বিবরণী আয়েশা (আ)-এর স্পষ্ট বর্ণনার প্রেক্ষিতে কোন মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আয়েশা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন যে, মহানবী-এর জাগ্রত অবস্থায় এবং পূর্ণ সচেতনতায় প্রথম ওহী নাযিল হইয়াছিল। কোন কোন ভাষ্যকার অবশ্য এই দুইটি ঘটনার মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করিয়াছেন। তাহারা বলেন, প্রথমে স্বপ্নে এবং পরে জাগ্রত অবস্থায় ওহী গৃহীত হইয়াছিল। এই ব্যাখ্যায় যদিও হেরা গুহায় ওহী লাভ করিবার পূর্বেকার সময়ে সুস্বপ্ন দেখার তথ্যের সহিত কিছু পরিমাণ মিল রহিয়াছে তবুও এই তথ্যকে উপেক্ষা করা হইয়াছে যে, উবায়দ ইবন উমায়র এই স্বপ্নের ঘটনাটি হেরার গুহার বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।
বস্তুত বিবেচনাধীন বর্ণনাটি মহানবী -এর প্রাথমিক পর্যায়ের স্বপ্ন দেখার সহিত দ্বিতীয় পর্যায়ের নির্জন ইবাদত ও ধ্যানের (তাহান্নুছ) সহিত তালগোল পাকাইয়া গিয়াছে। ইহার সহিত আরও একটি বিষয় যুক্ত হইয়াছে। তাহা হইল, মহানবী -এর জাগ্রত ও পূর্ণ সচেতন অবস্থায় হেরা পর্বতের গুহায় প্রথম ওহী নাযিল হইয়াছিল। ঘটনাটির আরেকটি প্রেক্ষিতে তথ্যের এই মিশ্রণ মোটামুটি স্পষ্ট হইয়া উঠে। ইহাতে দেখা যায় যে, মহানবী কথিত স্বপ্ন দেখিবার পরপরই তিনি গুহা হইতে বাহির হইয়া আসেন এবং পর্বতের মাঝামাঝি স্থানে আসিবার পর তিনি জিবরাঈল (আ)-কে আকাশে দেখিতে পান। তবে অন্য বর্ণনামতে ইহা প্রথম ওহী নাযিলের বিরতির পরে ছিল না। ২৬
অবশ্য ইহাও সঠিক বলিয়া প্রতিপন্ন হয় না যে, কুরায়শগণ প্রতি বৎসর রমযান মাসে তাহানুছে নিজদিগকে নিমগ্ন রাখিত এবং কুরায়শদের এই প্রথার অনুকরণে মহানবী নিজকে হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানে নিরত রাখিতেন। তদুপরি তিনি তাঁহার পরিবারসহ নির্জনে কাল কাটাইতেন—এই বক্তব্য নির্জনে অবস্থান ও ইবাদতের ধারণার সহিত সঙ্গতিহীন। কারণ নির্জনে গভীর ধ্যান ও ইবাদত তাহানুছের একমাত্র উদ্দেশ্য। অন্য আর একটি বিবরণী যথা খাদীজা (রা) মহানবী-এর অনুসন্ধানে তাঁহার লোকদের প্রেরণ করেন এবং তিনি পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে দাঁড়াইয়া থাকা অবস্থায় আকাশে অবস্থানকারী জিবরাঈল (আ)-এর দিকে তাকাইয়াছিলেন, ইহা গ্রহণযোগ্য নয়। এই বর্ণনা হইতে এমন ধারণা করা যায় যে, মহানবী যখন গুহায় অবস্থান করিতেছিলেন তখন তাঁহার পরিবার পর্বতের আরেকটি অবস্থানে ছিলেন। এই অবস্থানস্থলটি পর্বতের ব্যাপ্তি বা আকার দ্বারা যেমন প্রভাবিত হয় না তেমনি জনহীন পর্বতে তাহাদিগকে টানিয়া আনিবার কোন উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। এমনকি তারপরও ইহা অসম্ভব যে, খাদীজা (রা) যদি আদৌ পর্বতে গিয়া থাকেন তবুও মহানবী-এর অবস্থান সম্পর্কে তিনি অনবহিত ছিলেন।
স্পষ্টতই এখানে একটি ঘটনাকে মিশ্রিত করিয়া ফেলা হইয়াছে যাহা আরেকটি প্রসঙ্গে ঘটিয়াছিল। ইহা খুব সম্ভব ওহী নাযিলের বিরতিকালে মহানবী-এর হেরা পর্বতে যাতায়াতকালে ঘটিয়া থাকিতে পারে।
বিষয়টি লইয়া আলোচনা করিতে গিয়া ইবন ইসহাক প্রথমে বুখারী উদ্ধৃত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনার অংশবিশেষের পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন। উপরে যেভাবে উদ্ধৃত করা হইয়াছে সেইভাবে ইন ইসহাক উল্লেখ করিয়াছেন যে, মহানবী ঘুমের মধ্যে চমকপ্রদ স্বপ্ন দেখিতেন এবং তাহা যেন ভোরবেলার আলোর মত উদ্ভাসিত হইত। তারপর নির্জনতা তাঁহার নিকট প্রিয় হইয়া উঠে এবং উহা এতই প্রিয় ছিল যে, উহার চাইতে আর কিছুই তাঁহার প্রিয় ছিল না। ১৯ এই পর্যন্ত আসিয়া ইবন ইসহাক ঘটনাটির বর্ণনায় ক্ষান্ত দিয়াছেন এবং 'যে সমস্ত লোক জানে' তাহাদের জানার ভিত্তিতে তিনি আরেকটি ঘটনার অনুপ্রবেশ ঘটাইয়াছেন বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তাঁহার বর্ণনায় কিছু অস্বাভাবিক ঘটনার অবতারণা করিয়াছেন। যেমন বৃক্ষাদি ও পাথরসমূহ সম্ভাব্য রাসূল -কে সালাম করিতেছে। ২২ তারপর ইবন ইসহাক আরেকটি বর্ণনার ভিত্তিতে ওহী অবতীর্ণ হওয়ার কাহিনী শুরু করিয়াছেন। তিনি ওয়াহ্হ্ব ইন্ন কায়সান (মৃ. ১২৭ হি.)-এর নিকট হইতে এই বর্ণনা গ্রহণ করেন। বলা হইয়া থাকে যে, এই ওয়াহ্হ্ব ইন্ন কায়সান এই বিষয়ে আবদুল্লাহ ইনুষ যুবায়রকে উবায়দ ইবন উমায়র ইব্ন্ন কাতাদা আল-লায়ছী ২৩ (মৃ. ৬৮ হি.)-এর মাধ্যমে বলিতে শুনিয়াছেন যেখানে 'উবায়দ ঘটনাটি নিম্নরূপে বর্ণনা করেন:
"আল্লাহ্র রাসূল প্রতি বৎসর এক মাসের জন্য হেরা পর্বতের গুহায় (يُجاور) নির্জনে সময় কাটাইতেন। জাহিলিয়া যুগে কুরায়শগণ এইরূপ এক মাস ধরিয়া তাহান্নুছ-এ সময় কাটাইতে অভ্যস্ত ছিল। ২৪ সুতরাং আল্লাহ্র রাসূল বৎসরের ঐ সময় নির্জনতায় অতিবাহিত করিতেন। ঐ সময় তাঁহার নিকট সাহায্যপ্রার্থী গরীবদিগকে তিনি আহার করাইতেন। যখন আল্লাহ্র রাসূল মাসব্যাপী সময় যাপন সম্পন্ন করিতেন তখন বাড়ী ফিরিয়া আসিবার পূর্বে তিনি প্রথম যে কাজটি করিতেন তাহা হইতেছে, কা'বাঘরে গিয়া ইহাকে সাতবার প্রদক্ষিণ করিতেন অথবা আল্লাহ যতবার চাহিতেন ততবারই তিনি ইহার তাওয়াফ করিতেন। এই অভ্যাস তিনি ঐ মাস পর্যন্ত বজায় রাখিয়াছিলেন যে মাসে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সম্মানিত করিতে ইচ্ছা করেন। বৎসরের ঐ মাসে আল্লাহ তাঁহাকে নবুওয়াত দান করেন এবং সেই মাসটি হইতেছে রমযান (রামাদান)। সুতরাং আল্লাহ্র রাসূল বরাবরের ন্যায় হেরা পর্বতের উদ্দেশে গমন করেন এবং তাঁহার পরিবার তাঁহার সাথে ছিল। সেখানে তাঁহার অবস্থিতিকালে এক রাত্রে আল্লাহ
তাঁহার বাণী প্রেরণ করিয়া তাঁহাকে সম্মানিত করেন এবং এইভাবে তাঁহার বান্দাগণকে সৌভাগ্যে ভূষিত করেন। আল্লাহ্র আদেশে জিবরাঈল (আ) তাঁহার নিকট আসেন। আল্লাহ্র রাসূল বলেন, “জিবরাঈল আমার নিকট আসেন, আমি তখন নিদ্রিত ছিলাম। তাহার হাতে লিখনসহ একটি রেশমী কৌটা ছিল। তিনি আমাকে বলিলেন, 'পড়'। আমি (মহানবী) বলিলাম, 'আমি পড়িতে পারি না।' ইহাতে তিনি আমাকে এত সজোরে আলিঙ্গন করিলেন যে, আমার মনে হইতেছিল আমি মরিয়া যাইব। তারপর তিনি আমাকে আলিঙ্গনমুক্ত করিয়া বলিলেন, 'পড়।' আমি উত্তর দিলাম, 'আমি পড়িতে পারি না।' ইহাতে তিনি পুন অত্যন্ত শক্তভাবে আমাকে আলিঙ্গন করিলেন এবং আমার দম বন্ধ হইবার উপক্রম হইল। তিনি আমাকে ছাড়িয়া দিয়া আবার আদেশ করিলেন, 'পড়'। তখন আমি বলিলাম, 'আমি কী পড়িব?' ইহাতে আবারও তিনি জোরে আমাকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া ছাড়িয়া দিলেন এবং বলিলেন, "পড়! তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন, সৃষ্টি করিয়াছেন মানুষকে 'আলাক' হইতে। পড়, এবং তোমার প্রভু মহা মহিমান্বিত; যিনি শিক্ষা দিয়াছেন কলমের সাহায্যে; শিক্ষা দিয়াছেন মানুষকে, যাহা সে জানিত না"।
মহানবী বলেন, 'অতঃপর আমি ইহা পাঠ করিলাম।' তাহার পর ইহার সমাপ্তি ঘটিল, তিনি আমাকে ছাড়িয়া গেলে আমি ঘুম হইতে জাগিয়া উঠিলাম। আমার নিকট এইরূপ বোধ হইতেছিল যেন একটি বিরল লিখন আমার হৃদয়ে অংকিত হইয়া গিয়াছে। তারপর আমি গুহা হইতে বাহির হইয়া আসিলাম। পর্বতের মাঝামাঝি জায়গায় থাকাকালে আকাশ হইতে একটি কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইলাম এবং কে যেন বলিতেছেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল এবং আমি জিবরাঈল।' আকাশের দিকে তাকাইবার জন্য আমি মাথা উপরের দিকে উঠাইলাম এবং স্পষ্টভাবে মানুষের আকৃতিতে জিবরাঈলকে দেখিতে পাইলাম। তাঁহার দুই পা দিগন্তে বিস্তার করিয়া রহিয়াছে। তিনি বলিতেছেন, 'হে মুহাম্মাদ। আপনি আল্লাহ্র রাসূল এবং আমি জিবরাঈল।' ইহাতে আমি তাঁহার দিকে তাকাইয়া রহিলাম এবং সামনে বা পিছনে না গিয়া একভাবে স্থির হইয়া থাকিলাম। তাহার দিক হইতে দৃষ্টি সরাইয়া আমি দিগন্তে দৃষ্টি স্থাপন করিলাম এবং আমি যেদিকেই তাকাই না কেন তাহাকে একই অবস্থানে দেখিতে পাইলাম। সামনে বা পিছনে এক চুলও না নড়িয়া আমি দাঁড়াইয়া রহিলাম এবং আমার খোঁজে খাদীজা তাহার লোক প্রেরণ না করা পর্যন্ত ঐ অবস্থায় থাকিলাম। খাদীজার লোকেরা মক্কার উচ্চ অঞ্চলে অনুসন্ধান করিয়া ফিরিয়া গেলেও আমি ঐ স্থানে পূর্ববত দাঁড়াইয়া রহিলাম। তারপর জিবরাঈল আমাকে ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলেন।"
"আমি স্থানটি ত্যাগ করিয়া আমার পরিবারে ফিরিয়া আসিলাম এবং খাদীজাকে স্পর্শ করিয়া ও তাহাকে হেলান দিয়া বসিয়া পড়িলাম। তিনি (খাদীজা) বলিলেন, 'হে আবুল কাসিম! আপনি কোথায় ছিলেন? আল্লাহর শপথ! আমি আপনার অনুসন্ধানে আমার লোকদের মক্কার উচ্চ এলাকায় প্রেরণ করিয়াছি। কিন্তু তাহারা আপনাকে না পাইয়া ফিরিয়া আসিয়াছে'। তখন আমি যাহা দেখিয়াছি তাহা সবিস্তারে তাহার নিকট বর্ণনা করি। ইহাতে খাদিজা বলিল, "হে আমার পিতার
