📄 ২. ওয়াট-এর অভিমত
হানীফদের সম্পর্কে ওয়াট-এর অভিমত প্রধানত তাহার রচিত Muhammad at Mecca (১৯৫৩)১, হানীফের উপর The Encyclopaedia of Islam (১৯৬৬, ১৯৮৬)২-এ লিখিত প্রবন্ধ ও তাহার Muhammad's Mecca (১৯৮৮)৩ গ্রন্থে বর্ণিত হইয়াছে। তাহার বিবরণী অপরিহার্যরূপে জেফারি-বেল তত্ত্ব এবং Hilmi Omar Bey কর্তৃক গৃহীত ধারণার ভিত্তিতে রচিত। এই বিষয়ে বেল-এর নিবন্ধ প্রকাশের কিছুকাল পরেই Hilmi Omar Bey, The Moslem World নামক পত্রিকার কলামে বেলকে সমর্থন করিয়া নিবন্ধ লিখেন। তিনি তাহার নিবন্ধে উল্লেখ করেন যে, যাহাদিগকে ইতিহাসে ও কাহিনীতে হানীফ হিসাবে অভিহিত করা হয়, তাহদিগকে কুরআনের বর্ণনায় যথাযোগ্য বলিয়া দৃষ্ট হয় না। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তাহারা একেবারে প্রথম দিকে যেমন হানীফ পদবী ধারণ করিত না, তেমনি ইবরাহীমের ধর্মের অন্বেষণেও তাহারা বাহির হয় নাই। কিন্তু পরবর্তী কালের ব্যাখ্যাকার ও কাহিনীকার কর্তৃক এই পদবী আরোপিত হয়। কুরআনে ব্যবহৃত এই পরিভাষাটির বিশদীকরণ ও ইহার যথাযথ তাৎপর্যদানের জন্য তাহারা এইরূপ কার্যক্রম গ্রহণ করেন।৪
ওয়াট তাহার পূর্ববর্তীগণের অভিমতসমূহ কত ঘনিষ্ঠভাবে পুনরুল্লেখ করিয়াছেন তাহা নিম্নের তুলনামূলক সারণীতে দেখা যাইবে:
(ক) বেল বর্ণনা করেন যে, হানীফগণ ইতিহাসখ্যাত ঐতিহাসিক কোন সম্প্রদায় বা দল ছিল না, বরং তাহারা ছিল আরবদের ধর্মের আদর্শ অনুসারীভুক্ত।
(ক) বেলের অবিকল শব্দগুলি ওয়াট উদ্ধৃত করিয়া একই মত ব্যক্ত করেন।
(খ) জেফারীর তত্ত্ব হইতে গ্রহণ করিয়া এবং স্বীয় তত্ত্ব ঈষৎ পরিবর্তন করিয়া বেল অভিমত প্রকাশ করেন যে, হানীফ শব্দটি প্রাচীন সিরীয় ভাষা হইতে উদ্ভূত এবং ইহা বহুবচনে প্রথম ব্যবহৃত হয় এবং ইহার অর্থ হইতেছে ধর্মহীন অখৃস্টান।
(খ) ওয়াট এই মতামত গ্রহণ ও ইহার আরও সম্প্রসারণ করেন। ৬
(গ) বেল মনে করেন যে, হানীফ শব্দের উপর কুরআন একেশ্বরবাদীর একটি নূতন ও সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ আরোপ করিয়াছে।
(গ) ওয়াট মোটামুটি একই মত পোষণ করেন। প্রাচীন সিরিয়ার কোন কোন অঞ্চলে যে অর্থে একেশ্বরবাদী শব্দ ব্যবহৃত হইত তিনি তাহা ঈষৎ পরিবর্তন করিয়া 'অপ্রধান অর্থে' ব্যবহার করেন। ৭
(ঘ) জেফারী হইতে তাহার প্রয়োজনীয় সংকেত গ্রহণ করিয়া বেল মত প্রকাশ করেন যে, কুরআনে হানীফের ব্যবহার ও ইবরাহীমের কাহিনীর আশ্রয় গ্রহণ মদীনাতে সম্পন্ন হয়, যখন ইয়াহুদী ও খৃস্ট ধর্ম হইতে বাহির হইয়া আসিবার উদ্দেশ্যে এবং ইয়াহূদীদের সহিত মহানবী -এর সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
(ঘ) বস্তুত ওয়াট একই প্রবন্ধের পুনঃ অবতারণা করেন। তিনি বলেন যে, হানীফিয়াহ সম্পর্কে কুরআনে বর্ণিত ভাবধারা "ইয়াহুদী ও খৃস্টানগণ কর্তৃক মুহাম্মাদ -এর ধর্মের বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনার প্রতি মুসলমানদের প্রতিরোধের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত"। ইহা ছিল ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্মের বিরুদ্ধে কুরআনের কৈফিয়তমূলক অংশবিশেষ। ৮
(ঙ) পুনঃ জেফারীর সূত্রের বরাতে বেল মত প্রকাশ করেন যে, মহানবী -এর ধর্ম প্রাথমিক আমলে এমনকি হানীফিয়াহ নামে অভিহিত হইত এবং ইসলাম ও মুসলিম শব্দের পারিভাষিক ব্যবহার দ্বিতীয় হিজরীর পূর্বে হয় নাই।
(ঙ) ওয়াট একইরূপ মতামত পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বলেন যে, ইসলাম ও মুসলিম শব্দের পারিভাষিক ব্যবহার দ্বিতীয় হিজরীর পরেই হইয়াছে। ৯
(চ) এই বিষয়ে বেল-এর মতামতকে সমর্থন করিয়া H.O. Bey সংযোজন করেন যে, পরবর্তী কালের মুসলিম ইতিহাসবিদগণ হানীফ শব্দটির কুরআনের ব্যবহার ব্যাখ্যা করিতে গিয়া বিভিন্ন ব্যক্তিকে হানীফ হিসাবে অভিহিত করেন। কিন্তু তাহারা নিজেরা এই উপাধি ধারণ করিতেন না।
(চ) ওয়াট তাহা পুনরুল্লেখ করিয়া ঐকমত্য পোষণ করেন। ১০
এখন এখানে মূল নিবন্ধের চূড়ান্ত অসমর্থনীয়তা দেখা যাইতে পারে যাহাতে হানীফের আশ্রয় গ্রহণ ও ইবরাহীমের কাহিনীর উদ্ভব হইয়াছে। যেমন ওয়াট বলেন, "মদীনার আমলের প্রথমদিকে ইয়াহুদীদের সহিত যখন মহানবী -এর সম্পর্কের টানাপোড়েন চলিতেছিল ১১ এবং ইয়াহুদী ও খৃস্টান কর্তৃক মুহাম্মাদ -এর ধর্মের উপর বুদ্ধিগত সমালোচনার বিরুদ্ধে মুসলমানদের প্রতিরোধ কার্যক্রমের সহিত হানীফিয়ার ভাবধারাকে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত করা হইতেছিল" ১২-তাহা
সবিস্তারে উপরে উল্লেখ করা হইয়াছে। দেখা গিয়াছে যে, মহানবী -এর একেবারে গোড়ার দিকের ধর্ম প্রচারের সময় হানীফ ও ইবরাহীমের প্রসংগ মক্কাতেই ব্যবহার করা হইয়াছে এবং তাহা কোনমতেই ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের সমালোচনার প্রত্যুত্তরে ছিল না। পক্ষান্তরে কিতাবধারীদের সহিত ইবরাহীমের অভিন্নতার দাবির প্রত্যুত্তরে মদীনাতে হানীফ ও ইবরাহীমের কাহিনীর অবতারণা করা হইয়াছে। তাহাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মীয় আচার-অনুশীলনে একত্ববাদের ত্রুটিসহ তাহাদের দাবির অসঙ্গতি দেখাইবার উদ্দেশ্যে ইহা করা হয়। যেহেতু কুরআনের অধিকাংশ ভাবাদর্শ ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম হইতে গৃহীত হইয়াছে—এইরূপ শত্রুতামূলক প্রচারণার বিরুদ্ধে ১৩ মুসলমানদের নিজেদের রক্ষার ক্ষেত্রে এমন কোন প্রশ্ন উত্থাপিত হইয়াছে কিনা যে, যেমন ওয়াটের মতে, "তাহারা বলেন, তাহাদের ধর্ম আল্লাহ্র প্রতি খাঁটি ইবাদতের যাহা আল্লাহ তাঁহার পূর্ববর্তী নবীগণ ও মুহাম্মাদ -এর প্রতি অবতীর্ণ করিয়াছেন"। ১৪ কারণ হানীফিয়াহ ও ইবরাহীমের প্রসংগের অবতারণা মদীনাতেই হয় এবং ইহা ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের এইরূপ কোন মতামতের বিপক্ষে ছিল না। তবে তাহা ছিল এক আল্লাহ্ ইবাদতের অপরিহার্য বিষয়সমূহের স্পষ্ট অসম্পূর্ণতার বিরুদ্ধে। অথবা ইহাও সত্য নয় যে, "কুরআনের অধিকাংশ ভাবধারা ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম হইতে গ্রহণ করা হইয়াছে"। প্রাচ্যবিদগণ নিজেরাই এবং স্বতন্ত্রভাবে ওয়াট স্বীকার করেন যে, মুহাম্মাদ নিজে কখনও ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্মের গ্রন্থসমূহ পাঠ করেন নাই। ইহাও প্রমাণ করা হইয়াছে ১৫ যে, গৃহশিক্ষকের মাধ্যমে তিনি খৃষ্টতত্ত্বের পাঠ গ্রহণ করিয়াছিলেন অথবা যেইসব সাধারণ ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের সহিত তাঁহার সাক্ষাতের সুযোগ ঘটিয়াছিল তাহাদের নিকট হইতে তিনি তথ্য সংগ্রহ করিয়াছিলেন—এই তত্ত্বসমূহ সমভাবে অগ্রহণীয় ও অযৌক্তিক। ইহা ছাড়াও কুরআনের মৌলিক শিক্ষাসমূহ ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম হইতে একেবারে শুরু হইতেই পৃথক ছিল। ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্মের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা খুব জোরালোভাবে মক্কাতেই করা হয়। এমনকি মদীনাতে হানীফ ও ইবরাহীমের কাহিনীর প্রসংগ আমাদিগকে একটি শিক্ষামূলক অন্তর্দৃষ্টি গ্রহণে সহায়তা করে যাহাতে সেই সময়ে ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম সম্পর্কে কুরআনের উদ্দেশ্য কি ছিল তাহা জানা যায়। অতঃপর কুরআনের অধিকাংশ ভাবধারা ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম হইতে গৃহীত হইয়াছে এইরূপ পক্ষপাতমূলক ধারণা তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা বাঞ্ছনীয়। যদি কেহ ইসলাম ধর্মকে মূল্যহীন বিবেচনা করিয়া প্রকৃতপক্ষে জানিতে ও বুঝিতে চায় তাহা হইলে তাহাকে অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। এই নিবন্ধে হানীফিয়াহ ও ইবরাহীমের কাহিনীর অবতারণা মদীনাতেই সর্বপ্রথম করা হয় এবং তাহাও ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম হইতে বাহির হইয়া আসিবার জন্য যে কোন অবস্থা এইরূপ প্রচারণামূলক বক্তব্য একটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভ্রান্তিকর।
প্রাচ্যবিদবর্গ, বিশেষ করিয়া ওয়াট ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্মের বিপক্ষে কুরআনের কৈফিয়তমূলক বিষয়বস্তুর সন্ধান লাভের চেষ্টা করেন এবং তাহাদের এইরূপ দাবির মধ্যে তাহারা কোন প্রকার অসঙ্গতি দেখিতে ব্যর্থ হন। এইভাবে যদি হানীফিয়াহ শব্দটি এক সময়ে মুহাম্মাদ -এর
ধর্মের নামের বেলায় অবশ্যই প্রযুক্ত হইয়া থাকে এবং যদি ইসলাম ও মুসলিম শব্দদ্বয়ের কৌশলগত ব্যবহার হিজরী দ্বিতীয় সনের সমাপ্তির পূর্বে সম্পন্ন না হইয়া থাকে তাহা হইলে ইহা একই সময়ে এইরূপ সুপারিশ করা যাইতে পারে না যে, হানীফ ও হানাফীয়াহ শব্দদ্বয়ের ধারণা মদীনার আমলের গোড়ার দিকে অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরী সালের দিকে ছাড়া বাস্তবে বিদ্যমান ছিল না, যখন এমন দাবি করা হয় যে, মহানবী ইসলাম ও মুসলিম শব্দ দুইটিকে গ্রহণ করেন এবং ইয়াহুদীদের সহিত কলহ করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম হানীফ ও হানীফিয়াহ শব্দদ্বয়ের প্রয়োগ করেন। তথাপি ওয়াট তাহার পূর্ববর্তীগণের অনুসরণপূর্বক তাহার পাঠকবর্গকে এই জাজ্জ্বল্যমান অসঙ্গতি গ্রহণের জন্য উপহার দিতে পারেন।
পুনঃ ওয়াট স্বীকার করেন যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে (বস্তুত সর্বদা) কুরআনে হানীফ শব্দটি মুশরিকুন অর্থাৎ অংশীবাদীদের সহিত তুলনামূলক বৈপরীত্য বুঝাইবার জন্য ব্যবহৃত হইয়াছে এবং ধর্ম হিসাবে বহু ঈশ্বরবাদের বিপরীতে হানীফিয়াহকে উল্লেখ করা হইয়াছে। এই প্রসংগে ওয়াট যেমন বলেন, হানীফিয়াহ-এর বিপরীতে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের দুর্নীতিগ্রস্ত একেশ্বরবাদ। ১৬ তাহা হইলে ইহা নিশ্চিতরূপে বলা যায় যে, এই শব্দটির প্রয়োগের উপর ব্যাখ্যাদানের জন্য ইয়াহুদীদের সহিত অবিশ্বাসপূর্ণ সম্পর্কের কোন দোহাই দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। পূর্বসূত্র পুরাদস্তুরভাবে চালু বহু ঈশ্বরবাদ ও প্রতিমা পূজা এই সব কিছুই মক্কাতে বিদ্যমান ছিল এবং ইহার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য তাহা যথেষ্টই ছিল। এখানে আরও উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের "দুর্নীতিগ্রস্ত একেশ্বরবাদ"-এর এই ব্যাখ্যা ওয়াট-এর নিজস্ব ভাবনাপ্রসূত। কিতাবধারীদের বিপক্ষে কুরআনে হানীফ ও হানাফিয়াহ শব্দদ্বয়ের ব্যবহার সম্পর্কে বিবেচনা করিতে গেলে ইহা (কুরআন) কিতাবধারীগণকে মু'মিন হিসাবে গণ্য করে নাই, যাহাতে কুরআন তাহাদিগকে এক আল্লাহর ইবাদতের জন্য এবং কাহাকেও তাঁহার শরীক না করিবার জন্য আহ্বান জানায়।
প্রকৃতপক্ষে হানীফ ও হানীফিয়াহ-এর ব্যবহার মক্কাতেই হইয়াছিল এবং তাহা হিজরতের ও ইয়াহুদীদের সহিত মতানৈক্য হওয়ার বহু পূর্বেই ঘটিয়াছিল। মুসলিম ও ইসলাম শব্দের সহিত বিনিময় করিয়াও এই শব্দগুলিকে ব্যবহার করা হইত। কিন্তু ইহা বলা আদৌ সঠিক হইবে না যে, ইসলাম ও মুসলিমের পরিভাষাগত ব্যবহার কেবল হিজরী দ্বিতীয় সালের পরই শুরু হইয়াছিল। বেল-এর বিশ্লেষণের প্রতি যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান এবং কুরআনের আয়াত নাযিলের তারিখ নিরূপণ করা হইলেও (এবং ইহা যথার্থই স্মরণযোগ্য হইবে যে, এই বিষয়ে এমনকি ওয়াট নিজেই বেল-এর মতামত সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করেন নাই) মক্কায় অবতীর্ণ কুরআনের প্রথম দিকের অনেক আয়াত আছে যেখানে পরিভাষাগত দিক দিয়া এই দুইটি শব্দের প্রয়োগ হইয়াছে। বস্তুত কমপক্ষে তিন ডজন (৩৬টি) মক্কায় অবতীর্ণ আয়াত ১৭ আছে যেখানে এই দুইটি শব্দের একটি অথবা অন্যটি প্রয়োগ করা হইয়াছে এবং কখনও পরিভাষাগত ভাবধারায় অথবা পরিভাষাগত ও সাধারণ এই উভয় ভাবধারাতেই ইহার ব্যবহার দেখা যায়।
মুসলিম শব্দের পরিভাষাগত ব্যবহার সবচাইতে প্রথমে সূরা ৬৮: ৩৫-৩৬-এ ঘটে। আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার ক্রমানুসারে এই সূরা (আল-কালাম) সবচাইতে প্রথমের। ইহার প্রথম চারটি আয়াত প্রাচীন মুসলিম আলিমগণের (পণ্ডিতগণ) মতানুসারে দ্বিতীয় স্থানে রহিয়াছে। পক্ষান্তরে অভ্যন্তরীণ প্রমাণ হইতে ইহা স্পষ্ট হয় যে, এই সূরার অবশিষ্টাংশ ইহার প্রথমাংশ হইতে খুব বেশী পরে অবতীর্ণ হয় নাই এবং তাহা অবশ্যই মক্কাতেই নাযিল হইয়াছিল। আয়াতটি নিম্নরূপ: أَفَنَجْعَلُ الْمُسْلِمِينَ كَالْمُجْرِمِينَ . مَا لَكُمْ كَيْفَ تَحْكُمُونَ .
