📄 হানীফ সম্প্রদায় এবং 'উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ-এর ঘটনা
এক : হানীফ সম্প্রদায়
মুহাম্মাদ-এর নবুওয়াত দাবির সামান্য পূর্বে ইতিহাস রচয়িতাগণ কিছু সংখ্যক লোকের উল্লেখ করেন যাহারা পৌত্তলিকতা ও বহু ঈশ্বরবাদ পরিত্যাগ করিয়া ইবরাহীম (আ)-এর সত্য ধর্মের অন্বেষণ করেন। তাঁহাদিগকে আল-হানীফিয়্যাহ নামে অভিহিত করা হয়। বারবার যাঁহাদের নাম উচ্চারিত হয়, তহারা হইলেন:
(১) ওয়ারাকা ইবন নাওফাল (ইব্ন আহমাদ ইব্ন 'আবদুল 'উয্যা)।
(২) 'উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ (ইব্ন আ'মাশ ইবন 'আবদুল উয্যা)।
(৩) 'উবায়দুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ।
(৪) যায়দ ইব্ন 'আমর ইব্ন নুফায়ল।
(৫) 'উমায়্যা ইন্ন 'আবৗস্ সাল্ত।
(৬) 'আমর ইব্ন 'আবাসাহ।
(৭) সিরমাহ ইব্ন আবী 'আমাম (অথবা ইব্ন আবী কায়স)।
(৮) আন-নাবিগাই আল-জা'দী।
(৯) রি'আব ইবনুল বারাআ।
(১০) 'আবূ 'আমের আল্-আওসী।
(১১) খালিদ ইব্ন সিনান ইব্ন গায়ছ।
(১২) 'আবূ কায়স ইবনুল আসলাত।
এই তালিকার প্রথম চার জন দুইটি কারণে স্ব-উদ্যোগে একটি শ্রেণী গঠন করিয়াছিলেন বলিয়া কথিত হইয়া থাকে। প্রথমত, তাঁহারা সকলেই মক্কার অধিবাসী ছিলেন এবং তাঁহারা কেবল মুহাম্মাদ-এর সমসাময়িকই ছিলেন না, বরং তাঁহারা তাঁহার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও পরিচিতজনদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। দ্বিতীয়ত, তাঁহারা আনুষ্ঠানিকভাবে পৌত্তলিকতাকে মানিয়া লইতে অস্বীকার করেন এবং প্রায় একই সাথে ইবরাহীম (আ)-এর সত্য ধর্মের অন্বেষণে প্রবৃত্ত হন। ইবন ইসহাক কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, এই চার ব্যক্তি একদিন কুরায়শদের একটি বার্ষিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সমবেত হন। ঐ অনুষ্ঠানে একটি পাথরের মূর্তির পূজা ও দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গের ব্যবস্থা ছিল। তখন এই অনুষ্ঠান হইতে উক্ত চার ব্যক্তি নীরবে সরিয়া পড়েন এবং নিচুস্বরে নিজেদের মধ্যে এইরূপ আলোচনা করিতে থাকেন যে, তাঁহাদের কুরায়শ গোত্রের লোকেরা তাহাদের পূর্বপুরুষ ইবরাহীম (আ)-এবং সত্য ধর্ম হইতে পথভ্রষ্ট হইয়াছে। সত্য ধর্মের পরিবর্তে একটি পাথরের মূর্তির পূজা করা অর্থহীন। কারণ এই মূর্তি যেমন কোন কিছু দেখিতে ও শুনিতে পায় না তেমনি কাহারও কোন ক্ষতি বা উপকার করিতে পারে না। তারপর তাঁহারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইয়া গেলেন এবং পৃথকভাবে তাঁহারা বিভিন্ন অঞ্চল পরিভ্রমণ করিয়া ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম আল-হানীফিয়্যা'র অন্বেষণ করিতে থাকেন।
ইহা স্পষ্ট যে, যদিও এই চার ব্যক্তি একত্রে একই সময়ে স্বগোত্রের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হইতে বিচ্ছিন্ন হন তবুও বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তি পূজার প্রতি তাহাদের বিরাগ অনেক আগে হইতে তাহাদের মনে সৃষ্টি হইতেছিল। ইহাও অবশ্য লক্ষণীয় যে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান হইতে তাহাদের একযোগে সরিয়া পড়ার বিষয়টি স্বতঃস্ফূর্ত ছিল এবং অন্যের বিরক্তি উদ্রেককর ছিল না কিংবা ইহা তাহাদের পক্ষে কোন পরিকল্পিত গণআন্দোলনও ছিল না। ইবন ইসহাক বর্ণিত তথ্যের আলোকে ইহা আরও স্পষ্ট যে, মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে তাহাদের অনুভূতি অন্য কাহারও নিকট প্রকাশ করিবেন না বলিয়া তাহারা একমত হন। কিন্তু তাহাদের কার্যক্রমের ধরন যাহাই হউক, ইহা খুবই তাৎর্যপূর্ণ যে, তাহারা বিশ্বাস করিতেন তাহাদের গোত্রীয় লোকেরা ইবরাহীম (আ)-এর মূল ধর্ম আল-হানীফিয়্যা হইতে বহু দূরে সরিয়া গিয়াছে এবং এই ধর্ম তাহাদের অনুসরণ করা উচিত বলিয়াও তাহারা মনে করিতেন।
প্রথমোক্ত ব্যক্তি হইলেন ওয়ারাকা ইবন নাওফাল। তিনি কুরায়শ বংশের বনূ আসাদ গোত্রের লোক এবং উম্মুল মু'মিনীন খাদীজা (রা)-এর চাচা (সম্ভবত ইহা মুদ্রণ ত্রুটি, প্রকৃতপক্ষে ওয়ারাকা খাদিজা (রা)-এর চাচাতো ভাই) ছিলেন। হযরত খাদীজা (রা)-এর পিতা খুওয়ায়লিদ ও নাওফাল হইলেন আসাদ ইবন 'আবদুল 'উয্যার দুই পুত্র। এই চারজনের মধ্যে ওয়ারাকা ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ। তাঁহার সত্য ধর্মের অন্বেষণের বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায় না। তবে লিপিবদ্ধ বিবরণ অনুযায়ী তিনি পরবর্তী কালে খৃস্ট ধর্মে দীক্ষিত হন এবং ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের উপর প্রভূত জ্ঞান অর্জন করেন। হিব্রু ভাষাতেও তাঁহার দখল ছিল এবং তিনি বাইবেলের অংশবিশেষ হিব্রু ভাষায় অনুবাদ করেন। মহানবী যখন প্রথম ওহী লাভ করেন তখন ওয়ারাকা নিতান্তই বয়োবৃদ্ধ ছিলেন। ইহা সর্বজনবিদিত যে, মহানবী-এর প্রথম ওহী লাভের মত অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার পরপরই খাদীজা (রা) কিভাবে মহানবীকে তাঁহার চাচাত ভাইয়ের নিকট লইয়া গিয়াছিলেন এবং ওয়ারাকা তাঁহাদিগকে আশ্বাস দিয়াছিলেন যে, মুহাম্মাদ আল্লাহ্র নিকট হইতে ওহী লাভ করিয়াছেন, যেমন মূসা (আ) আল্লাহ্র নিকট হইতে নির্দেশ পাইতেন। তিনি আরও বলেন, মুহাম্মাদ তাঁহার স্বীয় গোত্রের লোকদের নিকট হইতে অনেক দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করিবেন। তিনি (ওয়ারাকা) যদি সেই সময় পর্যন্ত জীবিত থাকিতেন তাহা হইলে তিনি তাঁহাকে সম্ভাব্য সকল প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করিতেন। এই বিবরণ হইতে ইহা স্পষ্ট যে, যদিও ওয়ারাকা খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন তবুও তিনি দুইটি সুনির্দিষ্ট ধারণা পোষণ করিতেন, যেমন 'আল্লাহ্ ওহী' জিবরীল (আ) (নামূস)-এর মাধ্যমে কোন নবীর উপর অবতীর্ণ হইয়া থাকে এবং 'আল্লাহ্ কোন নবী' শীঘ্রই আবির্ভূত হইবেন। বস্তুত ওয়ারাকা নিশ্চিত ছিলেন যে, মুহাম্মাদ হইতেছেন সেই প্রত্যাশিত নবী। ওয়ারাকার প্রাক-বংশপরিচয়, বৃদ্ধ বয়স ও ইয়াহুদী- খৃস্টানদের ধর্মগ্রন্থের সহিত পরিচিতির প্রেক্ষিতে ইহা ধরিয়া লওয়া যুক্তিসঙ্গত যে, তাঁহার উপরিউক্ত ধারণাসমূহ সেই সময়ে বিদ্যমান ধর্মগ্রন্থসমূহ পঠন-পাঠনের ফলে সৃষ্টি হইয়াছিল।
তালিকার দ্বিতীয় ব্যক্তি হইলেন 'উছমান ইব্দুল হুওয়ায়রিছ। তিনি বনূ আসাদ গোত্রভুক্ত এবং ওয়ারাকা ও খাদীজা (রা) উভয়েরই চাচাত ভাই। কারণ 'উছমানের পিতা আল-হুওয়ায়রিছ ছিলেন আসাদ ইবন 'আবদুল 'উয্যা'র আর এক পুত্র। 'উছমানের সত্যধর্মের অনুসন্ধান প্রচেষ্টার সমাপ্তি ঘটে বিদেশী সহায়তায় মক্কায় ধর্মশাসন পরিবর্তনের মধ্য দিয়া, যাহা পরবর্তী অংশে বর্ণনা করা হইবে।
বনূ আসাদ ইব্ন খুযায়মা গোত্রের 'উবায়দুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ এই তালিকার তৃতীয় ব্যক্তি। 'উবায়দুল্লাহ ছিলেন মহানবী -এর ফুফাত ভাই। যেহেতু তাহার মা উমায়মা ছিলেন 'আবদুল মুত্তালিব-এর কন্যা। অন্যান্যদের ন্যায় 'উবায়দুল্লাহ আল-হানীফিয়্যাদের অন্বেষণে পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহ পরিভ্রমণ করেন। মহানবী-এর আহ্বানে সাড়া দিলে তিনি ইসলাম ধর্মে দীক্ষা গ্রহণকারী প্রথম মুসলমানদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হন। তাঁহার স্ত্রী 'উম্মু হাবীবা (রা)-ও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। 'উম্মু হাবীবা ছিলেন বনূ 'আবদ শাম্স গোত্রের আবূ সুফয়ান ইবন হারব-এর কন্যা। 'উবায়দুল্লাহ ও তাঁহার স্ত্রী উভয়ই ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী প্রাথমিক পর্যায়ের মুসলমান এবং তাহারা আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। সেখানে উবায়দুল্লাহ শেষ পর্যন্ত খৃষ্ট ধর্মে প্রত্যাবর্তন করেন এবং ঐ অবস্থায় তাহার মৃত্যু হয়। তাহার স্ত্রী 'উম্মু হাবীবা অবশ্য ইসলাম ধর্মে অবিচল চিত্তে অবস্থান করেন এবং পরবর্তী কালে মহানবী-কে বিবাহ করেন। ৬
