📄 ক. মক্কায় অবতীর্ণ সূরাসমূহে ইবরাহীম (আ)-এর পরিচয়
ইবরাহীম (আ)-এর ধর্মীয় বাণী, প্রকৃতপক্ষে পূর্ববর্তী সকল নবীর বাণীতে বারংবার মক্কায় প্রসঙ্গের অবতারণা করা হইয়াছে। এই মক্কাতেই মৌলিক ঐক্য ও নবীগণের প্রদত্ত বাণীসমূহের ধারাবাহিকতার উপর সন্দেহাতীতভাবে জোর দেওয়া হইয়াছে। মক্কার সমগ্র আমলে অবিশ্বাসী কুরাযশদের প্রতি সর্বদা প্ররোচনা দানের বিষয় এমন ছিল যে, পূর্বে তাহাদের প্রতি প্রেরিত নবীগণের ধর্মোপদেশ প্রত্যাখ্যানের কারণে তাহাদের উপর বংশ-পরম্পরায় আল্লাহ্ অভিশাপ নামিয়া আসিয়াছে। ইহা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে, আল্লাহর একত্ববাদের বাণী প্রচারের জন্য নবীগণের আগমন ঘটে। কুরআনের একেবারে প্রথমদিকের আয়াতসমূহের একটিতে এই তথ্যের উপর গুরুত্ব প্রদান করা হইয়াছে এবং ইবরাহীম ও মূসা (আ) উভয়কেই একই বাণীর বাহক হিসাবে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। আয়াতটি এইরূপ:
إِنَّ هَذَا لَفِي الصُّحُفِ الْأُولَى . صُحُفِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى "ইহা তো আছে পূর্ববর্তী গ্রন্থে-ইবরাহীম ও মূসার গ্রন্থে" (৮৭: ১৮-১৯)।
আরেকটি মক্কী আয়াতে আছে:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلا أَنَا فَاعْبُدُونِ . "আমি তোমার পূর্বে এমন কোন রাসূল প্রেরণ করি নাই তাহার প্রতি এই প্রত্যাদেশ ব্যতীত যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই; সুতরাং আমারই ইবাদত কর" (২১: ২৫)।
প্রকৃতপক্ষে পূর্ববর্তী নবীগণের উদাহরণ, তাঁহাদের প্রত্যেকের আল্লাহর একত্ববাদের প্রচার এবং বংশ-পরম্পরায় একই ধর্মীয় বাণীর ঐক্য ও ধারাবাহিকতার বিষয় মক্কায় অবতীর্ণ একাধিক আয়াতে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বর্ণনা করা হইয়াছে। ১৭ কখনও কখনও ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা (যীশু) (আ)-এর প্রতি স্বতন্ত্র গুরুত্ব আরোপ করা হইয়াছে এবং ইহা এই কারণে যে, কুরআনে যাহাদিগকে সম্বোধন করা হইয়াছে সেই সকল প্রত্যক্ষ শ্রোতা নবীগণের স্মৃতি সযত্নে হৃদয়ে লালন এবং তাঁহাদের দৃষ্টান্ত ও ঐতিহ্য অনুসরণকারী বলিয়া দাবি করেন। কিন্তু তাহাদের নিকট কখনও এইরূপ মত প্রকাশ করা হয় নাই যে, নবীগণের মধ্যে কাহারও ধর্মোপদেশ ও শিক্ষা অন্য যে কোন নবীর চাইতে অধিকতর বিশুদ্ধ ছিল।
যে আয়াতগুলি অত্যন্ত জোরালোভাবে এই বিষয়টির উপর আলোকপাত করে তাহা হইল ৬: ৮৩-৯০ আয়াত। এই আয়াতগুলিতে আল্লাহ্ একত্ববাদের বিষয়টি ইবরাহীমের অনুসারীদের বুঝাইবার জন্য তাঁহাকে যে সংগ্রাম করিতে হইয়াছে উহার বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে এবং ইহাতে সুপরিচিত নবীগণের উল্লেখ করত ধর্ম উপদেশ প্রদানকারী ব্যক্তিবর্গকে নবীগণ প্রবর্তিত পথনির্দেশ অনুসরণ করিয়া চলিবার জন্য উপদেশ দেওয়া হইয়াছে। আয়াতগুলি নিম্নরূপ:
وَتِلْكَ حُجَّتُنَا أَتَيْنُهَا ابْرَاهِيمَ عَلَى قَوْمِهِ نَرْفَعُ دَرَجَت مَّنْ نَّشَاءُ إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٌ. وَوَهَبْنَا لَهُ اسْحَقَ وَيَعْقُوبَ كُلاً هَدَيْنَا وَنُوحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ دَاوُدَ وَسُلَيْمَنَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَى وَهَرُوْنَ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ ، وَزَكَرِيَّا وَيَحْيَى وَعِيسَى وَالْيَاسَ كُلٌّ مِّنَ الصَّلِحِيْنَ . وَاسْمُعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوْطًا وَكُلاً فَضَّلْنَا عَلَى العَلَمِينَ . وَمِنْ آبَائِهِمْ وَذُرِّيَّتِهِمْ وَإِخْوَانِهِمْ وَاجْتَبَيْنَهُمْ وَهَدَيْنَهُمْ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ . ذَلِكَ هُدَى اللهِ يَهْدِي بِهِ مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ أُولَئِكَ الَّذِينَ أَتَيْنُهُمُ الكتب والحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ فَإِنْ يَكْفُرْ بِهَا هُؤُلاء فَقَدْ وَكَلْنَا بِهَا قَوْمًا لَيْسُوا بِهَا بِكُفِرِينَ . أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ فَبِهُدُهُمُ اقْتَدِهُ .
(৮৩) "এবং ইহা আমার যুক্তি-প্রমাণ যাহা আমি ইবরাহীমকে দিয়াছিলাম তাহার সম্প্রদায়ের মুকাবিলায়; যাহাকে ইচ্ছা মর্যাদায় আমি উন্নীত করি। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। (৮৪) আর আমি তাহাকে দান করিয়াছিলাম ইসহাক ও ইয়াকূব এবং ইহাদের প্রত্যেককে সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম; পূর্বে নূহকেও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম এবং তাহার বংশধর দাউদ, সুলায়মান ও আইয়ূব, ইউসুফ, মূসা ও হারুনকেও, আর এইভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদিগকে পুরস্কৃত করি। (৮৫) এবং যাকারিয়া, ইয়াহ্ইয়া, ঈসা ও ইলয়াসকেও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম, ইহারা সকলের সজ্জনদিগের অন্তর্ভুক্ত; (৮৬) আরও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম ইসমাঈল, আল-ইয়াসা, ইউনুস ও লূতকে; এবং শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছিলাম বিশ্বজগতের উপর প্রত্যেকে, (৮৭) এবং ইহাদের পিতৃপুরুষ, বংশধর ও ভ্রাতৃবৃন্দের কয়েকজনকে। আমি তাহাদিগকে মনোনীত করিয়াছিলাম এবং সরল পথে পরিচালিত করিয়াছিলাম। (৮৮) ইহা আল্লাহ্র হিদায়াত, স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাহাকে ইচ্ছা তিনি ইহা দ্বারা সৎপথে পরিচালিত করেন। তাহারা যদি শিরক করিত, তবে তাহাদের কৃতকর্ম নিষ্ফল হইত। (৮৯) এবং উহাদিগকেই কিতাব, কর্তৃত্ব ও নবুওয়াত প্রদান করিয়াছি, অতঃপর ইহারা যদি এইগুলিকে প্রত্যাখ্যানও করে তবে আমি তো এমন এক সম্প্রদায়ের প্রতি এইগুলির ভার অর্পণ করিয়াছি যাহারা এইগুলি প্রত্যাখ্যান করিবে না। (৯০) উহাদিগকেই আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করিয়াছেন, সুতরাং তুমি তাহাদের পথের অনুসরণ কর" (৬ঃ ৮৩-৯০)।
একই মর্মের দীর্ঘ আরও কয়েকটি আয়াত হইল: ২১: ৫১-৯২। ইহাতে ইবরাহীমের স্বীয় লোকদের আল্লাহ্র একত্ববাদে দীক্ষাদানের প্রচেষ্টার বিবরণের (আয়াতসমূহ ৫৩-৭০) পর বিভিন্ন নবী, যেমন ইসহাক, ইয়াকূব (জ্যাকব), লূত, নূহ, দাউদ, সুলায়মান, আইয়ূব, ইসমাঈল, ইদরীস, যুল-কিফল, যুননূন (ইউনুস), যাকারিয়্যা (আ)-এর একই মিশনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনার উল্লেখ রহিয়াছে। এই আয়াতসমূহের শেষ অর্থাৎ ৯২ নং আয়াতে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দ্ব্যর্থহীন বিবরণী আছে, যাহাতে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, এই নবীগণ একই ধর্মবিশ্বাসের অনুসারী একটি একক সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করিয়াছেন। আয়াতটি এইরূপ: إِنَّ هَذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاعْبُدُونِ
"এই যে তোমাদিগের জাতি-ইহা তো একই জাতি এবং আমিই তোমাদিগের প্রতিপালক, অতএব তোমরা আমার ইবাদত কর" (২১ঃ ৯২)।
এইরূপে অন্যান্য নবীদের সহিত ইবরাহীমের প্রসঙ্গ মক্কায় অবতীর্ণ সূরাসমূহে পুনপুন আসিয়াছে। তাঁহাদের কাহারও মধ্যে কোন পার্থক্য সৃষ্টি করা হয় নাই। এই মক্কাতেই একদিকে ইসলাম ও অন্যদিকে ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃস্টধর্মের মৌলিক পার্থক্যসমূহ স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হইয়াছে। তাই ইয়াহুদীদের ধারণামতে যীশু নবী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন ভণ্ড, প্রতারক (না'উযু বিল্লাহ)। পক্ষান্তরে খৃস্টানদের বিশ্বাস! যীশু কোন মানুষ নন, স্বয়ং স্রষ্টা তাহার মধ্যে মূর্ত। ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের এই দুই প্রকার ধারণা ইসলামে একইসাথে ও সমভাবে দৃঢ়তার সহিত প্রত্যাখ্যান করা হইয়াছে। আবার আল্লাহ্ পুত্র বা পুত্রগণের এই যে ধারণা, যাহা ইয়াহুদী ও খৃস্টান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাস তাহাও সন্দেহাতীতভাবে প্রত্যাখ্যান করা হইয়াছে। অধিকন্তু মারইয়ামের (মেরীর) বিরুদ্ধে ইয়াহুদীদের দারুণ অবমাননাকর অপবাদ স্পষ্টভাবে অগ্রাহ্য করা হইয়াছে। ইয়াহুদী ও খৃস্টান এই উভয় সম্প্রদায়ের মতবাদের বিপক্ষে ইহাও উল্লেখ করা হয় যে, বিচার দিবসে প্রত্যেক মানুষ তাহার স্বীয় কৃতকর্মের জন্য দায়ী থাকিবে এবং তাহাকে একক ও ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহ তাআলার নিকট জবাবদিহি করিতে হইবে। এই বিচারের সময় কোন জাতি, বংশ এবং এমনকি কোন ব্যক্তি কর্তৃক সাধারণ ক্ষমা প্রভৃতি কোন কিছুই কাজে আসিবে না। ১৮ এই সকল ক্ষেত্রে মদীনায় যাহা পরবর্তীতে ঘটিয়াছিল তাহা এই সকল বিষয়ের বিশদীকরণ ভিন্ন অন্য কিছ নহে।
টিকাঃ
১৭. উদাহরণস্বরূপ দ্র. কুরআনের আয়াত ৬ ৪:৭৪-৯০; ৭:৫৮-৯৩; ৭:১০০-১২৯; ১০:১৩, ১০:৪৭, ১০ :৭১-৯২; ১৬:৩৬; ১৬:৪৩-৪৪; ১৬:১২০-১২৩; ১৯ :৪১-৫৮; ২০:৯-৯৯; ২১:২৫; ২১:৫১-৯৩; ২৩:২৩-৫০; ২৬:১০-১৯১।
১৮. দ্র. সূরা ১১২ ও ১৯:১৬-৩৫, ৮০, ৮৮-৯৩; ৯৯: ৬-৮; ১০১ :৬-১১।
📄 দুই: জেফারী-বেল তত্ত্বের অসমর্থনযোগ্যতা
শুরুতেই ইহা উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, হানীফ শব্দের উৎপত্তি সম্পর্কিত বিবরণীসমূহ ধ্বনিত রঙ্গের সাদৃশ্যের উপর ভিত্তি করিয়া প্রণীত। তাই স্পষ্টভাবে ইহা অনুমান নির্ভর এবং কেবল পরীক্ষামূলক। বস্তুত বেল কর্তৃক জেফারীর মতামতকে সমর্থনের খুব বেশী পরে নয় দুইজন পণ্ডিত যুগ্মভাবে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করিয়া উহাতে আলোচনা করেন যে, শব্দটির প্রয়োগ ইসলাম-পূর্ব যুগের এবং তাহার মতে প্রাচীন সিরিয়ার ও আরামীয়-নাবাতীয় ভাষা হইতে ইহার উৎপত্তি হইয়াছে। ১৩ তখন হইতে শব্দটির উৎপত্তি লইয়া পণ্ডিতগণের মধ্যে মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়, তাহারা ইহাকে কখনও প্রাচীন সিরিয়ার আবার কখনও প্রাচীন নাবাতীয় ভাষার বলিয়া অনুমান করেন। ১৪
শব্দটির উৎপত্তির বিষয়টি বর্তমান আলোচনার সহিত সরাসরি সম্পৃক্ততা খুবই কম বলিয়া অনুমিত হয়। কারণ ইহা সুবিদিত যে, কোন শব্দের অর্থ, স্থান ও কাজের পরিবর্তনের সহিত পরিবর্তিত হইয়া থাকে। আমাদের বর্তমান সময়ের একটি অতি শিক্ষামূলক উদাহরণ হইতেছে 'গণতন্ত্র' শব্দের প্রয়োগ। কম্যুনিস্ট ব্লকে ইহার অর্থ হইতেছে একটি সমাজতান্ত্রিক সর্ববিষয় নিয়ন্ত্রণকারী প্রথা। কিন্তু পাশ্চাত্য ব্লকে ইহা সর্ববিষয় নিয়ন্ত্রণকারী প্রথার বিপরীত। অতঃপর ইহা যদি প্রদর্শন করাও হয় যে, প্রাচীন সিরীয় ভাষাভাষী খৃস্টানগণ ধর্মহীন অসভ্য ব্যক্তি হিসাবে হানপা শব্দটিকে ব্যবহার করিত অথবা প্রাচীন স্থানীয় ধর্মের অনুসারী আরবগণ কর্তৃক শব্দটি ব্যবহৃত হইত, তবুও ইহা অপরিহার্যভাবে এই অর্থ করে না যে, আরবগণ একই ভাবার্থে আরবী শব্দ হানীফকে ব্যবহার করিত, যদিও হানপা শব্দ হইতে হানীফ শব্দের উৎপত্তি হইয়াছে বলিয়া ধরিয়া লওয়া হয়।
দ্বিতীয়ত, বিদেশী ভাষা হইতে উদ্ভূত হওয়ার তত্ত্ব প্রশ্নের জন্ম দেয়, কখন এই আহরণের ঘটনা ঘটে? সাধারণভাবে মতামতটি এমন হইবে যে, এই দৃশ্যপটে মুহাম্মাদ -এর অবতীর্ণ হওয়ার বহু পূর্বেই ইহা ঘটিয়াছিল। সেই ক্ষেত্রে শব্দটি বহু পূর্ব হইতে আরবদেশে প্রচলিত ছিল এবং ইহা একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর লোকদের বেলায় প্রযোজ্য হইত। বিষয়টি ইহা হইলে এইরূপ ধারণা করা কি যুক্তিসঙ্গত হইবে যে, ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের নিকট হইতে শুধু বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য মুহাম্মাদ একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং একজন একেশ্বরবাদীর একেবারে বিপরীত অর্থে ইহার ব্যবহার করিয়া থাকিবেন? অধিকন্তু শব্দটির এইরূপ অভিনব ব্যবহার কি তাঁহার স্বীয় লোকদের বিরোধিতা ও সমালোচনা করিতে আহ্বান করিবে না? এই বিষয়ে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের কথা না হয় বাদ দেওয়া গেল, যদিও তাহাদের বিরুদ্ধে কার্যটির পদক্ষেপ গ্রহণের কথা ছিল। কিন্তু বেল মনে করেন যে, শব্দটি কুরআনে সর্বপ্রথম ব্যবহৃত হয় এবং প্রাচীন সিরীয়ভাষী খৃস্টানগণ কর্তৃক যে অর্থে ইহার ব্যবহার হইত উহার বিপরীত অর্থে কুরআনে ব্যবহৃত হইয়াছে। কারণ বেল-এর বর্ণনামতে মুহাম্মাদ “যাহাদের নিকট হইতে তথ্য আহরণ করিতেন তাহাদের ভাষা” হইতে এই শব্দটি গ্রহণ করেন। ইহাই কি আদৌ যুক্তিসঙ্গত হইবে যে, যখন তিনি ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের
সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করিতেছেন তখনও তিনি তাহাদের ব্যবহৃত শব্দই ব্যবহার করিবেন, যদি ও আরবদের নিকট ইহা ব্যবহৃত বা বোধগম্য হইত না?
