📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 এক: তত্ত্বের সারসংক্ষেপ

📄 এক: তত্ত্বের সারসংক্ষেপ


প্রাচ্যবিদগণের একটি অবিরাম প্রচেষ্টা হইতেছে ইসলামের উত্থানকে সমসাময়িক অবস্থার সহিত সম্পর্কিত করিয়া দেখান যে, মুহাম্মাদ বিভিন্ন উৎস হইতে তথ্য ও ভাব গ্রহণ করিয়াছেন। তাই হানীফ সম্প্রদায়ের আলোচনার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে প্রাচ্যবিদগণের মনোযোগ খুব বেশী আকর্ষণ করিতে সক্ষম হইয়াছে। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে লিখিতে বসিয়া এ্যালয় স্প্রেংগার (Aloy Sprenger) মত প্রকাশ করেন যে, ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের পূর্বেকার আরবদেশে হানীফ সম্প্রদায়ের একটি অংশ এক ব্যাপক ভিত্তিক ধর্মীয় আন্দোলনের সূত্রপাত করে এবং মুহাম্মাদ নিজকে শুধু এই আন্দোলনের পুরোভাগে স্থাপিত করেন। তিনি স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এই আন্দোলনকে সংগঠিত ও পরিচালিত করেন।১ এইরূপ চরম মতামত খুব শীঘ্রই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। ইগনায় গোল্ডযিহার (Ignaz Goldziher) ছিলেন প্রশ্ন উত্থাপনকারীদের অন্যতম। তিনি স্প্রেংগারের ভুলগুলির উল্লেখ করিয়া বলেন যে, হানীফগণ কোন সংগঠিত দল ছিল না, বরং তাহারা ছিল কিছু সংখ্যক বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিমাত্র।২
উনবিংশ শতাব্দীর সমাপ্তিলগ্নে এবং বিংশ শতাব্দীর একেবারে প্রাথমিক পর্বে কিছু সংখ্যক পণ্ডিত এই বিষয়টির উপর আলোকপাত করেন। তাহারা 'হানীফ'-এর শব্দ প্রকরণের উপর মনোযোগ নিবদ্ধ করেন।° কিছুকাল ধরিয়া এইরূপ মত প্রচলিত ছিল যে, হানীফ শব্দটির হিব্রু ভাষার 'হানেফ' শব্দের সহিত সম্পৃক্ততা থাকিতে পারে। হানেফ শব্দের অর্থ অপবিত্র। তবে শব্দটির মূল যাহাই হউক না কেন সাধারণ প্রামাণ্য বিষয় হইতে কোন লক্ষণীয় ব্যতিক্রম দেখা যায় না যে, মুহাম্মাদ হানীফ সম্প্রদায় কর্তৃক প্রভাবিত ছিলেন। ১৯০৭ সালে R. A. Nicholson -এর নিবন্ধে এই প্রচলিত ধারণার প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি বলেন, "ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, হানীফিয়‍্যা সম্প্রদায়ের অধিকাংশই মুহাম্মাদ-এর সমসাময়িক ছিলেন বলিয়া তিনি তাহাদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন এবং ইহাদের নিকট হইতে তিনি প্রথম উদ্দীপনা লাভ করিয়া থাকিবেন"। ৪
বিষয়টির বুৎপত্তি সংক্রান্ত অর্থ আর্থার জেফারী'র (Arthur Jeffery) নিবন্ধ The Foreign Vocabulary of the Qur'an-এর অধিকতর মনোযোগ আকর্ষণ করে। ৫ তিনি বলেন, হানীফ শব্দটি প্রাচীন সিরীয় ভাষার 'হানপা' শব্দ হইতে উৎপত্তি হইয়াছে। ইহার অর্থ "ধর্মহীন অখৃস্টান”। তিনি আরও বলেন, কুরআনে হানীফ শব্দটি প্রধানত ইবরাহীমের প্রতি প্রযুক্ত হইয়াছে। ইবরাহীম (আ) মুহাম্মাদ-এর জীবনধারার এক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যেমন মুহাম্মাদ দাবি করেন যে, তাঁহার শিক্ষা ইয়াহুদী ধর্ম অথবা খৃস্টধর্মের বহু পূর্বে অবতীর্ণ ইবরাহীম (আ)-এর মিল্লাত হইতে আসিয়াছে এবং তিনি মিল্লাত ইবরাহীমের ধর্মকেই পুনর্বাসিত করিতেছেন। ৬