যায়দ ইব্ন আমর ইব্ন নুফায়ল-এর কাহিনী সবচাইতে বেশী চিত্তাকর্ষক। ৭ তিনি বনূ 'আদী (ইব্ন কা'ব ইব্ন লু'আয়্যি) গোত্রের লোক ছিলেন। তিনি ছিলেন 'উমার ইবনুল খাত্তাব-এর চাচাত ভাই এবং আল-খাত্তাব ও আমর উভয়ই ছিলেন নুফায়ল-এর পুত্র। যায়দ-এর পুত্র সা'ঈদ উমার-এর ভগ্নী ফাতিমাকে বিবাহ করেন এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়ই প্রথম দিকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। যায়দ মূর্তিপূজার ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত কোন পশুর গোশত গ্রহণ করিতেন না। একইভাবে যে সমস্ত প্রাণী আপনাআপনি মারা যায় উহার গোশত ভক্ষণ ও মদপান হইতেও তিনি বিরত থাকিতেন। তিনি শেষ পর্যন্ত তাহার এই ধরনের মতামতকে গোপন রাখিতেন না এবং কন্যা শিশুকে হত্যার নির্মম জাহিলী প্রথার বিরুদ্ধাচরণ করিতেন; বরং নিজে কন্যা শিশুর ভরণপোষণ করিবেন এইরূপ অঙ্গীকার করিয়া তাহাদের জীবন রক্ষা করিতেন। কখনও কখনও তিনি কা'বাগৃহের পার্শ্বে বসিয়া এইরূপ ঘোষণা দান করিতেন যে, তাহার গোত্রের লোকদের মধ্যে একমাত্র তিনিই ইবরাহীম (আ)-এর ধর্মের অনুসারী এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদা করিতেন। তাহার শপথ পূর্বক মূর্তিপূজা পরিত্যাগ এবং জাহিলী প্রথার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ঘোষণা তাহার স্বীয় পরিজনদের এমনকি চাচাত ভাই আল-খাত্তাবের শত্রুতার সৃষ্টি করে। আল-খাত্তাব এজন্য যায়দের স্ত্রী ও অন্যদেরকে তাহার বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে। এই সকল লোকের শত্রুতা ও বিরুদ্ধতার কারণে যায়দের পক্ষে মক্কায় অবস্থান করা কঠিন হইয়া পড়ে। যে কোনভাবেই হউক, তিনি ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম হানীফিয়্যার সন্ধানে পার্শ্ববর্তী দেশ, বিশেষ করিয়া সিরিয়াতে গমন করেন। সেখানে তিনি খৃস্টান রাহেব ও ইয়াহুদী রাব্বীদের সাক্ষাৎ লাভ করেন। কিন্তু খৃস্ট কিংবা ইয়াহুদী ধর্ম তাহাকে আকর্ষণ করিতে পারে নাই। বর্ণিত আছে যে, তিনি এই দুইটি ধর্মকেও বহু ঈশ্বরবাদী প্রথা দ্বারা কলুষিত বলিয়া মনে করেন। আরও বর্ণিত আছে যে, ইবরাহীম (আ)-এর সত্য ধর্মের বিষয়ে অনুসন্ধানে একজন খৃস্টীয় রাহেব তাহাকে জানান যে, যায়দের নিজ দেশে ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম হানীফিয়্যাসহ একজন নবীর আগমন ঘটিবে এবং সেই নবীর আবির্ভাব খুব শীঘ্রই হইবে। এই তথ্য অবগত হইয়া যায়দ খুব দ্রুত মক্কায় প্রত্যাবর্তন করিতে থাকেন, কিন্তু সিরিয়ার সীমানার মধ্যে থাকা অবস্থায় তিনি কিছু সংখ্যক আততায়ী কর্তৃক নিহত হন। একটি বিবরণী হইতে জানা যায় যে, মহানবী -এর দীনি দাওয়াতের পূর্বে তিনি মক্কায় মহানবী -এর সহিত সাক্ষাত করেন। এই ঘটনা অবশ্যই যায়দের দুর্ভাগ্য কবলিত সিরিয়া ভ্রমণের পূর্বেই সংঘটিত হইয়া থাকিবে। আরও বর্ণিত আছে যে, একদা তাহার পুত্র সাঈদ যায়দের আত্মার মাগফিরাতের জন্য দু'আ করিবেন কিনা এই মর্মে মহানবী -কে জিজ্ঞাসা করিলে মহানবী সম্মতিসূচক মন্তব্য করেন।
এই চার ব্যক্তি ছাড়াও তালিকাভুক্ত অন্যান্য ব্যক্তিগণ সকলে মহানবী -এর সমসাময়িক ছিলেন। তালিকার পঞ্চম ব্যক্তি 'উমায়্যা ইব্ন আবিস সাল্ভ বনূ ছাকীফ গোত্রভুক্ত ছিলেন। তাহার পিতা আবুস সান্ত ইবন 'আবির রাবীআহ'র ন্যায় উমায়্যাও একজন কবি ছিলেন। তিনিও একজন হানীফ এবং সত্যধর্মের অনুসন্ধানকারী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই যে, পৌত্তলিতার প্রতি তাহার কোন বিশ্বাস ছিল না। তিনি মদ্যপানকে বেআইনী বিবেচনা করিয়া ইহা গ্রহণে বিরত থাকিতেন। তিনি খৃস্টান ও ইয়াহুদীদের ধর্মগ্রন্থ পাঠ করিলেও ইহাদের কোন ধর্ম গ্রহণ করেন নাই। ধর্মীয় বিষয়ের উপর ভিত্তি করিয়া তিনি প্রধানত কবিতা রচনা করিতেন, তবে তাহার কবিতায় উল্লেখযোগ্যভাবে স্রষ্টার একক সত্তার প্রতি ইঙ্গিত থাকিত। 'আবূ বাক্স আস-সিদ্দীক (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, একদিন তিনি ও যায়দ ইবন 'আমর কা'বার নিকটে বসিয়াছিলেন। এমন সময় উমায়্যা ইব্ন আবিস সান্ত সেখান দিয়া কোথাও যাইতেছিলেন। তখন যায়দ উমায়্যাকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, তিনি যে সত্য ধর্মের অন্বেষণ করিতেছেন তাহার সন্ধান পাইয়াছেন কিনা। উত্তরে উমায়্যা জানান যে, তিনি এখনও উহার সন্ধান জানিতে পারেন নাই। তখন তিনি একটি স্বরচিত কবিতা আবৃতি করিয়া বলেন যে, আল্লাহ্র নিকট আল-হানীফিয়া ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম গ্রহণীয় নয়। অন্যান্যদের মত তিনিও বিশ্বাস করিতেন যে, সত্য ধর্ম লইয়া শীঘ্রই একজন নবী অবতীর্ণ হইবেন এবং তিনি নিজেই সেই নবী হইবেন বলিয়া আশা পোষণ করিতেন। অতঃপর মুহাম্মাদ যখন নবুওয়াত প্রাপ্ত হইলেন তখন হিংসার বশবর্তী হইয়া উমায়্যা তাহার নবুওয়াতকে অস্বীকার ও তীব্রভাবে বিরোধিতা করিলেন।
তালিকার ৬ষ্ঠ, ৭ম ও ৮ম ব্যক্তি যথাক্রমে 'আমর ইবন 'আবাসা, সিরমাহ ইবন আনাস ও আন-নাবিগা আল-জা'দীকে একত্রে একটি দলে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। কারণ তাঁহাদের সকলেই মুহাম্মাদ -এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। বনূ সুলায়ম গোত্রের 'আমর ইবন 'আবাসা'র স্বীয় ভাষ্য অনুযায়ী জাহিলিয়্যা যুগের মূর্তিপূজাকে তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়া পরিত্যাগ করেন। তিনি মূর্তিপূজারী লোকদিগকে ইহার অসারতা সম্পর্কে অবহিত করিতেন। তিনি আরও জানান যে, একদিন তিনি দেব-দেবী ও উহার পূজার বিরুদ্ধে যখন কথা বলিতেছিলেন তখন উপস্থিত শ্রোতাদের একজন উল্লেখ করেন যে, মক্কায় এক ব্যক্তি (অর্থাৎ মহানবী ) দেব-দেবী ও উহার পূজার বিরুদ্ধে ঠিক অনুরূপভাবে মত প্রকাশ করেন। এই কথা শোনার পর 'আমর মক্কায় আসেন এবং মহানবী -এর নিকট ইসলাম সম্পর্কে তাঁহার বক্তব্য শুনিয়া তিনি তাঁহার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। ১২
অনুরূপভাবে বনূ 'আদী ইবনুন' নাজ্জার গোত্রের সিরমাহ ইবন আনাস জাহিলিয়্যা যুগের মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করিয়া সন্যাস জীবন গ্রহণ করেন এবং নিজের জন্য একটি উপাসনাগৃহ নির্মাণ করিয়া সেখানে অপবিত্র অবস্থায় অন্য সকলের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন। স্ত্রী সহবাসের পর তিনি গোসল করিয়া পরিচ্ছন্ন হইতেন, ঋতুকালীন স্ত্রী সহবাস করিতেন না এবং সকল প্রকার উত্তেজক পানীয় পরিহার করিতেন। তিনি ঘোষণা দিয়া বলিতেন যে, তিনি কেবল ইবরাহীম (আ)-এর এক আল্লাহ্র উপাসনা এবং তাঁহার প্রবর্তিত ধর্মের অনুসরণ করেন। মহানবী যখন মদীনায় হিজরত করেন তখন সিরমাহ ছিলেন খুবই বৃদ্ধ। তিনি মুহাম্মাদ সমীপে উপস্থিত হইয়া তাঁহার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। ১৩
বনূ আমের ইবন সা'সা'আ গোত্রের আন-নাবিগাহ আল-জা'দী জাহিলিয়্যা যুগে এক আল্লাহ্র ইবাদত ও ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম প্রসংগে আলোচনা করিতেন। ইহা ব্যতীত তিনি মৃত্যু-পরবর্তী জীবন, 'আযাব, বেহেশত ও দোযখ সম্পর্কে বিশ্বাস করিতেন। পরবর্তী কালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ১৪ অনুরূপভাবে রিআব ইবনুল বারাআ, 'আবূ 'আমের-আল-'আওসী ও খালিদ ইবন সিনান ইবন গায়ছও পৌত্তলিকতা পরিত্যগ করিয়া এক আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করেন। তিনিও বিশ্বাস করিতেন যে, ইবরাহীম (আ)-এর ধর্মসহ শীঘ্রই একজন নবীর আগমন ঘটিবে। ১৫