"আমি কি আত্মসমর্পণকারীদিগকে অপরাধীদিগের সদৃশ গণ্য করিব? তোমাদিগের কি হইয়াছে? তোমাদিগের এ কেমন (অদ্ভূত) সিদ্ধান্ত?” (৬৮: ৩৫-৩৬)।
মক্কার অবিশ্বাসীদের মস্তব্য খণ্ডনের জন্য এই ঘোষণা আসিয়াছে যে, যদি মৃত্যুর পর তাহারা আদৌ পুনরুত্থিত হয় তাহা হইলে মক্কার সমাজে তাহারা যেমন সম্মানিত ও প্রভাবশালী ছিল, মৃত্যুর পরেও তাহারা অনুরূপ সুবিধা ভোগ করিবে।১৮
কেবল এই একটি আয়াত মুসলিম ও ইসলাম শব্দের পরিভাষাগত ব্যবহার আরম্ভ করা সম্পর্কে তাহাদের ধারণা অপনোদনের জন্য যথেষ্ট বলিয়া বিবেচনা করা যায়। অন্যান্য আরও কয়েকটি আয়াত উদ্ধৃত করা যায় যাহা কেবল মক্কার প্রথমদিকের পরিভাষাগত ভাবধারায় এই শব্দের প্রয়োগের বিষয় বর্ণনার মাধ্যমে নয়, বরং ইহা প্রমাণ করা যে, (ক) হানীফ শব্দের প্রকাশের ক্ষেত্রে যেমন তেমনি মুসলিম (এবং ইসলাম) শব্দের বেলায়ও ইহা সম্পূর্ণ এক আল্লাহ্ ইবাদতকারীর অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে এবং তাহা একজন বহু ঈশ্বরবাদীর বিপরীতে অবশ্যই এবং (খ) ইহা পূর্ববর্তী সকল নবী ও তাহাদের অনুসারীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হইয়াছে।
কয়েকটি প্রাসঙ্গিক আয়াত হইতেছে। رُبَمَا يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْ كَانُوا مُسْلِمِينَ .
(১) "কখনও কখনও কাফিরগণ আকাঙ্খা করিবে যে, তাহারা যদি মুসলিম হইত" (১৫: ২)।
বিচার দিবসে কাফিরদিগের অবস্থা বর্ণনা প্রসংগে এই ঘোষণা দান করা হইয়াছে। الَّذِينَ آمَنُوا بِأَيْتِنَا وَكَانُوا مُسْلِمِينَ .
(২) "যাহারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করিয়াছিল এবং আত্মসমর্পণ করিয়াছিল (মুসলিম ছিল)......." (৪৩: ৬৯)।
এখানে পরকালে মুসলিমদের অবস্থান বুঝাইবার জন্য এই প্রসঙ্গের অবতারণা করা হইয়াছে। قُلْ إِنَّمَا يُوحَى إِلَى أَنَّمَا الْهُكُمْ إلهُ وَاحِدٌ فَهَلْ أَنْتُمْ مُسْلِمُونَ .
(৩) "বল, 'আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদিগের ইলাহ একই ইলাহ, সুতরাং তোমরা হইয়া যাও এক আল্লাহ্র প্রতি আত্মসমর্পণকারী” (২১: ১০৮)।
وَمَا أَنْتَ بِهدِى العُمْيِ عَنْ ضَلَلَتِهِمْ إِنْ تُسْمِعُ الا مَنْ يُؤْمِنُ بِأَيْتِنَا فَهُمْ مُسْلِمُونَ .
(৪) ও (৫) "তুমি অন্ধদিগকে উহাদের পথভ্রষ্টতা হইতে পথে আনিতে পারিবে না। তুমি শুনাইতে পারিবে কেবল তাহাদিগকে, যাহারা আমার নিদর্শনাবলীতে বিশ্বাস করে। আর তাহারাই আত্মসমর্পণকারী” (২৭:৮১ ও ৩০:৫৩)।
মক্কার কাফিরদের একগুঁয়ে বিরোধিতার প্রেক্ষাপটে এই আয়াত নাযিল হয়।
وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلاً مِّمَّنْ دَعَا إِلَى اللهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ انَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ .
(৬) "কথায় কে উত্তম ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা যে আল্লাহ্ প্রতি মানুষকে আহ্বান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি তো আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত" (৪১: ৩৩)।
أَفَمَنْ شَرَحَ اللَّهُ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ فَهُوَ عَلَى نُورٍ مِّنْ رَبِّهِ .
(৭) "আল্লাহ ইসলামের জন্য যাহার বক্ষ উন্মুক্ত করিয়া দিয়াছেন এবং যে তাহার প্রতিপালকের আলোকে আছে.........." (৩৯: ২২)।
قَالَمْ يَسْتَجِيبُوا لَكُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّمَا أُنْزِلَ بِعِلْمِ اللَّهِ وَأَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَهَلْ أَنْتُمْ مُسْلِمُونَ .
(৮) "যদি তাহারা তোমাদিগের আহ্বানে সাড়া না দেয় তবে জানিয়া রাখ, ইহা তো আল্লাহ্রই 'ইলম মুতাবিক অবতীর্ণ এবং তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই। তাহা হইলে তোমরা আত্মসমর্পণকারী হইবে কি” (১১: ১৪)?
কুরআন যদি আল্লাহ্ প্রত্যাদেশ না হয় তাহা হইলে কুরআনের আয়াতের ন্যায় কোন বাণী মক্কার কাফিরগণ তৈয়ার করিতে পারে কিনা এইরূপ চ্যালেঞ্জের এবং চ্যালেঞ্জ মুকাবিলাতে তাহারা অসমর্থ বুঝাইবার জন্য এই আয়াত নাযিল হয়।
فَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَمَا سَأَلْتُكُمْ مِّنْ أَجْرِ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى اللَّهِ وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ .
(৯) "অতঃপর তোমরা মুখ ফিরাইয়া লইলে লইতে পার, তোমাদিগের নিকট আমি তো কোন পারিশ্রমিক চাহি নাই, আমার পারিশ্রমিক আছে আল্লাহ্র নিকট। আমি তো আত্মসমর্পণকারীদিগের অন্তর্ভুক্ত হইতে আদিষ্ট হইয়াছি" (১০ঃ ৭২)।
নূহ (আ) তাঁহার অনুসারীদের প্রতি আহ্বান জানাইবার জন্য আল্লাহ তাঁহার মুখে এই বাণী (১০ঃ ৭২) প্রদান করেন।
وَقَالَ مُوسَى يُقَوْمِ إِنْ كُنْتُمْ أَمَنْتُمْ بِاللَّهِ فَعَلَيْهِ تَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُّسْلِمِينَ .
(১০) "মূসা বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! যদি তোমরা আল্লাহতে ঈমান আনিয়া থাক, যদি তোমরা আত্মসমর্পণকারী হও তবে তোমরা তাহারই উপর নির্ভর কর" (১০:৮৪)।
رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ .
(১১) “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদিগকে ধৈর্যদান কর এবং আত্মসমর্পণকারীরূপে আমাদিগের মৃত্যু ঘটাও” (৭:১২৬)।
মূসা (আ)-এর অনুসারিগণ আল্লাহর নিকট এই মুনাজাত করেন। তাহারা ফিরাউনের অত্যাচার ও নির্যাতন ভোগ করিয়াছিল।
فَأَخْرَجْنَا مَنْ كَانَ فِيْهَا مِنَ الْمُؤْمِنِينَ . فَمَا وَجَدْنَا فِيهَا غَيْرَ بَيْتٍ مِّنَ الْمُسْلِمِينَ .
(১২) "সেখানে যেইসব মু'মিন ছিল আমি তাহাদিগকে উদ্ধার করিয়াছিলাম এবং সেখানে একটি পরিবার ব্যতীত কোন আত্মসমর্পণকারী আমি পাই নাই" (৫১: ৩৫-৩৬)।
নবী লূত (আ)-এর লোকদের প্রসংগে ফেরেশতাদের মুখে এই আয়াত উচ্চারিত হয়।
লক্ষ্য করা যাইতে পারে যে, উপরে উল্লিখিত সকল আয়াতে ইসলাম ও মুসলিম শব্দের অভিব্যক্তি ইহার পরিভাষাগত ভাবধারায় ব্যবহৃত হইয়াছে। ইহাও উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, ২, ৭, ৮, ১০ ও ১২ নম্বর আয়াতে মুসলিম শব্দটি অর্থের দিক দিয়া একই সীমানাভুক্ত মু'মিনের সহিত উল্লিখিত হইয়াছে যেখানে মু'মিন বলিতে যাহার একমাত্র আল্লাহ্র উপর বিশ্বাস আছে তাহাকে বুঝান হইয়াছে। কিন্তু ৯, ১০, ১১ ও ১২ নং আয়াতে ইহা স্পষ্ট করা হইয়াছে যে, পূর্ববর্তী নবীগণ ও তাঁহাদের অনুসারীদিগকেও মুসলিম অভিধায় আখ্যায়িত করা হইয়াছে। এখানে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, এই সকল আয়াতের সমস্তই মক্কায় অবতীর্ণ হইয়াছে।
অতঃপর মহানবী -এর মদীনায় হিজরতের পর এবং ইয়াহুদীদের সহিত তাঁহার মতপার্থক্যের কারণে ইসলাম ও মুসলিম শব্দের পরিভাষাগত ভাবধারায় ব্যবহার শুরু হইয়াছিল এইরূপ দাবির মত অসত্য ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য আর কিছুই হইতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে তাহার পূর্বসূরীদের মত ওয়াটও এই ব্যাপারে আত্মবিরোধী ও বিভ্রান্ত। তিনি আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছেন যে, মদীনায় হিজরতের পূর্বে এবং ইয়াহুদীদের সহিত মতপার্থক্যের কারণে মহানবী তাঁহার ধর্মের নাম হিসাবে আল-হানীফিয়াহ ব্যবহার করেন। একই সময়ে ওয়াট তাহার পাঠকবর্গকে বিশ্বাস করিতে বলেন যে, আল-হানীফিয়াহ ও ইবরাহীমের কাহিনী অবলম্বন মহানবী মদীনাতে ইয়াহুদীদের সহিত বিবাদের পরই কেবল গ্রহণ করিয়াছিলেন।
মহানবী -এর দৃশ্যে আবির্ভূত হওয়ার প্রাক্কালে প্রকৃত হানীফদের বিদ্যমানতা লইয়া আমাদের মনে প্রশ্ন উঠে। ওয়াট বর্ণনা করেন যে, প্রাচীন গ্রন্থসমূহ হানীফের সকল প্রকার প্রসঙ্গ
হইতেছে এমন প্রচেষ্টা যাহা কুরআনের বর্ণনা ব্যাখ্যা করে এবং যেহেতু নাম উল্লেখকৃত ব্যক্তিবর্গের কেহই নিজকে হানীফ হিসাবে অভিহিত করেন নাই, তাই তিনি বলেন নাই যে, তিনি হানীফিয়ার সন্ধানে রত আছেন। ১৯ কুরআনের ১২টি আয়াতে যেখানে হানীফের প্রসঙ্গ আসিয়াছে সেখানে বিষয়বস্তুর কোন আলোচনা ছাড়াই ওয়াট বর্ণনা করেন যে, “ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের পূর্বের অর্ধ শতাব্দীর মধ্যে কোন হানীফ আন্দোলন হইয়াছে এইরূপ সামান্যতম ইঙ্গিত কুরআনে পাওয়া যায় না”। ২০ তিনি জোর দিয়া বলেন, "এমন কোন প্রমাণ নাই পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক হানীফ নামে অভিহিত কোন ব্যক্তি নিজে এই নাম ব্যবহার করিয়াছে অথবা সমসাময়িক ব্যক্তিবর্গ দ্বারা হানীফ নামে সম্বোধিত হইয়াছে"।......এই হানীফিয়াহ আন্দোলন সম্পূর্ণভাবে দ্বিতীয় শতাব্দীর মুসলিম পণ্ডিতদের দ্বারা সৃষ্ট।” ২১ তাহার মতানুসারে প্রাথমিক পর্যায়ের মুসলিম পণ্ডিতগণ "কুরআনের কোন কোন আয়াতের পটভূমি বর্ণনার চেষ্টা করেন অথবা সম্ভবত কুরআনের অধিকাংশ ভাব ও ধারণা ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম হইতে গ্রহণ করা হইয়াছে এইরূপ শত্রুতামূলক প্রচারণার প্রতিবাদ করেন"। ২২ তিনি অন্য স্থানে বলিয়াছেন, "মুসলিমগণকে নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করিতে হইবে। তিনি বলেন, মুসলমানদের ধর্ম হইতেছে আল্লাহ্ খাঁটি ইবাদত যাহা মুহাম্মাদ ও তাঁহার পূর্ববর্তী নবীগণের উপর অবতীর্ণ হইয়াছে। ২৩ তবুও কেবল প্রাথমিকভাবে আমাদের মুসলিম পণ্ডিতগণ কর্তৃক সরবরাহকৃত নাম ও তথ্যাদির উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করিয়া ওয়াট একই সময়ে বর্ণনা করিয়াছেন যে, হানীফ নামে অভিহিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ "এতদসত্ত্বেও একত্ববাদের প্রতি তেমন আকর্ষণ অনুভব করে নাই" এবং এই সকল ব্যক্তির প্রকৃত অস্তিত্ব ঐ পথের একটি অতিরিক্ত বিবরণ প্রদান করে যেখানে একত্ববাদ তৎকালীন পরিবেশে পরিব্যপ্ত হইয়া পড়ে। আর এইরূপ পরিবেশেই মুহাম্মাদ বড় হইয়া উঠেন। ২৪ "এই আন্দোলন ও ব্যক্তিবর্গের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু কোন ব্যক্তি একজন হানীফ (ইসলামী ভাবধারায়) এইরূপ কোন নিশ্চিত দাবি পরবর্তী কালের কোন মুসলিম কৈফিয়ত দানকারীর কাজ....."। ২৫
যেহেতু কুরআনে কোন হানীফ আন্দোলন সম্পর্কে বর্ণনা নাই এবং হানীফ আন্দোলনের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে দ্বিতীয় শতাব্দীর মুসলিম পণ্ডিতবর্গের সৃষ্টি, তাই ওয়াট এই বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিয়া গুরুত্বের সহিত একই সাথে দাবি করেন যে, সেই সময়ে এই আন্দোলন ও হানীফ নামধারী ব্যক্তিবর্গ বিদ্যমান ছিলেন। আর হানীফ ও আল-হানীফিয়াহ আখ্যাদান হইতেছে পরবর্তী কালের মুসলিম কৈফিয়তদানকারীদের কাজ। এইরূপ দৃশ্যমান অসঙ্গতি অথবা বরং হানীফ ও আল-হানীফিয়্যাহ পরিভাষাদ্বয়ের বিষয়ে মূল আপত্তির সহজে ব্যাখ্যা দান করা যাইতে পারে।