এই গবেষণা সন্দর্ভটি প্রকাশিত হওয়ার পূর্বে ইহা অনুসরণ করিয়া রিচার্ড বেল The Moslem World৭ পত্রিকায় আরেকটি তত্ত্বের অবতারণা করেন। এই তত্ত্ব প্রধানত জেফারি'র নিবন্ধে উল্লিখিত পরোক্ষ ইঙ্গিতের উপর ভিত্তি করিয়া প্রণীত এবং তিনি ইহাকে মুহাম্মাদ-এর জীবনধারায় কোন এক পর্যায়ে ইবরাহীম-এর ক্রিয়াকলাপ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। এই সম্পর্কে বেল-এর মন্তব্য: "আমার মনে হয়, সংক্ষিপ্ত হইলেও আমরা সম্পূর্ণ গুপ্ত তথ্য জানিতে পারিয়াছি"। এই গুপ্ত তথ্যটি নিম্নরূপ: তিনি প্রথমে শব্দটির উৎস সম্পর্কে জেফারি'র ধারণাকে এই বলিয়া সংশোধন করিয়াছেন যে, "হানীফ" (hanif) শব্দটির দ্বিতীয় শব্দাংশের (syllable) দীর্ঘ স্বরবর্ণটিকে যদি প্রাচীন সিরিয়ার ভাষায় এক বচনে ব্যবহৃত হানপা (hanpa) শব্দটি হইতে প্রকৃতি প্রত্যয় নির্ণয় করিতে হয়, তাহা হইলে ইহা হইবে মারাত্মক ভ্রমপূর্ণ। কিন্তু আরবী ভাষায় বহুবচনে ব্যবহৃত হুনাফা শব্দটি প্রাচীন সিরীয় ভাষার বহুবচন হানেফে (hanephe) শব্দের একটি পুনর্গঠন মাত্র। অতঃপর বেল মত প্রকাশ করেন যে, শব্দটি বহুবচনে অন্য ভাষা হইতে গ্রহণ করা হইয়াছে এবং আরবী ভাষার ব্যাকরণের রীতি অনুযায়ী বহুবচন হইতে একবচন হানীফ-এ উল্টাইয়া রূপান্তরিত হইয়াছে। তিনি আরও বলেন যে, সিরীয় ভাষাভাষী খৃস্টানগণ অধর্মান্তরিত আরবদের বুঝাইবার জন্য হানেফ শব্দটি ব্যবহার করিত। অতএব "আরববাসিগণ হইতেছে হুনাফা যাহারা ইয়াহুদীও নয়, খৃস্টানও নয়, কিন্তু প্রাচীন দেশীয় ধর্ম অনুসরণ করিয়া চলিত"।
এইভাবে শব্দটির উৎপত্তি ও অর্থ ব্যাখ্যা করিয়া বেল উল্লেখ করেন যে, মুহাম্মাদ বহু ঈশ্বরবাদের বিরোধিতার বিষয়টি প্রচারে ইহা ব্যবহার করিতেন এবং প্রকৃতপক্ষে ইয়াহুদীদের সহিত ধর্মীয় মতপার্থক্যের কারণে যে মক্কা নগরী একদা তাঁহাকে প্রত্যাখ্যান করিয়াছিল তাহার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে তিনি মক্কা নগরীকে তাঁহার প্রবর্তিত ধর্মের কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করিতেছিলেন। বেল যুক্তি পেশ করেন যে, যদিও মহানবী ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃস্টধর্ম হইতে প্রথমদিকে বেশ কিছু উপদেশ গ্রহণ করেন, কিন্তু তাঁহার মদীনায় আসার পর কিছু নির্দিষ্ট কারণে ইয়াহুদীদের সহিত তাঁহার মতবিরোধ হয়। ১০ অতঃপর তিনি এই উভয় ধর্মের সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করিতে আরম্ভ করেন। তিনি প্রথমে জেরুসালেম হইতে মক্কায় কিবলা পরিবর্তন করেন এবং তারপর ঘোষণা দান করেন যে, আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ মূলত একই ছিল, "কিন্তু কালক্রমে ইয়াহুদী ও খৃস্টান সম্প্রদায় উভয়ই পবিত্র বিশ্বাস হইতে সরিয়া আসিয়া নিজস্ব পথে পরিচালিত হয়"। ১১ বেল তাহার বর্ণনার সহিত আরও সংযোজন করিয়া বলেন যে, মুহাম্মাদ-কে আর একটি ধর্ম কাজে লাগাইতে হয়। তাহা হইতেছে, "আরবদের ধর্ম অথবা সেই সকল লোকের ভাষা যাহাদের নিকট হইতে তিনি তখন পর্যন্ত ধর্মীয় বিষয়ে