প্রকৃত তথ্য এই যে, একজন একেশ্বরবাদীর ভাবধারায় সেই সময়ে আরবে হানীফ শব্দটির স্পষ্ট প্রচলন ছিল। এমনকি বেল-এর নিজস্ব যুক্তিতর্কের বেলায়ও ইহাকে একটি অনুসিদ্ধান্ত হিসাবে বিবেচনা করা যাইতে পারে। কারণ প্রাচীন সিরীয়ভাষী খৃস্টানগণ যদি আরবদের বুঝাইতে এই পদ ব্যবহার করিয়া থাকে এবং বেল-এর স্বীকৃতিমতে যদি আবরাহাম আরবদের পূর্বপুরুষ হইয়া থাকেন তাহা হইলে তাহাদের প্রাচীন ও স্থানীয় ধর্ম একেশ্বরবাদ ভিন্ন অন্য কিছুই হইতে পারে না। কারণ বংশের আদিপুরুষ ইবরাহীম ঐশী আদেশ অনুসরণ করিয়া একটি ধর্ম প্রচার করেন এবং ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের মতানুসারে সেই ধর্ম হইতেছে আল্লাহর একত্ববাদ। স্বাভাবিকভাবে তাহা ছিল আরবদের প্রাচীন ও স্থানীয় ধর্ম। হানীফ শব্দটির এই অর্থ বিলম্বে হইলেও বেল-এর ঘনিষ্ঠ শিষ্য ওয়াট কর্তৃক স্বীকার করিয়া লওয়া হইয়াছে বলিয়া দেখা যায়। ওয়াট স্বীকার করেন যে, কিছু সংখ্যক প্রাচীন আরামীয় এলাকায় পদটির প্রাথমিক অর্থ ধর্মহীন অথবা নিকৃষ্ট ধর্মাবলম্বী হইলেও অপ্রধান অর্থে ব্যবহৃত হইতে দেখা যায়। এই অপ্রধান অর্থাৎ দ্বিতীয় অর্থে দার্শনিক মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গকে বুঝান হইয়াছে যাহারা অপরিহার্যভাবে একেশ্বরবাদী ছিল। তিনি আরও বলেন যে, কুরআনে ব্যবহৃত শব্দটিতে এই প্রধান অর্থকে অবহেলা করা হইয়াছে এবং অন্যত্র অপরিচিত নয় এইরূপ শব্দার্থ বিদ্যাগত পদ্ধতি শব্দটির দ্বিতীয় অর্থে ধীরে ধীরে অগ্রগতি লাভ করিয়াছে....। ১৫ এখানে উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, যাহাকে প্রধান অর্থ বলিয়া অভিহিত করা হইতেছে কুরআনে তাহাকে অবহেলা করা হয় নাই এবং শব্দটির অপ্রধান অর্থ তৈয়ারীতেও কোন ভূমিকা পালন করে নাই। স্মরণাতীত কাল হইতে আরববাসিগণ যে অর্থে শব্দটি বুঝিতে ও প্রয়োগ করিতে থাকে এখানে সেই অর্থে শব্দটিকে ব্যবহার করা হয়।
শব্দটির উৎপত্তি ও অর্থের প্রশ্নটি ব্যতিরেকে জেফারী-বেল তত্ত্বের প্রধান বিষয়বস্তু ছিল সম্পূর্ণরূপে ভুল। কারণ তাহাদের তত্ত্ব অনুযায়ী মহানবী মদীনায় হিজরত করিবার পর ইবরাহীম (আ)-এর ধর্মমতের ও হানীফিয়্যার সহিত তাহার ধর্মীয় শিক্ষাকে সম্পর্কিত করেন, বিশেষ করিয়া মদীনায় ইয়াহুদীদের সহিত তাঁহার মতপার্থক্য সৃষ্টি হইবার পর তিনি এইরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এখানে উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, এই তত্ত্বের অন্তর্নিহিত সূত্র হইতেছে 'কুরআন মহানবীর নিজস্ব সৃষ্টি'। এই মতামত আদৌ সত্য নয়। ইহাও সত্য নয় যেমন পূর্বে দেখান হইয়াছে যে, মহানবী মক্কায় ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের নিকট হইতে তথ্য আহরণ করিয়া তাঁহার মতবাদ তৈয়ারী করেন। তাহাদের সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করিবার উদ্দেশ্যে তিনি যেমন মক্কায় তাহাদের নিকট হইতে কোন তথ্য আহরণ করেন নাই, তেমনি মদীনাতে ইবরাহীমের ধর্মমত ও হানীফিয়্যার উপরও নির্ভর করেন নাই।
কুরআনের তিনটি স্পষ্ট ঘটনা পরবর্তী ধারণার বিরোধিতা করে। প্রথমে ইবরাহীম (আ)-এর বাণী এবং প্রকৃতপক্ষে পূর্ববর্তী সকল নবীর বাণীর সহিত পরিচিতির প্রসংগ ও ঘোষণা সর্বপ্রথম
মদীনাতে নয়, মক্কাতেই অনেক পূর্বে সম্পন্ন হইয়াছিল। কুরআনের বেশ কিছু আয়াত মক্কায় অবতীর্ণ এই তথ্যের সত্যতা প্রতিপাদন করে। এই মক্কাতেই মহানবী পূর্ববর্তী সকল নবী কর্তৃক প্রদত্ত ধর্মীয় বাণীর সাধারণ উৎস ও আবশ্যকীয় পরিচিতির উপর গুরুত্বারোপ করেন। পূর্ববর্তী নবীগণের মধ্যে ইবরাহীমের পূর্বে আগত নবী, যেমন নূহ ও আদমও রহিয়াছেন। ইহা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ মুহাম্মাদ নিশ্চিতভাবে দাবি করেন যে, সকল নবীর উপর আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ একই ছিল। তারপর আরও দাবি করেন যে, তাঁহার বাণীর উৎস হইতেছে ইবরাহীম (আ) এবং ইহাতে এই দাবির পূর্ববর্তীতা ও এক আল্লাহ্র ইবাদতের অধিকতর বিশুদ্ধতা স্বীকার করিতে গিয়া একটি সুস্পষ্ট অসঙ্গতির উপাদান পরিলক্ষিত হইবে। বেলও অনুরূপ মত পোষণ করেন। দ্বিতীয়ত, মদীনায় হিজরতের বহু পূর্বে এই মক্কাতেই ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃষ্টধর্মের মৌলিক তত্ত্বসমূহের ব্যতিক্রম সাধিত হয়। তৃতীয়, কুরআনের মক্কার ঘটনাবলীতে প্রথম হানীফের প্রসংগ দেখিতে পাওয়া যায়। মদীনায় অবতীর্ণ সূরাসমূহ ইবরাহীম (আ)-কে হানীফ হিসাবে উল্লেখ করায় ইহা স্পষ্ট যে, মূসা ও ঈসা (আ)-এর বাণীসমূহকে অবজ্ঞা করিবার কোন অভিপ্রায়ের বিন্দুমাত্র ইঙ্গিত পাওয়া যায় না, তেমনি সকল নবীর প্রদত্ত বাণীসমূহের একত্ব ও অভিন্নতার উপর যে গুরুত্ব আরোপ করা হয় তাহা হইতে সামান্যতম ব্যতিক্রমও পরিলক্ষিত হয় না।
কুরআনের প্রাসঙ্গিক আনুপূর্বিক বর্ণনাসমূহ দ্বারা উপরি উল্লিখিত ঘটনাসমূহ ব্যাখ্যা করিবার পূর্বে জেরুসালেম হইতে মক্কার দিকে কিবলা পরিবর্তনের বিষয়টি সংক্ষেপে উল্লেখ করা প্রয়োজন। কিবলা পুনঃনির্ধারণের বিষয়টি অবশ্যই তাঁহার মদীনায় আগমনের পর ঘটে, তবে তাঁহার মদীনায় পৌঁছিবার ষোল কি সতর মাস পর অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরীর রজব মাসের মধ্যবর্তী সময়ে ইহা ঘটে। ১৬ ইহার অর্থ বদর যুদ্ধের দুই মাসেরও বেশী পূর্বে কিবলা পরিবর্তিত হয়, আর বদর যুদ্ধ ঐ বৎসরের রমযান মাসে সংঘটিত হইয়াছিল। ইহা সকলের নিকট সুবিদিত যে, বদর যুদ্ধের পর কোন এক সময় হইতে ইয়াহুদীদের সহিত মতানৈক্য শুরু হয়। অতএব কিবলা পরিবর্তনের কারণ যাহাই হউক না কেন ঐতিহাসিকভাবে ইহা প্রমাণিত করা যাইবে না যে, গৃহীত ব্যবস্থাটি ছিল ইয়াহুদীদের সহিত মতপার্থক্যের পরিণতি।
যাহা হউক, ইহা যদি মহানবী এর নিজস্ব সিদ্ধান্তের ফল হইত তাহা হইলে তিনি একটি সুবিধামত সময়ে ইহার ব্যবস্থা করিতেন। কারণ সেই সময়ে মদীনাতে তাঁহার অবস্থান তেমন সুসংহত হয় নাই এবং সেই সময় এমন কিছু করিলে তাহা ইয়াহূদীদিগকে তাঁহার বিরোধী করিয়া তুলিত। তাই তিনি বরং নূতন স্থাপিত এই রাষ্ট্রের প্রতি ইয়াহুদীদের সমর্থন ও আনুগত্য লাভের চেষ্টা করিতেছিলেন। ইহা কিছু পরিমাণে হইলেও বিপক্ষে বলা হইবে যে, মহানবী মক্কাকে তাঁহার ধর্ম প্রতিষ্ঠার কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করিতে চাহিয়াছিলেন যখন তিনি একই সময়ে মক্কার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের পরিকল্পনা করিতেছিলেন বলিয়া বলা হইয়া থাকে। বেল অবশ্য এইরূপ ধারণা পোষণ করেন।
📄 খ. মক্কায় অবতীর্ণ আয়াতসমূহে হানীফের বর্ণনা
অনুরূপভাবে মক্কায় অবতীর্ণ কুরআনের আয়াতসমূহে প্রথমে হানীফ প্রসঙ্গটি পাওয়া যায়। যেমন বেল উল্লেখ করেন যে, হানীফ শব্দটি কুরআনে ১২ স্থানে উল্লিখিত হইয়াছে। ইহার মধ্যে ১০ স্থানে বহুবচনে ব্যবহৃত হইয়াছে। তিনি এইরূপ ধারণা প্রদান করিতে চাহেন যে, হানীফ শব্দটির ১২ স্থানে প্রয়োগ মদীনার আয়াতসমূহের বেলায় ঘটিয়াছে। কিন্তু ইহা সম্পূর্ণ ঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে এই ১২ স্থানের মধ্যে ঠিক অর্ধেক অর্থাৎ ৬ বার আমরা মক্কায় অবতীর্ণ সূরাসমূহে দেখিতে পাই। এই সূরাগুলি হইতেছে: ১০: ১০৫ (সূরা ইউনূস) ১৬: ১২০ (সূরা আন্-নাহ্) ১৬: ১২৩ (সূরা আন-নাহল) ৩০: ৩০ (সূরা আর-রূম) ৬: ৭৯ (সূরা আল-আন'আম) ৬: ১৬১ (সূরা আল-আন'আম)
কালানুক্রম অনুসারে শব্দটি সবচাইতে প্রথম ব্যবহৃত হয় সম্ভবত সূরা আর-রূম-এর ৩০ নম্বর আয়াতে (৩০: ৩০)। এই আয়াতে শিরক বা বহু ঈশ্বরবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হইয়াছে। কারণ ইহার পূর্ববর্তী ২০-২৯ নম্বর আয়াতসমূহে স্ত্রী-পুরুষভেদে বিভিন্ন প্রকার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের মানুষ সৃষ্টির বিষয়টি তুলিয়া ধরা হইয়াছে যাহাতে আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁহার পরম একত্ব ও কেবল তাঁহার ইবাদতের বিষয়টি আসিয়াছে। তারপর ৩০: ৩০ আয়াতে সরাসরি উপদেশ দান করা হইয়াছে, উহা এইরূপ:
فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا فِطْرَتَ اللهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرُ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ .
"তুমি একনিষ্ঠ হইয়া (হানীফ হিসাবে) নিজকে দীনে প্রতিষ্ঠিত কর। আল্লাহ্র প্রকৃতির অনুসরণ কর, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করিয়াছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নাই। ইহাই সরল দীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না"।
এখানে আল্লাহ্র প্রকৃতি (ফিতরাত) বলিতে যাহা প্রায়ই মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম বলিয়া উল্লিখিত হইয়া থাকে তাহা বুঝান হয় নাই, বরং ভূমিষ্ঠ হওয়ার কালে মন ও অন্তরের পবিত্রতা, বাহিরের পারিপার্শ্বিক প্রভাবমুক্ত অথবা অর্জিত অভ্যাস ও মানসিকতা, নির্ভেজাল আনুগত্য ও আল্লাহ্র প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণকেই বুঝান হইয়াছে। এই আয়াতের ঠিক পরবর্তী আয়াতে ইহার অর্থ আরও স্পষ্ট করা হইয়াছে যেখানে কেবল এক আল্লাহ্র ইবাদত, তাঁহার নিকট নিরাপত্তা ও সাহায্য চাওয়ার জন্য আহ্বান জানান হইয়াছে এবং একই সাথে তাঁহার কোন শরীক না করিবার জন্য কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে।
অনুরূপভাবে ১০: ১০৫ নং আয়াতের বিবরণীও প্রথমদিকের। এখানে পুনঃ বহু ঈশ্বরবাদের বিপরীতার্থক শব্দ হিসাবে হানীফের ব্যবহার হইয়াছে। আয়াতটির যথাসময়ের পূর্বকালীন তারিখ ইহার বিষয়বস্তু ও তৎসহ ইহার ঠিক পূর্বের ও পরের আয়াতসমূহে নির্দেশিত করা হইয়াছে। এইরূপে ১০: ১০৪ নম্বর আয়াতে মহানবী মুহাম্মাদকে এক আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাসের ধরন সম্পর্কে স্পষ্টরূপে ব্যাখ্যা করিতে বলা হইয়াছে। মক্কার বহু ঈশ্বরবাদীদের সন্দেহ ও জিজ্ঞাসার জবাবে ইহা করা হয় এবং ১০৬ নম্বর আয়াতে হানীফের ব্যাখ্যা দান করা হইয়াছে। ১০: ১০৪-১০৬ নম্বর আয়াত এইভাবে আসিয়াছে:
قُلْ يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنْ كُنْتُمْ فِي شَكٍّ مِّنْ دِينِي فَلَا أَعْبُدُ الَّذِينَ تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلَكِنْ أَعْبُدُ اللَّهَ الَّذِي يَتَوَفَّكُمْ وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ . وَأَنْ أَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا وَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُشْرِكِينَ . وَلَا تَدْعُ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنْفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ فَإِنْ فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذَا مِّنَ الظَّلِمِينَ .