যদিও Goldziher উল্লেখ করেন যে, এক আল্লাহর ইবাদতের প্রতি আগ্রহশীল কিছু সংখ্যক ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কে মুসলিম ঐতিহাসিকগণ কথা বলেন, কিন্তু একত্ববাদের প্রতি গড়িয়া উঠা কোন আন্দোলন সম্পর্কে কোন বর্ণনা করেন না। Sprenger-এর মত এই যে, মুহাম্মাদ ঐরূপ তত্ত্বের সহিত সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গের নিকট হইতে অনুপ্রেরণা লাভ করেন, যে তত্ত্বে বলা হয় যে, তিনি ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম হইতে তাঁহার তথ্য সংগ্রহ করেন। এই ধারণাটি শীঘ্রই আপনা হইতে।
প্রকাশ পায় যে, যাহারা একত্ববাদের অন্বেষণে বাহির হইয়াছিলেন তাহারা ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম হইতে একত্ববাদের মূলনীতি আত্মীভূত করেন এবং এই দুইটি ধর্ম দ্বারা একত্ববাদের প্রতি গড়িয়া উঠা ঝোঁক ও আন্দোলনের উন্নতি বিধান ঘটে। মুহাম্মাদ কেবল এই দুইটি ধর্ম হইতেও প্রচুর পরিমাণ তথ্য আহরণ করেন নাই, চলমান প্রবল ক্ষমতাসম্পন্ন প্রবণতা হইতেও একত্ববাদের জন্য তিনি প্রয়োজনীয় অনুপ্রেরণা লাভ করেন। এইরূপ তত্ত্বের বিরুদ্ধে একমাত্র আপত্তি হইতেছে আল-হানীফিয়ার ধারণা এবং প্রকৃতপক্ষে ইবরাহীমের কাহিনীর প্রসঙ্গের অবতারণা। অতএব ইহা এখন পরিহার করা অথবা হানীফ ও আল-হানীফিয়াহকে স্বস্থান হইতে সরাইয়া দেওয়া প্রয়োজনীয় হইয়া পড়িয়াছে। তাই তাহাদের উপর এই আক্রমণ, যেমন প্রাচ্যবিদগণ ইবরাহীমের কাহিনীর উপর আক্রমণ সূচিত করিয়াছেন।
প্রাচ্যবিদগণ তাহাদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ত্রিমুখী কৌশল গ্রহণ করেন। প্রমাণ করিবার জন্য এইরূপ প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয় যে, হানীফ পরিভাষাটির উৎপত্তি বিদেশে এবং এমনকি যদি আরবদেশে ইহা বর্তমান কালেরও হইয়া থাকে তবুও ইহার অর্থ হইতেছে 'পৌত্তলিক' অথবা প্রাচীন আরবের স্থানীয় ধর্মের অনুসারী। দ্বিতীয়ত, ইহা উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মুহাম্মাদ মদীনায় ইয়াহুদীদের সহিত যখন কলহে লিপ্ত হন তখন তাঁহার প্রচারিত ধর্মোপদেশ ইবরাহীমের বলিয়া খুঁজিয়া বাহির করা হয় এবং একত্ববাদের বিপরীত অর্থে তিনি তাঁহার প্রতি হানীফ শব্দটি প্রয়োগ করেন। আর ইহা করা হয় খাঁটি মৌলিক আরব ধর্মের সহিত তাঁহার প্রচারিত ধর্মের অভিন্নতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে। আরও উল্লেখ করা হয় যে, হানীফগণ ইতিহাসখ্যাত লোকদের কোন দল বা উপদল ছিল না, বরং তাহারা ছিল মুহাম্মাদ -এর অশান্ত চিত্তের ফসল।
জেফারী হইতে সংকেত গ্রহণ করিয়া প্রধানত বেলই এই দুইটি কৌশল গ্রহণ করেন। বেল-এর মতামত পুনরাবৃত্তি করিয়া এবং বস্তুত তাহার কথা উদ্ধৃত করিয়া ওয়াট তৃতীয় কৌশল তৈয়ার করেন। তিনি ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের বিরুদ্ধে কুরআনের সমর্থনমূলক তত্ত্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর মুসলিম ইতিহাসবিদগণ পর্যন্ত বিস্তৃত করিয়া দাবি করেন যে, হানীফের কাহিনী তাহাদের তৈয়ারী অথবা কুরআনের কৈফিয়তমূলক তথ্য সমর্থনের জন্য তাহাদিগকে হানীফ আখ্যা দেওয়া হইয়াছে। তিনি ইহার সহিত আরও যুক্ত করেন যে, এই আন্দোলন ও আন্দোলনের সহিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ যেই সময় বর্তমান ছিল এবং ইহাতে মুহাম্মাদ যে পরিবেশে বড় হইয়া উঠেন সেই পরিবেশে একত্ববাদের পরিব্যাপ্তির প্রমাণ পাওয়া যায়। এইরূপে কার্যত ওয়াট স্প্রেংগারের তত্ত্বকে বেল-এর মতামতের উপর জোড়া দিয়াছেন অথবা ইসলাম ধর্মের উৎপত্তির ইয়াহুদী-খৃস্টীয় উৎস সম্পর্কিত তত্ত্বের সহিত স্প্রেংগার ও বেল-এর মতামতের মিশ্রণ ঘটাইয়াছেন। এই মিশ্রণের বিভিন্ন উপাদান আর যাহা হউক অন্যায়ভাবে আত্মীভূত যাহার প্রত্যেকটি উপাদানের পৃথক পরিমিতি বিদ্যমান। অতঃপর এই বিভ্রান্তিমূলক ও অসঙ্গতিপূর্ণ বিবরণ যে, হানীফ আন্দোলন "সম্পূর্ণভাবে
দ্বিতীয় শতকের মুসলিম পণ্ডিতবর্গের সৃষ্টি” ও “এই আন্দোলন এবং আন্দোলন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বিদ্যমান ছিল” ইত্যাদি।
এই সকল কৌশলের মূলগত ধারণা যেমন একত্ববাদের প্রতি সৃষ্ট ঝোঁক ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম কর্তৃক পরিপোষিত হইয়াছে, একটি ভ্রান্তি যাহা মুহাম্মাদ ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম হইতে তাঁহার সকল তথ্য ও ভাব আহরণ করিয়াছেন-এইরূপ ভ্রান্তির সহিত তুলনীয়। এই পরবর্তী ধারণার চূড়ান্ত অগ্রহণযোগ্যতা ইতোপূর্বে আলোচনা করা হইয়াছে। ২৬ যেহেতু এই দুইটি ধর্ম ব্যবস্থা প্রাথমিক পর্যায়ের ইতিহাসবিদগণ কর্তৃক উল্লিখিত তথ্যানুসন্ধানকারীদের মধ্যে একত্ববাদের মূল ভাব জাগ্রত করিতে পারে নাই, তাহা তথ্য সহকারে উপরে সবিস্তার আলোকপাত করা হইয়াছে এবং একই সাথে তাহাদের দ্বারা ইহাও উল্লিখিত হইয়াছে। সাধারণভাবে ঐ সকল তথ্যানুসন্ধানকারীদের নিকট যখন এই দুইটি ধর্ম ব্যবস্থা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট পণ্ডিতগণ ব্যাখ্যা প্রদান করেন তখন তাহাতে যেমন তাহারা অনুপ্রাণিত হয় নাই তেমনি তাহারা এই দুইটি ধর্মের কোনটিকেই গ্রহণ করে নাই। বাস্তবিকই প্রকৃত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুসন্ধিৎসু মনের কৌতূহল