ভ্রাতুষ্পুত্র! তাঁহার (আল্লাহ্) শপথ যাঁহার হাতে খাদীজার জীবন! আমার মনে হয় আপনি এই সকল লোকের নবী হইবেন"।
"তারপর তিনি উঠিয়া পোশাক পরিধান করিলেন এবং ওয়ারাকা ইন্ন নওফাল ইন্ন আসাদ ইন্ন 'আবদুল 'উয্যা ইন্ন কুসায়্যি-এর নিকট গেলেন। ওয়ারাকা ছিলেন তাঁহার চাচার পুত্র এবং খৃস্টান। তিনি বাইবেল পাঠ করিয়াছিলেন এবং তাওরাত ও ইনজীল গ্রন্থের পণ্ডিত ব্যক্তিদের নিকট হইতে শুনিয়াছিলেন। আল্লাহর রাসূল যাহা দেখিয়াছেন ও শুনিয়াছেন এবং যাহা তাঁহাকে বর্ণনা করিয়াছেন খাদীজা অবিকল তাহা ওয়ারাকাকে বিবৃত করেন। ইহা শুনিয়া ওয়ারাকা বলিয়া উঠেন : পবিত্র, পবিত্র, যাঁহার হাতে ওয়ারাকার জীবন সেই পরম সত্তার শপথ! হে খাদীজা, যদি তুমি সত্য বলিয়া থাক তবে অবশ্যই সেই মহান নামূস (জিবরাঈল) যিনি মূসার নিকট আসিতেন, তিনি মুহাম্মাদের নিকট আসিয়াছেন। নিশ্চয় তিনি এই লোকদের নবী। সুতরাং তাঁহাকে নিশ্চিন্ত থাকিতে বল।"
তারপর খাদীজা আল্লাহ্র রাসূল-এর নিকট ফিরিয়া আসিয়া ওয়ারাকা ইবন নাওফাল-এর সহিত আলোচনার বিষয়বস্তু তাঁহাকে অবহিত করেন। তারপর আল্লাহ্র রাসূল তাঁহার বিশ্রাম ত্যাগ করিয়া (জাওয়ারা) কা'বাঘরে গমন করেন এবং কা'বাঘরে যে কাজ করিতে অভ্যস্ত অর্থাৎ কা'বাঘর প্রদক্ষিণ করিতে থাকেন। সেখানে কা'বাঘর প্রদক্ষিণকারী ওয়ারাকার সহিত তাঁহার সাক্ষাত ঘটে। ওয়ারাকা তাঁহাকে বলেন, "হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র! তুমি যাহা দেখিয়াছ ও শুনিয়াছ তাহা আমাকে বল”। আল্লাহ্র রাসূল তাঁহাকে সকল বিষয় খুলিয়া বলিলেন। ওয়ারাকা তাঁহাকে বলিলেন, "যাহার হাতে আমার জীবন তাঁহার শপথ! তুমি প্রকৃতই এই লোকদের নবী এবং মূসার নিকট যিনি আসিয়াছিলেন সেই মহান নামূস তোমার নিকট আসিয়াছেন। তোমাকে লোকেরা বিশ্বাস করিবে না, তোমাকে কষ্ট দেওয়া হইবে, তুমি নিজ জন্মস্থান হইতে বিতাড়িত হইবে এবং তোমার সহিত যুদ্ধ হইবে। আমি যদি সেই পর্যন্ত জীবিত থাকি তাহা হইলে, যেমন আল্লাহ জানেন, আমি অবশ্যই আল্লাহ্ দীনের সাহায্য করিব"। তখন ওয়ারাকা মহানবী -এর দিকে স্বীয় মাথা ঝুঁকাইয়া তাঁহার কপালের মধ্যখানে চুম্বন করিলেন। তারপর আল্লাহ্র রাসূল তাঁহার গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন”। ২৫
ইহা স্পষ্টভাবে বোধগম্য যে, এই ঘটনা বুখারী শরীফে প্রদত্ত ও ইতোপূর্বে উল্লিখিত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনা হইতে অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। এই বিভিন্নতা প্রকৃত তথ্যের বিচ্যুতি, অতিরিক্ত সংযোজন এবং ঈষৎ পরিবর্তনের মধ্যে দৃষ্ট হয়। তথ্যের বিচ্যুতি প্রসঙ্গে ইবন ইসহাক প্রদত্ত বিবরণে হেরা পর্বতের গুহায় মহানবী-এর তাহান্নুছ পালন কালের পূর্বে উত্তম ও প্রকৃত স্বপ্ন দেখিবার সময়ের কোন উল্লেখ নাই। দ্বিতীয়ত, জিবরাঈল (আ)-এর সহিত সাক্ষাত ও অভিজ্ঞতার পরিণতির প্রেক্ষিতে মহানবী -এর মধ্যে সৃষ্ট ভীতি ও হতভম্ব হওয়ার কোন
ইঙ্গিত দেখা যায় না। সর্বশেষ হেরার গুহায় প্রথম ওহী লাভের পর পরবর্তী ওহী লাভে যে বিরতি ঘটে সে সম্পর্কেও কোন উল্লেখ নাই।
অতিরিক্ত বক্তব্য প্রসঙ্গে প্রথম যে বিষয়টি লক্ষ্য করা যায় তাহা হইতেছে, এই বিবরণে হেরা পর্বতের গুহায় মহানবী-এর সাময়িক অবস্থানের কথা বলা হইয়াছে এবং তাহা ছিল প্রত্যেক বৎসর রমযান মাসে কুরায়শগণ কর্তৃক মহানবী-এর অনুরূপ তাহান্নুছ পালনের প্রথা। ইহাতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, মহানবী ইহা প্রতি বৎসরই পালন করিতেন। দ্বিতীয়ত, আরও বলা হইয়াছে যে, মহানবী যখন গুহা হইতে নিচে নামিয়া আসিতেছিলেন এবং পাহাড়ের মাঝামাঝি স্থানে পৌঁছাইলে জিবরাঈল (আ) আকাশে পুনঃ আবির্ভূত হইলেন এবং মহানবীকে নাম ধরিয়া ডাকিয়া তাঁহাকে নিশ্চয়তা দিলেন যে, তিনি প্রকৃতই আল্লাহ্ রাসূল। তৃতীয়ত, বিবরণীটি উল্লেখ করে যে, হেরা পর্বত হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া তিনি প্রথম যে কাজটি করেন তাহা হইল, কা'বাঘরে গমন ও ইহার প্রদক্ষিণ। অবশেষে ওয়ারাকার সহিত খাদীজার সাক্ষাতকার এবং কা'বার চত্বরে ওয়ারাকা মহানবী-এর সহিত কথোপকথনে ইতোপূর্বে খাদীজার নিকট যে মতামত প্রকাশ করেন তাহাই এখানে পুনর্ব্যক্ত করেন। এই বিষয় বিবরণীতে উল্লিখিত হইয়াছে।
আরও লক্ষণীয় যে, ইহার পরিবর্তনসমূহ যাহা আয়েশা (রা)-এর বর্ণনাতে যে সকল তথ্যের প্রকাশ ঘটিয়াছে তাহা এই বিবরণীতে আসিয়াছে। প্রথমত উল্লেখ করা যায় যে, তাহান্নুছ-এর জন্য মহানবী যখন হেরার গুহায় গমন করেন তখন তাঁহার সহিত তাঁহার পরিবারবর্গ ছিলেন। দ্বিতীয়ত এবং অধিকতর গুরুত্বপূর্ণভাবে উল্লিখিত হইয়াছে যে, মহানবী হেরার গুহায় যখন নিদ্রা যাইতেছিলেন তখন জিবরাঈল (আ) আসিয়া তাঁহাকে ওহী প্রদান করেন। ইহাতে আরও উল্লেখ করা হইয়াছে যে, জিবরাঈল (আ) মহানবীকে চারবার সজোরে আলিঙ্গন করেন। অন্য বিবরণীতে তিনবারের উল্লেখ আছে এবং দুইবার মহানবী জিবরাঈল (আ)-কে বলেন যে, তিনি পড়িতে জানেন না এবং দুইবার জিবরাঈল (আ)-কে জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, তিনি কী পড়িবেন। তৃতীয়ত, এই বিবরণীতে খাদীজা (রা) একাকী ওয়ারাকার নিকট গিয়া তাঁহার স্বামীর ঘটনার বিষয়ে ওয়ারাকার মতামত প্রার্থনা করেন।
এখানে লক্ষ্য করা বাঞ্ছনীয় হইবে যে, এই বিবরণীর চূড়ান্ত প্রামাণ্য সাক্ষী হইতেছেন 'উবায়দ ইবন 'উমায়র ইব্ন কাতাদা যিনি একজন তাবিঈ। তিনি কিন্তু তাঁহার বর্ণিত তথ্যের কোন সূত্রের উল্লেখ করেন নাই। বিবরণীটি তাই যুক্তির দিক হইতে মুরসাল অর্থাৎ মহানবী-এর পর কেবল দ্বিতীয় স্তরের। ব্যাখ্যা প্রদানের ইহা একটি স্বীকৃত নীতি যে, যদি একটি মুরসাল বিবরণ এমন একটি বিবরণের সহিত ভিন্নতর হয় যাহার ইসনাদ মহানবী পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যতা ও ধারাবাহিকতা ভঙ্গ করে নাই (মাওসূল, মারফু) তাহা হইলে শেষোক্তটি গ্রহণযোগ্য হইবে। অতঃপর ইবন ইসহাক কর্তৃক উদ্ধৃত 'উবায়দ ইব্ন উমায়র-এর বর্ণনাটির বুখারী শরীফে উল্লিখিত
বর্ণনাটির সহিত ভিন্নতা রহিয়াছে এবং সেই ক্ষেত্রে বুখারী শরীফের বর্ণনাটি গ্রহণযোগ্যতা পাইবে।
যাহাই হউক না কেন, মহানবী -এর নিদ্রিত অবস্থায় হেরা পর্বতের গুহায় প্রথম ওহী লাভ এবং সেই সময় তিনি স্বপ্নাবস্থায় ছিলেন এইরূপ বিবরণী আয়েশা (আ)-এর স্পষ্ট বর্ণনার প্রেক্ষিতে কোন মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আয়েশা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন যে, মহানবী-এর জাগ্রত অবস্থায় এবং পূর্ণ সচেতনতায় প্রথম ওহী নাযিল হইয়াছিল। কোন কোন ভাষ্যকার অবশ্য এই দুইটি ঘটনার মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করিয়াছেন। তাহারা বলেন, প্রথমে স্বপ্নে এবং পরে জাগ্রত অবস্থায় ওহী গৃহীত হইয়াছিল। এই ব্যাখ্যায় যদিও হেরা গুহায় ওহী লাভ করিবার পূর্বেকার সময়ে সুস্বপ্ন দেখার তথ্যের সহিত কিছু পরিমাণ মিল রহিয়াছে তবুও এই তথ্যকে উপেক্ষা করা হইয়াছে যে, উবায়দ ইবন উমায়র এই স্বপ্নের ঘটনাটি হেরার গুহার বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।
বস্তুত বিবেচনাধীন বর্ণনাটি মহানবী -এর প্রাথমিক পর্যায়ের স্বপ্ন দেখার সহিত দ্বিতীয় পর্যায়ের নির্জন ইবাদত ও ধ্যানের (তাহান্নুছ) সহিত তালগোল পাকাইয়া গিয়াছে। ইহার সহিত আরও একটি বিষয় যুক্ত হইয়াছে। তাহা হইল, মহানবী -এর জাগ্রত ও পূর্ণ সচেতন অবস্থায় হেরা পর্বতের গুহায় প্রথম ওহী নাযিল হইয়াছিল। ঘটনাটির আরেকটি প্রেক্ষিতে তথ্যের এই মিশ্রণ মোটামুটি স্পষ্ট হইয়া উঠে। ইহাতে দেখা যায় যে, মহানবী কথিত স্বপ্ন দেখিবার পরপরই তিনি গুহা হইতে বাহির হইয়া আসেন এবং পর্বতের মাঝামাঝি স্থানে আসিবার পর তিনি জিবরাঈল (আ)-কে আকাশে দেখিতে পান। তবে অন্য বর্ণনামতে ইহা প্রথম ওহী নাযিলের বিরতির পরে ছিল না। ২৬
অবশ্য ইহাও সঠিক বলিয়া প্রতিপন্ন হয় না যে, কুরায়শগণ প্রতি বৎসর রমযান মাসে তাহানুছে নিজদিগকে নিমগ্ন রাখিত এবং কুরায়শদের এই প্রথার অনুকরণে মহানবী নিজকে হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানে নিরত রাখিতেন। তদুপরি তিনি তাঁহার পরিবারসহ নির্জনে কাল কাটাইতেন—এই বক্তব্য নির্জনে অবস্থান ও ইবাদতের ধারণার সহিত সঙ্গতিহীন। কারণ নির্জনে গভীর ধ্যান ও ইবাদত তাহানুছের একমাত্র উদ্দেশ্য। অন্য আর একটি বিবরণী যথা খাদীজা (রা) মহানবী-এর অনুসন্ধানে তাঁহার লোকদের প্রেরণ করেন এবং তিনি পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে দাঁড়াইয়া থাকা অবস্থায় আকাশে অবস্থানকারী জিবরাঈল (আ)-এর দিকে তাকাইয়াছিলেন, ইহা গ্রহণযোগ্য নয়। এই বর্ণনা হইতে এমন ধারণা করা যায় যে, মহানবী যখন গুহায় অবস্থান করিতেছিলেন তখন তাঁহার পরিবার পর্বতের আরেকটি অবস্থানে ছিলেন। এই অবস্থানস্থলটি পর্বতের ব্যাপ্তি বা আকার দ্বারা যেমন প্রভাবিত হয় না তেমনি জনহীন পর্বতে তাহাদিগকে টানিয়া আনিবার কোন উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। এমনকি তারপরও ইহা অসম্ভব যে, খাদীজা (রা) যদি আদৌ পর্বতে গিয়া থাকেন তবুও মহানবী-এর অবস্থান সম্পর্কে তিনি অনবহিত ছিলেন।