তথ্য আহরণ করেন। এই সকল লোক হইতেছে 'হুনাফা'। তাহা অবশ্যই প্রথম যুগীয় খাঁটি ধর্মের বিচ্যুতি ভিন্ন আর কিছুই নহে এবং যেহেতু আবরাহাম (ইবরাহীম আ) তাঁহার পুত্র ইশমায়েল (ইসমাঈল আ)-এর মাধ্যমে আরবদের পূর্বপুরুষ হিসাবে পরিগণিত তাই মুহাম্মাদ তাঁহাকে হুনাফাদের ধর্মের প্রবর্তক হিসাবে গ্রহণ করেন"। কিন্তু তিনি সতর্কতার সহিত আরও যোগ করেন যে, তিনি বহু ঈশ্বরবাদীদের একজন নহেন এবং তিনি যে হানীফ ধর্মের প্রবর্তন করেন, তাহা অন্যান্য অবতীর্ণ ধর্মের ন্যায় একটি বিশুদ্ধ এক আল্লাহর ইবাদতের ধর্ম। এইরূপ যুক্তি উপস্থাপন করিয়া বেল বলেন, "আবরাহাম যেহেতু ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃস্টধর্ম উভয় হইতে পূর্বে পৃথিবীতে আগমন করেন, তাই এই দুই ধর্ম হইতে তাঁহার ধর্ম অধিক্ষতর বিশুদ্ধ...। এই সেই ধর্ম যাহাকে মুহাম্মাদ নিজে গ্রহণ করিয়া পুনঃঅধিষ্ঠিত করিবার জন্য প্রচার শুরু করেন। তিনি তাঁহার মুখমণ্ডল এখন হইতে ইয়াহুদী ধর্ম বা খৃস্টধর্মের দিকে নহে, বরং আরবদের পবিত্র মূল ধর্মের দিকে স্থির করেন"। অতঃপর বেল এইভাবে উপসংহার টানেন যে, "হানীফ সম্প্রদায়ই আরব ধর্মের মূল আদর্শের অনুসারী। তাহারা ইতিহাসখ্যাত লোকদের কোন ক্ষুদ্র গোত্র বা উপদল ছিল না, বরং তাহারা ছিল মুহাম্মাদ-এর অশান্ত মনের ফসল"। ১২
হানিফিয়্যা সম্প্রদায় একটি সংগঠিত উপদল যাহারা আল্লাহ্ একত্ববাদের পক্ষে একটি আন্দোলন শুরু করেন-অনুমানের এই সর্বোচ্চ সীমা হইতে শুরু করিয়া অনুমান ও ধারণার প্রায় শতাব্দী কালব্যাপী ইহা সর্বনিম্ন সীমায় পৌঁছে। তারপর উল্লেখ করা হয় হানিফিয়্যা সম্প্রদায় কোন ইতিহাস খ্যাত উপদল বা গোত্র ছিল না, বরং শুধু আরব ধর্মের আদর্শ উৎসের কাল্পনিক অনুসারী ছিল এবং তাহা ছিল মুহাম্মাদ-এর অশান্ত চিত্তের সৃষ্ট ফসল। এই অনুমান ব্যতিরেকে বেল-এর প্রধান মতামতসমূহ হইতেছে- (ক) যেহেতু হানীফ পরিভাষা প্রাচীন সিরীয় ভাষার বহুবচনে ব্যবহৃত হানেফে শব্দ হইতে হইয়াছে; (খ) যেহেতু প্রাচীন সিরীয় ভাষাভাষী খৃস্টানগণ যে অর্থে আরববাসীরা "প্রাচীন স্থানীয় ধর্ম" অনুসরণ করিত সেই অর্থে আরবগণ শব্দের ব্যবহার করে; (গ) যেহেতু মুহাম্মাদ মদীনার ইয়াহুদী সম্প্রদায় হইতে বাহির হইয়া গিয়া যখন এই পরিভাষাটি গ্রহণ করেন সেহেতু তিনি ইহার উপর বহু ঈশ্বরবাদের বৈপরীত্যের ধারণা আরোপ করেন। তিনি তাঁহার ধর্মীয় উপদেশসমূহকে আরববাসীদের মূল ধর্মের ধরিয়া লওয়া উৎসের সহিত চিহ্নিত করেন। আরবদের পূর্বপুরুষ আবরাহাম ও ইসমাঈলের মাধ্যমে যে ধর্মের প্রবর্তন করেন, তিনি তাহার সহিত স্বীয় প্রবর্তিত ধর্মীয় ব্যবস্থাকে চিহ্নিত করিয়া অধিকতর গুরুত্বারোপ করেন যে, পূর্ববর্তী নবীগণের উপর অবতীর্ণ আল্লাহর প্রত্যাদেশ মূলত একই ছিল। হানীফিয়্যা সম্প্রদায় সম্পর্কে ওয়াট যে মতামত ব্যক্ত করিয়াছেন তাহা প্রধানত জেফারি-বেল তত্ত্বের উপর ভিত্তি করিয়া প্রণীত। এইরূপ পর্যালোচনার পূর্বে জেফারি-বেল তত্ত্বের অবস্থানকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে পরীক্ষা করা বাঞ্ছনীয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00