মিটাইবার জন্য বিদ্যমান ধর্মীয় ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততা ও অক্ষমতাকে পূর্বাহ্নে মানিয়া লইতে বাধ্য করে। কারণ ইহা এমন একটি অবস্থা যাহা একটি নূতন ব্যবস্থার উদ্ভব ও সাফল্য সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা প্রদান করে। ইবরাহীমের মূল ধর্মকে খুঁজিয়া বাহির করিবার আকাঙ্খা উপস্থাপিত হয় শুধু ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্মের ভাবধারা সেই সময়কার পরিবেশের মধ্যে অনুপ্রবেশ দ্বারা নয়, বরং একদিকে সেই সময়ে বিদ্যমান ব্যাপকহারে প্রতিমা পূজা ও বহু ঈশ্বরবাদের বিরুদ্ধে আকস্মিক এক বিরাট পরিবর্তন দ্বারা এবং অপর দিকে ইবরাহীমের ধর্মোপদেশ সম্পর্কে সচেতনতা ও অবিরাম চলমানতা দ্বারা। ইহা আরবদের প্রতিমা পূজার কারণে অধঃপতিত হওয়া সত্ত্বেও মহামহিম প্রভু এক আল্লাহ্ নাম ও ধারণা, কা'বা শরীফের পবিত্রতা ও ইহার সহিত সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদি জাগরুক রাখিয়াছে। কারণ কল্পনার চূড়ান্ত বিস্তার ঘটাইয়াও ইহা বলা যাইবে না এই পরবর্তী ধারণাসমূহ ও কর্মকাণ্ড ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্মের প্রভাবে জন্মলাভ করিয়াছে অথবা ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে ইহার আদৌ কোন অস্তিত্ব ছিল না।
ইহাও একটি অন্যায্য দাবি যে, প্রথম আমলের মুসলিম ইতিহাসবিদগণ হানীফের কাহিনী উদ্ভাবন করেন অথবা কুর'আনে উল্লিখিত কাহিনীর উপর গুরুত্বারোপের উদ্দেশ্যে তাহাদের জন্য এই পদবী বা আখ্যা উদ্ভান্ন করেন। এই অভিযোগের সপক্ষে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। এইরূপ অভিযোগ আনয়নের পর প্রাচ্যবিদগণ বস্তুত ইতিহাসবিদদের বিরুদ্ধে দুইটি বক্রোক্তি করেন। যেমন কুর'আনে হানীফের প্রসঙ্গ সম্পর্কে ভুল বুঝাবুঝি এবং মিথ্যা উদ্ভাবন। যেমন ওয়াট নিজেই উল্লেখ করেন যে, কুরআন কোনভাবেই কোন হানীফ আন্দোলনের কথা বলে না। তাই ইতিহাসবিদগণের গল্পের জন্য হানীফদের খুঁজিয়া বাহির করিবার কোন প্রয়োজন পড়ে না। অথবা
ইহা বলাও সঠিক হইবে না যে, ঐ সকল ব্যক্তির যাহারা ইবরাহীমের মূল ধর্মের অন্বেষণে রত ছিল তাহারা হানীফ নামে পরিচিত ছিল না অথবা নিজেদেরকে উক্ত নামে অভিহিত করিত না। সূত্রগ্রন্থসমূহে স্পষ্ট করিয়া তাহাদিগকে হানীফ নামে অভিহিত করা হইয়াছে। এই সূত্রসমূহে আরও উদ্ধৃত করা হইয়াছে যে, তাহারা ইবরাহীমের মূল ধর্ম আল-হানীফিয়াহ-এর অন্বেষণ করিতেছিল। ওয়াট এই প্রামাণিক তথ্য প্রত্যাখ্যান করেন বিশেষ করিয়া এই কারণে যে, ঐ সকল ব্যক্তিকে উপলক্ষ করিয়া রচিত কবিতা ও বিবরণী অযৌক্তিক ও অসঙ্গতিতে পূর্ণ। কিন্তু অন্যান্য বিষয়ে বাস্তব অবস্থাকে প্রতিফলিত করিয়া রচিত কবিতাকে প্রামাণিক সাক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করিয়াছেন। তবে যাহাই ঘটুক না কেন ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, হানীফ শব্দ ইসলাম-পূর্ব আরবদেশে প্রচলিত ছিল এবং প্রাচ্যবিদগণ নিজেরাই ইহা স্বীকার করেন। তবে ইহা ইবরাহীমের মূল ধর্মের স্বীকৃতিমূলক ভাবধারায় ব্যবহৃত হইত। কুরআনে এই শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে ইহার সাধারণভাবে গৃহীত ও বোধগম্য ভাবধারায়, তবে তাহা বিপরীত ও দুর্বোধ্য অর্থে নয়। তাই ইসলাম-পূর্ব আরবে এই শব্দের অবিমিশ্র ব্যবহার হইতেছে একটি চূড়ান্ত প্রমাণ যে, একটি বিশেষ ধরনের ব্যক্তিবর্গের প্রসঙ্গে ইহা ব্যবহৃত হয়। অতএব এইরূপ সিদ্ধান্তে আসা যাইতে পারে যে, ঐ নাম বা আখ্যা দ্বারা কাহাকেও পরিচিত বা অভিহিত করা হইত না-এইরূপ ধারণা করা হাস্যকর প্রস্তাব ছাড়া আর কিছুই নহে।
আবার ইয়াহুদী ও খৃস্টীয় সমালোচনার বিপক্ষে কুরআনের কৈফিয়তমূলক তত্ত্ব যাহার উপর মুসলিম ইতিহাসবিদদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অপবাদের ভিত্তি সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন ও অগ্রহণযোগ্য। এখন প্রাপ্ত তথ্যসমূহের সারসংক্ষেপ করিলে দাঁড়ায়: (ক) শুধু ইবরাহীমের নহে, প্রকৃতপক্ষে পূর্ববর্তী সকল নবীর উল্লেখ মক্কাতেই হইয়াছিল এবং তাহা সর্বপ্রথম মদীনাতে হয় নাই। (খ) মক্কাতেই বর্গীয় বা দলগত ভাবধারায় হানীফ শব্দের ব্যবহার হয় এবং তাহাই ইবরাহীমের প্রসংগে এবং সম্পূর্ণরূপে একত্ববাদের অর্থে প্রযুক্ত হয়। (গ) সেই পরিমাণ হানীফ হিসাবে ইবরাহীমের প্রসঙ্গ মদীনাতে এবং কিতাবধারীদের সম্পর্কে উল্লিখিত হইয়াছিল যেই পরিমাণে ইবরাহীমের সহিত অভিন্নতার সম্পর্কে তাহাদের দাবির প্রত্যুত্তরে এবং এইরূপ অসঙ্গতি নির্দেশ করিবার উদ্দেশ্যে তাহাদের সুস্পষ্ট বহু ঈশ্বরবাদে বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান দ্বারা সম্পন্ন হইয়াছিল। ইহা অত্যন্ত সঙ্গতভাবে উল্লেখ করা হয় যে, ইবরাহীম বহু ঈশ্বরবাদী (অংশীবাদী) ছিলেন না, যাহাতে যদি তাহারা তাহাদের দাবির প্রতি বিশ্বস্ত থাকে তাহা হইলে একত্ববাদের অপরিহার্য বস্তুসমূহকে মানিয়া লওয়া উচিত হইবে। একটি সাধারণ কর্মপন্থায় সকলকে সমবেত হইবার উন্মুক্ত আহ্বান হইতে ইহা মোটামুটি স্পষ্ট হয় যে, সকলে এক আল্লাহ্র ইবাদত করিবে এবং তাঁহার সহিত কাহাকেও শরীক করিবে না। তাই কুরআনের পক্ষে কোন কৈফিয়ত প্রদান ও আত্মরক্ষার কৌশল অবলম্বনের প্রশ্ন উঠে না। মদীনায় অবতীর্ণ সূরাসমূহের বিষয় বিবেচনা করা হইলে একজন হানীফ (মু'মিন) হিসাবে ইবরাহীমের প্রসঙ্গ সম্পর্কে কুরআনের মনোভাব হইতেছে