এই তালিকার শেষ ব্যক্তি হইলেন আবূ কায়স ইবনুল আসলাত এবং উপরিউক্ত তিন ব্যক্তি হইতে তাহাকে পৃথকভাবে বিবেচনা করিতে হইবে, যদিও তাহাদের কেহই মদীনাতে হানীফ হিসাবে পরিচিত ছিলেন না। মহানবী -এর মদীনাতে হিজরতের পর তিনি মহানবী -এর সহিত সাক্ষাত করিলেও ইসলাম গ্রহণ করিতে পারেন নাই। তিনি ছিলেন একজন কবি এবং 'আওস গোত্রের গণ্যমান্য ব্যক্তি। তিনি তাহার কবিতায় আল-হানীফিয়া সম্পর্কে উল্লেখ করিতেন এবং ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃস্ট ধর্মের পবিত্র গ্রন্থদ্বয়ে একজন নবীর আগমনবার্তার বিষয়টি তাঁহার কবিতা রচনার উপজীব্য বিষয় ছিল। মদীনার ইয়াহুদীগণ তাহাকে ইয়াহুদী ধর্ম গ্রহণের আহ্বান জানাইলেও তিনি তাহা প্রত্যাখ্যান করেন। তাহার দলভুক্ত অন্য অনেকের ন্যায় তিনিও সত্য ধর্মের অন্বেষণে সিরিয়া পরিভ্রমণ করেন। সিরিয়াতে খৃস্টান রাহেব ও ইয়াহুদী রাব্বীগণ তাহাদের স্ব স্ব ধর্ম গ্রহণের জন্য আহ্বান জানাইলেও তিনি তাহা গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন। তৎপ্রেক্ষিতে একজন রাহেব তাহাকে জানান যে, আল-হানীফিয়া নামে তিনি যে ধর্মের অন্বেষণ করিতেছেন তাহা ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম এবং ইহা তাহার নিজ দেশে দেখিতে পাইবেন। অতঃপর তিনি মদীনাতে প্রত্যাবর্তন করিয়া উমরা পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় গমন করেন। মক্কায় তিনি যায়দ ইবন 'আমর ইবন নুফায়লের সাথে সাক্ষাত করিয়া আলাপ-আলোচনা করেন। যায়দ তাহাকে বলেন যে, তিনিও খৃস্টান রাহেব ও ইয়াহুদীদের ধর্মকে সঠিক নয় বলিয়া মনে করেন এবং প্রকৃত আল্লাহর ইবাদতের ধর্ম হইতেছে ইবরাহীম (আ)-এর আল-হানীফিয়া। মহানবী মদীনায় হিজরত করিলে 'আবূ কায়স তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিয়া ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য শ্রবণ করেন এবং ইহার সত্যতা অনুধাবন ও তাঁহাকে (মুহাম্মাদ) নবী হিসাবে গ্রহণ করেন। মক্কায় ফিরিবার পথে আবূ কায়স-এর সহিত আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি-এর দেখা হয়। উবায়্যি তাঁহাকে খাযরাজ গোত্রের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করিতে থাকে। ইহাতে তিনি ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি এক বৎসরের জন্য স্থগিত রাখিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই সময়সীমা অতিক্রান্ত হইবার পূর্বেই মহানবী -এর মদীনায় হিজরতের প্রায় ১০ মাস পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ১৬
এই সকল ব্যক্তি ছাড়াও কুস ইব্ন সাইদা, আদ্দাস (উৎবাহ ইবন রাবীআ-এর মাওলা) এবং এমনকি বুসরার রাহেব বাহীরাকেও কেহ কেহ হানীফদের মধ্যে গণ্য করেন। ১৭ কেহ তাহাদিগকে 'আবূ যার আল-গিফারী ও সালমান আল-ফারিসী'র সমপর্যায়ভুক্ত বলিয়া মনে করেন। আবূ যার আল-গিফারী ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করিয়া তিন বৎসর যাবৎ আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করিতে থাকেন। ১৮ পক্ষান্তরে সালমান আল-ফারিসী ইবরাহীম (আ)-এর সত্য ধর্ম আল-হানীফিয়ার দীর্ঘ অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হন। অবশেষে তিনি ইসলাম ধর্মের মধ্যেই চূড়ান্ত সত্যের সন্ধান লাভ করিতে সক্ষম হন। ১৯
উপরের বর্ণনা হইতে ইহা স্পষ্ট যে, সেই সময়ে প্রচলিত বহু ঈশ্বরবাদী ও সর্বব্যাপী পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে এক আকস্মিক বিরাট পরিবর্তনের দ্বারা উপরিউক্ত ব্যক্তিবর্গ কর্মপ্রেরণা লাভ করেন, আবার অন্যভাবে বলিতে গেলে এক আল্লাহ্র প্রতি ইবাদতের জন্য প্রবল আসক্তি অনুভব করেন। ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম আল-হানীফিয়ার সহিত এক আল্লাহর ইবাদতকে তাহারা সমকক্ষ গণ্য করেন। প্রাপ্ত সূত্রসমূহ দ্ব্যর্থহীনভাবে এই সত্যের পক্ষে সমর্থন প্রকাশ করে এবং যাহারা ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম হিসাবে আল-হানীফিয়াকে বিশেষভাবে উল্লেখ ও চিহ্নিত করেন তাহাদের মধ্যে অনেকেই এতদসম্পর্কে তথ্যের পুনরুল্লেখ করেন। এমনকি উমায়্যা ইবন আবিস সাল্ত-এর কবিতায়ও স্পষ্টভাবে আল-হানীফিয়া শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়। অবশ্য তাহাদের অনেকেই স্বীয় লোকদের মধ্যে হানীফ হিসাবে বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন।
ইবরাহীম (আ)-এর ধর্মে প্রত্যাবর্তনের এই ঐকান্তিক আগ্রহ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ইহা একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, পৌত্তলিকতার অন্ধকারে নিপতিত হওয়া সত্ত্বেও আরববাসিগণ তাহাদের উৎস কা'বা শরীফের পবিত্রতা ও ইবরাহীম (আ)-এর অনেক ধর্মীয় আচার ও প্রথা খুঁজিয়া বাহির করিতে সক্ষম হয়। অবশ্য তাহারা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ্র ধারণা সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হয় নাই। ইহাই স্বাভাবিক ছিল যে, এক আল্লাহ্র ইবাদতের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ ঐ সকল পুণ্যাত্মা তাহাদের পূর্বপুরুষের মূল ধর্মের পুনরুজ্জীবন চাহিতেছিলেন। আল-হানীফিয়ার অনুসন্ধান আর একটি প্রমাণ এবং একই সাথে আরবে ইবরাহীম (আ)-এর প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় অনুশাসনের ধারাবাহিকতার একটি পরিণতি। ইহা অবশ্য এই মতের বর্ণনা করে যে, ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃস্টধর্ম সেই সময় আরবদেশে ও সিরিয়ায় প্রাধান্য বিস্তার করিলেও সত্য ধর্মের অনুসন্ধানকারিগণ এই দুইটি ধর্মের প্রশ্নহীন একেশ্বরবাদিতার আবেদন খুঁজিয়া পায় নাই। কারণ তাহাদের অনেকেই এই দুইটি ধর্মের কোনটিই গ্রহণ করে নাই, যদিও এই দুই ধর্মের পণ্ডিত ব্যক্তিদের সহিত তাহাদের সাক্ষাত হইয়াছিল। বস্তুত বহু হানীফ সেই সময়কার ইয়াহুদী ও খৃষ্ট ধর্মকে বিকৃত বলিয়া মনে করিত। ওয়ারাকা ইবন নাওফাল ও 'উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ-এর মত কিছু সংখ্যক সত্যানুসন্ধানকারী যদিও খৃস্টধর্ম গ্রহণ করেন তবুও ওয়ারাকা ইহাকে চূড়ান্ত সত্য হিসাবে মানিয়া লইতে পারেন নাই। কারণ সকল প্রকার বিবেচনা শেষে তিনি এইরূপ ধারণা পোষণ করিতেন যে, আর একজন নবী আসিবেন এবং তাঁহার উপর আল্লাহ্ ওহী অবতীর্ণ হইবে। দ্বিতীয় ব্যক্তি উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ অবশ্য স্বার্থ ও উচ্চাকাংখা সাধনে তৎপর ছিলেন।
তবে এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই যে, মুহাম্মাদ-এর নবুওয়াত লাভের প্রাক্কালে প্রকৃত ধর্মের অনুসন্ধানের একটি উদ্দীপনা এবং সত্য খুঁজিয়া বাহির করিবার একটি প্রবল আগ্রহ চূড়ান্ত গতিবেগ সঞ্চয় করিয়াছিল। মহানবী-এর স্বীয় শহর-সহ ঐ এলাকার বহু চিন্তাশীল ব্যক্তি এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার সহিত যুক্ত ছিলেন এবং তাহাদের মধ্যে মহানবী-এর আপন আত্মীয়-পরিজনও ছিলেন। উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ নিজে একজন চিন্তাশীল ব্যক্তি হইয়া সত্যানুন্ধানের সেই সময়কার উৎসাহ-উদ্দীপনা হইতে নিজকে সম্পূর্ণরূপে সরাইয়া রাখিতে পারেন নাই। তিনি কিভাবে এই প্রচেষ্টার প্রতি সাড়া দিলেন তাহা আলোচনার পূর্বে তাঁহার বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য করা সময়োপযোগী হইবে।
টিকাঃ
৬. ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ২২৩-২২৪।
৭. তাহার জন্য দেখুন, একই পুস্তকের একই পরিচ্ছেদ, পৃ. ২২৪-২৩২; আল-ইসাবা, ১খ., পৃ. ৫৬৯-৫৭০, নং ২৯২৩; আল-ইসতী'আব, ২খ., পৃ. ৬১৪, নং ৯৮২; কিতাবুল আগানী, ২খ., পৃ. ১৩৩।
৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৯-২০১।
৯. তাহার জন্য দ্র. ইব্ন কুতায়বা, আশ-শি'র ওয়াশ-শু'আরা, ১খ., পৃ. ৪৫৯ এবং কিতাবুল আগানী, ৩খ., পৃ. ১৭ প.।
১০. উসদুল গাবা, ৩খ., পৃ. ২০৭, নং ৩০৬৪; আরও দ্র. ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ৬০, কা'বা শরীফের উপর আবরাহার আক্রমণ প্রসংগে উদ্ধৃত কবিতার কিছু পার্থক্য রহিয়াছে। আল-মাস'উদীর মুরূজ, ১খ., পৃ. ৭০-৭১ (দারুল আন্দালুস বৈরূত ১৯৮৩ খৃ. সং. পৃ. ৮৪)-এ তাহার কিছু সংখ্যক কবিতার চরণের উদ্ধৃতি আছে। ইহার একটি চরণের এইরূপ: الْحَمْدُ لله لا شَريكَ لَهُ ، مَنْ لَمْ يَقُلْهَا فَنَفْسُهُ ظُلْمًا .