(১০৪) "বল, হে মানুষ! তোমরা যদি আমার দীনের প্রতি সংশয়যুক্ত হও তবে জানিয়া রাখ, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাহাদের ইবাদত কর আমি উহাদের ইবাদত করি না। পরন্তু আমি ইবাদত করি আল্লাহ্ যিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটান এবং আমি মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হইবার জন্য আদিষ্ট হইয়াছি। (১০৫) আর উহাও এই যে, তুমি একনিষ্ঠভাবে দীনে প্রতিষ্ঠিত হও এবং কখনও অংশীবাদীদিগের অন্তর্ভুক্ত হইও না। (১০৬) এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাহাকেও ডাকিবে না, যাহা তোমার উপকারও করিতে পারে না, অপকারও করিতে পারে না। কারণ ইহা করিলে তখন তুমি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হইবে"।
উপাসনার বস্তুসমূহের, যথা দেব-দেবীর মূর্তি যাহার ভাল বা মন্দ করিবার কোন ক্ষমতা নাই, প্রসংগের অবতারণা মক্কায় বিদ্যমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে আর একটি অভ্যন্তরীণ প্রমাণ যেই কারণে এই আয়াত নাযিল হয়।
একই ভাবধারায় ও ভাষায় ৬: ৭৯ নং আয়াতে শব্দটির ব্যবহার দেখিতে পাওয়া যায়। বাস্তবিকই সূরার এই অংশ ৭১ নং আয়াতের সহিত শুরু হইয়াছে যাহা অস্বীকৃতি বা প্রত্যাখ্যানের অর্থবোধক একটি জিজ্ঞাসা: "বল, আল্লাহ ব্যতীত আমরা কি এমন কিছুকে ডাকিব যাহা আমাদিগের কোন উপকার কিংবা অপকার করিতে পারে না?" পরবর্তী আয়াতসমূহে ইবরাহীম (আ)-এর মূর্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণ না করিবার বর্ণনা রহিয়াছে। অতঃপর ইবরাহীমের ঘোষণা ৭৯ নম্বর আয়াতে এইভাবে আসিয়াছে:
إِنِّي وَجَهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِين . "আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁহার দিকে মুখ ফিরাইতেছি, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন এবং আমি অংশবাদীদিগের অন্তর্ভুক্ত নই" (৬ঃ ৭৯)।
এই সূরার ১৬১ নম্বর আয়াতের শেষ পর্যায়ে এই শব্দের ব্যবহার পুনঃ দৃষ্টিগোচর হয়। এইখানেও আয়াতের বিষয়বস্তু এই অর্থ জ্ঞাপন করে যে, ইহা মক্কাতে অবতীর্ণ হইয়াছিল। ইহার পূর্ববর্তী ১৫৬-১৫৮ নম্বর আয়াতসমূহ বিশেষভাবে আরবদের অথবা বরং মক্কাবাসীদের উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়। তাহাদিগকে বলা হয় যে, তাহাদের এই হিদায়াত গ্রহণ করা উচিত। কারণ তাহা হইলে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদিগকে যেমন আসমানী কিতাব দেওয়া হইয়াছে তেমনি আরববাসিগণকে কোন কিতাব দেওয়া হয় নাই বলিয়া যে ওজর পেশ করা হয় তাহা আর করিতে হইবে না। তাহাদিগকে সর্বশেষ আসমানী কিতাব কুরআন দেওয়া হইয়াছে। ইহার পরও তাহারা অপেক্ষা করিতে থাকিবে যে, কোন বিশেষ নির্দশন অথবা ফেরেশতা অথবা আল্লাহ স্বয়ং তাহাদের নিকট অবতীর্ণ হইবেন? ইহার অনুসরণে ১৫৯-১৬০ নম্বর আয়াতে বর্ণনা করা হইয়াছে যে, “যাহারা নিজেদের ধর্মের মধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি করত উপদেশে পরিণত হয়" তাহাদের জন্য নবীর করণীয় কিছু নাই। আর প্রত্যেকেই স্বীয় কর্মফল ভোগ করিবে। তখন ১৬১ নম্বর আয়াতে নবীকে নিম্নরূপ ঘোষণা প্রদান করিতে নির্দেশ দেওয়া হয়:
قُلْ إِنَّنِي هَدَيْنِي رَبِّي إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ دِينًا فَيَمًا مِّلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ .
"বল, আমার প্রতিপালক আমাকে সৎপথে পরিচালিত করিয়াছেন। উহাই সুপ্রতিষ্ঠিত দীন, ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ, সে ছিল একনিষ্ঠ এবং সে অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না" (৬ঃ ১৬১)।
যাহারা তাহাদের স্বধর্মে বিভক্তি আনয়ন করে তাহাদের সম্পর্কে পরোক্ষ উল্লেখের অর্থ যেমন ভাষ্যকারগণ উল্লেখ করিয়াছেন, ইয়াহুদী ও খৃস্টান সম্প্রদায় এবং এই দুইটি সম্প্রদায়ের প্রত্যেকে আসমানী কিতাব লাভ করিয়াছে। অথবা ইহার অর্থ সাধারণভাবে এমনও হইতে পারে যে, তাহারা নিজেদের ধর্মে নূতন কিছুর অন্তর্ভুক্তি কিংবা অন্য কোনভাবে পরিবর্তন সাধন করিয়াছে। কিন্তু যদি এই পরোক্ষ ইঙ্গিত ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের প্রতি আরোপ করা হয় তবুও ইহা মূল বিষয়বস্তুর ব্যতিক্রম কিছু হইবে না। কারণ নূতন ধর্মমতের বিপক্ষে মক্কার বিরোধিতা এমনই দাবি করে যে, মহানবী -এর কিছু সংখ্যক ইয়াহুদী ও খৃস্টান বন্ধু তাঁহাকে যাহা শিখাইয়াছেন তিনি তাহাই ঘোষণা করেন। অতঃপর ইহা উল্লেখ করা খুবই যুক্তিসংগত হইবে যে, তাহাদের (ইয়াহুদী ও খৃস্টান) বিষয়ে মহানবী -এর করণীয় কিছু ছিল না।
মক্কায় অবতীর্ণ অন্য দুইটি আয়াত যথা ১৬: ১২০ ও ১৬: ১২৩-এ হানীফ শব্দের উল্লেখ আছে। বস্তুত এই সূরার চারিটি আয়াত একটি স্বতন্ত্র মাত্রা গঠন করিয়াছে যাহাতে পুনরায় আল্লাহ্ একত্ববাদের উপর জোর দেওয়া এবং অংশীবাদের সকল ধারাকে প্রত্যাখ্যান করা হইয়াছে। আয়াত চারটির বর্ণনা নিম্নরূপ: إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً قَانِتًا لِلَّهِ حَنِيفًا وَلَمْ يَكُ مِنَ الْمُشْرِكِينَ . شَاكِرًا لِأَنْعُمِهِ اجْتَبُهُ وَهَدَهُ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ ، وَآتَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ .
(১২০) ইবরাহীম ছিল এক উম্মত, আল্লাহ্র অনুগত, একনিষ্ঠ এবং সে ছিল না অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত; (১২১) সে ছিল আল্লাহ্ অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞ। আল্লাহ তাহাকে মনোনীত করিয়াছিলেন এবং তাহাকে পরিচালিত করিয়াছিলেন সরল পথে। (১২২) আমি তাহাকে দুনিয়ায় দিয়াছিলাম মংগল এবং আখিরাতেও, সে নিশ্চয়ই সৎকর্মপরায়ণদিগের অন্যতম। এখন আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করিলাম, 'তুমি একনিষ্ঠ ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ কর; এবং সে মুশরিকদিগের অন্তর্ভুক্ত ছিল না" (১৬: ১২০-১২৩)।
মদীনার ঘটনাবলীতে যাওয়ার পূর্বে মক্কার ঘটনাবলী সম্পর্কে যে সকল বিষয়ের বর্ণনা করা হইয়াছে তাহার সারসংক্ষেপ বর্ণনা করা যাইতে পারে। প্রথম ও সর্বাগ্রে ইহা স্পষ্ট যে, হানীফের প্রসঙ্গ ও ইবরাহীমের ধর্মীয় বাণী মদীনায় হিজরতের বহু পূর্বে মক্কাতেই করা হয়। দ্বিতীয়, মক্কায় অবতীর্ণ সূরাসমূহে সর্বমোট ছয়টি ক্ষেত্রে 'হানীফ' শব্দের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। হানীফ নামটি সম্পূর্ণরূপে এক আল্লাহ্ ইবাদতকারীদের বেলায় ব্যবহৃত হইয়াছে যাহারা অংশীবাদীদের সকল প্রকার ছায়াকে পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করিয়াছে। তৃতীয়, ছয়টি স্থানের কমপক্ষে দুইটিতে অর্থাৎ ৩০: ৩০ ও ১০: ১০৫ নম্বর আয়াতে হানীফ শব্দটি ইবরাহীমের কোন প্রসংগ ছাড়াই ব্যবহৃত হইয়াছে। ইহার অর্থ এই যে, শব্দটি এক আল্লাহর ইবাদতকারীর এক বর্গীয় ভাবধারায় ব্যবহার এবং তাহা জনগণের সাধারণ বোধগম্যতার মধ্যেই করা হয়। তাই কুরআন, অতঃপর মুহাম্মাদ একটি নূতন ও অসাধারণ ভাবধারায় হানীফ শব্দটির ব্যবহার করিয়াছেন-এইরূপ প্রশ্নের অবতরণা করার আবশ্যক হয় না। চতুর্থ, এক আল্লাহ্ ইবাদতকারী একজন আদর্শ ব্যক্তি হিসাবে ইবরাহীম (আ)-কে চার স্থানে যদিও উদ্ধৃত করা হইয়াছে, তবুও অন্য কোন নবীকে একটি অপ্রধান অবস্থানে নামাইয়া আনার কোন প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয় নাই কিংবা ইবরাহীমের শিক্ষা হইতে তাহাদের শিক্ষাকে ভিন্নমতে দেখিবার জন্য কোন মত প্রকাশ করা হয় নাই। পক্ষান্তরে ইবরাহীমের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হইয়াছে এই বোধগম্য কারণে যে, তাঁহার প্রত্যক্ষ অনুসারীবৃন্দ যথা-আরব, ইয়াহুদী ও খৃস্টান তাঁহার স্মৃতিকে বিশেষভাবে লালন করে এবং একইসাথে সকল নবীর প্রদত্ত বাণীর পরিচিতি ও ধারাবহিকতা অভ্রান্তভাবে উল্লিখিত হইয়াছে যাহা ৬: ৮০-৯০ নম্বর আয়াতসমূহে পরিলক্ষিত হয়। ইহাতে একজন হানীফ হিসাবে ইবরাহীম (আ)-এর প্রসংগ আসিয়াছে এবং উপরের বর্ণনাতে উল্লিখিত হইয়াছে।
গ. মদীনার ঘটনাবলীতে হানীফের প্রসঙ্গ
মদীনায় যাহা ঘটে তাহা এই সকল বিষয় ও নীতিসমূহের বিশদ ব্যাখ্যা মাত্র। মদীনার ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের সামাজিক অবস্থানের প্রেক্ষাপটে মদীনার বিবৃতিসমূহ প্রণীত হয়। কিন্তু মক্কায় অবতীর্ণ সূরাসমূহে যেভাবে আসিয়াছে ঠিক সেইভাবে সম্পূর্ণরূপে এক আল্লাহর ইবাদতের উপর একইরূপ গুরুত্ব আরোপ, সকল নবী প্রদত্ত বাণীসমূহের পরিচিতি ও ধারাবাহিকতার একইরূপ পুনরুক্তি এবং হানীফ নামটির একই রূপ বর্গীয় ব্যবহার মদনীর সূরাসমূহে প্রত্যক্ষ করা যায়। মক্কায় সূরাসমূহে যেমন তেমনি মদীনার সূরাগুলিতেও ছয়টির মধ্যে দুইটি স্থানে বর্গীয় ভাবধারায় হানীফ নামটি ইবরাহীম (আ)-এর প্রসঙ্গ ছাড়াই বহুবচনে ব্যবহৃত হইয়াছে। নিম্নের ২২: ৩০-৩১ নম্বর আয়াতে এইরূপ ব্যবহার দেখা যায় :
... فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّوْرِ حُنَفَاءَ لِلَّهِ غَيْرَ مُشْرِكِيْنَ بِهِ.
(৩০) “.......... সুতরাং তোমরা বর্জন কর মূর্তিপূজার অপবিত্রতা এবং দূরে থাক মিথ্যা কথন হইতে, (৩১) আল্লাহ্র প্রতি একনিষ্ঠ হইয়া এবং তাঁহার কোন শরীক না করিয়া” (২২ : ৩০-৩১)।
হানীফ নামের বর্গীয় ব্যবহার ও তৎসহ আল্লাহর একত্ববাদের উপর গুরুত্ব আরোপ এইখানে সন্দেহাতীতভাবে পরিলক্ষিত হয়। ইহাও উল্লেখযোগ্য যে, সমাপনী উক্তি "তাঁহার কোন শরীক না করিয়া" 'হুনাফা লিল্লাহি' শব্দদ্বয়ের অভিব্যক্তির ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ মাত্র। ইবরাহীমের প্রসংগ উল্লেখ ব্যতিরেকে এই নামের অন্য বর্গীয় ব্যবহার ৯৮ : ৫ সংখ্যক আয়াতে এইভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে :
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَا ......