কিতাবধারীদের বহু ঈশ্বরবাদী বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা ও আচার-অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ ও প্রকাশ্যে নিন্দা জ্ঞাপন। (ঘ) অথবা এমন নহে যে, কুরআনের যে কোন স্থানে যেমন প্রাচ্যবিদগণের ধারণা মুতাবিক একটি প্রাচীন ও বিশুদ্ধতর একত্ববাদের এমন কোন দাবি করা হইয়াছে। কোন নবীর শিক্ষার জন্য কোন অগ্রাধিকার বা শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করা হয় নাই। পক্ষান্তরে ইয়াকুব, মূসা ও ঈসা (আ)-সহ সকল নবীর ক্ষমতা ও একত্ববাদের ইবাদতকামিতা এবং তাঁহাদের সকলের ধর্মীয় শিক্ষার অনুবৃত্তি সকল সময় ধরিয়া গুরুত্বলাভ করিয়া আসিয়াছে। তাঁহাদের কাহারও মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য সৃষ্টি করা হয় নাই। (ঙ) পর্যায়ক্রমে সর্বশেষ বটে কিন্তু গুরুত্বহীন নহে যে, এই মক্কাতেই ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের সকল প্রকার মৌলিক বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান হইতে একটি স্পষ্ট ব্যতিক্রম সূচিত হয়। অতএব ইহা প্রকৃত সত্যের অপলাপ ভিন্ন আর কিছুই হইতে পারে না যে, মুহাম্মাদ এর মদীনায় হিজরত করিবার পর তাহার সহিত ইয়াহুদীদের বিবাদ সৃষ্টি হইলে তিনি ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম হইতে সরিয়া আসিবার জন্য ইবরাহীমের ধর্ম ও আল-হানীফিয়ার আশ্রয় গ্রহণ করেন।
এই সর্বশেষ বিষয়টি আরও কিছু সতর্ক মনোযোগ আকর্ষণের দাবি রাখে। ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর ইহা একটি প্রতিষ্ঠিত ও সুপরিচিত ধরন এই যে, যখনই কোন ব্যক্তি বা কোন দল কোন কিছু সংস্কারের জন্য নূতন পরিকল্পনা বা কর্মসূচী লইয়া আগাইয়া আসে তখন তাহারা প্রথম যে পদক্ষেপটি গ্রহণ করে তাহা হইতেছে তাহাদের পরিকল্পনার অভিনবত্ব ও মূলনীতির ব্যাখ্যাদান এবং কেন ইহা প্রচলিত বিশ্বাস, ধারণা ও আচার-অনুশীলন হইতে প্রস্তাবিত কর্মসূচিটি ভিন্ন তাহা তুলিয়া ধরা। প্রকৃতপক্ষে তাহাদের পরিকল্পনার সাফল্য এই প্রাথমিক পদক্ষেপের উপরই নির্ভর করে এবং বিশেষত যদি সেই কর্ম-পরিকল্পনা কোন মতবাদ ও বিশ্বাসের সহিত সম্পর্কিত হইত। অতএব মুহাম্মাদ কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ যদি তাঁহার স্বীয় চিন্তা ও প্রস্তুতির এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর স্বাভাবিক প্রবাহের সহিত কোন পারম্পর্য থাকিত তাহা হইলে ইহা যথার্থই হইত যে, সূত্রপাতেই, তিনি প্রচলিত বিশ্বাস ও মতের সহিত তাহার নিজস্ব ভাবধারার বৈশিষ্ট্যকে ব্যাখ্যা করিতে পারিতেন। বাস্তবিকই মদীনায় হিজরতের পূর্বে তিনি যে সমর্থন লাভ করেন এবং যে বিরোধিতার সম্মুখীন হন, তাহা কেবল তাঁহার ধর্মপ্রচারের নূতনত্ব ও স্বাতন্ত্র্য দ্বারা ব্যাখ্যা করা যাইতে পারে। এই সুপরিচিত ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর বিপরীতে, স্বাভাবিক যুক্তি ও সাধারণ জ্ঞানের বিপরীতে এবং সর্বোপরি কুরআন ও ঘটনাপঞ্জীর বিপরীতে প্রাচ্যবিদগণ আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে প্রয়াসী হন যে, মুহাম্মাদ ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম হইতে কিছু পরিমাণ তথ্য আহরণ করেন এবং তাহাও অপ্রধান সূত্র হইতে সংগৃহীত হয়। তারপর একটি নূতন ধর্মের ২৭ নামে ইহা প্রচার করিতে থাকেন। দীর্ঘ দশ বৎসরের অধিক কাল ধর্ম প্রচার করিবার পর তিনি মদীনায় আগমন করেন এবং ইয়াহুদীদের সহিত বিবাদে জড়াইয়া পড়েন। সেই সময় তিনি অনেক প্রাচীন কোন নবীর শিক্ষার সহিত তাহার নীতিসমূহের অনুসরণের মাধ্যমে ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম হইতে
সরিয়া আসেন। ইহা বিস্ময়কর যে, এইরূপ একটি অদ্ভুত হাস্যকর যুক্তি এত গুরুত্ব সহকারে উপস্থাপন করা হইয়াছে। কুরআন এবং অতঃপর মহানবী খৃস্টানদের ত্রিত্ববাদ, আল্লাহ্ পুত্রত্ব, ঈসার উপর আল্লাহ্ ক্ষমতা আরোপ এবং কিতাবধারীদের এইরূপ অন্যান্য বিশ্বাস একেবারে শুরু হইতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তাহাদের ইবরাহীমের সহিত অভিন্নতার দাবির উত্তরে যখন একজন হানীফ হিসাবে ইবরাহীমের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয় তখন মদীনাতে ভিন্ন বিশ্বাস ও ভাবধারার বিরুদ্ধে একই রূপ আক্রমণ চালান হয়। ইবরাহীমের একত্ববাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টি আকর্ষক অথবা গঠনমূলক বহু ঈশ্বরবাদের উপর বিশ্বাস ও ধর্মাচরণের বিপক্ষে পরোক্ষ আপত্তির নিরসন হয় নাই অথবা তারপর হইতে ইহার সন্তোষজনক নিষ্পত্তি হইয়াছে। ইহার পরিবর্তে ইহা দাবি করা হয় যে, মুহাম্মাদ তাঁহার সকল ধর্মাদর্শ ও তথ্য ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম হইতে আহরণ করিয়াছেন। আরও দাবি করা হয় যে, নবী হিসাবে ১৩ বৎসর ধর্ম প্রচারের পর মদীনায় আসিয়া তিনি ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম হইতে সম্পর্কচ্ছেদ করেন। বলা হয় যে, কুরআন ও অন্যান্য ঘটনার বিবরণে আল-হানীফিয়াহ ও হানীফদের সম্পর্কে যাহা বলা হইয়াছে তাহা তাঁহার অস্থির চিত্তের অথবা ইতিহাসবিদদের কল্পনার ফসল। স্পষ্টতই কিতাবধারীদের বিশ্বাসের উপর কুরআনের আক্রমণের বিরুদ্ধে এই সকল তত্ত্ব ছিল উদ্ধৃত ঘোষণা ও কৈফিয়তস্বরূপ।
টিকাঃ
১. A. Sprenger, Das Leben und die Lehre des Mohammed. 1. Berlin 1861, pp. 45-134.
২. I. Goldziher, Muhammadanische Studien, 1, Halle 1888, pp. 1-39.
৩. দ্র. J. Wellhausen, Reste Arabiscen Heidentums, ২য় সং, বার্লিন ১৮৯৭ খৃ., পৃ. ২৩৮; D.S. Margoliouth, JRAS, 1903, পৃ. ৪৬৭-৪৯৩; Sir Charles Layall, ঐ., পৃ. ৭৭২-৭৮৪ এবং L. Caetain, Annalli dell' Islam, 1, Milan, ১৯০৫, পৃ. ১৮১-১৯২.