স্পষ্টতই এখানে একটি ঘটনাকে মিশ্রিত করিয়া ফেলা হইয়াছে যাহা আরেকটি প্রসঙ্গে ঘটিয়াছিল। ইহা খুব সম্ভব ওহী নাযিলের বিরতিকালে মহানবী-এর হেরা পর্বতে যাতায়াতকালে ঘটিয়া থাকিতে পারে।
📄 তিন: আল-ওয়াকিদী প্রদত্ত বর্ণনা
সময়ের প্রেক্ষিতে পরবর্তী বর্ণনা হইতেছে আল-ওয়াকিদীর (মুহাম্মাদ ইবন 'উমার (১২০-২০৭ হি.) যাহা তাঁহার সচিব মুহাম্মাদ ইবন সা'দ (১৬৮-২৩০ হি.)-এর মাধ্যমে আসিয়াছে।
১. আল-ওয়াকিদী বুখারী শরীফে উল্লিখিত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনার প্রথম দিকের অংশবিশেষ প্রথমে উদ্ধৃত করেন, তবে ভিন্ন সনদে অর্থাৎ মা'মার ইবন রাশিদ ও মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল্লাহ সূত্রে। বস্তুত হাদীছের এই অংশটি বুখারী শরীফে প্রদত্ত হাদীছের অনুরূপ। ইহাতে বলা হইয়াছে যে, মহানবী প্রথমদিকে কিছু দিন সুস্বপ্ন (অথবা সত্য) দেখিতেন এবং ইহার পর তাঁহার নিকট নির্জনতা এতই পছন্দনীয় হইয়া উঠে যে, ইহার চাইতে আর কিছুই তাঁহার নিকট অধিকতর প্রিয় ছিল না। তাঁহার পর হেরা পর্বতের গুহায় একটানা কয়েক দিন ধরিয়া তাহানুছে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। খাবার সংগ্রহের জন্য তিনি মাঝে মাঝে পরিবারের নিকট ফিরিয়া আসিতেন যাহাতে গুহায় নির্জনবাস করা সম্ভবপর হয়। তাঁহার নিকট সত্য না আসা পর্যন্ত এইভাবে তাঁহার গুহাবাস চলিতে থাকে। ২৭
'(২) এই বিষয়ে আল-ওয়াকিদী আরেকটি হাদীছের অবতারণা করেন, যাহা তিনি ইবরাহীম ইন্ন ইসমা'ঈলের মাধ্যমে সংগ্রহ করেন। হাদীছটি ইবরাহীম ইন্ন ইসমাঈ'ল পান দাউদ ইবনুল হুসায়ন হইতে। ইহার পর ইহা ধারাবাহিকভাবে 'ইকরিমা এবং ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে সংগৃহীত হয়। বলা হইয়া থাকে যে, ইব্ন আব্বাসের বর্ণনামতে মহানবী আজয়াদে যখন ঐরূপ অবস্থায় (অর্থাৎ সম্ভবত ওহী । প্রাপ্তির পরবর্তী) ছিলেন তখন আকাশের দিগন্তে একজন ফেরেশতাকে এক পায়ের উপর আরেক পা আড়াআড়িভাবে রাখিয়া বসা অবস্থা দেখিতে পান। তিনি নাম ধরিয়া তাঁহাকে ডাকিতেছেন এবং নিজকে জিবরাঈল বলিয়া পরিচয় দিতেছেন। এই দৃশ্য দেখিয়া মহানবী ভীত হইয়া পড়েন এবং আকাশের অন্যান্য দিকে তাকাইতে থাকেন। কিন্তু তিনি যে দিকেই দৃষ্টিপাত করেন সেই দিকেই এই ফেরেশতাকে দেখিতে পান। এই কারণে মহানবী দ্রুত বাড়ী ফিরিয়া খাদীজা (রা)-এর নিকট গেলেন এবং নিজের আশংকার
কথা ব্যক্ত করিলেন। তিনি হয়ত একজন ভবিষ্যৎবক্তা হিসাবে পরিগণিত হইতে পারেন যাহা তিনি সবচাইতে বেশি অপছন্দ করেন। মেধা ও মননের যে গুণাবলী তাঁহার রহিয়াছে তাহা উল্লেখ করিয়া খাদীজা (রা) তাঁহাকে সান্ত্বনা দিলেন। তারপর তিনি ওয়ারাকার নিকট গিয়া সমস্ত ঘটনা বিবৃত করেন। ওয়ারাকা বলেন যে, ইনি হইতেছেন মহান নামূস যিনি তাঁহার স্বামীর নিকট উপস্থিত হইয়াছেন এবং ইহা তাঁহার নবুওয়াত প্রাপ্তির প্রারম্ভিক পর্যায় বলিয়া তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন যে, তাঁহার স্বামীর ভাল ব্যতীত অন্য কিছু চিন্তার প্রয়োজন নাই। ২৮
৩. আল-ওয়াকিদী পরবর্তীতে অন্য দুইটি বিবরণী পরপর উপস্থাপন করিয়াছেন। তিনি ইহা ভিন্ন ভিন্ন ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের নিকট হইতে গ্রহণ করেন। এই দুইটি বিবরণীই উল্লেখ করে যে, মহানবী কখনও কখনও জ্যোতি দেখিতেন ও শব্দ শুনিতেন এবং স্ত্রীর নিকট তাঁহার ভীত হওয়ার কথা প্রকাশ করিয়া আশঙ্কা করিতেন যে, তিনি সম্ভবত কোন ভবিষ্যৎবক্তা আখ্যায়িত হইতে পারেন। খাদীজা (রা) তাঁহার মহৎ গুণাবলীর উল্লেখ করিয়া তাঁহাকে সান্ত্বনা প্রদান করিতেন। এই বিবরণীর একটিতে উল্লেখ করা হয় যে, তিনি হয়ত পাগল হইয়া যাইতে পারেন—এইরূপ ভীতির কথা তাঁহার স্ত্রীর নিকট প্রকাশ করেন। ইহা শুনিয়া খাদীজা (রা) ওয়ারাকার নিকট গমন করিলে তিনি বলেন যে, তাহার স্বামীর নিকট যিনি আবির্ভূত হইয়াছেন তিনি হইতেছেন 'নামূস' এবং তাহার স্বামী নবী হইবেন। ওয়ারাকা যদি সেই সময় পর্যন্ত জীবিত থাকেন তাহা হইলে তিনি তাঁহার স্বামীকে সাহায্য করিবেন। ২৯
৪. ইহার পর ওয়াকিদী তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সূত্র হইতে সংগৃহীত তিনটি পৃথক হাদীছ পেশ করেন। ইহাদের দুইটির বিবরণ এইরূপ: প্রথম যে বিষয়টি মহানবী এর নিকট প্রকাশিত হয় তাহা ছিল সূরা 'আলাক-এর প্রথম পাঁচটি আয়াত। আল-ওয়াকিদী উল্লেখ করেন যে, হেরা পর্বতের গুহায় প্রথম ওহী নাযিলের দিন ইহা সংঘটিত হয়। ৩০ তৃতীয় হাদীছটি দাউদ ইবনুল হুসায়ন-এর নিকট হইতে প্রাপ্ত হন। তিনি গাতাফান ইব্ন তারীফ-এর নিকট হইতে এবং গাতফান ইবন আব্বাসের নিকট হইতে হাদীছটি সংগ্রহ করেন। হাদীছটি এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে: হেরার গুহায় প্রথম ওহী নাযিল হওয়ার পর মহানবী বেশ কয়েক দিন জিবরাঈল (আ)-কে দেখিতে পান নাই। এই কারণে তিনি বিষন্ন হইয়া পড়েন এবং নিজকে পর্বতের উপর হইতে নিচে নিক্ষেপ করিবার উদ্দেশ্যে বারবার ছাবীর ও হেরা পর্বতে গমন করেন। একবার তিনি যখন কোন একটি পর্বতে যাইতেছিলেন তখন তিনি আকাশ হইতে একটি কণ্ঠস্বর শুনিতে পান। তিনি আকাশের দিকে তাকাইলে জিবরাঈল (আ)-কে একটি চেয়ারে এক পা আরেক পায়ের উপর আড়াআড়িভাবে রাখিয়া বসিয় থাকিতে দেখেনে। তিনি তাঁহাকে আহ্বান করিয়া বলিতেছেন, “হে মুহাম্মাদ! আপনি সত্যই আল্লাহ্র রাসূল এবং আমি জিবরাঈল"। মহানবী তখন সে স্থান ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলেন এবং তাঁহার মন শান্ত হইল। ইহার পর হইতে কোন বিরতি ছাড়া নিয়মিত ওহী নাযিল হইতে থাকে। ৩১
এখন নির্ভরযোগ্য পণ্ডিতবর্গ আল-ওয়াকিদীর বিশ্বাসযোগ্যতাকে খুব নিম্ন পর্যায়ের বলিয়া রায় দিয়াছেন। কিন্তু কোনরূপ প্রশ্ন উত্থাপন ব্যতিরেকে এই হাদীছে যেসব বিষয় বর্ণিত হইয়াছে তাহা নিচে ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা যাইতে পারে।
প্রথমত, ইহা বলা হইয়া থাকে যে, প্রকৃত স্বপ্নের একটি প্রাথমিক পর্যায় ছিল সত্য স্বপ্ন এবং যাহার পরে মহানবী নির্জনে কালাতিপাত করিতে পছন্দ করিতে শুরু করেন।
দ্বিতীয়ত, উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মহানবী একটানা বেশ কিছুদিন হেরা গুহায় নির্জনে সময় অতিবাহিত করিতেন এবং খাবার-দাবার সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পরিবারের নিকট প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করিতেন। এই হাদীছে ইহার উল্লেখ নাই যে, মহানবী-এর পক্ষে এই তাহানুছ পালন কুরায়শদের সামাজিক প্রথার অনুকরণ ছিল এবং ইহাতে এমন কোন ইঙ্গিত নাই যে, মহানবী-এর পরিবার তাঁহার সহিত পাহাড়ে গিয়াছিলেন।
তৃতীয়ত, ইহা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে, হেরা পর্বতের গুহাতেই প্রথম ওহী নাযিল হয় এবং এই ওহীতে সূরা 'আলাক-এর প্রথম পাঁচটি আয়াত অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফেরেশতা কিভাবে হেরা গুহায় উপস্থিত হইলেন এবং কুরআনের প্রথম পাঠ শুনাইলেন তাহার বিস্তারিত বিবরণের কোন উল্লেখ নাই। একই সাথে এমন কোন ইঙ্গিত দেওয়া হয় নাই যে, মহানবী -এর নিদ্রিত অবস্থায় (স্বপ্নযোগে) এই ঘটনাটি সংঘটিত হইয়াছিল।
চতুর্থত, আল-ওয়াকিদীর একটি হাদীছের বর্ণনানুযায়ী দিগন্তে ফেরেশতা জিবরাঈল (আ)-কে দেখিতে পাওয়ার প্রসঙ্গে বলা হইয়াছে যে, ইহা আজয়াদে ঘটে। পক্ষান্তরে তাঁহার আরেকটি বর্ণনায় উল্লেখ রহিয়াছে যে, মহানবী-এর ছাবীর ও হেরা পর্বতে বারবার যাতায়াতকালে ইহা ঘটিয়াছিল। প্রথম ওহী নাযিলের পর বেশ কিছু দিন ফেরেশতার আবির্ভাব না ঘটায় মহানবী বারংবার পর্বত দুইটিতে আসা-যাওয়া করিতেন। এই তথ্যটি ওহী অবতীর্ণ হওয়ার বিরতির সত্যকে সমর্থন করে।
পঞ্চমত, মহানবী-এর পর্বতের উপর হইতে নিচে নিজকে নিক্ষেপ করিবার কথিত অভিপ্রায় প্রসঙ্গে অভ্রান্তভাবে ইহা দেখা যায় যে, বর্ণনাকারীর ইহা ছিল অনুমানমাত্র এবং এই ক্ষেত্রে তাহা হয় ইব্ন আব্বাসের অথবা তাঁহার পরবর্তী অন্য কোন বর্ণনাকারীর হইতে পারে।
ষষ্ঠত, ওয়ারাকার সহিত আলোচনার প্রসঙ্গে আল-ওয়াকিদীর একটি হাদীছ মোতাবেক বর্ণিত আজয়াদে ফেরেশতাকে দেখিবার পর এই ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল। পক্ষান্তরে অন্য হাদীছ মতে মহানবী-এর কখনও কখনও জ্যোতি দেখিতে ও শব্দ শুনিতে পাওয়ার পর ইহা ঘটিয়াছিল। এই দুইটি শেষ পয়েন্ট (অর্থাৎ পঞ্চম ও ষষ্ঠ) ব্যতিরেকে আল-ওয়াকিদী যেভাবে তথ্য উপস্থাপন করিয়াছেন উহার আয়েশা (রা) কর্তৃক বর্ণিত ও বুখারী শরীফে লিপিবদ্ধ বর্ণনার সহিত সামঞ্জস্য রহিয়াছে।
টিকাঃ
২৭. ইবন সা'দ, ১খ., পৃ. ১৯৪.
২৮. ঐ, পৃ. ১৯৪ ১৯৫.
২৯. ঐ, পৃ. ১৯৫.
৩০. ঐ, পৃ. ১৯৬.
৩১. ঐ.