"তাহারা তো (হুনাফা হিসাবে) আদিষ্ট হইয়াছিল আল্লাহ্ আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হইয়া একনিষ্ঠভাবে তাঁহার ইবাদত করিতে...."।
এখানেও পুনঃ হুনাফা শব্দ "আল্লাহ্ আনুগত্যে বিশুদ্ধ চিত্ত হইয়া একনিষ্ঠভাবে” এই অর্থে প্রয়োগ করা হইয়াছে।
অবশিষ্ট চারটি মাদানী আয়াতে হানীফ শব্দ অবশ্যই ইবরাহীমের সম্পর্কে ব্যবহৃত হয়। তবে ইহা তো সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ্ ওয়াহদানিয়াত-এর ভাবধারা এবং অংশীবাদের একই আপোষহীন প্রত্যাখ্যান স্পষ্ট। এই চার স্থানে আসমানী কিতাবের অনুসারীদের, আরও নির্দিষ্ট করিয়া বলিতে গেলে ইয়াহুদীদের সহিত মত বিনিময়ের প্রেক্ষাপটে এই আনুপূর্বিক বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে। এই সকল আয়াতের মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য বিষয় হইতেছে আরবদের সহিত ইবরাহীমের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান-এই দাবি করিবার উদ্দেশ্যে কিংবা মূসা (আ) ও ঈসা (আ)-এর ধর্মোপদেশের চাইতে ইবরাহীমের ধর্মীয় বাণী অধিকতর ভাল ও গুরুত্বের দিক দিয়া অধিকতর মর্যাদাবান ইহা প্রমাণের জন্য ইবরাহীমকে উদ্ধৃত করা হয় নাই; বরং আরও ব্যাখ্যা করিয়া বলিতে গেলে প্রথমত ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের নিজেদের দাবির অসঙ্গতি, যেমন তাহাদের দাবি যে, ইবরাহীম (আ)-এর ধর্মের ধারক ও বাহক, এবং দ্বিতীয়ত ইবরাহীম নিজেই একজন ইয়াহুদী বা খৃস্টান ছিলেন এবং ইয়াহুদী ও খৃস্টান না হওয়া ব্যতিরেকে আর কেহই পরকালে মুক্তি পাইবে না. কিংবা বেহেশতে দাখিল হইতে পারিবে না, ২০ এই সকল দাবির সবই স্ববিরোধী। এইরূপ দাবির বিরুদ্ধে ইহা উল্লেখ করা হয় যে, যখন তাহারা অন্যান্যদেরকে ইয়াহূদী বা খৃস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়ার জন্য আহ্বান জানায়, তখন তাহারা নিজেরাই আপোষহীনভাবে বিভক্ত হইয়া পড়ে। ইয়াহুদীরা দাবি করে খৃস্টানদের দাঁড়াইবার কোন ভিত্তি নাই, পক্ষান্তরে খৃস্টানদের দাবি হইতেছে ইয়াহুদীদের স্বীয় পক্ষ সমর্থনে তেমন কিছুই নাই, যদিও তাহাদের উভয় সম্প্রদায়ই আসমানী কিতাবধারী। ইহা আরও স্পষ্ট করা হয় যে, অন্তর্নিহিত বিষয় হইতেছে আল্লাহর একত্ববাদ এবং আল্লাহ প্রেরিত সকল নবীর বাণীর অবিরাম চলমানতা ও পরিচিতি। নিচের আয়াতের প্রতি লক্ষ্য করিলে ইহা সুস্পষ্ট হইবে। সূরা বাকারার ১৩৫ আয়াতে বলা হইয়াছে:
وَقَالُوا كُونُوا هُودًا أَوْ نَصَارَى تَهْتَدُوا قُلْ بَلْ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ .
"তাহারা বলে, ইয়াহূদী অথবা খৃস্টান হও, সঠিক পথ পাইবে। বল, বরং একনিষ্ঠ (হানীফ) হইয়া আমরা ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করিব এবং যে অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না" (২: ১৩৫)।
মূসা (আ)-এর বিস্তারিত বর্ণনার পরিণতি হিসাবে এই বিবরণ আসিয়াছে এবং বনী ইসরাঈলের প্রতি আল্লাহর একত্ববাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হিসাবে প্রতিফলিত করিবার জন্য তাঁহার প্রচেষ্টা (২:৪৭-১৩৪)। এই দীর্ঘ বিবরণীর ঘটনায় চারটি বিষয়ের উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হইয়াছে। (এক) ইহা সুস্পষ্ট করা হইয়াছে যে, এই যুক্তি সাধারণভাবে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের বিরুদ্ধে নয় কিংবা তাহারা যেহেতু মূসা ও ঈসা (আ)-এর অনুসারী তাই তাহাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হইয়াছে বলিয়াও নয়, বরং ঐ সকল নবী (আ)-এর নামে প্রচলিত নির্দিষ্ট মতবাদ ও আচার-অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে। অতঃপর ইহা দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করা যায়ঃ "যাহারা বিশ্বাস করে, যাহারা ইয়াহুদী হইয়াছে এবং খৃস্টান ও সাবিঈ-যাহারাই আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করে ও সৎ কাজ করে তাহাদের জন্য পুরস্কার তাহাদের প্রতিপালকের নিকট আছে। তাহাদের কোন ভয় নাই এবং তাহারা দুঃখিত হইবে না" (২ঃ ৬২)। ২১
(দুই) ইহা উল্লেখ করা হইয়াছে যে, ইহা কেবল ইয়াহূদীদের একটি শাখা সচেতনভাবে এবং জানিয়া-শুনিয়া বাইবেলের পরিবর্তন সাধন করে। পক্ষান্তরে ইয়াহুদীদের অপর শাখা ধর্মগ্রন্থে প্রকৃতপক্ষে কি পরিবর্তন করা হইয়াছে তাহা জানিত না এবং তাহারা শুধু প্রথমোক্তদের ইচ্ছা ও খেয়াল-খুশীমত ইহা অনুসরণ করিয়া চলে (আয়াত ২ঃ ৭৫, ৭৮)।
(তিন) একইরূপ ভাবধারায় এমন বর্ণনা রহিয়াছে যে, মূসা (আ)-এর গ্রন্থে যে বাণী ধারণ করা হইয়াছে তাহা তাঁহার সময় পর্যন্ত থামিয়া থাকে নাই। কারণ আল্লাহ তা'আলা ঈসা (আ)-সহ অন্যান্য নবীগণকে প্রেরণ করিয়া সেই ধারা অনুসরণ করিবার ব্যবস্থা করিয়াছেন। কিন্তু ইহা সত্ত্বেও ইয়াহুদীগণ যখন দেখিল যে, তাহাদের পছন্দ বা অপছন্দের সহিত মূসা (আ)-এর গ্রন্থের ঐশী বাণীর কোন মিল নাই, তখন তাহারা কোন কোন নবীকে মিথ্যা বলিয়া প্রতিপন্ন করিল এবং তাঁহাদের কাহাকেও হত্যা পর্যন্ত করিল (আয়াত ২:৮৭)। ২২ ইয়াহুদী ও খৃস্টান ব্যতীত আর কেহই জান্নাতে প্রবেশ করিতে পারিবে না, এই দাবির ত্রুটি এই প্রসংগে চিহ্নিত করা হইয়াছে এবং ইহা পুনঃ ব্যক্ত করা হইয়াছে যে, যাহারা সর্বান্তকরণে আল্লাহ তা'আলার নিকট আত্মসমর্পণ ও ভাল কাজ করিবে তাহারা আল্লাহ তাআলা ঘোষিত পুরস্কার লাভ করিবে (আয়াত ২: ১১১-১১২)।
আল্লাহ্ পুত্র সম্পর্কিত ধারণা যা ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের মধ্যে সাধারণভাবে প্রচলিত তাহা এই আয়াতে (আয়াত ২: ১১৬-১১৭) দৃঢ়ভাবে খণ্ডন করা হইয়াছে। ইয়াহুদী ও খৃস্টানগণ ইবরাহীম ও ইয়া'কূব (আ)-এর সহিত তাহাদের জ্ঞাতি সম্পর্ক রহিয়াছে এইরূপ ঘোষণা দান করিলেও এই আয়াতে অবশেষে ইবরাহীম ও ইয়া'কূব (আ)-এর প্রসঙ্গ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ পূর্বক ইহা দেখান হইয়াছে যে, তাঁহারা উভয়ই তাঁহাদের বংশধর ও উত্তরাধিকারিগণকে একমাত্র এক আল্লাহ্ ইবাদত ও তাঁহার নিকট সর্বান্তকরণে আত্মসমর্পণ করিতে নির্দেশ প্রদান করেন (আয়াত ২: ১৩২-১৩৩) এবং এই যুক্তির অনুবৃত্তিক্রমে আয়াত ১৩৫-এ বর্ণনা করা হইয়াছে: "তাহারা বলে, ইয়াহুদী হও অথবা খৃস্টান হও, তোমরা সঠিক পথনির্দেশ প্রাপ্ত হইবে। বল, বরং একনিষ্ঠ হইয়া আমরা ইবরাহীমের ধর্ম হানীফ অনুসরণ করিব এবং সে অংশীবাদীগণের অন্তর্ভুক্ত ছিল না"।
এইখানে ও অন্যত্র সমগ্র আলোচনাটি এক আল্লাহ্ ইবাদত সম্পর্কে আবর্তিত হইয়াছে। আরববাসী ও মহানবী-এর অনুসারীদের জন্য একমাত্র ও স্বতন্ত্রভাবে ইবরাহীম (আ)-এর সহিত সম্বন্ধ রহিয়াছে এমন দাবি করা হয় নাই। অথচ ইহার বিপরীতে সমগ্র আলোচনার মুখ্য বিষয় হইতেছে যেহেতু ইয়াহুদী ও খৃস্টানগণ নিজেরাই ইবরাহীমের সহিত তাহাদের সম্পর্কের দাবি করে, তাই ইহা কেবল একত্ববাদের প্রতি দৃঢ়রূপে আনুগত্য পোষণ করা তাহাদের জন্য শোভন হয় যাহা ইবরাহীম শিখাইয়াছিলেন ও নিজেই আদর্শের প্রতীকস্বরূপ হইয়াছিলেন। সেই কারণে যখনই তাঁহাকে 'হানীফ' হিসাবে বর্ণনা করা হয় তখনই জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয় যে, তিনি অংশীবাদীগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। নবীদের ক্ষেত্রে কোনরূপ অগ্রাধিকার বা শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান কিংবা ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের নবীদের মর্যাদা খর্ব করিবার জন্য এমন কোন চাতুরী অথবা সুপারিশও নাই যে, একজন নবীর শিক্ষা বা উপদেশ অন্য নবী হইতে ভিন্নতর হইবে। সকল নবীর বাণীর অভিন্নতা ও অবিরাম চলমানতার উপর নিচের আয়াতে (আয়াত ২: ১৩৬) জোরালোভাবে প্রকাশ করা হইয়াছে:
قُولُوا آمَنَّا بِاللهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ إِلِى إِبْرَاهِيمَ وَاسْمُعِيلَ وَاسْحَقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِنْ رَّبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ .
"তোমরা বল, আমরা আল্লাহতে ঈমান রাখি এবং যাহা আমাদের প্রতি এবং ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়া'কূব ও তাহার বংশধরগণের প্রতি অবতীর্ণ হইয়াছে এবং যাহা তাহাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে মূসা, ঈসা ও অন্যান্য নবীগণকে দেওয়া হইয়াছে। আমরা তাহাদের মধ্যে কোন পার্থক্য করি না এবং আমরা তাঁহার নিকট আত্মসমর্পণকারী"।
ইবরাহীমের সহিত তাহাদের সম্বন্ধ রহিয়াছে, ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের এইরূপ দাবির অসঙ্গতির দৃষ্টান্ত হিসাবে বিশ্বাসী (হানীফ) হিসাবে ইবরাহীমের প্রসঙ্গে অবতারণা করা হইয়াছে। কারণ, আয়াত ৩ঃ ৬৭ ও ৩৪ ৯৫-এ হানীফ শব্দের দুইটি ভিন্ন প্রয়োগে প্রকৃত একত্ববাদের প্রতি তাহাদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন অধিকতর স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। এই সূরার ৩৩ নং আয়াত হইতে এই যুক্তির অবতারণা করা হইয়াছে যেখানে আল্লাহ্র বিশেষ অনুগ্রহ লাভকারী হিসাবে আদম, নূহ ও ইবরাহীম এবং ইমরান-এর পরিবারের উল্লেখ প্রথমে আসিয়াছে। ইহার পর আয়াত ৩৫ হইতে ৬২ পর্যন্ত ঈসা (আ)-এর জন্ম ও ধর্ম প্রচারের কাহিনী বিবৃত হইয়াছে। এই বিবরণীতে ইহার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে যেখানে তিনি ঘোষণা দান করেন, "আল্লাহ আমার প্রতিপালক এবং তোমাদের প্রতিপালক, সুতরাং তোমরা তাঁহার ইবাদত করিবে। ইহাই সরল পথ"। ২৩ ইহাতে আরও গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে যে, আল্লাহ্র ইচ্ছা ও সর্বশক্তিমানের নিদর্শন হিসাবে আদমের সৃষ্টির ন্যায় ঈসাকে সৃষ্টি করা হইয়াছে। ২৪ অতএব ঈসার অসাধারণ জন্ম তাঁহার প্রতি ঈশ্বরত্ব আরোপ করিবার কোন কারণ হইতে পারে না। আয়াত নং ৩ঃ ৬৪-তে খৃস্টান ও ইয়াহুদী উভয় সম্প্রদায়ের প্রতি এক ঐকান্তিক আহ্বান করা হইয়াছে। আয়াতটি নিম্নরূপ:
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ إِلا نَعْبُدَ إِلا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّنْ دُونِ اللَّهِ فَإِنْ تَوَلَّوا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّنَا مُسْلِمُونَ .
"তুমি বল, হে কিতাবীগণ! আইস সে কথায় যাহা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যেন আমরা আল্লাহ ব্যতীত কাহারও ইবাদত না করি, কোন কিছুকেই তাঁহার শরীক না করি এবং আমাদের কেহ কাহাকেও আল্লাহ ব্যতীত প্রতিপালকরূপে গ্রহণ না করে। যদি তাহারা মুখ ফিরাইয়া লয় তবে বল, তোমরা সাক্ষী থাক আমরা মুসলিম" (৩:৬৪)।
ইবরাহীম (আ) একজন ইয়াহুদী বা খৃস্টান ছিলেন- এই দাবির অযৌক্তিকতা পরবর্তীতে একটি সরল তথ্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া দেখান হইয়াছে যে, ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তি হিসাবে যথাক্রমে তাওরাত ও ইনজীল কিতাব ইবরাহীমের অনেক পরে নাযিল হইয়াছে (আয়াত ৩: ৬৫-৬৬)। অতঃপর যদি তাহারা ইবরাহীমের সহিত নিজেদেরকে অভিন্নরূপে গণ্য করিতে ইচ্ছুক হয় তবে পরিপূর্ণ একত্ববাদকে মানিয়া লইয়া তাহারা ইহা করিতে পারে। কারণ আয়াত ৩: ৬৭-এ ঘোষণা করা হয়:
مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًا وَلا نَصْرَانِيًّا وَلكِنْ كَانَ حَنِيفًا مُّسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ .
"ইবরাহীম ইয়াহুদীও ছিল না, খৃস্টানও ছিল না; সে ছিল একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণকারী এবং সে অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না"।
পরবর্তী আয়াতেও এই যুক্তি উপস্থাপিত হইয়াছে যাহা নিম্নরূপ:
إِنَّ أُولَى النَّاسِ بِإِبْرَاهِيمَ لَلَّذِينَ اتَّبَعُوهُ وَهَذَا النَّبِيُّ وَالَّذِينَ آمَنُوا .
"নিশ্চয় মানুষের মধ্যে তাহারা ইবরাহীমের ঘনিষ্ঠতম যাহারা তাহার অনুসরণ করিয়াছে তাহারা এবং এই নবী ও যাহারা ঈমান আনিয়াছে..." (৩ঃ ৬৮)।
যদি কেহ প্রকৃতপক্ষে নিজকে ইবরাহীমের সহিত অভিন্নরূপে গণ্য করিতে চাহে তাহা হইলে একত্ববাদের একই ভাব ও ইবরাহীমের নির্দেশিত পথ অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার উপর একইরূপ গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে যাহা উপরে উদ্ধৃত আয়াতের বিষয়বস্তু হিসাবে প্রতীয়মান। এই একই বিষয় আয়াত ৩: ৯৫-এ উল্লিখিত হইয়াছে, যাহা নিম্নরূপ:
قُلْ صَدَقَ اللَّهُ فَاتَّبِعُوا مِلَّةَ إِبْرِهِيمَ حَنِيفًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ .
"বল, আল্লাহ সত্য বলিয়াছেন। সুতরাং তোমরা একনিষ্ঠ ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ কর, সে অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নহে” (৩ঃ ৯৫)।
উপরিউক্ত তিনটি আয়াতে (অর্থাৎ ২: ১৩৫; ৩:৬৭ ও ৩ঃ ৯৫) তাহারা যে ইবরাহীমের সম্প্রদায়ভুক্ত “ধর্মগ্রন্থের লোকদের" অর্থাৎ কিতাবধারীদের নিজেদের এই দাবির জবাবে একজন হানীফ হিসাবে ইবরাহীমের প্রসঙ্গের অবতারণা করা হইয়াছে। যদি তাহারা তাহাদের দাবির প্রতি সত্যই বিশ্বস্ত থাকে, তাহা হইলে ইবরাহীমের মিল্লাত কঠোরভাবে অনুসরণ করিবার জন্য অতঃপর তাহাদিগকে আহ্বান জানান হয়। মূসা ও ঈসা (আ) কর্তৃক প্রচারিত ধর্মোপদেশের উপর অগ্রাধিকার প্রদান বা শ্রেষ্ঠত্ব আরোপের কোন অজুহাত কোথাও করা হয় নাই অথবা এমন কোন সুপারিশও করা হয় নাই যে, ইবরাহীমের সহিত সম্পর্কের দাবি করিবার অধিকার একচেটিয়া কেবল আরবদের অধিকারভুক্ত। অধিকন্তু সকল নবীর সমকক্ষতা ও তাঁহাদের শিক্ষার অভিন্নতা সর্বত্র বিশেষ গুরুত্বের সহিত উল্লিখিত হইয়াছে।
আয়াত ৪: ১২৫ (সূরা আন-নিসা)-এ হানীফ শব্দের উল্লেখ দেখা যায়। এইখানেও মূলভাব হইতেছে: সম্পূর্ণ একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা এবং এর বিপরীতে অংশীবাদের সকল ছায়াকে সঠিকভাবে প্রত্যাখ্যানের উপর জোর দেওয়া হইয়াছে। এই সূরার আয়াত ১১৬-তে এই মূল ভাবটি সুনির্দিষ্টভাবে শুরু হইয়াছে। আয়াতটির বর্ণনা নিম্নরূপঃ "আল্লাহ তাঁহার শরীক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না, ইহা ব্যতীত সব কিছু যাহাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং কেহ আল্লাহ্র সহিত অন্য কাহাকেও শরীক করিলে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়" (৪: ১১৬)। ২৫
তারপর আয়াত ১১৭-১২০-এ বর্ণনা রহিয়াছে যে, শয়তানই মানুষকে পথভ্রষ্ট করে এবং আল্লাহর পরিবর্তে বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করে, আর তাহাদের হৃদয়ে মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করে। এই মিথ্যা আশা ও প্রতিশ্রুতি এখানে পরোক্ষভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে, যাহা পাঠকবর্গ স্পষ্টভাবে বুঝিতে পারিয়াছে এবং ইহা কুরআনের অন্যত্র বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হইয়াছে। ইহা সবই পৌত্তলিক আরবদের দাবি ছিল যে, মৃত্যুর পর শেষ বিচারের দিনে ২৬ তাহাদিগকে পুনরুত্থিত করা হইবে না এবং তাহাদের দেব-দেবীগণ তাহাদের পক্ষে ২৭ আল্লাহ্র সহিত মধ্যস্থতা করিবে। আর কিতাবধারীদের দাবি যে, তাহারা "আল্লাহ্ পুত্র ও প্রিয়পাত্র" ২৮ এবং তাহাদেরকে নির্দিষ্ট কিছু সময়কালে নরকাগ্নি ভোগ ব্যতীত কোন কষ্টভোগ করিতে হইবে না। ২৯ তারপর একজন ইয়াহুদী বা একজন খৃস্টান ব্যতীত কেহই জান্নাতে প্রবেশ করিতে পারিবে না।৩০ এই সূরার ১২১-১২৪ নং আয়াতে পৌত্তলিক আরব ও কিতাবধারীদিগকে সম্বোধন করিয়া বলা হইয়াছে, "তোমাদের খুশী ও কিতাবীদের খেয়াল-খুশী অনুসারে কোন কাজ হইবে না"। ৩১ একই সাথে ব্যক্তিগত দায়-দায়িত্বের নীতির উপর এই বলিয়া জোর দেওয়া হইয়াছে যে, যে কেহই ভাল কাজ করিবে এবং যাহার ঈমান আছে তাহাকে পুরস্কৃত করা হইবে। আর যে বা যাহারা মন্দ কাজ করিবে আল্লাহ তাহার বা তাহাদের যথাযথ প্রতিদান প্রদান করিবেন। ৩২ অতঃপর আয়াত ৪:১২৫-এ উল্লেখ করা হইয়াছে যে, আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণের সর্বোত্তম উপায় হইতেছে উত্তম কাজ করা এবং একজন হানীফ হিসাবে ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করা। আয়াতটি নিম্নরূপ:
وَمَنْ أَحْسَنُ دِينًا مِّمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ وَاتَّبَعَ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا
"তাহার অপেক্ষা দীনে কে উত্তম যে সৎকর্মপরায়ণ হইয়া আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং একনিষ্ঠভাবে ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করে" (৪ : ১২৫)?
হানীফ শব্দটি দৃশ্যমান এইরূপ কুরআনের ১২টি আয়াতের (৬টি মক্কায় ও ৬টি মদীনায় অবতীর্ণ) একটি বিশ্লেষণ জেফারি-বেল তত্ত্বের অগ্রহণযোগ্যতাকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করিয়াছে। ইহাতে বলা হইয়াছে যে, মহানবী হানীফ শব্দটির অভিব্যক্তির আশ্রয় গ্রহণ করিয়া এই তত্ত্বের উপর এক আল্লাহ্ ইবাদতকারীদের সম্পর্কে একটি নূতন ধারণার সূচনা করেন এবং তাঁহার মদীনায় হিজরতের পর তাঁহার ও ইয়াহুদীদের মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে কেবল ইবরাহীমের ধর্মের সাথে তিনি সম্পর্ক স্থাপন করেন। ইয়াহুদী ও খৃস্ট এই উভয় ধর্ম হইতে বাহির হইয়া আসিয়া ইবরাহীমের স্মৃতি লালনকারী পৌত্তলিক আরবদের উপর স্বীয় ধর্মমতের জয়লাভ করাই তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল। দেখা গিয়াছে যে, মদীনায় হিজরতের বহু পূর্বে এবং মহানবী -এর ধর্মপ্রচারের একেবারে গোড়ার দিকে মক্কাতে হানীফ শব্দের ব্যবহার ও ইবরাহীমের ধর্মোপদেশের প্রসংগ আসিয়াছে। এই মক্কাতেই আবার ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃস্টধর্মের মৌলিক ও প্রধান মতবাদসমূহের ব্যতিক্রম ঘটিয়াছে। যুক্তির মুখ্য বিষয় হইতেছে এক আল্লাহর ইবাদত। খৃস্টধর্মের ত্রিত্ববাদ যথা পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা শুরু হইতেই প্রত্যাখ্যান করা হইয়াছে এবং এই প্রত্যাখ্যান মক্কা ও মদীনার সমগ্র কালব্যাপী বারংবার পুনরুক্ত হইয়াছে। বাস্তবিকই ইহা ছিল একটি কঠোর ও অদম্য একত্ববাদের ভাবধারা যেখানে মক্কী ও মাদানী যুগের সমগ্র আমল ধরিয়া হানীফ পরিভাষার ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। যেহেতু মহানবী বহু ঈশ্বরবাদের বিপরীত একটি নূতন ভাবধারায় হানীف শব্দ ব্যবহার করেন, তাই বেল পরোক্ষভাবে স্বীকার করেন যে, সম্পূর্ণভাবে এক আল্লাহ্ ইবাদতকারীর ভাবধারায় কুরআনে সর্বত্র হানীف শব্দের প্রয়োগ হইয়াছে। হানীف শব্দের উপর কোন অসাধারণ ও অজানা ভাবধারা আরোপ না করিয়া মক্কা ও মদীনায় অবতীর্ণ আয়াতসমূহে ইবরাহীমের কোন উল্লেখ ব্যতিরেকে ইহাকে তাহার বর্গীয় নামে দেখান হইয়াছে। এইরূপ ধারণা করা খুবই অযৌক্তিক হইবে যে, শুধু ইয়াহুদী ও খৃস্টান সম্প্রদায় হইতে বিচ্ছিন্ন হইবার স্বার্থে এবং তাঁহার ধর্মমতে আনিবার জন্য পৌত্তলিক আরবদের মন জয় করিবার উদ্দেশ্যে মহানবী হানীف শব্দের একটি নূতন অর্থ তৈয়ার করেন। কারণ তাহা হইলে মহানবী -এর শত্রুপক্ষ কর্তৃক বিভ্রান্তি সৃষ্টি, সমালোচনা ও ভুল বুঝাবুঝির সমূহ আংশকা থাকিত। তবুও কুরায়ش গোত্রের বিরোধিতাকারী অথবা কিতাবধারী যাহারাই হউন না কেন পবিত্র কুরআনে হানীف শব্দের প্রয়োগের বিষয়ে তাহাদের নিকট হইতে কোন আপত্তি উত্থাপিত হইতে দেখা যায় নাই। আর কল্পনা করুন তো যদি কোন ব্যক্তি ইংল্যান্ডের কোন ইতিহাস প্রসিদ্ধ পণ্ডিত ব্যক্তিকে জ্ঞানীর বিপরীতার্থক শব্দ নির্বোধ নামে অভিহিত করিবার দুঃসাহস দেখায় এবং ইংরেজদিগকে তাহাদের জাতীয় বীরকে নির্বোধ ব্যক্তি হিসাবে গ্রহণের আহ্বান জানায় তাহা হইলে কিরূপ অবস্থার সৃষ্টি হইবে!
প্রকৃত তথ্য হইতেছে কুরআনে একটি নূতন ভাবধারায় হানীف শব্দটি সরাসরি ইহার বিপরীত ভাবধারায় ব্যবহৃত হয় নাই যদিও আরবগণ এই যাবৎ এই বিপরীত অর্থেই ইহা গ্রহণ করিয়া আসিয়াছে। তাহা ছাড়া ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম ত্যাগ করিয়া আসিবার উদ্দেশ্যে ইবরাহীম (আ)-এর কাহিনীতেও ইহার কোন প্রসংগ উল্লিখিত হয় নাই। মদীনার প্রসংগে ইবরাহীমকে হানীف হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে এবং ইবরাহীমের সহিত কিতাবধারীদের সম্বন্ধ রহিয়াছে-এইরূপ দাবির প্রত্যুত্তরে ইহার উল্লেখ করা হয়। ইহা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, একজন ইয়াহুদী অথবা একজন খৃস্টান হওয়া তো দূরের কথা, ইবরাহীম (আ) একজন খাঁটি এক আল্লাহ্ ইবাদতকারী হানীف ছিলেন, তিনি বহু ঈশ্বরবাদী ছিলেন না। অতঃপর যদি তাহাদের দাবির উপর তাহারা বিশ্বস্ত থাকে তাহা হইলে তাহাদিগকে ইবরাহীম (আ)-এর মিল্লাতের প্রতি অনুগত থাকিবার আহ্বান জানান হয়। ইহা ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ইহার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, কুরআন ও অতঃপর মুহাম্মাদ সেই সময়কার ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-আচরণকে একত্ববাদের পরিপন্থী এবং ইবরাহীম (আ) ও অন্যান্য নবীগণের শিক্ষার স্পষ্ট ব্যতিক্রম হিসাবে বিবেচনা করিতেন। ইহা আরও অর্থ প্রকাশ করে যে, ইহা জেফারি-বেল তত্ত্বের বিপরীত। কুরআন কখনও এই সাক্ষ্য দেয় না যে, মুহাম্মাদ সমালোচনার ভয়ে ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম হইতে একত্ববাদের ধারণা গ্রহণ করেন; বরং তাঁহার প্রচারিত ধর্মীয় বাণী অনেক আগে ইবরাহীম (আ) কর্তৃক প্রচারিত ধর্মোপদেশ হইতে গ্রহণ করেন বলিয়া কুরআনে প্রমাণ পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের বিষয়ে কুরআন আরও সাক্ষ্য দেয় যে, ইবরাহীমের সহিত তাহাদের সম্বন্ধ রহিয়াছে এইরূপ দাবির জবাবে এবং একত্ববাদ ও ইবরাহীমের ধর্ম শিক্ষার সহিত তাহাদের ধর্মবিশ্বাস ও অনুশীলনের মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতির বিপরীতে একজন হানীف (মু'মিন) হিসাবে ইবরাহীমের প্রসঙ্গ কুরআনে উল্লিখিত হইয়াছে। সেই কারণে ইহা বারংবার উল্লেখ করা হইয়াছে যে, তিনি যেমন বহু ঈশ্বরবাদীদের কেহই ছিলেন না, তেমনি ইয়াহুদী বা খৃস্টানও ছিলেন না। তাই ইবরাহীমের মিল্লাত অনুসরণ করিবার জন্য কিতাবধারীদের প্রতি প্রকাশ্য আহ্বান জানান যায় অথবা অন্তত এমন একটি সাধারণ নিয়ম, যথা এক আল্লাহ্ ইবাদত ও তাঁহার সহিত কাহাকেও শরীক না করিবার বিষয়ে একমত হওয়া যায়। ইহা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, কোন ধর্মমত অধিকতর পূর্বের বলিয়া তাহা অধিকতর বিশুদ্ধ ও প্রথম শ্রেণীর, আর অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে পরবর্তী কালের হইলে তাহা দ্বিতীয় শ্রেণীর, বিষয়টি তাহা ছিল না। বিষয়টি ছিল স্পষ্টভাবে একত্ববাদ এবং ইহার বিরোধিতা। হানীف ও মদীনায় ইবরাহীমের কাহিনীর পক্ষে কুরআন ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের ইসলাম সম্পর্কে সমালোচনার বিরুদ্ধে আদৌ কোন রক্ষণাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করে নাই। ইয়াহুদী ও খৃস্টানগণ ইবরাহীম (আ)-এর সহিত তাহাদের অভিন্নতার দাবি করে এবং অতঃপর তাহাদের এইরূপ দাবির অসঙ্গতি ও তৎসহ তাহাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচরণে একত্ববাদের স্পষ্ট অস্বীকৃতির বিরুদ্ধে ইহা ছিল একটি প্রচণ্ড আক্রমণ।