১১. কিতাবুল আগানী, ৩খ., পৃ. ১৮৭।
১২. মুসনাদ আহমাদ, ৪খ., পৃ. ১১১, ১১৪; মুসলিম, কিতাবু সালাতিল মুসাফিরীন, বাব ৫৩, হাদীছ নং ৩৯৪, পৃ. ৮৩২; নববী, ৪খ., পৃ. ১১৪-১১৫; উসদুল গাবা, ৩খ., পৃ. ২১০; আল-ইসতীয়াব, ১খ., পৃ. ১১৯২-১১৯৪, হাদীছ নং ১৯৩৬।
১৩. আল-ইসাবা, ২খ., পৃ. ১৮২-১৮৩, নং ৪০৬১।
১৪. আল-ইসতী'আব, ৪খ., পৃ. ১৫১৪, নং ২৬৪৮।
১৫. ইব্ন কুতায়বা, আল-মা'আরিফ (সম্পা. ছারওয়াত উকাশা), কায়রো, তা. বি., ৫৮-৬৮; আল-মাস'উদী, মুরূজ, ১খ. (সম্পা. এম.এম. আবদুল হামীদ), বৈরূত, তা. বি., পৃ. ৬৭-৬৯।
১৬. ইব্ন সাদ, ৪খ., পৃ. ৩৮৩-৩৮৫।
১৭. ইব্ন কুতায়বা, পূর্বে উল্লিখিত, পৃ. ৬১; আল-মাস'ঊদী, মুরূজ, ১খ., পৃ. ৬৯, ৭৪, ৭৫।
১৮. মুসনাদ আহমাদ, ৫খ., পৃ. ১৭৪; আল-ইসতী'আব, ১খ., পৃ. ২৫২-২৫৬।
১৯. ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ২১৪-২২২; আয-যাহাবী, সিয়ার, ১খ., পৃ. ৫০৫-৫৫৭।
📄 এক: হানীফ সম্প্রদায়
মুহাম্মাদ-এর নবুওয়াত দাবির সামান্য পূর্বে ইতিহাস রচয়িতাগণ কিছু সংখ্যক লোকের উল্লেখ করেন যাহারা পৌত্তলিকতা ও বহু ঈশ্বরবাদ পরিত্যাগ করিয়া ইবরাহীম (আ)-এর সত্য ধর্মের অন্বেষণ করেন। তাঁহাদিগকে আল-হানীফিয়্যাহ নামে অভিহিত করা হয়। বারবার যাঁহাদের নাম উচ্চারিত হয়, তহারা হইলেন:
(১) ওয়ারাকা ইবন নাওফাল (ইব্ন আহমাদ ইব্ন 'আবদুল 'উয্যা)।
(২) 'উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ (ইব্ন আ'মাশ ইবন 'আবদুল উয্যা)।
(৩) 'উবায়দুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ।
(৪) যায়দ ইব্ন 'আমর ইব্ন নুফায়ল।
(৫) 'উমায়্যা ইন্ন 'আবৗস্ সাল্ত।
(৬) 'আমর ইব্ন 'আবাসাহ।
(৭) সিরমাহ ইব্ন আবী 'আমাম (অথবা ইব্ন আবী কায়স)।
(৮) আন-নাবিগাই আল-জা'দী।
(৯) রি'আব ইবনুল বারাআ।
(১০) 'আবূ 'আমের আল্-আওসী।
(১১) খালিদ ইব্ন সিনান ইব্ন গায়ছ।
(১২) 'আবূ কায়স ইবনুল আসলাত।
এই তালিকার প্রথম চার জন দুইটি কারণে স্ব-উদ্যোগে একটি শ্রেণী গঠন করিয়াছিলেন বলিয়া কথিত হইয়া থাকে। প্রথমত, তাঁহারা সকলেই মক্কার অধিবাসী ছিলেন এবং তাঁহারা কেবল মুহাম্মাদ-এর সমসাময়িকই ছিলেন না, বরং তাঁহারা তাঁহার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও পরিচিতজনদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। দ্বিতীয়ত, তাঁহারা আনুষ্ঠানিকভাবে পৌত্তলিকতাকে মানিয়া লইতে অস্বীকার করেন এবং প্রায় একই সাথে ইবরাহীম (আ)-এর সত্য ধর্মের অন্বেষণে প্রবৃত্ত হন। ইবন ইসহাক কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, এই চার ব্যক্তি একদিন কুরায়শদের একটি বার্ষিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সমবেত হন। ঐ অনুষ্ঠানে একটি পাথরের মূর্তির পূজা ও দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গের ব্যবস্থা ছিল। তখন এই অনুষ্ঠান হইতে উক্ত চার ব্যক্তি নীরবে সরিয়া পড়েন এবং নিচুস্বরে নিজেদের মধ্যে এইরূপ আলোচনা করিতে থাকেন যে, তাঁহাদের কুরায়শ গোত্রের লোকেরা তাহাদের পূর্বপুরুষ ইবরাহীম (আ)-এবং সত্য ধর্ম হইতে পথভ্রষ্ট হইয়াছে। সত্য ধর্মের পরিবর্তে একটি পাথরের মূর্তির পূজা করা অর্থহীন। কারণ এই মূর্তি যেমন কোন কিছু দেখিতে ও শুনিতে পায় না তেমনি কাহারও কোন ক্ষতি বা উপকার করিতে পারে না। তারপর তাঁহারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইয়া গেলেন এবং পৃথকভাবে তাঁহারা বিভিন্ন অঞ্চল পরিভ্রমণ করিয়া ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম আল-হানীফিয়্যা'র অন্বেষণ করিতে থাকেন।
ইহা স্পষ্ট যে, যদিও এই চার ব্যক্তি একত্রে একই সময়ে স্বগোত্রের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হইতে বিচ্ছিন্ন হন তবুও বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তি পূজার প্রতি তাহাদের বিরাগ অনেক আগে হইতে তাহাদের মনে সৃষ্টি হইতেছিল। ইহাও অবশ্য লক্ষণীয় যে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান হইতে তাহাদের একযোগে সরিয়া পড়ার বিষয়টি স্বতঃস্ফূর্ত ছিল এবং অন্যের বিরক্তি উদ্রেককর ছিল না কিংবা ইহা তাহাদের পক্ষে কোন পরিকল্পিত গণআন্দোলনও ছিল না। ইবন ইসহাক বর্ণিত তথ্যের আলোকে ইহা আরও স্পষ্ট যে, মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে তাহাদের অনুভূতি অন্য কাহারও নিকট প্রকাশ করিবেন না বলিয়া তাহারা একমত হন। কিন্তু তাহাদের কার্যক্রমের ধরন যাহাই হউক, ইহা খুবই তাৎর্যপূর্ণ যে, তাহারা বিশ্বাস করিতেন তাহাদের গোত্রীয় লোকেরা ইবরাহীম (আ)-এর মূল ধর্ম আল-হানীফিয়্যা হইতে বহু দূরে সরিয়া গিয়াছে এবং এই ধর্ম তাহাদের অনুসরণ করা উচিত বলিয়াও তাহারা মনে করিতেন।
প্রথমোক্ত ব্যক্তি হইলেন ওয়ারাকা ইবন নাওফাল। তিনি কুরায়শ বংশের বনূ আসাদ গোত্রের লোক এবং উম্মুল মু'মিনীন খাদীজা (রা)-এর চাচা (সম্ভবত ইহা মুদ্রণ ত্রুটি, প্রকৃতপক্ষে ওয়ারাকা খাদিজা (রা)-এর চাচাতো ভাই) ছিলেন। হযরত খাদীজা (রা)-এর পিতা খুওয়ায়লিদ ও নাওফাল হইলেন আসাদ ইবন 'আবদুল 'উয্যার দুই পুত্র। এই চারজনের মধ্যে ওয়ারাকা ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ। তাঁহার সত্য ধর্মের অন্বেষণের বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায় না। তবে লিপিবদ্ধ বিবরণ অনুযায়ী তিনি পরবর্তী কালে খৃস্ট ধর্মে দীক্ষিত হন এবং ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের উপর প্রভূত জ্ঞান অর্জন করেন। হিব্রু ভাষাতেও তাঁহার দখল ছিল এবং তিনি বাইবেলের অংশবিশেষ হিব্রু ভাষায় অনুবাদ করেন। মহানবী যখন প্রথম ওহী লাভ করেন তখন ওয়ারাকা নিতান্তই বয়োবৃদ্ধ ছিলেন। ইহা সর্বজনবিদিত যে, মহানবী-এর প্রথম ওহী লাভের মত অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার পরপরই খাদীজা (রা) কিভাবে মহানবীকে তাঁহার চাচাত ভাইয়ের নিকট লইয়া গিয়াছিলেন এবং ওয়ারাকা তাঁহাদিগকে আশ্বাস দিয়াছিলেন যে, মুহাম্মাদ আল্লাহ্র নিকট হইতে ওহী লাভ করিয়াছেন, যেমন মূসা (আ) আল্লাহ্র নিকট হইতে নির্দেশ পাইতেন। তিনি আরও বলেন, মুহাম্মাদ তাঁহার স্বীয় গোত্রের লোকদের নিকট হইতে অনেক দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করিবেন। তিনি (ওয়ারাকা) যদি সেই সময় পর্যন্ত জীবিত থাকিতেন তাহা হইলে তিনি তাঁহাকে সম্ভাব্য সকল প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করিতেন। এই বিবরণ হইতে ইহা স্পষ্ট যে, যদিও ওয়ারাকা খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন তবুও তিনি দুইটি সুনির্দিষ্ট ধারণা পোষণ করিতেন, যেমন 'আল্লাহ্ ওহী' জিবরীল (আ) (নামূস)-এর মাধ্যমে কোন নবীর উপর অবতীর্ণ হইয়া থাকে এবং 'আল্লাহ্ কোন নবী' শীঘ্রই আবির্ভূত হইবেন। বস্তুত ওয়ারাকা নিশ্চিত ছিলেন যে, মুহাম্মাদ হইতেছেন সেই প্রত্যাশিত নবী। ওয়ারাকার প্রাক-বংশপরিচয়, বৃদ্ধ বয়স ও ইয়াহুদী- খৃস্টানদের ধর্মগ্রন্থের সহিত পরিচিতির প্রেক্ষিতে ইহা ধরিয়া লওয়া যুক্তিসঙ্গত যে, তাঁহার উপরিউক্ত ধারণাসমূহ সেই সময়ে বিদ্যমান ধর্মগ্রন্থসমূহ পঠন-পাঠনের ফলে সৃষ্টি হইয়াছিল।
তালিকার দ্বিতীয় ব্যক্তি হইলেন 'উছমান ইব্দুল হুওয়ায়রিছ। তিনি বনূ আসাদ গোত্রভুক্ত এবং ওয়ারাকা ও খাদীজা (রা) উভয়েরই চাচাত ভাই। কারণ 'উছমানের পিতা আল-হুওয়ায়রিছ ছিলেন আসাদ ইবন 'আবদুল 'উয্যা'র আর এক পুত্র। 'উছমানের সত্যধর্মের অনুসন্ধান প্রচেষ্টার সমাপ্তি ঘটে বিদেশী সহায়তায় মক্কায় ধর্মশাসন পরিবর্তনের মধ্য দিয়া, যাহা পরবর্তী অংশে বর্ণনা করা হইবে।
বনূ আসাদ ইব্ন খুযায়মা গোত্রের 'উবায়দুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ এই তালিকার তৃতীয় ব্যক্তি। 'উবায়দুল্লাহ ছিলেন মহানবী -এর ফুফাত ভাই। যেহেতু তাহার মা উমায়মা ছিলেন 'আবদুল মুত্তালিব-এর কন্যা। অন্যান্যদের ন্যায় 'উবায়দুল্লাহ আল-হানীফিয়্যাদের অন্বেষণে পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহ পরিভ্রমণ করেন। মহানবী-এর আহ্বানে সাড়া দিলে তিনি ইসলাম ধর্মে দীক্ষা গ্রহণকারী প্রথম মুসলমানদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হন। তাঁহার স্ত্রী 'উম্মু হাবীবা (রা)-ও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। 'উম্মু হাবীবা ছিলেন বনূ 'আবদ শাম্স গোত্রের আবূ সুফয়ান ইবন হারব-এর কন্যা। 'উবায়দুল্লাহ ও তাঁহার স্ত্রী উভয়ই ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী প্রাথমিক পর্যায়ের মুসলমান এবং তাহারা আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। সেখানে উবায়দুল্লাহ শেষ পর্যন্ত খৃষ্ট ধর্মে প্রত্যাবর্তন করেন এবং ঐ অবস্থায় তাহার মৃত্যু হয়। তাহার স্ত্রী 'উম্মু হাবীবা অবশ্য ইসলাম ধর্মে অবিচল চিত্তে অবস্থান করেন এবং পরবর্তী কালে মহানবী-কে বিবাহ করেন। ৬