সময়ের প্রেক্ষিতে পরবর্তী বর্ণনা হইতেছে আল-ওয়াকিদীর (মুহাম্মাদ ইবন 'উমার (১২০-২০৭ হি.) যাহা তাঁহার সচিব মুহাম্মাদ ইবন সা'দ (১৬৮-২৩০ হি.)-এর মাধ্যমে আসিয়াছে।
১. আল-ওয়াকিদী বুখারী শরীফে উল্লিখিত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনার প্রথম দিকের অংশবিশেষ প্রথমে উদ্ধৃত করেন, তবে ভিন্ন সনদে অর্থাৎ মা'মার ইবন রাশিদ ও মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল্লাহ সূত্রে। বস্তুত হাদীছের এই অংশটি বুখারী শরীফে প্রদত্ত হাদীছের অনুরূপ। ইহাতে বলা হইয়াছে যে, মহানবী প্রথমদিকে কিছু দিন সুস্বপ্ন (অথবা সত্য) দেখিতেন এবং ইহার পর তাঁহার নিকট নির্জনতা এতই পছন্দনীয় হইয়া উঠে যে, ইহার চাইতে আর কিছুই তাঁহার নিকট অধিকতর প্রিয় ছিল না। তাঁহার পর হেরা পর্বতের গুহায় একটানা কয়েক দিন ধরিয়া তাহানুছে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। খাবার সংগ্রহের জন্য তিনি মাঝে মাঝে পরিবারের নিকট ফিরিয়া আসিতেন যাহাতে গুহায় নির্জনবাস করা সম্ভবপর হয়। তাঁহার নিকট সত্য না আসা পর্যন্ত এইভাবে তাঁহার গুহাবাস চলিতে থাকে। ২৭
'(২) এই বিষয়ে আল-ওয়াকিদী আরেকটি হাদীছের অবতারণা করেন, যাহা তিনি ইবরাহীম ইন্ন ইসমা'ঈলের মাধ্যমে সংগ্রহ করেন। হাদীছটি ইবরাহীম ইন্ন ইসমাঈ'ল পান দাউদ ইবনুল হুসায়ন হইতে। ইহার পর ইহা ধারাবাহিকভাবে 'ইকরিমা এবং ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে সংগৃহীত হয়। বলা হইয়া থাকে যে, ইব্ন আব্বাসের বর্ণনামতে মহানবী আজয়াদে যখন ঐরূপ অবস্থায় (অর্থাৎ সম্ভবত ওহী । প্রাপ্তির পরবর্তী) ছিলেন তখন আকাশের দিগন্তে একজন ফেরেশতাকে এক পায়ের উপর আরেক পা আড়াআড়িভাবে রাখিয়া বসা অবস্থা দেখিতে পান। তিনি নাম ধরিয়া তাঁহাকে ডাকিতেছেন এবং নিজকে জিবরাঈল বলিয়া পরিচয় দিতেছেন। এই দৃশ্য দেখিয়া মহানবী ভীত হইয়া পড়েন এবং আকাশের অন্যান্য দিকে তাকাইতে থাকেন। কিন্তু তিনি যে দিকেই দৃষ্টিপাত করেন সেই দিকেই এই ফেরেশতাকে দেখিতে পান। এই কারণে মহানবী দ্রুত বাড়ী ফিরিয়া খাদীজা (রা)-এর নিকট গেলেন এবং নিজের আশংকার
কথা ব্যক্ত করিলেন। তিনি হয়ত একজন ভবিষ্যৎবক্তা হিসাবে পরিগণিত হইতে পারেন যাহা তিনি সবচাইতে বেশি অপছন্দ করেন। মেধা ও মননের যে গুণাবলী তাঁহার রহিয়াছে তাহা উল্লেখ করিয়া খাদীজা (রা) তাঁহাকে সান্ত্বনা দিলেন। তারপর তিনি ওয়ারাকার নিকট গিয়া সমস্ত ঘটনা বিবৃত করেন। ওয়ারাকা বলেন যে, ইনি হইতেছেন মহান নামূস যিনি তাঁহার স্বামীর নিকট উপস্থিত হইয়াছেন এবং ইহা তাঁহার নবুওয়াত প্রাপ্তির প্রারম্ভিক পর্যায় বলিয়া তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন যে, তাঁহার স্বামীর ভাল ব্যতীত অন্য কিছু চিন্তার প্রয়োজন নাই। ২৮
৩. আল-ওয়াকিদী পরবর্তীতে অন্য দুইটি বিবরণী পরপর উপস্থাপন করিয়াছেন। তিনি ইহা ভিন্ন ভিন্ন ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের নিকট হইতে গ্রহণ করেন। এই দুইটি বিবরণীই উল্লেখ করে যে, মহানবী কখনও কখনও জ্যোতি দেখিতেন ও শব্দ শুনিতেন এবং স্ত্রীর নিকট তাঁহার ভীত হওয়ার কথা প্রকাশ করিয়া আশঙ্কা করিতেন যে, তিনি সম্ভবত কোন ভবিষ্যৎবক্তা আখ্যায়িত হইতে পারেন। খাদীজা (রা) তাঁহার মহৎ গুণাবলীর উল্লেখ করিয়া তাঁহাকে সান্ত্বনা প্রদান করিতেন। এই বিবরণীর একটিতে উল্লেখ করা হয় যে, তিনি হয়ত পাগল হইয়া যাইতে পারেন—এইরূপ ভীতির কথা তাঁহার স্ত্রীর নিকট প্রকাশ করেন। ইহা শুনিয়া খাদীজা (রা) ওয়ারাকার নিকট গমন করিলে তিনি বলেন যে, তাহার স্বামীর নিকট যিনি আবির্ভূত হইয়াছেন তিনি হইতেছেন 'নামূস' এবং তাহার স্বামী নবী হইবেন। ওয়ারাকা যদি সেই সময় পর্যন্ত জীবিত থাকেন তাহা হইলে তিনি তাঁহার স্বামীকে সাহায্য করিবেন। ২৯
৪. ইহার পর ওয়াকিদী তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সূত্র হইতে সংগৃহীত তিনটি পৃথক হাদীছ পেশ করেন। ইহাদের দুইটির বিবরণ এইরূপ: প্রথম যে বিষয়টি মহানবী এর নিকট প্রকাশিত হয় তাহা ছিল সূরা 'আলাক-এর প্রথম পাঁচটি আয়াত। আল-ওয়াকিদী উল্লেখ করেন যে, হেরা পর্বতের গুহায় প্রথম ওহী নাযিলের দিন ইহা সংঘটিত হয়। ৩০ তৃতীয় হাদীছটি দাউদ ইবনুল হুসায়ন-এর নিকট হইতে প্রাপ্ত হন। তিনি গাতাফান ইব্ন তারীফ-এর নিকট হইতে এবং গাতফান ইবন আব্বাসের নিকট হইতে হাদীছটি সংগ্রহ করেন। হাদীছটি এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে: হেরার গুহায় প্রথম ওহী নাযিল হওয়ার পর মহানবী বেশ কয়েক দিন জিবরাঈল (আ)-কে দেখিতে পান নাই। এই কারণে তিনি বিষন্ন হইয়া পড়েন এবং নিজকে পর্বতের উপর হইতে নিচে নিক্ষেপ করিবার উদ্দেশ্যে বারবার ছাবীর ও হেরা পর্বতে গমন করেন। একবার তিনি যখন কোন একটি পর্বতে যাইতেছিলেন তখন তিনি আকাশ হইতে একটি কণ্ঠস্বর শুনিতে পান। তিনি আকাশের দিকে তাকাইলে জিবরাঈল (আ)-কে একটি চেয়ারে এক পা আরেক পায়ের উপর আড়াআড়িভাবে রাখিয়া বসিয় থাকিতে দেখেনে। তিনি তাঁহাকে আহ্বান করিয়া বলিতেছেন, “হে মুহাম্মাদ! আপনি সত্যই আল্লাহ্র রাসূল এবং আমি জিবরাঈল"। মহানবী তখন সে স্থান ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলেন এবং তাঁহার মন শান্ত হইল। ইহার পর হইতে কোন বিরতি ছাড়া নিয়মিত ওহী নাযিল হইতে থাকে। ৩১
এখন নির্ভরযোগ্য পণ্ডিতবর্গ আল-ওয়াকিদীর বিশ্বাসযোগ্যতাকে খুব নিম্ন পর্যায়ের বলিয়া রায় দিয়াছেন। কিন্তু কোনরূপ প্রশ্ন উত্থাপন ব্যতিরেকে এই হাদীছে যেসব বিষয় বর্ণিত হইয়াছে তাহা নিচে ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা যাইতে পারে।
প্রথমত, ইহা বলা হইয়া থাকে যে, প্রকৃত স্বপ্নের একটি প্রাথমিক পর্যায় ছিল সত্য স্বপ্ন এবং যাহার পরে মহানবী নির্জনে কালাতিপাত করিতে পছন্দ করিতে শুরু করেন।
দ্বিতীয়ত, উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মহানবী একটানা বেশ কিছুদিন হেরা গুহায় নির্জনে সময় অতিবাহিত করিতেন এবং খাবার-দাবার সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পরিবারের নিকট প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করিতেন। এই হাদীছে ইহার উল্লেখ নাই যে, মহানবী-এর পক্ষে এই তাহানুছ পালন কুরায়শদের সামাজিক প্রথার অনুকরণ ছিল এবং ইহাতে এমন কোন ইঙ্গিত নাই যে, মহানবী-এর পরিবার তাঁহার সহিত পাহাড়ে গিয়াছিলেন।
তৃতীয়ত, ইহা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে, হেরা পর্বতের গুহাতেই প্রথম ওহী নাযিল হয় এবং এই ওহীতে সূরা 'আলাক-এর প্রথম পাঁচটি আয়াত অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফেরেশতা কিভাবে হেরা গুহায় উপস্থিত হইলেন এবং কুরআনের প্রথম পাঠ শুনাইলেন তাহার বিস্তারিত বিবরণের কোন উল্লেখ নাই। একই সাথে এমন কোন ইঙ্গিত দেওয়া হয় নাই যে, মহানবী -এর নিদ্রিত অবস্থায় (স্বপ্নযোগে) এই ঘটনাটি সংঘটিত হইয়াছিল।
চতুর্থত, আল-ওয়াকিদীর একটি হাদীছের বর্ণনানুযায়ী দিগন্তে ফেরেশতা জিবরাঈল (আ)-কে দেখিতে পাওয়ার প্রসঙ্গে বলা হইয়াছে যে, ইহা আজয়াদে ঘটে। পক্ষান্তরে তাঁহার আরেকটি বর্ণনায় উল্লেখ রহিয়াছে যে, মহানবী-এর ছাবীর ও হেরা পর্বতে বারবার যাতায়াতকালে ইহা ঘটিয়াছিল। প্রথম ওহী নাযিলের পর বেশ কিছু দিন ফেরেশতার আবির্ভাব না ঘটায় মহানবী বারংবার পর্বত দুইটিতে আসা-যাওয়া করিতেন। এই তথ্যটি ওহী অবতীর্ণ হওয়ার বিরতির সত্যকে সমর্থন করে।
পঞ্চমত, মহানবী-এর পর্বতের উপর হইতে নিচে নিজকে নিক্ষেপ করিবার কথিত অভিপ্রায় প্রসঙ্গে অভ্রান্তভাবে ইহা দেখা যায় যে, বর্ণনাকারীর ইহা ছিল অনুমানমাত্র এবং এই ক্ষেত্রে তাহা হয় ইব্ন আব্বাসের অথবা তাঁহার পরবর্তী অন্য কোন বর্ণনাকারীর হইতে পারে।
ষষ্ঠত, ওয়ারাকার সহিত আলোচনার প্রসঙ্গে আল-ওয়াকিদীর একটি হাদীছ মোতাবেক বর্ণিত আজয়াদে ফেরেশতাকে দেখিবার পর এই ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল। পক্ষান্তরে অন্য হাদীছ মতে মহানবী-এর কখনও কখনও জ্যোতি দেখিতে ও শব্দ শুনিতে পাওয়ার পর ইহা ঘটিয়াছিল। এই দুইটি শেষ পয়েন্ট (অর্থাৎ পঞ্চম ও ষষ্ঠ) ব্যতিরেকে আল-ওয়াকিদী যেভাবে তথ্য উপস্থাপন করিয়াছেন উহার আয়েশা (রা) কর্তৃক বর্ণিত ও বুখারী শরীফে লিপিবদ্ধ বর্ণনার সহিত সামঞ্জস্য রহিয়াছে।
সময়ের প্রেক্ষিতে পরবর্তী বর্ণনা হইতেছে আল-ওয়াকিদীর (মুহাম্মাদ ইবন 'উমার (১২০-২০৭ হি.) যাহা তাঁহার সচিব মুহাম্মাদ ইবন সা'দ (১৬৮-২৩০ হি.)-এর মাধ্যমে আসিয়াছে।
১. আল-ওয়াকিদী বুখারী শরীফে উল্লিখিত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনার প্রথম দিকের অংশবিশেষ প্রথমে উদ্ধৃত করেন, তবে ভিন্ন সনদে অর্থাৎ মা'মার ইবন রাশিদ ও মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল্লাহ সূত্রে। বস্তুত হাদীছের এই অংশটি বুখারী শরীফে প্রদত্ত হাদীছের অনুরূপ। ইহাতে বলা হইয়াছে যে, মহানবী প্রথমদিকে কিছু দিন সুস্বপ্ন (অথবা সত্য) দেখিতেন এবং ইহার পর তাঁহার নিকট নির্জনতা এতই পছন্দনীয় হইয়া উঠে যে, ইহার চাইতে আর কিছুই তাঁহার নিকট অধিকতর প্রিয় ছিল না। তাঁহার পর হেরা পর্বতের গুহায় একটানা কয়েক দিন ধরিয়া তাহানুছে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। খাবার সংগ্রহের জন্য তিনি মাঝে মাঝে পরিবারের নিকট ফিরিয়া আসিতেন যাহাতে গুহায় নির্জনবাস করা সম্ভবপর হয়। তাঁহার নিকট সত্য না আসা পর্যন্ত এইভাবে তাঁহার গুহাবাস চলিতে থাকে। ২৭