টিকাঃ
১. A. Sprenger, Das Leben und die Lehre des Mohammed. 1. Berlin 1861, pp. 45-134.
২. I. Goldziher, Muhammadanische Studien, 1, Halle 1888, pp. 1-39.
৩. দ্র. J. Wellhausen, Reste Arabiscen Heidentums, ২য় সং, বার্লিন ১৮৯৭ খৃ., পৃ. ২৩৮; D.S. Margoliouth, JRAS, 1903, পৃ. ৪৬৭-৪৯৩; Sir Charles Layall, ঐ., পৃ. ৭৭২-৭৮৪ এবং L. Caetain, Annalli dell' Islam, 1, Milan, ১৯০৫, পৃ. ১৮১-১৯২।
৪. R.A. Nicholson, A Literary History of the Arabs (১ম, সং. ১৯০৭), পৃ. মু. ১৯৮৮, পৃ. ১৫০। আরও দ্র. পি.কে. হিট্টি, History of the Arabs (১ম সং. ১৯৩৭), ১০ম সং. ১৯৮৬, পৃ. ১০৭-১০৮।
৫. ১৯৩৮ সালে সর্বপ্রথম বরোদায় প্রকাশিত।
৬. A. Jeffery, পৃ. গ্র., ১১২-১১৫।
৭. R. Bell, "Who were the Hanifs". The moslem World. ১৯৩০, পৃ. ১২০-১২৪। বেল এইভাবে জেফারির ঋণ স্বীকার করিয়াছেন, “ডঃ এ. জেফারি "The foreign Vocabulary of the Koran"-এর উপর লিখিত নিবন্ধ আলোচনাকালে এইরূপ মত প্রকাশ করেন এবং ইহা একটি মূল্যবান গ্রন্থ যাহা কোন প্রকাশক কর্তৃক সত্বর প্রকাশিত হইবে বলিয়া আশা করা যায়। এই ধারণাটি জেফারির আলোচনা হইতে আমি গ্রহণ করিয়াছি”-প্রাগুক্ত, পৃ. ১২০।
৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২১।
৯. প্রাগুক্ত বরাত।
১০. প্রাগুক্ত বরাত, পৃ. ১২২-১২৩।
১১. প্রাগুক্ত বরাত, পৃ. ১২৩-১২৪।
১২. প্রাগুক্ত বরাত, ১২৪।
১৩. N. A. Faris and H. W. Glidden, "The development of the meaning of the Koranic Hanif, "Journal of the Palestine Oriental Society," ১৯খ., ১৯৩৯, পৃ. ১-১৩।
১৪. উদাহরণস্বরূপ দ্র. Hitti, পৃ. গ্র., ১০৮; Watt, M. at M. পৃ. ১৬২-১৬৩ এবং E.I., ৩খ., পৃ. ১৬৬, নিচে আরও দ্র. মূল পাঠ।
১৫. E.I., ৩খ., পৃ. ১৬৬।
১৬. বুখারী, নং ৩৯৯ (ফাতহুল বারী, ১খ., পৃ. ৫৯৮, কিতাবুস সালাত, বাব ৩১); আযরাকী, আখবার মক্কা, ২খ., পৃ. ১৯। এই মর্মে একটি বর্ণনায় আছে যে, হিজরতের মাত্র দুই মাস পরে কিবলা পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে (দ্র. ইবন মাজাহ, নং ১০১০, ১খ, পৃ. ৩২২, কিতাব ৫. বাব ৫৬), কিন্তু ইহা সঠিক নয় বলিয়া মনে হয়।
১৭. উদাহরণস্বরূপ দ্র. কুরআনের আয়াত ৬ ৪:৭৪-৯০; ৭:৫৮-৯৩; ৭:১০০-১২৯; ১০:১৩, ১০:৪৭, ১০ :৭১-৯২; ১৬:৩৬; ১৬:৪৩-৪৪; ১৬:১২০-১২৩; ১৯ :৪১-৫৮; ২০:৯-৯৯; ২১:২৫; ২১:৫১-৯৩; ২৩:২৩-৫০; ২৬:১০-১৯১।
১৮. দ্র. সূরা ১১২ ও ১৯:১৬-৩৫, ৮০, ৮৮-৯৩; ৯৯: ৬-৮; ১০১ :৬-১১।
১৯. দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্র. আল-কুরতুবী, তাফসীর, ৭খ., পৃ. ১৪৯-১৫০।
২০. উদাহরণস্বরূপ দ্র. সূরা ২য়, আয়াত ১১১ [২:১১১]।
২১. মূল পাঠটি নিম্নরূপ: إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالنَّصْرَى وَالصَّبِئِينَ مَنْ أَمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ . "নিশ্চয় যাহারা বিশ্বাস করে, যাহারা ইয়াহুদী হইয়াছে এবং খৃস্টান ও সাবিঈন-যাহারাই আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে তাহাদের জন্য পুরস্কার তাহার প্রতিপালকের নিকট। তাহাদের কোন ভয় নাই এবং তাহারা দুঃখিতও হইবে না"।
২২. وَلَقَدْ أَتَيْنَا مُوسَى الْكِتٰبَ وَقَفَّيْنَا مِنْ بَعْدِهِ بِالرُّسُلِ وَأَتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَتِ . وَأَيَّدْنُهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ أَفَكُلَّمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَى أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقًا كَذَّبْتُمْ وَفَرِيقًا تَقْتُلُونَ . "এবং নিশ্চয় আমি মূসাকে কিতাব দিয়াছি এবং তাহার পরে পর্যায়ক্রমে রাসূলগণকে প্রেরণ করিয়াছি, মারয়াম-তনয় ঈসাকে স্পষ্ট প্রমাণ দিয়াছি এবং পবিত্র আত্মা দ্বারা তাহাকে শক্তিশালী করিয়াছি। তবে কি যখনই কোন রাসূল তোমাদের নিকট এমন কিছু আনিয়াছে যাহা তোমাদের মনঃপূত নহে তখনই তোমরা অহংকার করিয়াছ আর কতককে অস্বীকার করিয়াছ এবং কতককে হত্যা করিয়াছ"!
২৩. আয়াত ৩:৫১।
২৪. আয়াত ৩:৫৯।
২৫. আয়াত ৪:১১৬ : মূলপাঠ নিম্নরূপ: إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًاً بعيداً ইহা উপরে পাঠের মধ্যে উদ্ধৃত হইয়াছে।
২৬. আয়াত ১৬:৩৮ : وَأَقْسَمُ بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لَا يَبْعَثُ اللَّهُ مَنْ يَمُوتُদৃঢ়তার সহিত আল্লাহ্র শপথ করিয়া বলে, যাহার মৃত্যু হয় আল্লাহ তাহাকে পুনর্জীবিত করিবেন না"। আরও দ্র. ৭২:৭।
২৭. উদাহরণস্বরূপ আয়াত ৬:৯৪; ১০:১৮ ও ৩৯:৪৩ দেখা যাইতে পারে।
২৮. আয়াত ৫:৮০ : وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى نَحْنُ أَبْنَاءُ اللَّهِ وَأَحِبَّاءُهُ. "ইয়াহুদী ও খৃস্টানরা বলে, তাহারা আল্লাহ্র পুত্র ও প্রিয়পাত্র"।
২৯. আয়াত ২:৮০ : . وَقَالُوا لَنْ تَمَسَّنَا النَّارُ الاَّ أَيَّامًا مُعْدُودَةً "তাহারা বলে, দিন কতক ব্যতীত অগ্নি আমাদিগকে কখনও স্পর্শ করিবে না"। আয়াত ৩:২৪ :
قَالُوا لَنْ تَمَسَّنَا النَّارُ الاَّ أَيَّامًا مَّعْجُودَات . "এই হেতু যে, তাহারা বলিয়া থাকে, 'দিন কতক ব্যতীত আমাদিগকে অগ্নি স্পর্শ করিবে না'"।
৩০. আয়াত ২:১১১ : وَقَالُوا لَنْ يَدْخُلَ الْجَنَّةَ الا مَنْ كَانَ هُودًا أَوْ نَصَارَى : বলে, "ইয়াহুদী বা খৃস্টান ছাড়া অন্য কেহ কখনও জান্নাতে প্রবেশ করিবে না"।
৩১. আয়াত ৪:১২৩ : لَيْسَ بِأَمَانِيكُمْ وَلَا أَمَانِي أَهْلِ الْكِتَبِ مَنْ يَعْمَلْ سُوء يُجْزَى...... "তোমাদের খেয়ালখুশী ও কিতাবীদের খেয়াল-খুশী অনুসারে কাজ হইবে না; কেহ মন্দ কাজ করিলে তাহার প্রতিফল সে পাইবে....।"
৩২. আয়াত ৪:১২২-১২৪।
📄 গ. মদীনার ঘটনাবলীতে হানীফের প্রসঙ্গ
মদীনায় যাহা ঘটে তাহা এই সকল বিষয় ও নীতিসমূহের বিশদ ব্যাখ্যা মাত্র। মদীনার ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের সামাজিক অবস্থানের প্রেক্ষাপটে মদীনার বিবৃতিসমূহ প্রণীত হয়। কিন্তু মক্কায় অবতীর্ণ সূরাসমূহে যেভাবে আসিয়াছে ঠিক সেইভাবে সম্পূর্ণরূপে এক আল্লাহর ইবাদতের উপর একইরূপ গুরুত্ব আরোপ, সকল নবী প্রদত্ত বাণীসমূহের পরিচিতি ও ধারাবাহিকতার একইরূপ পুনরুক্তি এবং হানীফ নামটির একই রূপ বর্গীয় ব্যবহার মদনীর সূরাসমূহে প্রত্যক্ষ করা যায়। মক্কায় সূরাসমূহে যেমন তেমনি মদীনার সূরাগুলিতেও ছয়টির মধ্যে দুইটি স্থানে বর্গীয় ভাবধারায় হানীফ নামটি ইবরাহীম (আ)-এর প্রসঙ্গ ছাড়াই বহুবচনে ব্যবহৃত হইয়াছে। নিম্নের ২২: ৩০-৩১ নম্বর আয়াতে এইরূপ ব্যবহার দেখা যায় :
... فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّوْرِ حُنَفَاءَ لِلَّهِ غَيْرَ مُشْرِكِيْنَ بِهِ.
(৩০) “.......... সুতরাং তোমরা বর্জন কর মূর্তিপূজার অপবিত্রতা এবং দূরে থাক মিথ্যা কথন হইতে, (৩১) আল্লাহ্র প্রতি একনিষ্ঠ হইয়া এবং তাঁহার কোন শরীক না করিয়া” (২২ : ৩০-৩১)।
হানীফ নামের বর্গীয় ব্যবহার ও তৎসহ আল্লাহর একত্ববাদের উপর গুরুত্ব আরোপ এইখানে সন্দেহাতীতভাবে পরিলক্ষিত হয়। ইহাও উল্লেখযোগ্য যে, সমাপনী উক্তি "তাঁহার কোন শরীক না করিয়া" 'হুনাফা লিল্লাহি' শব্দদ্বয়ের অভিব্যক্তির ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ মাত্র। ইবরাহীমের প্রসংগ উল্লেখ ব্যতিরেকে এই নামের অন্য বর্গীয় ব্যবহার ৯৮ : ৫ সংখ্যক আয়াতে এইভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে :
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَا ......
"তাহারা তো (হুনাফা হিসাবে) আদিষ্ট হইয়াছিল আল্লাহ্ আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হইয়া একনিষ্ঠভাবে তাঁহার ইবাদত করিতে...."।
এখানেও পুনঃ হুনাফা শব্দ "আল্লাহ্ আনুগত্যে বিশুদ্ধ চিত্ত হইয়া একনিষ্ঠভাবে” এই অর্থে প্রয়োগ করা হইয়াছে।
অবশিষ্ট চারটি মাদানী আয়াতে হানীف শব্দ অবশ্যই ইবরাহীমের সম্পর্কে ব্যবহৃত হয়। তবে ইহা তো সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ্ ওয়াহদানিয়াত-এর ভাবধারা এবং অংশীবাদের একই আপোষহীন প্রত্যাখ্যান স্পষ্ট। এই চার স্থানে আসমানী কিতাবের অনুসারীদের, আরও নির্দিষ্ট করিয়া বলিতে গেলে ইয়াহুদীদের সহিত মত বিনিময়ের প্রেক্ষাপটে এই আনুপূর্বিক বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে। এই সকল আয়াতের মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য বিষয় হইতেছে আরবদের সহিত ইবরাহীমের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান-এই দাবি করিবার উদ্দেশ্যে কিংবা মূসা (আ) ও ঈসা (আ)-এর ধর্মোপদেশের চাইতে ইবরাহীমের ধর্মীয় বাণী অধিকতর ভাল ও গুরুত্বের দিক দিয়া অধিকতর মর্যাদাবান ইহা প্রমাণের জন্য ইবরাহীমকে উদ্ধৃত করা হয় নাই; বরং আরও ব্যাখ্যা করিয়া বলিতে গেলে প্রথমত ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের নিজেদের দাবির অসঙ্গতি, যেমন তাহাদের দাবি যে, ইবরাহীম (আ)-এর ধর্মের ধারক ও বাহক, এবং দ্বিতীয়ত ইবরাহীম নিজেই একজন ইয়াহুদী বা খৃস্টান ছিলেন এবং ইয়াহুদী ও খৃস্টান না হওয়া ব্যতিরেকে আর কেহই পরকালে মুক্তি পাইবে না. কিংবা বেহেশতে দাখিল হইতে পারিবে না, ২০ এই সকল দাবির সবই স্ববিরোধী। এইরূপ দাবির বিরুদ্ধে ইহা উল্লেখ করা হয় যে, যখন তাহারা অন্যান্যদেরকে ইয়াহূদী বা খৃস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়ার জন্য আহ্বান জানায়, তখন তাহারা নিজেরাই আপোষহীনভাবে বিভক্ত হইয়া পড়ে। ইয়াহুদীরা দাবি করে খৃস্টানদের দাঁড়াইবার কোন ভিত্তি নাই, পক্ষান্তরে খৃস্টানদের দাবি হইতেছে ইয়াহুদীদের স্বীয় পক্ষ সমর্থনে তেমন কিছুই নাই, যদিও তাহাদের উভয় সম্প্রদায়ই আসমানী কিতাবধারী। ইহা আরও স্পষ্ট করা হয় যে, অন্তর্নিহিত বিষয় হইতেছে আল্লাহর একত্ববাদ এবং আল্লাহ প্রেরিত সকল নবীর বাণীর অবিরাম চলমানতা ও পরিচিতি। নিচের আয়াতের প্রতি লক্ষ্য করিলে ইহা সুস্পষ্ট হইবে। সূরা বাকারার ১৩৫ আয়াতে বলা হইয়াছে:
وَقَالُوا كُونُوا هُودًا أَوْ نَصَارَى تَهْتَدُوا قُلْ بَلْ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ .
"তাহারা বলে, ইয়াহূদী অথবা খৃস্টান হও, সঠিক পথ পাইবে। বল, বরং একনিষ্ঠ (হানীফ) হইয়া আমরা ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করিব এবং যে অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না" (২: ১৩৫)।
মূসা (আ)-এর বিস্তারিত বর্ণনার পরিণতি হিসাবে এই বিবরণ আসিয়াছে এবং বনী ইসরাঈলের প্রতি আল্লাহর একত্ববাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হিসাবে প্রতিফলিত করিবার জন্য তাঁহার প্রচেষ্টা (২:৪৭-১৩৪)। এই দীর্ঘ বিবরণীর ঘটনায় চারটি বিষয়ের উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হইয়াছে। (এক) ইহা সুস্পষ্ট করা হইয়াছে যে, এই যুক্তি সাধারণভাবে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের বিরুদ্ধে নয় কিংবা তাহারা যেহেতু মূসা ও ঈসা (আ)-এর অনুসারী তাই তাহাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হইয়াছে বলিয়াও নয়, বরং ঐ সকল নবী (আ)-এর নামে প্রচলিত নির্দিষ্ট মতবাদ ও আচার-অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে। অতঃপর ইহা দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করা যায়ঃ "যাহারা বিশ্বাস করে, যাহারা ইয়াহুদী হইয়াছে এবং খৃস্টান ও সাবিঈ-যাহারাই আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করে ও সৎ কাজ করে তাহাদের জন্য পুরস্কার তাহাদের প্রতিপালকের নিকট আছে। তাহাদের কোন ভয় নাই এবং তাহারা দুঃখিত হইবে না" (২ঃ ৬২)। ২১
(দুই) ইহা উল্লেখ করা হইয়াছে যে, ইহা কেবল ইয়াহূদীদের একটি শাখা সচেতনভাবে এবং জানিয়া-শুনিয়া বাইবেলের পরিবর্তন সাধন করে। পক্ষান্তরে ইয়াহুদীদের অপর শাখা ধর্মগ্রন্থে প্রকৃতপক্ষে কি পরিবর্তন করা হইয়াছে তাহা জানিত না এবং তাহারা শুধু প্রথমোক্তদের ইচ্ছা ও খেয়াল-খুশীমত ইহা অনুসরণ করিয়া চলে (আয়াত ২ঃ ৭৫, ৭৮)।
(তিন) একইরূপ ভাবধারায় এমন বর্ণনা রহিয়াছে যে, মূসা (আ)-এর গ্রন্থে যে বাণী ধারণ করা হইয়াছে তাহা তাঁহার সময় পর্যন্ত থামিয়া থাকে নাই। কারণ আল্লাহ তা'আলা ঈসা (আ)-সহ অন্যান্য নবীগণকে প্রেরণ করিয়া সেই ধারা অনুসরণ করিবার ব্যবস্থা করিয়াছেন। কিন্তু ইহা সত্ত্বেও ইয়াহুদীগণ যখন দেখিল যে, তাহাদের পছন্দ বা অপছন্দের সহিত মূসা (আ)-এর গ্রন্থের ঐশী বাণীর কোন মিল নাই, তখন তাহারা কোন কোন নবীকে মিথ্যা বলিয়া প্রতিপন্ন করিল এবং তাঁহাদের কাহাকেও হত্যা পর্যন্ত করিল (আয়াত ২:৮৭)। ২২ ইয়াহুদী ও খৃস্টান ব্যতীত আর কেহই জান্নাতে প্রবেশ করিতে পারিবে না, এই দাবির ত্রুটি এই প্রসংগে চিহ্নিত করা হইয়াছে এবং ইহা পুনঃ ব্যক্ত করা হইয়াছে যে, যাহারা সর্বান্তকরণে আল্লাহ তা'আলার নিকট আত্মসমর্পণ ও ভাল কাজ করিবে তাহারা আল্লাহ তাআলা ঘোষিত পুরস্কার লাভ করিবে (আয়াত ২: ১১১-১১২)।
আল্লাহ্ পুত্র সম্পর্কিত ধারণা যা ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের মধ্যে সাধারণভাবে প্রচলিত তাহা এই আয়াতে (আয়াত ২: ১১৬-১১৭) দৃঢ়ভাবে খণ্ডন করা হইয়াছে। ইয়াহুদী ও খৃস্টানগণ ইবরাহীম ও ইয়া'কূব (আ)-এর সহিত তাহাদের জ্ঞাতি সম্পর্ক রহিয়াছে এইরূপ ঘোষণা দান করিলেও এই আয়াতে অবশেষে ইবরাহীম ও ইয়া'কূব (আ)-এর প্রসঙ্গ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ পূর্বক ইহা দেখান হইয়াছে যে, তাঁহারা উভয়ই তাঁহাদের বংশধর ও উত্তরাধিকারিগণকে একমাত্র এক আল্লাহ্ ইবাদত ও তাঁহার নিকট সর্বান্তকরণে আত্মসমর্পণ করিতে নির্দেশ প্রদান করেন (আয়াত ২: ১৩২-১৩৩) এবং এই যুক্তির অনুবৃত্তিক্রমে আয়াত ১৩৫-এ বর্ণনা করা হইয়াছে: "তাহারা বলে, ইয়াহুদী হও অথবা খৃস্টান হও, তোমরা সঠিক পথনির্দেশ প্রাপ্ত হইবে। বল, বরং একনিষ্ঠ হইয়া আমরা ইবরাহীমের ধর্ম হানীফ অনুসরণ করিব এবং সে অংশীবাদীগণের অন্তর্ভুক্ত ছিল না"।
এইখানে ও অন্যত্র সমগ্র আলোচনাটি এক আল্লাহ্ ইবাদত সম্পর্কে আবর্তিত হইয়াছে। আরববাসী ও মহানবী-এর অনুসারীদের জন্য একমাত্র ও স্বতন্ত্রভাবে ইবরাহীম (আ)-এর সহিত সম্বন্ধ রহিয়াছে এমন দাবি করা হয় নাই। অথচ ইহার বিপরীতে সমগ্র আলোচনার মুখ্য বিষয় হইতেছে যেহেতু ইয়াহুদী ও খৃস্টানগণ নিজেরাই ইবরাহীমের সহিত তাহাদের সম্পর্কের দাবি করে, তাই ইহা কেবল একত্ববাদের প্রতি দৃঢ়রূপে আনুগত্য পোষণ করা তাহাদের জন্য শোভন হয় যাহা ইবরাহীম শিখাইয়াছিলেন ও নিজেই আদর্শের প্রতীকস্বরূপ হইয়াছিলেন। সেই কারণে যখনই তাঁহাকে 'হানীফ' হিসাবে বর্ণনা করা হয় তখনই জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয় যে, তিনি অংশীবাদীগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। নবীদের ক্ষেত্রে কোনরূপ অগ্রাধিকার বা শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান কিংবা ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের নবীদের মর্যাদা খর্ব করিবার জন্য এমন কোন চাতুরী অথবা সুপারিশও নাই যে, একজন নবীর শিক্ষা বা উপদেশ অন্য নবী হইতে ভিন্নতর হইবে। সকল নবীর বাণীর অভিন্নতা ও অবিরাম চলমানতার উপর নিচের আয়াতে (আয়াত ২: ১৩৬) জোরালোভাবে প্রকাশ করা হইয়াছে:
قُولُوا آمَنَّا بِاللهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ إِلِى إِبْرَاهِيمَ وَاسْمُعِيلَ وَاسْحَقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِنْ رَّبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ .
"তোমরা বল, আমরা আল্লাহতে ঈমান রাখি এবং যাহা আমাদের প্রতি এবং ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়া'কূব ও তাহার বংশধরগণের প্রতি অবতীর্ণ হইয়াছে এবং যাহা তাহাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে মূসা, ঈসা ও অন্যান্য নবীগণকে দেওয়া হইয়াছে। আমরা তাহাদের মধ্যে কোন পার্থক্য করি না এবং আমরা তাঁহার নিকট আত্মসমর্পণকারী"।
ইবরাহীমের সহিত তাহাদের সম্বন্ধ রহিয়াছে, ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের এইরূপ দাবির অসঙ্গতির দৃষ্টান্ত হিসাবে বিশ্বাসী (হানীফ) হিসাবে ইবরাহীমের প্রসঙ্গে অবতারণা করা হইয়াছে। কারণ, আয়াত ৩ঃ ৬৭ ও ৩৪ ৯৫-এ হানীফ শব্দের দুইটি ভিন্ন প্রয়োগে প্রকৃত একত্ববাদের প্রতি তাহাদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন অধিকতর স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। এই সূরার ৩৩ নং আয়াত হইতে এই যুক্তির অবতারণা করা হইয়াছে যেখানে আল্লাহ্র বিশেষ অনুগ্রহ লাভকারী হিসাবে আদম, নূহ ও ইবরাহীম এবং ইমরান-এর পরিবারের উল্লেখ প্রথমে আসিয়াছে। ইহার পর আয়াত ৩৫ হইতে ৬২ পর্যন্ত ঈসা (আ)-এর জন্ম ও ধর্ম প্রচারের কাহিনী বিবৃত হইয়াছে। এই বিবরণীতে ইহার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে যেখানে তিনি ঘোষণা দান করেন, "আল্লাহ আমার প্রতিপালক এবং তোমাদের প্রতিপালক, সুতরাং তোমরা তাঁহার ইবাদত করিবে। ইহাই সরল পথ"। ২৩ ইহাতে আরও গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে যে, আল্লাহ্র ইচ্ছা ও সর্বশক্তিমানের নিদর্শন হিসাবে আদমের সৃষ্টির ন্যায় ঈসাকে সৃষ্টি করা হইয়াছে। ২৪ অতএব ঈসার অসাধারণ জন্ম তাঁহার প্রতি ঈশ্বরত্ব আরোপ করিবার কোন কারণ হইতে পারে না। আয়াত নং ৩ঃ ৬৪-তে খৃস্টান ও ইয়াহুদী উভয় সম্প্রদায়ের প্রতি এক ঐকান্তিক আহ্বান করা হইয়াছে। আয়াতটি নিম্নরূপ:
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ إِلا نَعْبُدَ إِلا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّنْ دُونِ اللَّهِ فَإِنْ تَوَلَّوا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّنَا مُسْلِمُونَ .
"তুমি বল, হে কিতাবীগণ! আইস সে কথায় যাহা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যেন আমরা আল্লাহ ব্যতীত কাহারও ইবাদত না করি, কোন কিছুকেই তাঁহার শরীক না করি এবং আমাদের কেহ কাহাকেও আল্লাহ ব্যতীত প্রতিপালকরূপে গ্রহণ না করে। যদি তাহারা মুখ ফিরাইয়া লয় তবে বল, তোমরা সাক্ষী থাক আমরা মুসলিম" (৩:৬৪)।
ইবরাহীম (আ) একজন ইয়াহুদী বা খৃস্টান ছিলেন- এই দাবির অযৌক্তিকতা পরবর্তীতে একটি সরল তথ্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া দেখান হইয়াছে যে, ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তি হিসাবে যথাক্রমে তাওরাত ও ইনজীল কিতাব ইবরাহীমের অনেক পরে নাযিল হইয়াছে (আয়াত ৩: ৬৫-৬৬)। অতঃপর যদি তাহারা ইবরাহীমের সহিত নিজেদেরকে অভিন্নরূপে গণ্য করিতে ইচ্ছুক হয় তবে পরিপূর্ণ একত্ববাদকে মানিয়া লইয়া তাহারা ইহা করিতে পারে। কারণ আয়াত ৩: ৬৭-এ ঘোষণা করা হয়:
مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًا وَلا نَصْرَانِيًّا وَلكِنْ كَانَ حَنِيفًا مُّسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ .
"ইবরাহীম ইয়াহুদীও ছিল না, খৃস্টানও ছিল না; সে ছিল একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণকারী এবং সে অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না"।
পরবর্তী আয়াতেও এই যুক্তি উপস্থাপিত হইয়াছে যাহা নিম্নরূপ:
إِنَّ أُولَى النَّاسِ بِإِبْرَاهِيمَ لَلَّذِينَ اتَّبَعُوهُ وَهَذَا النَّبِيُّ وَالَّذِينَ آمَنُوا .
"নিশ্চয় মানুষের মধ্যে তাহারা ইবরাহীমের ঘনিষ্ঠতম যাহারা তাহার অনুসরণ করিয়াছে তাহারা এবং এই নবী ও যাহারা ঈমান আনিয়াছে..." (৩ঃ ৬৮)।
যদি কেহ প্রকৃতপক্ষে নিজকে ইবরাহীমের সহিত অভিন্নরূপে গণ্য করিতে চাহে তাহা হইলে একত্ববাদের একই ভাব ও ইবরাহীমের নির্দেশিত পথ অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার উপর একইরূপ গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে যাহা উপরে উদ্ধৃত আয়াতের বিষয়বস্তু হিসাবে প্রতীয়মান। এই একই বিষয় আয়াত ৩: ৯৫-এ উল্লিখিত হইয়াছে, যাহা নিম্নরূপ:
قُلْ صَدَقَ اللَّهُ فَاتَّبِعُوا مِلَّةَ إِبْرِهِيمَ حَنِيفًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ .
"বল, আল্লাহ সত্য বলিয়াছেন। সুতরাং তোমরা একনিষ্ঠ ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ কর, সে অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নহে” (৩ঃ ৯৫)।
উপরিউক্ত তিনটি আয়াতে (অর্থাৎ ২: ১৩৫; ৩:৬৭ ও ৩ঃ ৯৫) তাহারা যে ইবরাহীমের সম্প্রদায়ভুক্ত “ধর্মগ্রন্থের লোকদের" অর্থাৎ কিতাবধারীদের নিজেদের এই দাবির জবাবে একজন হানীফ হিসাবে ইবরাহীমের প্রসঙ্গের অবতারণা করা হইয়াছে। যদি তাহারা তাহাদের দাবির প্রতি সত্যই বিশ্বস্ত থাকে, তাহা হইলে ইবরাহীমের মিল্লাত কঠোরভাবে অনুসরণ করিবার জন্য অতঃপর তাহাদিগকে আহ্বান জানান হয়। মূসা ও ঈসা (আ) কর্তৃক প্রচারিত ধর্মোপদেশের উপর অগ্রাধিকার প্রদান বা শ্রেষ্ঠত্ব আরোপের কোন অজুহাত কোথাও করা হয় নাই অথবা এমন কোন সুপারিশও করা হয় নাই যে, ইবরাহীমের সহিত সম্পর্কের দাবি করিবার অধিকার একচেটিয়া কেবল আরবদের অধিকারভুক্ত। অধিকন্তু সকল নবীর সমকক্ষতা ও তাঁহাদের শিক্ষার অভিন্নতা সর্বত্র বিশেষ গুরুত্বের সহিত উল্লিখিত হইয়াছে।
আয়াত ৪: ১২৫ (সূরা আন-নিসা)-এ হানীফ শব্দের উল্লেখ দেখা যায়। এইখানেও মূলভাব হইতেছে: সম্পূর্ণ একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা এবং এর বিপরীতে অংশীবাদের সকল ছায়াকে সঠিকভাবে প্রত্যাখ্যানের উপর জোর দেওয়া হইয়াছে। এই সূরার আয়াত ১১৬-তে এই মূল ভাবটি সুনির্দিষ্টভাবে শুরু হইয়াছে। আয়াতটির বর্ণনা নিম্নরূপঃ "আল্লাহ তাঁহার শরীক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না, ইহা ব্যতীত সব কিছু যাহাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং কেহ আল্লাহ্র সহিত অন্য কাহাকেও শরীক করিলে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়" (৪: ১১৬)। ২৫
তারপর আয়াত ১১৭-১২০-এ বর্ণনা রহিয়াছে যে, শয়তানই মানুষকে পথভ্রষ্ট করে এবং আল্লাহর পরিবর্তে বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করে, আর তাহাদের হৃদয়ে মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করে। এই মিথ্যা আশা ও প্রতিশ্রুতি এখানে পরোক্ষভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে, যাহা পাঠকবর্গ স্পষ্টভাবে বুঝিতে পারিয়াছে এবং ইহা কুরআনের অন্যত্র বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হইয়াছে। ইহা সবই পৌত্তলিক আরবদের দাবি ছিল যে, মৃত্যুর পর শেষ বিচারের দিনে ২৬ তাহাদিগকে পুনরুত্থিত করা হইবে না এবং তাহাদের দেব-দেবীগণ তাহাদের পক্ষে ২৭ আল্লাহ্র সহিত মধ্যস্থতা করিবে। আর কিতাবধারীদের দাবি যে, তাহারা "আল্লাহ্ পুত্র ও প্রিয়পাত্র" ২৮ এবং তাহাদেরকে নির্দিষ্ট কিছু সময়কালে নরকাগ্নি ভোগ ব্যতীত কোন কষ্টভোগ করিতে হইবে না। ২৯ তারপর একজন ইয়াহুদী বা একজন খৃস্টান ব্যতীত কেহই জান্নাতে প্রবেশ করিতে পারিবে না।৩০ এই সূরার ১২১-১২৪ নং আয়াতে পৌত্তলিক আরব ও কিতাবধারীদিগকে সম্বোধন করিয়া বলা হইয়াছে, "তোমাদের খুশী ও কিতাবীদের খেয়াল-খুশী অনুসারে কোন কাজ হইবে না"। ৩১ একই সাথে ব্যক্তিগত দায়-দায়িত্বের নীতির উপর এই বলিয়া জোর দেওয়া হইয়াছে যে, যে কেহই ভাল কাজ করিবে এবং যাহার ঈমান আছে তাহাকে পুরস্কৃত করা হইবে। আর যে বা যাহারা মন্দ কাজ করিবে আল্লাহ তাহার বা তাহাদের যথাযথ প্রতিদান প্রদান করিবেন। ৩২ অতঃপর আয়াত ৪:১২৫-এ উল্লেখ করা হইয়াছে যে, আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণের সর্বোত্তম উপায় হইতেছে উত্তম কাজ করা এবং একজন হানীফ হিসাবে ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করা। আয়াতটি নিম্নরূপ:
وَمَنْ أَحْسَنُ دِينًا مِّمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ وَاتَّبَعَ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا
"তাহার অপেক্ষা দীনে কে উত্তম যে সৎকর্মপরায়ণ হইয়া আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং একনিষ্ঠভাবে ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করে" (৪ : ১২৫)?