যায়দ ইব্ন আমর ইব্ন নুফায়ল-এর কাহিনী সবচাইতে বেশী চিত্তাকর্ষক। ৭ তিনি বনূ 'আদী (ইব্ন কা'ব ইব্ন লু'আয়্যি) গোত্রের লোক ছিলেন। তিনি ছিলেন 'উমার ইবনুল খাত্তাব-এর চাচাত ভাই এবং আল-খাত্তাব ও আমর উভয়ই ছিলেন নুফায়ল-এর পুত্র। যায়দ-এর পুত্র সা'ঈদ উমার-এর ভগ্নী ফাতিমাকে বিবাহ করেন এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়ই প্রথম দিকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। যায়দ মূর্তিপূজার ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত কোন পশুর গোশত গ্রহণ করিতেন না। একইভাবে যে সমস্ত প্রাণী আপনাআপনি মারা যায় উহার গোশত ভক্ষণ ও মদপান হইতেও তিনি বিরত থাকিতেন। তিনি শেষ পর্যন্ত তাহার এই ধরনের মতামতকে গোপন রাখিতেন না এবং কন্যা শিশুকে হত্যার নির্মম জাহিলী প্রথার বিরুদ্ধাচরণ করিতেন; বরং নিজে কন্যা শিশুর ভরণপোষণ করিবেন এইরূপ অঙ্গীকার করিয়া তাহাদের জীবন রক্ষা করিতেন। কখনও কখনও তিনি কা'বাগৃহের পার্শ্বে বসিয়া এইরূপ ঘোষণা দান করিতেন যে, তাহার গোত্রের লোকদের মধ্যে একমাত্র তিনিই ইবরাহীম (আ)-এর ধর্মের অনুসারী এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদা করিতেন। তাহার শপথ পূর্বক মূর্তিপূজা পরিত্যাগ এবং জাহিলী প্রথার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ঘোষণা তাহার স্বীয় পরিজনদের এমনকি চাচাত ভাই আল-খাত্তাবের শত্রুতার সৃষ্টি করে। আল-খাত্তাব এজন্য যায়দের স্ত্রী ও অন্যদেরকে তাহার বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে। এই সকল লোকের শত্রুতা ও বিরুদ্ধতার কারণে যায়দের পক্ষে মক্কায় অবস্থান করা কঠিন হইয়া পড়ে। যে কোনভাবেই হউক, তিনি ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম হানীফিয়্যার সন্ধানে পার্শ্ববর্তী দেশ, বিশেষ করিয়া সিরিয়াতে গমন করেন। সেখানে তিনি খৃস্টান রাহেব ও ইয়াহুদী রাব্বীদের সাক্ষাৎ লাভ করেন। কিন্তু খৃস্ট কিংবা ইয়াহুদী ধর্ম তাহাকে আকর্ষণ করিতে পারে নাই। বর্ণিত আছে যে, তিনি এই দুইটি ধর্মকেও বহু ঈশ্বরবাদী প্রথা দ্বারা কলুষিত বলিয়া মনে করেন। আরও বর্ণিত আছে যে, ইবরাহীম (আ)-এর সত্য ধর্মের বিষয়ে অনুসন্ধানে একজন খৃস্টীয় রাহেব তাহাকে জানান যে, যায়দের নিজ দেশে ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম হানীফিয়্যাসহ একজন নবীর আগমন ঘটিবে এবং সেই নবীর আবির্ভাব খুব শীঘ্রই হইবে। এই তথ্য অবগত হইয়া যায়দ খুব দ্রুত মক্কায় প্রত্যাবর্তন করিতে থাকেন, কিন্তু সিরিয়ার সীমানার মধ্যে থাকা অবস্থায় তিনি কিছু সংখ্যক আততায়ী কর্তৃক নিহত হন। একটি বিবরণী হইতে জানা যায় যে, মহানবী -এর দীনি দাওয়াতের পূর্বে তিনি মক্কায় মহানবী -এর সহিত সাক্ষাত করেন। এই ঘটনা অবশ্যই যায়দের দুর্ভাগ্য কবলিত সিরিয়া ভ্রমণের পূর্বেই সংঘটিত হইয়া থাকিবে। আরও বর্ণিত আছে যে, একদা তাহার পুত্র সাঈদ যায়দের আত্মার মাগফিরাতের জন্য দু'আ করিবেন কিনা এই মর্মে মহানবী -কে জিজ্ঞাসা করিলে মহানবী সম্মতিসূচক মন্তব্য করেন।
এই চার ব্যক্তি ছাড়াও তালিকাভুক্ত অন্যান্য ব্যক্তিগণ সকলে মহানবী -এর সমসাময়িক ছিলেন। তালিকার পঞ্চম ব্যক্তি 'উমায়্যা ইব্ন আবিস সাল্ভ বনূ ছাকীফ গোত্রভুক্ত ছিলেন। তাহার পিতা আবুস সান্ত ইবন 'আবির রাবীআহ'র ন্যায় উমায়্যাও একজন কবি ছিলেন। তিনিও একজন হানীফ এবং সত্যধর্মের অনুসন্ধানকারী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই যে, পৌত্তলিতার প্রতি তাহার কোন বিশ্বাস ছিল না। তিনি মদ্যপানকে বেআইনী বিবেচনা করিয়া ইহা গ্রহণে বিরত থাকিতেন। তিনি খৃস্টান ও ইয়াহুদীদের ধর্মগ্রন্থ পাঠ করিলেও ইহাদের কোন ধর্ম গ্রহণ করেন নাই। ধর্মীয় বিষয়ের উপর ভিত্তি করিয়া তিনি প্রধানত কবিতা রচনা করিতেন, তবে তাহার কবিতায় উল্লেখযোগ্যভাবে স্রষ্টার একক সত্তার প্রতি ইঙ্গিত থাকিত। 'আবূ বাক্স আস-সিদ্দীক (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, একদিন তিনি ও যায়দ ইবন 'আমর কা'বার নিকটে বসিয়াছিলেন। এমন সময় উমায়্যা ইব্ন আবিস সান্ত সেখান দিয়া কোথাও যাইতেছিলেন। তখন যায়দ উমায়্যাকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, তিনি যে সত্য ধর্মের অন্বেষণ করিতেছেন তাহার সন্ধান পাইয়াছেন কিনা। উত্তরে উমায়্যা জানান যে, তিনি এখনও উহার সন্ধান জানিতে পারেন নাই। তখন তিনি একটি স্বরচিত কবিতা আবৃতি করিয়া বলেন যে, আল্লাহ্র নিকট আল-হানীফিয়া ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম গ্রহণীয় নয়। অন্যান্যদের মত তিনিও বিশ্বাস করিতেন যে, সত্য ধর্ম লইয়া শীঘ্রই একজন নবী অবতীর্ণ হইবেন এবং তিনি নিজেই সেই নবী হইবেন বলিয়া আশা পোষণ করিতেন। অতঃপর মুহাম্মাদ যখন নবুওয়াত প্রাপ্ত হইলেন তখন হিংসার বশবর্তী হইয়া উমায়্যা তাহার নবুওয়াতকে অস্বীকার ও তীব্রভাবে বিরোধিতা করিলেন।
তালিকার ৬ষ্ঠ, ৭ম ও ৮ম ব্যক্তি যথাক্রমে 'আমর ইবন 'আবাসা, সিরমাহ ইবন আনাস ও আন-নাবিগা আল-জা'দীকে একত্রে একটি দলে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। কারণ তাঁহাদের সকলেই মুহাম্মাদ -এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। বনূ সুলায়ম গোত্রের 'আমর ইবন 'আবাসা'র স্বীয় ভাষ্য অনুযায়ী জাহিলিয়্যা যুগের মূর্তিপূজাকে তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়া পরিত্যাগ করেন। তিনি মূর্তিপূজারী লোকদিগকে ইহার অসারতা সম্পর্কে অবহিত করিতেন। তিনি আরও জানান যে, একদিন তিনি দেব-দেবী ও উহার পূজার বিরুদ্ধে যখন কথা বলিতেছিলেন তখন উপস্থিত শ্রোতাদের একজন উল্লেখ করেন যে, মক্কায় এক ব্যক্তি (অর্থাৎ মহানবী ) দেব-দেবী ও উহার পূজার বিরুদ্ধে ঠিক অনুরূপভাবে মত প্রকাশ করেন। এই কথা শোনার পর 'আমর মক্কায় আসেন এবং মহানবী -এর নিকট ইসলাম সম্পর্কে তাঁহার বক্তব্য শুনিয়া তিনি তাঁহার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। ১২
অনুরূপভাবে বনূ 'আদী ইবনুন' নাজ্জার গোত্রের সিরমাহ ইবন আনাস জাহিলিয়্যা যুগের মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করিয়া সন্যাস জীবন গ্রহণ করেন এবং নিজের জন্য একটি উপাসনাগৃহ নির্মাণ করিয়া সেখানে অপবিত্র অবস্থায় অন্য সকলের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন। স্ত্রী সহবাসের পর তিনি গোসল করিয়া পরিচ্ছন্ন হইতেন, ঋতুকালীন স্ত্রী সহবাস করিতেন না এবং সকল প্রকার উত্তেজক পানীয় পরিহার করিতেন। তিনি ঘোষণা দিয়া বলিতেন যে, তিনি কেবল ইবরাহীম (আ)-এর এক আল্লাহ্র উপাসনা এবং তাঁহার প্রবর্তিত ধর্মের অনুসরণ করেন। মহানবী যখন মদীনায় হিজরত করেন তখন সিরমাহ ছিলেন খুবই বৃদ্ধ। তিনি মুহাম্মাদ সমীপে উপস্থিত হইয়া তাঁহার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। ১৩
বনূ আমের ইবন সা'সা'আ গোত্রের আন-নাবিগাহ আল-জা'দী জাহিলিয়্যা যুগে এক আল্লাহ্র ইবাদত ও ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম প্রসংগে আলোচনা করিতেন। ইহা ব্যতীত তিনি মৃত্যু-পরবর্তী জীবন, 'আযাব, বেহেশত ও দোযখ সম্পর্কে বিশ্বাস করিতেন। পরবর্তী কালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ১৪ অনুরূপভাবে রিআব ইবনুল বারাআ, 'আবূ 'আমের-আল-'আওসী ও খালিদ ইবন সিনান ইবন গায়ছও পৌত্তলিকতা পরিত্যগ করিয়া এক আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করেন। তিনিও বিশ্বাস করিতেন যে, ইবরাহীম (আ)-এর ধর্মসহ শীঘ্রই একজন নবীর আগমন ঘটিবে। ১৫