'(২) এই বিষয়ে আল-ওয়াকিদী আরেকটি হাদীছের অবতারণা করেন, যাহা তিনি ইবরাহীম ইন্ন ইসমা'ঈলের মাধ্যমে সংগ্রহ করেন। হাদীছটি ইবরাহীম ইন্ন ইসমাঈ'ল পান দাউদ ইবনুল হুসায়ন হইতে। ইহার পর ইহা ধারাবাহিকভাবে 'ইকরিমা এবং ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে সংগৃহীত হয়। বলা হইয়া থাকে যে, ইব্ন আব্বাসের বর্ণনামতে মহানবী আজয়াদে যখন ঐরূপ অবস্থায় (অর্থাৎ সম্ভবত ওহী । প্রাপ্তির পরবর্তী) ছিলেন তখন আকাশের দিগন্তে একজন ফেরেশতাকে এক পায়ের উপর আরেক পা আড়াআড়িভাবে রাখিয়া বসা অবস্থা দেখিতে পান। তিনি নাম ধরিয়া তাঁহাকে ডাকিতেছেন এবং নিজকে জিবরাঈল বলিয়া পরিচয় দিতেছেন। এই দৃশ্য দেখিয়া মহানবী ভীত হইয়া পড়েন এবং আকাশের অন্যান্য দিকে তাকাইতে থাকেন। কিন্তু তিনি যে দিকেই দৃষ্টিপাত করেন সেই দিকেই এই ফেরেশতাকে দেখিতে পান। এই কারণে মহানবী দ্রুত বাড়ী ফিরিয়া খাদীজা (রা)-এর নিকট গেলেন এবং নিজের আশংকার
কথা ব্যক্ত করিলেন। তিনি হয়ত একজন ভবিষ্যৎবক্তা হিসাবে পরিগণিত হইতে পারেন যাহা তিনি সবচাইতে বেশি অপছন্দ করেন। মেধা ও মননের যে গুণাবলী তাঁহার রহিয়াছে তাহা উল্লেখ করিয়া খাদীজা (রা) তাঁহাকে সান্ত্বনা দিলেন। তারপর তিনি ওয়ারাকার নিকট গিয়া সমস্ত ঘটনা বিবৃত করেন। ওয়ারাকা বলেন যে, ইনি হইতেছেন মহান নামূস যিনি তাঁহার স্বামীর নিকট উপস্থিত হইয়াছেন এবং ইহা তাঁহার নবুওয়াত প্রাপ্তির প্রারম্ভিক পর্যায় বলিয়া তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন যে, তাঁহার স্বামীর ভাল ব্যতীত অন্য কিছু চিন্তার প্রয়োজন নাই। ২৮
৩. আল-ওয়াকিদী পরবর্তীতে অন্য দুইটি বিবরণী পরপর উপস্থাপন করিয়াছেন। তিনি ইহা ভিন্ন ভিন্ন ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের নিকট হইতে গ্রহণ করেন। এই দুইটি বিবরণীই উল্লেখ করে যে, মহানবী কখনও কখনও জ্যোতি দেখিতেন ও শব্দ শুনিতেন এবং স্ত্রীর নিকট তাঁহার ভীত হওয়ার কথা প্রকাশ করিয়া আশঙ্কা করিতেন যে, তিনি সম্ভবত কোন ভবিষ্যৎবক্তা আখ্যায়িত হইতে পারেন। খাদীজা (রা) তাঁহার মহৎ গুণাবলীর উল্লেখ করিয়া তাঁহাকে সান্ত্বনা প্রদান করিতেন। এই বিবরণীর একটিতে উল্লেখ করা হয় যে, তিনি হয়ত পাগল হইয়া যাইতে পারেন—এইরূপ ভীতির কথা তাঁহার স্ত্রীর নিকট প্রকাশ করেন। ইহা শুনিয়া খাদীজা (রা) ওয়ারাকার নিকট গমন করিলে তিনি বলেন যে, তাহার স্বামীর নিকট যিনি আবির্ভূত হইয়াছেন তিনি হইতেছেন 'নামূস' এবং তাহার স্বামী নবী হইবেন। ওয়ারাকা যদি সেই সময় পর্যন্ত জীবিত থাকেন তাহা হইলে তিনি তাঁহার স্বামীকে সাহায্য করিবেন। ২৯
৪. ইহার পর ওয়াকিদী তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সূত্র হইতে সংগৃহীত তিনটি পৃথক হাদীছ পেশ করেন। ইহাদের দুইটির বিবরণ এইরূপ: প্রথম যে বিষয়টি মহানবী এর নিকট প্রকাশিত হয় তাহা ছিল সূরা 'আলাক-এর প্রথম পাঁচটি আয়াত। আল-ওয়াকিদী উল্লেখ করেন যে, হেরা পর্বতের গুহায় প্রথম ওহী নাযিলের দিন ইহা সংঘটিত হয়। ৩০ তৃতীয় হাদীছটি দাউদ ইবনুল হুসায়ন-এর নিকট হইতে প্রাপ্ত হন। তিনি গাতাফান ইব্ন তারীফ-এর নিকট হইতে এবং গাতফান ইবন আব্বাসের নিকট হইতে হাদীছটি সংগ্রহ করেন। হাদীছটি এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে: হেরার গুহায় প্রথম ওহী নাযিল হওয়ার পর মহানবী বেশ কয়েক দিন জিবরাঈল (আ)-কে দেখিতে পান নাই। এই কারণে তিনি বিষন্ন হইয়া পড়েন এবং নিজকে পর্বতের উপর হইতে নিচে নিক্ষেপ করিবার উদ্দেশ্যে বারবার ছাবীর ও হেরা পর্বতে গমন করেন। একবার তিনি যখন কোন একটি পর্বতে যাইতেছিলেন তখন তিনি আকাশ হইতে একটি কণ্ঠস্বর শুনিতে পান। তিনি আকাশের দিকে তাকাইলে জিবরাঈল (আ)-কে একটি চেয়ারে এক পা আরেক পায়ের উপর আড়াআড়িভাবে রাখিয়া বসিয় থাকিতে দেখেনে। তিনি তাঁহাকে আহ্বান করিয়া বলিতেছেন, “হে মুহাম্মাদ! আপনি সত্যই আল্লাহ্র রাসূল এবং আমি জিবরাঈল"। মহানবী তখন সে স্থান ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলেন এবং তাঁহার মন শান্ত হইল। ইহার পর হইতে কোন বিরতি ছাড়া নিয়মিত ওহী নাযিল হইতে থাকে। ৩১
এখন নির্ভরযোগ্য পণ্ডিতবর্গ আল-ওয়াকিদীর বিশ্বাসযোগ্যতাকে খুব নিম্ন পর্যায়ের বলিয়া রায় দিয়াছেন। কিন্তু কোনরূপ প্রশ্ন উত্থাপন ব্যতিরেকে এই হাদীছে যেসব বিষয় বর্ণিত হইয়াছে তাহা নিচে ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা যাইতে পারে।
প্রথমত, ইহা বলা হইয়া থাকে যে, প্রকৃত স্বপ্নের একটি প্রাথমিক পর্যায় ছিল সত্য স্বপ্ন এবং যাহার পরে মহানবী নির্জনে কালাতিপাত করিতে পছন্দ করিতে শুরু করেন।
দ্বিতীয়ত, উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মহানবী একটানা বেশ কিছুদিন হেরা গুহায় নির্জনে সময় অতিবাহিত করিতেন এবং খাবার-দাবার সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পরিবারের নিকট প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করিতেন। এই হাদীছে ইহার উল্লেখ নাই যে, মহানবী-এর পক্ষে এই তাহানুছ পালন কুরায়শদের সামাজিক প্রথার অনুকরণ ছিল এবং ইহাতে এমন কোন ইঙ্গিত নাই যে, মহানবী-এর পরিবার তাঁহার সহিত পাহাড়ে গিয়াছিলেন।
তৃতীয়ত, ইহা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে, হেরা পর্বতের গুহাতেই প্রথম ওহী নাযিল হয় এবং এই ওহীতে সূরা 'আলাক-এর প্রথম পাঁচটি আয়াত অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফেরেশতা কিভাবে হেরা গুহায় উপস্থিত হইলেন এবং কুরআনের প্রথম পাঠ শুনাইলেন তাহার বিস্তারিত বিবরণের কোন উল্লেখ নাই। একই সাথে এমন কোন ইঙ্গিত দেওয়া হয় নাই যে, মহানবী -এর নিদ্রিত অবস্থায় (স্বপ্নযোগে) এই ঘটনাটি সংঘটিত হইয়াছিল।
চতুর্থত, আল-ওয়াকিদীর একটি হাদীছের বর্ণনানুযায়ী দিগন্তে ফেরেশতা জিবরাঈল (আ)-কে দেখিতে পাওয়ার প্রসঙ্গে বলা হইয়াছে যে, ইহা আজয়াদে ঘটে। পক্ষান্তরে তাঁহার আরেকটি বর্ণনায় উল্লেখ রহিয়াছে যে, মহানবী-এর ছাবীর ও হেরা পর্বতে বারবার যাতায়াতকালে ইহা ঘটিয়াছিল। প্রথম ওহী নাযিলের পর বেশ কিছু দিন ফেরেশতার আবির্ভাব না ঘটায় মহানবী বারংবার পর্বত দুইটিতে আসা-যাওয়া করিতেন। এই তথ্যটি ওহী অবতীর্ণ হওয়ার বিরতির সত্যকে সমর্থন করে।
পঞ্চমত, মহানবী-এর পর্বতের উপর হইতে নিচে নিজকে নিক্ষেপ করিবার কথিত অভিপ্রায় প্রসঙ্গে অভ্রান্তভাবে ইহা দেখা যায় যে, বর্ণনাকারীর ইহা ছিল অনুমানমাত্র এবং এই ক্ষেত্রে তাহা হয় ইব্ন আব্বাসের অথবা তাঁহার পরবর্তী অন্য কোন বর্ণনাকারীর হইতে পারে।
ষষ্ঠত, ওয়ারাকার সহিত আলোচনার প্রসঙ্গে আল-ওয়াকিদীর একটি হাদীছ মোতাবেক বর্ণিত আজয়াদে ফেরেশতাকে দেখিবার পর এই ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল। পক্ষান্তরে অন্য হাদীছ মতে মহানবী-এর কখনও কখনও জ্যোতি দেখিতে ও শব্দ শুনিতে পাওয়ার পর ইহা ঘটিয়াছিল। এই দুইটি শেষ পয়েন্ট (অর্থাৎ পঞ্চম ও ষষ্ঠ) ব্যতিরেকে আল-ওয়াকিদী যেভাবে তথ্য উপস্থাপন করিয়াছেন উহার আয়েশা (রা) কর্তৃক বর্ণিত ও বুখারী শরীফে লিপিবদ্ধ বর্ণনার সহিত সামঞ্জস্য রহিয়াছে।
📄 চার: আত-তাবারীর বর্ণনা
আল-ওয়াকিদীর রচনার এক শত বৎসরের ও অধিক কাল পরে আত্-তাবারী (২২৪-৩১০ হি.) ইবন ইসহাকের বিবরণী পুনরোল্লেখ করেন যাহা উপরে উল্লেখ করা হইয়াছে। পুনরোল্লেখের সময় শব্দের ঈষৎ পরিবর্তন এবং মূল পাঠের সামান্য সংযোজন ও বিয়োজন করা হয়। অন্যথায় তাহার নাম উল্লেখসহ যথাসাধ্য মূল পাঠের কাছাকাছি থাকিয়াছেন। ৩২ ইবন ইসহাকের বিবরণীর উপর তাহার বর্ণনা প্রকাশ করিবার পূর্বে আত্-তাবারী যাহা হউক ঘটনাটির আর একটি বিবরণ উপস্থাপন করিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি জানান যে, তিনি ইহা আহমাদ ইবন 'উছমান (আবূ জাওরা')-এর নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছেন। হাদীছটি সংগ্রহের পরম্পরা হইতেছে : ওয়াহব ইবন জারীর হইতে আহমাদ ইবন 'উছমান, ওয়াহ্হ্ ইবন জারীর তাহার পিতা জারীর হইতে, জারীর নু'মান ইব্ন রাশেদ হইতে, রাশেদ আয-যুহরী হইতে, তিনি 'উরওয়া হইতে, আর 'উরওয়া আয়েশা (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। ইবন ইসহাকের বিবরণী হইতে এই বিবরণীকে এরূপ তথ্য দ্বারা পৃথকভাবে চিহ্নিত করা যায় যে, পরবর্তী ব্যক্তির বিবরণীর সূত্র যেখানে উবায়দ ইব্ন উমার পর্যন্ত গিয়া শেষ হইয়াছে তাহা হইলে তাহা মুরসাল বলিয়া পরিগণিত হইবে। আত্-তাবারীর হাদীছটি আয-যুহরী ও 'উরওয়া-এর মাধ্যমে আয়েশা (রা) পর্যন্ত সম্প্রসারিত হইয়াছে। এই হাদীছের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ:
(ক) হাদীছের প্রথম অংশে বর্ণিত তথ্যসমূহ বুখারী শরীফে উল্লিখিত হাদীছের তথ্যের সহিত অবিকল মিল রহিয়াছে। যেমন : সত্য ও উত্তম স্বপ্ন দোখিবার প্রারম্ভিক কাল, ইহার পর মহানবী -এর নির্জনবাসের প্রতি অনুরাগ, তাঁহার একাকী ইবাদত এবং হেরার গুহায় একটানা কয়েক দিন ধরিয়া তাঁহার অবস্থান, গুহায় একাকী অবস্থানের উদ্দেশ্যে পরিবারের নিকট হইতে মাঝে মাঝে খাবার সংগ্রহের জন্য আগমন এবং তাঁহার নিকট সত্য উদ্ভাসিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁহার এই সকল কার্যক্রম। এই বিষয়টির আলোকে বুখারী শরীফে বর্ণিত হাদীছের সহিত ইহার যে অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হয় উহা নিম্নরূপ : মহানবী বলিয়াছেন বলিয়া বিবৃত হইয়াছে:
(খ) অতঃপর তিনি (ফেরেশতা) আমার নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল। আল্লাহ্র রাসূল বলিলেন, 'ইহা শুনিয়া আমি যদিও দাঁড়াইয়াছিলাম, কিন্তু হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া পড়িলাম। তারপর আমি আমার পরিবারের নিকট ফিরিয়া আসিলাম এবং আমার হৃৎপিণ্ড ধড়ফড় করিতেছিল। আমি খাদীজার নিকট গিয়া তাঁহাকে বলিলাম, আমাকে ঢাকিয়া দাও, আমাকে ঢাকিয়া দাও। আমার ভীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আমি কম্বলে ঢাকা অবস্থায় রহিলাম। তখন তিনি (ফেরেশতা) আমার নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল। মহানবী বলেন, 'ইহাতে আমার বোধ হইতেছিল যে, আমি যেন নিজকে পর্বতের উপর হইতে নিচে নিক্ষেপ করিতেছি এবং আমি যখন তেমনই করিতে চাহিলাম তখনই তিনি আমার নিকট আসিয়া বলিলেন, 'হে মুহাম্মাদ! আমি জিবরাঈল এবং আপনি আল্লাহ্র রাসূল।'
তখন তিনি আমাকে আদেশ করিলেন, "পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন"। অতঃপর আমি পড়িলাম। তারপর আমি খাদীজার নিকট আসিয়া তাহাকে বলিলাম, "আমি আমার জীবন সম্পর্কে শংকিত হইয়া পড়িয়াছি। তিনি বলিলেন ....."।
(গ) এই দফা হইতে বর্ণনাটি পুনঃ বুখারী শরীফে উল্লিখিত হাদীছের অনুরূপ অর্থাৎ মহানবী -এর প্রতি খাদীজার সান্ত্বনাসূচক কথাবার্তা, তাঁহাদের ওয়ারাকার নিকট গমন, ওয়ারাকার অভিমত যে, জিবরাঈল ফেরেশতা (নামূস) আল্লাহ্ ওহী লইয়া আসিয়াছিলেন, মহানবী -এর নিজের লোকেরা তাঁহার বিরুদ্ধাচরণ করিবে ইত্যাদি এবং বর্ণনার শেষে রহিয়াছে ওয়ারাকার মন্তব্য যে, তিনি সেই সময় পর্যন্ত যদি বাঁচিয়া থাকেন তাহা হইলে তিনি মহানবীকে সর্বতোভাবে সাহায্য করিবেন।
এই হাদীছটি যদিও আয়েশা (রা)-এর নিকট হইতে শুরু হইয়া আয-যুহরী ও 'উরওয়া'র মাধ্যমে পাওয়া গিয়াছে তবুও নিম্নের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বুখারী শরীফে উদ্ধৃত হাদীছের সহিত ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়:
১. ইহাতে বলা হইয়াছে যে, হিরা গুহায় মহানবীকে ফেরেশতা প্রথম যে কথা বলিয়াছিলেন তাহা হইতেছে তিনি (মহানবী) আল্লাহ্র রাসূল।
২. গুহা হইতে মহানবী বাড়ীতে ফিরিয়া আসিবার পর ফেরেশতা পুনঃ আবির্ভূত হন এবং বলেন যে, তিনি (মহানবী) আল্লাহ্র রাসূল।
৩. ফেরেশতার দ্বিতীয়বার উপস্থিত হওয়ার এবং মহানবীকে দ্বিতীয়বার আল্লাহ্ রাসূল হিসাবে অভিহিত করিবার পর তিনি (মহানবী) নিজকে পাহাড়ের উপর হইতে নিচে নিক্ষেপ করিবার বিষয়ে চিন্তা করেন।
৪. তিনি যখন প্রায় নিজকে নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত হন তখন জিবরাঈল ফেরেশতা তৃতীয়বার উপস্থিত হইয়া নিজকে জিবরাঈল বলিয়া পরিচয় প্রদান করেন এবং মহানবীকে নিশ্চয়তা প্রদান করেন যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল এবং তাঁহাকে সূরা 'আলাক-এর প্রথম আয়াত পাঠ করান।
৫. মহানবী যে পড়িতে অক্ষম ছিলেন ইহার কোথাও কোন উল্লেখ নাই।
৬. ওহী নাযিল হওয়ার বিরতি সম্পর্কে কোন উল্লেখ নাই।
অতএব ইহা এখন স্পষ্ট যে, আয়েশা (রা) অথবা এই বিষয়ে আয-যুহরী একই ঘটনার উপর দুইটি ভিন্ন ভিন্ন বিবরণী দিতে পারিতেন না। যদি এখানে বর্ণিত তথ্য সত্য হইয়া থাকে এবং তাহা যে কোনভাবেই হউক না কেন বাদ পড়িয়া গিয়া অথবা তাহাদের চক্ষু এড়াইয়া গিয়া থাকে তাহা হইলে তাহাদের পরবর্তী বর্ণনাকারীদের তাহাদের তথ্য সংগ্রহের সূত্রের উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু এই বিষয়ের কিছুই এখানে অথবা অন্য কোথাও উল্লেখ করা হয় নাই। এমনকি আয-যুহরী যেমন অনুমান করেন সে অনুযায়ী বুখারী শরীফে উল্লিখিত কথিত আত্মহত্যা প্রচেষ্টার
ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে এখানে বলা হইয়াছে। এইরূপে আয-যুহরী হয়ত উল্লেখ করিতে পারিতেন যে, ওহী নাযিল হইতে বিলম্বের কারণে মহানবী পাহাড়ের উপর হইতে নিচে লাফাইয়া পড়িয়া আত্মহত্যা করিবার ইচ্ছা পোষণ করেন এবং মহানবী তাহা করিতে নিজকে নিরস্ত্র করেন যখন জিবরাঈল (আ) উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে নিশ্চয়তা দেন যে, তিনি আল্লাহ্ রাসূল। পক্ষান্তরে বর্তমান বিবরণীটি কেবল ওহী নাযিল হওয়ার বিরতির কোন উল্লেখই করে নাই, ইহা আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছে যে, মহানবী আত্মহত্যা করিতে মনস্থ করিয়াছিলেন। কিন্তু ফেরেশতা জিবরাঈল দ্বিতীয়বার আবির্ভূত হইয়া মহানবীকে নিশ্চয়তা দেন যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল। এই বিবরণীর চরম অযৌক্তিকতা ছাড়াও ইহা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, আয-যুহরী নিজে ঘটনাটির কারণ ও ফলাফল সম্পর্কে এই ধরনের পরস্পরবিরোধী ও বিপরীতধর্মী বর্ণনা দিতে পারিতেন না।
তাই উহা স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, আয-যুহরীর পরবর্তী বর্ণনাকারিগণ অথবা তাহাদের মধ্যে কয়েকজনের মাধ্যমে আত-তাবারীর নিকট এই বিবরণী পৌঁছিয়াছে, তাহারা শুধু আয-যুহরীর নিজের বর্ণনাকেই তালগোল পাকাইয়া ফেলে নাই, বরং অন্য বিষয়ের সহিত মূল ঘটনাটিকে মিশাইয়া ফেলিয়াছে। বস্তুত কিছু সংখ্যক বর্ণনাকারী সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য মতামত সম্পূর্ণ এক নয়। উহাহরণস্বরূপ নু'মান ইব্ন রাশেদের নাম করা যাইতে পারে। বলা হইয়া থাকে যে, তিনি আয-যুহরীর নিকট হইতে ইহা শুনিয়াছেন। কিন্তু বেশ কিছু সংখ্যক যোগ্য পণ্ডিত নু'মান ইব্ন রাশেদকে খুবই 'দুর্বল ও বিভ্রান্ত' বলিয়া অভিহিত করেন। কারণ তিনি প্রচুর ভুল ও ভিত্তিহীন অনুমান করিতেন। এমনকি ইহাও বলা হয় যে, তিনি নিন্দনীয় ও অর্থহীন বিবরণ দিয়াছেন এবং তাহাকে পরিহার করা বাঞ্ছনীয় হইবে। ৩৩
অনুরূপভাবে জারীরকেও (ইবন হাযম ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন শুজা আল-আযদী) প্রচুর ভুল করা, তাহার বর্ণনাকৃত হাদীছের সহিত স্বীয় অনুমানের মিশ্রণ, ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতার মধ্যে পরিবর্তন সাধন এবং এমনকি নিন্দনীয় বিবরণীর জন্য নির্ভরযোগ্য বলিয়া বিবেচনা করা হয় না। ৩৪ বলা হইয়া থাকে যে, তিনি আন-নু'মান ইব্ন রাশেদের নিকট হইতে ইহা গ্রহণ করিয়াছেন। তাহার পুত্র ওয়াহ্হ্বও ভুল করিতেন এবং তিনি তাহার পিতার নিকট হইতে কোন নজীর হিসাবে বিবরণী গ্রহণ করিতেন। জানা যায় যে, যাহাদের নিকট কোন হাদীছ শুনেন নাই তাহাদের নামে তাহার বর্ণনার উৎস হিসাবে উল্লেখ করিতেন। "শু'বা হইতে" তিনি এরূপ প্রায় চার হাজার হাদীছ বর্ণনা করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেইসব বর্ণনা ছিল আবদুর রহমান আর-রাসসাসী-এর। ৩৫
স্পষ্টতই এরূপ বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে প্রাপ্ত হাদীছসমূহ সতর্কতার সহিত গ্রহণ করা আবশ্যক এবং হাদীছ ব্যাখ্যার স্বীকৃত নিয়মানুযায়ী এই সকল বর্ণনাকে একই বিষয়ের উপর বর্ণনাকারীদের উপরে কোন মতেই স্থান দেওয়া যাইতে পারে না।
আত্-তাবারীর পরবর্তী কালে রচিত গ্রন্থাবলীতে যে বর্ণনা দেখিতে পাওয়া যায়, তাহা অনুসরণ করিবার তেমন কোন আবশ্যকতা নাই। কারণ মূল কাহিনীতে কোন কিছু নূতন বা নির্ভরযোগ্য
তথ্য সংযোজনে তাহাদের করণীয় কিছু নাই। সবকিছু বিচার করিয়া মহানবী -এর উপর প্রথম ওহী নাযিলের সবচাইতে নির্ভরযোগ্য বর্ণনা আয়েশা (রা) দিয়াছেন এবং তাহা বুখারী শরীফে লিপিবদ্ধ হইয়াছে। উপরে যে সকল বর্ণনা লক্ষ্য করা গিয়াছে তাহা এবং এই বর্ণনা হইতে নিচের তথ্যসমূহের উদ্ভব হইয়াছে। অবশ্য ইহার মধ্যে তাহারা যেসব বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করিয়াছেন তাহা অন্তর্ভুক্ত হয় নাই।
১. তাহার আহ্বানের প্রাক্কালে মহানবী চমকপ্রদ স্বপ্ন দেখিবার একটি প্রারম্ভিক পর্যায়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এই স্বপ্ন তাঁহার নিকট ভোরবেলার সূর্যালোকের ন্যায় উদ্ভাসিত হইত।
২. ইহার পর তিনি নির্জনবাস পছন্দ করিতে শুরু করেন এবং হেরা পর্বতের উপরে অবস্থিত গুহায় তিনি একাকী ইবাদত ও গভীর ধ্যানে একটি সময় অতিবাহিত করেন।
৩. হেরা পর্বতের গুহায় জিবরাঈল ফেরেশতা উপস্থিত হইয়া প্রথম ওহী নাযিল করেন।
৪. হেরার গুহায় প্রথম সাক্ষাতের পরপরই মহানবী জিবরাঈল (আ)-কে আকাশে আবির্ভূত হইতে দেখেন এবং জিবরাঈল (আ) তাঁহার নাম ধরিয়া আহ্বান করত স্বীয় পরিচয় প্রদান এবং তিনি (মহানবী) আল্লাহ্র রাসূল তাহার নিশ্চয়তা প্রদান করেন।
৫. মহানবী জিবরাঈল ফেরেশতার নিকট হইতে যাহা গ্রহণ করেন তাহা বাহিরের কোন বিষয়। বাহিরের সূত্র হইতে প্রাপ্ত ইহা ছিল একটি সুস্পষ্ট পাঠ এবং ইহা তাঁহার স্বীয় ধ্যান বা চিন্তা-প্রসূত কোন ফসল ছিল না। হেরা পর্বতের অনন্য অভিজ্ঞতা তাঁহার মানসিক প্রতিক্রিয়ার কোন দৃশ্য ছিল না।
৬. আল্লাহর তরফ হইতে নাযিলকৃত ওহী লাভের পর মহানবী -এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল একজন ব্যক্তির যিনি জীবনে এইরূপ ঘটনার কখনও প্রত্যাশা করেন নাই। তাঁহার নূতন অবস্থান ও মর্যাদা সম্পর্কে তিনি প্রথমদিকে নিশ্চিত ছিলেন না। ফেরেশতা জিবরাঈল (আ) আল্লাহ তাআলার নির্দেশে তাঁহাকে নিশ্চয়তা প্রদান করা এবং ওয়ারাকা ইবন নাওফাল-এর সহিত তাঁহার আলোচনার পর তাঁহার চিত্ত স্থিরতা লাভ করে।
৭. আল্লাহ্ ওহী লাভের পূর্বে মহানবী একজন নবীর ভূমিকা পালনের জন্য কোনরূপ চিন্তা বা পূর্ব পরিকল্পনা গ্রহণ করেন নাই।
৮. হেরার গুহায় প্রথম ওহী নাযিলের পর ওহী প্রাপ্তিতে একটি বিরতি ঘটে। ওহী লাভের এই বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার প্রথম ধাক্কা সামলাইয়া লইবার জন্য ইহা ছিল একটি দম ফেলার অবসর মাত্র।
টিকাঃ
৩২. আত্-তাবারী, তারীখ, ২খ., ৩০০ ৩০২ (১/১১৪৯ – ১১৫৩).