হানীফ শব্দটি দৃশ্যমান এইরূপ কুরআনের ১২টি আয়াতের (৬টি মক্কায় ও ৬টি মদীনায় অবতীর্ণ) একটি বিশ্লেষণ জেফারি-বেল তত্ত্বের অগ্রহণযোগ্যতাকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করিয়াছে। ইহাতে বলা হইয়াছে যে, মহানবী হানীফ শব্দটির অভিব্যক্তির আশ্রয় গ্রহণ করিয়া এই তত্ত্বের উপর এক আল্লাহ্ ইবাদতকারীদের সম্পর্কে একটি নূতন ধারণার সূচনা করেন এবং তাঁহার মদীনায় হিজরতের পর তাঁহার ও ইয়াহুদীদের মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে কেবল ইবরাহীমের ধর্মের সাথে তিনি সম্পর্ক স্থাপন করেন। ইয়াহুদী ও খৃস্ট এই উভয় ধর্ম হইতে বাহির হইয়া আসিয়া ইবরাহীমের স্মৃতি লালনকারী পৌত্তলিক আরবদের উপর স্বীয় ধর্মমতের জয়লাভ করাই তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল। দেখা গিয়াছে যে, মদীনায় হিজরতের বহু পূর্বে এবং মহানবী -এর ধর্মপ্রচারের একেবারে গোড়ার দিকে মক্কাতে হানীফ শব্দের ব্যবহার ও ইবরাহীমের ধর্মোপদেশের প্রসংগ আসিয়াছে। এই মক্কাতেই আবার ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃস্টধর্মের মৌলিক ও প্রধান মতবাদসমূহের ব্যতিক্রম ঘটিয়াছে। যুক্তির মুখ্য বিষয় হইতেছে এক আল্লাহর ইবাদত। খৃস্টধর্মের ত্রিত্ববাদ যথা পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা শুরু হইতেই প্রত্যাখ্যান করা হইয়াছে এবং এই প্রত্যাখ্যান মক্কা ও মদীনার সমগ্র কালব্যাপী বারংবার পুনরুক্ত হইয়াছে। বাস্তবিকই ইহা ছিল একটি কঠোর ও অদম্য একত্ববাদের ভাবধারা যেখানে মক্কী ও মাদানী যুগের সমগ্র আমল ধরিয়া হানীফ পরিভাষার ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। যেহেতু মহানবী বহু ঈশ্বরবাদের বিপরীত একটি নূতন ভাবধারায় হানীফ শব্দ ব্যবহার করেন, তাই বেল পরোক্ষভাবে স্বীকার করেন যে, সম্পূর্ণভাবে এক আল্লাহ্ ইবাদতকারীর ভাবধারায় কুরআনে সর্বত্র হানীফ শব্দের প্রয়োগ হইয়াছে। হানীফ শব্দের উপর কোন অসাধারণ ও অজানা ভাবধারা আরোপ না করিয়া মক্কা ও মদীনায় অবতীর্ণ আয়াতসমূহে ইবরাহীমের কোন উল্লেখ ব্যতিরেকে ইহাকে তাহার বর্গীয় নামে দেখান হইয়াছে। এইরূপ ধারণা করা খুবই অযৌক্তিক হইবে যে, শুধু ইয়াহুদী ও খৃস্টান সম্প্রদায় হইতে বিচ্ছিন্ন হইবার স্বার্থে এবং তাঁহার ধর্মমতে আনিবার জন্য পৌত্তলিক আরবদের মন জয় করিবার উদ্দেশ্যে মহানবী হানীف শব্দের একটি নূতন অর্থ তৈয়ার করেন। কারণ তাহা হইলে মহানবী -এর শত্রুপক্ষ কর্তৃক বিভ্রান্তি সৃষ্টি, সমালোচনা ও ভুল বুঝাবুঝির সমূহ আংশকা থাকিত। তবুও কুরায়শ গোত্রের বিরোধিতাকারী অথবা কিতাবধারী যাহারাই হউন না কেন পবিত্র কুরআনে হানীف শব্দের প্রয়োগের বিষয়ে তাহাদের নিকট হইতে কোন আপত্তি উত্থাপিত হইতে দেখা যায় নাই। আর কল্পনা করুন তো যদি কোন ব্যক্তি ইংল্যান্ডের কোন ইতিহাস প্রসিদ্ধ পণ্ডিত ব্যক্তিকে জ্ঞানীর বিপরীতার্থক শব্দ নির্বোধ নামে অভিহিত করিবার দুঃসাহস দেখায় এবং ইংরেজদিগকে তাহাদের জাতীয় বীরকে নির্বোধ ব্যক্তি হিসাবে গ্রহণের আহ্বান জানায় তাহা হইলে কিরূপ অবস্থার সৃষ্টি হইবে!
প্রকৃত তথ্য হইতেছে কুরআনে একটি নূতন ভাবধারায় হানীف শব্দটি সরাসরি ইহার বিপরীত ভাবধারায় ব্যবহৃত হয় নাই যদিও আরবগণ এই যাবৎ এই বিপরীত অর্থেই ইহা গ্রহণ করিয়া আসিয়াছে। তাহা ছাড়া ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম ত্যাগ করিয়া আসিবার উদ্দেশ্যে ইবরাহীম (আ)-এর কাহিনীতেও ইহার কোন প্রসংগ উল্লিখিত হয় নাই। মদীনার প্রসংগে ইবরাহীমকে হানীف হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে এবং ইবরাহীমের সহিত কিতাবধারীদের সম্বন্ধ রহিয়াছে-এইরূপ দাবির প্রত্যুত্তরে ইহার উল্লেখ করা হয়। ইহা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, একজন ইয়াহুদী অথবা একজন খৃস্টান হওয়া তো দূরের কথা, ইবরাহীম (আ) একজন খাঁটি এক আল্লাহ্ ইবাদতকারী হানীف ছিলেন, তিনি বহু ঈশ্বরবাদী ছিলেন না। অতঃপর যদি তাহাদের দাবির উপর তাহারা বিশ্বস্ত থাকে তাহা হইলে তাহাদিগকে ইবরাহীম (আ)-এর মিল্লাতের প্রতি অনুগত থাকিবার আহ্বান জানান হয়। ইহা ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ইহার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, কুরআন ও অতঃপর মুহাম্মাদ সেই সময়কার ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-আচরণকে একত্ববাদের পরিপন্থী এবং ইবরাহীম (আ) ও অন্যান্য নবীগণের শিক্ষার স্পষ্ট ব্যতিক্রম হিসাবে বিবেচনা করিতেন। ইহা আরও অর্থ প্রকাশ করে যে, ইহা জেফারি-বেল তত্ত্বের বিপরীত। কুরআন কখনও এই সাক্ষ্য দেয় না যে, মুহাম্মাদ সমালোচনার ভয়ে ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম হইতে একত্ববাদের ধারণা গ্রহণ করেন; বরং তাঁহার প্রচারিত ধর্মীয় বাণী অনেক আগে ইবরাহীম (আ) কর্তৃক প্রচারিত ধর্মোপদেশ হইতে গ্রহণ করেন বলিয়া কুরআনে প্রমাণ পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের বিষয়ে কুরআন আরও সাক্ষ্য দেয় যে, ইবরাহীমের সহিত তাহাদের সম্বন্ধ রহিয়াছে এইরূপ দাবির জবাবে এবং একত্ববাদ ও ইবরাহীমের ধর্ম শিক্ষার সহিত তাহাদের ধর্মবিশ্বাস ও অনুশীলনের মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতির বিপরীতে একজন হানীف (মু'মিন) হিসাবে ইবরাহীমের প্রসঙ্গ কুরআনে উল্লিখিত হইয়াছে। সেই কারণে ইহা বারংবার উল্লেখ করা হইয়াছে যে, তিনি যেমন বহু ঈশ্বরবাদীদের কেহই ছিলেন না, তেমনি ইয়াহুদী বা খৃস্টানও ছিলেন না। তাই ইবরাহীমের মিল্লাত অনুসরণ করিবার জন্য কিতাবধারীদের প্রতি প্রকাশ্য আহ্বান জানান যায় অথবা অন্তত এমন একটি সাধারণ নিয়ম, যথা এক আল্লাহ্ ইবাদত ও তাঁহার সহিত কাহাকেও শরীক না করিবার বিষয়ে একমত হওয়া যায়। ইহা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, কোন ধর্মমত অধিকতর পূর্বের বলিয়া তাহা অধিকতর বিশুদ্ধ ও প্রথম শ্রেণীর, আর অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে পরবর্তী কালের হইলে তাহা দ্বিতীয় শ্রেণীর, বিষয়টি তাহা ছিল না। বিষয়টি ছিল স্পষ্টভাবে একত্ববাদ এবং ইহার বিরোধিতা। হানীف ও মদীনায় ইবরাহীমের কাহিনীর পক্ষে কুরআন ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের ইসলাম সম্পর্কে সমালোচনার বিরুদ্ধে আদৌ কোন রক্ষণাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করে নাই। ইয়াহুদী ও খৃস্টানগণ ইবরাহীম (আ)-এর সহিত তাহাদের অভিন্নতার দাবি করে এবং অতঃপর তাহাদের এইরূপ দাবির অসঙ্গতি ও তৎসহ তাহাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচরণে একত্ববাদের স্পষ্ট অস্বীকৃতির বিরুদ্ধে ইহা ছিল একটি প্রচণ্ড আক্রমণ।
টিকাঃ
১৭. উদাহরণস্বরূপ দ্র. কুরআনের আয়াত ৬ ৪:৭৪-৯০; ৭:৫৮-৯৩; ৭:১০০-১২৯; ১০:১৩, ১০:৪৭, ১০ :৭১-৯২; ১৬:৩৬; ১৬:৪৩-৪৪; ১৬:১২০-১২৩; ১৯ :৪১-৫৮; ২০:৯-৯৯; ২১:২৫; ২১:৫১-৯৩; ২৩:২৩-৫০; ২৬:১০-১৯১।
১৮. দ্র. সূরা ১১২ ও ১৯:১৬-৩৫, ৮০, ৮৮-৯৩; ৯৯: ৬-৮; ১০১ :৬-১১।
১৯. দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্র. আল-কুরতুবী, তাফসীর, ৭খ., পৃ. ১৪৯-১৫০।
২০. উদাহরণস্বরূপ দ্র. সূরা ২য়, আয়াত ১১১ [২:১১১]।
২১. মূল পাঠটি নিম্নরূপ: إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالنَّصْرَى وَالصَّبِئِينَ مَنْ أَمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ . "নিশ্চয় যাহারা বিশ্বাস করে, যাহারা ইয়াহুদী হইয়াছে এবং খৃস্টান ও সাবিঈন-যাহারাই আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে তাহাদের জন্য পুরস্কার তাহার প্রতিপালকের নিকট। তাহাদের কোন ভয় নাই এবং তাহারা দুঃখিতও হইবে না"।
২২. وَلَقَدْ أَتَيْنَا مُوسَى الْكِتٰبَ وَقَفَّيْنَا مِنْ بَعْدِهِ بِالرُّسُلِ وَأَتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَتِ . وَأَيَّدْنُهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ أَفَكُلَّمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَى أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقًا كَذَّبْتُمْ وَفَرِيقًا تَقْتُلُونَ . "এবং নিশ্চয় আমি মূসাকে কিতাব দিয়াছি এবং তাহার পরে পর্যায়ক্রমে রাসূলগণকে প্রেরণ করিয়াছি, মারয়াম-তনয় ঈসাকে স্পষ্ট প্রমাণ দিয়াছি এবং পবিত্র আত্মা দ্বারা তাহাকে শক্তিশালী করিয়াছি। তবে কি যখনই কোন রাসূল তোমাদের নিকট এমন কিছু আনিয়াছে যাহা তোমাদের মনঃপূত নহে তখনই তোমরা অহংকার করিয়াছ আর কতককে অস্বীকার করিয়াছ এবং কতককে হত্যা করিয়াছ"!
২৩. আয়াত ৩:৫১।
২৪. আয়াত ৩:৫৯।
২৫. আয়াত ৪:১১৬ : মূলপাঠ নিম্নরূপ: إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًاً بعيداً ইহা উপরে পাঠের মধ্যে উদ্ধৃত হইয়াছে।
২৬. আয়াত ১৬:৩৮ : وَأَقْسَمُ بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لَا يَبْعَثُ اللَّهُ مَنْ يَمُوتُদৃঢ়তার সহিত আল্লাহ্র শপথ করিয়া বলে, যাহার মৃত্যু হয় আল্লাহ তাহাকে পুনর্জীবিত করিবেন না"। আরও দ্র. ৭২:৭।
২৭. উদাহরণস্বরূপ আয়াত ৬:৯৪; ১০:১৮ ও ৩৯:৪৩ দেখা যাইতে পারে।
২৮. আয়াত ৫:৮০ : وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى نَحْنُ أَبْنَاءُ اللَّهِ وَأَحِبَّاءُهُ. "ইয়াহুদী ও খৃস্টানরা বলে, তাহারা আল্লাহ্র পুত্র ও প্রিয়পাত্র"।
২৯. আয়াত ২:৮০ : . وَقَالُوا لَنْ تَمَسَّنَا النَّارُ الاَّ أَيَّامًا مُعْدُودَةً "তাহারা বলে, দিন কতক ব্যতীত অগ্নি আমাদিগকে কখনও স্পর্শ করিবে না"। আয়াত ৩:২৪ :
قَالُوا لَنْ تَمَسَّنَا النَّارُ الاَّ أَيَّامًا مَّعْجُودَات . "এই হেতু যে, তাহারা বলিয়া থাকে, 'দিন কতক ব্যতীত আমাদিগকে অগ্নি স্পর্শ করিবে না'"।
৩০. আয়াত ২:১১১ : وَقَالُوا لَنْ يَدْخُلَ الْجَنَّةَ الا مَنْ كَانَ هُودًا أَوْ نَصَارَى : বলে, "ইয়াহুদী বা খৃস্টান ছাড়া অন্য কেহ কখনও জান্নাতে প্রবেশ করিবে না"।
৩১. আয়াত ৪:১২৩ : لَيْسَ بِأَمَانِيكُمْ وَلَا أَمَانِي أَهْلِ الْكِتَبِ مَنْ يَعْمَلْ سُوء يُجْزَى...... "তোমাদের খেয়ালখুশী ও কিতাবীদের খেয়াল-খুশী অনুসারে কাজ হইবে না; কেহ মন্দ কাজ করিলে তাহার প্রতিফল সে পাইবে....।"
৩২. আয়াত ৪:১২২-১২৪।