৪. R.A. Nicholson, A Literary History of the Arabs (১ম, সং. ১৯০৭), পৃ. মু. ১৯৮৮, পৃ. ১৫০। আরও দ্র. পি.কে. হিট্টি, History of the Arabs (১ম সং. ১৯৩৭), ১০ম সং. ১৯৮৬, পৃ. ১০৭-১০৮.
৫. ১৯৩৮ সালে সর্বপ্রথম বরোদায় প্রকাশিত.
৬. A. Jeffery, পৃ. গ্র., ১১২-১১৫.
৭. R. Bell, "Who were the Hanifs". The moslem World. ১৯৩০, পৃ. ১২০-১২৪। বেল এইভাবে জেফারির ঋণ স্বীকার করিয়াছেন, “ডঃ এ. জেফারি "The foreign Vocabulary of the Koran"-এর উপর লিখিত নিবন্ধ আলোচনাকালে এইরূপ মত প্রকাশ করেন এবং ইহা একটি মূল্যবান গ্রন্থ যাহা কোন প্রকাশক কর্তৃক সত্বর প্রকাশিত হইবে বলিয়া আশা করা যায়। এই ধারণাটি জেফারির আলোচনা হইতে আমি গ্রহণ করিয়াছি”-প্রাগুক্ত, পৃ. ১২০.
৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২১.
৯. প্রাগুক্ত বরাত.
১০. প্রাগুক্ত বরাত, পৃ. ১২২-১২৩.
১১. প্রাগুক্ত বরাত, পৃ. ১২৩-১২৪.
১২. প্রাগুক্ত বরাত, ১২৪.
১৩. N. A. Faris and H. W. Glidden, "The development of the meaning of the Koranic Hanif, "Journal of the Palestine Oriental Society," ১৯খ., ১৯৩৯, পৃ. ১-১৩.
১৪. উদাহরণস্বরূপ দ্র. Hitti, পৃ. গ্র., ১০৮; Watt, M. at M. পৃ. ১৬২-১৬৩ এবং E.I., ৩খ., পৃ. ১৬৬, নিচে আরও দ্র. মূল পাঠ.
১৫. E.I., ৩খ., পৃ. ১৬৬.
১৬. বুখারী, নং ৩৯৯ (ফাতহুল বারী, ১খ., পৃ. ৫৯৮, কিতাবুস সালাত, বাব ৩১); আযরাকী, আখবার মক্কা, ২খ., পৃ. ১৯। এই মর্মে একটি বর্ণনায় আছে যে, হিজরতের মাত্র দুই মাস পরে কিবলা পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে (দ্র. ইবন মাজাহ, নং ১০১০, ১খ, পৃ. ৩২২, কিতাব ৫. বাব ৫৬), কিন্তু ইহা সঠিক নয় বলিয়া মনে হয়.
১৭. উদাহরণস্বরূপ দ্র. কুরআনের আয়াত ৬ ৪:৭৪-৯০; ৭:৫৮-৯৩; ৭:১০০-১২৯; ১০:১৩, ১০:৪৭, ১০ :৭১-৯২; ১৬:৩৬; ১৬:৪৩-৪৪; ১৬:১২০-১২৩; ১৯ :৪১-৫৮; ২০:৯-৯৯; ২১:২৫; ২১:৫১-৯৩; ২৩:২৩-৫০; ২৬:১০-১৯১.
১৮. দ্র. সূরা ১১২ ও ১৯:১৬-৩৫, ৮০, ৮৮-৯৩; ৯৯: ৬-৮; ১০১ :৬-১১.
১৯. দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্র. আল-কুরতুবী, তাফসীর, ৭খ., পৃ. ১৪৯-১৫০.
২০. উদাহরণস্বরূপ দ্র. সূরা ২য়, আয়াত ১১১ [২:১১১].
২১. মূল পাঠটি নিম্নরূপ: إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالنَّصْرَى وَالصَّبِئِينَ مَنْ أَمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ . "নিশ্চয় যাহারা বিশ্বাস করে, যাহারা ইয়াহুদী হইয়াছে এবং খৃস্টান ও সাবিঈন-যাহারাই আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে তাহাদের জন্য পুরস্কার তাহার প্রতিপালকের নিকট। তাহাদের কোন ভয় নাই এবং তাহারা দুঃখিতও হইবে না".
২২. وَلَقَدْ أَتَيْنَا مُوسَى الْكِتٰبَ وَقَفَّيْنَا مِنْ بَعْدِهِ بِالرُّسُلِ وَأَتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَتِ . وَأَيَّدْنُهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ أَفَكُلَّمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَى أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقًا كَذَّبْتُمْ وَفَرِيقًا تَقْتُلُونَ . "এবং নিশ্চয় আমি মূসাকে কিতাব দিয়াছি এবং তাহার পরে পর্যায়ক্রমে রাসূলগণকে প্রেরণ করিয়াছি, মারয়াম-তনয় ঈসাকে স্পষ্ট প্রমাণ দিয়াছি এবং পবিত্র আত্মা দ্বারা তাহাকে শক্তিশালী করিয়াছি। তবে কি যখনই কোন রাসূল তোমাদের নিকট এমন কিছু আনিয়াছে যাহা তোমাদের মনঃপূত নহে তখনই তোমরা অহংকার করিয়াছ আর কতককে অস্বীকার করিয়াছ এবং কতককে হত্যা করিয়াছ"!
২৩. আয়াত ৩:৫১.
২৪. আয়াত ৩:৫৯.
২৫. আয়াত ৪:১১৬ : মূলপাঠ নিম্নরূপ: إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًاً بعيداً ইহা উপরে পাঠের মধ্যে উদ্ধৃত হইয়াছে.
২৬. আয়াত ১৬:৩৮ : وَأَقْسَمُ بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لَا يَبْعَثُ اللَّهُ مَنْ يَمُوتُদৃঢ়তার সহিত আল্লাহ্র শপথ করিয়া বলে, যাহার মৃত্যু হয় আল্লাহ তাহাকে পুনর্জীবিত করিবেন না"। আরও দ্র. ৭২:৭.
২৭. উদাহরণস্বরূপ আয়াত ৬:৯৪; ১০:১৮ ও ৩৯:৪৩ দেখা যাইতে পারে.
২৮. আয়াত ৫:৮০ : وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى نَحْنُ أَبْنَاءُ اللَّهِ وَأَحِبَّاءُهُ. "ইয়াহুদী ও খৃস্টানরা বলে, তাহারা আল্লাহ্র পুত্র ও প্রিয়পাত্র" .
২৯. আয়াত ২:৮০ : . وَقَالُوا لَنْ تَمَسَّنَا النَّارُ الاَّ أَيَّامًا مُعْدُودَةً "তাহারা বলে, দিন কতক ব্যতীত অগ্নি আমাদিগকে কখনও স্পর্শ করিবে না"। আয়াত ৩:২৪ :
قَالُوا لَنْ تَمَسَّنَا النَّارُ الاَّ أَيَّامًا مَّعْدُودَات . "এই হেতু যে, তাহারা বলিয়া থাকে, 'দিন কতক ব্যতীত আমাদিগকে অগ্নি স্পর্শ করিবে না'".
৩০. আয়াত ২:১১১ : وَقَالُوا لَنْ يَدْخُلَ الْجَنَّةَ الا مَنْ كَانَ هُودًا أَوْ نَصَارَى : বলে, "ইয়াহুদী বা খৃস্টান ছাড়া অন্য কেহ কখনও জান্নাতে প্রবেশ করিবে না".
৩১. আয়াত ৪:১২৩ : لَيْسَ بِأَمَانِيكُمْ وَلَا أَمَانِي أَهْلِ الْكِتَبِ مَنْ يَعْمَلْ سُوء يُجْزَى...... "তোমাদের খেয়ালখুশী ও কিতাবীদের খেয়াল-খুশী অনুসারে কাজ হইবে না; কেহ মন্দ কাজ করিলে তাহার প্রতিফল সে পাইবে...." .
৩২. আয়াত ৪:১২৪.