৩৩. ইব্ন হাজার আল-আসকালানী, তাহযীবুত্ তাহযীব, ১০খ, হায়দারাবাদ ১২২৭ হি., পৃ. ১৫২, নং ৮১৯, সমালোচনার অংশবিশেষ নিম্নরূপ:
قال على ابن المدينى ذكره يحى القطان فضعفه جدا وقال عبد الله بن احمد سألت ابي عنه فقال مضطرب الحديث وروى احاديث مناكير وقال ابن معين ضعيف وقال مرة ليس بشئ وقال البخاري وابو حاتم في حديثه وهم كثير ......
৩৪. ঐ, ২খ., ৭১ - ৭২; নং ১১১.
৩৫. ঐ. ১১খ., ১৬১ - ১৬২, নং ২৭৩.
আল-ওয়াকিদীর রচনার এক শত বৎসরের ও অধিক কাল পরে আত্-তাবারী (২২৪-৩১০ হি.) ইবন ইসহাকের বিবরণী পুনরোল্লেখ করেন যাহা উপরে উল্লেখ করা হইয়াছে। পুনরোল্লেখের সময় শব্দের ঈষৎ পরিবর্তন এবং মূল পাঠের সামান্য সংযোজন ও বিয়োজন করা হয়। অন্যথায় তাহার নাম উল্লেখসহ যথাসাধ্য মূল পাঠের কাছাকাছি থাকিয়াছেন। ৩২ ইবন ইসহাকের বিবরণীর উপর তাহার বর্ণনা প্রকাশ করিবার পূর্বে আত্-তাবারী যাহা হউক ঘটনাটির আর একটি বিবরণ উপস্থাপন করিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি জানান যে, তিনি ইহা আহমাদ ইবন 'উছমান (আবূ জাওরা')-এর নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছেন। হাদীছটি সংগ্রহের পরম্পরা হইতেছে : ওয়াহব ইবন জারীর হইতে আহমাদ ইবন 'উছমান, ওয়াহ্হ্ ইবন জারীর তাহার পিতা জারীর হইতে, জারীর নু'মান ইব্ন রাশেদ হইতে, রাশেদ আয-যুহরী হইতে, তিনি 'উরওয়া হইতে, আর 'উরওয়া আয়েশা (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। ইবন ইসহাকের বিবরণী হইতে এই বিবরণীকে এরূপ তথ্য দ্বারা পৃথকভাবে চিহ্নিত করা যায় যে, পরবর্তী ব্যক্তির বিবরণীর সূত্র যেখানে উবায়দ ইব্ন উমার পর্যন্ত গিয়া শেষ হইয়াছে তাহা হইলে তাহা মুরসাল বলিয়া পরিগণিত হইবে। আত্-তাবারীর হাদীছটি আয-যুহরী ও 'উরওয়া-এর মাধ্যমে আয়েশা (রা) পর্যন্ত সম্প্রসারিত হইয়াছে। এই হাদীছের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ:
(ক) হাদীছের প্রথম অংশে বর্ণিত তথ্যসমূহ বুখারী শরীফে উল্লিখিত হাদীছের তথ্যের সহিত অবিকল মিল রহিয়াছে। যেমন : সত্য ও উত্তম স্বপ্ন দোখিবার প্রারম্ভিক কাল, ইহার পর মহানবী -এর নির্জনবাসের প্রতি অনুরাগ, তাঁহার একাকী ইবাদত এবং হেরার গুহায় একটানা কয়েক দিন ধরিয়া তাঁহার অবস্থান, গুহায় একাকী অবস্থানের উদ্দেশ্যে পরিবারের নিকট হইতে মাঝে মাঝে খাবার সংগ্রহের জন্য আগমন এবং তাঁহার নিকট সত্য উদ্ভাসিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁহার এই সকল কার্যক্রম। এই বিষয়টির আলোকে বুখারী শরীফে বর্ণিত হাদীছের সহিত ইহার যে অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হয় উহা নিম্নরূপ : মহানবী বলিয়াছেন বলিয়া বিবৃত হইয়াছে:
(খ) অতঃপর তিনি (ফেরেশতা) আমার নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল। আল্লাহ্র রাসূল বলিলেন, 'ইহা শুনিয়া আমি যদিও দাঁড়াইয়াছিলাম, কিন্তু হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া পড়িলাম। তারপর আমি আমার পরিবারের নিকট ফিরিয়া আসিলাম এবং আমার হৃৎপিণ্ড ধড়ফড় করিতেছিল। আমি খাদীজার নিকট গিয়া তাঁহাকে বলিলাম, আমাকে ঢাকিয়া দাও, আমাকে ঢাকিয়া দাও। আমার ভীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আমি কম্বলে ঢাকা অবস্থায় রহিলাম। তখন তিনি (ফেরেশতা) আমার নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল। মহানবী বলেন, 'ইহাতে আমার বোধ হইতেছিল যে, আমি যেন নিজকে পর্বতের উপর হইতে নিচে নিক্ষেপ করিতেছি এবং আমি যখন তেমনই করিতে চাহিলাম তখনই তিনি আমার নিকট আসিয়া বলিলেন, 'হে মুহাম্মাদ! আমি জিবরাঈল এবং আপনি আল্লাহ্র রাসূল।'
তখন তিনি আমাকে আদেশ করিলেন, "পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন"। অতঃপর আমি পড়িলাম। তারপর আমি খাদীজার নিকট আসিয়া তাহাকে বলিলাম, "আমি আমার জীবন সম্পর্কে শংকিত হইয়া পড়িয়াছি। তিনি বলিলেন ....."।
(গ) এই দফা হইতে বর্ণনাটি পুনঃ বুখারী শরীফে উল্লিখিত হাদীছের অনুরূপ অর্থাৎ মহানবী -এর প্রতি খাদীজার সান্ত্বনাসূচক কথাবার্তা, তাঁহাদের ওয়ারাকার নিকট গমন, ওয়ারাকার অভিমত যে, জিবরাঈল ফেরেশতা (নামূস) আল্লাহ্ ওহী লইয়া আসিয়াছিলেন, মহানবী -এর নিজের লোকেরা তাঁহার বিরুদ্ধাচরণ করিবে ইত্যাদি এবং বর্ণনার শেষে রহিয়াছে ওয়ারাকার মন্তব্য যে, তিনি সেই সময় পর্যন্ত যদি বাঁচিয়া থাকেন তাহা হইলে তিনি মহানবীকে সর্বতোভাবে সাহায্য করিবেন।
এই হাদীছটি যদিও আয়েশা (রা)-এর নিকট হইতে শুরু হইয়া আয-যুহরী ও 'উরওয়া'র মাধ্যমে পাওয়া গিয়াছে তবুও নিম্নের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বুখারী শরীফে উদ্ধৃত হাদীছের সহিত ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়:
১. ইহাতে বলা হইয়াছে যে, হিরা গুহায় মহানবীকে ফেরেশতা প্রথম যে কথা বলিয়াছিলেন তাহা হইতেছে তিনি (মহানবী) আল্লাহ্র রাসূল।
২. গুহা হইতে মহানবী বাড়ীতে ফিরিয়া আসিবার পর ফেরেশতা পুনঃ আবির্ভূত হন এবং বলেন যে, তিনি (মহানবী) আল্লাহ্র রাসূল।
৩. ফেরেশতার দ্বিতীয়বার উপস্থিত হওয়ার এবং মহানবীকে দ্বিতীয়বার আল্লাহ্ রাসূল হিসাবে অভিহিত করিবার পর তিনি (মহানবী) নিজকে পাহাড়ের উপর হইতে নিচে নিক্ষেপ করিবার বিষয়ে চিন্তা করেন।
৪. তিনি যখন প্রায় নিজকে নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত হন তখন জিবরাঈল ফেরেশতা তৃতীয়বার উপস্থিত হইয়া নিজকে জিবরাঈল বলিয়া পরিচয় প্রদান করেন এবং মহানবীকে নিশ্চয়তা প্রদান করেন যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল এবং তাঁহাকে সূরা 'আলাক-এর প্রথম আয়াত পাঠ করান।
৫. মহানবী যে পড়িতে অক্ষম ছিলেন ইহার কোথাও কোন উল্লেখ নাই।
৬. ওহী নাযিল হওয়ার বিরতি সম্পর্কে কোন উল্লেখ নাই।
অতএব ইহা এখন স্পষ্ট যে, আয়েশা (রা) অথবা এই বিষয়ে আয-যুহরী একই ঘটনার উপর দুইটি ভিন্ন ভিন্ন বিবরণী দিতে পারিতেন না। যদি এখানে বর্ণিত তথ্য সত্য হইয়া থাকে এবং তাহা যে কোনভাবেই হউক না কেন বাদ পড়িয়া গিয়া অথবা তাহাদের চক্ষু এড়াইয়া গিয়া থাকে তাহা হইলে তাহাদের পরবর্তী বর্ণনাকারীদের তাহাদের তথ্য সংগ্রহের সূত্রের উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু এই বিষয়ের কিছুই এখানে অথবা অন্য কোথাও উল্লেখ করা হয় নাই। এমনকি আয-যুহরী যেমন অনুমান করেন সে অনুযায়ী বুখারী শরীফে উল্লিখিত কথিত আত্মহত্যা প্রচেষ্টার
ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে এখানে বলা হইয়াছে। এইরূপে আয-যুহরী হয়ত উল্লেখ করিতে পারিতেন যে, ওহী নাযিল হইতে বিলম্বের কারণে মহানবী পাহাড়ের উপর হইতে নিচে লাফাইয়া পড়িয়া আত্মহত্যা করিবার ইচ্ছা পোষণ করেন এবং মহানবী তাহা করিতে নিজকে নিরস্ত্র করেন যখন জিবরাঈল (আ) উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে নিশ্চয়তা দেন যে, তিনি আল্লাহ্ রাসূল। পক্ষান্তরে বর্তমান বিবরণীটি কেবল ওহী নাযিল হওয়ার বিরতির কোন উল্লেখই করে নাই, ইহা আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছে যে, মহানবী আত্মহত্যা করিতে মনস্থ করিয়াছিলেন। কিন্তু ফেরেশতা জibraঈল দ্বিতীয়বার আবির্ভূত হইয়া মহানবীকে নিশ্চয়তা দেন যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল। এই বিবরণীর চরম অযৌক্তিকতা ছাড়াও ইহা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, আয-যুহরী নিজে ঘটনাটির কারণ ও ফলাফল সম্পর্কে এই ধরনের পরস্পরবিরোধী ও বিপরীতধর্মী বর্ণনা দিতে পারিতেন না।
তাই উহা স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, আয-যুহরীর পরবর্তী বর্ণনাকারিগণ অথবা তাহাদের মধ্যে কয়েকজনের মাধ্যমে আত-তাবারীর নিকট এই বিবরণী পৌঁছিয়াছে, তাহারা শুধু আয-যুহরীর নিজের বর্ণনাকেই তালগোল পাকাইয়া ফেলে নাই, বরং অন্য বিষয়ের সহিত মূল ঘটনাটিকে মিশাইয়া ফেলিয়াছে। বস্তুত কিছু সংখ্যক বর্ণনাকারী সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য মতামত সম্পূর্ণ এক নয়। উহাহরণস্বরূপ নু'মান ইব্ন রাশেদের নাম করা যাইতে পারে। বলা হইয়া থাকে যে, তিনি আয-যুহরীর নিকট হইতে ইহা শুনিয়াছেন। কিন্তু বেশ কিছু সংখ্যক যোগ্য পণ্ডিত নু'মান ইব্ন রাশেদকে খুবই 'দুর্বল ও বিভ্রান্ত' বলিয়া অভিহিত করেন। কারণ তিনি প্রচুর ভুল ও ভিত্তিহীন অনুমান করিতেন। এমনকি ইহাও বলা হয় যে, তিনি নিন্দনীয় ও অর্থহীন বিবরণ দিয়াছেন এবং তাহাকে পরিহার করা বাঞ্ছনীয় হইবে। ৩৩
অনুরূপভাবে জারীরকেও (ইবন হাযম ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন শুজা আল-আযদী) প্রচুর ভুল করা, তাহার বর্ণনাকৃত হাদীছের সহিত স্বীয় অনুমানের মিশ্রণ, ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতার মধ্যে পরিবর্তন সাধন এবং এমনকি নিন্দনীয় বিবরণীর জন্য নির্ভরযোগ্য বলিয়া বিবেচনা করা হয় না। ৩৪ বলা হইয়া থাকে যে, তিনি আন-নু'মান ইব্ন রাশেদের নিকট হইতে ইহা গ্রহণ করিয়াছেন। তাহার পুত্র ওয়াহ্হ্বও ভুল করিতেন এবং তিনি তাহার পিতার নিকট হইতে কোন নজীর হিসাবে বিবরণী গ্রহণ করিতেন। জানা যায় যে, যাহাদের নিকট কোন হাদীছ শুনেন নাই তাহাদের নামে তাহার বর্ণনার উৎস হিসাবে উল্লেখ করিতেন। "শু'বা হইতে" তিনি এরূপ প্রায় চার হাজার হাদীছ বর্ণনা করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেইসব বর্ণনা ছিল আবদুর রহমান আর-রাসসাসী-এর। ৩৫