এই তালিকার শেষ ব্যক্তি হইলেন আবূ কায়স ইবনুল আসলাত এবং উপরিউক্ত তিন ব্যক্তি হইতে তাহাকে পৃথকভাবে বিবেচনা করিতে হইবে, যদিও তাহাদের কেহই মদীনাতে হানীফ হিসাবে পরিচিত ছিলেন না। মহানবী -এর মদীনাতে হিজরতের পর তিনি মহানবী -এর সহিত সাক্ষাত করিলেও ইসলাম গ্রহণ করিতে পারেন নাই। তিনি ছিলেন একজন কবি এবং 'আওস গোত্রের গণ্যমান্য ব্যক্তি। তিনি তাহার কবিতায় আল-হানীফিয়া সম্পর্কে উল্লেখ করিতেন এবং ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃস্ট ধর্মের পবিত্র গ্রন্থদ্বয়ে একজন নবীর আগমনবার্তার বিষয়টি তাঁহার কবিতা রচনার উপজীব্য বিষয় ছিল। মদীনার ইয়াহুদীগণ তাহাকে ইয়াহুদী ধর্ম গ্রহণের আহ্বান জানাইলেও তিনি তাহা প্রত্যাখ্যান করেন। তাহার দলভুক্ত অন্য অনেকের ন্যায় তিনিও সত্য ধর্মের অন্বেষণে সিরিয়া পরিভ্রমণ করেন। সিরিয়াতে খৃস্টান রাheব ও ইয়াহুদী রাব্বীগণ তাহাদের স্ব স্ব ধর্ম গ্রহণের জন্য আহ্বান জানাইলেও তিনি তাহা গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন। তৎপ্রেক্ষিতে একজন রাহেব তাহাকে জানান যে, আল-হানীফিয়া নামে তিনি যে ধর্মের অন্বেষণ করিতেছেন তাহা ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম এবং ইহা তাহার নিজ দেশে দেখিতে পাইবেন। অতঃপর তিনি মদীনাতে প্রত্যাবর্তন করিয়া উমরা পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় গমন করেন। মক্কায় তিনি যায়দ ইবন 'আমর ইবন নুফায়লের সাথে সাক্ষাত করিয়া আলাপ-আলোচনা করেন। যায়দ তাহাকে বলেন যে, তিনিও খৃস্টান রাহেব ও ইয়াহুদীদের ধর্মকে সঠিক নয় বলিয়া মনে করেন এবং প্রকৃত আল্লাহর ইবাদতের ধর্ম হইতেছে ইবরাহীম (আ)-এর আল-হানীফিয়া। মহানবী মদীনায় হিজরত করিলে 'আবূ কায়স তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিয়া ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য শ্রবণ করেন এবং ইহার সত্যতা অনুধাবন ও তাঁহাকে (মুহাম্মাদ) নবী হিসাবে গ্রহণ করেন। মক্কায় ফিরিবার পথে আবূ কায়স-এর সহিত আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি-এর দেখা হয়। উবায়্যি তাঁহাকে খাযরাজ গোত্রের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করিতে থাকে। ইহাতে তিনি ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি এক বৎসরের জন্য স্থগিত রাখিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই সময়সীমা অতিক্রান্ত হইবার পূর্বেই মহানবী -এর মদীনায় হিজরতের প্রায় ১০ মাস পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ১৬
এই সকল ব্যক্তি ছাড়াও কুস ইব্ন সাইদা, আদ্দাস (উৎবাহ ইবন রাবীআ-এর মাওলা) এবং এমনকি বুসরার রাহেব বাহীরাকেও কেহ কেহ হানীফদের মধ্যে গণ্য করেন। ১৭ কেহ তাহাদিগকে 'আবূ যার আল-গিফারী ও সালমান আল-ফারিসী'র সমপর্যায়ভুক্ত বলিয়া মনে করেন। আবূ যার আল-গিফারী ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করিয়া তিন বৎসর যাবৎ আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করিতে থাকেন। ১৮ পক্ষান্তরে সালমান আল-ফারিসী ইবরাহীম (আ)-এর সত্য ধর্ম আল-হানীফিয়ার দীর্ঘ অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হন। অবশেষে তিনি ইসলাম ধর্মের মধ্যেই চূড়ান্ত সত্যের সন্ধান লাভ করিতে সক্ষম হন। ১৯
উপরের বর্ণনা হইতে ইহা স্পষ্ট যে, সেই সময়ে প্রচলিত বহু ঈশ্বরবাদী ও সর্বব্যাপী পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে এক আকস্মিক বিরাট পরিবর্তনের দ্বারা উপরিউক্ত ব্যক্তিবর্গ কর্মপ্রেরণা লাভ করেন, আবার অন্যভাবে বলিতে গেলে এক আল্লাহ্র প্রতি ইবাদতের জন্য প্রবল আসক্তি অনুভব করেন। ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম আল-হানীফিয়ার সহিত এক আল্লাহর ইবাদতকে তাহারা সমকক্ষ গণ্য করেন। প্রাপ্ত সূত্রসমূহ দ্ব্যর্থহীনভাবে এই সত্যের পক্ষে সমর্থন প্রকাশ করে এবং যাহারা ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম হিসাবে আল-হানীফিয়াকে বিশেষভাবে উল্লেখ ও চিহ্নিত করেন তাহাদের মধ্যে অনেকেই এতদসম্পর্কে তথ্যের পুনরুল্লেখ করেন। এমনকি উমায়্যা ইবন আবিস সাল্ত-এর কবিতায়ও স্পষ্টভাবে আল-হানীফিয়া শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়। অবশ্য তাহাদের অনেকেই স্বীয় লোকদের মধ্যে হানীফ হিসাবে বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন।
ইবরাহীম (আ)-এর ধর্মে প্রত্যাবর্তনের এই ঐকান্তিক আগ্রহ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ইহা একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, পৌত্তলিকতার অন্ধকারে নিপতিত হওয়া সত্ত্বেও আরববাসিগণ তাহাদের উৎস কা'বা শরীফের পবিত্রতা ও ইবরাহীম (আ)-এর অনেক ধর্মীয় আচার ও প্রথা খুঁজিয়া বাহির করিতে সক্ষম হয়। অবশ্য তাহারা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ্র ধারণা সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হয় নাই। ইহাই স্বাভাবিক ছিল যে, এক আল্লাহ্র ইবাদতের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ ঐ সকল পুণ্যাত্মা তাহাদের পূর্বপুরুষের মূল ধর্মের পুনরুজ্জীবন চাহিতেছিলেন। আল-হানীফিয়ার অনুসন্ধান আর একটি প্রমাণ এবং একই সাথে আরবে ইবরাহীম (আ)-এর প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় অনুশাসনের ধারাবাহিকতার একটি পরিণতি। ইহা অবশ্য এই মতের বর্ণনা করে যে, ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃস্টধর্ম সেই সময় আরবদেশে ও সিরিয়ায় প্রাধান্য বিস্তার করিলেও সত্য ধর্মের অনুসন্ধানকারিগণ এই দুইটি ধর্মের প্রশ্নহীন একেশ্বরবাদিতার আবেদন খুঁজিয়া পায় নাই। কারণ তাহাদের অনেকেই এই দুইটি ধর্মের কোনটিই গ্রহণ করে নাই, যদিও এই দুই ধর্মের পণ্ডিত ব্যক্তিদের সহিত তাহাদের সাক্ষাত হইয়াছিল। বস্তুত বহু হানীফ সেই সময়কার ইয়াহুদী ও খৃষ্ট ধর্মকে বিকৃত বলিয়া মনে করিত। ওয়ারাকা ইবন নাওফাল ও 'উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ-এর মত কিছু সংখ্যক সত্যানুসন্ধানকারী যদিও খৃস্টধর্ম গ্রহণ করেন তবুও ওয়ারাকা ইহাকে চূড়ান্ত সত্য হিসাবে মানিয়া লইতে পারেন নাই। কারণ সকল প্রকার বিবেচনা শেষে তিনি এইরূপ ধারণা পোষণ করিতেন যে, আর একজন নবী আসিবেন এবং তাঁহার উপর আল্লাহ্ ওহী অবতীর্ণ হইবে। দ্বিতীয় ব্যক্তি উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ অবশ্য স্বার্থ ও উচ্চাকাংখা সাধনে তৎপর ছিলেন।
তবে এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই যে, মুহাম্মাদ-এর নবুওয়াত লাভের প্রাক্কালে প্রকৃত ধর্মের অনুসন্ধানের একটি উদ্দীপনা এবং সত্য খুঁজিয়া বাহির করিবার একটি প্রবল আগ্রহ চূড়ান্ত গতিবেগ সঞ্চয় করিয়াছিল। মহানবী-এর স্বীয় শহর-সহ ঐ এলাকার বহু চিন্তাশীল ব্যক্তি এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার সহিত যুক্ত ছিলেন এবং তাহাদের মধ্যে মহানবী-এর আপন আত্মীয়-পরিজনও ছিলেন। উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ নিজে একজন চিন্তাশীল ব্যক্তি হইয়া সত্যানুন্ধানের সেই সময়কার উৎসাহ-উদ্দীপনা হইতে নিজকে সম্পূর্ণরূপে সরাইয়া রাখিতে পারেন নাই। তিনি কিভাবে এই প্রচেষ্টার প্রতি সাড়া দিলেন তাহা আলোচনার পূর্বে তাঁহার বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য করা সময়োপযোগী হইবে।
টিকাঃ
৬. ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ২২৩-২২৪।
৭. তাহার জন্য দেখুন, একই পুস্তকের একই পরিচ্ছেদ, পৃ. ২২৪-২৩২; আল-ইসাবা, ১খ., পৃ. ৫৬৯-৫৭০, নং ২৯২৩; আল-ইসতী'আব, ২খ., পৃ. ৬১৪, নং ৯৮২; কিতাবুল আগানী, ২খ., পৃ. ১৩৩।
৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৯-২০১।
৯. তাহার জন্য দ্র. ইব্ন কুতায়বা, আশ-শি'র ওয়াশ-শু'আরা, ১খ., পৃ. ৪৫৯ এবং কিতাবুল আগানী, ৩খ., পৃ. ১৭ প.।
১০. উসদুল গাবা, ৩খ., পৃ. ২০৭, নং ৩০৬৪; আরও দ্র. ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ৬০, কা'বা শরীফের উপর আবরাহার আক্রমণ প্রসংগে উদ্ধৃত কবিতার কিছু পার্থক্য রহিয়াছে। আল-মাস'উদীর মুরূজ, ১খ., পৃ. ৭০-৭১ (দারুল আন্দালুস বৈরূত ১৯৮৩ খৃ. সং. পৃ. ৮৪)-এ তাহার কিছু সংখ্যক কবিতার চরণের উদ্ধৃতি আছে। ইহার একটি চরণের এইরূপ: الْحَمْدُ لله لا شَريكَ لَهُ ، مَنْ لَمْ يَقُلْهَا فَنَفْسُهُ ظُلْمًا .