স্পষ্টতই এরূপ বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে প্রাপ্ত হাদীছসমূহ সতর্কতার সহিত গ্রহণ করা আবশ্যক এবং হাদীছ ব্যাখ্যার স্বীকৃত নিয়মানুযায়ী এই সকল বর্ণনাকে একই বিষয়ের উপর বর্ণনাকারীদের উপরে কোন মতেই স্থান দেওয়া যাইতে পারে না।
আল-ওয়াকিদীর রচনার এক শত বৎসরের ও অধিক কাল পরে আত্-তাবারী (২২৪-৩১০ হি.) ইবন ইসহাকের বিবরণী পুনরোল্লেখ করেন যাহা উপরে উল্লেখ করা হইয়াছে। পুনরোল্লেখের সময় শব্দের ঈষৎ পরিবর্তন এবং মূল পাঠের সামান্য সংযোজন ও বিয়োজন করা হয়। অন্যথায় তাহার নাম উল্লেখসহ যথাসাধ্য মূল পাঠের কাছাকাছি থাকিয়াছেন। ৩২ ইবন ইসহাকের বিবরণীর উপর তাহার বর্ণনা প্রকাশ করিবার পূর্বে আত্-তাবারী যাহা হউক ঘটনাটির আর একটি বিবরণ উপস্থাপন করিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি জানান যে, তিনি ইহা আহমাদ ইবন 'উছমান (আবূ জাওরা')-এর নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছেন। হাদীছটি সংগ্রহের পরম্পরা হইতেছে : ওয়াহব ইবন জারীর হইতে আহমাদ ইবন 'উছমান, ওয়াহ্হ্ ইবন জারীর তাহার পিতা জারীর হইতে, জারীর নু'মান ইব্ন রাশেদ হইতে, রাশেদ আয-যুহরী হইতে, তিনি 'উরওয়া হইতে, আর 'উরওয়া আয়েশা (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। ইবন ইসহাকের বিবরণী হইতে এই বিবরণীকে এরূপ তথ্য দ্বারা পৃথকভাবে চিহ্নিত করা যায় যে, পরবর্তী ব্যক্তির বিবরণীর সূত্র যেখানে উবায়দ ইব্ন উমার পর্যন্ত গিয়া শেষ হইয়াছে তাহা হইলে তাহা মুরসাল বলিয়া পরিগণিত হইবে। আত্-তাবারীর হাদীছটি আয-যুহরী ও 'উরওয়া-এর মাধ্যমে আয়েশা (রা) পর্যন্ত সম্প্রসারিত হইয়াছে। এই হাদীছের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ:
(ক) হাদীছের প্রথম অংশে বর্ণিত তথ্যসমূহ বুখারী শরীফে উল্লিখিত হাদীছের তথ্যের সহিত অবিকল মিল রহিয়াছে। যেমন : সত্য ও উত্তম স্বপ্ন দোখিবার প্রারম্ভিক কাল, ইহার পর মহানবী -এর নির্জনবাসের প্রতি অনুরাগ, তাঁহার একাকী ইবাদত এবং হেরার গুহায় একটানা কয়েক দিন ধরিয়া তাঁহার অবস্থান, গুহায় একাকী অবস্থানের উদ্দেশ্যে পরিবারের নিকট হইতে মাঝে মাঝে খাবার সংগ্রহের জন্য আগমন এবং তাঁহার নিকট সত্য উদ্ভাসিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁহার এই সকল কার্যক্রম। এই বিষয়টির আলোকে বুখারী শরীফে বর্ণিত হাদীছের সহিত ইহার যে অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হয় উহা নিম্নরূপ : মহানবী বলিয়াছেন বলিয়া বিবৃত হইয়াছে:
(খ) অতঃপর তিনি (ফেরেশতা) আমার নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল। আল্লাহ্র রাসূল বলিলেন, 'ইহা শুনিয়া আমি যদিও দাঁড়াইয়াছিলাম, কিন্তু হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া পড়িলাম। তারপর আমি আমার পরিবারের নিকট ফিরিয়া আসিলাম এবং আমার হৃৎপিণ্ড ধড়ফড় করিতেছিল। আমি খাদীজার নিকট গিয়া তাঁহাকে বলিলাম, আমাকে ঢাকিয়া দাও, আমাকে ঢাকিয়া দাও। আমার ভীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আমি কম্বলে ঢাকা অবস্থায় রহিলাম। তখন তিনি (ফেরেশতা) আমার নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল। মহানবী বলেন, 'ইহাতে আমার বোধ হইতেছিল যে, আমি যেন নিজকে পর্বতের উপর হইতে নিচে নিক্ষেপ করিতেছি এবং আমি যখন তেমনই করিতে চাহিলাম তখনই তিনি আমার নিকট আসিয়া বলিলেন, 'হে মুহাম্মাদ! আমি জিবরাঈল এবং আপনি আল্লাহ্র রাসূল।'
তখন তিনি আমাকে আদেশ করিলেন, "পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন"। অতঃপর আমি পড়িলাম। তারপর আমি খাদীজার নিকট আসিয়া তাহাকে বলিলাম, "আমি আমার জীবন সম্পর্কে শংকিত হইয়া পড়িয়াছি। তিনি বলিলেন ....."।
(গ) এই দফা হইতে বর্ণনাটি পুনঃ বুখারী শরীফে উল্লিখিত হাদীছের অনুরূপ অর্থাৎ মহানবী -এর প্রতি খাদীজার সান্ত্বনাসূচক কথাবার্তা, তাঁহাদের ওয়ারাকার নিকট গমন, ওয়ারাকার অভিমত যে, জিবরাঈল ফেরেশতা (নামূস) আল্লাহ্ ওহী লইয়া আসিয়াছিলেন, মহানবী -এর নিজের লোকেরা তাঁহার বিরুদ্ধাচরণ করিবে ইত্যাদি এবং বর্ণনার শেষে রহিয়াছে ওয়ারাকার মন্তব্য যে, তিনি সেই সময় পর্যন্ত যদি বাঁচিয়া থাকেন তাহা হইলে তিনি মহানবীকে সর্বতোভাবে সাহায্য করিবেন।
এই হাদীছটি যদিও আয়েশা (রা)-এর নিকট হইতে শুরু হইয়া আয-যুহরী ও 'উরওয়া'র মাধ্যমে পাওয়া গিয়াছে তবুও নিম্নের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বুখারী শরীফে উদ্ধৃত হাদীছের সহিত ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়:
১. ইহাতে বলা হইয়াছে যে, হিরা গুহায় মহানবীকে ফেরেশতা প্রথম যে কথা বলিয়াছিলেন তাহা হইতেছে তিনি (মহানবী) আল্লাহ্র রাসূল।
২. গুহা হইতে মহানবী বাড়ীতে ফিরিয়া আসিবার পর ফেরেশতা পুনঃ আবির্ভূত হন এবং বলেন যে, তিনি (মহানবী) আল্লাহ্র রাসূল।
৩. ফেরেশতার দ্বিতীয়বার উপস্থিত হওয়ার এবং মহানবীকে দ্বিতীয়বার আল্লাহ্ রাসূল হিসাবে অভিহিত করিবার পর তিনি (মহানবী) নিজকে পাহাড়ের উপর হইতে নিচে নিক্ষেপ করিবার বিষয়ে চিন্তা করেন।
৪. তিনি যখন প্রায় নিজকে নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত হন তখন জিবরাঈল ফেরেশতা তৃতীয়বার উপস্থিত হইয়া নিজকে জিবরাঈল বলিয়া পরিচয় প্রদান করেন এবং মহানবীকে নিশ্চয়তা প্রদান করেন যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল এবং তাঁহাকে সূরা 'আলাক-এর প্রথম আয়াত পাঠ করান।
৫. মহানবী যে পড়িতে অক্ষম ছিলেন ইহার কোথাও কোন উল্লেখ নাই।
৬. ওহী নাযিল হওয়ার বিরতি সম্পর্কে কোন উল্লেখ নাই।
অতএব ইহা এখন স্পষ্ট যে, আয়েশা (রা) অথবা এই বিষয়ে আয-যুহরী একই ঘটনার উপর দুইটি ভিন্ন ভিন্ন বিবরণী দিতে পারিতেন না। যদি এখানে বর্ণিত তথ্য সত্য হইয়া থাকে এবং তাহা যে কোনভাবেই হউক না কেন বাদ পড়িয়া গিয়া অথবা তাহাদের চক্ষু এড়াইয়া গিয়া থাকে তাহা হইলে তাহাদের পরবর্তী বর্ণনাকারীদের তাহাদের তথ্য সংগ্রহের সূত্রের উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু এই বিষয়ের কিছুই এখানে অথবা অন্য কোথাও উল্লেখ করা হয় নাই। এমনকি আয-যুহরী যেমন অনুমান করেন সে অনুযায়ী বুখারী শরীফে উল্লিখিত কথিত আত্মহত্যা প্রচেষ্টার
ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে এখানে বলা হইয়াছে। এইরূপে আয-যুহরী হয়ত উল্লেখ করিতে পারিতেন যে, ওহী নাযিল হইতে বিলম্বের কারণে মহানবী পাহাড়ের উপর হইতে নিচে লাফাইয়া পড়িয়া আত্মহত্যা করিবার ইচ্ছা পোষণ করেন এবং মহানবী তাহা করিতে নিজকে নিরস্ত্র করেন যখন জিবরাঈল (আ) উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে নিশ্চয়তা দেন যে, তিনি আল্লাহ্ রাসূল। পক্ষান্তরে বর্তমান বিবরণীটি কেবল ওহী নাযিল হওয়ার বিরতির কোন উল্লেখই করে নাই, ইহা আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছে যে, মহানবী আত্মহত্যা করিতে মনস্থ করিয়াছিলেন। কিন্তু ফেরেশতা জibraঈল দ্বিতীয়বার আবির্ভূত হইয়া মহানবীকে নিশ্চয়তা দেন যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল। এই বিবরণীর চরম অযৌক্তিকতা ছাড়াও ইহা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, আয-যুহরী নিজে ঘটনাটির কারণ ও ফলাফল সম্পর্কে এই ধরনের পরস্পরবিরোধী ও বিপরীতধর্মী বর্ণনা দিতে পারিতেন না।
তাই উহা স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, আয-যুহরীর পরবর্তী বর্ণনাকারিগণ অথবা তাহাদের মধ্যে কয়েকজনের মাধ্যমে আত-তাবারীর নিকট এই বিবরণী পৌঁছিয়াছে, তাহারা শুধু আয-যুহরীর নিজের বর্ণনাকেই তালগোল পাকাইয়া ফেলে নাই, বরং অন্য বিষয়ের সহিত মূল ঘটনাটিকে মিশাইয়া ফেলিয়াছে। বস্তুত কিছু সংখ্যক বর্ণনাকারী সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য মতামত সম্পূর্ণ এক নয়। উহাহরণস্বরূপ নু'মান ইব্ন রাশেদের নাম করা যাইতে পারে। বলা হইয়া থাকে যে, তিনি আয-যুহরীর নিকট হইতে ইহা শুনিয়াছেন। কিন্তু বেশ কিছু সংখ্যক যোগ্য পণ্ডিত নু'মান ইব্ন রাশেদকে খুবই 'দুর্বল ও বিভ্রান্ত' বলিয়া অভিহিত করেন। কারণ তিনি প্রচুর ভুল ও ভিত্তিহীন অনুমান করিতেন। এমনকি ইহাও বলা হয় যে, তিনি নিন্দনীয় ও অর্থহীন বিবরণ দিয়াছেন এবং তাহাকে পরিহার করা বাঞ্ছনীয় হইবে। ৩৩
অনুরূপভাবে জারীরকেও (ইবন হাযম ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন শুজা আল-আযদী) প্রচুর ভুল করা, তাহার বর্ণনাকৃত হাদীছের সহিত স্বীয় অনুমানের মিশ্রণ, ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতার মধ্যে পরিবর্তন সাধন এবং এমনকি নিন্দনীয় বিবরণীর জন্য নির্ভরযোগ্য বলিয়া বিবেচনা করা হয় না। ৩৪ বলা হইয়া থাকে যে, তিনি আন-নু'মান ইব্ন রাশেদের নিকট হইতে ইহা গ্রহণ করিয়াছেন। তাহার পুত্র ওয়াহ্হ্বও ভুল করিতেন এবং তিনি তাহার পিতার নিকট হইতে কোন নজীর হিসাবে বিবরণী গ্রহণ করিতেন। জানা যায় যে, যাহাদের নিকট কোন হাদীছ শুনেন নাই তাহাদের নামে তাহার বর্ণনার উৎস হিসাবে উল্লেখ করিতেন। "শু'বা হইতে" তিনি এরূপ প্রায় চার হাজার হাদীছ বর্ণনা করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেইসব বর্ণনা ছিল আবদুর রহমান আর-রাসসাসী-এর। ৩৫
স্পষ্টতই এরূপ বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে প্রাপ্ত হাদীছসমূহ সতর্কতার সহিত গ্রহণ করা আবশ্যক এবং হাদীছ ব্যাখ্যার স্বীকৃত নিয়মানুযায়ী এই সকল বর্ণনাকে একই বিষয়ের উপর বর্ণনাকারীদের উপরে কোন মতেই স্থান দেওয়া যাইতে পারে না।