১১. কিতাবুল আগানী, ৩খ., পৃ. ১৮৭।
১২. মুসনাদ আহমাদ, ৪খ., পৃ. ১১১, ১১৪; মুসলিম, কিতাবু সালাতিল মুসাফিরীন, বাব ৫৩, হাদীছ নং ৩৯৪, পৃ. ৮৩২; নববী, ৪খ., পৃ. ১১৪-১১৫; উসদুল গাবা, ৩খ., পৃ. ২১০; আল-ইসতীয়াব, ১খ., পৃ. ১১৯২-১১৯৪, হাদীছ নং ১৯৩৬।
১৩. আল-ইসাবা, ২খ., পৃ. ১৮২-১৮৩, নং ৪০৬১।
১৪. আল-ইসতী'আব, ৪খ., পৃ. ১৫১৪, নং ২৬৪৮।
১৫. ইব্ন কুতায়বা, আল-মা'আরিফ (সম্পা. ছারওয়াত উকাশা), কায়রো, তা. বি., ৫৮-৬৮; আল-মাস'উদী, মুরূজ, ১খ. (সম্পা. এম.এম. আবদুল হামীদ), বৈরূত, তা. বি., পৃ. ৬৭-৬৯।
১৬. ইব্ন সাদ, ৪খ., পৃ. ৩৮৩-৩৮৫।
১৭. ইব্ন কুতায়বা, পূর্বে উল্লিখিত, পৃ. ৬১; আল-মাস'ঊদী, মুরূজ, ১খ., পৃ. ৬৯, ৭৪, ৭৫।
১৮. মুসনাদ আহমাদ, ৫খ., পৃ. ১৭৪; আল-ইসতী'আব, ১খ., পৃ. ২৫২-২৫৬।
১৯. ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ২১৪-২২২; আয-যাহাবী, সিয়ার, ১খ., পৃ. ৫০৫-৫৫৭।
📄 দুই: উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ-এর প্রসংগ
খাদীজা (রা) ও ওয়ারাকা ইবন নাওফাল-এর চাচাত ভাই 'উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ কুরায়শ গোত্রের মধ্যে সবচাইতে বুদ্ধিমান ও সঙ্গতিসম্পন্ন ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন। ২০ অন্যান্যদের মত তিনিও সত্যানুসন্ধানের জন্য সফর করেন এবং সিরিয়ায় গমন করিয়া সেখানে খৃস্টধর্ম গ্রহণ করেন। তবে তাহার খৃস্টধর্মের দীক্ষা গ্রহণ কোন স্বার্থশূন্য ছিল না। তিনি মক্কার শাসক হইবার জন্য একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন যাহাতে বায়যাণ্টীয় শক্তির সাহায্যে মক্কার শাসন ক্ষমতা হাতে লইয়া ইহার অধিবাসীদিগকে খৃস্টধর্মে দীক্ষিত করিতে পারেন। ২১ ইবন ইসহাকের বর্ণনামতে তিনি বায়যান্টীয় শাসনকর্তার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া তাহার জন্য তৎকর্তৃক মক্কা অবরোধের এবং মক্কাবাসী কর্তৃক তাহাকে কর প্রেরণের ব্যবস্থার জন্য প্রস্তাব করেন। তিনি পরামর্শ দেন যে, মক্কাবাসিগণ যদি এই প্রস্তাব মানিয়া লইতে সম্মত না হয় তাহা হইলে বায়যাণ্টীয় শাসক কর্তৃক সিরিয়ার সহিত মক্কার বাণিজ্য বন্ধ করিয়া দিয়া তাহাদিগকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করা হইবে। ২২ বায়যাণ্টীয় শাসক স্বাভাবিকভাবে এই পরিকল্পনায় একটি সুযোগের সন্ধান দেখিতে পান, যাহাতে আরবের হৃদয় হিসাবে পরিচিত এবং বাণিজ্যিকভাবে সমৃদ্ধ ও ধর্মীয় দিক দিয়া কেন্দ্রীয় নগরী মক্কাকে করতলগত করিয়া ইহাকে গাস্সানীয় রাজ্যের মত একটি করদ রাজ্যে পরিণত করিতে পারিবেন। তাহার উদ্দেশ্য সাধনে একটি সহজ পথ হিসাবে এই পরিকল্পনা তাহার অন্তরকে নাড়া দিতে পারিয়াছিল। কারণ ত্রিশ বৎসর পূর্বে মক্কা বিজয়ের জন্য আবরাহার সামরিক বাহিনী ব্যর্থ হইয়াছিল। তদনুযায়ী বায়যাণ্টীয় শাসক উছমানকে মক্কার গভর্নর নিযুক্ত করেন ২৩ এবং ইহার অধিবাসীদিগকে তাহার বশ্যতা স্বীকারের জন্য পত্র প্রেরণ করেন। ২৪
উছমান সিরিয়া হইতে এই ক্ষমতা লাভ করিয়া মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং কুরায়শদিগকে তাহাদের শাসক হিসাবে তাহাকে মানিয়া লওয়ার নির্দেশ জারী করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, তাহারা যদি ইহা মানিতে অস্বীকার করে তাহা হইলে বায়যান্টীয় শাসক কর্তৃক সিরিয়ার সহিত বাণিজ্যের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হইবে। ২৫ মক্কাবাসিগণ সর্বজনীনভাবে এই দাবির বিরোধিতা করে এবং তাহার গোত্রভুক্ত জনৈক আসওয়াদ ইব্ন আসাদ ইব্ন আবদুল উয্যা ২৬ এই বিরোধিতায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি সমগ্র কুরায়শ শাখাগোত্রগুলিকে বিরোধিতা করিবার জন্য সংগঠিত করেন। এইভাবে স্বীয় সমর্থন লাভে ব্যর্থ হইয়া উছমান সিরিয়ায় পালাইয়া যাইতে বাধ্য হন। তিনি তবুও তাহার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে হতোদ্যম না হইয়া সিরিয়ার বায়যাণ্টীয় কর্তৃপক্ষকে সিরিয়ার সহিত মক্কার ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করিয়া দেওয়ার জন্য উসকানি দিতে থাকেন। অতঃপর মক্কার দুইজন প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী সাঈদ ইবনুল আসী ইবন উমায়্যা ও আবূ যে'ব (অর্থাৎ হিশাম ইব্ন শু'বাহ ইব্ন আবদুল্লাহ) সিরিয়া গমন করিলে তাহাদিগকে গ্রেপ্তার করিয়া জেলে অন্তরীণ করিয়া রাখা হয়। আবূ যে'ব জেলখানায় মৃত্যুমুখে পতিত হন। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে কুরায়শ নেতা আল-ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা সিরিয়া গমন করেন এবং দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর সাঈদকে মুক্ত করিতে সক্ষম হন। আল-ওয়ালীদ-এর কূটনৈতিক তৎপরতা এবং আরবদের সহিত বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখিবার বায়যাণ্টীয় কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনে উছমানের পরিকল্পনা সম্পূর্ণ পাল্টাইয়া যায় এবং অল্পকাল পরেই তাহাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। একটি তথ্য অনুযায়ী আমর ইব্ন জাফনা আল-গাস্সানী তাহাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করে। এই আমর ছিল বায়যান্টীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিয়োজিত একজন অফিসার যাহাকে মক্কাবাসীদের বাণিজ্য অবরোধ ও মক্কার ব্যবসায়ীদের কারাগারে আটক করিবার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ২৭
এইভাবে উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ-এর ঘটনার পরিসমাপ্তি ঘটে। ইহা অবশ্যই ফিজার যুদ্ধের পরের ঘটনা এবং খুব সম্ভব কা'বাগৃহ পুনর্নির্মাণের নিকটবর্তী সময়ে ইহা ঘটিয়া থাকিবে। মহানবী-এর প্রায় ৩৫ বৎসর বয়সের সময় কা'বাঘর পুনঃনির্মিত হয়। মক্কায় একটি কেন্দ্রীয় ও সিদ্ধান্তদানক্ষম কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতিতে উছমানকে এইরূপ উচ্চাভিলাসী পদক্ষেপ গ্রহণে সম্ভবত প্ররোচিত করিয়াছিল। তাহার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় ইহা প্রমাণিত হয় যে, সেই সময়ে মক্কার শাসনব্যবস্থা যাহাই থাকুক না কেন এবং আন্ত-গোত্রীয় দ্বন্দ্বের প্রকৃতি ও ব্যাপ্তি যেমনই হউক না কেন, কুরায়শ বংশ কোন বৈদেশিক হস্তক্ষেপ হইতে তাহাদের স্বাধীনতা রক্ষার মূল বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করিত।
এই ঘটনা প্রসংগে প্রাচ্যবিদগণ বেশ কিছু সংখ্যক ধারণা পোষণ করিয়া লয়। ওয়াট ইসলামের উত্থানকে মক্কার রাজনীতি ও উচ্চ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করিতে পছন্দ করেন। তিনি দুইটি বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্র বায়যান্টীয় ও পারস্য সাম্রাজ্যের মধ্যে মক্কার নিরপেক্ষতার নীতিকে এই বিষয়টির সহিত সম্পৃক্ত করেন। তিনি বলেন, অন্যান্য কারণ থাকা সত্ত্বেও মক্কাবাসিগণ উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছকে প্রত্যাখ্যান করে। কারণ তাহারা মনে করে যে, তাহাদের নিরপেক্ষতার নীতি হইতে সরিয়া আসা বিজ্ঞজনোচিত হইবে না। ওয়াটের নিরপেক্ষতার তত্ত্বের সামগ্রিকভাবে অগ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি সম্পর্কে পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে। এখানে শুধু এইটুকুই যোগ করা যাইতে পারে যে, অপর ক্ষমতাশালী রাষ্ট্র পারস্য সাম্রাজ্য মক্কাকে তাহাদের নিয়ন্ত্রণে আনয়নের কোনরূপ উদ্যোগ গ্রহণ করে নাই। তাই এই দুই শক্তিশালী রাষ্ট্রের মধ্যে কোন নিরপেক্ষতার নীতি অবলম্বনের প্রশ্ন বর্তমান ক্ষেত্রে উঠিতে পারে না। উছমান-এর অভিসন্দির বিপক্ষে মক্কার বিরুদ্ধতার সাধারণ কারণ উছমানের জ্ঞাতি আসওয়াদ-এর মতে, মক্কার স্বাধীন সত্তা। মক্কা কখনও এইরূপ কোন বাদশাহর অধীনে শাসিত হয় নাই এবং এইরূপ কোন অধীনতা মানিয়া লয় নাই। ২৯ দুইটি বৃহৎ শক্তির মধ্যে নিরপেক্ষতার নীতি অবলম্বনের বিষয়টির সহিত মক্কা কর্তৃক উছমানের প্রতারণাপূর্ণ দাবি প্রত্যাখ্যানকে ব্যাখ্যা করিবার প্রয়োজন হয় না, যখন সে একটি প্রতিষ্ঠিত ধর্মকে পরিত্যাগ ও একটি বৈদেশিক শক্তির ক্রীড়নকে পরিণত হইয়াছিল। এই অসৎ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য এমন ছিল যে, সে কেবল মক্কার শাসকই হইবে না, সেখানকার প্রতিষ্ঠিত ধর্মের পরিবর্তে খৃস্টধর্মের প্রচলন করিবে। যদি তাহার ধর্মবিশ্বাস পরিত্যাগ নাও করিত এবং এমনকি বিদেশী অনুচর হিসাবে কাজ করিত, তবুও মক্কাবাসীদের প্রতিক্রিয়া একই রকম হইত।
ওয়াট হিলফুল ফুযূল সম্পর্কে তাহার তত্ত্বের সহিত এই ঘটনার একটি যোগসূত্র সৃষ্টি করিতে প্রয়াস পাইয়াছেন। তাই তিনি বলেন যে, হিল্ল্ফ-এর বাহিরে যদি বনু উমায়্যা ও বনূ মাখযূম গোত্র উছমান-এর বিরোধিতা করিবার জন্য আগাইয়া আসিত তাহা হইলে "ইহা ফুযূলের মৈত্রীবদ্ধতাকে মহাজীবন দান করিতে পারিত"। কিন্তু "নেতৃত্বদানের জন্য আসাদ গোত্রের একজন সদস্যকে পাওয়ার ফলে এইরূপ একটি পরিণতি এড়ান গিয়াছিল"।৩০ কোন উৎস গ্রন্থের সমর্থন ছাড়াই ইহা সম্পূর্ণ একটি অনুমান মাত্র। হিলফুল ফুযূল শুরু হইতেই দুর্বল ও অকার্যকর এইরূপ ধারণা ছিল সম্পূর্ণরূপে ত্রুটিপূর্ণ। এই ধারণার ভিত্তিহীনতা সম্পর্কে পূর্বেই আলোকপাত করা হইয়াছে। ৩১ উছমানের নিজের গোত্র বনূ আসাদ অবশ্যই হিল্ল্ফ-এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু উৎস গ্রন্থাদিতে এমন কোন ইঙ্গিত পাওয়া যায় না যে, এই দলের স্বার্থে তিনি কাজ করিয়াছিলেন। হিলফ্টভুক্ত অন্যান্য গোত্রসমূহ তাহাদের অবস্থানের উন্নতি ঘটাইবার জন্য তাহার এই প্রচেষ্টাকে কোনভাবেই বিবেচনাপ্রসূত বলিয়া দেখে নাই অথবা উৎস গ্রন্থাদিতে এমন কোন ইঙ্গিত নাই যে, উমায়্যা ও মাখযূমের মত গোত্রসমূহ হিল্ফের সহিত তাহাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আলোকে বিষয়টিকে বিবেচনা করিয়াছে এবং তাহা ছাড়া উছমানের বিরোধিতা করিবার জন্য বনূ আসাদ গোত্রের কাহাকেও অগ্রণী ভূমিকা পালনের উদ্দেশ্যে পাওয়ার কোন চেষ্টা করে নাই। যদি ঘটনাটি হিল্ফ ও তাহাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলির কোন বিষয় হইত তাহা হইলে ইহা বিশ্বাস করিবার কোন কারণ ছিল না যে, বনু আসাদ গোত্রের আল-আসওয়াদ ইব্ন আসাদ-এর মত একজন নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি তাহার গোত্রীয় স্বার্থ অনুধাবনে ব্যর্থ হইবেন এবং তাহার পরিবর্তে বিপক্ষ দলের হাতের ক্রীড়নকে পরিণত হইবেন। অধিকন্তু ইহাও বিশ্বাসযোগ্য নয় যে, তাহার স্বীয় গোত্রের অন্যান্য নেতৃবর্গও তাহাকে ঐ ভূমিকা পালনের জন্য সমর্থন দান করিবেন। ওয়াট ঘটনাটির এইসব দিক উপেক্ষা করিয়া একটি অনুমানের উপর আরেকটি অনুমান দাঁড় করাইয়াছেন। এই সকল অনুমান এইরূপ ধরিয়া লওয়া ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত যে, হিল্ল্ফ-এর নেতৃবর্গ তাহাদের প্রতিদ্বন্দ্বিগণের ছল-চাতুরী যেন না বুঝিবার মত যথেষ্ট পরিমাণে বোকা ছিলেন। তবে যাহাই ঘটুক না কেন-বনূ মাখযূম ও বনূ উমায়্যার লোকেরা এই ঘটনার বিষয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে পর্দার অন্তরালে ছিল- ওয়াট-এর এই প্রাথমিক ধারণা ছিল ভ্রান্ত। কারণ বনূ মাখযূম গোত্রের অধিপতি আল-ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা প্রকৃতপক্ষে এই ঘটনার চূড়ান্ত দৃশ্যে প্রধান ভূমিকা পালন করেন এবং তিনিই উছমানের পতন ঘটান।
এই প্রসংগে তৃতীয় অনুমানটি মূলত মারগোলিয়থের সৃষ্ট এবং পরবর্তীতে ওয়াট ইহা গ্রহণ করেন। ইহা এইরূপ যে, উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ-এর ঘটনার প্রেক্ষিতে মুহাম্মাদ তাহার খৃস্টধর্ম অথবা ইয়াহুদী ধর্ম গ্রহণের ফলে যে রাজনৈতিক জটিলতার সৃষ্টি হইয়াছিল সে সম্পর্কে সতর্ক ছিলেন। তাই তিনি (মুহাম্মাদ) এইরূপ রাজনৈতিক জটিলতামুক্ত এক আল্লাহ্ ইবাদতের ধর্ম প্রচলনে আগাইয়া আসেন। স্পষ্টতই এইরূপ ধারণার আর একটি ভিত্তি পাওয়া যায় যে, মুহাম্মাদ নবী হওয়ার জন্য সচেতনভাবে সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছিলেন।
এইরূপ অনুমানের ত্রুটি সম্বন্ধে পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে। ৩২ ইহা ছাড়া ওয়াটের এই ব্যাখ্যা আর একটি প্রতারণাদোষে দুষ্ট। ইহা এইরূপ অর্থ প্রকাশ যে, সেই সময়কার খৃস্টধর্ম ও ইয়াহুদী ধর্ম স্পষ্ট ও সন্দেহাতীতভাবে একশ্বরবাদের প্রচারকার্যে নিয়োজিত ছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই দুইটি ধর্মের ভূমিকা তাহা ছিল না এবং সত্য অনুসন্ধানকারীদের আচরণের মাধ্যমে ইহা বিস্তারিত প্রকাশ করা হইয়াছে। এই দুইটি ধর্মের সত্যতা অনুসন্ধানকারীদের অধিকাংশই কোন সন্তোষজনক ফলাফল লাভ করিতে না পারিয়া ইহাদের কোনটিকেই গ্রহণ করা হইতে বিরত থাকে। এই তথ্য প্রমাণ করে যে, খৃস্টধর্ম ও ইয়াহুদী ধর্মের বিকল্প-এক আল্লাহর ইবাদতের কোন ধর্ম প্রচারের জন্য মুহাম্মাদ-কে রাজনৈতিক বিবেচনার আশ্রয় গ্রহণ করিতে হইবে। ওয়াটের বর্ণনা মোতাবেক ইসলাম শুধু আরবদের নিকট কোন বিকল্প এক আল্লাহ্ ইবাদতের ধর্মমাত্র ছিল না, যাহা খৃষ্টধর্ম ও ইয়াহুদীদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা হারাইয়া আসিয়াছে। ৩৬
টিকাঃ
২০. আল-ফাসী, আল-ইকদুছ-ছামীন ইত্যাদি, ১খ., পৃ. ১৫৩।
২১. মুহাম্মাদ ইব্ন হাবীব আল-বাগদাদী, কিতাবুল মুনাম্মিক ফী আখবার কুরায়শ, সম্পা. খুরশিদ আহমাদ ফরিক, বৈরূত ১৯৮৫ খৃ., পৃ. ১৫৪।
২২. সুহায়লী, আল-রাওদুল উনুফ, ১খ., পৃ. ২৫৫।
২৩. পূর্বোক্ত বরাত।
২৪. গ্রাগুক্ত, আরও দ্র. আল-ফাসী, পূর্বোক্ত।
২৫. পূর্বোক্ত বরাত।
২৬. তিনি উছমানের চাচা হন। তবে আল-ফাসী ঐ বিরোধিতাকারী ব্যক্তিকে আবূ জাম'আহ নামে অভিহিত করিয়া উছমান-এর চাচাত ভাই হিসাবে বর্ণনা করিয়াছেন।
২৭. সুহায়লী, পূর্বোক্ত।
২৮. ওয়াট, এম, এট এম. পৃ. ১৬।
২৯. সুহায়লী, পূর্বোক্ত।
৩০. ওয়াট, এম, এট এম, ১৬।
৩১. প্রাগুক্ত, পৃ. ২২৭-২২৮।
৩২. প্রাগুক্ত, পরিচ্ছেদ ১০।
৩৩. ওয়াট, Muhamad's Mecca, পৃ. ৩৮।